📄 পঞ্চমত, ইসলাম দলিলনির্ভর জীবনব্যবস্থা
ইসলাম কখনো বলপ্রয়োগ ও অন্যায় হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের বিধিবিধান সমাধানের ক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণের ওপর নির্ভর করে। কারণ, দলিল-প্রমাণ মানুষকে সূক্ষ্মদৃষ্টি ও গভীর জ্ঞান দান করে। তাই আল্লাহ তাআলা ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে হিকমত অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ‘তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো সুন্দর পন্থায়। তোমার রব ভালো করেই জানেন, কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী হয় আর কে সৎ পথে আছে।’ ২৭০
কঠোরতা পরিহার করে দয়ার্দ্র ভঙ্গিতে দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘অতএব, আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা আপনার পাশ থেকে সরে পড়ত। তাই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।’ ২৭১
স্বাভাবিকভাবে ইসলাম দয়া, কোমলতা, নম্রতা, উদারতা ও বদান্যতার ধর্ম, যা অন্তর ও আত্মায় প্রভাব সৃষ্টি করে। তথাপি ক্ষেত্রবিশেষে কঠোরতা অবলম্বন করতে হয়। কল্যাণের জন্য সেটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো, যেন তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা খুঁজে পায়। আর জেনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথেই আছেন।’ ২৭২
তিনি আরও ইরশাদ করেন : ‘যে সমস্ত আহলে কিতাব আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ইমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা হারাম করেছেন—তা হারাম মানে না এবং সত্য ধর্ম গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় করজোড়ে জিজিয়া প্রদান করে।’ ২৭৩
ইসলামে অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহ বা ধ্বংসের নেশার কারণে যুদ্ধের বিধান দেওয়া হয়নি; বরং ইসলামের শান্তির দাওয়াত গ্রহণ না করার কারণে অবাধ্য কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ আবশ্যক করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুসলিম ও অমুসলিমদের যুদ্ধের পার্থক্য বর্ণনা করে ইরশাদ করেন: ‘যারা মুমিন, তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং যারা কাফির, তারা শয়তানের পক্ষে যুদ্ধ করে। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।’ ২৭৪
ইসলাম মানুষের বিভিন্ন অন্যায়, অকল্যাণ থেকে সমাজ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্য সমুচিত শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। অপরাধের শাস্তি দিতে ইসলাম ফৌজদারি আইনের ব্যবস্থা করেছে। আর এই ফৌজদারি আইনে শাস্তি তিন ধরনের। যথা: হুদুদ, কিসাস ও তাজির। এগুলোর প্রতিটিই সুদীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে, যা দণ্ডবিধির আলোচনায় বিশদভাবে উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
২৭০. সুরা আন-নাহল: ১২৫
২৭১. সুরা আলি ইমরান: ১৫৯
২৭২. সুরা আত-তাওবা : ১২৩
২৭৩. সুরা আত-তাওবা : ২৯
২৭৪. সুরা আন-নিসা: ৭৬
📄 ষষ্ঠত, ইসলাম মানুষের কষ্টকে লাঘবকারী
ইসলাম হচ্ছে সহজ ও সরল ধর্ম। একজন মুসলমান যেন কোনো কষ্ট বা সমস্যায় না পড়ে, সে জন্য ইসলাম তার জন্য দিয়েছে যথোপযুক্ত বিধান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘আর তোমরা আল্লাহর জন্য শ্রম স্বীকার করো যেভাবে শ্রম স্বীকার করা উচিত। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন। তিনি ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেননি। এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের আদর্শ। তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।’ ২৭৫
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে: ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্গত। অতএব যে ব্যক্তি এই গৃহে হজ অথবা উমরা পালন করে, তার জন্য এতদুভয়ের প্রদক্ষিণ করা দোষণীয় নয়।’ ২৭৬
ইসলামের নীতি হলো, ইসলাম কখনো মানুষের ওপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘কোনো ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সাধ্যের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না।’ ২৭৭
রাসুলুল্লাহ -কে প্রশ্ন করা হলো, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ধর্ম কোনটি? উত্তরে তিনি বললেন, ‘সঠিক ও উদারতাময় ধর্ম।’ ২৭৮
ইমাম বুখারি আয়েশা সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: ‘রাসুলুল্লাহ -কে যদি দুটি জিনিসের মধ্য হতে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে পাপকর্ম না হলে তিনি সবচেয়ে সহজটা গ্রহণ করতেন।’ ২৭৯
ইমাম বুখারি আনাস থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, ভীত-সন্ত্রস্ত করো না।’ ২৮০
টিকাঃ
২৭৫. সুরা আল-হজ: ৭৮
২৭৬. সুরা আল-বাকারা: ১৫৮
২৭৭. সুরা আল-বাকারা: ২৮৬
২৭৮. মুসনাদু আহমাদ: ৪/১৭, হা. নং ২১০৮
২৭৯. সহিহুল বুখারি: ৪/১৮৯, হা. নং ৩৫৬০
২৮০. সহিহুল বুখারি : ১/২৭, হা. নং ৬৯
📄 সপ্তমত, ইসলাম মানুষের কল্যাণকর বিষয় বাস্তবায়নকারী
ইসলাম মানুষের জন্য সকল কল্যাণকর বিষয় বাস্তবায়ন করে এবং সকল অকল্যাণকর বিষয় প্রতিহত করে। ইসলাম মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে সত্য ও ন্যায়, দূরীভূত করেছে অসত্য ও অন্যায়কে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ ২৮১
‘আমি অবতীর্ণ করেছি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য সুচিকিৎসা ও দয়া, কিন্তু তা সীমালঙ্ঘনকারীদের কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।’ ২৮২
মصلحة (মাসলাহাত) বা কল্যাণ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক একটি শব্দ। এটি মানুষের ব্যষ্টিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে মানসিক, শারীরিক, আর্থিক ও স্বভাবগত সকল কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। ইসলামি শরিয়তের বর্ণনা থেকে আমরা জানি কল্যাণকামিতার বহু দিক রয়েছে। তেমনই একটি দিক হলো ক্রয়-বিক্রয়। ক্রয়-বিক্রয়ের বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ নানানভাবে উপকৃত হয়ে থাকে। যেমন: মুদারাবা ব্যবসা, শেয়ার ব্যবসা, বর্গাচাষ, ভাড়াচুক্তি, অগ্রিম অর্থে লেনদেন, বাকি অর্থে লেনদেন, বন্ধক এমন আরও অনেক চুক্তি আছে।
ইসলাম মানুষের সকল কল্যাণকামিতা আদায়ের পাশাপাশি সব ধরনের অকল্যাণকে দূর করার আদেশও দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎ কাজ ও সীমালঙ্ঘন করতে। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’ ২৮৩
অকল্যাণ শব্দটি সব ধরনের কষ্ট ও কাঠিন্যকে নির্দেশ করে। উদাহরণত দারিদ্র্য, অসুস্থতা, অজ্ঞতা, ধোঁকাবাজি, ছিনতাই, চুরি, সুদ, ঘুষ, জিনা, আত্মসাৎ ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ বলেন : ‘ক্ষতি করাও যাবে না এবং ক্ষতি সহাও যাবে না।’ ২৮৪
টিকাঃ
২৮১. সুরা আল-অাম্বিয়া: ১০৭
২৮২. সুরা বনি ইসরাইল: ৮২
২৮৩. সুরা আন-নাহল: ৯০
২৮৪. মুসতাদরাকুল হাকিম: ২/৬৬, হা. নং ২৩৪৫