📄 আল্লাহর ওপর ভরসা
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হলো, পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে সকল বিষয়কে তাঁর ওপর ন্যস্ত করা। (আত-তাওয়াক্কুল) শব্দটি (ওকালাত) থেকে নির্গত হয়েছে, যার অর্থ সমর্পণ করা। যেমন বলা হয়, 'সে আল্লাহর ওপর ভরসা করেছে, তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে, তাঁর ওপর নির্ভর করেছে।' ২২০
তাওয়াক্কুলের জন্য শর্ত হলো, শরয়ি বিবেচনায় বিষয়টি সঠিক হতে হবে। শরিয়া অনুমোদিত সম্ভাব্য সকল উপকরণ গ্রহণ করে তবেই তাওয়াক্কুল করতে হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি সঠিকভাবে তাওয়াক্কুল করে, সে অবশ্যই এই বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করবে যে, আল্লাহ তাআলা তার ভরসাকৃত বিষয়ে সাড়া দেবেন। এর জন্য সে নিজের যথাযথ চেষ্টা- প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। অতএব, যদি কারও তাওয়াক্কুল সকল উপকরণ গ্রহণ করে পরিপূর্ণ বিনয়ের সাথে না হয়, তাহলে তার তাওয়াক্কুল শরিয়াসম্মত হবে না; বরং তা (তাওয়াক্কুল) এর পরিবর্তে (তাওয়াক্কুল) অর্থাৎ একে অপরের ওপর নির্ভর করাতে পরিণত হবে।
イমাম গাজ্জালি তাওয়াক্কুল সম্পর্কে বলেন, 'ইমানের দরজাসমূহ থেকে একটি দরজা হলো তাওয়াক্কুল। আর ইমানের প্রতিটি দরজা ইলম, আমল ও স্থিরতা ছাড়া সুবিন্যস্ত হয় না। এমনিভাবে এই তিনটি বিষয় ছাড়া তাওয়াক্কুলও সুবিন্যস্ত হয় না। এর মধ্যে ইলম হলো মূল, আমল তার ফল আর স্থিরতা তার উদ্দেশ্য।' ২২১
তাওয়াক্কুলের বিষয়টি আকিদার সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহর ওপর যার ভরসা যত বেশি, তার ইচ্ছাশক্তি ও মনোবল তত সুদৃঢ়। তার ধৈর্য, বিশ্বাস ও বিনয় তত বেশি বৃদ্ধি পায়। মুমিনের অবস্থা এমনই হওয়া উচিত। আর এর বিপরীত (তাওয়াক্কুল) অর্থ, মানুষ মানুষের ওপর নির্ভর করা। যাদের ওপর নির্ভর করা হবে, তারা চাই শাসক হোক কিংবা নেতৃস্থানীয় বা অন্য কেউ হোক। যদি মানুষের ওপর নির্ভর করা হয়, তবে তা (তাওয়াক্কুল) হবে, (তাওয়াক্কুল) নয়। এমনিভাবে যদি কেউ শুধু মুখেই বলে যে, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম, কিন্তু সে কাজে-কর্মে তার বিপরীত করে, তাহলে সেটাও প্রকৃত তাওয়াক্কুল হবে না। এমন ত্রুটিপূর্ণ তাওয়াক্কুল অনর্থক আশা-আকাঙ্ক্ষা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুল করে মাধ্যম গ্রহণ এবং সেই অনুযায়ী আন্তরিক চেষ্টা সহকারে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেন : ‘আর আপনি বলে দিন, তোমরা আমল করে যাও। অতঃপর আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনগণ তোমাদের আমল লক্ষ করবেন।’ ২২২
আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর ভরসা করে তদনুযায়ী কাজ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। অন্যদিকে যারা নিজেদের কথা ও কাজে মিল রাখে না, তাদের নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন : 'হে মুমিনগণ, তোমরা যা করো না, তা কেন বলে বেড়াও? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।' ২২৩
ইমাম তিরমিজি আনাস থেকে বর্ণনা করেন: 'এক ব্যক্তি জানতে চাইল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার এই উটনীকে বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব? উত্তরে রাসুলুল্লাহ বললেন, আগে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।' ২২৪
এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ প্রকৃত তাওয়াক্কুলের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ-এর সময় কিছু মানুষ ছিল, যারা তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ জানত না। তাই তারা যখন হজের সফরে বের হতো, তখন সাথে দীর্ঘ সফরের জন্য রসদ বা খাদ্যদ্রব্য না নিয়েই বেরিয়ে পড়ত। তারা বলত, আমরা আল্লাহর ঘরের হজ করব, আর তিনি আমাদের খাওয়াবেন না?! নিজেদেরকে তারা আল্লাহর ওপর ভরসাকারী বলে দাবি করত। আল্লাহ তাআলা তাদের আসবাব গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন : 'আর তোমরা সাথে পাথেয় নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া।' ২২৫
তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এক শ্রেণির মিথ্যাবাদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় এবং আল্লাহর ওপর ভরসাকারীদের নিয়ে কটাক্ষ করে। এ সকল মিথ্যা অপবাদ রটনাকারীরা সর্বদা ইসলামের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জঘন্য ও মন্দ ধারণা পোষণ করে। অথচ ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের এমন মিথ্যারোপের কোনো দলিল-প্রমাণই তারা পেশ করতে পারে না; বরং এ সকল মানুষের বিপক্ষে আল্লাহর অনেক প্রমাণ আছে। কেননা, তিনি মানুষকে বারবার তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি যথাযথ পদক্ষেপ ও আসবাব গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন।
সালাফে সালেহিন ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাওয়াক্কুলের অধিকারী। তাঁরা পৃথিবীর দিদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। অর্ধ পৃথিবী বিজিত হয়েছিল তাদের হাতে। তাঁরা সত্য ও ন্যায়ের ঝান্ডা উঁচু করেছেন। পৃথিবীব্যাপী দাওয়াতের প্রসার, বিভিন্ন ভূখণ্ড বিজিত হওয়া ও হকের ঝান্ডা বুলন্দ হওয়ার কারণ এটাই যে, তাঁরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর তাদের অগ্রনায়ক ছিলেন মানবতার মুক্তির দিশারি, আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ। যুদ্ধের সময় তিনি থাকতেন সকলের সামনে। এমনকি যখন যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করত, তখন রাসুলুল্লাহ শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি থাকতেন। যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে শ্রেষ্ঠ বীরযোদ্ধারা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ -এর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিতেন। তিনি হতেন তাদের ইমাম। সবার আগে থাকতেন তিনি। তাঁর পেছনে থেকে অন্যরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন।
ইমাম ইবনে কাইয়িম জাওজিয়া বলেন, 'রাসুলুল্লাহ -এর গাজওয়ার সংখ্যা সাতাশটি। আর বিভিন্ন সারিয়া ও খণ্ড যুদ্ধের সংখ্যা প্রায় ষাটটি।' ২২৬
দাওয়াতের সে প্রসারণ আজ আর নেই। মুসলমানদের হাতে নতুন ভূমি বিজিত হওয়া দূরে থাক; বরং মুসলিমদের ভূমিতে আজ নাপাক কাফির-মুশরিকদের নগ্ন থাবা পড়েছে। ইসলামের পতাকার স্থলে জায়গা করে নিয়েছে জাতীয়তাবাদের পতাকা। কালিমার পতাকার স্থানে আজ বিভিন্ন শিরকি পতাকা বাধাহীনভাবে উড়ছে। এ অধঃপতনের একমাত্র কারণ রাসুলুল্লাহ -এর প্রকৃত আদর্শ ভুলে যাওয়া। বর্তমানে মুসলমানদের যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে, তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞতা। মুসলমানরা আজ বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। তারা আজ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। অথচ তারা ইসলামি শরিয়তের সকল বিধানকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে, এটাই ছিল যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার দাবি। দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও পরিপূর্ণ মনোবলের সাথে সে বরকতময় শরিয়ত অনুযায়ী আমল করবে। জীবনের পরতে পরতে কল্যাণকর কাজ করার প্রতি উৎসাহী হবে। অথচ আজ শরিয়ত পালনে মুসলিমগণ পরনির্ভরশীল! অন্যের অধীনতা স্বীকার করে মনোতুষ্টিতে ভোগা আজ মুসলিমদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
উমর-এর এ বক্তব্যটি কতই না চমৎকার! তিনি বলেন: 'আল্লাহর নিকট রিজিকের জন্য দুআ করে কেউ যেন রিজিক অন্বেষণ করা থেকে বিরত না থাকে। কারণ, দুআ করলেই আকাশ হতে সোনা- রুপা বর্ষিত হয় না; বরং দুআ করার পর রিজিক অন্বেষণ করতে হয়।' ২২৭
উল্লেখ্য, যদি কোনো মুমিন বান্দা আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকে, তাহলে সে যতদিন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকবে, ততদিন শান্তি ও নিরাপত্তার মাঝে থাকবে। তার জীবনে উচ্ছৃঙ্খলতা, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার লেশমাত্র থাকবে না। কোনো মুসলিম যখন নেক আমল ও প্রয়োজনীয় মাধ্যম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তখন তাকে সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যারা আল্লাহর ওপর ভরসাও করে আবার শরিয়ত অনুযায়ী আমলও করে; যদিও সে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম না হয়।
তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান বিষয় হচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত মনজিলে পৌঁছুক আর নাই পৌঁছুক, যথাযথভাবে আমল করে যেতে হবে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি ত্রুটিমুক্তভাবে তাওয়াক্কুলের চাহিদামতো আমল করে যায়, তাহলে সে অবশ্যই আত্মিকভাবে শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করবে, তার মনে প্রফুল্লতা বিরাজ করবে এবং তার মস্তিষ্ক থাকবে ঠান্ডা ও স্থির।
টিকাঃ
২২০. আল-মিসবাহুল মুনির : ২/৬৭০ (আল-মাকতাবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
২২১. ইহইয়াউ উলuমিদ্দিন: ৪/২৪৫ (দারুল মারিফা, বৈরুত)
২২২. সুরা আত-তাওবা: ১০৫
২২৩. সুরা আস-সফ: ২-৩
২২৪. সুনানুত তিরমিজি: ৪/২৪৯, হা. নং ২৫১৭ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
২২৫. সুরা আল-বাকারা: ১৯৭
২২৬. জাদুল মাআদ: ১/১২৫ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
২২৭. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৬২ (দারুল মারিফা, বৈরুত)
📄 মুসলমানের উদ্যমতা
সকল মানুষের মধ্যে একমাত্র মুসলিম জাতিই উদ্যমতা, প্রাণবন্ততা ও তৎপরতা ইত্যাদি গুণে স্বতন্ত্র। ইসলামের নির্দেশও এমনই যে, মুসলমানরা যেন কর্মঠ ও উদ্যমী হয় এবং অলসতা ও সংকীর্ণতা থেকে পরিপূর্ণরূপে বেঁচে থাকে। তাই আমাদের উচিত, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা।
ইসলামের নির্দেশমতো চললে পার্থিব জীবনের অনুকূল-প্রতিকূল যেকোনো পরিস্থিতিতে দৃঢ় মনোবল, সাহায্য, শক্তি ও উদ্যমতা পাওয়া যাবে। তাই যে ব্যক্তি ইসলামের এই চাহিদা মোতাবেক কাজ করবে না, নিঃসন্দেহে সে সহায়হীন ও পরিত্যক্ত হবে এবং দুর্বল, পশ্চাদপদ ও নিম্নগামী লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
ইসলামের চাহিদাই হলো মুসলমানগণ যেন তৎপর ও উদ্যমী হয়। তারা যেন হিম্মত ও সাহসিকতার সাথে সত্যের দাওয়াত নিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলে। এরই মধ্য দিয়ে একজন মুসলমান সমাজ, রাষ্ট্র ও সকল মানুষের জন্য কল্যাণের বার্তাবাহকরূপে আবির্ভূত হতে পারে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কর্মঠ ও উদ্যমী হওয়া আবশ্যক।
বিশেষ করে, বর্তমানকালে এ গুণগুলোর বড়ই অভাব অনুভূত হচ্ছে। সর্বত্র আজ কুফর ও শিরকে ছেয়ে গেছে। পাপাচারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতা ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাপকভাবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধবাদী কাফির-মুশরিক, নাস্তিক-মুরতাদরা দ্বীনের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। মানুষরূপী শয়তানগুলো দিন-রাত ইসলাম নির্মূল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাই কাফির-মুশরিকদের ওপর বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে এবং ইসলামের সম্মান রক্ষা করার জন্যে সকল নিদ্রা, দুর্বলতা ও অধঃপতনের বেড়াজাল ছিন্ন করে মুসলমানদের জাগ্রত হতে হবে, তাদের হতে হবে সদা তৎপর ও উদ্যমী।
বস্তুত, মুসলমান তো হবে সর্বদা প্রাণবন্ত, কর্মঠ ও উচ্চ মনোবলসম্পন্ন। সে তো ক্লান্তিহীনভাবে কুরবানির চেষ্টায় থাকবে, সদা সৎকর্মের প্রতি উৎসাহ দেবে, সত্যকে আঁকড়ে থাকবে ও পরস্পরকে সদুপদেশ দেবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : 'কসম সময়ের। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাগিদ দেয় সত্যের, তাগিদ দেয় সবরের।' ২২৮
শিরক ও লৌকিকতামুক্ত নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।' ২২৯
যে সকল মুমিনের মাঝে নেক আমল, সত্যতা ও সততার মতো তাকওয়ার সকল গুণ পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান রয়েছে, তাদের গুণকীর্তন করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজা পালনকারী পুরুষ ও রোজা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও জিকিরকারী নারী—তাদের সবার জন্য আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।' ২৩০
মুসলমানগণ যেন একে অপরের কষ্ট ও বিপদ দূর করতে পারে, সে জন্য পারস্পরিক ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সাহায্য-সহযোগিতার প্রতি উৎসাহ দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা।' ২৩১
আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ঐক্যের ডোরে আবদ্ধ হয়ে পরস্পর ভাইয়ের ন্যায় একই সাথে শত্রুর বিরুদ্ধে কিতালের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে ইরশাদ করেন : 'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে।' ২৩২
ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সর্বদা যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরির মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও ইসলাম মুসলমানদেরকে শরিয়তের জ্ঞান অর্জন করতে আদেশ দিয়েছে। অর্থাৎ মুসলমানগণ যেন একটি বিধান আদায় করতে গিয়ে আরেকটি বিধান বাদ না দেয় এবং সবর্দাই যেন ইসলামের সকল বিধান তারা পালন করে, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে তারা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে স্বজাতির নিকট ফিরে তাদের ভীতি প্রদর্শন করে, যেন তারা বেঁচে থাকতে পারে।' ২৩৩
ইসলামের দাওয়াত উত্তম ও সুন্দর ভঙ্গিতে পৃথিবীর আনাচে-ানাচে ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'আপন পালনকর্তার পথে আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে। আর তাদের সাথে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করুন।' ২৩৪
রাসুলুল্লাহ বলেছেন, ইমানের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা রয়েছে, যা মুমিন ব্যক্তির জীবনে ফুটে ওঠে। এর মাধ্যমে একজন মুমিন কর্মঠ ও উদ্যমী হয়ে ওঠে। ফলে তার দ্বারা কোনো ধরনের অন্যায় কর্ম সাধিত হয় না। তার প্রতিটি কথা ও কাজ ইসলামি ভূখণ্ড ও উম্মাহর কল্যাণে আসে। রাসুলুল্লাহ এমন ইমানের বাস্তব প্রমাণ বুঝিয়ে দিয়েছেন, যা একজন মুমিনকে জীবনের নানা পরিস্থিতিতে নেক আমল করার জন্য সহায়ক হয়। আবু জর গিফারি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন : 'তোমার মুসলিম ভাইয়ের সামনে তোমার মুচকি হাসি তোমার জন্য সদকা। সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা তোমার জন্য সদকা। পথহারা ব্যক্তিকে পথ দেখানো তোমার জন্য সদকা। অন্ধ ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেওয়া তোমার জন্য সদকা। রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড় ইত্যাদি সরিয়ে দেওয়া তোমার জন্য সদকা। তোমার বালতি থেকে তোমার ভাইয়ের বালতিতে পানি ঢেলে দেওয়া সদকা।' ২৩৫
সুতরাং প্রকৃত মুসলমানকে অবশ্যই সৎ আমল করতে হবে। অন্যের উপকার করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। আমাদের সালাফে সালেহিন এমনই ছিলেন। যারাই ইসলামকে জীবনের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছে, তারাই এমন মহৎ গুণের অধিকারী হতে পেরেছে। তারা কখনো আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না। তাদের মতো এমন গুণে গুণান্বিত হওয়ার মাধ্যমেই দুনিয়ার বুক থেকে সকল অন্যায়-অত্যাচার দূর করে আল্লাহর মনোনীত ধর্মের আলো জ্বালানো সম্ভব। যারা এর আলোকে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্য করে থাকেন এবং জমিনে তাদেরকে খিলাফত দান করেন।
টিকাঃ
২২৮. সুরা আল-আসর: ১-৩
২২৯. সুরা আল-কাহফ : ১১০
২৩০. সুরা আল-আহজাব : ৩৫
২৩১. সুরা আল-মায়িদা: ২
২৩২. সুরা আস-সফ: ৪
২৩৩. সুরা আত-তাওবা: ১২২
২৩৪. সুরা আন-নাহল: ১২৫
২৩৫. সুনানুত তিরমিজি: ৩/৪০৪, হা. নং ১৯৫৬ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলাম
পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, ইসলাম মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে সৃদৃঢ়ভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। একমাত্র ইসলামই পেরেছে পৃথিবীর সকল মানুষের মাঝে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। এই সুবিশাল আলোচনা সামান্য পরিধিতে বর্ণনা করা সম্ভব নয়, বিধায় কয়েকটি বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করেই ক্ষান্ত করছি।
ইসলামের প্রাথমিক ঘোষণা হলো, এ ধর্মের অনুসারী সকলে ইমান ও আকিদার ক্ষেত্রে সমান এবং তারা সবাই পরস্পর ভাই ভাই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।' ২৩৬
ইসলাম আরও ঘোষণা করে যে, পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে পরস্পর পরিচিতি অর্জন ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করার জন্য। এর মাধ্যমেই সকলের মাঝে শান্তি ও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে তাঁকে অধিক ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।' ২৩৭
পারস্পরিক ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও দয়ার অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য আল্লাহ তাআলা মুমিনের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ইরশাদ করেন : 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।' ২৩৮
ইসলাম নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া, অপর ভাইকে পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসা এবং অহংকার পরিহার করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেন : 'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে অপর ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।' ২৩৯
মুমিন ব্যক্তি তো নিজ জীবনকে অপর মুসলিমের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে। অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে আচার-আচরণ, লেনদেন ও চলাফেরার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা এমন হতে হবে, যেন সকলে পরস্পর ভাই ভাই। তাদের একে অপরের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না, থাকবে শুধু পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও পরোপকারিতা। কেউ কারও ওপর অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘন করবে না। কারও সাথে কেউ দুরাচার দেখাবে না; বরং সকলে একটি দেহের মতো বসবাস করবে।
নুমান বিন বাশির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'পারস্পরিক দয়া-ভালোবাসার ক্ষেত্রে মুমিনদের দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন অনিদ্রা ও জ্বরের মাধ্যমে পুরো দেহ সাড়া দেয়।' ২৪০
যেহেতু মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক হচ্ছে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সেহেতু একজন মুসলমান কখনো তার অন্য ভাইয়ের ওপর জুলুম করতে পারে না। বিপদে তাকে একা ছেড়ে দিতে পারে না; বরং সে অপর মুমিন ভাইয়ের প্রতি সাহায্য-সহায়তার হাত বাড়াবে, যেন তার কষ্ট ও মুসিবত সহজ হয়ে যায় এবং দুঃখ-বেদনা দূর হয়ে যায়। জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করবে না। শত্রুর জুলমের মুখে তাকে সমর্পণ করবে না। আর যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে কোনো মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার একটি বিপদ দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।' ২৪১
মোটকথা, প্রতিটি মুসলিম এই পৃথিবীকে শান্তিময় করার একনিষ্ঠ কর্মী। যার সর্বনিম্ন একটি প্রমাণ হলো, কোনো মুসলমান তার অপর মুসলিম ভাইকে হাত বা কথার মাধ্যমে কষ্ট দেবে না। সকল মানুষ একজন মুসলমানের পক্ষ থেকে নিজেদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা অনুভব করবে। অর্থাৎ প্রকৃত মুসলমান কখনো অন্যের জানমালের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'প্রকৃত মুসলমান হলো, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর প্রকৃত মুমিন হলো, যাকে মানুষ নিজেদের জানমালের ব্যাপারে নিরাপদ মনে করে।' ২৪২
ইসলামের শান্তি ও নিরাপত্তার পরিধি ব্যাপক। ইসলামের সুশীতল ছায়া সুবিস্তৃত। শুধু মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টিজীবের জন্যই ইসলামে শান্তির বিধান রয়েছে। ইসলামের বিধান হলো, একটি প্রাণী যেন আরেকটি প্রাণীর ওপর, অনুরূপ একজন মানুষ যেন অন্য কোনো মানুষ বা প্রাণীর ওপর কোনোরূপ অবিচার না করে; বরং একে অপরের প্রতি যেন দয়াপরবশ হয়ে জীবনযাপন করে। একজন মানুষ যদি একটি বোবা প্রাণীর কষ্ট দূর করে বা তার খাদ্যের ব্যবস্থা করে কিংবা তাকে পানি পান করায়, তাহলে এর বিনিময়ে তার জন্য অনেক কল্যাণ ও উত্তম প্রতিদান লিপিবদ্ধ করা হবে। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, ইসলাম শুধু মানুষের মাঝেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং ইসলাম মানবসমাজ পেরিয়ে প্রাণীদের মাঝেও শান্তির বিধান প্রতিষ্ঠা করেছে।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'একদা এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভীষণ পিপাসার্ত হয়ে পড়ে। সে একটি কূপ দেখে সেখানে নেমে পানি পান করে আবার ওপরে উঠে আসল। তখন লোকটি দেখতে পেল, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে আর পিপাসার জ্বালায় মাটি খাচ্ছে। সে (মনে মনে) বলল, পিপাসার তাড়নায় আমার যেই অবস্থা হয়েছিল, এই কুকুরটিরও পিপাসায় একই অবস্থা হয়েছে। অতঃপর সে পুনরায় কূপে নেমে তার মোজার মধ্যে পানি ভরে কুকুরের মুখে ধরল। অবশেষে কুকুরটি তৃষ্ণা নিবারণ করল। ফলে আল্লাহ তাআলা দয়া পরবশ হয়ে লোকটিকে মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের কোনো প্রতিদান আছে? উত্তরে রাসুলুল্লাহ বললেন, প্রত্যেক তাজা কলিজার অধিকারী তথা জীবিত প্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রতিদান রয়েছে।' ২৪৩
রাসুলুল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুকে কষ্ট দেওয়ার কারণে নিন্দা প্রকাশ করেছেন। এটাকে তিনি জুলুম ও জাহান্নামে যাওয়ারও একটি কারণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'জনৈকা মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে শাস্তি পেয়েছে। সে মহিলাটি বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল, যার কারণে বিড়ালটি মারা যায়। ফলে মহিলাটি জাহান্নামে প্রবেশ করে।' বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর রাসুলুল্লাহ বললেন, আল্লাহই ভালো জানেন, বাঁধা থাকাকালীন তুমি তাকে না খেতে দিয়েছিলে, না পান করতে দিয়েছিলে আর না তাকে তুমি ছেড়ে দিয়েছিলে, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বাঁচত।' ২৪৪
পশুর গায়ে ছাপ দেওয়া হারাম। কেননা, এতে ওদের কষ্ট হয়। ইমাম মুসলিম জাবির থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : 'একদা রাসুলুল্লাহ-এর পাশ দিয়ে একটি গাধা যাচ্ছিল। তার চেহারা ছিল ছাপ দেওয়া। রাসুলুল্লাহ তা দেখে বললেন, যে এর চেহারায় ছাপ দিয়েছে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক।' ২৪৫
ইমাম আবু দাউদ জাবির সূত্রে ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেন : 'একদা রাসুলুল্লাহ-এর পাশ দিয়ে চেহারায় দাগ দেওয়া একটি গাধা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি (তা দেখে) বললেন, তোমাদের নিকট কি এ সংবাদ পৌঁছেনি, যে ব্যক্তি পশুর চেহারায় দাগ দেয় বা প্রহার করে আমি তাকে অভিসম্পাত করেছি? অতঃপর তিনি (সামনে থেকে) এরূপ করতে নিষেধ করলেন।' ২৪৬
এমনিভাবে এক প্রাণীকে আরেক প্রাণীর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলাও হারাম। কেননা, এর ফলে একটি আরেকটিকে গুঁতো মারতে পারে বা কোনো ক্ষতি করতে পারে। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন : 'রাসুলুল্লাহ পশুদের পরস্পর লড়াই করার জন্য উত্তেজিত করতে নিষেধ করেছেন।' ২৪৭
ইসলামে শান্তির বিধান এতটাই বিস্তৃত যে, খোঁড়া, কানা বা রোগা প্রাণীকে পর্যন্ত কষ্ট দিতে ইসলাম নিষেধ করেছে। শুধু তাই নয়; বরং সেগুলোর প্রতি ইহসান ও দয়া করার আদেশ দিয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন : 'একদা আমরা রাসুলুল্লাহ-এর সাথে সফরে ছিলাম। এক সময় রাসুলুল্লাহ নিজ প্রয়োজন সারতে গেলেন। তখন আমরা একটি হুমারা পাখি দেখলাম, যার সাথে তার দুটি বাচ্চা ছিল। আমরা তার বাচ্চা দুটিকে রেখে দিলাম। অতঃপর হুমারা পাখিটি পাখা ঝাপটাতে লাগল। তারপর রাসুলুল্লাহ এসে বললেন, কে এই বাচ্চা দুটি নিয়ে তাকে কষ্ট দিচ্ছে? তার বাচ্চা তার নিকট ফিরিয়ে দাও। এছাড়াও আমরা একটি পিঁপড়ার বাসাতে আগুন দিয়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ দেখে বললেন, কে এখানে আগুন ধরিয়েছে? আমরা বললাম, আমরা হে আল্লাহর রাসুল। এ কথা শুনে তিনি বললেন, আগুনের মালিক ছাড়া কারও জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই।' ২৪৯
এই সকল আয়াত ও হাদিসের ভাষ্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম অসহায় প্রাণীর প্রতিও দয়া প্রদর্শন করার নির্দেশ দিয়েছে। এটি হচ্ছে ইসলামের বিশালত্ব, যা মানব-জিনসহ সকল প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করে। অতএব, যখন পৃথিবীতে এ ধরনের মহান আদর্শমূলক কাজ ছড়িয়ে পড়বে, তখন অবশ্যই অন্যায়-অত্যাচার দূর হয়ে বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই হলো প্রকৃত শান্তি, যা কেবল ইসলামি শরিয়ার আকিদা-দর্শনের মাঝেই বিদ্যমান রয়েছে। আর ইসলাম ছাড়া বিভিন্ন জাগতিক তন্ত্র-মন্ত্রের ধ্বজাধারী, যেমন ইহুদি-খ্রিষ্টান, হিন্দু-বৌদ্ধ, নাস্তিক যে কেউ-ই শান্তির বুলি প্রচার করুক, তা মিথ্যা মন্ত্র বৈ কিছু নয়। তাদের এসব মিথ্যা দাবি মানবতার সাথে স্পষ্ট প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি।
টিকাঃ
২৩৬. সুরা আল-হুজুরাত : ১০
২৩৭. সুরা আল-হুজুরাত : ১৩
২৩৮. সুরা আল-ফাতহ: ২৯
২৩৯. সহিহুল বুখারি : ১/১২, হা. নং ১৩ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
২৪০. সহিহ মুসলিম: ৪/১৯৯৯, হা. নং ২৫৮৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
২৪১. সহিহু মুসলিম: ৪/১৯৯৬, হা. নং ২৫৮০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
২৪২. সহিহু ইবনি হিব্বান: ১/৪০৬, হা. নং ১৮০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
২৪৩. মুআত্তা মালিক: ৫/১৩৬১, হা. নং ৩৪৩৫ (মুআসসাসাতু জাইদ বিন সুলতান, আবুধাবি) - হাদিসটি সহিহ।
২৪৪. সহিহুল বুখারি : ২/১১২, হা. নং ২৩৬৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
২৪৫. সহিহু মুসলিম : ৩/১৭৭৩, হা. নং ২১১৭ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
২৪৬. সুনানু আবি দাউদ: ৩/২৬-২৭, হা. নং ২৫৬৪ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
২৪৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩/২৬২, হা. নং ১৭০৮ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ।
২৪৮. দামিরি বলেন, হুমারা চড়ুইয়ের মতো এক প্রকার পাখি। এটি খাওয়া হালাল হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। কেননা, তা চড়ুই পাখিরই একটি প্রকার।
২৪৯. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৫৫, হা. নং ২৬৭৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 ইসলামের সর্বজনীনতা ও মানবতা
ইসলামের পূর্বে সকল আসমানি ধর্ম কোনো না কোনো জাতির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য বিধিবদ্ধ ছিল। এ সকল ধর্মের পরিসীমাও ছিল সীমাবদ্ধ। উদাহরণত তখন সে ধর্মটি একটি প্রজন্মের জন্য উপযোগী হতো অথবা তা মানুষের মধ্যকার নির্দিষ্ট এক জাতির জন্য উপযোগী ছিল। কিন্তু ইসলাম এমন এক বৈশিষ্ট্যে দীপ্তিমান, যা মানব অস্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম সকল মানুষের জন্য; চাই সে মানুষ যে জাতি বা যে বংশ কিংবা যে সময়ের-ই হোক না কেন। কারণ, ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সব সময়ের জন্য উপযোগী। সবার জন্য এক অনুপম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য ইসলামের প্রযোজ্যতা সম্পর্কে ইরশাদ করেন : 'আপনি বলে দিন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।' ২৫০
তিনি আরও বলেন : 'আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।' ২৫১
ইসলাম তার মহান জীবনব্যবস্থার কারণে সকল প্রথাপ্রীতি, জাতীয়তা ও দেশচেতনাকে ডিঙিয়ে মানবতার জন্য এক অনুপম আদর্শ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছে, যা সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য একটি উৎকর্ষ জীবনব্যবস্থা হিসাবে সর্বদা বিরাজমান থাকবে। তার সামনে যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, ইসলামের অনুসারী ও দায়িগণ যত বাধা-প্রতিবাদেরই সম্মুখীন হন না কেন, কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম স্বমহিমায় চিরউজ্জ্বল থাকবে।
এ সকল বাধা সত্ত্বেও ইসলাম সদা মানবতার ধর্মরূপেই বিদ্যমান থাকবে। তাই ইসলাম ও মানবতার মাঝে কোনো কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যেমন: রীতি-নীতি, আইন-কানুন, দেশ ও সময়ের ভিন্নতাসহ বিভিন্ন বাধা। ইসলাম এ সকল বস্তুর কোনোরূপ স্বীকৃতিই দেয় না; বরং ইসলামের ডাক হলো প্রকৃত মানবতার প্রতি, যাতে পৃথিবীকে একটি পরিশুদ্ধরূপে নিয়ে যাওয়া যায়। ইসলামের আহ্বান হলো, মানুষের মন-মানসিকতাকে পরিশুদ্ধ করার প্রতি, যেন তার মাঝে চিন্তার ঔজ্জ্বল্যের মতো অমূল্য সম্পদকে নিকৃষ্ট চিন্তাধারার স্থানে প্রতিস্থাপিত করা যায়। এ ছাড়াও ইসলামের দাওয়াত হলো, সমাজের বিভিন্ন অংশে বিরাজমান কুপ্রথা, কুসংস্কার ও খারাপ অবস্থার সংশোধনের প্রতি। যাতে প্রত্যেক ময়লা-আবর্জনা, নাপাকি ও ফাসাদ থেকে পৃথিবীকে সংশোধন করা যায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। এরপরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহভীরু।' ২৫২
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: 'হে মানবজাতি, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের তরফ হতে সমাগত হয়েছে উপদেশ, অন্তরস্থ রোগের শিফা এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।' ২৫৩
ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী থাকবে। জীবন অবসানের চরম মুহূর্তটি পর্যন্ত এর প্রতি আনুগত্য করে চলতে হবে। এ ধর্মটিই সমগ্র মানবতার পালনীয় একমাত্র ধর্ম। অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ অনুসরণ বা পালন করার অবকাশ নেই। কেননা, অন্যান্য আসমানি ধর্মের ওপর এর মর্যাদা চিরন্তন। ইসলাম অন্যান্য আসমানি ধর্মের সত্যায়নকারী। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অংশ-বিশেষ উল্লেখ করে বলেন: 'আর আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর সংরক্ষক।' ২৫৪
অন্যান্য জীবনব্যবস্থা, জাতীয়তা, আইন-কানুন ও ধর্মের ওপর ইসলামকে কর্তৃত্ব প্রদান ও বিজয়ী করা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: 'তিনিই তাঁর রাসুলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে। যাতে সকল দ্বীনের ওপর একে বিজয়ী করেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।' ২৫৫
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষের স্বভাবধর্ম। এখানে গোত্রপ্রীতি, বর্ণবাদ, বংশীয় আভিজাত্য, ভাষা বিভেদ, জাতীয়তা ও দেশচেতনার কোনো স্থান নেই। ইসলাম কোনো জাতির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টান; তারা ছিল বিশেষ দুটি জাতি। তাদের জন্য আনীত ধর্ম তাদের জাতির মাঝেই নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু ইসলাম সমগ্র বিশ্বের জন্য, সকল মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য এক সর্বজনীন ধর্ম।
টিকাঃ
২৫০. সুরা আল-আরাফ: ১৫৮
২৫১. সুরা সাবা: ২৮
২৫২. সুরা আল-হুজুরাত: ১৩
২৫৩. সুরা ইউনুস: ৫৭
২৫৪. সুরা আল-মায়িদা: ৪৮
২৫৫. সুরা আস-সফ : ০৯