📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ইজমা থেকে

📄 ইজমা থেকে


তিন. ইজমা থেকে দলিল:
বস্তুত, কুরআন-সুন্নাহয় 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' এর আকিদার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে এত বেশি দলিল-প্রমাণ এসেছে যে, এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো ফকিহ বা আলিম মতানৈক্য করেননি। উম্মাহর সবাই এক বাক্যে এ আকিদার আবশ্যকীয়তা ও তা ইমানের অংশ হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কারও থেকে এ ব্যাপারে ভিন্ন কোনো মত পাওয়া যায়নি। তাই বলা যায়, এ বিষয়ে উম্মতের মাঝে প্রকৃত অর্থেই মৌন ইজমা হয়ে গেছে। একাধিক ফকিহের ভাষ্য থেকেও ইজমার বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়।

যেমন ইমাম ইবনে হাজাম বলেন:
'আর এটা বিশুদ্ধ কথা যে, আল্লাহ তাআলার বাণী "আর তোমাদের মধ্য হতে যে কেউ তাদেরকে বন্ধু বানাবে, সে তাদেরই একজন।” [সুরা আল-মায়িদা : ৫১] আয়াতটি তার বাহ্যিক অর্থে এসেছে যে, সে (কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী নামধারী মুসলমান) কাফিরদের মধ্য হতে একজন বলে গণ্য হবে। এটা এমন ধ্রুব সত্য, যাতে দুজন মুসলমান পরস্পর মতভেদ করতে পারে না। '

আর ইজমা হবে না-ই বা কেন, যেখানে আমরা প্রতি নামাজে সুরা ফাতিহার মধ্যে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের পথ ভিন্ন সরল পথের কামনা করি। কেননা, এ সুরায় উল্লিখিত আল-মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দল্লিন দ্বারা যে ইহুদি-খ্রিষ্টান উদ্দেশ্য, সে ব্যাপারে সকল মুফাসসিরের ইজমা রয়েছে। সুতরাং তাদের সাথে যে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তা সুরা ফাতিহার মধ্যেই পরোক্ষভাবে বলা আছে।

টিকাঃ
১০৩. আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম: ১২/৩৩ (দারুল ফিকর, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 কিয়াস বা যুক্তি থেকে

📄 কিয়াস বা যুক্তি থেকে


চার. কিয়াস বা যুক্তি থেকে দলিল
সুস্থ বিবেক ও বিশুদ্ধ যুক্তিও এ কথা বলে যে, 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' এর আকিদা রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য ফরজ। কারণ, মানুষ যখন অনেক জিনিসের মাঝে কোনোটি শ্রেষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ধারণা বা বিশ্বাস রাখে, তখন সে নিজের জন্য নির্দিষ্ট সে জিনিসটিকেই বেছে নেবে। শুধু তাই নয়; বরং বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদেরও সে সেটিই নেওয়ার জন্য বলবে। কারণ, এখানে তার পূর্ণ বিশ্বাস কাজ করছে। সে জানে যে, এখানে জিনিসগুলোর মধ্যে ভালো-মন্দ আছে। সে নির্ভরযোগ্য কোনো মাধ্যমে যখন এর মধ্য হতে একটির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পেরেছে, তখন সে কেবল সেটিই নেওয়ার চিন্তা করবে এবং বাকিগুলো বর্জন করবে। একটিকেই কেবল সে ভালো বলবে, অন্যগুলোকে মন্দ বলবে। তার পরিচিত লোকদেরকেও সে একই আহ্বান জানাবে। 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' এর বিষয়টিও ঠিক তদ্রূপই। মুসলমানরা যখন নিশ্চিত সূত্রে জানতে পেরেছে যে, ইসলামই হলো একমাত্র সঠিক ধর্ম, তখন সে চূড়ান্তভাবে এ কথা বিশ্বাস করে নিয়েছে, ইসলাম ভিন্ন দুনিয়াতে যত ধর্ম বা দর্শন আছে সবই বাতিল। এ বিশ্বাসের আবশ্যকীয় দাবি হলো, এটিকে ভালো বলে প্রচার করবে। এ মতাদর্শীদের সাথে হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে। নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলবে। পাশাপাশি এর বিপরীত সকল ধর্ম ও বিশ্বাসের লোকদের এ সত্য পথে আসার আহ্বান করবে। আহ্বানে সাড়া না দিলে তাদের বাতিল ও ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করবে। তাদের বিশ্বাসের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে। আর যারা এ সত্য ও সঠিক বিশ্বাস না মেনে, এর সামনে মাথা নত না করে উল্টো পৃথিবী থেকে তা মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তাদেরকে সত্য ও কল্যাণের পথে বাধা মনে করে তাদের প্রধান শত্রু জ্ঞান করবে। অতঃপর সর্বাত্মকভাবে তাদের বিরুদ্ধে শক্তি ব্যয় করে নত হতে তাদের বাধ্য করবে, না হয় নিশ্চিহ্ন করে দেবে। যুক্তির নিরিখে এটাই সঠিক ও বিবেকগ্রাহ্য বলে প্রতিভাত হয়। এতে কোনো বিবেকবান দ্বিমত পোষণ করতে পারে না।

এর বিপরীতে কাফিরদের মধ্যে কিছু উদারচিন্তার লোক আছে, যারা ভাবে যে, প্রত্যেকের চিন্তা-দর্শনই স্ব স্ব স্থানে ভালো ও সঠিক। অতএব, শুধু নিজের দর্শনকে বিশুদ্ধ আখ্যা দিয়ে অন্যদের চিন্তা-দর্শন ভুল বলা ঠিক নয়। এতে বরং অন্যের মতাদর্শের প্রতি অসম্মান জানানো হয়, যা ভদ্রতা ও শিষ্টাচার পরিপন্থী। অতএব, পৃথিবীতে সবাইকে সহাবস্থান করে একে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে শান্তিতে বসবাস করা উচিত। মূলত যারা এমন কথা বলে, তারা উদারচিন্তার নয়; বরং তারা হলো সংশয়বাদী। তাদের কোনো চূড়ান্ত ধর্ম বা বিশ্বাসই নেই। তারা নিজেরাও জানে না যে, সে যে মতটি গ্রহণ করছে বা যে বিশ্বাস লালন করছে, তা আদৌ সঠিক বা চূড়ান্ত কিনা। কারণ, তার কাছে তো নিশ্চিত কোনো দলিল নেই। আর তাই সে পৃথিবীর সবাইকে তার মতো করে ভাবতে থাকে। সে চিন্তা করে, আমারটার মতো সবারটাই বুঝি এমন সংশয়পূর্ণ। অন্যান্য সংশয়বাদীরাও তার কথায় সাড়া দেয়। তাদের বাতিল মতাদর্শের মাধ্যমে পৃথিবীতে কল্পিত এক শান্তি আনয়নের দাবি করে, যা কোনোদিনও বাস্তবায়িত হওয়ার নয়। কীভাবেই বা হবে, তাদের তো নীতিমালা ও সংবিধানই ঠিক নেই! তাদের দর্শন ও চিন্তায় রয়েছে হাজারও ভুল। এ ভুল পথে কোনোদিনও পৃথিবীতে শান্তি আসতে পারে না। এর বিপরীতে মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, ইসলামের বিধানই হলো চূড়ান্ত ও সঠিক। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। যখন নির্ভরযোগ্য সূত্রে সাব্যস্ত হয়েছে যে, এটাই চূড়ান্ত পথ, তখন এ পথের পথিকদের অবশ্যই এ অধিকার আছে যে, এর বিপরীত সকল মত ও দর্শনকে বাতিল বলে ঘোষণা দেবে। তাদের এসব ভুল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। এসব মানবরচিত বিধিবিধানের প্রতি পূর্ণ বিদ্বেষ ও ঘৃণা রাখবে। কেননা, তারা এটা নিশ্চিত জানে যে, এগুলো ভুল ও মন্দ এবং মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে ক্ষতিকর। এগুলো সঠিক পথ ও মত প্রতিষ্ঠার পথে বাধা। তাই এসব বাধার বিপরীতে নিজেদের অন্তরে ঘৃণা ও শত্রুতা রাখতে হবে। এগুলো উৎখাত করার জন্য সর্বশক্তি ব্যয় করতে হবে। এভাবেই চূড়ান্ত বিশ্বাস ও সংশয়পূর্ণ বিশ্বাসের মাঝে মৌলিক পার্থক্য থাকায় প্রকৃত শান্তিবাদী ও তথাকথিত শান্তিবাদীদের মাঝে অসামান্য পার্থক্য সৃষ্টি হয়। আমাদের অনেক সাধারণ মুসলিম এ বিষয়গুলো সম্বন্ধে না জানায় কাফিরদের প্রচারিত প্রোপাগাণ্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে সবার সাথে এক নিয়মে চলতে চায়। পৃথিবীর সবাইকে শান্তিবাদী বলে ভাবতে ভালোবাসে। কাফির ও মুসলিম উভয়ের জন্য একই আচরণে বিশ্বাস করে। 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' এর আকিদায় বিশ্বাসী মুসলিমদের গোঁড়া ও কট্টরপন্থী বলে গালিগালাজ করে। অথচ প্রকৃত সত্য থেকে তারা কত আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে! আল্লাহ তাদের হিদায়াত দিন এবং সঠিক বুঝ দান করুন।

টিকাঃ
১০৪. উল্লেখ্য যে, এখানে শরয়ি কিয়াস উদ্দেশ্য নয়, যা মুজতাহিদ ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহর বিভিন্ন নস সামনে রেখে করে থাকেন; বরং আভিধানিক অর্থে এখানে কিয়াস বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক বিবেক ও সাধারণ যুক্তির আলোকে যা বুঝানো হয়ে থাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px