📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ২. জিনার হদ

📄 ২. জিনার হদ


জিনা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও জঘন্য একটি কাজ। জিনাকারী ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির শত্রু। জিনার কারণে মানুষের প্রকৃত পরিচয় ও বংশ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। কারণ, জিনার ব্যাপকতার কারণে প্রকৃতভাবে কে কার সন্তান, এটা নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতেও জিনা অত্যন্ত জঘন্য একটি অপরাধ ও কবিরা গুনাহ।

সংগত কারণেই জিনার ক্ষেত্রে ইসলাম কঠিন হদ নির্ধারণ করেছে। সমাজ থেকে যেন জিনা নির্মূল হয়ে যায়, সে ব্যাপারে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

জিনার হদের পরিমাণ
অবিবাহিত নারী-পুরুষের জিনার হদ হলো, একশ বেত্রাঘাত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে বলেন:
“ব্যভিচারী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকরণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।”

আর বিবাহিত নারী-পুরুষের জিনার হদ হলো মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত পাথর মারতে থাকা। উবাদা বিন সামিত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
‘তোমরা আমার নিকট থেকে বিধান জেনে নাও। তোমরা আমার নিকট থেকে বিধান জেনে নাও। আল্লাহ তাআলা নারীদের সতীত্ব রক্ষার জন্য পথ বাতলে দিয়েছেন। অবিবাহিত নারী-পুরুষ জিনা করলে শাস্তি একশ বেত্রাঘাত। আর বিবাহিত নারী-পুরুষ জিনা করলে একশ বেত্রাঘাত ও প্রস্তরাঘাতে হত্যা।’

জাবির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত :
'জনৈক ব্যক্তি এক নারীর সাথে জিনা করেছিল। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে তাকে বেত্রাঘাত করা হলো। অতঃপর সংবাদ দেওয়া হলো যে, সে বিবাহিত। তখন তিনি তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার আদেশ দিলেন। অতঃপর তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হলো।'

পূর্বের মতো এখানেও একটি কথা স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের সন্দেহ থাকলে এই হদও রহিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ জিনার অভিযোগে অভিযুক্ত নারী-পুরুষ থেকে জিনার হদ রহিত হয়ে যাবে, যদি উপযুক্ত প্রমাণ না থাকে। শাস্তি যেহেতু অনেক বড়, তাই অপরাধও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ খুঁত থাকলে হদ প্রয়োগ করা যাবে না।

উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'তোমরা যথাসম্ভব হদসমূহ প্রতিহত করো।'

টিকাঃ
৫০৯. সুরা আন-নুর: ২
৫১০. সহিহ মুসলিম: ৩/১৩১৬, হা. নং ১৬৯০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৫১১. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১৫১, হা. নং ৪৪৩৮ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ。
৫১২. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ৭/৪০২ (আল মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৩. মদপানের হদ

📄 ৩. মদপানের হদ


মদ মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলে। মদপান করলে মানুষের আকল ও বুদ্ধি-বিবেক ঠিক থাকে না। তখন সে উন্মাদের মতো অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে।

মদ কাকে বলে, এ বিষয়ে আহলে ইলমদের মাঝে কিছুটা মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, আঙুর, খেজুর, জলপাই, জব, গম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি নেশা জাতীয় প্রতিটি জিনিসই মদ। আবার কেউ কেউ বলেছেন, শুধুমাত্র আঙুর দিয়ে তৈরি নেশা জাতীয় বস্তুই মদ। তবে মদের গুণাগুণ যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সেটার হুকুমও মদের মতোই হারাম। প্রকৃত মদ কাকে বলে, এ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও সকলেই কিন্তু একটি বিষয়ে একমত যে, মদ যেরকম হারাম তদ্রূপ প্রতিটি নেশা জাতীয় বস্তুই হারাম। যে জিনিস মানুষের আকলকে পরিবর্তন করে ফেলে সেটাই হারাম।

আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'প্রতিটি নেশা জাতীয় দ্রব্যই মদ। আর প্রত্যেক নেশা জাতীয় জিনিসই হারাম।'

বড় বড় অপরাধ ও গুনাহের কারণে দুনিয়াতেই কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। মদপান করা সে সকল অপরাধেরই একটি। মদপানকারীর হদ বা শাস্তি হলো আশি বেত্রাঘাত।

আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'রাসুলুল্লাহ ﷺ এক লোককে মদপান করার অপরাধে খেজুরের দুটি ডাল দিয়ে চল্লিশটি আঘাত করেন। তিনি (আনাস) বলেন, আবু বকর ও এমনটি করেছেন। অতঃপর উমর-এর খিলাফতের সময় তিনি সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন। তখন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ বললেন, সর্বনিম্ন হদ হলো আশিটি বেত্রাঘাত। অতঃপর উমর মদপানের ক্ষেত্রে এ হদ প্রদানের আদেশ দেন।'

সায়িব বিন ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সময় এবং আবু বকর ও উমর-এর খিলাফতের শুরুর দিকে মদ পানকারীর দিকে ধেয়ে যেতাম। আমাদের হাত, জুতা ও চাদর দিয়ে তাকে প্রহার করতাম। এরপর উমর স্বীয় খিলাফতের শেষভাগে এর জন্য চল্লিশটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করলেন। অতঃপর তারা যখন অবাধ্য হয়ে গেল এবং পাপাচারে আরও বেশি লিপ্ত হতে থাকল, তখন তিনি তাদের আশিটি করে বেত্রাঘাত করলেন।'

খালিদ বিন ওয়ালিদ পত্রবাহকের মাধ্যমে উমর-এর নিকট লিখে পাঠালেন :
'মানুষ মদপানে লিপ্ত হয়ে গেছে এবং তারা এর জন্য নির্ধারিত শাস্তিকে তুচ্ছ মনে করছে। উমর (পত্রবাহককে) বললেন, এরা তোমার পাশে আছে, এদের জিজ্ঞেস করো। সে সময় তাঁর পাশে আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণ বসা ছিলেন। অতঃপর পত্রবাহক তাঁদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা সকলে একমত হলেন যে, মদপানকারীকে আশি বেত্রাঘাত করা হবে।'

আর সে যদি মদপান না ছেড়ে মদপান করতেই থাকে, আর প্রতিবারই তার ওপর হদ প্রয়োগ করা হয়; তবুও সে তৃতীয়বারের হদ ডিঙিয়ে চতুর্থবারেও মদপান করে, তবে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'যদি সে মদপান করে, তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করো। এরপর সে যদি আবার পান করে, তাহলে আবার বেত্রাঘাত করো। এরপর যদি তৃতীয়বার পান করে, তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করো। যদি চতুর্থবার পান করে, তাহলে তাকে হত্যা করো।'

টিকাঃ
৫১৩. মুসনাদু আহমাদ: ৮/২৬৯, হা. নং ৪৬৪৫ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ。
৫১৪. সহিহু মুসলিম: ৩/১৩৩০, হা. নং ১৭০৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৫১৫. সহিহুল বুখারি: ৮/১৫৮, হা. নং ৬৭৭৯ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৫১৬. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১৬৬-১৬৭, হা. নং ৪৪৮৯ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান。
৫১৭. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১৬৪, হা. নং ৪৪৮৪ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ。

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৪. অপবাদের হদ

📄 ৪. অপবাদের হদ


এখানে অপবাদ বলতে বুঝানো হয়েছে, সতী নারীকে জিনা-ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। কেবল নোংরা চরিত্রের অধিকারী, ধারণাপ্রবণ অবিশ্বাসীরাই এমন অন্যায়মূলক কথা বলার দুঃসাহস দেখিয়ে সতী স্বাধীন ও পবিত্র-চরিত্রের নারীদের অপবাদ দিতে পারে; তাদের মর্যাদা, পবিত্রতা ও সততার ওপর আঘাত করতে পারে।

একজন স্বাধীন সতী নারী সব ধরনের অপবাদ থেকে নিজেকে সর্বাত্মকভাবে রক্ষা করে। সে নিজের সতীত্ব রক্ষা ও নিজেকে পবিত্র রেখে সব ধরনের অপবাদ থেকে আত্মরক্ষাকে ইমান ও আকিদার পর সবচেয়ে বড় ও পবিত্র দায়িত্ব মনে করে। সে কিছুতেই তার ওপর মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে পারে না এবং তা মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে কিছু জঘন্য নোংরা চরিত্রের অধিকারী লোক সতী-সাধ্বী নারীর পরিচ্ছন্ন, শুভ্র ও পবিত্র চরিত্রের ওপর কলঙ্কের দাগ দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এ অপরাধ ছোট বা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি বড় ও জঘন্য একটি অপরাধ।

স্বাধীন সতী নারীদের অপবাদদাতাদের কঠিন শাস্তির ধমকি দিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে বলেন :
“যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ইমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকালে ও পরকালে ধিকৃত হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি।”

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
'তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক অপরাধ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সেগুলাে কী? তিনি বললেন, আল্লাহ সাথে শরিক করা, জাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, অন্যায়ভাবে নিরপরাধ লোককে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা ও সতী-সাধ্বী সরলমনা ইমানদার নারীদের অপবাদ দেওয়া।'

যারা সতী-সাধ্বী সরলমনা ইমানদার নারীদের অপবাদ দেয়, ইসলাম তাদের জন্য কঠিন শাস্তি আবশ্যক করেছে। যাতে তারা তাদের এই নিকৃষ্ট কাজের সাজা পায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করার দুঃসাহস না পায়। অন্যরাও যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং এ ধরনের অশ্লীল কথা মুখে উচ্চারণ করার দুঃসাহস না দেখাতে পারে।

সতী নারীদের মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত না করে, তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। আর এরাই নাফরমান।”

কেউ সতী-সাধ্বী সরলমনা ইমানদার নারীদের মিথ্যা অপবাদ দিলে তার ওপর হদ ওয়াজিব হয়ে যায়। আর তার হদ হলো আশিটি বেত্রাঘাত; যেমনটি উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও আজীবনের জন্য তার কোনো ধরনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। যদিও সাক্ষ্য গ্রহণ করা-না করার মাসআলার ক্ষেত্রে আহলে ইলমদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি মনে তাওবা করলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। আর অন্যরা বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।

টিকাঃ
৫১৮. সুরা আন-নুর : ২৩
৫১৯. সহিহুল বুখারি : ৪/১০, হা. নং ২৭৬৬ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৫২০. সুরা আন-নুর: ৪

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৫. ডাকাতির হদ

📄 ৫. ডাকাতির হদ


ডাকাতি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অস্ত্র বা শক্তি দেখিয়ে কারও সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে ডাকাতির চারটি প্রকার রয়েছে। প্রত্যেক প্রকারের জন্য আলাদা আলাদা বিধান। এক : ডাকাতি করতে এসে শুধু সম্পদ লুট করবে, কিন্তু কাউকে হত্যা করবে না। দুই: সম্পদ নেবে না, কিন্তু কাউকে হত্যা করবে। তিন: সম্পদও নিয়ে যাবে এবং কাউকে হত্যাও করবে। চার: সম্পদ ছিনতাই বা হত্যা কোনোটিই করবে না; বরং শুধু ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি করবে। সুতরাং প্রথম প্রকারের ক্ষেত্রে অপরাধীর হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ ডান হাত ও বাম পা কিংবা বাম হাত ও ডান পা কেটে ফেলা হবে। দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে অপরাধীকে অন্য কোনো শাস্তি দেওয়া ছাড়া সরাসরি হত্যা করা হবে। তৃতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে অপরাধীর হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে তারপর তাকে শূলীতে চড়িয়ে হত্যা করবে। চতুর্থ প্রকারের ক্ষেত্রে তাকে দেশান্তর করবে। ৫২১

আল্লাহ তাআলা বলেন :
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।”

আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'উকল গোত্রের কিছু লোক মদিনায় আসল। (কিন্তু মদিনার আলো-বাতাস তাদের অনুকূলে ছিল না। তাই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল।) তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের উটের দুধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দিলেন। তারা যখন তা পান করল, তখন সুস্থ হয়ে গেল। এরপর তারা উটের রাখালদের হত্যা করে জন্তুগুলো ছিনতাই করে নিয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট সকাল বেলা এই সংবাদ পৌঁছল। তখনই তিনি তাদের ধাওয়া করে ধরার জন্য একদল লোক পাঠালেন। দুপরের আগেই তাদের ধরে নিয়ে আসা হলো। তখন তিনি তাদের হাত পা কাটার এবং চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাদের উত্তপ্ত রোদের মধ্যে ফেলে রাখা হলো, এমনকি তারা পানি পান করতে চাইলে তাদের পানি পর্যন্ত দেওয়া হলো না। আর এভাবেই তাদের মৃত্যু হলো।'

'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে যুদ্ধ করে' এ কথা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যারা ডাকাতি করে মানুষের ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। এর জন্য প্রয়োজনে মানুষও হত্যা করে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ফলে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, নিজেদের জানমালের ব্যাপারে তারা সর্বদা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

সুতরাং এই নির্দয় বিপথগামী লোকদের ব্যাপারে কোনো ধরনের দয়া, সহানুভূতি ও নমনীয়তা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ, তারা দয়া ও কোমল আচরণ পাওয়ার উপযুক্ত নয়; বরং তারা কঠিন শাস্তির উপযুক্ত। যাতে এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর দেহ থেকে এই পচা দূষিত অংশটুকু বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহ আতঙ্কমুক্ত নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে। তাদের জন্য ইসলামের নির্ধারিত হদ বা শাস্তি হলো, উল্লিখিত কুরআনের আয়াতে যা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মালামাল লুটের ক্ষেত্রে বিপরীত দিক থেকে তার হাত-পা কেটে দেওয়া হবে। আর শুধু হত্যার ক্ষেত্রে তাকেও হত্যা করা হবে। আর যদি সে লুট ও হত্যা উভয়টি করে তাহলে বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে তারপর শূলীতে চড়িয়ে হত্যা করা হবে। যেন এ ভয়ংকর শাস্তি দেখে জীবনে আর কেউ ডাকাতির সাহস না করে। এটাই ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে, সে কোনো ধরনের অপরাধকে সামান্য পরিমাণ প্রশ্রয় না দিয়ে গোড়া থেকে সেটাকে উপড়ে ফেলে। আর লুট বা হত্যা কোনোটিই না করলে বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধে তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।

সমাজ ও জাতির শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য ইসলাম এই পাঁচ ধরনের হদ বা শাস্তি নির্ধারণ করেছে। এই হদগুলো এমন যে, এগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো যাবে না। আর ক্ষমা করার তো প্রশ্নই আসে না। এ ক্ষেত্রে কারও থেকে কোনো ধরনের সুপারিশও গ্রহণীয় হবে না। কারণ, এ ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ নমনীয়তা উম্মাহকে কঠিন ঝুঁকি ও বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে।

বি.দ্র.: আমরা যে সকল কিসাস ও হুদুদের কথা উল্লেখ করলাম, ইসলামি রাষ্ট্রই কেবল এগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। আর এ সকল বিধান বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও ইসলামি রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্র তার শক্তি ও প্রভাব দিয়ে অপরাধ দমনের জন্য এ সকল কিসাস, হুদুদ ও তাজিরসহ ইসলামের প্রতিটি বিধানই বাস্তবায়ন করবে। রাষ্ট্র ব্যতীত অন্য কেউ এ সকল বিধান বাস্তবায়ন করতে সক্ষম নয়। কারণ, একমাত্র রাষ্ট্রেরই হুদুদ ও কিসাসগুলো বাস্তবায়ন করা ও তার পরবর্তী বিশৃঙ্খলা কঠিন হাতে দমন করার শক্তি আছে।

টিকাঃ
৫২১. বাদায়িউস সানায়ি: ৭/৯৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৫২২. সুরা আল-মায়িদা : ৩৩
৫২৩. সহিহুল বুখারি: ৮/১৬৩, হা. নং ৬৮০৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)

ফন্ট সাইজ
15px
17px