📄 আত্মিক রূপ
মানুষ স্বভাবগতভাবে একটি ধর্মকে আপন করে নিতে চায়। এটি প্রত্যেক মানুষের স্বভাবের সাথে মিশে আছে। অতীত ও বর্তমানে এ বাস্তবতার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। প্রাচীনকালে প্রত্যেক সমাজে যেমনই হোক না কেন, তাদের উপাসনা করার জন্য একটি জায়গা নির্দিষ্ট করা থাকত। স্বভাবগতভাবেই যুগে যুগে সকল সভ্যতার মানুষ এই কাজটি করেছে। তাই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সৃষ্টিগতভাবে মানুষ ধর্মপ্রাণ।
স্বভাব ও গঠনের দিক থেকে মানুষ দুধরনের। প্রথম প্রকার হলো, বস্তুগত। ভারত্ব বা ওজন আছে এমন। যা রক্ত, শিরা, হাড়, গোশত ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা গঠিত। দ্বিতীয় প্রকার হলো, আত্মিক। মানব হৃদয়ের গভীরে যার স্থান। মানুষ তা উপলব্ধি করে। এই আত্মা মানুষকে চালিকাশক্তির মতো পরিচালিত করে। এটিই মানুষের মধ্যে মায়া-মমতা, ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয় এবং বিভিন্ন সক্ষমতা দান করে, যা মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে। দয়া, ভালোবাসা, সততা, নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া, আত্মত্যাগ, উদারতা, লজ্জাশীলতা ইত্যাদি এ আত্মিকতার এক একটি রূপ। মানব গঠনের এই দুটি উপাদান একটি অপরটির পরিপূরক। তারা পরস্পর একসাথে মিলে পূর্ণতা লাভ করে। একটি ছাড়া অপরটি অচল। যেমন রাত-দিন ও নর-নারী, একটি অপরটির মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়।
📄 উত্তম গুণাবলি অর্জনের উপায়সমূহ
উল্লিখিত উত্তম গুণাবলি অর্জনের কিছু মাধ্যম রয়েছে। যেমন: সর্বদা আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক রাখা। যদি কোনো মুমিন বান্দা এমনটি করে, তাহলে সে আল্লাহকে ইলাহ বলে ইমান আনার পর সর্বদা তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি সহকারে প্রার্থনা করতে থাকে। কথা, কাজ, ইবাদত যেমন : নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, জিকির, তাসবিহ, দুআ ইত্যাদি সকল বিষয়ে আল্লাহর আনুগত্য করতে থাকে।
এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা ইসলামের অবস্থান নির্ণয় করতে পেরেছি। তা এরকম যে, ইসলাম একটি পরিমিত, মধ্যবর্তী ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম। ইসলাম দেহ ও মন—দুটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের সাথে সুন্দর সামঞ্জস্য বিধান করেছে। দুটিকে পরস্পরের সম্পূরক বানিয়েছে। মানুষের মাঝে যেমন রয়েছে নিজ খেয়াল-খুশি, আমিত্ব ও বিভিন্ন ধরনের খারাপ চাহিদা। ঠিক তেমনই তার বিপরীতে রয়েছে জাগ্রত হৃদয়, সুষ্ঠু স্বভাব, সুন্দর চরিত্র, সৌন্দর্যমণ্ডিত বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রূপ, সকল ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা এবং সকল অন্যায় ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকার মানসিকতা। ইসলাম তো মানুষকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পার্থিব কাজকর্মে অংশগ্রহণ করতে বলেছে এবং মন-মস্তিষ্ককে সর্বদা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করার আদেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান করো এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেও না। তুমি অনুগ্রহ করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করার প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।’ ২০৮
তিনি আরও ইরশাদ করেন : ‘হে মানবজাতি, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ ২০৯
ইসলাম মানুষকে এই নির্দেশ দেয় যে, তাদের দুনিয়া যেন আখিরাতে শান্তি লাভের একটি মাধ্যম হয়। সুতরাং এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে, ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কারণ, উভয় জগতেই মানুষের জন্য সুখ ও কষ্ট রয়েছে। দুনিয়ার জীবনে এমন কোনো বাড়াবাড়ি করা যাবে না, যার কারণে তাকে বঞ্চিত হতে হয়। আবার পরকালীন জীবন থেকে এমন অমনোযোগীও হওয়া যাবে না যে, এর দরুন আখিরাতে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়।
ইসলাম কখনো দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ হয়ে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়াকে সমর্থন করে না। এমনিভাবে আত্মিক চাহিদা এবং স্রষ্টা থেকে বিমুখ হয়ে শুধু দৈহিক চাহিদা পূরণে ব্যস্ত হওয়াকেও সমর্থন করে না। অতএব, দুনিয়াবিমুখতা যদি শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ এবং সীমালঙ্ঘন হয়, তাহলে আত্মিক চাহিদা থেকে বিমুখিতাও বড় ধরনের সীমালঙ্ঘন হবে; বরং তা হবে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতার নামান্তর। এটাই ইসলামের ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যাতে কোনো বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি নেই। প্রান্তিকতাহীন ইসলামের এমন সুষম নীতি যুগ যুগ ধরে মানবতার কল্যাণ বয়ে এনেছে।
টিকাঃ
২০৮. সুরা আল-কাসাস : ৭৭
২০৯. সুরা আল-বাকারা : ১৬৮