📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রকৃতি ও পরিধি
এ পর্যায়ে ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রকৃতি ও পরিধি আলোচনা করা প্রয়োজন।
এ পর্যায়ে যারা জ্ঞানের স্তর আল্লাহর পক্ষ থেকে শেষ দিন কাল -পাত্র ভেদে সমগ্র মানব জাতির জন্য দা‘ওয়াত যুগে যুগে নবী রাসূল পাঠিয়ে আল্লাহ তা‘আলা মাধ্যমে প্রায় করুণাময়ের ব্যবস্থা করেছেন । তারা সকলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে দা‘ওয়াত নিয়ে এসে আল্লাহর দিকেই মানব সমাজকে দা‘ওয়াত দিয়েছেন । আল্লাহর দেয়া হেদায়াতকে তাদের জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপে গ্রহণ করে পক্ষ থেকে, তেমনি এ দা‘ওয়াতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে, তাই এ দা‘ওয়াত রব্বানী দা‘ওয়াত’ ।
আল্লাহর নবী ও প্রথম মানব হযরত আদম নূহ, ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ, মূসা, ‘ঈসা, মুহাম্মদ(স.) সকলেই একই দা‘ওয়াত নিয়ে এসেছিলেন । তাঁকে সর্বাত্মক ক্ষমতার অধিকারী মেনে নিয়ে তাঁর দেয়া জীবন বিধান পূর্ণাঙ্গ রূপে অনুসরণ করতে হবে। এটাই ইসলামী দা‘ওয়াতের মূল কথা । আল কুরআনে এসেছে
"ولقد بعثنا في كل أمة رسولا أن اعبدوا الله واجتنبوا الطاغوت"
“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমি রাসূল পাঠিয়েছি এ আদেশ দিয়ে যে,তোমরা একমাত্র আমারই এবাদত কর এবং তাগুত শয়তানী বা আল্লাহদ্রোহী হতে দূরে থাক” (সূরা নাহল: ৩৬)।
সুতরাং ইসলামী দা‘ওয়াত মানব সভ্যতার মতই প্রাচীন,চিরন্তন ও শাশ্বত । আর কখনই বা তা হতে পারে না । এটা ফিতরাতী দা‘ওয়াত’ । তথা মানব সুলভ নিয়মনীতি বা সুন্নাহ পালনের দা‘ওয়াত’ । সেই ফিতরাত, যে স্রষ্টাকে সত্য হিসেবে মানব সত্তার ভেতর মেনে নিতে মানব সমাজ সর্বদা উদগ্রীব। সভ্য চেতনা বা মানব স্বভাব ও ফিতরাত যতদিন মানব সত্তায় থাকবে, ততদিন তার কার্যকারিতা বহমান থাকবে।
আল কুরআনে এরশাদ এসেছেঃ
"فأقم وجهك للدين حنيفا فطرت الله التي فطر الناس عليها لا تبديل لخلق الله"
“তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত কর, যে দ্বীন হল আল্লাহর ফিতরাত উপর মানব জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে । আল্লাহর সৃষ্টি কর্মে কোন পরিবর্তন নেই” (সূরা রূম: ৩০) । এ ফিতরাতী তাওহীদের দা‘ওয়াত নিয়ে যুগে যুগে নবী এসেছেন, তাদের মাঝে সময়ের কোন ছেদ হয়ন। হযরত মুহাম্মদ (স.)। যার উপর অবতীর্ণ হয় আলকুরআনুল কারীম । এ পবিত্র গ্রন্থ আল - কুরআন সেই মহানবীকে ঘিরে মানব কল্যাণের শুভ সংবাদদাতা এবং মন্দ কাজের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ককারী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় । তাঁকে অধিষ্ঠিত করা হয় সারা বিশ্বের জমতে রহমত স্বরূপ তখন মুক্তির বাণীর বাহক হিসেবে । তাঁর এ মুক্তির ডাক বা আহ্বান কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে । তিনি শেষনবী । তাঁর পর আর কোন নবী আসবেন না । তাঁর উম্মত বা অনুসারীবৃন্দই এ দা‘ওয়াতের কাজ আঞ্জাম দিবেন । আর এতে তাঁদেরও কল্যাণ এবং মুক্তি নিহিত রয়েছে । ইরশাদ হচ্ছেঃ
"ولتكن منكم أمة يدعون إلى الخير يأمرون بالمعروف وينهون عن المنكر وأولئك هم المفلحون"
“ তোমাদের এমন দল হবে যারা কল্যাণের দিকে (মানুষকে) আহ্বান করবে । সৎ কাজের আদেশ করবে, আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আর তারাই মূলত সফলকাম” । (সূরা আল ইমরান: ১০৪)
তাই ইসলামী দা‘ওয়াতের বিষয় হলো, তা অন্যের পৌছে দেয়া, জানানো সকলের উপর ফরজ । এ জন্য মহানবী(স.)। বিদায়ী হজ্জে ভাষণে বলেছিলেনঃ
"بلغوا عني ولو أية"
সংক্ষেপে, এ দা‘ওয়াতের লক্ষ্য হলো- জীবন, জগত ও আল্লাহ সম্পর্কে ‘আকীদা- বিশ্বাস, জীবন চলার সহজ সরল পথ ও পদ্ধতির দিকে হেদায়েত দান করা । যাতে তারা সঠিক পথ অবলম্বনে করে ইহ ও পারলৌকিক জীবনে শান্তি - কল্যাণ ও সফলতা লাভ করে । এ মর্মে আল্লাহ পাক বলেনঃ
"كتاب أنزلناه إليك لتخرج الناس من الظلمات إلى النور بإذن ربهم إلي صراط العزيز الحميد"
“ এ গ্রন্থ আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানব জাতিকে তাদের অনুমতিক্রমেই অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনতে পারেন এবং ( বের করে আনাটা) সেই পথে, যিনি পরাক্রমশালী, প্রশংসাই”(সূরা ইবরাহীম :১)।
অতএব এ দা‘ওয়াতী কাজ আল্লাহরই অনুমোদনে ক্রমে যা অলংকৃতভাবেই ঘোষণা দেয়া হয়েছে । এ কাজ ও দা‘ওয়াত উভয়টাই সকলের জন্য উন্মুক্ত । এ কাজ করতে যেমন কোন ব্যক্তি, সংস্থা কিংবা মানবীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন নেই, তেমনি তা সারা বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য । এতে ‘আরব অনারব, প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য কোন ভেদাভেদ নেই । ক্রমাগত পর্যন্ত সকল মানব গোষ্ঠীর জন্য এ দা‘ওয়াত প্রযোজ্য ।
وما أرسلناك إلا كافة للناس بشيرا ونذيرا" -
“ আপনাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি”(সূরা সাবা:২৮)।
সুতরাং এ- দা‘ওয়াতের লক্ষ্য মহৎ ও কল্যাণকর । বরং কাউকে এ দা‘ওয়াত দান মানে তাকে অনুকম্পা বা দয়া করা(charity) বিশেষ । এজন্যও দা‘ওয়াত দানকারীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব যা আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন, বলা হয়েছে:
"كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر"
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদিগকে বের করা হয়েছে মানব কল্যাণের জন্যই । তোমরা মানুষের সৎকাজের নির্দেশ দিবে, আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে”(সূরা আল- ইমরান: ১১০)।
এ দা‘ওয়াত মৌখিক ও व्यावहारिक এবং গতিশীল । যেহেতু তা ফিতরাতী দা‘ওয়াত, তাই এটা মানব স্বভাবকে মূল্যায়ন করে তার প্রতি ও সহজ যোগাযোগ স্থাপনাকে ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে সমাধানের চর্চার মাধ্যমে আগ্রহ, ধৈর্য এবং সমাজের চাহিদার আলোকে অন্তর্ভুক্ত ব্যবহারিক, মানবিক ও সর্বোত্তম পন্থায় এ দা‘ওয়াতী কার্যক্রম পরিচালিত হয় । কোন জোর জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেয়া হয়না । কোন সুনির্দিষ্ট কিংবা প্রচারণার বা প্রয়োজন দেখিয়ে আকৃষ্ট করা হয় না । এ মর্মে আল্লাহ পাক বলেনঃ
"ادع إلى سبيل ربك بالحكمة والموعظة الحسنة وجادلهم بالتي هي أحسن"
“ তুমি হিকমত তথা প্রজ্ঞা ও কৌশলে এবং সদুপদেশাবলী উত্তম কথনের মাধ্যমে তোমার প্রভুরই পথে দা‘ওয়াত দিবে। আর তার তর্ক ও মোকাবিলার করতে সর্বোত্তম পন্থায়”(সূরা নাহল:১২৫)। (যার বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে)।
অন্যত্র কোন কোন অভ্যাস বা ফ্যাসাদ পূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বনে করা হবে না, বরং এটা আল্লাহর রাস্তায় সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দা‘ওয়াত।
এ দা‘ওয়াতের মূল কর্মসূচী হল- আহ্বানের মাধ্যমে চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা চালানো । এ জন্য আল কুরআনে মহানবী (স.) এর দা‘ওয়াতের কর্মসূচীকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়-
"هو الذي بعث في الأميين رسولا منهم يتلوا عليهم آياته ويزكيهم و يعلمهم الكتاب والحكمة"
“তিনি সেই সত্তা,যিনি উম্মী(নিরক্ষর )দের মাঝে এমন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি (আল্লাহর) আয়াত আবৃত্তি করবেন, তাদের আত্মা পরিশুদ্ধ করবেন, (সেই) কিতাব এবং হিকমত (প্রজ্ঞা ও কৌশল এবং প্রয়োগ) শিক্ষা দিবেন ( সূরা মু‘মিনূন:২)।
দা‘ওয়াতী মূলনীতির জাতি তথা জগতের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে তার কুরআনের স্বীকৃতি বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে । কারণ ইতিহাস বলবে, ‘আরবের বিচ্ছিন্ন নিরক্ষরতা প্রধান ও বেদুঈন জাতি ইসলামী দা‘ওয়াতী কর্মসূচীর আওতায় এসে জগতের শিক্ষকের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে ।
উল্লেখ্য, প্রথমে থেকেই ইসলামী দা‘ওয়াতের টার্গেট হলো মানব সত্তার,যুক্তি ও প্রকৃতি এবং কেন্দ্রবিন্দু থেকে অবলম্বনের মাধ্যমে সমগ্র মানব সত্তাকে যুক্তি করা, যেখানে মানুষ তাদের জীবনের সর্ব স্তরে ইসলামকেই একমাত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে । অতএব, সে সভ্য সুন্দর ও কল্যাণের প্রাচীর রচনারী হতে, যুক্তি ও সমাজ জীবনে তা প্রতিষ্ঠা করা হবে- এটাই ইসলামী দা‘ওয়াতী কর্মসূচীর প্রাথমিক ও বৈপ্লবিক সফলতা।
এখানে আরো উল্লেখ্য, কেউ যেন মনে করেন- ইসলামী দা‘ওয়াত বলতে বুঝায় শুধু ওয়ায-নসীহত,কিংবা মসজিদ মাদ্রাসায় গিয়ে নামায রোযার কথা বলা অথবা শুধু অমুসলিমদেরকে ইসলাম কবুল করার আহ্বান জানানো বা তাদের নিকট ইসলামের সৌন্দর্য পেশ করা । হাঁ, যদিও এসব কাজ ইসলামী দা‘ওয়াতেরই অন্তর্ভুক্ত অংশ-বিশেষ, তাই বলে এ গুলো একক ভাবে ইসলামী দা‘ওয়াতের পূর্ণ রূপ বহন করে না । দা‘ওয়াত বলতে বলতে ব্যাপক কর্মসূচী ও কর্ম প্রচেষ্ঠার সমষ্টি । যে কর্মসূচী এ প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর জমিনে দ্বীন প্রতিষ্ঠার করা, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সর্ব স্তরে দ্বীন আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হবে । সে সকল কর্ম সৃষ্টি আল্লাহর উদ্যোগে নেয়া বা কোন দল দুটি ব্যক্তির সমাজ উদ্যোগে নেয়া সকল বৈজ্ঞানিক প্রচার মাধ্যম, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে । যা দা‘ওয়াতের সংজ্ঞা নির্ধারণের পক্ষেই আলোচনা হয়েছে।
আর এ দা‘ওয়াত শুধু অমুসলিমদের বেলায় নয় বরং তা মুসলিম সমাজেও কার্যকর । তখন এর অর্থ হবে তাদেরকে ইসলামের শিক্ষা দীক্ষা উন্নয়ন কর, প্রশিক্ষণ দেয়া এবং তাদের সমাজে ইসলামী পরিপূর্ণতা সকল কুসংস্কার দূর করে । যাতে মুসলমানগণ পূর্ণাঙ্গ মুসলিমের আলোকে ইসলাম চর্চা করতে পারে । এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
"يا أيها الذين آمنوا آمنوا"
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আন”(সূরা নিসা : ১৩৬)।
সুতরাং এ আয়াতে মু’মিনগণকে আবার ঈমানের দা‘ওয়াত দেয়ার অর্থ কি? এর অর্থ হল, ইসলামের অন্যান্য বিষয় চর্চার মাধ্যমে তাদের ঈমানের আরো পাকাপোক্ত করা । অতএব মুসলমানদেরকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে দা‘ওয়াতী কার্যক্রম চলবে।
অতএব, উক্ত ইসলামী দা‘ওয়াতের মূল কথা হলো- সমগ্র মানব জাতি (মুসলিম হোক আর অমুসলিম হোক) তাদেরকে সর্ব প্রকার শয়তানী ও তাগুত শক্তি ও আনুগত্য পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদে এর প্রতি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং মার‘দূদ হিসেবে মেনে নেয়ার দা‘ওয়াত, তথা জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (স.) প্রদর্শিত বিধান যেমন আল্লাহ আহ্বান জানানো । মোট কথা ইসলামকে এতো পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেয়ার দা‘ওয়াতই ইসলামী দা‘ওয়াত’ ।
ইসলামী দা‘ওয়াত চিরন্তন ও প্রাচীন হলেও কোন ইয়াহুদী বা খ্রীষ্টানদের দা‘ওয়াতকে ইসলামী দা‘ওয়াত বলা যাবেনা । কারণ মুহাম্মদ (স.) এর আগমনের পর তাঁর রেসালাতের অধীনে দা‘ওয়াতই ইসলামী দা‘ওয়াত । পরবর্তী সকল দা‘ওয়াত বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছে । শেষ নবী মুহাম্মদ (স.) এর দা‘ওয়াত কিয়ামত পর্যন্ত চূড়ান্ত রক্ষাকবচ, এ ধারা পূর্ববর্তী সকল দা‘ওয়াতকে রহিত ও অকার্যকর করেছে । সাথে সাথে এ গুলো বিকৃত ও বিভিন্ন । দা‘ওয়াতের পথও প্রচলিত হযরত মুহাম্মদ (স.) এর নীতিই মুসলমান দা‘ওয়াতের অনুকরণীয় আদর্শ বা উসওয়ায়ে হাসানা । আল কুরআনে পূর্ববর্তী নবীগণের জীবনাদর্শ যতটুকু গ্রহণ করার জন্য বলা হয়েছে, ততটুকুই অনুকরণীয়।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) কে দা‘ওয়াত সূচনা লগ্নে থেকেই তাঁর সে বিষয় জনীয় দা‘ওয়াতকে সারা বিশ্বের ছড়িয়ে দিতে চালিয়ে গিয়েছেন এবং তা সারা বিশ্বব্যাপী প্রসার লাভ করেছে । যুগে যুগে অসংখ্য সাহাবা, তাবে‘ঈ, ও তাবে‘তাবে‘ঈন সহ বিভিন্ন ওয়ায়েযে, ‘আলেম, পীর-মাশায়েখ, মুহাদ্দিস, ফকীহ তথা দীনগুণী ইসলামী দা‘ওয়াতী কাজ করে আসছেন ।
টিকাঃ
১০.তিরমিযী, আল - জামে‘উস সহীহ, কিতাবুল ‘ইলম, খ. ৫ পৃ.৪০।
📄 ইসলামী দা‘ওয়াতের পদ্ধতিতে কুরআনিক সংবিধান
আল-কুরআনুল কারীম ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রথম ও মৌলিক উৎস । ইসলামী দা‘ওয়াতের পদ্ধতি বর্ণনায় আল- কুরআনে মানব জাতির জন্য যে ক‘টি আয়াতের মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দিয়েছে, তন্মধ্যে ইসলামী দা‘ওয়াতের সংবিধানগুলো ক‘টি আয়াত হলো:
প্রথমত: আল-কুরআনুল কারীম ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রধান ও মৌলিক উৎস । ইসলামী দা‘ওয়াতের পদ্ধতি বর্ণনায় আল- কুরআনে মানব জাতির জন্য যে ক‘টি আয়াতের মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দিয়েছে, তন্মধ্যে ইসলামী দা‘ওয়াতের সংবিধানগুলো ক‘টি আয়াত হলো:
"ادع إلى سبيل ربك بالحكمة والموعظة الحسنة وجادلهم بالتي هي أحسن إن ربك هو أعلم بمن ضل عن سبيله وهو أعلم بالمهتدين . وإن عاقبتم فعاقبوا بمثل ما عوقبتم به ، ولئن صبرتم لهو خير للصابرين . واصبر وما صبرك إلا بالله ، ولا تحزن عليهم ولا تك في ضيق مما يمكرون . إن الله مع الذين اتقوا والذين هم محسنون"
“ আপনি দা‘ওয়াত দেন হিকমত ও মাউ‘যায়া হাসানার দ্বারা, আর সর্বোত্তম পন্থায় যুক্তি তর্ক করুন । নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ ভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভাল জানেন তাদেরকে, যারা সঠিক পথে আছে । আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয় । আর আপনি যদি সবর করেন, তবে তা সবরকারীদের জন্য উত্তম । আপনি সবর করবেন । আপনার সবর আল্লাহর জন্যই, অন্য কারো জন্য নয় । আর তাদের জন্য দুঃখ করবেন না এবং তারা তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না । নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্ম করে ”(সূরা আন নাহল :১২৫-১২৮)।
এ আয়াত সমূহের আলোকে কয়েকটি মন্তব্য করা যায় :
প্রথমত: প্রথম আয়াতে প্রথমত বলা হল, উক্ত আয়াত সমূহ যদিও মহানবী (স.) কে উদ্দেশ্য করে বলা, তবু তাঁর উম্মত ও অনুসারী হিসেবে এ আদেশ সকল যুগের দাঈর জন্যই কার্যকর । নবী করীম (স.) এ পদ্ধতিই তার সাহাবাগণকে শিক্ষা দিয়েছিলেন এ মর্মে অন্য স্থানে ইরশাদ হয়েছে:
قل هذه سبيلي أدع إلي الله على بصيرة أنا و من اتبعني
“বলুন, এটাই আমার পথ যে, আমি আমার অভিজ্ঞতার উপর আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াত দেই । আর আমার যারা অনুসরণ করে, তারাও তাই” (সূরা ইউসুফ: ১০৮)।
দ্বিতীয়ত: কথা হল, পূর্বেই বলা হয় যে, পদ্ধতিও কোন দা‘ওয়াতের পরিকল্পনা নিতে হলে অবশ্যই চারটি উপাদান থাকতে হবে । সে গুলো হল: দা‘ঈ, মাদ‘উ, দা‘ওয়াতের বিষয়বস্তু, উপস্থাপন কৌশল ও মাধ্যম । উপরোক্ত আয়াতগুলোতে চারটি উপাদানই এখানে বিদ্যমান । কেননা আপনি দা‘ওয়াত দেন বলে যাকে সম্বোধন করা হয়েছে, তিনি দা‘ঈ । যাকে সম্বোধন করা হয় । অতএব দা‘ওয়াতের প্রকৃতি ও কৌশলের উপরোক্ত আয়াতগুলোতে বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই ।
তৃতীয়ত: আর মাদ‘উ উভয় রাখা হয়েছে এজন্য যে, যাতে এ দা‘ওয়াতের আওতায় গোটা মানব জাতি অন্তর্ভুক্ত হয় । এমনিভাবে যাতে বস্তুত ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে । আর এটাই হলো দা‘ওয়াতের বিষয়বস্তু। আর হিকমত, মাউ‘যায়া হাসানা, মুজাদালা, মু‘আকাবা, সবর ইত্যাদি হলো দা‘ওয়াতের উপস্থাপন কৌশল, যা তার মাধ্যমও নির্ধারণ করে ।
চতুর্থত: যে কোন দা‘ওয়াতী পদ্ধতির বাস্তবায়ন পূর্বে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় । আর তা হলো:
১. কিভাবে তা সূচনা করা হবে।
২. কি ধরনের উপস্থাপন করা হবে, তা প্রাথমিক পেশ পরেই হোক,আর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পরেই হোক
৩. উপস্থাপনের পর এর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও অগ্রগতি সংরক্ষণ তথা ধরে রাখার চেষ্টা করা।
৪. ভাবোত্তীর্ণ হয়ে চিন্তা থাকা ও একে সফল রাখা । আর তা জিহাদ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে । যেন দা‘ওয়াতী প্রবাহকে প্রতিষ্ঠিত করা ও এ পথে বাধা অপসারণ করা যায় ।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, আয়াতগুলোতে এর দিকনির্দেশনা সম্পর্কে চমৎকার দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে । কেননা প্রথমেই বলা হয়েছে, দা‘ওয়াত দেন আল্লাহর রাস্তার দিকে।এখানে দা‘ওয়াতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে । এর দ্বারাই দা‘ওয়াতের সূচনা করতে হবে । ব্যক্তি বা দলের সুনামের দিকে দা‘ওয়াত দিলে তা ইসলামী দা‘ওয়াত সূচনা হবে না, কিংবা হঠাৎ করে শুরু করে দিয়েই সে দা‘ওয়াতের কাঙ্খিত সূচনা হবে না। সবস্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং এর মাঝে ইসলামী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্বাচন করতে হবে । এটাই সূচনা পর্ব ।
অতঃপর তা উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে জবরদস্তি বা প্রতারণাপূর্ণ পন্থায় নয়, বরং সুস্পষ্টফলে, যেন দা‘ওয়াতকৃত ব্যক্তিরা মজলিসগুলোতে আলোচনা শুনে পরিবর্তন আসে, যাতে সে ব্যক্তিগত তথা তার বাস্থ্য আচরণে আল্লাহ পরিবর্তন আনতে থাকে । আর করা হয় । করা হয় হিকমত ও মাউ‘যায়ার মাধ্যমে, ওয়ায়েজ মাধ্যমে। এ ওয়ায়েজকে চালানো হয়েছে দলীল এবং মাউ‘যায়া পরিভাষায় বাতেন্ত করা হয়েছে । এমনিযোগে চালানো হয়েছে মাউ‘যায়ায় পরিমাণ বাতেন্ত হবে। আর এ পর্যায়ে নির্বাচন হলে চলবে না, কেননা ফলাফলের মালিক আল্লাহ পাক । দা‘ঈর কর্তব্য দা‘ওয়াতী কাজ চালিয়ে যাওয়া । যার দিক নির্দেশনা ঐ আয়াতেই আছে যে, এ দা‘ওয়াত হল দাওয়াতের হেদায়েত করতে, সে মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্টি ব্যক্ত আছে । আর এটা হল তাঁর অপর দিকে এ ব্যাপারে আল্লাহ ব্যক্তিকে যদি দা‘ওয়াত কবুল করে নেয়, তা হলে তাকে টেনে নিতে হবে । সেই হিকমত ও মাউ‘যায়ীয়া নীতি অনুসারেই শিক্ষা দিতে হবে । এর সাধারণ ভুল ত্রুটি, বিচ্যুতি মার্জণীয় । প্রজ্ঞা ও সাংঘিক উদ্দেশ্য प्रशंसনীয়।
টিকাঃ
১৬. সুনান তিরমিযী, প্রাগুক্ত ।
১৭. সুনানে দারেমী, ১৪, খ.পৃ.২৯. ( হযরত তাউস আন দাউদ হতে মুরসাল হতে বর্ণিত )
১৮. মায়িযোদীন ফতহ, ফী যিলালিল কুরআন, (বৈরুত: দারুশ শুরুক ১৯৮২ইং)খ.পৃ.২২৩১ ।
১৯. ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান আনওয়ারী, মানহাজুদ দা‘ওয়াতে ওয়াছ ছুল কিতাবিল কারীম, (ইসলামাবাদ পি.এইচ.ডি থিসিস, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৮ ) পৃ. ৪৮৫।