📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর আভিধানিক অর্থ

📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর আভিধানিক অর্থ


'الولاء (আল-ওয়ালা) শব্দটি وَلِي এর মাসদার। এর অর্থ মৈত্রী, বন্ধুত্ব, নৈকট্য, সাহায্য ইত্যাদি। যেমন 'আল-মুনজিদ'-এ বলা হয়েছে:
الওয়ালউ : আল-মাহাব্বাতু ওয়াস সাদাকাতু, আল-কুরবু ওয়াল কারাবাতুন নাসরাতু, আল-মিলকু, মিরাসুন ইয়াসতাহিক্কুহু আল-মারউ বিসাবাবি ইতকি শাখসিন ফি মিলকিহি আও বিসাবাবি আকদিল মুওয়ালাতি।
'الولاء (আল-ওয়ালা) অর্থ: হৃদ্যতা, সততা, নৈকট্য, সাহায্য, মালিকানা, নিজ মালিকানাধীন দাসমুক্তি বা মুওয়ালাত চুক্তির ভিত্তিতে প্রাপ্ত মিরাস।'

এটি তিন হরফবিশিষ্ট এমন একটি শব্দ, যা থেকে গঠিত সকল শব্দেই নিকটবর্তিতার অর্থ পাওয়া যায়। যেমন 'মাকায়িসুল লুগাত'-এ বলা হয়েছে :
وَلَي শব্দটি و (ওয়া), ل (লাম) ও ي (ইয়া) যোগে গঠিত। এটি একটি বিশুদ্ধ উৎস, যা নিকটবর্তিতার অর্থ বুঝায়। এ থেকে একটি শব্দ হলো, وَلِيٌّ যার অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। বলা হয়, تَبَاعَدَ بَعْدَ وَلْي অর্থাৎ নিকটবর্তী হওয়ার পর সে দূরে চলে গেছে। جَلَسَ মিম্মা ইয়ালিনি অর্থাৎ আমার নিকটবর্তী স্থানে সে বসল। আল-ওয়ালিউ অর্থ বসন্তকালের প্রথম বৃষ্টির পরের বৃষ্টি। এটাকে এ জন্যই আল-ওয়ালিউ বলা হয় যে, তা বসন্তকালের প্রথম বৃষ্টির পরপরই আসে। এ জাতীয় আরেকটি শব্দ হলো, আল-মাওলা যার অর্থ মুক্তকারী মনিব, মুক্ত দাস, সঙ্গী, মৈত্রীবদ্ধ, চাচাতো ভাই, সাহায্যকারী, প্রতিবেশী। এর সবগুলোতেই রয়েছে নিকটবর্তিতার অর্থ।

আর আল-বারাউ শব্দটির অর্থ হলো, নিষ্কৃতি, দায়মুক্তি, অব্যাহতি, দূরত্ব ইত্যাদি। যেমন 'আল-মুজামুল অসিত'-এ এসেছে:
বারিয়া আল-মারিদ অর্থ : সে সুস্থ হলো, তার আপদ থেকে সে মুক্তি পেল। বারিয়া মিন ফুলান অর্থ : অমুকের থেকে সে দূরে সরে গেল, তার থেকে সে অব্যাহতি পেল। বারিয়া মিনাদ দ্বীন ওয়াল আইবি ওয়াত তুহমাতি অর্থ: ঋণ, দোষ ও অপবাদ থেকে নিষ্কৃতি ও অব্যাহতি পেল।

ইবনে মানজুর 'লিসানুল আরব'-এ বলেন :
ইবনুল আ'রাবি বলেন, বারিয়া অর্থ সে মুক্তি বা নিষ্কৃতি পেল। বারিয়া অর্থ : সে মুক্ত থাকল ও দূরে গেল। বারিয়া অর্থ: অব্যাহতি দিল ও সতর্ক করল। ...ইবনুল আ'রাবি বলেন, আল-বারি অর্থ : মন্দ ও নিকৃষ্ট কাজসমূহ থেকে মুক্ত, ভ্রান্তি ও মিথ্যা থেকে নিষ্কৃতি লাভকারী, অপবাদসমূহ থেকে দূরবর্তী, শিরক থেকে পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী।

টিকাঃ
৮৫. আল-মুনজিদ: ৯১৯ (আল-মাতবাআতুল কাসুলিকিয়্যা, বৈরুত)
৮৬. মাকায়িসুল লুগাত: ৬/১৪১ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৮৭. আল-মুজামুল অসিত: ১/৪৬ (দারুদ দাওয়াহ, ইসকানদারিয়া)
৮৮. লিসানুল আরব: ১/৩৩ (দারু সাদির, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর পারিভাষিক অর্থ

📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর পারিভাষিক অর্থ


কুরআন ও সুন্নাহর সকল নস সামনে রাখলে প্রতিভাত হয় যে, সামগ্রিকভাবে চারটি জিনিস হলো 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' এর মূল। যথা: 'আল-ওয়ালা' এর জন্য মূল হলো, হৃদ্যতা ও সাহায্য। আর 'আল-বারা' এর মূল হলো, বিদ্বেষ ও শত্রুতা।

অতএব, 'আল-ওয়ালা' এর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে—আল্লাহ, তাঁর রাসুল, তাঁর দ্বীন ও অনুগত মুমিনদের ভালোবাসা এবং আল্লাহ, তাঁর রাসুল, তাঁর দ্বীন ও অনুগত মুমিনদের সাহায্য করা।

আর 'আল-বারা' এর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে—সকল প্রকার তাগুতি আদর্শ ও কুফর-শিরকের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা এবং বস্তুগত, আদর্শগত ও সত্তাগত সকল তাগুত ও কাফিরের সাথে শত্রুতা রাখা।

এ সংজ্ঞা থেকে আমরা পরোক্ষভাবে 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' এর রুকনসমূহও জানতে পারলাম। সুতরাং 'আল-ওয়ালা' এর রুকন হলো, হৃদ্যতা ও সাহায্য এবং 'আল-বারা' এর রুকন হলো, বিদ্বেষ ও শত্রুতা। এখানে 'হৃদ্যতা ও সাহায্য' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আমরা অন্তরে মুমিনদের প্রতি ভালোবাসা ও হৃদ্যতা রাখব, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখব, কাফিরদের মোকাবেলায় আমরা সবাই মুসলমানদের সাহায্য করাকে আবশ্যক মনে করব এবং দ্বীনের যেকোনো প্রয়োজনে সাধ্যানুসারে সাহায্য-সহযোগিতা করাকে কর্তব্য মনে করব। আর 'বিদ্বেষ ও শত্রুতা' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানবরচিত সকল কুফরি আইনের প্রতি চরম বিদ্বেষ রাখব, তাগুতের আদর্শের প্রতি ঘৃণা রাখব, শিরক-কুফরকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাজ্য মনে করব, সকল কাফির ও তাগুতের সাথে অন্তরে চিরশত্রুতা পোষণ করব এবং তাদের সাথে শরিয়া অনুমোদিত প্রয়োজন ছাড়া সকল সম্পর্ক ছিন্ন করব।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর প্রায়োগিক প্রকারভেদ

📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর প্রায়োগিক প্রকারভেদ


'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' সবার সাথে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়; বরং মানুষভেদে এতে তারতম্য হবে। কারও সাথে পূর্ণ 'ওয়ালা', কারও সাথে পূর্ণ 'বারা' আর কারও সাথে উভয়টিই কমবেশ করে থাকবে। এ হিসাবে মানুষকে তিনভাবে ভাগ করা যায়। প্রতিটি মুমিনের জন্য এ তিন শ্রেণির মানুষ চিনে তার সাথে সে অনুপাতে 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা' বা মিত্রতা ও শত্রুতা রাখা আবশ্যক। এর অন্যথা হলে তার ইমানে সমস্যা সৃষ্টি হবে। তিনটি শ্রেণি হলো :

এক : নেককার ও সালিহ মুমিনশ্রেণি। সুতরাং এদের সাথে পূর্ণ 'ওয়ালা' রাখতে হবে। অন্তর থেকে তাদের ভালোবাসতে হবে। তাদের প্রতি নমনীয় হতে হবে, তাদের সাথে কোমল আচরণ করতে হবে এবং তাদের সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করতে হবে।

দুই : তাগুত ও কাফিরসম্প্রদায়। অমুসলিম সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, সে যতই শান্তিপ্রিয় হওয়ার দাবি করুক না কেন, তাদের সাথে মুমিনের চিরশত্রুতা ও বিদ্বেষ রাখতে হবে। দ্বীনি বিষয়ে তাদের প্রতি নমনীয়ভাব দেখানো যাবে না। অন্তরে তাদের জন্য কোনো ভালোবাসা রাখা যাবে না। মুসলমানদের বিপরীতে তাদের ন্যূনতম সাহায্য-সহযোগিতাও করা যাবে না। এক কথায় তাদের সাথে পূর্ণরূপে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। তবে ইসলামি রাষ্ট্রে জিজিয়া-কর দিয়ে বসবাসরত অমুসলিমদের সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করা জরুরি, অনুরূপ দারুল কুফরে বসবাসরত কাফিরদের সাথে বৈধ পার্থিব লেনদেন করারও অনুমতি আছে।

তিন : গুনাহগার ও ফাসিক মুমিনশ্রেণি। এদের পাপ ও গুনাহের হিসাবে 'ওয়ালা' ও 'বারা' এর মধ্যে কমবেশ হতে থাকবে। সুতরাং যার গুনাহ অধিক ও জঘন্য হবে তার সাথে 'ওয়ালা' এর তুলনায় 'বারা' অধিক থাকবে। আর যার গুনাহ স্বল্প ও হালকা হবে, তার প্রতি 'বারা' এর পরিমাণও কমে যাবে। যেমন: বিদআত, প্রকাশ্য কবিরা গুনাহ, ইসলামি শিআর সংশ্লিষ্ট গুনাহ ইত্যাদির ক্ষেত্রে 'বারা' এর পরিমাণ বেশি থাকবে, আর সগিরা গুনাহ, অপ্রকাশ্য কবিরা গুনাহ বা গুনাহের পর তাওবা করলে 'বারা' এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হবে। আর খালিস দিলে তাওবা করলে তো আর কোনো 'বারা'-ই রাখা যাবে না।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা যেমন কুফর, শিরক থেকে মুমিনদের 'বারা' ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেছেন, তেমনই গুনাহ ও ফিসকের প্রতিও মুমিনদের ঘৃণা সৃষ্টির কথা বলেছেন। তাই যারা বলে, 'বারা' শুধু কাফিরদের জন্যই খাস, তাদের কথা ঠিক নয়। বস্তুত গুনাহগারদের জন্যও 'বারা' আছে; যদিও তা কাফির-তাগুতদের 'বারা' এর মতো কঠিন নয়। উভয়ের মাঝে অবস্থাভেদে ও অপরাধের মাত্রা অনুসারে অনেক তারতম্য ও ফারাক রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'আর মহান হজের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে যে, নিশ্চয় মুশরিকদের থেকে আল্লাহ দায়মুক্ত এবং তাঁর রাসুলও। অতএব, তোমরা যদি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি মুখ ফিরাও, তবে জেনে রেখো যে, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না। আর কাফিরদের মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও।'

এ দুই আয়াতে কাফির ও তাগুতদের সাথে স্পষ্ট ভাষায় 'বারা' বা সম্পর্কচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে। তাই প্রতিটি মুমিনের জন্য অবশ্যকর্তব্য হলো, তারাও যেন সব কাফির ও তাগুত থেকে 'বারা' এর ঘোষণা দেয়।

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর তোমরা জেনে রাখো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসুল রয়েছেন। তিনি অনেক বিষয়ে তোমাদের কথা মানলে তোমরাই কষ্ট পেতে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করেছেন এবং সেটাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন। আর কুফরি, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের কাছে অপ্রিয় করেছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত।'

টিকাঃ
৮৯. সুরা আল-মুমতাহিনা: ৪
৯০. সুরা আত-তাওবা: ০৩
৯১. সুরা আল-হুজুরাত : ০৭

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর সারকথা

📄 ‘আল-ওরায়া ওয়াল-বারা’ এর সারকথা


এক. কাফিরদের সাথে অন্তরঙ্গ বা বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো সম্পর্ক রাখা যাবে না। চাই দ্বীনি বিষয়ে হোক বা পার্থিব বিষয়ে। তবে হ্যাঁ, পার্থিব জরুরত ও লেনদেন ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাদের সাথে প্রয়োজন-মাফিক উঠাবসা করা যাবে।

দুই. কাফিরদের প্রতি অন্তরে ঘৃণা ও বিদ্বেষ লালন করতে হবে। তাদেরকে আল্লাহ, রাসুল, দ্বীন ও মুসলমানদের শত্রু জ্ঞান করতে হবে। দ্বীনি বিষয়ে তাদের প্রতি সামান্য নমনীয়তাও দেখানো যাবে না।

তিন. মুসলমানদের বিপরীতে কাফিরদের কোনোরূপ সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না। আর্থিক, সামরিক, আদর্শিক কোনোভাবেই না।

চার. দ্বীন নিয়ে কাফিরদের হাসি-ঠাট্টা ও বিরোধিতার বৈঠকে অংশগ্রহণ করা যাবে না। এমন মজলিস, হলরুম বা সংসদ অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে।

পাঁচ. কাফিরদের নিঃশর্ত অনুসরণ করা থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকতে হবে।

ছয়. কাফিরদেরকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ, উল্লেখযোগ্য বা সম্মানযোগ্য কোনো পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

সাত. একান্ত দ্বীনি বা পার্থিব প্রয়োজন ছাড়া কাফিরদের দেশে বসবাস বা সফর করা যাবে না।

আট. কাফিরদের ধর্মীয় পোশাক-আশাক, কালচার ও চলাফেরার সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

নয়. কাফিরদের ধর্মীয় বা কোনো আনন্দ উৎসবে যোগ দেওয়া যাবে না এবং এ উপলক্ষ্যে অভিনন্দন জানানো যাবে না।

দশ. কাফির থাকাবস্থায় তাদের জন্য রহমত ও ক্ষমার দুআও করা যাবে না। মারা গেলে একেবারেই না। আর জীবিত থাকলে শুধু হিদায়াতের দুআ করা যাবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px