📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 পাঁচ. ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া

📄 পাঁচ. ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া


ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া অর্থ দ্বীনের ব্যাপারে বিমুখতা প্রদর্শন করা। এভাবে বলা যে, আমার সাথে আল্লাহ ও রাসুলের বা ইসলামের কোনো শত্রুতাও নেই আবার কোনো বন্ধুত্বও নেই। আমি সবার ক্ষেত্রে সমতায় বিশ্বাসী ও সব ধর্মকেই সমান মর্যাদার চোখে দেখি। এমন কথা বলা বা বিশ্বাস করা নিঃসন্দেহে কুফরি।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
'তাদের যখন বলা হয়, আল্লাহ তাআলা যা অবতরণ করেছেন তার দিকে এবং রাসুলের দিকে এসো, তখন মুনাফিকদের তুমি দেখবে, তারা তোমার নিকট হতে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
'তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনলাম এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করলাম। কিন্তু এরপর ওদের একদল বিমুখতা প্রদর্শন করে। ওরা নিশ্চিত মুমিন নয়। যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে তাদের মাঝে ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর যদি তাদের প্রাপ্য থাকে, তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসুলের নিকট ছুটে আসে। তাদের অন্তরে কি ব্যাধি আছে? না তারা সংশয় পোষণ করে? না তারা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ওদের প্রতিও জুলুম করবেন? বরং ওরাই তো জালিম। '

ইমাম ইবনে কাইয়িম জাওজিয়া বলেন:
'কুফরে ইরাজ বা বিমুখতামূলক কুফর হলো, কর্ণ ও অন্তর দিয়ে রাসুল থেকে বিমুখতা প্রদর্শন করা। রাসুল-কে সত্যায়নও না করা, আবার শত্রুতাও না করা এবং তাঁর আনীত দ্বীনের প্রতি বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ না করা। '

টিকাঃ
৬০. সুরা আন-নিসা: ৬১
৬১. সুরা আন-নুর: ৪৭-৫০
৬২. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৩৪7 (দারুল কিতাবিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ছয়. দ্বীনের কোনো বিধান অপছন্দ করা

📄 ছয়. দ্বীনের কোনো বিধান অপছন্দ করা


ইমান ঠিক থাকার জন্য দ্বীনের সকল বিধানের প্রতি নিঃশর্ত সন্তুষ্টি ও আনুগত্য প্রকাশ আবশ্যক। অতএব, কেউ যদি দ্বীনের সুসাব্যস্ত কোনো বিধানের ব্যাপারে নাক ছিটকায় বা কোনো আইনের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করে, তাহলে তা যত ছোট বিধান-ই হোক না কেন, এতে তার ইমান বিনষ্ট হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
'যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ এবং তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দেবেন। এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তাআলা যা অবতরণ করেছেন, ওরা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দেবেন। '

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া শরিয়তের যে কোনো বিধান অপছন্দ করাকে 'নাওয়াকিজুত তাওহিদ' বা তাওহিদ ভঙ্গকারী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণ উল্লেখ করে বলেন:
'কেননা, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল-এর প্রদানকৃত সকল সংবাদ স্বীকার করে, মুমিনরা যা সত্যায়ন করে, সেও তার সবই সত্যায়ন করে; এতদসত্ত্বেও তার প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার চাহিদা মোতাবেক না হওয়ার কারণে সে তা অপছন্দ করে, এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে এবং অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। সে বলে, আমি এটার স্বীকৃতি দেবো না এবং তা আঁকড়ে ধরব না। আমি এই বিধানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি এবং এটাকে ঘৃণা করি। এটা প্রথম প্রকার- ভিন্ন আরেকটি প্রকার। এই ব্যক্তির কুফরি ইসলামের সুনিশ্চিত দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং পুরো কুরআনে এ প্রকারের কুফরে লিপ্ত ব্যক্তিকে কাফির বলার বিষয়টি ভরপুর। '

টিকাঃ
৬৩. সুরা মুহাম্মাদ: ৮-৯
৬৪. আস-সারিমুল মাসলুল: ৫২২ (আল-হারাসুল অতনি, সৌদিআরব)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 সাত. দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা বা গালি দেওয়া

📄 সাত. দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা বা গালি দেওয়া


আল্লাহ, রাসুল বা দ্বীনের বড় থেকে ছোট কোনো বিধানের ব্যাপারে যদি কেউ ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা তুচ্ছ জ্ঞান করে কিংবা আল্লাহ বা তাঁর রাসুলকে গালি দেয়, তাহলে সে সঙ্গে সঙ্গে ইমান থেকে বের হয়ে কাফির হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন: 'মুনাফিকরা আশঙ্কা করে এমন সুরা না আবার অবতীর্ণ হয়ে যায়, যা তাদের অন্তরের কথা ব্যক্ত করে দেবে। আপনি বলে দিন, তোমরা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে থাকো। তোমরা যা আশঙ্কা করছ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা প্রকাশ করে দেবেন। আপনি তাদের প্রশ্ন করলে নিশ্চয়ই তারা বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে? ছলনা করো না, তোমরা ইমান আনার পর কুফরি করেছ। তোমাদের মধ্যে কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেবো; এ জন্য যে, তারা ছিল অপরাধী।'

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: 'আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা কুফরি হওয়ার ব্যাপারে এই আয়াতটি সুস্পষ্ট। তাহলে গালি দেওয়ার ব্যাপারটি তো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না।'

তিনি আরও বলেন:
'যদি কেউ আল্লাহ বা রাসুল-কে গালি দেয়, তাহলে সে ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকে কাফির হয়ে যাবে। চাই গালিদাতা এটা হারাম মনে করুক বা হালাল মনে করুক অথবা কোনো ধরনের বিশ্বাসই না রাখুক। এটাই ফুকাহায়ে কিরাম ও আহলুস সুন্নাহর মাজহাব, যারা এ কথার প্রবক্তা যে, ইমান হলো কথা ও কাজের নাম। ইমাম শাফিয়ি ও ইমাম আহমাদ-এর সমপর্যায়ভুক্ত প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুইয়া বলেন, মুসলমানদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ বা তাঁর রাসুল-কে গালি দেবে, সে কাফির হয়ে যাবে; যদিও সে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তা স্বীকার করে।'

টিকাঃ
৬৫. সুরা আত-তাওবা: ৬৪-৬৬
৬৬. আস-সারিমুল মাসলুল: ৩১ (আল-হারাসুল অতনি, সৌদিআরব)
৬৭. আস-সারিমুল মাসলুল: ৫১২

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 আট. গাইরুল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা

📄 আট. গাইরুল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা


আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির নিকট সরাসরি কোনো কিছু প্রার্থনা করা সুস্পষ্ট শিরক, যা মানুষের ইমান বিনষ্ট করে দেয়। যেমন: পির-আওলিয়ার কাছে সন্তান চাওয়া, কোনো কবরবাসীর কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া ইত্যাদি।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও আহ্বান করো না, যা তোমার উপকারও করে না, অপকারও করে না। কারণ, এটা করলে তো তুমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর আল্লাহ যদি তোমার ওপর কোনো কষ্ট আরোপ করেন, তিনি ছাড়া আর কেউ নেই, যে তা দূর করবে। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে এমন কেউ নেই, যে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করবে। তাঁর বান্দাদের মধ্যে তিনি যাকে ইচ্ছা কল্যাণ দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
'আল্লাহর সাথে অপর কাউকে ডেকো না। '

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন :
'লেহ দুনওয়াতু আহলুল হক্কি। সত্যের আহ্বান একমাত্র তাঁরই। আর যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদের ডাকে, তারা তাদের আহ্বানে কোনোই সাড়া প্রদান করে না। '

আল্লামা শাওকানি বলেন:
'সমস্ত দুআ আল্লাহর জন্য হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওহিদ খাঁটি হতে পারে না। আহ্বান, সাহায্য-প্রার্থনা, আশা-আকাঙ্খা, কল্যাণ চাওয়া এবং অকল্যাণ দূর করতে চাওয়া ইত্যাদি আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহরই পক্ষ থেকে। অন্যের জন্য নয়, অন্যের পক্ষ থেকেও নয়। '

তবে যেসব বিষয়ে আল্লাহ মাখলুককে সক্ষমতা দান করেছেন সেসব ক্ষেত্রে মাখলুককে মাধ্যম মনে করে তার সাহায্য চাওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন কেউ গর্তে পড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, ভাই, আমাকে বাঁচাও, আমাকে সাহায্য করো। এ ঘটনায় তাকে সাহায্য করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য আল্লাহ মাখলুককে দান করেছেন, তাই এখানে অসিলা বা মাধ্যম হিসাবে মাখলুকের কাছে সাহায্য চাওয়া শিরক হবে না। এভাবে দুনিয়ার অন্যান্য কাজে একে অপরের কাছে সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়া সম্পূর্ণরূপে জায়িজ। এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরামের ইজমা রয়েছে।

'আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা'-তে বলা হয়েছে:
'উলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, মাখলুকের সাধ্যের মধ্যে হলে তার কাছে কোনো অনিষ্ট দূরীকরণ বা কোনো সুবিধা অর্জনের জন্য সাহায্য চাওয়া বৈধ; চাই সে যে মাখলুকই হোক না কেন। অতএব, মুসলিম বা কাফির, ভালো বা মন্দ সব ধরনের লোকের কাছেই সাহায্য চাওয়া যাবে। '

'ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমা'-তে এসেছে :
'জীবিত, উপস্থিত ও সক্ষম ব্যক্তির কাছে তার সাধ্যের মধ্যে সাহায্য চাওয়া বৈধ। যেমন, কেউ কোনো লোকের কাছে সহযোগিতার জন্য কিছু টাকা ঋণ চাইল অথবা বাদশার নিকট কোনো অধিকার আদায় বা জুলুম দূর করতে তার শক্তি বা প্রভাবের সাহায্য কামনা করল। '

বুঝা গেল, মাখলুকের কাছে কোনো কিছু চাইলেই তা ইমান বিনষ্টের কারণ হবে না; বরং দেখতে হবে, যা চাওয়া হচ্ছে তা মাখলুকের সাধ্যে আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে তা শিরক হবে না এবং এতে কোনো সমস্যাও হবে না। যেমন লেনদেন, চলাফেরা, উঠাবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরস্পরে এক অপরের সাহায্য চাওয়া। আর যদি তা বান্দার সাধ্যের বাইরে হয় তাহলে তা হবে শিরক এবং এর কারণে তার ইমান বিনষ্ট হয়ে যাবে। যেমন সরাসরি পিরের কাছে সন্তান চাওয়া, মৃত ব্যক্তির কাছে বিপদআপদ থেকে মুক্তি চাওয়া ইত্যাদি।

টিকাঃ
৬৮. সুরা ইউনুস: ১০৬-১০৭
৬৯. সুরা আল-জিন: ১৮
৭০. সুরা আর-রাদ: ১৪
৭১. আল-ফাতহুর রাব্বানি: ১/৩৩৮ (মাকতাবাতুল জাইলিল জাদিদ, সানআ)
৭২. আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা: ৪/৩০ (অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, কুয়েত)
৭৩. ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমা: ১/১৭৪ (রিয়াসাতu ইদারাতিল বুহুসিল ইলমিয়্যা ওয়াল ইফতা, রিয়াদ)

ফন্ট সাইজ
15px
17px