📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে মুজাদালা প্রয়োগের মূলনীতি
বিভিন্ন চিন্তা ভাবনা, দল-উপদল ও ধর্মের লোকজনের মাঝে প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক চলে আসছে। আর এ পৃথিবীতে মানব সভ্যতার উন্নতি এবং তার বিভিন্ন দিক দিয়ে চিন্তার ক্ষেত্র সুপ্রশস্ত করা এর উৎপত্তি ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য । এর মাধ্যমে এ মানব সভ্যতা সৃজনী প্রতিভা ও প্রেক্ষাপটের বিকাশে দ্বীনি চিন্তার ক্ষেত্র সুপ্রশস্ত করা এর উৎপত্তি।
আর মানব সমাজের সব বস্তু থেকে ভাল যেমন আছে তেমনি খারাপও আছে । বিশেষতঃ ‘আকীদা বিষয়ক বা চিন্তার দ্বন্দ্ব মূলক বিতর্কে আক-বাক-চাতুর্য্য প্রদর্শন করে যা হোক জয়লাভ করার মানসিকতা অনেককে অন্ধ-বধিরও করে দেয় । তাই সে জানে না যে কোনটা নিজের জন্য ভাল, না কোনটা খারাপ ।
১. সত্যকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে বিতর্ক করা
সত্যের প্রতি মানুষের স্বভাবত একটা আকর্ষণ থাকে । এ জন্য বৈষয়িক কোন কারণে তা মানলেও এর যথার্থতাকে মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে। অন্তরে আড়ালে সমর্থন করে। সত্যের বাণীতে হল দুর্বল। তাই সত্যের জন্য বিতর্ক যাওয়া যদি থেকে অনেক সংগ্রামে। তাছাড়া, আল্লাহ সত্য, তাঁর দ্বীন ইসলাম সত্য। এ সত্যকে বিজয়ী করার জন্য কিছু বিবাদীর প্রয়োজনকে পরাস্ত করতে হয়না। এ ব্যাপারে আল কুরআনে এসেছে:
"وما نرسل المرسلين إلا مبشرين ومنذرين ويجادل الذين كفروا بالباطل ليدحضوا به الحق"
“ আমি রাসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীর রূপেই প্রেরণ করে থাকি এবং কাফেররাই মিথ্যা অবলম্বনে বিতর্ক করে, তার দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আমার নিদর্শনাবলীকে ব্যর্থ করে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করার পর ঠাট্টারূপে গ্রহণ করেছে”(সূরা কাহফ: ৫৬)।
সুতরাং সত্য নিয়ে ঠাট্টা করা, মিথ্যাকে বিজয়ী করা মুসলিম স্বভাবের পরিপন্থী। একজন মুমিন কখনো তা করতে পারে না। তাই দা‘ঈকে বিতর্কের পূর্বে নিয়ত পবিত্র করতে হবে, তার উদ্দেশ্য হবে सत्यকে বিজয়ী করা।
২. উপন্যাস বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দলীল সহকারে তর্ক করা
বিতর্ককারী দা‘ঈকে উপহাস্য বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন ও দলীল প্রমাণ ব্যতীত কখনো বিতর্কে লিপ্ত হবে না, সে বিষয়ে জয়েস নয়। যারা উঠে জ্ঞান ও দলীল প্রমাণ ছাড়া শুধু তর্ক করে আল কুরআনে তাদের কাজে নিন্দা জানানো হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
"يا أهل الكتاب لم تحاجون في إبراهيم وما أنزلت التوراة والإنجيل إلا من بعده أفلا تعقلون هاأنتم هؤلاء حاججتم فيما لكم به علم فلم تحاجون فيما ليس لكم به علم والله يعلم وأنتم لا تعلمون"
“হে আহলে কিতাব, কেন তোমরা ইবরাহীমের বিষয়ে বাদানুবাদ কর? অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল তার পরে অবতীর্ণ হয়েছে। তোমরা কি বুঝনা? শোন! ইতিপূর্বে তোমরা যে বিষয়ে কিছু জানতে, তাই নিয়ে বিতর্ক করেছ। এখন আবার তোমরা সে বিষয়ে কিছুই জান না, সে বিষয়ে কেন বিতর্ক করছ? আল্লাহই জানেন এবং তোমরাই জানোএই তোমরা জানোএই তোমরা জানোএই তোমরা জানোএই তোমরা জানোএই “সূরা আল ‘ইমরান:৬৫-৬৬)। আল্লাহ পাক আরো বলেন,
"ومن الناس من يجادل في الله بغير علم ويتبع كل شيطان مريد"
অর্থাৎ “কতক মানুষ জ্ঞান চর্চা ব্যতীত আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক এবং প্রত্যেক অবাধ্য শয়তানের অনুসরণ করে”(সূরা হজ্জ:৩)।
অতএব দা‘ঈ যে বিষয়ে জয়েস না, সে বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া জায়েজ নয়। আর যুক্তি প্রমাণ ছাড়া শুধু তর্কে যাওয়া বাঞ্চনীয় নয়, কারণ হতে পারে কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে সত্যের পক্ষের হয়েও শুধু তা না জানার কারণে তিনি হেরে যাবেন এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি।
৩. তর্কে লিপ্ত প্রতিপক্ষের অবস্থাভেদে পদক্ষেপ গ্রহণ
মুজাদালায় सर्वोत्तम পন্থায় হওয়ার একটা হেকমতপূর্ণ বিষয় যে, প্রতিপক্ষের অবস্থা যাচাই করতে হবে, বিবেচনায় আনতে হবে । কেননা অবস্থা ভেদে তার জন্য ভিন্ন হয়। এটা হল কুরআনের পদ্ধতি। তাই দেখা যায় যখন পৌত্তলিক মুশরিকদের সাথে মুজাদালা করা হয় তখন পূর্ববর্তী কাফের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে কি পরিণতি হয়েছিল তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। কিন্তু যখন ইয়াহুদী ও নাসারা তথা আহলে কিতাবের সাথে মুজাদালা হয়, তখন তাদের বিভিন্ন ভুল ও পন্থী সংশোধন ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার দ্বারা তার কিতাবী জ্ঞানের অধিকারীরা। যেমন পূর্বে উল্লেখিত আয়াতে দেখেছি তারা ইবরাহীম হওয়ার দাবী করে, তখন তা খণ্ডন করা হল:
“وما أنزلت التوراة والإنجيل إلا من بعده”
অর্থাৎ “তাওরাত ও ইঞ্জিল তো তার পরে নাযিল করা হয়”সেটা বলা হয়:
“ما كان إبراهيم يهوديا ولا نصرانيا ولكن حنيفا مسلما وما كان من المشركين”
অর্থাৎ ইবরাহীম ইয়াহুদীও ছিলেন না বা নাসারাও ছিলেন না, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম, আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিলেন না”(সূরা আল ‘ইমরান: ৬৭)।
এমনিভাবে যখন মুনাফেকদের সাথে মুজাদালা করতে হয়, তখন শুধু ভূমিকা নেয়া হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন ধর্মান্ধ থাকাও এর মধ্যে। যেমন আল্লাহ বাণী:
"وإذا قيل لهم لا تفسدوا في الأرض قالوا إنما نحن مصلحون . ألا إنهم هم المفسدون ولكن لا يشعرون . وإذا قيل لهم آمنوا كما آمن الناس قالوا أنؤمن كما آمن السفهاء ألا إنهم هم السفهاء ولكن لا يعلمون"
অর্থাৎ আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ায় রংগ-তামাশা সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি । মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝে না। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, অন্যান্যরা যেভাবে ঈমান এনেছে, তোমরাও সেভাবে ঈমান আন, তখন তারা বলে, আমরাও কি ঈমান আনব বোকাদেরই মত। মনে রেখো, প্রকৃত পক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বুঝে না”(সূরা বাকারা:১১-১৩)।
সুতরাং দা‘ঈ যে তার প্রতিপক্ষের ধর্ম ‘আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা- চেতনা, শিক্ষা- সংস্কৃতি পরিমাণ করতে সে অনুসারে তর্ক করতে হবে। প্রতিপক্ষ যে বিষয়ে অজ্ঞ সে বিষয়ে তার সাথে তর্ক লিপ্ত না হওয়াই শ্রেয়।
৪. তর্ক পরিবেশকে অন্ধ সমর্থন যুক্ত তর্কে খণ্ডন যুক্ত রেখে চলা
তর্কে পক্ষ বিপক্ষ উভয় কোন তা‘আসুব তথা পূর্ব মতকে যুক্তাহীনভাবে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকতে এ ধরনের ঘোষণা দেয়া চলেনা বিতর্ক পরিবেশে সুস্থ করার মত সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষ সহজে তা মেনে নিতেও হয়। তাছাড়া, এটা তার অন্তর স্পর্শ করবে। এতে তার অন্তর আল্লাহ সদয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়ে উঠে। এ জন্য দেখা যায় আল কুরআনে বলা হয়:
"قل من يرزقكم من السماوات والأرض قل الله وإنا أوإياكم لعلى هدى أوفي ضلال مبين"
“বলুন, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল থেকে কে তোমাদেরকে রিযিক দেয়। বলুন, আল্লাহ। আমরা অথবা তোমরা সৎ পথে অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি কি আছি”( সূরা সাবা:২৪)।
এ আয়াতেও শেষাংশে আমরা অথবা তোমরা বলে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি যে, প্রতিপক্ষ বিভ্রান্তি বা গোমরাহীতে আছে। বরং তার সম্মানে আঘাতও দিয়ে তাতে উত্তেজিত না করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে উপলব্ধি উপস্থাপন করা হয়। অথচ তা‘আলাই জানেন যে নবী (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা জানেন যে, তারাই সত্যপন্থী। তারপরও “অথবা” দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
টিকাঃ
২০২. মাওলূদ ইয়াসীন, শরহু দিওয়ান আল ‘আযীযা (মুনাযারা রশীদিয়ার পরিশিষ্ট সংযুক্তি)-পৃ-২ তা।
২০৩. ড. মুহাম্মদ মুহাম্মদ হুসাইন, আল ইত্তেজাহাতুল ওয়াতানিয়্যা (মুনাযারা রশীদিয়ার সাথে সংযুক্তি ) পৃ. ৭৫।
📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে মুজাদালার প্রয়োগের দরকার আছে কি না
পূর্বেই উল্লেখ করা হয় যে, মুজাদালা सर्वोत्तम পন্থায় অবলম্বনে না করলে মানব সমাজে এর একটি নেতিবাচক দিক ফুটে উঠবে। অথচ মুজাদালা করার জন্য আল কুরআনে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-
"وجادلهم بالتي هي أحسن"
অর্থাৎ তাদের সাথে সর্বোত্তম ভাবে মুজাদালা করুন”(সূরা নাহল: ১২৫)। অন্য আয়াতে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়:
"ولا تجادلوا أهل الكتاب إلا بالتي هي أحسن"
অর্থাৎ তোমরা আহলে কিতাবের সাথে সর্বোত্তম পন্থা ব্যতিরেকে অন্য পন্থায় মুজাদালা করো না”(সূরা আনকাবুত:৪৬)।
সুতরাং উপরের সংজ্ঞা অনুসারে মুজাদালার স্বরূপ নির্ধারণ করলে তা আল-কুরআনের নির্দেশনার সাথে সেফাকাত থাকে। সে কোন পক্ষের প্রতি পক্ষের যুক্তি খণ্ডন করতে না পারলে।
তৃতীয়ত: সত্য নিয়ে চলা, আর মিথ্যা নিয়ে চলা, এটাতে সতর্ককারী উভয় পক্ষের উভয় উত্থানে প্রাধান্য দেয়ার প্রয়াস থাকতে পারে। এ জন্য দেখা যায়, মিথ্যা বা বাতিল নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তাদের সে কাজটাকেও আল কুরআনে মুজাদালা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। যথা আল্লাহর বাণী:
"ويجادل الذين كفروا بالباطل ليدحضوا به الحق"
“ আর কাফেররাই মিথ্যা অবলম্বনে বিতর্ক করে তা দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে”(সূরা কাহফ:৫৬)।
অতএব কেউ শুধু শুধু তর্ক করার উদ্দেশ্যে মুজাদালা হওয়ার যে মতামত দিয়েছেন, তারা মুজাদালার মুনায়ারা মাঝে পার্থক্য করেছেন, এভাবে যে, মুনায়ারা উদ্দেশ্যে শুধু জব্দ করা, মুনায়ারা উদ্দেশ্যে শুধু জব্দ করা। আর মুজাদালার উদ্দেশ্য শুধু জব্দ করা নয় । এতে সঠিক বিষয় প্রতিষ্ঠিত করা উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং এ মজমা যথাযথ নয়। বরং প্রতিপক্ষকে জব্দ করার পাশাপাশি-পাশ সঠিক ও সত্য প্রকাশ করার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
চতুর্থত: কারো মতে জ্ঞানগর্ভ পদ্ধতিতে মুজাদালা হতে হবে। যেমন ইবন সীনার মত। আবার কারো মতে, যুক্তি প্রদর্শনের ভিত্তি - বা হেতুবাক্য গুলো।
📄 ইসলামী দা‘ওয়াতে মুজাদারা প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ
আর নতুন ক্রিয়া পদ বলার অর্থ অনেকে বেশী গুরুত্ব দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা নতুন ক্রিয়া পদ বলা হয়। কারণ মুজাদালা বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিনিষ্ঠ হওয়ার কারণে এর উপর ভিত্তি করে যে মতামত প্রতিষ্ঠিত হয়, তা সাধারণত স্থায়ী রূপ নিতে পারে। যেমন রাসূলুল্লাহর হিজরত হিকমত। অতএব এর দ্বারা দ্বীনের তার‘ঈ सर्वोत्तम ভাবে হতে পারে।
এজন্য ইসলামী দা‘ওয়াতী মুজাদালার ধরন, ও তা প্রয়োগের পদ্ধতি জানতে হবে। যার বিস্তারিত আলোচনা পূর্বেই করা হয়েছে।
ইসলামী দা‘ওয়াতে মুজাদালা প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ
পূর্বেই দা‘ওয়াতী মুজাদালার ধরন, তা প্রয়োগের পদ্ধতি জানার পর তা কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত, তা জানা প্রয়োজন । কেননা মুসলিম সমাজে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে যে,‘আকীদার ক্ষেত্রে তা করা যাবে কি না, মুসলমানগণ পরস্পরে মুজাদালা করতে পারবেন কিনা, ইত্যাদি।
প্রথমত: বিষয়বস্তু দিক বিবেচনায় বলা বলতে গেলে বলতে হয় যে, যেহেতু ‘আকীদা, শরী‘আত, আখলাক এবং এসব ক‘টিই ইসলামী দা‘ওয়াতের বিষয়বস্তু, সেহেতু এসব দিক নিয়েই মুজাদালা চলতে পারে। আমরা পূর্বেই দেখেছি, আল কুরআনে আল্লাহ, রাসূল, তাঁর নবী, মালাক পুনরুত্থান এবং হাশর ইত্যাদি ব্যাপারে মুজাদালা করা হয়েছে মুশরিক ও আহলে কিতাবের সাথে।
‘আকীদা একটি স্পর্শকাতর গায়েবী বিষয় নিঃসন্দেহে। কিন্তু তার ভিত্তি যদি মজবুত দলীলের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বরং এতে ঈমান দৃঢ় হয়। সে অনুসারে জীবন পথে উঠে। অন্যথায় সৃষ্টি হয় নেফাকী। অতএব দা‘ওয়াতের সকল বিষয়বস্তুতে মুজাদালা করা যাবে। কারণ ইসলাম এমন যুক্তি নির্ভর তথা বিজ্ঞান সম্মত জীবন বিধান। অন্ধ বিশ্বাসের স্থান ইসলামে নেই।
দ্বিতীয়ত: দা‘ঈর নিজ মুজাদালার প্রতিপক্ষ বিবেচনায় মুসলিম সকলকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। কেননা অমুসলিমদেরকে যুক্তি খণ্ডন মুজাদালার পাশাপাশি মুসলমানদের সাথেও তা করা যাবে । কারণ মানুষ স্বভাবত তর্কপ্রিয় হওয়ার কারণে তাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। তাই মুসলমানগণও এর বহির্ভূত নয়। এ জন্য আল কুরআনে বলা হয়:
"ولو شاء ربك لجعل الناس أمة واحدة ولا يزالون مختلفين إلا من رحم ربك"
“আল্লাহ ইচ্ছা করলে একই শরীয়তে একই দলভুক্ত করতে পারতেন, আর তারা মতবিরোধের উপর চলেন। এমনিভাবে যাদেরকে আপনার প্রভু রহম করেছেন তারা মতবিরোধের উপর চলেন। এমনিভাবে যাদেরকে আপনার প্রভু রহম করেছেন তারা মতবিরোধের উপর চলেন”(সূরা হূদ:১১৮-১১৯)। এমনিভাবে দেখা যায় মুসলিম মহিলা একটা মদীনায় (স.) এর কাছে এসে মুজাদালা করতে এসেছিল। আল্লাহ পাক তার কাজকে তিরষ্কার করেননি। বরং এ ঘটনাটি যে সূরাতে বর্ণিত হয়, তার নামকরণ করা হয়েছে সূরা আল মুজাদালা। অতএব মুসলিম সমাজেও চলতে পারে । এতে দ্বীন বাণীতে হয়ে যাবে না যদি এতে পূর্বে বর্ণিত নীতিমালা ও আদব কায়দা অবলম্বন করা হয়।
তেমনিভাবে সামগ্রিক মর্যাদায় যে কোন স্তরের লোকজনের সাথে মুজাদালা করা যাবে । এমনকি রাজনৈতিক হলেও হযরত ইবরাহীম এর সময়কার ঘটনা সম্রাট নমরূদ এবং হযরত মূসা (আ.) এর সময়কার ফেরা‘উনের সাথে মুজাদালা করেছিলেন, যা কুরআন কারীমেই বর্ণিত হয়েছে।
এমনি ভাবে যারা তর্ক প্রিয় বা যুক্তি দিয়ে না বুঝালে কোন কিছু মানতে চায় না তাদের সাথে মুজাদালা করাকে মুফাসসিরগণ প্রায় মনে করেছেন। যা এর বক্তব্য থেকে বুঝা যায়। যারা তর্কের পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত সাথে মুজাদালা করা সম্ভবপর। আর যারা সাধারণ শ্রেণী বা অজ্ঞ, তাদের সাথে মুজাদালা না করাই ভাল। কারণ হল তারা আবেগ প্রবণ সর্ব সাধারণ স্বভাব প্রকৃতির মানুষ এবং তাদের সাথে মাউ‘য়িযাই উত্তম, নতুবা তারা তর্কে করতে অজ্ঞতা বসত, তাদের সাথে বিতর্কে সিদ্ধান্ত পৌঁছা কষ্টকর। অনেক ক্ষেত্রে ফাসাদ সৃষ্টি হওয়ার চেয়ে বেশী বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে বিবেচনা করে একজন দা‘ঈ মুজাদালা প্রয়োগ করতে পারেন।
উপসংহারে বলা যায়, পরস্পরের বিতর্কপূর্ণ বিষয়ে যুক্তি প্রমাণ প্রদর্শনমূলক মত বিনিময়, যাকে ‘আরবীতে বলা হয় মুজাদালা, তা ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও শর্তসাপেক্ষে বিষয়, তা হতে হবে সর্বোত্তম পন্থায়। শুধু তর্কের খাতিরে তর্ক নয় বরং সত্য প্রতিষ্ঠা ও উত্তম ভাব রাজত্বা এবং চিন্তাকর্ষক আচারের মাধ্যমে তা সম্পাদিত হলে তবে তা সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। বিরোধ মীমাংসা করবে। পরস্পরে সম্পর্ক বিনষ্ট করার পরিবর্তে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করবে। মানব সমাজে বহুল প্রচলিত একটি পদ্ধতিকে বাদ দেয়ার অবকাশ নেই। বরং কুরআন কারীম নির্দেশিত ও রাসূল করীম (স.) প্রদর্শিত পন্থায় সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে তথা যথাযথ ক্ষেত্রে মুজাদালার প্রয়োগে ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে প্রভূত সাফল্য আসতে পারে বলে আশা করা যায়।