📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৯. প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাফিরদের নিয়োগ দেওয়া

📄 ৯. প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাফিরদের নিয়োগ দেওয়া


আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَلَنْ يَجْعَلَ اللهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا ﴾
'আর আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের জন্য কোনো পথ রাখবেন না।'

আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
আমি উমর -কে বললাম, আমার একজন খ্রিষ্টান কেরানি আছে। উমর বললেন, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন! এ তুমি কী করেছ? তুমি কি এ আয়াত শোনোনি? আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর একে অপরের বন্ধু।” [সুরা আল-মায়িদা : ৫১] তুমি কি তাকে একনিষ্ঠ কর্মী বানাওনি? আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনিন, তার লেখাটাই আমার দরকার হয় আর তার ধর্ম তার থাকবে! তিনি বললেন, আল্লাহ যখন তাদের অপমানিত করেছেন, আমি তাদের সম্মান দেবো না। আল্লাহ যখন তাদের লাঞ্ছিত করেছেন, আমি তাদের মর্যাদা দেবো না। আল্লাহ যখন তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন, আমি তাদের কাছে টানব না।

ইমাম কুরতুবি বলেন :
উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো আহলে কিতাবকে (ইহুদি-খ্রিষ্টানকে) সরকারি পদে নিয়োগ দেবে না। কারণ, তারা ঘুষ বৈধ মনে করে। তোমরা নিজেদের ও জনগণের কাজের জন্য এমন লোকদের থেকে সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করো, যারা আল্লাহকে ভয় করে। উমর রা-কে বলা হলো, এখানে হীরার জনৈক খ্রিষ্টান আছে, যে লেখালেখি ও কলম চালনায় বেশ পারঙ্গম। সে কি আপনার লেখার কাজ করতে পারে না? তিনি বললেন, “আমি অমুসলিমদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করব না।” সুতরাং জিম্মিকে কেরানি পদে নিয়োগ দেওয়া কিংবা ব্যবসার পরিচালক ও অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়া জায়িজ নেই। আমি বলি, এ যুগে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। এখন আহলে কিতাবকে (ইহুদি-খ্রিষ্টানকে) রেজিস্টার ও আমানতদার বানানো হচ্ছে। এ কারণে অনেক বোকা ও অজ্ঞদের দৃষ্টিতে তারা প্রশাসক ও গভর্নর হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে।

আল্লামা ইবনে কাইয়িম বলেন:
ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে জিম্মি কাফিরদের নিয়োগ দেওয়ার বিধান : কাউকে কোনো পদে নিয়োগদান যেহেতু ক্ষমতা প্রদানেরই নামান্তর, বিধায় জিম্মিদের নিয়োগদান মানে তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতা রাখা। অথচ আল্লাহ তাআলা ফয়সালা দিয়েছেন যে, যারা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখবে, তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়াও কাফিরদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ না করে কারও ইমান পূর্ণ হবে না। আর কাউকে ক্ষমতা প্রদান তো সম্পর্কচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। অতএব, সম্পর্কচ্ছেদ ও ক্ষমতা প্রদান কখনো একসাথে হতে পারে না। এ ছাড়াও ক্ষমতা প্রদান বস্তুত মর্যাদাদান বুঝায়। অতএব, কুফরির লাঞ্ছনার সাথে এটা কোনোদিন একত্রিত হতে পারে না। অনুরূপ ক্ষমতা প্রদান তো সম্পর্ক স্থাপন বুঝায়। অতএব, কাফিরদের শত্রুতার সাথে তা কখনো একত্রিত হতে পারে না।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
আর জিম্মিদের থেকে প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক কোনো কাজে সাহায্য নেওয়া যাবে না। কেননা, এতে অনেক গোলযোগ ও অনিষ্ট দেখা দেবে বা এর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আবু তালিব -এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আহমাদ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, খারাজ উসুল করার মতো কোনো দায়িত্বে কি জিম্মিকে বসানো যাবে? তিনি বললেন, না। কোনো ব্যাপারেই তাদের মদদ নেওয়া যাবে না। ...আবু বকর অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তিনি কোনো মুরতাদকে সরকারি পদে নিয়োগ দেবেন না; যদিও তারা ইসলামে ফিরে আসুক। কারণ, তাদের দ্বীনদারি বিনষ্ট হওয়া নিয়ে আশঙ্কা আছে।

টিকাঃ
১৭৫. সুরা আন-নিসা: ১৪১
১৭৬. আহকামু আহলিল মিলাল ওয়ার-রিদ্দাহ: পৃ. নং ১১৭, হা. নং ৩২৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত) -হাদিসটি হাসান।
১৭৭. তাফসিরুল কুরতুবি: ৪/১৭৯ (আল-মাকতাবাতুল মিসরিয়‍্যা, কায়রো)
১৭৮. আহকামu আহলিজ জিম্মাহ: ১/৪৯৯ (রামাদি, দাম্মাম)
১৭৯. আল-ফাতাওয়াল কুবরা: ৫/৫৩৯-৫৪০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ১০. কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য রাখা

📄 ১০. কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য রাখা


কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করার ক্ষেত্রে বিধান তিন ধরনের। এক. তাদের ধর্মীয় বিষয়ে সাদৃশ্য অবলম্বন করা এবং তা সম্মানের চোখে দেখা। সন্দেহ নেই যে, এটা পরিষ্কার কুফর। দুই. বৈধ পার্থিব বিষয়ে তাদের অনুসরণের উদ্দেশ্যে বা তাদের সাথে মিল রাখার নিয়তে সাদৃশ্য অবলম্বন করা। এটা মাকরুহ বা নাজায়িজ। তিন. বৈধ পার্থিব বিষয়ে তাদের সাথে সাদৃশ্য হওয়া, কিন্তু অন্তরে তাদের সাথে মিল রাখার কোনোরূপ চিন্তা থাকবে না; বরং পার্থিব প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা উদ্দেশ্য হবে। এটা জায়িজ ও মুবাহ।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'নিশ্চয় যারা তাদের নিকট সৎপথ ব্যক্ত হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এ জন্য যে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে, তারা তাদের বলে, “আমরা কিছু কিছু বিষয়ে তোমাদের কথা মান্য করব।” আর আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি সম্বন্ধে অবগত আছেন।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা জালিমদের পথ প্রদর্শন করেন না।'

আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
'যে অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদেরই একজন।'

মুল্লা আলি কারি বলেন:
“যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে” অর্থাৎ যে ব্যক্তি পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কাফিরদের সাথে নিজেকে সাদৃশ্যপূর্ণ করবে, অথবা ফাসিক-ফুজ্জার কিংবা বুজুর্গ ও নেক বান্দাদের সাথে, “তাহলে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।” অর্থাৎ গুনাহ ও সাওয়াবের ক্ষেত্রে। আল্লামা তিবি বলেন, এটা আকৃতি, স্বভাব ও ধর্মীয় প্রতীক সবগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর ধর্মীয় প্রতীক সাদৃশ্য অবলম্বনের ক্ষেত্রে অধিক স্পষ্ট হওয়ায় হাদিসটি এ অধ্যায়ে আনা হয়েছে। (মুল্লা আলি কারি বলেন) “আমি বলব, বরং এখানে শুধু প্রতীকই উদ্দেশ্য, অন্য কিছু নয়। কেননা, আকৃতিগত রূপে সাদৃশ্য অবলম্বন অসম্ভব। আর অভ্যন্তরীণ স্বভাব-চরিত্রের ক্ষেত্রে তো সাদৃশ্য অবলম্বন বলা হয় না; বরং বলা হয় স্বভাব গ্রহণ।”

আল্লামা মুনাবি এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন:
'অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে তাদের ফ্যাশনের মতো, চলাফেরায় তাদের কর্মের মতো ও স্বভাব-চরিত্রে তাদের আচার-আচরণের মতো সাজ গ্রহণ করে। আর বেশ-ভূষা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাদের আদর্শ-কালচার অনুসরণ করে।'

শাইখিজাদা দামাদে আফিন্দি বলেন:
'বিশুদ্ধ মতানুসারে মাথায় অগ্নিপূজারিদের টুপি পরিধান করার দ্বারা কাফির হয়ে যাবে। তবে বন্দীকে মুক্তি করার জন্য, বা কারও মতে গরম-ঠান্ডা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে হলে সমস্যা নেই। আর কারও মতে এতে যদি কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে কাফির হয়ে যাবে। অনুরূপ কোমরে জুন্নার (বিজাতিদের ধর্মীয় বিশেষ ফিতা) বাঁধলেও কাফির হয়ে যাবে।'

イমাম নববি বলেন :
'কোমরে জুন্নার (বিজাতিদের ধর্মীয় ফিতা) বাঁধলে কাফির হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি মাথায় অগ্নিপূজারিদের টুপি পরিধান করবে, তার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরাম মতভেদ করেছেন। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, সে কাফির হয়ে যাবে। যদি কোমরে কোনো ফিতা বাঁধে, অতঃপর তাকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে সে উত্তরে বলল, এটা জুন্নার; তাহলে অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরামের মতে সে কাফির হয়ে যাবে। যদি কোমরে জুন্নার বেঁধে সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে দারুল হারবে প্রবেশ করে, তবুও সে কাফির হয়ে যাবে। আর যদি বন্দীদের মুক্ত করার উদ্দেশ্যে যায়, তাহরে কাফির হবে না।'

টিকাঃ
১৮০. সুরা মুহাম্মাদ: ২৫-২৬
১৮১. সুরা আল-মায়িদা: ৫১
১৮২. সুনানু আবি দাউদ: ৪/৪৪, হা. নং ৪০৩১ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
১৮৩. মিরকাতুল মাফাতিহ : ৭/২৭৮২, হা. নং ৪৩৪৭ সংশ্লিষ্ট আলোচনা (দারুল ফিকর, বৈরুত)
১৮৪. ফাইজুল কাদির: ৬/১০৪ (আল-মাকতাবাতুত তিজারিয়‍্যাতিল কুবরা, মিশর)
১৮৫. মাজমাউল আনহুর: ১/৬৯৮ (দারu ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
১৮৬. রাওজাতুত তালিবিন: ১০/৬৯ (আল-মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ১১. কাফিরদের দেশে বসবাস বা সফর করা

📄 ১১. কাফিরদের দেশে বসবাস বা সফর করা


কাফিরদের দেশে যদি পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ না থাকে, ইসলামের সব শিআর প্রকাশের অনুমোদন না থাকে, তাহলে স্বেচ্ছায় সে দেশে মুসলমানদের জন্য বসবাস করা হারাম। আর যদি পুরোপুরিভাবে ইসলাম পালন ও শিআর প্রকাশের সুযোগ থাকে, তাহলে কাফিরদের প্রতি অন্তরে পূর্ণ ঘৃণা ও বিদ্বেষ রেখে বসবাস করা জায়িজ হলেও তা নিরাপদ ও উত্তম নয়। তবে শরয়ি কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্য থাকলে সে ক্ষেত্রে থাকাটাই বরং উত্তম। যেমন: অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়া, দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া বা ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি। আর ওই সব দেশে সফর করার ক্ষেত্রে নীতি হলো, প্রয়োজন ছাড়া বিনোদন ইত্যাদির উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের দেশে যাওয়াও নাজায়িজ। কেননা, এতে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই নিজের দ্বীন ও চরিত্রকে আশঙ্কার মুখে ফেলা হয়। তবে দ্বীনি বা পার্থিব বৈধ প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে। যেমন : চিকিৎসা, ব্যবসা, বৈধ শিক্ষা, দ্বীনের দাওয়াত ইত্যাদি। তবে এর বৈধতার জন্য তিনটি শর্ত আছে। এক. তার দ্বীনের ব্যাপারে এতটুকু জ্ঞান থাকতে হবে, যদ্দরুন সে দ্বীনের ব্যাপারে সংশয়ে পড়া থেকে বাঁচতে পারে। দুই. তার এতটুকু চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকতে হবে, যার ভিত্তিতে সে সকল অশ্লীলতা ও নোংরামি থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারে। তিন. সে দেশে পূর্ণভাবে দ্বীন পালন করার স্বাধীনতা থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তাদের প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা দুনিয়াতে অসহায় ছিলাম। তারা প্রত্যুত্তরে বলেন, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে? এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস! তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও খুঁজে পায় না, আল্লাহ অচিরেই তাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।'

ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
ইযা আনযালাল্লাহু বিক্বাওমিন আযাবান, আসাবাল আযাবু মান কানা ফিহিম, সুম্মা বুইছু আলা আ'মালিহিম
'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতিৰ ওপর আজাব অবতীর্ণ করেন, তাদের মধ্যে যারাই আছে, সবাইকে সেই আজাব গ্রাস করে। অতঃপর তাদের (ভালো-মন্দ)আমলের ভিত্তিতে তাদের পুনরুত্থান করা হবে। '

ইবনে হাজার আসকালানি বলেন:
'এ হাদিস থেকে কাফির ও জালিমদের কাছ থেকে পালানোর শরয়ি অনুমোদন বুঝা যায়। কারণ, তাদের সাথে বসবাস করা নিজেকে ধ্বংসের মাঝে নিক্ষেপ করার নামান্তর। এ বিধান তখন প্রযোজ্য হবে, যখন সে তাদের (তাদের) সাহায্য করবে না এবং তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হবে না। কিন্তু যদি সে তাদের সাহায্য করে অথবা তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তবে সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে। সামুদের জনপদ থেকে রাসুলুল্লাহ -এর তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান এ কথারই সমর্থন করে।'

জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
'আমি প্রত্যেক ওই মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে। '

ইমাম আবু মুহাম্মাদ বিন হাজাম এ ব্যাপারে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন :
'সুতরাং এ থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নিকটবর্তী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বেচ্ছায় দারুল কুফরে যোদ্ধা হিসাবে চলে যায়, সে তার এই অপরাধের কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। তার ওপর মুরতাদের সব হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেমন: গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে তাকে হত্যা করা, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি। কারণ, রাসুলুল্লাহ কোনো মুসলমান থেকে দায়িত্বমুক্তির ঘোষণা করেননি। আর যে ব্যক্তি নিজের ওপর জুলুমের আশঙ্কায় দারুল হারবে পলায়ন করে, আর সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে না, তাদের বিপরীতে কাফিরদের সাহায্যও করে না এবং মুসলমানদের মধ্যে এমন কাউকে পায় না, যে তাকে আশ্রয় দেবে, তাহলে এতে তার কোনো অসুবিধা নেই। কেননা, সে অপারগ ও বাধ্য। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইমাম জুহরি এ সংকল্প করেছিলেন যে, খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক মারা গেলে তিনি রোমে চলে যাবেন। কেননা, ওলিদ বিন ইয়াজিদ ক্ষমতা পেলে তাঁকে হত্যা করার মান্নত করেছিল। আর হিশামের পর সেই ছিল (পূর্ব-নির্ধারিত) খলিফা। অতএব, যার অবস্থা এমন হবে, তাকে মাজুর বা ক্ষমাযোগ্য ধরা হবে। তেমনই যেসব মুসলমান ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, তুরস্ক, সুদান, ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রে বসবাস করে, সে যদি বার্ধক্য, দারিদ্র্য, অসুস্থতা বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির কারণে চলে আসতে সক্ষম না হয়, তাকে মাজুর হিসাবে গণ্য করা হবে। সে যদি সেখানে কাফিরদের খিদমত, লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে মদদ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে সেও কাফির বলে গণ্য হবে। আর যদি সে দারুল হারবে দুনিয়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে আসে এবং তাদের কাছে জিম্মির মতো হয়ে থাকে; অথচ সে মুসলিম সমাজ বা দেশে চলে আসতে সক্ষম, তাহলে সে কুফর থেকে দূরে নয় এবং আমরা তার কোনো ওজর আছে বলে মনে করি না। আমরা আল্লাহর কাছে এ থেকে মুক্তি কামনা করছি। তবে কুফরকারী শাসক তথা সীমালঙ্ঘনকারী ও এ জাতীয় শাসকদের আনুগত্যে যারা বসবাস করবে, তারা তাদের (কাফিরদের কুফরি রাষ্ট্রে বসবাসকারীদের) মতো নয়। কেননা, মিশর, কাইরাওয়ান প্রমুখ অঞ্চলে ইসলামই বিজয়ী এবং সবকিছুর পরও এসব দেশের শাসকরা প্রকাশ্যে ইসলাম থেকে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়নি; বরং তারা ইসলামের সাথেই সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে। যদিও তাদের কর্মের বাস্তবতায় তারা কাফির। তবে যারা স্বেচ্ছায় কারামতিদের দেশে বসবাস করবে, তারা নিঃসন্দেহে কাফির। কেননা, তারা প্রকাশ্যে কুফর ও ইসলাম পরিত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। আল্লাহর কাছে আমরা এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আর যে ব্যক্তি এমন দেশে বসবাস করবে, যেখানে কুফরি পর্যায়ের কিছু প্রবৃত্তিপূজা প্রকাশ পায়, তাহলে সে (বসবাসকারী) কাফির হবে না। কেননা, সর্বাবস্থায় সেখানে তাওহিদের অস্তিত্ব, মুহাম্মাদ-এর রিসালাতের স্বীকৃতি, ইসলাম ভিন্ন অন্য সব ধর্ম থেকে মুক্ত ঘোষণা, নামাজ প্রতিষ্ঠা, রমজানের রোজা রাখা এবং ইসলাম ও শরিয়তের সকল বিষয় থাকার ভিত্তিতে ইসলামই বিজয়ী। আর সকল প্রশংসা সারা জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই। রাসুলুল্লাহ-এর বাণী “আমি প্রত্যেক ওই মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে” আমাদের কথাকে স্পষ্ট করে। রাসুলুল্লাহ এদ্বারা এখানে দারুল হারব উদ্দেশ্য নিয়েছেন। নইলে তো রাসুলুল্লাহ খাইবারে তাঁর দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন; অথচ ওখানকার সব অধিবাসীই ইহুদি ছিল। যখন জিম্মিগণ তাদের শহরে থাকবে এবং তাদের সাথে অন্যরা মেলামেশা করবে না, তাহলে মুসলামানদের কর্তৃত্ব ও পারস্পরিক ব্যবসায়িক লেনদেনের কারণে তথায় বসবাসকারী (মুসলিম) ব্যক্তিকে কাফিরও বলা যাবে না, গুনাহগারও বলা যাবে না; বরং সে একজন উত্তম মুসলমান। তাদের বসবাসের স্থানকে দারুল ইসলাম বলা হবে, দারুশ শিরক (দারুল হারব) নয়। কেননা, কোনো দেশের বিজয়ী, শাসক ও মালিকের ভিত্তিতেই (দারুল ইসলাম বা দারুল হারব বলে) দেশের নাম নির্ধারিত হয়। কোনো প্রকাশ্য কাফির যদি দারুল ইসলামের কোনো এলাকা দখল করে নেয় এবং মুসলমানদেরকে তাদের আপন অবস্থায় বহাল রাখে, সে উক্ত এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসে এবং নিজেকে অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করে, তাহলে তাতে অবস্থানকারী যে-ই তাকে সাহায্য করবে এবং তার সাথে থাকবে, সে কাফির হিসেবে গণ্য হবে; যদিও সে (নাগরিক) নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করুক। '

টিকাঃ
১৮৭. সুরা আন-নিসা: ৯৭-৯৯
১৮৮. সহিহুল বুখারি: ৯/৫৬, হা. নং ৭১০৮ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
১৮৯. ফাতহুল বারি: ১৩/৬১, (দারুল মারিফা, বৈরুত)
১৯০. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৪৫, হা. নং ২৬৪৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
১৯১. শিয়াদের মধ্যে অত্যন্ত উগ্র ও নিকৃষ্ট একটি দলের নাম। এদের নেতা আবু তাহির কারামতি সে-ই নরাধম, যে ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা আক্রমণ করে এবং অসংখ্য হাজিদের হত্যা করে হাজরে আসওয়াদ পাথর চুরি করে নিয়ে যায়। প্রায় বাইশ বছর পর তা পুনরায় যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়।
১৯২. আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম ১২/১২৫-১২৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ১২. কাফিরদের উৎসবে শরিক হওয়া

📄 ১২. কাফিরদের উৎসবে শরিক হওয়া


কাফিরদের ধর্মীয় বা আনন্দ উৎসবে মুসলমানদের শরিক হওয়া, অনুরূপ এতে কোনো ধরনের সাহায্য করা বা একে অপরকে অভিনন্দন জানানো কিছুতেই জায়িজ নয়। সুতরাং কাফিরদের শিআর ও শিরকি কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শরিক হওয়া স্পষ্ট কুফর। আর মনে ঘৃণা রেখে এমনিই কৌতূহলবশত শরিক হওয়া হারাম।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
'আর যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং অসার কার্যকলাপের সম্মুখীন হলে আপন মর্যাদা রক্ষার্থে তা পরিহার করে চলে।'

তাবিয়িনে কিরামের অনেকেই এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুশরিকদের ধর্মীয় দিবস ও আনন্দ উৎসবে না যাওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ এটি মুমিনদের একটি বৈশিষ্ট্য যে, তারা মুশরিকদের উৎসবে যোগদান করবে না।

আল্লামা ইবনে কাসির এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'এটাও রহমানের বান্দাদের একটি গুণ যে, তারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না। কারও মতে এখানে আয-যুরা এর অর্থ শিরক ও মূর্তিপূজা। কারও মতে এর অর্থ মিথ্যা, পাপাচার, কুফর, বেহুদা ও বাতিল কর্মকাণ্ড। মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেন, এর অর্থ অসার কাজ ও গানবাজনা। আবুল আলিয়া, তাউস, ইবনে সিরিন , জাহহাক, রবি বিন আনাস-সহ অনেকেই বলেছেন, এর অর্থ মুশরিকদের ধর্মীয় দিবস ও আনন্দ উৎসব। আমর বিন কাইস -এর মতে, এর অর্থ অশ্লীল ও মন্দ মজলিস। মালিক জুহরি থেকে বর্ণনা করে বলেন, এর অর্থ মদপান। তারা এতে উপস্থিত হতো না এবং এতে আকর্ষণবোধও করত না। '

আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
মাইন বানা বিলাদিল আ'আজিমি ওয়া সানাআ নায়রুযাহুম ওয়া মিহরা জানাহুম ওয়া তাশাব্বাহা বিহিম হাত্তা ইয়ামূতা ওয়া হুয়া কাযালিকা হুশিরা মা'আহুম ইয়াওমাল ক্বিয়ামাত
'যে ব্যক্তি অনারব তথা অমুসলিম দেশে বাসস্থান নির্মাণ করে এবং তাদের নওরোজ ও মেহেরজান উৎসব পালন করে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, অতঃপর এ অবস্থার ওপরই তার মৃত্যু হয়, তাহলে ওই সব কাফিরদের সাথেই তার হাশর হবে।'

তাদের সাথে ধর্মীয় ও আনন্দ উৎসবে যোগদান মানে তাদের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, তাদের কর্মকে সমর্থন করা; অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে বারবার কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে বারণ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও; অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুল ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখো। '

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'যারা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস করে তাদের আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি গোষ্ঠী হয়।'

এ ছাড়াও এতে শরিক হওয়ার দ্বারা তাদের কুফরি ও মন্দ কাজে সহযোগিতা পাওয়া যায়। অথচ কুরআনে আল্লাহর অবাধ্যতা ও মন্দ কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ সীমালঙ্ঘনে এক অপরকে সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শাস্তিদানে কঠোর।'

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে উত্তম তথা সৎকর্ম করার এবং অসৎকর্ম পরিত্যাগ তথা তাকওয়া অবলম্বনের ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর ভ্রান্ত কাজে পরস্পরকে সাহায্য এবং পাপ ও হারাম কাজে একে অপরকে সহায়তা করতে নিষেধ করছেন।'

টিকাঃ
১৯৩. সুরা আল-ফুরকান: ৭২
১৯৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৬/১১৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৯৫. নওরোজ ও মেহেরজান ইরানের অগ্নিপূজারীদের বিশেষ দুটি উৎসব দিবস ছিল। এতে বিভিন্ন শিরকি ও কুফরি কর্মকাণ্ড থাকার পাশাপাশি তা বিজাতীয় ঐতিহ্য হওয়ায় মুসলমানদের জন্য তা পালন করা ও তাতে অংশগ্রহণ করার নিষিদ্ধ।
১৯৬. আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯/৩৯২, হা. নং ১৮৮৬৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৯৭. সুরা আল-মুমতাহিনা: ০১
১৯৮. সুরা আল-মুজাদালা : ২২
১৯৯. সুরা আল-মায়িদা : ০২
২০০. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

ফন্ট সাইজ
15px
17px