📘 ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতি ও আধুনিক প্রেক্ষাপট > 📄 হিকমতের স্বরূপ

📄 হিকমতের স্বরূপ


হিকমত শব্দটি আরবী । মূল ধাতুগত দিক দিয়ে এর বিভিন্ন অর্থ করা হয় । বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত আরবী-বাংলা অভিধানে বলা হয় যে, এর অর্থ হল তত্ত্বজ্ঞান, বিজ্ঞতা, জ্ঞান, দর্শন, পরিজ্ঞানান্বিতা, বিচক্ষণতা। এ শব্দটি ‘আরবী ভাষায় حکمت থেকে ব্যবহৃত হয় । এ অভিধায় এ অর্থ আদেশ করা, শাসন করা, নিষেধ করা, বিরত রাখা, বিধিসম্মত পরিচালনা করা, আদেশ প্রবর্তন করা, মীমাংসা করা। এ থেকেই حكيمশব্দটির ব্যবহার, যা এমনকি বাংলা ভাষাতেও প্রচলিত। আরবী ভাষাতে حكيم শব্দটি ফয়সালা কারী ও চিকিৎসক অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। حکمت শব্দটি কার্যকারণ ও রহস্য অর্থেও ব্যবহৃত। যেমন বলা হয় تشريع حكمة। এর অর্থ আইন প্রণয়নের কার্যকারণ বা الحكمة
‘এর পিছনে যুক্তি রহস্য। মূলত হিকমত এমন একটি ব্যাপকার্থক প্রত্যয়, যার প্রতিশব্দ নেই । যাকে এক কথায় অন্য ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব নয় ।
আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান ‘আলী নাদভী সাহেব উল্লেখ করেছেন:
الحكمة الكلمة البليغة العربية التي جاعت في الأمي لا اعتقد أنها من الممكن ترجمتها أو نقلها إلى لغة أخرى”
অর্থাৎ “আয়াতে উল্লেখিত হিকমত শব্দটির তাৎপর্য পূর্ণ আরবী শব্দ, যা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না”। আর এ জন্য হিকমত শব্দটির যথাযথ ওপর মতামত ও বৈশিষ্ট্যময় বিভিন্ন পরিভাষার নিচে এ গুলোর মাঝে ক‘টি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য উল্লেখ করা হলো:
ক. বিশিষ্ট তা‘ঈ মুজাহিদ (র.) বলেন - في القول "هي الإصابة "الحكمة
والفعل
অর্থাৎ কথা ও কাজে সঠিক তথা যথাযথ করার নাম হিকমত”।
প্রখ্যাত মুফাসসির তাবারী ও খায়েন এক বাণীতে এ মতই পোষণ করেছেন”।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী এ সঙ্গে আরো কিছু যুক্ত করে বলেন في الإصابة "هي
القول والفعل ووضع كل شيء موضعه"
অর্থাৎ “কথা ও কাজে সঠিক তথা যথাযথ এবং প্রত্যেকটি বিষয় বা বস্তুকে যথাযথ স্থানে রাখাকে হিকমত বলে””।
উল্লেখ্য, তাফসীরে বাযেন কোনো কোনো তাফসীরের অনুসন্ধানে এ মতকে সমর্থন করেছেন তাঁরা দু’জনেই বলেছেন, কেউ কথা ও কাজে উভয় যথাযথ না হলে তাকে হাকীম বলা যাবে না”।
খ. ইমাম মালেক (র.) বলেন, হিকমতের অর্থ আমার অন্তরে যা আসে তা হল, আল্লাহ তা‘আলা দ্বীন সম্পর্কে profundo বুঝ । আর এটা এমন একটা বস্তু, যা আল্লাহ স্বীয় দয়া, করুণায় মানুষের অন্তরে ঢেলে দেন”। আল্লামা তাবারী স্বীয় তাফসীরে ইবনে যায়েদ (র.) থেকে এমনি একটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন:
“الحكمة شيء يجعله الله في القلب ينور له به”
অর্থাৎ“হিকমত এমন একটা বস্তু, যা আল্লাহ পাক (মানব) অন্তরে স্থাপন করে দেন, যার দ্বারা তা আলোকিত হয়ে যায়””।
গ. আল্লামা আলুসী এমনি এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন যে, আবু ‘উসমানের মতে
“هي نور يقذف به بين الوسواس والإلهام”
“হিকমত হল একটি জ্যোতি বিশেষ, যার দ্বারা কোনটা শয়তানের পক্ষ থেকে) প্ররোচনা, আর কোনটা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) ইলহাম, তা পার্থক্য করা যায়””। ঘ. ‘আল্লামাহ ইবনুল কায়্যিম হিকমতের সংজ্ঞায় উল্লেখ্য করেন:
قال ابن قتيبة الجمهور : الحكمة إصابة الحق والعمل به ، وهي العلم النافع والعمل الصالح”
অর্থাৎ “ইবন কুতাইবা ও অধিকাংশ ‘উলামার মতে হিকমত হল, সত্যে উপনীত হওয়া এবং সে অনুসারে কাজ করা । এটা হল উপকারী বিদ্যা ও নেক কাজ””। ঙ. লিসানুল ‘আরব প্রণেতা ইবন মনযূর আল ইফরীকী এবং বিশিষ্ট ভাষাবিদ ইবনুল আছীর উল্লেখ করেন:
“الحكمة عبارة عن معرفة أفضل الأشياء بأفضل العلوم”
অর্থাৎ “সর্বোত্তম বিদ্যার মাধ্যমে सर्वोत्तम বিষয়সমূহ জানার নাম হিকমত””। চ.‘আল্লামা রাগেব ইসফাহানী মতে - صالح وعمل علم لكل حسن اسم الحكمة وهو بالعلم العملي أخص منه من النظري وفي العمل إستعمالا أكثر
منه في العلم وإن كان العمل لا يكون محكما من دون العلم به ... وهي في تعاريف الشرع اسم للعلوم العملية أي المدركة بالعقل ‘
অর্থাৎ “ হিকমত হল উত্তম বিদ্যা ও নেক কাজ। আর এটা তাত্ত্বিক বিদ্যার চেয়ে ফলিত বিদ্যার সাথে সম্পর্ক যুক্ত বেশী । আর বিদ্যার চেয়ে কর্ম ক্ষেত্রে বেশী ব্যবহৃত । যদিও কোন কাজ সম্পর্কে না জানা পর্যন্ত তা হিকমতপূর্ণ হয় না । আর এটা শরীয়তের পরিভাষায় সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের নাম””।
ছ. কারো মতে- الأشياء" كليات ويعني الموجودة بحقائقها "معرفة
অর্থাৎ “বস্তু বা বিষয়সমূহের স্বভাবগত মূলনীতি সম্পর্কে জানার নাম হিকমত””।
‘আল্লামা রাযী উল্লেখ করেন, হিকমত হল- আল্লাহর একতি বিশেষ । তাই একে যখন আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়, তখন এর অর্থ হবে বিষয় বা বস্ত সমূহের বুদ্ধিগত বা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য যোগ্যতা ও উদ্ভাবন করা। আর সে হিকমতকে বান্দার সাথে সম্পর্কিত করা হয়, তখন এর অর্থ হবে যে, সে স্বভাবগত গুণাগুণ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে, বস্তুর উপযোগিতা আনতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে না।
উপরিউক্ত সংজ্ঞা ও মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে হিকমতের স্বরূপ সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হল-
প্রথমত: এটা কথা ও কাজের এক বিশ্লেষণ। তা হল, এ গুলো যথার্থ হবার ক্ষেত্রে যেখানে যা প্রযোজ্য, সেখানে তা করতে সমর্থ হলেই বলা হবে সে হিকমতধারী । যথা প্রখ্যাত তা‘ঈ মুজাহিদ, বিশিষ্ট মুফাসসির তাবারী, রাযী, খায়েন, আলুসী প্রমুখের মত।
দ্বিতীয়ত: এটা এমন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নাম, যার দ্বারা বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে সে অনুসারে কাজের নির্দিষ্ট বলয় নির্ধারিত হওয়া যায় । যথা আল্লামা রাগেব, ইবন মনযূর, ইবনুল আছীর প্রমুখের মতামত থেকে আমরা এটা জানতে পারি।
তৃতীয়ত: এটা একটা নূর বা সহজাত জ্যোতি, যা ইসলামী তথা আল্লাহ প্রদত্ত । যার মাধ্যমে মানুষ সত্যকে চিনে নিতে পারে এবং সত্য, মিথ্যা, ভাল মন্দ, কল্যাণ অকল্যাণের মাঝে পার্থক্য করতে পারে।

টিকাঃ
৮৩.মুহাম্মদ আলাউদ্দিন আল- আযহারী, প্রাগুক্ত, ২৭. পৃ. ১২০৫।
৮৪.প্রাগুক্ত, ড. আল মু‘জাম আল ওসীত, (দিল্লী: দারুল ইলম, তা.বি.)পৃ.১৯০।
৮৫.ড. আল মু‘জাম আল ওসীত, পৃ.১৯০।
৮৬.সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নাদভী, মা‘রাকাত মিন আ‘যাযিব দাওয়াহ (কূয়েত: দারুল কলম, ১৯৮১ইং/১৪০১হি:)পৃ. ২৫।
৮৭.ইবন জরীর তাবারী, জামি উল বায়ান ফি তাফসীলিল কুরআন, (বৈরুত: দারুল মারিফা ১৪০৫হি.) পৃ. ৩৭, তা.বো. সা‘দী মা‘আনী পৃ. ৭৪।
৮৮.প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭, তা.বো. সা‘দী মা‘আনী . পৃ. ৭৪১।
৮৯.মুহাম্মদ আলাউদ্দিন বাগদাদী, তাফসীরে খায়েন, (কায়রো:‘মাতবা‘আতু মুস্তফা আল বাবী, তা.বি.) পৃ.৩১২।
৯০.ড. ৭৪, তাফসীরে খায়েন প্রত্যেকটি তা সমর্থন করেছেন, প্রখ্যাত মুফাসসির আবু হায়ানের আল বাহরুল মুহীত (১৭. পৃ.৩১০) এবং আল্লামার রুহুল মা‘আনী (১৭.পৃ.৭৯) এ ধরনের মতামত পাওয়া যায়।
৯১.ইমাম মালেক, তাফসীরুল কুরতুবী ‘আলায়ান, ১৪.পৃ.৩০২।
৯২.ইবন জরীর তাবারী, প্রাগুক্ত,১৪.পৃ. ৪৩৬।
৯৩.আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩৭.পৃ.৭৪১।
৯৪.ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ, মাওয়ারেযু সা‘আদা (সিরিয়া: মাতবাআতুর রিয়াদ আল হাদীছাহ, তা. বি) ১৪.পৃ.৫৮।
৯৫.ইবন মানযূর আল ইফরীকী, লিসানুল ‘আরব (দার সাদর, তা. বি) ১২খ.পৃ.১৪০, ইনবুল আছীর, আন নিহায়া ফি গারীবিল হাদীছ ওলায়িল আথার, (বৈরুত: আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যাহ, তা. ১৪.)পৃ.১১১৯।
৯৬.রা - রাগেব আল ইসফাহানী, আয-যারিয়াতু মাকারিমুশ শরী‘আহ (বৈরুত: দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ, ১৯৮০হি:)পৃ.১০৪।
৯৭.ড.তাফসীরে বাযেন,১৪.পৃ.২১১, রাগেব ইসফাহানী, প্রাগুক্ত।
৯৮.ফখরুদ্দীন রাযী, প্রাগুক্ত।

📘 ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতি ও আধুনিক প্রেক্ষাপট > 📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত

📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত


পূর্বেই এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে যে, ইসলামী দা‘ওয়াতের পদ্ধতির অন্যতম স্তম্ভ ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল হিকমত। কি ভাবে দা‘ওয়াত দিতে হবে হিকমতের সাথে। তিনি বলেছেন “তোমরা রবের পথে দা‘ওয়াত দাও হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে, যুক্তি তর্ক কর সর্বোত্তম পন্থায়” (সূরা নাহল: ১২৬)। এ আয়াতে হিকমত সম্পর্কে যা উদ্দেশ্য তা নিয়েও প্রচুর মতামত রয়েছে । কারো মতে- আল কুরআন নিজেই।
অধিকাংশের মতে এটাই যুক্তি বা কথা, যা মানব অন্তরে এমনিতেই স্থান করে নেয়। মানুষ কোন ভিন্ন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই তা গ্রহণ করতে পারে । আর তাদের হিকমত শুধু সমালোচনার দা‘ওয়াত দেয়ার জন্য প্রযোজ্য। আর যারা কুটিল, অবহেলা, उदासीनতা অথবা অন্য কারণবশত উপলব্ধিতে অক্ষম সেই পথ থেকে কথা শুনেও পথভ্রষ্ট থাকবে। আর যারা কুটিল ও ধূর্ত, বক্র হৃদয়ের অধিকারী তর্ক লিপ্ত হয় এবং সত্যকে সহজ গ্রহণ করতে চায় না, তাদের মুজাদালা বিল আহসান দ্বারা দা‘ওয়াত দিতে হবে । যেখানে আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে”।
অতএব উপরোক্ত মতামতগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, প্রথমোক্ত দুটি মতে হিকমত অর্থ কুরআন সুন্নাহ। আর এ দুটি মতে অন্তর্ভুক্ত আলোতে হয় যে, ইসলামী দা‘ওয়াত অবশ্যই কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক হতে হবে। উভয়টির দা‘ওয়াত পদ্ধতির প্রাথমিক উৎস। কিন্তু দা‘ওয়াতের কার্যক্রমে অন্যান্য প্রয়োগ ও ফলিত দিকটি প্রয়োজন।
তৃতীয় মতটি উভয় দিকে দেখে হিকমত বলতে এক বিশেষ ধরনের দলীল বা যুক্তির কথা উল্লেখ করা হয় যা শুনে কেউ বিনাদ্বিধায় মানব মনে স্থান করে নেয় । কিন্তু পূর্বোক্ত আলোচনায় হিকমতের যে ব্যাপক ফুটে উঠেছে, তা দ্বারা কেবল দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রেও হিকমতে শুধু বিশেষ জ্ঞান বা কথার সীমাবদ্ধ করা সমীচীন হবে না । কেননা হিকমতের ধারণাটি কথা ও কাজ উভয়ের মাঝে বিস্তৃত। যা দা‘ওয়াতের প্রয়োগেও কার্যকরী। কেননা দা‘ওয়াত প্রচেষ্টা, যা আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ গুণ। সবাই দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত প্রয়োগে সমান দক্ষভাবে স্থান করে নিতে পারে না ।

টিকাঃ
১০২.যামাখশারী, প্রাগুক্ত, ১৪.পৃ.১০১।
১০৩.ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২২.পৃ.১০৭।
১০৪.ফখরুদ্দীন আর রাযী, প্রাগুক্ত, ১৯৮. পৃ. ১৩৮. আলুসী, প্রাগুক্ত, ১৯৮. পৃ.১৩৪-৩৫।
১০৫.ফখরুদ্দীন বাযেন, প্রাগুক্ত।

📘 ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতি ও আধুনিক প্রেক্ষাপট > 📄 ইসলামী দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের ধরন ও প্রায়োগিক নমুনা

📄 ইসলামী দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের ধরন ও প্রায়োগিক নমুনা


উল্লেখ্য, ইসলামী দা‘ওয়াতের কার্যক্রমে এ পরিধি যেমন ব্যাপক, তেমনি হিকমতের পরিধিও ব্যাপক । সুতরাং দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের ধরনসমূহ সম্পর্কে ধারণা নেয়া ও এর প্রয়োগ প্রসঙ্গে মন্তব্য নয় । তবে দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের মৌলিক কয়েকটি দিক আছে, যেমন প্রস্তুতি, স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা, বিষয় বিবেচনা, উপস্থাপন এবং ভাষার নিজস্ব আচরণ । এসব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ক‘টি দিক পেশ করা হল:-
প্রথমত: দা‘ওয়াতের প্রস্তুতি বিষয়ক বিবেচনা
দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত প্রয়োগের প্রথম কথা হল- দা‘ওয়াতের প্রস্তুতি নিতে হবে । হঠাৎ আবেগাপ্লুত হয়ে একজনকে কিছু শুনিয়ে দেয়া বা আবেগের তোড়ে কাউকে কিছু বলা যায়। কোন পরিকল্পনা কিছু না নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধরনের দা‘ওয়াত তেমন ফলপ্রসূ হয় না । তাই দা‘ঈ কে দা‘ওয়াত দানকারীকে প্রস্তুতি নিতে হবে । এজন্য আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আ.) কে নবুয়ত দিয়ে ফিরা‘উনের নিকট পাঠাবার জন্য পাঠানোর পূর্বে মূসা (আ.) প্রস্তুতিমূলক ভাবে তার নিজের নিকট থেকে দোয়া করলেন:
"رب اشرح لي صدري ويسرلي أمري واحلل عقدة من لساني يفقهوا قولي واجعل وزيرا من أهلي هارون أخي"
“হে আমার প্রভু পালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন, আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে, আর আমার পরিবারবর্গের মধ্যে থেকে আমার ভাই হারুনকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন”(সূরা ত্বহা:২৫-৩০)। দা‘ওয়াতী কাজ করতে গেলে ধৈর্য ও সংযমের জন্য অন্তরের প্রশস্ততা, দা‘ওয়াত উপস্থাপনে ভাষার সাবলীলতা ও সার্বিক কাজে সাহায্যকারী সঙ্গীর প্রয়োজন । অতএব মূসার (আ.) উপরোক্ত আবেদনটি এ ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনি ভাবে আখেরী নবী মুহাম্মদ (স.) কে দা‘ওয়াতী কাজের প্রস্তুতি স্বরূপ সুরা আলাক, মুযযাম্মিল ও মুদ্দাসসিরের প্রথম দিকের আয়াত গুলো অবতীর্ণ হয়েছিল । তাতে পড়া, ধৈর্য ধরা, ইবাদাতে রাত্রি জাগরণ ও পবিত্রতা অর্জন ইত্যাদি কার্যাবলি ও গুণাবলীর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল ।
এ ছাড়া প্রস্তুতি মূলক ভাবে আরো কিছু কাজ কিন্তু ফলপ্রসূ হয়, যথা:-
উল্লিখিত বিষয়টি দা‘ঈ নিজে কর্মে প্রতিপালন: যে বিষয়টির দা‘ওয়াত হচ্ছে তাই দা‘ঈ নিজে জীবনে বাস্তবায়ণ করা । এ জন্য আল কুরআনে বলা হয়েছে:
"يا أيها الذين آمنوا لم يقولون مالا تفعلون كبر مقتا عند الله أن تقولوا مالا تفعلون"
অর্থাৎ“হে মু‘মিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক” (সূরা আস সাফ:২-৩)। এ জন্য মহানবী (স.) বলেছেন- "ابدأ بنفسك" “তোমরা নিজের দ্বারা শুরু কর”১০৫।
দা‘ওয়াতের উপস্থাপনা মূল্যায়ন করা: দা‘ওয়াতের বিষয়বস্তু, পদ্ধতি, ভাষা, দা‘ওয়াতের টার্গেটকৃত উপযুক্ত ব্যক্তি, যে মূল্যায়ন করে দা‘ওয়াতকে অগ্রসর হতে হবে।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্টতা: দা‘ঈ যে বিষয়ে যে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য দা‘ওয়াত দিচ্ছেন, তা স্পষ্ট নিজের কাছে স্পষ্ট থাকতে হবে। ইসলামী দা‘ওয়াতের লক্ষ্য হল ইনসান প্রচার, আর উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এ ছাড়া ব্যক্তি বা সমষ্টি, প্রভৃতি, সুনাম ইত্যাদি কোন দা‘ওয়াতী কাজ করলে, তা ইসলামী দা‘ওয়াত হবে না, এবং দা‘ওয়াত ফলপ্রসূ হবে না। বরং এমন অজ্ঞতার জন্য অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে।
পরিকল্পনা প্রণয়ন: হিকমত অনুসারে এ দা‘ওয়াতী কাজ ফলপ্রসূ করার জন্য সময় কালভিত্তিক সম্ভাব্য পর্যায়ে ভাগ করতে হবে । যেমন প্রস্তুতি পর্ব, উপস্থাপন পর্ব, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পর্ব এবং মোকাবিলার ও হকের বাস্তবায়ণ পর্ব ইত্যাদি। শুধু উপস্থাপনা করে দিলেই শেষ হবে না, প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
মূল সমস্যা নিরূপণ: যে ব্যক্তি বা সমাজে দা‘ওয়াতী কাজ করা উদ্দেশ্য, তার মূল সমস্যা নিরূপণ করতে হবে এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে । এজন্য মূল সমস্যা নকল নবী (আ.) তাদের সমাজে বিরাজমান দা‘ওয়াতের ব্যাপারে মূল সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করেছেন। যেমন নূহ (আ.) এর যুগে শিরক দা‘ওয়াত, হূদ (আ.) ও সালেহ (আ.) এর সময়ে ইহ-পারত্রিক জীবনে ভারসাম্য, লূত (আ.) এর যুগে নৈতিক মৌলবাদ ভারসাম্য এবং শু‘আইব (আ.) এ যুগে ব্যবসা বাণিজ্যে সততা ও ইনসাফের দা‘ওয়াতের উপর দিয়ে ছিলেন।
দ্বিতীয়ত: বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্র
দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে বিষয় বস্তু একটা মৌলিক দিক তথা উপকরণ । বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে হিকমত হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অগ্রাধিকার দেয়া । এজন্য দেশ, কাল মুসলমান যেহেতু পৃথিবীর শৈথিল্য সমাজে নামিয়ে হল। তাই মক্কী যুগে মানুষের সংশোধনের উপর জোর দেয়া হয়েছে । মাদানী যুগে তা ইসলামী ‘আকীদার বিষয়টি মূল। তা থেকে দ্বীনের অন্যান্য শাখা প্রশাখা বের হয়ে আসে।
মহানবী (স.) ও তাঁর দা‘ওয়াতের হিকমত অবলম্বনে করেছেন এবং তাঁর সাহাবাগণকে এভাবে অবলম্বনের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন । তাই হযরত মুআয (রা.) কে ইয়ামেনে পাঠানোর সময়ে নসীহত শিক্ষা দেন: হে মুয়ায ! তুমি আহলে কিতাবের একটা জাতির নিকট যাচ্ছ । তাই তাদেরকে (প্রথমে) এ কথা সাক্ষ্য দিতে দা‘ওয়াত দিবে যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল । সুতরাং এটা যদি তারা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তাদের উপর সাদকা (যাকাত) ফরজ করে । । এটা যদি মনে নেয়, তবে তাদের সর্বোত্তম সম্পদ নেয়া থেকে সতর্ক থেক । কারণ দু‘খ ও আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল নেই”।
কে হিকমত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, সর্ব প্রথম তাওহীদ তথা ‘আকীদার দা‘ওয়াত দিতে হবে । তা মনে নিলে ইবাদাতের দা‘ওয়াত । এমনি ভাবে ইসলামের অন্যান্য দিকে ধাবিত হতে হবে। এটাই হিকমতপূর্ণ পদ্ধতি।
উল্লেখ্য যে, এ জন্য সে সমাজে, যখন মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত । তাই ইসলামী সমাজে ‘আকীদার দা‘ওয়াত না দিয়ে ইবাদাতের ওয়ায করতে হিকমত মতে হাদীস তাদের সামনে সম্বোধন করে না।
তৃতীয়ত: সময় নির্বাচনের ক্ষেত্র
সময় নির্বাচন দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ । অনেক দা‘ঈ সময় না বুঝে দেয়ার জন্য দা‘ওয়াতী কাজ ফলপ্রসূ হয় না । দা‘ওয়াতের সময় বিবেচনায় হিকমতের বিভিন্ন দিক রয়েছে । নিম্নে ক‘টি দিক আলোচনা করা হল:
সময় নির্বাচন : নির্দিষ্ট দা‘ওয়াতের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে, এমনি সম্ভাব্য একটা সময় নির্বাচন, যাকে দা‘ওয়াত হচ্ছে, সে যদি অন্য কোন জরুরী কাজে ব্যস্ত থাকে, তবে সে সময় তাকে দা‘ওয়াত দেয়া যাবে না । এজন্য আল্লাহ পাক বলেছেন- "فذكر إن نفعت الذكرى"
“উদ্দেশ্য ফলপ্রসূ হলে তবেই উপদেশ দাও ”(সূরা আল-‘আ‘লা:৯)
সুতরাং যে ব্যক্তি তার নিজের ছাত্ররা জরুরী কাজে ব্যস্ত, সে দা‘ওয়াতের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে না। আর জরুরী কাজ কোনটি, তা দা‘ঈর নিজের প্রজ্ঞা ও ইসলামী মূলনীতির দ্বারা উপলব্ধি করতে হবে।

টিকাঃ
১০৫.সহীহ মুসলিম, কিতাবুল যাকাত, (মুহাদ্দীস নওয়াবীর মুসলিম, বৈরুত, ১৯৮৬)খ. পৃ. ১৩৫. বুখারী কিতাবুল যাকাত, বাবু সালাতিল ইবন সুম‘আ ওয়া দু‘আয়িহি, ২৭. পৃ. ২৬১।

📘 ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতি ও আধুনিক প্রেক্ষাপট > 📄 দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের অবস্থান ও গুরুত্ব

📄 দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের অবস্থান ও গুরুত্ব


পূর্বের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম । হিকমত ব্যতীত দা‘ওয়াতী কার্যক্রম হতে পারে না। দা‘ওয়াতের পদ্ধতি হিকমত নির্ভর । অন্যথায় সে কার্যক্রম হবে সাময়িক প্রচেষ্টার মতো ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে।
আল্লাহ পাকের অন্যতম সিফাত বা গুণ হল হিকমত, যা থেকে আমরা আল্লাহকে হাকীম নামে অভিহিত করি। কোরআন কারীমে দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমতকে নসীহতের পূর্বে স্থান দিয়ে হিকমতের গুরুত্ব প্রমাণ করা হয়েছে। তিনি সকলকে হিকমত শিক্ষা দিয়েছেন। মানব জীবনে তার জন্য শিক্ষা, তা-ই শিক্ষা ছিলেন। হিকমত অবলম্বনের কিয়ামত পর্যন্ত দা‘ওয়াতের উপর ফরত দিয়েছেন তিনি। নবী মুহাম্মদ (স.) এর রিসালাতের দায়িত্বের অন্যতম একটা দিক ছিল মানুষকে হিকমত শিক্ষা দেয়া।
ইরশাদ হচ্ছে- الكتاب يعلمهم "তিনি তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন"।

টিকাঃ
১১৮.মুহাম্মদ আহমদ, পৃ. ৯৬। ১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00