📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 আল্লাহর আইনের বিপরীত বিচার করার বিধান

📄 আল্লাহর আইনের বিপরীত বিচার করার বিধান


এ বিষয়টি নিয়ে অনেকের মাঝে বেশ ইখতিলাফ ও বিতর্ক দেখা যায়। কিছু মানুষ আছে, যারা এটাকে কোনোভাবেই কুফর মানতে চায় না। এর বিপরীতে কিছু লোক সকল ক্ষেত্রেই এটাকে কুফর বলে প্রচার করে। এদিকে কুরআনের স্পষ্ট আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর দেওয়া আইন অনুসারে বিচার না করলে সে কাফির, ফাসিক ও জালিম। এগুলোরই বা রহস্য কী? একই অপরাধীর জন্য তিন রকমের বিশেষণ কেন? এখানে মূল আলোচনার বিষয় হলো, মানবরচিত আইনে বিচার করা কুফরে আকবার বা বড় কুফর কিনা, যা ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়? বস্তুত এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়।

এখানে এভাবে উত্তর হবে যে, যদি রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সে আল্লাহর আইনকে সঠিক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও পার্থিব স্বার্থে কখনো ভিন্ন আইনে বিচার করে অথবা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তাহলে সে কাফির নয়; বরং জালিম বা ফাসিক। এ ধরনের কুফরকে বলা হবে 'কুফর দুনা কুফর'। অর্থাৎ এর কারণে সে মারাত্মক গুনাহগার হলেও দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে না। আর যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানবরচিত আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং আদালতে নিয়মিত সে অনুসারেই বিচার-আচার করা হয় কিংবা সে আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানবরচিত আইনকেই সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে অথবা মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানকল্পে এ আইন অনুসারে ফয়সালা করাকে কল্যাণকর ও আবশ্যক বলে বিশ্বাস করে তাহলে তার কুফর ও ইরতিদাদের বিষয়টি সুস্পষ্ট। এখানে তার কুফরির ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এটাকে 'কুফর দুনা কুফর' বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে প্রচার করে, তারা নিশ্চিত দ্বীনের অপব্যাখ্যা করে তাগুতদের খুশি করতে চায়। আমরা এদের থেকে মুক্ত এবং তারাও আমাদের থেকে মুক্ত।

আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম বলেন:
وَأَمَّا الَّذِي قِيْلَ فِيْهِ كُفْرُ دُوْنَ كُفْرٍ إِذَا حَاكَمَ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ مَعَ اعْتِقَادِ أَنَّهُ عَاصٍ وَأَنَّ حُكْمَ اللَّهِ هُوَ الْحَقُّ فَهَذَا الَّذِي يَصْدُرُ مِنْهُ الْمَرَّةَ نَحْوُهَا أَمَّا الَّذِي جَعَلَ قَوَانِينَ بِتَرْتِيْبٍ وَتَخْضِيعِ فَهُوَ كُفْرُ وَإِنْ قَالُوْا أَخْطَأْنَا وَحُكْمُ الشَّرْعِ أَعْدَلُ فَفَرْقُ بَيْنَ الْمُقَرَّرِ وَالْمُثْبَتِ وَالْمُرَجَّحِ جَعَلُوهُ هُوَ الْمَرْجِعَ فَهَذَا كُفْرُ نَاقِلُ عَنِ الْمِلَّةِ.

'আল্লাহর আইনকে সঠিক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য আইনে বিচার-ফয়সালা করে নিজেকে গুনাহগার ভাবলে তার ব্যাপারে বলা হয়েছে 'কুফর দুনা কুফর'। আর এটা কেবল ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার থেকে তা এক দুবার প্রকাশ পায়। কিন্তু যে ব্যক্তি যথাযথভাবে আইনকানুন তৈরি করবে এবং তা মেনে চলবে তখন তা কুফরি বলে বিবেচিত হবে। যদিও সে একথা বলে যে, (এর কারণে) আমি গুনাহগার হয়েছি এবং শরিয়তের ফয়সালাই অধিক নিষ্ঠাপূর্ণ। অতএব, চূড়ান্ত, প্রমাণিত ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত আইনের মাঝে পার্থক্য আছে; যেখানে তারা মানবরচিত আইনকেই মূল বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তা এমন কুফর বলে গণ্য হবে, যা (ব্যক্তিকে) দ্বীন থেকে বের করে দেয়।'

এ বিষয়ে অনেক উলামায়ে কিরাম এমনই বক্তব্য পেশ করেছেন। তাদের সকলের তাফসির বা মন্তব্য থেকে একথাই স্পষ্ট হয়েছে যে, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কোনো বিধান দ্বারা বিচারকারী পরিচালনা করা আল্লাহর সাথে এক জঘন্য ও স্পষ্ট ঔদ্ধত্য। অথচ বর্তমানে প্রায় সকল মুসলিম ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, জেনে বা না জেনে মানবরচিত আইনে পরিচালিত কোর্টের সামনে বিচারের জন্য ভিড় জমায়।

উম্মাহর ফকিহগণ আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য বিধান দ্বারা বিচারকারীদেরকে শুধু কাফিরই বলেননি; বরং তাদের পক্ষ অবলম্বনকারী আলিমদেরকেও কাফির বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزلَ اللهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কুরআনের বিধান গোপন করে এবং এর বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা নিজেদের উদরে আগুনই ভক্ষণ করে এবং আল্লাহ তাআলা না তাদের সাথে কিয়ামতের দিন কথা বলবেন আর না তাদের পবিত্র করবেন। বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব।’

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
وَمَتَى تَرَكَ الْعَالِمُ مَا عَلِمَهُ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ وَاتَّبَعَ حُكْمَ الْحَاكِمِ الْمُخَالِفِ لِحُكْمِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَانَ مُرْتَدًّا كَافِرًا يَسْتَحِقُّ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.
‘আর যখন কোনো আলিম কুরআন-সুন্নাহ হতে অর্জিত শিক্ষা অনুযায়ী আমল ত্যাগ করে এবং আল্লাহ ও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারী বিচারকের অনুসরণ করে তখন সে একজন ধর্মত্যাগী এবং কাফির হিসাবে বিবেচিত হবে, যে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানে শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত।

টিকাঃ
৩৩৩. ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম : ১২/২৮০, ফতোয়া নং ৪০৬০ (মাতবাআতুল হুকুমাহ, মক্কা)
৩৩৪. সুরা আল-বাকারা: ১৭৪
৩৩৫. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ৩৫/৩৭৩ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)

এ বিষয়টি নিয়ে অনেকের মাঝে বেশ ইখতিলাফ ও বিতর্ক দেখা যায়। কিছু মানুষ আছে, যারা এটাকে কোনোভাবেই কুফর মানতে চায় না। এর বিপরীতে কিছু লোক সকল ক্ষেত্রেই এটাকে কুফর বলে প্রচার করে। এদিকে কুরআনের স্পষ্ট আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর দেওয়া আইন অনুসারে বিচার না করলে সে কাফির, ফাসিক ও জালিম। এগুলোরই বা রহস্য কী? একই অপরাধীর জন্য তিন রকমের বিশেষণ কেন? এখানে মূল আলোচনার বিষয় হলো, মানবরচিত আইনে বিচার করা কুফরে আকবার বা বড় কুফর কিনা, যা ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়? বস্তুত এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়।

এখানে এভাবে উত্তর হবে যে, যদি রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সে আল্লাহর আইনকে সঠিক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও পার্থিব স্বার্থে কখনো ভিন্ন আইনে বিচার করে অথবা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তাহলে সে কাফির নয়; বরং জালিম বা ফাসিক। এ ধরনের কুফরকে বলা হবে 'কুফর দুনা কুফর'। অর্থাৎ এর কারণে সে মারাত্মক গুনাহগার হলেও দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে না। আর যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানবরচিত আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং আদালতে নিয়মিত সে অনুসারেই বিচার-আচার করা হয় কিংবা সে আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানবরচিত আইনকেই সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে অথবা মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানকল্পে এ আইন অনুসারে ফয়সালা করাকে কল্যাণকর ও আবশ্যক বলে বিশ্বাস করে তাহলে তার কুফর ও ইরতিদাদের বিষয়টি সুস্পষ্ট। এখানে তার কুফরির ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এটাকে 'কুফর দুনা কুফর' বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে প্রচার করে, তারা নিশ্চিত দ্বীনের অপব্যাখ্যা করে তাগুতদের খুশি করতে চায়। আমরা এদের থেকে মুক্ত এবং তারাও আমাদের থেকে মুক্ত।

আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম বলেন:
وَأَمَّا الَّذِي قِيْلَ فِيْهِ كُفْرُ دُوْنَ كُفْرٍ إِذَا حَاكَمَ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ مَعَ اعْتِقَادِ أَنَّهُ عَاصٍ وَأَنَّ حُكْمَ اللَّهِ هُوَ الْحَقُّ فَهَذَا الَّذِي يَصْدُرُ مِنْهُ الْمَرَّةَ نَحْوُهَا أَمَّا الَّذِي جَعَلَ قَوَانِينَ بِتَرْتِيْبٍ وَتَخْضِيعِ فَهُوَ كُفْرُ وَإِنْ قَالُوْا أَخْطَأْنَا وَحُكْمُ الشَّرْعِ أَعْدَلُ فَفَرْقُ بَيْنَ الْمُقَرَّরِ وَالْمُثْبَتِ وَالْمُرَجَّحِ جَعَلُوهُ هُوَ الْمَرْجِعَ فَهৈদَا كُفْرُ نَاقِلُ عَنِ الْمِلَّةِ.
'আল্লাহর আইনকে সঠিক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য আইনে বিচার-ফয়সালা করে নিজেকে গুনাহগার ভাবলে তার ব্যাপারে বলা হয়েছে 'কুফর দুনা কুফর'। আর এটা কেবল ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার থেকে তা এক দুবার প্রকাশ পায়। কিন্তু যে ব্যক্তি যথাযথভাবে আইনকানুন তৈরি করবে এবং তা মেনে চলবে তখন তা কুফরি বলে বিবেচিত হবে। যদিও সে একথা বলে যে, (এর কারণে) আমি গুনাহগার হয়েছি এবং শরিয়তের ফয়সালাই অধিক নিষ্ঠাপূর্ণ। অতএব, চূড়ান্ত, প্রমাণিত ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত আইনের মাঝে পার্থক্য আছে; যেখানে তারা মানবরচিত আইনকেই মূল বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তা এমন কুফর বলে গণ্য হবে, যা (ব্যক্তিকে) দ্বীন থেকে বের করে দেয়।'

এ বিষয়ে অনেক উলামায়ে কিরাম এমনই বক্তব্য পেশ করেছেন। তাদের সকলের তাফসির বা মন্তব্য থেকে একথাই স্পষ্ট হয়েছে যে, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কোনো বিধান দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করা আল্লাহর সাথে এক জঘন্য ও স্পষ্ট ঔদ্ধত্য। উম্মাহর ফকিহগণ আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য বিধান দ্বারা বিচারকারীদেরকে শুধু কাফিরই বলেননি; বরং তাদের পক্ষ অবলম্বনকারী আলিমদেরকেও কাফির বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْমَ الْقِيَামَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কুরআনের বিধান গোপন করে এবং এর বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা নিজেদের উদরে আগুনই ভক্ষণ করে এবং আল্লাহ তাআলা না তাদের সাথে কিয়ামতের দিন কথা বলবেন আর না তাদের পবিত্র করবেন। বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব।’

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন :
وَمَتَى تَرَكَ الْعَالِمُ مَا عَلِمَهُ مِنْ كِتَابِ اللهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ وَاتَّبَعَ حُكْمَ الْحَاكِمِ الْمُخَالِفِ لِحُكْمِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَانَ مُرْتَدًّا كَافِرًا يَسْتَحِقُّ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.
‘আর যখন কোনো আলিম কুরআন-সুন্নাহ হতে অর্জিত শিক্ষা অনুযায়ী আমল ত্যাগ করে এবং আল্লাহ ও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারী বিচারকের অনুসরণ করে তখন সে একজন ধর্মত্যাগী এবং কাফির হিসাবে বিবেচিত হবে, যে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানে শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত।’

টিকাঃ
৩৩৩. ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, মুহাম্মাদ বিন ইবরাহিম : ১২/২৮০, ফতোয়া নং ৪০৬০ (মাতবাআতুল হুকুমাহ, মক্কা)
৩৩৪. সুরা আল-বাকারা: ১৭৪
৩৩৫. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ৩৫/৩৭৩ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ইবনে আব্বাস -এর উদ্ধৃত كفر دون كفر এর ব্যাখ্যা

📄 ইবনে আব্বাস -এর উদ্ধৃত كفر دون كفر এর ব্যাখ্যা


এ বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমত আমাদেরকে তখনকার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত হতে হবে। সময়টি ছিলো আলি ও মুয়াবিয়া -এর মাঝে মতানৈক্যের কাল। তখন আলি -এর শিবিরের কিছু লোক (যারা পরবর্তীতে খারিজি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন) আলি, মুআবিয়া ও তাঁদের দুই প্রতিনিধিকে কাফির বলে আখ্যায়িত করে। নিজেদের দাবির পক্ষে তারা আল্লাহ তাআলার এই বাণী পেশ করে: وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ 'যেসব লোক আল্লাহর অবতীর্ণকৃত আইনানুসারে ফায়সালা করে না তারাই কাফির।'

এ আয়াতের ভিত্তিতে খারিজিরা বলতে থাকে, সৃষ্ট বিবাদ মীমাংসায় আল্লাহর শরিয়া বাস্তবায়িত হয়নি। আর যারা শরিয়া বাস্তবায়িত করেনি তারা কাফির। তাদের এমন বক্তব্যের প্রতিউত্তরে ইবনে আব্বাস বলেন, যা ঘটেছে তা হলো 'কুফর দুনা কুফর'। অতএব, উল্লেখিত চারজন সাহাবি ইসলাম থেকে খারিজ হবেন না। উক্ত আয়াতের ব্যাপারে খারিজিদের ধারণা ভুল ছিল। তারা এই আয়াতকে দলিল হিসাবে পেশ করে সাহাবিদেরকে কাফির ঘোষণা করেছিল। অথচ বিষয়টি এরকম নয়। ঠিক একইভাবে বর্তমানেও কিছু মানুষ ইবনে আব্বাস -এর এই বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে চলছে। তাই এই আলোচনায় এ অস্পষ্টতা দূর করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

যেকোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের প্রথমে জানতে হবে, এই পরিস্থিতির ব্যাপারে শরিয়ার হুকুম, ফতোয়া ও রায় কী? ইবনে আব্বাস যে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে 'কুফর দুনা কুফর' বলেছিলেন, সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি পরিপূর্ণ জানতেন যে, এ ব্যাপারে শরিয়তের ফতোয়া, হুকুম ও রায় কী? তাই তিনি সব কিছু জেনেশুনেই তখন খারিজিদের সাথে কথোপকথন চলাকালীন তাদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা যে কুফর সম্পর্কে চিন্তা করছ, এটা আসলে সেই কুফর নয়। মূলত খারিজিদের মনে যা ছিল তার পরিপ্রেক্ষিতেই ইবনে আব্বাস এই রায় দিয়েছেন। এটা নিশ্চিতভাবে শুধু তাদের জন্য এবং ওই সময়ের সাথেই সীমাবদ্ধ।

তিনি ঐ সময়ের নেতাদের অবস্থা বিবেচনা করেই তাদের সন্দেহের উত্তর দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি তাদের উপর শরিয়ার হুকুম প্রয়োগ করেছিলেন। আর যারা আল্লাহর আইন দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে না তাদের ব্যাপারে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো তখন তিনি বললেন, কুফরের জন্য এটাই (আল্লাহর আইন দ্বারা বিচার না করাই) যথেষ্ট। অতএব যখন ইবনে আব্বাস এটাকে কুফর হিসাবে গণ্য করেছেন তখন এটা কুফরে আকবারই ধরতে হবে। কুরআনের আয়াতের তাফসিরের নিয়মানুযায়ী এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে আমাদের কয়েকটি মূলনীতি বুঝতে হবে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সকল মুফাসসির ও ফকিহ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোনো একজন সাহাবি বা কয়েকজন সাহাবির বক্তব্যের ভিত্তিতে কুরআনের আম (ব্যাপক অর্থবহ) আয়াতকে বাদ দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ যদি কুরআনের কোনো আম আয়াতের পক্ষে ইজমা, কুরআনের অন্য কোনো আয়াত বা হাদিসের দলিল থাকে তাহলে সাহাবির বক্তব্য দ্বারা সেই আম আয়াতকে খাস করে ব্যবহার করা যাবে না। এর অর্থ এই নয় যে, ইবনে আব্বাস সে সময় যে ফতোয়া প্রদান করেছেন তা ভুল ছিল; বরং তিনি তখন বাস্তব পরিস্থিতি অবলোকন করে বুঝেশুনে সঠিক ফতোয়াই দিয়েছেন, যা কুরআর-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

২. কুরআনের প্রতিটি আয়াতকে তার বাহ্যিক অর্থে ব্যবহার করা হবে, যতক্ষণ না বাহ্যিক অর্থের বিপরীত ভিন্ন অর্থে হওয়ার পক্ষে কোনো দলিল পাওয়া যায়। মুফাসসিরগণ বলেন, যদি এই নিয়ম না থাকত তাহলে ভ্রান্তপন্থী লোকদের জন্য বিদআতের দরজা খুলে যেত। তারা কুরআনের ভিন্ন অর্থ খোঁজার চেষ্টা করত এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ উপস্থাপন করত। অর্থাৎ কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অর্থ বুঝাতে হলে তার পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ ইবনে আব্বাস উল্লেখিত সুরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অর্থ বুঝিয়েছেন এবং তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে একটি হাদিসকে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। ওই আয়াতের বাহ্যিক অর্থে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানমতে বিচার করবে না তারা কাফির। আর খারিজিরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আলি ও মুআবিয়া -সহ চারজন সাহাবিকে কাফির বলেছে। তাই তাদের এই বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্য ইবনে আব্বাস আয়াতের বাহ্যিক অর্থ বাদ দিয়ে দলিলের মাধ্যমে তার ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করেছেন। দলিল হলো, বুরাইদা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 'বিচারক তিন প্রকারের। তাদের দুজন জাহান্নামে যাবে আর একজন জান্নাতে যাবে। প্রথমত, জান্নাতি সেই ব্যক্তি, যে সত্য জানে এবং সত্যের দ্বারা বিচার করে। দ্বিতীয়ত, এমন বিচারক, যে তার মূর্খতা দিয়ে মানুষের মাঝে বিচার করে, সে জাহান্নামি। তৃতীয়ত, যে সত্য জানে, কিন্তু সত্য থেকে বিমুখ সেও জাহান্নামি।'

৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস শরিয়া পরিবর্তনকারীকে কাফির বলেননি; বরং আয়াতে ওই সব লোকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যারা ঐশী বিধান বা আইন ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটা নিশ্চয় কুফরে আকবার তথা শরিয়া পরিবর্তন করার কুফর থেকে ছোট।

৪. ইবনে আব্বাস কিছু কিছু মাসআলায় অন্য সাহাবিদের চেয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতেন। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। যেমন তিনি নিকাহে মুতআকে হালাল মনে করতেন। পরবর্তী কালে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। অনুরূপ তিনি সুদি পণ্য কমবেশ করে নগদে লেনদেন করাকে জায়িজ মনে করতেন। তাহলে 'কুফর দুনা কুফর' এর অন্ধ অনুসারীরা কেন অন্যান্য নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর অন্ধ অনুসরণ করে না?

৫. পূর্ববর্তী মুফাসিসরগণ এবং আধুনিক যুগের মুফাসিসরগণ সবাই ইবনে আব্বাস-এর উক্তি বর্ণনা করেছেন এবং তারাও ওই সময়ের বাস্তবতা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতেন। তাহলে কেন তারা এ বিষয়ে তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করছেন এবং তাদের যুগের শরিয়া পরিবর্তন করার জন্য কিছু শাসককে কাফির বলেছেন?

৬. এমনিভাবে ইবনে আব্বাস-এর আরেকটি বক্তব্য ছিল এই যে, তিনি বলেছিলেন, 'এটা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করার মতো কুফর নয়।' তাঁর একথা দ্বারা এমন কিছু বুঝার সুযোগ নেই যে, এটা কুফরে আসগর বা ছোট কুফর; বরং তাদের এসব কর্মকাণ্ড কুফরে আকবার বা বড় কুফর ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করার মতো কুফরের স্তরের নয়। অর্থাৎ তাদের কুফরির স্তরটা বড় হলেও ফেরেশতাদের কুফরির স্তরটা তার চেয়েও বড়। মোটকথা, যখন আল্লাহর সীমা অতিক্রম করা হবে তখনই তা বড় কুফুর বলে বিবেচিত হবে। আর তারা যেহেতু আল্লাহর সীমা অতিক্রম করেছে তাই তারা বড় কুফুরই করেছে।

আল্লামা ইবনে কাসির এই আয়াতগুলোর তাফসিরে বলেন: 'যেরকমভাবে মুসলিম নামধারী মোঙ্গলীয় শাসকরা চেঙ্গিস খানের প্রণীত সংবিধান দ্বারা বিচার-ফয়সালা করত, যা তাদের নেতা চেঙ্গিস খানের 'ইয়াসিক' নামক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। 'ইয়াসিক' এমন একটি আইনগ্রন্থ, যা বিভিন্ন ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সেখানে তার নিজস্ব খেয়ালখুশি ও চিন্তাধারারও অনেক আইন সন্নিবেশিত ছিল। এভাবেই এটা তাদের মাঝে অনুসরণীয় একটি সংবিধানরূপে স্বীকৃতি পায়। তারা আল্লাহর কিতাব এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর উপর এটাকে প্রাধান্য দিত। অতএব, যে কেউ এমনটা করবে সে কাফির হয়ে যাবে। তার বিরূদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করতে হবে, যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে। সুতরাং কমবেশি কোনো বিষয়েই তিনি ছাড়া কেউ ফয়সালা করতে পারবে না।'

টিকাঃ
৩৩৬. সুরা আল-মায়িদা: ৪৪
৩৩৭. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪/১০১, হা. নং ৭০১২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
৩৩৮. সুরা আত-তাওবা: ৫
৩৩৯. তারিখু দিমাশক, ইবনু আসাকির: ৫২/২৭৯ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৩৪০. মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৯/১৭৩, হা. নং ৫২৬৬ (দারুল মামুন লিত্তুরাস, দামেশক)
৩৪১. সুরা আল-মায়িদা: ৪০-৫০
৩৪২. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৩/১১৯ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

এ বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমত আমাদেরকে তখনকার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত হতে হবে। সময়টি ছিলো আলি ও মুয়াবিয়া -এর মাঝে মতানৈক্যের কাল। তখন আলি -এর শিবিরের কিছু লোক (যারা পরবর্তীতে খারিজি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন) আলি, মুআবিয়া ও তাঁদের দুই প্রতিনিধিকে কাফির বলে আখ্যায়িত করে। নিজেদের দাবির পক্ষে তারা আল্লাহ তাআলার এই বাণী পেশ করে:

وَمَن لَّমْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾
'যেসব লোক আল্লাহর অবতীর্ণকৃত আইনানুসারে ফায়সালা করে না তারাই কাফির।'

এ আয়াতের ভিত্তিতে খারিজিরা বলতে থাকে, সৃষ্ট বিবাদ মীমাংসায় আল্লাহর শরিয়া বাস্তবায়িত হয়নি। আর যারা শরিয়া বাস্তবায়িত করেনি তারা কাফির। তাদের এমন বক্তব্যের প্রতিউত্তরে ইবনে আব্বাস বলেন, যা ঘটেছে তা হলো 'কুফর দুনা কুফর'। অতএব, উল্লেখিত চারজন সাহাবি ইসলাম থেকে খারিজ হবেন না। উক্ত আয়াতের ব্যাপারে খারিজিদের ধারণা ভুল ছিল। তারা এই আয়াতকে দলিল হিসাবে পেশ করে সাহাবিদেরকে কাফির ঘোষণা করেছিল। অথচ বিষয়টি এরকম নয়। ঠিক একইভাবে বর্তমানেও কিছু মানুষ ইবনে আব্বাস -এর এই বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে চলছে। তাই এই আলোচনায় এ অস্পষ্টতা দূর করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

যেকোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের প্রথমে জানতে হবে, এই পরিস্থিতির ব্যাপারে শরিয়ার হুকুম, ফতোয়া ও রায় কী? ইবনে আব্বাস যে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে 'কুফর দুনা কুফর' বলেছিলেন, সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি পরিপূর্ণ জানতেন যে, এ ব্যাপারে শরিয়তের ফতোয়া, হুকুম ও রায় কী? তাই তিনি সব কিছু জেনেশুনেই তখন খারিজিদের সাথে কথোপকথন চলাকালীন তাদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা যে কুফর সম্পর্কে চিন্তা করছ, এটা আসলে সেই কুফর নয়। মূলত খারিজিদের মনে যা ছিল তার পরিপ্রেক্ষিতেই ইবনে আব্বাস এই রায় দিয়েছেন। এটা নিশ্চিতভাবে শুধু তাদের জন্য এবং ওই সময়ের সাথেই সীমাবদ্ধ। তিনি ঐ সময়ের নেতাদের অবস্থা বিবেচনা করেই তাদের সন্দেহের উত্তর দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি তাদের উপর শরিয়ার হুকুম প্রয়োগ করেছিলেন। আর যারা আল্লাহর আইন দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে না তাদের ব্যাপারে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো তখন তিনি বললেন, কুফরের জন্য এটাই (আল্লাহর আইন দ্বারা বিচার না করাই) যথেষ্ট।

অতএব যখন ইবনে আব্বাস এটাকে কুফর হিসাবে গণ্য করেছেন তখন এটা কুফরে আকবারই ধরতে হবে। কুরআনের আয়াতের তাফসিরের নিয়মানুযায়ী এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে আমাদের কয়েকটি মূলনীতি বুঝতে হবে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সকল মুফাসসির ও ফকিহ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোনো একজন সাহাবি বা কয়েকজন সাহাবির বক্তব্যের ভিত্তিতে কুরআনের আম (ব্যাপক অর্থবহ) আয়াতকে বাদ দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ যদি কুরআনের কোনো আম আয়াতের পক্ষে ইজমা, কুরআনের অন্য কোনো আয়াত বা হাদিসের দলিল থাকে তাহলে সাহাবির বক্তব্য দ্বারা সেই আম আয়াতকে খাস করে ব্যবহার করা যাবে না। এর অর্থ এই নয় যে, ইবনে আব্বাস সে সময় যে ফতোয়া প্রদান করেছেন তা ভুল ছিল; বরং তিনি তখন বাস্তব পরিস্থিতি অবলোকন করে বুঝেশুনে সঠিক ফতোয়াই দিয়েছেন, যা কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

২. কুরআনের প্রতিটি আয়াতকে তার বাহ্যিক অর্থে ব্যবহার করা হবে, যতক্ষণ না বাহ্যিক অর্থের বিপরীত ভিন্ন অর্থে হওয়ার পক্ষে কোনো দলিল পাওয়া যায়। মুফাসসিরগণ বলেন, যদি এই নিয়ম না থাকত তাহলে ভ্রান্তপন্থী লোকদের জন্য বিদআতের দরজা খুলে যেত। তারা কুরআনের ভিন্ন অর্থ খোঁজার চেষ্টা করত এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ উপস্থাপন করত। অর্থাৎ কোনো আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অর্থ বুঝাতে হলে তার পক্ষে দলিল উপস্থাপন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ ইবনে আব্বাস উল্লেখিত সুরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অর্থ বুঝিয়েছেন এবং তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে একটি হাদিসকে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। ওই আয়াতের বাহ্যিক অর্থে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানমতে বিচার করবে না তারা কাফির। আর খারিজিরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আলি ও মুআবিয়া -সহ চারজন সাহাবিকে কাফির বলেছে। তাই তাদের এই বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্য ইবনে আব্বাস আয়াতের বাহ্যিক অর্থ বাদ দিয়ে দলিলের মাধ্যমে তার ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করেছেন। দলিল হলো, বুরাইদা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

الْقُضَاةُ ثَلَاثَةُ: قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضٍ فِي الْجَنَّةِ. قَاضٍ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ فَهُوَ فِي الْجَنَّةِ، وَقَاضٍ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ مُتَعَمِّدًا فَهُوَ فِي النَّارِ، وَقَاضٍ قَضَى بِغَيْرِ عِلْمٍ فَهُوَ فِي النَّارِ.
'বিচারক তিন প্রকারের। তাদের দুজন জাহান্নামে যাবে আর একজন জান্নাতে যাবে। প্রথমত, জান্নাতি সেই ব্যক্তি, যে সত্য জানে এবং সত্যের দ্বারা বিচার করে। দ্বিতীয়ত, এমন বিচারক, যে তার মূর্খতা দিয়ে মানুষের মাঝে বিচার করে, সে জাহান্নামি। তৃতীয়ত, যে সত্য জানে, কিন্তু সত্য থেকে বিমুখ সেও জাহান্নামি।'

৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস শরিয়া পরিবর্তনকারীকে কাফির বলেননি; বরং আয়াতে ওই সব লোকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যারা ঐশী বিধান বা আইন ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটা নিশ্চয় কুফরে আকবার তথা শরিয়া পরিবর্তন করার কুফর থেকে ছোট।

৪. ইবনে আব্বাস কিছু কিছু মাসআলায় অন্য সাহাবিদের চেয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতেন। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। যেমন তিনি নিকাহে মুতআকে হালাল মনে করতেন। পরবর্তী কালে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। অনুরূপ তিনি সুদি পণ্য কমবেশ করে নগদে লেনদেন করাকে জায়িজ মনে করতেন। তাহলে 'কুফর দুনা কুফর' এর অন্ধ অনুসারীরা কেন অন্যান্য নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর অন্ধ অনুসরণ করে না?

৫. পূর্ববর্তী মুফাসিসরগণ এবং আধুনিক যুগের মুফাসিসরগণ সবাই ইবনে আব্বাস-এর উক্তি বর্ণনা করেছেন এবং তারাও ওই সময়ের বাস্তবতা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতেন। তাহলে কেন তারা এ বিষয়ে তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করছেন এবং তাদের যুগের শরিয়া পরিবর্তন করার জন্য কিছু শাসককে কাফির বলেছেন?

৬. এমনিভাবে ইবনে আব্বাস-এর আরেকটি বক্তব্য ছিল এই যে, তিনি বলেছিলেন, 'এটা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করার মতো কুফর নয়।' তাঁর একথা দ্বারা এমন কিছু বুঝার সুযোগ নেই যে, এটা কুফরে আসগর বা ছোট কুফর; বরং তাদের এসব কর্মকাণ্ড কুফরে আকবার বা বড় কুফর ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করার মতো কুফরের স্তরের নয়। অর্থাৎ তাদের কুফরির স্তরটা বড় হলেও ফেরেশতাদের কুফরির স্তরটা তার চেয়েও বড়। মোটকথা, যখন আল্লাহর সীমা অতিক্রম করা হবে তখনই তা বড় কুফুর বলে বিবেচিত হবে। আর তারা যেহেতু আল্লাহর সীমা অতিক্রম করেছে তাই তারা বড় কুফুরই করেছে।

আল্লামা ইবনে কাসির তাঁর যুগেও যখন এমন বাস্তবতা অবলোকন করেছিলেন তখন ঠিকই তিনি এই বিষয়ে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করে তাদের বড় কুফরির কথা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন:

وَكَمَا يَحْكُمُ بِهِ التَّتَارُ مِنَ السَّيَاسَاتِ الْمَلَكِيَّةِ الْمَأْخُوذَةِ عَنْ مَلِكِهِمْ جِنْكِرْ خَانَ الَّذِي وَضَعَ لَهُمُ الياسق، وَهُوَ عِبَارَةٌ عَنْ كِتَابٍ مَجْمُوع مِنْ أَحْكَام قد اقتبسها من شَرَائِعَ شَتَّى مِنَ الْيَهُودِيَّةِ وَالنَّصْرَانِيَّةِ وَالْمِلَّةِ الْإِسْلَامِيَّةِ وغيرها، وَفِيهَا كَثِيرٌ مِنَ الْأَحْكَامِ أَخَذَهَا مِنْ مُجَرَّدِ نظره وهواه، فصارت في بينه شرعا متبعا يقدمونه على الحكم بِكِتَابِ اللهِ وَسُنَّةِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ مِنْهُمْ فَهُوَ كَافِرُ يَجِبُ قِتَالُهُ حتى يرجع إلى حكم الله ورسوله، فَلَا يَحْكُمُ سِوَاهُ فِي قَلِيلٍ وَلَا كَثِيرٍ.
'যেরকমভাবে মুসলিম নামধারী মোঙ্গলীয় শাসকরা চেঙ্গিস খানের প্রণীত সংবিধান দ্বারা বিচার-ফয়সালা করত, যা তাদের নেতা চেঙ্গিস খানের 'ইয়াসিক' নামক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। 'ইয়াসিক' এমন একটি আইনগ্রন্থ, যা বিভিন্ন ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সেখানে তার নিজস্ব খেয়ালখুশি ও চিন্তাধারারও অনেক আইন সন্নিবেশিত ছিল। এভাবেই এটা তাদের মাঝে অনুসরণীয় একটি সংবিধানরূপে স্বীকৃতি পায়। তারা আল্লাহর কিতাব এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর উপর এটাকে প্রাধান্য দিত। অতএব, যে কেউ এমনটা করবে সে কাফির হয়ে যাবে। তার বিরূদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করতে হবে, যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে। সুতরাং কমবেশি কোনো বিষয়েই তিনি ছাড়া কেউ ফয়সালা করতে পারবে না।'

টিকাঃ
৩৩৬. সুরা আল-মায়িদা: ৪৪
৩৩৭. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪/১০১, হা. নং ৭০১২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
৩৩৮. সুরা আত-তাওবা: ৫
৩৩৯. তারিখু দিমাশক, ইবনু আসাকির: ৫২/২৭৯ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৩৪০. মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৯/১৭৩, হা. নং ৫২৬৬ (দারুল মামুন লিত্তুরাস, দামেশক)
৩৪১. সুরা আল-মায়িদা: ৪০-৫০
৩৪২. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৩/১১৯ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 কাফির, ফাসিক ও জালিম বিচারক কারা?

📄 কাফির, ফাসিক ও জালিম বিচারক কারা?


আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার করবে না তারা কাফির, ফাসিক ও জালিম। তিনটি উদাহরণের মাধ্যমে এ তিন শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

১. কাফির: এর উদাহরণ হলো, যখন কোনো ব্যভিচারীর বিচার করার সময় সকল সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে সে দোষী সাব্যস্ত হয়, কিন্তু বিচারক তাকে শরিয়াসম্মত শাস্তি না দিয়ে মানবরচিত অন্য কোনো শাস্তি দেয় অথবা জেল-জরিমানা করে। আবার সে এ কথা বলে যে, আমরা এ ধরনের অপরাধের জন্য এমন শাস্তিই দিয়ে থাকি। অর্থাৎ এ অপরাধের জন্য এটাই আমাদের শাস্তির নির্ধারিত ও চূড়ান্ত বিধান। তাহলে এতে সে আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে ফেলায় পরিপূর্ণরূপে কাফির সাব্যস্ত হবে।

২. জালিম : এর উদাহরণও একই। তবে পার্থক্য হলো, এই বিচারক আল্লাহর বিধান মানে এবং ব্যভিচারের শাস্তির ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকারও করে না। কিন্তু সে কিছু লোককে শরিয়া-নির্ধারিত শাস্তি প্রদান করে না। কারণ, তার সাথে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ভালো সম্পর্ক আছে অথবা তাদের সামাজিক মর্যাদা উঁচু কিংবা তারা তাকে ঘুষ দিয়েছে। তাহলে এমন বিচারক জালিম হিসাবে বিবেচিত হবে।

৩. ফাসিক : তার উদাহরণ হলো, সে শরিয়া অনুযায়ী বিচার করে ঠিক, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজের সুবিধার জন্য অথবা ভয়ের কারণে সে এমন কিছু অপকৌশল অবলম্বন করে, যাতে নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকা যায়। যেমন ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন শরয়ি সাক্ষী আছে। কিন্তু বিচারক অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে বলল, এই সাক্ষী ভালোভাবে ঘটনা দেখেনি বা অমুক সাক্ষী ন্যায়পরায়ণ নয়। এভাবে সে সাক্ষীদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা ও ভুয়া অজুহাত দেখিয়ে সাক্ষ্য দিতে বাধা দিল। তাহলে এমন বিচারক ফাসিক বলে বিবেচিত হবে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার করবে না তারা কাফির, ফাসিক ও জালিম। তিনটি উদাহরণের মাধ্যমে এ তিন শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো :

১. কাফির: এর উদাহরণ হলো, যখন কোনো ব্যভিচারীর বিচার করার সময় সকল সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে সে দোষী সাব্যস্ত হয়, কিন্তু বিচারক তাকে শরিয়াসম্মত শাস্তি না দিয়ে মানবরচিত অন্য কোনো শাস্তি দেয় অথবা জেল-জরিমানা করে। আবার সে এ কথা বলে যে, আমরা এ ধরনের অপরাধের জন্য এমন শাস্তিই দিয়ে থাকি। অর্থাৎ এ অপরাধের জন্য এটাই আমাদের শাস্তির নির্ধারিত ও চূড়ান্ত বিধান। তাহলে এতে সে আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে ফেলায় পরিপূর্ণরূপে কাফির সাব্যস্ত হবে।

২. জালিম : এর উদাহরণও একই। তবে পার্থক্য হলো, এই বিচারক আল্লাহর বিধান মানে এবং ব্যভিচারের শাস্তির ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে অস্বীকারও করে না। কিন্তু সে কিছু লোককে শরিয়া-নির্ধারিত শাস্তি প্রদান করে না। কারণ, তার সাথে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ভালো সম্পর্ক আছে অথবা তাদের সামাজিক মর্যাদা উঁচু কিংবা তারা তাকে ঘুষ দিয়েছে। তাহলে এমন বিচারক জালিম হিসাবে বিবেচিত হবে।

৩. ফাসিক : তার উদাহরণ হলো, সে শরিয়া অনুযায়ী বিচার করে ঠিক, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজের সুবিধার জন্য অথবা ভয়ের কারণে সে এমন কিছু অপকৌশল অবলম্বন করে, যাতে নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকা যায়। যেমন ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন শরয়ি সাক্ষী আছে। কিন্তু বিচারক অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে বলল, এই সাক্ষী ভালোভাবে ঘটনা দেখেনি বা অমুক সাক্ষী ন্যায়পরায়ণ নয়। এভাবে সে সাক্ষীদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা ও ভুয়া অজুহাত দেখিয়ে সাক্ষ্য দিতে বাধা দিল। তাহলে এমন বিচারক ফাসিক বলে বিবেচিত হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px