📄 দেহ ও রুহের মাঝে সম্পর্ক
মানুষের সত্তা দুটি রূপের সমন্বয়ে গঠিত। ১. দৈহিক রূপ। ২. আত্মিক রূপ।
📄 ইসলামে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থার বিধান
বাহ্যিক বিচার দ্বারা উদ্দেশ্য, বাস্তবতার বিপরীত হলেও বাহ্যিক দলিল-প্রমাণাদির ভিত্তিতে মীমাংসা করা। আর অভ্যন্তরীণ বিচার দ্বারা উদ্দেশ্য, বাহ্যিক দলিল-প্রমাণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে প্রকৃত ঘটনার নিরিখে বিচার করা।
সুতরাং বিচার বিভাগের নিয়মানুসারে বিচারকের জন্য এই সুযোগ আছে যে, তিনি তার নিকট বিদ্যমান দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ফয়সালা করবেন। চাই তার ফয়সালা বাস্তবতার অনুকূল হোক বা প্রতিকূল হোক। কেননা, তিনি যা দেখেন, শুনেন বা তার সামনে যেসব প্রমাণ তুলে ধরা হয়, তাকে তার ওপর ভিত্তি করেই সমাধান দিতে হবে। দলিল-প্রমাণের বাইরে তার অন্য কোনো ক্ষমতা নেই। অনেক সময় দেখা যায়, উপস্থাপিত দলিলগুলো মিথ্যাও হয়। এ ক্ষেত্রে বিচারকের এই ক্ষমতা নেই যে, তিনি মানুষের মনের উদ্দেশ্য বা গোপন তথ্য সম্পর্কে অবগত হবেন। কার কথায় কী গোপনীয়তা রয়েছে, সে সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন।
উদাহরণ :
১. যদি কোনো লোকের ব্যভিচারের পক্ষে সাক্ষী একজনই থাকে, তাহলে তার জন্য বিষয়টি গোপন রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ, যদি বিচারকের নিকট এই ব্যভিচারের অভিযোগ চারজন সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত না হয়, তাহলে অভিযোগকারী নিজেই শাস্তিযোগ্য বলে গণ্য হবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে সে বিচারকের নিকট পর্যাপ্ত প্রমাণাদি তথা চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য পেশ করতে সক্ষম না হওয়ায় উল্টো সে নিজেই মানুষকে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। যদিও অভ্যন্তরীণ ঘটনা ও বাস্তবতার নিরিখে ওই একজন প্রত্যক্ষদর্শী শাস্তিযোগ্য নয়; বরং যে ব্যভিচার করেছে, সেই প্রকৃত শাস্তিযোগ্য।
২. যদি কোনো সম্পদ প্রকৃত মালিক ব্যতীত অন্য কারও জন্য সাব্যস্ত হয় এবং তার কাছে অসংখ্য প্রমাণাদি থাকে। আর আসল মালিকের নিকট কোনো প্রমাণ না থাকে। এ অবস্থায় মূল ঘটনা জানা থাকলেও বিচারকের জন্য এই সুযোগ নেই যে, তিনি প্রমাণ ছাড়া প্রকৃত মালিকের পক্ষে ফয়সালা করবেন। কারণ, সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বাহ্যিক অবস্থার ওপর হুকুম দেওয়া ছাড়া বিচারকের আর কোনো ক্ষমতা নেই।
৩. যদি কোনো ঋণগ্রস্ত লোক দাবি করে, সে খুব অভাবের মধ্যে আছে; অথচ বাস্তবে সে সচ্ছল, আর এই বিষয়টি বিচারকের জানা না থাকে, তাহলে বিচারক তাকে ঋণ দেরিতে শোধ করার সুযোগ করে দেবে। কেননা, বিচারক তার দাবি অনুযায়ী বাহ্যিক দিক বিবেচনা করে হুকুম দিতে বাধ্য। যদিও ঋণগ্রস্ত প্রকৃতপক্ষে মিথ্যুক। এ মিথ্যার দরুন সে গুনাহগার হবে, বিচারকের কোনো গুনাহ ও ক্ষতি হবে না।
উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন : 'আমি তো একজন মানুষ। আমার কাছে (অনেক সময়) বিবাদকারী বিচার নিয়ে আসবে। তখন হয়তো তোমাদের কেউ অন্যের চেয়ে অধিক বাকপটু হওয়ায় আমি মনে করব, সে সত্য বলেছে। তাই আমি সে অনুযায়ী তার পক্ষে ফয়সালা দিয়ে দেবো। অতএব, বিচারে আমি যদি (অজ্ঞাতসারে) অন্য কোনো মুসলমানের হক তাকে দিয়ে দিই, তবে তা মূলত জাহান্নামের একটি অংশ। এখন সে তা চাইলে গ্রহণ করুক বা চাইলে ত্যাগ করুক।' ২১০
এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ তাঁর নিকট উত্থাপিত দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতেই ফয়সালা করেছেন এবং বলে দিয়েছেন যে, এতে কেউ মিথ্যার আশ্রয় নিলে এর জন্য তাকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। অর্থাৎ বিচার বিভাগের বিবেচনায় তার জন্য দুনিয়াতে প্রমাণের ভিত্তিতে ফয়সালা করা হবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিবেচনায় তার সাথে এবং আল্লাহর সাথে পরকালে বোঝাপড়া হবে। সত্যবাদী হলে তো ঠিক আছে, কিন্তু মিথ্যাবাদী হলে তাকে পাকড়াও করা হবে। ইসলামে এটি একটি মৌলিক বিষয়। এর ওপর ভিত্তি করেই আখিরাতে বান্দাকে শাস্তি বা পুরস্কার দেওয়া হবে।
উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : 'রাসুলুল্লাহ -এর যুগে কিছু মানুষকে ওহির ভিত্তিতে পাকড়াও করা হতো। কিন্তু এখন আর ওহি নাজিল হয় না। তাই আমরা তোমাদের বাহ্যিক আমল বিবেচনা করব। অতএব, যে ব্যক্তি আমাদের কাছে কল্যাণ প্রকাশ করবে, তাকে আমরা নিরাপত্তা দেবো, তাকে কাছে টেনে নেব। তার অন্তরের গোপন তথ্য আমাদের জানার কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহই তার গোপন বিষয়ের হিসাব নেবেন। আর যে ব্যক্তি আমাদের কাছে মন্দ প্রকাশ করবে, তাকে আমরা নিরাপত্তা দেবো না এবং তাকে সত্যবাদী বলে জানব না; যদিও সে দাবি করে যে, তার অন্তর ভালো।' ২১১
ইসলামের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থার মধ্য থেকে বাহ্যিক দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। তন্মধ্য থেকে আমরা এখানে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করছি।
এক. বিচার-মীমাংসা সাধারণত করা হয় মানুষের বাহ্যিক অবস্থার আলোকে, মনের গোপন উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। ইসলামের এই পদ্ধতিটি মানুষকে অনেক কষ্ট-কাঠিন্য থেকে রক্ষা করে। এটি মানুষের জন্য অনেক সহজবোধ্যও বটে। কেননা, মনের গোপন বিষয় জানা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
দুই. যদি মানুষকে তার গোপনভেদ প্রকাশ করতে চাপ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তার কোনো অকল্যাণও হতে পারে। তা ছাড়া মানুষের গোপনীয়তা সম্পর্কে অবগত হওয়া অত্যন্ত কষ্টকর বিষয়। তাই এ ক্ষেত্রে আরও অনেক সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিন. যদি স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ উপেক্ষা করে বিচারকের অনুসন্ধান বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বিচার করা হয়, তাহলে সমাজে গোলযোগ সৃষ্টি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। যদি এভাবে দলিল-প্রমাণ বাদ দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছানুযায়ী ফয়সালা দেওয়া হয়, তাহলে বিশৃঙ্খলা বাধার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সার্বিক বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণের ওপর নির্ভর করাই অধিক নিরাপদ।
টিকাঃ
২১০. সহিহুল বুখারি: ৩/১৩১, হা. নং ২৪৫৮ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
২১১. সহিহুল বুখারি: ৩/১৬৯, হা. নং ২৬৪১, (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
📄 মানসিক রোগ থেকে আরোগ্য
কিছু মানসিক রোগ রয়েছে, যা খুবই কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক। মানুষের মধ্যে উন্নত গুণাবলি না থাকলে সে বিভিন্ন ধরনের মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। আল্লাহ তাআলা সকল যুগে প্রতিটি মানুষকে সৃষ্টিগতভাবে কিছু উত্তম চরিত্র দান করেছেন। কিন্তু মানুষের অযত্ন ও অবহেলার দরুন এটি ধ্বংস হয়ে যায়, যার পরিণতিতে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় অসংখ্য আত্মিক ব্যাধি।
অন্তরের রোগব্যাধি বিভিন্ন প্রকারের। তন্মধ্যে একটি হলো দ্বিমুখিতা, এতে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি দুটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে এবং অবস্থান ও সময়ভেদে সে তার দ্বিমুখী রূপ প্রকাশ করে। আরেকটি হলো অবসাদগ্রস্থতা। এটি নৈরাশ্যজনিত কারণে সৃষ্ট এমন তিক্ত এক অনুভূতি, যা অসুস্থ অন্তরকে গ্রাস করে ফেলে। এতে সে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় এবং চরম পেরেশানি ও কষ্ট অনুভব করে। আরেকটি হলো গুনাহ ও পাপাচারের সাথে অনুভূতির বন্ধন। এটি এমন এক অনুভূতি, যা বিপথগামী অন্তরের ওপর চেপে বসে। অতঃপর সে নিরবচ্ছিন্নভাবে এর তিক্ততার অনুভূতি আস্বাদন করতে থাকে। এটা এমন এক দুর্ভাগ্য, যা পাপিষ্ঠ মানুষের আজীবনের সঙ্গী হয়ে যায় এবং সে স্থিরতা ও শান্তি থেকে স্থায়ীভাবে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। আরেকটি হলো যন্ত্রণাদায়ক উৎকণ্ঠা ও শঙ্কার অনুভূতি, যা মানুষকে নিরবচ্ছিন্নভাবে স্থায়ী ভীতির অনুভূতি আস্বাদন করায়। তাকে কখনো নিশ্চিন্তে থাকতে দেয় না। সে দুনিয়ার সবকিছু পেয়েও চরম অশান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকে। এ কষ্টের যন্ত্রণা খুবই কঠিন এবং সুস্থ জীবনের জন্য মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টিকারী। আরেকটি হলো আমিত্বের দাগ, যা বক্র অন্তরের ওপর কর্তৃত্ব চালায়, যদ্দরুন সে অন্যদের কল্যাণ ও সুবিধার কোনো পরোয়াই করে না। যেভাবেই হোক না কেন, সে শুধু নিজ স্বার্থের প্রতিই যত্নবান হয়। এ জাতীয় অনুভূতি তাকে হীনতা ও কৃপণতার স্বভাবে অভ্যস্ত করে। লোলুপতা ও অতৃপ্ততা উপার্জনের ক্ষেত্রে তাকে সীমালঙ্ঘনকারী মানুষে পরিণত করে। আর এটা এমন এক অনুভূতি, যা মানুষকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেয়, যাতে না আছে কোনো ইতিবাচক দিক, আর না আছে কোনো লাভ বা কল্যাণ। আর তা এমন মানুষের স্বভাব, যে তাকওয়ার স্বাদ আস্বাদন করেনি। অতএব, সে সর্বদা বস্তুগত ব্যবস্থা বা ধর্মবিরোধী ভ্রান্ত দর্শনের বেড়াজালে আটকে থাকে।
এখানে মারাত্মক আরেকটি দুরারোগ্য রোগ আছে, যা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে অবিরতভাবে পশ্চাদমুখিতা, পরাজিত মানসিকতা ও অধোগামিতার দিকে নিয়ে যায়। আর তা হলো দুর্বলতা ও অপূর্ণতার উপলব্ধি। এটা এমন এক অনুভূতি, যা অন্তরে অবসন্নতা ও অসম্পূর্ণতার অনুভূতি জাগ্রত করে। তার এ বিশ্বাস জন্মায় যে, সে মান-মর্যাদায় অন্যদের থেকে পিছিয়ে। একপর্যায়ে সে অধঃপতন ও পরাজিত মানসিকতার চূড়ান্ত স্তরে নিপতিত হয়। তার মনে এ ভুল চিন্তার উদয় হয় যে, অন্যের সাহায্য ছাড়া কিংবা অন্যদের পেছনে দৌড়ানো ছাড়া তার কোনো গতি নেই। ২১২
সম্ভবত এ যুগে মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে ভয়ানক পরীক্ষার বিষয় হলো, নিজ দুর্বলতার ব্যাপারে তার সর্বগ্রাসী ঝুঁকিপূর্ণ অনুভূতি। সে ভাবে, নিজেদের ব্যক্তিজীবন এবং চারিত্রিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে ভিনদেশিদের অনুকরণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর এ অন্ধ অনুকরণপ্রবণতা উম্মাহকে আত্মনির্ভর করে তুলবে না; বরং এতে তারা দুর্বল, বোকা ও নিকৃষ্ট এক জাতিতে রূপান্তরিত হবে।
এখানে আরও কিছু ব্যক্তিগত অন্তরের রোগ আছে। যেমন: বেপরোয়াভাব। এর স্বরূপ হলো, যে পরিস্থিতিই হোক না কেন, কোনো বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ না করার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এটা অত্যন্ত জঘন্য ও নিকৃষ্ট অনুভূতি, যদ্বারা সে স্বীয় অক্ষমতা, উদাসীনতা ও শিথিলতার স্থায়িত্ব উপভোগ করে। যদ্দরুন সে বেপরোয়া জিন্দেগির সমীকরণে এসে শুধু উপেক্ষা আর ব্যর্থতারই সম্মুখীন হয়। ব্যক্তিগতভাবে ও দলবদ্ধভাবে এটা অনেক মানুষেরই স্বভাব, যাদের ওপর উদাসীনতাপ্রীতি এবং আত্মমর্যাদার অনুপস্থিতি চেপে বসেছে। আর এটা মূলত ধ্বংস, বিনাশ ও বিক্ষিপ্ততার পথ, যা ব্যক্তি ও দল উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। এমন মানসিকতার লোকেরা অধিকাংশ সময় বিপদ ও ব্যর্থতার শিকার হয়।
এরপর হলো অহংকার ও অহমিকা। এটা এমন বিনাশী রোগ, যা মানুষকে আক্রান্ত করে তার অন্তরে নিজের বড়ত্বের অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়; অথচ তার কল্পিত অনুভূতি ও ভুয়া ধারণা ছাড়া এর বাস্তবতার কোনো ভিত্তি নেই। এ রোগ কাউকে আক্রমণ করলে তার সত্তা ও অনুভূতি থেকে বিনয়, ভারসাম্য, সচেতনতা ও সুস্থ চিন্তা-ভাবনা সম্পূর্ণরূপে বিদায় নেয়। এমন ব্যক্তি শুধু আত্মপ্রবঞ্চনাতেই নিমজ্জিত থাকে; যদ্দরুন সে অবিরতভাবে স্বীয় অবাস্তব কল্পনা ও ভ্রান্ত চিন্তার ব্যাপারে উদাসীন থাকে। সে ধারণা করে, সে কিছু একটা করছে, কিন্তু বাস্তবে সে অলীক কল্পনা ও চরম ভ্রান্তি ছাড়া কিছুই করছে না।
আমরা এসব রোগের উল্লেখ এ জন্যই করেছি যে, মানুষ যেন জানতে পারে, মানবরচিত বিভিন্ন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আইন-কানুনই এসব তিক্ততা, ব্যর্থতা ও সমস্যা সৃষ্টি করেছে। সুতরাং তা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর মনোনীত নিয়মকানুনের সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়াও এসব রোগের বৈশিষ্ট্য ও সর্বশেষ পরিণতি অত্যন্ত জঘন্য হয়ে থাকে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো, বাস্তব উপলব্ধি থেকে পালানোর জন্য কিংবা মদ্যপ অবস্থায় বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে দুনিয়ার মিথ্যা ভোগবিলাসে নিমগ্ন হওয়ার উদ্দেশ্যে সীমাতিরিক্ত মদপান ও নেশায় আসক্ত হওয়া। এভাবে এসব রোগের আরেকটি কুফল হলো, পতিতা নারীদের সাথে উত্তেজিত পশুর ন্যায় মাত্রাতিরিক্ত যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হওয়া। এতে চারিত্রিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি সমাজে অবৈধ সন্তানের সংখ্যাও বৃদ্ধি করে। অনুরূপ এসব রোগের আরেকটি মর্মান্তিক পরিণতি হলো তালাক। এটি দৃশ্যমান ও চলমান মারাত্মক এক প্রবণতা, যা অবিরতভাবে সহজেই ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা এমন সমাজে ঘটে থাকে, যে সমাজ চরিত্র গঠন ও জীবন পরিচালনার জন্য পশ্চিমা দর্শনকে ভিত্তিরূপে গ্রহণ করেছে। আমাদের পরিসংখ্যান ও অনুসন্ধান অনুসারে অধিকাংশ তালাকের ঘটনা ওই সব সমাজে ঘটছে, যেসব সমাজ আল্লাহর নীতি পশ্চাদে রেখে সীমালঙ্ঘনকারী ও পাপাচারীদের মতো অবাধ্য হয়েছে এবং পঙ্কিল ও অবিশ্বাসের জগতে জীবন উপভোগ করেছে। এ জন্যই নাস্তিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার দেশসমূহে তালাকের ঘটনা অনেক বেশি ঘটছে। আর এটা হলো অধঃপতন ও অবক্ষয়ের পথ। চাই তা পুঁজিবাদী দেশে হোক, যার নেতৃত্বে রয়েছে আমেরিকা কিংবা সমাজতান্ত্রিক দেশে হোক, যার নেতৃত্বে রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
সুইডেনের তালাকের পরিসংখ্যানের একটি রিপোর্ট বলছে, সেখানে প্রতি সাতটি বৈবাহিক সম্পর্কের একটি তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ হয়। আর নরওয়েতে প্রতি ছয়টি বৈবাহিক সম্পর্কের একটি তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ হয়। ২১৩
এ ব্যাপারে আরেকটি পরিসংখ্যান আছে, যা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র 'পারাভদা' পত্রিকা প্রকাশ করেছে যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে বিগত বছরে তালাকের সংখ্যা এক মিলিয়নে পৌঁছেছে। আর অধিকাংশ তালাকই মস্কো, লেনিনগ্রাড ও কিয়েভের মতো বড় বড় শহরে ঘটেছে। পত্রিকাটির ভাষ্যমতে চাঞ্চল্যকর এ রিপোর্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পারিবারিক অবস্থার চরম অবনতির দিকে ইঙ্গিত করছে এবং জোরালো প্রশ্ন তুলছে যে, এমনটি কি অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ঘটছে না মাদকতায় আসক্তির কারণে, না এ জন্য যে, নতুন প্রজন্ম পারিবারিক সম্পর্কের অনুভূতি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে? ২১৪
ওই সকল রোগের এসব অশুভ পরিণতিতেই আল্লাহর সরল পথ থেকে বিচ্যুত লোকেরা এসব ভুল পদক্ষেপ ও বিকৃত চালচলন চর্চা করছে। এর দরুন সমাজে অরাজকতা ও অশান্তি ব্যাপকহারে বেড়ে চলছে। আর বিবেকশূন্যতা তো আরও জঘন্য ব্যাপার। তারাই এ দুর্ভাগ্যের শিকার হয়, যাদের স্বভাব ও প্রকৃতি বিনষ্ট হয়ে গেছে এবং মন্দ হয়ে গেছে নিজেদের লক্ষ্য ও অভিপ্রায়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, অন্তর তখনই প্রাণবন্ত ও স্থির থাকে, যখন সে মহান আল্লাহর ভয় ও তাকওয়াকে ভিত্তিরূপে গ্রহণ করে। কেননা, অন্তরে যখন আল্লাহর ভয়ের ছাপ বসবে, তখন অন্তর জীবন্ত, পরিশুদ্ধ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আর এটি এমন এক বৈশিষ্ট্য, যা ইসলাম ভিন্ন অন্য কোথাও পাওয়া যায় না, যা তার অনুসারীদের গভীর ও সুপ্ত এক শক্তিবলে দৃঢ় করে তোলে। এটি এমন এক ভিত্তিমূল, ইসলামি আকিদা সম্পূর্ণরূপে যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এখানে অন্তরের ব্যাধির একাংশই মাত্র উল্লেখ করলাম। এ ছাড়া আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যা অনৈসলামি সমাজব্যবস্থাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, যা মানুষের জন্য আল্লাহর মনোনীত ব্যবস্থা বর্জন করে পশ্চিমা সভ্যতা ও কৃষ্টি-কালচার গ্রহণ করতে উৎসাহী করে তুলছে। কিন্তু এসব ব্যাধি ও সমস্যা থেকে সত্যিকারের একজন মুসলিম যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে। সত্যিকারের মুসলিম তাকেই বলা হয়, যার হৃদয়, অনুভূতি ও ভাবনা ইসলামের আকিদা-বিশ্বাসকে সুদৃঢ়ভাবে গ্রহণ করেছে কিংবা যে ব্যক্তি আকিদা, সংবিধান ও জীবনব্যবস্থা হিসাবে ইসলামের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে পূর্ণভাবে তাকে আঁকড়ে ধরেছে।
এই হলো সে মুসলিম, যে নিজের সাথে, তার রবের সাথে এবং সকল মুসলিমের সাথে সৎ ও নিষ্ঠাবান। যে নিজের জন্য আল্লাহর সাথে এ প্রতিজ্ঞা করেছে যে, সে ইসলামের বাণী আঁকড়ে ধরবে এবং সুখে-দুঃখে সর্বদা আল্লাহর শরিয়তের নির্দেশনা অনুসারে জীবন পরিচালনা করবে। পাশাপাশি এ শরিয়ত অনুযায়ী চলার জন্য সে অন্যদেরকেও আহ্বান করবে এবং ধর্মত্যাগী, মুনাফিক ও জাহিলদের মধ্য হতে যারা আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করবে, যথাসম্ভব দলিল-প্রমাণ ও শক্তি প্রয়োগ করে তাদের মোকাবেলা করবে।
একজন মুসলিম মাত্রই অন্তরের এসব রোগব্যাধি ও ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে সর্বাধিক দূরে অবস্থান করবে। 'মুসলিম' শব্দটিই তার এ অবস্থা প্রমাণ করে। কেননা, শব্দটি আরবি (الاستسلام) (আল-ইসতিসলাম) থেকে নির্গত হয়েছে, ২১৫ যার অর্থ হলো, নমনীয় হওয়া, আত্মসমর্পণ করা। সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে নমনীয় হয় না এবং অন্য কারও কাছে আত্মসমর্পণ করে না। অথবা এটি (আস-সালাম) থেকে নির্গত হয়েছে, যার অর্থ নিরাপত্তা, শান্তি, অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি। আর এটিই একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য যে, সে হবে প্রশান্ত চিত্তের অধিকারী, সকল অনুভূতি ও আবেগকে সমর্পণকারী। যত কষ্ট ও বিপদাপদই আসুক না কেন, কিছুই তাকে বিচলিত করতে পারে না।
একজন মুসলিম সদা-সর্বদা এক আল্লাহর সামনেই শুধু মাথানত করে। সে অন্য কোনো পূজনীয় বস্তুর সামনে নত হয় না; চাই সেটা মানুষ হোক বা মাটি-পাথরের মূর্তি, সম্পদ হোক বা কামনা-বাসনা, লোভ হোক বা অন্য কিছু। অনুরূপভাবে নিজ বংশ, জাতি, দেশ, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানসন্ততি কারও জন্যই সে মাথানত করে না, কারোরই আনুগত্য করে না; বরং সে শুধু ওই মহান সত্তার বশ্যতা স্বীকার করে, যিনি সকল মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। এই হলো প্রকৃত মুসলিমের পরিচয়। আর কোনো ব্যক্তি প্রকৃত ইসলাম ও মুসলমানের গণ্ডিতে প্রবেশ করতে পারবে না; যতক্ষণ না সে নিজ উপলব্ধি ও ইচ্ছায় নিজকে আল্লাহর সামনে সমর্পণ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: 'হে নবি, আপনি বলুন, নিশ্চয় আল্লাহর পথনির্দেশই হলো একমাত্র পথনির্দেশ। আর আমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আমরা বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করি।' ২১৬
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন : 'হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে আর সে সৎকর্মশীল, তাহলে তার প্রতিদান তার রবের নিকট রয়েছে।' ২১৭
তিনি আরও বলেন: 'যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে আর সে সৎকর্মশীল, তাহলে সে সুদৃঢ় হাতল আঁকড়ে ধরল।' ২১৮
মূলত একজন মুসলিমের অবস্থা এমনই, যেমনটি পূর্বে বলে এসেছি যে, সে নিজেকে গাইরুল্লাহর দাসত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে নেবে। এটাও তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে, সে চিন্তা-চেতনা, উপলব্ধি সার্বিক দিক থেকে মানুষের সকল কর্তৃত্ব, বন্দিত্ব ও আইন-কানুন থেকে নিজেকে মুক্ত ভাববে; যাতে বন্দী হওয়ার পর তার শুধু এ উপলব্ধি থাকে যে, সে সম্পূর্ণরূপে একমাত্র আল্লাহর দাস। এতে তাগুত কর্তৃক বন্দিত্বের দরুন তার অন্তরে তাগুত্বের প্রতি কোনো প্রকার নমনীয়তা, দাসত্বভাব ও আনুগত্যের অনুভূতি জাগ্রত হবে না।
কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি সর্বোচ্চ স্তরের একটি বৈশিষ্ট্য, যা শুধু মুসলিমরাই অর্জন করতে পারে, অন্য কারও জন্য এসব গুণ অর্জন করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। আর এটিই হলো আল্লাহর পূর্ণ দাসত্বের উপলব্ধি যে, আল্লাহ তাআলা-ই হলেন একমাত্র ইবাদতযোগ্য উপাস্য, যার হাতে গোটা জগতের চাবিকাঠি ও সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন : 'আর তাদের শুধু এক ইলাহের ইবাদতেরই আদেশ করা হয়েছে। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তারা যা কিছু শরিক করে, তিনি তা থেকে পবিত্র ও মহান।' ২১৯
অতএব, এ ভিত্তিতে যে ব্যক্তি ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশ করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সামনে সমর্পণ করেছে, মানুষ-নির্মিত পৃথিবীর সকল বন্দিত্ব এবং অন্তর ও অনুভূতির ওপর কর্তৃত্বকারী সকল প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে, সেই একমাত্র অন্তরের সকল রোগব্যাধি থেকে আরোগ্যলাভ করেছে, যা বিভিন্ন দল-উপদলকে আক্রমণ করে দুর্বল, বিশৃঙ্খল ও অস্থির করে ছেড়েছে।
যে মুসলিমের অবস্থা এমন হবে, সে নিশ্চয়ই নিরাপদ ও প্রশান্ত থাকবে এবং প্রবৃত্তিগত, ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকবে, যেসব ব্যাধিতে আল্লাহর আদেশ অমান্যকারী ও তাঁর নিদর্শনসমূহ অস্বীকারকারীরা আক্রান্ত।
যে মুসলিমের অবস্থা এমন হবে, সে কখনো বিষন্ন, অহংকারী ও ব্যক্তিত্বহীন হতে পারে না; বরং সে হয় প্রশান্ত, বিনয়ী ও পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে স্বার্থপর, কৃপণ ও হিংসুক হতে পারে না, যে কিনা নিজের তৃষ্ণা মিটানোর জন্য অপরকে কষ্টে ফেলে দূরে চলে যায়। সে নির্জীব, দুর্বল, তুচ্ছ ও অন্ধ জাহিলিয়াতের ক্ষেত্রে অন্যদের অনুগামী হতে পারে না। বরং মুসলিম তো তার রবের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল হবে, যার পরে তার অপূর্ণতার কোনো অনুভূতিই আসবে না। সুতরাং এ ব্যাপারে একজন মুসলিম স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যার সত্তায় দুর্বলতা ও ভ্রান্তির বিপরীত শক্তি ও দৃঢ়তা প্রকাশ পায়।
আর ত্রুটিযুক্ত চালচলন, যেমন: অলস সময় নষ্ট, অরাজকতা, নিজের ক্ষতিসাধন বা বাস্তব উপলব্ধি থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে নেশায় আসক্ত হওয়া—এ ধরনের ভয়ংকর ও ক্ষতিকর বিষয়াদি থেকে একজন মুসলিম যোজন যোজন দূরে থাকে। মুসলিম তো আল্লাহভীরু, নিষ্কলঙ্ক, পবিত্র ও আপন লক্ষ্যে অবিচল। সে উচ্চাঙ্গের শালীনতা ও আদব বজায় রেখে জীবন পরিচালনা করে, যা ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে।
এ ছাড়া মুসলিম সমাজ এ ব্যাপারে খুবই সজাগ ও দৃঢ় এবং লাগামহীন জীবনযাপনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। বরং মুসলিম সমাজ ইসলামি আকিদা ও আলোকিত শরিয়তের কল্যাণে বিশৃঙ্খলা, বিচ্ছিন্নতা ও অধঃপতন থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে। আর মুসলিমদের মাঝে তালাকের ঘটনা অনেক অনেক কম। শত্রু-মিত্র সবাই তা জানে এবং সবাই এটি স্বীকার করে যে, তুলনামূলকভাবে তালাকের ঘটনা মুসলিমদের মাঝে কম ঘটে, যা বস্তুবাদী আধুনিক সভ্যতার দাবিদার অনৈসলামিক সমাজে অনেকগুণ বেশি।
টিকাঃ
২১২. উসুসুস সিহহাতিন নাফসিয়্যা: পৃ. ৩৬৪, ড. আব্দুল আজিজ কাওসি
২১৩. মাজাল্লাতু হাজারাতিল ইসলাম: ২/৩৬৫, প্রকাশ: ১৯৬১ ইং
২১৪. আল-কুদস পত্রিকা, তারিখ: ২৭/০৮/১৯৮৩ ইং
২১৫. ইশতিকাক (নির্গত হওয়া) দুধরনের। এক. ইশতিকাকে লফজি, দুই. ইশতিকাকে মা'নবি। এখানে ইশতিকাকে মা'নবি উদ্দেশ্য। ইশতিকাকে লফজির জন্য মূল হরফ ও বাব এক হওয়া শর্ত হলেও ইশতিকাকে মা'নবির জন্য এরূপ কোনো শর্ত নেই।
২১৬. সুরা আল-আনআম: ৭১
২১৭. সুরা আল-বাকারা: ১১২
২১৮. সুরা লুকমান: ২২
২১৯. সুরা আত-তাওবা: ৩১
📄 আল্লাহর ওপর ভরসা
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হলো, পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে সকল বিষয়কে তাঁর ওপর ন্যস্ত করা। (আত-তাওয়াক্কুল) শব্দটি (ওকালাত) থেকে নির্গত হয়েছে, যার অর্থ সমর্পণ করা। যেমন বলা হয়, 'সে আল্লাহর ওপর ভরসা করেছে, তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে, তাঁর ওপর নির্ভর করেছে।' ২২০
তাওয়াক্কুলের জন্য শর্ত হলো, শরয়ি বিবেচনায় বিষয়টি সঠিক হতে হবে। শরিয়া অনুমোদিত সম্ভাব্য সকল উপকরণ গ্রহণ করে তবেই তাওয়াক্কুল করতে হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি সঠিকভাবে তাওয়াক্কুল করে, সে অবশ্যই এই বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করবে যে, আল্লাহ তাআলা তার ভরসাকৃত বিষয়ে সাড়া দেবেন। এর জন্য সে নিজের যথাযথ চেষ্টা- প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। অতএব, যদি কারও তাওয়াক্কুল সকল উপকরণ গ্রহণ করে পরিপূর্ণ বিনয়ের সাথে না হয়, তাহলে তার তাওয়াক্কুল শরিয়াসম্মত হবে না; বরং তা (তাওয়াক্কুল) এর পরিবর্তে (তাওয়াক্কুল) অর্থাৎ একে অপরের ওপর নির্ভর করাতে পরিণত হবে।
イমাম গাজ্জালি তাওয়াক্কুল সম্পর্কে বলেন, 'ইমানের দরজাসমূহ থেকে একটি দরজা হলো তাওয়াক্কুল। আর ইমানের প্রতিটি দরজা ইলম, আমল ও স্থিরতা ছাড়া সুবিন্যস্ত হয় না। এমনিভাবে এই তিনটি বিষয় ছাড়া তাওয়াক্কুলও সুবিন্যস্ত হয় না। এর মধ্যে ইলম হলো মূল, আমল তার ফল আর স্থিরতা তার উদ্দেশ্য।' ২২১
তাওয়াক্কুলের বিষয়টি আকিদার সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহর ওপর যার ভরসা যত বেশি, তার ইচ্ছাশক্তি ও মনোবল তত সুদৃঢ়। তার ধৈর্য, বিশ্বাস ও বিনয় তত বেশি বৃদ্ধি পায়। মুমিনের অবস্থা এমনই হওয়া উচিত। আর এর বিপরীত (তাওয়াক্কুল) অর্থ, মানুষ মানুষের ওপর নির্ভর করা। যাদের ওপর নির্ভর করা হবে, তারা চাই শাসক হোক কিংবা নেতৃস্থানীয় বা অন্য কেউ হোক। যদি মানুষের ওপর নির্ভর করা হয়, তবে তা (তাওয়াক্কুল) হবে, (তাওয়াক্কুল) নয়। এমনিভাবে যদি কেউ শুধু মুখেই বলে যে, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম, কিন্তু সে কাজে-কর্মে তার বিপরীত করে, তাহলে সেটাও প্রকৃত তাওয়াক্কুল হবে না। এমন ত্রুটিপূর্ণ তাওয়াক্কুল অনর্থক আশা-আকাঙ্ক্ষা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুল করে মাধ্যম গ্রহণ এবং সেই অনুযায়ী আন্তরিক চেষ্টা সহকারে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেন : ‘আর আপনি বলে দিন, তোমরা আমল করে যাও। অতঃপর আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনগণ তোমাদের আমল লক্ষ করবেন।’ ২২২
আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর ভরসা করে তদনুযায়ী কাজ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। অন্যদিকে যারা নিজেদের কথা ও কাজে মিল রাখে না, তাদের নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন : 'হে মুমিনগণ, তোমরা যা করো না, তা কেন বলে বেড়াও? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।' ২২৩
ইমাম তিরমিজি আনাস থেকে বর্ণনা করেন: 'এক ব্যক্তি জানতে চাইল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার এই উটনীকে বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব? উত্তরে রাসুলুল্লাহ বললেন, আগে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।' ২২৪
এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ প্রকৃত তাওয়াক্কুলের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ-এর সময় কিছু মানুষ ছিল, যারা তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ জানত না। তাই তারা যখন হজের সফরে বের হতো, তখন সাথে দীর্ঘ সফরের জন্য রসদ বা খাদ্যদ্রব্য না নিয়েই বেরিয়ে পড়ত। তারা বলত, আমরা আল্লাহর ঘরের হজ করব, আর তিনি আমাদের খাওয়াবেন না?! নিজেদেরকে তারা আল্লাহর ওপর ভরসাকারী বলে দাবি করত। আল্লাহ তাআলা তাদের আসবাব গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন : 'আর তোমরা সাথে পাথেয় নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া।' ২২৫
তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এক শ্রেণির মিথ্যাবাদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় এবং আল্লাহর ওপর ভরসাকারীদের নিয়ে কটাক্ষ করে। এ সকল মিথ্যা অপবাদ রটনাকারীরা সর্বদা ইসলামের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জঘন্য ও মন্দ ধারণা পোষণ করে। অথচ ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের এমন মিথ্যারোপের কোনো দলিল-প্রমাণই তারা পেশ করতে পারে না; বরং এ সকল মানুষের বিপক্ষে আল্লাহর অনেক প্রমাণ আছে। কেননা, তিনি মানুষকে বারবার তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি যথাযথ পদক্ষেপ ও আসবাব গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন।
সালাফে সালেহিন ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাওয়াক্কুলের অধিকারী। তাঁরা পৃথিবীর দিদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। অর্ধ পৃথিবী বিজিত হয়েছিল তাদের হাতে। তাঁরা সত্য ও ন্যায়ের ঝান্ডা উঁচু করেছেন। পৃথিবীব্যাপী দাওয়াতের প্রসার, বিভিন্ন ভূখণ্ড বিজিত হওয়া ও হকের ঝান্ডা বুলন্দ হওয়ার কারণ এটাই যে, তাঁরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর তাদের অগ্রনায়ক ছিলেন মানবতার মুক্তির দিশারি, আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ। যুদ্ধের সময় তিনি থাকতেন সকলের সামনে। এমনকি যখন যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করত, তখন রাসুলুল্লাহ শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি থাকতেন। যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে শ্রেষ্ঠ বীরযোদ্ধারা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ -এর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিতেন। তিনি হতেন তাদের ইমাম। সবার আগে থাকতেন তিনি। তাঁর পেছনে থেকে অন্যরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন।
ইমাম ইবনে কাইয়িম জাওজিয়া বলেন, 'রাসুলুল্লাহ -এর গাজওয়ার সংখ্যা সাতাশটি। আর বিভিন্ন সারিয়া ও খণ্ড যুদ্ধের সংখ্যা প্রায় ষাটটি।' ২২৬
দাওয়াতের সে প্রসারণ আজ আর নেই। মুসলমানদের হাতে নতুন ভূমি বিজিত হওয়া দূরে থাক; বরং মুসলিমদের ভূমিতে আজ নাপাক কাফির-মুশরিকদের নগ্ন থাবা পড়েছে। ইসলামের পতাকার স্থলে জায়গা করে নিয়েছে জাতীয়তাবাদের পতাকা। কালিমার পতাকার স্থানে আজ বিভিন্ন শিরকি পতাকা বাধাহীনভাবে উড়ছে। এ অধঃপতনের একমাত্র কারণ রাসুলুল্লাহ -এর প্রকৃত আদর্শ ভুলে যাওয়া। বর্তমানে মুসলমানদের যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে, তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞতা। মুসলমানরা আজ বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। তারা আজ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। অথচ তারা ইসলামি শরিয়তের সকল বিধানকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে, এটাই ছিল যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার দাবি। দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও পরিপূর্ণ মনোবলের সাথে সে বরকতময় শরিয়ত অনুযায়ী আমল করবে। জীবনের পরতে পরতে কল্যাণকর কাজ করার প্রতি উৎসাহী হবে। অথচ আজ শরিয়ত পালনে মুসলিমগণ পরনির্ভরশীল! অন্যের অধীনতা স্বীকার করে মনোতুষ্টিতে ভোগা আজ মুসলিমদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
উমর-এর এ বক্তব্যটি কতই না চমৎকার! তিনি বলেন: 'আল্লাহর নিকট রিজিকের জন্য দুআ করে কেউ যেন রিজিক অন্বেষণ করা থেকে বিরত না থাকে। কারণ, দুআ করলেই আকাশ হতে সোনা- রুপা বর্ষিত হয় না; বরং দুআ করার পর রিজিক অন্বেষণ করতে হয়।' ২২৭
উল্লেখ্য, যদি কোনো মুমিন বান্দা আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকে, তাহলে সে যতদিন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকবে, ততদিন শান্তি ও নিরাপত্তার মাঝে থাকবে। তার জীবনে উচ্ছৃঙ্খলতা, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার লেশমাত্র থাকবে না। কোনো মুসলিম যখন নেক আমল ও প্রয়োজনীয় মাধ্যম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তখন তাকে সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যারা আল্লাহর ওপর ভরসাও করে আবার শরিয়ত অনুযায়ী আমলও করে; যদিও সে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম না হয়।
তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান বিষয় হচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত মনজিলে পৌঁছুক আর নাই পৌঁছুক, যথাযথভাবে আমল করে যেতে হবে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি ত্রুটিমুক্তভাবে তাওয়াক্কুলের চাহিদামতো আমল করে যায়, তাহলে সে অবশ্যই আত্মিকভাবে শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করবে, তার মনে প্রফুল্লতা বিরাজ করবে এবং তার মস্তিষ্ক থাকবে ঠান্ডা ও স্থির।
টিকাঃ
২২০. আল-মিসবাহুল মুনির : ২/৬৭০ (আল-মাকতাবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
২২১. ইহইয়াউ উলuমিদ্দিন: ৪/২৪৫ (দারুল মারিফা, বৈরুত)
২২২. সুরা আত-তাওবা: ১০৫
২২৩. সুরা আস-সফ: ২-৩
২২৪. সুনানুত তিরমিজি: ৪/২৪৯, হা. নং ২৫১৭ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
২২৫. সুরা আল-বাকারা: ১৯৭
২২৬. জাদুল মাআদ: ১/১২৫ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
২২৭. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৬২ (দারুল মারিফা, বৈরুত)