📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 দুই. তাওহিদুল উলুহিয়্যা

📄 দুই. তাওহিদুল উলুহিয়্যা


তাওহিদুল উলুহিয়্যা অর্থ, কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দেওয়া। সুতরাং ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই হতে হবে। আর ইবাদত হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা কিছুর আদেশ-নিষেধ করেছেন, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আনুগত্য করা।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ইবাদতের সংজ্ঞায় বলেন:
الْعِبَادَةُ هِيَ اسْمُ جَامِعُ لِكُلِّ مَا يُحِبُّهُ اللَّهُ وَيَرْضَاهُ: مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَعْمَالِ الْبَاطِنَةِ وَالظَّاهِرَةِ
'আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় সকল অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কথা ও কাজের সমষ্টির নাম হলো ইবাদত।'

তাওহিদুল উলুহিয়্যাকে 'তাওহিদুল ইবাদাহ'-ও বলা হয়। কেননা, ألوهية (উলুহিয়্যা) শব্দ থেকে নির্গত مألوه (মালুহ) এর অর্থ হলো معبود (মাবুদ) বা ইবাদতের উপযুক্ত। তাওহিদুল উলুহিয়্যা-ই হলো সেই তাওহিদ, যার দিকে সকল নবি-রাসুল আহ্বান করেছেন এবং যার জন্য আসমানি কিতাবসমূহ নাজিল হয়েছে। এটা 'তাওহিদুর রুবুবিয়্যা'-কেও অন্তর্ভুক্ত করে। কেননা, 'তাওহিদুল উলুহিয়্যা' হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, যার কোনো শরিক নেই। আর ইবাদতের ক্ষেত্রে যার একত্ববাদ মেনে নেওয়া হয়, প্রকারান্তরে সৃষ্টি, রাজত্ব, পরিচালনা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও তার একত্ববাদকে মেনে নেওয়া হয়। তাই এ দুটি প্রকারের মাঝে তাওহিদুল উলুহিয়্যা-ই হলো আসল ও মূল।

এই তাওহিদের মূল কথা হলো, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে কথায় বা কাজে তাঁর কোনো সৃষ্টিকে শরিক না করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে আর কাউকে শরিক করো না এবং পিতামাতার সাথে সদাচরণ করো।'

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'তোমার রব এটা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সাথে সদ্বব্যবহার করবে।'

টিকাঃ
৪১. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১০/১৪৯ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)
৪২. সুরা আন-নিসা: ৩৬
৪৩. সুরা বনি ইসরাইল: ২৩

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 তিন. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত

📄 তিন. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত


তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত অর্থ কোনো ধরনের (তাহরিফ) বা বিকৃতিসাধন, تعطিল (তাতিল) বা নিষ্ক্রিয়করণ تكييف বা ধরন নির্ধারণ এবং تمثیل (তামসিল) বা সাদৃশ্য প্রদান ব্যতীত আল্লাহ তাআলার নামসমূহ ও গুণাবলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى
'আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। উত্তম সব নাম তো তাঁরই।'

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ. هُوَ اللهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ. هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
'তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। তিনি অসীম দয়াময় ও পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তিদাতা, তিনিই নিরাপত্তা বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অতীব মহিমান্বিত। ওরা (কাফিররা) যাদের শরিক স্থির করে আল্লাহ তাআলা তা হতে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ। সৃজনকর্তা, অস্তিত্বদাতা, রূপদাতা, উত্তম সব নাম তো তাঁরই। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
'আল্লাহর প্রতি ইমানের অংশ হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে নিজের জন্য যেসব গুণ সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ তাঁর রবকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন, সেগুলোর প্রতি কোনো ধরনের তাহরিফ (বিকৃতিসাধন), তাতিল (নিষ্ক্রিয়করণ), তাকয়িফ (ধরন নির্ধারণ) ও তামসিল (সাদৃশ্য প্রদান) ব্যতীত ইমান আনা। বরং বান্দাগণ এ বিশ্বাস করবে, আল্লাহ তাআলা এমন মহান যে, “তার মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সুরা আশ-শুরা : ১১] সুতরাং আল্লাহ নিজের জন্য যেসব গুণ সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলো অস্বীকার করা যাবে না, আল্লাহর কালাম বিকৃত করা যাবে না, আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহের অপব্যাখ্যা করা যাবে না, তাঁর কোনো আকৃতি বর্ণনা করা যাবে না এবং তাঁর গুণাবলির সাথে মাখলুকের গুণাবলির কোনো তুলনা করা যাবে না। কেননা, আল্লাহর সমতুল্য কেউ নেই, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, তাঁর নেই কোনো অংশীদার। সৃষ্টির দ্বারা তাঁকে অনুমান করা যাবে না। কেননা, তিনিই নিজের ব্যাপারে এবং অন্যের ব্যাপারে সৃষ্টির চেয়ে অধিক জ্ঞাতা, অধিক সত্যবাদী এবং সর্বোত্তম বর্ণনাকারী। অতপর তাঁর রাসুলগণ হলেন মহাসত্যবাদী যারা আল্লাহর ওপর এমন বিষয় আরোপ করে, যা তারা জানে না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “ওরা যা আরোপ করে, তোমার রব তা হতে পবিত্র, যিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী। শান্তি বর্ষিত হোক রাসুলদের প্রতি। সকল প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহরই প্রাপ্য।” [সুরা আস-সাফফাত : ১৮০-১৮২] সুতরাং নবি-রাসুলের বিরোধীরা আল্লাহর জন্য যেসব গুণ আরোপ করে, আল্লাহ সেগুলো থেকে নিজেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন এবং রাসুলদের প্রতি শান্তি বর্ষণ করেছেন। কেননা, তাঁরা যা বলেন, তা দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নাম ও গুণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচকের সমন্বয় সাধন করেছেন। সুতরাং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর জন্য রাসুলদের আনীত হিদায়াত থেকে ফেরার কোনো অবকাশ নেই। কেননা, এটাই হলো সিরাতে মুসতাকিম বা সরল পথ; তাদের পথ, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন— আম্বিয়ায়ে কিরাম, সিদ্দিকিনে কিরাম, শুহাদায়ে কিরাম ও সালিহিনের পথ। '

বি. দ্র.: এ তিনটি প্রকারের পাশাপাশি অনেকের মুখে তাওহিদুল হাকিমিয়্যা নামে আরেকটি প্রকারের কথা শোনা যায়। এর মর্মার্থ হলো, আইন বা বিধান একমাত্র আল্লাহরই। এটা প্রণয়নের একচ্ছত্র অধিকার কেবল তাঁরই। এতে বান্দার কোনো শিরকত থাকতে পারবে না। আল্লাহ আইন করে দেবেন, আর বান্দা তা বাস্তবায়ন করবে। আল্লাহর আইন বা বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন করা স্পষ্ট শিরক বা কুফর। তাই এটাও বিশুদ্ধ তাওহিদের জন্য অতিআবশ্যক একটি শর্ত। তবে আমাদের উলামায়ে সালাফ এটাকে তাওহিদের তিন প্রকার থেকে অতিরিক্ত একটি প্রকার হিসাবে উল্লেখ করেননি; বরং এটাকে তাওহিদুর রুবুবিয়্যা বা তাওহিদুল উলুহিয়্যার অন্তর্গত করেছেন। আল্লাহ তাআলা ছাড়া যেহেতু অন্য কারও আইন প্রণয়ন করা, আদেশ করা, নিষেধ করা ও পরিচালনা করার অধিকার নেই, সে অর্থে এটা তাওহিদুর রুবuবিয়‍্যার অন্তর্ভুক্ত। আর এসব আইন মানা ও বাস্তবায়ন করা যেহেতু বান্দার দায়িত্ব; তাই এ অর্থে এটা তাওহিদুল উলুহিয়্যা বা তথা তাওহিদুল ইবাদার অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং তাওহিদের প্রকার তিনটিই থাকছে। এর জন্য আলাদা একটি প্রকার বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। তবে কেউ বোঝার সুবিধার্থে বা গুরুত্বের বিচারে তাওহিদকে চার ভাগে বিভক্ত করলেও মৌলিক কোনো সমস্যা নেই। কেননা, মাসআলাই মূল, সংখ্যা নয়।

টিকাঃ
৪৪. সুরা তহা : ৮
৪৫. সুরা আল-হাশর: ২২-২৪
৪৬. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ৩/১২৯-১৩০ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)

ফন্ট সাইজ
15px
17px