📄 ১. চুরির হদ
কারও অনুপস্থিতিতে বা অমনোযোগিতার সুযোগ নিয়ে তার রক্ষিত মাল নিয়ে যাওয়াকে চুরি বলা হয়। চুরি করা অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। এতে সমাজের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয় এবং মানুষের মালের নিরাপত্তা থাকে না, ফলে সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো, বিশৃঙ্খলা দূর করে সমাজে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা। আর এতে যদি কিছুটা কঠোরতা করতে হয় তবুও তা করতে হবে। সুতরাং চুরির মাধ্যমে কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাহলে ইসলামের বিধান হলো, তার হাত কেটে দেওয়া হবে। এতে করে সে যেমন আর চুরি করতে পারবে না বা চুরি করার সাহস পাবে না, সাথে অন্যরাও চুরি করার সাহস হারিয়ে ফেলবে। ফলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
কিছু দুষ্কৃতিকারী বলে, ইসলামের বিধান অনেক কঠিন ও বর্বর। সামান্য চুরির কারণে একজন মানুষের হাত কাটা হবে!?
এ ধরনের অভিযোগ ও অপবাদ আরোপ করা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব, যারা ইসলাম ও ইসলামের বিধান সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ অথবা ইসলাম ও ইসলামের বিধানের ব্যাপারে শত্রুতা পোষণ করে। কোনো মুসলমান এ ধরনের অভিযোগ করতে পারে না। আর যদি কোনো মুসলমান এ ধরনের অভিযোগ আনে, তাহলে সে মুরতাদ তথা দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। কারণ, যে মুসলিম নামধারী ব্যক্তি ইসলামের কোনো বিধানের ব্যাপারে অভিযোগ করে, কোনো বিধানকে নিয়ে কটাক্ষ করে, তাতে কোনো দোষ বা ত্রুটি আছে বলে মনে করে, কোনো বিধানকে অসম্পূর্ণ মনে করে—তাহলে সে ইসলাম থেকে খারিজ ও মুরতাদ হয়ে যায়।
ইসলামে চুরির হদ হলো হাত কাটা। পবিত্র কুরআনে কারিমে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন :
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও। আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি হুঁশিয়ারি। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
কারও ব্যাপারে চুরির অভিযোগ উঠলেই যে তার হাত কাটা ওয়াজিব হয়ে যায়, বিষয়টি মোটেও এমন নয়; বরং চুরির অপরাধে কারও হাত কাটতে হলে তিনটি শর্ত পাওয়া অপরিহার্য। তিনটি শর্ত পাওয়া গেলেই কেবল চোরের হাত কাটতে হবে, অন্যথায় নয়। শর্ত তিনটি নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
এক. চুরির সময় চোরের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং আর্থিক সচ্ছলতা থাকতে হবে। তাকে চুরির সময় সম্পূর্ণ সুস্থ পাওয়া গেলে তবেই তার মাঝে এ শর্তটি পাওয়া গেছে বলে ধর্তব্য হবে। পাগল বা অচেতন অবস্থায় চুরি করেনি, এমন হতে হবে। সে কাজ করতে সক্ষম হবে। সে যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসাবে বিবেচনা করা হবে এবং সে শাস্তির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে। আর যদি সে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কারণে বাধ্য হয়ে চুরি করে এবং তার সামনে কোনো কাজ করে জীবিকা নির্বাহের কোনো পথ না থাকে, তাহলে তার হাত কাটা হবে না। কারণ, এগুলো এমন ওজর, যার কারণে শরয়ি হদ মওকুফ হয়ে যায়।
মুআজ, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ও উকবা বিন আমির থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন :
'হদের ব্যাপারে তোমাদের কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হলে তোমরা হদ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকো।'
অনন্যোপায় লোকদের হারাম খাওয়ার অপরাধ ক্ষমার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
“অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানি ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোনো পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।”
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“অতএব যে ব্যাক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে, কিন্তু কোনো গুনাহের প্রতি প্রবণতা না থাকে; তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল।”
তাই যখন চুরির সাথে কোনো সন্দেহ যুক্ত থাকবে, তখন হদ মওকুফ হয়ে যাবে। যখন চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি আর্থিক অসচ্ছলতায় থাকবে, তখনও হদ মওকুফ হবে। যখন উক্ত ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য ঠিক না থাকবে, তখনও হদ মওকুফ হবে।
দুই. চুরির মাল সংরক্ষিত স্থানে থাকতে হবে। যখন চোর চুরি করে, তখন সে সম্পদ নিরাপদ ও সংরক্ষিত স্থানে ছিল বলে প্রমাণিত হতে হবে। যদি চুরিকৃত মাল নিরাপদ ও সংরক্ষিত স্থানে না থাকে; বরং প্রকাশ্য কোনো স্থানে অরক্ষিত অবস্থায় থাকে, তাহলে চোরের হাত কাটা হবে না। কারণ, অনেক দুর্বল হৃদয়ের মানুষ আছে, যারা মালামাল সামনে পাওয়ার কারণে লোভ সামলাতে না পেরে চুরি করে। মূলত সেই সম্পদ যদি তার চোখের সামনে না থেকে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষিত থাকত, তাহলে হয়তো সে চুরি করত না। কারণ, চুরি করা তার পেশা নয়, কিন্তু সামনে সম্পদ দেখে মনের কুমন্ত্রণায় সে চুরি করেছে। এ ক্ষেত্রে তার ওপর চুরির হদ প্রয়োগ হবে না।
এখানে একটি প্রশ্ন হতে পারে যে, নিরাপদ সংরক্ষিত জায়গা বলতে কী বোঝায়? প্রত্যেক চোরই তো চুরি করার পর নিজের ওপর হদ প্রয়োগ হওয়া থেকে বাঁচার জন্য এই দাবি করবে যে, ওই সম্পদকে সে অরক্ষিত অবস্থায় পেয়েছে, তাই চুরি করেছে। কিন্তু হয়তো বাস্তবতা আসলে ভিন্ন, সে মূলত রক্ষিত স্থান থেকেই সম্পদ চুরি করেছিল। এখন শাস্তির ভয়ে মিথ্যে বলছে।
মূলত নিরাপদ সংরক্ষিত স্থান বলতে ওই স্থানকেই বলা হয়, প্রত্যেক অঞ্চলে যেটাকে সংরক্ষিত স্থান হিসাবে ধরা হয়। এখানে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই, যার ভিত্তিতে বলা হবে, এটা সংরক্ষিত স্থান আর ওটা অসংরক্ষিত স্থান। তাই যে এলাকায় যে সকল স্থানকে সংরক্ষিত স্থান হিসাবে গণ্য করা হয়, সে অঞ্চলে চুরির হদ প্রয়োগের জন্য সেটাই সংরক্ষিত স্থান হিসাবে ধরা হবে। সুতরাং কেউ যদি সমাজের দৃষ্টিতে সংরক্ষিত সম্পদ চুরি করে, তবেই কেবল তার হাত কাটা হবে, অন্যথায় নয়।
তিন. চুরিকৃত সম্পদের মূল্য নিসাব পরিমাণ হতে হবে। যদি চুরিকৃত সম্পদের মূল্যমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের মূল্যমান থেকে কম হয়, তাহলে চুরির হদ প্রয়োগ হবে না। নিসাবের পরিমাণ কতটুকু, এ নিয়ে আহলে ইলমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সবচেয়ে অগ্রগণ্য মত হলো, দশ দিরহাম বা তার সমমূল্যের অন্য যেকোনো সম্পদই নিসাবের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কেউ যদি দশ দিরহাম বা তার সমমূল্যের অন্য কোনো সম্পদ অথবা তার চেয়ে বেশি মূল্যের কিছু চুরি করে, সাথে তার মধ্যে পূর্বোল্লিখিত শর্ত দুটিও পাওয়া যায়, তাহলে হদ হিসাবে তার হাত কাটা হবে।
এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, চুরির হদ প্রয়োগ করতে হলে উল্লিখিত তিনটি শর্ত একসাথে থাকতে হবে। তিনটি শর্তের দুটি পাওয়া যায়, কিন্তু একটি শর্ত পাওয়া যায়নি; যদি অবস্থা এমন হয়, তাহলে হদ প্রয়োগ হবে না। কারণ, একটি শর্ত না পাওয়ার কারণে এতে এক ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। আর সন্দেহযুক্ত বিষয়ে শরিয়তের হদ প্রয়োগ করা যায় না; বরং সন্দেহ হদকে রহিত করে দেয়।
অন্যদিকে হাদিসে নির্দেশনা এসেছে, কোনোভাবে যদি হদ প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা যায়, তাহলে বিরত থাকাই নীতি। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'যদি হদ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা থাকে, তার মাধ্যমে তোমরা হদ প্রয়োগ প্রতিরোধ করো।'
অন্য হাদিসে এসেছে :
'তোমরা যথাসম্ভব মুসলমানদের ওপর হদ প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকো। যদি হদ প্রয়োগ না করে বের হওয়ার কোনো পথ থাকে, তাহলে রাস্তা ছেড়ে দাও। কারণ, খলিফার মাফ করে ভুল করাটা শাস্তি দিয়ে ভুল করার চেয়ে উত্তম।'
ওপরের আলোচনা থেকে আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, চোরের হাত তখনই কাটা হবে, যখন তার চুরির ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ বাকি থাকবে না। যখন সন্দেহাতীতভাবে চুরির বিষয়টা প্রমাণিত হবে এবং হদ থেকে বাঁচানোর সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে, কেবল তখনই চোরের ওপর চুরির হদ প্রয়োগ হবে।
টিকাঃ
৫০২. সুরা আল-মায়িদা: ৩৮
৫০৩. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ৫/৫১১, হা. নং ২৮৪৯৪ (মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)
৫০৪. সুরা আল-বাকারা: ১৭৩
৫০৫. সুরা আল-মায়িদা: ৩
৫০৭. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২/৮৫০, হা. নং ২৫৪৫ (দারু ইহয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা, কায়রো) - হাদিসটি জইফ।
৫০৮. সুনানুত তিরমিজি: ৩/৮৫, হা. নং ১৪২৪ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ。
📄 ২. জিনার হদ
জিনা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও জঘন্য একটি কাজ। জিনাকারী ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির শত্রু। জিনার কারণে মানুষের প্রকৃত পরিচয় ও বংশ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। কারণ, জিনার ব্যাপকতার কারণে প্রকৃতভাবে কে কার সন্তান, এটা নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতেও জিনা অত্যন্ত জঘন্য একটি অপরাধ ও কবিরা গুনাহ।
সংগত কারণেই জিনার ক্ষেত্রে ইসলাম কঠিন হদ নির্ধারণ করেছে। সমাজ থেকে যেন জিনা নির্মূল হয়ে যায়, সে ব্যাপারে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
জিনার হদের পরিমাণ
অবিবাহিত নারী-পুরুষের জিনার হদ হলো, একশ বেত্রাঘাত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে বলেন:
“ব্যভিচারী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকরণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।”
আর বিবাহিত নারী-পুরুষের জিনার হদ হলো মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত পাথর মারতে থাকা। উবাদা বিন সামিত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
‘তোমরা আমার নিকট থেকে বিধান জেনে নাও। তোমরা আমার নিকট থেকে বিধান জেনে নাও। আল্লাহ তাআলা নারীদের সতীত্ব রক্ষার জন্য পথ বাতলে দিয়েছেন। অবিবাহিত নারী-পুরুষ জিনা করলে শাস্তি একশ বেত্রাঘাত। আর বিবাহিত নারী-পুরুষ জিনা করলে একশ বেত্রাঘাত ও প্রস্তরাঘাতে হত্যা।’
জাবির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত :
'জনৈক ব্যক্তি এক নারীর সাথে জিনা করেছিল। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে তাকে বেত্রাঘাত করা হলো। অতঃপর সংবাদ দেওয়া হলো যে, সে বিবাহিত। তখন তিনি তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার আদেশ দিলেন। অতঃপর তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হলো।'
পূর্বের মতো এখানেও একটি কথা স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের সন্দেহ থাকলে এই হদও রহিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ জিনার অভিযোগে অভিযুক্ত নারী-পুরুষ থেকে জিনার হদ রহিত হয়ে যাবে, যদি উপযুক্ত প্রমাণ না থাকে। শাস্তি যেহেতু অনেক বড়, তাই অপরাধও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ খুঁত থাকলে হদ প্রয়োগ করা যাবে না।
উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'তোমরা যথাসম্ভব হদসমূহ প্রতিহত করো।'
টিকাঃ
৫০৯. সুরা আন-নুর: ২
৫১০. সহিহ মুসলিম: ৩/১৩১৬, হা. নং ১৬৯০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৫১১. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১৫১, হা. নং ৪৪৩৮ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ。
৫১২. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ৭/৪০২ (আল মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 ৩. মদপানের হদ
মদ মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলে। মদপান করলে মানুষের আকল ও বুদ্ধি-বিবেক ঠিক থাকে না। তখন সে উন্মাদের মতো অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে।
মদ কাকে বলে, এ বিষয়ে আহলে ইলমদের মাঝে কিছুটা মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, আঙুর, খেজুর, জলপাই, জব, গম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি নেশা জাতীয় প্রতিটি জিনিসই মদ। আবার কেউ কেউ বলেছেন, শুধুমাত্র আঙুর দিয়ে তৈরি নেশা জাতীয় বস্তুই মদ। তবে মদের গুণাগুণ যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সেটার হুকুমও মদের মতোই হারাম। প্রকৃত মদ কাকে বলে, এ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও সকলেই কিন্তু একটি বিষয়ে একমত যে, মদ যেরকম হারাম তদ্রূপ প্রতিটি নেশা জাতীয় বস্তুই হারাম। যে জিনিস মানুষের আকলকে পরিবর্তন করে ফেলে সেটাই হারাম।
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'প্রতিটি নেশা জাতীয় দ্রব্যই মদ। আর প্রত্যেক নেশা জাতীয় জিনিসই হারাম।'
বড় বড় অপরাধ ও গুনাহের কারণে দুনিয়াতেই কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। মদপান করা সে সকল অপরাধেরই একটি। মদপানকারীর হদ বা শাস্তি হলো আশি বেত্রাঘাত।
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'রাসুলুল্লাহ ﷺ এক লোককে মদপান করার অপরাধে খেজুরের দুটি ডাল দিয়ে চল্লিশটি আঘাত করেন। তিনি (আনাস) বলেন, আবু বকর ও এমনটি করেছেন। অতঃপর উমর-এর খিলাফতের সময় তিনি সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন। তখন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ বললেন, সর্বনিম্ন হদ হলো আশিটি বেত্রাঘাত। অতঃপর উমর মদপানের ক্ষেত্রে এ হদ প্রদানের আদেশ দেন।'
সায়িব বিন ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সময় এবং আবু বকর ও উমর-এর খিলাফতের শুরুর দিকে মদ পানকারীর দিকে ধেয়ে যেতাম। আমাদের হাত, জুতা ও চাদর দিয়ে তাকে প্রহার করতাম। এরপর উমর স্বীয় খিলাফতের শেষভাগে এর জন্য চল্লিশটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করলেন। অতঃপর তারা যখন অবাধ্য হয়ে গেল এবং পাপাচারে আরও বেশি লিপ্ত হতে থাকল, তখন তিনি তাদের আশিটি করে বেত্রাঘাত করলেন।'
খালিদ বিন ওয়ালিদ পত্রবাহকের মাধ্যমে উমর-এর নিকট লিখে পাঠালেন :
'মানুষ মদপানে লিপ্ত হয়ে গেছে এবং তারা এর জন্য নির্ধারিত শাস্তিকে তুচ্ছ মনে করছে। উমর (পত্রবাহককে) বললেন, এরা তোমার পাশে আছে, এদের জিজ্ঞেস করো। সে সময় তাঁর পাশে আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণ বসা ছিলেন। অতঃপর পত্রবাহক তাঁদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা সকলে একমত হলেন যে, মদপানকারীকে আশি বেত্রাঘাত করা হবে।'
আর সে যদি মদপান না ছেড়ে মদপান করতেই থাকে, আর প্রতিবারই তার ওপর হদ প্রয়োগ করা হয়; তবুও সে তৃতীয়বারের হদ ডিঙিয়ে চতুর্থবারেও মদপান করে, তবে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'যদি সে মদপান করে, তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করো। এরপর সে যদি আবার পান করে, তাহলে আবার বেত্রাঘাত করো। এরপর যদি তৃতীয়বার পান করে, তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করো। যদি চতুর্থবার পান করে, তাহলে তাকে হত্যা করো।'
টিকাঃ
৫১৩. মুসনাদু আহমাদ: ৮/২৬৯, হা. নং ৪৬৪৫ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ。
৫১৪. সহিহু মুসলিম: ৩/১৩৩০, হা. নং ১৭০৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৫১৫. সহিহুল বুখারি: ৮/১৫৮, হা. নং ৬৭৭৯ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৫১৬. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১৬৬-১৬৭, হা. নং ৪৪৮৯ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান。
৫১৭. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১৬৪, হা. নং ৪৪৮৪ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ。
📄 ৪. অপবাদের হদ
এখানে অপবাদ বলতে বুঝানো হয়েছে, সতী নারীকে জিনা-ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। কেবল নোংরা চরিত্রের অধিকারী, ধারণাপ্রবণ অবিশ্বাসীরাই এমন অন্যায়মূলক কথা বলার দুঃসাহস দেখিয়ে সতী স্বাধীন ও পবিত্র-চরিত্রের নারীদের অপবাদ দিতে পারে; তাদের মর্যাদা, পবিত্রতা ও সততার ওপর আঘাত করতে পারে।
একজন স্বাধীন সতী নারী সব ধরনের অপবাদ থেকে নিজেকে সর্বাত্মকভাবে রক্ষা করে। সে নিজের সতীত্ব রক্ষা ও নিজেকে পবিত্র রেখে সব ধরনের অপবাদ থেকে আত্মরক্ষাকে ইমান ও আকিদার পর সবচেয়ে বড় ও পবিত্র দায়িত্ব মনে করে। সে কিছুতেই তার ওপর মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে পারে না এবং তা মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে কিছু জঘন্য নোংরা চরিত্রের অধিকারী লোক সতী-সাধ্বী নারীর পরিচ্ছন্ন, শুভ্র ও পবিত্র চরিত্রের ওপর কলঙ্কের দাগ দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এ অপরাধ ছোট বা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি বড় ও জঘন্য একটি অপরাধ।
স্বাধীন সতী নারীদের অপবাদদাতাদের কঠিন শাস্তির ধমকি দিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে বলেন :
“যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ইমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকালে ও পরকালে ধিকৃত হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি।”
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
'তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক অপরাধ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সেগুলাে কী? তিনি বললেন, আল্লাহ সাথে শরিক করা, জাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, অন্যায়ভাবে নিরপরাধ লোককে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা ও সতী-সাধ্বী সরলমনা ইমানদার নারীদের অপবাদ দেওয়া।'
যারা সতী-সাধ্বী সরলমনা ইমানদার নারীদের অপবাদ দেয়, ইসলাম তাদের জন্য কঠিন শাস্তি আবশ্যক করেছে। যাতে তারা তাদের এই নিকৃষ্ট কাজের সাজা পায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করার দুঃসাহস না পায়। অন্যরাও যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং এ ধরনের অশ্লীল কথা মুখে উচ্চারণ করার দুঃসাহস না দেখাতে পারে।
সতী নারীদের মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত না করে, তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। আর এরাই নাফরমান।”
কেউ সতী-সাধ্বী সরলমনা ইমানদার নারীদের মিথ্যা অপবাদ দিলে তার ওপর হদ ওয়াজিব হয়ে যায়। আর তার হদ হলো আশিটি বেত্রাঘাত; যেমনটি উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও আজীবনের জন্য তার কোনো ধরনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। যদিও সাক্ষ্য গ্রহণ করা-না করার মাসআলার ক্ষেত্রে আহলে ইলমদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি মনে তাওবা করলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। আর অন্যরা বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।
টিকাঃ
৫১৮. সুরা আন-নুর : ২৩
৫১৯. সহিহুল বুখারি : ৪/১০, হা. নং ২৭৬৬ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৫২০. সুরা আন-নুর: ৪