📄 ছয়. তাকদিরের প্রতি ঈমান
তাকদিরের প্রতি ইমান আনার অর্থ হলো, এই বিশ্বাস লালন করা যে, আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা সহকারে পৃথিবী এবং তাতে অবস্থিত সকল জড় ও জীবকে সৃষ্টি করেছেন। হঠাৎ করে নিজে নিজে এ পৃথিবী সৃষ্টি হয়নি; বরং ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং পূর্ব নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসারেই আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি বস্তুর ভালো-মন্দ ও চূড়ান্ত ফলাফল তিনি লিখে রেখেছেন। কোনো জিনিসই তাঁর তাকদিরের বাইরে যেতে পারে না।
তিনি ইরশাদ করেন :
( وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا )
'তিনিই প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে পরিমিতভাবে শোধিত করেছেন। '
( وَكُلُّ شَيْءٍ عِندَهُ بِمِقْدَارٍ )
'আর তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা পরিমাণ ও সীমা রয়েছে। '
( وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا )
'আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত।'
এখান থেকে যে স্বচ্ছ ধারণাটি পাওয়া যায় তা হলো, আল্লাহর নির্ধারিত নির্দেশ ব্যতীত কোনো কিছু সামান্য পরিমাণও নড়তে পারে না। কোনো ঘটনা ঘটা বা কোনো কিছু হওয়ার আগেই তা আল্লাহ তাআলার ইলমে বিদ্যমান রয়েছে।
অতএব তাকদির হলো, আল্লাহ তাআলার চিরন্তন জ্ঞানের প্রতি এ বিশ্বাস রাখা যে, কোনো কিছু ঘটা বা হওয়ার আগেই তিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানেন।
আলি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
'চারটি বিষয়ের প্রতি ইমান আনা ব্যতীত কেউ মুমিন হতে পারে না। এক. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল। তিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। দুই. মৃত্যুর প্রতি ইমান আনা। তিন. মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি ইমান আনা। চার. তাকদিরের প্রতি ইমান আনা।'
টিকাঃ
২৩. সুরা আল-ফুরকান: ২
২৪. সুরা আর-রাদ: ৮
২৫. সুরা আল-আহজাব : ৩৮
২৬. সুনানুত তিরমিজি: ৪/২০, হা. নং ২১৪৫ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 সারকথা
এগুলোই হলো ইসলামি আকিদার মূলভিত্তি, যার কোনো একটি বা তার আংশিক না থাকলে ইসলামি আকিদা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে কোনো বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি কিংবা কমবেশ করার সামান্য পরিমাণও অবকাশ নেই। এগুলো ইমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ক। যে কারণে আল্লাহ তাআলা এই বিষয়গুলোর প্রতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ সকল মৌলিক বিশ্বাসের অস্বীকারকারীদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেন :
'আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাবসমূহ, রাসুলগণ ও কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করবে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে সুদূর ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে।'
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন :
'আপনি কি ভেবে দেখেননি যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির এমন কোনো পরামর্শ হয় না, যাতে তিনি চতুর্থ না থাকেন এবং পাঁচজনেরও হয় না, যাতে তিনি ষষ্ঠ না থাকেন; তারা এতদপেক্ষা কম হোক বা বেশি হোক, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে আছেন।'
তিনি আরও ইরশাদ করেন :
'তারা কি জেনে নেয়নি, আল্লাহ তাদের রহস্য ও সলাপরামর্শ সম্পর্কে সম্যক অবগত এবং সমস্ত গোপন বিষয় আল্লাহ খুব ভালো করেই জানেন?'
ইসলামি আকিদার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পরিপূর্ণ মানসিক স্বাধীনতা। এখানে মানুষ অন্য মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে নেয়। তাঁর অনুসরণ, ইবাদত, আনুগত্য ও নির্দেশ মেনে জীবন পরিচালনা করে। আর মুমিনের অভিভাবক আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না।
যেমন তিনি ইরশাদ করেন :
‘আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদের বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরি করে তাদের বন্ধু হচ্ছে তাগুত। তারা তাদের আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।’
সুতরাং কেউ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে পারবে না। আল্লাহর আইনের বিপরীতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করতে পারবে না বা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে অজ্ঞ-মূর্খরাই ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাই তারা সর্বদা শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। এই স্তরে এসে মানুষ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
প্রথম শ্রেণি: যারা আল্লাহকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছেন। এরাই হলো আল্লাহর খাঁটি বান্দা।
দ্বিতীয় শ্রেণি: এ শ্রেণি অভিভাবক গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক মত ও পথের অনুসরণ করে থাকে। তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টিকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে। হতে পারে তা নির্জীব মূর্তি কিংবা তাগুত শাসক ও বিচারক। আবার হতে পারে জাতীয়তা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র বা সাম্যবাদের মতো বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ﴿فَرِيقًا هَدَى وَفَرِيقًا حَقَّ عَلَيْهِمُ الضَّلَالَةُ إِنَّهُمُ اتَّخَذُوا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ اللَّهِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ ﴾
‘এক দলকে তিনি পথপ্রদর্শন করেছেন এবং একদলের জন্য পথ ভ্রষ্টতা অবধারিত হয়ে গেছে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানদের অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করেছে। অথচ তারা ধারণা করে যে, তারা সৎ পথে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন: ( اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّরُونَ )
'তোমরা অনুসরণ করো, যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যান্য (বাতিল) অভিভাবকদের অনুসরণ করো না। আর তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।'
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ব্যতীত অন্য কাউকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করা বা অনুসরণ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সম্বোধন করে আল্লাহ ইরশাদ করেন: ( قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّমَاوَاتِ وَالْأَرْضِ )
'আপনি বলে দিন, আমি কি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করব?'
এই আয়াতের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, একজন মুসলমান পরিপূর্ণ স্বাধীন বিবেকের অধিকারী। আর এটাই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা, যা মন-মানসিকতায় আনে প্রশান্তি এবং অন্তরে জাগ্রত করে আল্লাহর মহত্ত্বের অনুভূতি। এই স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্রতা জাগতিক সৃষ্ট পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুসলমানদের মুক্ত করে রাখে। তাই তো একজন প্রকৃত মুসলিম কোনো স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুর পরোয়া না করে একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে।
উল্লিখিত আলোচনায় ইমানের মূল ভিত্তি ও ইসলামি আকিদার মৌলিক ছয়টি বিষয় ও তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। বস্তুত ইসলামি আকিদা শরিয়ার ব্যাপক ও বিস্তৃত একটি অধ্যায়, যার বিস্তারিত ও বিশদ বিবরণ দেওয়া এ সংক্ষিপ্ত কলেবরে সম্ভব নয়।
টিকাঃ
২৭. সুরা আন-নিসা: ১৩৬
২৮. সুরা আল-মুজাদালা: ৭
২৯. সুরা আত-তাওবা: ৭৮
৩০. সুরা আল-বাকারা: ২৫৭
৩১. সুরা আল-আরাফ: ৩০
৩২. সুরা আল-আরাফ: ৩
৩৩. সুরা আল-আনআম: ১৪