📄 দুই. জাতি ও সমাজকে ইসলামের রঙে রাঙানো
এতে কোনো সন্দেহে নেই যে, জাতি ও সমাজকে ইসলামের রঙে রাঙানো ইসলামি রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রধান দায়িত্ব। ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষে এমনটি করা কঠিন কিছু নয়। কারণ, রাষ্ট্র জাতি ও সমাজকে সঠিক পথ ও মতের ওপর রাখার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম সহজেই অবলম্বন করতে পারে। যেমন: প্রচার মাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ সকল মাধ্যম খুব সহজে এবং অতিদ্রুতই ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি পরিবর্তন করতে ও জাতি গঠনে সাহায্য করে।
মুসলিম উম্মাহকে ইসলাম অনুযায়ী আকৃতি দেওয়া ওয়াজিব। উম্মাহকে এমনভাবে ইসলাম অনুযায়ী সাজাতে হবে, যেন তাদের চিন্তা-চেতনা ও আকিদা-বিশ্বাসের সাথে ইসলাম মিশে যায়। ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষার ওপর তাদের জীবন পরিচালিত হয়। যেন মানুষ কোনো ধরনের কঠোরতা না করে আল্লাহর বিধান মেনে নেয় এবং তাঁর দেওয়া বিধান বা পদ্ধতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আল্লাহ রঙে রঙিন হও। আল্লাহর রঙের চেয়ে উত্তম রং আর কার হতে পারে? আর শুধু আমরা তাঁরই ইবাদত করি।”
ইসলামি রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব হলো, মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের ওপর উঠানোর জন্য সে তার শক্তির একটি বিরাট অংশ ব্যয় করবে। আর এর জন্য সে অনুমোদিত বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করবে। যার একটি হলো দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। কারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুশিক্ষার মাধ্যমেই একটি জাতির চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটে।
আরেকটি হলো প্রচার মাধ্যম। যেমন: রেডিও, পত্র-পত্রিকা, অনলাইন মাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। অশ্লীল, নোংরা ও ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এবং মুসলমানদের মাঝে বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য সৃষ্টি করতে পারে— এমন কোনো বিষয় যেন কোনোভাবেই কোনো প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত না হয়, সে বিষয়টি রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে হবে।
টিকাঃ
৪৯৪. সুরা আল-বাকারা: ১৩৮
📄 তিন. দণ্ডবিধি কার্যকর করা
ইসলামি বিধানের বড় একটি অধ্যায় হলো, হদ-কিসাস বা দণ্ডবিধি। এই অধ্যায়টি বিস্তৃত ও প্রশস্ত। এতে আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়টিই শামিল। কোনো বান্দা যখন অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করবে, তখন তাকে স্বীয় অপরাধের কারণে এই দুনিয়াতেই শাস্তি ভোগ করতে হবে, যাতে সে পরবর্তী সময়ে ওই ধরনের অপরাধে আর জড়িয়ে না পড়ে এবং অন্য সকল মানুষ দণ্ড কার্যকরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায়।
ইসলামে দণ্ডবিধি মোট তিন প্রকার : ১. কিসাস (القصاص) ২. হদ (الحد) ৩. তাজির (التعزير)
📄 চার. সমগ্র বিশ্বে ইসলাম প্রচার-প্রসার করা
পৃথিবীর সব দিকে, প্রতিটি প্রান্তে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামি রাষ্ট্রের মৌলিক একটি দায়িত্ব। ইসলামি রাষ্ট্রের মহান একটি লক্ষ্য হলো, পৃথিবীর সব জায়গায় যেন ইসলামি শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ যেন এই মহান ধর্ম সম্পর্কে ভালো করে বুঝতে পারে এবং স্বেচ্ছায় আগ্রহী হয়ে ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করে।
ইসলাম হলো সমস্ত মানবজাতির ধর্ম। আল্লাহ তাআলা ইহজগতে মানবজাতির জন্য একটি পথ প্রদর্শক আলোকবর্তিকা নির্ধারণ করে রেখেছেন, যাতে মানুষ তার সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। তাদের জন্য দিয়েছেন একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনবিধান, যার ওপর নির্ভর করে মানুষ সর্বস্থানে সদা কল্যাণের সাথে থাকতে পারে। এই জীবনবিধান এতই বিস্তৃত, পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, মানুষ যখন যেখানেই থাকুক, ইসলাম তার জন্য সমস্ত কল্যাণের বিষয় নিশ্চিত করবে, তাকে সমস্ত অকল্যাণ ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে।
ইসলাম একটি স্বভাবজাত ধর্ম। আল্লাহ তাআলা সমস্ত মানবজাতির জন্য এই ধর্মকে মনোনীত করেছেন। তিনি এই ধর্মের প্রতিটি মূলনীতি, প্রতিটি বিধান ও প্রতিটি বিশ্বাসকে এতটাই বিস্তৃত ও বাস্তবসম্মত করে দিয়েছেন যে, সর্বযুগে সব ভাষা-বর্ণ-গোত্রের মানুষের জন্য ইসলামই একমাত্র উপযুক্ত ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম হিসাবে বিবেচিত হয়। আল্লাহ তাআলা সমস্ত মানবজাতিকেই এই ধর্ম গ্রহণ ও পালনের জন্য আহ্বান করেছেন, যাতে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সুখ-সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কারিমে বলেন :
'হে ইমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক পরিহার করো। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'৫৩৬
ইসলাম সর্বজনীন ধর্ম। এই ধর্ম কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতি বা শ্রেণির জন্য নয়; বরং এই ধর্ম সমগ্র মানবজাতির ধর্ম। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
'আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী হিসাবে পাঠিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।'৫৩৭
ইসলাম প্রচার-প্রসারের বিভিন্ন মাধ্যম
ইসলাম প্রচারের এই গুরুদায়িত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করা একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব। কারণ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের মাধ্যম ও সক্ষমতা থাকে। যা কোনো ব্যক্তির বা দলের পক্ষে কখনই অর্জন করা সম্ভব হয় না। সুতরাং কোনো একক ব্যক্তি কখনোই ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করতে সক্ষম হবে না। কারণ, এটি এমন এক দায়িত্ব, যা আদায় করতে বিভিন্ন উপকরণ ও মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। এ সকল উপকরণ কেবল রাষ্ট্রই জোগান দিতে পারে। ইসলাম প্রচারের জন্য এ সকল মাধ্যম ও উপকরণ রাষ্ট্র প্রথমে মুসলমানদের মধ্যে প্রয়োগ করবে, অতঃপর পৃথিবীর সকল দিকের সকল মানুষের মধ্যে তা প্রয়োগ করবে। ইসলাম প্রচারের মাধ্যম বিভিন্ন রকমের হতে পারে। আমরা এখানে কয়েকটি উল্লেখ করছি।
টিকাঃ
৫৩৬. সুরা আল-বাকারা: ২০৮
৫৩৭. সুরা সাবা: ২৮
📄 পাঁচ. জাকাত উসুল ও দারিদ্র্য দূরীকরণ
এ বিধানটি জাকাতসংক্রান্ত একটি বিধান, যা ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম প্রধান খুঁটি, যা থেকে একমাত্র ফাসিক-ফাজিররাই দূরে থাকে। জাকাতব্যবস্থা পরিচালনার জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়, শ্রম ও ঘাম দিতে হয়। জাকাতের অর্থ জমা করার জন্য বহুসংখ্যক মানুষকে নিয়োগ করতে হয়। তাই প্রতি বছর নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকদের কাছ থেকে জাকাত উত্তোলন করার এই গুরুদায়িত্ব একমাত্র রাষ্ট্রের।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
'তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ করো, যাতে এর মাধ্যমে তুমি সেগুলোকে পবিত্র ও বরকতময় করতে পারো। আর তুমি তাদের জন্য দুআ করো। নিঃসন্দেহে তোমার দুআ তাদের জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ।'৫৪০
এমনিভাবে কেউ যদি জাকাত দিতে অস্বীকার করে, তাহলে তাকে জাকাত দিতে বাধ্য করা এবং জরিমানা হিসাবে তার উৎকৃষ্ট মাল বেছে নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিদানের আশায় তা স্বেচ্ছায় দেবে, তবে তার জন্য প্রতিদান রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তা দিতে অস্বীকার করবে, আমি তার সম্পদের ভালো অংশ নিয়ে নেব; আমাদের প্রভুর অধিকারসমূহের একটি অধিকার হিসাবে। এ থেকে সামান্য পরিমাণও মুহাম্মাদ ﷺ-এর পরিবারের জন্য হালাল নয়।'৫৪১
জাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটি। সহিহ বুখারিতে এসেছে, আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ একদিন সাহাবিদের সামনে এলেন। তখন জিবরিল এসে বললেন, ইসলাম কী? তিনি বললেন :
'তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরিক করবে না। নামাজ আদায় করবে। ফরজ জাকাত দেবে এবং রমজানের রোজা রাখবে।'৫৪২
ইবনে উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেন :
'ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর। আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, রমজানের রোজা রাখা ও হজ করা।'৫৪৩
জাকাত দরিদ্রদের অধিকার, ধনীর পক্ষ থেকে কোনো দান নয়। জাকাত প্রদানের খাত মোট আটটি। আট শ্রেণির প্রত্যেক শ্রেণিকে বা যেকোনো এক শ্রেণিকে জাকাত প্রদান করলে জাকাত আদায় হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন :
'জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী ও (ইসলামের দিকে) যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথের মুজাহিদদের জন্য ও মুসাফিরদের জন্য। এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'৫৪৪
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ যখন মুআজ বিন জাবাল-কে ইয়ামানের গভর্নর হিসাবে প্রেরণ করেন, তখন তাকে বলেছিলেন:
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাদের মালের মধ্যে তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করে দরিদ্রদের দিয়ে দেওয়া হবে।'৫৪৫
নিসাবের মালিকদের থেকে জাকাত উসুলের দায়িত্ব মুসলিম রাষ্ট্রের কাঁধে বর্তিত হবে; হোক সেটা নগদ অর্থ, সোনা-রুপা বা গবাদি পশু অথবা ব্যবসায়িক পণ্যের জাকাত। সর্বপরি, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, জাকাত উসুল ও বিতরণের কার্যক্রমকে একটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোতে রূপদান করা এবং এতে দক্ষ ও বিশ্বস্ত লোকদের দায়িত্বশীল হিসাবে নিয়োগ দেওয়া।
কেউ যদি জাকাত দিতে অস্বীকার করে, তাহলে তাকে জাকাত দিতে বাধ্য করা এবং জরিমানা হিসাবে তার উৎকৃষ্ট মাল বেছে নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ বলেন :
'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিদানের আশায় তা স্বেচ্ছায় দেবে, তার জন্য প্রতিদান রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তা দিতে অস্বীকার করবে, আমি তার সম্পদের ভালো অংশ নিয়ে নেব, আমাদের প্রভুর অধিকারসমূহের একটি অধিকার হিসাবে। এ থেকে সামান্য পরিমাণও মুহাম্মাদ ﷺ-এর পরিবারের জন্য হালাল নয়।'৫৪৬
টিকাঃ
৫৪০. সুরা আত-তাওবা : ১০৩
৫৪১. সুনানুদ দারিমি: ২/১০৪৩, হা. নং ১৭১৯ (দারুল মুগনি, সৌদিআরব) - হাদিসটি হাসান।
৫৪২. সহিহুল বুখারি: ১/১৯, হা. নং ৫০ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৫৪৩. সহিহু মুসলিম: ১/৪৫, হা. নং ১৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৫৪৪. সুরা আত-তাওবা: ৬০
৫৪৫. সহিহুল বুখারি : ২/১০৪, হা. নং ১৩৯৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৫৪৬. সুনানুদ দারিমি: ২/১০৪৩, হা. নং ১৭১৯ (দারুল মুগনি, সৌদিআরব) - হাদিসটি হাসান।