📄 অর্থনৈতিক প্রভাব
অর্থনীতিকে সমাজ গঠন ও তার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা হ্রাসের মাঝে বেকারত্ব, অনিষ্টতা এবং বিচ্যুতির দিক রয়েছে। রাসূল সাঃ দরিদ্রতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেছেন: (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কুফরী, দরিদ্রতা এবং কবরের আযাব থেকে পানাহ চাই।)(১) তিনি আরো বলেছেন: (হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি দরিদ্রতা, অপ্রতুলতা ও অপমান হতে এবং আমি আশ্রয় প্রার্থনা করি যেন আমি কারো উপর অত্যাচার না করি বা আমি যেন অত্যাচারিত না হই।)(২)
উম্মতের অর্থনৈতিক দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী অনুঘটক হল মন্দ চরিত্রের বিস্তার লাভ। কেননা মন্দ চরিত্র নিজ অভ্যন্তরে অনিষ্টতা ও অন্যায়কে ধারণ করে যা উম্মতের উন্নতি, অগ্রগতি, বিকাশ এবং তার কল্যাণ ব্যবহারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। নিম্নে উম্মতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর মন্দ চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হল:
প্রথমত: আয় হ্রাস করে: মন্দ স্বভাব ব্যক্তি ও সমাজের আয়কে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আর তার স্বরূপ হল যে, বিচ্যুত চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিগণ রোগাক্রান্ত হয়ে কর্মে অনুপস্থিত থাকে বা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিলম্ব করে; ফলে এটা সময় অপচয় এবং উপকারহীন কাজে সময় ব্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। আরেক দিক থেকে বলা যায় যে, মন্দ স্বভাবের অধিকারী ব্যক্তি তার আয়ের কিছু অংশ গান শোনা, গানের যন্ত্রপাতি ও ক্যাসেট ক্রয়ের ন্যায় অনৈতিকতায় ব্যয় করে বা নাটক, সিনেমা দর্শনের মধ্য দিয়ে সময় নষ্টমূলক কাজে ব্যয় করে বা নেশাজাতীয় ও মাদকদ্রব্য সংগ্রহে খরচ করে; যা সামগ্রিকভাবে উম্মতের অর্থের অপচয় এবং উম্মতকে দুর্বল করার বিষয়টি প্রতিফলিত করে। কিছু গবেষণা ইঙ্গিত করছে যে, কিছু ইসলামী সমাজে পরিবারের ১৩% বাজেট গান-বাদ্যে ব্যয় করা হয়। মদ পানের কারণে কোন একটি সমাজের লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩১৯৫ পাউন্ড! (৩)
দ্বিতীয়ত: বেকারত্ব: আচরণগত বিচ্যুতির প্রভাবের অন্যতম হল আরাম-আয়েশের প্রতি ঝোঁক এবং অভাব পূরণের জন্য অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ। বিশেষত মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে; তথা এই শ্রেণীটি আরামের প্রতি আগ্রহী আর কর্মে অনাগ্রহী। কোন একটা জরিপে তাদের সংখ্যা ২.১১%।(১)
তৃতীয়ত: মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ব্যয়: জাতীয় অর্থনীতির উপর ব্যক্তির মাদকাসক্তির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যদি একাধিক ব্যক্তি যদি আসক্ত হয় তাহলে কেমন প্রভাব পড়তে পারে? নিশ্চয় তার প্রভাব হবে অধিক মারাত্মক তাদেরকে কর্ম থেকে বিরত রাখার কারণে। তদুপরি এর সাথে যুক্ত হবে বিশাল অর্থ তাদের চিকিৎসা ব্যায়ের অংশ হিসেবে। অথচ এ অর্থগুলো লাভজনক অর্থনৈতিক চ্যানেলে ব্যয় করাটা যৌক্তিক ছিল। আচরণগত বিচ্যুতির মাঝে এমন উপাদান রয়েছে যা ব্যক্তিকে আসক্তি ও তার চিন্তা-শক্তি আক্রান্ত হওয়ার কারণে প্রতিবন্ধিতার দিকে ধাবিত করে। যা তাকে চাকরিচ্যুত করে এবং তার চিকিৎসা খরচ রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে নির্বাহ করতে হয়।
অন্যদিকে, শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের কারণে অন্যদের সম্পদের ক্ষতি হয় যা মূলতঃ জাতির অর্থের অপচয় হিসেবে গণ্য। আর আচরণগত বিচ্যুতির ফলে অর্থ ও শক্তির অপচয় হয়। অনুরূপভাবে ব্যাভিচার ও সমকামিতায় লিপ্ত হওয়ার ফলে এমন রোগে আক্রান্ত হয় যা তাদেরকে কর্ম ও দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত করে। আর এটি কতগুলো বিবেক-বুদ্ধি ও শরীরকে নিষ্ক্রিয় করা যাদের জাতি গঠনে ভূমিকা রাখার অপার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মন্দ আচরণে আক্রান্ত হওয়ার কারণে জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনির্মাণে তারা ভূমিকা রাখার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে। উল্টো তাদের চিকিৎসা, ঔষুধ, ডাক্তার, বেড এবং হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে; যা মূলত জাতির অর্থনীতির অপচয় করছে。
চতুর্থত: ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ ধ্বংস করা: মহান আল্লাহ তায়ালা অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণকে হারাম করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴿ অর্থ: [আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।](২) আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: (রাসূল সাঃ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিসম্পাত করেছেন।)(১)
ঘুষের বিষয়টি শুধু সম্পদ ও সুবিধা অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তা পদ ও কর্ম অর্জনে পর্যবসিত হয়; যা ব্যক্তিকে এমন স্থানে প্রতিষ্ঠিত করে যার যোগ্য সে নয়। অযোগ্য ব্যক্তিকে কর্মে নিয়োজিত করার মাঝে সময়, শক্তি ও সক্ষমতার অপচয় রয়েছে এবং উৎপাদন ক্ষমতার হ্রাস রয়েছে; যার প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতে। অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্যতম আলামত। আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন: (যখন আমানত নষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। সে বলল, কীভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন: যখন কোন কাজের দায়িত্ব অনুপযুক্ত লোকের উপর ন্যাস্ত করা হয় তখন তুমি কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে।)(২) ঘুষ কখনো উম্মতের সম্পদ ধ্বংস করার মাধ্যমে তার অধিকার ও অর্থনীতিকে বিনষ্ট করেছে। অনেক ঘুষখোর রয়েছে যাদের উপর প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়িত্ব ন্যাস্ত করার পর জাতীয় প্রকল্পগুলোকে ঘুষের বিনিময়ে ধ্বংস করেছে। কখনো এমন হয়েছে যে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষুধ বা খাদ্য সমাজের সদস্যদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে ফলে সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও জাতির উপর আর্থিক ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিয়েছে。
পঞ্চমত: উৎপাদন হ্রাস: উৎপাদন হ্রাস, গুণগত মানের দুর্বলতা এবং নিপুনতার অভাবের কারণ হল কর্মে আমানতদারিতা ও আন্তরিকতার অভাব। কেননা আমনতদারিতার মাঝে পেশাগত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ চেষ্টা, হকদারের হক প্রদান এবং তাদের নায্য হক না কমানোর মন্ত্র নিহিত রয়েছে। আর এ বিষয়েই শরীয়ত তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছে এবং তাদের জন্য কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴿ অর্থ: [হ ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।](৩) রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি তোমার কাছে কিছু আমানত রেখেছে তাকে তা ফেরত দাও। যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না।)(৪)
যখন উম্মত আমানত হারিয়ে ফেলে তখন পেশাগত দায়িত্ব ও লেনদেনে খেয়ানত, ধোঁকা, মিথ্যা ও প্রতারণা প্রবেশ করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য হোঁচট খায় ও তাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। ফলে তার প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর ইসলাম খেয়ানতকে মুনাফেকির একটি আলামত হিসেবে গণ্য করেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (মুনাফেকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে আর আমানত রাখলে খেয়ানত করে।)(১)
ষষ্ঠত: সম্পদ বিনষ্ট করা: মন্দ চরিত্র যা রেখে যায় তার অন্যতম হল নানা উপায়ে সম্পদ বিনষ্ট করা; যেমন: অপচয় এবং মুদ্রা পাচার ইত্যাদি। চারিত্রিকভাবে নষ্টদের অধিকাংশ সম্পদ হারাম কাজে ও বিলাসিতায় ব্যয় হয়। অথচ মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَا تُسْرِফُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴿ অর্থ: [আর অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।](২) অন্যদিকে, আমরা মাদক ও নেশাদ্রব্য ব্যবসায়ীদের দেখতে পাই যে, তারা বাইরে ডলার পাচারে ভূমিকা রাখছে ধ্বংসাত্মক বাণিজ্যিক ডিল বিনিময় এবং তা জাতির জন্য আনায়ন করার লক্ষ্যে।(৩) এর মাঝে জাতির জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি রয়েছে。
সপ্তমত: প্রতিকারমূলক সুরক্ষা ব্যয়: যিনা, চুরি, ঘুষ, পাচার, মাদক চোরাচালান ইত্যাদি মন্দ স্বভাবের বিরুদ্ধে লড়াই রাষ্ট্র ও তার নিরাপত্তা এজেন্সীগুলোকে অপরাধীদের অনুসন্ধানে, তাদের অপকর্ম নস্যাতে এবং তাদের পাকড়াও করতে বিশাল অংকের অর্থ খরচে বাধ্য করে। একই সমই যদি রাষ্ট্র তাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকত তাহলে উক্ত অর্থগুলো উন্নয়নমূলক ভিন্ন খাতে ব্যয় করতে পারত; যার আর্থিক উন্নয়নের সুফল জাতি ভোগ করত। কিন্তু প্রতিকারমূলক সুরক্ষা ব্যয়ের কারণে অর্থনীতির বিরাট একটা অংশ নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হচ্ছে。
টিকা:
(১) সুনানে নাসায়ী (৩/৭৩-৭৪, হা: ১৩৪৭), মুসনাদে আহমাদ (৫/৩৬), শাইখ আলবানী সহীহ সুনানে নাসায়ীতে (১২৭৬) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(২) সুনানে আবু দাউদ (২/১৯০-১৯১, হা: ৫৪৪), শাইখ আলবানী সহীহ সুনানে আবু দাউদে (১৩৬৬-১৫৪৪) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(৩) মুতাওয়াল্লী আশমাবী, আল-জাওয়ানেব আল-ইজতেমায়িয়্যাহ (১/১০১-১০২)。
(১) প্রাগুক্ত (২/৮২)。
(২) সূরা আল-বাকারা: (১৮৮)。
(১) মুসনাদে আহমদ (২/১৬৪)。
(২) সহীহ বুখারী (১/৩৭, হা: ৫৯)。
(৩) সূরা আল-আনফাল: (২৭)。
(৪) সুনানে আবু দাউদ (২/১৯০-১৯১, হা: ৫৪৪), মুসনাদে আহমাদ (৩/৪১৪), শাইখ আলবানী সহীহ জামেউস সগীরে (১/১০৭, হা: ২৪০) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(১) সহীহ বুখারী (১/২৭, হাঃ ৩৩), সহীহ মুসলিম (১/৭৮, হাঃ ১০৭/৫৯)。
(২) সূরা আল-আনআ'ম: (১৪১)。
(৩) মুতাওয়াল্লী আশমাবী, আল-জাওয়ানেব আল-ইজতেমায়িয়্যাহ (১/১০১-১০২)。