📄 ১১. কাফিরদের দেশে বসবাস বা সফর করা
কাফিরদের দেশে যদি পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ না থাকে, ইসলামের সব শিআর প্রকাশের অনুমোদন না থাকে, তাহলে স্বেচ্ছায় সে দেশে মুসলমানদের জন্য বসবাস করা হারাম। আর যদি পুরোপুরিভাবে ইসলাম পালন ও শিআর প্রকাশের সুযোগ থাকে, তাহলে কাফিরদের প্রতি অন্তরে পূর্ণ ঘৃণা ও বিদ্বেষ রেখে বসবাস করা জায়িজ হলেও তা নিরাপদ ও উত্তম নয়। তবে শরয়ি কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্য থাকলে সে ক্ষেত্রে থাকাটাই বরং উত্তম। যেমন: অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়া, দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া বা ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি। আর ওই সব দেশে সফর করার ক্ষেত্রে নীতি হলো, প্রয়োজন ছাড়া বিনোদন ইত্যাদির উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের দেশে যাওয়াও নাজায়িজ। কেননা, এতে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই নিজের দ্বীন ও চরিত্রকে আশঙ্কার মুখে ফেলা হয়। তবে দ্বীনি বা পার্থিব বৈধ প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে। যেমন : চিকিৎসা, ব্যবসা, বৈধ শিক্ষা, দ্বীনের দাওয়াত ইত্যাদি। তবে এর বৈধতার জন্য তিনটি শর্ত আছে। এক. তার দ্বীনের ব্যাপারে এতটুকু জ্ঞান থাকতে হবে, যদ্দরুন সে দ্বীনের ব্যাপারে সংশয়ে পড়া থেকে বাঁচতে পারে। দুই. তার এতটুকু চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকতে হবে, যার ভিত্তিতে সে সকল অশ্লীলতা ও নোংরামি থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারে। তিন. সে দেশে পূর্ণভাবে দ্বীন পালন করার স্বাধীনতা থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তাদের প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা দুনিয়াতে অসহায় ছিলাম। তারা প্রত্যুত্তরে বলেন, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে? এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস! তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও খুঁজে পায় না, আল্লাহ অচিরেই তাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।'
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
ইযা আনযালাল্লাহু বিক্বাওমিন আযাবান, আসাবাল আযাবু মান কানা ফিহিম, সুম্মা বুইছু আলা আ'মালিহিম
'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতিৰ ওপর আজাব অবতীর্ণ করেন, তাদের মধ্যে যারাই আছে, সবাইকে সেই আজাব গ্রাস করে। অতঃপর তাদের (ভালো-মন্দ)আমলের ভিত্তিতে তাদের পুনরুত্থান করা হবে। '
ইবনে হাজার আসকালানি বলেন:
'এ হাদিস থেকে কাফির ও জালিমদের কাছ থেকে পালানোর শরয়ি অনুমোদন বুঝা যায়। কারণ, তাদের সাথে বসবাস করা নিজেকে ধ্বংসের মাঝে নিক্ষেপ করার নামান্তর। এ বিধান তখন প্রযোজ্য হবে, যখন সে তাদের (তাদের) সাহায্য করবে না এবং তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হবে না। কিন্তু যদি সে তাদের সাহায্য করে অথবা তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তবে সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে। সামুদের জনপদ থেকে রাসুলুল্লাহ -এর তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান এ কথারই সমর্থন করে।'
জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
'আমি প্রত্যেক ওই মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে। '
ইমাম আবু মুহাম্মাদ বিন হাজাম এ ব্যাপারে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন :
'সুতরাং এ থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নিকটবর্তী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বেচ্ছায় দারুল কুফরে যোদ্ধা হিসাবে চলে যায়, সে তার এই অপরাধের কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। তার ওপর মুরতাদের সব হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেমন: গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে তাকে হত্যা করা, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি। কারণ, রাসুলুল্লাহ কোনো মুসলমান থেকে দায়িত্বমুক্তির ঘোষণা করেননি। আর যে ব্যক্তি নিজের ওপর জুলুমের আশঙ্কায় দারুল হারবে পলায়ন করে, আর সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে না, তাদের বিপরীতে কাফিরদের সাহায্যও করে না এবং মুসলমানদের মধ্যে এমন কাউকে পায় না, যে তাকে আশ্রয় দেবে, তাহলে এতে তার কোনো অসুবিধা নেই। কেননা, সে অপারগ ও বাধ্য। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইমাম জুহরি এ সংকল্প করেছিলেন যে, খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক মারা গেলে তিনি রোমে চলে যাবেন। কেননা, ওলিদ বিন ইয়াজিদ ক্ষমতা পেলে তাঁকে হত্যা করার মান্নত করেছিল। আর হিশামের পর সেই ছিল (পূর্ব-নির্ধারিত) খলিফা। অতএব, যার অবস্থা এমন হবে, তাকে মাজুর বা ক্ষমাযোগ্য ধরা হবে। তেমনই যেসব মুসলমান ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, তুরস্ক, সুদান, ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রে বসবাস করে, সে যদি বার্ধক্য, দারিদ্র্য, অসুস্থতা বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির কারণে চলে আসতে সক্ষম না হয়, তাকে মাজুর হিসাবে গণ্য করা হবে। সে যদি সেখানে কাফিরদের খিদমত, লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে মদদ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে সেও কাফির বলে গণ্য হবে। আর যদি সে দারুল হারবে দুনিয়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে আসে এবং তাদের কাছে জিম্মির মতো হয়ে থাকে; অথচ সে মুসলিম সমাজ বা দেশে চলে আসতে সক্ষম, তাহলে সে কুফর থেকে দূরে নয় এবং আমরা তার কোনো ওজর আছে বলে মনে করি না। আমরা আল্লাহর কাছে এ থেকে মুক্তি কামনা করছি। তবে কুফরকারী শাসক তথা সীমালঙ্ঘনকারী ও এ জাতীয় শাসকদের আনুগত্যে যারা বসবাস করবে, তারা তাদের (কাফিরদের কুফরি রাষ্ট্রে বসবাসকারীদের) মতো নয়। কেননা, মিশর, কাইরাওয়ান প্রমুখ অঞ্চলে ইসলামই বিজয়ী এবং সবকিছুর পরও এসব দেশের শাসকরা প্রকাশ্যে ইসলাম থেকে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়নি; বরং তারা ইসলামের সাথেই সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে। যদিও তাদের কর্মের বাস্তবতায় তারা কাফির। তবে যারা স্বেচ্ছায় কারামতিদের দেশে বসবাস করবে, তারা নিঃসন্দেহে কাফির। কেননা, তারা প্রকাশ্যে কুফর ও ইসলাম পরিত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। আল্লাহর কাছে আমরা এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আর যে ব্যক্তি এমন দেশে বসবাস করবে, যেখানে কুফরি পর্যায়ের কিছু প্রবৃত্তিপূজা প্রকাশ পায়, তাহলে সে (বসবাসকারী) কাফির হবে না। কেননা, সর্বাবস্থায় সেখানে তাওহিদের অস্তিত্ব, মুহাম্মাদ-এর রিসালাতের স্বীকৃতি, ইসলাম ভিন্ন অন্য সব ধর্ম থেকে মুক্ত ঘোষণা, নামাজ প্রতিষ্ঠা, রমজানের রোজা রাখা এবং ইসলাম ও শরিয়তের সকল বিষয় থাকার ভিত্তিতে ইসলামই বিজয়ী। আর সকল প্রশংসা সারা জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই। রাসুলুল্লাহ-এর বাণী “আমি প্রত্যেক ওই মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে” আমাদের কথাকে স্পষ্ট করে। রাসুলুল্লাহ এদ্বারা এখানে দারুল হারব উদ্দেশ্য নিয়েছেন। নইলে তো রাসুলুল্লাহ খাইবারে তাঁর দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন; অথচ ওখানকার সব অধিবাসীই ইহুদি ছিল। যখন জিম্মিগণ তাদের শহরে থাকবে এবং তাদের সাথে অন্যরা মেলামেশা করবে না, তাহলে মুসলামানদের কর্তৃত্ব ও পারস্পরিক ব্যবসায়িক লেনদেনের কারণে তথায় বসবাসকারী (মুসলিম) ব্যক্তিকে কাফিরও বলা যাবে না, গুনাহগারও বলা যাবে না; বরং সে একজন উত্তম মুসলমান। তাদের বসবাসের স্থানকে দারুল ইসলাম বলা হবে, দারুশ শিরক (দারুল হারব) নয়। কেননা, কোনো দেশের বিজয়ী, শাসক ও মালিকের ভিত্তিতেই (দারুল ইসলাম বা দারুল হারব বলে) দেশের নাম নির্ধারিত হয়। কোনো প্রকাশ্য কাফির যদি দারুল ইসলামের কোনো এলাকা দখল করে নেয় এবং মুসলমানদেরকে তাদের আপন অবস্থায় বহাল রাখে, সে উক্ত এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসে এবং নিজেকে অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করে, তাহলে তাতে অবস্থানকারী যে-ই তাকে সাহায্য করবে এবং তার সাথে থাকবে, সে কাফির হিসেবে গণ্য হবে; যদিও সে (নাগরিক) নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করুক। '
টিকাঃ
১৮৭. সুরা আন-নিসা: ৯৭-৯৯
১৮৮. সহিহুল বুখারি: ৯/৫৬, হা. নং ৭১০৮ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
১৮৯. ফাতহুল বারি: ১৩/৬১, (দারুল মারিফা, বৈরুত)
১৯০. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৪৫, হা. নং ২৬৪৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
১৯১. শিয়াদের মধ্যে অত্যন্ত উগ্র ও নিকৃষ্ট একটি দলের নাম। এদের নেতা আবু তাহির কারামতি সে-ই নরাধম, যে ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা আক্রমণ করে এবং অসংখ্য হাজিদের হত্যা করে হাজরে আসওয়াদ পাথর চুরি করে নিয়ে যায়। প্রায় বাইশ বছর পর তা পুনরায় যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়।
১৯২. আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম ১২/১২৫-১২৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ১২. কাফিরদের উৎসবে শরিক হওয়া
কাফিরদের ধর্মীয় বা আনন্দ উৎসবে মুসলমানদের শরিক হওয়া, অনুরূপ এতে কোনো ধরনের সাহায্য করা বা একে অপরকে অভিনন্দন জানানো কিছুতেই জায়িজ নয়। সুতরাং কাফিরদের শিআর ও শিরকি কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শরিক হওয়া স্পষ্ট কুফর। আর মনে ঘৃণা রেখে এমনিই কৌতূহলবশত শরিক হওয়া হারাম।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
'আর যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং অসার কার্যকলাপের সম্মুখীন হলে আপন মর্যাদা রক্ষার্থে তা পরিহার করে চলে।'
তাবিয়িনে কিরামের অনেকেই এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুশরিকদের ধর্মীয় দিবস ও আনন্দ উৎসবে না যাওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ এটি মুমিনদের একটি বৈশিষ্ট্য যে, তারা মুশরিকদের উৎসবে যোগদান করবে না।
আল্লামা ইবনে কাসির এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'এটাও রহমানের বান্দাদের একটি গুণ যে, তারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না। কারও মতে এখানে আয-যুরা এর অর্থ শিরক ও মূর্তিপূজা। কারও মতে এর অর্থ মিথ্যা, পাপাচার, কুফর, বেহুদা ও বাতিল কর্মকাণ্ড। মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেন, এর অর্থ অসার কাজ ও গানবাজনা। আবুল আলিয়া, তাউস, ইবনে সিরিন , জাহহাক, রবি বিন আনাস-সহ অনেকেই বলেছেন, এর অর্থ মুশরিকদের ধর্মীয় দিবস ও আনন্দ উৎসব। আমর বিন কাইস -এর মতে, এর অর্থ অশ্লীল ও মন্দ মজলিস। মালিক জুহরি থেকে বর্ণনা করে বলেন, এর অর্থ মদপান। তারা এতে উপস্থিত হতো না এবং এতে আকর্ষণবোধও করত না। '
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
মাইন বানা বিলাদিল আ'আজিমি ওয়া সানাআ নায়রুযাহুম ওয়া মিহরা জানাহুম ওয়া তাশাব্বাহা বিহিম হাত্তা ইয়ামূতা ওয়া হুয়া কাযালিকা হুশিরা মা'আহুম ইয়াওমাল ক্বিয়ামাত
'যে ব্যক্তি অনারব তথা অমুসলিম দেশে বাসস্থান নির্মাণ করে এবং তাদের নওরোজ ও মেহেরজান উৎসব পালন করে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, অতঃপর এ অবস্থার ওপরই তার মৃত্যু হয়, তাহলে ওই সব কাফিরদের সাথেই তার হাশর হবে।'
তাদের সাথে ধর্মীয় ও আনন্দ উৎসবে যোগদান মানে তাদের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, তাদের কর্মকে সমর্থন করা; অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে বারবার কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে বারণ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও; অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুল ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখো। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'যারা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস করে তাদের আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি গোষ্ঠী হয়।'
এ ছাড়াও এতে শরিক হওয়ার দ্বারা তাদের কুফরি ও মন্দ কাজে সহযোগিতা পাওয়া যায়। অথচ কুরআনে আল্লাহর অবাধ্যতা ও মন্দ কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ সীমালঙ্ঘনে এক অপরকে সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শাস্তিদানে কঠোর।'
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে উত্তম তথা সৎকর্ম করার এবং অসৎকর্ম পরিত্যাগ তথা তাকওয়া অবলম্বনের ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর ভ্রান্ত কাজে পরস্পরকে সাহায্য এবং পাপ ও হারাম কাজে একে অপরকে সহায়তা করতে নিষেধ করছেন।'
টিকাঃ
১৯৩. সুরা আল-ফুরকান: ৭২
১৯৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৬/১১৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৯৫. নওরোজ ও মেহেরজান ইরানের অগ্নিপূজারীদের বিশেষ দুটি উৎসব দিবস ছিল। এতে বিভিন্ন শিরকি ও কুফরি কর্মকাণ্ড থাকার পাশাপাশি তা বিজাতীয় ঐতিহ্য হওয়ায় মুসলমানদের জন্য তা পালন করা ও তাতে অংশগ্রহণ করার নিষিদ্ধ।
১৯৬. আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯/৩৯২, হা. নং ১৮৮৬৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৯৭. সুরা আল-মুমতাহিনা: ০১
১৯৮. সুরা আল-মুজাদালা : ২২
১৯৯. সুরা আল-মায়িদা : ০২
২০০. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
📄 ১৩. কাফিরদের জন্য রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা
কাফিরদের জন্য রহমত ও ক্ষমার প্রার্থনা করা হারাম। মৃত কাফির হলে তো বিষয়টি পরিষ্কার। আর জীবিত হলে তার জন্য শুধু হিদায়াতের দুআ করা যাবে। তবে মাগফিরাত বা রহমতের দুআ করার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। বিশুদ্ধ মত হলো, হিদায়াতের অর্থে মাগফিরাত বা রহমতের দুআও করা যেতে পারে, সরাসরি মাগফিরাত বা রহমতের অর্থে নয়। অর্থাৎ জীবিত কোনো কাফিরের ব্যাপারে যখন এ দুআ করা হবে যে, “হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করো, তাকে রহম করো।” তখন এর অর্থ হবে, হিদায়াত দিয়ে তাকে ক্ষমা করো এবং রহম করো। এমন অর্থ উদ্দেশ্য না নিয়ে সরাসরি ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা জায়িজ হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴾ 'আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করা নবি ও মুমিনদের জন্য সংগত নয়, যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামের অধিবাসী। '
আল্লামা আব্দুর রহমান বিন নাসির সাদি বলেন:
‘অর্থাৎ নবি ও মুমিনদের জন্য সমীচীন নয় যে, “মুশরিকদের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে এবং তাঁর সাথে অন্যেরও উপাসনা করেছে। “আত্মীয়-স্বজন হলেও নয়, যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামের অধিবাসী।” কেননা, এ অবস্থায় তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার দ্বারা কোনো লাভ নেই। অতএব, নবি ও মুমিনদের জন্য এমনটা করা উচিত হবে না। কেননা, তারা যখন শিরকের ওপর মারা গেছে কিংবা কোনোভাবে জানা গেছে যে, তারা শিরকের ওপরই মরবে, তখন তাদের জন্য আল্লাহর আজাব অবধারিত হয়ে যাবে। তাদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম আবশ্যক হয়ে গেছে। সুপারিশকারীদের সুপারিশ ও ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা প্রার্থনা তাদের কোনো উপকারে আসবে না। এ ছাড়াও নবি ও মুমিনগণের ওপর আবশ্যকীয় করণীয় হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ব্যাপারে স্বীয় রবের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানানো, আল্লাহ যাকে বন্ধু বানিয়েছেন তাকে বন্ধু বানানো এবং আল্লাহ যাকে শত্রু ঘোষণা করেছেন তাকে শত্রু জ্ঞান করা। আর কারও জাহান্নামি হয়ে যাওয়া স্পষ্ট হওয়ার পরও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এর (আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার) সাথে সাংঘর্ষিক ও বিপরীত।”
আল্লাহর রাসুল তো জীবিত কাফিরদের জন্যও অনুগ্রহ ও ক্ষমার দুআ করেননি; বরং তাদের হিদায়াতের দুআ করেছেন। অতএব, মৃত কাফিরদের জন্য দুআ করার কোনোই অবকাশ নেই। আবু মুসা আশআরি বলেন :
'ইহুদিরা রাসুলুল্লাহ-এর সামনে এসে হাঁচি দিত এবং এ আশা করত যে, তিনি তাদের হাঁচির জবাবে বলবেন, “ইয়ারহামুকাল্লাহ” (অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন)। কিন্তু তিনি বলতেন, “ইয়াহদিকুমুল্লাহ ওয়া ইউসলিহু বালাকুম” (অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের হিদায়াত করুন এবং তোমাদের অবস্থা সংশোধন করে দিন)।
ইমাম নববি বলেন :
'আর কাফিরের জানাজার নামাজ পড়া এবং তার জন্য মাগফিরাতের দুআ করা কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্য ও ইজমার ভিত্তিতে হারাম।'
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
'কেননা, কাফিরদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার ভিত্তিতে নাজায়িজ। '
হাফিজ বদরুদ্দির আইনি বলেন:
'যদি প্রশ্ন করা হয়, এক হাদিসে তো এভাবে এসেছে, “হে আল্লাহ, আমার জাতিকে ক্ষমা করুন। কেননা, তারা জানে না।” তাহলে উত্তরে বলব, এর অর্থ হলো, তাদেরকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করুন, যদ্দরুন তাদের মাগফিরাত করা যায়। যেহেতু কুফরের গুনাহ তো মাফ করা হয় না। অথবা এর অর্থ এমন হবে, তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তাদের ক্ষমা করুন।'
টিকাঃ
২০১. সুরা আত-তাওবা: ১১৩
২০২. তাফসিরুস সাদি: ৩৫৩ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
২০৩. সুনানুত তিরমিজি: ৪/৩৭৯, হা. নং ২৭৩৯ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত)-হাদিসটি সহিহ।
২০৪. আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব: ৫/১৪৪ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
২০৫. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১২/৪৮৯ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)
২০৬. উমদাতুল কারি: ২৩/১৯ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)