📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 মন্দ চরিত্র নিরাময়ের পদ্ধতি

📄 মন্দ চরিত্র নিরাময়ের পদ্ধতি


প্রত্যেক রোগেরই ঔষুধ রয়েছে, কেই হয়ত জানে আবার কেউ জানে না। ইসলামী মানহাজের আলোকে দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে বিচ্যুত আচরণের চিকিৎসা মৃত অন্তরকে জীবিত করে; যেহেতু এর ফলে জীবন উত্তম চরিত্রের চর্চা করে এবং পৃথিবীকে উত্তমতা ও কল্যাণ দিয়ে আবাদ করে। মন্দ চরিত্র নিরাময়ের পদ্ধতি নিম্নে আলোচনা করা হল:

প্রথমতঃ শরয়ী জ্ঞানের প্রচার করাঃ
ইলমের মর্যাদা তার বিষয় বস্তুর আলোকে হয়ে থাকে। বস্তুত ইলমের উপকারিতা চরিত্রের মাঝে তার প্রভাব বাস্তবায়নের মাঝে নিহিত থাকে। আর সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ইলম হল দ্বীনের ইলম; কেননা তা জানার ফলে মানুষ পথ পায় আর এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে পথভ্রষ্ট হয়।

ইলমের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি জানতে পারে আল্লাহ তাকে কী নির্দেশ করেছেন, ফলে তার অনুসরণ করে এবং জানতে পারে কোন বিষয় থেকে তিনি নিষেধ করেছেন, ফলে তা থেকে বিরত থাকে। আর সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ইলম হল শরীয়ত ও এর শাখা-প্রশাখার ইলম। এটা এমন ইলম যা বান্দাকে তার রবের নিকটবর্তী করে, তার নিকট উত্তম চরিত্রকে সুশোভিত করে যেন তা গ্রহণ করে, মন্দ চরিত্র থেকে তাকে দূরে রাখে এবং তার নিকট পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে তোলে। তাই আলেমগণই আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করে এবং মন্দ চরিত্র থেকে দূরে থাকে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ﴿ [আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাকে ভয় করে।]

কাজেই মানুষ আল্লাহর সম্পর্কে যত বেশি জানবে তত বেশি তাকে ভয় করবে। আল্লাহর ভয় তার জন্য পাপমুক্ত থাকা এবং তার সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত থাকাকে আবশ্যক করে। এটা ইলমের ফযিলতের প্রমাণ বহন করে, কেননা তা আল্লাহকে ভয় করার প্রতি আহ্বান করে।

ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: ইলম হল জীবন ও নূর আর অজ্ঞতা হল মৃত্যু ও অন্ধকার। সকল অকল্যাণের কারণ হল জীবন ও নূরের অনুপস্থিতি, আর সকল কল্যাণের উৎস হল নূর। কিতাব ও সুন্নাহর নূরের চেয়ে উত্তম কিছু নেই। এই দুয়ের মাধ্যমে অন্তর পূণর্জ্জীবিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجিীবُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ ۖ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ﴿ [মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দাও; যখন সে তোমাদেরকে আহবান করে তার প্রতি, যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন। আর নিশ্চয় তাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।]

অর্থাৎ তোমরা আনুগত্যের আহবানে সাড়া দাও এবং কুরআনের অন্তর্গত আদেশ-নিষেধের বিষয়ে সাড়া দাও, কেননা এতেই রয়েছে স্থায়ী জীবন ও দীর্ঘস্থায়ী নিয়ামত।

সুতরাং পরিবার, মাদরাসা ও সকল শিক্ষার মাধ্যমসমূহ সবচেয়ে উত্তম যে চিকিৎসা উপস্থাপন করতে পারে তা হল শরয়ী ইলম শিক্ষা দেয়া; যা মন্দ আচরণকে দূরীভূত করে আর উত্তম চরিত্র গঠন করে।

কাজেই শুধু ইসলামী বিভাগগুলোতেই শরয়ী শিক্ষা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, যেমনটি ইসলামী সমাজের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান, বরং বিজ্ঞান বিভাগের সকল শাখায় পর্যাপ্ত পরিমাণ শরয়ী শিক্ষা থাকা আবশ্যক। এটাই হল সঠিক চিকিৎসা ও নিরাময়। যারা মাদকাসক্তি থেকে ফিরে এসেছে তাদের একটা বিরাট অংশ দ্বীনি দিক-নির্দেশনার ফলেই ফিরে এসেছে, যেমনটি গবেষণা থেকে প্রমাণিত। আর এটি আমাদের নিকট কুরআন ও সুন্নাহর ইমানের মাধ্যমেও প্রমাণিত।

পরিবার যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক্ষেত্রে ঘাটতি লক্ষ্য করে, তাহলে তাদের উপর আবশ্যক হল তারা শরয়ী শিক্ষার এই ঘাটতি পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে; যা তাদেরকে দ্বীন ও ফরয বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবে এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ শরীয়ত যা থেকে নিষেধ করেছে তার জ্ঞান দিবে। কোন মুসলিম পরিবার বা কোন মুসলিম ব্যক্তি যেন এই কারণ না দেখায় যে, যাদের বিভাগ ভিন্ন যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিজিক্স বা কৃষি তাদেরকে শরয়ী জ্ঞান শিখানো হবে না। বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য এতটুকু জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক যা দ্বীনের বিষয়ে তার অজ্ঞতাকে দূর করবে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শিক্ষিতদের চেয়ে অশিক্ষিতদের মাঝে মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণের প্রবণতা অনেক বেশি। যেখানে তাদের পরিমাণ হল প্রায় ৭০%। মাদক গ্রহণের অন্যতম কারণ হল তার হাকিকত সম্পর্কে অজ্ঞতা ও তার উপকারিতার বিষয়ে ভুল ধারণা। যেহেতু অধিকাংশ মাদকসেবীরা মনে করে যে, মাদক তার কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং বন্ধুদের সাথে সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।

দ্বিতীয়তঃ সৎ সঙ্গীঃ
চারিত্রিক প্রভাবকের অন্যতম হল সৎ সঙ্গী যারা তাকে কল্যাণের পথ দেখায় ও তা গ্রহণে উৎসাহিত করে এবং অকল্যাণের পথ হতে সতর্ক করে ও সে পথে চলতে নিরুৎসাহিত করে। এ মর্মে নবী সাঃ বলেন: (সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।) তিনি আরো বলেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।)

সুতরাং বিচ্যুত আচরণ নিরাময় করতে বা তার থেকে রক্ষা পেতে অথবা উত্তম চরিত্র গঠন করতে অবশ্যই সৎ সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। কেননা যে উত্তম চরিত্র গঠন করতে চায় তাকে অবশ্যই সেই পথেই চলতে হবে এবং এই পথে অবশ্যই তাকে সৎ সঙ্গী গ্রহণ করতে হবে, যে তাকে ভাল কাজ, সততা, উত্তম আচরণ, ধৈর্যধারণ ও প্রতিশ্রুতি পূরণে সহযোগিতা করবে।

সৎ সঙ্গীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: শরয়ী জ্ঞানের প্রতি গুরুত্বারোপ, বাস্তব জীবনে তার বাস্তবায়ন, উন্নত চিন্তাধারা, উত্তম আচরণকারী, কথার পূর্বে কর্মের মাধ্যমে কল্যাণের প্রতি আহবানকারী, আপনি তাকে কল্যণের পথে অগ্রগামী ও তার পথ উন্মোচনকারী পাবেন, সে হবে অকল্যাণের পথ রুদ্ধকারী, সে বন্ধুর ভুল এড়িয়ে যায়, তাকে সততার সাথে নসীহা করে, সে কাজকে ভালবাসে প্রফুল্লচিত্তে অলসতা বশত নয়।

পক্ষান্তরে অসৎ বন্ধু: তার বন্ধুত্ব গ্রহণের পর শুধু আফসোস ও অনুশোচনা করতে হবে; অথচ তখন অনুশোচনা কোন কাজে আসবে না। মহান আল্লাহ অসৎ সঙ্গের পরিণতি বর্ণনা করে বলেন: ﴾وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي ۗ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا﴿ [যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম। হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ পৌছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।]

সালাফে সালেহীনগণ অসৎ সঙ্গ থেকে সতর্ক করেছেন। জনৈক সালাফ বলেন: তোমরা দু'ধরণের মানুষ থেকে সতর্ক থাক। প্রবৃত্তির অনুসারী যাকে তার প্রবৃত্তি ফেতনাগ্রস্ত করেছে আর দুনিয়া অনুসন্ধানী লোক, দুনিয়া যাকে অন্ধ করে রেখেছে।

মাঠপর্যায়ের গবেষণা ইঙ্গিত করে যে, খারাপ চরিত্রে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গীর কার্যকর প্রভার রয়েছ। গবেষণা স্পষ্ট করেছে যে, কর্মক্ষেত্রের লোকদের নতুন সদস্যদের উপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে তাদের নিকট ভুল বার্তা পৌছানোর ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, অর্ধেকেরও বেশি প্রায় ৫৪.৬% মাদকাসক্ত ব্যক্তি বারবার মাদক ছাড়তে চেষ্টা করেছে, কিন্তু খারাপ বন্ধু থাকার দরুন তারা তা করতে পারেনি। বরং এ পথে ধাবিত হওয়ার জন্য প্রধান কারণ ছিল অসৎ সঙ্গ, যার পরিমাণ হল ৮৫.৫%।

তৃতীয়তঃ শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ করা:
বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমতের অন্যতম নির্দশন হল, তিনি তাদের জন্য শরয়ী শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন এবং তা প্রয়োগ করা ওয়াজীব করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ﴿ [আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফের।] তিনি আরো বলেন: ﴾وَمَن لَّমْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴿ [আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই যালিম।]

সুতরাং আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করা কাফেরদের কাজ। ইবনে আব্বাস রাঃ অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: কুফর বিভিন্ন স্তরের, যুলুম বিভিন্ন স্তরের এবং ফাসেকী বিভিন্ন স্তরের। যখন সেটাকে হালাল মনে করে করা হবে তখন তা সবচেয়ে বড় যুলুম, আর হালাল মনে করে না করলে কবিরা গুনাহ হবে।

শরয়ী শাস্তি প্রয়োগের সময় অপরাধীর সাথে অনুকম্পা প্রদর্শনা না করা আবশ্যক যাতে করে মন্দ ও বিচ্যুত আচরণ বিস্তার লাভ না করে; কেননা অপরাধমূলক খারাপ ও বিচ্যুত চরিত্র বিস্তার লাভের অন্যতম কারণ হল অপরাধীকে কম শাস্তি দেয়া ও তাদের প্রতি অনুকম্পা করা। তাদের প্রতি অধিক দয়া দেখানো হয় এই দাবীতে যে তাদেরকে শাস্তি দিলে তাদের উপর মানসিক ও স্নায়ুবিক চাপ বাড়বে।

এটা হল মানব রচিত নীতি যা সমাজে বিচ্যুত আচরণ প্রসার ও বিস্তারের জন্য দায়ী। যদিও আমরা দেখতে পায় যে, শরয়ী শাস্তির ক্ষেত্রে অপরাধীর সাথে দয়া প্রদর্শনের কোন উপায় নেই। বরং কোন প্রকার নমনীয়তা ছাড়াই শাস্তি প্রয়োগ করা হবে, যা অপরাধীকে তার কর্ম থেকে বিরত রাখবে এবং অন্যদেরকে বিচ্যুতি থেকে সতর্ক করবে। আমাদের নবী সাঃ বলেন: (সে মহান সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি মুহাম্মাদ তনয়া ফাতিমা রাঃ চুরি করত তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।)

মহান আল্লাহ যিনার শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বলেন: ﴾الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ ۖ وَلَا تَأْخُذْকُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآখِرِ ۖ وَلْيَশْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ﴿ [ব্যব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী— তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরী করতে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং আখেরাতের উপর ঈমানদার হও; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।]

শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ ব্যক্তিকে তা পুণরায় করা হতে বিরত রাখে কেননা সেখানে তোষামোদ ও অনুকম্পার কোন স্থান নেই।

অপর দিকে ব্যক্তির সংশোধনের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রয়োগের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। মানুষ স্বভাবগতভাবেই যেখানে খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে তা থেকে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করে, যেমনভাবে ভাল অভিজ্ঞতার কাজ বারবার করতে আগ্রহী থাকে।

ইসলামী শরীয়ত ব্যতীত সমাজে এমন কোন শরীয়ত পাওয়া যাবে না যা বিচ্যুত আচরণকে প্রতিরোধ করে; যেহেতু ইসলামী শরীয়তের শাস্তি অপরাধ অনুযায়ী হয়ে থাকে, তা প্রয়োগে শৈথিল্যের কোন স্থান নেই। তা মানুষকে বিচ্যুত আচরণ থেকে দূরে থাকতে ও উত্তম চরিত্রের দিকে আগ্রসর হতে উৎসাহিত করে। যে সমাজে ইসলামী শাস্তি প্রয়োগ করা হয় না সে সমাজ নিয়ে পর্যাবেক্ষণকারী লক্ষ্য করবে যে, সেখানে অপরাধ প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা সমাজের লোকদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করছে। পক্ষান্তরে নববী সমাজ পর্যাবেক্ষণকারী লক্ষ্য করবে যে, অপরাধ প্রবণতা সেখানে হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি যখন আবু বকর রাঃ খেলাফতের সময় উমর রাঃ বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন এক বছরে একটি বিচারের আবেদনও করা হয়নি। বর্তমান সময়ে রাজকীয় সৌদি আরব তার বড় প্রমাণ, যেখানে মানুষেরা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা উপভোগ করছে যা এর জনগণের জন্য আরামদায়ক ও শান্তিময় জীবন নিশ্চিত করছে।

চতুর্থতঃ প্রচার মাধ্যমগুলোর সঠিক ব্যবহার:
মিডিয়াকে তার বিভিন্ন পঠন ও শ্রবণযোগ্য মাধ্যমগুলোতে শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্রভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়, বিশেষত বর্তমান সময়ে যখন তার সাথে যোগাযোগ ও তথ্যের প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে এমনকি তা ঘরের গোপন বিষয় প্রকাশ করতে ও যা ইচ্ছা তা প্রচার করতে সক্ষম হচ্ছে।

যেহেতু এগুলো মাধ্যম তাই তার হুকুম হল, তাতে যা ভাল বা মন্দ প্রচার করা হয় সে অনুযায়ী। আর তার পরিণতি কখনো ভাল হয় বা কখনো খারাপ হয় তাতে উপস্থাপিত বিষয়ের আলোকে। সুতরাং তা কল্যাণের সুবাতাস ও উন্নত চরিত্রের প্রচার এবং খারাপ ও মন্দ আচরণ প্রতিরোধের মাধ্যম যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় ও ইসলামের সঠিক দিক-নির্দেশনা পেশ করা হয়।

মন্দ চরিত্র ও বিচ্ছিন্নতার আস্তানা থেকে মানবতাকে বাঁচাতে ইসলামই হল সঠিক মানহাজ। কাজেই এর উপর ভিত্তি করে ইসলামী মিডিয়া গড়ে তোলা আবশ্যক যা নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করবেঃ
১- ইসলামের দিকে আহ্বান।
২- নির্দেশনা ও নসীহার ব্যাপারে সততা অবলম্বন।
৩- অশ্লীলতা প্রচার থেকে দূরে থাকা।

এর ফলে পৃথিবীর সকল স্থানে সংশোধনমূলক দাওয়াতের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে, তাকে কোন শত্রু বা হিংসুক বাধা দিতে পারবে না।

সীমালঙ্ঘনকারীরা দায়ীদেরকে মানুষদের নিকট আল্লাহর আহবান পৌছাতে বাধা দেয়। সুতরাং মিডিয়গুলো এই বন্দীত্বকে শেষ করে দিয়েছে। কাজেই তাওহীদের বাণী ও তার ফযিলত কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই প্রচার করা যায়। এখানে সীলঙ্ঘনকারী ও শত্রুরা আক্রমণ করতে পারে না। তাই যদি মুসলিম সমাজে এই মিডিয়াগুলো সঠিক ব্যবহার করা হয় তবে তা হবে সমাজ ও ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তারকারী সবচেয়ে সফল ও কার্যকরী মাধ্যম। শরীয়ত সম্মত চ্যানেল প্রতিষ্ঠার দ্বারা বিশ্ববাসীর নিকট তাওহীদের বাণী ও তার আলো প্রচার করবে এবং এমন মানহায প্রচার করবে যা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ বাস্তবায়ন করবে, এর মাধ্যমে অকল্যাণ ও মন্দ আচরণের বন্ধনকে ছিন্ন করবে; যা বর্তমান ইসলামী সমাজের মূলকে আতঙ্কিত করছে।

পঞ্চমতঃ মসজিদগুলোর সঠিক ব্যবহার:
এই উম্মতের উপর আল্লাহর তায়ালার একটি অন্যতম নিয়ামত হল তিনি তাদের জন্য মসজিদে জামাতে সালাত আদায়ের বিধান দিয়েছেন; যে মসজিদ হল দাওয়াতের কেন্দ্র, দিক-নির্দেশনার মিম্বার যা অন্তরকে কল্যাণের মাধ্যমে আবাদ করে এবং তা হতে জাহেলিয়াতের চরিত্র, পাপাচারের অন্ধকার ও তার দূর্বিপাককে দূরীভূত করে।

অনুরূপভাবে আরেকটি নিয়ামতে হল তিনি জুমার দিনে খুতবার বিধান দিয়েছেন, যার মাধ্যমে একজন খতিব মানুষকে দিক-নির্দেশনা, সঠিক বিষয়ে বর্ণনা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে সক্ষম হবেন; আলেমের হিকমতের সাথে এবং তাদের প্রতি দয়াদ্র হয়ে ও তাদেরকে ভালবেসে। জাবের রাঃ কর্তৃক বর্ণিত নবী সাঃ এর খুতবার বিবরণে এসেছে, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কণ্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোন সেনাবাহিনীকে সতর্ক করে বলছেন: তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো।)

একজন খতিবের কর্তব্য হল সে সমাজের সমস্যা ও তাতে প্রচলিত খারাপ চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানবে, যাতে তাদের নিকট শরীয়তের হুকুম এবং ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মতের উপর দুনিয়া ও আখেরাতে এর ভয়াবহতা বর্ণনা করতে পারে। তবে তা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলবে না। কেননা সাধারণভাবে বললে নির্দিষ্ট করে বলার প্রয়োজন হয়না। কারণ মিম্বারে কারো প্রকাশ্য সমালোচনা ও দোষ বর্ণনা শ্রোতার সাথে অসৌজন্যতার ও অপরাধীকে ধমক দেয়ার শামিল, যা তাকে নসীহা গ্রহণ না করতে ও পাপে ডুবে থাকতে উৎসাহিত করে।

দুইটি বিষয় থাকলে খুতবা কাঙ্খিত ফলাফল দিতে পারে:
এক: খতিবের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ঃ
১- সে উত্তম আদর্শ হবে এবং মানুষের মাঝে এ বিষয়ে সুপরিচিত হবে। কেননা যার কাছে কিছু নেই সে দেয়ার ক্ষমতা রাখে না।
২- ভাষা ও উপস্থাপনার দিকে থেকে খুতবার জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি নিবে।
৩- খুতবা হবে বিষয় ভিত্তিক।
৪- খুতবায় পর্যাপ্ত পরিমাণ কুরআন-সুন্নাহ, আলেমদের উক্তি ও তাদের জীবনী থাকবে।
৫- খতীব খুতবা দীর্ঘ করবে না বা কারো কন্ঠ নকল করবে না।
৬- খুতবা ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ ও মন্দ বিষয় হতে ভীতি সম্বলিত হবে এবং তা সমাজের সমস্যার সমাধান করবে যার অন্যতম হল মন্দ চরিত্র।

একই সাথে খুতবার ক্ষেত্রে মুসল্লীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়:
১- সকাল সকাল মসজিদে উপস্থিত হওয়া।
২- চুপ করে বসা ও মনোযোগ সহকারে খুতবা ও খুতবার দিক-নির্দেশনা শ্রবণ করা। নবী সাঃ বলেছেন: (তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে জুম'আর দিবসে ইমাম খুৎবা দেয়ার সময় বল চুপ কর, তাহলে তুমি অনর্থক কথা বললে।)

এজন্য ইমামের উচিত খুতবা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মুসল্লীদেরকে চুপ করে খুতবা শোনার প্রতি আকৃষ্ট করা।

অন্য দিক থেকে মসজিদ শিক্ষণীয় কার্যকরী দায়িত্ব পালন করতে পারে, যেমনঃ
ক- শরয়ী ইলমের দারস প্রদান।
খ- দিক-নির্দেশনামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করা যেখানে মানুষদেরকে ভাল কাজে উৎসাহিত করা হবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা হবে।
গ- কুরআনুল কারীমের হালাকার ব্যবস্থা করা, কেননা কুরআন চরিত্রের সংবিধান ও অন্তরের চিকিৎসক, এর মাধ্যম উম্মত সুখী হবে এবং তা বর্জনে মানুষেরা হতভাগা হবে।
ঘ- শরয়ী কিতাব সম্বলিত লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা, যার দায়িত্ব পালন করবে কোন আলেম বা ছাত্র এবং ছাত্র-শিক্ষক ও মূর্খ সকলের জন্য সেবা দিবে।
ঙ- মসজিদে একটি চ্যারিটেবল প্রতিষ্ঠান থাকবে, যা ধনীদের থেকে সম্পদ সংগ্রহ করবে। ফলে তা দরিদ্রদের জন্য প্রশান্তির মাধ্যম হবে, যা তাদেরকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে রক্ষা করবে এবং মন্দ চরিত্র থেকে হেফাযত করবে।

মসজিদ যদি এই মহান দায়িত্বগুলো পালন করে তবে তা সমাজ থেকে খারাপ আচরণের মূলোৎপাটন করতে এবং ও উত্তম চরিত্রের বিস্তারে অবদান রাখবে। অনুরূপভাবে তা উত্তম জাতী গঠনে ভুমিকা রাখবে, মানব জাতীর জন্য যাদেরকে বের করা হয়েছে।

ষষ্ঠতঃ মনের বিরুদ্ধে জিহাদ:
মনের মাঝে অকল্যাণ ও বিচ্যুতির প্রতি আকর্ষণ রয়েছে, আর এগুলোকে মানুষের নিকট সুশোভিত করে দেখায় মানব ও জিন শয়তান। সুতরাং যদি স্বীয় প্রচেষ্টা না থাকে তবে মন সে দিকে আকৃষ্ট হয়; তাই মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হল সর্বোচ্চ জিহাদ। যদি মন ভাল চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হতো এবং প্রবৃত্তি ও তার আকর্ষণ দ্বারা প্রভাবিত না হতো তবে মনের জিহাদের কোন অর্থ থাকত না। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ﴿ [নিশ্চয় মানুষের নাফস খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়েই থাকে।]

মনের মাঝে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তার সাথে হিংসা করে, তার হক নষ্ট করার মাধ্যমে যুলুম করার প্রতি আকর্ষণ থাকে। মনের মাঝে নিজের প্রতি যুলুম করার আগ্রহ থাকে, খারাপ প্রবৃত্তি যেমন যিনা ও হারাম ভক্ষণে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে। তাইতো যে কখনো এমন ব্যক্তির উপর যুলুম করে, যে তার প্রতি যুলুম করেনি। এই প্রবৃত্তিগুলো তার উপর প্রভাব বিস্তার করে যদিও অন্য কিছু না করে। সুতরাং যখন দেখে যে তার সমপর্যায়ের কেউ যুলুম করছে বা এই প্রবৃত্তিগুলো গ্রহণ করছে তখন তার মাঝে এতে জড়িত হতে বা যুলুম করতে বেশি আগ্রহ জাগে।

তাই মনের নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ﴿ [আর যে তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।]

ইবনুল কায়্যিম রহঃ জিহাদকে চারটি স্তর বিভক্ত করেছেন: মনের বিরুদ্ধে জিহাদ, শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ, কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ।

মনের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি স্তরঃ
১- হেদায়েত ও সত্য দ্বীন শিক্ষার জন্য জিহাদ; যা ব্যতীত দুনিয়া ও আখেরাতে মনের কোন সাফল্য ও সৌভাগ্য নেই।
২- জ্ঞান শিক্ষার পর সে অনুযায়ী আমল করার জন্য জিহাদ।
৩- সে দিকে আহ্বান করার জন্য জিহাদ।
৪- দাওয়াতের পথে যে কষ্ট আসে তার উপর ধৈর্যধারণ করার জন্য জিহাদ।

শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ, এর দুটি স্তরঃ
১- বান্দার নিকট ঈমান বিধ্বংসী যে সন্দেহ ও শুবহাত আসে তা প্রতিহত করার জন্য জিহাদ।
২- তার যে খারাপ ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি জাগ্রত হয় তার বিরুদ্ধে জিহাদ।

মনকে উপযোগী করার প্রথম কাজ হল কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করা। কেননা সেটা কোন সহজ বিষয় নয়; তাই তার প্রতিদান মহান, তার পরিণতি কল্যাণকর এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তা বান্দার জন্য আনন্দদায়ক। আল্লাহ তায়ালা তাকওয়া ও ধৈর্যের সওয়াবের বিষয়ে বলেন: ﴾إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيעُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ﴿ [নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্যধারণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ মুসহিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।]

অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারাম কর্ম সম্পাদনে আল্লাহকে ভয় করবে এবং কষ্ট, বিপদ ও আদেশ পালনে ধৈর্যধারণ করবে, নিশ্চয় তা সৎকর্মের অন্তর্গত, আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।

সপ্তমতঃ দূরদৃষ্টি:
দুনিয়া পরবর্তী বিষয়ে দূরদৃষ্টি মন্দ চরিত্র পরিহার ও উত্তম চরিত্র গ্রহণে শক্তিশালী ও কার্যকরী অনুঘটক। পক্ষান্তরে অদূরদর্শিতা, দুনিয়ার সম্ভোগে দ্রুততা ও বিচ্যুত প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করা তার দূরদৃষ্টির অভাবের পরিচায়ক, যেমনটি দুর্বল ঈমানের লোকদের হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا * وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ﴿ [কিন্তু তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।]

আর এর চিকিৎসা হল যা এই খারাপ চরিত্রকে প্রতিহত করবে ও তাকে সমূলে উৎপাটিত করবে, তা হল এই জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাস যে দুনিয়া হল পরীক্ষাগার ও অস্থায়ী। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَنَبْلُوَنَّকُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَبَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴿ [আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরিক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে। যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।] তিনি আরো বলেন: ﴾الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ﴿ [যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য—কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴾إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا﴿ [নিশ্চয় যমীনের উপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কাজে কে শ্রেষ্ঠ।]

সুতরাং যমীনের উপর যা কিছু আছে সুস্বাদু খাদ্য ও পানীয়, সুন্দর পোষাক, গাছপালা, নদীনালা, ক্ষেত, ফলমূল, আকর্ষণীয় দৃশ্য, চিত্তাকর্ষক বাগান, শব্দাবলী, আকর্ষণীয় চিত্র, স্বর্ণ, রোপ্য, ঘোড়া, উট ইত্যাদি এই সবগুলোকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার জন্য শোভা বানিয়েছেন এবং তাদের জন্য পরীক্ষা ও ফেতনা স্বরূপ করেছেন। তা সত্বেও আল্লাহ তায়ালা এগুলোকে বিনাশ করবেন এবং যমীন পুনরায় তৃণবিহীন ভূমিতে পরিণত হবে।

সুতরাং মানুষ যখন এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে এবং তার প্রতি ঈমান রাখবে, তাহলে কি সে অদূরদর্শী হতে পারে এবং আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার এই কষ্টদায়ক প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে?! মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا * حَدَائِقَ وَأَعْنَبًا * وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا * وَكَأْسًا دِهَاقًا * لَّا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا كِذَّابًا * جَزَاءً مِّن رَّبِّكَ عَطَاءً حِسَابًا﴿ [নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য আছে সাফল্য, উদ্যানসমূহ, আঙ্গুরসমূহ, আর সমবয়স্কা উদভিন্ন যৌবনা তরুণী এবং পরিপূর্ণ পানপাত্র। সেখানে তারা শুনবে না কোন অসার ও মিথ্যা বাক্য; আপনার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, যথোচিত দানস্বরূপ।]

সুতরাং ইসলামী শিক্ষার মানহায তার অনুসারীদের নিকট থেকে প্রত্যাশা করে যে, তারা ভবিষ্যতের দিকে ও ভবিষ্যতের আনন্দের দিকে দৃষ্টি দিবে এবং অস্থায়ী দুনিয়া ও তার কষ্ট হতে দূরে থাকবে। তারা প্রবৃত্তি ও তার যন্ত্রণাদায়ক প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করবে যেন স্থায়ী স্বাদ আস্বাদন করতে পারে; যা প্রেমময়ী, দয়াশীল ও ক্ষমাশীল রবের নিকট শেষ হয় না।

টিকাঃ
(১) আদাবুদ দুনিয়া ওয়া আদদ্বীন পৃঃ (২৮)।
(২) সূরা আল-ফাতির: (২৮)।
(৩) তাফসীরে সাদী (৪/২১৬)।
(৪) মিফতাহু দারীস সায়াদা (১/৫২)।
(১) সূরা আল-আনফাল: (২৪)।
(২) আল-জামে লি আহকামিল কুরআনঃ (৭/২৪৭)।
(৩) আল-জাওয়াবুল ইজতেমায়িয়া আয-যহেরাতিল ইদমান (২/৮২)।
(৪) পূর্বোক্ত (২/১২৭)
(১) সহীহ বুখারী (৩/৪৬৩, হাঃ ৫৫৩৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০২৬, হাঃ ১৪৬-২৬২৮)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৬৮, হাঃ ৪৮৩৩), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন, সিলসিলা সহিহা (২/৬৩৩, হাঃ ৯২৭)।
(৩) আল-আখলাক ওয়া আস-সিরা, পৃঃ (২৪)।
(৪) সূরা আল-ফুরকানঃ (২৭-২৯)।
(৫) ইকতেযাইস সিরাত আল-মুস্তাকিম পৃঃ (২৫)।
(৬) আল-জাওয়াবুল ইজতেমায়িয়া আয-যহেরাতিল ইদমান (২/৯০)।
(১) সূরা আল মায়েদাঃ (৪৪)।
(২) সূরা আল মায়েদাঃ (৪৫)।
(৩) তাফসীরে সাদী (১/৪৮৮-৪৮৯)।
(৪) আত-তারবিয়া ইসলামিয়া ওয়া দাওরুহা ফি মুকাফাহাতিল জারিমা পৃঃ (২২৪)।
(৫) সহীহ মুসলিম (৩/১৩১৫, হাঃ ১/১৬৮৮)।
(৬) সূরা আন-নূরঃ (২)।
(১) ইলমু ইজতেমায়ীল ইকাব (১/১১৫)।
(২) ওকী বিন হিব্বান রচিত, আখবারুল কুযা (১/১০৪)।
(১) সহীহ মুসলিম (২/৫৯২, হাঃ ৮৬৭)।
(২) মিম্বারুল জুমআ, আমানাহ ওয়া মাসউলিয়াহ পৃঃ (২১)।
(১) দেখুনঃ মিম্বারুল জুমআ, আমানাহ ওয়া মাসউলিয়াহ।
(২) সুনানে আবু দাউদ (১/৬৬৫, হাঃ ১১১২)।
(১) সূরা ইউসুফঃ (৫৩)।
(২) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, পৃঃ (৪০-৪১)।
(৩) সূরা আন-নাযিয়াতঃ (৪০-৪১)।
(১) সূরা ইউসুফঃ (৯০)।
(২) তাফসীরে সাদী (২/৪৩৪)।
(১) সূরা আল-আলাঃ (১৬-১৭)।
(২) সূরা আল-বাকারাঃ (১৫৬)।
(৩) সূরা আল-মুলকঃ (২)।
(৪) সূরা আল-কাহাফঃ (৭)।
(৫) তাফসীরে সাদী (৩/১৪৩)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px