📄 ক. নফিরে আমের ঘোষণা
এটি খিলাফাভিত্তিক শাসনব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। ব্যক্তিবিশেষ কারও জন্য এ আদেশ করা ও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। যুদ্ধের যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, সৈন্য সংগ্রহ ও প্রস্তুত করা এবং সামরিক আক্রমণ পরিচালনার মতো কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো একমাত্র রাষ্ট্রই আঞ্জাম দিয়ে থাকে। এটি সত্য যে, জিহাদ আল্লাহর একটি ফরজ বিধান, যা থেকে পিছিয়ে থাকা মুনাফিকের আলামত। কেবল হতভাগ্যরাই জিহাদ থেকে পিছিয়ে থেকে নিজেদের সফল মনে করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
“তোমরা বের হয়ে পড়ো স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জাম নিয়ে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো নিজেদের মাল ও জান দিয়ে।”
“যদি বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ আজাব দেবেন এবং অপর একটি জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন।”
অনেক ফকিহ ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফার অনুমতি ব্যতীত জিহাদে বের হওয়া হারাম বা মাকরূহ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু একই স্থানে তারা এ মাসআলাও লিপিবদ্ধ করেন যে, কয়েকটি অবস্থায় খলিফার নিকট জিহাদের অনুমতি নেওয়া শর্ত নয়। যথা: ১. ইমাম যখন জিহাদে বাধা দেয়। ২. যখন জিহাদে কল্যাণ থাকা সত্ত্বেও খলিফার কাছে অনুমতি পাওয়া যায় না। ৩. যখন জানা থাকে যে, খলিফা কূটস্বার্থে জিহাদের অনুমতি দেবে না।
বাকি থেকে যায়, যদি খলিফাই না থাকে, তাহলে কী বিধান? তো এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরাম বলেন, জিহাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা এতই বেশি যে, কখনো যদি খলিফা নাও থাকে, জিহাদ বন্ধ করা যাবে না। অর্থাৎ জিহাদ কিয়ামত পর্যন্ত বাকি থাকবে, যদিও কখনো খলিফা না পাওয়া যায়। তাই যারা বলে, খলিফা না থাকলে জিহাদ করা যাবে না, তাদের কথা ভিত্তিহীন ও ভুল।
টিকাঃ
৪৮২. সুরা আত-তাওবা: ৪১
৪৮৩. সুরা আত-তাওবা: ৩৯
৪৮৪. আল-মুগনি: ৯/২০২ (মাকতাবাতুল কাহিরা, মিশর)
📄 খ. কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ
মুসলমানদের ওপর থেকে ফিতনা-ফাসাদ, বিপদ-মুসিবত দূর করার একটি মৌলিক ও কার্যকর পদ্ধতি হলো জিহাদ। পাশাপাশি এটি মুসলমানদের ওপর থেকে লাঞ্ছনা ও জিল্লতি দূর করার একমাত্র কার্যকর পথ।
আমরা পূর্বেও এই বিষয়টি বলেছি এবং এখানেও বলছি যে, অনেক মানুষ এমন আছে, যাদের উত্তম নসিহত ও স্পষ্ট দলিলসমৃদ্ধ বয়ান কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। হক ও সত্য গ্রহণে তারা তেমন উদ্বুদ্ধও হয় না। তাদের মধ্যে এমন হঠকারিতা ও দাম্ভিকতা কাজ করে, যা তাদের দ্বীনের পথে আসতে বাধা দেয়।
এমন শত্রুদের মোকাবেলা করা ও তাদের প্রভাব দূর করার জন্য জিহাদ এবং জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পারো নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে। যদ্বারা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করবে এবং অন্যদেরকেও, যাদের তোমরা জানো না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। আর তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করো, তার প্রতিদান তোমাদের পুরোপুরি প্রদান করা হবে। (প্রতিদান কম দিয়ে) তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।”
ইসলামের শত্রুরা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং তাদের বিতাড়িত করতে হবে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে কারিমে বলেন :
“আর তাদের হত্যা করো যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদের বের করে দাও সেখান থেকে, যেখান থেকে তারা তোমাদের বের করেছে। বস্তুত ফিতনা-ফাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মাসজিদুল হারামের নিকটে, যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে, তাহলে তাদের হত্যা করো। কাফিরদের শাস্তি এমনই।”
কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে, কারণ তারা ইসলাম ও মানবতার বিরুদ্ধে সর্বদা বিদ্বেষ পোষণ করে এবং ইসলাম ও মানবতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। জমিনে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে তো তাদের জুড়ি মেলা ভার। কাফিররা জমিনে ন্যায়ানুগ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কাফির নেতারা সাধারণ মানুষদের ইসলাম গ্রহণ করতে বাধা দেয়।
আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে বলেন:
“আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই করো, যে পর্যন্ত না ফিতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত্ত হয়ে যায়, তাহলে কারও প্রতি কোনো জবরদস্তি নেই। কিন্তু যারা জালিম, তাদের ব্যাপারটি ভিন্ন।”
বুরাইদা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো। যারা আল্লাহর সাথে কুফরি করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো। তোমরা যুদ্ধ করে যাও, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করো না, গনিমতের মাল চুরি করো না, লাশ বিকৃত করো না এবং শিশু সন্তানকে হত্যা করো না।'
আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'তোমরা আল্লাহর নামে, আল্লাহর সাহায্যে ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দ্বীনের ওপর থেকে জিহাদের পথে যাত্রা করো। তোমরা অতিবৃদ্ধ, শিশু, নাবালক ও নারীকে হত্যা করো না। গনিমতের সম্পদ চুরি করো না। তোমরা তোমাদের গনিমতের মাল একত্রে জমা করবে। নিজেদের অবস্থান সংশোধন করবে এবং সৎ কাজ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।'
যুদ্ধক্ষেত্রে কাফিরদের পরাজিত করার জন্য কৌশল অবলম্বন করা যাবে। কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'নবিজি যখন কোনো যুদ্ধের ইচ্ছা করতেন, তখন বাস্তবতার বিপরীত অন্য একটি বিষয় প্রকাশ করতেন এবং বলতেন যে, যুদ্ধ হলো ধোঁকা ও কৌশল।'
এ সকল দলিল থেকে কেবল জিহাদের ফরজিয়াত প্রমাণিত হয়। জিহাদ যেমন ফরজ, তেমনই পূর্ণ সতর্কতা ও দক্ষতার সাথে জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করাও ফরজ। কারণ, জিহাদ অত্যন্ত কঠিন একটি আমল। সুতরাং এর জন্য চাই পূর্ণ সতর্কতা ও দক্ষতা।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
“তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।”
টিকাঃ
৪৮৫. সুরা আল-আনফাল: ৬০
৪৮৬. সুরা আল-বাকারা: ১৯১
৪৮৭. সুরা আল-বাকারা: ১৯৩
৪৮৮. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৩৭, হা. নং ২৬১৩ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়া, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ。
৪৮৯. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৩৭-৩৮, হা. নং ২৬১৪ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়া, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ。
৪৯০. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৪৩, হা. নং ২৬৩৭ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ。
৪৯১. সুরা আন-নিসা: ৭১
📄 গ. মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
الْرَّدَّةُ অথবা الْإِرْتِدَادُ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের হয়ে অন্য কোনো ধর্ম, দর্শন বা মতাদর্শে প্রবেশ করা।
একজন মুসলিম তার ধর্ম ইসলাম থেকে বের হয়ে ইহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু বা অন্য কোনো ধর্মে প্রবেশ করা যেমন রিদ্দাহ, অনুরূপ মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের হয়ে কমিউনিস্ট, অজ্ঞেয়বাদীসহ বিভিন্ন নাস্তিক্যবাদে প্রবেশ করাও রিদ্দাহর শামিল। রিদ্দাহর কারণে আল্লাহর ক্রোধ আবশ্যক হয়ে যায়। কারণ, সে আল্লাহর আদেশ থেকে বের হয়ে পথভ্রষ্ট অস্বীকারকারীদের পথ অবলম্বন করেছে এবং সত্য ধর্ম থেকে বাইরে চলে গেছে। এই অবাধ্য ও পাপিষ্ঠ লোকটি শাশ্বত সত্যকে হালকা ও তুচ্ছ মনে করেছে। ইসলাম ধর্ম তো এতটাই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার যে, জ্ঞানসম্পন্ন কোনো লোক এ ব্যাপারে সন্দেহ করতে পারে না। কেবল পথভ্রষ্ট, নির্বোধ ও বোকারাই ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারে এবং ইসলামকে হালকা মনে করতে পারে।
সুতরাং যারা ইসলাম ছেড়ে অন্য ধর্মে প্রবেশ করবে, তাদের সমস্ত আমল বাতিল হয়ে যাবে। তাদের জন্য থাকবে জাহান্নাম ও লাঞ্ছনাকর জীবন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
“তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোজখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।”
যে সকল লোক সম্মান ও ইজ্জতের পথ ছেড়ে হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, ইসলাম তাকে হত্যা করা ওয়াজিব করেছে। তবে সাধারণ ক্ষেত্রে হাকিম বা বিচারক তার জন্য এক বা একাধিক দক্ষ আলিম নিযুক্ত করবেন, যারা তার সাথে কথা বলবে এবং ইসলামের ব্যাপারে তার সমস্ত সন্দেহ-সংশয় দূর করার চেষ্টা করবেন। অতঃপর সে যদি আবার ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তো ভালো। তাকে তার আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাকে হত্যা করা হবে না। আর যদি এরপরও সে তার রিদ্দাহর ওপর অটল থাকে, তাহলে বিচারক তাকে হত্যার আদেশ দেবেন এবং কোনো ধরনের সংশয় ছাড়াই তাকে হত্যা করতে হবে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'যে ইসলাম ধর্ম পরিবর্তন করবে, তোমরা তাকে হত্যা করো।'
রিদ্দাহ কখনো ব্যাপক আকার ধারণ করে। ইসলামের অকাট্য একটি বিধানের ব্যাপারেও যদি কোনো গোত্র বা জাতি আপত্তি জানায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। তাদেরকে সমূলে উৎখাত করে তবেই ক্ষান্ত হবে। যেমন আবু বকর একদল লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, যারা ইসলামের সব বিধান মানলেও শুধু জাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। অনুরূপ যারা মিথ্যা নবুওয়াত দাবি করবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এখানে সামান্যও নমনীয় হওয়া যাবে না। যেমনিভাবে আবু বকর নমনীয় হননি; বরং এর বিরুদ্ধে পুরো ইসলামি সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছেন। মোটকথা, রিদ্দাহ জাতীয় কোনো ফিতনাকেই জিইয়ে রাখা যাবে না। কঠিনভাবে তাদের দমন করতে হবে এবং রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ও শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
টিকাঃ
৪৯২. সুরা আল-বাকারা : ২১৭
৪৯৩. সহিহুল বুখারি: ৪/৬১, হা. নং ৩০১৭ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)