📄 ব্যক্তিগত দা‘ওয়াত
ক. আদ-দা‘ওয়াতুল খাসসাহ (الخاصة الدعوة):
খাস দা‘ওয়াত বা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে টার্গেট করে দা‘ওয়াত । পরস্পরের কথোপকথন, আলোচনা, ইত্যাদির মাধ্যমে দা‘ওয়াত । এতে গোটা জনগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা হয় না । অনেক সময় এটা কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই হয় । যেমন হঠাৎ সাক্ষাতে কথাবার্তার সময়, কিংবা বৈঠক বা ভ্রমণ করতে গিয়ে কিংবা বন্ধুদের সংগে আলোচনার সময় ব্যক্তিগতভাবে এর সুযোগ আসে।
আর এ দা‘ওয়াত কোন ব্যক্তিগত উদ্যোগেও হতে পারে, আবার কোন সমষ্টি তথা জামাতের মাধ্যমেও হতে পারে, যদি সে দা‘ওয়াত শুধু একজনকে টার্গেট করে পরিচালিত হয়।
📄 সমষ্টিগত দা‘ওয়াত
খ. আদ দা‘ওয়াতুল ‘আম্মাহ (العامة الدعوة):
অর্থাৎ সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত দা‘ওয়াত । ওয়াজ নসীহত, বক্তৃতা, লেখালেখি রেডিও , টিভি ইত্যাদির মাধ্যমে দা‘ওয়াত দেয়া।
এগুলোর প্রকারের মাঝে আম দা‘ওয়াত মাধ্যমে দা‘ওয়াতী বিষয়ে প্রসার বেশী হলেও ব্যক্তি বিশেষকে দা‘ওয়াত প্রদানের বেশী ফলপ্রসূ হয়ে থাকে । কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিরাও এ ধরনের দা‘ওয়াতী কাজ করতে সক্ষম ।
বস্তুতঃ উপরোক্ত শ্রেণীদ্বয়ের আলোকে দা‘ওয়াতের উদ্দেশ্যে নিহিত দুয়েরও দু‘প্রকার:
ক. ব্যক্তিগত দা‘ওয়াত (الفردية الدعوة) ।
খ. সমষ্টিগত দা‘ওয়াত (الاجتماعية الدعوة) । ক.ব্যক্তিগত দা‘ওয়াত
এ দা‘ওয়াত কোন ব্যক্তির উদ্যোগে সম্পাদিত হয়ে থাকে । তার নিজস্ব চেষ্টা, পরিকল্পনা ও কর্ম তৎপরতায় এটা সম্পাদিত হয়। এতে তারকে আরও ব্যাপক ও সহজলভ্য আল্লাহর জ্ঞান প্রদানে কোন ব্যক্তি বিশেষের সকল কর্ম তৎপরতা এর অন্তর্ভুক্ত । সেটা অন্য কোন ব্যক্তি বিশেষকে নির্দিষ্ট করেই হোক বা ব্যক্তি সমষ্টিকে নির্দিষ্ট করেই হোক না কেন । দা‘ওয়াতী প্রেরণার এ ব্যাপকতা ইসলামী সমাজের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার অন্তর্ভুক্ত । মহানবী (স.) বলেছেন- প্রত্যেককেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে ।’ প্রত্যেক ইসলামী দা‘ওয়াত প্রচারে সক্ষম ও সুযোগ অনুসারে সকলকে কিছু না কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও হলেও । আর এ ধরনের দা‘ওয়াতে যুগে যুগে অসংখ্য নবী (আ.), বিভিন্ন ইসলাম প্রচারকগণ, পীর-মাশায়েখ ও আওলিয়া কেরামের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচার হয়েছে বেশী।
খ. সমষ্টিগত দা‘ওয়াত
এর অর্থ হল কোন সংস্থা, সমিতি বা সংগঠন কর্তৃক আঞ্জাম দা‘ওয়াত’ এর দায়িত্ব নেয়া । তাকে জামা‘আতী দা‘ওয়াতও বলা হয় । যে সংস্থা বা সংগঠন নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য, পরিকল্পনা নির্দিষ্ট কর্মসূচীর মাধ্যমে কাজ করে । সে সকল কর্মসূচী সাধারণ জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, যেমন জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক সংগঠন ইত্যাদি । এখানে দা‘ওয়াতের পরিধি ব্যাপক । ‘আলামিল ইসলামী’ ইত্যাদি।
অথবা কোন ব্যক্তি বিশেষ বা কোন শ্রেণী বিশেষকে নির্দিষ্ট করেও হতে পারে । যেমন শ্রমিক সংস্থা বা সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, শিক্ষক সমিতি, বণিক সমিতি ইত্যাদি।
উল্লেখ্য যে, মানব সমাজে এ ধরনের কর্ম তৎপরতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে । আর তা বিভিন্ন কারণে:
১. বাতিল তথা ইসলামী বিরোধী শক্তির দৌরাত্ম্য ও ফেতনা ফ্যাসাদ বৃদ্ধি পেয়েছে । সাথে সাথে তাদের মাঝে পরস্পরের সহযোগিতা হওয়ার মনোভাব আরো জোরদার হয়েছে । সেবারে দা‘ওয়াতের উদ্যোগ খুব কমই ফলপ্রসূ হতে পারে কিংবা টিকে থাকতে পারে।
২. দা‘ওয়াতকৃত জনতার মাঝে বিভিন্ন প্রকার বিরোধী কাজের উপস্থিতি ও শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে জনগণের মোকাবিলা সম্ভব নয়।
৩. ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিকল্পনা বৃহৎ এবং তাদের অপকর্ম সাংগঠনিক কর্মতৎপরতায় নিয়ন্ত্রিত।
৪. দা‘ওয়াতের বিষয় সম্পর্কে গবেষণা এবং তার ব্যাপক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে । তাই সম্মিলিত উদ্যোগ তথা সাংগঠনিক প্রয়োজন রয়েছে।
৫. সমষ্টিগত দা‘ওয়াতের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জুমা‘আ, বাবুল জুমা‘আ ফিল কুরা ওয়াল মুদুন, ২৭. পৃ. ৩৫।
📄 সমষ্টিগত ও সংগঠিত দা‘ওয়াত সম্পর্কে ইসলামী বিধান
কোন সংস্থায় একত্রিত হয়ে বা সংগঠিত হয়ে দা‘ওয়াতের ব্যাপারে আল কুরআন ও সুন্নাহয় বিভিন্ন ভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে, নির্দেশ দেয়া হয়েছে । যথা:
আল কুরআনের দলীল:
দলবদ্ধ হয়ে দা‘ওয়াতী কাজ করার জন্য বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে । আল্লাহ পাক বলেন:
১. আল্লাহ পাক বলেন :
“ولتكن منكم أمة يدعون إلى الخير ويأمرون بالمعروف وينهون عن المنكر”
“ তোমাদের মাঝে এমন এক দল হোক, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের আদেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে”(সূরা আল ইমরান: ১০৪)। এখানে উম্মাহ শব্দটি ব্যবহার করা হয় । যার অর্থ সমষ্টি তথা দল । ২. আল্লাহ পাক বলেন:
“كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر وتؤمنون بالله”
“ তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে, তোমরা সৎকর্মের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর বিশ্বাস করবে” (সূরা আল ইমরান: ১১০)। এখানেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ।
৩. আল্লাহর বাণী:
“فلو لا نفر من كل فرقة منهم طائفة ليتفقهوا في الدين ولينذروا قومهم إذا رجعوا إليهم لعلهم يحذرون”
“তাদের (মু’মিনদের) প্রত্যেক দলের এক অংশ বের হয় না কেন, যাতে তারা দ্বীন সম্বন্ধে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের জাতিকে সতর্ক করতে পারে যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে, যাতে ওরা সতর্ক হয়”(সূরা তাওবা: ১২২) । ৪. কুরআন কারীমের অন্যত্র এসেছেঃ
"قال سنشد عضدك بأخيك ونجعل لكما سلطانا فلا يصلون إليكما بآياتنا أنتما ومن اتبعكما الغالبون"
“ আল্লাহ বললেন- (হে মূসা) আমি তোমার ভ্রাতার দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করব এবং তোমাদের নিকট পৌঁছতে পারবে না । তোমরা এবং তোমাদের অনুসারীরা আমার নিদর্শন বলে এদের উপর প্রবল হবে” (সূরা কাসাস : ৩৫) । এখানে ভাইদ্বয়ের দ্বারা শক্তিশালী করা এবং অনুসারীদের সকলে বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে সাংগঠনিক শক্তির কথাই বলা হয়েছে ।
৫. আল্লাহর বাণী:
“وتعاونوا على البر والتقوى”
“ তোমরা নেক কাজ এবং তাকওয়ার বিষয়ে পরস্পরে সহযোগিতা কর”(সূরা মায়িদা: ২)। এখানে পরস্পরে সহযোগী হয়ে সৎ তথা গ্রহণীয় জীবন যাপনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে ।
৫. আল্লাহ পাক আরো বলেনঃ
“واعتصموا بحبل الله”
“ তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (ইসলামকে) আকড়িয়ে ধর”(সূরা আল ইমরান : ১০৩)।
৬. সূরা ইয়াসীনে আসহাবুল কারিয়্যা তথা দা‘ওয়াতের প্রসারে আলোচনায় দেখা যায়, আল্লাহ পাক প্রথমে দুজন দা‘ঈ পাঠান, অতঃপর তাদের সাহায্য তৃতীয় আরেকজনকে কে পাঠান । এভাবে সেখানে সংঘবদ্ধ দা‘ওয়াতের উভয় হয়।
রাসূল (স.)এর বাণী
মহানবী (স.) সংঘবদ্ধ হওয়ার জন্য সরাসরি আদেশ করেছেন ।
১. জামা‘আতবদ্ধ হওয়ার জন্য তোমাদের উপর ওয়াজিব, এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে দূরে থাকা দরকার।
২. যে জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে জাহেলিয়াতের অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল।
অতএব জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাকে ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার অবস্থার শামিল করা হয়েছে ।
৩. জামাতবদ্ধ লোকদের সঙ্গে আল্লাহর শক্তি ও সাহায্য বিরাজ করে।
টিকাঃ
১২.সূরা ইয়াসীন : ১৩-১৭ ।
১৩.সুনান তিরমিযী, কিতাবুল ফিতান, বাব ফী লুযুমিল জামাআতি, ৪খ. পৃ.৪৬৫।
১৪.সহীহ মুসলিম (নওয়াবীর শরাহ সহ ), কিতাবুল ইমারত, বাবু ওজুবি মুলাযিমাতি জামায়াতিল মুসলিমীন, ১২খ. পৃ. ২৩৮।
১৫.সুনান তিরমিযী, প্রাগুক্ত।