📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ক. কিসাস

📄 ক. কিসাস


শাব্দিক অর্থ হলো অনুরূপ করা বা সমান করা। শরিয়তের পরিভাষায়, 'হত্যা বা জখমের ক্ষেত্রে অনুরূপ নীতিভিত্তিক ন্যায়বিচারকে কিসাস বলে।' যদি কেউ ইচ্ছাকৃত হত্যা করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। তবে যদি নিহতের অভিভাবকরা ক্ষমা করে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিসাস প্রয়োগ করা ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ, কোনো ব্যক্তি বিশেষের কাজ নয়।

সুতরাং কোনো নিরপরাধ লোককে অন্যায়ভাবে হত্যা করলে সাজাস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করা হবে। অথবা হত্যা করেনি, কিন্তু কারও আংশিক ক্ষতি করেছে, যেমন অন্যায়ভাবে কারও হাত, পা বা আঙুল কেটে ফেলেছে অথবা এ সকল অঙ্গপ্রতঙ্গ ভেঙে ফেলেছে অথবা অন্যায়ভাবে আঘাত করে কারও মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, কারও দাঁত ভেঙে দিয়েছে, তাহলে প্রহারকারীকেও অনুরূপ শাস্তি দিতে হবে। অর্থাৎ জানের বিনিময়ে জান, হাতের বিনিময়ে হাত, পায়ের বিনিময়ে পা, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং আঘাতের বিনিময়ে আঘাত করার শাস্তি প্রদান করা হবে। এটাকেই কিসাস বলা হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, হত্যা বা আঘাতের ক্ষেত্রে অনুরূপ শাস্তি প্রদানের বিচারের নাম কিসাস।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
“হে ইমানদারগণ, তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।”

আঘাতের বিনিময়ে আঘাত করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমসমূহের বিনিময়ে সমান জখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যায়। আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালিম।”

“হে বুদ্ধিমানগণ, কিসাসের মধ্যেই রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন, যাতে তোমরা সাবধান হতে পারো।”

“হে ইমানদারগণ, তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। কিন্তু যদি কেউ তার ভাই কর্তৃক কোনো বিষয়ে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে ন্যায়সংগতভাবে পাওনা (রক্ত বিনিময়) সাব্যস্ত করা এবং সদ্ভাবে তা পরিশোধ করা কর্তব্য। এটি তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সহজকরণ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শান্তি।”

একটি বিশেষ মাসআলা
পেটে থাকা শিশুকে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তাহলে এটাকেও অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হবে এবং এই অপরাধের কারণে হত্যাকারীর ওপর গুররা (الغرة) ওয়াজিব হবে। গুররা বলা হয় দিয়তের বিশ ভাগের এক ভাগকে।

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
‘দুই প্রতিবেশী মহিলার মধ্যে কথা কাটাকাটি ও চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হলো। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে এক মহিলা অপর মহিলাকে একটি পাথর মারল। এতে আঘাতপ্রাপ্ত মহিলাটির সন্তানের গর্ভপাত ঘটল, যার চুল গজিয়েছিল। সাথে আঘাতপ্রাপ্ত মহিলাটিও নিহত হলো। তখন হত্যাকারী মহিলার ওপর দিয়তের ফয়সালা করা হলো। নিহত মহিলার চাচা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, সে একটি বাচ্চা শিশু প্রসব করেছে, যার চুল গজিয়েছিল। তখন হত্যাকারী মহিলার বাবা বলল, সে মিথ্যাবাদী। আল্লাহর কসম, শিশুটি তার মায়ের পেট থেকে জীবিত বের হয়নি—পৃথিবীতে এসে খায়ওনি এবং পানও করেনি। আর এমন শিশুর জন্য কোনো দিয়ত নেই। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, এটি কি জাহিলি যুগের কবিতার ন্যায় কবিতা এবং জাহিলি জ্যেতির্বিদদের মন্ত্র? নিশ্চয় শিশুর জন্য গুররা (দিয়তের বিশ ভাগের এক ভাগ) নির্ধারিত।’

টিকাঃ
৪৯৫. সুরা আল-বাকারা: ১৭৮
৪৯৬. সুরা আল-মায়িদা: ৪৫
৪৯৭. সুরা আল-বাকারা: ১৭৮
৪৯৮. সুরা আল-বাকারা : ১৭৮
৪৯৯. সুনানুন নাসায়ি : ৮/৫১, হা. নং ৪৮২৮ (মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, হালব) -হাদিসটির সনদ জইফ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 খ. হদ

📄 খ. হদ


حد (হদ) শব্দের আভিধানিক অর্থ বাধা দেওয়া, প্রতিরোধ করা। পরিভাষায় হদ বলা হয়, এমন নির্দিষ্ট শাস্তিকে, যা আল্লাহ তাআলার অধিকার হিসাবে সাব্যস্ত। ৫০০

যখন আল্লাহ তাআলার নির্দিষ্ট কিছু নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা হবে, তখন হদ কার্যকর করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে হদ কার্যকর করা থেকে বিরত থাকা বা এতে কোনো ধরনের শিথিলতা করা বা হদের ক্ষেত্রে কমবেশ করার কারও কোনো অধিকার নেই।

আয়িশা থেকে বর্ণিত যে, উসামা বিন জাইদ যখন স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্র চুরিকারী মাখজুম গোত্রের এক নারীর ব্যাপারে সুপারিশ করেছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বলেছিলেন :
'তুমি কি আল্লাহর হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?' অতঃপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন এবং বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীরা তো এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যকার সম্মানিত কোনো লোক চুরি করত, তখন তারা হদ প্রয়োগ না করে তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল অসহায় লোক চুরি করত, তখন তারা তার ওপর হদ প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদও যদি চুরি করত, তাহলেও আমি তার হাত কাটতাম।'

হদ প্রকরণ
হদ সাত প্রকার : ১. চুরির হদ (حد السرقة) ২. জিনার হদ (حد الزنا) ৩. মদপানের হদ (حد الشرب) ৪. অপবাদের হদ (حد القذف) ৫. ডাকাতির হদ (حد الحرابة) ৬. জাদুর হদ (حد السحر) ৭. সমকামিতার হদ (حد اللواطة)

নিম্নে হদের প্রকারগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো :

টিকাঃ
৫০০. আত-তারিফাত, জুরজানি : ৮৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৫০১. সহিহুল বুখারি: ৪/১৭৫, হা. নং ৩৪৭৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 গ. তাজির

📄 গ. তাজির


হদ ও কিসাসের মতো শাস্তির আরেকটি প্রকার হচ্ছে তাজির। যে সমস্ত অপরাধের জন্য শরিয়াহ কর্তৃক নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি নেই, সেসব অপরাধের জন্য তাজিরের ব্যবস্থা রয়েছে। তাজিরের সীমা ও পরিমাণের ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো নস নেই। রাষ্ট্রের অভিজ্ঞ আলিম ও ফকিহরা বসে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করবেন। এটি বিচারকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। বিচারক অপরাধের বিবেচনায় শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে তাজিরের দায়িত্ব নিতে পারবে না। তবে যাদের ওপর শিষ্টাচারের দায়িত্ব, তারা তাজিরের দায়িত্ব পালন করতে পারবে। যেমন : অভিভাবক, পিতা, স্বামী প্রমুখ তাদের অধীনদের শিষ্টাচার ঠিক রাখার জন্য সীমিত পরিসরে তাজিরের দায়িত্ব পাবে।

আভিধানিক অর্থে তাজির: تعزیر (তাজির) শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে মর্যাদা প্রদান, সম্মান প্রদর্শন। এর আরেকটি অর্থ হচ্ছে, শিষ্টাচার শিক্ষাদান, শাস্তিপ্রদান।

পারিভাষিক অর্থে তাজির: যে সকল অপরাধের নির্দিষ্ট শরয়ি হদ নেই, সে সকল অপরাধের জন্য শাস্তি প্রদান করে শিক্ষা প্রদান করা।

বিস্তারিত বলতে গেলে, যে সকল অপরাধের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহমতে কোনো শাস্তি নির্ধারিত নেই, সে সকল অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদানকে তাজির বলে। এ ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সেই শাস্তিগুলো নির্ধারণ করবেন ইসলামি হাকিম বা বিচারক। বিচারক অপরাধীকে তার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করবেন।

তবে বিচারককে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী ও গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। যে বিচারক ন্যায়পরায়ণতার সাথে মানুষের বিচার করেন, বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করেন না, আবেগতাড়িত হয়ে কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেন না, ব্যক্তি বিদ্বেষবশত কারও ওপর অন্যায় ফয়সালা করেন না; বরং তিনি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজ থেকে ফিতনা- ফাসাদ, অন্যায়-অপরাধ দূর করতে সচেষ্ট; সর্বদা তিনি তটস্থ থাকেন যে, তার ভুল ও অন্যায় বিচারের মাধ্যমে সমাজে না জানি ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে—এমন বিচারকই বিভিন্ন অপরাধের তাজিরভিত্তিক শাস্তি নির্ধারণের অনুমতিপ্রাপ্ত।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আর তোমরা এমন ফাসাদ থেকে বেঁচে থাকো, যা বিশেষত শুধু তাদের ওপর পতিত হবে না, যারা তোমাদের মধ্যে জালিম। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠোর।”

টিকাঃ
৫৩২. আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা : পৃ. নং ৩৪৪ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৫৩৩. সুরা আল-আনফাল : ২৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px