📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৩. মুসলমানদের বিপরীতে কাফিরদের সাহায্য করা

📄 ৩. মুসলমানদের বিপরীতে কাফিরদের সাহায্য করা


যদি কোনো মুসলিম কাফিরদের সাথে মিলে বা জোটবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এ জন্য যুদ্ধ করে যে, তারা মুসলিম কিংবা এ জন্য যে, তারা ইসলামের বিশেষ কোনো বিধান পালন করছে এবং তাদের জেতানোর জন্য সামরিক বা আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তাদের প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা দুনিয়াতে অসহায় ছিলাম। তারা প্রত্যুত্তরে বলেন, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে? এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস! তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও পায় না, আল্লাহ অচিরেই তাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। '

ইমাম কুরতুবি বলেন:
'এখানে উদ্দেশ্য মক্কার ওই সব লোক, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং রাসুলুল্লাহ -এর প্রতি ইমানও এনেছিল। অতঃপর যখন নবি হিজরত করলেন, তখন তারা নিজেদের গোত্রের লোকদের সাথে রয়ে গেল। এদের মধ্যে অনেককে পরীক্ষায় ফেলা হলে তারা ফিতনায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর যখন বদর যুদ্ধের সময় হলো, তাদের মধ্য হতে একদল লোক কাফিরদের সাথে (মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করার জন্য) বের হলো। তখন এ আয়াত নাজিল হয়। '

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে ইমানদারগণ, তোমরা মুসলমানদের বাদ দিয়ে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কি এমনটি করে আল্লাহর কাছে নিজেদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য দলিল স্থাপন করতে চাও?'

ইমাম তাবারি উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'আল্লাহ তাআলা তাদের বলছেন, ওহে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনয়নকারী লোকসকল, তোমরা কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তোমাদের স্বজাতি ও দ্বীনি ভাই মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করো না। ফাতাকুনু কাম্মান আউযাবা লাহুন নারু মিনাল মুনাফিকিনা।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পথপ্রদর্শন করেন না। বস্তুত, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, আপনি তাদের দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই (ইহুদি-খ্রিষ্টানদের) মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন; ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য অনুতপ্ত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরাই কি সেসব লোক, যারা আল্লাহর নামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করত যে, আমরা তোমাদের সাথেই আছি? তাদের কৃতকর্মসমূহ নষ্ট হয়ে গেছে; ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে।'

ইমাম তাবারি বলেন:
'আমাদের মতে, এ ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সমস্ত মুমিনকে নিষেধ করেছেন, তারা যেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনয়নকারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে ইহুদি- খ্রিষ্টানদের সাহায্যকারী ও মিত্র না বানায়। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ, রাসুল ও মুমিনদের বাদ দিয়ে তাদেরকে মিত্র ও সাহায্যকারী বানাবে—সে আল্লাহ, রাসুল ও মুমিনদের বিরোধী শিবিরের লোক। আর আল্লাহ ও রাসুল তার থেকে মুক্ত।'

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন :
“আল্লাহর বাণী ফাতারা আল্লাযিনা ফি কুলুবিহিম মারাদুন “যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তাদের আপনি দেখবেন।” অর্থাৎ (যাদের অন্তরে) সন্দেহ, সংশয় ও কপটতা রয়েছে। ইউসারিউনা ফিহিম “দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে।” অর্থাৎ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে তাদের বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার জন্য দৌড়ঝাঁপ করে। ইয়াকুলুনা নাখশা আন তুসিবানা দাইরাতুন “তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই।” অর্থাৎ তাদের বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার কারণ ব্যাখ্যা করে বলে, তারা ভয় করছে যে, কাফিররা যদি মুসলমানদের ওপর বিজয় লাভ করে, তখন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে তাদের একটা অবস্থান হওয়ায় উপকৃত হবে।'

আল্লাহ তাআলা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারীদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম অবধারিত করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আপনি তাদের অনেককে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন। কতই না নিকৃষ্ট তাদের কৃতকর্ম। যে কারণে তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল শাস্তি পেতে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও নবির প্রতি এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত; তবে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই ফাসিক।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'যাঁরা ইমান এনেছে, হিজরত করেছে, স্বীয় জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে এবং যাঁরা তাঁদেরকে আশ্রয় ও সাহায্য সহায়তা দিয়েছে, তাঁরা একে অপরের বন্ধু। আর যারা ইমান এনেছে, কিন্তু হিজরত করেনি, তোমাদের জন্য তাদের অভিভাবকত্বের কোনো দায়িত্ব নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরত করে। অবশ্য যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে, তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তোমাদের সাথে যাদের চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নয়। বস্তুত, তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সেসবই দেখেন। আর যারা কাফির তারা একে অপরের বন্ধু। তোমরা যদি উক্ত ব্যবস্থা কার্যকর না করো, তবে ফিতনা বিস্তার লাভ করবে এবং বড়ই বিপর্যয় দেখা দেবে। আর যাঁরা ইমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে এবং যাঁরা তাঁদের আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য-সহায়তা করেছে, তাঁরাই হলো প্রকৃত মুমিন। তাঁদের জন্য রয়েছে, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। আর যাঁরা ইমান এনেছে পরবর্তী পর্যায়ে এবং হিজরত করেছে এবং তোমাদের সাথে মিলে জিহাদ করেছে, তাঁরাও তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। যারা আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পর বেশি হকদার। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত। '

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন :
'আল্লাহ তাআলা বলেন, ওয়াইনিস তানসারুকুম “তারা যদি তোমাদের সহায়তা কামনা করে।” যেসব লোক হিজরত করে কাফিরদের সঙ্গ নিয়ে যুদ্ধ করতে যায়নি, তারা যদি সাহায্য কামনা করে, তাদের সাহায্য করো। তাদের সাহায্য করা ওয়াজিব। কারণ, তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। তবে তারা যদি এমন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য চায়, যাদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদে তোমাদের চুক্তি রয়েছে, তখন তোমরা তোমাদের দায় ও চুক্তি ভঙ্গ করবে না। এটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। '

ইমাম কুরতুবি বলেন :
'আল্লাহর বাণী “ওয়াইনিস তানসারুকুম ফিদ দ্বীনি যদি তারা ধর্মীয় ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে” এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দারুল হারব থেকে হিজরত করতে অক্ষম মুমিনরা যদি তোমাদের কাছে সৈন্যপ্রেরণ বা সম্পদ সাহায্য চায়, তাহলে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও। এটি তোমাদের ওপর ফরজ। অতএব, তোমরা তাদের নিরাশ করবে না। তবে তারা যদি এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করে, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি আছে, তখন সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি ভঙ্গ করবে না। ইবনুল আরাবি বলেন, কিন্তু তারা (সাহায্য প্রার্থনাকারী মুমিনরা) যদি দুর্বল বন্দী হয় (তাহলে কাফিরদের সাথে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বন্দীদের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকা যাবে না)। কেননা, মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রাখা এবং তাদের সাহায্য করা ওয়াজিব। এমনকি অভিযান চালিয়ে তাদের মুক্ত করার সম্ভাবনা থাকলে, তাদের মুক্ত করার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে বা তাদের মুক্ত করতে টাকার প্রয়োজন হলে সব টাকা খরচ করে হলেও তাদের মুক্ত করতে হবে। এমনকি এর জন্য মুমিনদের কাছে অতিরিক্ত এক দিরহামও যেন অবশিষ্ট না থাকে। ইমাম মালিক ও সমস্ত আলিম এমনই বলেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! কত নীচু তাদের চরিত্র, যাদের ভাইয়েরা আজ দুশমনের কারাগারে বন্দী; অথচ তাদের হাতে রয়েছে সম্পদের খাজানা, তাদের রয়েছে শক্তি-সামর্থ্য, তারা সংখ্যায় যথেষ্ট, তাদের রয়েছে সেনাবাহিনী, রয়েছে অস্ত্র-শস্ত্র।'

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা পরস্পরে একে অপরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এদের ওপর আল্লাহ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন :
'মুনাফিকদের গর্হিত গুণাবলি বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা ও গুণাবলি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “ইমানদার পুরুষরা ও ইমানদার নারীরা পরস্পরে একে অপরের বন্ধু” অর্থাৎ একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। যেমন সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, “মুমিনগণ পরস্পর একটি প্রাসাদের ন্যায়, যার একাংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। এই বলে রাসুল এক হাতের আঙুলগুলো অপর হাতের আঙুলে প্রবেশ করালেন।” [সহিহুল বুখারি: ৪৮১] বুখারির অন্য একটি বর্ণনায় আরও এসেছে, “পরস্পর মহব্বত, দয়া ও অনুগ্রহের ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ একটি দেহের ন্যায়। যখন তার এক অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন তার পুরো দেহ বিনিদ্রা ও জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ে।” [সহিহুল বুখারি : ৬০১১] '

ইমাম ইবনে হাজাম বলেন:
'যে ব্যক্তি নিকটবর্তী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বেচ্ছায় দারুল কুফরে যোদ্ধা হিসেবে চলে যায়, সে তার এই অপরাধের কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। তার ওপর মুরতাদের সব হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেমন, গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে তাকে হত্যা করা, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি।'

টিকাঃ
১৩০. সুরা আন-নিসা : ৯৭-৯৯
১৩১. তাফসিরুল কুরতুবি : ৫/৩৪৫ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১৩২. সুরা আন-নিসা : ১৪৪
১৩৩. তাফসিরুত তাবারি : ৯/৩৩৬ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৩৪. সুরা আল-মায়িদা: ৫১-৫৩
১৩৫. তাফসিরুত তাবারি: ১০/৩৯৮ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৩৬. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১২০-১২১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৩৭. সুরা আল-মায়িদা: ৮০-৮১
১৩৮. সুরা আল-আনফাল: ৭২-৭৫
১৩৯. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/৮৫-৮৬ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৪০. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/৫৭ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১৪১. সুরা আত-তাওবা: ৭১
১৪২. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/১৫৩-১৫৪ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৪৩. আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম: ১২/১২৫-১২৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৪. কাফিরদের নিঃশর্ত আনুগত্য করা

📄 ৪. কাফিরদের নিঃশর্ত আনুগত্য করা


এর ব্যাখ্যা হলো, তারা তাকে যা করতে বলে, সে তা-ই করে। প্রতিটি আদেশই সে মান্য করে চলে; এমনকি কুফরি হলেও সে কোনো পরোয়া করে না। যার অবস্থা এমন হবে, সে নিশ্চিতই ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কেননা, কাফির মাত্রই তাকে কুফরির আদেশ করবে। আর বাস্তবে এমন কোনো আদেশ না করলেও সে তা মানার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাই তার কুফরির জন্য যথেষ্ট।

আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ إِنَّ اللَّهَ কَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴾ ‘হে নবি, আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’

আল্লামা সাদি বলেন : ‘অতএব, আপনি কোনো কাফিরেরই অনুসরণ করবেন না, যে কিনা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে শত্রুতা প্রকাশ করে। আর অনুসরণ করবেন না কোনো মুনাফিকের, যে কিনা তার অস্বীকৃতি ও কুফর গোপন রেখে তার বিপরীতটা প্রকাশ করে। এরাই প্রকৃত দুশমন। সুতরাং কিছু বিষয়ে তাদের অনুসরণ করবেন না, যা তাকওয়া বিনষ্ট করে দেয় এবং তার পরিপন্থী হয়; যদ্দরুন তারা আপনাকে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে।’

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য করো, তবে তারা তোমাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে; ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।'

ইমাম তাবারি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
'আল্লাহ তাআলা এ আয়াত দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন, হে ওই সকল লোক, যারা আল্লাহর ওয়াদা ও ভীতিপ্রদর্শন, তাঁর আদেশ ও নিষেধের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সত্যায়ন করে, তোমরা যদি কাফিরদের অনুসরণ করো অর্থাৎ ওই সব লোকের, যারা তোমাদের নবি মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াত অস্বীকার করেছে, যেমন ইহুদি- খ্রিষ্টানরা, তাদের কৃত আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে যদি তোমরা তাদের কথা মেনে চলো এবং তাদেরকে তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী ভেবে তাদের উপদেশ গ্রহণ করো, তবে তারা তোমাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, তারা তোমাদের ইমান আনার পর মুরতাদ হয়ে যেতে এবং ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর আয়াতসমূহ অস্বীকার করতে প্ররোচিত করবে। যদ্দরুন তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, এতে করে আল্লাহ তোমাদের যে দ্বীন ও ইমানের পথ প্রদর্শন করেছিলেন, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। “ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে” অর্থ ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমরা নিজেদের ক্ষতির মধ্যে ফেলেছ, তোমাদের দ্বীন থেকে সরে পড়েছ এবং তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টি ধ্বংস হয়েছে। এদ্বারা আল্লাহ মুমিনদেরকে কাফিরদের মতামত মানা এবং ধর্মের ক্ষেত্রে তাদের উপদেশ গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। '

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'নিশ্চয়ই যারা নিজেদের নিকট সৎপথ স্পষ্ট হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্য তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এ জন্য যে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে, তারা তাদের বলে, “আমরা কোনো কোনো বিষয়ে তোমাদের কথা মান্য করব।” আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি সম্বন্ধে অবগত আছেন। ফেরেশতা যখন তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে প্রাণ হরণ করবে, তখন তাদের কেমন দশা হবে? এটা এ জন্য যে, তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করে, যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অপ্রিয় গণ্য করে; ফলে তিনি তাদের কর্মসমূহ ব্যর্থ করে দেন। '

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আপনি কি দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাজিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাজিল হয়েছে, তাতে তারা ইমান এনেছে, তারপরও তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়? অথচ সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদের ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। '

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির কথাকে খণ্ডন করা হয়েছে, যে দাবি করে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ও পূর্বের সকল নবির ওপর যা নাজিল করেছেন, সে তাতে বিশ্বাস রাখে, এতদসত্ত্বেও সে বিবাদের ফয়সালার জন্য আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ ব্যতিরেকে অন্য কোথাও যেতে চায়। যেমন আয়াতটির শানে নুজুলের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন আনসারি ও ইহুদির মাঝে বিবাদ চলছিল। ইহুদি লোকটি বলল, আমরা মুহাম্মাদ -এর কাছে যাব। আর মুনাফিক বলল, বরং আমরা কাব বিন আশরাফের কাছে যাব। সে-ই ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাগুত বলে নাম দিয়েছেন। কিন্তু ইহুদি লোকটি আল্লাহর রাসুল ছাড়া অন্য কারও কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাল। মুনাফিক লোকটি যখন তার অস্বীকৃতি দেখতে পেল, বাধ্য হয়ে আল্লাহর রাসুল-এর কাছে আসল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ইহুদির পক্ষে ফয়সালা করলেন। '

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন :
'অতএব, যে ব্যক্তি অহংকারবশত অন্যের কথা মেনে আল্লাহর কিছু ইবাদত থেকে বিরত থাকল সে এ ক্ষেত্রে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এর বক্তব্য বাস্তবায়ন করল না। এরাই ওই সকল লোক, যারা তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে; এ কারণে যে, আল্লাহর হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ক্ষেত্রে তারা তাদের আনুগত্য করেছে। এরা দুধরনের লোক। এক. যারা এ কথা জানবে যে, কাফিররা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলেছে আর তারা এ পরিবর্তন মেনে নিয়েই তাদের অনুসরণ করছে; যদ্দরুন তাদের নেতাদের অনুসরণে তারা আল্লাহর হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম বলে বিশ্বাস করছে; অথচ তাদের জানা আছে, তারা রাসুলুল্লাহ -এর আনীত দ্বীনের বিরোধিতা করেছে, তাহলে এটা হবে কুফর, যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল শিরক বলে অভিহিত করেছেন। যদিও তারা তাদের উদ্দেশ্যে সালাত বা সিজদা করে না। অতএব, যে ব্যক্তি জেনেশুনে দ্বীনের বিপরীতে অন্য কারও অনুসরণ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিবর্তে তার কথা শুনবে, সে তাদের মতোই মুশরিক হয়ে যাবে। দুই. আল্লাহর হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম বলে যাদের বিশ্বাস ঠিক থাকবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তারা তাদের অনুসরণ করে, যেমন কোনো মুসলিম গুনাহকে গুনাহ বিশ্বাস করেই গুনাহ করে থাকে, তাহলে তাদের বিধান অন্যান্য গুনাহগারদের মতোই হবে।'

টিকাঃ
১৪৪. সুরা আল-আহজাব : ০১
১৪৫. তাফসিরুস সাদি : পৃ. নং ৬৫৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৪৬. সুরা আলি ইমরান : ১৪৯
১৪৭. তাফসিরুত তাবারি: ৭/২৭৬ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৪৮. সূরা মুহাম্মাদ: ২২-৩১
১৪৯. সুরা আন-নিসা : ৬০
১৫০. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/৩০৫ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্য, বৈরুত)
১৫১. এখানে আরবি ভাষ্যে লিপিকারদের থেকে শব্দগত কিছু ভুল হয়ে গেছে। অর্থাৎ 'হালাল' এর জায়গায় 'হারাম' আর 'হারাম' এর জায়গায় 'হালাল' চলে এসেছে। অনেক প্রাজ্ঞ আলেম এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তাই অনুবাদের মধ্যে আমরা সঠিক অনুবাদটিই করে দিয়েছি।
১৫২. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ৭/৭০ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৫. কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য ফাঁস করা

📄 ৫. কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য ফাঁস করা


কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য ও দুর্বল কোনো দিক ফাঁস করা স্পষ্ট কুফর। কেননা, এতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সাব্যস্ত হয়, যার কারণে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যায়। তবে যদি কেউ মুসলামানদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং পার্থিব কোনো স্বার্থ বা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এমনটা করে, তবে তা কুফর হবে না ঠিক, তবে এতে মারাত্মক কবিরা গুনাহ হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের অনিষ্ট করতে ত্রুটি করবে না। তারা তা-ই কামনা করে, যা তোমাদের বিপন্ন করে। তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায় এবং তাদের হৃদয় যা গোপন রাখে, তা আরও গুরুতর। তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি, যদি তোমরা অনুধাবন করো।'

ইমাম কুরতুবি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
‘আল-বিতানাতু শব্দটি মাসদার। একবচন ও বহুবচন উভয়ের জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বিতানাতুর রাজুলি এর অর্থ হলো, মানুষের এমন সব ঘনিষ্ঠজন, যারা তার কথা গোপন রাখে। ...আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে মুমিনদের নিষেধ করেছেন কাফির, ইহুদি ও প্রবৃত্তিপূজারিদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুপ্রবেশকারী বানানো থেকে, যাদের ওপর তারা (মুসলমানরা) নিজেদের সিদ্ধান্তের ভার সোপর্দ করে এবং নিজেদের সকল বিষয়ে তাদের প্রতিই নির্ভর করে। বলা হয়, যে ব্যক্তি তোমার দ্বীন ও নীতিবিরোধী তার সাথে কোনো কথা শেয়ার করতে নেই। কবি বলেন, “ব্যক্তি সম্পর্কে নয়; বরং তার বন্ধু সম্পর্কে শোধাও। কেননা, প্রত্যেক বন্ধু তার সঙ্গীরই অনুগামী হয়।”’

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
'মানুষ তার বন্ধুর নীতির ওপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।'

এরপর ইমাম কুরতুবি তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন :
'এরপর তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বলার কারণ আল্লাহ তাআলা এভাবে বর্ণনা করছেন লা ইয়ালুনাকুম খাবালান “তারা তোমাদের অকল্যাণ সাধনে কোনো ত্রুটি করবে না।” অর্থাৎ তোমাদেরকে তারা ফাসাদে না ফেলে ছাড়বে না। তারা বাহ্যত যদিও তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে, কিন্তু তোমাদেরকে ধোঁকা- প্রতারণায় ফেলতে চেষ্টার কমতি করবে না।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুল এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এবং আমার পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়ে থাকো, তবে কেন তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করছ? তোমরা যা গোপন করো এবং যা প্রকাশ করো, তা সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। '

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'পবিত্র এ সুরার প্রথমাংশ অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিল হাতিব বিন আবু বালতাআ-এর ঘটনা। '

ঘটনাটি ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে সহিহ সনদে আলি থেকে বর্ণনা করেছেন। আলি বলেন:
'রাসুলুল্লাহ আমাকে, জুবাইরকে ও মিকদাদকে কোথাও পাঠানোর উদ্দেশে বললেন, এখনই বের হয়ে রওজায়ে খাখ নামক স্থানে চলে যাও। সেখানে একজন উষ্ট্রারোহী নারীকে পাবে, যার কাছে একটি চিঠি আছে। তার কাছ থেকে তা নিয়ে এসো। আমরা ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত বেগে রওয়ানা হলাম এবং রওজায়ে খাখে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে সেই উষ্ট্রারোহী নারীকে পেয়ে গেলাম। আমরা বললাম, চিঠি বের করো। সে বলল, আমার কাছে কোনো চিঠি নেই। আমরা বললাম, হয় চিঠি বের করো, নয়তো আমরা কাপড় খুলে তল্লাশি করব। আলি বলেন, তখন সে তার মাথার ঝুঁটি থেকে চিঠিটি বের করে দিল। আমরা চিঠি নিয়ে রাসুলুল্লাহ এর কাছে ফিরে এলাম। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, “হাতিব বিন আবু বালতাআর পক্ষ থেকে মক্কার কয়েকজন মুশরিকের প্রতি।” তাতে তিনি রাসুলুল্লাহ এর কিছু গোপন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের জানিয়ে দিয়েছেন।

তখন রাসুলুল্লাহ তাঁকে বললেন, হাতিব, এটা কী? তিনি বললেন, আমার ব্যাপারে জলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কুরাইশ বংশের ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তবে আসল কুরাইশ ছিলাম না। আপনার সাথে যে সকল মুহাজির আছেন, মক্কায় তাঁদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা তাঁদের পরিবার-পরিজনকে সুরক্ষা দেয়। যেহেতু তাদের সাথে আমার কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই আমি চাইছিলাম যে, পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর জন্য তাদের সাথে এমন সম্পর্ক করি। আমি কুফরি কিংবা দ্বীন পরিত্যাগ করে এ কাজ করিনি আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি।

রাসুলুল্লাহ সব শুনে বললেন, নিশ্চয়ই সে তোমাদের সত্য বলেছে। উমর বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসুলুল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরি সাহাবিদের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন, তোমরা যা-ই ইচ্ছা করো। কারণ, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। '

এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কাফিরদের কাছে মুসলমানদের গোপন সংবাদ সরবরাহ করা কুফরি। তবে পার্থিব উদ্দেশ্যে হলে তা কুফরি হবে না; বরং তা হবে কবিরা গুনাহ। এ জন্যই হাতিব বিন আবু বালতাআ -এর ওপর আল্লাহর রাসুল কুফরির হুকুম আরোপ করেননি। যেহেতু তিনি পার্থিব একটি উদ্দেশ্যে কাজটি করেছিলেন। উমর ভেবেছিলেন, তিনি মুসলমানদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এমনটা করেছেন; এ জন্য তিনি তাঁকে হত্যা করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল তাঁকে এ জন্য শান্ত করলেন যে, পার্থিব উদ্দেশ্যে এমন করায় কাজটি কুফরি হয়ে সে মুরতাদ হয়ে যায়নি যে, তাকে হত্যা করতে হবে; বরং এটা কবিরা গুনাহ হয়েছে। এটা কবিরা গুনাহ হলেও হাতিব যেহেতু বদরি সাহাবি, তাই আল্লাহর ঘোষণা অনুসারে তার এ গুনাহও মাফ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এ ঘটনায় হাতিব বদরি সাহাবি হওয়ায় ক্ষমা পেয়ে গেছেন। নইলে এমন অপরাধের জন্য ইসলামি শরিয়তে আলাদা শাস্তির বিধান আছে, যা রাষ্ট্রপ্রধান অপরাধের মাত্রা বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন করবেন। মোটকথা, প্রমাণ হলো যে, মুসলমানদের ক্ষতির উদ্দেশ্যে বা কাফিরদের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে বা ইসলামের পরাজয় ঘটানোর উদ্দেশ্যে কাফিরদের নিকট মুসলমানদের গোপন তথ্য সরবরাহ করা কুফর। আর শুধু পার্থিব উদ্দেশ্যে হলে তা কবিরা গুনাহ বলে বিবেচিত হবে।

টিকাঃ
১৫৩. সুরা আলি ইমরান : ১১৮
১৫৪. তাফসিরুল কুরতুবি: ৪/১৭৮ (আল-মাকতাবাতুল মিসরিয়‍্যা, কায়রো)
১৫৫. সুনানু আবি দাউদ: ৪/২৫৯, হা. নং ৪৮৩৩ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) -হাদিসটি হাসান।
১৫৬. তাফসিরুল কুরতুবি: ৪/১৭৯ (আল-মাকতাবাতুল মিসরিয়‍্যা, কায়রো)
১৫৭. সুরা আল-মুমতাহিনা: ০১
১৫৮. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/১১১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৫৯. মুসনাদু আহমাদ : ২/৩৭-৩৮, হা. নং ৬০০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ৬. কাফির ও তাগুতদের কাছে বিচার চাওয়া

📄 ৬. কাফির ও তাগুতদের কাছে বিচার চাওয়া


মানবরচিত আইন প্রণয়নকারী ও প্রয়োগকারী তাগুতদের কাছে বিচার চাওয়া এবং এ বিচারব্যবস্থাকে শ্রদ্ধার নজরে দেখা শরিয়তে মুহাম্মাদির প্রতি স্পষ্ট অবমাননা ও অস্বীকৃতির নামান্তর। সাধারণ অবস্থায় এ পদ্ধতিতে বিচারকারী ও বিচারপ্রার্থী উভয়ে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে। বিচারকারীর মুরতাদ হওয়ার বিষয়টি তো পরিষ্কার। কেননা, সে এটাকে শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে এবং সকল আইনের বিপরীতে একমাত্র সঠিক ও আমলযোগ্য বলে বিশ্বাস করে। বিচারপ্রার্থীও যদি এমন বিশ্বাস রাখে, তাহলে সেও মুরতাদ। তবে হ্যাঁ, যদি কেউ এ ব্যবস্থাকে ভুল বলে স্বীকার করে, অন্তরে এর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং শরিয়তের আইনকেই সঠিক ও একমাত্র আমলযোগ্য মনে করে, তাহলে এসব মানবরচিত আইনের আশ্রয় নেওয়া কুফরি হবে না; বরং হারাম ও কবিরা গুনাহ হবে। কোথাও ইসলামি শরিয়ত না থাকলে সেক্ষেত্রে যথাসম্ভব আলিমদের নিকট থেকে শরয়ি ফয়সালা নিয়ে আমল করতে হবে, অন্যথায় সবর করতে হবে। তবে কতিপয় উলামায়ে কিরাম তিনটি শর্তে তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা করার অনুমোদন দিয়েছেন। যথা: একান্ত জরুরত ও বাধ্য হওয়া, অন্তরে এ আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ বিদ্বেষ ও ঘৃণা রাখা এবং শরিয়া অনুসারে ন্যায্য অধিকারের অতিরিক্ত কোনো কিছু গ্রহণ না করা। তবে এতে সন্দেহ নেই যে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাদের কাছে বিচারপ্রার্থী না হয়ে সবর করার মধ্যেই রয়েছে আজিমত; যদিও এতে তার পার্থিব ক্ষতি হোক।

আল্লাহ তাআলা বলেন : 'আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাজিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাজিল হয়েছে, তাতে তারা ইমান এনেছে? তারপরও তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়; অথচ সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়।'

ইমাম বাগাবি এ আয়াতটির শানে নুজুল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
'ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, এ আয়াতটি নাজিল হয়েছে বিশর নামক এক মুনাফিকের ব্যাপারে। তার মাঝে ও এক ইহুদির মাঝে কোনো বিষয়ে বিবাদ ছিল। ইহুদি লোকটি বলল, আমরা মুহাম্মাদ -এর কাছে যাব। আর মুনাফিক বলল, বরং আমরা কাব বিন আশরাফের কাছে যাব। সে-ই ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাগুত বলে নাম দিয়েছেন। কিন্তু ইহুদি লোকটি আল্লাহর রাসুল ছাড়া অন্য কারও কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাল। মুনাফিক লোকটি যখন তার অস্বীকৃতি দেখতে পেল, বাধ্য হয়ে আল্লাহর রাসুল-এর কাছে আসল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ইহুদির পক্ষে ফয়সালা করলেন। তাঁর নিকট থেকে দুজনে যখন বের হলো, মুনাফিক তাকে (ইহুদি লোকটিকে) ধরে বলল, আমাকে উমর -এর কাছে নিয়ে চলো। অতঃপর তারা উমর-এর কাছে এল। ইহুদি বলল, আমি এবং এ লোকটি একটি বিবাদ নিয়ে মুহাম্মাদ -এর কাছে গিয়েছিলোম। অতঃপর তিনি তার বিপরীতে আমার পক্ষে ফয়সালা করলেন। কিন্তু সে এতে সন্তুষ্ট নয়। সে ভাবছে, আপনার কাছে এর বিচার দায়ের করবে। তখন উমর মুনাফিক লোকটিকে বললেন, ঘটনা কি এমনই? মুনাফিক বলল, হ্যাঁ। উমর তাদের বললেন, তোমরা দাঁড়াও, আমি আসছি। অতঃপর উমর ঘরে প্রবেশ করে হাতে তলোয়ার পেঁচিয়ে নিলেন। এরপর ঘর থেকে বের হয়ে এসে মুনাফিক লোকটিকে আঘাত করলে লোকটি নিথর হয়ে গেল। উমর বললেন, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিচারে সন্তুষ্ট হয় না, তার বিচার আমি এভাবেই করি। এরপর এ আয়াতটি নাজিল হলো এবং জিবরাইল বললেন, উমর সত্য ও মিথ্যার মাঝে প্রভেদ সৃষ্টি করেছেন। এ থেকেই তার নাম হয় ফারুক (হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী)।'

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির কথাকে খণ্ডন করা হয়েছে, যে দাবি করে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ও পূর্বের সকল নবির ওপর যা নাজিল করেছেন, সে তাতে বিশ্বাস রাখে, এতদসত্ত্বেও সে বিবাদের ফয়সালার জন্য আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ ব্যতিরেকে অন্য কোথাও যেতে চায়। যেমন আয়াতটির শানে নুজুলের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, এক আনসারি ও এক ইহুদির মাঝে বিবাদ চলছিল। ইহুদি বলতে লাগল, আমার ও তোমার মাঝে মুহাম্মাদ বিচারক। আর সে বলছিল, আমার ও তোমার মাঝে কাব বিন আশরাফ বিচারক। কারও মতে আয়াতটি এক দল মুনাফিকের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে, যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করত। তারা জাহিলিয়াতের যুগের বিচারকদের নিকট বিচার প্রার্থনার ইচ্ছা করেছিল। এ ছাড়াও (শানে নুজুলের ব্যাপারে) আরও মত রয়েছে। আয়াতটি এসব ঘটনার চেয়ে আরো ব্যাপকতা বুঝায়। কেননা, আয়াতটি প্রত্যেক ওই ব্যক্তির নিন্দা করেছে, যে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে বাতিলের নিকট বিচার প্রার্থনা করেছে। এখানে তাগুত বলতে এটাই উদ্দেশ্য। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়।”'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'তারা কি জাহিলিয়াতের বিধিবিধান কামনা করে? আর দৃঢ়বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা আর কে আছে?'

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'আল্লাহ তাআলা ওই সব লোকদের প্রত্যাখ্যান করেছেন, যারা সব কল্যাণের আধার ও সব অকল্যাণ থেকে বাধাদানকারী আল্লাহর সুদৃঢ় আইন অমান্য করে মানবরচিত চিন্তাধারা, খেয়ালখুশি ও রীতিনীতির দিকে ফিরে যায়, যা শরিয়ার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি; যেমনটি জাহিলি যুগের লোকেরা তাদের খেয়াল ও প্রবৃত্তির ভিত্তিতে রচিত আইনের দ্বারা বিভিন্ন ভ্রান্ত ও জাহালাতপূর্ণ বিচার-আচার করত এবং যেরকমভাবে বর্তমানে মোঙ্গলীয় শাসকরা চেঙ্গিস খানের প্রণীত রাষ্ট্রনীতি দ্বারা বিচার-ফয়সালা করে, যা তাদের নেতা চেঙ্গিস খানের 'ইয়াসিক' নামক সংবিধান থেকে নেওয়া হয়েছে। 'ইয়াসিক' এটা এমন একটি আইনগ্রন্থ, যা বিভিন্ন ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সেখানে তার নিজস্ব খেয়ালখুশি ও চিন্তাধারারও অনেক আইন সন্নিবেশিত ছিল। এভাবেই এটা তাদের মাঝে অনুসরণীয় একটি সংবিধানরূপে স্বীকৃতি পায়। তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসুল -এর সুন্নাহর ওপর এটাকে প্রাধান্য দেয়। অতএব যে কেউ এমনটা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। তার বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করতে হবে, যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে, অতঃপর কমবেশি কোনো ক্ষেত্রেই শরিয়ার বিধান ছাড়া ফয়সালা করবে না।'

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন: 'আল্লাহর তাআলার নিকটে তিন শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে নিকৃষ্ট। এক. হারাম শরিফে অন্যায় ও অপকর্মকারী। দুই. ইসলামি যুগে জাহিলি যুগের আইন-কানুন অন্বেষণকারী। তিন. ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া কারও রক্তপাত দাবিকারী। '

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র ঈসাকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই তারা আদিষ্ট ছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। তারা যা কিছু শরিক করে, তা থেকে তিনি পবিত্র। '

ইমাম তাবারি বলেন :
'আবুল বুখতারি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুজাইফা -কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহর বাণী اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ এর ব্যাপারে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, মনে রেখো, তারা (ইহুদিরা) তাদের (পণ্ডিতদের) উদ্দেশ্যে রোজাও রাখত না এবং তাদের উদ্দেশ্যে নামাজও পড়ত না। কিন্তু তারা (পণ্ডিতরা) যখন তাদের জন্য কোনো জিনিস হালাল করে দিত, তারা তা হালাল বলে মেনে নিত এবং যখন তারা আল্লাহর কোনো হালালকে হারাম করত, তখন তারাও তা হারাম বলে মেনে নিত। আর এটাই ছিল তাদের রব বানানোর স্বরূপ। '

আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'যে ব্যক্তি সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ-এর ওপর অবতীর্ণ সুদৃঢ় শরিয়ত বাদ দিয়ে পূর্বের রহিত শরিয়তমতে বিচার কামনা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে যে ব্যক্তি 'ইয়াসাক' (চেঙ্গিস খানের বানানো সংবিধান) অনুসারে বিচার কামনা করে এবং এটাকে শরিয়তের ওপর প্রাধান্য দেয়, তার অবস্থা কী হবে? যে এমনটি করবে, সে মুসলমানদের ইজমার ভিত্তিতে কাফির হয়ে যাবে। '

টিকাঃ
১৬০. সুরা আন-নিসা : ৬০
১৬১. তাফসিরুল বাগাবি: ১/৬৫৫-৬৫৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
১৬২. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/৩০৫ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্য, বৈরুত)
১৬৩. সুরা আল-মায়িদা: ৫০
১৬৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১১৯ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্য, বৈরুত)
১৬৫. সহিহুল বুখারি : ৯/৬, হা. নং ৬৮৮২ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
১৬৬. সুরা আত-তাওবা : ৩১
১৬৭. তাফসিরুত তাবারি: ১৪/২০৯ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৬৮. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/১১৯ (দারুল ফিকর, বৈরুত)

ফন্ট সাইজ
15px
17px