📄 গ. আদালত ও ন্যায়পরায়ণতা থাকা
এটি বিশেষ একটি পরিভাষা। আদালত বলা হয়, দ্বীনি বিষয়ে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা, সগিরা গুনাহ পরিত্যাগ করা, কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণভাবে বেঁচে থাকা, নিজের ব্যক্তিত্ব ঠিক রাখা, আমানত রক্ষা করা, কোনো বিষয়ে গাফিলতি না করা। কারও মতে, আদালত হলো, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা। খলিফার গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম ইবনে হাজাম বলেন, 'যার দ্বারা কবিরা গুনাহ হয় না এবং যাকে সগিরা গুনাহ করতে দেখা যায় না।'
মাওয়ারদি বলেন, আদালত বা ন্যায়পরায়ণতার অর্থ হলো, সত্যবাদী হওয়া, আমানতদার হওয়া, হারাম, নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা, সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকা, আবেগ, ভালোবাসা, রাগ ও ক্রোধের সময় কারও প্রতি প্রভাবিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকা। কারও মধ্যে এই গুণগুলো পরিপূর্ণভাবে থাকলে তার সাক্ষ্য গ্রহণীয় এবং তিনি ইমাম বা খলিফারূপে বরণীয়। আর কারও মধ্যে এগুলোর কোনো একটির ঘাটতি থাকলে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না, ও তার হুকুমও কার্যকর হবে না এবং তিনি খলিফা হতে পারবেন না।
টিকাঃ
৪৩৪. আল-মুহাল্লা: ৮/৪২৫ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ঘ. ইলম থাকা
ইলমের দিক থেকে খিলাফতের যোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সীমা হলো, সমসাময়িক সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা ও হুকুমের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করে সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা থাকা। মুসলমানগণ যখন কোনো সমস্যায় পতিত হবে, তখন উলামায়ে কিরাম ও ফুকাহায়ে কিরামের ওপর ওয়াজিব হলো, উক্ত সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে একটি সুষ্ঠু ও সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।
এ ধরনের পর্যালোচনাসভায় খলিফা নিবৃত্ত থাকবেন না; বরং তিনি পর্যালোচনা থেকে সঠিক মতটি বের করে আনবেন। ফুকাহায়ে কিরামের গবেষণা ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব মতামত থাকবে। তিনি নিজ যোগ্যতায় তা থেকে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতটি বের করে আনবেন। আর এ কাজটি শরয়ি বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন আলিম ব্যতীত সম্ভব নয়।
তবে একদল ফুকাহায়ে কিরামের দৃষ্টিতে খলিফার জন্য আলিম হওয়া শর্ত নয়; বরং জেনারেল কেউ-ও খলিফা হতে পারবে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তার একদল আলিম উপদেষ্টা থাকবে, যারা তাঁকে শরয়ি ফয়সালা করতে সাহায্য করবে। তবে এতে কোনো মতানৈক্য নেই যে, তার জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেক থাকতে হবে। মেধাহীন নির্বোধ কাউকে খলিফা বানানো কারো মতেই জায়িজ নেই।
টিকাঃ
৪৩৫. আল-আহকামুস সুলতানিয়া: পৃ. নং ১১২ (দারুল হাদিস, কায়রো)
📄 ঙ. দোষ-ত্রুটিমুক্ত হওয়া
দোষ-ত্রুটি মুক্ত হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহগত, মস্তিষ্কগত, আত্মিক ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া। যদি কেউ এমন কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হয়, তাহলে সে এ মহান ইমামতের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।
দেহগত দোষ-ত্রুটি: খলিফা হবেন সুঠাম দেহের অধিকারী। খিলাফতের দায়িত্বভার বহনে সক্ষম। খিলাফতের দায়িত্ব কখনো কখনো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ দায়িত্ব আদায়ে অনেক কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে। তাই খলিফা যদি রুগ্ন শরীরের অধিকারী হন, তাহলে তার পক্ষে এ গুরুদায়িত্ব আনজাম দেওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। সুতরাং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী বা অত্যাধিক রুগ্ন ব্যক্তিগণ খিলাফতের উপযুক্ত নন।
মস্তিষ্কগত ত্রুটি: খিলাফতের মতো এত বড় দায়িত্বের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক-ত্রুটিযুক্ত কাউকে নির্বাচন করা রীতিমতো ভয়ানক ব্যাপার। উন্মত্ত বা দিগ্ভ্রান্ত কারও হাতে মুসলিমদের নেতৃত্ব সোপর্দ করা জায়িজ নেই। এটি এমন স্পষ্ট বিষয় যে, এ ক্ষেত্রে দলিল দেওয়াটা বাহুল্যতা। কোনো একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কগত কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সে যথেষ্ট ইলমের অধিকারী নয়। ইলমের প্রাচুর্যতা না থাকার কারণে এমন একজন সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তিকে যেখানে অনেকের দৃষ্টিতে খিলাফতের দায়িত্বের উপযুক্ত মনে করা হয় না; সেখানে মস্তিষ্ক-বিকৃত ব্যক্তিকে যে খিলাফতের যোগ্য মনে করা হবে না, সে কথা বলে কয়ে বুঝাতে হয় না।
আত্মিক ত্রুটি: এ ধরনের ত্রুটি মস্তিষ্কজনিত ত্রুটির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। এগুলোর ফলে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব আপন জায়গায় ঠিক থাকে না; বরং তা অনেক নিচু স্থানে অবস্থান করে। এগুলোর ফলে একজন ব্যক্তি পরিণত হয় অস্থির ও অপূর্ণাঙ্গ হিসাবে। যদি আত্মিক ত্রুটি পূর্ণতায় পৌঁছে যায়, তবে অনিষ্টের আর কোনো কিছু বাকি থাকে না।
টিকাঃ
৪৩৬. আল-আহকামুস সুলতানিয়া: পৃ. নং ১৯ (দারুল হাদিস, কায়রো)
📄 চ. কুরাইশি হওয়া
খলিফা হবেন কুরাইশ বংশের। তবে যদি কুরাইশ বংশের কোনো যোগ্য লোক না পাওয়া যায়, তাহলে অন্য কোনো যোগ্য লোক, যার মধ্যে খিলাফতের সকল শর্ত পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়, তাকে খলিফা হিসাবে মনোনীত করা হবে।
খলিফা কুরাইশ বংশ থেকে হওয়ার শর্তের ব্যাপারে হাদিস রয়েছে। বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“খলিফাগণ হবে কুরাইশ বংশ থেকে।”
টিকাঃ
৪৩৭. মুসনাদু আহমাদ: ১৯/৩১৮, হা. নং. ১২৩০৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।