📄 মাউ‘য়িযা হাসানা প্রয়োগরে মূলনীতি
মাউ‘য়িযা হাসানা হওয়ার জন্য তথা ওয়া‘যের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য কিছু মূলনীতি আছে । যা অনুসরণ করলে ওয়া‘যকারী দা‘ঈ বা সমষ্টি পর্যায়ের ওয়া‘যে সুফল লাভ করতে পারেন। সে সবের মাঝে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ ক‘টি মূলনীতি নিম্ন উল্লেখ্য:
১. হিকমত অবলম্বন: মাউ‘য়িযা হাসানা করতে অবশ্যই হিকমত অবলম্বন করতে হবে। তথা কোন কাল পাত্র ও পরিস্থিতি বিচার করে বলতে হবে। কারণ অজ্ঞতার বিভিন্নতায় গুনাগুণেও বিভিন্নতা আসে। কেননা মসজিদে মাউ‘য়িযা হল মানুষের অন্তর নরম করার অন্যতম হাতিয়ার। সেখানে মাউ‘য়িযার সময় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যেমন আছর অথবা মাগরিবের পর থেকে ইশার নামাযের পূর্ব পর্যন্ত । কিন্তু তা রোজগারান্তে হয়, যেখানে শ্রোতার মন মানসিকতায় সম্পূর্ণ নতুন ও সংক্ষিপ্ত হওয়ারই বাঞ্চনীয়।
তেমনি শীতের রাতে ওয়া-বৃষ্টি বর্ষণ ইত্যাদি লক্ষ্য রেখে মাউ‘য়িযায়া পরিবেশন করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ একজন যুবককে ওয়া‘য হলে তাকে উৎসাহ ব্যঞ্জক দিকটি প্রাধান্য দেয়া বাঞ্চনীয়। তেমনি কোন বয়োবৃদ্ধকে জীবনের শেষ পরিণতি ও পরকালের চিত্র তুলে ধরে ওয়া‘য করলে বেশি কার্যকরী হতে পারে । এমনিভাবে পরিস্থিতিতে যাচাই করতে হবে । কোন শোক বা আনন্দ সভায় কিংবা কোন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। অন্যথায় তার মাউ‘য়িযা কখনো হাসানা হবে না। এ জন্য আল্লাহ পাক বলেন:
إن ذكر إن نفعت الذكر “উপদেশ দাও যদি সে উপদেশ উপকারে আসে”(সূরা আ‘লা : ৯)।
২. দা‘ঈর আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থ মনোভাব প্রদর্শন: মাউ‘য়িযাকে ফলপ্রসূ করতে হলে দা‘ঈকে বৈষয়িক কোন মনোবৃত্তি প্রয়োগ করতে হবে । নির্দিষ্ট ব্যক্তি যদি কোন ভাবে বুঝতে পারে যে, এতে দাঈর কোন বৈষয়িক স্বার্থ নিহিত আছে, তা হলে তার ওয়া‘যের প্রভাব হালকা হয়ে যাবে। সুতরাং মাউ‘য়িযাকে এমনভাবে হৃদয় নিংড়ানো আকুতি দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে যে, এতে দাইর কোন স্বার্থ নেই । যেমন টাকা পয়সা, সম্মান, পদমর্যাদা, সুনাম- সুখ্যাতি অর্জন ইত্যাদি । এ জন্য দেখা যায়, প্রত্যেক নবী (আ.) তাদের দা‘ওয়াতী কার্যে ঘোষণা দিতেন:
وما أجر إن إلا على رب العالمين
এ বিষয়ে আমি তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাহি না, আমার প্রতিদান একমাত্র বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের কাছে”। তেমনি তারা প্রতিদান চাইতেন আল্লাহর কাছে। সে আদেশ দিয়েছেন ঘোষণা দেয়ার জন্য-
قل لا أسلكم عليه أجرا إن هو إلا ذكر للعالمين
“(হে নবী) বলুন, আমি তোমাদের নিকট কোন বদলা চাচ্ছি না, এটা বরং বিশ্ব জগতের জন্য উপদেশ স্বরূপ”(সূরা আন‘আম:৯০)। সুতরাং দা‘ঈর অত্যন্ত ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে মাউ‘য়িযায়া করতে হবে। এজন্য বলা হয়, “যা অন্তর থেকে বের হয়, তা অন্যের অন্তরে স্থান লাভ করে”।
৩. শ্রোতৃত্ব, সৌন্দর্য ও ভালবাসার উপলব্ধি করা: দা‘ঈকে স্বীয় মাউ‘য়িযায় কথা বলে শ্রোতৃত্ব, সৌন্দর্য ও ভালবাসার বন্ধন বজায় উদগীরণ করতে হবে । তবেই তা মাদ‘উর (দা‘ওয়াত কৃত ব্যক্তি) এর অন্তর স্পর্শ করবে। আর এটা মাউ‘য়িযার ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আল কুরআনে আল্লাহ পাক বৈচিত্র্যময় সম্বোধন করেছেন। যেমন, হে ঈমানদারগণ, হে মানব জাতি, হে মুমিন । এমনি ভাবে বলেছেন-কুরআনে স্থানে স্থানে নবী (আ.) কে ইবরাহীম(আ.), এমনিতর বলা হয় যে, জাতির ভাই কওমের লোকদেরকে আহ্বান করত বলতেন। তাই দা‘ঈও সে পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন।
নবী (আ.) কিভাবে ভালবাসা উদগীরণ করতেন, তার প্রচুর নমুনা আল কুরআনে এসেছে । যেমন এক পর্যন্ত সালেহ (আ.) বলেনঃ
ونصحت لكم ولكن لا تحبون الناصحين
টিকাঃ
১৩৪.সূরা আ‘রাফ: ১৩৮,১২৭,১৪৫,১৬৪,১৮০।
১৩৫.সূরা শু‘আরা: ১০৯,১২৭,১৪৫,১৬৪,১৮০।
📄 মাউ‘য়িযা হাসানা প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ
কাদের ক্ষেত্রে মাউ‘য়িযা হাসানা করা যাবে - এ নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী চিন্তাবিদগণের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে । প্রথমত: মাদ‘উর (দা‘ওয়াতকৃত ব্যক্তি) দের সাধারণ ঝোঁক ও জ্ঞান বৃদ্ধির পরিধিতে দিক দিয়ে বলা হয় যে, সমাজে যারা সাধারণ শ্রেণীর মানুষ, গাফেল- অমনোযোগী, শুধু কথা বুঝা হয় না, আর তবুও তেমন কোন বোধ নেই তাদের মনস্তাত্বিক অবস্থা এখনো জ্ঞান ও জগতে বিদ্যমান স্বাভাবিক বিষয়গুলো বেশী বেশি উপলব্ধি করতে সক্ষম - এ শ্রেণীর লোকদেরকে মাউ‘য়িযায়া হাসানার দ্বারা দা‘ওয়াত দিতে হবে । আর যারা তর্ক তথা তারা বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কে তথ্য দ্বারা গ্রহণ করতে আগ্রহী তাদেরকে উত্তম পন্থায় যুক্তি তর্কের মাধ্যমে দা‘ওয়াত দিতে হবে। অনেক মুফাসসির এ মতটি প্রকাশ করেছেন । যেমন ইমাম রাযী, যামাখশারীন নিসাপূরী প্রমুখ।
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে, এ মতামতটি যথাযথ নয় । কারণ জ্ঞানী জনী তাদের আকল অনুভূতি আছে । যারা তর্কে আগ্রহী তাদের ঐ মনস্তাত্বিক দিক নিশ্চয় না। জ্ঞান কথা বাড়ীয়ে দিয়ে ঘটনাবহুল ঘটনা। মানুষের জীবনে আন্দোলন সৃষ্টিকারী জ্ঞান নয় বরং আবেগ। তাই জ্ঞান ও তর্কে লিপ্ত বুদ্ধিজীবীদেরও মাউ‘য়িযায়া করতে হবে । আর তারা আগ্রহী হলে হবে।
অনেক সময় যুক্তিতে হারলে মানুষ প্রতি পক্ষের মত সর্বান্তকরণে গ্রহণ করতে চায় না। সে ক্ষেত্রে মাউ‘য়িযায়া হলো সে তা গ্রহণ করতে পারে। এজন্য উলামায়ে কেরাম বিতর্কের সময় তবুও শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিপক্ষকে জয় করতে পারেযে ওয়া‘য করেন। অতএব মাউ‘য়িযা একটা সর্বব্যাপী দা‘ওয়াতী পদ্ধতি।
দ্বিতীয়ত: এ মাউ‘য়িযা হাসানা কি শুধু মুসলমানদের জন্য, না অমুসলিমদেরকেও তা করা যাবে-এ নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে । ক. প্রথম দলের মতে মাউ‘য়িযা হাসানা শুধু মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য।কারণ আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন:
“هذا بيان للناس وهدي وموعظة للمتقين”
“এই হলো মানুষের জন্য বর্ণনা, আর মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত ও উপদেশ ‘আর (মানুষ) বলে ‘আম (ব্যাপক) ধারণা দিয়ে মাউ‘য়িযাকে মুত্তাকীদের জন্য খাছ (নির্দিষ্ট) করা হয়েছে।
খ. জমহুর ওলামা মতে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে মাউ‘য়িযা করা যাবে। আর উপরোক্ত আয়াতে মত্তাকী বলতে প্রতি ভীতি প্রদর্শন
(المتقون من كل أمة) বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবন আব্বাস (রা.), ইবন আতিয়া (র.) প্রমুখের মত ও তা-ই।
আসলে প্রতিটি মানুষের অন্তরে সৃষ্টিকর্তার ভয় কোন না কোন ভাবে কিছু বিদ্যমান। আর যে যত বেশী মুত্তাকী মাউ‘য়িযা থেকে বেশী কার্যকর । আর তাই এই নয় যে, অমুসলিম মুত্তাকীদের মাঝে মাউ‘য়িযা করা যাবে না। বরং আল কুরআনে এসেছে কাফেরদের উদ্দেশ্য নিজ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে ব্যাপক ভাবে মাউ‘য়িযায়া করেছেন । ঈমান আনাকে, আর না আনাকে । যেমন পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সালেহ (আ.) এর কওম তাঁকে বলেছিল, তুমি আমাদের ওয়া‘য কর আর না কর - উভয়ই সমান। তেমনি দেখা যায়, হযরত মুহাম্মদ (স.)কে আল্লাহ পাক আদেশ করেছেন মক্কাবাসীদেরকে বলার জন্য:
"قل إنما أعظكم بواحدة أن تقوموا مثني وفرادى ثم تتفكروا"
“ বলুন, “আমি তোমাদেরকে যে অবস্থা উপদেশ দিচ্ছি যে, আল্লাহর জন্য দু‘জন বা একাকী যাও, অতঃপর চিন্তাভাবনা কর”(সূরা শুরা : ১৩৬)।
তোমরা ভাবে নসীহত করা মাউ‘য়িযার অন্তর্ভুক্ত অথচ অনেক রাসূল (আ.) এর কন্ঠে এসেছে, "أبلغ رسالات ربي وأنا لكم ناصح أمين" “আমার প্রভুর রিসালাত সমূহ তোমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছি। আর আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত উপদেশ দাতা”(সূরা আ‘রাফ:৬৮)। এমনিভাবে প্রত্যেক রাসূল তাদের উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন। জাহাজের সুসংবাদ দিয়েছেন । মক্কার সেই সব ক‘টি কাজই মাউ‘য়িযায়া হাসানার অন্তর্ভুক্ত।
তাহছাড়া, প্রথম মুত্তাকীদের উল্লেখিত যে আয়াত দ্বারা অমুসলিমদের জন্য খাস করা হয়, পক্ষান্তরে অন্য আয়াতে এসেছে যে, এটা সকল মানুষের জন্য। ইরশাদ হচ্ছে:
"يا أيها الناس قد جاءتكم موعظة من ربكم وشفاء لما في الصدور"
“হে মানব সকল! তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে মাউ‘য়িযা এসেছে এবং অন্তরের রোগ নিরাময়ের জন্য ঔষধ এসেছে”(সূরা ইউনুস: ৫৭)।
টিকাঃ
১৩৬.ড. ফখরুদ্দীন রাযী, প্রাগুক্ত, ১৪. পৃ.৪৪৪।
১৩৭.আলুসী, প্রাগুক্ত, ১৪. পৃ. ১৫৭।
১৩৮.ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ১৪. পৃ. ১৫৭। আলুসী, প্রাগুক্ত।
১৩৯.ড. মুহা: আব্দুর রহমান আনওয়ারী, ইসলামী দা‘ওয়াহ কার্যক্রমে মাউ‘য়িযা হাসানা : স্বরূপ ও প্রয়োগ, দি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ,৮ম খ. ১ম সংখ্যা, কুষ্টিয়া, ডিসেম্বর ১৯৯৯।