📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 দুটি কথা

📄 দুটি কথা


একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলার পথে সামগ্রিক যে দিক-নির্দেশনার দরকার হয়, সেটাই হলো জীবনব্যবস্থা। পৃথিবীতে মৌলিকভাবে দু’ধরনের জীবনব্যবস্থা বিদ্যমান। একটি হলো, আল্লাহ্‌প্রদত্ত নির্দেশিকা, যাকে বলা হয় ইসলামি জীবনব্যবস্থা। আরেকটি হলো, মানবরচিত জীবনব্যবস্থা, যা বিভিন্ন শ্রেণির দর্শন ও যুক্তিভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন: হিন্দুইজম, সেক্যুলারিজম, ডেমোক্রেসি ইত্যাদি।

এত এত জীবনব্যবস্থার মধ্যে ইসলামি জীবনব্যবস্থা একেবারেই স্বতন্ত্র ও অনন্য। কারণ, তা এমন এক মহান সত্তা-প্রদত্ত জীবন নির্দেশিকা, যিনি ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল বিষয়ে অবগত। এর বিপরীত মানুষের জ্ঞান ও গবেষণা ক্ষুদ্রাতি থেকে ক্ষুদ্র। স্বাভাবিকতই উভয়ের প্রদত্ত জীবনব্যবস্থার মাঝে থাকবে আকাশ-পাতাল ব্যবধান; বরং তার চেয়েও অসংখ্য গুণ বেশি।

দ্বিতীয়ত, ইসলামি জীবনব্যবস্থা এমন এক সুদৃঢ় নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার স্থায়িত্ব কিয়ামত পর্যন্ত গ্যারান্টিপ্রাপ্ত। সর্বযুগে, সর্বক্ষেত্রে ও সর্বশ্রেণির মানুষের জন্যই এর বিধিবিধান সমভাবে প্রযোজ্য। এর বিপরীত মানবরচিত জীবনব্যবস্থা হয়ে থাকে সাময়িক ও পতনোন্মুখ। বর্তমান হিসাবে একটি নীতি তৈরি করলেও কিছুদিন পর অবস্থার পরিবর্তনে সে নীতিকেই পদতলে পিষ্ট করে আবার নতুন করে আইন তৈরি করতে হয়।

তৃতীয়ত, ইসলামের প্রতিটি বিধান ন্যায় ও সুষমভাবে প্রণীত। এতে নেই কোনো প্রান্তিকতার ছোঁয়া। নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ধনী-গরিব, আরব-অনারব; সবার জন্য উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে নীতিমালা। কারও প্রতি সামান্য পরিমাণ অযাচিত কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। অগ্রাধিকারের জায়গায় অগ্রাধিকার, সাম্যের জায়গায় সাম্য, কঠোরতার পথে তাদের মুক্তি। তাই মানুষের এহেন করুণ মুহূর্তে আমরা তাদের নিকট ইসলামের শাশ্বত বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেছি। যেন তারা এর সুশীতল ছায়ায় পূর্ণরূপে আশ্রয় নিয়ে জীবনের সব ক্লেশ দূর করতে পারে এবং ইসলামের দীপ্ত আলোয় আলোকিত করতে পারে নিজেদের জীবন ও সমাজ।

মানবরচিত জীবনব্যবস্থার কুফল, স্বৈরাচারিতা ও অপূর্ণতা দেরিতে হলেও আজ সমগ্র বিশ্ব অনুধাবন করছে। ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, ভারত উপমহাদেশ, পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ— সর্বত্রই আজ মানুষ চলমান কুফরি জীবনব্যবস্থার প্রতি বিষিয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের মৌলিক বিশ্বাস বুঝতে শুরু করেছে। আল্লাহর ভূমিতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের নিয়োজিত করার চেষ্টা করছে। তাদের দৃঢ় ইমানি চেতনা ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনেক স্বৈরশাসকের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে এবং পশ্চিমাদের অনেক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে।

ইসলামের এই পুনর্জাগরণ মুসলমানদের ঘরে ঘরে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আবারও ইসলাম ফিরে আসছে। এই মুহূর্তে মুসলমানদের করণীয় হচ্ছে, বৈশ্বিক এই সংগ্রামে পূর্ণ আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সাথে স্বশরীরে অংশগ্রহণ করা। আর এ কাজের পূর্বশর্ত হিসাবে আমাদের অবশ্যই বিশ্ব-মুসলিমের সমস্যাকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। কুফরের সাথে ইসলামি বিপ্লবের প্রকৃত রূপ উপলব্ধি করতে হবে এবং ইসলাম যে মানুষের সমস্যার পরিপূর্ণ ও সঠিক সমাধান দেয়, এ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আর তাই ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের থাকতে হবে স্পষ্ট ধারণা ও স্বচ্ছ জ্ঞান।

এ মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমাদের এবারের সংকলন ‘ইসলামি জীবনব্যবস্থা’। ব্যাপক চিন্তা ও সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকে বইটি বিন্যস্ত করা হয়েছে। বস্তুত একটি বইয়ে ইসলামের সব বিধিবিধান বিশদভাবে সংকলন করা কখনোই সম্ভব নয়। তাই এতে ইসলামের কিছু বিষয়ের আলোচনা এসেছে বিশদভাবে, আর অন্যান্য বিষয়ে সাধারণ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস, কুফর ও ইসলামের সংঘাত, ইসলামি শরিয়াব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, সমরব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থায়নব্যবস্থা, দণ্ডবিধি, ফৌজদারি এবং বিভিন্ন বাতিল দর্শন ও মতবাদ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। কারণ, আমাদের সমাজে এগুলোর প্রয়োগ তো নেই-ই; এমনকি এসব নিয়ে ওয়াজ বা সাধারণ আলোচনা পর্যন্ত কোথাও করা হয় না। আর তাই মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য, সূক্ষ্মতা ও দূরদর্শিতা সম্বন্ধে একেবারেই অনবগত। এ ব্যাপারটি ভালোভাবে অনুধাবন করলে তারা খুব দ্রুতই আবার ইসলামের দিকে ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়; যেমন সন্তান স্বীয় জন্মদাত্রী মাকে চেনার পর তার কোলে ফিরে আসে। পাশাপাশি ইবাদত, তাকওয়া, আখলাক, ইনসাফ, তাওয়াক্কুল, তাজকিয়া, হুকুক, বিবাহ, তালাক ইত্যাদি বিষয়েও প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। কারণ, এসব বিষয়ে মুসলিম জনসাধারণ কমবেশি কিছুটা হলেও অবগত আছে। পুরোপুরি না হলেও তাদের আংশিক ধারণা রয়েছে। তাই এসব বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়নি। যদিও প্রয়োজনভেদে কিছু কিছু জায়গায় একটু বিশদ আলোচনাও এসেছে। এসব আলোচনায় শুধু মৌলিক দিকগুলোর প্রতিই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে; যদিও এতটুকু থেকেও মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য সম্বন্ধে যথেষ্ট ধারণা পাবে বলে আমরা আশাবাদী।

কুরআন-হাদিসের নুসুসের পাশাপাশি তাফসির, ফিকহ, উসুল, ফালসাফা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, সমরনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের শতাধিক প্রাচীন ও আধুনিক গ্রন্থকে সামনে রেখে বক্ষ্যমাণ বইটি সংকলন করা হয়েছে। গ্রন্থটি সংকলন ও বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনেক কিতাবই উপকারে এসেছে। আকায়িদ ও শরয়িব্যবস্থার ক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ, তাফসির ও ফিকহে মুদাল্লালের ওপরই কেবল নির্ভর করতে হয়েছে। শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর নুসুসের পাশাপাশি আন-নিজামুস সিয়াসি ফিল ইসলাম, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, নিজামুল ইসলাম, সিয়াসাতুত তাদাররুজ থেকেও বেশ উপকৃত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। অর্থায়নব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিতাবুল খারাজ, আল-মালু ওয়াল হুকুম ফিল ইসলাম, নিজামুল ইসলাম-সহ আরও বেশ কিছু প্রাচীন ও আধুনিক কিতাব সামনে ছিল। সমাজব্যবস্থা ও বিভিন্ন বাতিল মতবাদের ক্ষেত্রে কিতাবুশ শুয়ুইয়‍্যাহ ওয়াল ইনসানিয়্যা, আল-মাওকিফ মিনাদ দ্বীন লি-লেনিন, আসালিবুল গাজওয়ায়িল ফিকরি, আল-আলমানিয়্যাতু ও সামারাতুহাল খাবিসা, নাশআতুল আলমানিয়্যা, মা-জা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, আল-মাদখাল ইলা নাজরিয়‍্যাতিল ইলতিজামিল আম্মাহ ফিল ফিকহিল ইসলামি, তারিখু ইবনি খালদুন, মানাহিজুশ শারিয়াতিল ইসলামিয়্যা, মাজাহিবু ফিকরিয়‍্যাতিম মুআসিরা- সহ বিভিন্ন কিতাব থেকে সহায়তা নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি উপকারে এসেছে ড. আমির আব্দুল আজিজ বিরচিত 'নিজামুল ইসলাম' গ্রন্থটি।

বক্ষ্যমাণ বইটির বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনেকাংশে উক্ত গ্রন্থটিরই অনুসরণ করা হয়েছে। আল-মাকতাবাতুশ শামিলা, আল-মাকতাবাতুল কামিলা ও জাওয়ামিউল কালিমের পাশাপাশি বিভিন্ন দ্বীনি ওয়েবসাইট ও অনলাইন মাকতাবার সাহায্যও অনেক কাজে লেগেছে। ইসলামি গ্রন্থাদির পাশাপাশি কিছু জেনারেল লেভেলের বই ও উইকিপিডিয়া থেকেও প্রয়োজনমতো উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে।

গ্রন্থটিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল আনয়নের প্রতি। যথাসম্ভব শরয়ি নস থেকে দলিল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যেন প্রতিটি মাসআলার ব্যাপারে পাঠকের অন্তরে পূর্ণ আস্থা ও প্রশান্তি আসে। কারও মনে যেন কোনো সন্দেহ বা সংশয়ের অবকাশ না থাকে। গ্রন্থটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে উদ্ধৃত সব হাদিসের মান নির্ণয় করে দেওয়া হয়েছে। যেন পাঠকরা জানতে পারে, কোন দলিলের শক্তি ও মান কেমন। প্রয়োজনবশত সামান্য কয়েকটি জইফ হাদিস থাকলেও এতে অধিকাংশই সহিহ ও হাসান হাদিস আনা হয়েছে। মওজু বা অত্যাধিক দুর্বল হাদিস পুরোপুরি পরিহার করা হয়েছে। কেননা, এ দুপ্রকারের হাদিস মাসায়িল বা ফাজায়িল কোনো ক্ষেত্রেই দলিলযোগ্য নয়। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের সব হাদিসই সহিহ হওয়ায় এসব হাদিসের সাথে ভিন্নভাবে কোনো মন্তব্য উল্লেখ করা হয়নি। এ দুটি ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থের হাদিসগুলোর উদ্ধৃতি শেষে তার মান সংযুক্ত করে দেওয়া আছে। মুআমালা বা লেনদেন সংশ্লিষ্ট মাসআলার ক্ষেত্রে চার মাজহাব সামনে রেখে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও ইখতিলাফ থাকলে ইখতিলাফ বর্ণনা করে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গ্রন্থটি সুন্দর ও নিভুল করার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও এতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ভুল থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই এতে কোনো ধরনের ভুল নজরে পড়লে অবহিত করার অনুরোধ রইল; যেন পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করে নেওয়া যায়।

শেষে সকল পাঠকের উদ্দেশে বলতে চাই, পুরো বিশ্বজুড়ে আজ ইসলাম আবার জাগছে। এ জাগরণ থেকে বাড়ছে মানুষের জানার আগ্রহ। ব্যাপক অনুসন্ধিৎসু অধ্যয়ন থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের জ্ঞানের পরিধি। অথচ মুসলিম হয়েও আজ আমরা জানি না-নিজেদের দ্বীনের মর্মবাণী। উপলব্ধি করি না-ইসলামের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা। বুঝার চেষ্টা করি না-ইসলামি বিধিবিধানের সর্বজনীনতা। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী আছে? বিশ্বের এ জাগরণকালে যারা পিছিয়ে থাকবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাত সব জায়গায়ই পিছিয়ে থাকবে। মহাবিশ্বের মহাধর্ম ইসলামের জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে তাই আমাদের জানার কোনো বিকল্প নেই। যেভাবেই হোক জানুন, যেভাবেই হোক বুঝুন। তবে জানার উৎস যেন হয় নির্ভরযোগ্য এবং বুঝার মাধ্যম যেন হয় আস্থাযোগ্য। ইসলামের পূর্ণ ছায়ায় ফিরে এসে আপনার জীবন হয়ে উঠুক আল্লাহর রঙে রঙিন। আপনার চলন-বলন হয়ে উঠুক ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত। বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে এ দুআ ও প্রত্যাশাই করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমিন।

তারেকুজ্জামান
১০/০৩/২০১৯ ইং

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ইসলাম পরিচিতি

📄 ইসলাম পরিচিতি


আভিধানিক অর্থ :
'ইসলাম' শব্দটি আরবি শব্দ, যার অর্থ আনুগত্য করা, আত্মসমর্পণ করা। এটা سلم থেকে নির্গত হয়েছে। সিন, লাম ও মিমযোগে গঠিত শব্দ অধিকাংশ সময় সুস্থতা ও নিরাপত্তার অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইসলাম ধর্ম যেহেতু অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণভাবে মেনে চলার নাম, তাই অর্থের মূল ধারণ করায় 'ইসলাম' নামটি আভিধানিকভাবে যথার্থ।

ইমাম ইবনে ফারিস রাজি বলেন:
(سَلِمَ) السِّينُ وَاللَّامُ وَالْمِيمُ مُعْظَمُ بَابِهِ مِنَ الصَّحَّةِ وَالْعَافِيَةِ : وَيَكُونُ فِيهِ مَا يَشِدُّ، وَالشَّاذُ عَنْهُ قَلِيلٌ، فَالسَّلَامَةُ: أَنْ يَسْلَمَ الْإِنْسَانُ مِنَ الْعَاهَةِ وَالْأَذَى. قَالَ أَهْلُ الْعِلْمِ اللَّهُ جَلَّ ثَنَاؤُهُ هُوَ السَّلَامُ : لِسَلَامَتِهِ مِمَّا يَلْحَقُ الْمَخْلُوقِينَ مِنَ الْعَيْبِ وَالنَّقْصِ وَالْفَنَاءِ. قَالَ اللهُ جَلَّ جَلَالُهُ: {وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ} [يونس: ٢٥] ، فَالسَّلَامُ اللهُ جَلَّ ثَنَاؤُهُ، وَدَارُهُ الْجَنَّةُ. وَمِنَ الْبَابِ أَيْضًا الْإِسْلَامُ، وَهُوَ الِانْقِيَادُ : لِأَنَّهُ يَسْلَمُ مِنَ الْإِبَاءِ وَالِامْتِنَاعِ。

سلم (সালিমা)। সিন, লাম ও মিমযোগে গঠিত অধিকাংশ শব্দে সুস্থতা ও মুক্তির অর্থ রয়েছে। কখনো ব্যতিক্রমও হয়; যদিও এর সংখ্যা নিতান্তই কম। অতএব, سلامة (সালামাহ) অর্থ বিপদ ও কষ্ট থেকে মানুষের নিরাপদ থাকা। উলামায়ে কিরাম বলেন, আল্লাহ তাআলা হলেন سلام (সালাম)। যেহেতু তিনি দোষ, ত্রুটি ও বিনাশ হওয়া থেকে মুক্ত, যা মাখলুকের গুণাগুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আল্লাহ আহ্বান করেন শান্তি-নিরাপত্তার আবাসের দিকে”। [সুরা ইউনুস : ২৫] আল্লাহ হলেন শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা এবং জান্নাত হলো তাঁর আবাস। এ শব্দ থেকেই এসেছে, الإسلام (আল-ইসলাম)। এর অর্থ মান্য করা, আনুগত্য প্রদর্শন করা। (সুস্থতা ও নিরাপত্তার অর্থের সাথে ইসলামের অর্থের পুরাই মিল রয়েছে।) কেননা, এটা অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতা থেকে (মুসলিমকে) নিরাপদ করে।’

ইমাম আবু আব্দুল্লাহ জাইনুদ্দিন রাজি বলেন: وَأَسْلَمَ دَخَلَ فِي (السَّلَم) بِفَتْحَتَيْنِ وَهُوَ الْإِسْتِسْلَامُ. ‘আর أَسْلَمَ অর্থাৎ সে আনুগত্যে প্রবেশ করল। ‘ইসলাম’ এর অর্থ হলো, আত্মসমর্পণ করা ও অনুগত হওয়া।’

আল-মুনজিদে ‘ইসলাম’ এর অর্থ এভাবে বলা হয়েছে: الْاِنْقِيَادُ لِأَمْرِ الْأَمِرِ وَنَهْيِهِ بِلَا اعْتِرَاضٍ ‘কোনো প্রকারের আপত্তি ছাড়া হুকুমদাতার আদেশ-নিষেধ মান্য করা।’

এভাবে প্রায় সব অভিধানবিদই الإسلام (আল-ইসলাম) এর অর্থ ‘আনুগত্য করা ও আত্মসমর্পন করা’ লিখেছেন। আর এটাই তার মূল আভিধানিক অর্থ। এ অর্থেই কুরআনে এসেছে : فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ ) ‘যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম তাকে জবেহ করার জন্যে শায়িত করল।’

মোটকথা, আভিধানিকভাবে الإسلام (আল-ইসলাম) শব্দটি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ করার অর্থ বুঝায়। চাই মাখলুকের আনুগত্য হোক বা খালিকের, দ্বীনি বিষয়ে হোক বা পার্থিব, স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্যতামূলক; সকল ক্ষেত্রেই তাকে الإسلام (আল-ইসলাম) বলা যাবে।

পরিভাষিক অর্থ:
পরিভাষায় ইসলামের দুটি প্রকার রয়েছে। যথ: কাওনি বা ব্যবস্থাপনাগত ইসলাম এবং শরয়ি বা বিধানগত ইসলাম।

এক. কাওনি বা ব্যবস্থাপনাগত ইসলাম
আল্লাহর সৃষ্টিব্যবস্থা ও নিজামের সামনে সকল মাখলুকের আত্মসমর্পণ করার নাম কাওনি বা ব্যবস্থাপনাগত ইসলাম। আল্লাহর নির্ধারিত সৃষ্টিব্যবস্থার সাথে কেউই বিদ্রোহ বা বিরোধিতা করতে পারে না। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সব মেনে নিতে বাধ্য থাকে।

কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে : أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ 'তারা কি আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন তালাশ করছে? আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্যতামূলক একমাত্র তাঁরই আনুগত্য প্রদর্শন করে। আর সবাই তাঁরই দিকে ফিরে যাবে।"

ইসলামের এ সংজ্ঞানুসারে আল্লাহর প্রতিটি মাখলুকই মুসলিম বা আত্মসমর্পণকারী। কেননা, তাদের আল্লাহর নিজামের বাইরে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। সুস্থতা-অসুস্থতা, জীবন-মৃত্যু, সচ্ছলতা-দীনতা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষ স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় সব-মেনে নেয়। কেননা, এ ছাড়া যে তাদের ভিন্ন কোনো উপায় নেই!

বস্তুত এ ইসলাম শরিয়তের উদ্দিষ্ট নয়। এর জন্য কোনো প্রতিদান বা শাস্তি নেই। এ ইসলামের সাথে জান্নাত-জাহান্নামেরও কোনো সম্পর্ক নেই। যেহেতু এ ইসলামে কাফির-মুশরিক, মুমিন-মুনাফিক সবাই অন্তর্ভুক্ত। সকল মাখলুকই এ ইসলামে প্রবেশ করে।

দুই. শরয়ি বা বিধানগত ইসলাম
আল্লাহর দেওয়া বিধিনিষেধ ও তাঁর সকল আইন মেনে নেওয়ার নাম হলো শরয়ি বা বিধানগত ইসলাম। এটা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক একটি দ্বীন। এটা গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা হয়নি। ইসলামের আহ্বান জানানোর পর যার ইচ্ছা হয় গ্রহণ করে দুনিয়া-আখিরাতের সফলতা অর্জন করবে, আর যার ইচ্ছা হয় গ্রহণ না করে জিজিয়া-কর দিয়ে জিল্লতির সাথে বেঁচে থাকবে। এ জন্যই এর সাথে প্রতিদান বা শাস্তির বিষয়টি জড়িত। এ ইসলামের সাথেই জান্নাত-জাহান্নামের সম্পর্ক। আর শরিয়তে এ ইসলামই মুখ্য উদ্দেশ্য।

ইমাম কুরতুবি বলেন:
وَالْإِسْلَامُ بِمَعْنَى الْإِيمَانِ والطاعات، قال أَبُو الْعَالِيَةِ، وَعَلَيْهِ جُمْهُورُ الْمُتَكَلِّمِينَ
'আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং তাঁর আনুগত্য করার নাম ইসলাম। ইমাম আবুল আলিয়া বলেন, “এটাই অধিকাংশ বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের মত।”'

এটি ব্যাপক অর্থবহ একটি সংজ্ঞা, যার অধীনে আল্লাহপ্রদত্ত মানুষের জীবন পরিচালনার পদ্ধতি, ইহকালীন ও পরকালীন সকল বিধিবিধানের প্রতি বান্দার আন্তরিক সত্যায়ন এবং পরিপূর্ণ আনুগত্যসহ যাবতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত। এটিই হলো প্রকৃত ইসলামের বাস্তবতা ও তার মূলভিত্তি।

'আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা'-তে এসেছে :
هُوَ اسْتِسْلَامُ الْعَبْدِ لِلَّهِ عَزَّ وَجَل بِاتِّبَاعِ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الشَّهَادَةِ بِاللِّسَانِ، وَالتَّصْدِيقِ بِالْقَلْبِ، وَالْعَمَل بالجوارح.
'ইসলাম হলো রাসুলুল্লাহ -এর আনীত শরিয়তের অনুসরণ, যথা তাওহিদ-রিসালাতের মৌখিক স্বীকৃতি, আন্তরিক বিশ্বাস ও কাজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য প্রদর্শন করা।'

এ শরয়ি বা বিধিবিধানগত ইসলাম আবার দুপ্রকার। এক. আম বা ব্যাপক। দুই. খাস বা বিশেষ।

ক. আম ইসলাম
সকল নবি-রাসুল সমষ্টিগতভাবে যে বিধান ও দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তাকে আম ইসলাম বলা হয়। যেমন: তাওহিদ- রিসালাত, আম্বিয়া-ফেরেশতা, কিতাব-তাকদির, কবর-কিয়ামত, হাশর-নাশর, জান্নাত-জাহান্নামসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা; পাশাপাশি কুফর, শিরক, চুরি, ব্যভিচার, জাদু, জুলুমসহ সব ধরনের নিষিদ্ধ কাজ ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। এসব এমন বিধান, যা সকল নবি-রাসুলেরই দাওয়াতের অংশ ছিল। ব্যাপকভাবে তাঁরা এসব বিষয়ের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন। এগুলো কোনো যুগ বা স্থানের সাথে বিশেষিত নয়; বরং সর্বযুগে সর্বস্থানে এসব বিধানাবলি চালু ছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এতে কোনো রদ-বদল হবে না। কুরআনে এ আম অর্থে 'ইসলাম' বা 'মুসলিম'-এর ব্যবহার প্রচুর পাওয়া যায়।

আল্লাহ তাআলা নুহ -এর ব্যাপারে বলেন: فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ )
'তারপরও যদি বিমুখতা প্রদর্শন করো, তবে আমি তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় কামনা করি না। আমার বিনিময় আল্লাহর দায়িত্বে। আর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমি যেন মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হই।'

আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম -এর ব্যাপারে বলেন: ﴿ مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا ﴾ 'イবরাহিম ইহুদি ছিলেন না, খ্রিষ্টানও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম।'

আল্লাহ তাআলা ঈসা -এর হাওয়ারিদের ব্যাপারে বলেন: ﴿ فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ﴾ 'অতঃপর ঈসা যখন বনি ইসরাইলের কুফরি উপলব্ধি করতে পারলেন, তখন বললেন, কারা আছে আল্লাহর পথে আমাকে সাহায্য করবে? সঙ্গী-সাথিরা বলল, আমরা রয়েছি আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি। আর আপনি সাক্ষী থাকেন যে, আমরা হলাম মুসলমান।'

খ. খাস ইসলাম
শেষ নবি মুহাম্মাদ এর আনীত দ্বীন ও শরিয়তকে খাস ইসলাম বলে। রাসুলুল্লাহ হাদিসে জিবরিলে এ খাস ইসলাম এর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: الْإِسْلَامُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا 'ইসলাম হলো, তুমি এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, রমজান মাসের রোজা রাখবে এবং সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ করবে।'

সুতরাং যেকোনো আনুগত্যের নামই ইসলাম নয়; বরং আনুগত্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর দেওয়া বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে। আবার শুধু বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে আনুগত্য করাই যথেষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তা শেষ নবি মুহাম্মাদ এর আনীত শরিয়তের অনুকূলে হবে। অতএব, প্রকৃত ইসলাম রাসুলুল্লাহ কর্তৃক আনীত আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার নাম। এতে যে কমবেশ করবে সে প্রকৃত ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১. মাকায়িসুল লুগাহ : ৩/৯০ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
২. মুখতারুস সিহাহ: পৃ. নং ১৫৩ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত)
৩. আল-মুনজিদ: পৃ. নং ৩৪৭ (আল-মাতবাআতুল কাসুলিকিয়্যা, বৈরুত)
৪. সুরা আস-সাফফাত : ১০৩

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ইসলামের বুনিয়াদ

📄 ইসলামের বুনিয়াদ


প্রতিটি জিনিসেরই মূল কিছু বুনিয়াদ থাকে, যার ওপর ভিত্তি করে সে অস্তিত্ব লাভ করে। বুনিয়াদ না থাকলে জিনিস বিনষ্ট হয়ে যায়। বুনিয়াদ দুর্বল হলে সে জিনিসও দুর্বল হয়ে যায়। ইসলামেরও তেমনই কিছু বুনিয়াদ আছে, যার পূর্ণতায় ইসলাম পূর্ণ হয়, আর অপূর্ণতায় ইসলাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ইসলামের বুনিয়াদ হলো পাঁচটি। যথা: তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, রোজা রাখা, জাকাত দেওয়া ও হজ করা।

ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেন : بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
'ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি। যথা: এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত আদায় করা, হজ পালন করা ও রমজান মাসের রোজা রাখা।'

প্রতিটি মুমিনের মাঝে এ পাঁচটি বিষয় অবশ্যই থাকতে হবে; নচেৎ সে প্রকৃত অর্থে মুমিন নয়। পাঁচটির কোনোটিই না থাকলে তো সে পরিষ্কার কাফির। আর যদি কিছু থাকে আর কিছু না থাকে তাহলে হুকুম আরোপের দিক থেকে কিছুটা পার্থক্য হবে। কেননা, হাদিসে বর্ণিত পাঁচটি ভিত্তিমূল সমমানের বা একই মর্যাদার নয়। এগুলোর মধ্যে শ্রেণিগতভাবে কিছুটা পার্থক্য আছে।

সুতরাং প্রথমটি অর্থাৎ তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য না থাকলে সে ইসলামের যত আমলই করুক না কেন, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সে কাফির হিসাবেই বিবেচিত থাকবে। আর প্রথমটি ঠিক থাকার পর যদি বাকি চারটি বা কোনো একটি না থাকে, তাহলে হানাফি মাজহাবমতে সে কাফির তো হবে না বটে, কিন্তু তার ইমান ও ইসলামের অবস্থা হবে অত্যন্ত দুর্বল। অবশ্য এ চারটির মধ্যে নামাজের বিষয়ে বেশ শক্তিশালী মতানৈক্য রয়েছে। অনেকে মুহাদ্দিস ও ফকিহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগকারী কাফির হয়ে যায়। অনেকে তো নামাজের সাথে জাকাত, রোজা ও হজকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
'সকল মুসলিম এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তি তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেবে না, সে কাফির। তবে বাকি চারটি আমলের কোনোটির পরিত্যাগকারীকে কাফির সাব্যস্ত করার ব্যাপারে তাঁদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আর আমরা যখন বলে থাকি, "আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, গুনাহের কারণে কাউকে কাফির বলা যাবে না” এদ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য থাকে গুনাহের কাজ, যেমন জিনা, মদপান করা ইত্যাদি। কিন্তু ইসলামের এ চারটি মূল ভিত্তি পরিত্যাগকারীর ব্যাপারে যে মতভেদ রয়েছে, তা তো প্রসিদ্ধ। ইমাম আহমাদ থেকে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। এক মতানুসারে এ চারটির কোনোটি পরিত্যাগ করলেই সে কাফির হয়ে যাবে। এটা ইমাম আবু বকর ও কিছু মালিকি মাজহাবের আলিম, যেমন ইবনে হাবিব-এর নিকট গ্রহণীয় মত। দ্বিতীয় মতানুসারে শুধু নামাজ ও জাকাত পরিত্যাগের কারণে কাফির হবে। তৃতীয় মতানুসারে নামাজ পরিত্যাগ করলে এবং জাকাত পরিত্যাগের ভিত্তিতে খলিফার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলে কাফির হবে। চতুর্থ মতানুসারে শুধু নামাজ পরিত্যাগ করলে কাফির হবে। পঞ্চম মতানুসারে এ চারটির কোনোটি পরিত্যাগের কারণেই কাফির হবে না। বস্তুত এগুলো সব সালাফে সালিহিনের প্রসিদ্ধ মতামত।'

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি বলেন:
'ইমাম আইয়ুব সাখতিয়ানি বলেন, নামাজ পরিত্যাগ করা কুফর, যাতে কোনো মতভেদ করা যাবে না। পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের একটি বড় দল এ মতই পোষণ করেন। এটাই ইমাম ইবনে মুবারক ও ইমাম আহমাদ-এর মত। ইমাম ইসহাক এ ব্যাপারে আলিমদের ইজমার দাবি করেছেন। মুহাম্মাদ বিন নাসর মারুজি বলেন, এটাই অধিকাংশ মুহাদ্দিসদের মাজহাব।'

আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাতে বলা হয়েছে :
'আর দ্বিতীয় অবস্থা অর্থাৎ নামাজের আবশ্যকীয়তা অস্বীকার না করে অলসতা ও উদাসীনতাবশত নামাজ পরিত্যাগ করলে তার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরাম মতভেদ করেছেন। মালিকি ও শাফিয়ি মাজহাবের মতানুসারে তাকে হদস্বরূপ হত্যা করা হবে। অর্থাৎ মৃত্যুর পর তার বিধান মুসলিম মাইয়েতের মতোই—গোসল করানো হবে, জানাজা নামাজ পড়ানো হবে এবং মুসলমানদের কবরে দাফন করা হবে। ... হানাফি মাজহাব মতে, অলসতাবশত ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগকারী ফাসিক। তাই তাকে হত্যা করা হবে না; বরং তাজির হিসাবে শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাওবা বা মৃত্যু পর্যন্ত তাকে বন্দী করে রাখা হবে। আর হাম্বলি মাজহাব মতে, অলসতাবশত নামাজ পরিত্যাগকারীকে নামাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হবে, যদি তুমি নামাজ পড়ো, তাহলে তো ঠিক আছে; নচেৎ আমরা তোমাকে হত্যা করব। সুতরাং সে নামাজ পড়লে বেঁচে গেল, অন্যথায় তাকে হত্যা করা আবশ্যক। তবে তিনদিন বন্দী রাখার পূর্বে তাকে হত্যা করা যাবে না। প্রতি ওয়াক্তে তাকে নামাজের জন্য ডাকা হবে। নামাজ পড়লে বেঁচে যাবে; নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে- (হাম্বলিদের) কারও মতে (এই হত্যাটা) হদ হিসাবে আর কারও মতে কুফরির কারণে। অর্থাৎ (কুফরির কারণে হলে) তাকে গোসল দেওয়া হবে না, তার জানাজার নামাজ পড়া হবে না এবং মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে দাফনও করা হবে না। অবশ্য মুরতাদদের মতো তার স্ত্রী-সন্তানকে বন্দী ও দাস-দাসী বানানো যাবে না।'

মোটকথা, ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি একসাথে বলা হলেও মর্যাদাগতভাবে এতে কিছু পার্থক্য আছে। সুতরাং শাহাদাহ বা তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া হলো ইসলামের প্রধান ও মূল ভিত্তি। আর নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ হলো তার প্রধান চারটি শাখা। এ চারটির কোনোটি পরিত্যাগ করলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে কিনা- এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, ইসলামে কালিমায়ে শাহাদাতের পর এ চারটি বিধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষত নামাজ। তাই শুধু তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়ার দ্বারা ইসলাম পূর্ণ হবে না; বরং তার সাথে এ চারটি আমলও আবশ্যিকভাবে করতে হবে। অবশ্য জাকাত ও হজ, এ দুটি বিধান সবার জন্য নয়; বরং শুধু তাদের জন্য, যাদের কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদ আছে এবং হজ করার সামর্থ্য আছে।

টিকাঃ
১১. সহিহু মুসলিম: ১/৩৬, হা. নং ৮ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
১২. সহিহুল বুখারি: ১/১১, হা. নং ৮, (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
১৩. মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনি তাইমিয়া: ৭/৩০২ (মাজমাউ মালিক ফাহাদ, মদিনা)
১৪. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম : ১/১৪৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১৫. আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা: ২৭/৫৩-৫৪ (অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, কুয়েত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


এই ছিল ইসলামি জীবনব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত চিত্রায়ন। বস্তুত ইসলামের সর্বজনীন এ নিজাম বা ব্যবস্থা এতটাই বিস্তৃত যে, সংক্ষিপ্ত ও ছোট এ পরিসরে তা আনা পুরো সমুদ্রকে একটি গ্লাসে রাখার নামান্তর। আর তাই বইটি লিখতে গিয়ে বারবার এ উপলব্ধি এসেছে যে, এতটুকুতে কি পাঠকের তৃপ্তি মিটবে? বস্তুত ইসলামের সামগ্রিক বিষয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খ এখানে আনা সম্ভব ছিল না। শুধু পাঠককে এ মেসেজ দেওয়ার জন্যই বইটি লেখা হয়েছে যে, তারা যেন বুঝতে পারে, ইসলামের বিস্তৃতি ও ব্যাপ্তি কত বিশাল! প্রতিটি অঙ্গনেই রয়েছে এর সুনিপুণ নির্দেশনা। বইটিতে আমরা ছয়টি অধ্যায়ে আকিদা, শরিয়াব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থায়নব্যবস্থা ও বিভিন্ন বাতিল মতবাদ নিয়ে সম্যক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সামগ্রিক জীবনে ইসলামের এ ব্যবস্থাপনা যদি আজ বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে পৃথিবীর মানুষ সকল ফিতনা, বিবাদ ও অশান্তি থেকে মুক্তি পেত। কিন্তু আফসোস! বিধর্মীরা তো দূরে থাক, স্বয়ং মুসলিম দেশের শাসকদেরই এ ব্যবস্থাপনার ওপর পূর্ণ আস্থা বা কোনো ধারণা নেই। আমি পূর্ণ নিশ্চয়তা ও গ্যারান্টির সাথে চ্যালেঞ্জ করছি, পুরো বিশ্ব বা ন্যূনতম বিশ্বের কোনো একটি দেশ যদিও এ জীবনব্যবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করে, তবে এক বছরও লাগবে না ইনশাআল্লাহ, দেশ থেকে সকল দুর্নীতি, অরাজকতা, খুন, রাহাজনি, চুরি, অশ্লীলতাসহ অশান্তির সব উপকরণ পুরোপুরি বিদায় নেবে। এতে আমাদের এক চুল পরিমাণও সন্দেহ নেই।

তিক্ত বাস্তবতা হলো, ইসলামের জীবনব্যবস্থার মধ্যে যে এমন নিখুঁত ও সবচেয়ে নির্ভুল নির্দেশনা রয়েছে, তা অনেকে জানেই না, বা জানলেও বিশ্বাস করতে চায় না। অধিকাংশ মানুষের ধারণা, ইসলাম মানে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, দান-সদকা, সত্য কথা বলা, হালাল খাওয়াসহ ব্যক্তিক জীবনের কয়েকটি আমলের নাম। ইসলামের যে প্রজ্ঞাপূর্ণ একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থা আছে, ইসলাম যে সমাজব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেছে, ইসলাম যে অর্থায়নব্যবস্থার ব্যাপারেও নিখুঁত দিক-নির্দেশনা দিয়েছে, তা আজ কজনেই বা জানে! এজন্যই বক্ষ্যমাণ বইটিতে ইবাদতের চেয়ে অনালোচিত এসব বিষয়েই অধিক আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, বইটি থেকে একজন সত্যানুসন্ধানী পাঠক ইসলামি জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ না পেলেও সম্যক ধারণা পেয়ে যাবে যে, ইসলামের ব্যাপ্তি ও গভীরতা কতটা সুবিস্তৃত!

আশার কথার হলো, ইসলামি জীবনব্যবস্থার বিপরীত মানবরচিত মতাবাদ-মতাদর্শগুলোর কুৎসিত স্বরূপ দিনদিন মানুষের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে। জনগণ আজ ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে যে, বিশ্বজুড়ে চলমান জুলুম, নির্যাতন, নগ্নতা, অশ্লীলতা, দুর্নীতি, লুটতরাজ—সকল অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দূর করে ন্যায়নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ইসলামি শাসনব্যবস্থা ব্যতিরেকে ভিন্ন কোনো পথ নেই। ইসলামের আলোকিত জীবনব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পারে সকলের সুখ ও শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা। এ সত্য বুঝতে পেরেই মানুষ তাদের মধ্যে বিদ্যমান কুফরি জীবনব্যবস্থা ও জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনাকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে প্রস্তুত হচ্ছে। নিজেদের দ্বীনি মৌলিক বিশ্বাসকে যথাযথভাবে ধারণ করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় বসবাস করতে চাচ্ছে।

আর ইসলামের এ আলোকিত জীবনব্যবস্থাকে সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব আমাদের মুসলিমদেরই নিতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসাবে অবশ্যই আমাদের বিশ্বমুসলিম তথা মানবতার সমস্যাকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের থাকতে হবে পরিষ্কার জ্ঞান। যখন আমরা ইসলামের সৌন্দর্য ও সূক্ষ্মতা অনুধাবন করতে পারব, তখনই এর জন্য নিজেদের সর্বস্ব কুরবান করার মতো মানসিকতা লালন করতে সচেষ্ট হবে।

বস্তুত, ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থার নাম, যার পরতে পরতে রয়েছে দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার ছোঁয়া। প্রতিটি সিদ্ধান্তে রয়েছে ওহিভিত্তিক নিখুঁত পরিচর্যার পরশ। সূচনাকাল থেকে চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল, কিন্তু বিরোধীরা হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত এতে কোনো ছিদ্র খুঁজে পায়নি। এটিই প্রমাণ করে যে, এ জীবনব্যবস্থা ও নির্দেশিকা মানবরচিত হতে পারে না। এটি সমগ্র জাহানের পালনকর্তা মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া নির্দেশনার আলোকে গঠিত এক সর্বজনীন ব্যবস্থার নাম, যা কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য স্থায়ী বিধান হিসাবে কার্যকর ছিল, আছে এবং থাকবে।

তাই মুসলিম-অমুসলিম, আলিম-জাহিল, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ—সবাইকে বিনত অনুরোধ করব, ইসলামকে জানুন। ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও এর সর্বজনীনতা উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। ইনশাআল্লাহ ইসলামের বিজয় অত্যাসন্ন; যদি আমরা ইসলামকে সঠিকভাবে জেনে তদনুযায়ী কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারি। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি অঙ্গনে ইসলামি জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের তাওফিক দিন এবং তাঁর মনোনীত দ্বীন ইসলামের ওপর অটল রাখুন। আমিন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px