📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ফরজে কিফায়া ও ফরজে আইন জিহাদ

📄 ফরজে কিফায়া ও ফরজে আইন জিহাদ


ফরজে কিফায়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মুসলিমদের যদি একটি দল এ ফরজ আদায় করে তাহলে বাকি সকলে এ ফরজ পরিত্যাগের গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তাদের মধ্যকার কোনো ব্যক্তি বা ফরজে কিফায়া আদায় হয়-এমন সংখ্যক লোক সে ফরজ আদায় না করে, তবে সকলেই গুনাহগার হবে। ৪৬৯ আর ফরজে আইন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে ফরজ ব্যক্তিগতভাবে সকলের ওপর ফরজ। কেউই এ ফরজের আওতার বাইরে নয়। সকলকেই এ ফরজ আদায় করতে হবে। ৪৭০

জিহাদের সাধারণ হুকুম হলো, এটি ফরজে কিফায়া। মুসলিমদের পক্ষ থেকে মুজাহিদ জামাআত জিহাদ করলে সকলেই ফরজে কিফায়া পরিত্যাগের গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। ৪৭১ মুসলিমদের সকলেই একই সময়ে জিহাদে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ অবস্থায় যদি সকলের ওপরই এটি ফরজ হতো, তবে এটি অনেক কষ্টকর হতো, যার সামর্থ্য মানুষের ছিল না। তাই সাধারণ অবস্থায় সকলেই নিজ নিজ কাজে থাকবে। ছাত্ররা শিক্ষার্জন করবে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে, শ্রমিকরা কাজ করবে। মোটকথা, প্রত্যেকেই আপন আপন কাজে নিয়োজিত থাকবে এবং একদল মুসলিম মুজাহিদ ময়দানের জিহাদে মশগুল থাকবেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং যাতে তারা নিজ কওমকে (নাফরমানি হতে) ভয় প্রদর্শন করে, যখন তারা তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা বাঁচতে পারে।'

এ আয়াতের মধ্যে মুসলিমদের তাদের কাজের ক্ষেত্র ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের কর্তব্যের ক্ষেত্রে তাদের পৃথক পৃথক শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মাঝে তালিবে ইলম থাকবেন, যারা ইলম তালাশ করবেন; মুজাহিদ থাকবেন, যারা শত্রুদের প্রতিহত করবেন; জীবনের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিবর্গ থাকবেন। কিন্তু যখন জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যাবে, তখন মুসলিমদের মাঝে কোনো শ্রেণিভেদ থাকবে না। বিভিন্ন শ্রেণি বিভিন্ন কাজ করবে তা হবে না; বরং সকলেই একই সাথে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন অবস্থা হবে একদম পৃথক। মুসলিমরা তখন নানা ধরনের বিপদাপদ ও সংকটের মাঝে থাকবে। যেমন শত্রুরা যদি মুসলিম ভূখণ্ড আক্রমণ করে, তাদের ভূমি দখল করে ফেলে, শত্রুদের দাপট বেড়ে যায়, তারা যদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ঝলকানি দেখায়, মুসলিমদের কষ্ট দেয়, তাদের হত্যা করে, তাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে; তখন মুসলিমদের জাগরিত হওয়া ব্যতীত কোনো উপায় থাকবে না, তাদের সকলকে অবশ্যই মুজাহিদদের সারিতে গিয়ে যোগ দিতে হবে। মুসলিম চাই সে পুরুষ হোক বা নারী, যুবক হোক বা বৃদ্ধ, দুর্বল হোক বা সবল, ধনী হোক বা দরিদ্র—সকলকেই অস্ত্রধারণ করতে হবে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

ইমাম জাসসাস বলেন:
'মুসলমানদের প্রসিদ্ধ আকিদা হলো, যখন সীমান্তবর্তী মুসলমানরা শত্রুর আশঙ্কা করবে, কিন্তু তাদের মাঝে শত্রুকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বিদ্যমান থাকবে না, তারা নিজ পরিবার-পরিজন, দেশ ও জানের ব্যাপারে শঙ্কাগ্রস্ত হবে, এমতাবস্থায় পুরো উম্মাহর ওপর ফরজ হয়ে যায় যে, যে ব্যক্তিই শত্রুদের ক্ষতি থেকে মুসলমানদের রক্ষা করতে সক্ষম, সে জিহাদে বের হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে উম্মাহর মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। কেননা, তাদের সাহায্য না করে বসে থাকা বৈধ—এটা কোনো মুসলমানের কথা হতে পারে না, যখন নাকি শত্রুরা মুসলমানদের রক্ত প্রবাহিত করছে ও তাদের পরিবার-পরিজনকে বন্দী করছে।'৪৭২

আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি বলেন: 'যদি শত্রুরা মুসলমানদের কোনো সীমানায় আক্রমণ চালায়, তাহলে যুদ্ধে সক্ষম নিকটবর্তী মুসলমানদের ওপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। যদি তাদের সাহায্যের প্রয়োজন না হয়, তাহলে আক্রান্ত এলাকা থেকে যারা দূরে অবস্থান করছে, তাদের ওপর জিহাদ ফরজে কিফায়া। তবে শত্রুর নিকটে যারা রয়েছে, তারা যদি শত্রুকে প্রতিরোধ করতে অপারগ হয়, অথবা অপারগ না হলেও অলসতাবশত জিহাদ ত্যাগ করে, তাহলে তাদের পার্শ্ববর্তীদের ওপর নামাজ, রোজার ন্যায় জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়, যা ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়। এভাবে ক্রমানুসারে পূর্ব- পশ্চিমের সকল মুসলমানের ওপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়।'৪৭৩

বর্তমান বিশ্বে মুসলিমরা এক ভয়ংকর জীবনযাপন করছে। বিশ্বের সকল মুসলিম আজ লাঞ্ছনা-অপমান, নির্যাতন, অত্যাচার, হত্যা ও লুণ্ঠনের শিকার। মুসলিমরা বীরের জাতি, যারা মাথা নত করা কাকে বলে জানত না! আজ তারাই সর্বদা মাথা নিচু করে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। মুসলিমদের এ ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করার জন্য সকল মুসলিমকে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সন্দেহ নেই যে, আজ আমাদের ওপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে গেছে; তবুও আমরা বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এতে কেউ তো কবিরা গুনাহে লিপ্ত আর কেউ এর বিরোধিতা করে কুফরের সীমায় প্রবেশ করছে। তাই আজ আমাদের সকলকে আল্লাহর পথের সৈনিক হয়ে যেতে হবে। শত্রুদের বিরুদ্ধে সকলকে এক সারিতে দাঁড়িয়ে সীসাঢালা প্রাচীর হয়ে পৃথিবীর সকল তাগুতি শক্তিকে রুখে দাঁড়াতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।'৪৯৪

মুসলিমদের বর্তমান সময়ের এ চরম মুহূর্তে বসে না থেকে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে শত্রু প্রতিরোধে স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করতে হবে। আজকের এমন পরিস্থিতিতে সকল মুসলিমের ওপর তাদের সর্বশক্তি নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে পড়া আবশ্যক হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
'তোমরা বের হয়ে পড়ো স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করো। এটি তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।'৪৯৫

আল্লাহ আরও বলেন:
'আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পারো নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্যে থেকে।'৪৯৬

সর্বোপরি জিহাদ ফরজে আইন হয়ে গেলে এ ফরজ আদায় করা না করার দিক থেকে চারটি অবস্থা সৃষ্টি হয়। যথা:
১. আজিমত : জিহাদ ফরজে আইন জানার পর সরাসরি তা আদায়ে সচেষ্ট ব্যক্তি আজিমতের ওপর রয়েছে।
২. রুখসত: জিহাদ ফরজে আইন জানার পর আদায়ের জন্য আকুল ব্যক্তি প্রস্তুতি এ পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তা হবে রুখসত।
৩. কবিরা গুনাহ: জিহাদ ফরজে আইন জানার পরও আদায়ে অগ্রসর না হয়ে বসে থাকা কবিরা গুনাহ।
৪. কুফর : জিহাদ না করে উল্টো জিহাদের বিরোধিতা করা, জিহাদকে সন্ত্রাস বাদ আখ্যা দেওয়া কুফর।

টিকাঃ
৪৬৯. উসুলুল ফিকহ: পৃ. নং ২৯ মুহাম্মাদ সালাম কর্তৃক রচিত
৪৭০. বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ২/১৪৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৪৭১. সুরা আত-তাওবা: ১২২
৪৭২. আহকামুল কুরআন, জাসসাস : ৩/১৪৬-১৪৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৪৭৩. রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৪৯৪. সুরা আস-সফ : ৪
৪৯৫. সুরা আত-তাওবা : ৪১
৪৯৬. সুরা আল-আনফাল : ৬০

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 যুদ্ধের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার গুরুত্ব

📄 যুদ্ধের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার গুরুত্ব


যুদ্ধের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাধ্যমতো চেষ্টা করা মুসলিমদের ওপর ফরজ। ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সর্বদিক থেকে পরিকল্পনা করার জন্য সর্বোচ্চ সাধনা করা মুসলিমদের ওপর ফরজ। এ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা তৈরি করার স্বার্থে উপযুক্ত কর্মপন্থা গ্রহণ, পার্থিব সরঞ্জামাদি একত্রিকরণ, দক্ষতা অর্জন, সাংগঠনিক কাঠামো গঠন, মানসিক প্রস্তুতি অর্জনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ আবশ্যক।

আমাদের এমন প্রস্তুতি ফরজ করে কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে :
'আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পারো নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্যে থেকে।'৪৭৭

সাবধানতা ও সচেতনতা গ্রহণকে ফরজ করে, এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে ইরশাদ হচ্ছে :
'হে ইমানদারগণ, তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো এবং পৃথক পৃথক সৈন্যদলে কিংবা সমবেতভাবে বেরিয়ে পড়ো।'৪৭৮

যে সকল মুসলিম ইসলামি তালিমের অধীনে ইসলামি নিজামের অধীনে, সুবিন্যস্ত হুকুম-আহকামের পাবন্দির সাথে বেড়ে উঠেছে, তারাই হচ্ছে কিতালের জন্য যোগ্য মুসলিম। এমন মুসলিমরা সংগঠন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক দিকনির্দেশনা, সঠিক পরিকল্পনার জন্য অধিক যোগ্য। সকল ক্ষেত্রে মুসলিমরা সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এটাই কাম্য। আর যুদ্ধের বিষয়ে তা তো বলাই বাহুল্য।

টিকাঃ
৪৭৭. সুরা আল-আনফাল: ৬০
৪৭৮. সুরা আন-নিসা: ৭১

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 যুদ্ধের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি

📄 যুদ্ধের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি


যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। কেননা, যুদ্ধ শুধু জজবা ও আবেগের দ্বারা হয় না; বরং এর জন্য লাগে নিখুঁত পরিকল্পনা, দক্ষ পরিচালনা ও পূর্ণ প্রস্ততি। আমাদের এ বিষয়টি জেনে নেওয়া উচিত যে, যুদ্ধক্ষেত্রে কীভাবে সফলতা আসবে এবং এর জন্য পর্যায়ক্রমে কোন কোন ধাপ পূরণ করতে হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px