📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ১২. কাফিরদের উৎসবে শরিক হওয়া

📄 ১২. কাফিরদের উৎসবে শরিক হওয়া


কাফিরদের ধর্মীয় বা আনন্দ উৎসবে মুসলমানদের শরিক হওয়া, অনুরূপ এতে কোনো ধরনের সাহায্য করা বা একে অপরকে অভিনন্দন জানানো কিছুতেই জায়িজ নয়। সুতরাং কাফিরদের শিআর ও শিরকি কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শরিক হওয়া স্পষ্ট কুফর। আর মনে ঘৃণা রেখে এমনিই কৌতূহলবশত শরিক হওয়া হারাম।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
'আর যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং অসার কার্যকলাপের সম্মুখীন হলে আপন মর্যাদা রক্ষার্থে তা পরিহার করে চলে।'

তাবিয়িনে কিরামের অনেকেই এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুশরিকদের ধর্মীয় দিবস ও আনন্দ উৎসবে না যাওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ এটি মুমিনদের একটি বৈশিষ্ট্য যে, তারা মুশরিকদের উৎসবে যোগদান করবে না।

আল্লামা ইবনে কাসির এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'এটাও রহমানের বান্দাদের একটি গুণ যে, তারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না। কারও মতে এখানে আয-যুরা এর অর্থ শিরক ও মূর্তিপূজা। কারও মতে এর অর্থ মিথ্যা, পাপাচার, কুফর, বেহুদা ও বাতিল কর্মকাণ্ড। মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেন, এর অর্থ অসার কাজ ও গানবাজনা। আবুল আলিয়া, তাউস, ইবনে সিরিন , জাহহাক, রবি বিন আনাস-সহ অনেকেই বলেছেন, এর অর্থ মুশরিকদের ধর্মীয় দিবস ও আনন্দ উৎসব। আমর বিন কাইস -এর মতে, এর অর্থ অশ্লীল ও মন্দ মজলিস। মালিক জুহরি থেকে বর্ণনা করে বলেন, এর অর্থ মদপান। তারা এতে উপস্থিত হতো না এবং এতে আকর্ষণবোধও করত না। '

আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
মাইন বানা বিলাদিল আ'আজিমি ওয়া সানাআ নায়রুযাহুম ওয়া মিহরা জানাহুম ওয়া তাশাব্বাহা বিহিম হাত্তা ইয়ামূতা ওয়া হুয়া কাযালিকা হুশিরা মা'আহুম ইয়াওমাল ক্বিয়ামাত
'যে ব্যক্তি অনারব তথা অমুসলিম দেশে বাসস্থান নির্মাণ করে এবং তাদের নওরোজ ও মেহেরজান উৎসব পালন করে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, অতঃপর এ অবস্থার ওপরই তার মৃত্যু হয়, তাহলে ওই সব কাফিরদের সাথেই তার হাশর হবে।'

তাদের সাথে ধর্মীয় ও আনন্দ উৎসবে যোগদান মানে তাদের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, তাদের কর্মকে সমর্থন করা; অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে বারবার কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে বারণ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও; অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুল ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখো। '

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'যারা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস করে তাদের আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি গোষ্ঠী হয়।'

এ ছাড়াও এতে শরিক হওয়ার দ্বারা তাদের কুফরি ও মন্দ কাজে সহযোগিতা পাওয়া যায়। অথচ কুরআনে আল্লাহর অবাধ্যতা ও মন্দ কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ সীমালঙ্ঘনে এক অপরকে সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শাস্তিদানে কঠোর।'

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে উত্তম তথা সৎকর্ম করার এবং অসৎকর্ম পরিত্যাগ তথা তাকওয়া অবলম্বনের ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর ভ্রান্ত কাজে পরস্পরকে সাহায্য এবং পাপ ও হারাম কাজে একে অপরকে সহায়তা করতে নিষেধ করছেন।'

টিকাঃ
১৯৩. সুরা আল-ফুরকান: ৭২
১৯৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৬/১১৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৯৫. নওরোজ ও মেহেরজান ইরানের অগ্নিপূজারীদের বিশেষ দুটি উৎসব দিবস ছিল। এতে বিভিন্ন শিরকি ও কুফরি কর্মকাণ্ড থাকার পাশাপাশি তা বিজাতীয় ঐতিহ্য হওয়ায় মুসলমানদের জন্য তা পালন করা ও তাতে অংশগ্রহণ করার নিষিদ্ধ।
১৯৬. আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯/৩৯২, হা. নং ১৮৮৬৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৯৭. সুরা আল-মুমতাহিনা: ০১
১৯৮. সুরা আল-মুজাদালা : ২২
১৯৯. সুরা আল-মায়িদা : ০২
২০০. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ১৩. কাফিরদের জন্য রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা

📄 ১৩. কাফিরদের জন্য রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা


কাফিরদের জন্য রহমত ও ক্ষমার প্রার্থনা করা হারাম। মৃত কাফির হলে তো বিষয়টি পরিষ্কার। আর জীবিত হলে তার জন্য শুধু হিদায়াতের দুআ করা যাবে। তবে মাগফিরাত বা রহমতের দুআ করার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। বিশুদ্ধ মত হলো, হিদায়াতের অর্থে মাগফিরাত বা রহমতের দুআও করা যেতে পারে, সরাসরি মাগফিরাত বা রহমতের অর্থে নয়। অর্থাৎ জীবিত কোনো কাফিরের ব্যাপারে যখন এ দুআ করা হবে যে, “হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করো, তাকে রহম করো।” তখন এর অর্থ হবে, হিদায়াত দিয়ে তাকে ক্ষমা করো এবং রহম করো। এমন অর্থ উদ্দেশ্য না নিয়ে সরাসরি ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা জায়িজ হবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴾ 'আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করা নবি ও মুমিনদের জন্য সংগত নয়, যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামের অধিবাসী। '

আল্লামা আব্দুর রহমান বিন নাসির সাদি বলেন:
‘অর্থাৎ নবি ও মুমিনদের জন্য সমীচীন নয় যে, “মুশরিকদের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে এবং তাঁর সাথে অন্যেরও উপাসনা করেছে। “আত্মীয়-স্বজন হলেও নয়, যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামের অধিবাসী।” কেননা, এ অবস্থায় তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার দ্বারা কোনো লাভ নেই। অতএব, নবি ও মুমিনদের জন্য এমনটা করা উচিত হবে না। কেননা, তারা যখন শিরকের ওপর মারা গেছে কিংবা কোনোভাবে জানা গেছে যে, তারা শিরকের ওপরই মরবে, তখন তাদের জন্য আল্লাহর আজাব অবধারিত হয়ে যাবে। তাদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম আবশ্যক হয়ে গেছে। সুপারিশকারীদের সুপারিশ ও ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা প্রার্থনা তাদের কোনো উপকারে আসবে না। এ ছাড়াও নবি ও মুমিনগণের ওপর আবশ্যকীয় করণীয় হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ব্যাপারে স্বীয় রবের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানানো, আল্লাহ যাকে বন্ধু বানিয়েছেন তাকে বন্ধু বানানো এবং আল্লাহ যাকে শত্রু ঘোষণা করেছেন তাকে শত্রু জ্ঞান করা। আর কারও জাহান্নামি হয়ে যাওয়া স্পষ্ট হওয়ার পরও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এর (আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার) সাথে সাংঘর্ষিক ও বিপরীত।”

আল্লাহর রাসুল তো জীবিত কাফিরদের জন্যও অনুগ্রহ ও ক্ষমার দুআ করেননি; বরং তাদের হিদায়াতের দুআ করেছেন। অতএব, মৃত কাফিরদের জন্য দুআ করার কোনোই অবকাশ নেই। আবু মুসা আশআরি বলেন :
'ইহুদিরা রাসুলুল্লাহ-এর সামনে এসে হাঁচি দিত এবং এ আশা করত যে, তিনি তাদের হাঁচির জবাবে বলবেন, “ইয়ারহামুকাল্লাহ” (অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন)। কিন্তু তিনি বলতেন, “ইয়াহদিকুমুল্লাহ ওয়া ইউসলিহু বালাকুম” (অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের হিদায়াত করুন এবং তোমাদের অবস্থা সংশোধন করে দিন)।

ইমাম নববি বলেন :
'আর কাফিরের জানাজার নামাজ পড়া এবং তার জন্য মাগফিরাতের দুআ করা কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্য ও ইজমার ভিত্তিতে হারাম।'

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
'কেননা, কাফিরদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার ভিত্তিতে নাজায়িজ। '

হাফিজ বদরুদ্দির আইনি বলেন:
'যদি প্রশ্ন করা হয়, এক হাদিসে তো এভাবে এসেছে, “হে আল্লাহ, আমার জাতিকে ক্ষমা করুন। কেননা, তারা জানে না।” তাহলে উত্তরে বলব, এর অর্থ হলো, তাদেরকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করুন, যদ্দরুন তাদের মাগফিরাত করা যায়। যেহেতু কুফরের গুনাহ তো মাফ করা হয় না। অথবা এর অর্থ এমন হবে, তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তাদের ক্ষমা করুন।'

টিকাঃ
২০১. সুরা আত-তাওবা: ১১৩
২০২. তাফসিরুস সাদি: ৩৫৩ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
২০৩. সুনানুত তিরমিজি: ৪/৩৭৯, হা. নং ২৭৩৯ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত)-হাদিসটি সহিহ।
২০৪. আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব: ৫/১৪৪ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
২০৫. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১২/৪৮৯ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)
২০৬. উমদাতুল কারি: ২৩/১৯ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)

ফন্ট সাইজ
15px
17px