📄 ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধান
মুসলমানদের ইমাম বা খলিফা হওয়ার যোগ্য সেই ব্যক্তি, যিনি তাদের কল্যাণ ও সফলতার দিকে পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন, তাদের মাঝে শরিয়তের বিধান বাস্তবায়ন করবেন। যিনি মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন, মানুষের মধ্য থেকে অন্যায় ও জুলুম প্রতিহত করবেন। মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার যোগ্য তিনি, যিনি মুসলমানদের কল্যাণের জন্য নিরলসভাবে কঠিন পরিশ্রম করার যোগ্যতা রাখেন।
ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব রয়েছে। যেমন: হদ ও কিসাস বাস্তবায়ন করা, মুলমানদের নামাজে ইমামতি করা, বিভিন্ন অঞ্চলের আমির/গভর্নর নিয়োগ দেওয়া, মানুষদের জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করা, জিহাদের জন্য বাহিনী গঠন করা ও বাহিনীর আমির নির্ধারণ করা, দক্ষ ও বিচক্ষণ সমরবিদদের সাথে পরামর্শ করে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা সাজানো, জাকাত, ফাই, খারাজ, গনিমতসহ অর্থ সংগ্রহের বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা।
📄 মুসলিম শাসকের দায়িত্বসমূহ
মুসলিম শাসকের দায়িত্বের পরিধি ব্যাপক। সংক্ষেপে তার কিয়দাংশ উল্লেখ করছি। একজন মুসলিম শাসককে দশটি বিষয় ভালোভাবে পালন করতে হবে। যথা:
১. দ্বীনের হিফাজত
খলিফা দ্বীন হিফাজতের মূলনীতি অনুযায়ী কাজ করবেন। কেউ বিদআত সৃষ্টি করলে অথবা কোনো সংশয়বাদী দ্বীন থেকে সরে গেলে তখন খলিফা তার সামনে স্পষ্ট দলিল পেশ করে তার সন্দেহ দূর করবেন। যদি এর পরেও সংশয়বাদী বা বিদআতকারী সঠিক পথে না আসে, তবে তাকে যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করবেন। যাতে করে সে কোনো ধরণের বিশ্রঙ্খলা ও ফিতনার বিস্তার ঘটাতে না পারে এবং উম্মত তার পথভ্রষ্টতা থেকে বেঁচে থাকতে পারে।
২. শরয়িভাবে বিবাদ মীমাংসাকরণ
খলিফা বিবাদে লিপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যকার বিরোধ মিটিয়ে দেবেন। যাতে করে সবদিকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়, জালিমের জুলুম বন্ধ হয়ে যায় এবং মাজলুম আর নির্যাতিত না হয়।
৩. জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
খলিফাকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে নিরাপদে সারা দেশে ভ্রমণ করতে পারে এবং সফরে তাদের জান ও মালের ক্ষতির কোনো শঙ্কা না থাকে।
৪. হদ ও কিসাস বাস্তবায়ন
খলিফা প্রকাশ্যে জনসম্মুখে অপরাধমূলক কাজের শাস্তি বাস্তবায়ন করবেন। যাতে করে আল্লাহ কর্তৃক পবিত্র কাজ ও বিষয়বস্তু নিরাপদ থাকে এবং বান্দার হকগুলো ক্ষতি ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
৫. সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যাতে কোনোভাবেই শত্রুরা দেশের ভেতরে প্রবেশ করে মানুষের জান ও মালের ক্ষতি না করতে পারে।
৬. জিহাদের ইবাদত পালন
ইসলামের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা খলিফার গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। অমুসলিমদের প্রথমে ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেবে। তারা যদি ইসলাম কবুল করে অথবা জিজিয়া দেয়, তাহলে তাদের ছেড়ে দিতে হবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করবে, যাতে করে ইসলাম সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং আল্লাহর কালিমা সবার ঊর্ধ্বে থাকে।
৭. ফাই ও জাকাত সংগ্রহ
শরিয়ত মোতাবেক ফাই ও জাকাত সংগ্রহ করা খলিফার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
৮. অভাবীদের ভাতা প্রদান
বাইতুল মাল থেকে অভাবীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা এবং সময়মতো তা প্রাপকের নিকট পৌঁছে দেওয়া খলিফার দায়িত্বসমূহের একটি।
৯. বিশ্বস্ত কর্মী নিয়োগদান
সৎ ও বিশ্বস্ত লোকদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া খলিফার দায়িত্ব। যাতে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগ দুর্নীতিমুক্ত থাকে এবং সুচারুভাবে দায়িত্ব আদায় হয়।
১০. কর্মকর্তাদের তদারকি
খলিফাকে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয় ও সকল পরিস্থিতির প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যেন তার নিয়োগকৃত কর্মকর্তা কোনো ধরনের দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে না পড়ে এবং জনগণ তাদের অধিকার পেতে অসুবিধায় না পড়ে।
এটিই হলো মুসলিম শাসকের দায়িত্বের সংক্ষিপ্ত, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ একটি তালিকা। নিঃসন্দেহে এই দায়িত্বগুলো অনেক বড় এবং খুবই ভারী। এ দায়িত্ব বহনে অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্বেরও অনেক কষ্ট হয়ে যায়। তাই এমন বড়, সূক্ষ্ম ও ভারী দায়িত্ব পালন করতে হলে আমিরকে হতে হবে দৃঢ় সংকল্পী, অগাধ জ্ঞান ও বুদ্ধির অধিকারী, অভিজ্ঞ আলিম ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। সাথে সাথে তাকে হতে হবে দৃঢ় ইমানদার, মুত্তাকি ও সঠিক আকিদা-বিশ্বাসে অটল, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখবে।
📄 রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন
খলিফা নির্বাচন করবে উম্মতের 'আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ'। তাঁরা মানুষের মধ্য থেকে খিলাফতের জন্য উপযুক্ত একজনকে খুঁজে বের করবেন। বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ করবেন, কে খিলাফতের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। তারা দেখবেন কার মাঝে বিচক্ষণতা, দুনিয়াবি ও শরয়ি বিষয়ের পরিপূর্ণ ইলম আছে; কার মাঝে হিকমত ও প্রজ্ঞা ফুটে ওঠে এবং মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা কেমন ইত্যাদি।
'আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ' কোনো ধরনের জোর-জবরদস্তি ব্যতীত খিলাফতের উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট পূর্ণ আদব ও সম্মানের সাথে খিলাফতের বিষয়টি পেশ করবেন। তাঁকে মুসলিম উম্মাহর খলিফা হওয়ার প্রস্তাব দেবেন। এ বিষয়ে তাকে বোঝাবেন। তিনি যদি রাজি হন, তাহলে প্রথমে তাঁরা তাঁর কাছে বাইআত দেবেন। অতঃপর তিনি কোনো মসজিদে অথবা রাষ্ট্রের গুরত্বপূর্ণ কোনো স্থানে জনগণের সামনে উপস্থিত হয়ে সকলের বাইআত গ্রহণ করবেন। তিনি যদি খিলাফতের দায়িত্ব নিতে রাজি না হন, তাহলে ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ খিলাফতের যোগ্য অন্য আরেকজনকে খুঁজে বের করবেন, যার মধ্যে খলিফা হওয়ার সকল শর্তগুলো পাওয়া যায়। অতঃপর সবাই তাঁর কাছে বাইআত দেবেন।
কিন্তু যদি খিলাফতের জন্য সমান উপযুক্ত দুজন লোক থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে যিনি বয়সে প্রবীণ, তাকে খলিফা হিসাবে মনোনীত করবে। আর যদি এমন হয় যে, একজনের ইলম বেশি আর একজনের বীরত্ব বেশি, তাহলে পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে দুজনের একজন অগ্রাধিকার পাবে। উদাহরণত তখন যদি মুসলিম উম্মাহ কাফিরদের সাথে যুদ্ধের অবস্থায় থাকে, তাহলে অধিক বীরত্বের অধিকারীকে খলিফা হিসাবে মনোনীত করা হবে এবং সকলে তাঁর কাছে বাইআত দেবে। আর যদি তখন মুসলিম উম্মাহ মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মুখোমুখি থাকে—যেমন তাদের মধ্যে বিদআত বা মানতিক-ফালসাফার ছড়াছড়ি থাকে, তাহলে আলিম অগ্রাধিকার পাবে। তাকে খলিফা হিসাবে মনোনীত করা হবে এবং তাঁর কাছে সবাই বাইআত দেবে।
রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের আরেকটি পদ্ধতি হলো, খলিফা বেঁচে থাকাকালীন খিলাফতের উপযুক্ত কাউকে খলিফা হিসাবে নির্ধারণ করে যাবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। মুসলিম জনগণ যদি তাকে মেনে নেয় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে বাইআত দেয়, তাহলেই সে খলিফা হবে। পূর্বের খলিফার এ নিয়োগকে শুধু একটি মতামত বা নসিহত হিসাবে বিবেচনা করা হবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসাবে নয়। ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ এই সিদ্ধান্তকে বাতিল করে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে খিলাফতের উপযুক্ত অন্য আরেকজনকে মনোনীত করতে পারবেন।
আবু বকর মৃত্যুর পূর্বে এ পদ্ধতিতেই উমর-কে খলিফা হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। অতঃপর সাহাবায়ে কিরাম সবাই তাঁকে মেনে নিয়েছিলেন। এভাবে উমর মৃত্যুর পূর্বে শীর্ষস্থানীয় ছয়জন সাহাবিকে নির্ধারণ করেছিলেন এবং ছেলে আব্দুল্লাহকে বাদ দিয়ে এদের মধ্য থেকে কাউকে খলিফা হিসাবে বেছে নিতে বলেছিলেন। খলিফা কর্তৃক পরবর্তী কোনো খলিফা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। এর মাধ্যমে পরবর্তীকালে ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ, এ বিষয়ে আবু বকর ও উমর সঠিক ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে যে অন্যরা সঠিক থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আর উত্তরাধিকারসূত্রে খলিফা নির্ধারণের পদ্ধতি অর্থাৎ বাদশার ইনতিকালের পর তাঁর ছেলে বা পরিবারের অন্য কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পদ্ধতিটি ইসলামসম্মত নয়। এটা মানবস্বভাব বিরুদ্ধও বটে। ইসলামের স্বাধীন শুরার পরামর্শের ভিত্তিতে উপযুক্ত লোককে নিয়োগের পরিবর্তে যোগ্য হোক বা অযোগ্য পরিবারের কেউ শাসনকর্তা নিযুক্ত হবে—এটা জ্ঞানী মাত্রই মেনে নিতে পারে না।