📄 ইসলামের সর্বজনীনতা ও মানবতা
ইসলামের পূর্বে সকল আসমানি ধর্ম কোনো না কোনো জাতির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য বিধিবদ্ধ ছিল। এ সকল ধর্মের পরিসীমাও ছিল সীমাবদ্ধ। উদাহরণত তখন সে ধর্মটি একটি প্রজন্মের জন্য উপযোগী হতো অথবা তা মানুষের মধ্যকার নির্দিষ্ট এক জাতির জন্য উপযোগী ছিল। কিন্তু ইসলাম এমন এক বৈশিষ্ট্যে দীপ্তিমান, যা মানব অস্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম সকল মানুষের জন্য; চাই সে মানুষ যে জাতি বা যে বংশ কিংবা যে সময়ের-ই হোক না কেন। কারণ, ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সব সময়ের জন্য উপযোগী। সবার জন্য এক অনুপম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য ইসলামের প্রযোজ্যতা সম্পর্কে ইরশাদ করেন : 'আপনি বলে দিন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।' ২৫০
তিনি আরও বলেন : 'আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।' ২৫১
ইসলাম তার মহান জীবনব্যবস্থার কারণে সকল প্রথাপ্রীতি, জাতীয়তা ও দেশচেতনাকে ডিঙিয়ে মানবতার জন্য এক অনুপম আদর্শ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছে, যা সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য একটি উৎকর্ষ জীবনব্যবস্থা হিসাবে সর্বদা বিরাজমান থাকবে। তার সামনে যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, ইসলামের অনুসারী ও দায়িগণ যত বাধা-প্রতিবাদেরই সম্মুখীন হন না কেন, কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম স্বমহিমায় চিরউজ্জ্বল থাকবে।
এ সকল বাধা সত্ত্বেও ইসলাম সদা মানবতার ধর্মরূপেই বিদ্যমান থাকবে। তাই ইসলাম ও মানবতার মাঝে কোনো কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যেমন: রীতি-নীতি, আইন-কানুন, দেশ ও সময়ের ভিন্নতাসহ বিভিন্ন বাধা। ইসলাম এ সকল বস্তুর কোনোরূপ স্বীকৃতিই দেয় না; বরং ইসলামের ডাক হলো প্রকৃত মানবতার প্রতি, যাতে পৃথিবীকে একটি পরিশুদ্ধরূপে নিয়ে যাওয়া যায়। ইসলামের আহ্বান হলো, মানুষের মন-মানসিকতাকে পরিশুদ্ধ করার প্রতি, যেন তার মাঝে চিন্তার ঔজ্জ্বল্যের মতো অমূল্য সম্পদকে নিকৃষ্ট চিন্তাধারার স্থানে প্রতিস্থাপিত করা যায়। এ ছাড়াও ইসলামের দাওয়াত হলো, সমাজের বিভিন্ন অংশে বিরাজমান কুপ্রথা, কুসংস্কার ও খারাপ অবস্থার সংশোধনের প্রতি। যাতে প্রত্যেক ময়লা-আবর্জনা, নাপাকি ও ফাসাদ থেকে পৃথিবীকে সংশোধন করা যায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। এরপরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহভীরু।' ২৫২
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: 'হে মানবজাতি, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের তরফ হতে সমাগত হয়েছে উপদেশ, অন্তরস্থ রোগের শিফা এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।' ২৫৩
ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী থাকবে। জীবন অবসানের চরম মুহূর্তটি পর্যন্ত এর প্রতি আনুগত্য করে চলতে হবে। এ ধর্মটিই সমগ্র মানবতার পালনীয় একমাত্র ধর্ম। অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ অনুসরণ বা পালন করার অবকাশ নেই। কেননা, অন্যান্য আসমানি ধর্মের ওপর এর মর্যাদা চিরন্তন। ইসলাম অন্যান্য আসমানি ধর্মের সত্যায়নকারী। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অংশ-বিশেষ উল্লেখ করে বলেন: 'আর আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর সংরক্ষক।' ২৫৪
অন্যান্য জীবনব্যবস্থা, জাতীয়তা, আইন-কানুন ও ধর্মের ওপর ইসলামকে কর্তৃত্ব প্রদান ও বিজয়ী করা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: 'তিনিই তাঁর রাসুলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে। যাতে সকল দ্বীনের ওপর একে বিজয়ী করেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।' ২৫৫
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষের স্বভাবধর্ম। এখানে গোত্রপ্রীতি, বর্ণবাদ, বংশীয় আভিজাত্য, ভাষা বিভেদ, জাতীয়তা ও দেশচেতনার কোনো স্থান নেই। ইসলাম কোনো জাতির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টান; তারা ছিল বিশেষ দুটি জাতি। তাদের জন্য আনীত ধর্ম তাদের জাতির মাঝেই নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু ইসলাম সমগ্র বিশ্বের জন্য, সকল মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য এক সর্বজনীন ধর্ম।
টিকাঃ
২৫০. সুরা আল-আরাফ: ১৫৮
২৫১. সুরা সাবা: ২৮
২৫২. সুরা আল-হুজুরাত: ১৩
২৫৩. সুরা ইউনুস: ৫৭
২৫৪. সুরা আল-মায়িদা: ৪৮
২৫৫. সুরা আস-সফ : ০৯