📄 তিন. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান
নবি-রাসুলদের ওপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ইমান আনা ইসলামি আকিদার অন্যতম ভিত্তি। আসমানি কিতাবসমূহ অনেক। তন্মধ্যে চারটি হলো বড় ও প্রধান কিতাব। তথা তাওরাত, জাবুর, ইনজিল ও কুরআন। এই আসমানি গ্রন্থগুলোতে রয়েছে মানবতার হিদায়াত ও কল্যাণ, যা মানুষকে উভয় জাহানের শান্তি ও মুক্তির পথ দেখায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ﴿নَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ - مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ ﴾ 'তিনি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন সত্যতার সাথে; যা সত্যায়ন করে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের। আর তিনি এ কিতাবের পূর্বে মানুষের হিদায়াতের জন্য নাজিল করেছেন তাওরাত ও ইনজিল এবং অবতীর্ণ করেছেন কুরআন।'
তিনি আরও ইরশাদ করেন : ﴿وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا ﴾ 'আর আমি দাউদকে দান করেছি জাবুর।'
টিকাঃ
১৯. সুরা আলি ইমরান : ৩-৪
২০. সুরা আন-নিসা : ১৬৩
📄 চার. নবি-রাসুলদের প্রতি ঈমান
অতঃপর নবি-রাসুলদের প্রতি ইমান আনা। তাঁরা ছিলেন মানবজাতির কান্ডারি। মানবতার শান্তি ও সৌভাগ্যের পথপ্রদর্শক। তাদের দান করা হয়েছে অদম্য মনোবল এবং অনন্য গুণাবলি। তাই তাঁরা আল্লাহ তাআলার রিসালাতের মহান দায়িত্ব আদায় করতে পেরেছেন। নিঃসন্দেহে নবি-রাসুলগণ ছিলেন সর্বোৎকৃষ্ট মানব। কারণ, তাঁরা ছিলেন এমন পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী, যার সামনে অন্য মানুষদের স্বভাব- চরিত্র একেবারেই নগণ্য।
এঁরাই হলেন রবের প্রেরিত দূত, মানবতার পথপ্রদর্শক, জগতের আলোকবর্তিকা। তাঁরা তাঁদের উচ্চ মনোবল, দৃঢ় ধৈর্যশক্তি ও পরিপূর্ণ ইমানের মাধ্যমে হতভাগ্য, দারিদ্র্য-দুর্দশাগ্রস্ত ও সংকীর্ণ একটি সমাজকে সুখী, সচ্ছল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সমাজে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরাই পেরেছেন দেশ ও মানবতার সকল ক্লান্তি, অবসাদ ও নির্যাতন বিদূরিত করে একটি শান্তিময় ও সুখের রাজ্য উপহার দিতে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : 'আর আমি অনেক রাসুল পাঠিয়েছি, ইতিপূর্বে যাদের ইতিবৃত্ত আমি আপনাকে শুনিয়েছি এবং অনেক রাসুল পাঠিয়েছি, যাদের বৃত্তান্ত আপনাকে শুনাইনি। আর আল্লাহ মুসার সাথে সরাসরি কথোপকথন করেছেন।'
উল্লেখ্য যে, নবি-রাসুলদের কাউকে অস্বীকার করার অধিকার কারও নেই। সকলের প্রতিই ইমান আনতে হবে সমানভাবে। কারও প্রতি ইমান আনবে আর কারও প্রতি আনবে না; এমনটি করার সুযোগ নেই। অবশ্য শরিয়তগুলোর মধ্য হতে বর্তমানে শুধু শেষ নবি মুহাম্মাদ- এর শরিয়তই বহাল আছে এবং পূর্বের নবিদের শরিয়ত রহিত হয়ে গেছে। তাই শরিয়তের ক্ষেত্রে এখন শুধু শরিয়তে মুহাম্মাদিই মানতে হবে; অন্যথায় নাজাত মিলবে না।
টিকাঃ
২১. সুরা আন-নিসা : ১৬৪
📄 পাঁচ. কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান
ইমানের মৌলিক বিষয়গুলোর অন্যতম হলো কিয়ামত দিবসের প্রতি ইমান রাখা। কিয়ামত হলো আল্লাহর সকল সৃষ্টির ধ্বংস শেষে বিচার দিবস। যেদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকুলের যাবতীয় বিষয়ের হিসাব-নিকাশ করে ভালো-মন্দের ফয়সালা করবেন। যে দিবসে কারও সামান্য পাপ বা অপরাধ থাকলেও তা দৃষ্টিগোচর হবে এবং কারও সুঁই পরিমাণ পুণ্য থাকলে তাও দৃশ্যমান হবে। কোনো কিছুই সেদিন গোপন থাকবে না।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ﴿يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ ﴾
‘সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে প্রকাশ পাবে, যাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো হয়। অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলেও তা দেখতে পাবে।'
কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন-হাদিসের বিভিন্ন স্থানে মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের সাথে বিশেষভাবে শুধু কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, 'যারা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে...।' এর কারণ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে স্বাভাবিকত অন্যান্য বিষয়েও বিশ্বাস রাখে। এ ভিত্তিতে বলা যায়, মুমিনকে কাফির থেকে পৃথক করার জন্য এ দুটি আলামতই যথেষ্ট। অনেক কাফির আছে, যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী হলেও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাসী নয়। তাই মুমিন হতে হলে তাকে অবশ্যই কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।
টিকাঃ
২২. সুরা আজ-জিলজাল: ৬-৮
📄 ছয়. তাকদিরের প্রতি ঈমান
তাকদিরের প্রতি ইমান আনার অর্থ হলো, এই বিশ্বাস লালন করা যে, আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা সহকারে পৃথিবী এবং তাতে অবস্থিত সকল জড় ও জীবকে সৃষ্টি করেছেন। হঠাৎ করে নিজে নিজে এ পৃথিবী সৃষ্টি হয়নি; বরং ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং পূর্ব নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসারেই আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি বস্তুর ভালো-মন্দ ও চূড়ান্ত ফলাফল তিনি লিখে রেখেছেন। কোনো জিনিসই তাঁর তাকদিরের বাইরে যেতে পারে না।
তিনি ইরশাদ করেন :
( وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا )
'তিনিই প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে পরিমিতভাবে শোধিত করেছেন। '
( وَكُلُّ شَيْءٍ عِندَهُ بِمِقْدَارٍ )
'আর তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা পরিমাণ ও সীমা রয়েছে। '
( وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا )
'আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত।'
এখান থেকে যে স্বচ্ছ ধারণাটি পাওয়া যায় তা হলো, আল্লাহর নির্ধারিত নির্দেশ ব্যতীত কোনো কিছু সামান্য পরিমাণও নড়তে পারে না। কোনো ঘটনা ঘটা বা কোনো কিছু হওয়ার আগেই তা আল্লাহ তাআলার ইলমে বিদ্যমান রয়েছে।
অতএব তাকদির হলো, আল্লাহ তাআলার চিরন্তন জ্ঞানের প্রতি এ বিশ্বাস রাখা যে, কোনো কিছু ঘটা বা হওয়ার আগেই তিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানেন।
আলি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন:
'চারটি বিষয়ের প্রতি ইমান আনা ব্যতীত কেউ মুমিন হতে পারে না। এক. এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল। তিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। দুই. মৃত্যুর প্রতি ইমান আনা। তিন. মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি ইমান আনা। চার. তাকদিরের প্রতি ইমান আনা।'
টিকাঃ
২৩. সুরা আল-ফুরকান: ২
২৪. সুরা আর-রাদ: ৮
২৫. সুরা আল-আহজাব : ৩৮
২৬. সুনানুত তিরমিজি: ৪/২০, হা. নং ২১৪৫ (দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।