📄 শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলাম
পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, ইসলাম মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে সৃদৃঢ়ভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। একমাত্র ইসলামই পেরেছে পৃথিবীর সকল মানুষের মাঝে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। এই সুবিশাল আলোচনা সামান্য পরিধিতে বর্ণনা করা সম্ভব নয়, বিধায় কয়েকটি বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করেই ক্ষান্ত করছি।
ইসলামের প্রাথমিক ঘোষণা হলো, এ ধর্মের অনুসারী সকলে ইমান ও আকিদার ক্ষেত্রে সমান এবং তারা সবাই পরস্পর ভাই ভাই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।' ২৩৬
ইসলাম আরও ঘোষণা করে যে, পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে পরস্পর পরিচিতি অর্জন ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করার জন্য। এর মাধ্যমেই সকলের মাঝে শান্তি ও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে তাঁকে অধিক ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।' ২৩৭
পারস্পরিক ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও দয়ার অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য আল্লাহ তাআলা মুমিনের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ইরশাদ করেন : 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।' ২৩৮
ইসলাম নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া, অপর ভাইকে পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসা এবং অহংকার পরিহার করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেন : 'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে অপর ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।' ২৩৯
মুমিন ব্যক্তি তো নিজ জীবনকে অপর মুসলিমের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে। অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে আচার-আচরণ, লেনদেন ও চলাফেরার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা এমন হতে হবে, যেন সকলে পরস্পর ভাই ভাই। তাদের একে অপরের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না, থাকবে শুধু পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও পরোপকারিতা। কেউ কারও ওপর অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘন করবে না। কারও সাথে কেউ দুরাচার দেখাবে না; বরং সকলে একটি দেহের মতো বসবাস করবে।
নুমান বিন বাশির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'পারস্পরিক দয়া-ভালোবাসার ক্ষেত্রে মুমিনদের দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন অনিদ্রা ও জ্বরের মাধ্যমে পুরো দেহ সাড়া দেয়।' ২৪০
যেহেতু মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক হচ্ছে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সেহেতু একজন মুসলমান কখনো তার অন্য ভাইয়ের ওপর জুলুম করতে পারে না। বিপদে তাকে একা ছেড়ে দিতে পারে না; বরং সে অপর মুমিন ভাইয়ের প্রতি সাহায্য-সহায়তার হাত বাড়াবে, যেন তার কষ্ট ও মুসিবত সহজ হয়ে যায় এবং দুঃখ-বেদনা দূর হয়ে যায়। জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করবে না। শত্রুর জুলমের মুখে তাকে সমর্পণ করবে না। আর যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে কোনো মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার একটি বিপদ দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।' ২৪১
মোটকথা, প্রতিটি মুসলিম এই পৃথিবীকে শান্তিময় করার একনিষ্ঠ কর্মী। যার সর্বনিম্ন একটি প্রমাণ হলো, কোনো মুসলমান তার অপর মুসলিম ভাইকে হাত বা কথার মাধ্যমে কষ্ট দেবে না। সকল মানুষ একজন মুসলমানের পক্ষ থেকে নিজেদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা অনুভব করবে। অর্থাৎ প্রকৃত মুসলমান কখনো অন্যের জানমালের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'প্রকৃত মুসলমান হলো, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর প্রকৃত মুমিন হলো, যাকে মানুষ নিজেদের জানমালের ব্যাপারে নিরাপদ মনে করে।' ২৪২
ইসলামের শান্তি ও নিরাপত্তার পরিধি ব্যাপক। ইসলামের সুশীতল ছায়া সুবিস্তৃত। শুধু মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টিজীবের জন্যই ইসলামে শান্তির বিধান রয়েছে। ইসলামের বিধান হলো, একটি প্রাণী যেন আরেকটি প্রাণীর ওপর, অনুরূপ একজন মানুষ যেন অন্য কোনো মানুষ বা প্রাণীর ওপর কোনোরূপ অবিচার না করে; বরং একে অপরের প্রতি যেন দয়াপরবশ হয়ে জীবনযাপন করে। একজন মানুষ যদি একটি বোবা প্রাণীর কষ্ট দূর করে বা তার খাদ্যের ব্যবস্থা করে কিংবা তাকে পানি পান করায়, তাহলে এর বিনিময়ে তার জন্য অনেক কল্যাণ ও উত্তম প্রতিদান লিপিবদ্ধ করা হবে। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, ইসলাম শুধু মানুষের মাঝেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং ইসলাম মানবসমাজ পেরিয়ে প্রাণীদের মাঝেও শান্তির বিধান প্রতিষ্ঠা করেছে।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'একদা এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভীষণ পিপাসার্ত হয়ে পড়ে। সে একটি কূপ দেখে সেখানে নেমে পানি পান করে আবার ওপরে উঠে আসল। তখন লোকটি দেখতে পেল, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে আর পিপাসার জ্বালায় মাটি খাচ্ছে। সে (মনে মনে) বলল, পিপাসার তাড়নায় আমার যেই অবস্থা হয়েছিল, এই কুকুরটিরও পিপাসায় একই অবস্থা হয়েছে। অতঃপর সে পুনরায় কূপে নেমে তার মোজার মধ্যে পানি ভরে কুকুরের মুখে ধরল। অবশেষে কুকুরটি তৃষ্ণা নিবারণ করল। ফলে আল্লাহ তাআলা দয়া পরবশ হয়ে লোকটিকে মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের কোনো প্রতিদান আছে? উত্তরে রাসুলুল্লাহ বললেন, প্রত্যেক তাজা কলিজার অধিকারী তথা জীবিত প্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রতিদান রয়েছে।' ২৪৩
রাসুলুল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুকে কষ্ট দেওয়ার কারণে নিন্দা প্রকাশ করেছেন। এটাকে তিনি জুলুম ও জাহান্নামে যাওয়ারও একটি কারণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'জনৈকা মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে শাস্তি পেয়েছে। সে মহিলাটি বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল, যার কারণে বিড়ালটি মারা যায়। ফলে মহিলাটি জাহান্নামে প্রবেশ করে।' বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর রাসুলুল্লাহ বললেন, আল্লাহই ভালো জানেন, বাঁধা থাকাকালীন তুমি তাকে না খেতে দিয়েছিলে, না পান করতে দিয়েছিলে আর না তাকে তুমি ছেড়ে দিয়েছিলে, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বাঁচত।' ২৪৪
পশুর গায়ে ছাপ দেওয়া হারাম। কেননা, এতে ওদের কষ্ট হয়। ইমাম মুসলিম জাবির থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : 'একদা রাসুলুল্লাহ-এর পাশ দিয়ে একটি গাধা যাচ্ছিল। তার চেহারা ছিল ছাপ দেওয়া। রাসুলুল্লাহ তা দেখে বললেন, যে এর চেহারায় ছাপ দিয়েছে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক।' ২৪৫
ইমাম আবু দাউদ জাবির সূত্রে ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেন : 'একদা রাসুলুল্লাহ-এর পাশ দিয়ে চেহারায় দাগ দেওয়া একটি গাধা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি (তা দেখে) বললেন, তোমাদের নিকট কি এ সংবাদ পৌঁছেনি, যে ব্যক্তি পশুর চেহারায় দাগ দেয় বা প্রহার করে আমি তাকে অভিসম্পাত করেছি? অতঃপর তিনি (সামনে থেকে) এরূপ করতে নিষেধ করলেন।' ২৪৬
এমনিভাবে এক প্রাণীকে আরেক প্রাণীর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলাও হারাম। কেননা, এর ফলে একটি আরেকটিকে গুঁতো মারতে পারে বা কোনো ক্ষতি করতে পারে। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন : 'রাসুলুল্লাহ পশুদের পরস্পর লড়াই করার জন্য উত্তেজিত করতে নিষেধ করেছেন।' ২৪৭
ইসলামে শান্তির বিধান এতটাই বিস্তৃত যে, খোঁড়া, কানা বা রোগা প্রাণীকে পর্যন্ত কষ্ট দিতে ইসলাম নিষেধ করেছে। শুধু তাই নয়; বরং সেগুলোর প্রতি ইহসান ও দয়া করার আদেশ দিয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন : 'একদা আমরা রাসুলুল্লাহ-এর সাথে সফরে ছিলাম। এক সময় রাসুলুল্লাহ নিজ প্রয়োজন সারতে গেলেন। তখন আমরা একটি হুমারা পাখি দেখলাম, যার সাথে তার দুটি বাচ্চা ছিল। আমরা তার বাচ্চা দুটিকে রেখে দিলাম। অতঃপর হুমারা পাখিটি পাখা ঝাপটাতে লাগল। তারপর রাসুলুল্লাহ এসে বললেন, কে এই বাচ্চা দুটি নিয়ে তাকে কষ্ট দিচ্ছে? তার বাচ্চা তার নিকট ফিরিয়ে দাও। এছাড়াও আমরা একটি পিঁপড়ার বাসাতে আগুন দিয়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ দেখে বললেন, কে এখানে আগুন ধরিয়েছে? আমরা বললাম, আমরা হে আল্লাহর রাসুল। এ কথা শুনে তিনি বললেন, আগুনের মালিক ছাড়া কারও জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই।' ২৪৯
এই সকল আয়াত ও হাদিসের ভাষ্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম অসহায় প্রাণীর প্রতিও দয়া প্রদর্শন করার নির্দেশ দিয়েছে। এটি হচ্ছে ইসলামের বিশালত্ব, যা মানব-জিনসহ সকল প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করে। অতএব, যখন পৃথিবীতে এ ধরনের মহান আদর্শমূলক কাজ ছড়িয়ে পড়বে, তখন অবশ্যই অন্যায়-অত্যাচার দূর হয়ে বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই হলো প্রকৃত শান্তি, যা কেবল ইসলামি শরিয়ার আকিদা-দর্শনের মাঝেই বিদ্যমান রয়েছে। আর ইসলাম ছাড়া বিভিন্ন জাগতিক তন্ত্র-মন্ত্রের ধ্বজাধারী, যেমন ইহুদি-খ্রিষ্টান, হিন্দু-বৌদ্ধ, নাস্তিক যে কেউ-ই শান্তির বুলি প্রচার করুক, তা মিথ্যা মন্ত্র বৈ কিছু নয়। তাদের এসব মিথ্যা দাবি মানবতার সাথে স্পষ্ট প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি।
টিকাঃ
২৩৬. সুরা আল-হুজুরাত : ১০
২৩৭. সুরা আল-হুজুরাত : ১৩
২৩৮. সুরা আল-ফাতহ: ২৯
২৩৯. সহিহুল বুখারি : ১/১২, হা. নং ১৩ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
২৪০. সহিহ মুসলিম: ৪/১৯৯৯, হা. নং ২৫৮৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
২৪১. সহিহু মুসলিম: ৪/১৯৯৬, হা. নং ২৫৮০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
২৪২. সহিহু ইবনি হিব্বান: ১/৪০৬, হা. নং ১৮০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
২৪৩. মুআত্তা মালিক: ৫/১৩৬১, হা. নং ৩৪৩৫ (মুআসসাসাতু জাইদ বিন সুলতান, আবুধাবি) - হাদিসটি সহিহ।
২৪৪. সহিহুল বুখারি : ২/১১২, হা. নং ২৩৬৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
২৪৫. সহিহু মুসলিম : ৩/১৭৭৩, হা. নং ২১১৭ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
২৪৬. সুনানু আবি দাউদ: ৩/২৬-২৭, হা. নং ২৫৬৪ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
২৪৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩/২৬২, হা. নং ১৭০৮ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ।
২৪৮. দামিরি বলেন, হুমারা চড়ুইয়ের মতো এক প্রকার পাখি। এটি খাওয়া হালাল হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। কেননা, তা চড়ুই পাখিরই একটি প্রকার।
২৪৯. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৫৫, হা. নং ২৬৭৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 ইসলামের সর্বজনীনতা ও মানবতা
ইসলামের পূর্বে সকল আসমানি ধর্ম কোনো না কোনো জাতির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য বিধিবদ্ধ ছিল। এ সকল ধর্মের পরিসীমাও ছিল সীমাবদ্ধ। উদাহরণত তখন সে ধর্মটি একটি প্রজন্মের জন্য উপযোগী হতো অথবা তা মানুষের মধ্যকার নির্দিষ্ট এক জাতির জন্য উপযোগী ছিল। কিন্তু ইসলাম এমন এক বৈশিষ্ট্যে দীপ্তিমান, যা মানব অস্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম সকল মানুষের জন্য; চাই সে মানুষ যে জাতি বা যে বংশ কিংবা যে সময়ের-ই হোক না কেন। কারণ, ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সব সময়ের জন্য উপযোগী। সবার জন্য এক অনুপম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য ইসলামের প্রযোজ্যতা সম্পর্কে ইরশাদ করেন : 'আপনি বলে দিন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।' ২৫০
তিনি আরও বলেন : 'আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।' ২৫১
ইসলাম তার মহান জীবনব্যবস্থার কারণে সকল প্রথাপ্রীতি, জাতীয়তা ও দেশচেতনাকে ডিঙিয়ে মানবতার জন্য এক অনুপম আদর্শ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছে, যা সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য একটি উৎকর্ষ জীবনব্যবস্থা হিসাবে সর্বদা বিরাজমান থাকবে। তার সামনে যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, ইসলামের অনুসারী ও দায়িগণ যত বাধা-প্রতিবাদেরই সম্মুখীন হন না কেন, কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম স্বমহিমায় চিরউজ্জ্বল থাকবে।
এ সকল বাধা সত্ত্বেও ইসলাম সদা মানবতার ধর্মরূপেই বিদ্যমান থাকবে। তাই ইসলাম ও মানবতার মাঝে কোনো কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যেমন: রীতি-নীতি, আইন-কানুন, দেশ ও সময়ের ভিন্নতাসহ বিভিন্ন বাধা। ইসলাম এ সকল বস্তুর কোনোরূপ স্বীকৃতিই দেয় না; বরং ইসলামের ডাক হলো প্রকৃত মানবতার প্রতি, যাতে পৃথিবীকে একটি পরিশুদ্ধরূপে নিয়ে যাওয়া যায়। ইসলামের আহ্বান হলো, মানুষের মন-মানসিকতাকে পরিশুদ্ধ করার প্রতি, যেন তার মাঝে চিন্তার ঔজ্জ্বল্যের মতো অমূল্য সম্পদকে নিকৃষ্ট চিন্তাধারার স্থানে প্রতিস্থাপিত করা যায়। এ ছাড়াও ইসলামের দাওয়াত হলো, সমাজের বিভিন্ন অংশে বিরাজমান কুপ্রথা, কুসংস্কার ও খারাপ অবস্থার সংশোধনের প্রতি। যাতে প্রত্যেক ময়লা-আবর্জনা, নাপাকি ও ফাসাদ থেকে পৃথিবীকে সংশোধন করা যায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। এরপরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহভীরু।' ২৫২
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: 'হে মানবজাতি, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের তরফ হতে সমাগত হয়েছে উপদেশ, অন্তরস্থ রোগের শিফা এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।' ২৫৩
ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী থাকবে। জীবন অবসানের চরম মুহূর্তটি পর্যন্ত এর প্রতি আনুগত্য করে চলতে হবে। এ ধর্মটিই সমগ্র মানবতার পালনীয় একমাত্র ধর্ম। অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ অনুসরণ বা পালন করার অবকাশ নেই। কেননা, অন্যান্য আসমানি ধর্মের ওপর এর মর্যাদা চিরন্তন। ইসলাম অন্যান্য আসমানি ধর্মের সত্যায়নকারী। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অংশ-বিশেষ উল্লেখ করে বলেন: 'আর আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর সংরক্ষক।' ২৫৪
অন্যান্য জীবনব্যবস্থা, জাতীয়তা, আইন-কানুন ও ধর্মের ওপর ইসলামকে কর্তৃত্ব প্রদান ও বিজয়ী করা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: 'তিনিই তাঁর রাসুলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে। যাতে সকল দ্বীনের ওপর একে বিজয়ী করেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।' ২৫৫
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষের স্বভাবধর্ম। এখানে গোত্রপ্রীতি, বর্ণবাদ, বংশীয় আভিজাত্য, ভাষা বিভেদ, জাতীয়তা ও দেশচেতনার কোনো স্থান নেই। ইসলাম কোনো জাতির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টান; তারা ছিল বিশেষ দুটি জাতি। তাদের জন্য আনীত ধর্ম তাদের জাতির মাঝেই নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু ইসলাম সমগ্র বিশ্বের জন্য, সকল মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য এক সর্বজনীন ধর্ম।
টিকাঃ
২৫০. সুরা আল-আরাফ: ১৫৮
২৫১. সুরা সাবা: ২৮
২৫২. সুরা আল-হুজুরাত: ১৩
২৫৩. সুরা ইউনুস: ৫৭
২৫৪. সুরা আল-মায়িদা: ৪৮
২৫৫. সুরা আস-সফ : ০৯