📄 ১. কাফিরদের ভালোবাসা ও মিত্র হিসাবে গ্রহণ করা
এটা মূলত কুফরকেই ভালোবাসার নামান্তর। যেমন কেউ শয়তানকে তার শয়তানির কারণে ভালোবাসল বা কোনো তাগুতকে তাদের মানবরচিত কুফরি সংবিধানের কারণে পছন্দ করল অথবা তাদের ইসলামবিরোধী তথাকথিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী মনোভাবের জন্য ভালোবাসল, তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করল, জোটবদ্ধ হলো, তাহলে এটা স্পষ্ট কুফর। এর কারণে সে দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'যারা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি গোষ্ঠী হয়। '
আল্লামা ইবনে কাসির এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'সাইদ বিন আব্দুল আজিজ-সহ প্রমুখের মতে আয়াতটি নাজিল হয়েছে আবু উবাইদা বিন আব্দুল্লাহ বিন জাররাহ-এর ব্যাপারে, বদরের যুদ্ধে যখন তিনি তাঁর পিতাকে হত্যা করলেন। এ জন্যই উমর তাঁর পরবর্তী খলিফা নিয়োগের জন্য ছয়জনের শুরা গঠনকালে বলেছিলেন, যদি আবু উবাইদা আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে আমি তাঁকেই খলিফা ঘোষণা করতাম। আর কারও মতে আল্লাহর বাণী - "যদিও তারা তাদের পিতা হয়” নাজিল হয়েছে আবু উবায়দা-এর ব্যাপারে, যিনি বদর যুদ্ধে তাঁর পিতাকে হত্যা করেছিলেন। "অথবা তাদের পুত্র হয়” নাজিল হয়েছে আবু বকর সিদ্দিক-এর ব্যাপারে, যিনি সেদিন তাঁর পুত্র আব্দুর রহমানকে হত্যা করতে মনস্থ করেছিলেন। "অথবা তাদের ভ্রাতা হয়” নাজিল হয়েছে মুসআব বিন উমাইর-এর ব্যাপারে, যিনি সেদিন তাঁর ভাই উবাইদ বিন উমাইরকে হত্যা করেছিলেন। "অথবা তাদের গোষ্ঠী হয়” নাজিল হয়েছে উমর-এর ব্যাপারে, যিনি সেদিন তাঁর এক আত্মীয়কে হত্যা করেছিলেন এবং হামজা, আলি ও উবাইদা বিন হারিস-এর ব্যাপারে, যারা সেদিন উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ বিন উতবাকে হত্যা করেছিলেন। আর আল্লাহ-ই সর্বজ্ঞ।'
আল্লামা ইবনে কাসির আরও বলেন :
'আমার মতে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ মুসলমানদের সাথে যে পরামর্শ করেছিলেন, সেই পরামর্শও এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। তখন আবু বকর মুক্তিপণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন; যেন সম্পদের মাধ্যমে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি করা যায়। বন্দীরা ছিল তাঁদের ভাই-বেরাদার ও আত্মীয়স্বজন। হতে পারে আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়াত দিয়ে দেবেন। উমর বললেন, আবু বকর যে মত ব্যক্ত করেছেন, এর সাথে আমি একমত নই। আপনি অমুককে (উমর-এর আত্মীয়) আমার হাতে উঠিয়ে দিন, আমি তাকে হত্যা করি। আর আলি-এর হাতে আকিলকে দিন। অমুকের হাতে অমুককে দিন। যাতে আল্লাহ তাআলা জানতে পারেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের জন্য কোনো সহানুভূতি নেই। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও; অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুল ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এবং আমার পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়ে থাকো, তবে কেন তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব করছ? তোমরা যা গোপন করো এবং যা প্রকাশ করো তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।'
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'পবিত্র এ সুরার প্রথমাংশ অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিল হাতিব বিন আবু বালতাআ-এর ঘটনা।'
ঘটনাটি ইমাম আহমাদ সহিহ সনদে আলি থেকে বর্ণনা করেছেন। আলি বলেন:
'রাসুলুল্লাহ আমাকে, জুবাইরকে ও মিকদাদকে পাঠিয়ে বললেন, এখনই রওয়ানা হয়ে রওজায়ে খাখ নামক স্থানে পৌঁছে যাও। সেখানে একজন উষ্ট্রারোহী নারীকে পাবে, যার কাছে একটি চিঠি আছে। তার কাছ থেকে তা নিয়ে এসো। আমরা ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত বেগে রওয়ানা হলাম এবং রওজায়ে খাখে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে সেই উষ্ট্রারোহী নারীকে পেয়ে গেলাম। আমরা বললাম, চিঠি বের করো। সে বলল, আমার কাছে কোনো চিঠি নেই। আমরা বললাম, হয় চিঠি বের করো, নয়তো আমরা কাপড় খুলে তল্লাশি করব। আলি বললেন, তখন সে তার মাথার ঝুঁটি থেকে চিঠিটি বের করে দিল। আমরা চিঠি নিয়ে রাসুলুল্লাহ -এর কাছে ফিরে এলাম। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, “হাতিব বিন আবু বালতাআর পক্ষ থেকে মক্কার কয়েকজন মুশরিকের প্রতি।” তাতে তিনি রাসুলুল্লাহ -এর কিছু সিদ্ধান্তের ব্যাপার তাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তখন রাসুলুল্লাহ তাঁকে বললেন, হাতিব, এটা কী? তিনি বললেন, আমার ব্যাপারে জলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কুরাইশ বংশের ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তবে আসল কুরাইশ ছিলাম না। আপনার সাথে যে সকল মুহাজির আছেন, মক্কায় তাঁদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা তাঁদের পরিবার-পরিজনকে সুরক্ষা দেয়। যেহেতু তাদের সাথে আমার কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই আমি চাইছিলাম যে, পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর জন্য তাদের সাথে এমন সম্পর্ক করি। আমি কুফরি কিংবা আমার দ্বীন পরিত্যাগ করে এ কাজ করিনি আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, নিশ্চয়ই সে তোমাদের সত্য বলেছে। উমর বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বদরি সাহাবিদের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন, “তোমরা যা-ই ইচ্ছা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।”'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে ইমানদারগণ, তোমাদের পিতা ও ভাই যদি ইমান অপেক্ষা কুফরকে ভালোবাসে, তবে তাদের অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না। আর তোমাদের মধ্য হতে যারা তাদের অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করবে, তারা সীমালঙ্ঘনকারী। বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা, যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করো—এসব তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা জালিমদের পথ প্রদর্শন করেন না। '
ইমাম তাবারি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'যে মুসলমানদের বাদ দিয়ে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করবে, সে তাদের দ্বীন ও মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, কেউ কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারে না, যতক্ষণ না সে উক্ত ব্যক্তির দ্বীন ও অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট হয়। আর যখন সে তার ওপর ও তার দ্বীনের ওপর সন্তুষ্ট হবে, তখন তার বিপরীত সে সবকিছুর ব্যাপারে বিরোধিতা ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং তার ওপর তার কাফির বন্ধুর বিধানই প্রযোজ্য হবে। '
আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
'সে সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান ও সমস্ত মানুষ থেকে অধিক প্রিয় হব।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
'মুনাফিকদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি, যারা মুমিনদের পরিবর্তে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয়। তারা কি তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে? অথচ যাবতীয় সম্মানই তো আল্লাহর। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কখনোই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, নিশ্চয়ই আল্লাহ-প্রদর্শিত পথই প্রকৃত পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্ক্ষাসমূহের অনুসরণ করেন ওই জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে আল্লাহর কবল থেকে কেউ আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী থাকবে না।'
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন :
'মুমিনগণ যেন মুমিনদের ছেড়ে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টতার আশঙ্কা করো, তাহলে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর (শাস্তি) সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করছেন। আর সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।'
ইমাম তাবারি উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'এর অর্থ হচ্ছে, হে মুমিনগণ, তোমরা কাফিরদের সাহায্য ও সহায়তাকারীরূপে গ্রহণ করো না—এভাবে যে, তোমরা মুমিনদের ব্যতিরেকে তাদেরকে তাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে ভালোবাসবে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করবে, মুমিনদের দুর্বলতা তাদের নিকট প্রকাশ করবে। কেননা, যে এ ধরনের কাজ করবে সে আল্লাহর জিম্মা থেকে মুক্ত। অর্থাৎ এসব কর্মের কারণে মুরতাদ হয়ে কুফরে প্রবেশ করায় তার সাথে আল্লাহ তাআলার এবং আল্লাহ তাআলার সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।'
উল্লেখ্য যে, আল্লাহ তাআলার বাণী “তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টতার আশঙ্কা করো, তাহলে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে।” এখান থেকে অনেকেই মনে করে, কাফিরদের পক্ষ থেকে নিজের ওপর কোনো ক্ষতির আশঙ্কা করলে তাদের সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে এবং তাদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বলে মনে করা যাবে। অথচ এটা ভুল চিন্তা। তুকিয়ার অর্থ এ নয় যে, কাফিরদের সাথে তাদের সবকিছু হালাল হয়ে গেছে; বরং তুকিয়ার অর্থ হলো, মৌখিকভাবে তাদের সমর্থনের কথা প্রকাশ করা। কিন্তু কর্মগতভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিপরীতে তাদের কোনোরূপ সাহায্য করা কিছুতেই বৈধ হবে না, যদ্দরুন মুসলমানদের জান-মালের ক্ষতি হয়।
ইমাম ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করে বলেন:
'আল্লাহর বাণী "তবে তোমরা যদি তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।” এর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস বলেন, মুখের মাধ্যমে তুকিয়া হলো, কাউকে আল্লাহর অবাধ্যতা জাতীয় কোনো কথা বলতে বলা হয়েছে, যদ্দরুন সে মানুষের ভয়ে সে কথা বলে ফেলে, কিন্তু তার অন্তর ইমানের ওপর অটল থাকে; তাহলে এতে তার কোনো গুনাহ হবে না। নিশ্চয়ই তুকিয়া শুধু মৌখিকভাবেই হয়ে থাকে।'
ইমাম ইবনে আবি হাতিম ইকরামা থেকে বর্ণনা করে বলেন:
'আল্লাহর বাণী "তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।" এর ব্যাখ্যায় ইকরামা বলেন, এ তুকিয়া (ভয় ও আশঙ্কাজনিত কাজের বৈধতা) ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক আছে, যতক্ষণ না সে কোনো মুসলিমের রক্ত প্রবাহিত করবে এবং তার ধন-সম্পদ হালাল করে নেবে।'
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'আল্লাহর বাণী "তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।” এর ব্যাখ্যা হলো, যে ব্যক্তি কোনো শহরে বা কোনো সময়ে কাফিরদের পক্ষ থেকে অনিষ্টের আশঙ্কা করে, তাহলে তার জন্য অন্তর দিয়ে নয়; বরং বাহ্যিকভাবে কিছু প্রকাশ করে তাদের থেকে আত্মরক্ষা করার অবকাশ আছে। যেমনটি ইমাম বুখারি আবু দারদা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নিশ্চয় আমরা কিছু লোকের সাথে দাঁত বের করে হাসি; অথচ আমাদের অন্তর তাদেরকে অভিশাপ দেয়। ইমাম সাওরি বলেন, ইবনে আব্বাস বলেছেন, তুকিয়া কাজের মাধ্যমে নয়; বরং তা শুধু মুখ দিয়েই করা হয়। এমনিভাবে আওফা ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, তুকিয়া শুধু মুখ দিয়েই সংঘটিত হয়। এভাবে আবুল আলিয়া, আবুশ শাসা, জাহহাক, রবি বিন আনাস এমন মতই ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের উপরিউক্ত ব্যাখ্যা আল্লাহর এ বাণী সমর্থন করে, “যাকে (কুফরি করতে) বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার অন্তর ইমানের ওপর অটল থাকে, সে ব্যতীত যে কেউ ইমান আনার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরির জন্য হৃদয়-মন উন্মুক্ত করে দেয়, তাদের ওপর আল্লাহর গজব আপতিত হবে এবং তাদের জন্যে রয়েছে মহাশাস্তি।” [সুরা আন-নাহল: ১০৬] ইমাম বুখারি বলেন, হাসান বসরি বলেছেন, তুকিয়ার বৈধতা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। '
মূলত তুকিয়া করার জন্য উপযুক্ত হলো দুর্বল শ্রেণির মুসলমান, যারা কাফিরদের দেশ থেকে বের হওয়ার সামর্থ্য রাখে না বা এর কোনো উপায়- পদ্ধতি খুঁজে পায় না। এমতাবস্থায় তারা একান্ত বাধ্য হলে তুকিয়ার আশ্রয় গ্রহণ করবে। অর্থাৎ তারা এ দুর্বল অবস্থায় জিহাদের মাধ্যমে কাফিরদের মূলোৎপাটন করতে সক্ষম না হওয়ায় নিজেদের জান-মাল ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে তুকিয়া করবে। এরাই হলো এ আয়াতের দ্বারা উদ্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
‘কিন্তু পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্য হতে যারা অসহায়, যারা কোনো উপায় বের করতে পারে না এবং পথও জানে না, তাদের কথা ভিন্ন। এদের ব্যাপারে আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।'
তুকিয়া এই ধরনের দুর্বল মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু যারা কোনো কৌশল অবলম্বন কিংবা হিজরতের কোনো পথ বের করতে সক্ষম, তাদের জন্য যেহেতু কাফিরদের দেশে থাকার বৈধতা নেই, তাই মৌখিকভাবে হলেও তাদের জন্য কোনো কুফরি ও ইসলামবিরোধী কাজে সমর্থন দেওয়া জায়েজ হবে না।
টিকাঃ
১০৫. সুরা আল-মুজাদালা: ২২
১০৬. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/৮৪ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১০৭. প্রাগুক্ত
১০৮. সুরা আল-মুমতাহিনা : ০১
১০৯. তাফসিরু ইবনি কাসির : ৮/১১১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১১০. মুসনাদু আহমাদ : ২/৩৭-৩৮, হা. নং ৬০০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
১১১. সুরা আত-তাওবা: ২৩-২৪
১১২. সুরা আল-মায়িদা: ৫১
১১৩. তাফসিরুত তাবারি: ১০/৪০০, (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১১৪. সহিহুল বুখারি: ১/২১, হা. নং ১৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
১১৫. সুরা আন-নিসা: ১৩৮-১৩৯
১১৬. সুরা আল-বাকারা: ১২০
১১৭. সুরা আলি ইমরান: ২৮
১১৮. তাফসিরুত তাবারি: ৬/৩১৩ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১১৯. তাফসিরু ইবনি আবি হাতিম: ২/৬২৯, হা. নং ৩৩৮১ (মাকতাবাতু নাজ্জার মুস্তাফা আল-বাজ, সৌদি আরব)
১২০. তাফসিরু ইবনি আবি হাতিম : ২/৬২৯, হা. নং ৩৩৮০ (মাকতাবাতু নাজ্জার মুস্তাফা আল-বাজ, সৌদি আরব)
১২১. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/২৫ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
📄 ২. কাফিরদের ধর্মের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ হলো, কাফিররা যে ধর্ম বা মতাদর্শের ওপর আছে, তা পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে ঠিক মনে করা। যেমন: কেউ ভাবল যে, তাদের ধর্ম ঠিক আছে বা তারা সঠিক মতাদর্শের ওপর আছে বা ইসলামও সঠিক, অন্যগুলোও সঠিক বা সব ধর্মকে সমান মনে করল বা ধর্মরিপেক্ষতায় বিশ্বাস করল বা মুসলমানকে কাফিরের মতো মনে করল। কাফিরদের ধর্ম বা মতাদর্শের প্রতি এমন মনোভাব ও সন্তোষ থাকা পরিষ্কার কুফরি, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন। আর যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসা সত্ত্বেও শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছিল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করে, তবে (সে জেনে রাখুক,) আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
'আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনোই তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
আল্লাহ তাআলা ইমানের জন্য তাগুতকে অস্বীকারের শর্তারোপ করে বলেন:
'অতএব যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর ওপর ইমান আনবে, সে এমন সুদৃঢ় হাতল ধারণ করল, যা কখনো ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।'
উলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে, কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফর। হাতিব বিন আবু বালতাআ -এর ঘটনায়ও এ কথার সমর্থন মেলে, যখন তিনি রাসুলুল্লাহ -এর গোপন অভিযানের কথা মক্কার লোকদের জানানোর জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন। পরে ওহির মাধ্যমে ঘটনা প্রকাশ পেলে হাতিব বিন আবু বালতাআ এ বলে নিজের অপারগতা পেশ করেন:
'আমার ব্যাপারে জলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কুরাইশ বংশের ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তবে আসল কুরাইশ ছিলাম না। আপনার সাথে যে সকল মুহাজির আছেন, মক্কায় তাঁদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে, যারা তাঁদের পরিবার-পরিজনকে সুরক্ষা দেয়। যেহেতু তাদের সাথে আমার কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই আমি চাইছিলাম যে, পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর জন্য তাদের সাথে এমন সম্পর্ক করি। আমি কুফরি কিংবা আমার দ্বীন পরিত্যাগ করে এ কাজ করিনি আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই সে তোমাদের সত্য বলেছে। '
এ হাদিসে হাতিব-এর উক্তি “আমি কুফরি কিংবা দ্বীন পরিত্যাগ করে এ কাজ করিনি আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি।”-থেকে স্পষ্টই বুঝা যায়, কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফর। সাহাবি হাতিব আল্লাহর রাসুল-কে এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, যদিও এমন করাটা আমার বড় অন্যায় হয়ে গেছে, কিন্তু এতে আমার অন্তরে দ্বীনত্যাগ বা কুফরের প্রতি সন্তুষ্টি ছিল না; বরং বিষয়টি পার্থিব বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এরপর আল্লাহর রাসুল তার ওজর মেনে নেন এবং শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন এ জন্য যে, তিনি ছিলেন বদরি সাহাবি, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
'যে ব্যক্তি ইমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরি করে, তবে সে নয়, যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার অন্তর ইমানের ওপর অটল থাকে; বরং যে ব্যক্তি কুফরির জন্য মন উন্মুক্ত করে দেয়, তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'আর যারা জুলুম করেছে, তাদের প্রতি তোমরা ঝুঁকে পড়ো না। অন্যথায় তোমাদের আগুন স্পর্শ করবে। আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো বন্ধু নেই, অতঃপর তোমাদের কোনো সাহায্য করা হবে না।'
ইমাম কুরতুবি বলেন :
'আল্লাহর বাণী وَلَا تَرْكَنُوا “আর তোমরা ঝুঁকে পড়ো না।” الرُّكُونُ প্রকৃত অর্থে ভরসা করা, আস্থা রাখা, বস্তুর প্রতি নির্ভর করা ও তাতে সন্তুষ্ট থাকা। কাতাদা বলেন, এর অর্থ হলো, তোমরা তাদের সাথে হৃদয়তা রেখো না এবং তাদের অনুসরণ করো না। ইবনে জুরাইজ বলেন, তোমরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ো না। আবুল আলিয়া বলেন, তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়ো না। বস্তুত, এর সবগুলোই কাছাকাছি কথা। ইবনে জাইদ বলেন, এখানে الرُّكُونُ। অর্থ নমনীয় হওয়া। আর তা হলো তাদের কুফরি অস্বীকার না করা।'
টিকাঃ
১২২. সুরা আন-নিসা: ৯৮-৯৯
১২৩. সুরা আলি ইমরান: ১৯
১২৪. সুরা আলি ইমরান: ৮৫
১২৫. সুরা আল-বাকারা: ২৫৬
১২৬. মুসনাদু আহমাদ: ২/৩৭-৩৮, হা. নং ৬০০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) -হাদিসটি সহিহ।
১২৭. সুরা আন-নিসা: ১০৬
১২৮. সুরা হুদ: ১১৩
১২৯. তাফসিরুল কুরতুবি: ৯/১০৮ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, বৈরুত)
📄 ৩. মুসলমানদের বিপরীতে কাফিরদের সাহায্য করা
যদি কোনো মুসলিম কাফিরদের সাথে মিলে বা জোটবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এ জন্য যুদ্ধ করে যে, তারা মুসলিম কিংবা এ জন্য যে, তারা ইসলামের বিশেষ কোনো বিধান পালন করছে এবং তাদের জেতানোর জন্য সামরিক বা আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তাদের প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা দুনিয়াতে অসহায় ছিলাম। তারা প্রত্যুত্তরে বলেন, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে? এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস! তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও পায় না, আল্লাহ অচিরেই তাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। '
ইমাম কুরতুবি বলেন:
'এখানে উদ্দেশ্য মক্কার ওই সব লোক, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং রাসুলুল্লাহ -এর প্রতি ইমানও এনেছিল। অতঃপর যখন নবি হিজরত করলেন, তখন তারা নিজেদের গোত্রের লোকদের সাথে রয়ে গেল। এদের মধ্যে অনেককে পরীক্ষায় ফেলা হলে তারা ফিতনায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর যখন বদর যুদ্ধের সময় হলো, তাদের মধ্য হতে একদল লোক কাফিরদের সাথে (মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করার জন্য) বের হলো। তখন এ আয়াত নাজিল হয়। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে ইমানদারগণ, তোমরা মুসলমানদের বাদ দিয়ে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কি এমনটি করে আল্লাহর কাছে নিজেদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য দলিল স্থাপন করতে চাও?'
ইমাম তাবারি উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
'আল্লাহ তাআলা তাদের বলছেন, ওহে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনয়নকারী লোকসকল, তোমরা কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তোমাদের স্বজাতি ও দ্বীনি ভাই মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করো না। ফাতাকুনু কাম্মান আউযাবা লাহুন নারু মিনাল মুনাফিকিনা।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পথপ্রদর্শন করেন না। বস্তুত, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, আপনি তাদের দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই (ইহুদি-খ্রিষ্টানদের) মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন; ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য অনুতপ্ত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরাই কি সেসব লোক, যারা আল্লাহর নামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করত যে, আমরা তোমাদের সাথেই আছি? তাদের কৃতকর্মসমূহ নষ্ট হয়ে গেছে; ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে।'
ইমাম তাবারি বলেন:
'আমাদের মতে, এ ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সমস্ত মুমিনকে নিষেধ করেছেন, তারা যেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনয়নকারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে ইহুদি- খ্রিষ্টানদের সাহায্যকারী ও মিত্র না বানায়। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ, রাসুল ও মুমিনদের বাদ দিয়ে তাদেরকে মিত্র ও সাহায্যকারী বানাবে—সে আল্লাহ, রাসুল ও মুমিনদের বিরোধী শিবিরের লোক। আর আল্লাহ ও রাসুল তার থেকে মুক্ত।'
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন :
“আল্লাহর বাণী ফাতারা আল্লাযিনা ফি কুলুবিহিম মারাদুন “যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তাদের আপনি দেখবেন।” অর্থাৎ (যাদের অন্তরে) সন্দেহ, সংশয় ও কপটতা রয়েছে। ইউসারিউনা ফিহিম “দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে।” অর্থাৎ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে তাদের বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার জন্য দৌড়ঝাঁপ করে। ইয়াকুলুনা নাখশা আন তুসিবানা দাইরাতুন “তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই।” অর্থাৎ তাদের বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার কারণ ব্যাখ্যা করে বলে, তারা ভয় করছে যে, কাফিররা যদি মুসলমানদের ওপর বিজয় লাভ করে, তখন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে তাদের একটা অবস্থান হওয়ায় উপকৃত হবে।'
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারীদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম অবধারিত করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আপনি তাদের অনেককে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন। কতই না নিকৃষ্ট তাদের কৃতকর্ম। যে কারণে তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল শাস্তি পেতে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও নবির প্রতি এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত; তবে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই ফাসিক।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'যাঁরা ইমান এনেছে, হিজরত করেছে, স্বীয় জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে এবং যাঁরা তাঁদেরকে আশ্রয় ও সাহায্য সহায়তা দিয়েছে, তাঁরা একে অপরের বন্ধু। আর যারা ইমান এনেছে, কিন্তু হিজরত করেনি, তোমাদের জন্য তাদের অভিভাবকত্বের কোনো দায়িত্ব নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরত করে। অবশ্য যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে, তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তোমাদের সাথে যাদের চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নয়। বস্তুত, তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সেসবই দেখেন। আর যারা কাফির তারা একে অপরের বন্ধু। তোমরা যদি উক্ত ব্যবস্থা কার্যকর না করো, তবে ফিতনা বিস্তার লাভ করবে এবং বড়ই বিপর্যয় দেখা দেবে। আর যাঁরা ইমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে এবং যাঁরা তাঁদের আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য-সহায়তা করেছে, তাঁরাই হলো প্রকৃত মুমিন। তাঁদের জন্য রয়েছে, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। আর যাঁরা ইমান এনেছে পরবর্তী পর্যায়ে এবং হিজরত করেছে এবং তোমাদের সাথে মিলে জিহাদ করেছে, তাঁরাও তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। যারা আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পর বেশি হকদার। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত। '
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন :
'আল্লাহ তাআলা বলেন, ওয়াইনিস তানসারুকুম “তারা যদি তোমাদের সহায়তা কামনা করে।” যেসব লোক হিজরত করে কাফিরদের সঙ্গ নিয়ে যুদ্ধ করতে যায়নি, তারা যদি সাহায্য কামনা করে, তাদের সাহায্য করো। তাদের সাহায্য করা ওয়াজিব। কারণ, তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। তবে তারা যদি এমন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য চায়, যাদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদে তোমাদের চুক্তি রয়েছে, তখন তোমরা তোমাদের দায় ও চুক্তি ভঙ্গ করবে না। এটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। '
ইমাম কুরতুবি বলেন :
'আল্লাহর বাণী “ওয়াইনিস তানসারুকুম ফিদ দ্বীনি যদি তারা ধর্মীয় ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে” এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দারুল হারব থেকে হিজরত করতে অক্ষম মুমিনরা যদি তোমাদের কাছে সৈন্যপ্রেরণ বা সম্পদ সাহায্য চায়, তাহলে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও। এটি তোমাদের ওপর ফরজ। অতএব, তোমরা তাদের নিরাশ করবে না। তবে তারা যদি এমন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করে, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি আছে, তখন সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি ভঙ্গ করবে না। ইবনুল আরাবি বলেন, কিন্তু তারা (সাহায্য প্রার্থনাকারী মুমিনরা) যদি দুর্বল বন্দী হয় (তাহলে কাফিরদের সাথে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বন্দীদের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকা যাবে না)। কেননা, মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রাখা এবং তাদের সাহায্য করা ওয়াজিব। এমনকি অভিযান চালিয়ে তাদের মুক্ত করার সম্ভাবনা থাকলে, তাদের মুক্ত করার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে বা তাদের মুক্ত করতে টাকার প্রয়োজন হলে সব টাকা খরচ করে হলেও তাদের মুক্ত করতে হবে। এমনকি এর জন্য মুমিনদের কাছে অতিরিক্ত এক দিরহামও যেন অবশিষ্ট না থাকে। ইমাম মালিক ও সমস্ত আলিম এমনই বলেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! কত নীচু তাদের চরিত্র, যাদের ভাইয়েরা আজ দুশমনের কারাগারে বন্দী; অথচ তাদের হাতে রয়েছে সম্পদের খাজানা, তাদের রয়েছে শক্তি-সামর্থ্য, তারা সংখ্যায় যথেষ্ট, তাদের রয়েছে সেনাবাহিনী, রয়েছে অস্ত্র-শস্ত্র।'
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা পরস্পরে একে অপরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এদের ওপর আল্লাহ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন :
'মুনাফিকদের গর্হিত গুণাবলি বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা ও গুণাবলি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “ইমানদার পুরুষরা ও ইমানদার নারীরা পরস্পরে একে অপরের বন্ধু” অর্থাৎ একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। যেমন সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, “মুমিনগণ পরস্পর একটি প্রাসাদের ন্যায়, যার একাংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। এই বলে রাসুল এক হাতের আঙুলগুলো অপর হাতের আঙুলে প্রবেশ করালেন।” [সহিহুল বুখারি: ৪৮১] বুখারির অন্য একটি বর্ণনায় আরও এসেছে, “পরস্পর মহব্বত, দয়া ও অনুগ্রহের ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ একটি দেহের ন্যায়। যখন তার এক অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন তার পুরো দেহ বিনিদ্রা ও জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ে।” [সহিহুল বুখারি : ৬০১১] '
ইমাম ইবনে হাজাম বলেন:
'যে ব্যক্তি নিকটবর্তী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বেচ্ছায় দারুল কুফরে যোদ্ধা হিসেবে চলে যায়, সে তার এই অপরাধের কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। তার ওপর মুরতাদের সব হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেমন, গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে তাকে হত্যা করা, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি।'
টিকাঃ
১৩০. সুরা আন-নিসা : ৯৭-৯৯
১৩১. তাফসিরুল কুরতুবি : ৫/৩৪৫ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১৩২. সুরা আন-নিসা : ১৪৪
১৩৩. তাফসিরুত তাবারি : ৯/৩৩৬ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৩৪. সুরা আল-মায়িদা: ৫১-৫৩
১৩৫. তাফসিরুত তাবারি: ১০/৩৯৮ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৩৬. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৩/১২০-১২১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৩৭. সুরা আল-মায়িদা: ৮০-৮১
১৩৮. সুরা আল-আনফাল: ৭২-৭৫
১৩৯. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/৮৫-৮৬ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৪০. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/৫৭ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১৪১. সুরা আত-তাওবা: ৭১
১৪২. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/১৫৩-১৫৪ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৪৩. আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম: ১২/১২৫-১২৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ৪. কাফিরদের নিঃশর্ত আনুগত্য করা
এর ব্যাখ্যা হলো, তারা তাকে যা করতে বলে, সে তা-ই করে। প্রতিটি আদেশই সে মান্য করে চলে; এমনকি কুফরি হলেও সে কোনো পরোয়া করে না। যার অবস্থা এমন হবে, সে নিশ্চিতই ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কেননা, কাফির মাত্রই তাকে কুফরির আদেশ করবে। আর বাস্তবে এমন কোনো আদেশ না করলেও সে তা মানার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাই তার কুফরির জন্য যথেষ্ট।
আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ إِنَّ اللَّهَ কَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴾ ‘হে নবি, আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
আল্লামা সাদি বলেন : ‘অতএব, আপনি কোনো কাফিরেরই অনুসরণ করবেন না, যে কিনা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে শত্রুতা প্রকাশ করে। আর অনুসরণ করবেন না কোনো মুনাফিকের, যে কিনা তার অস্বীকৃতি ও কুফর গোপন রেখে তার বিপরীতটা প্রকাশ করে। এরাই প্রকৃত দুশমন। সুতরাং কিছু বিষয়ে তাদের অনুসরণ করবেন না, যা তাকওয়া বিনষ্ট করে দেয় এবং তার পরিপন্থী হয়; যদ্দরুন তারা আপনাকে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে।’
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'হে মুমিনগণ, যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য করো, তবে তারা তোমাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে; ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।'
ইমাম তাবারি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
'আল্লাহ তাআলা এ আয়াত দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন, হে ওই সকল লোক, যারা আল্লাহর ওয়াদা ও ভীতিপ্রদর্শন, তাঁর আদেশ ও নিষেধের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সত্যায়ন করে, তোমরা যদি কাফিরদের অনুসরণ করো অর্থাৎ ওই সব লোকের, যারা তোমাদের নবি মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াত অস্বীকার করেছে, যেমন ইহুদি- খ্রিষ্টানরা, তাদের কৃত আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে যদি তোমরা তাদের কথা মেনে চলো এবং তাদেরকে তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী ভেবে তাদের উপদেশ গ্রহণ করো, তবে তারা তোমাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, তারা তোমাদের ইমান আনার পর মুরতাদ হয়ে যেতে এবং ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর আয়াতসমূহ অস্বীকার করতে প্ররোচিত করবে। যদ্দরুন তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, এতে করে আল্লাহ তোমাদের যে দ্বীন ও ইমানের পথ প্রদর্শন করেছিলেন, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। “ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে” অর্থ ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমরা নিজেদের ক্ষতির মধ্যে ফেলেছ, তোমাদের দ্বীন থেকে সরে পড়েছ এবং তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টি ধ্বংস হয়েছে। এদ্বারা আল্লাহ মুমিনদেরকে কাফিরদের মতামত মানা এবং ধর্মের ক্ষেত্রে তাদের উপদেশ গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'নিশ্চয়ই যারা নিজেদের নিকট সৎপথ স্পষ্ট হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্য তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এ জন্য যে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে, তারা তাদের বলে, “আমরা কোনো কোনো বিষয়ে তোমাদের কথা মান্য করব।” আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি সম্বন্ধে অবগত আছেন। ফেরেশতা যখন তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে প্রাণ হরণ করবে, তখন তাদের কেমন দশা হবে? এটা এ জন্য যে, তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করে, যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অপ্রিয় গণ্য করে; ফলে তিনি তাদের কর্মসমূহ ব্যর্থ করে দেন। '
আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আপনি কি দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাজিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাজিল হয়েছে, তাতে তারা ইমান এনেছে, তারপরও তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়? অথচ সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদের ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। '
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন:
'এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির কথাকে খণ্ডন করা হয়েছে, যে দাবি করে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ও পূর্বের সকল নবির ওপর যা নাজিল করেছেন, সে তাতে বিশ্বাস রাখে, এতদসত্ত্বেও সে বিবাদের ফয়সালার জন্য আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ ব্যতিরেকে অন্য কোথাও যেতে চায়। যেমন আয়াতটির শানে নুজুলের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন আনসারি ও ইহুদির মাঝে বিবাদ চলছিল। ইহুদি লোকটি বলল, আমরা মুহাম্মাদ -এর কাছে যাব। আর মুনাফিক বলল, বরং আমরা কাব বিন আশরাফের কাছে যাব। সে-ই ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাগুত বলে নাম দিয়েছেন। কিন্তু ইহুদি লোকটি আল্লাহর রাসুল ছাড়া অন্য কারও কাছে বিচার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাল। মুনাফিক লোকটি যখন তার অস্বীকৃতি দেখতে পেল, বাধ্য হয়ে আল্লাহর রাসুল-এর কাছে আসল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ইহুদির পক্ষে ফয়সালা করলেন। '
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন :
'অতএব, যে ব্যক্তি অহংকারবশত অন্যের কথা মেনে আল্লাহর কিছু ইবাদত থেকে বিরত থাকল সে এ ক্ষেত্রে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এর বক্তব্য বাস্তবায়ন করল না। এরাই ওই সকল লোক, যারা তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে; এ কারণে যে, আল্লাহর হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ক্ষেত্রে তারা তাদের আনুগত্য করেছে। এরা দুধরনের লোক। এক. যারা এ কথা জানবে যে, কাফিররা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলেছে আর তারা এ পরিবর্তন মেনে নিয়েই তাদের অনুসরণ করছে; যদ্দরুন তাদের নেতাদের অনুসরণে তারা আল্লাহর হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম বলে বিশ্বাস করছে; অথচ তাদের জানা আছে, তারা রাসুলুল্লাহ -এর আনীত দ্বীনের বিরোধিতা করেছে, তাহলে এটা হবে কুফর, যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল শিরক বলে অভিহিত করেছেন। যদিও তারা তাদের উদ্দেশ্যে সালাত বা সিজদা করে না। অতএব, যে ব্যক্তি জেনেশুনে দ্বীনের বিপরীতে অন্য কারও অনুসরণ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিবর্তে তার কথা শুনবে, সে তাদের মতোই মুশরিক হয়ে যাবে। দুই. আল্লাহর হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম বলে যাদের বিশ্বাস ঠিক থাকবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তারা তাদের অনুসরণ করে, যেমন কোনো মুসলিম গুনাহকে গুনাহ বিশ্বাস করেই গুনাহ করে থাকে, তাহলে তাদের বিধান অন্যান্য গুনাহগারদের মতোই হবে।'
টিকাঃ
১৪৪. সুরা আল-আহজাব : ০১
১৪৫. তাফসিরুস সাদি : পৃ. নং ৬৫৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৪৬. সুরা আলি ইমরান : ১৪৯
১৪৭. তাফসিরুত তাবারি: ৭/২৭৬ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৪৮. সূরা মুহাম্মাদ: ২২-৩১
১৪৯. সুরা আন-নিসা : ৬০
১৫০. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/৩০৫ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্য, বৈরুত)
১৫১. এখানে আরবি ভাষ্যে লিপিকারদের থেকে শব্দগত কিছু ভুল হয়ে গেছে। অর্থাৎ 'হালাল' এর জায়গায় 'হারাম' আর 'হারাম' এর জায়গায় 'হালাল' চলে এসেছে। অনেক প্রাজ্ঞ আলেম এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তাই অনুবাদের মধ্যে আমরা সঠিক অনুবাদটিই করে দিয়েছি।
১৫২. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ৭/৭০ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)