📄 ৫. কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য ফাঁস করা
কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য ও দুর্বল কোনো দিক ফাঁস করা স্পষ্ট কুফর। কেননা, এতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সাব্যস্ত হয়, যার কারণে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যায়। তবে যদি কেউ মুসলামানদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং পার্থিব কোনো স্বার্থ বা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এমনটা করে, তবে তা কুফর হবে না ঠিক, তবে এতে মারাত্মক কবিরা গুনাহ হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের অনিষ্ট করতে ত্রুটি করবে না। তারা তা-ই কামনা করে, যা তোমাদের বিপন্ন করে। তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায় এবং তাদের হৃদয় যা গোপন রাখে, তা আরও গুরুতর। তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি, যদি তোমরা অনুধাবন করো।'
ইমাম কুরতুবি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
‘আল-বিতানাতু শব্দটি মাসদার। একবচন ও বহুবচন উভয়ের জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বিতানাতুর রাজুলি এর অর্থ হলো, মানুষের এমন সব ঘনিষ্ঠজন, যারা তার কথা গোপন রাখে। ...আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে মুমিনদের নিষেধ করেছেন কাফির, ইহুদি ও প্রবৃত্তিপূজারিদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুপ্রবেশকারী বানানো থেকে, যাদের ওপর তারা (মুসলমানরা) নিজেদের সিদ্ধান্তের ভার সোপর্দ করে এবং নিজেদের সকল বিষয়ে তাদের প্রতিই নির্ভর করে। বলা হয়, যে ব্যক্তি তোমার দ্বীন ও নীতিবিরোধী তার সাথে কোনো কথা শেয়ার করতে নেই। কবি বলেন, “ব্যক্তি সম্পর্কে নয়; বরং তার বন্ধু সম্পর্কে শোধাও। কেননা, প্রত্যেক বন্ধু তার সঙ্গীরই অনুগামী হয়।”’
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
'মানুষ তার বন্ধুর নীতির ওপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।'
এরপর ইমাম কুরতুবি তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন :
'এরপর তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বলার কারণ আল্লাহ তাআলা এভাবে বর্ণনা করছেন লা ইয়ালুনাকুম খাবালান “তারা তোমাদের অকল্যাণ সাধনে কোনো ত্রুটি করবে না।” অর্থাৎ তোমাদেরকে তারা ফাসাদে না ফেলে ছাড়বে না। তারা বাহ্যত যদিও তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে, কিন্তু তোমাদেরকে ধোঁকা- প্রতারণায় ফেলতে চেষ্টার কমতি করবে না।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুল এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এবং আমার পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়ে থাকো, তবে কেন তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করছ? তোমরা যা গোপন করো এবং যা প্রকাশ করো, তা সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। '
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'পবিত্র এ সুরার প্রথমাংশ অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিল হাতিব বিন আবু বালতাআ-এর ঘটনা। '
ঘটনাটি ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে সহিহ সনদে আলি থেকে বর্ণনা করেছেন। আলি বলেন:
'রাসুলুল্লাহ আমাকে, জুবাইরকে ও মিকদাদকে কোথাও পাঠানোর উদ্দেশে বললেন, এখনই বের হয়ে রওজায়ে খাখ নামক স্থানে চলে যাও। সেখানে একজন উষ্ট্রারোহী নারীকে পাবে, যার কাছে একটি চিঠি আছে। তার কাছ থেকে তা নিয়ে এসো। আমরা ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত বেগে রওয়ানা হলাম এবং রওজায়ে খাখে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে সেই উষ্ট্রারোহী নারীকে পেয়ে গেলাম। আমরা বললাম, চিঠি বের করো। সে বলল, আমার কাছে কোনো চিঠি নেই। আমরা বললাম, হয় চিঠি বের করো, নয়তো আমরা কাপড় খুলে তল্লাশি করব। আলি বলেন, তখন সে তার মাথার ঝুঁটি থেকে চিঠিটি বের করে দিল। আমরা চিঠি নিয়ে রাসুলুল্লাহ এর কাছে ফিরে এলাম। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, “হাতিব বিন আবু বালতাআর পক্ষ থেকে মক্কার কয়েকজন মুশরিকের প্রতি।” তাতে তিনি রাসুলুল্লাহ এর কিছু গোপন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের জানিয়ে দিয়েছেন।
তখন রাসুলুল্লাহ তাঁকে বললেন, হাতিব, এটা কী? তিনি বললেন, আমার ব্যাপারে জলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কুরাইশ বংশের ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তবে আসল কুরাইশ ছিলাম না। আপনার সাথে যে সকল মুহাজির আছেন, মক্কায় তাঁদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা তাঁদের পরিবার-পরিজনকে সুরক্ষা দেয়। যেহেতু তাদের সাথে আমার কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই আমি চাইছিলাম যে, পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর জন্য তাদের সাথে এমন সম্পর্ক করি। আমি কুফরি কিংবা দ্বীন পরিত্যাগ করে এ কাজ করিনি আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি।
রাসুলুল্লাহ সব শুনে বললেন, নিশ্চয়ই সে তোমাদের সত্য বলেছে। উমর বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসুলুল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরি সাহাবিদের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন, তোমরা যা-ই ইচ্ছা করো। কারণ, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। '
এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন সংবাদ সরবরাহ করা কুফরি। তবে পার্থিব উদ্দেশ্যে হলে তা কুফরি হবে না; বরং তা হবে কবিরা গুনাহ। এ জন্যই হাতিব বিন আবু বালতাআ -এর ওপর আল্লাহর রাসুল কুফরির হুকুম আরোপ করেননি। যেহেতু তিনি পার্থিব একটি উদ্দেশ্যে কাজটি করেছিলেন। উমর ভেবেছিলেন, তিনি মুসলমানদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এমনটা করেছেন; এ জন্য তিনি তাঁকে হত্যা করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল তাঁকে এ জন্য শান্ত করলেন যে, পার্থিব উদ্দেশ্যে এমন করায় কাজটি কুফরি হয়ে সে মুরতাদ হয়ে যায়নি যে, তাকে হত্যা করতে হবে; বরং এটা কবিরা গুনাহ হয়েছে। এটা কবিরা গুনাহ হলেও হাতিব যেহেতু বদরি সাহাবি, তাই আল্লাহর ঘোষণা অনুসারে তার এ গুনাহও মাফ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এ ঘটনায় হাতিব বদরি সাহাবি হওয়ায় ক্ষমা পেয়ে গেছেন। নইলে এমন অপরাধের জন্য ইসলামি শরিয়তে আলাদা শাস্তির বিধান আছে, যা রাষ্ট্রপ্রধান অপরাধের মাত্রা বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন করবেন। মোটকথা, প্রমাণ হলো যে, মুসলমানদের ক্ষতির উদ্দেশ্যে বা কাফিরদের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে বা ইসলামের পরাজয় ঘটানোর উদ্দেশ্যে কাফিরদের নিকট মুসলমানদের গোপন তথ্য সরবরাহ করা কুফর। আর শুধু পার্থিব উদ্দেশ্যে হলে তা কবিরা গুনাহ বলে বিবেচিত হবে।
টিকাঃ
১৫৩. সুরা আলি ইমরান : ১১৮
১৫৪. তাফসিরুল কুরতুবি: ৪/১৭৮ (আল-মাকতাবাতুল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১৫৫. সুনানু আবি দাউদ: ৪/২৫৯, হা. নং ৪৮৩৩ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) -হাদিসটি হাসান।
১৫৬. তাফসিরুল কুরতুবি: ৪/১৭৯ (আল-মাকতাবাতুল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১৫৭. সুরা আল-মুমতাহিনা: ০১
১৫৮. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/১১১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৫৯. মুসনাদু আহমাদ : ২/৩৭-৩৮, হা. নং ৬০০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
📄 ৬. কাফির ও তাগুতদের কাছে বিচার চাওয়া
মানবরচিত আইন প্রণয়নকারী ও প্রয়োগকারী তাগুতদের কাছে বিচার চাওয়া এবং এ বিচারব্যবস্থাকে শ্রদ্ধার নজরে দেখা শরিয়তে মুহাম্মাদির প্রতি স্পষ্ট অবমাননা ও অস্বীকৃতির নামান্তর। সাধারণ অবস্থায় এ পদ্ধতিতে বিচারকারী ও বিচারপ্রার্থী উভয়ে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে। বিচারকারীর মুরতাদ হওয়ার বিষয়টি তো পরিষ্কার। কেননা, সে এটাকে শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে এবং সকল আইনের বিপরীতে একমাত্র সঠিক ও আমলযোগ্য বলে বিশ্বাস করে। বিচারপ্রার্থীও যদি এমন বিশ্বাস রাখে, তাহলে সেও মুরতাদ। তবে হ্যাঁ, যদি কেউ এ ব্যবস্থাকে ভুল বলে স্বীকার করে, অন্তরে এর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং শরিয়তের আইনকেই সঠিক ও একমাত্র আমলযোগ্য মনে করে, তাহলে এসব মানবরচিত আইনের আশ্রয় নেওয়া কুফরি হবে না; বরং হারাম ও কবিরা গুনাহ হবে। কোথাও ইসলামি শরিয়ত না থাকলে সেক্ষেত্রে যথাসম্ভব আলিমদের নিকট থেকে শরয়ি ফয়সালা নিয়ে আমল করতে হবে, অন্যথায় সবর করতে হবে। তবে কতিপয় উলামায়ে কিরাম তিনটি শর্তে তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা করার অনুমোদন দিয়েছেন। যথা: একান্ত জরুরত ও বাধ্য হওয়া, অন্তরে এ আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ বিদ্বেষ ও ঘৃণা রাখা এবং শরিয়া অনুসারে ন্যায্য অধিকারের অতিরিক্ত কোনো কিছু গ্রহণ না করা। তবে এতে সন্দেহ নেই যে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাদের কাছে বিচারপ্রার্থী না হয়ে সবর করার মধ্যেই রয়েছে আজিমত; যদিও এতে তার পার্থিব ক্ষতি হোক।
আল্লাহ তাআলা বলেন : 'আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাজিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাজিল হয়েছে, তাতে তারা ইমান এনেছে? তারপরও তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়; অথচ সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়।'
ইমাম বাগাবি এ আয়াতটির শানে নুজুল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
'ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, এ আয়াতটি নাজিল হয়েছে বিশর নামক এক মুনাফিকের ব্যাপারে। তার মাঝে ও এক ইহুদির মাঝে কোনো বিষয়ে বিবাদ ছিল। ইহুদি লোকটি বলল, আমরা মুহাম্মাদ -এর কাছে যাব। আর মুনাফিক বলল, বরং আমরা কাব বিন আশরাফের কাছে যাব। সে-ই ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাগুত বলে নাম দিয়েছেন। কিন্তু ইহুদি লোকটি আল্লাহর রাসুল ছাড়া অন্য কারও কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাল। মুনাফিক লোকটি যখন তার অস্বীকৃতি দেখতে পেল, বাধ্য হয়ে আল্লাহর রাসুল-এর কাছে আসল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ইহুদির পক্ষে ফয়সালা করলেন। তাঁর নিকট থেকে দুজনে যখন বের হলো, মুনাফিক তাকে (ইহুদি লোকটিকে) ধরে বলল, আমাকে উমর -এর কাছে নিয়ে চলো। অতঃপর তারা উমর-এর কাছে এল। ইহুদি বলল, আমি এবং এ লোকটি একটি বিবাদ নিয়ে মুহাম্মাদ -এর কাছে গিয়েছিলোম। অতঃপর তিনি তার বিপরীতে আমার পক্ষে ফয়সালা করলেন। কিন্তু সে এতে সন্তুষ্ট নয়। সে ভাবছে, আপনার কাছে এর বিচার দায়ের করবে। তখন উমর মুনাফিক লোকটিকে বললেন, ঘটনা কি এমনই? মুনাফিক বলল, হ্যাঁ। উমর তাদের বললেন, তোমরা দাঁড়াও, আমি আসছি। অতঃপর উমর ঘরে প্রবেশ করে হাতে তলোয়ার পেঁচিয়ে নিলেন। এরপর ঘর থেকে বের হয়ে এসে মুনাফিক লোকটিকে আঘাত করলে লোকটি নিথর হয়ে গেল। উমর বললেন, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিচারে সন্তুষ্ট হয় না, তার বিচার আমি এভাবেই করি। এরপর এ আয়াতটি নাজিল হলো এবং জিবরাইল বললেন, উমর সত্য ও মিথ্যার মাঝে প্রভেদ সৃষ্টি করেছেন। এ থেকেই তার নাম হয় ফারুক (হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী)।'
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির কথাকে খণ্ডন করা হয়েছে, যে দাবি করে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ও পূর্বের সকল নবির ওপর যা নাজিল করেছেন, সে তাতে বিশ্বাস রাখে, এতদসত্ত্বেও সে বিবাদের ফয়সালার জন্য আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ ব্যতিরেকে অন্য কোথাও যেতে চায়। যেমন আয়াতটির শানে নুজুলের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, এক আনসারি ও এক ইহুদির মাঝে বিবাদ চলছিল। ইহুদি বলতে লাগল, আমার ও তোমার মাঝে মুহাম্মাদ বিচারক। আর সে বলছিল, আমার ও তোমার মাঝে কাব বিন আশরাফ বিচারক। কারও মতে আয়াতটি এক দল মুনাফিকের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে, যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করত। তারা জাহিলিয়াতের যুগের বিচারকদের নিকট বিচার প্রার্থনার ইচ্ছা করেছিল। এ ছাড়াও (শানে নুজুলের ব্যাপারে) আরও মত রয়েছে। আয়াতটি এসব ঘটনার চেয়ে আরো ব্যাপকতা বুঝায়। কেননা, আয়াতটি প্রত্যেক ওই ব্যক্তির নিন্দা করেছে, যে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে বাতিলের নিকট বিচার প্রার্থনা করেছে। এখানে তাগুত বলতে এটাই উদ্দেশ্য। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়।”'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'তারা কি জাহিলিয়াতের বিধিবিধান কামনা করে? আর দৃঢ়বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা আর কে আছে?'
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'আল্লাহ তাআলা ওই সব লোকদের প্রত্যাখ্যান করেছেন, যারা সব কল্যাণের আধার ও সব অকল্যাণ থেকে বাধাদানকারী আল্লাহর সুদৃঢ় আইন অমান্য করে মানবরচিত চিন্তাধারা, খেয়ালখুশি ও রীতিনীতির দিকে ফিরে যায়, যা শরিয়ার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি; যেমনটি জাহিলি যুগের লোকেরা তাদের খেয়াল ও প্রবৃত্তির ভিত্তিতে রচিত আইনের দ্বারা বিভিন্ন ভ্রান্ত ও জাহালাতপূর্ণ বিচার-আচার করত এবং যেরকমভাবে বর্তমানে মোঙ্গলীয় শাসকরা চেঙ্গিস খানের প্রণীত রাষ্ট্রনীতি দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে, যা তাদের নেতা চেঙ্গিস খানের 'ইয়াসিক' নামক সংবিধান থেকে নেওয়া হয়েছে। 'ইয়াসিক' এটা এমন একটি আইনগ্রন্থ, যা বিভিন্ন ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সেখানে তার নিজস্ব খেয়ালখুশি ও চিন্তাধারারও অনেক আইন সন্নিবেশিত ছিল। এভাবেই এটা তাদের মাঝে অনুসরণীয় একটি সংবিধানরূপে স্বীকৃতি পায়। তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসুল -এর সুন্নাহর ওপর এটাকে প্রাধান্য দেয়। অতএব যে কেউ এমনটা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। তার বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করতে হবে, যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে, অতঃপর কমবেশি কোনো ক্ষেত্রেই শরিয়ার বিধান ছাড়া ফয়সালা করবে না।'
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: 'আল্লাহর তাআলার নিকটে তিন শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে নিকৃষ্ট। এক. হারাম শরিফে অন্যায় ও অপকর্মকারী। দুই. ইসলামি যুগে জাহিলি যুগের আইন-কানুন অন্বেষণকারী। তিন. ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া কারও রক্তপাত দাবিকারী। '
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র ঈসাকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই তারা আদিষ্ট ছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। তারা যা কিছু শরিক করে, তা থেকে তিনি পবিত্র। '
ইমাম তাবারি বলেন :
'আবুল বুখতারি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুজাইফা -কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহর বাণী اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ এর ব্যাপারে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, মনে রেখো, তারা (ইহুদিরা) তাদের (পণ্ডিতদের) উদ্দেশ্যে রোজাও রাখত না এবং তাদের উদ্দেশ্যে নামাজও পড়ত না। কিন্তু তারা (পণ্ডিতরা) যখন তাদের জন্য কোনো জিনিস হালাল করে দিত, তারা তা হালাল বলে মেনে নিত এবং যখন তারা আল্লাহর কোনো হালালকে হারাম করত, তখন তারাও তা হারাম বলে মেনে নিত। আর এটাই ছিল তাদের রব বানানোর স্বরূপ। '
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'যে ব্যক্তি সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ-এর ওপর অবতীর্ণ সুদৃঢ় শরিয়ত বাদ দিয়ে পূর্বের রহিত শরিয়তমতে বিচার কামনা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে যে ব্যক্তি 'ইয়াসাক' (চেঙ্গিস খানের বানানো সংবিধান) অনুসারে বিচার কামনা করে এবং এটাকে শরিয়তের ওপর প্রাধান্য দেয়, তার অবস্থা কী হবে? যে এমনটি করবে, সে মুসলমানদের ইজমার ভিত্তিতে কাফির হয়ে যাবে। '
টিকাঃ
১৬০. সুরা আন-নিসা : ৬০
১৬১. তাফসিরুল বাগাবি: ১/৬৫৫-৬৫৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
১৬২. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/৩০৫ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্য, বৈরুত)
১৬৩. সুরা আল-মায়িদা: ৫০
১৬৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১১৯ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্য, বৈরুত)
১৬৫. সহিহুল বুখারি : ৯/৬, হা. নং ৬৮৮২ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
১৬৬. সুরা আত-তাওবা : ৩১
১৬৭. তাফসিরুত তাবারি: ১৪/২০৯ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৬৮. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/১১৯ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ৭. দ্বীনের ব্যাপারে কাফিরদের সাথে নমনীয়তা দেখানো
এখানে নমনীয়তার অর্থ, সৌজন্যবশত কাফিরদের ভ্রান্ত ও ভুল কোনো কাজের ব্যাপারে নীরব থাকা বা সাপোর্ট করা এবং তাদের প্রতি সৌহার্দ্যভাব প্রকাশ করে নমনীয়তা দেখানো। সুতরাং সে কাজটি যদি কুফরি হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানোও কুফরি হবে। যেহেতু কুফরির প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফরির অন্তর্ভুক্ত। আর যদি কাজটি কুফরি না হয়ে নাজায়িজ কিছু হয়, তাহলে নমনীয়তা দেখানো নাজায়িজ হবে। মোটকথা, কাফিরের কাজের ধরন অনুসারে মুসলমানের নমনীয়তার ওপর হুকুম আরোপিত হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
( وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ )
'তারা চায়, যদি আপনি নমনীয় হোন, তাহলে তারাও নমনীয় হবে।'
ইমাম তাবারি বলেন:
দুটি মত হতে অধিক বিশুদ্ধ মত হলো, যারা বলেন, “আয়াতটির অর্থ হলো, ওই সকল মুশরিক কামনা করে, হে মুহাম্মাদ, আপনি যদি তাদের মাবুদদের প্রতি নরম হয়ে তাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে আপনার দ্বীনের বিষয়ে একটু নমনীয়তা দেখান, তাহলে তারাও আপনার মাবুদের ইবাদতের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাবে।” যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যদি আমি আপনাকে দৃঢ়পদ না রাখতাম, আপনি তাদের প্রতি কিছুটা ঝুঁকেই পড়তেন। তখন অবশ্যই আমি আপনাকে ইহজীবনে দ্বিগুন ও পরজীবনে দ্বিগুন শাস্তি আস্বাদন করাতাম। এ সময় আপনি আমার বিপরীতে কোনো সাহায্যকারী পেতেন না।” [সুরা বনি ইসরাইল : ৭৪-৭৫] শব্দটি الدُّهْنِ (তেল) থেকে নির্গত হয়েছে। কথার নমনীয়তাকে তেলের তরলতার সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
﴿ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ﴾
'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। আর তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।'
ইমাম তাবারি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
আল্লাহ তাআলা বলেন, মুহাম্মাদ হলেন আল্লাহর রাসুল। আর অনুসারী সঙ্গীগণ, যারা তাঁর সাথে তাঁর দ্বীনের ওপর আছেন—তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর, তাদের ব্যাপারে তাঁদের অন্তর শক্ত ও দয়ার পরিমাণ সীমিত। “নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।” আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের অন্তর একে অপরের জন্য নরম, কোমল ও সহজ।
এখানে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে, মুমিনগণ নিজেদের মধ্যে তো খুবই সহনশীল ও নরমদিল হবে, একে অপরের প্রতি সহায়তাপরায়ণ হবে এবং নিজেদের মধ্যে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখবে। কিন্তু কাফিরদের ব্যাপারে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো হবে। তাদের সাথে কোনো বিষয়ে নরমি ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখা যাবে না। বিশেষত দ্বীনের বিষয়ে ছাড় দেওয়া বা নমনীয়ভাব দেখানোর ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই।
টিকাঃ
১৬৯. সুরা আল-কলাম : ০৯
১৭০. তাফসিরুত তাবারি: ২৩/৫৩৪ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৭১. সুরা আল-ফাতহ : ২৯
১৭২. তাফসিরুত তাবারি: ২২/২৬১ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
📄 ৮. দ্বীন নিয়ে হাসিঠাট্টা ও বিরোধিতার মজলিসে বসা
দ্বীন নিয়ে ঠাট্টার মজলিস বলতে সাধারণ মজলিসও হতে পারে, অনুরূপ তাগুতদের আইনসভা বা সংসদও হতে পারে, যেখানে আল্লাহর দ্বীন নিয়ে মশকরা করা হয়, ইসলামের বিধানের ব্যাপারে কটুক্তি করা হয় এবং শরিয়তের হুকুমের বিরোধিতা করা হয়। এসব মজলিসে অংশগ্রহণ করে দ্বীনের ব্যাপারে ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা বিরোধিতা করতে দেখলে অবশ্যই তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং স্থান ত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তাদের কথায় মৌন সমর্থন থাকায়, তাদের মতো সে-ও কাফির হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكিতাবِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذَا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا
'কিতাবে তোমাদের প্রতি তিনি নাজিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে, আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু করে, তোমরা তাদের সাথে বসবে না। নয়তো তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে। নিশ্চয় মুনাফিক ও কাফির সবাইকে আল্লাহ জাহান্নামে একত্র করবেন।'
ইমাম বাগাবি বলেন:
যদি তোমরা কাফিরদের সাথে বসো, যে সময়ে তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে অশালীন কথাবার্তা ও বিদ্রুপ করছে এবং তোমরা তাতে সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে তোমরাও তাদের মতো কাফির বলে গণ্য হবে। আর যদি তারা অন্য কথায় লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের সাথে বসা অনুত্তম হলেও এতে কোনো সমস্যা নেই।
টিকাঃ
১৭৩. সুরা আন-নিসা: ১৪০
১৭৪. তাফসিরুল বাগাবি: ১/৭১৪ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)