📄 মুজাদালার স্বরূপ
‘আরবী মুজাদালা (مجالدة)শব্দটি জাদল (جدل) থেকে উৎপত্তি। جدل এর উৎপত্তিগত অর্থ পাকানো, ঝগড়া বিবাদ করা, বাক-বিতণ্ডায় হওয়া, ইত্যাদি । এজন্য আরবীতে চামড়া,পশম দ্বারা পাকানো রশিকে জাদীল (جديل) বলা হয়। শক্ত মাটিতে জানালাतून (جدالة) বলা হয়। যখন কোন শিশু বা হরিণ শাবক শক্ত হয়ে পায়ে হাঁটার অনুশীলন করে, তখন বলা হয় "غلام ود الطبيعة" "جدل الرجل" অর্থাৎ সে মাটিতে যখন বলা হয় যে, “اشتدت خصومته" অর্থাৎ “তার ঝগড়া বিবাদ প্রকট লাভ করেছে)।
সুতরাং উৎপত্তিগত এ সকল অর্থের দিকে লক্ষ্য করেই মুজাদালা শব্দটি পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করা, তর্কে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত অনেক সময় (جدل)শব্দটিও এর সমার্থে ব্যবহৃত হয়।
টিকাঃ
১৪০. ড. আল মু‘জামুল ওসীত, পৃ.১১২।
১৪১.“ইবন মনযুর আল ইফরীকী, লিসানুল ‘আরব (বৈরুত: দার বৈরুত লি তাবা‘য়াতি ওয়ান নাশর, ১৪০৬) ১১খ. পৃ.১০৮।
১৪২.আল মু‘জামুল ওসীত, পৃ.১১২।
১৪৩. आलूसी, কারো ড. ইবন কাছীর দ্বারা বকর আর রাযী, প্রাগুক্ত, পৃ.১৬৬।
📄 বিভিন্ন ধরনের মুজাদালা
ওপরে কথা সর্ব সাধারণের মাঝে প্রসিদ্ধ বা প্রচলিত ঝগড়া বিবাদ । তবে এর বাইরেও যুক্তিশাস্ত্রের মাঝে প্রসিদ্ধ এক বিশেষ ধরনের বিতর্ক রয়েছে। যেমন জুরজানীর তা‘রিফাত গ্রন্থে।
পঞ্চমতঃ কারো কারো সংজ্ঞায় দেখা গেছে শুধু দলিলের পরস্পরের মোকাবেলা বুঝায় যেমন ফখরুদ্দীন রাযীর সংজ্ঞায়। কিন্তু অন্যদের সংজ্ঞায় বা মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে। এটাই যথার্থ কারণ দলীল প্রয়োগের মোকাবেলা এক প্রকারের গবেষণা হতে পারে না। একাধিক পক্ষের গবেষণা হতে পারে। তখন তা মুজাদালা হবে না। একাধিক পক্ষের যুক্তি তর্ক প্রদর্শনের মাধ্যমে সত্যকে বা ভাব বিনিময় হলেই বরং তা মুজাদালার রূপ নিবে।
এমনিভাবে এক পক্ষ যুক্তি, অপর পক্ষ যুক্তি ব্যতীত স্বীয় মতে অটল থাকার যুক্তি না দিয়ে এ দ্বিতীয় পক্ষের ওপরে সে মুজাদালা বলা হবে না। অথবা উভয় পক্ষ যুক্তি না দিয়ে ঝগড়া শুরু করলে তা মুজাদালা হবে না। বরং তা হবে মুকাবারা (مكابرة) বা দম্ভ ও অহমিকা প্রদর্শন।
ষষ্ঠতঃ উপর্যুক্ত বিতর্কমূলক গবেষণা করলে ড: রিয়াদ তারিকের সংজ্ঞাকে অধিক প্রামাণ্য ও গোছানো বলে মনে হয়। কারণ এতে অনেক পক্ষ বিপক্ষ, যুক্তি প্রদর্শন, প্রত্যেকের মত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, ইত্যাদি উপকরণ গুলো যা মুজাদালার উপাদান হিসেবে নেয়া যায় তার অধিকাংশ গুলোই তাতে রয়েছে।
সপ্তমতঃ মুজাদালার একটি সংজ্ঞা এভাবে নির্ধারণ করা যায় যে, এটা হল “দু‘পক্ষ বা ততোধিক পক্ষের পরস্পরের মত খণ্ডন করার অভিপ্রায়ে যুক্তি প্রমাণ প্রদর্শনমূলক মত বিনিময়।
উল্লেখ্য, বর্তমান আদলে সেমিনার বা আলোচনা সভায় কোন কোন সময় মুজাদালার রূপ নিতে পারে। তাই তর্কে বা বিবাদে ব্যাখ্যা বা সংযোজনমূলক আলোচনার চেয়ে এটা ব্যাপক। তাই সেমিনারের আলোচনা মুজাদালায় চেয়ে ব্যাপক। আর মত বিনিময়রূপে যখন লিপ্ত দু বা ততোধিক পক্ষের মাঝেই মুজাদালায় সংগঠিত হওয়া স্বাভাবিক।
বিভিন্ন ধরনের মুজাদালা
উল্লেখ্য, বিভিন্ন ধরনের মুজাদালা হতে পারে:
প্রথমত: অংশগ্রহণকারীদের অবস্থান অনুসারে মুজাদালা দু ধরনের :
ক.ব্যক্তিক মুজাদালা (المجادلة الخاصة)যা এক ব্যক্তি থেকে অপর ব্যক্তির মাঝে অনুষ্ঠিত হয়।
খ.সমষ্টিগত মুজাদালা (المجادلة العامة) যা একাধিক ব্যক্তি বা পক্ষের মাঝে অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয়ত: উপস্থাপনের মাধ্যমগত দিক দিয়েও মুজাদালা দু‘ ধরনের যথা:
ক. বাচনিক মুজাদালা (المجادلة القولية) যা কথা বার্তা ও আলোচনার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। এ ধরনের মুজাদালা কোন কোন সেমিনার বা সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়। খ. লিখিত মুজাদালা (المجادلة العملية) কোন কাজ বা বস্তু উপস্থাপনের মাধ্যমে ও যুক্তি প্রদর্শনে করে মুজাদালা হতে পারে । এ ধরনের মুজাদালায় কাজী তৈয়ব (র.) এ ধরনের মুজাদালায় বেশি উল্লেখ্য করেছেন, “অহ আল্লাহর নির্দেশের নাম”- কুরআন কারীমের এ আয়াতকে শ্রবণ করে নাফসকে দায়ী করেছিল যে, সে আল্লাহ হতে উৎকৃষ্ট ও উত্তম বাপের নাম, যা হলে মানুষ জীবিত থাকে । আল্লাহর নির্দেশে সাথে প্রাণ বা আত্মার কিসের সম্পর্ক? শয়তান তখন ইসলামী উগ্রবিতর্কে না পেরে জনকে নিয়ে কুফরের কুমন্ত্রণা রুজু করেছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এক বড় ঝড় হয় পড়লেন এর নাফসকে জিজ্ঞাসা করলেন কেন আমি জীবিত আছি, আমার মধ্যে তো একদিনেরও অবশিষ্ট নেই? এখনও তোমাদের সন্দেহে আমার মধ্যে "من الروح قل ربى أمر" অর্থাৎ আমার প্রতিপালকের নির্দেশ মাত্র” কথাটি সত্য এবং আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হয়ে থাকে, রক্তের ধারা নয়, এটাও ছিল এক ধরনের বিতর্ক তথা মৌখিক নয় আমলী।
এছাড়া ফলিত মুজাদালার দৃষ্টান্ত আম্বিয়া কেরামের দা‘ওয়াতী জীবনেও পাওয়া যায়। যথা ইবরাহীম (আ.) পুত্র হত্যার অন্যতম প্রমাণ করার জন্য সে ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন । আল কুরআনে এসেছে, তিনি সে পুত্রগুলো থেকে এদের বড়টিকে রেখে দেন। আর সেটার এসে কুড়ালটি কাঁটাচ্ছিল । যেমন এক বড় মূর্তির হাতে কুড়ালটি আসার পরও মূর্তি রক্ষায় কোন ক্ষতি করতে পারেনি। এছাড়া, এগুলো নিজেদেরকে বাঁচাতে পারেনি, তাদের রক্ষাকারী হতে দুর্বল কেন। ইবরাহীম (আ.) এর কওম যখন প্রশ্ন করল, মূর্তি রক্ষাকারী কে? তখন তিনি এগুলোর নিকট জিজ্ঞাসা করতে বলেন । আর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটিও হল, এগুলো শুনতে ও বলতে পারে না । তখন তাদের পুত্ররক্ষকের ডাক শুনতে পারল না। সুতরাং যে শুনতে পারে না, যে অন্যের উপকার বা ক্ষতি কিছুই করতে পারে না, যে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তার অন্যের উপাস্য হওয়ার যোগ্যতা নেই । তা তিনি সকলকে যথাযথ ধর্মীয় নৈতিক দেয়ায় দিলেন।
তৃতীয়ত: আয়োজনের ধরণ হিসেবেও এটা দু রকমের হতে পারে:
ক. আনুষ্ঠানিক মুজাদালা (المنظمة أو الاحتفالية): যা পূর্ব নির্ধারিত সময়ে কোন সভা বা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োজন করা হয়। যাকে মুনায়ারা মাহফিল বা বহে অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম-অমুসলিম, এমনকি মুসলমানদের বিভিন্ন মাযহাবের ‘ওলামা মায়েষ এ ধরনের অনুষ্ঠান প্রচুর হারে অনুষ্ঠিত হয়।
খ. অনানুষ্ঠানিক মুজাদালা (المنظمة غير المجادلة) যা বিভিন্ন অনির্ধারিত আলোচনা, দেখা সাক্ষাৎ বা কথা বার্তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
চতুর্থত: ভাষাগত দিক দিয়েও মুজাদালা দু ধরনের।
ক. গদ্য ভিত্তিক মুজাদালা (النثرية المجادلة): যা ছন্দায়িত নয়, বরং স্বাভাবিক কথা বা আলোচনায় অনুষ্ঠিত হয়। এ পদ্ধতিতেই স্বভাবত মুজাদালা বেশী অনুষ্ঠিত হয়। যেমন সভা-সমিতিতে ফিচার কালে উচ্চাঙ্গের মর্যাদায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ।
খ. কাব্যিক মুজাদালা (الشعرية المجادلة): যা ছন্দায়িত ভাবে পরস্পরের কথোপকথন হয়। যেমন রাজনৈতিকদের মাঝে বা বাংলায় বাউল গান গবেষণার মাঝে এ ধরনের মুজাদালা প্রায়শই অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।
বস্তুতঃ যুক্তি ও উপস্থাপনার ধরনের দিক দিয়েও মুজাদালা দু‘ রকমের হতে পারে।
গ. নন্দিত মুজাদালা (الممدوحة المجادلة): যা সত্যনিষ্ঠা যুক্তি ও সুন্দর স্বভাব নিয়ে উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।
ঘ. নিন্দিত মুজাদালা (المذمومة المجادلة): মিথ্যাশ্রয়ী হয়ে ভ্রান্ত যুক্তি প্রদর্শন, ঝগড়াটে ভাব ও পদ্ধতির মাধ্যমে যে মুজাদালা পরিচালিত হয়।
সর্বোপরি, একই মুজাদালায় একাধিক রকমের বিশেষত্ব একত্রিত হতে পারে । যেমন একই সাথে সামষ্টিক-মাশনিক, আনুষ্ঠানিক ও বাচনিক মুজাদালা হতে পারে।
📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে মুজাদালার স্বরূপ
পূর্বেই আলোচনা সাধারণত একটা ঝগড়া ফুটে উঠেছে যে, এটা হল দু বা ততোধিক পক্ষের পরস্পরের মত খণ্ডন করার অভিপ্রায়ে যুক্তি প্রমাণ প্রদর্শনমূলক ভাব বিনিময়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে মুজাদালা করার অনুমতি দেয়া হয়নি, বরং শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেয়া হয়েছে । বলা হয়েছে-“وجادلهم بالتي هي أحسن”অর্থাৎ “সর্বোত্তম ভাবে তাদের সাথে মুজাদালা করুন”(সূরা নাহল: ১২৫)। অতএব এ দা‘ওয়াতী ক্ষেত্রে মুজাদালাতে সীমিত করা হয়েছে যে, তা হবে أحسن বা সর্বোত্তম ভাবে।
এ সর্বোত্তমভাবে হওয়ার বিষয়টি ব্যাপক। এটা কি কথা, না কাজে, তা বলা হয়নি । আরবী ভাষায় بالتي موصولة (সংযুক্ত শব্দ) উহা ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় । যামাখশারীসহ মুফাসসিরগণের মাঝে এ ব্যাপারে কিছু মতামত পাওয়া যায় । কারো মতে এ দ্বারা যেমন উচ্চাঙ্গের কথা বা কথা বলা হয়, তেমনি শান্ত স্বভাবও কিছু রয়েছে। এজন্য কথার মাধ্যমে মুজাদালার suave দিক রয়েছে।
আপনি আমার বান্দাদেরকে বলুন, তারা যেন ঐ উত্তম কথাই বলে”(সূরা বানী ইসরাঈল: ৫৩)। তোমাদেরকে কাজ ও আচরণের প্রতিও ইশারা করে আল কুরআনে বলা হয়েছে:
"ولا تستوي الحسنة ولا السيئة ادفع بالتي هي أحسن فإذا الذي بينك وبينه عداوة كأنه ولي حميم وما يلقاها إلا الذين صبروا وما يلقاها إلا ذو حظ عظيم"
“সমান নয় ভাল ও মন্দ। যা সবচেয়ে ভাল-সুন্দর তা দ্বারাই মোকাবিলা করুন । তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান”।(সূরা হা-মীম সেজদা: ৩৪-৩৫)।
অতএব দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে মুজাদালার সাথে উহা অন্তর্গত হল সর্বোত্তম পন্থা (أحسن الطرق) কিন্তু এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থার স্বরূপ নির্ধারণ করতে গিয়ে এটা একটা আপেক্ষিক কেন্দ্র করে, যেহেতু এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মতামতকে গুলিয়ে দেখা বাঞ্চনীয় । নিম্নে তাঁদের মতামত উল্লেখ করা যায়।
১. প্রখ্যাত মুফাসসির তা‘ঈ মুজাহিদ (র.) এর মতে ওটার অর্থ,
الإعراض عن أذاهم للمدوعين الداعية”
অর্থাৎ দা‘ওয়াতকৃত ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে দাইর জন্য যা কষ্টদায়ক হয়, তা এড়িয়ে যাওয়া। ‘আল্লামা তাবারী এ ধরনের মত পোষণ করে বলেছেন,
“وجادلهم بالتي هي أحسن”
أي بالخصومة التي هي أحسن من غيرها أن تصفح عما نالوا به عرضك من الأذى”
অর্থাৎ তাদের সাথে বিতর্ক করুন এমন পন্থায় যা অন্য পন্থা চেয়ে উত্তম। অতএব যে, তারা আপনাকে যে কষ্ট দিয়েছে তা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন।
২. ‘আল্লামা যামাখশারী মুজাদালা বিল্লাতী আহসানের ব্যাখ্যায় বলেন:
أي بالطريقة التي هي أحسن طرق المجادلة من الرفق واللين من غير فظاظة ولا تعنيف
অর্থাৎ“ মুজাদালার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থায় যেমন রীতি সুলভ ও নরম মেজাজে মুজাদালা করা, এতে কর্কশ ও তিরস্কার ভাব না দেখানো”। যামাখশারী থেকে শায়খ ‘আলাউদ্দিন বাগদাদী ও একই মত পোষণ করেছেন”।
৩. ফখরুদ্দীন রাযী বলেন, "الدليل التي يكون المقصود من ذكرها إلزام الخصم وفحمه أن يدل على" قسمين: القسم الأول أن يكون دليلا مركبا من مقدمات مسلمة عند الجمهور أو من مقدمات مسلمة عند القائل وهو الجدل الواقع على الوجه الأحسن ، والقسم الثاني: أن يكون دليلا مركبا من مقدمات باطلة فاسدة إلا أن قائلها يحاول ترويجها على المستمعين بالسفاهة والشغب والجدل الباطلة والطرق الفاسدة ، وهذا القسم لا يليق بأهل الفضل ، إنما اللائق بهم هو القسم الأول ، ذلك هو المراد بقوله تعالى: وجادلهم بالتي هي أحسن”
অর্থাৎ যে সকল দলীল উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হয় প্রতিপক্ষের জব্দ করা যাকে বলা হয় জাদাল, তা দু‘ ধরনের। প্রথম প্রকারের জাদাল হল, যার দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় সর্ব সাধারণের কিংবা বক্তার কাছে স্বীকৃত হেতুবাক্য (premise) এর উপর, তাহলে তা জাদাল হবে সর্বোত্তম পন্থায় । আর দ্বিতীয় প্রকার জাদাল হল যার দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় ভ্রান্ত হেতুবাক্যসমূহের উপর, যে গুলো এর প্রবক্তা নিজেই তোতলামীর মাধ্যমে প্রচারণার চেষ্টা চালায় অত্যন্ত নির্লজ্জতা, অশান্ত, ভ্রান্ত কৌশল ও নষ্ট পন্থার । আর এ ধরনের জাদাল কর্মী ব্যক্তিবর্গের জন্য মানায় না । তাদের মানুষ প্রথম প্রকারের জাদাল করা। আর আল্লাহর বাণী“এবং তাদের সাথে সর্বোত্তম পন্থায় মুজাদালা কর” দ্বারা উদ্দেশ্য তা-ই। আল্লামা নিয়ামুদ্দীন নিশাপূরী এ মতের প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন।
৪. নাসাফীর মতে: "بالطريقة التي أحسن طريق المجادلة من الرفق واللين ولأجل العقول" القلوب ويوقظ النفوس يوقظ ما غير فظاظة من
অর্থাৎ নরম ও এমন পন্থায় যা হল মুজাদালার সর্বোত্তম পন্থা, যা সৌহার্দ্য সুলভ ও নরম মেজাজে সম্পাদিত হয়। অর্থাৎ যা দ্বারা হৃদয় জেগে উঠে, আত্মায় জাগরিত হয়, জ্ঞান চক্ষু উন্মিলিত হয়, জ্ঞান চক্ষু উদ্ভাসিত হয়”।
৫. ইবন কাছীর বলেন - "أي من احتاج إلى مناظرة وجدال فليكن بالوجه الحسن من رفق ولين وحسن خطاب"
অর্থাৎ যাদের সাথে মুনায়ারা ও মুজাদালা করার প্রয়োজন হয়, তাদের সাথে তা করতে হবে উত্তম ভাবে, প্রীতি সৌহার্দ্য, নরম মেজাজে ও সুন্দরভাবে।
৬. বায়দাবী কিছু সমন্বয় সাধনামূলক মন্তব্য উল্লেখ করেন - أي جادل معانديهم بالتي هي أحسن طرق المجادلة من الرفق واللين وإيثار المقدمات التي هي أشهر ، فإن في ذلك نفع في تسكين لهبهم وتليين شغبهم”
অর্থাৎ একে পৃষ্ঠীয় ভাবে সত্য অস্বীকারকারীদের সাথে মুজাদালা করুন এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থায়। যাতে প্রীতি সৌহার্দ্য নরম মেজাজ, সহজতর যুক্তি ও সর্বাধিক হেতুবাক্য সমূহের প্রাধান্য বা ধরনের দিক বিদ্যমান থাকে। কেননা এতে তাদের ভেদ শিথিল চিন্তা করার তাদের অশান্ত উচ্ছৃঙ্খল ভাব প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব রয়েছে।‘আল্লামা আলুসীও তার বিষয়টির ব্যাখ্যায় প্রায় এ ধরনের মন্তব্য করেছেন।
টিকাঃ
১৮৯. আবু আব্দুল্লাহ কুরতুবী,প্রাগুক্ত,১৪.পৃ.১৫৪.আরো ড. ইবন কাছীর ,প্রাগুক্ত, ৩৭. পৃ.৪৫.।
১৯০. আলুসী,প্রাগুক্ত, পৃ.১৫৪.
১৯১.ড. ইবন জরীর তাবারী, প্রাগুক্ত,১৪.পৃ.১০১।
১৯২.প্রাগুক্ত।
১৯৩.ফখরুদ্দীন রাযী, প্রাগুক্ত, ২৭. পৃ.৪০৫।
১৯৪.‘আলাউদ্দিন বাগদাদী, তাফসীরে খায়েন, ৩৭. পৃ.১০১।
📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে মুজাদালা প্রয়োগের মূলনীতি
বিভিন্ন চিন্তা ভাবনা, দল-উপদল ও ধর্মের লোকজনের মাঝে প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক চলে আসছে। আর এ পৃথিবীতে মানব সভ্যতার উন্নতি এবং তার বিভিন্ন দিক দিয়ে চিন্তার ক্ষেত্র সুপ্রশস্ত করা এর উৎপত্তি ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য । এর মাধ্যমে এ মানব সভ্যতা সৃজনী প্রতিভা ও প্রেক্ষাপটের বিকাশে দ্বীনি চিন্তার ক্ষেত্র সুপ্রশস্ত করা এর উৎপত্তি।
আর মানব সমাজের সব বস্তু থেকে ভাল যেমন আছে তেমনি খারাপও আছে । বিশেষতঃ ‘আকীদা বিষয়ক বা চিন্তার দ্বন্দ্ব মূলক বিতর্কে আক-বাক-চাতুর্য্য প্রদর্শন করে যা হোক জয়লাভ করার মানসিকতা অনেককে অন্ধ-বধিরও করে দেয় । তাই সে জানে না যে কোনটা নিজের জন্য ভাল, না কোনটা খারাপ ।
১. সত্যকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে বিতর্ক করা
সত্যের প্রতি মানুষের স্বভাবত একটা আকর্ষণ থাকে । এ জন্য বৈষয়িক কোন কারণে তা মানলেও এর যথার্থতাকে মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে। অন্তরে আড়ালে সমর্থন করে। সত্যের বাণীতে হল দুর্বল। তাই সত্যের জন্য বিতর্ক যাওয়া যদি থেকে অনেক সংগ্রামে। তাছাড়া, আল্লাহ সত্য, তাঁর দ্বীন ইসলাম সত্য। এ সত্যকে বিজয়ী করার জন্য কিছু বিবাদীর প্রয়োজনকে পরাস্ত করতে হয়না। এ ব্যাপারে আল কুরআনে এসেছে:
"وما نرسل المرسلين إلا مبشرين ومنذرين ويجادل الذين كفروا بالباطل ليدحضوا به الحق"
“ আমি রাসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীর রূপেই প্রেরণ করে থাকি এবং কাফেররাই মিথ্যা অবলম্বনে বিতর্ক করে, তার দ্বারা সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে আমার নিদর্শনাবলীকে ব্যর্থ করে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করার পর ঠাট্টারূপে গ্রহণ করেছে”(সূরা কাহফ: ৫৬)।
সুতরাং সত্য নিয়ে ঠাট্টা করা, মিথ্যাকে বিজয়ী করা মুসলিম স্বভাবের পরিপন্থী। একজন মুমিন কখনো তা করতে পারে না। তাই দা‘ঈকে বিতর্কের পূর্বে নিয়ত পবিত্র করতে হবে, তার উদ্দেশ্য হবে सत्यকে বিজয়ী করা।
২. উপন্যাস বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দলীল সহকারে তর্ক করা
বিতর্ককারী দা‘ঈকে উপহাস্য বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন ও দলীল প্রমাণ ব্যতীত কখনো বিতর্কে লিপ্ত হবে না, সে বিষয়ে জয়েস নয়। যারা উঠে জ্ঞান ও দলীল প্রমাণ ছাড়া শুধু তর্ক করে আল কুরআনে তাদের কাজে নিন্দা জানানো হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
"يا أهل الكتاب لم تحاجون في إبراهيم وما أنزلت التوراة والإنجيل إلا من بعده أفلا تعقلون هاأنتم هؤلاء حاججتم فيما لكم به علم فلم تحاجون فيما ليس لكم به علم والله يعلم وأنتم لا تعلمون"
“হে আহলে কিতাব, কেন তোমরা ইবরাহীমের বিষয়ে বাদানুবাদ কর? অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল তার পরে অবতীর্ণ হয়েছে। তোমরা কি বুঝনা? শোন! ইতিপূর্বে তোমরা যে বিষয়ে কিছু জানতে, তাই নিয়ে বিতর্ক করেছ। এখন আবার তোমরা সে বিষয়ে কিছুই জান না, সে বিষয়ে কেন বিতর্ক করছ? আল্লাহই জানেন এবং তোমরাই জানোএই তোমরা জানোএই তোমরা জানোএই তোমরা জানোএই তোমরা জানোএই “সূরা আল ‘ইমরান:৬৫-৬৬)। আল্লাহ পাক আরো বলেন,
"ومن الناس من يجادل في الله بغير علم ويتبع كل شيطان مريد"
অর্থাৎ “কতক মানুষ জ্ঞান চর্চা ব্যতীত আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক এবং প্রত্যেক অবাধ্য শয়তানের অনুসরণ করে”(সূরা হজ্জ:৩)।
অতএব দা‘ঈ যে বিষয়ে জয়েস না, সে বিষয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া জায়েজ নয়। আর যুক্তি প্রমাণ ছাড়া শুধু তর্কে যাওয়া বাঞ্চনীয় নয়, কারণ হতে পারে কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে সত্যের পক্ষের হয়েও শুধু তা না জানার কারণে তিনি হেরে যাবেন এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি।
৩. তর্কে লিপ্ত প্রতিপক্ষের অবস্থাভেদে পদক্ষেপ গ্রহণ
মুজাদালায় सर्वोत्तम পন্থায় হওয়ার একটা হেকমতপূর্ণ বিষয় যে, প্রতিপক্ষের অবস্থা যাচাই করতে হবে, বিবেচনায় আনতে হবে । কেননা অবস্থা ভেদে তার জন্য ভিন্ন হয়। এটা হল কুরআনের পদ্ধতি। তাই দেখা যায় যখন পৌত্তলিক মুশরিকদের সাথে মুজাদালা করা হয় তখন পূর্ববর্তী কাফের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে কি পরিণতি হয়েছিল তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। কিন্তু যখন ইয়াহুদী ও নাসারা তথা আহলে কিতাবের সাথে মুজাদালা হয়, তখন তাদের বিভিন্ন ভুল ও পন্থী সংশোধন ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার দ্বারা তার কিতাবী জ্ঞানের অধিকারীরা। যেমন পূর্বে উল্লেখিত আয়াতে দেখেছি তারা ইবরাহীম হওয়ার দাবী করে, তখন তা খণ্ডন করা হল:
“وما أنزلت التوراة والإنجيل إلا من بعده”
অর্থাৎ “তাওরাত ও ইঞ্জিল তো তার পরে নাযিল করা হয়”সেটা বলা হয়:
“ما كان إبراهيم يهوديا ولا نصرانيا ولكن حنيفا مسلما وما كان من المشركين”
অর্থাৎ ইবরাহীম ইয়াহুদীও ছিলেন না বা নাসারাও ছিলেন না, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম, আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিলেন না”(সূরা আল ‘ইমরান: ৬৭)।
এমনিভাবে যখন মুনাফেকদের সাথে মুজাদালা করতে হয়, তখন শুধু ভূমিকা নেয়া হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন ধর্মান্ধ থাকাও এর মধ্যে। যেমন আল্লাহ বাণী:
"وإذا قيل لهم لا تفسدوا في الأرض قالوا إنما نحن مصلحون . ألا إنهم هم المفسدون ولكن لا يشعرون . وإذا قيل لهم آمنوا كما آمن الناس قالوا أنؤمن كما آمن السفهاء ألا إنهم هم السفهاء ولكن لا يعلمون"
অর্থাৎ আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ায় রংগ-তামাশা সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি । মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝে না। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, অন্যান্যরা যেভাবে ঈমান এনেছে, তোমরাও সেভাবে ঈমান আন, তখন তারা বলে, আমরাও কি ঈমান আনব বোকাদেরই মত। মনে রেখো, প্রকৃত পক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বুঝে না”(সূরা বাকারা:১১-১৩)।
সুতরাং দা‘ঈ যে তার প্রতিপক্ষের ধর্ম ‘আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা- চেতনা, শিক্ষা- সংস্কৃতি পরিমাণ করতে সে অনুসারে তর্ক করতে হবে। প্রতিপক্ষ যে বিষয়ে অজ্ঞ সে বিষয়ে তার সাথে তর্ক লিপ্ত না হওয়াই শ্রেয়।
৪. তর্ক পরিবেশকে অন্ধ সমর্থন যুক্ত তর্কে খণ্ডন যুক্ত রেখে চলা
তর্কে পক্ষ বিপক্ষ উভয় কোন তা‘আসুব তথা পূর্ব মতকে যুক্তাহীনভাবে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকতে এ ধরনের ঘোষণা দেয়া চলেনা বিতর্ক পরিবেশে সুস্থ করার মত সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষ সহজে তা মেনে নিতেও হয়। তাছাড়া, এটা তার অন্তর স্পর্শ করবে। এতে তার অন্তর আল্লাহ সদয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়ে উঠে। এ জন্য দেখা যায় আল কুরআনে বলা হয়:
"قل من يرزقكم من السماوات والأرض قل الله وإنا أوإياكم لعلى هدى أوفي ضلال مبين"
“বলুন, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল থেকে কে তোমাদেরকে রিযিক দেয়। বলুন, আল্লাহ। আমরা অথবা তোমরা সৎ পথে অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি কি আছি”( সূরা সাবা:২৪)।
এ আয়াতেও শেষাংশে আমরা অথবা তোমরা বলে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি যে, প্রতিপক্ষ বিভ্রান্তি বা গোমরাহীতে আছে। বরং তার সম্মানে আঘাতও দিয়ে তাতে উত্তেজিত না করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে উপলব্ধি উপস্থাপন করা হয়। অথচ তা‘আলাই জানেন যে নবী (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা জানেন যে, তারাই সত্যপন্থী। তারপরও “অথবা” দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
টিকাঃ
২০২. মাওলূদ ইয়াসীন, শরহু দিওয়ান আল ‘আযীযা (মুনাযারা রশীদিয়ার পরিশিষ্ট সংযুক্তি)-পৃ-২ তা।
২০৩. ড. মুহাম্মদ মুহাম্মদ হুসাইন, আল ইত্তেজাহাতুল ওয়াতানিয়্যা (মুনাযারা রশীদিয়ার সাথে সংযুক্তি ) পৃ. ৭৫।