📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 পারিভাষিক অর্থ

📄 পারিভাষিক অর্থ


শাইখ আহমাদ মহি উদ্দিন আজুজ বলেন : هي تبادل الآراء في أمر من الأمور لمعرفة أصوبها وأصلحها لأجل اعتماده والعمل به
'মুসলিমদের কোনো একটি কাজে সর্বাধিক সঠিক ও কল্যাণময় পন্থাটির ওপর নির্ভর ও আমল করার জন্য পরস্পর মত বিনিময় করাকে বলা হয় শুরা বা পরামর্শ।'

ড. মুহাম্মাদ আবু ফিরাস বলেন : تقليب الآراء المختلفة ووجهات النظر المطروحة في قضية من القضايا واختبارها من أصحاب العقول والأفهام حتى يتوصل إلى الصواب منها أو إلى أصوبها وأحسنها ليعمل به لكي تتحقق أحسن النتائج
‘শুরা হলো, কোনো বিষয়ে সর্বোত্তম ফলাফল বের করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মতামত ও চিন্তাভাবনা পেশ করে চিন্তাশীল ও বোদ্ধাজনদের পর্যবেক্ষণে যাচাই-বাছাইয়ের পর সঠিক বা সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বোত্তম সিদ্ধান্তে পৌঁছা।’

টিকাঃ
৩৪৪. মানাহিজুশ শারিয়াতিল ইসলামিয়া: ২/১২৮ (মাকতাবাতুল মাআরিফ, বৈরুত)
৩৪৫. আন-নিজামুস সিয়াসি ফিল ইসলাম, ড. মুহাম্মাদ আবু ফিরাস : পৃ. নং ৭০

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 শুরার গুরুত্ব

📄 শুরার গুরুত্ব


শুরার অর্থ ও সংজ্ঞা থেকেই বোঝা যায় যে, এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুরা মূলত আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই জরুরি। পরিচর্যাগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিকসহ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে আমরা এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারি।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 শুরার শরয়ি হুকুম

📄 শুরার শরয়ি হুকুম


পরামর্শ করার হুকুম নিয়ে দুধরনের মত পাওয়া যায়। ইমাম কাতাদা , ইমাম ইবনে ইসহাক , ইমাম শাফিয়ি -সহ প্রমুখদের মতে পরামর্শ করা মুসতাহাব। এর বিপরীতে ইমাম ইবনে আতিয়া, ইমাম রাজি, ইমাম নববি -সহ প্রমুখ এটিকে ওয়াজিব বা আবশ্যক মনে করেন।

বিধানগত দিক থেকে পরামর্শ করা ওয়াজিব হোক বা মুসতাহাব, বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে এটিকে হালকা করে দেখা, গুরুত্ব না দেওয়া বা শিথিলতা করার কোনো সুযোগ নেই। মুসলমানদের মাঝে পরামর্শের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কমতি বা ছাড়াছাড়ি করার মানসিকতা থাকলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির রয়েছে। তাই সকল ক্ষেত্রে, বিশেষত জাতীয় ও গণকাজে পরামর্শ করা নেওয়া একান্ত জরুরি। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসের ভাষ্যও পরামর্শ করার আবশ্যকীয়তার দিকে ইঙ্গিত বহন করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন : وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ 'আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।'

এ আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা পরামর্শ করার আদেশ করেছেন। এই আয়াত দ্বারা রাসুলুল্লাহ -কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -কে পরামর্শ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে; অথচ তিনি একজন নবি। বিভিন্ন বিষয়ে অবগত করার জন্য তাঁর কাছে ওহি আসত। তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আর কী বলার থাকতে পারে, যাদের স্বভাবের মধ্যেই মিশে আছে দুর্বলতা, ভুলে যাওয়া, তাড়াহুড়া করা ও ভুল করা!

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণাগুণের বর্ণনা দিয়ে বলেন : وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ ‘নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে তারা নিজেদের কাজ সম্পাদন করে।'

তাই মানুষের প্রতিটি দিকের কল্যাণ নিশ্চিতকরণে পরামর্শ করার গুরুত্ব অনেক বেশি। যাতে করে কার্যসিদ্ধির ক্ষেত্রে উম্মাহ ভুল ও ভ্রান্তিতে পতিত না হয়। উম্মাহকে যেন অবনতি ও পরাজয়ের গ্লানি আস্বাদন করতে না হয়। উম্মাহকে যেন একচেটিয়া ও নির্দিষ্ট কারও মতের অনুগত হতে না হয়। মানুষের জীবন সঠিকতা ও উত্তমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য এটি একটি মৌলিক নিয়ম। এর ফলে মানুষ প্রকৃত কর্ম তালাশ করতে পারবে, তারা শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগুতে পারবে, কল্যাণের পথে আসতে পারবে। এ নীতিটি ক্ষতির প্রতিবন্ধক হবে। ব্যক্তির ও ক্ষতির উপাদানের মাঝে বাধা হয়ে থাকবে এটি। এ জন্য ইসলাম এর প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে এবং এ ব্যাপারে শিথিলতা করতে নিষেধ করে দিয়েছে। এটির প্রতি এত বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আরেকটি কারণ হলো, যাতে করে মানুষ আমিত্ববোধ ও একনায়কতান্ত্রিকতার ক্ষতিতে পতিত হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারে।

পরামর্শের সুযোগ থাকার ফলে যদি সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে সকলেই তার বাহ বাহ পায়। আর যদি তা ভুল হয়ে থাকে, তবে ভুলের মাশুল সবাইকে গুননি। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :

إِذَا كَانَ أُمَرَاؤُكُمْ خِيَارَكُمْ، وَأَغْنِيَاؤُكُمْ سُمَحَاءَكُمْ، وَأُمُورُكُمْ شُورَى بَيْنَكُمْ فَظَهْرُ الْأَرْضِ خَيْرٌ لَكُمْ مِنْ بَطْنِهَا، وَإِذَا كَانَ أُمَرَاؤُكُمْ شِرَارَكُمْ وَأَغْنِيَاؤُكُمْ بُخَلَاءَكُمْ، وَأُمُورُكُمْ إِلَى نِسَائِكُمْ فَبَطْنُ الْأَرْضِ خَيْرٌ لَكُمْ مِنْ ظَهْرِهَا

'যখন তোমাদের আমিরগণ হবে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম এবং তোমাদের ধনীরা হবে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল এবং তোমাদের কাজকর্ম পরিচালিত হবে তোমাদের পরামর্শের ভিত্তিতে, তখন জমিনের ভেতরের চেয়ে জমিনের ওপর হবে তোমাদের জন্য উত্তম। আর যখন তোমাদের আমিরগণ হবে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ আর তোমাদের ধনীরা হবে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে কৃপণ এবং তোমাদের কর্তৃত্ব থাকবে মহিলাদের হাতে তখন জমিনের ওপরের চেয়ে জমিনের ভেতরটা তোমাদের জন্য উত্তম হবে।'

এখানে আরেকটি বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি যে, পরামর্শ কখনো নসনির্ভর বিষয়গুলোতে হবে না। কেননা, যেসব বিধান কুরআন ও হাদিসের নস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, সেসব বিষয়ে পরামর্শ করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে কারও কোনো মতামত প্রদানের অবকাশ নেই। নসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এসব বিষয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ বা পর্যালোচনার অবকাশ নেই। কেননা, এতে কোনো ভুল-ভ্রান্তির অবকাশ নেই। পরামর্শ হবে কেবল পার্থিব বিষয়াদিতে, যে বিষয়গুলো বুদ্ধি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। আর وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। এ আয়াতের মধ্যে الْأَمْرِ দ্বারা উদ্দেশ্য, উম্মাহর পার্থিব বিষয় সংবলিত শাসকদের কর্মপন্থাসমূহ।

যদি শাসকদের আকিদা, ইবাদত ও হালাল-হারামের মতো ওহি সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে পরামর্শ করার সুযোগ দেওয়া হতো, তবে ইসলামের মূলভিত্তি পুরোটাই ভেঙে পড়ত, দ্বীনের বিষয়গুলো মানুষের চাহিদার ওপর অর্পিত হতো এবং সর্বদা এগুলো পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ওপর থাকত।

টিকাঃ
৩৪৭. আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা : ২৬/২৭৯-২৮০ (অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, বৈরুত)
৩৪৮. সুরা আলি ইমরান : ১৫৯
৩৪৯. সুরা আশ-শুরা : ৩৮
৩৫০. সুনানুত তিরমিজি: ৪/৯৯, হা. নং ২২৬৬ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ।
৩৫১. তাফসিরুল মানার : ৪/১৬৪ (আল-হাইয়াতুল মিসরিয়্যা)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 নবুওয়াতের যুগে ও খোলাফায়ে রাশিদার যুগে পরামর্শ

📄 নবুওয়াতের যুগে ও খোলাফায়ে রাশিদার যুগে পরামর্শ


পরামর্শ করাটা রাসুলুল্লাহ -এর সাধারণ অভ্যাস ছিল। তিনি পার্থিব বিষয়গুলো সাহাবায়ে কিরামের সামনে পেশ করতেন, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং পরামর্শের ভিত্তিতে সঠিক ও নির্ভেজাল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ তাঁর আশপাশে থাকা বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ও প্রভাবশালী সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতেন। তিনি এটা করতেন সাধারণ ও বিশেষ উভয় বিষয়াদির ক্ষেত্রে। তাহলে একবার চিন্তা করে দেখুন, যুদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে অবস্থা কী ছিল?

উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা সংগত মনে করছি:

• বদর যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ হাব্বাব বিন মুনজির -এর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। বদরে এসে রাসুলুল্লাহ প্রথমে অল্প পানিসম্পন্ন এক স্থানে অবস্থান নিলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে অবস্থানের জায়গা সম্পর্কে তোমরা পরামর্শ দাও। তখন হাব্বাব বিন মুনজির বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি এই জায়গা সম্পর্কে এবং এখানকার কূপগুলো সম্পর্কে অবগত আছি। আপনি যদি চান, তাহলে আমরা পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সমৃদ্ধ ও সুমিষ্ট কূপের নিকট যাব। সেটি হবে আমাদের অবস্থানস্থল। শত্রুপক্ষের আগেই সেখানে পৌঁছব এবং সেই কূপ ব্যতীত সকল কূপের পানি নষ্ট করে দেবো। তখন রাসুলুল্লাহ হাব্বাব -এর এই পরামর্শ গ্রহণ করলেন। কারণ, এটি ছিল যুদ্ধের জন্য খুবই উপযুক্ত ও সঠিক একটি পরামর্শ। এ ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাসুলুল্লাহ পরামর্শের মাধ্যমেই এই মতটি গ্রহণ করেছিলেন।

• উহুদের সময় রাসুলুল্লাহ সাহাবায়ে কিরাম -এর সাথে পরামর্শ করলেন যে, মদিনা থেকে বের হয়ে যুদ্ধ করবেন নাকি মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করবেন। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ -এর মত ছিল মদিনা থেকে বের না হয়ে ভেতরেই অবস্থান করা। আর যখন শত্রুপক্ষ মদিনায় প্রবেশ করবে, তখন গলির মুখে তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন এবং নারী ও শিশুরা ঘরের ভেতরে ছাদের ওপর অবস্থান করবে। আর মূলত এটিই ছিল সঠিক মত। অন্যদিকে যে সকল সাহাবি বদর যুদ্ধে যেতে পারেনি, তারা পরামর্শ দিল মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার এবং তারা এ ব্যাপারে রীতিমতো পীড়াপীড়ি করতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখে তাদের পরামর্শকে প্রাধান্য দিলেন এবং বাইরে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এখানে রাসুলুল্লাহ তাঁর আগ্রহের বিপরীত অধিকাংশ সাহাবি, বিশেষ করে যুবক সাহাবিদের আগ্রহ ও মতামত প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

• খন্দক যুদ্ধের সময় যখন সমস্ত মুশরিক এক হয়ে মুসলমানদের সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য মদিনায় আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল, তখন রাসুলুল্লাহ সাহাবায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করলেন। তখন সালমান ফারসি পরিখা খননের পরামর্শ দিলেন। যেন তা শত্রুদের মদিনায় প্রবেশের প্রতিবন্ধক হিসাবে দাঁড়ায়। তখন রাসুলুল্লাহ এই মত গ্রহণ করে পরিখা খননের আদেশ দিলেন এবং নিজেও খনন কাজে অংশগ্রহণ করলেন।

• অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহ বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারেও সাহাবায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। তখন আবু বকর বন্দীদের ব্যাপারে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিলেন। আর উমর তাদের হত্যা করার পরামর্শ দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ আবু বকর -এর মত গ্রহণ করলেন এবং মুক্তিপণের বিনিময়ে সবাইকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

টিকাঃ
৩৫২. সুরা আল-আনআম: ১০৬
৩৫৩. সুরা ইউনুস: ১০৯
৩৫৪. সুরা আল-আহজাব : ২

পরামর্শ করাটা রাসুলুল্লাহ -এর সাধারণ অভ্যাস ছিল। তিনি পার্থিব বিষয়গুলো সাহাবায়ে কিরামের সামনে পেশ করতেন, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং পরামর্শের ভিত্তিতে সঠিক ও নির্ভেজাল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ তাঁর আশপাশে থাকা বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ও প্রভাবশালী সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতেন। তিনি এটা করতেন সাধারণ ও বিশেষ উভয় বিষয়াদির ক্ষেত্রে। তাহলে একবার চিন্তা করে দেখুন, যুদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে অবস্থা কী ছিল?

উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা সংগত মনে করছি:

• বদর যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ হাব্বাব বিন মুনজির -এর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। বদরে এসে রাসুলুল্লাহ প্রথমে অল্প পানিসম্পন্ন এক স্থানে অবস্থান নিলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে অবস্থানের জায়গা সম্পর্কে তোমরা পরামর্শ দাও। তখন হাব্বাব বিন মুনজির বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি এই জায়গা সম্পর্কে এবং এখানকার কূপগুলো সম্পর্কে অবগত আছি। আপনি যদি চান, তাহলে আমরা পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সমৃদ্ধ ও সুমিষ্ট কূপের নিকট যাব। সেটি হবে আমাদের অবস্থানস্থল। শত্রুপক্ষের আগেই সেখানে পৌঁছব এবং সেই কূপ ব্যতীত সকল কূপের পানি নষ্ট করে দেবো। তখন রাসুলুল্লাহ হাব্বাব -এর এই পরামর্শ গ্রহণ করলেন। কারণ, এটি ছিল যুদ্ধের জন্য খুবই উপযুক্ত ও সঠিক একটি পরামর্শ। এ ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাসুলুল্লাহ পরামর্শের মাধ্যমেই এই মতটি গ্রহণ করেছিলেন।

• উহুদের সময় রাসুলুল্লাহ সাহাবায়ে কিরাম -এর সাথে পরামর্শ করলেন যে, মদিনা থেকে বের হয়ে যুদ্ধ করবেন নাকি মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করবেন। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ -এর মত ছিল মদিনা থেকে বের না হয়ে ভেতরেই অবস্থান করা। আর যখন শত্রুপক্ষ মদিনায় প্রবেশ করবে, তখন গলির মুখে তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন এবং নারী ও শিশুরা ঘরের ভেতরে ছাদের ওপর অবস্থান করবে। আর মূলত এটিই ছিল সঠিক মত। অন্যদিকে যে সকল সাহাবি বদর যুদ্ধে যেতে পারেনি, তারা পরামর্শ দিল মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার এবং তারা এ ব্যাপারে রীতিমতো পীড়াপীড়ি করতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখে তাদের পরামর্শকে প্রাধান্য দিলেন এবং বাইরে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এখানে রাসুলুল্লাহ তাঁর আগ্রহের বিপরীত অধিকাংশ সাহাবি, বিশেষ করে যুবক সাহাবিদের আগ্রহ ও মতামত প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

• খন্দক যুদ্ধের সময় যখন সমস্ত মুশরিক এক হয়ে মুসলমানদের সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য মদিনায় আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল, তখন রাসুলুল্লাহ সাহাবায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করলেন। তখন সালমান ফারসি পরিখা খননের পরামর্শ দিলেন। যেন তা শত্রুদের মদিনায় প্রবেশের প্রতিবন্ধক হিসাবে দাঁড়ায়। তখন রাসুলুল্লাহ এই মত গ্রহণ করে পরিখা খননের আদেশ দিলেন এবং নিজেও খনন কাজে অংশগ্রহণ করলেন।

• অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহ বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারেও সাহাবায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। তখন আবু বকর বন্দীদের ব্যাপারে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিলেন। আর উমর তাদের হত্যা করার পরামর্শ দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ আবু বকর -এর মত গ্রহণ করলেন এবং মুক্তিপণের বিনিময়ে সবাইকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

টিকাঃ
৩৫২. সুরা আল-আনআম: ১০৬
৩৫৩. সুরা ইউনুস: ১০৯
৩৫৪. সুরা আল-আহজাব : ২

ফন্ট সাইজ
15px
17px