📄 চারিত্রিক বিচ্যুতির কারণসমূহ
প্রকৃতি ও পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে চারিত্রিক বিচ্যুতিসমূহও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। ব্যক্তি ও সমাজের উপর তার বিপদ ও ক্ষতির ভিত্তিতে এর প্রভাব কম বেশি হয়ে থাকে। অপর দিক থেকে সমাজের ভিন্নতার কারণেও চারিত্রিক বিচ্যুতির ভিন্নতা হয়ে থাকে; বিচ্যুতির উপকরণসমূহের শক্তির তারতম্যে কারণে। যেমন দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের দূর্বলতা, বিচ্যুত আক্বীদা, সামাজিক প্রতিপালন, অর্থনৈতিক অবস্থা, সাংস্কৃতি স্নায়ু যুদ্ধের প্রভাব, লালন-পালনের ধরণ ইত্যাদি অন্যান্য উপকরণসমূহ। যখন এগুলোর নেতিবাচক প্রভাব বেড়ে যায় তখন বিচ্যুতির পরিমাণও বৃদ্ধি পায় এবং তা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে।
মানুষের চারিত্রিক বিচ্যুতির কারণ হিসেবে কোন একটি নির্দিষ্ট কারণকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তবে এ কারণগুলো তার প্রভাবের শক্তি বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট কারণগুলোর প্রতিরোধ বা গুরুত্বারোপ জীবনের কোন একটি নির্দিষ্ট দিকের উপর ভিত্তি করে সম্ভব নয়। কেননা বিচ্যুতির কারণসমূহ ভিন্ন ভিন্ন, উদাহরণস্বরূপ সন্তানের উপর পিতার ইতিবাচক বা নেতিবাচক আচরণের প্রভাব রয়েছে। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রতিটি নবজাতকই জন্মলাভ করে ফিতরাতের উপর। এরপর তা মা-বাপ তাকে ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে।) অনুরূপভাবে বন্ধুর উপর বন্ধুর প্রভাব রয়েছে, যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।)
কাজেই বিচ্যুতির ঘটনাটি অবশ্যই একাধিক কারণের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরী হতে হবে এবং বিচ্যুতির ঘটনাটি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। যেন এটি একটি আক্বীদাগত, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং পরিপালনগত ইত্যাদি সমস্যার সাথে সম্পর্কিত সকল কিছু নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়। সুতরাং চারিত্রিক বিচ্যুতির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কারণগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা আবশ্যক। কেননা মূল কারণ জানা গেলে চিকিৎসা দেয়া ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হয়।
এই পরিচ্ছেদে আমরা যে কারণগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করব সেগুলো হল:
১- দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাব।
২- মনস্তাত্ত্বিক অসঙ্গতি।
৩- আর্থিক কারণসমূহ।
৪- সামাজিক পরিবেশ।
প্রথমতঃ দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাবঃ
নিঃসন্দেহে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাব চারিত্রিক বিচ্যুতির অন্যতম ও প্রধান কারণ। কেননা এ অবস্থায় মানুষ হঠাৎ মৃত্যু বা কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। সুতরাং সেই দিনের উপভোগে তার চিন্তা নিবন্ধিত যা প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণে, ভোগের গণ্ডিতে এবং বিচ্যুতির স্রোতের অধীনে; যা তাকে ডানে বামে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাইতো তার নিকট ভাল-মন্দ একাকার হয়ে গেছে। আর তার চাহিদের স্রোত যেদিকে প্রবাহিত করে সে সেই প্রবাহের অধীন। ফলে তা তাকে খারাপের দিকে নিয়ে যায়। ফলস্বরূপ তার মাঝে উদাসীনতা, মন্দ চিন্তা ও বিকৃত আচরণের প্রাদুর্ভাব ঘটে। যা তার জন্য বিচ্যুত আচরণ করা ও তার দিকে অগ্রসর হওয়াকে সহজ করে দেয়। নিচের পয়েন্টগুলো থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবেঃ
বিচ্যুতি ও উদাসীনতাঃ
উদাসীনতা হল: অসতর্কতার দরুণ মানুষের মাঝে যে অন্যমনস্কের সৃষ্টি হয়। যখন মানুষের এরূপ অবস্থা হয় তখন তার মাঝে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়। আর মানুষের নিকট যখন দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায় তখন তার ইন্দ্রীয়গুলোকে মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য তথা ভাল কাজ, সত্য শ্রবণ, জ্ঞানার্জন ও সতর্কতায় ব্যবহারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সে চতুষ্পদ জন্তুর মত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ﴿ [আর আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।] মহান আল্লাহ আরো বলেন: ﴾وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْرَمَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ * يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ﴿ [এটা আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যাতিক্রম করেন না, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, আর তারা আখিরাত সম্বন্ধে গাফিল।] অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার উপার্জন বিষয়ক জ্ঞান আছে। কাজেই তারা তা অর্জনে অধিক মেধাবী কিন্তু দ্বীনি বিষয় এবং পরকালে যা তাদের উপকারে আসবে সে বিষয়ে তারা গাফিল।
সুতরাং এটাই তার পথ ও পন্থা। কেননা শয়তান তার বন্ধু। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ﴿ [আর যে রহমানের যিক্র থেকে বিমুখ হয় আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সে হয় তার সহচর।] অর্থাৎ এই ব্যক্তি যে হেদায়াতের পথ থেকে গাফিল ছিল, আমি তার জন্য শয়তানকে নিযুক্ত করে দিব, যে তাকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জাহান্নামের পথে নিয়ে যাবে।
যে সমস্ত কারণ মানুষকে গাফলতির দিকে নিয়ে যায় তার অন্যতম হল, জায়েয কাজে শিথিলতা ও অধিক পরিমাণে তাতে মগ্ন থাকা। ফলে তা গাফলতির অবির্ভাব ঘটায়, যা অধিক আশাবাদী হওয়ার কারণ। ফলস্বরূপ সে পাপ কাজের দিকে অগ্রসর হয়। এ সকল গাফেলরা তাদের গাফলতির প্রভাবে খারাপ কাজে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয় না। ফলে তাদেরকে দেখবেন যে, তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে, তা উপভোগ করছে ও তাতেই তারা আনন্দিত। আর এ সবগুলোই হয়ে থাকে অন্তরে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের বা একেবারে নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে।
দ্বীন নষ্ট হয় হয়ত বাতিল বিশ্বাস ও সে অনুযায়ী কথা বলার কারণে অথবা বিশ্বাসের বিপরীত আমল করার কারণে। প্রথম ধরণ হল বিদআত, আর দ্বিতীয় ধরণ হল, ফাসেকী আমল। প্রথমটি হয়ে থাকে সন্দেহের কারণে আর দ্বিতীয়টি হয়ে থাকে প্রবৃত্তির কারণে। ইসলামী শিক্ষার ভুমিকা হল ভুল বিশ্বাসের রাস্তাকে বিশুদ্ধ করা যেন মানুষেরা সঠিক আচরণের দিকে ফিরে আসে। কেননা মানুষের অন্তরে একনিষ্ট দ্বীন ও বিশুদ্ধ আকিদা না থাকলে তার অকল্যাণ ও ফাসাদের পরিমাণ ব্যাপক আকার ধারণ করে, ফেতনা বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যবোধ ধ্বংস হয়। ফলে বাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রতারণা ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে কোন সততা, প্রতিশ্রুতিশীলতা, আমানতদারিতা ও লজ্জাবোধ থাকে না। কেননা তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধকে নষ্ট করেছে; আর তা হল আংশিক নয় বরং সম্পূর্ণরূপে এবং শুধু কথায় নয় বরং বাস্তবে আল্লাহর মানহাজকে গ্রহণ করা।
বিচ্যুতি ও অস্থিরতাঃ
মানসিক অস্থিরতা ও দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাবের মাঝে জোড়ালো সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি কিছু মানসিক রোগ ব্যক্তির মাঝে চারিত্রিক বিচ্যুতি ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ সাইকোপ্যাথি রোগ। তা এমন অসুস্থ অবস্থা যা পুনরাবৃত্তিমূলক আবেগপ্রবণ আচরণে নিজেকে প্রকাশ করে, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সমাজকে তুচ্ছ মনে করে এবং এর প্রতি শত্রুতা প্রকাশ করে। যেহেতু ভুক্তভোগী নিজেকে নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা বা বঞ্চনা ও হতাশার সম্ভাবনায় ভুগছেন। তাই তিনি দুনিয়াবী আনন্দগুলি স্থগিত করতে অক্ষম, বরং তার চাহিদা এবং উদ্দেশ্যগুলি মেটাতে দ্রুত অগ্রসর হয়।
মানুষের চারিত্রিক বিচ্যুতি সংঘটনকারী এই মানসিক উপসর্গগুলো নিয়ে গবেষণাকারী ব্যক্তি লক্ষ্য করবে যে, এই উপসর্গগুলো মূলত মানসিক প্রশান্তি যা মানুষকে এই প্রভাবগুলো মোকাবেলা করার সুযোগ করে দেয় তার অভাবে সৃষ্ট। আর এটা মানসিক প্রশান্তি ও আস্থার কারণগুলোর সাথে সম্পর্ক কম থাকার কারণে হয়ে থাকে। মূলত যা আল্লাহর প্রতি শক্তিশালী ঈমানের প্রমাণ বহন করে। তাইতো এর পরে সে কোন ক্ষতি ও বিপদের আশঙ্কা করে না। কেননা জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যেখানে মানুষ আল্লাহর অভিমুখী হতে বাধ্য, চায় সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন। বস্তুত জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যা পুরো জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, এ অবস্থায় কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসীগণই স্থির থাকতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴿ [যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।] তিনি আরো বলেন: ﴾فَمَن يُؤْمِن بِرَبِّهِ فَلَا يَخَافُ بَحْسًا وَلَا رَهَقًا﴿ [সুতরাং যে ব্যক্তি তার রবের প্রতি ঈমান আনে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না।]
বিচ্যুতি ও অমূলক কল্পনাঃ
কিছু মানুষের দ্বীনের ব্যাপারে কুধারণা সৃষ্টি হয়েছে, তারা মনে করে যে, দ্বীন হল আমল ব্যতীত শুধু মৌখিক স্বীকৃতি, অথবা দ্বীন আমলের সমষ্টি কিন্তু তা যখন যেভাবে ইচ্ছা আদায় করা যাবে। এদেরকে তাদের ধারণা বিচ্যুতি ও নিম্ন চরিত্রের দিকে নিয়ে যায়। কেননা তারা মনের চারিত্রিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। যদি প্রকৃত ধারণার ক্ষেত্রে তাদের অন্তর ও দৃষ্টি সতর্ক হত এবং তাদের কল্পনা সঠিক হত, তবে অবশ্যই তাদের চরিত্র সংশোধন হত। জাহেলী যুগে নষ্ট চরিত্রের ব্যাপকতা ছিল; যেমন মেয়ে সন্তানকে জীবিত প্রোথিত করা, মদ পান ও যিনা করা। কিন্তু যখন তারা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল এবং মেনে নিল যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই, তখন তাদের এসকল চরিত্র পরিবর্তন হয়ে গেল। ফলে তারা পথ হারানোর পর পথ পেল, অধঃপতনের পর তারা সমুন্নত হল, চরিত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তারা উন্নত চরিত্রের অধিকারী হল, পৃথিবী সংকীর্ণ হওয়ার পর প্রশস্ত হল, তাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেল ও তাদের মধ্য থেকে আমিত্ববাদ দূরীভূত হল। আর যুলুমের স্থল ভ্রাতৃত্বে পরিবর্তিত হল। এই সবগুলোই হয়েছিল তাদের আক্বিদাগত ও ইবাদতগত ধারণা বিশুদ্ধ হওয়ার পর। ফলে তাদের মধ্য থেকে বিচ্যুতি বিদায় নিল এবং সে স্থানে উত্তম চরিত্র আগমন করল।
মাঠ পর্যায়ে গবেষণার আলোকে বিচ্যুতিঃ
মিসরে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সাথে বিচ্যুতির সম্পর্ক কত গভীর। আর চারিত্রিক বিচ্যুতির পিছনে দুর্বল দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যেঃ
১- চুরির অপরাধের সাথে জড়িত বেনামাযির পরিমাণ ৭১.৮%।
২- বেরোযাদার চুরির সাথে জড়িত অপরাধীর পরিমাণ ৫৩.৫%।
৩- আরেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইস্কান্দারিয়ার বিচারালয়ে আগত বিচ্যুত ঘটনাসমূহের সাথে জড়িত সকলেই আক্বিদাকে একটি প্রচলিত ধারণা বলে বিশ্বাস করে এবং তাদের মাঝে একজনকেও পাওয়া যায়নি যে দ্বীনি ফরয বিধানসমূহকে পরিপূর্ণভাবে পালন করে। আর এটাই চারিত্রিক বিচ্যুরিত পিছনে দুর্বল দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের দৃঢ় সম্পর্ককে প্রমাণ করে।
অনুরূপভাবে টেকনোলজিতে আগ্রগামী বিশ্বের সমাজে চিন্তাগত চরম সমস্যা বিদ্যমান। যেমন, বিভিন্ন রূপে ও প্রকারে জাতিগত ও অর্থগত বিবাদ, বিকৃত চিন্তা, নষ্ট চরিত্র এবং অত্যাচার। এ সকল বিচ্যুতিগুলো প্রকাশ পেয়েছে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতিতে। আর প্রত্যেক ব্যক্তি এমনভাবে চলাফেরা করে যেন সে নিজেই চারিত্রিক মূল্যবোধের মাপকাঠি।
দ্বিতীয়তঃ মানসিক অসঙ্গতি
নফস বা আত্মা মৌলিক দিক থেকে এক, তবে তার অবস্থাগত দিক থেকে তিন প্রকার: নফসে মুতমাইন্না, নফসে আম্মারা বিস-সু ও নফসে লাওয়ামা। সুতরাং আত্মা যদি আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়, তাঁর যিকিরে প্রশান্তি পায়, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁর সাক্ষাতে আগ্রহী থাকে ও তাঁর নৈকট্য লাভে আনন্দিত হয়, তবে তা নফসে মুতমাইন্না। আর যখন এর বিপরীত হয় তখন তা নফসে আম্মারা বিস-সু; তা এই ব্যক্তিকে প্রবৃত্তি অনুযায়ী খারাপ কর্ম ও বাতিল অনুসরণের আদেশ করে। ফলে তা সকল খারাপের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। তৃতীয় অবস্থা হল নফসে লাওয়ামা, এটা মুমিনের অবস্থা। সে নিজেকে প্রতিটি অবস্থার জন্য তিরস্কার করে ও সকল কাজে ঘাটতি মনে করে। ফলে সে লজ্জিত হয় ও আফসোস করে। পক্ষান্তরে পাপী সামনে অগ্রসর হতেই থাকে নিজেকে কখনো তিরস্কার করে না।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অন্তরের রোগ ও তার নিরাময়ের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং নবী সাঃ এর সুন্নাতেও তা বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ﴿ [তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী।] তিনি আরো বলেন: ﴾فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ﴿ [সুতরাং যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে আপনি তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিলিত হতে দেখবেন এ বলে, আমরা আশংকা করছি যে, কোন বিপদ আমাদের আক্রান্ত করবে।] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴾يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مّিনَ النّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا﴿ [হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর তাহলে পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।] তিনি আরো বলেছেন: ﴾يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِّمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ﴿ [হে মানবসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।] নবী সাঃ বলেছেন: (তারা জানেনা তো জিজ্ঞাসা করল না কেন? কেননা অজ্ঞতার চিকিৎসা হল জিজ্ঞেস করা।)
মানসিক অসঙ্গতিকে অন্তরের রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যা চারিত্রিক বিচ্যুতি ঘটায়। আর তা দুই প্রকারঃ
- অনুভূতি নষ্ট হয়ে যাওয়া।
- স্বাভাবিক চলাচল ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
এর উভয়টির অনুপস্থিতির কারণে কষ্ট ও শান্তি হয়। কেননা আনন্দের কারণ হল সামঞ্জস্যশীলতার অনুভূতি আর কষ্টের কারণ হল অসঙ্গতির অনুভূতি। অন্তরের রোগ দুর্বল দৃষ্টিভঙ্গি ও সংকীর্ণ দিগন্তের দিকে নিয়ে যায়। কেননা মানসিক প্রবৃত্তি ও চাহিদা এবং তার দুনিয়াবী কল্যাণের বৈশিষ্ট্য হল, তা মানুষের দূরদৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয় বা তাকে রাতকানা করে দেয় বা তার উপর কোন ধরণের পর্দা বিস্তার করে দেয়; এর ফলে মানুষ হককে বাতিল ও বাতিলকে হক হিসেবে দেখে, তার বিষয়গুলো গুলিয়ে যায় এবং যেকোন জিনিসের ধারণা তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়। এর এটা পর্দার পুরুত্ব অনুযায়ী হয়ে থাকে। ফলে তার মাঝে মানসিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়; পর্দা যে পরিমাণ তার দূরদৃষ্টিকে আড়াল করে সে অনুসারে।
মানসিক অস্থিরতাঃ
কিছু ব্যক্তি রয়েছে যাদের মাঝে বোধ শক্তির ক্ষেত্রে অস্থিরতা নেই, কিন্তু তাদের খারাপ আচরণ এমন নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত যায়, যে পর্যন্ত অস্থির বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিরা যেতে পারে না। তাদের কাউকে দেখা যায় এমন কিছু আচরণের সাথে জড়িত যা সঠিক চরিত্র ও বিশুদ্ধ স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরণের বিচ্যুত আচরণের অন্তর্গত হল, মাদক গ্রহণ ও তা প্রসার করা, সমকামিতা ইত্যাদি বিচ্যুত আচরণসমূহ। যার লক্ষণ হল, বিপদের সময়ে ভয়, অস্থিরতা, খাবার গ্রহণ থেকে দূরে থাকা ও ক্ষুধা মন্দা, চরম লজ্জাশীলতা, দ্রুত রাগান্বিত হওয়া, আনুগত্য না করা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা, দ্রুত বিভ্রান্ত হওয়া, কঠিন অভিমান, আক্রমণাত্বক শত্রুতার দিকে অগ্রসর হওয়া, দিবা স্বপ্ন দেখা, মিথ্যা বলা, মাঝে মাঝে চুরি করা ইত্যাদি। যেহেতু এসকল অস্থিরতার কোন ওষুধ পাওয়া যায় না সেহেতু তাদের চরিত্রের মাঝে বিপদজনক প্রভাব ফেলে।
মানসিক সঙ্গতিঃ
সঙ্গতি বলতে, ব্যক্তির চারপাশের সামাজিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা, যেখানে ব্যক্তি তার চারপাশের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করে নিতে সক্ষম এবং সে পরিবেশ ও সমাজে আপতিত সমস্যাগুলোকে সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে সক্ষম। আর মুসলিম ব্যক্তির ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারিত হবে ইসলামী মানহাজের আলোকে। সুতরাং মানসিক সঙ্গতি হল, একটি চলমান কর্মতৎপরতা যা আচরণ ও সামাজিক পরিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাতে পরিবর্তন পরিমার্জনের মাধ্যমে যেন ব্যক্তি ও পরিবেশের মাঝে ইসলামী মূলনীতির আলোকে ভারসাম্য তৈরী হয়।
সুতরাং ইতিবাচক মানসিক সঙ্গতি ব্যক্তি, সমাজ ও কর্মের মাঝে সামঞ্জস্যতার দাবী রাখে। যাতে ব্যক্তি উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অনুভব করে যা তাকে নিজ ব্যক্তিত্ব, সমাজ ও পেশা সম্পর্কে প্রশান্তি দেবে। ব্যক্তি যখন সঠিক পদ্ধতিতে এই তিনটি দিক তথা নিজ সত্ত্বা, সমাজ ও পেশার মাঝে সমন্বয় করতে পারে না তখন সে পরোক্ষ মাধ্যমে তা প্রকাশের চেষ্টা করে। সে নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে করে যে তা তাকে উচ্চমানের সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি এনে দিবে। এই পরোক্ষ মাধ্যমগুলোকে মানসিক আচরণ বিশেষজ্ঞরা (মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা কৌশল) বলে অভিহিত করেন। তা হল কতগুলো মাধ্যম ও উপকরণের সমষ্টি যা একজন ব্যক্তি বাস্তবায়ন করে। এগুলোর কাজ হল হাকিকতকে বিকৃত করা এবং কতগুলো যুক্তি দাঁড় করানো যেন ব্যক্তি অধঃপতন ও সংঘাত হতে সৃষ্ট অস্থিরতা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পায়; যা তার মনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। এর লক্ষ্য হল, নিজেকে রক্ষা করা, তার পক্ষ হতে প্রতিহত করা, মনের বিশ্বাসকে সংরক্ষণ করা, আত্মসম্মানবোধ রক্ষা করা ও মনের প্রশান্তি বাস্তবায়ন করা। পরবর্তীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, মানুষের নিকট হয়ত ইতিবাচক মানসিক সঙ্গতি অথবা অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক নেতিবাচক মানসিক সঙ্গতি রয়েছে। কেননা মানুষ যখন কোন সমস্যা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুভব করে, যেমন চাহিদা পূরণে অর্থের প্রয়োজনীয়তা তখন সে বুঝতে পার যে, এটা অর্জনের একমাত্র পথ হল, পরিশ্রম, ধৈর্যধারণ ও একটা ভাল মানের আয়ের উৎস। তাই সে সঞ্চয় করতে থাকে যাতে তার নিকট প্রয়োজীয় পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত হয়। কিন্তু যখন এটা পূর্ণ করতে পারে না, তখন সে আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। আর এটা তার চোখের সামনেই রাখে এ আশায় যে, আল্লাহ হয়ত কোন সুযোগ নিয়ে আসবেন। তাই সে এটা বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। এই ধরণের ব্যক্তির নিকট গ্রহণযোগ্য সঙ্গতি রয়েছে। কেননা তখনই এটা গ্রহণযোগ্য সঙ্গতি বলে গণ্য হবে, যখন ব্যক্তি সকল সম্ভবনা ও সাম্ভব্য ফলাফলের আলোকে তার সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। অতঃপর তা বাস্তবায়নের জন্য এমন পদ্ধতি গ্রহণ করবে যা ইসলামী মানহাজের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আর যখন মানুষ স্বীয় ক্ষমতা ও প্রস্তুতি অনুযায়ী তার সমস্যাগুলোর যথাপোযুক্ত সমাধান করতে অপারগ হবে, তখন সে কতগুলো (প্রতিরক্ষামূলক কৌশল) পদ্ধতি অবলম্বনের দিকে যাবে; যা এক ধরণের বাস্তবতাকে বিকৃত করা। মানুষ এগুলো করে থাকে নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যগুলো সাধনের লক্ষ্যেঃ
- ব্যক্তি তার অস্থিরতা অবস্থা ও তদসংশ্লিষ্ট পাপের অনুভূতি থেকে বেঁচে থাকবে।
- ব্যক্তি তার স্বীয় ব্যক্তিত্বকে রক্ষা করবে।
- প্রতিরক্ষা কৌশলের আড়ালে সে তার প্রবৃত্তি ও ভোগকে বাস্তবায়ন করবে।
প্রতিরক্ষা কৌশলসমূহঃ
তা হল ব্যক্তির প্রবঞ্চনার পথের আশ্রয় নেয়া যখন সে এমন বিপদের সম্মুখীন হয় যা সমাধান করার ক্ষমতা নেই, অথবা সে নিজে ভুল পথে চলে বুঝতে পেরে নিজেকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রবঞ্চনাকর দায়মুক্তির আশ্রয় নিবে। প্রতিরক্ষা কৌশলসমূহ নিম্নরূপঃ
যখন মানুষ অনুভব করবে যে, তার কাজটি আবশ্যকীয় কর্মের বিপরীত, তখন সে তার বিকৃত আচরণকে দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করবে কতগুলো খোড়া যুক্তির মাধ্যমে। এই যুক্তিগুলো নিম্নরূপঃ
১- যৌক্তিকতা অনুসন্ধানঃ যখন মানুষ তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিফল হবে, বা ওয়াজীব আদায় করতে ত্রুটি করবে, অথবা ভাল চরিত্রের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গিয়ে খারাপ আচরণ করবে, তখন সে তার এই আচরণকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য কতগুলো দুর্বল ওযর অনুসন্ধানের চেষ্টা করবে। যেন তার থেকে অভ্যন্তরীণ বা সামাজিক তিরস্কার দূরীভূত হয়। সুতরাং তা এমন কৌশল যা ব্যক্তি তার খারাপ আচরণকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য পেশ করে। উদাহরণস্বরূপঃ বেতন রয়েছে এমন কাজে যে ব্যক্তি তার নির্ধারিত পুরো সময় দেয়, আর মনে মনে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, অফিস তার ও তার সহকর্মীদের মাঝ ইনসাফ করেনি, অথবা কাজের তুলনায় বেতন কম বা তার অধিকাংশ সহকর্মীগণ তার চেয়ে কম পরিশ্রম করে ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের যুক্তি যা সে তার মনে প্রাশান্তি দেয়ার জন্য অনুসন্ধান করে থাকে।
২- অন্যের উপর দায় চাপানোঃ এর অর্থ হল, তার নিজের মনের মাঝে বিদ্যমান অনাকাঙ্খিত গুণাবলীকে অন্যের উপর চাপানো, সেটাকে বিরাট করে প্রকাশ করার পরে। সুতরাং মানুষ যখন কোন কাজ করে, অতঃপর বুঝতে পারে যে, এটি উত্তম চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক তখন তা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। অথবা যখন কোন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়, তখন তার কারণটা অন্যের উপর চাপায়। যেমন একজন ছাত্র বলল যে কঠিন প্রশ্নই আমার ফেল করার কারণ। বা কোন ব্যক্তি বলল যে, প্রয়োজনই এটা করতে বা পরিত্যাগে বাধ্য করেছে। অথবা অমুক ব্যক্তি আমার নিকট এটাকে সুশোভিত করেছে বা আমাকে ধোঁকা দিয়েছে।
৩- অন্যের রূপ ধারণঃ এটা অন্যের উপর দায় চাপানো বিপরীত। কেননা এই অবস্থায় ব্যক্তি অন্যের মাঝ বিদ্যমান ভাল গুণগুলোকে নিজের বলে প্রচার করে। সুতরাং সে নিজের জন্য অন্যের মাঝে বিদ্যমান ভাল বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধার করে। আর নিজেকে অন্য ব্যক্তির আকৃতিতে প্রকাশ করে যার মাঝে ঐ বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান। অথবা ব্যক্তি নিজেকে অন্য ব্যক্তি বা দলের সাথে মিলিয়ে ফেলে যাদের মাঝে আকর্ষণীয় গুণ রয়েছে, অথচ সে গুণ তার মাঝে নেই। অন্যের আকৃতি ধারণ করা তা যেকোন ভাবেই হোক না কেন, একটি ভুল পদ্ধতি ও মানসিক অসঙ্গতির খারাপ উদাহরণ। তা কয়েকটি উদাহরণ হতে স্পষ্ট হয়, যেমন কোন সমস্যায় পড়লে যেকোন সরকারী ব্যক্তির রূপ ধারণ করা, বা আলেম না হয়েও আলেমের রূপ ধারণ করা অথবা কোন দলের নেতার রূপ ধারণ করবে অথচ সে তার উপযুক্ত নয়।
৪- নেতিবাচক মনোভাবঃ তা হল প্রতিরোধমূলক কর্ম সাধন। তা হা-বোধক বা না-বোধক হতে পারে। তখনই হা-বোধক হবে যখন সে তার থেকে প্রত্যাশিত বিষয়ের বিপরীত কর্ম করে। আর না-বোধক হবে যখন সে প্রত্যাশিত কর্ম করা থেকে বিরত থাকে। সুতরাং তা দায়িত্ববোধ ও চাপের প্রতিরোধ যখন কোন ব্যক্তি প্রত্যাশার বিপরীত কর্ম করে, বা তা করা থেকে বিরত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, চুপ থাকা, প্রতিরোধ করা, বিরোধিতা করা, তর্ক করা, বিদ্রোহ করা, একগুঁয়েমি করা ও প্রত্যাখ্যান করা। কাজেই আপনি যখন এরূপ ব্যক্তির কাছ থেকে সুপারিশ চাইবেন অন্য ব্যক্তির নিকট থেকে কিছু অর্থ ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে, তখন সে মধ্যস্থতা করা থেকে বিরত থাকবে। এটা হল না-বোধক কর্ম। আর যদি সে ঋণদাতার নিকট ঋণ গ্রহীতার অবস্থানকে বিনষ্ট করতে চেষ্টা করে ও ঋণ প্রদান না করতে উৎসাহিত করে তবে সে দাবির বিপরীত কর্ম করল। মধ্যস্থতাকারী এই দুই ধরণের আচরণই তার মানসিক রোগের প্রমাণ বহন করে। এর কারণ হতে পারে সে ঋণগ্রহীতাকে অপছন্দ করে, বা তার সাথে হিংসা করে ইত্যাদি বিকৃত আচরণ।
৫- শত্রুতাঃ প্রতিরক্ষামূলক কৌশল কোন কোন সময় শত্রুতার রূপ ধারণ করে। আর তা হল কোন ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে আক্রমণ করা, যার মাধ্যমে ব্যক্তি যুক্তি পেশ করবে যে, ঐটা-ই মূল ঘটনার অনুঘটক এবং তার অক্ষমতার জন্য সে-ই দায়ী। এ ধরণের কৌশলগুলো ষড়যন্ত্র, নিন্দা, অবজ্ঞা বা বিদ্রূপ আকারে প্রকাশ পায়। এ সবগুলোই চারিত্রিক বিচ্যুতির রূপ, যার কোন গ্রহণযোগ্য যৌক্তিকতা নেই।
৬- পশ্চাৎপদতাঃ সাফল্যহীন আচরণ ও সঙ্গতি হতে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া যায়। বিশেষত মানুষ যখন এমন সমস্যার সম্মুখীন হয় যা সে মোকাবেলা করতে পারে না। যেমন প্রাপ্ত বয়স্ক লোক যখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের পথে চলে। তখন সে নিম্ন স্তরের দিকে ফিরে যায় প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে।
এ থেকে স্পষ্ট হল যে, মানুষ যখন তার ক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য করতে পারে না, তখন তার প্রয়োজন পূরণের জন্য বিকৃত ধরণের বিচ্যুত চরিত্রের দিকে অগ্রসর হয়। এ ক্ষেত্রে সে সহযোগিতা নেয় এমন সব প্রতিরক্ষা কৌশল ও যুক্তির, যার ছায়ার নিচে সে তার প্রবৃত্তি ও ভোগ চরিতার্থ করতে পারবে।
প্রতিরক্ষা কৌশলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ
ক- ব্যক্তির মনের ব্যাথা থেকে বেঁচে থাকা; নফসে লাওয়ামার প্রভাবের ফলস্বরূপ।
খ- অন্যদের সমালোচনা বা সম্ভাব্য সমালোচনা থেকে মুক্তি পাওয়া।
গ- মনের ব্যাথা থেকে রক্ষা পাওয়া যা একজন ব্যক্তি ব্যর্থতার কারণে বা সাফল্যহীন হওয়ার কারণে অনুভব করে।
প্রতিরক্ষা কৌশল বিদ্যমান থাকার কারণসমূহঃ
১. মানসিক যন্ত্রণাকে লুকিয়ে রাখা, বিকল্প প্রকাশের মাধ্যমে যা তার মনের মাঝে প্রবেশ করে। আর এটাই হল প্রতিরক্ষা কৌশল।
২. বাস্তবতা থেকে পলায়ন করা; তা মোকাবেলা করার ক্ষমতা না থাকার কারণে।
৩. ভুল ও নিষ্ফলতা মোকাবেলায় সহযোগিতাকারী সঠিক পূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ব্যর্থতা এবং পূর্বে এ ধরণের পরিস্থিতিতে পড়া থেকে বিরত থাকা।
৪. এটা পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সঠিক শিক্ষার অভাবের কারণে হয়ে থাকে।
দীর্ঘস্থায়ীভাবে প্রতিরক্ষা কৌশল প্রয়োগের ভয়াবহতাঃ
যদিও প্রতিরক্ষা কৌশল মনের অভ্যন্তরের কষ্টকে লাঘব করে; যা তাকে পর্যুদস্ত করে ও পীড়িত করে। তবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে তা প্রয়োগ ব্যক্তিকে ব্যর্থ, মিথ্যাবাদী ও অন্যদের মোকাবেলা করতে অক্ষম করে তোলে।
মানসিক অসঙ্গতির কারণসূহঃ মানসিক অসঙ্গতি যা তার মাঝে অস্থিরতা ও চারিত্রিক বিচ্যুতি নিয়ে আসে তার অন্যতম কারণ হল: উচ্চাকাঙ্খা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরশীলতা, অধিক পরিমাণে খাওয়া ইত্যাদি। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলঃ
১- আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরশীলতাঃ ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: সবচেয়ে লাঞ্ছিত মানুষ সে-ই ব্যক্তি যে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভর করে। কেননা এর কারণে তার যে সফলতা ও কল্যাণ হাতছাড়া হয়ে যায় তার পরিমাণ যা কিছু অর্জিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। আর সে ধ্বংস ও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ ব্যক্তির উদাহরণ হল মাকড়সার ঘর দ্বারা গরম ও ঠান্ডা থেকে আত্মরক্ষাকারীর ন্যায়। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরতার অরেকটি দিক হল, ইবাদত আদায়ে ত্রুটি করে অর্থের প্রতি ভালবাসা ও তা অর্জনের চেষ্টায় লেগে থাকা। অথবা মানুষ গণক, জাদুকর ও দাজ্জালদের কথার উপর নির্ভর করবে। এসকল কাজ মানসিক অস্থিরতার কারণ।
২- আকাঙ্খা করা ও তুষ্ট না হওয়াঃ মানব মনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, মালিকানার প্রতি ভালবাসা। এই বৈশিষ্ট্যের ফলস্বরূপ তার মাঝে উচ্চাকাঙ্খার বিষয়টি প্রকাশ পায়। যেহেতু মানুষ তার আশার কল্পনাকে অঙ্কন করে যদিও তা দুর্বল বিষয় হোক না কেন; সে ঐ পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম নয় আল্লাহ প্রদত্ত তার স্বাভাবিক ও সীমাবন্ধ ক্ষমতা দ্বারা, বিশেষ করে তার আকাঙ্খা যদি এমন হয় যা অর্জন করা দূরূহ। সে আশা করে বিশাল অট্রালিকা, সুন্দর বাহন, আরামদায়ক বিছান ও নেতৃত্ব। এমনকি তার আশার কারণে মন্দকে ভাল বলে ও কঠিনকে সহজ বলে মনে হয়। কাজেই মিথ্যা আকাঙ্খা ও বাতিল কল্পনা এর আরোহী কে নিয়ে খেলা করতে থাকে যেমন কুকুর মৃত দেহ নিয়ে খেলা করতে থাকে। আর এটাই প্রত্যক নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য আত্মার অবলম্বন। আর এই কাল্পনিক আকাঙ্খার ফলে বিচ্যুতি, পাপ, ক্লান্তি ও কষ্টে নিপতিত হয়।
৩- অধিক পরিমাণ খাবার গ্রহণঃ একজন ব্যক্তির অপচয় ও ব্যাপক পরিমাণে খাবার গ্রহণ তাকে আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় ও তাকে ব্যস্ত রাখে পেটের চাহিদা পূরণে। আর যখন তা পেয়ে যায় তখন তার ব্যয়পদ্ধতি ও তার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা তাকে ব্যস্ত রাখে। তার উপর প্রবৃত্তির উৎসগুলো, শয়তানের পথগুলো প্রভাব বিস্তার করে। যে শয়তান মানুষের শিরায় রক্তের মত প্রবাহিত হয়। আর যখন শয়তানের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধীনে প্রবৃত্তি উৎসগুলো শক্তিশালী হয় তখন মানুষ ভাল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে খারাপ পথে পরিচালিত হয়; তার অস্থির মনের চাহিদা পূরণের জন্য। বিশেষ করে যখন খাবারের পরিমাণ সংক্রান্ত ইসলামী শিক্ষা অনুপস্থিত থাকে। এ মর্মে রাসূল সাঃ বলেছেন: (মানুষ পেট হতে অধিক নিকৃষ্ট কোন পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে এমন কয়েক গ্রাস খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।)
তৃতীয়তঃ অর্থনৈতিক কারণসমূহ
মানব জীবনের উপর অর্থনীতির একটা বিরাট প্রভাব রয়েছে, তার দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণে এর ভূমিকার কারণে; যেমন খাদ্য, পানীয়, পোষাক, বাসস্থান ইত্যাদি আরো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খরচ। নিঃসন্দেহে ব্যক্তির আচরণে তার আর্থিক সমৃদ্ধি ও ঘাতটির প্রভাব রয়েছে। আর অর্থনীতির প্রভাব শুধুমাত্র যুব সমাজের উপর সীমাবদ্ধ নয়। বরং ছোট শিশুদের উপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে; পরিতৃপ্ত হওয়া বা বঞ্চিত হওয়ার দিক থেকে এবং অবহেলা বা দেখাশুনা ও নিরাপত্তা বা নিরাপত্তাহীনতা দিক থেকে। এই অনুচ্ছেদে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো আলাচনা করা হবে:
ক- বিচ্যুতির সহযোগিতাকারী অর্থনৈতিক কারণসমূহ, তা হল দুইটি কারণ দারিদ্রতা ও প্রাচুর্যতা।
খ- সে সমস্ত প্রভাবক যা দারিদ্রতা ও প্রচুর্যতার সাথে মিলিত হলে তা চারিত্রিক বিচ্যুতির উপর প্রভাব বিস্তার করে।
গ- অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তার প্রভাব। আর মানুষের জন্য কোনটি অধিক কল্যাণকর।
ক- বিচ্যুতির সহযোগিতাকারী অর্থনৈতিক কারণসমূহঃ
প্রথমতঃ প্রাচুর্যতা: প্রাচুর্যতার অর্থ হল নিয়ামতপূর্ণ ও বিলাসী জীবন। দুর্বল দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ, খেল-তামাশা ও অশ্লীলতার প্রসার, দুর্বল চারিত্রিক প্রতিপালনের সাথে অর্থিক প্রাচুর্য ও অধিক পরিমাণ নগদ অর্থের উপস্থিতি বিলাসী ব্যক্তিদেরকে খারাপ চরিত্রের দিক নিয়ে যায়; তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করার জন্য। নিম্নের পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে প্রাচুর্যের বিচ্যুতির বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করা সম্ভবঃ
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: ব্যক্তির নিকট অধিক পরিমাণে নগদ টাকার উপস্থিতি এবং সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে তাতে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত থাকা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ। আর এ কর্মটাই স্বয়ং উন্নত চরিত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া। শিল্প সমাজের বৈশিষ্ট্য হল একদিকে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ ও শিক্ষার উপর প্রভাব, অপর দিকে ব্যক্তি নিজেকে পরিবার থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তা করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে। সেখানে পতিতাবৃত্তি এবং পাপ ও অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ করার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। এই রোগগুলো যে কোন সমাজকে টুকরা টুকরা করে দেয়। কেননা প্রাচুর্যতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানবসমাজের সম্পর্ক নষ্ট করার সবচেয়ে শক্তিশালী ও নোংরা কারণ। প্রবৃত্তির চারণক্ষেত্রে ডুবে থাকা ও লোলুপ স্বভাবকে পরিতৃপ্ত করা আত্মমর্যাদা ও সম্মানবোধের অনুভূতিকে হত্যা করে এবং খারাপ চরিত্রকে তার অধঃপতিত জীবনের নিটক প্রিয় করে তোলে যা তাকে অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। ফলে সে সামাজিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে তার আর্থিক দিক ও উচ্চাভিলাষ পূরণে ব্যস্ত থাকে।
খেল-তামাশার জীবন: অর্থনৈতিক প্রাচুর্যতা অধিকাংশ সময় খেল-তামাশা ও চাহিদা পূরণে সময় নষ্ট করার দিকে নিয়ে যায়; যা দ্বীনি গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য ও আরামদায়ক স্থানের প্রভাবে হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে কিছু পরিবারের নিকট আর্থিক প্রাচুর্যতা ও বিনোদন মাধ্যমের উপস্থিতি অনেক সময় যুব সমাজকে চরিত্র নষ্টকারী হারাম বিনোদন উপভোগের দিকে নিয়ে যায়। ধনাঢ্য নারীদের বিনোদনকে জনৈক লেখক বর্ণনা করেছেন এইভাবে, মা একদল যিয়ারতকারীকে অভ্যর্থনা জানায় যেন তারা তাদের অধিকাংশ সময়কে তাস খেলা, স্বামী-স্ত্রী ও প্রেমিকদের সম্পর্কে বকবকানি করে এবং অর্থ ও জিনিসপত্র নিয়ে আলাপ করে সময় কাটাতে পারে।
মাদকদ্রব্যঃ যে ধনী ব্যক্তি ইসলামী শিক্ষার উপর গড়ে উঠেনি সে তার সম্পদ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে ব্যয় করে যদিও তা হারাম হয় না কেন। যেমন মাদক ও এ জাতীয় বস্তু। কাতারের অপরাধ বিশ্লেষণ অধিদপ্তর উপসাগরীয় দেশসমূহের মাদক গ্রহণ বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করে যাতে প্রমাণিত হয় যে, এর কারণ হল উপসাগরীয় দেশসমূহের আর্থিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যতা।
অহঙ্কার-অহমিকা: যে ব্যক্তি অর্থের সঠিক ব্যয় জানেনা তার নিকট অধিক পরিমাণ অর্থের উপস্থিতি তাকে হক থেকে বিচ্যুত করে দেয়। কেননা সে চিন্তা করে যে, সে এমন কিছুর মালিক যা অন্যরা খুজে ফিরছে। তাই অনেক সময় তা বাতিল পন্থায় ব্যয় করে, ফলে সে নিজে ও অন্যকে ইসলামী চরিত্র থেকে ভ্রষ্ট করে দেয়। সে এ সম্পদের মাধ্যমে কিছু মানুষকে অপদস্থ করে, তাদের উপর গর্ব করে এবং কল্যাণের পথের দায়ীদের সাথে শত্রুতা করে। কেননা অপচয়কারীরা সংশোধনকারী ও কল্যাণকামীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত থেকে পলায়ন করে ও তাতে বাধা দেয় এবং মানুষদেরকে এ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। রাসূলগণের দাওয়াত ও তাদের বাস্তব আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে, যা তারা পরিত্যাগ করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ كَافِرُونَ﴿ [আর আমি যে জনপদেই সতর্ককারী প্রেরণ করলেই সেখানকার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ আমরা তার সাথে কুফরী করি।] কারুন যাকে আল্লাহ তায়ালা এত ধনভান্ডার দান করেছিলেন যে, তার চাবি বহন করতে একদল শক্তিশালী লোক লাগত। যখন তাকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা এই সম্পদ দিয়ে আখেরাত অনুসন্ধান করতে ও দুনিয়ায় তার অংশ ভুলে না যেতে আহবান জানাল, তখন সে বলল আল্লাহ তাকে এই সম্পদ দিয়েছেন কারণ আল্লাহ জানেন যে, আমিই এর হকদার। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ * قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِندِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِن قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْتَلُ عَن ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ﴿ [আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং যমীনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না। সে বলল, এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে পেয়েছি। সে কি জানত না আল্লাহ তার আগে ধ্বংস করেছেন বহু প্রজন্মকে, যারা তার চেয়ে শক্তিতে ছিল প্রবল, জনসংখ্যায় ছিল বেশী? আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না।]
প্রাচুর্যতা ও যুলুমঃ আল্লাহর সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তির নিকট আনন্দের সময়ে সম্পদ থাকলে সে অনেক সময় তা বান্দাদের উপর যুলুম করার জন্য ব্যয় করে। এর মাধ্যমে সে উত্তম চরিত্র থেকে নিকৃষ্ট চরিত্রের দিকে যায়। কেননা প্রাচুর্যতা ও যুলুমের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যুলুম প্রাচুর্যের সাথেই থাকে এবং প্রাচুর্যতা যুলুমের অন্যতম কারণ। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّনْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ﴿ [অতঃপর তোমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের লোকসমূহ এমন প্রজ্ঞাবান কেন হয়নি, যারা যমীনে ফাসাদ করা থেকে নিষেধ করত? অল্প সংখ্যক ছাড়া, যাদেরকে আমি তাদের মধ্য থেকে নাজাত দিয়েছিলাম। আর যারা যুলম করেছে, তারা বিলাসিতার পেছনে পড়ে ছিল এবং তারা ছিল অপরাধী।]
দ্বিতীয়ত: দারিদ্রতাঃ
ফকির বলা হয়: যার কিছুই নেই বা তার ও তার অধীনস্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অর্ধেকের কম পরিমাণের মালিক। আর মিসকিন বলা হয়: যে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় জিনিসের অর্ধেক বা অধিকাংশের মালিক কিন্তু তার নিকট পর্যাপ্ত পরিমাণ নেই। অর্থাৎ তাদের উভয়েরই অতিরিক্ত আর্থিক উৎসের প্রয়োজন। আর নিঃসন্দেহে মানুষের আচরণের উপর দারিদ্রতার প্রভাব রয়েছে যদি তার মাঝে ঈমান ও সঠিক চরিত্র না থাকে। কেননা অনেক সময় বঞ্চিত দরিদ্রকে তার কষ্ট ও বঞ্চনা এমন আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে যা উত্তম ও সম্মানিত চরিত্রবানরা পছন্দ করে না- বিশেষ করে যদি তার প্রতিবেশীরা নিয়ামতপ্রাপ্ত বিত্তশালী হয়। রাসূল সাঃ দারিদ্রতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন, হাদিসে এসেছে, তিনি বলেছেন: (اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ) (হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কুফরী, দরিদ্রতা ও কবর 'আযাব হতে আশ্রয় চাই।) তিনি আরো বলেছেন: (اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ) (হে আল্লাহ! আমি দরিদ্রতা হতে, তোমার কম অনুকম্পা ও অসম্মানী হতে এবং আমি কারো প্রতি জুলুম করা হতে বা নিজে অত্যাচারিত হওয়া থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) অনুরূপভাবে দারিদ্রতা ব্যক্তিকে ঋণগ্রস্থতার দিকে নিয়ে যায়, আর ঋণগ্রস্থতা মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিকে অগ্রসর করে। রাসূল সাঃ এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলতেন, (اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ) (হে আল্লাহ্! গুনাহ্ ও ঋণগ্রস্থতা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই। তখন এক ব্যাক্তি তাঁকে বলল, আপনি কতই না ঋণগ্রস্থতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যখন কোন ব্যাক্তি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে তখন কথা বলার সময় মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।)
নিশ্চয় ব্যক্তির আচরণ ও তার জীবনধারায় নগদ অর্থ প্রবাহের ঘাটতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে; যেহেতু তার প্রভাব শিক্ষা, জীবিকা ও স্বাস্থ্যের উপর প্রকাশ পায়। আর এটা আচরণের ধরণ ও তার বিচ্যুতির উপর প্রভাব ফেলে। নিচের পয়েন্টগুলোতে এটা আরো স্পষ্ট হবেঃ
দারিদ্রতা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে এর প্রভাবঃ শিক্ষার উপর দারিদ্রতার প্রভার রয়েছে। সুতরাং অল্প উপার্জন পিতা বা পরিবারকে বাধ্য করে অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে কাটাতে; পরিবারের প্রয়োজনের অনুসন্ধান করতে। ফলে সে সন্তানদের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। সে তাদেরকে সমাজের বিচ্যুতির প্রভাবকের সামনে ছেড়ে দেয়। অনুরূপভাবে অতি দারিদ্রতা পিতাকে রুক্ষ মেজাজী ও দ্রুত রাগান্বিত করে তোলে। যার ফলে সে রূঢ় ও কঠোর স্বভাবের হয়। আবার অনেক সময় সে জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে সন্তানদের সহযোগিতা নেয় যা তাদের শিক্ষার সুযোগকে নষ্ট করে বা তাদের পড়া লেখার সময় কমিয়ে দেয়। অনুরূপভাবে বাড়িও পড়ালেখার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। এ সকল অবস্থা পারিবারিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে, মূর্খতার দ্বারকে উন্মুক্ত করে এবং বিচ্যুতির জানালাকে খোলা রাখে; যা সন্তানদেরকে চারিত্রিক বিচ্যুতির সম্মুখীন করে।
দারিদ্রতা ও বেকারত্বঃ কিছু সমাজে ব্যাপকহারে বেকরাত্ব বিদ্যমান। আর এটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থার বিরুপ প্রভাব বিস্তার করে। শিল্পোন্নত দেশসমূহে কর্মজীবিদের খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা ও বেকারত্বের হার বৃদ্ধি গৃহহীন হওয়া, বিভ্রান্তি ও ভিক্ষাবৃত্তির অপরাধের হার বৃদ্ধি করছে, অনুরূপভাবে অশ্লীলতা ও যৌন অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এগুলো অনেক সময় পারিবারিক দারিদ্রতা ও আবশ্যকীয় প্রয়োজন পূরণের আশার কারণে হয়ে থাকে। ফলে পরিবার বিচ্যুতির কারণে শরীয়ত বহির্ভূত পন্থায় উপার্জনের দিকে যায়। আবার অনেকে মনে করেন যে, দারিদ্রতা, অনির্দিষ্ট জীবিকা ও কষ্টসাধ্য কাজ মাদক গ্রহণ ও তা বিক্রয় প্রসারে সাহায্য করে; বেকারত্বের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ঘাতটি পূরণে মাধ্যম হিসেবে। পরিবারের কর্তা ও কিশোর অপরাধের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তি এই যে, পরিবার প্রধানের বেকারত্ব তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত অর্থনৈতিক অবস্থা যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে তার দায়িত্বের ত্রুটি; এর ফলে পরিবার তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ত্রুটির সম্মুখীন হয়। আবার অনেক সময় পিতা ও পরিবারের কর্তার বেকারত্ব মা ও সন্তানদেরকে রিযিকের উৎস অনুসন্ধানে বাধ্য করে। এই অবস্থাগুলো অনেক সময় বিচ্যুতি ঘটার দিকে নিয়ে যায়।
দারিদ্রতা ও শিশু-কিশোরঃ স্বল্প আয় বা একেবারেই আয় না থাকা, পিতা কর্তৃক কিশোর সন্তানদেরকে অতি অল্প বয়সে কাজ করাতে উৎসাহিত করে। যদিও কিছু কিছু কাজে জড়িত হওয়া যেমন কফিশপ বা বিনোদন কেন্দ্রে কাজ করা কিশোরদেরকে অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। কিছু কিছু গবেষণা প্রমাণ করেছে, যে সমস্ত কিশোররা কাজ করে তাদের মাঝে অপরাধের প্রবণতা যারা কাজ করে না তাদের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে দশগুণ পর্যন্ত বেশি। অনুরূপভাবে কিশোরদের অল্প বয়সে কর্মে জড়িত হওয়া প্রাপ্ত বয়স্ক বিচ্যুতদের থেকে তাদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা নিয়ে আসে; কিশোরদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরিপক্কতা না থাকার ফলে।
দারিদ্রতা ও তোষামোদঃ তীব্র দারিদ্রতা অনেক সময় বিচ্যুত ব্যক্তিকে কর্ম সম্পাদনের বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণের দিকে নিয়ে যায়। অনুরূপভাবে তাকে লেনদেনে তোষামোদি ও চাটুকারিতার দিকে নিয়ে যায়। এই দিকে ইঙ্গিত করে ইবনুল জাওযী রহঃ বলেনঃ আমরা এমন কিছু লোকদের দেখেছি, যারা শাসকদের নিকট থেকে কিছু পাওয়ার জন্য তাদেরকে ধোঁকা দেয়। কেউ তাদের তোষামোদি করে, কেউ বা নাজায়েয পর্যায়ের প্রশংসা করে আবার কেউ বা খারাপ কাজ দেখে চুপ থাকে ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের চাটুকারিতা করে দারিদ্রতার কারণে।
দারিদ্রতা ও সুস্থ্যতাঃ দারিদ্রতা শারিরিক সুস্থ্যতার জন্য বিপদজনক যেহেতু এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে অখাদ্য ও খারাপ বাসস্থান। তা মানসিক সুস্থ্যতার জন্যও বিপদজনক কেননা এর কারণে অস্থিরতা, অসন্তোষ, উদ্বেগ ও বিরক্তির অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়। দারিদ্রতার সাথে অ্যানিমিয়া, যক্ষা ও হাড়ের রিকেটস রোগ ইত্যাদি জটিল রোগের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আর এটা খাবার ও ঔষুধের মূল্য জোগাড় করার জন্য বিচ্যুত আচরণ ভিক্ষা বৃত্তির দিকে নিয়ে যায়।
খ- বিচ্যুতির অর্থনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে সহযোগী কারণসমূহঃ
এই প্রভাবকের ক্ষেত্রে কতগুলো প্রশ্ন আসে, সেগুলো হল: শুধুমাত্র দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা অথবা উভয়টি বিচ্যুত আচরণের জন্য দায়ী? নাকি অন্য কোন প্রভাবক আছে যেগুলো এর যেকোন একটি বা উভয়টির সাথে সম্পৃক্ত হলে বিচ্যুতি সংঘটিত হয়? এই প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি যে, গবেষকগণ এই বিষয়টি নিয়ে তাদের পরিবেশে গবেষণা চালিয়েছে। তাদের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে যে, দারিদ্রতার সাথে বিচ্যুতির সম্পর্ক খুবই দূর্বল এবং দারিদ্রতাই একমাত্র বিচ্যুতির কারণ নয়। কেননা অনেক দরিদ্র কিশোরদের মাঝে বীরত্ব ও আমানতদারিতার গুণ বিদ্যমান। বিচ্যুতি তাদেরকে চুরি করতে বা শরীয়ত বহির্ভূত পন্থায় উপার্জন করতে আকৃষ্ট করেনি। বরং তারা বিচ্যুত লোকদেরকে ঘৃণা করে। অপরদিকে অনেক ধনাঢ্য পরিবারে বেড়ে উঠা কিশোরদেরকে বিচ্যুত হতে দেখা যায়।
এ ব্যাপারে আমরা একটি উদাহরণ গ্রহণ করতে পারি যা প্রমাণ করে যে, দরিদ্রদেরকে তাদের দারিদ্রতা চারিত্রিক বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যায়নি। এই উদাহরণের নমুনা হলেন চারশ জন দরিদ্র মুহাজির সাহাবী, যাদের মদিনায় কোন বাসস্থান ছিলনা, কোন নিকট আত্মীয় ছিলনা তথাপি তাদের নিজেদেরকে আবদ্ধ রেখেছিল আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্য, তারা রাসূল সাঃ কর্তৃক প্রেরিত সারিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল, তারা হলেন আহলে সুফফার সাহাবীগণ। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ﴿ [এগুলো অভাবগ্রস্থ লোকদের প্রাপ্য; যারা আল্লাহ্র পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, দেশময় ঘুরাফিরা করতে পারে না; আত্মসম্মানবোধে না চাওয়ার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে; আপনি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না। আর যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ্ সে ব্যাপারে সবিশেষ জ্ঞানী।]
অর্থনৈতিক দিক থেকে ধনাঢ্যতার আরেকটি উদাহরণ হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র তথাপি অন্য সমাজের চেয়ে তাদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনুরূপভাবে দারিদ্রতার সাথে বিচ্যুতির সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণার ফলাফলগুলো বৈপরিত্যপূর্ণ। এই দিকে ইঙ্গিত করে বিচ্যুতি বিষয়ক একজন গবেষক বলেন: অর্থনৈতিক কারণ ও কিশোর অপরাধের সম্পর্ক বিষয়ক পরিচালিত গবেষণাগুলোর ফলাফল পরস্পর বিরোধী। এর কারণ হিসেবে বলেন: এসমস্ত গবেষণার পদ্ধতিগত ঘাটতির কারণে, কেননা তা সূক্ষ্ম তুলনা বা অপরাধীদের নিদিষ্ট নীতির দলের উপর নির্ভর করে তৈরী করা হয়নি। এমনকি এসমস্ত গবেষণার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম কোন মাধ্যম ব্যবহার করা হয়নি।
সুতরাং এই উপসংহারে আসা যায় যে, স্বয়ং দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা বিচ্যুতির কারণ নয়; তবে যদি তার সাথে যুক্ত হয় ইসলামী মূল্যবোধের চরিত্রের উপর দুর্বল প্রতিপালন। এর ফলে দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা চারিত্রিক বিচ্যুতির প্রভাবক কারণ হিসেবে প্রকাশ পায়। কেননা এমন অনেক ধনী ব্যক্তি পাওয়া যায় যে তার সম্পদের হেফাযত করে এবং একমাত্র শরীয়তসম্মত পন্থায় তা ব্যয় করে। আবার এমন দরিদ্র পাওয়া যায় যে বিচ্যুত না হয়ে তার দারিদ্রতার উপর ধৈর্যধারণ করে। আমার দৃষ্টিতে এর মূল হল প্রতিপালন ও দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ। যদি তা দুর্বল হয় বা অনুপস্থিত হয় তাহলে বিচ্যুতির ক্ষেত্রে দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়ে আল্লাহই ভাল জানেন।
গ- অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বিচ্যুতির ক্ষেত্রে এর প্রভাবঃ
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে তিনটি নীতি: ইসলামী নীতি, পুঁজিবাদী নীতি ও সমাজতান্ত্রিক নীতি। বাস্তবধর্মী গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, মানব রচিত অর্থনৈতিক নীতি ব্যার্থ হয়েছে, কেননা তা চারিত্রিক বিচ্যুতির ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। পক্ষান্তরে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজের জন্য কার্যকর নিরাময়ের ব্যবস্থা করেছে। তন্মধ্যে উদাহরণস্বরূপ, ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে সম্পর্ক সৃষ্টি; যা যাকাত, সাদকা ও ইহসানের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।
অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা মনে করে, দারিদ্রতা নির্মূলের একমাত্র উপায় হল ধনীদেরকে নির্মূল করা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ও তাদের প্রাচুর্যতা থেকে বঞ্চিত করা। বরং তারা এর চেয়েও দূরে গেছে মালিকানা বাতিলের কারণে বিশেষত উৎপাদিত সম্পদের ক্ষেত্রে যেমন যমীন ও অস্ত্র ইত্যাদি। তারা দরিদ্র সমাজকে ধনীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে, তাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষের প্রসার ঘটিয়েছে এবং সংঘাতের আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছে। এমনকি সবশেষে যারা সংখ্যায় বেশি তারাই বিজয়ী হয়েছে। আর তারা হল সাধারণ শ্রমিক শ্রেণী যাদেরকে তারা সর্বহারা বলে। এর অর্থ হল চারিত্রিক মূলনীতি থেকে সমাজের বিচ্যুত হয়ে খারাপ চরিত্র যেমন সংঘাত, বিদ্বেষ এর দিকে যাওয়া। আর মালিকানার প্রতি আগ্রহের প্রবণতাকে শেষ করে দেওয়া; যার অনুপস্থিতি চারিত্রিক বিচ্যুতির অনেকগুলো কারণকে প্রকাশ করে যার অন্যতম হল মানসিক টেনশন।
অনেক বিতর্ক সংঘটিত হয়েছে বিচ্যুতি ও অপরাধ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সমাজে অপরাধী চরিত্রের জন্য দায়ী। এই মতটি প্রকাশ করেন ইতালিয়ান চিন্তাবিদ (তুরানি), সবচেয়ে প্রশিদ্ধ যে ব্যক্তি পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থাকে সমাজে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য দায়ী করেছন তিনি হল্যান্ডের চিন্তাবিদ ইউনজার। উদাহরণস্বরূপ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার আলোকে মানুষকে ধনী-গরিব দুই ভাগে ভাগ করাই সরাসরি চুরির অপরাধের সাথে সম্পর্কিত।
পক্ষান্তরে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনী-গরিবের সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। সুতরাং তা ধনী-গরিবের মাঝে শত্রুতা-সংঘাত সৃষ্টিকারী সকল মতবাদ বা মানুষের মাঝে শ্রেণীবিন্যাসের মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। আর কেনই বা তা করবে? অথচ ভ্রাতৃত্ব হল ঈমানের সমার্থবোধক ও ইসলামের ফলস্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ﴿ [মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও।]
ইসলাম তাদের মাঝের সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্ববোধের সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে দেখে, ভ্রাতৃত্ববন্ধন রক্ষা, সাদকা ও ইহসান করার মাধ্যমে; দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য, যেন শয়তান তাকে প্রলুব্ধ করে বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যেতে না পারে। মহান আল্লাহ বান্দাদেরকে দান সাদকার আদেশ করে বলেন: ﴾وَأَنفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُم مُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ﴿ [আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর।] তিনি আরো বলেনঃ ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَاكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ يَوْمٌ لَّا بَيْعٌ فِيهِ وَلَا خُلَّةٌ وَلَا شَفَاعَةٌ وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴿ [হে মুমিনগণ! আমি যা তোমাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তোমরা ব্যয় কর সেদিন আসার পূর্বে, যেদিন বেচা-কেনা, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকবে না, আর কাফেররাই যালিম।]
দারিদ্রতার সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলাম ধনীদেরকে দরিদ্রদের জন্য দান যেমন যাকাত ও সাদকা করতে এবং সচ্ছল নিকট আত্মীয়দেরকে দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অনুরূপভাবে দারিদ্রতা বিমোচনের জন্য সঠিক সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছে। এর বর্ণনা পবিত্র কুরআনে নূহ আঃ এর জবানে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا﴿ [অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, এবং তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।]
ইবনে আব্বাস রাঃ ও অন্যান্যরা বলেন: অর্থাৎ যখন তোমরা তাওবা করবে, ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং মানুষদেরকে খাবার খাওয়াবে তখন তোমাদের রিযিক বৃদ্ধি পাবে। অনুরূপভাবে ইসলাম আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের আশার প্রাঞ্জলতা রোপন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴾إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴿ [তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।] তিনি আরো বলেনঃ ﴾سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا﴿ [অবশ্যই আল্লাহ কষ্টের পর দেবেন স্বস্তি।]
আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, দারিদ্র চিরস্থায়ী নয়। বরং তা পরিবর্তনশীল। আবার কখনো দূরীভূত হয়ে আবার ফিরে আসে। আজকের দিনের দরিদ্র ব্যক্তিরা হতে পারে আগামীকাল ধনী। কেননা রিযিক আল্লাহর হাতে। আর ইসলামে মানুষের মর্যাদা অর্থের ভিত্তিতে নয় বরং তাকওয়ার ভিত্তিতে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴿ [তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন।] নবী সাঃ বলেছেন: (বহু এমন লোকও আছে যার মাথা উষ্কখুষ্ক ধুলোভরা, যাদেরকে দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। (কিন্তু সে আল্লাহর নিকট এত প্রিয় যে) সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন।)
অপরদিকে ধনীদের জন্য সম্পদ ব্যবহারে ইসলামের দিকনির্দেশনা হল, এমন নির্দেশনা যা অপচয় ও বিচ্যুতি হতে মুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴿ [আর তোমরা অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।] তিনি আরো বলেন: ﴾وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا * إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴿ [এবং কিছুতেই অপব্যয় কর না। নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রাবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴾وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ﴿ [আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং যমীনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না।]
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি ইনসাফ ভিত্তিক ব্যবস্থা, যা আন্তরিক বন্ধন সৃষ্টি করে; সঠিক সামাজিক সংহতির মাধ্যমে। যা ব্যক্তিকে তার প্রিয় বস্তুকে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও প্রতিদানের আশায়। আর পারস্পরিক সহযোগিতা দারিদ্রতার ফলে সৃষ্ট গরিবদের বিচ্যুতির বিপক্ষে দাঁড়াতে সাহায্য করে এবং ধনীদের বিচ্যুতিপূর্ণ বিলাসিতার বিপরীতে দাঁড়াতেও সাহায্য করে। যদিও মুসলিম সমাজে ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে বিচ্যুতির পদস্খলন বিদ্যমান কিন্তু সেটা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগের অভাবে এবং ইসলামী শিক্ষার মানহাজ বাস্তবায়ন না করার কারণে।
পূর্বের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কিছু ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে বিদ্যমান বিচ্যুতির জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হল ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আর দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক চারিত্রিক প্রতিপালনের অনুপস্থিতি বা দুর্বলতার সময় এবং বিপর্যয়কর পরিবেশের উপস্থিতিতে চারিত্রিক বিচ্যুতির অন্যতম কারণ।
চতুর্থতঃ সামাজিক পরিবেশ
পরিবেশ বলতে বুঝায়, মানুষের চার পাশে পরিবেষ্টিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকসমূহ। আর এটা মানুষের আচরণে ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল মানুষের চারপাশে বেষ্টিত পারিবারিক, গোত্রীয়, শিক্ষাক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি বিভিন্ন দল এবং সংস্কৃতি ও বিশ্বাসগত বিভিন্ন ধরণ যা অনেক সময় এক জাতীয় আবার কখনো বা ভিন্নভিন্ন হয়। মানুষকে প্রায়ই তাদের সাথে উঠবসা করতে হয় আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী হওয়া বা প্রতিবেশীর হুকুমে হওয়ার কারণে। নিশ্চয় এদের সকলের ব্যক্তি জীবনে প্রভাব রয়েছে তার অনুরাগ ও চারিত্রিক পথের ধরণ অনুযায়ী এবং ব্যক্তির সে প্রভাবকগুলো গ্রহণ করার স্তর অনুসারে।
সঙ্গী দুই ধরণের হয়ে থাকে: অসৎ সঙ্গী ও সৎ সঙ্গী। কোন ব্যক্তির খারাপ লোকদের সাথে উঠাবসা তার জন্য বিচ্ছিন্নতা, বিভেদ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, দুর্বলতা, তাদের পক্ষ হতে বহনের অযোগ্য বোঝা, স্বীয় কল্যাণ বিনষ্ট করা, কল্যাণ বাদ দিয়ে তাদের সাথে ব্যস্ত থাকা এবং তাদের চাহিদার মাঝে নিজের চিন্তাকে নিবদ্ধ রাখাকে আবশ্যক করে। এরপর তার আল্লাহ ও আখেরাতের জন্য কী বাকী থাকবে? এমনকি আল্লাহর হক নষ্ট করার কারণে যখন পরিতাপ ও আফসোসের দিন আসবে, তখন আফসোস ও পরিতাপ কোন উপকারে আসবে না। সে সময় অত্যাচারী তার উভয় হাত কামড়াতে থাকবে এবং আকাঙ্খা করবে যদি অমুক ব্যক্তিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করত আর রাসূলের পথকে যদি আঁকড়ে ধরত। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا﴿ [যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম। হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ পৌছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।] আরেকটি কুরআনিক উদাহরণ রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন: ﴾الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ﴿ [বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকীরা ছাড়া।] তিনি আরো বলেন: ﴾إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتُّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ * وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَلَهُمْ حَسَرَاتٍ عَلَيْهِمْ وَمَا هُم بِخَارِجِينَ مِنَ النَّارِ﴿ [যখন যাদের অনুসরণ করা হয়েছে তারা, যারা অনুসরণ করেছে তাদের থেকে নিজেদের মুক্ত করে নেবে এবং তারা শাস্তি দেখতে পাবে। আর তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, আর যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে, 'হায়! যদি একবার আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী তাদেরকে দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। আর তারা কখনো আগুন থেকে বহির্গমণকারী নয়।]
এজন্য সালাফগণ বলতেন: তোমরা দু'ধরণের মানুষ থেকে সতর্ক থাক। এক: প্রবৃত্তি অনুসরণকারী যাকে তার প্রবৃত্তি ফেতনাগ্রস্থ করে রেখেছে, দুই: দুনিয়া পাগল ব্যক্তি যাকে দুনিয়া অন্ধ করে রেখেছে। তারা আরো বলতেন: তোমরা পাপাচারী আলেম ও মূর্খ ইবাদতকারীর ফেতনা থেকে সতর্ক থাক। কেননা তাদের ফেতনাটা সকলের জন্য ফেতনা।
সুতরাং খারাপ বন্ধুগণ মানুষকে খারাপ পথই দেখাবে, ফলে তারা তার স্বভাবকে খারাপে রূপান্তরিত করবে এবং তার কাছে খারাপ আমলসমূহকে সুশোভিত করে উপস্থাপন করবে। এমনকি যখন খারাপ চরিত্রে জড়িয়ে পড়বে ও তার কাছে নত হয়ে যাবে এবং সে অধঃপতনের গহ্বরে নিপতিত হবে, তখন সে মর্যাদাবান লোকদের নিকট অপছন্দনীয় ও বিবেকবানদের হতে প্রত্যাখাত হবে। নিকৃষ্ট লোকেরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে আর উত্তম লোকরো তার থেকে সতর্ক থাকবে। অনুরূপভাবে সে কষ্ট-ক্লেশের মাঝে থাকবে তার উপর খারাপ স্বভাব ও বিকৃত আচরণ ভর করা এবং তার বিচ্যুতির কারণে।
এখানে নিচের প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা আবশ্যকঃ জীবন বা কর্মের কারণে খারাপ লোকের সাথে উঠাবসার প্রয়োজন দেখা দিলে একজন মুসলিম কী করবে? তাদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে তাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচার উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, এ সকল ক্ষেত্রে তাদের সাথে লেনদেনের সময় হিকমত অবলম্বন করা আবশ্যক। এর বর্ণনা দিয়ে ইবনুল কায়্যিম আল জাওযীয়া বলেন: তাদের সাথে উঠাবসা করা একান্তই আবশ্যক হয়ে পড়ে, তাদের এড়িয়ে চলা সম্ভব না হয়, তবে তাদের সাথে সহমত পোষণ করা থেকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে, তার সাহায্যকারী ও শক্তি না থাকলে তাদের কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করবে, কেননা তারা অবশ্যই তাকে কষ্ট দিবে। তবে এই কষ্টের পর তাদের, মুমিনদের ও বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে সম্মান, ভালবাসা, মর্যাদা ও প্রশংসা আসবে। আর যদি উঠাবসা জায়েয বিষয়ের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে চেষ্টা করবে যেন সেই মজলিসকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগানো যায়, নিজেকে এব্যাপারে উৎসাহিত করবে ও অন্তরকে শক্ত করবে। যদি তার সক্ষমতা এটা করতে অপারগ হয় তবে সে যেন তাদের মাঝ থেকে সেরূপভাবে বেরিয়ে যায় যেরূপভাবে আটার খামির থেকে চুলকে বের করে দেয়া হয়। তাদের মাঝে তার অবস্থা যেন হয়, উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত, কাছে থেকেও দূরে এবং জাগ্রত থেকেও ঘুমন্ত।
পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার তথা সৎ ব্যক্তিদের সঙ্গ গ্রহণ, এটা কাঙ্খিত ও ইপ্সিত। কেননা এখানে কুৎসিত কিছু নেই। বরং এর মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী হবে। সুতরাং সৎকর্মশীলগণ ব্যক্তির জন্য শোভা স্বরূপ, যা তাকে প্রতিদিন সুন্দর সুন্দর পোশাক পরিধান করাবে, তাদের সহচর্যে সীমাহীন কল্যাণ লাভ হবে, তা তার মাঝে ভাল কাজের প্রতি ভালবাসা ও সে অনুযায়ী আমল করার শক্তি যোগাবে এবং তার মাঝে খারাপ কাজের প্রতি ঘৃণা ও তা পরিত্যাগ করার স্পৃহা তৈরী করবে। ফলে তার স্বভাব ও চরিত্র সুন্দর থেকে সুন্দরতম হবে। কাজেই এদের সঙ্গ গ্রহণে উৎসাহী থাকা উচিত। তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূল সাঃ বলেন: (সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।)
যদিও চারিত্রিক বিচ্যুতির ক্ষেত্রে পরিবেশের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, তথাপি তা এমন কোন জটিল কারণ নয় যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা দুষ্কর। কেননা এমন কত লোক রয়েছে যারা কুফর ও নাস্তিকতার মাঝে জীবন যাপন করেছে, কিন্তু তারা তাকওয়ার ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ। আবার এমন কত ব্যক্তি রয়েছে যারা উত্তম তাকওয়া সম্পন্ন গৃহে লালিত-পালিত হয়েছে, তথাপি তারা এর দ্বারা প্রভাবিত হয়নি বরং বিচ্যুত হয়েছে ও পরিবেশের পথ থেকে সরে গেছে ফলে তারা কুফর ও নাস্তিকতার উদাহরণে পরিণত হয়েছে। নূহ আঃ ও লূত আঃ এর স্ত্রীরা ছিল নবী গৃহে, কিন্তু তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অপরপক্ষে ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন কুফরী গৃহে কিন্তু তিনি হককে বুঝতে পেরেছিলেন তাই তো কুফর থেকে সঠিক পথে ফিরে এসেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ * وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴿ [যারা কুফরী করে, আল্লাহ্ তাদের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন নূহের স্ত্রী ও লুতের স্ত্রীর, তারা ছিল আমাদের বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লুত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারলেন না এবং তাদেরকে বলা হল, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ কর। আর যারা ঈমান আনে, আল্লাহ্ তাদের জন্য পেশ করেন ফেরাউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত, যখন সে এ বলে প্রার্থনা করেছিল, হে আমার রব! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে উদ্ধার করুন ফেরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।]
এর অর্থ সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকে হেয় করা নয় বরং তা ব্যক্তির আচরণে সবচেয়ে বড় প্রভাবক। কেননা সঙ্গ গ্রহণের জন্য আবশ্যক হল সাদৃশ্যতা গ্রহণ। কিন্তু ব্যক্তি তার প্রচেষ্টা দ্বারা আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্যে এ থেকে মুক্তি পেতে পারে। আরো কতগুলো প্রভাবক রয়েছে যা খারাপ চরিত্রের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখে ও তার কারণ হিসেবে বিবেচিত এবং উত্তম চরিত্র থেকে বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তার প্রভাব ক্রিয়াশীল। সেগুলো নিম্নরূপঃ
১- শিক্ষণীয় প্রতিপালনের অভাবঃ সঠিক শিক্ষণীয় প্রতিপালনকে উন্নত প্রশংসনীয় আচরণের জন্য ফলস্বরূপ গণ্য করা হয়, অনুরূপভাবে খারাপ প্রতিপালন নোংরা চরিত্রের মূল। বরং খারাপ প্রতিপালন মানুষের আক্বীদার মূলে প্রভাব ফেলে এবং তাকে তার প্রকৃত স্বভাব থেকে বিচ্যুত করে। নবী সাঃ এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন: (প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বা খৃস্টান অথবা অগ্নি উপাসকরূপে রুপান্তরিত করে।)
আর শিক্ষণীয় প্রতিপালনের অভাব বিভিন্ন দিক থেকে হয়ে থাকে যা ব্যক্তি ও সমাজের চরিত্র গঠনে ভুমিকা রাখে, সেগুলো হল:
শিক্ষাগত দিক: ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীয়ী ইলমের বিষয়ে দুর্বল প্রতিপালন সবচেয়ে বড় স্বীয় নিরাপত্তাকে হারিয়ে ফেলে। কেননা শরীয়ী ইলমই ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়ার বীজ বপন করে এবং দুনিয়া পরবর্তীতে যে নিয়ামত বা শাস্তি রয়েছে সে বিষয়ে দূরদর্শিতা তৈরী করে। যা তাকে ভাল কাজে অগ্রগামী করে ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। ব্যক্তির অন্তরে শরয়ী শিক্ষার অভাব তাকে এমন মূর্খতার দিকে নিয়ে যায় যা তাকে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। কাজেই তা খারাপের জখমে ও বিপদের কষ্টে এবং নিকৃষ্ট চরিত্রে ব্যাথায় নাড়া দেয় না। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: ব্যাপক মূর্খতায় অন্তর মৃত্যুবরণ করে, আর যে কোন ধরণের মূর্খতায় তা রোগাক্রান্ত হয়। শরীয়ী ইলম বাদ দিয়ে দুনিয়াবী শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা অন্তর ও বিবেকে ফাটল সৃষ্টি করে। ফলে ঐ ব্যক্তি শুধু ঐসকল জ্ঞানই জানে যা আখেরাত বিমুখ হয়ে তার দুনিয়াবী লালসা বাস্তবায়ন করবে। ফলশ্রুতিতে সে চুরি করবে, আক্রমণ করবে, যিনা করবে ও হারাম কাজে জড়িত হবে।
আক্বীদা ও ইবাদতগত দিকঃ ব্যক্তিকে আক্বীদা ও ইবাদতের ক্ষেত্রে দুর্বল প্রতিপালন, তাকে সহজে প্রবৃত্তি ও আনন্দের পিছনে তাড়িত করবে; যা তাকে বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যাবে। কেননা সঠিক আক্বীদা ও ইবাদত একজন মুসলিমের মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস, সুদৃঢ় দূরদর্শিতা, চরম ধৈর্য ও উচ্চাকাঙ্খা সৃষ্টি করে এবং হীনমন্যতা থেকে দূরে রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ﴿ [আপনি তেলাওয়াত করুন কিতাব থেকে যা আপনার প্রতি ওহী করা হয় এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয় সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।]
অশ্লীলতা হল যার কদর্যতা সকলের নিকট স্পষ্ট এবং সকল বিবেকবান ব্যক্তি তা খারাপ মনে করে। তাই একে যিনা ও সমকামিতা দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। আল্লাহ একে ফাহেশা বলেছেন যেন মানুষরা এর নোংরামি থেকে বিরত থাকে। অনুরূপভাবে নোংরা কথাকেও অশ্লীলতা বলা হয়। আর তা হল যার কদর্যতা খুবই স্পষ্ট যেমন গালি দেয়া, অপবাদ দেয়া ইত্যাদি। আর বান্দা যখন নির্দেশিত পন্থায় সালাত আদায় করে তখন তা তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। এটা জ্ঞাত বিষয় যে কোন ব্যক্তি যদি গোপন বিনয়ের ও প্রকাশ্য আমলের মাধ্যমে এই সালাতের হেফাযত করে এবং সে আল্লাহকে যথাযথ ভয় করে, তবে সে ওয়াজীব সময় বাস্তবায়ন করবে ও কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। আর যখন দ্বীনি প্রতিপালন দূর্বল হবে তখন ব্যক্তি বিচ্যুত আচরণের দিকে ধাবিত হবে।
চারিত্রিক দিকঃ ইসলামী মূল্যবোধের উপর দুর্বল চারিত্রিক প্রতিপালন ব্যক্তিকে এর বিপরীত খারাপ আচরণে জড়িত হওয়াকে অতি সহজ করে দেয়। কেননা সে ধৈর্য্যের শিক্ষার উপর গড়ে উঠেনি। যার ফলে তার খামখেয়ালিপনা ও প্রবৃত্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে পারে না। সে লজ্জাশীলতার শিক্ষা পায়নি যার ফলে সে অপরাধ কর্ম করতে লজ্জাবোধ করে না। সে সততা ও আমানতদারিতার শিক্ষা পায়নি তার ফলে সে চুরি করে, প্রতারণা করে এবং কথা ও কাজে ধোঁকা দেয়। ইবনে হাযম রহঃ বলেন: সৌভাগ্যবান সেই যার অন্তর ভাল কাজে প্রশান্তি পায় এবং খারাপ ও পাপ কাজ থেকে পলায়ন করে। আর দুর্ভাগা সে যার অন্তর খারাপ ও পাপ কাজে প্রশান্তি পায় এবং ভাল ও আনুগত্যের কাজ থেকে পলায়ন করে। কাজেই চারিত্রিক প্রতিপালনের দুর্বলতা বিচ্যুতি ও বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ।
শাস্তিগত দিকঃ অপরাধ দমনে শাস্তির কার্যকর প্রভাব রয়েছে। আর শাস্তি প্রয়োগ না করা ব্যক্তি ও সমাজকে শয়তানের আক্রমণের কাছে নতি স্বীকার করার সুযোগ সৃষ্টি করে। যেহেতু বর্তমান সমাজে ইসলামী শাস্তি প্রয়োগ হয়না, তাই তা চারিত্রিক বিচ্যুতির সম্মুখীন হচ্ছে। কেননা মানব রচিত আইন একদিক থেকে বিচ্যুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অপরদিকে সেখানে শরয়ী নিয়ন্ত্রণ অনুপস্থিত। আর অপরাধী যখন প্রতিরোধমূলক শাস্তি পায়না তখন অকল্যাণ তার অন্তরের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করে। ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: অপরাধী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের শাস্তি পরিপূর্ণ হয়না যদি না তা প্রতিরোধকারী কষ্টদায়ক না হয় এবং যারা এরূপ কর্ম করতে চায় তাদের জন্য অপরাধী একজন শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত না হয়। এজন্য ছোট-বড়, কম-বেশী অপরাধ অনুযায়ী তার কোন কিছু নষ্ট করা আবশ্যক। কাজেই শরয়ী শাস্তি বাস্তবায়ন ব্যতীত কোন প্রতিরোধকারী নেই।
২- খারাপ আদর্শঃ খারাপ আদর্শ অন্যদের মাঝে কার্যকর প্রভাব ফেলে; কেননা তা অন্যদের সামনে বিচ্যুতির বাস্তব উদাহরণ উপস্থাপন করে। আর এটা স্পষ্ট করে পথ, পন্থা ও প্রতারণার মাধ্যমে যা দুর্বল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদেরকে বিচ্যুত আচরণের দিকে নিয়ে যায়। রাসূল সাঃ এর ও এর সাথে জড়িত ব্যক্তির ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন, আরো বর্ণনা করেছেন যারা এর অনুসরণ করবে ও এর দ্বারা প্রভাবিত হবে তাদের বোঝা তাকে বহন করতে হবে। নবী সাঃ বলেন: (যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে (ইসলামের পরিপন্থী) কোন খারাপ প্রথা বা কাজের প্রচলন করবে, তাকে তার এ কাজের বোঝা (গুনাহ এবং শাস্তি) বহন করতে হবে। তারপর যারা তাকে অনুসরণ করে এ কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ বোঝাও তাকে বইতে হবে। তবে এতে তাদের অপরাধ ও শাস্তি কোন অংশেই কমবে না।)
খারাপ আদর্শ হয় নোংরা কথা ও নিকৃষ্ট কাজের মাধ্যমে; চায় তা সরাসরি হোক বা ছবি, লেখনি অথবা অন্যকোন মাধ্যমে হোক যেটাকে মানুষ অন্যের মাঝে প্রভাব বিস্তার করার জন্য ব্যবহার করে ও তাদের মাঝে বিপর্যয় বিস্তার করে। সুতরাং খারাপ আদর্শ বিচ্যুত আচরণের বাস্তব উদাহরণ, কেননা তার প্রভাব ব্যাপক। বিশেষ করে যদি সে আদর্শ ব্যক্তি ভাল মানুষদের নিকট প্রিয় হয় ও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। যেমন পিতা, শিক্ষক, বন্ধু ইত্যাদি। অথবা খারাপ আদর্শের ব্যক্তি এমন বৈশিষ্ট্যের হবে যাতে শারীরিক বা মেধাভিত্তিক একধরণের শক্তি রয়েছে। ফলে অন্যরা তার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তার পথই অনুসরণ করবে। সুতরাং কিশোর ও যুবক বয়সে বীরত্বপূর্ণ গুণের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, যেহেতু ব্যক্তি এই সময় বীরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই যদি সমাজে খারাপ আদর্শ বিদ্যমান থাকে আর উত্তম আদর্শ অনুপস্থিত থাকে, তবে যুব সমাজ তাদের নষ্ট চরিত্রেরই অনুসরণ করে, যেমন চুরি করা, ডাকাতি করা, ছিনতাই করা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে যদি খারাপ আদর্শ অনুপস্থিত থাকে ও উত্তম আদর্শ প্রকাশিত হয়, যা ভালকাজে বীরত্বের প্রতি গুরুত্ব দেয়, তবে যুব সমাজ তার অনুসরণ করে। যেমন অন্যদের সাহায্য করা, ভাল কাজে কষ্ট ও দুর্দশা সহ্য করা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে বৃদ্ধ বয়সের মানুষ, যদি দুষ্টপ্রকৃতির বৃদ্ধ তার আচরণে এমন কিছু থাকে যা অনুসরণ ও খারাপ আদর্শের মাধ্যম তবে তা তার সমবয়ষ্কদের মাঝে প্রভাব ফেলে। আর মানুষ পরস্পরের কার্যক্রম ও অনসরণের ক্ষেত্রে বিড়ালের পালের ন্যায়, যারা পারস্পারিক সাদৃশ্য রাখতে অভ্যস্ত।
৩- বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতধারা দ্বারা প্রভাবিত হওয়াঃ ইসলামী সমাজের জন্য শত্রুদের থেকে আগত বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতধারাকে চরিত্রের জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকারক মনে করা হয়। যেহেতু আকর্ষণীয় বক্তব্য, রঙ্গিন স্ক্রিন ও সরাসরি সম্প্রচারগুলোতে অন্ধকার রাত্রীর ন্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক ফেতনা ছড়ানো হয়। তা দৃঢ় বিশ্বাসের পরিবর্তে সংশয়ের বীজ বপন করে ও ফেতনা ছাড়ে যা চরিত্রকে নষ্ট করে ও অধঃপতিত করে। বায়বীয় চিন্তার স্রোতধারার বিস্তৃতি বিভিন্ন উপায়ে হয়ে থাকে যা নিম্নরূপঃ
সরাসরি সম্প্রচারঃ সরাসরি সম্প্রচার সবচেয়ে দ্রুততম আধুনিক মাধ্যমে যা পূরো বিশ্বকে গ্রাস করে নিয়েছে এবং মানুষের মাঝে ভাল-মন্দ সমানভাবে প্রচার করেছে। আর মন্দের পরিমাণই ব্যাপক ও অধিক। কাফের ও ইতর লোকদের খারাপ চরিত্রগত অভ্যাস সম্প্রচার করা হয় যা দ্বীন ও চরিত্রকে নষ্ট করে, সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে এবং বিপর্যয় ও দুশ্চরিত্রের বিস্তার করে; এগুলোকে আকর্ষণীয় পোষাকে উপস্থাপনের মাধ্যমে। এর ফলে যুব সমাজ ও দুর্বল আত্মার মানুষেরা পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং তাদের উপর কুপ্রবৃত্তি ভর করছে।
তরজমা বা অনুবাদঃ বিচ্যুত চিন্তাধারা আরবী ভাষায় অনুবাদ করায় ঐ সমস্ত পাঠকদের উপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে যাদের শরয়ী ও জ্ঞানগত সুরক্ষা নেই; যা তাদেরকে পঠিত চিন্তার ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করবে। যেমন সে চিন্তার অনুবাদ করা যা নারী স্বাধীনতা ও তাদের বাড়ী থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য আহবান করে, যেন তারা পুরুষদের সাথে বাজারে, কারখানায়, শ্রেণীকক্ষে ও সকল স্থানে দাঁড়াতে পারে। আর এর বিরোধীতা করাই পশ্চদপদতা। আবার কতগুলো গল্প ও বর্ণনার মাধ্যমে যুব সমাজকে হারাম সম্পর্কে জড়াতে উৎসাহিত করে, যাকে সুশোভিত করা হয় আন্তর্জাতিক বর্ণনা নামকরণ করে। আবার কতগুলো পাঠকের সামনে অপরাধের পথকে স্পষ্ট করে, কিভাবে এর জন্য পরিকল্পনা করবে, কিভাবে বাস্তবায়ন করবে ইত্যাদি। এ ধরণের অনুবাদগুলোর মানুষের আচরণের উপর মারাত্মক প্রভাব রয়েছে।
কাফের দেশে ভ্রমণঃ বিনা প্রয়োজনে কাফের দেশে ভ্রমণ করা ভ্রমণকারীদের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। যেহেতু তারা হারাম চর্চা দেখতে পায়, যা তাতে পতিত হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সেটাকে তাদের সমাজে স্থানান্তরিত করার দিকে পরিচালিত করে বা এসম্পর্কে ও তার প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে আলোচনা করতে উৎসাহিত করে। আবার অনেক সময় সে দিকে আহবান করতে ও তা প্রচার করতে ভুমিকা রাখে। কাজেই মুসলিম সমাজে অবাধ মেলামেশা, পর্দাহীনতা ও মাদকের বিস্তৃতির পিছনে সফরের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
সম্মানিত শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায রহঃ কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেসকল কোম্পানী সম্পর্কে যারা বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করে মুসলিম সন্তানদেরকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য গ্রীষ্মের ছুটি পাশ্চাত্যে কাটনোর জন্য আহবান করে। তিনি এর উত্তরে বলেন: মুসলিমদের সাথে কাফেরদের শত্রুতার বিষয়ে অসংখ্য আয়াত রয়েছে, এর উদ্দেশ্য হল তারা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কোন ধরণের ত্রুটি করে না। এ ক্ষেত্রে তাদের অসংখ্য পদ্ধতি এবং প্রকাশ্য ও গোপন মাধ্যম রয়েছে। তারমধ্য হতে বর্তমানে প্রকাশ পেয়েছে কিছু ভ্রমণ ও পর্যটন কোম্পানী কর্তৃক এমন বিজ্ঞাপন প্রচার যাতে এই দেশের সন্তানদেরকে ইংরেজী শিক্ষার অযুহাতে গ্রীষ্মের ছুটি ইউরোপ আমেরিকায় কাটানোর আহ্বান জানানো হয়। তারা সফরের পূরো সময়ের জন্য একটি পূর্ণ প্যাকেজ তৈরী করে। এই প্যাকেজে বিভিন্ন ধারা থাকে তন্মধ্যেঃ
ক- ছাত্রের অবস্থানের জন্য একটি ইংরেজ কাফের পরিবার চয়ন করা; যদিও এতে অসংখ্য বিপদের কারণ রয়েছে।
খ- যে শহরে অবস্থান করবে সে শহরে মিউজিক অনুষ্ঠান, নাট্যমঞ্চ ও বিভিন্ন বিনোদনে ছাড়ের ব্যবস্থা করা।
গ- নাচ ও বিনোদন কেন্দ্র পরিদর্শন করা।
ঘ- ইংরেজ যুবতীদের সাথে ডিসকো নাচ ও নাচের প্রতিযোগিতা চর্চা করা।
ঙ- এক ইংরেজ শহরের বিনোদন কেন্দ্রে প্রাপ্য বিষয়ের বর্ণনায় এসেছে: (নাইট শো, ডিসকো নাচ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আধুনিক জায ও রক মিউজিক, নাট্যমঞ্চ ও সিনেমা হল এবং ঐতিহ্যবাহী ইংরেজ মদের বার।)
এ ধরণের বিজ্ঞাপনগুলো অনেক মারাত্মক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তন্মধ্যেঃ - মুসলিম যুবকদেরকে বিচ্যুত ও ভ্রষ্ট করা। - চরিত্র নষ্ট করা ও খারাপ কাজে জড়িত করা, নষ্টের উপকরণগুলো সহজলভ্য ও হাতের নাগালে করার মাধ্যমে। - মুসলিমদের আক্বীদায় সন্দেহের সৃষ্টি করা। - পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি মুগ্ধতা ও আকর্ষণের মনোভাব তৈরী করা। - পাশ্চাত্যের নিকৃষ্ট আচার আচরণে অনেক বেশি অভ্যস্ত হওয়া। - দ্বীনের প্রতি মনোযোগ না দিতে ও তার আদেশসমূহ ও আদবের প্রতি দৃষ্টি না দিতে অভ্যস্ত হওয়া। - মুসলিম যুব সমাজকে প্রস্তুত করা যেন এই সফর থেকে ফিরে যাওয়ার পরে তারা তাদের দেশে পাশ্চাত্যের দিকে আহ্বানকারী হয় এবং তারা পশ্চিমা চিন্তাধারা, অভ্যাস ও জীবনধরণ পদ্ধতি দ্বারা তৃপ্ত হয়। ইত্যাদি বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেগুলো বাস্তবায়নে ইসলামের শত্রুরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসংখ্য পথ ও পদ্ধতির মাধ্যমে প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।
যারা শিক্ষার জন্য বিদেশে সফর করে সে ভাষা দ্বারা অধিক উপকৃত হওয়ার আশায় পরিবারসহ বসবাস করছে তাদের হুকুম সম্পর্কীয় প্রশ্নের উত্তরে সম্মানিত শায়খ বলেন: সেখানে পরিবারসহ বসবাস করা জায়েয নয়, যেহেতু ছাত্রের কাফেরদের চরিত্র ও নারী দ্বারা ফেতনায় পড়ার সম্ভবনা রয়েছে। আর ছাত্রের বসবাস ফেতনার স্থান থেকে দূরে হওয়া আবশ্যক। এই আলোচনা শিক্ষার উদ্দেশ্যে কাফেরদের দেশে ভ্রমণ করা বৈধ এমতের উপর ভিত্তি করে। তবে সঠিক হল, চরম প্রয়োজন ছাড়া শিক্ষার উদ্দেশ্যে কাফের দেশে সফর করা জায়েয নয়, তবে এক্ষেত্রে শর্ত হল, তাকে জ্ঞান ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে এবং সে ফেতনার উপকরণ হতে দূরে থাকবে।
৪- সামাজিক সুপরামর্শের অভাবঃ নেক ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধের মাধ্যমে সামাজিক সুপরামর্শ সামাজিক বিশুদ্ধতা ও নিরাপত্তার মূল। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴿ [পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।] রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘৃণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর।) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজীব, উত্তম ও সুন্দর আমল।
আর যখন সামাজিক সুপরামর্শের অভাব হবে, তখন বিচ্যুত ব্যক্তি বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য তার সামনে উন্মুক্ত সুযোগ পেয়ে যাবে। কেউ তাকে বিচ্যুতি থেকে নিষেধ করবে না এবং কেউ তার সমালোচনাও করবে না। ফলে সে ভ্রষ্টতা ও বক্রতা আরো বাড়িয়ে দিবে। হয়ত তার দ্বারা অন্যরা প্রভাবিত হবে। কাজেই নারী তাকে খারাপ চরিত্র থেকে নিষেধ করার জন্য কাউকে পাবে না, ছোটরা অসৎ আমলের ব্যাপারে আদব দেয়ার কাউকে পাবে না, যুবকেরা খারাপ চরিত্র থেকে সতর্ক করার কাউকে পাবে না এবং প্রাপ্তবয়স্কদেরকে কেউ সঠিক কাজ ও উন্নত চরিত্রের আদেশ করবে না। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এর ফলে সমাজ ভেঙ্গে পড়বে; কেননা তার সদস্যগুলো এমন স্বাধীনতা পেয়েছে যা সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত। কাজেই মানুষেরা প্রবৃত্তির অনুসরণে কোন লাঞ্ছনাবোধ করে না। জাতির সদস্যদের মাঝে সামাজিক সুপরামর্শের অভাবের কারণগুলো নিম্নরূপঃ
ব্যক্তিগত ব্যস্ততাঃ মানুষ তার ব্যক্তিগত বিষয়ে, তা পর্যালোচনায় ও নিজস্ব কল্যাণ বাস্তবায়নের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে সে সত্য বলা ভুলে যায়; যে সত্য মানুষকে ভাল কাজ করতে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। অনেক সময় বন্ধু, প্রতিবেশী বা কোন সন্তানের মাঝে ত্রুটি দেখতে পায়, কিন্তু নিজের বিষয়ে ব্যস্ত থেকে অন্যদের কল্যাণ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয় না। আর এতে বিরাট অকল্যাণ রয়েছে যা উম্মতের উপর বর্তায় এমনকি ঐ ব্যক্তির উপরও বর্তায়। নবী সাঃ বলেছেন: (যার হাতে আমার প্রাণ সে সত্তার কসম, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে থাকবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর তাঁর আযাব নিপতিত করবেন। তখন তোমরা তাঁর নিকট দোয়া করবে কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল হবে না)
আর্থিক প্রতিযোগিতাঃ সামাজিক সুপরামর্শের অভাবের অন্যতম কারণ হল মানুষের মাঝে আর্থিক প্রতিযোগিতা। প্রত্যেক ব্যক্তিই অর্থ জমা করার পিছনে ছুটছে, যা মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করছে। ফলে মানুষদেরকে তাদের চরিত্রগত দিক বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যার ফলে মানুষেরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পরিত্যাগ করে সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতার পিছনে দৌড়াচ্ছে। আবার অনেক সময় বিচ্যুত লোকদের সম্পদের কারণে তাদের সাথে উঠাবসা করছে, খাচ্ছে ও তোষামোদ করছে; তাদের থেকে কিছু পাওয়ার আশায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে সতর্ক করেছেন এবং বিচ্যুত লোকদের সাথে মেলামেশা করার ফলে বনী ইসরাঈলরা কী শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিল তার বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ﴾لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ * كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ﴿ [বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে দাউদ ও মারইয়াম পুত্র ঈসার মুখে লা'নত করা হয়েছে। তা এ কারণে যে, তারা অবাধ্য হয়েছে এবং তারা সীমালঙ্ঘন করত। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা হতে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট।]
দায়িত্ববোধ অনুভব না করাঃ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমাজের দায়িত্ববোধ অনুভব না করার ফলে তা তাদেরকে এই বিধানের প্রতি অজ্ঞতা ও বাস্তবায়ন না করার দিকে নিয়ে গেছে। নবী সাঃ বলেছেন: (যার হাতে আমার প্রাণ সে সত্তার কসম, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে থাকবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর তাঁর আযাব নিপতিত করবেন। তখন তোমরা তাঁর নিকট দোয়া করবে কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল হবে না।)
কাজেই উম্মতের যে বিষয়টি একান্ত প্রয়োজন তা হল, এই বিধানের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে দায়িত্বের পরিধি জানা, যেন তারা আল্লাহর আবশ্যকীয় বিধান পালন করতে পারে।
৫- খারাপ সঙ্গীঃ বন্ধুর উপর তার কথা, কাজ ও বিশ্বাসে খারাপ বন্ধুর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। আর ইসলামী শিক্ষানীতি এ বিষয়ে অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে সতর্ক করেছে। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ﴿ [বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকীরা ছাড়া।] তিনি আরো বলেন: ﴾وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَّقَدْ أَضَلَّনি عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا﴿ [যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম। হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ পৌছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।] আর নবী সাঃ বলেছেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর গড়ে উঠে, সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিৎ সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।)
সুতরাং খারাপ সঙ্গী ব্যক্তির বিশ্বাসের উপর ও ইবাদতের বিধান পালনের উপর প্রভাব ফেলে। অনুরূপভাবে তা ব্যক্তির আচরণ ও চরিত্রের উপর প্রভাব ফেলে। ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: খারাপ বন্ধু তার জন্য বিচ্ছিন্নতা, বিভক্ততা, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, দুর্বলতা ও এমন বোঝা নিয়ে আসে যা বহন করতে সক্ষম নয়। তার কল্যাণ বিনষ্ট হয়, কল্যাণ বাদ দিয়ে তাদেরকে নিয়ে ও তাদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাদের চাহিদা ও দাবীর পিছনে চলে তার চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত হয়। কাজেই আল্লাহ ও পরকালের জন্য তার কী বাকী থাকে? বস্তুত খারাপ সঙ্গী হক হতে বাধা প্রদান করে, বাতিলের আদেশ দেয়, মিষ্ট ভাষায় খারাপ জিনিসকে সুশোভিত করে ও ভাল কাজ হতে নিষেধ করে; অকল্যাণ ও ফাসাদের প্রতি ভালবাসায় এবং কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতি ঘৃণায়। যেসব পরিবেশে মানুষ খারাপ সঙ্গীর শিকারে পরিণত হয় তা নিম্নরূপঃ
পড়ার সাথীঃ মাদরাসার সহপাঠীরা কোন সময় ভাল হয় আবার কোন সময় খারাপ হয়; উভয় প্রকার হতে কোন একটিকে এখতিয়ার করা এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার আলোকে। তাদের সাথে অধিক পরিমাণে উঠাবসা করা তাদের অনুসরণ ও অনুকরণ আবশ্যক করে, এজন্য নবী সাঃ আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছেন: (সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হযত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।)
এজন্য পরিবারের উপর ওয়াজীব হল, তারা তাদের সন্তানদেরকে উত্তম সাথী নির্বাচনের দিকনির্দেশনা দিবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপরও অনুরূপ কর্তব্য, তারা তাদের সকল ছাত্রদেরকে উত্তম সাথী হিসেবে গড়ে তুলবে।
আত্মীয়-স্বজনঃ সকল আত্মীয়-স্বজনই কল্যাণকামী ও ভাল নয় এবং আত্মীয়দের সকল সন্তানেরাও সৎকর্মশীল নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক পরিবার উদাসীন থাকে এবং তাদের সন্তানদেরকে খারাপ আত্মীয়দের সাথে মেলামেশা করার সুযোগ দেয়। যার ফলে ক্ষতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। আর তারা বিচ্যুত আচরণের উপর পরস্পর অধিক সহযোগিতা করে। যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্কের সাথে প্রবৃত্তির সম্পর্ক সম্পৃক্ত থাকে। কাজেই এ ধোঁকা থেকে পরিবারের সতর্ক থাকা উচিত এবং খারাপ লোকদের থেকে বেঁচে থাকা উচিত তারা যে পর্যায়েরই আত্মীয় হোক না কেন।
গ্রামের সাথীঃ স্থানগত নৈকট্য, সহজ সাক্ষাত ও বিপর্যয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাথী হওয়ার কারণে অনেক সময় গ্রামের লোকদের মধ্য হতেই খারাপ সঙ্গী হয়ে থাকে। আর এটা ছোট-বড় সকলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। গ্রামের এ ধরণের খারাপ সঙ্গী হওয়ার পিছনে পিতা-মাতার উদাসীনতার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশেষত যখন গ্রামের লোকদের মাঝে ভাল ও তাকওয়ার কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার ও সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধের সুপরামর্শের অভাব থাকে।
কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীঃ কর্মক্ষেত্রে খারাপ সহকর্মীর অপর সহকর্মীদের উপর কার্যকর প্রভাব রয়েছে। যেহেতু ব্যক্তিগত কাজের মঙ্গলের জন্য তাদের মাঝে সম্পর্ক বিদ্যমান। যা কোন কোন সময় এমন গভীর হয় যে পারস্পরিক যিয়ারত ও সম্পর্ক তৈরীতে রূপ নেয়। ফলে তাদের মাঝে সম্পর্ক গভীর হয় এবং তাদের মাঝে ধারাবাহিক ফ্যাসাদের চিত্র ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং ব্যক্তি যদি সতর্ক না হয় তবে কিছু সময় পর দেখবে যে সে তাদের মতই খারাপ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে এমন শক্তিশালী সংকল্পে অভ্যস্ত হতে হবে, যেন কোন বিচ্যুত ব্যক্তি তার উপর প্রভাব ফেলতে না পারে। আর ঐ ধরণের সম্পর্কগুলো যেন কাজের ও দায়িত্বপালনের পরিধি অতিক্রম না করে। সর্বপরি সে তার কর্মক্ষেত্রে কল্যাণকামিতার উত্তম ভিত্তি হবে, যা দ্বারা তার চারপাশের লোকদের অবস্থা সংশোধন হবে।
টিকাঃ
(১) আত-তারবিয়া ইসলামিয়া ওয়া দাওরুহা ফি ইলাজিল আহদাসিল জানেহীন, পৃঃ (৩৭২)।
(২) সহীহ বুখারী (১/৪২৪ হাঃ ১৩৮৫), সহীহ মুসলিম (৪/২০৪৭, হাঃ ২২/২৬৫)।
(৩) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৬৮, হাঃ ৪৮৩৩), সুনানে তিরমিযি (৪/৫০৯, হাঃ ২৩৭৮)। শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(৪) আস-সুলুকীল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী, পৃঃ (১৫৮-১৫৯)।
(১) আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন পৃঃ (৩৬২)।
(২) সূরা আল-আরাফঃ (১৭৯)।
(৩) সূরা আর-রুম (৬-৭)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৪৩৭)।
(৫) সূরা আয-যুখরুফঃ (৩৬)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/১৩৮)।
(২) ফাতহুল বারী (১/৬১)।
(৩) ইকতেযাইস সিরাত আল-মুস্তাকীম, পৃঃ (২৫)।
(৪) কালেমাত ফিল আখলাক পৃঃ (৬২)।
(৫) মুকাদ্দামা ফি ইলমিন নাফসিল ইজতেমায়ী ওয়া দিরাসাত আল-মুসলিমীন, পৃঃ (১৫৮-১৫৯)।
(১) ফি জিলালিল কুরআন (৪/১৩/২০৬)।
(২) সূরা আর-রাদ (২৮)।
(৩) সূরা আল-জীনঃ (১৩)।
(৪) ওয়াকিউনাল মুয়াসারা, পৃঃ (১৬৮)।
(৫) আল-জারিমা ফিল মুজতামা পৃঃ (৩৮৫)।
(১) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩৮৬)।
(২) হাজাতুনা ইলাল ঈমান ওয়াল আখলাক বিজিওয়ারিল ইলমে ওয়াত তেকনুলোজিয়া, পৃঃ (৩০৪)।
(৩) ইগাসাতুল লাহফান পৃঃ (৯১-৯৪)।
(৪) সূরা আল-বাকারাঃ (১০)।
(৫) সূরা আল-মায়েদাঃ (৫২)।
(১) সূরা আল-আহযাবঃ (৩২)।
(২) সূরা ইউনুসঃ (৫৭)।
(৩) সুনানে আবু দাউদ (১/২৩৯-২৪০, হাঃ ৩৩৬), সুনানে ইবনে মাজাহ (১/১৮৯, হাঃ ৫৭২), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(৪) আত-তুহফা আল-ইরাকিয়া ফি আমালিল কালবিয়া, পৃঃ (১৬৩)।
(৫) বাসায়ের লিল মুসলিম আল মুয়াসের, পৃঃ (১১৯)।
(৬) ইলমুল আমরাদ আন-নাফসিয়া ওয়াল আকলিয়া, পৃঃ (৪৭৯-৪৭০)।
(৭) মুকাদ্দামাতুল খাদামাতুল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (৪২৪)।
(১) আস-সুলুকুল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী (১/১৪৫)।
(২) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া ওয়াল ইলাজান নাফসী, পৃঃ (২৯)।
(৩) পূর্বোক্ত পৃঃ (৪১)।
(৪) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া, পৃঃ (২১৭)।
(১) পূর্বোক্ত, পৃঃ (২১৯)।
(২) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া, পৃঃ (২২১)।
(১) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া ওয়াল ইলাজান নাফসী, পৃঃ (৪২)।
(২) মুশকিলাতুশ শাবাব ওয়াল মানহাজাল ইসলামী ফি ইলাজিহা, পৃঃ (৮৫-৮৬)।
(৩) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া ওয়াল ইলাজান নাফসী, পৃঃ (৪৪)।
(১) মাদারিজুস সালেকীন (১/৪৮৮-৪৯৪)।
(২) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৪৯২)।
(৩) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৪৯১)।
(১) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৪৯৩)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৪/৫০৯-৫১০, হাঃ ২৩৮০) তিনি হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) মুকাদ্দামাতুল খাদামাতুল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (৪৪0)।
(১) আস-সুলুকুল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী, (১/১১১)।
(২) সুনানুল্লাহ ফিল মুজতামা মিন খিলালিল কুরআন, পৃঃ (৩৬-৩৭০।
(৩) ইলমুল ইজতেমা আল-হাদারী আত-তামাদ্দুন ফিশ শারকীল আওসাত, পৃঃ (১১৭-১৭৮)।
(১) আল-আয়ামেল আল-মুয়াদ্দিয়া ইলা তায়াতিল মুখাদ্দারাত, পৃঃ (৪২২)।
(২) আল-ইসলাম ওয়া দরুরিয়াতুল হায়া, পৃঃ (১৫২-১৫৩)।
(৩) সূরা সাবাঃ (৩৪)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৪০৯-৪১০)।
(৫) সূরা আল-কাসাসঃ (৭৭-৭৮)।
(১) আল-ইসলাম ওয়া দরুরিয়াতুল হায়া, পৃঃ (১৫৩)।
(২) সূরা হুদঃ (১১৬)।
(৩) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কায়ফা আলাজাহাল ইসলাম, পৃঃ (৮১)।
(৪) পূর্বোক্ত, পৃঃ (১৩)।
(৫) সুনানে নাসায়ী (৩/৭৩-৭৪, হাঃ ১৩৪৭), আহমাদ (৫/৩৬,৩৯,৪২), শায়খ আলবানী হাদিসটির সনদকে সহীহ বলেছেন।
(৬) সুনানে আবু দাউদ (২/১৯০-১৯১, হাঃ ১৫৪৪), সুনানে নাসায়ী (৮/২৬১, হাঃ ৫৪৬২), আহমাদ (২/৩০৫-৩২৫), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) সহীহ বুখারী (১/২৬৮, হাঃ ৮৩২, সহীহ মুসলিম (১/৪১২, হাঃ ১২৯-৫৮৯)।
(২) মুকাদ্দামাতুল খাদামাতাল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (৪৪২-৪৪৩)।
(৩) আস-সুলুকুল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী (১/১১০)।
(৪) আল-আয়ামেল আল-মুয়াদ্দিয়া ইলা তায়াতিল মুখাদ্দারাত, পৃঃ (৪৫৮)।
(১) আল-জারিমা ফিল মুজতামা, পৃঃ (৩৮০)।
(২) পূর্বোক্ত (৩৭৮)।
(৩) সয়দুল খাতের, পৃঃ (১৬১)।
(৪) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (১৬)।
(৫) মুকাদ্দামাতুল খাদামাত আল ইজতেমাইয়া পৃঃ (৪৪২)।
(১) পূর্বোক্ত পৃঃ (৪৪১)।
(২) মাদারিজুস সালেকীন (২/৪৫৬)।
(৩) সূরা আল-বাকারাঃ (২৭৩)।
(৪) আল- জারিমা ফিল মুজতামা, পৃঃ (৩৮৪)।
(৫) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩৭২)।
(৬) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩৭২)।
(১) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (৯)।
(২) আল-জারিমা ফিল মুজতামা পৃঃ (৩৮২)।
(৩) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (২৭)।
(৪) সূরা আল-হুজুরাতঃ (১০)।
(৫) সূরা আল-হাদীদঃ (৭)।
(১) সূরা আল-বাকারাঃ (২৫৪)।
(২) সূরা নূহঃ (১০-১২)।
(৩) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/৪৫৩)।
(৪) সূরা আন-নূরঃ (৩২)।
(৫) সূরা আত-ত্বলাকঃ (৭)।
(৬) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (১৩৩)।
(৭) সূরা আল-হুজুরাতঃ (১৩)।
(৮) সহীহ মুসলিম (৪/২০২৪, হাঃ ১৩৮-২৬২২)।
(১) সূরা আল-আনআমঃ (১৪১)।
(২) সূরা আল-ইসরাঃ (২৬-২৭)।
(৩) সূরা আল-কাসাসঃ (৭৭)।
(৪) আল খুলুকুল কামেল (১/৬৫)।
(১) মাদারিজুস সালেকীন (১/৪৮৯)।
(২) সূরা আল-ফুরকানঃ (২৭-২৯)।
(৩) সূরা আয-যুখরুফঃ (৬৭)।
(৪) সূরা আল-বাকারাঃ (১৬৬-১৬৭)।
(৫) ইকতেযাইস সিরাতাল মুস্তাকীম, পৃঃ (২৫)।
(১) ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া (১০/৯৪)।
(২) সূরা আল-আনকাবূতঃ (৪৫)।
(৩) মাদরিজুস সালেকীনঃ (১/৪০২)।
(৪) ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-ঈমান পৃঃ (২৮-২৯)।
(১) আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার পৃঃ (১৮)।
(২) আলামুল মুয়াক্কেয়ীন (২/১২২)।
(৩) সহীহ মুসলিম (২/৭০৫, হাঃ ৬৯-১০১৭)।
(১) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পৃঃ (৪৪)।
(১) ফাতাওয়া ইসলামীয়া (১/১১৮-১১৯)।
(১) প্রাগুক্ত (১/১১৭)।
(২) সূরা আল-মায়েদাঃ (২)।
(১) সহীহ মুসলিম (১/৬৯, হাঃ ৭৮-৪৯)।
(২) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, পৃঃ (২৬-২৭)।
(৩) সুনানে তিরমিযি (৪/৪০৬, হাঃ ২১৬৯), তিনি বলেন: এই হাদিসটি হাসান। শায়খ আলবানীও হাদিসকে হাসান বলেছেন।
(১) সূরা আল-মায়েদাঃ (৭৮-৭৯)।
(২) হাদিসটির তাখরিজ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩) সূরা আয-যুখরুফ: (৬৭)।
(৪) সূরা আল-ফুরকান: (২৭-২৯)।
(৫) সুনানে আবু দাউদ: (৫/১৬৮, হাঃ ৪৮৩৩)।
(১) মাদারিজুস সালেকীনঃ (১/৪৮৯)।
(২) সহীহ বুখারী (৩/৪৬৩, হাঃ ৫৫৩৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০২৬, হাঃ ১৪৬-২৬২৮)।
📄 বিচ্যুত আচরণসমূহের দায়ভার
উম্মতের মাঝে বিচ্যুত আচরণের উপস্থিতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে অধঃপতনের আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর ইসলামী শিক্ষার দায়িত্ব অর্পিত ব্যক্তিদের মাঝে ত্রুটি বিদ্যমানতার বিষয়ে এটা একটা ইন্ডিকেটর। বিচ্যুত আচরণের বিষয়ে শিক্ষার এই দায়ভার কোনটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং প্রত্যেক কর্তৃপক্ষই তাদের অবহেলার পরিমাণ অনুযায়ী দায়ী। সুতরাং দেশের কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে, অনুরূপভাবে পরিবারের, সমাজ ও ব্যক্তির তাদের পরিমাণ অনুযায়ী দায়ভার রয়েছে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক। আর প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। নেতা (イمام) একজন রক্ষক, সে তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে তার পরিবারের লোকজন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক, তাকে তার রক্ষনাবেক্ষন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইবনু উমর রাঃ বলেন আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছেন, ছেলে তার পিতার সম্পত্তির রক্ষক এবং সে জিজ্ঞাসিত হবে তার রক্ষনাবেক্ষন সম্বন্ধে। অতএব, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।)
বিচ্যুত আচরণের জন্য দায়ী কর্তৃপক্ষসমূহ নিম্নরূপঃ
প্রথমতঃ ব্যক্তিগত দায়ভারঃ
মানুষের উপর তার ব্যক্তিগত দায়ভার বর্তায়। সুতরাং সে তার চলাচল, বিচ্যুতি ও তদসংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে দায়িত্বশীল। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ﴿ [প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।] তিনি আরো বলেন: ﴾فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ * وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴿ [কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে সে তাও দেখবে।]
কাজেই কোন ব্যক্তির জন্য উচিত নয় যে, সে তার বিচ্যুতির জন্য সামাজিক পরিবেশকে দায়ী করবে, -যে পরিবেশে সে বসবাস করছে তা যদি বিচ্যুত হয়- অথবা খারাপ বন্ধু বা পরিবারকে দায়ী করবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যেন সে তার দায়িত্ব বহন করতে পারে। তাকে জ্ঞান দান করেছেন যা বিধি-বিধান প্রযোজ্য হওয়ার ভিত্তি, আর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন, যাদের সর্বশেষ হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাঃ, কুরআন আমাদের মাঝে বিদ্যমান, অনুরূপভাবে সুন্নাহ ও বিদ্যমান যা আমাদেরকে হকের পথ দেখায় এবং আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কি আবশ্যক করেছেন আর কি নিষেধ করেছেন তা বর্ণনা করে এবং মানব মনে এমন কিছুর উদ্রেক করে যা এগুলোকে আবশ্যক করে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا﴿ [তারপর তাকে তার সৎকাজের এবং তার অসৎ-কাজের জ্ঞান দান করেছেন।] অর্থাৎ তার জন্য ভাল-মন্দ বর্ণনা করে দিয়েছেন। শাওকানী বলেন: অর্থাৎ তাকে জানিয়েছেন ও বুঝিয়েছেন তার জন্য কি এবং এর মাঝে কি ভাল-মন্দ রয়েছে।
মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে আখেরাতের জন্য কি কাজ করেছে ও কি অর্জন করেছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে ও চিন্তা করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴿ [হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; এবং প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।]
নবী সাঃ ব্যক্তির চলাফেরারের বিষয়ে তার স্বীয় দায়িত্বের কথা বর্ণনা করে বলেন, (কিয়ামত দিবসে কোনো বান্দার পা ততক্ষণ পর্যন্ত নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: কোন কাজে তার জীবন অতিবাহিত করেছে এবং ইলম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে এবং তার ধন-সম্পদ কোথা হতে উপার্জন করেছে এবং তা কোথায় ব্যয় করেছে; এবং তার দেহ কোন কাজের মধ্য দিয়ে জীর্ণ করেছে।)
মুসলিম ব্যক্তির জানা উচিত যে, নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সর্বোত্তম জিহাদের অন্তর্ভুক্ত, এমনকি এটাকে সর্বশ্রেষ্ট জিহাদ বলা হয়েছে। নবী সাঃ বলেছেন: (প্রকৃত মুজাহিদ হলো সেই, যে স্বীয় নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে।) আর অপারগ ব্যক্তি সে যার সম্পর্কে উমর রাঃ বলেন: (প্রকৃত অপারগ ব্যক্তি সেই যে তার স্বীয় নফসকে পরিচালনা করতে অক্ষম।)
ফেরাউনের স্ত্রীর কথা চিন্তা করুন! সে একজন কাফের, উদ্ধত ও প্রতাপশালী ব্যক্তির গৃহে এবং আল্লাহর শত্রুর বাড়ীতে ছিল, কিন্তু সে তার নিজের দায়িত্বের বিষয় অনুধাবন করতে পেরেছিল, তাই সে কুফরীর দায় প্রকাশ করেনি যদিও সে তার অধীনে থাকত। বরং সে ঈমান এনেছিল এবং এমন কথা বলেছিল যার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছে: ﴾وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴿ [আর যারা ঈমান আনে, আল্লাহ্ তাদের জন্য পেশ করেন ফেরাউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত, যখন সে এ বলে প্রার্থনা করেছিল, হে আমার রব! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে উদ্ধার করুন ফেরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।]
আবার অনেক মানুষ তাদের বিচ্যুতির পক্ষে দলিল পেশ করে তাকদীরের কথা বলে। অর্থাৎ এটা তাদের উপর নির্ধারিত ও লিপিবদ্ধ। আর তারা ভুলে যায় শরীয়তের পক্ষ হতে তাদের কর্ম ও চলাচলের বিষয়ে দায়িত্ববোধ সম্পর্কে। অপরপক্ষে তাদেরকে রিযিক অন্বেষনের পিছনে ছুটতে দেখা যায় এই বলে যে, আল্লাহ তায়ালা সাবাব তথা উপকরণ গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তারা বিচ্যুতির ব্যাপারে নিজেদের বিভ্রান্ত করে, কিন্তু রিযিক উপার্জনের ক্ষেত্রে সঠিকপথে থাকে।
বান্দার নির্ধারিত তাকদীরের বিষয়ে দুটি অবস্থা এবং আদিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রেও দুটি অবস্থা। যখন এই অবস্থাগুলো বুঝবে তখন তার বিষয়গুলো ঠিক থাকবে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এর বর্ণনা করেছেন যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপঃ
প্রথম: তাকদীরের ক্ষেত্রে বান্দার অবস্থাঃ
১- তাকদীর পতিত হওয়ার পূর্বের অবস্থা: এই অবস্থায় তার কর্তব্য হচ্ছে সে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে, তাঁর উপর ভরসা করবে এবং তাঁর নিকট দোয়া করবে।
২- তাকদীর পতিত হওয়ার পরের অবস্থা: যদি তার কর্ম ছাড়াই তাকদীর নির্ধারিত বিষয় এসে যায়, তবে তার কর্তব্য হচ্ছে, ধৈর্যধারণ করা ও সন্তুষ্ট থাকা। আর যদি তার কর্মের ফলে তাকদীর নির্ধারিত বিষয় আসে এবং সেটা নিয়ামত হয়, তবে তার কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা করবে, আর যদি পাপের কাজ হয় তবে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে。
দ্বিতীয়ঃ আদিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে বান্দার অবস্থাঃ
১- কাজ করার পূর্বের অবস্থাঃ তা বাস্তবায়নের জন্য সংকল্প করা ও সে ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।
২- কাজ করার পরের অবস্থাঃ ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং কল্যাণকর কাজের নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া করা। এর মাধ্যেমে ব্যক্তি তার উত্তম আচরণ বাস্তবায়ন করবে এবং আদিষ্ট বিষয় ও তাকদীরের বিষয় হৃদয়াঙ্গম করতে পারবে।
কাজেই একজন মুসলিম তার চলাচল ও বিচ্যুতির বিষয়ে নিজের দায়িত্ববোধ অনুধাবন করবে। যদি সে শাস্তির উপযুক্ত হয় তবে দুনিয়াতে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। আর পরকালে আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন, নইলে তাকে শাস্তি দিবেন। তার কর্তব্য হল আল্লাহ থেকে যথাযথ লজ্জাবোধ করা যে, তিনি তাকে পাপকাজ করতে দেখবেন。
দ্বিতীয়তঃ পারিবারিক দায়ভারঃ
প্রতিপালনের পরিভাষায় পরিবারের অর্থ: তারা সে সমস্ত লোক যারা তার চারপাশে অবস্থান করে এবং তাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশ্বায়নের ফলে বর্তমানে মুসলিম পরিবারগুলো অসংখ্য আক্বীদাগত, চরিত্রগত ও চিন্তাগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে; যে বিশ্বায়নের মাধ্যমে চরিত্রগত ও ধর্মীয় সামাজিক পার্থক্যগুলোকে দূর করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো সন্তানদের প্রতি পরিবারের লালন-পালনগত দায়ভার বাড়িয়ে দিচ্ছে; বিশেষত এমন বিশ্বে যখন পঠনযোগ্য ও ভিষ্যুয়াল প্রচার মাধ্যমেগুলো বিস্তার লাভ করেছে যা পূর্ব হতে পশ্চিমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তাকে পথের দুর্গমতা বা দূরত্ব বাধা দিতে পারে না। বিশেষ যখন তা আকর্ষণীয় মোড়কে প্রচার করা হয়।
উপরাস্তু যখন মুসলিম পরিবারগুলো বৈশ্বিক সামাজিক পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, নারীরা কর্মক্ষেত্রে বের হচ্ছে, পুরুষের সাথে অফিস, মার্কেট ও কারখানায় মেলামেশা করছে। এ সকল বিষয়গুলো মুসলিম পরিবারকে নষ্টের হুমকি দিচ্ছে এবং এর সদস্যদের প্রতি শিক্ষার দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করছে。
ইসলাম পরিবারের উপর তার সদস্যদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক। আর প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। নেতা (ইমাম) একজন রক্ষক, সে তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে তার পরিবারের লোকজন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক, তাকে তার রক্ষনাবেক্ষন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।) এই হাদিস স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে ব্যক্তির দায়িত্বকে শক্তিশালী করে, যারা তার অধীনস্থ। অনুরূপভাবে মহিলা তার বাড়ীর সদস্যদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাদের হক আদায় ব্যতীত তার এই দায়িত্ব সম্পন্ন হবে না। যে দায়িত্বের অন্যতম হল রক্ষণাবেক্ষণ করা, দিকনির্দেশনা দেয়া এবং ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতিতে উপদেশ দেয়া; যার মাঝে থাকবে উত্তম আদর্শ, সদুপদেশ, উপমা বর্ণনা, আগ্রহী করা ও ভীতি প্রদর্শন করা এবং সবশেষ আদব শিক্ষা দেয়া。
মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ﴿ [হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর।] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন: তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের কাজ কর, তাঁর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তোমাদের পরিবারকে যিকিরের নির্দেশ দাও তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন। আলী বিন আবু তালেব রাঃ বলেন: তোমরা তাদের শিক্ষা দাও ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও。
পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা পরিপালনগত দায়িত্ব পালনের দাবী রাখে; নসিহত ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। কাজেই মুসলিম পরিবারের উপর আবশ্যক তাদের সন্তানদের প্রতি গুরুত্ব দেয়া ও হেফাযত করা এবং তাদেরকে সকল ধরণের চারিত্রিক বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা।
এই উম্মতের সালাফে সালেহীনগণ পরিবারের দায়িত্ব ও তার বিশাল গুরুত্ব অনুধাবন করতেন। উমর বিন আব্দুল আজিজ রহঃ আমাদের জন্য পরিপালনগত দায়িত্ববোধের একটি উত্তম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে গেছেন। তিনি তার সন্তানদেরকে উত্তমভাবে লালন-পালন করেছিলেন। তার নিকট সংবাদ পৌছেছিল যে, তার এক সন্তান একহাজার দিরহাম দিয়ে আংটির পাথর ক্রয় করেছেন, তখন তার কাছে লিখে পাঠালেন: আমার নিকট সংবাদ এসেছে যে, তুমি একহাজার দিরহাম দিয়ে একটি আংটির পাথর ক্রয় করেছ, তুমি সেটা বিক্রয় করে দিয়ে তার দ্বারা একহাজার জন ক্ষুধার্থকে খাবার দাও। আর তুমি একটি লোহার চায়না আংটি খরিদ কর এবং তাতে লিখে রাখ, আল্লাহ সে ব্যক্তির প্রতি রহম করুন যে তার নিজের মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত।
সুতরাং বর্তমানে পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে; যেহেতু জীবনকে বিশ্বায়ন, স্নায়ুযুদ্ধ ও আক্বীদাগত বিচ্যুতি বেষ্টন করে রেখেছে এবং সরাসরি সম্প্রচার ও দ্রুত ভ্রমণমাধ্যমের কারণে দূরত্ব কমে এসেছে।
তৃতীয়তঃ সামাজিক দায়ভারঃ
আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে একটি মহান বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যদি তারা এই বৈশিষ্ট্যের দাবী অনুযায়ী কাজ করে। বৈশিষ্ট্যটি হল উত্তমতা যার চাহিদা হল সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মাধ্যমে পারস্পরিক কল্যাণকামনার দায়িত্ব পালন করা। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ﴿ [তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য যাদের বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।]
উপরোক্ত আয়াতে এই উম্মতের প্রশংসা করা হয়েছে যতক্ষণ প্রর্যন্ত তারা এটা বাস্তবায়ন করবে এবং এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে। আর যখন তারা বাধা দেয়া ছেড়ে দিবে এবং খারাপ কাজে সহমত পোষণ করবে তখন তাদের থেকে এই প্রশংসা বিলীন হয়ে যাবে। কাজেই এই উম্মতের যে ব্যক্তি উক্ত গুণগুলো ধারণ করবে সে তাদের সাথে প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত হবে। কাতাদা রহঃ বলেন: আমার কাছে সংবাদ পৌছেছে উমর রাঃ একবার হজ করতে গিয়ে মানুষের মাঝে সহনশীলতা দেখতে পেলেন, তখন তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন [তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য যাদের বের করা হয়েছে;] অতঃপর বললেন: যে ব্যক্তি এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আনন্দিত হতে চায় সে যেন এর শর্ত পূরণ করে। আর যে ব্যক্তি এই গুণগুলো ধারণ করবে না, সে আহলে কেতাবদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হবে যাদেরকে আল্লাহ তিরস্কার করেছেন।
এটা উপরোক্ত উপকরণগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ হতে এই উম্মতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান; যার মাধ্যমে তারা বৈশিষ্ট্য মন্ডিত হয়েছে এবং সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে। তারা শ্রেষ্ঠ মানুষ নসিহত পেশ, কল্যাণের প্রতি ভালবাসা, দাওয়াত, শিক্ষা, দিকনির্দেশনা এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের বাধা প্রদানের দিক থেকে। তাই আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে আদেশ করেছেন যেন তারা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করণের দায়িত্ব পালন করে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴿ [আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম।]
ইসলাম সমাজের উপর সেই দায়িত্ব অর্পণ করে যা তার সাধ্যের মধ্যে। তাইতো সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী কল্যাণ কামনার দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘৃণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর।)
সামাজিক দায়িত্ব শুধু খারাপ কাজে বাধা প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কর্তব্য হল খারাপ কাজ বিদ্যমানতার কারণ দূর করা; দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতার মাধ্যমে। যেন সে তার প্রয়োজন পূরণে চুরি ধোঁকাবাজী ইত্যাদি বিচ্যুত আচরণের দিকে না যায়।
আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য আয়াতে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন: ﴾لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ﴿ [তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করবে না। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।] আবু তালহা রাঃ এই আয়াত শ্রবণের পর খুবই চমৎকার ঘটনা ঘটান, যা আনাস রাঃ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: (মদিনার আনসারীগণের মধ্যে আবু তালহা (রাঃ) সব চাইতে অধিক খেজুর বাগানের মালিক ছিলেন। মসজিদে নববীর নিকটবর্তী বায়রুহা নামক বাগানটি তাঁর কাছে অধিক প্রিয় ছিল। রাসূল সাঃ তাঁর বাগানে প্রবেশ করে এর সুপেয় পানি পান করতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ [তোমরা যা ভালোবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করবে না] তখন আবূ তালহা (রাঃ) রাসূল সাঃ এর কাছে গিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ বলছেনঃ তোমরা যা ভালোবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনও পূণ্য লাভ করবেনা। আর বায়রুহা বাগানটি আমার কাছে অধিক প্রিয়। এটি আল্লাহর নামে সাদকা করা হল, আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়রূপে থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভাল মনে করেন তাকে দান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাকে ধন্যবাদ এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ, এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ।)
চতুর্থতঃ রাষ্ট্রের দায়ভারঃ
রাষ্ট্র ব্যতীত সামাজিক মূল্যবোধ ঠিক হয় না, আর শাসক ব্যতীত কোন রাষ্ট্র হতে পারে না যে শাসক সেখানে ফয়সালা করবে ও আল্লাহর বিধান কায়েম করবে। আর শাসকের বিষয়গুলো প্রজা ছাড়া বাস্তবায়িত হবে না, যারা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জানবে, শাসকের হক আদায় করবে, তার কথা শ্রবণ করা, তার জন্য কল্যাণ কামনা ও একনিষ্টতার মাধ্যমে এবং সমাজের হক আদায় করবে রক্ষণাবেক্ষণ, সংশোধন ও ক্ষতি প্রতিরোধের মাধ্যমে, সর্বোপরি দেশ থেকে তা নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে।
সুতরাং খারাপ চরিত্র দূরীভূত করা ও তা প্রতিরোধ করা শাসকের দায়িত্ব। এরা দুই ধরণের: ওলামা ও শাসকবর্গ। এদের সাথে অন্তর্ভুক্ত হল, রাজাগণ, মাশায়েখগণ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ও সরকারী কর্মচারীবৃন্দ। তাদের প্রত্যেকের উপর আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তার আদেশ দেয়া এবং তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বারণ করা আবশ্যক।
রাষ্ট্রের আমানত বাস্তবায়নের ব্যাপারে শাসক আল্লাহর সামনে জিজ্ঞাসিত হবে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সকলেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক একজন দায়িত্বশীল এবং সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।) তিনি আরো বলেন: (আল্লাহ তায়ালা যে বান্দাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে খেয়ানতকারীরুপে যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।) তিনি আরো বলেন: (এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; সে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ প্রবেশ করতে পারবে না।) তিনি শাসনভারের দায়িত্ব সম্পর্কে আবু যার রাঃ কে বলেছিলেন: (হে আবূ যার! তুমি দুর্বল অথচ এটা হচ্ছে একটা আমানত। আর কিয়ামতের দিন এটা লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে। তবে যে এটা যথাযথরূপে গ্রহন করবে এবং তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে (তার কথা স্বতন্ত্র)।)
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শাসকের জন্য যে বিষয়গুলো পালন আবশ্যকীয় তা নিম্নরূপঃ
১- প্রমাণিত মূলনীতি ও সালাফে সালেহীনের ঐক্যমতের আলোকে দ্বীনের হেফাযত করা।
২- বিবাদমান দুই পক্ষের মাঝে সমাধান করে দেয়া, যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কোন যালিম সীমালঙ্ঘন করতে না পারে বা কোন নির্যাতিত নিজেকে দুর্বল মনে না করে。
৩- জাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও নারীর সংরক্ষণ করা যেন মানুষেরা জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে ও সফরের সময় নিরাপত্তা অনুভব করে নিজের ব্যক্তি বা সম্পদের ক্ষতি হওয়া থেকে।
৪- শরয়ী শাস্তি বাস্তবায়ন করা; যেন আল্লাহর হারামকৃত বিষয় লঙ্ঘন করা না হয় এবং বান্দার হক নষ্ট থেকে রক্ষা পায়।
৫- অপচয় ও কৃপণতা মুক্তভাবে বায়তুল মাল থেকে দান ও বেতন ভাতা নির্ধারণ করা এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করা।
রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে ভালকাজের প্রচার করা ও খারাপ কাজ প্রতিহত করা যা বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হল মানুষের মাঝে শরয়ী শিক্ষার বিস্তার করা এবং খারাপ চরিত্রবানদের উপর শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ করা। শাস্তি দুই ধরণের;
সাধারণ শাস্তিঃ তা হল শরয়ীতের নিষিদ্ধ কাজ করার ফলে কিংবা শরীয়তের আদেশ পালন না করার কারণে সে শাস্তি হয়।
হদের শাস্তিঃ আল্লাহর হক লঙ্ঘনের কারণে শরীয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট শাস্তি। যেমন যেনা, সমকামিতা, চুরি, মদ্যপান, মুরতাদ হওয়া, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইত্যাদি হদের শাস্তি。
অনির্ধারিত শাস্তিঃ যে সমস্ত অপরাধের ক্ষেত্রে শরীয়তে নির্দিষ্ট হদ নেই তার জন্য শাস্তি দেয়া। এর হুকুম ব্যক্তি ও কর্ম ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সুতরাং এটা এক দিক থেকে হদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কেননা তা সংশোধন ও সতর্ক করার জন্য শাস্তি, আর হদ থেকে ভিন্ন এ কারণে যে, অপরাধের ভিন্নতার কারণে তা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে。
সুতরাং রাষ্ট্র যদি তার শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের দায়িত্ব পালন করে তাহলে সমাজের বিষয়গুলো ঠিক থাকে এবং বিচ্যুত ব্যক্তিরা বিরত থাকে। আর যদি এই দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করে তাহলে সমাজের মানুষদের মাঝে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, খারাপ চরিত্র ব্যাপকতা লাভ করে এবং বিপদ নেমে আসে। তাই মুসলিম দেশের তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক।
নবী সাঃ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদের শাস্তি প্রয়োগ না করার ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেছেন: (যে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমা লঙ্ঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মতো, যারা কুরআ'র মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পেল উপর তলায় আর কেউ নীচ তলায় (পানির ব্যবস্থা ছিল উপর তলায়) কাজেই নীচের তলার লোকেরা পানি সংগ্রহ কালে উপর তলার লোকদের ডিঙ্গিয়ে যেত। তখন নীচ তলার লোকেরা বলল, উপর তলার লোকেদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নেই (তবে ভালো হয়) এমতাবস্থায় তারা যদি এদেরকে আপন মর্জির উপর ছেড়ে দেয় তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে) তবে তারা এবং সকলেই রক্ষা পাবে।)
রাষ্ট্রের শাসকের উপর আবশ্যক হল উপযুক্ত লোকদের উপর দায়িত্ব অর্পন করা। কেননা মানুষেরা হল আল্লাহর বান্দা আর শাসকগণ হলেন বান্দাদের উপর আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তারা বান্দাদের ব্যাপারে কার্যনির্বাহী; পরস্পর অংশিদারিত্ব পর্যায়ের। সুতরাং তাদের মাঝে দায়িত্ব ও প্রতিনিধিত্বের অর্থ রয়েছে। সুতরাং দয়িত্বশীল ও প্রতিনিধি যখন কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয় এবং তার চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে বাদ দেয় অথবা কোন পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশি দামে ক্রয় করার লোক থাকা সত্ত্বেও কম দামে বিক্রি করে তাহলে সে খিয়ানত করল।
যখন মুসলিম রাষ্ট্র এই দায়িত্বগুলো পালন করবে, তখন তাদের অবস্থা ভাল হবে, তাদের চরিত্র সংশোধিত হবে এবং তাদের চারিত্রিক বিচ্যুতি কমে আসবে। উমর রাঃ মদিনায় নৈশ প্রহরী রাখতেন এবং তিনি নিজে দিন-রাত মদিনার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন মুসলিমদের অবস্থা জানার জন্য, বঞ্চিতদেরকে তাদের হক দেয়ার জন্য এবং অত্যাচারিতদেরকে সাহায্য করা ও যালিমদেরকে পাকড়াও করার জন্য।
যদি সমাজ এমন দেশে হয় যে দেশ কল্যাণ প্রচারে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করে এবং শরয়ী শাস্তি বাস্তবায়ন করে, তাহলে সে সমাজের লোকদের মাঝে এই হদগুলোর প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত হবে, বিচ্যুত ও খারাপ আচরণ থেকে দূরে থাকবে এবং উন্নত চরিত্রের প্রতি তারা আগ্রহী হবে। সুতরাং এই সমাজের মাঝে কোন অপরাধ বিস্তার লাভ করবে না। কেননা যখন সমাজের মাঝে অকল্যাণ ও খারাপ চরিত্রের পথ রুদ্ধ হবে তখন অবশ্যই কল্যাণ ও উত্তম চরিত্রের পরিধি বিস্তার লাভ করবে। ফলে মানুষেরা ইসলামী চরিত্রে ভরপুর সুখী জীবন যাপন করবে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা প্রয়োজন তা হল, যদি শাসক তার প্রজাদের প্রতি যুলুম করে, তবে মুসলিমের প্রতি আবশ্যক হল ধৈর্যধারণ করা, বিদ্রোহ ও বিতর্কের মাধ্যমে তার মোকাবেলা করা বৈধ নয়। কেননা তাতে মুসলিমদের উপর অনেক বিপদ ও ক্ষতি নেমে আসে। যখন কোন সম্প্রদায় তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তখন তাদের আঙ্গিনায় অকল্যাণ নেমে আসে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা আমার ওফাতের পর অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়া দেখতে পাবে, তখন তোমরা ধৈর্যধারণ করবে, হাউযে কাওসারে আমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত।) এক ব্যক্তি রাসূল সাঃ কে জিজ্ঞেস করেছিল, (হে আল্লাহর নবী! যদি আমাদের উপর এমন শাসকেরা ক্ষমতাবান হয় যে, তারা তাদের হক তো আমাদের কাছে দাবী করে কিন্তু আমাদের হক তারা দেয়না। এমতাবস্থায় আপনি আমাদেরকে কি করতে বলেন? তিনি তার উত্তর এড়িয়ে গেলেন। তিনি আবার তাকে প্রশ্ন করলেন, আর তিনি এড়িয়ে গেলেন। এভাবে প্রশ্নকারী দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারও একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন আশআস ইবন কায়েস রাঃ তাকে টান দিলেন। তিনি বললেন: তোমরা শুনবে এবং মানবে। কেননা তাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তাদের উপর বর্তাবে আর তোমাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তোমাদের উপর বর্তাবে।)
পঞ্চমতঃ শিক্ষার পরিবেশের দায়ভারঃ
এর দ্বারা শিক্ষা ও সংশোধনের জন্য প্রস্তুতকৃত স্থানসমূহ। যেমন: মাদরাসা, মসজিদ, সামাজিক সংরক্ষণ অফিস, কিশোর সংরক্ষণ অফিস ও জেলখানা। এই পরিবেশগুলোর কার্যকর প্রভাব রয়েছে, খারাপ চরিত্রের প্রতিষেধকমূলক বা প্রতিরোধমূলক হোক। যেহেতু এর মাধ্যমে উত্তম চরিত্রের পরিপালনের বিস্তার এবং নোংরা চরিত্রের প্রতিকার করা হয় ও যারা এতে অভ্যস্ত তাদের থেকে তা দূর করা হয়।
মানুষের মাঝে উত্তম চরিত্র প্রথিত করতে এবং তাদের খারাপ ও বিচ্যুত আচরণকে প্রতিরোধ করতে এই পরিবেশের উপর শিক্ষণীয় গুরুত্বারোপের দায়িত্ব অর্পিত হয়। যা নবী সাঃ এর এই কথা থেকে গ্রহণ করা হয় (তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সকলেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।) সুতরাং শিক্ষক তার ক্লাসে ছাত্রদের বিষয়ে দায়িত্বশীল, মসজিদের ইমাম তার মসজিদের লোকদের বিষয়ে দায়িত্বশীল, তার এলাকায় খারাপ চরিত্রগুলো খুজে বের করে হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তার প্রতিকার করবে; আকর্ষণীয় জুমার খুতবার মাধ্যমে যাতে থাকবে ভাল কাজে উৎসাহ প্রদান, খারাপ থেকে সতর্কবার্তা, সত্য ঘটনা, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদাহরণ বর্ণনা এবং খারাপ চরিত্রের ফলে সমাজে যে সব ঘটনা ঘটছে তার পর্যালোচনা।
জেলার তার জেলে বন্দী লোকদের বিষয়ে দায়িত্বশীল, সে তাদের দেখাশোনা করবে, তাদেরকে উত্তম চরিত্রের প্রতি উৎসাহিত করবে, তাদের বিচ্যুতির দিকগুলো জানবে এবং তাদেরকে শিক্ষা, উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নিয়োগ দিবে যে তাদের থেকে অজ্ঞতা ও নোংরা চরিত্রকে দূর করবে।
অনুরূপভাবে সামাজিক সুরক্ষা অফিসসমূহ ও কিশোর অপরাধ বিষয়ক অফিসসমূহ তাদের সদস্যদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তারা তাদের সন্তানতুল্য। আর আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে সৎকর্ম, অনুগ্রহ ও পারস্পারিক সহযোগিতা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴿ [নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না।] নবী সাঃ বলেছেন: (আল্লাহ তায়ালা যে বান্দাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে খেয়ানতকারীরুপে যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।)
এ সকল দায়িত্বের ক্ষেত্রে বর্ণিত পরিণতি মুসলিমদের কোন বিষয়ে দায়িত্বশীলদের বিশাল মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। চায় তিনি শাসক হোন বা শিক্ষক হোন বা কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান হোন। কেননা মানুষদের দায়িত্বভার গ্রহণ করা সহজ কথা নয়। বরং ইসলামী মানহাজে তা বিশাল আমানত আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ; যা মানুষদের সকল বিষয় ও কর্মে পূর্ণ প্রচেষ্টার দাবী রাখে। আর এটা আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত মানুষের সকল ধরণের প্রতিপালন ও দিকনির্দেশনাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তায়ালা এই আমানত আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন: ﴾إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا﴿ [নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।] তিনি আরো বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴿ [হে ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।]
আর যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলগণ শিক্ষার দায়িত্বের আমানত আদায় করতে অক্ষম হবে তখন শিক্ষাদান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তাদের অধীনস্তদের মাঝে উত্তম চরিত্র বির্নিমাণে ও বিচ্যুত চরিত্র দূরীকরণে ব্যর্থ হবে। তার ফলে সমাজে অপরাধ ও ছিনতাই বৃদ্ধি পাবে এবং ফাসাদ ও সম্ভ্রমহানী ব্যাপক আকার ধারণ করবে। সর্বোপরি মানুষের হক নষ্ট করা হবে। বর্তমান সমাজ যে চারিত্রিক অধঃপতন লক্ষ্য করছে তা মূলত দায়িত্ব ও তার মহত্ব অনুভব না করার কারণে। আর এ থেকে সৃষ্টি হয়েছে দুর্বল ও ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা যা মানুষকে তার প্রবৃত্তি, আকাঙ্খা ও শয়তানী খেয়াল প্রতিরোধ করার ব্যাপারে শক্তিশালী করে না। সুতরাং মুসলিম সমাজকে অবশ্যই খারাপ চরিত্র প্রতিরোধে তার শিক্ষার দায়িত্ববোধ অনুধাবন করতে হবে এবং এই পরিবেশ তার সর্বশক্তি দিয়ে উত্তম চরিত্র গঠন করতে ও খারাপ চরিত্র দাফন করতে চেষ্টা করবে。
টিকাঃ
(১) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হাঃ ৬৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হাঃ ২০/১৮২৯)。
(২) সূরা আল-মুদ্দাস্সিরঃ (৩৮)。
(৩) সূরা আয-যিলযালঃ (৭-৮)。
(১) সূরা আশ-শামসঃ (৮)。
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/৫৫১)。
(৩) ফাতহুল কাদীর (৫/৪৪৯)。
(৪) সূরা আল-হাশরঃ (১৮)。
(৫) সুনানে তিরমিযি (৪/৫২৯, হাঃ ২৪১৭), তিনি বলেছেনঃ হাদিসটি হাসান সহীহ, শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(৬) আল-জামে লি আহকামিল কুরআন (১৩/২৪২)。
(৭) সুনানে তিরমিযি (৪/১৪২, হাঃ ১৬২১), মাসনাদে আহমাদ (৬/২০), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(৮) আদাবুদ দুনিয়া ওয়া আদদ্বীন পৃঃ (২৩৪)。
(১) খালেদ হামেদ রচিত আল-মুশকিলা আত-তারবাবীয় আল-উসারীয়া পৃঃ (৪)。
(২) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হাঃ ৬৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হাঃ ২০/১৮২৯)。
(৩) সূরা আত-তাহরীমঃ (৬)。
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/২৩৩)。
(৫) পূর্বোক্ত ((৪/৪১৭)。
(১) সিরাত ও মানাকিবু উমার বিন আব্দুল আজীজ, পৃঃ (৩১৫)。
(২) সূরা আলে ইমরানঃ (১১০)。
(৩) আল-জামে লি আহকামিল কুরআন (৪/১১১)。
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৪০৪)。
(১) তাফসীরে সাদী (১/২৬২)。
(২) সূরা আলে ইমরানঃ (১০৪)。
(৩) সহীহ মুসলিমঃ (১/৬৯, হাঃ ৭৮-৪৯)。
(৪) সূরা আলে ইমরান (৯২)。
(১) সহীহ বুখারী (৩/২০৯, হাঃ ৪৫৫৪)。
(২) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, পৃঃ (৬৮)。
(৩) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হাঃ ৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হাঃ ২০/১৮২৯)。
(৪) সহীহ মুসলিম (১/১২৫, হাঃ ২২৭-১৪২)。
(৫) পূর্বোক্ত (১/১২৬, হাঃ ২২৯-১৪২)。
(৬) পূর্বোক্ত (৩/১৪৫৭, হাঃ ১৬/১৮২৫)。
(১) আল-আহকাম আস-সুলতানিয়াঃ পৃঃ (১৮)。
(২) আল- উকুবাত ফিত তাশরী আল ইসলামী, পৃঃ (১৯)。
(৩) নায়লুল আওতার (৭/৮৭)。
(৪) আল-আহকাম আস-সুলতানিয়াঃ পৃঃ (১৮)。
(১) সহীহ বুখারী (২/২০৫-২০৬, হাঃ ২৪৯৩)。
(২) আস-সিয়াসা আশ-শারয়িয়া, পৃঃ (১৪)。
(৩) তারিখু উমার বিন খাত্তাব (১০২-১১৩)。
(৪) সহীহ মুসলিম (৩/১৪৭৪, হাঃ ৪৮-১৮৪৫)。
(৫) সহীহ মুসলিম (৩/১৪৭৪-১৪৭৫, হাঃ ৪৯-১৮৪৬)。
(১) সূরা আল-মায়েদাঃ (২)。
(২) সহীহ মুসলিম (১/১২৫, হাঃ ২২৭-১৪২)。
(১) সূরা আন-নিসা: (৫৮)。
(২) সূরা আল-আনফাল: (২৭)。
📄 মন্দ চরিত্র নিরাময়ের পদ্ধতি
প্রত্যেক রোগেরই ঔষুধ রয়েছে, কেই হয়ত জানে আবার কেউ জানে না। ইসলামী মানহাজের আলোকে দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে বিচ্যুত আচরণের চিকিৎসা মৃত অন্তরকে জীবিত করে; যেহেতু এর ফলে জীবন উত্তম চরিত্রের চর্চা করে এবং পৃথিবীকে উত্তমতা ও কল্যাণ দিয়ে আবাদ করে। মন্দ চরিত্র নিরাময়ের পদ্ধতি নিম্নে আলোচনা করা হল:
প্রথমতঃ শরয়ী জ্ঞানের প্রচার করাঃ
ইলমের মর্যাদা তার বিষয় বস্তুর আলোকে হয়ে থাকে। বস্তুত ইলমের উপকারিতা চরিত্রের মাঝে তার প্রভাব বাস্তবায়নের মাঝে নিহিত থাকে। আর সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ইলম হল দ্বীনের ইলম; কেননা তা জানার ফলে মানুষ পথ পায় আর এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে পথভ্রষ্ট হয়।
ইলমের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি জানতে পারে আল্লাহ তাকে কী নির্দেশ করেছেন, ফলে তার অনুসরণ করে এবং জানতে পারে কোন বিষয় থেকে তিনি নিষেধ করেছেন, ফলে তা থেকে বিরত থাকে। আর সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ইলম হল শরীয়ত ও এর শাখা-প্রশাখার ইলম। এটা এমন ইলম যা বান্দাকে তার রবের নিকটবর্তী করে, তার নিকট উত্তম চরিত্রকে সুশোভিত করে যেন তা গ্রহণ করে, মন্দ চরিত্র থেকে তাকে দূরে রাখে এবং তার নিকট পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে তোলে। তাই আলেমগণই আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করে এবং মন্দ চরিত্র থেকে দূরে থাকে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ﴿ [আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাকে ভয় করে।]
কাজেই মানুষ আল্লাহর সম্পর্কে যত বেশি জানবে তত বেশি তাকে ভয় করবে। আল্লাহর ভয় তার জন্য পাপমুক্ত থাকা এবং তার সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত থাকাকে আবশ্যক করে। এটা ইলমের ফযিলতের প্রমাণ বহন করে, কেননা তা আল্লাহকে ভয় করার প্রতি আহ্বান করে।
ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: ইলম হল জীবন ও নূর আর অজ্ঞতা হল মৃত্যু ও অন্ধকার। সকল অকল্যাণের কারণ হল জীবন ও নূরের অনুপস্থিতি, আর সকল কল্যাণের উৎস হল নূর। কিতাব ও সুন্নাহর নূরের চেয়ে উত্তম কিছু নেই। এই দুয়ের মাধ্যমে অন্তর পূণর্জ্জীবিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجিীবُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ ۖ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ﴿ [মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দাও; যখন সে তোমাদেরকে আহবান করে তার প্রতি, যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন। আর নিশ্চয় তাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।]
অর্থাৎ তোমরা আনুগত্যের আহবানে সাড়া দাও এবং কুরআনের অন্তর্গত আদেশ-নিষেধের বিষয়ে সাড়া দাও, কেননা এতেই রয়েছে স্থায়ী জীবন ও দীর্ঘস্থায়ী নিয়ামত।
সুতরাং পরিবার, মাদরাসা ও সকল শিক্ষার মাধ্যমসমূহ সবচেয়ে উত্তম যে চিকিৎসা উপস্থাপন করতে পারে তা হল শরয়ী ইলম শিক্ষা দেয়া; যা মন্দ আচরণকে দূরীভূত করে আর উত্তম চরিত্র গঠন করে।
কাজেই শুধু ইসলামী বিভাগগুলোতেই শরয়ী শিক্ষা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, যেমনটি ইসলামী সমাজের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান, বরং বিজ্ঞান বিভাগের সকল শাখায় পর্যাপ্ত পরিমাণ শরয়ী শিক্ষা থাকা আবশ্যক। এটাই হল সঠিক চিকিৎসা ও নিরাময়। যারা মাদকাসক্তি থেকে ফিরে এসেছে তাদের একটা বিরাট অংশ দ্বীনি দিক-নির্দেশনার ফলেই ফিরে এসেছে, যেমনটি গবেষণা থেকে প্রমাণিত। আর এটি আমাদের নিকট কুরআন ও সুন্নাহর ইমানের মাধ্যমেও প্রমাণিত।
পরিবার যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক্ষেত্রে ঘাটতি লক্ষ্য করে, তাহলে তাদের উপর আবশ্যক হল তারা শরয়ী শিক্ষার এই ঘাটতি পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে; যা তাদেরকে দ্বীন ও ফরয বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবে এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ শরীয়ত যা থেকে নিষেধ করেছে তার জ্ঞান দিবে। কোন মুসলিম পরিবার বা কোন মুসলিম ব্যক্তি যেন এই কারণ না দেখায় যে, যাদের বিভাগ ভিন্ন যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিজিক্স বা কৃষি তাদেরকে শরয়ী জ্ঞান শিখানো হবে না। বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য এতটুকু জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক যা দ্বীনের বিষয়ে তার অজ্ঞতাকে দূর করবে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শিক্ষিতদের চেয়ে অশিক্ষিতদের মাঝে মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণের প্রবণতা অনেক বেশি। যেখানে তাদের পরিমাণ হল প্রায় ৭০%। মাদক গ্রহণের অন্যতম কারণ হল তার হাকিকত সম্পর্কে অজ্ঞতা ও তার উপকারিতার বিষয়ে ভুল ধারণা। যেহেতু অধিকাংশ মাদকসেবীরা মনে করে যে, মাদক তার কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং বন্ধুদের সাথে সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয়তঃ সৎ সঙ্গীঃ
চারিত্রিক প্রভাবকের অন্যতম হল সৎ সঙ্গী যারা তাকে কল্যাণের পথ দেখায় ও তা গ্রহণে উৎসাহিত করে এবং অকল্যাণের পথ হতে সতর্ক করে ও সে পথে চলতে নিরুৎসাহিত করে। এ মর্মে নবী সাঃ বলেন: (সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।) তিনি আরো বলেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।)
সুতরাং বিচ্যুত আচরণ নিরাময় করতে বা তার থেকে রক্ষা পেতে অথবা উত্তম চরিত্র গঠন করতে অবশ্যই সৎ সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। কেননা যে উত্তম চরিত্র গঠন করতে চায় তাকে অবশ্যই সেই পথেই চলতে হবে এবং এই পথে অবশ্যই তাকে সৎ সঙ্গী গ্রহণ করতে হবে, যে তাকে ভাল কাজ, সততা, উত্তম আচরণ, ধৈর্যধারণ ও প্রতিশ্রুতি পূরণে সহযোগিতা করবে।
সৎ সঙ্গীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: শরয়ী জ্ঞানের প্রতি গুরুত্বারোপ, বাস্তব জীবনে তার বাস্তবায়ন, উন্নত চিন্তাধারা, উত্তম আচরণকারী, কথার পূর্বে কর্মের মাধ্যমে কল্যাণের প্রতি আহবানকারী, আপনি তাকে কল্যণের পথে অগ্রগামী ও তার পথ উন্মোচনকারী পাবেন, সে হবে অকল্যাণের পথ রুদ্ধকারী, সে বন্ধুর ভুল এড়িয়ে যায়, তাকে সততার সাথে নসীহা করে, সে কাজকে ভালবাসে প্রফুল্লচিত্তে অলসতা বশত নয়।
পক্ষান্তরে অসৎ বন্ধু: তার বন্ধুত্ব গ্রহণের পর শুধু আফসোস ও অনুশোচনা করতে হবে; অথচ তখন অনুশোচনা কোন কাজে আসবে না। মহান আল্লাহ অসৎ সঙ্গের পরিণতি বর্ণনা করে বলেন: ﴾وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي ۗ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا﴿ [যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম। হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ পৌছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।]
সালাফে সালেহীনগণ অসৎ সঙ্গ থেকে সতর্ক করেছেন। জনৈক সালাফ বলেন: তোমরা দু'ধরণের মানুষ থেকে সতর্ক থাক। প্রবৃত্তির অনুসারী যাকে তার প্রবৃত্তি ফেতনাগ্রস্ত করেছে আর দুনিয়া অনুসন্ধানী লোক, দুনিয়া যাকে অন্ধ করে রেখেছে।
মাঠপর্যায়ের গবেষণা ইঙ্গিত করে যে, খারাপ চরিত্রে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গীর কার্যকর প্রভার রয়েছ। গবেষণা স্পষ্ট করেছে যে, কর্মক্ষেত্রের লোকদের নতুন সদস্যদের উপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে তাদের নিকট ভুল বার্তা পৌছানোর ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, অর্ধেকেরও বেশি প্রায় ৫৪.৬% মাদকাসক্ত ব্যক্তি বারবার মাদক ছাড়তে চেষ্টা করেছে, কিন্তু খারাপ বন্ধু থাকার দরুন তারা তা করতে পারেনি। বরং এ পথে ধাবিত হওয়ার জন্য প্রধান কারণ ছিল অসৎ সঙ্গ, যার পরিমাণ হল ৮৫.৫%।
তৃতীয়তঃ শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ করা:
বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমতের অন্যতম নির্দশন হল, তিনি তাদের জন্য শরয়ী শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন এবং তা প্রয়োগ করা ওয়াজীব করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ﴿ [আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফের।] তিনি আরো বলেন: ﴾وَمَن لَّমْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴿ [আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই যালিম।]
সুতরাং আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করা কাফেরদের কাজ। ইবনে আব্বাস রাঃ অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: কুফর বিভিন্ন স্তরের, যুলুম বিভিন্ন স্তরের এবং ফাসেকী বিভিন্ন স্তরের। যখন সেটাকে হালাল মনে করে করা হবে তখন তা সবচেয়ে বড় যুলুম, আর হালাল মনে করে না করলে কবিরা গুনাহ হবে।
শরয়ী শাস্তি প্রয়োগের সময় অপরাধীর সাথে অনুকম্পা প্রদর্শনা না করা আবশ্যক যাতে করে মন্দ ও বিচ্যুত আচরণ বিস্তার লাভ না করে; কেননা অপরাধমূলক খারাপ ও বিচ্যুত চরিত্র বিস্তার লাভের অন্যতম কারণ হল অপরাধীকে কম শাস্তি দেয়া ও তাদের প্রতি অনুকম্পা করা। তাদের প্রতি অধিক দয়া দেখানো হয় এই দাবীতে যে তাদেরকে শাস্তি দিলে তাদের উপর মানসিক ও স্নায়ুবিক চাপ বাড়বে।
এটা হল মানব রচিত নীতি যা সমাজে বিচ্যুত আচরণ প্রসার ও বিস্তারের জন্য দায়ী। যদিও আমরা দেখতে পায় যে, শরয়ী শাস্তির ক্ষেত্রে অপরাধীর সাথে দয়া প্রদর্শনের কোন উপায় নেই। বরং কোন প্রকার নমনীয়তা ছাড়াই শাস্তি প্রয়োগ করা হবে, যা অপরাধীকে তার কর্ম থেকে বিরত রাখবে এবং অন্যদেরকে বিচ্যুতি থেকে সতর্ক করবে। আমাদের নবী সাঃ বলেন: (সে মহান সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি মুহাম্মাদ তনয়া ফাতিমা রাঃ চুরি করত তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।)
মহান আল্লাহ যিনার শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বলেন: ﴾الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ ۖ وَلَا تَأْخُذْকُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآখِرِ ۖ وَلْيَশْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ﴿ [ব্যব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী— তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরী করতে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং আখেরাতের উপর ঈমানদার হও; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।]
শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ ব্যক্তিকে তা পুণরায় করা হতে বিরত রাখে কেননা সেখানে তোষামোদ ও অনুকম্পার কোন স্থান নেই।
অপর দিকে ব্যক্তির সংশোধনের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রয়োগের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। মানুষ স্বভাবগতভাবেই যেখানে খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে তা থেকে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করে, যেমনভাবে ভাল অভিজ্ঞতার কাজ বারবার করতে আগ্রহী থাকে।
ইসলামী শরীয়ত ব্যতীত সমাজে এমন কোন শরীয়ত পাওয়া যাবে না যা বিচ্যুত আচরণকে প্রতিরোধ করে; যেহেতু ইসলামী শরীয়তের শাস্তি অপরাধ অনুযায়ী হয়ে থাকে, তা প্রয়োগে শৈথিল্যের কোন স্থান নেই। তা মানুষকে বিচ্যুত আচরণ থেকে দূরে থাকতে ও উত্তম চরিত্রের দিকে আগ্রসর হতে উৎসাহিত করে। যে সমাজে ইসলামী শাস্তি প্রয়োগ করা হয় না সে সমাজ নিয়ে পর্যাবেক্ষণকারী লক্ষ্য করবে যে, সেখানে অপরাধ প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা সমাজের লোকদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করছে। পক্ষান্তরে নববী সমাজ পর্যাবেক্ষণকারী লক্ষ্য করবে যে, অপরাধ প্রবণতা সেখানে হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি যখন আবু বকর রাঃ খেলাফতের সময় উমর রাঃ বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন এক বছরে একটি বিচারের আবেদনও করা হয়নি। বর্তমান সময়ে রাজকীয় সৌদি আরব তার বড় প্রমাণ, যেখানে মানুষেরা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা উপভোগ করছে যা এর জনগণের জন্য আরামদায়ক ও শান্তিময় জীবন নিশ্চিত করছে।
চতুর্থতঃ প্রচার মাধ্যমগুলোর সঠিক ব্যবহার:
মিডিয়াকে তার বিভিন্ন পঠন ও শ্রবণযোগ্য মাধ্যমগুলোতে শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্রভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়, বিশেষত বর্তমান সময়ে যখন তার সাথে যোগাযোগ ও তথ্যের প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে এমনকি তা ঘরের গোপন বিষয় প্রকাশ করতে ও যা ইচ্ছা তা প্রচার করতে সক্ষম হচ্ছে।
যেহেতু এগুলো মাধ্যম তাই তার হুকুম হল, তাতে যা ভাল বা মন্দ প্রচার করা হয় সে অনুযায়ী। আর তার পরিণতি কখনো ভাল হয় বা কখনো খারাপ হয় তাতে উপস্থাপিত বিষয়ের আলোকে। সুতরাং তা কল্যাণের সুবাতাস ও উন্নত চরিত্রের প্রচার এবং খারাপ ও মন্দ আচরণ প্রতিরোধের মাধ্যম যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় ও ইসলামের সঠিক দিক-নির্দেশনা পেশ করা হয়।
মন্দ চরিত্র ও বিচ্ছিন্নতার আস্তানা থেকে মানবতাকে বাঁচাতে ইসলামই হল সঠিক মানহাজ। কাজেই এর উপর ভিত্তি করে ইসলামী মিডিয়া গড়ে তোলা আবশ্যক যা নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করবেঃ
১- ইসলামের দিকে আহ্বান।
২- নির্দেশনা ও নসীহার ব্যাপারে সততা অবলম্বন।
৩- অশ্লীলতা প্রচার থেকে দূরে থাকা।
এর ফলে পৃথিবীর সকল স্থানে সংশোধনমূলক দাওয়াতের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে, তাকে কোন শত্রু বা হিংসুক বাধা দিতে পারবে না।
সীমালঙ্ঘনকারীরা দায়ীদেরকে মানুষদের নিকট আল্লাহর আহবান পৌছাতে বাধা দেয়। সুতরাং মিডিয়গুলো এই বন্দীত্বকে শেষ করে দিয়েছে। কাজেই তাওহীদের বাণী ও তার ফযিলত কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই প্রচার করা যায়। এখানে সীলঙ্ঘনকারী ও শত্রুরা আক্রমণ করতে পারে না। তাই যদি মুসলিম সমাজে এই মিডিয়াগুলো সঠিক ব্যবহার করা হয় তবে তা হবে সমাজ ও ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তারকারী সবচেয়ে সফল ও কার্যকরী মাধ্যম। শরীয়ত সম্মত চ্যানেল প্রতিষ্ঠার দ্বারা বিশ্ববাসীর নিকট তাওহীদের বাণী ও তার আলো প্রচার করবে এবং এমন মানহায প্রচার করবে যা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ বাস্তবায়ন করবে, এর মাধ্যমে অকল্যাণ ও মন্দ আচরণের বন্ধনকে ছিন্ন করবে; যা বর্তমান ইসলামী সমাজের মূলকে আতঙ্কিত করছে।
পঞ্চমতঃ মসজিদগুলোর সঠিক ব্যবহার:
এই উম্মতের উপর আল্লাহর তায়ালার একটি অন্যতম নিয়ামত হল তিনি তাদের জন্য মসজিদে জামাতে সালাত আদায়ের বিধান দিয়েছেন; যে মসজিদ হল দাওয়াতের কেন্দ্র, দিক-নির্দেশনার মিম্বার যা অন্তরকে কল্যাণের মাধ্যমে আবাদ করে এবং তা হতে জাহেলিয়াতের চরিত্র, পাপাচারের অন্ধকার ও তার দূর্বিপাককে দূরীভূত করে।
অনুরূপভাবে আরেকটি নিয়ামতে হল তিনি জুমার দিনে খুতবার বিধান দিয়েছেন, যার মাধ্যমে একজন খতিব মানুষকে দিক-নির্দেশনা, সঠিক বিষয়ে বর্ণনা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে সক্ষম হবেন; আলেমের হিকমতের সাথে এবং তাদের প্রতি দয়াদ্র হয়ে ও তাদেরকে ভালবেসে। জাবের রাঃ কর্তৃক বর্ণিত নবী সাঃ এর খুতবার বিবরণে এসেছে, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কণ্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোন সেনাবাহিনীকে সতর্ক করে বলছেন: তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো।)
একজন খতিবের কর্তব্য হল সে সমাজের সমস্যা ও তাতে প্রচলিত খারাপ চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানবে, যাতে তাদের নিকট শরীয়তের হুকুম এবং ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মতের উপর দুনিয়া ও আখেরাতে এর ভয়াবহতা বর্ণনা করতে পারে। তবে তা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলবে না। কেননা সাধারণভাবে বললে নির্দিষ্ট করে বলার প্রয়োজন হয়না। কারণ মিম্বারে কারো প্রকাশ্য সমালোচনা ও দোষ বর্ণনা শ্রোতার সাথে অসৌজন্যতার ও অপরাধীকে ধমক দেয়ার শামিল, যা তাকে নসীহা গ্রহণ না করতে ও পাপে ডুবে থাকতে উৎসাহিত করে।
দুইটি বিষয় থাকলে খুতবা কাঙ্খিত ফলাফল দিতে পারে:
এক: খতিবের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ঃ
১- সে উত্তম আদর্শ হবে এবং মানুষের মাঝে এ বিষয়ে সুপরিচিত হবে। কেননা যার কাছে কিছু নেই সে দেয়ার ক্ষমতা রাখে না।
২- ভাষা ও উপস্থাপনার দিকে থেকে খুতবার জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি নিবে।
৩- খুতবা হবে বিষয় ভিত্তিক।
৪- খুতবায় পর্যাপ্ত পরিমাণ কুরআন-সুন্নাহ, আলেমদের উক্তি ও তাদের জীবনী থাকবে।
৫- খতীব খুতবা দীর্ঘ করবে না বা কারো কন্ঠ নকল করবে না।
৬- খুতবা ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ ও মন্দ বিষয় হতে ভীতি সম্বলিত হবে এবং তা সমাজের সমস্যার সমাধান করবে যার অন্যতম হল মন্দ চরিত্র।
একই সাথে খুতবার ক্ষেত্রে মুসল্লীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়:
১- সকাল সকাল মসজিদে উপস্থিত হওয়া।
২- চুপ করে বসা ও মনোযোগ সহকারে খুতবা ও খুতবার দিক-নির্দেশনা শ্রবণ করা। নবী সাঃ বলেছেন: (তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে জুম'আর দিবসে ইমাম খুৎবা দেয়ার সময় বল চুপ কর, তাহলে তুমি অনর্থক কথা বললে।)
এজন্য ইমামের উচিত খুতবা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মুসল্লীদেরকে চুপ করে খুতবা শোনার প্রতি আকৃষ্ট করা।
অন্য দিক থেকে মসজিদ শিক্ষণীয় কার্যকরী দায়িত্ব পালন করতে পারে, যেমনঃ
ক- শরয়ী ইলমের দারস প্রদান।
খ- দিক-নির্দেশনামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করা যেখানে মানুষদেরকে ভাল কাজে উৎসাহিত করা হবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা হবে।
গ- কুরআনুল কারীমের হালাকার ব্যবস্থা করা, কেননা কুরআন চরিত্রের সংবিধান ও অন্তরের চিকিৎসক, এর মাধ্যম উম্মত সুখী হবে এবং তা বর্জনে মানুষেরা হতভাগা হবে।
ঘ- শরয়ী কিতাব সম্বলিত লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা, যার দায়িত্ব পালন করবে কোন আলেম বা ছাত্র এবং ছাত্র-শিক্ষক ও মূর্খ সকলের জন্য সেবা দিবে।
ঙ- মসজিদে একটি চ্যারিটেবল প্রতিষ্ঠান থাকবে, যা ধনীদের থেকে সম্পদ সংগ্রহ করবে। ফলে তা দরিদ্রদের জন্য প্রশান্তির মাধ্যম হবে, যা তাদেরকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে রক্ষা করবে এবং মন্দ চরিত্র থেকে হেফাযত করবে।
মসজিদ যদি এই মহান দায়িত্বগুলো পালন করে তবে তা সমাজ থেকে খারাপ আচরণের মূলোৎপাটন করতে এবং ও উত্তম চরিত্রের বিস্তারে অবদান রাখবে। অনুরূপভাবে তা উত্তম জাতী গঠনে ভুমিকা রাখবে, মানব জাতীর জন্য যাদেরকে বের করা হয়েছে।
ষষ্ঠতঃ মনের বিরুদ্ধে জিহাদ:
মনের মাঝে অকল্যাণ ও বিচ্যুতির প্রতি আকর্ষণ রয়েছে, আর এগুলোকে মানুষের নিকট সুশোভিত করে দেখায় মানব ও জিন শয়তান। সুতরাং যদি স্বীয় প্রচেষ্টা না থাকে তবে মন সে দিকে আকৃষ্ট হয়; তাই মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হল সর্বোচ্চ জিহাদ। যদি মন ভাল চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হতো এবং প্রবৃত্তি ও তার আকর্ষণ দ্বারা প্রভাবিত না হতো তবে মনের জিহাদের কোন অর্থ থাকত না। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ﴿ [নিশ্চয় মানুষের নাফস খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়েই থাকে।]
মনের মাঝে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তার সাথে হিংসা করে, তার হক নষ্ট করার মাধ্যমে যুলুম করার প্রতি আকর্ষণ থাকে। মনের মাঝে নিজের প্রতি যুলুম করার আগ্রহ থাকে, খারাপ প্রবৃত্তি যেমন যিনা ও হারাম ভক্ষণে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে। তাইতো যে কখনো এমন ব্যক্তির উপর যুলুম করে, যে তার প্রতি যুলুম করেনি। এই প্রবৃত্তিগুলো তার উপর প্রভাব বিস্তার করে যদিও অন্য কিছু না করে। সুতরাং যখন দেখে যে তার সমপর্যায়ের কেউ যুলুম করছে বা এই প্রবৃত্তিগুলো গ্রহণ করছে তখন তার মাঝে এতে জড়িত হতে বা যুলুম করতে বেশি আগ্রহ জাগে।
তাই মনের নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ﴿ [আর যে তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।]
ইবনুল কায়্যিম রহঃ জিহাদকে চারটি স্তর বিভক্ত করেছেন: মনের বিরুদ্ধে জিহাদ, শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ, কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ।
মনের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি স্তরঃ
১- হেদায়েত ও সত্য দ্বীন শিক্ষার জন্য জিহাদ; যা ব্যতীত দুনিয়া ও আখেরাতে মনের কোন সাফল্য ও সৌভাগ্য নেই।
২- জ্ঞান শিক্ষার পর সে অনুযায়ী আমল করার জন্য জিহাদ।
৩- সে দিকে আহ্বান করার জন্য জিহাদ।
৪- দাওয়াতের পথে যে কষ্ট আসে তার উপর ধৈর্যধারণ করার জন্য জিহাদ।
শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ, এর দুটি স্তরঃ
১- বান্দার নিকট ঈমান বিধ্বংসী যে সন্দেহ ও শুবহাত আসে তা প্রতিহত করার জন্য জিহাদ।
২- তার যে খারাপ ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি জাগ্রত হয় তার বিরুদ্ধে জিহাদ।
মনকে উপযোগী করার প্রথম কাজ হল কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করা। কেননা সেটা কোন সহজ বিষয় নয়; তাই তার প্রতিদান মহান, তার পরিণতি কল্যাণকর এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তা বান্দার জন্য আনন্দদায়ক। আল্লাহ তায়ালা তাকওয়া ও ধৈর্যের সওয়াবের বিষয়ে বলেন: ﴾إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيעُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ﴿ [নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্যধারণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ মুসহিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।]
অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারাম কর্ম সম্পাদনে আল্লাহকে ভয় করবে এবং কষ্ট, বিপদ ও আদেশ পালনে ধৈর্যধারণ করবে, নিশ্চয় তা সৎকর্মের অন্তর্গত, আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।
সপ্তমতঃ দূরদৃষ্টি:
দুনিয়া পরবর্তী বিষয়ে দূরদৃষ্টি মন্দ চরিত্র পরিহার ও উত্তম চরিত্র গ্রহণে শক্তিশালী ও কার্যকরী অনুঘটক। পক্ষান্তরে অদূরদর্শিতা, দুনিয়ার সম্ভোগে দ্রুততা ও বিচ্যুত প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করা তার দূরদৃষ্টির অভাবের পরিচায়ক, যেমনটি দুর্বল ঈমানের লোকদের হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا * وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ﴿ [কিন্তু তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।]
আর এর চিকিৎসা হল যা এই খারাপ চরিত্রকে প্রতিহত করবে ও তাকে সমূলে উৎপাটিত করবে, তা হল এই জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাস যে দুনিয়া হল পরীক্ষাগার ও অস্থায়ী। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَنَبْلُوَنَّকُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَبَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴿ [আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরিক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে। যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।] তিনি আরো বলেন: ﴾الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ﴿ [যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য—কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴾إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا﴿ [নিশ্চয় যমীনের উপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কাজে কে শ্রেষ্ঠ।]
সুতরাং যমীনের উপর যা কিছু আছে সুস্বাদু খাদ্য ও পানীয়, সুন্দর পোষাক, গাছপালা, নদীনালা, ক্ষেত, ফলমূল, আকর্ষণীয় দৃশ্য, চিত্তাকর্ষক বাগান, শব্দাবলী, আকর্ষণীয় চিত্র, স্বর্ণ, রোপ্য, ঘোড়া, উট ইত্যাদি এই সবগুলোকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার জন্য শোভা বানিয়েছেন এবং তাদের জন্য পরীক্ষা ও ফেতনা স্বরূপ করেছেন। তা সত্বেও আল্লাহ তায়ালা এগুলোকে বিনাশ করবেন এবং যমীন পুনরায় তৃণবিহীন ভূমিতে পরিণত হবে।
সুতরাং মানুষ যখন এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে এবং তার প্রতি ঈমান রাখবে, তাহলে কি সে অদূরদর্শী হতে পারে এবং আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার এই কষ্টদায়ক প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে?! মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا * حَدَائِقَ وَأَعْنَبًا * وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا * وَكَأْسًا دِهَاقًا * لَّا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا كِذَّابًا * جَزَاءً مِّن رَّبِّكَ عَطَاءً حِسَابًا﴿ [নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য আছে সাফল্য, উদ্যানসমূহ, আঙ্গুরসমূহ, আর সমবয়স্কা উদভিন্ন যৌবনা তরুণী এবং পরিপূর্ণ পানপাত্র। সেখানে তারা শুনবে না কোন অসার ও মিথ্যা বাক্য; আপনার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, যথোচিত দানস্বরূপ।]
সুতরাং ইসলামী শিক্ষার মানহায তার অনুসারীদের নিকট থেকে প্রত্যাশা করে যে, তারা ভবিষ্যতের দিকে ও ভবিষ্যতের আনন্দের দিকে দৃষ্টি দিবে এবং অস্থায়ী দুনিয়া ও তার কষ্ট হতে দূরে থাকবে। তারা প্রবৃত্তি ও তার যন্ত্রণাদায়ক প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করবে যেন স্থায়ী স্বাদ আস্বাদন করতে পারে; যা প্রেমময়ী, দয়াশীল ও ক্ষমাশীল রবের নিকট শেষ হয় না।
টিকাঃ
(১) আদাবুদ দুনিয়া ওয়া আদদ্বীন পৃঃ (২৮)।
(২) সূরা আল-ফাতির: (২৮)।
(৩) তাফসীরে সাদী (৪/২১৬)।
(৪) মিফতাহু দারীস সায়াদা (১/৫২)।
(১) সূরা আল-আনফাল: (২৪)।
(২) আল-জামে লি আহকামিল কুরআনঃ (৭/২৪৭)।
(৩) আল-জাওয়াবুল ইজতেমায়িয়া আয-যহেরাতিল ইদমান (২/৮২)।
(৪) পূর্বোক্ত (২/১২৭)
(১) সহীহ বুখারী (৩/৪৬৩, হাঃ ৫৫৩৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০২৬, হাঃ ১৪৬-২৬২৮)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৬৮, হাঃ ৪৮৩৩), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন, সিলসিলা সহিহা (২/৬৩৩, হাঃ ৯২৭)।
(৩) আল-আখলাক ওয়া আস-সিরা, পৃঃ (২৪)।
(৪) সূরা আল-ফুরকানঃ (২৭-২৯)।
(৫) ইকতেযাইস সিরাত আল-মুস্তাকিম পৃঃ (২৫)।
(৬) আল-জাওয়াবুল ইজতেমায়িয়া আয-যহেরাতিল ইদমান (২/৯০)।
(১) সূরা আল মায়েদাঃ (৪৪)।
(২) সূরা আল মায়েদাঃ (৪৫)।
(৩) তাফসীরে সাদী (১/৪৮৮-৪৮৯)।
(৪) আত-তারবিয়া ইসলামিয়া ওয়া দাওরুহা ফি মুকাফাহাতিল জারিমা পৃঃ (২২৪)।
(৫) সহীহ মুসলিম (৩/১৩১৫, হাঃ ১/১৬৮৮)।
(৬) সূরা আন-নূরঃ (২)।
(১) ইলমু ইজতেমায়ীল ইকাব (১/১১৫)।
(২) ওকী বিন হিব্বান রচিত, আখবারুল কুযা (১/১০৪)।
(১) সহীহ মুসলিম (২/৫৯২, হাঃ ৮৬৭)।
(২) মিম্বারুল জুমআ, আমানাহ ওয়া মাসউলিয়াহ পৃঃ (২১)।
(১) দেখুনঃ মিম্বারুল জুমআ, আমানাহ ওয়া মাসউলিয়াহ।
(২) সুনানে আবু দাউদ (১/৬৬৫, হাঃ ১১১২)।
(১) সূরা ইউসুফঃ (৫৩)।
(২) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, পৃঃ (৪০-৪১)।
(৩) সূরা আন-নাযিয়াতঃ (৪০-৪১)।
(১) সূরা ইউসুফঃ (৯০)।
(২) তাফসীরে সাদী (২/৪৩৪)।
(১) সূরা আল-আলাঃ (১৬-১৭)।
(২) সূরা আল-বাকারাঃ (১৫৬)।
(৩) সূরা আল-মুলকঃ (২)।
(৪) সূরা আল-কাহাফঃ (৭)।
(৫) তাফসীরে সাদী (৩/১৪৩)।