📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 মানসিক প্রভাবসমূহ

📄 মানসিক প্রভাবসমূহ


ইসলামী মানহায অমান্যতার অনেক খারাপ প্রভাব রয়েছে যা মানবসত্ত্বার নানা দিকে প্রতিফলিত হয়; তন্মধ্যে মানসিক দিক।

আর তা হল, যে ব্যক্তি ইসলামী মানহায পরিহার করে বিপথ অবলম্বন করবে; সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতার কারণে তার জন্য এমন একজনকে নির্ধারণ করে দেয়া হবে যে তার জন্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা নিয়ে আসবে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ﴿ [আর যে রহমানের যিকর থেকে বিমুখ হয় আমরা তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সে হয় তার সহচর।] (১) অর্থাৎ যে ব্যক্তি হেদায়েত থেকে উদাসীন হবে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করব যে তাকে পথভ্রষ্ট করে জাহান্নামের পথে নিয়ে যাবে। (২)

আর শয়তান মানুষকে কেবল যা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা আনায়ন করে তার প্রতিশ্রুতি দেয়। সে তাকে দরিদ্রতা, সংকটাপন্ন অবস্থা এবং অন্যের সম্পত্তিতে লোভ ও নিজের যা রয়েছে তাতে অতৃপ্তির কুমন্ত্রণা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْশَاءِ﴿ [শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্র্যের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়।] (৩) অর্থাৎ সে তোমাদেরকে দরিদ্রতার ভয় দেখায় যেন তোমরা তোমাদের সম্পত্তি আল্লাহর সন্তোষজনক কাজে ব্যয় না করে সঞ্চিত করে রাখ। এর সাথে সে তোমাদেরকে নিঃস্ব হওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্যয় করা থেকে নিষেধ করে এবং তোমাদেরকে পাপাচার, গর্হিতকাজ, হারামকাজ ও স্রষ্টার অবাধ্যতার নির্দেশ দেয়। (৪)

আর মুমিনগণের উপর শয়তানের কোন কর্তৃত্ব নেই। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ﴿ [বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনই ক্ষমতা থাকবে না।] (৫) তিনি বলেন: ﴾إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ﴿ [নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও তাদের রবেরই উপর নির্ভর করে তাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই।] (৬) তিনি আরো বলেন: ﴾إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ ۚ وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ وَكِيلًا﴿ [নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আপনার রব'ই যথেষ্ট।] (১)

আচরণগত বিচ্যুতির কিছু মানসিক প্রভাব নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলোতে আলোচিত হল:

প্রথমত: মানসিক অসঙ্গতি:
ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ গঠনকারী হল মানসিক সঙ্গতি। আর তা হল, ব্যক্তির চারপাশের সামাজিক পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়া এবং সফলভাবে উত্থাপিত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। (২) মানসিক অসঙ্গতির বাহ্যিকরূপের অন্যতম হল: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, খাবারে অনীহা, গুটিয়ে থাকা ও অতিরিক্ত লাজুকতা, তরিৎ রেগে যাওয়া, একগুঁয়েমি, আক্রমণাত্মক শত্রুতার প্রবণতা, দিবা-স্বপ্ন এবং মিথ্যা বলা ইত্যাদি মানসিক অস্থিরতার বাহ্যিকরূপ।

মানসিক অসঙ্গতি সৃষ্টিতে আচরণগত বিচ্যুতির বড় প্রভাব রয়েছে। কেননা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ফিজিওলজির ল্যাবের পরিক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মদের সামান্য পরিমাণ অংশও মানসিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। (৩)

দ্বিতীয়ত: হতাশা অনুভব করা:
আশার বিপরীত হল হতাশা। (৪) হতাশা মানুষকে অলসতা, উদাসীনতা এবং পরিশ্রমহীনতার দিকে ধাবিত করে। উপরন্তু তাকে প্ররোচিত করে প্রতারণামূলক ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ অনুসন্ধানে। অনুধাবন করুন চোর ও ভিক্ষুকের বিষয়টি, তাদের অনেকের কাজ ও উপার্জন করার শারীরিক সক্ষমতা থাকার পরেও তাদের চারিত্রিক বিচ্যুতি বেকারত্ব ও নিষ্ক্রিয়তার দিকে ধাবিত করেছে।

অনুরূপভাবে নেশাদ্রব্য অযৌক্তিক ভয়, হতাশা, নিরাশা, উৎকণ্ঠা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এটা চারিত্রিক মূল্যবোধ হারানোর দিকে নিয়ে যায় এবং পাগল বানিয়ে ফেলে। কেননা পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ৫০% পাগল মদপানে আসক্ত ছিল। (৫)

একজন মিথ্যাবাদীকে দেখবে যে, সত্য তাকে নাজাত দিতে পারে -এ ব্যাপারে হতাশা থেকে সে মিথ্যা বলে এবং একজন হিংসুক অন্যের ন্যায় তারও নেয়ামত প্রাপ্তি হতে পারে -সে এ বিষয়ে হতাশ। আর ইসলামী শিক্ষা মানুষকে আচরণগত বিচ্যুতি থেকে দূরে রাখে, তার অনুসারীদের হৃদয়ে প্রশান্তি ও ধীরস্থিরতা রোপন করে এবং হৃদয়কে সাহসিকতা ও অগ্রগামিতা দ্বারা পরিপূর্ণ করে। সুতরাং তাকে তুমি মিথ্যাবাদী বা হিংসুকরূপে পাবে না। যেমন রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা একত্রে থাকে না)। (১)

তৃতীয়ত: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা:
আরবি (القلق) অর্থ হল: বিরক্তি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা। (২) উদ্বেগ হল অন্তরের এমন অবস্থা যা অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায় এবং চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে ও প্রশান্তিকে দূর করে দেয়।

উদ্বেগ ও অস্থিরতার মূল হল ইসলামী মানহায থেকে দূরে থাকা; কেননা অন্তর প্রশান্তি লাভ করে আল্লাহর যিকিরে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾أَلَا بِذִক্রِ اللَّهِ تَطْمৈِنُّ الْقُلُوبُ﴿ [জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়।] (১)

ইসলামী মানহায থেকে ব্যক্তি যত দূরে সরে যাবে এবং খারাপ চরিত্রে লিপ্ত হবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা তাকে করায়ত্ব করবে। এ কথার স্বপক্ষে সর্বোত্তম সাক্ষী হল ইসলামী শিক্ষার মানহায থেকে বিচ্যুত ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি। তথা ডাক্তারদের বরাতে গবেষণা ইঙ্গিত করছে যে, প্রতি বিশজনে একজন আমেরিকান তার জীবনের কোন এক সময় মানসিক রোগ নিরাময়কেন্দ্রে কাটায়। বাস্তবতা হল, সর্বশেষ বিশ্বযুদ্ধকালীন যে যুবকেরা সামরিক সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল তাদের প্রতি ছয়জনে একজন অস্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিলো। কেননা সে অসুস্থ অথবা মানসিকভাবে দুর্বল ছিল। অনুরূপভাবে পরিসংখ্যাণ প্রমাণ করছে যে, আমেরিকায় মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সর্বশেষ বিশ্বযুদ্ধের সময়ে উদ্বিগ্নতার ব্যাধি দুই মিলিয়ন মানুষের প্রাণ নাশ করেছে। তন্মধ্যে এক মিলিয়ন মানুষের ব্যাধি সৃষ্টি হয়েছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও স্নায়ুবিক উত্তেজনা থেকে। (৪)

উদ্বিগ্নতা ও মানসিক অস্থিরতা আনায়নে মাদকদ্রব্য ও নেশাদ্রব্য পানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মাদকাসক্তদের উপর সরেজমিনের সমীক্ষা নিশ্চিত করেছে যে, তাদের নিকট তুচ্ছ বিষয়ের প্রভাব ৯.৯৬%, স্নায়ুবিক উত্তেজনা ৮.৮৬%, স্থায়ী উদ্বিগ্নতা ৬.৮৮%, অবসাদগ্রস্ততা ৫.৮৬%, ঘুমের সমস্যা ৫.৮৪% এবং স্থায়ী ভীতি ১.৭০%। (৫)

গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী মানুষের জীবনে ও আচরণে মানসিক উদ্বিগ্নতার কু-প্রভাব প্রত্যক্ষ করবে এবং এর থেকে একমাত্র মুক্তির উপায় হল ইসলামী মানহাযকে ধারণ করা ও মন্দ চরিত্র থেকে দূরে থাকা। একজন তাওহীদবাদী মুমিন অন্তরকে প্রশান্তি ও হৃদয়কে দৃঢ় বিশ্বাসে পূর্ণ রাখে তার বিপদাপদ যতই বৃদ্ধি পাক, দুর্ঘটনার ঝাঞ্চা বায়ু তার উপর দিয়ে যতই বয়ে যাক এবং দুঃখ-কষ্টে যতই আক্রান্ত হোক। কেননা সে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, দুনিয়া হল পরিক্ষা গৃহ; যেমনটি বর্ণনা করেছেন বিশ্বপালনকর্তা এবং তাদের উপর ধৈর্যশীলদের তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন: ﴾وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ মِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ﴿ [আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরিক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে।] (১)

চতুর্থত: অন্তরের ব্যাধি:
মহান আল্লাহ তায়ালা অন্তরের ব্যাধি ও তা থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে আল-কুরআনে আলোচনা করেছেন। ﴾فِي قُلُوبِهِم মَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ﴿ [তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারন তারা মিথ্যাবাদী।] (২) তিনি বলেন: ﴾يَا نِسَاءَ النَّبيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ মِّنَ النِّসَاءِ ۚ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا﴿ [হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।] (৩) তিনি আরো বলেন: ﴾لَّئِن لَّمْ يَنتَهِ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم মَّرَضٌ وَالْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينَةِ لَنُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا﴿ [এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে আর যারা নগরে গুজব রটনা করে, তারা বিরত না হলে আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে প্রবল করব; এরপর এ নগরীতে আপনার প্রতিবেশীরূপে তারা স্বল্প সময়ই থাকবে।] (৪)

আর অন্তরের ব্যাধি হল মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া এক ধরণের ভ্রান্তি; যা সত্য সম্পর্কে তার ভাবনা ও অভিপ্রায়কে নষ্ট করে দেয়। ফলে সে সত্যকে সত্য মনে করে না বা সত্যকে তার বিপরীত অবস্থায় দেখে বা তার সত্যকে উপলদ্ধি করার ক্ষমতা হ্রাস পায় বা সে ক্ষতিকর বাতিলকে ভালবাসে অথবা দুটিই তার মাঝে থাকে তবে বাতিল প্রাধান্য বিস্তার করে। (৫) এ জন্য বিপথগামীরা হকপন্থী ও সৎলোকদের সংস্পর্শ থেকে পালায়ন করে। বরং কখনো তাদেরকে ঘৃণা করে; কেননা সৎলোকেরা হারাম দ্বারা তাদের প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করতে নিষেধ করেন এবং তারা তাদের মত নয়। কখনো তারা সৎকর্মশীলদের অবুঝ মনে করে। আর এটি জাহালত ও ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত পর্যায়।

আর এর প্রতিকার সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِّمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ﴿ [হে লোকসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।] (১)

সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ ও অন্তরের আরোগ্য কামনা করে-যা অসংখ্য মানুষ প্রত্যাশা করে- সে যেন আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে; কেননা এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে সুখ- শান্তি।

টিকাঃ
(১) সূরা আয-যুখরুফ: (৩৬)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর: (৪/১৩৮)।
(৩) সূরা আল-বাকারা: (২৬৮)।
(৪) প্রাগুক্ত (১/৩২৯)।
(৫) সূরা আল-হিজর: (৪২)।
(৬) সূরা আন-নাহাল: (৯৯)।
(১) সূরা আল-ইসরা: (৬৫)।
(২) আব্দুল মজীদ আহমদ, আস-সুলুক আল-ইজরামী (১/১৪৫)।
(৩) মাহমুদ হাসান, মুকাদ্দিমাতুল খিদমাহ (পৃ: ৪২৪)।
(৪) ইবনে মানযূর, লিসানুল আরব (৬/২৫৯)।
(৫) সালেহ আব্দুল আজীজ, মাওকিফুল ইসলাম মিনাল খামর (৩৫-৩৬)।
(১) সুনানে ইবনে মাজাহ (২/৯২৭, হাঃ ২৭৭৪), সুনানে নাসায়ী (৬/১৩, হাঃ ৩১০৯), ইমাম হাকেম হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন (২/৭২)।
(২) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১০/৩২৩-৩২৪)।
(১) সূরা আর-রাদ: (২৮)।
(৪) আব্দুর রহমান ওয়াসেল, মুশকিলাতুশ শাবাব (পৃ: ৪৩)।
(৫) মুতাওয়াল্লী আশমাবী, আল-জাওয়ানেব আল-ইজতেমাইয়্যাহ (২/১২২)।
(১) সূরা আল-বাকারা: (১৫৫)।
(১) সূরা ইউনুস: (৫৭)।
(২) সূরা আল-বাকারা: (১০)।
(৩) সূরা আল-আহযাব: (৩২)।
(৪) সূরা আল-আহযাব: (৬০)।
(৫) ইবনুল কায়্যিম, ইগাসাতুল লাহফান (১/২৩)।

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 সামাজিক প্রভাব

📄 সামাজিক প্রভাব


সমাজে ফাটল, সম্পর্ক ভাঙ্গন, অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মাধ্যমে মন্দ স্বভাব- চরিত্রের প্রভাব সামাজিক পরিবেশের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়। এই পরিচ্ছেদের পূর্বোক্ত অনুচ্ছেদগুলোতে যে আলোচনা গত হয়েছে তা ছিল পরোক্ষ প্রভাব; যা প্রতিফলিত হয় সমাজের ধর্ম, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দিকগুলোতে। আর নিম্নে সমাজে মন্দ স্বভাব- চরিত্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ প্রভাব আলোচিত হল:

প্রথমত: আসমানী শাস্তি: যখন মন্দ চরিত্র কোন এক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাদের অঙ্গনে বালা-মসিবত নাযিল হয়। নবী সাঃ যিনা ও সুদ সম্পর্কে বলেছেন: (যখন কোন জনপদে ব্যাভিচার ও সুদ প্রকাশ পায় তখন তারা নিজেদের জন্য আল্লাহর শাস্তিকে বৈধ করে নেয়।)(১) লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসের মাঝে উপদেশ ও শিক্ষা রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّن سِجِّيلٍ مَّنضُودٍ * مُّسَوَّمَةً عِندَ رَبِّكَ ۖ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدٍ﴿ অর্থ: [অতঃপর যখন আমার আদেশ আসল তখন আমি জনপদকে উল্টে দিলাম, এবং তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর। যা আপনার রবের কাছে চিহ্নিত ছিল। আর এটা যালিমদের থেকে দূরে নয়।] (২)

দ্বিতীয়ত: পারস্পরিক শত্রুতা: মন্দ চরিত্র থেকে উদগত হল উম্মতের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক সামাজিক শত্রুতা। উদাহরণস্বরূপ হিংসাকে ধরা যেতে পারে। এটি ঈর্ষার শিকার ব্যক্তির প্রতি হিংসুকের শত্রুতার ফলাফল। হিংসুকের বিকৃত আচরণে, মন্দ স্বভাবে এবং যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা নেয়ামতদানে ধন্য করেছেন, তাদের সাথে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় হিংসা প্রকাশ পায়। এ প্রেক্ষিতে কখনো হিংসার শিকার ব্যক্তিও মন্দ আচরণের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে; ফলে তা থেকে হিংসা নির্গত হয়ে হিংসুকদের হৃদয়ে বাসা বাঁধে। গীবত ও চোগলখোরীর ন্যায় অনৈতিক আচরণের মাঝে এমন উপাদান নিহিত রয়েছে যা সমাজের মাঝে তাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আর এটি মন্দ ও ভুল আচরণের ফলাফল; যেটাকে তারা পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। অনুরূপভাবে সুদ, ব্যাভিচার, সমকামিতা নেশাদ্রব্য গ্রহণের মাধমে যাদের চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতা পরিবর্তন হয়ে গেছে; তাদের কপালে বিদ্বেষ ও সামাজিক ঘৃণা জোটে। কখনো এই পারস্পরিক শত্রুতা সৎলোক এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের মাঝে সংঘটিত হতে পারে।

তৃতীয়ত: সামাজিক বয়কট: সামাজিক বয়কট (সামাজিক বয়কট তথা সমাজের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়া) এর মূল উৎস হল মন্দ চরিত্র। কেননা প্রতিটি খারাপ আচরণ উম্মতের সদস্যদের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক বিনষ্টে বড় ধরণের ভূমিকা রাখে। যেমন চোগলখোরী উম্মতের সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন, পরিবার ও বন্ধুদের মাঝের সম্পর্ক কর্তনের একটি মারাত্মক মাধ্যম এবং শক্তিশালী অস্ত্র। অনুরূপভাবে তা শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রসারের উপায়। রাসূল সাঃ চোগলখোর সম্পর্কে বলেছেন: (কোন চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।)(১)

মিথ্যা হল অনিষ্টের মূল এবং সংবাদ নায্যতা হারানোর প্রমাণ। মিথ্যা সামাজিক সম্পর্ককে বিনষ্ট করে এবং তার কাঠামোকে স্থানচ্যুত করে। মিথ্যা কথার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক, একই পেশার সঙ্ঘবদ্ধতা এবং বন্ধু-বান্ধবদের দলবদ্ধতা ভেঙ্গে যায়। তার পিছনে রেখে যায় কথা ও কাজে সন্দেহ থেকে সৃষ্ট ঘৃণা-বিদ্বেষ। সামাজিক সম্পর্ক বিনষ্টের বীজ রোপনে হিংসার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কারণ না হলেও সামাজিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। কেননা হিংসা হিংসুক ব্যক্তিকে গীবত করা, মিথ্যা বলা এবং সমগ্র শক্তি দিয়ে নেয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তি থেকে নেয়ামত অপসারণ করার প্রচেষ্টার দিকে ধাবিত করে। এ নেয়ামতটি হতে পারে স্বামী-স্ত্রী, দু'জন বন্ধু, দু'টি পরিবার বা দুই অথবা ততোধিক গোষ্ঠির মাঝের সামাজিক সম্পর্ক। সুতরাং হিংসুক ব্যক্তি তার অভিযান শুরু করে এই সম্পর্কগুলো ভাঙ্গার লক্ষ্যে। আর এটি ভয়াবহ বিষয়! রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের রোগ তোমাদের মাঝেও সংক্রমিত হবে। তা হল, হিংসা ও বিদ্বেষ। এটি হল মুণ্ডনকারী। দ্বীন মুণ্ডনকারী, চুল মুণ্ডনকারী নয়। শপথ সেই সত্ত্বার যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! তোমরা পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ে সংবাদ দিব না যদি তোমরা তা কাজে পরিণত কর তবে তোমারা একে অপরকে ভালবাসবে? তাহল তোমরা পরস্পরের মাঝে সালাম বিনিময় করবে।)(২)

চতুর্থত: সামাজিক প্রতারণা: সামাজিক প্রতারণার নানা ধরণ ও প্রভাব রয়েছে। যেমন কথা, পরিমাপ, অধিকার এবং দায়িত্বে প্রতারণা করা। আবার তা ধন-সম্পদ এবং সম্পর্কেও হয়। এটি কেবল মন্দ স্বভাবের লোক থেকেই প্রকাশ পায়। মন্দ স্বভাবের ফলাফল হল ওজনে কম দেয়া এবং প্রাপ্য অধিকার প্রদানে কম করা ও দায়িত্ব অবহেলা করা। ﴾وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ * الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ * وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ * أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ * لِيَوْمٍ عَظِيمٍ﴿ অর্থ: [দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি বিশ্বাস করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে? মহাদিনে?] (১)

মন্দ স্বভাবে ফলাফলস্বরূপ সম্মানহানী করা হয়। অপবাদ আরোপ ও ব্যভিচারের মাধ্যমে সমাজের লোকদের চরিত্র হনন করা হয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের মান-সম্মান তোমাদের জন্য তেমনি সম্মানিত যেমন সম্মানিত তোমাদের এ দিনটি, তোমাদের এ মাস এবং তোমাদের এ শহর। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তি কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।)(২)

সামাজিক প্রতারণার প্রবেশদ্বারসমূহ: বাস্তবতা বিবর্জিত ও সঠিক চিত্র ব্যতীত নির্দিষ্ট বেশভূষায় এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রকাশ করা যার অবধারিত পরিণতি হল এক বা একাধিক অপর পক্ষকে ধোঁকা দেয়া অথবা এক সম্প্রদায়ের মানুষের নিকট এক কথা বলে আর অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ভিন্ন কথা বলে। এরূপ চরিত্রের মানুষের সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেছেন: (আর মানুষের মধ্যে সব থেকে নিকৃষ্ট ঐ দু’মুখো ব্যক্তি, যে একদলের সঙ্গে একভাবে কথা বলে। অপর দলের সঙ্গে আরেকভাবে কথা বলে।)(৩)

ইমাম কুরতুবী রহিঃ বলেন: “দু’মুখোর ব্যক্তি সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ; কেননা তার অবস্থা মুনাফিকের অবস্থার ন্যায়। বাতিলপন্থায় ও মিথ্যার মাধ্যমে তোষামোদকারী এবং মানুষের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টিকারী”। ইমাম নববী রহিঃ বলেন: “দু'মুখো হল সেই ব্যক্তি যে প্রত্যেক দলের নিকট তাই বলে যা তাদেরকে তৃপ্ত করে। এর মাধ্যমে সে তাদেরকে বুঝাতে চায় যে, সে তাদের দলে এবং তাদের প্রতিপক্ষের বিপরীত। তার এ ধরণের কর্ম মূলত নেফাকী এবং নিরেট মিথ্যা, ধোঁকা ও উভয় দলের গোপনীয় বিষয় অবগত হওয়ার কৌশল মাত্র! (৪)

পঞ্চমত: আইবুড়োত্ব ও বিবাহে বিলম্বতা: তাড়াতাড়ি বিবাহের পরিবর্তে বিলম্বে বিবাহের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে চারিত্রিক অধঃপতন। বিশেষত যারা নেশা বা মাদক জাতীয় দ্রব্যে আসক্ত এবং ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়; যার পরিণতি হল তালাকের বিস্তার লাভ। এর কারণ হল পারিবারিক দায়িত্বানুভূতির অনুপস্থিতি এবং অধিক পরিমাণে অন্তর্কলহ। অনুরূপভাবে জীবন-যাপনে নারীদের অনৈসলামী কালচারের দিকে ধাবিত হওয়া; যেমন: দেহপ্রদর্শনী, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, পর-পুরুষের সাথে এমন বিষয়ে গল্প করা যাতে পুরুষ অনাগ্রহী। আর এগুলো বিবাহ বিলম্ব এবং বিবাহ ছাড়া আইবুড়োত্বের কারণ।

কাজেই মন্দ চরিত্রের প্রভাব সমাজের উপর মারাত্মক যা সমাজের জীবন-যাপন ও আচরণে প্রতিফলিত হয়, অপরাধ ও অধঃপতনকে সৌন্দর্যময় করে তোলে এবং এতদুভয়কে সহজ ও তাতে অভ্যস্ত করে তোলে; যা সমাজের সদস্যদেরকে মন্দ আচরণে অভ্যস্ত করে তোলে।

টিকাঃ
(১) হাকেম, মুস্তাদরাক (২/৩৭) এবং তিনি হাদিসের সনদকে হাসান, সহীহ বলেছেন。
(২) সূরা হূদ: (৮২-৮৩)。
(১) সহীহ মুসলিম (১/১০১, হাঃ ১৬৮-১০৫)。
(২) সুনানে তিরমিযি (৪/৫৭৩, হাঃ ২৫১০), মুসনাদে আহমাদ (১/১৬৫), সহীহ তিরমিযি গ্রন্থে (২০৩৮-২৬৪১) শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন。
(১) সূরা আল-মুতাফফিফীন: (১-৫)。
(২) সহীহ বুখারী (১/৪১, হাঃ ৬৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০৬, হাঃ ৩০/১৬৭৯)。
(৩) সহীহ বুখারী (২/৫০৩, হাঃ ৩৪৯৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১১, হাঃ ১০০/২৫২৬)。
(৪) ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৭৫)。

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 পারিবারিক প্রভাব

📄 পারিবারিক প্রভাব


পরিবারের সদস্যদের মাঝে সংঘটিত মন্দ আচরণের দ্বারা পরিবার সরাসরি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। আর তা হল বেশি বেশি অবাধ মেলামেশা, দীর্ঘসময় ধরে সহাবস্থান এবং পরিবারের সদস্যদের মাঝে আদান-প্রদানকৃত দায়িত্বের আকারকে বোঝা মনে করার কারণে; যে দায়িত্ব সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল ব্যাক্তি, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের অভিভাবক, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার স্বামীগৃহের কর্ত্রী, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। খাদেম তার মনিবের ধন-সম্পদের রক্ষক, তাকেও তার মনিবের ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইবনু উমর রাঃ বলেন, আমার মনে হয়, রাসূল সাঃ আরো বলেছেন, পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের রক্ষক এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকেই তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।)(১) পরিবারের উপর মন্দ স্বভাবের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে নিম্নে আলোকপাত করা হল:

প্রথমত: দায়িত্বের বোঝা বৃদ্ধি পাওয়া: মন্দ স্বভাবের যে প্রভাব সর্বাগ্রে পরিবারে সাথে যুক্ত হয় তা হল, দায়িত্বের বোঝা ও ভার বৃদ্ধি পাওয়া এবং এর অনুসঙ্গ হিসেবে শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম বেড়ে যাওয়া; এর কষ্ট কেবল সেই অনুভব করে যে এতে আক্রান্ত হয়েছে। যথা বাবা-মা পারিবারিক ঘটনাবলী এবং চুরি, যুলুম, ধর্ষণ, মদ ও নেশা পান, জালিয়াতি, ব্যাভিচার, সমকামিতা, অবাধ্যতা, আনুগত্যহীনতা, মিথ্যা ও ভাইদের মাঝে কলহের ন্যায় ইত্যাদি নৈতিক অধঃপতনের অপরাধ সহ্য করেন। বর্ণিত সবগুলো মন্দ স্বভাবে তার বোঝাকে পরিবারে কাঁধে নিক্ষেপ করে; যা তরবিয়তি দায়িত্বশীলতার আকারকেই বৃদ্ধি করে।

দ্বিতীয়ত: খারাপ আদর্শ: স্বীকৃত বিষয় হল যে, অধিক পরিমাণে সঙ্গ লাভ, দীর্ঘ মেলামেশা সমস্যা সৃষ্টি করে। আর এই মূলনীতি থেকে যা হয় তা হল, পরিবারের নষ্ট সন্তান অন্যান্য ভাইদের উপর তার প্রভাব বিস্তার করে সার্বক্ষণিক সঙ্গের মাধ্যমে; যা মুসলিম পরিবার গঠনে মন্দ তরবিয়তি প্রভাব সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ পরিবার নিষ্কলুষ তরবিয়তি কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অনুসরণীয় আদর্শ হারায়। ইসলাম তার শ্রেষ্ঠ তরবিয়তি মানহাযে দ্বীন, চরিত্র এবং সমস্ত আমলে মন্দ আদর্শের ভয়াবহতা বর্ণনা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۚ أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَىٰ عَذَابِ السَّعِيرِ﴿ অর্থ: [আর তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তা অনুসরণ কর। তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের দিকে ডাকে, তবুও কি? (তারা পিতৃ পুরুষদের অনুসরণ করবে?] (১)

মন্দ আদর্শের ব্যক্তির সাথে যে ক্ষতি ও ধ্বংস যুক্ত হয় সে সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করল, তার জন্য তো এ কাজের গোনাহ আছেই। এরপর যারা এ মন্দ রীতির উপর আমল করবে তাদের গোনাহও তার ভাগে আসবে আমলকারীদের গোনাহ কোন প্রকার কম করা ব্যতিরেখেই।)(২) হাদিসটি মন্দ আদর্শের ভয়াবহতা ও মন্দ স্বভাবের অধিকারীর ভাগ্যে যে পাপ যুক্ত হয়; সে বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। এ জন্য উক্ত মন্দ প্রভাব অপনোদনের জন্য পরিবারের সর্বোত্তম সহায়ক হল মহান আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাঁর প্রজ্ঞাময় মানহায পরিবারের কাঠামোর মাঝে বাস্তবায়ন করা।

তৃতীয়ত: দুর্নাম: পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বিচ্যুতির কারণে পরিবারের দুর্নাম হয়। আর এই দুর্নামের সামাজিক ও পরিপালনগত প্রভাব রয়েছে; তন্মধ্যে: খারাপ পরিবারের সাথে একত্রে বসবাস করা অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করার ব্যাপারে মানুষের অনাগ্রহ। তাই এটি পিতামাতা এবং সন্তানদের উপর ভয়াবহ নৈতিক ও মানসিক প্রভাব ফেলে। এ জন্য পরিবারের দায়িত্ব হল সেই ইসলামী মানহায প্রয়োগের মাধ্যমে এই খারাপ প্রভাবকে প্রতিহত করা, যেই মানহায মন্দ চরিত্রের দুর্ভোগ ও বিপদ থেকে পরিবার ও সমাজের দূরে থাকাকে নিশ্চিত করে এবং গুজববাজ ও রোগাক্রান্ত হৃদয়ের অধিকারীদের মুখের আঘাত থেকে পরিবারের মান-সম্মানকে রক্ষা করে।

ইসলামী মানহাযের অন্তর্গত সতর্কতামূলক পরিপালনের মাঝে এর জন্য উত্তম সহায়ক রয়েছে। মহান আল্লাহর বাণীকে গভীরভাবে অনুধাবন করুন: ﴾يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ ۚ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا﴿ অর্থ: [হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।] (৩) এই দিকনির্দেশনার মাঝে সতর্কতামূলক তরবিয়ত রয়েছে যাতে কুপ্রবৃত্তির ব্যাধিতে আক্রান্ত অন্তরের অধিকারীদের কামনাভাব জাগ্রত না হয়। এই প্রতিকার ও সতর্কতামূলক তরবিয়ত অপেক্ষা আর কোন তরবিয়ত মহত্ত্বর!

চতুর্থত: বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতা: পরিবারের সদস্যদের মাঝে যখন গীবত, চোগলখোরি ও হিংসা-বিদ্বেষ বিস্তার লাভ করে তখন তাদের মাঝে শত্রুতা প্রবেশ করে, বিচ্ছিন্নতা ও সম্পর্কহীনতা তৈরি হয় এবং নৈকট্যতার পরিবর্তে দূরত্ব আপতিত হয়। আর নবী সাঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেছেন: (আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে। সে বলে, যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবেন।)(১)

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হল রিযিক বৃদ্ধি পাওয়া ও বয়সে বরকত লাভের দার। নবী সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুন্ন রাখে।)(২) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের খারাপ প্রভাব রয়েছে সদস্যদের উপর। তথা এতে তাদের পাপ এবং সামাজিক, মানসিক ও বস্তুগত ক্ষতি সাধিত হয়। আর এগুলো মূলত পারস্পরিক অসহযোগিতা, সাহায্যহীনতা এবং অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ না করার ফলাফল। কখনো এমনও হয় যে, ধনী ব্যক্তি সুখের নিদ্রায় আছে অথচ তার কোন নিকটাত্মীয় ক্ষুধার্ত রয়েছে এবং ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে। এ জন্য মুসলিম পরিবারের কর্তব্য হল, ইসলামী তরবিয়তি মানহাযের অন্তর্গত তরবিয়তের সকল উপায় অবলম্বন করে তারা একতা বজায় রাখবে এবং সম্পর্ক ছিন্নের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখবে。

পঞ্চমত: দেরিতে বিবাহ: পরিবারের ইমেজে যে মন্দ প্রভাব যুক্ত হয় তা হল, পরিবারের সন্তান-সন্ততির বিবাহে বিলম্ব করা। আর তার কারণ হল, কিছু মন্দ স্বভাবের উপস্থিতি; যার কার্যকর প্রভাব রয়েছে বিলম্বে বিবাহের ক্ষেত্রে। সে মন্দ স্বভাব হয় মাদক ও নেশাদ্রব্যে অর্থ ব্যয় বা হারাম খেলা অথবা হারাম উপায়ে কামনা-বাসনা তৃপ্ত করার ফল; যেমন: প্রেমিকা রাখা অথবা অভ্যাস ও কালচারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ফল।

বিলম্বে বিবাহের নানাবিধ খারাপ প্রভাব রয়েছে যা নিম্নে উপস্থাপন করা হল:(৩)
১- যুবকদের উদ্দেশ্যে রাসূল সাঃ এর অমূল্য উপদেশের বাস্তবায়নে ত্বরা না করা; রাসূল সাঃ বলেছেন: (হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মাঝে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত করে।)(৪)
২- হারামে পতিত হওয়ার পথ বন্ধ না করা; যেমন: নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়া এবং ব্যাভিচার করা。
৩- সন্তান-সন্ততি জন্মদানে বিলম্ব করা; যাদের নিয়ে রাসূল সাঃ কিয়ামত দিবসে গর্ব করবেন। তিনি বলেছেন: (তোমরা অধিক সন্তান প্রসবকারী এবং প্রেমময়ী নারীকে বিবাহ কর; কেননা আমি কিয়ামত দিবসে অন্যান্য উম্মতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করব।)
৪- বিবাহে বিলম্ব করার কারণে তরুণীদের মাঝে আইবুড়ো সমস্যার আবির্ভাব হয়。

ষষ্ঠত: মান-সম্ভ্রম হানি করা: মন্দ স্বভাবের মাঝে এমন উপাদান নিহিতি রয়েছে যা সম্ভ্রমহানি ও বংশ বিনষ্টের দিকে নিয়ে যায় এবং ব্যক্তির যা নয় তার দিকে তা সম্পৃক্ত করার দিকে ধাবিত করে। এগুলো হল যৌন বিকৃতির ফসল। অথচ নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের মান-সম্মান তোমাদের জন্য তেমনি সম্মানিত যেমন সম্মানিত তোমাদের এ দিনটি, তোমাদের এ মাস এবং তোমাদের এ শহর। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তি কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।)(১) কেবল প্রশান্ত জীবন যাপনের নিশ্চয়তা দানকারী ইসলামী তরবিয়তের মানহাযের মধ্য দিয়ে অনৈতিক আচরণ থেকে সুরক্ষামূলক তরবিয়তের মাধ্যমেই পরিবারের সম্ভ্রম রক্ষা করা সম্ভব। আর ইসলামী তরবিয়তের মানহায হল কুরআন ও সুন্নাহ যে নির্দেশনা ধারণ করেছে তার বাস্তবায়ন।(২)

টিকা:
(১) সহীহ বুখারী (১/২৮৪, হাঃ ৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯)。
(১) সূরা লুকমান: (২১)。
(২) সহীহ মুসলিম (২/৭০৫, হাঃ ৬৯-১০১৭)。
(৩) সূরা আল-আহযাব: (৩২)。
(১) সহীহ বুখারী (১/২৮৪, হাঃ ৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯)。
(২) সহীহ বুখারী (১/৮৯, হাঃ ৫৯৮৫), সহীহ মুসলিম (৪/১৯৮২)。
(৩) খালেদ আল-হাযেমী, আল-মুশকিলাত আত-তারবাবিয়্যাহ (পৃ: ১০-১১)。
(৪) সহীহ বুখারী (৩/৩৫৫, হাঃ ৫০৬৬), সহীহ মুসলিম (২/১০১৯)。
(১) সহীহ বুখারী (১/৪১, হাঃ ৬৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০৬, হাঃ ৩০/১৬৭৯)。
(২) সহীহ বুখারী (১/৪১, হাঃ ৬৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০৬, হাঃ ৩০/১৬৭৯)。

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 অর্থনৈতিক প্রভাব

📄 অর্থনৈতিক প্রভাব


অর্থনীতিকে সমাজ গঠন ও তার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা হ্রাসের মাঝে বেকারত্ব, অনিষ্টতা এবং বিচ্যুতির দিক রয়েছে। রাসূল সাঃ দরিদ্রতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেছেন: (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কুফরী, দরিদ্রতা এবং কবরের আযাব থেকে পানাহ চাই।)(১) তিনি আরো বলেছেন: (হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি দরিদ্রতা, অপ্রতুলতা ও অপমান হতে এবং আমি আশ্রয় প্রার্থনা করি যেন আমি কারো উপর অত্যাচার না করি বা আমি যেন অত্যাচারিত না হই।)(২)

উম্মতের অর্থনৈতিক দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী অনুঘটক হল মন্দ চরিত্রের বিস্তার লাভ। কেননা মন্দ চরিত্র নিজ অভ্যন্তরে অনিষ্টতা ও অন্যায়কে ধারণ করে যা উম্মতের উন্নতি, অগ্রগতি, বিকাশ এবং তার কল্যাণ ব্যবহারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। নিম্নে উম্মতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর মন্দ চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হল:

প্রথমত: আয় হ্রাস করে: মন্দ স্বভাব ব্যক্তি ও সমাজের আয়কে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আর তার স্বরূপ হল যে, বিচ্যুত চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিগণ রোগাক্রান্ত হয়ে কর্মে অনুপস্থিত থাকে বা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিলম্ব করে; ফলে এটা সময় অপচয় এবং উপকারহীন কাজে সময় ব্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। আরেক দিক থেকে বলা যায় যে, মন্দ স্বভাবের অধিকারী ব্যক্তি তার আয়ের কিছু অংশ গান শোনা, গানের যন্ত্রপাতি ও ক্যাসেট ক্রয়ের ন্যায় অনৈতিকতায় ব্যয় করে বা নাটক, সিনেমা দর্শনের মধ্য দিয়ে সময় নষ্টমূলক কাজে ব্যয় করে বা নেশাজাতীয় ও মাদকদ্রব্য সংগ্রহে খরচ করে; যা সামগ্রিকভাবে উম্মতের অর্থের অপচয় এবং উম্মতকে দুর্বল করার বিষয়টি প্রতিফলিত করে। কিছু গবেষণা ইঙ্গিত করছে যে, কিছু ইসলামী সমাজে পরিবারের ১৩% বাজেট গান-বাদ্যে ব্যয় করা হয়। মদ পানের কারণে কোন একটি সমাজের লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩১৯৫ পাউন্ড! (৩)

দ্বিতীয়ত: বেকারত্ব: আচরণগত বিচ্যুতির প্রভাবের অন্যতম হল আরাম-আয়েশের প্রতি ঝোঁক এবং অভাব পূরণের জন্য অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ। বিশেষত মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে; তথা এই শ্রেণীটি আরামের প্রতি আগ্রহী আর কর্মে অনাগ্রহী। কোন একটা জরিপে তাদের সংখ্যা ২.১১%।(১)

তৃতীয়ত: মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ব্যয়: জাতীয় অর্থনীতির উপর ব্যক্তির মাদকাসক্তির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যদি একাধিক ব্যক্তি যদি আসক্ত হয় তাহলে কেমন প্রভাব পড়তে পারে? নিশ্চয় তার প্রভাব হবে অধিক মারাত্মক তাদেরকে কর্ম থেকে বিরত রাখার কারণে। তদুপরি এর সাথে যুক্ত হবে বিশাল অর্থ তাদের চিকিৎসা ব্যায়ের অংশ হিসেবে। অথচ এ অর্থগুলো লাভজনক অর্থনৈতিক চ্যানেলে ব্যয় করাটা যৌক্তিক ছিল। আচরণগত বিচ্যুতির মাঝে এমন উপাদান রয়েছে যা ব্যক্তিকে আসক্তি ও তার চিন্তা-শক্তি আক্রান্ত হওয়ার কারণে প্রতিবন্ধিতার দিকে ধাবিত করে। যা তাকে চাকরিচ্যুত করে এবং তার চিকিৎসা খরচ রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে নির্বাহ করতে হয়।

অন্যদিকে, শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের কারণে অন্যদের সম্পদের ক্ষতি হয় যা মূলতঃ জাতির অর্থের অপচয় হিসেবে গণ্য। আর আচরণগত বিচ্যুতির ফলে অর্থ ও শক্তির অপচয় হয়। অনুরূপভাবে ব্যাভিচার ও সমকামিতায় লিপ্ত হওয়ার ফলে এমন রোগে আক্রান্ত হয় যা তাদেরকে কর্ম ও দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত করে। আর এটি কতগুলো বিবেক-বুদ্ধি ও শরীরকে নিষ্ক্রিয় করা যাদের জাতি গঠনে ভূমিকা রাখার অপার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মন্দ আচরণে আক্রান্ত হওয়ার কারণে জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনির্মাণে তারা ভূমিকা রাখার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে। উল্টো তাদের চিকিৎসা, ঔষুধ, ডাক্তার, বেড এবং হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে; যা মূলত জাতির অর্থনীতির অপচয় করছে。

চতুর্থত: ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ ধ্বংস করা: মহান আল্লাহ তায়ালা অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণকে হারাম করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴿ অর্থ: [আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।](২) আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: (রাসূল সাঃ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিসম্পাত করেছেন।)(১)

ঘুষের বিষয়টি শুধু সম্পদ ও সুবিধা অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তা পদ ও কর্ম অর্জনে পর্যবসিত হয়; যা ব্যক্তিকে এমন স্থানে প্রতিষ্ঠিত করে যার যোগ্য সে নয়। অযোগ্য ব্যক্তিকে কর্মে নিয়োজিত করার মাঝে সময়, শক্তি ও সক্ষমতার অপচয় রয়েছে এবং উৎপাদন ক্ষমতার হ্রাস রয়েছে; যার প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতে। অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্যতম আলামত। আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন: (যখন আমানত নষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। সে বলল, কীভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন: যখন কোন কাজের দায়িত্ব অনুপযুক্ত লোকের উপর ন্যাস্ত করা হয় তখন তুমি কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে।)(২) ঘুষ কখনো উম্মতের সম্পদ ধ্বংস করার মাধ্যমে তার অধিকার ও অর্থনীতিকে বিনষ্ট করেছে। অনেক ঘুষখোর রয়েছে যাদের উপর প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়িত্ব ন্যাস্ত করার পর জাতীয় প্রকল্পগুলোকে ঘুষের বিনিময়ে ধ্বংস করেছে। কখনো এমন হয়েছে যে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষুধ বা খাদ্য সমাজের সদস্যদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে ফলে সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও জাতির উপর আর্থিক ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিয়েছে。

পঞ্চমত: উৎপাদন হ্রাস: উৎপাদন হ্রাস, গুণগত মানের দুর্বলতা এবং নিপুনতার অভাবের কারণ হল কর্মে আমানতদারিতা ও আন্তরিকতার অভাব। কেননা আমনতদারিতার মাঝে পেশাগত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ চেষ্টা, হকদারের হক প্রদান এবং তাদের নায্য হক না কমানোর মন্ত্র নিহিত রয়েছে। আর এ বিষয়েই শরীয়ত তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছে এবং তাদের জন্য কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴿ অর্থ: [হ ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।](৩) রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি তোমার কাছে কিছু আমানত রেখেছে তাকে তা ফেরত দাও। যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না।)(৪)

যখন উম্মত আমানত হারিয়ে ফেলে তখন পেশাগত দায়িত্ব ও লেনদেনে খেয়ানত, ধোঁকা, মিথ্যা ও প্রতারণা প্রবেশ করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য হোঁচট খায় ও তাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। ফলে তার প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর ইসলাম খেয়ানতকে মুনাফেকির একটি আলামত হিসেবে গণ্য করেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (মুনাফেকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে আর আমানত রাখলে খেয়ানত করে।)(১)

ষষ্ঠত: সম্পদ বিনষ্ট করা: মন্দ চরিত্র যা রেখে যায় তার অন্যতম হল নানা উপায়ে সম্পদ বিনষ্ট করা; যেমন: অপচয় এবং মুদ্রা পাচার ইত্যাদি। চারিত্রিকভাবে নষ্টদের অধিকাংশ সম্পদ হারাম কাজে ও বিলাসিতায় ব্যয় হয়। অথচ মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَا تُسْرِফُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴿ অর্থ: [আর অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।](২) অন্যদিকে, আমরা মাদক ও নেশাদ্রব্য ব্যবসায়ীদের দেখতে পাই যে, তারা বাইরে ডলার পাচারে ভূমিকা রাখছে ধ্বংসাত্মক বাণিজ্যিক ডিল বিনিময় এবং তা জাতির জন্য আনায়ন করার লক্ষ্যে।(৩) এর মাঝে জাতির জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি রয়েছে。

সপ্তমত: প্রতিকারমূলক সুরক্ষা ব্যয়: যিনা, চুরি, ঘুষ, পাচার, মাদক চোরাচালান ইত্যাদি মন্দ স্বভাবের বিরুদ্ধে লড়াই রাষ্ট্র ও তার নিরাপত্তা এজেন্সীগুলোকে অপরাধীদের অনুসন্ধানে, তাদের অপকর্ম নস্যাতে এবং তাদের পাকড়াও করতে বিশাল অংকের অর্থ খরচে বাধ্য করে। একই সমই যদি রাষ্ট্র তাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকত তাহলে উক্ত অর্থগুলো উন্নয়নমূলক ভিন্ন খাতে ব্যয় করতে পারত; যার আর্থিক উন্নয়নের সুফল জাতি ভোগ করত। কিন্তু প্রতিকারমূলক সুরক্ষা ব্যয়ের কারণে অর্থনীতির বিরাট একটা অংশ নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হচ্ছে。

টিকা:
(১) সুনানে নাসায়ী (৩/৭৩-৭৪, হা: ১৩৪৭), মুসনাদে আহমাদ (৫/৩৬), শাইখ আলবানী সহীহ সুনানে নাসায়ীতে (১২৭৬) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(২) সুনানে আবু দাউদ (২/১৯০-১৯১, হা: ৫৪৪), শাইখ আলবানী সহীহ সুনানে আবু দাউদে (১৩৬৬-১৫৪৪) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(৩) মুতাওয়াল্লী আশমাবী, আল-জাওয়ানেব আল-ইজতেমায়িয়‍্যাহ (১/১০১-১০২)。
(১) প্রাগুক্ত (২/৮২)。
(২) সূরা আল-বাকারা: (১৮৮)。
(১) মুসনাদে আহমদ (২/১৬৪)。
(২) সহীহ বুখারী (১/৩৭, হা: ৫৯)。
(৩) সূরা আল-আনফাল: (২৭)。
(৪) সুনানে আবু দাউদ (২/১৯০-১৯১, হা: ৫৪৪), মুসনাদে আহমাদ (৩/৪১৪), শাইখ আলবানী সহীহ জামেউস সগীরে (১/১০৭, হা: ২৪০) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(১) সহীহ বুখারী (১/২৭, হাঃ ৩৩), সহীহ মুসলিম (১/৭৮, হাঃ ১০৭/৫৯)。
(২) সূরা আল-আনআ'ম: (১৪১)。
(৩) মুতাওয়াল্লী আশমাবী, আল-জাওয়ানেব আল-ইজতেমায়িয়‍্যাহ (১/১০১-১০২)。

ফন্ট সাইজ
15px
17px