📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 এক. নামাজ

📄 এক. নামাজ


নামাজ হলো ইসলামের আসল খুঁটি। এটি ইসলামের বড় ধরনের একটি শিআর বা নিদর্শন। নামাজ হলো আসমানের সাথে জমিনের যোগসূত্র। নামাজের মর্মার্থ হলো, বান্দা প্রতিদিন কয়েকবার বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে আল্লাহর ক্ষমতা ও রাজত্বের সামনে মাথা নত করবে। প্রতি রাকআত নামাজে সে আল্লাহর সাথে এ বাক্যাবলির দ্বারা কথা বলে :

‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। যিনি অসীম দয়ালু ও পরম করুণাময়। যিনি বিচারদিনের মালিক। আমরা আপনারই ইবাদত করছি এবং আপনারই নিকট সাহায্য চাচ্ছি। আমাদের সরল সঠিক পথপ্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের পথ নয়, যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট।’ ২৮৬

নামাজের গুরুত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাবের কারণে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে তা আদায় করা ফরজ করে দিয়েছেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করতে হবে। এক নামাজের ওয়াক্ত অতিবাহিত হওয়ার পর অন্য নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়। নতুন করে বান্দা আল্লাহ তাআলার ধ্যানে নিমগ্ন হয়।

কোনো বান্দা যদি সঠিক ও সুন্দরভাবে দৈনিক ফরজ নামাজসমূহ আদায় করে, তাহলে তার গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়। ২৮৭

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘দিনের দুপ্রান্তে ও রাতের প্রান্তভাগে নামাজ প্রতিষ্ঠা করুন। নিশ্চয় পুণ্যসমূহ পাপরাশিকে দূর করে দেয়। যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি একটি মহাস্মারক।’ ২৮৮

মুমিন বান্দা উত্তমরূপে অজু করে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে তার গুনাহগুলো এমনভাবে ঝরে পড়ে, যেভাবে শীতকালে শুষ্ক পাতাগুলো ঝরে পড়ে। আবু উসমান নাহদি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘আমি সালমান ফারসি-এর সাথে একটি গাছের নিচে ছিলাম। তিনি গাছের একটি শুকনো ডাল হাতে নিয়ে নাড়া দিলেন। এতে তার পাতা ঝরে পড়ল। অতঃপর আমাকে বললেন, হে আবু উসমান, তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না, কেন আমি এমন করলাম? আমি বললাম, বলুন, কেন এমন করলেন? তখন তিনি বললেন, আমার সাথে রাসুলুল্লাহ-ও এমন করেছিলেন, যখন আমি তাঁর সাথে একটি গাছের নিচে অবস্থানরত ছিলাম। তিনি গাছের একটি শুকনো ডাল হাতে নিয়ে নাড়া দিলেন। এতে তার পাতা ঝরে পড়ল। অতঃপর আমাকে বললেন, হে সালমান, তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না, কেন আমি এমন করলাম? আমি বললাম, বলুন, কেন এমন করলেন? তখন তিনি বললেন, নিশ্চয় মুসলিম বান্দা যখন উত্তমরূপে অজু করে অতঃপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তখন তার গুনাহসমূহ এমনিভাবে ঝরে যায়, যেমন এ পাতাগুলো ঝরে পড়ল।’ ২৮৯

টিকাঃ
২৮৬. সুরা আল-ফাতিহা : ১-৭
২৮৭. নামাজসহ বিভিন্ন আমলের দ্বারা গুনাহ মাফ হওয়ার যেসব আয়াত ও হাদিস পাওয়া যায়, জমহুর উলামায়ে কিরামের দৃষ্টিতে এখানে শুধু সগিরা গুনাহ মাফ হওয়া উদ্দেশ্য। কেননা, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ'র সর্বস্বীকৃত মূলনীতি হলো, কবিরা গুনাহ শুধু তাওবা করার দ্বারাই মাফ হয়; কোনো আমলের কারণে নয়। তবে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে কাউকে নিজ দয়ায় ক্ষমা করতে পারেন।
২৮৮. সুরা হুদ : ১১৪
২৮৯. মুসনাদু আহমাদ : ৩৯/১১১, হা. নং ২৩৭০৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 দুই. রোজা

📄 দুই. রোজা


রোজা হলো নিয়তের মাধ্যমে দিনভর পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম। এর মাধ্যমে মানুষের ধৈর্যশক্তি, স্থিরতা, দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় তৈরি হয়। আর রোজার অনুভূতি মানুষের অন্তর থেকে দুর্বলতা ও রিপুর কামনা মুছে ফেলে। রোজার আরেকটি উপকারিতা হলো, রোজার মাধ্যমে মানুষ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, উচ্চ মনোবল ও ইচ্ছাশক্তি অর্জন করতে পারে। আর উন্নত মনোবল ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ছাড়া কেউ রোজার সময় ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারে না। কষ্টসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যের প্রশিক্ষণের জন্য ইসলামে রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই যদি কেউ রোজার মাধ্যমে সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে, তাহলে তার যেকোনো ধরনের কষ্টকর ও কঠিন কাজ করতে বেগ পেতে হবে না। এমনিভাবে রোজা একজন মুমিনের আত্মাকে পবিত্র করে এবং অনিষ্টতা থেকে মুক্ত করে নিরাপদ রাখে।

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন: ‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়; যতটুকু আল্লাহ ইচ্ছা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “কিন্তু রোজা ব্যতীত। কেননা, রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেবো। বান্দা আমার জন্য পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থেকেছে।” আর রোজাদারের জন্য দুটি খুশি রয়েছে। একটি খুশি হলো যখন সে ইফতার করে। আরেকটি খুশি হলো, যখন সে তার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করবে। তার মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের ঘ্রাণের চেয়েও সুগন্ধিযুক্ত। রোজা হলো ঢালস্বরূপ, রোজা হলো ঢালস্বরূপ।’ ২৯০

টিকাঃ
২৯০. মুসনাদু আহমাদ: ১৫/৪৪৫-৪৪৬, হা. নং ৯৭১৪ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 তিন. জাকাত

📄 তিন. জাকাত


জাকাতের আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্র হওয়া। ২৯১

পরিভাষায় জাকাত হলো, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক এক চান্দ্র বৎসর শেষে তার জাকাতযোগ্য সম্পদের নির্দিষ্ট একটি অংশ উপযুক্ত প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে ফসলের ক্ষেত্রে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত নয়; বরং এ ক্ষেত্রে ফসল কাটার সময়কে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘আর তিনি ওই সত্তা, যিনি নানান প্রকার বাগান ও গুল্ম-লতা সৃষ্টি করেছেন, যার কতক স্বীয় কাণ্ডের ওপর সন্নিবিষ্ট, আর কতক কাণ্ডের ওপর সন্নিবিষ্ট নয়। আর তিনি সৃষ্টি করেছেন খেজুর বৃক্ষ ও শস্যখেত; যাতে বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য উৎপন্ন হয়ে থাকে। তিনি জাইতুন ও আনার বৃক্ষও সৃষ্টি করেছেন। কতক দৃশ্যত অভিন্ন ও স্বাদে ভিন্ন। এই সব ফল তোমরা আহার করো, যখন ফল ধরে। আর তা হতে শরিয়তের নির্ধারিত যে অংশ রয়েছে, তা ফসল কাটার দিন আদায় করে নাও, অপচয় করে সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে ভালোবাসেন না।’ ২৯২

জাকাত মানুষের সম্পদকে পবিত্র ও বৃদ্ধি করে। এ বৃদ্ধি তিনভাবে হয় : ১. জাকাতদাতার জন্য কল্যাণ। ২. জাকাতগ্রহীতার জন্য কল্যাণ। ৩. যে সম্পদ থেকে জাকাত প্রদান করা হয়েছে, সে সম্পদে কল্যাণ। এ তিন ক্ষেত্রেই বরকত বৃদ্ধি পায়। জাকাতদাতা জাকাত আদায়ের মাধ্যমে মনের কৃপণতা, আমিত্ব ও অহংকার থেকে মুক্তি পায়। এর মাধ্যমে মুসলমানের আকিদা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হয়। এমনিভাবে জাকাতগ্রহীতাও জাকাত গ্রহণের মাধ্যমে হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতার মতো অন্তরের এমন অসংখ্য দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে।

লক্ষণীয় বিষয় যে, জাকাত হলো গরিবের অধিকার। তাই জাকাত দিয়ে কেউ গরিবের ওপর ইহসান করার দাবি করতে পারে না। জাকাত তো অন্যের হক। যতক্ষণ না এটি আদায় করা হয়, তা ঋণের মতো থেকে যায় এবং মাথার ওপর বোঝা হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘আর তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক রয়েছে।’ ২৯৩

জাকাত ফরজ হওয়ার পরও আদায় না করলে এ সম্পদ মালিকের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘রাসুলুল্লাহ আমার নিকট এসে আমার হাতে রুপোর কয়েকটি বড় আংটি দেখে জিজ্ঞেসা করলেন, হে আয়েশা, এগুলো কী? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার জন্য সাজসজ্জার উদ্দেশ্যে এগুলো বানিয়েছি। তিনি বললেন, তুমি কি এগুলোর জাকাত দাও? আমি বললাম, না অথবা আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন। তিনি বললেন, তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।’ ২৯৪

টিকাঃ
২৯১. আল-মুজামুল অসিত: ১/৩৯৬ (দারুদ দাওয়াহ, ইসকানদারিয়া)
২৯২. সুরা আল-আনআম : ১৪১
২৯৩. সুরা আজ-জারিয়াত: ১৯
২৯৪. সুনানু আবি দাউদ : ২/৯৫, হা. নং ১৫৬৫ (আল-মাকতাবুল আসরিয়া, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 চার. হজ

📄 চার. হজ


হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। হজের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা। ২৯৫ এর শাব্দিক অর্থের সাথে ব্যবহারিক অর্থের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কেননা হজ পালনকারী আল্লাহর ঘর জিয়ারত করার ইচ্ছা নিয়েই সেখানে গমন করেন।

আল্লাহ তাআলা কাবা শরিফকে যুগ যুগ ধরে মানুষের মিলনমেলা ও নিরাপদ স্থান বানিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানুষ এসে সেখানে একত্রিত হয়। প্রতি বছর সমগ্র বিশ্বের মুসলমানরা তাদের এক কাবার দিকে ছুটে যায়। যেখানে নেই কোনো শেতাঙ্গ, কৃণাঙ্গ, ধনী, গরিব ভেদাভেদ। সকলে একই কালিমার টানে একই ঘরের পানে ছুটে যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘স্মরণ করো, যখন আমি কাবা গৃহকে মানুষের জন্য সম্মিলনস্থল ও শান্তির আলয় করলাম। আর তোমরা ইবরাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাজের জায়গা বানাও।’ ২৯৬

আয়াতের মধ্যে (আল-বাইত) দ্বারা কাবা শরিফকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম-এর সে দুআ সম্পর্কে ইরশাদ করেন : ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাস করিয়েছি। হে আমাদের পালনকর্তা, তারা যেন নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। তাই আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফল-ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করুন, সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।’ ২৯৭

টিকাঃ
২৯৫. আল-মুজামুল অসিত: ১/১৫৬ (দারুদ দাওয়াহ, ইসকানদারিয়া)
২৯৬. সুরা আল-বাকারা: ১২৫
২৯৭. সুরা ইবরাহিম : ৩৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px