📘 ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতি ও আধুনিক প্রেক্ষাপট > 📄 মাউ‘য়িযা হাসানা প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ

📄 মাউ‘য়িযা হাসানা প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ


কাদের ক্ষেত্রে মাউ‘য়িযা হাসানা করা যাবে - এ নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী চিন্তাবিদগণের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে । প্রথমত: মাদ‘উর (দা‘ওয়াতকৃত ব্যক্তি) দের সাধারণ ঝোঁক ও জ্ঞান বৃদ্ধির পরিধিতে দিক দিয়ে বলা হয় যে, সমাজে যারা সাধারণ শ্রেণীর মানুষ, গাফেল- অমনোযোগী, শুধু কথা বুঝা হয় না, আর তবুও তেমন কোন বোধ নেই তাদের মনস্তাত্বিক অবস্থা এখনো জ্ঞান ও জগতে বিদ্যমান স্বাভাবিক বিষয়গুলো বেশী বেশি উপলব্ধি করতে সক্ষম - এ শ্রেণীর লোকদেরকে মাউ‘য়িযায়া হাসানার দ্বারা দা‘ওয়াত দিতে হবে । আর যারা তর্ক তথা তারা বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কে তথ্য দ্বারা গ্রহণ করতে আগ্রহী তাদেরকে উত্তম পন্থায় যুক্তি তর্কের মাধ্যমে দা‘ওয়াত দিতে হবে। অনেক মুফাসসির এ মতটি প্রকাশ করেছেন । যেমন ইমাম রাযী, যামাখশারীন নিসাপূরী প্রমুখ।
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে, এ মতামতটি যথাযথ নয় । কারণ জ্ঞানী জনী তাদের আকল অনুভূতি আছে । যারা তর্কে আগ্রহী তাদের ঐ মনস্তাত্বিক দিক নিশ্চয় না। জ্ঞান কথা বাড়ীয়ে দিয়ে ঘটনাবহুল ঘটনা। মানুষের জীবনে আন্দোলন সৃষ্টিকারী জ্ঞান নয় বরং আবেগ। তাই জ্ঞান ও তর্কে লিপ্ত বুদ্ধিজীবীদেরও মাউ‘য়িযায়া করতে হবে । আর তারা আগ্রহী হলে হবে।
অনেক সময় যুক্তিতে হারলে মানুষ প্রতি পক্ষের মত সর্বান্তকরণে গ্রহণ করতে চায় না। সে ক্ষেত্রে মাউ‘য়িযায়া হলো সে তা গ্রহণ করতে পারে। এজন্য উলামায়ে কেরাম বিতর্কের সময় তবুও শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিপক্ষকে জয় করতে পারেযে ওয়া‘য করেন। অতএব মাউ‘য়িযা একটা সর্বব্যাপী দা‘ওয়াতী পদ্ধতি।
দ্বিতীয়ত: এ মাউ‘য়িযা হাসানা কি শুধু মুসলমানদের জন্য, না অমুসলিমদেরকেও তা করা যাবে-এ নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে । ক. প্রথম দলের মতে মাউ‘য়িযা হাসানা শুধু মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য।কারণ আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন:
“هذا بيان للناس وهدي وموعظة للمتقين”
“এই হলো মানুষের জন্য বর্ণনা, আর মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত ও উপদেশ ‘আর (মানুষ) বলে ‘আম (ব্যাপক) ধারণা দিয়ে মাউ‘য়িযাকে মুত্তাকীদের জন্য খাছ (নির্দিষ্ট) করা হয়েছে।
খ. জমহুর ওলামা মতে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে মাউ‘য়িযা করা যাবে। আর উপরোক্ত আয়াতে মত্তাকী বলতে প্রতি ভীতি প্রদর্শন
(المتقون من كل أمة) বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবন আব্বাস (রা.), ইবন আতিয়া (র.) প্রমুখের মত ও তা-ই।
আসলে প্রতিটি মানুষের অন্তরে সৃষ্টিকর্তার ভয় কোন না কোন ভাবে কিছু বিদ্যমান। আর যে যত বেশী মুত্তাকী মাউ‘য়িযা থেকে বেশী কার্যকর । আর তাই এই নয় যে, অমুসলিম মুত্তাকীদের মাঝে মাউ‘য়িযা করা যাবে না। বরং আল কুরআনে এসেছে কাফেরদের উদ্দেশ্য নিজ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে ব্যাপক ভাবে মাউ‘য়িযায়া করেছেন । ঈমান আনাকে, আর না আনাকে । যেমন পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সালেহ (আ.) এর কওম তাঁকে বলেছিল, তুমি আমাদের ওয়া‘য কর আর না কর - উভয়ই সমান। তেমনি দেখা যায়, হযরত মুহাম্মদ (স.)কে আল্লাহ পাক আদেশ করেছেন মক্কাবাসীদেরকে বলার জন্য:
"قل إنما أعظكم بواحدة أن تقوموا مثني وفرادى ثم تتفكروا"
“ বলুন, “আমি তোমাদেরকে যে অবস্থা উপদেশ দিচ্ছি যে, আল্লাহর জন্য দু‘জন বা একাকী যাও, অতঃপর চিন্তাভাবনা কর”(সূরা শুরা : ১৩৬)।
তোমরা ভাবে নসীহত করা মাউ‘য়িযার অন্তর্ভুক্ত অথচ অনেক রাসূল (আ.) এর কন্ঠে এসেছে, "أبلغ رسالات ربي وأنا لكم ناصح أمين" “আমার প্রভুর রিসালাত সমূহ তোমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছি। আর আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত উপদেশ দাতা”(সূরা আ‘রাফ:৬৮)। এমনিভাবে প্রত্যেক রাসূল তাদের উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন। জাহাজের সুসংবাদ দিয়েছেন । মক্কার সেই সব ক‘টি কাজই মাউ‘য়িযায়া হাসানার অন্তর্ভুক্ত।
তাহছাড়া, প্রথম মুত্তাকীদের উল্লেখিত যে আয়াত দ্বারা অমুসলিমদের জন্য খাস করা হয়, পক্ষান্তরে অন্য আয়াতে এসেছে যে, এটা সকল মানুষের জন্য। ইরশাদ হচ্ছে:
"يا أيها الناس قد جاءتكم موعظة من ربكم وشفاء لما في الصدور"
“হে মানব সকল! তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে মাউ‘য়িযা এসেছে এবং অন্তরের রোগ নিরাময়ের জন্য ঔষধ এসেছে”(সূরা ইউনুস: ৫৭)।

টিকাঃ
১৩৬.ড. ফখরুদ্দীন রাযী, প্রাগুক্ত, ১৪. পৃ.৪৪৪।
১৩৭.আলুসী, প্রাগুক্ত, ১৪. পৃ. ১৫৭।
১৩৮.ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১৪. পৃ. ১৫৭। আলুসী, প্রাগুক্ত।
১৩৯.ড. মুহা: আব্দুর রহমান আনওয়ারী, ইসলামী দা‘ওয়াহ কার্যক্রমে মাউ‘য়িযা হাসানা : স্বরূপ ও প্রয়োগ, দি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ,৮ম খ. ১ম সংখ্যা, কুষ্টিয়া, ডিসেম্বর ১৯৯৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00