📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 চারিত্রিক দোষত্রুটির পরিচয়, তার উৎসমূল ও নীতিমালা

📄 চারিত্রিক দোষত্রুটির পরিচয়, তার উৎসমূল ও নীতিমালা


اولত: চারিত্রিক দোষত্রুটির পরিচয়:
আরবি (السوء) শব্দের অর্থ হল: পাপ, অন্যায়, খারাপ। আর সায়্যিআহ অর্থ: পাপ বা অপরাধ। সাওআহ অর্থ হল: নিন্দিত অভ্যাস। আর প্রত্যেক মন্দ কথা ও কাজকে আরবিতে (سواء) বলা হয়।(১)
আখলাক অর্থ হল: মানুষের কতিপয় গুণাবলী যার মাধমে সে অন্যদের সাথে মেলামেশা করে থাকে। তা হতে পারে নন্দিত বা নিন্দিত।(২)
আখলাক হল মানুষের ভেতরের প্রতিচ্ছবি যেমন তার বাহ্যিক প্রতিচ্ছবি হল দৈহিক অবয়ব। আর আখলাকের নন্দিত ও নিন্দিত দিকে রয়েছে।(৩)
অর্থাৎ স্বভাব-চরিত্র হল মানুষ যে সকল ভাল এবং মন্দ গুণাবলী ধারণ করে তার সমষ্টি। আর সেটি মানুষের অভ্যন্তরীণ দিকের পরিচায়ক যেমন তার অবয়ব বাহ্যিক দিকের পরিচায়ক।
মন্দ চরিত্র বা চারিত্রিক দোষত্রুটির পরিচয়ে বলা যেতে পারে যে, তা হল আচরণগত বা মৌখিক বা কর্মর্গত অথবা আকীদাগত মন্দ বৈশিষ্ট্য।
কিছু মন্দ চরিত্রের প্রকাশ হাত, কান, চোখ ইত্যাদির ন্যায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে কর্ম হিসেবে হতে পারে। তন্মধ্যে কিছু জিহ্বা বা বর্ণনার মাধ্যমে কথা হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে আর কিছু অন্তরে লালিত বিশ্বাস হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে; যেমন: দ্বীনের বিধিবিধানের কিছু অংশের প্রতি অন্তরে ঘৃণা রাখা বা দ্বীনের কিছু বিধানের বিলোপ কামনা করা বা মন্দ চরিত্রকে হালাল মনে করা বা অন্তরে কোন সাহাবীর প্রতি বিদ্বেষ রাখা অথবা কোন ব্যক্তির প্রতি এরূপ বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ ব্যতীত সে উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে।

দ্বিতীয়ত: চারিত্রিক দোষত্রুটির উৎসমূল:
নিন্দিত চরিত্রের উৎস নির্ণয়ে উলামাদের মতান্তর ঘটেছে। ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযী রহিঃ এর মতে এটি চারটি জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত: অজ্ঞতা, যুলুম, কাম-প্রবৃত্তি এবং ক্রোধ।(৪)
ইবনু হাযম রহিঃ এর মতে চারিত্রিক দোষত্রুটির উৎস চারটি; সেগুলো হল: যুলুম, অজ্ঞতা, কাপুরুষতা এবং কৃপণতা।(৫)
গভীরভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণকারী দেখবে, যে সকল উৎস থেকে মন্দ আচরণের সৃষ্টি হয় তা মূলত: অজ্ঞতা, কাম-প্রবৃত্তি এবং ক্রোধ। অজ্ঞতা হল সকল চারিত্রিক বিচ্যুতির অন্তর্নিহিত কারণ।
একজন জাহেল ব্যক্তি তার অজ্ঞতার কারণে উত্তমকে অনুত্তম ও অনুত্তমকে উত্তম এবং পূর্ণতাকে অপূর্ণ ও অপূর্ণতাকে পূর্ণতার অবয়বে দেখে থাকে।(১)
আর কাম-প্রবৃত্তিকে আমি কামনা-শক্তি নামে নামকরণ করেছি; তার থেকে কামনা-বাসনামূলক পাপাচারগুলো সংঘটিত হয়, যেমন: ব্যাভিচার, ধোঁকা, মাদক এবং বড়াই ইত্যাদি।
আর ক্রোধকে আমি বেগদায়ক-শক্তি নামে অভিহিত করেছি; তার থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক পাপাচার সংঘটিত হয়, যেমন: মারপিট, হত্যা, লানত, যুলুম ইত্যাদি।
ইমাম লাইছ রহিঃ ইমাম মুজাহিদ রহিঃ থেকে বর্ণনা করেন: কাম-প্রবৃত্তি আর ক্রোধ হল সকল পাপের উৎস। (২)
এর বিশদ বর্ণনা নিম্নে উল্লেখ করা হল:
১- জাহালত বা অজ্ঞতা:
অজ্ঞতা হল জানার বিপরীত। আর অজ্ঞতা হল না জেনে কোন কাজ করা।(৩)
কল্যাণ ও অকল্যাণ সম্পর্কে না জানার মাঝে অজ্ঞতা সীমাবদ্ধ নয় বরং জানা সত্ত্বেও কোন কর্মকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তার বিপরীত কর্মকে গ্রহণ করাও এক প্রকারের জাহালত। কেননা কিছু নবী-রাসূলগণের কওমকে অজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে তাদের নবীগণের দাওয়ার গ্রহণে অস্বীকৃতির কারণে যদিও তাদের নিকট নবী-রাসূলগণ দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং কওমের লোকেরা দাওয়াত এবং দাওয়াত সহ যাকে প্রেরণ করা হয়েছে তার সত্যবাদিতা সম্পর্কে জানত।
নূহ আঃ তার সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যার বর্ণনা আল্লাহর বাণীতে এসেছে: وَيَقَوْمٍ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ মَالًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ ءَامَنُوا إِنَّهُم مُّلَقُوا رَبِّهِمْ وَلَكِنِّي أَرَبِّكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ অর্থ: হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের কাছে কোন ধন-সম্পদ চাই না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহরই কাছে আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়াও আমার কাজ নয়; তারা নিশ্চিতভাবে তাদের রবের সাক্ষাত লাভ করবে। কিন্তু আমি তো দেখছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।](৪) অনুরূপভাবে লুত আঃ তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন যা আল্লাহর বাণীতে এসেছে: أَبِنَّكُمْ ۞لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ শَهْوَةً مِّن دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ অর্থ: [তোমরা কি কামপ্রবৃত্তির জন্য নারীকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।] (১)
তাদের হক না গ্রহণ করা ও তাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মন্দ স্বভাবের অনুসরণ তাদেরকে অজ্ঞতার ন্যায় মন্দ বিশেষণের উপযুক্ত করে তুলেছে।
আর অজ্ঞতা হল চারিত্রিক বিচ্যুতির সবচেয়ে বড় অনুঘটক; কেননা উত্তম গুণাবলী ও তার মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি উক্ত বিষয়কে পরিহার করে তা ভারী মনে করার কারণে এবং সে মন্দ আচরণকে উপভোগ করে এটি হালকা মনে হওয়ায় এবং শয়তান এটাকে তার সামনে সুশোভিত করে দেয়ায় কারণে; যার পরিণতি হল দুঃখ-কষ্ট এবং আফসোস।
সুতরাং যে ব্যক্তি জাহেল সে সহজতার কারণে কোন কিছুকে সহজ মনে করে যদিও তার মাঝে তার ধ্বংস নিহিত থাকে, আর সে কোন বিষয় ভারী হওয়ার কারণে তাকে ভারী মনে করে যদিও তার মাঝে তার দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা এবং মুক্তি নিহিত থাকে। কাজেই তুমি দেখবে, কেউ যিনাকে সহজ মনে করে তার কু-প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করার জন্য, কেউ মুমিন ব্যক্তির হত্যা করাকে তুচ্ছ ভাবে তার ক্রোধ নিবারণের জন্য এবং কেউ পশ্চিমা অভ্যাস ও সভ্যতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের অনুরসণ-অনুকরণ করে তাদের প্রকৃত অবস্থা এবং তাদের নৈতিক অধঃপতন, পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙ্গনের দিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করেই।
এ জন্য শরয়ী জ্ঞান ব্যতীত উত্তম কোন কিছুই নেই চারিত্রিক বিচ্যুতির মূলোৎপাটন করার জন্য। এ অর্থের দিকে ইবনু হাযম রহিঃ ইশারা করে বলেন: “উত্তম গুণাবলী ব্যবহারে জ্ঞানের নেয়ামতের ভূমিকা বিরাট। আর তা হল, উত্তম গুণাবলী সম্পর্কে জেনে তা গ্রহণ করা ও মন্দ গুণাবলী সম্পর্কে জেনে তা পরিহার করা এবং চমৎকার স্তুতি শুনে তা গ্রহণে উৎসাহী হওয়া ও মন্দ স্তুতি শুনে তা এড়িয়ে যাওয়া। এ ভূমিকামূলক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, প্রতিটি উত্তম গুণে জানার ভূমিকা রয়েছে এবং প্রতিটি মন্দ গুণে অজ্ঞতার ভূমিকা রয়েছে। (২)

২- কামনা-শক্তি: কামনা-শক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হল আকর্ষণকারী শক্তি। আর তা হল; হাওয়া তথা কুপ্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা।
হাওয়া বা কুপ্রবৃত্তি হল: কামনা-বাসনার প্রতি অন্তরের ঝোঁক। আর তাকে এ নামে নামকরণের কারণ হল এটি ব্যক্তিকে দুনিয়াতে বিপদে নিক্ষেপ করে এবং আখেরাতে জাহান্নামে।
কুপ্রবৃত্তি হল সকল মন্দ আচরণের মূল। এটি কল্যাণ থেকে বাধাদানকারী এবং বিবেক-বুদ্ধির ধ্বংসকারী; কেননা এটি মন্দ স্বভাবের জন্ম দেয়, কলঙ্কজনক কর্মের প্রকাশ ঘটায় এবং ব্যক্তিত্বের আবরণকে ছিন্ন করে ও মন্দের প্রবেশদ্বারকে সচল করে। (৩)
সুতরাং কুপ্রবৃত্তি মানুষকে মন্দের আস্তাকুড়ে নিয়ে যায় এবং তাকে মৃত্যু ও ধ্বংসের গহ্বরের দিকে পরিচালিত করে; কেননা কুপ্রবৃত্তি হল যেমনটি ইবনুল গাযালী রহিঃ বলেছেন: “কুপ্রবৃত্তি উপস্থিত উপভোগের দিকে আহ্বান করে তার পরিণামের কথা না ভেবেই, তাৎক্ষণিক কামনা-বাসনা পূরণে উদ্বুদ্ধ করে যদিও তা দুনিয়াতে দুঃখ-কষ্ট এবং আখেরাতের আনন্দ উপভোগের পথে বাঁধার কারণ হয়”।(১) আর যে ব্যক্তি তার কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে না সে নিজেকে এমন আনন্দ উপভোগ এবং কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে যার পরিণতি দুঃখ-কষ্ট ও অনুতাপ-অনুশোচনা।
আর আল্লাহ তায়ালা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করাকে তিরস্কার করেছেন এবং যে তার অন্তরকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে তিনি তার প্রশংসা করেছেন: মহান আল্লাহ বলেন: وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ، وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى অর্থ: [সুতরাং যে সীমালঙ্ঘন করে।* এবং দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়।* জাহান্নামই হবে তার আবাস।* আর যে তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে।* জান্নাতই হবে তার আবাস।](২) তিনি বলেন : يَدَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ শَدِيدٌ بِمَا نَسُواْ يَوْمَ الْحِسَابِ অর্থ: [হে দাউদ! আমি আপনাকে যমীনে খলীফা বানিয়েছি, অতএব আপনি লোকদের মধ্যে সুবিচার করুন এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না, কেননা এটা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচার দিনকে ভুলে আছে।] (৩) তিনি বলেন: وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ، عَن ذِكْرِنَا وَأَتَّبَعَ هَوَلَهُ وَكَানَ أَمْرُهُ فُرُطَا অর্থ: [আর আপনি তার আনুগত্য করবেন না—যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে ও যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে।](৪) তিনি আরো বলেন: وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَلَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ অর্থ: [আল্লাহর পথ নির্দেশ আগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে বেশী বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ্ তো যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।](৫)
আল্লাহ তায়ালা কুপ্রবৃত্তি থেকে সতর্ক করে এবং ন্যায়-বিচার না করায় তার প্রভাব বর্ণনা করে বলেন: فَلَا تَتَّبِعُواْ الْهَوَى أَن تَعْدِلُوا অর্থ: [কাজেই তোমরা ন্যায়-বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না।](৬) অর্থাৎ খেয়াল-খুশি, সাম্প্রদায়িকতা এবং তোমাদের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ যেন তোমাদের বিষয়ে ন্যায়-বিচার পরিত্যাগে তোমাদেরকে উদ্বুদ্ধ না করে। বরং তোমরা ন্যায়-বিচারকে সর্বাবস্থায় ধারণ কর।(১) এটি হল আল্লাহর পক্ষ থেকে কুপ্রবৃত্তি অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা; কেননা এটি যুলুম ও অবিচারের মূল।
ন্যায়-বিচার হল: সকল উত্তম গুণের মূল। আর যুলুম হল সকল মন্দ গুণের মূল। সুতরাং যে মানুষের প্রাপ্যে প্রদানে কম করে সে মূলত তাদের প্রাপ্য প্রদানে ন্যায়-বিচার করল না, যে ওজনে কম প্রদান করে সে মূলত যুলুম করল এবং অবিচার করল, যে মানুষের কন্যদের সাথে ব্যাভিচার করল সে মূলত তাদের প্রতি যুলুম করল এবং অবিচার করল এবং যে মিথ্যা বলল সে মানুষের সাথে অন্যায় করল এবং তাদেরকে সত্য অবহিত করল না।
যে ব্যক্তি তার কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করে এবং অনুসরণ করে না; আল্লাহ তার প্রশংসা করেছেন ও তার প্রতিদান নিশ্চিত করেন ও তার সওয়াব নিশ্চিত করেন: وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى অর্থ: [আর যে তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে।* জান্নাতই হবে তার আবাস।] (২) অন্তরকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখা উত্তম চরিত্রের রুকন ও স্তম্ভ।

৩- বেগদায়ক-শক্তি:
বেগদায়ক-শক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হল; ক্রোধীয় শক্তি যা থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক পাপাচার সংঘটিত হয়। ক্রোধ বা রাগ হল: হৃদয়ের রক্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠা ক্ষতির আশংকা থেকে নিজের থেকে ক্ষতিকরকে প্রতিহত করা অথবা যার থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহায়।(৩)
আর মানুষের মাঝে রাগের স্বভাব রয়েছে; কেননা সে যদি তা হারিয়ে ফেলে তাহলে অনুভূতি জমাট বেঁধে যাবে, দ্বীন ও মান-সম্মানের গর্ব তাকে জাগ্রত করবে না এবং তার বীরত্ব নষ্ট হয়ে যাবে ও সে পরিণত হবে কাপুরুষে। রাগ হল দু'ধারী অস্ত্র। ইবনুল কায়্যিম রহিঃ বলেন: “ক্রোধের সীমা রয়েছে; আর তার সীমা হল প্রশংসনীয় বীরত্ব প্রদর্শন এবং মন্দ আচরণ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকে পরিহার করা। ক্রোধ যদি তার সীমা অতিক্রম করে তাহলে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে এবং অন্যায় করে। আর যদি সীমা থেকে কমে যায় তাহলে ব্যক্তি কাপুরুষ হয়ে যায় এবং মন্দ আচরণকে পরিহার করে না। (৪)
তবে এ ক্রোধীয় শক্তি চারিত্রিক দোষত্রুটির উৎসে পরিণত হয় যখন ব্যক্তি তার ক্রোধের গ্রহণীয় সীমা অতিক্রম করে যায়। তাই ক্রোধান্বিত ব্যক্তি তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঘাড়ের রগ ফুলাতে থাকে, তার রাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং গর্জন করতে থাকে। অবশেষে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মুখ দিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ বের হতে থাকে, অনায্য স্থানে হাতের ব্যবহার করে, রাগের কারণে বিচারে যুলুম করে, বিবেকবর্জিত এমন কথা বলে যা স্বাভাবিক অবস্থায় ভাবা যায় না এবং এমন কাজ করে স্বাভাবিক অবস্থায় যার কারণে লজ্জিত হয়। সুতরাং ক্রোধ হল হত্যা, গালিগালাজ, লানত, তিরস্কার, প্রহার এবং প্রত্যেক মন্দ কথা বা কাজের মূল।
ক্রোধ হল ঐ শক্তি যা মানুষকে অহংকার, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, শত্রুতা এবং নির্বুদ্ধিতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আর এ সবগুলোই হল মন্দ চরিত্রের অন্তর্গত। হাদিসে এসেছে: (একজন ব্যক্তি নবী সাঃ কে বললেন, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন: তুমি রাগান্বিত হয়ো না। সে ব্যক্তি এ কথাটি কয়েকবার বলল। তিনি প্রত্যেক বারেই বললেন: তুমি রাগান্বিত হয়ো না।)(১)
নবী সাঃ বলেছেন: (প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।)(২) আলী বিন আবী তালেব রাঃ বলেন: “সহনশীলতা হল ক্রোধজনিত উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করা”।(৩)

তৃতীয়ত: চারিত্রিক দোষত্রুটির নীতিমালা:
আরবি 'যাবেত' শব্দের অর্থ হল যা কোন কিছুকে সীমাবদ্ধ করে, বেষ্টন করে রাখে এবং তার শর্তাধীন করে রাখে। আর চারিত্রিক দোষত্রুটির নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল বিচ্যুত স্বভাব-চরিত্রের শর্তারোপকারী ও সীমাবদ্ধকারী।
সুতরাং মানুষ যখন তার আচরণে সবগুলো অথবা কিছু নীতিমালা হারিয়ে ফেলে তখন তার আচরণ বিচ্যুত হয়ে পড়ে; যদিও তার বাহ্যিক আচরণ প্রশংসনীয় হয়। যেমনটি অচিরেই নিম্নে সুস্পষ্ট হবে:

প্রথমত: মানহাযগত নীতিমালা:
মানহাযগত নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল চারিত্রিক ব্যবহার কিতাব ও সুন্নাহর মানহায অনুযায়ী হওয়া। কেননা প্রশংসনীয় চারিত্রিক নীতিমালার মূল হল ইসলামে আগত বিধানের আলোকে উত্তম গুণাবলী মেনে চলা। আর চারিত্রিক দোষত্রুটির মূল হল উত্তম গুণাবলী মেনে না চলা এবং তার বিপরীত গুণাবলী ধারণ করা। অর্থাৎ, উত্তম গুণাবলীর বিপরীত গুণাবলী সম্পাদন করা বা তাতে সীমালঙ্ঘন করা বা অবহেলা করা। তার বিশদ বর্ণনা নিম্নে প্রদান করা হল:
১- উত্তম গুণাবলীর বিপরীত গুণাবলী সম্পাদন করা; যা সংক্ষেপে হল: কষ্ট দেয়া থেকে বিরত না থেকে তা প্রদান করা, দানশীলতার পরিবর্তে কৃপণতা করা, কষ্ট সহ্য না করে প্রত্যাঘাত করা এবং চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল না রেখে গোমড়া করে রাখা। আর বিস্তারিত হল: সত্য কথার পরিবর্তে মিথ্যা বলা, আমানতদারিতার পরিবর্তে খেয়ানত করা, সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অবাধ্যচরণ করা, ধৈর্যের বিপরীতে অধৈর্য হওয়া এবং চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার পরিবর্তে যিনায় লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি।
২- উত্তম গুণাবলীতে সীমালঙ্ঘন করা অথবা তাতে অবহেলা করা মন্দ চরিত্র বা চারিত্রিক দোষত্রুটির অন্তর্গত; যেমন: মেহমানকে সম্মান জানাতে গিয়ে যদি অপচয় করে তা সে সীমালঙ্ঘন করল। আর এটা নিন্দনীয়। আর যদি যথাযথ সম্মান না জানায় তাহলে সে কৃপণতা করল। ইমাম মাওয়ারদী বলেন: “উত্তম আখলাকের সুনির্ধারিত সীমা রয়েছে এবং যথাযথ স্থান রয়েছে। যদি তা লঙ্ঘন করা হয় তাহলে মোসাহেবি হিসেবে গণ্য হবে আর যদি তার স্থান পরিবর্তন করা হয় তাহলে নিফাকী হিসেবে গণ্য হবে। মোসাহেবি হল অবমাননা আর নিফাকী হল নিকৃষ্টতা”।(১)
মানহাযগত নীতিমালার সারমর্ম হল: কমবেশি করা ব্যতীত রাসূল সাঃ এর অনুসরণ করা। কেননা রাসূল সাঃ কোন শিষ্টাচার পালনে ত্রুটি করেন নি; বরং তিনি তার রব কর্তৃক অর্পিত পদ্ধতিতে সর্বোত্তম শিষ্টাচার পালন করেছেন। এমনকি আল্লাহ তায়ালা তাকে পূর্ণাঙ্গ বিশেষণে ভূষিত করেছেন। তিনি বলেন: وَإِنَّكَ لَعَلَى ﴾خُلُقٍ عَظِيمٍ অর্থ: [আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।](২)
আল্লাহ তায়ালা নবী সাঃ এর মানহাযের অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে বলেন: وَمَا ءَاتَسْكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا ﴾ نَهَاكُمْ عَنْهُ فَأَنتَهُوا অর্থ: [রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক।](৩) রাসূল সাঃ তার মানহায আবশ্যিকরূপে গ্রহণ করার ব্যাপারে বলেছেন: (যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল যাতে আমার নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত।)(৪) তিনি আরো বলেছেন: (কেউ আমাদের এ শরীতে সংগত নয় এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।)(৫)

দ্বিতীয়ত: আখলাকগত নীতিমালা:
যেন মুহাম্মাদ সাঃ এর মানহাযের বাহ্যিকভাবে অনুকুল আমলটি কবুলিয়াত লাভ করে এবং মন্দ চরিত্র থেকে দূরে থাকে। সে জন্য উত্তম চরিত্র ধারণের কারণ যেন হয় বিশুদ্ধ চিত্তে আল্লাহর আনুগত্য। ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য যেন না হয় যা তাকে মন্দ চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত করাবে। কেননা একজন ব্যক্তি কখনো উত্তম গুণাবলীর উপর আমল করে; যেন তাকে বলা হয়: অমুক মুজাহিদ, অমুক আলেম, অমুক দানশীল! এগুলো আমলকে বিনষ্ট করে এবং এগুলোকে মন্দ চরিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (সর্বপ্রথম ব্যক্তি কিয়ামতের দিন যার ওপর ফয়সালা করা হবে, সে ব্যক্তি যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে, অতঃপর তাকে তার (আল্লাহর) নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: আপনার জন্য জিহাদ করে এমনকি শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি এ জন্য জিহাদ করেছ যেন বলা হয়: বীর, অতএব বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আরও এক ব্যক্তি যে ইলম শিখেছে, শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন তিলাওয়াত করেছে, তাকে আনা হবে। অতঃপর তাকে তার নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: আমি ইলম শিখেছ, শিক্ষা দিয়েছি ও আপনার জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেছি। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি ইলম শিক্ষা করেছ যেন বলা হয়: আলেম, কুরআন তিলাওয়াত করেছ যেন বলা হয়: সে কারী, অতএব বলা হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আরও এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সচ্ছলতা দিয়েছেন ও সকল প্রকার সম্পদ দান করেছেন, তাকে আনা হবে। তাকে তার নিয়ামতরাজি জানানো হবে, সে তা স্বীকার করবে। তিনি বলবেন: তুমি এতে কি আমল করেছ? সে বলবে: এমন খাত নেই যেখানে খরচ করা আপনি পছন্দ করেন আমি তাতে আপনার জন্য খরচ করি নাই। তিনি বলবেন: মিথ্যা বলেছ, তবে তুমি করেছ যেন বলা হয়: সে দানশীল, অতএব বলা হয়েছে, অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে, তাকে তার চেহারার ওপর ভর করে টেনে-হিঁচড়ে অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”) (১)
সুতরাং মুহাম্মাদ সাঃ এর অনুসরণের সাথে সাথে নিয়তের একনিষ্ঠতারও প্রয়োজন রয়েছে। কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন: (সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষের জন্য তার নিয়ত অনুযায়ী ফলাফল রয়েছে। অতএব যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হবে তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই গণ্য হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া অর্জন অথবা কোন নারীকে বিবাহের উদ্দেশ্যে হবে তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যের জন্য গণ্য হবে।) (২)

টিকাঃ
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১/৯৬-৯৭)।
(২) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৫৬)।
(৩) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২০৫)।
(৪) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩২১)।
(৫) ইবনে হাযম, আল-আখলাক ওয়াস-সীরাহ (৫৯০)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩২১)।
(২) ইবনে তাইমিয়াহ, আল-ঈমান (২৯)।
(৩) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১১/১২৯-১৩০)।
(৪) সূরা হূদ: (২৯)।
(১) সূরা আন-নামাল: (৫৫)।
(২) ইবনে হাযম, আল-আখলাক ওয়াস-সীরাহ (পৃঃ ২৫)।
(৩) আল-মাওয়ারদী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন (পৃঃ ১৯)।
(১) ইবনুল জাওযী, যাম্মুল হাওয়া (পৃঃ ১৮)।
(২) সূরা আন-নাযি'আত: (৪০-৪১)।
(৩) সূরা সোয়াদ: (২৬)।
(৪) সূরা আল-কাহফ: (২৮)।
(৫) সূরা আল-কাসাস: (৫০)।
(৬) সূরা আন-নিসা: (১৩৫)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৫৭৮)।
(২) সূরা আন-নাযি'আত: (৪০-৪১)।
(৩) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃঃ ১৩৮)।
(৪) আল-ফাওয়ায়েদ (পৃঃ ১৫৬)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/১১২, হা: ৬১১৬)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/১১২, হা: ৬১১৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১৪, হা: ১০৭-২৬০৯)।
(৩) আল-মাওয়ারদী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন (পৃঃ ২৫২)।
(১) আল-মাওয়ারদী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন (পৃঃ ২৪৩)।
(২) সূরা আল-কলম: (৪)।
(৩) সূরা আল-হাশর: (৭)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৩/১৩৪৩-১৩৪৪, হাঃ ১৮-১৭১৮)।
(৫) সহীহ বুখারী (২/২৬৭, হা: ২৬৯৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩৪৩, হা: ১৭-১৭১৮)।
(১) সহীহ মুসলিম (৩/১৫১৩-১৫১৪, হাঃ ১৫২-১৯০৫)।
(২) সহীহ বুখারী (১/১৩, হা: ১, ৫৪, ২৫২৯), সহীহ মুসলিম (৩/১৫১৫, হা: ১৫৫-১৯০৭)।

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 চারিত্রিক দোষত্রুটির প্রকারভেদ

📄 চারিত্রিক দোষত্রুটির প্রকারভেদ


চারিত্রিক দোষত্রুটি তার বৈশিষ্ট্য, উৎস, আধিক্য অনুযায়ী বহুরকম হয়ে থাকে। তার সংখ্যাধিক্যের কারণে একটি পুস্তিকায় জমা করা কষ্টসাধ্য বিষয়। এ জন্য এ স্থান এবং গ্রন্থ বিবেচনায় অনুকূল হল চারিত্রিক দোষত্রুটির কিছু উদাহরণ পেশ করা নিম্নোক্ত মূল্যবোধ ও উৎস অনুযায়ী; তা হল:
- শব্দগত বা মৌখিক দোষত্রুটি।
- কান ও চোখের দোষত্রুটি।
- কর্মগত দোষত্রুটি।
- অন্তর সম্পর্কিত দোষত্রুটি।

প্রথমত: শব্দগত বা মৌখিক দোষত্রুটি: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল যে সকল মন্দ কথাবার্তা মুখে উচ্চারণ করা হয়। এ সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেছেন: (নিশ্চয় বান্দা এমন কথা বলে যার পরিণাম সে চিন্তা করে না অথচ এ কথার কারণে সে নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের এমন গভীরে যার দূরত্ব মাশরিক এর দূরত্বের চাইতে অধিক।) (১) তিনি আরো বলেছেন: (মানুষকে তাদের জিভ ঘটিত পাপ ছাড়া অন্য কিছু কি তাদের মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?)(২)
মানুষ যে কোন কথাই বলুক না কেন, তা হয় তার পক্ষে অথবা বিপক্ষে লিপিবদ্ধ করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন: مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلِ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴿ অর্থ [সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।] (৩) আর জিহ্বা দ্বারা সংঘটিত পাপ অনেক; যার উল্লেখযোগ্য কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হল:

গীবত গীবতের সংজ্ঞা।
গীবতের আভিধানিক অর্থ: কোন ব্যক্তি কর্তৃক অপরজনের অজ্ঞাতে তার দোষত্রুটি উল্লেখ করা।(৪)
পারিভাষিক অর্থে: রাসূল সাঃ এর সুন্নাত গীবতের শরয়ী অর্থ সম্পর্কে স্পষ্ট করেছে; যেমনটি হাদিসে এসেছে: (তোমরা কি জান গীবত কী জিনিস? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, গীবত হল, তোমার ভাই এর সম্পর্কে এমন কিছু আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। প্রশ্ন করা হল, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাই এর মধ্যে থেকে থাকে তবে আপনি কি বলেন? তিনি বললেন, তুমি তার সম্পর্কে যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে তা হলে তো তুমি তার প্রতি অপবাদ আরোপ করলে।) (১)
গীবত দ্বারা উদ্দেশ্য হল: কোন ব্যক্তির অপছন্দনীয় বিষয় আলোচনা করা; চাই সেটি তার শরীর, দ্বীন, দুনিয়া, জীবন, চরিত্র, সম্পদ, সন্তান, স্ত্রী, খাদেম, চলাফেরা, হাস্যোজ্জ্বলতা, মলিনতা এবং অন্যান্য বিষয় কেন্দ্রিক হোক অথবা সেটি কথার দ্বারা বা সাংকেতিক ভাষায় বা ইঙ্গিতে হোক। (২)

গীবতের কারণসমূহ:
১- কখনো গীবতের কারণ হতে পারে গীবতকারীর ঘৃণা ও বিদ্বেষ। আর গীবত করার মাঝে গীবতকারীর নিরাময় এবং তার হৃদয়ের ফুটন্ত ঘৃণার গরল উদগীরণের ব্যবস্থা রয়েছে। সে গীবত করার মাধ্যমে যার গীবত করা হয় তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা ধ্বংস করতে এবং তাকে নিম্নস্তরে নামিয়ে আনতে চায়। আর এর প্রতি ইমাম গাযালী রহিঃ ইশারা পূর্বক বলেন: “প্রথমত সে ক্রোধ নিবারণ করতে চায় যদি তার ক্রোধের কারণ উক্ত ব্যক্তি হয়ে থাকে। সুতরাং যখন সে ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে পড়ে তখন তার দোষ-ত্রুটি উল্লেখ পূর্বক মনের ঝাল মিটিয়ে থাকে; ফলে তার যদি প্রতিরোধমূলক দ্বীনদারী না থাকে তাহলে স্বভাবতই কথার দ্বারা তার গীবত করে থাকে”। (৩)
২- কখনো গীবতের কারণ হতে পারে সঙ্গী ও বন্ধুদের সাথে তাল মেলান তাদের সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাদের ঘৃণা থেকে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে। এহইয়াউ উলুমুদ্দীনের লেখক গীবতের কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: “সঙ্গীদের সাথে সহমত জ্ঞাপন, বন্ধুদের সাথে সৌজন্যতা রক্ষা এবং কথায় তাদের পক্ষে সায় দেয়া; কেননা তারা যখন চারিত্রিক বিষয় উল্লেখ পূর্বক রসিকতা করে তখন সে মনে করে, যদি আমি তাদেরকে বাঁধা দেই তাহলে বিষয়টি তাদের ভারী মনে হবে এবং তারা তাকে বক্র দৃষ্টিতে দেখবে। ফলে সে তাদের কথায় সায় দেয় এবং সে মনে করে এটি উত্তম মেলামেশা”। (৪)
৩- গীবতের উদ্দেশ্য হতে পারে অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করে দেখান; যেমন বলা: অমুক জাহেল, তার বুঝ খুব হালকা এবং তার বচন খুব দুর্বল। (৫)

গীবত করার বিপদসমূহ:
১- যে ব্যক্তি গীবত করে সে হারাম কাজে জড়িত হয়ে পড়ে। এমনকি শরীয়ত প্রণেতা গীবতকারীকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণকারীর সাথে তুলনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ اجْتَنِبُواْ كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّনِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَহَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابُ رَّحِيمٌ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।] (১)
জাযযায রহিঃ বলেন: “ব্যাখ্যা হল, কারো অনুপস্থিতিতে তার মন্দ আলোচনা করা তার মৃত অবস্থায় গোশত ভক্ষণের পর্যায়ের; যে এ সম্পর্কে অনুভব করতে পারে না”। আবু ইয়ালা রহিঃ বলেন: এটি গীবত হারাম হওয়াকে নিশ্চিত করে; কেননা মুসলিম ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ এবং মন এটাকে সহজাতভাবেই অপছন্দ করে। ফলে গীবত তার নিকট অপছন্দনীয় পর্যায়ের হওয়ায় শোভনীয়”। (২)
২- গীবতের শাস্তি মর্মন্তদ এবং এর প্রভাব মারাত্মক। আর রাসূল সাঃ তার ভাষায় গীবতের শাস্তির বিষয়টি বর্ণনা করেছেন: (যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হল, সে সময় এমন কিছু মানুষের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখ ছিল তামার, তা দিয়ে তারা নিজেদের মুখমণ্ডল ও বক্ষ খামচে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি প্রশ্ন করলাম, ওরা কারা? হে জিবরীল! তিনি বললেন, ওরা সেই লোক, যারা মানুষের মাংস ভক্ষণ করত ও তাদের সম্ভ্রমহানী করত।) (৩)
৩- গীবত করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (হে জনগণ! তোমরা যারা মুখে মুখে ঈমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমদের গীবত করো না এবং তাদের দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ যদি কারো দোষত্রুটি তালাশ করেন তাকে তার তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন।)(৪)

প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা গীবতের ক্ষতির প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা:
১- যে ব্যক্তি মানুষের গীবত করে সে আল্লাহর শাস্তি ও তার ভয়াবহতা, যন্ত্রণা এবং শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা তার না থাকার বিষয়টি স্মরণ করবে। আর গীবত আল্লাহর অসন্তুষ্টি আনায়ন করে।
২- গীবতের কদর্যতা ও যখন সে কোন ব্যক্তির গীবত করার ইচ্ছা করে তখন গীবত তার উপরই প্রবর্তিত হয়- এ বিষয়টি অনুভব ও কল্পনা করা। আর স্মরণ করা যে, গীবতকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করে। মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই জীবিত মানুষের গোশত খেতে ভয় পায়, তাহলে মৃত মানুষের গোশত খাওয়া কীভাবে সম্ভব!
৩- যারা মানুষের গীবত করে মজা অনুভব করে; এমন মন্দ সাথীদের থেকে দূরে থাকা এবং তাদের পরিবর্তে যারা দ্বীনের উপর অবিচল থাকে এমন সৎ সাথীদের গ্রহণ করা।
৪-একজন প্রকৃত মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হল তার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকবে -বিষয়টি স্মরণে রাখা এবং আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা। যেমনটি রাসূল থেকে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: (প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে এবং প্রকৃত মুহাজির সে-ই, যে আল্লাহ্ তায়ালার নিষিদ্ধ কাজ ত্যাগ করে।)(১)
৫- দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে, তার প্রতি মানুষের প্রশংসা এবং যে তাকে ঘৃণা করে বা তার সাথে প্রতিযোগিতা করে তার নিন্দা আল্লাহ লিখে না রাখলে তাকে কোন উপকারই করতে পারবে না এবং তার মর্যাদা সমুন্নত করতে পারবে না। বরং এটি তার প্রতি মানুষের ঘৃণা ও অবজ্ঞা নিয়ে আসে; কেননা তারা ভালভাবে জানে যে এই লোকটি তাদের গীবত করবে যেমনিভাবে সে অন্যদের গীবত করেছে। কখনো বিষয়টি অন্যদের জানানোর কারণে ছড়িয়ে পড়ে ফলে মানুষেরা তার থেকে দূরে থাকে, তাকে ভীষণভাবে ভয় করে এবং তার মাঝে যে নিফাকের গুণাবলী রয়েছে-তার প্রতি ইঙ্গিত করে।
৬- গৃহে, বিদ্যালয়ে এবং সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ইসলামী স্বভাব চরিত্রে ধারণ করতে পিতা ও তরবিয়তের শিক্ষকগণের কাজ করা, মানুষের গীবতকারীদের তিরস্কার করা ও তাদের কথা না শোনা, ধমক দেয়া এবং অপরাধের কদর্যতা ও বিশালতা উপস্থাপন করা কর্তব্য। রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মানের উপর আক্রমনকে প্রতিরোধ করে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত দিবসে তার চেহারা থেকে জাহান্নামের আগুন রোধ করবেন।)(২)

চোগলখোরী:
আরবি (النميمة) বা চোগলখোরীর আভিধানিক অর্থ: পরনিন্দা। মহান আল্লাহ বলেন: অর্থ: [পিছনে নিন্দাকারী, যে একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়।](৩) নামীমাহ শব্দের মূল অর্থ হল: অস্পষ্ট কথা এবং নিঃশব্দে চলাচল। (৪)
পারিভাষিক অর্থে: নামীমাহ হল মানুষের একজনকে অপরজনের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলা, তাদের মাঝে বিবাদ লাগান এবং তাদের অন্তরকে শত্রুতা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ করার উদ্দেশ্যে তাদের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ান।(৫)
আলেমগণ বলেন: নামীমাহ বা চোগলখোরী হল, মানুষের একজনের কথাকে অন্যের কাছে বর্ণনা তাদের মাঝে সম্পর্ক বিনষ্টের লক্ষ্যে। (৬)
সুতরাং চোগলখোরি নষ্ট চরিত্র এবং হীন অন্তরের পরিচায়ক; কেননা এটি ঐক্যের পর বিচ্ছিন্নতা, ভালবাসার পর ঘৃণা এবং সন্ধির পর শত্রুতার উৎস। চোগলখোরির মাধ্যমে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, ভালবাসার বন্ধন নষ্ট করা হয় এবং চোগলখোরের জন্য যন্ত্রণা ও মানুষের ঘৃণা আনায়ন করা হয়।

চোগলখোরির কারণসমূহ:
১- চোগলখোরির কারণ কখনো হিংসা হতে পারে। যেমন চোগলখোর ব্যক্তি দুইজন বন্ধুর বন্ধুত্বকে হিংসার দৃষ্টিতে দেখে তাদের মাঝে সন্দেহের বীজ বপন ও বিবাদ লাগানোর উদ্দেশ্যে চোগলখোরির মাধ্যমে তা বিনষ্ট করতে মনস্থ করে।
২- চোগলখোরির কারণ কখনো হীন স্বভাব, আত্মিক অধঃপতন এবং সম্মান বিনষ্ট ও গোপনীয় বিষয় প্রকাশের প্রতি আগ্রহ হতে পারে। এটি নিন্দিত স্বভাবের মধ্য হতে সবচেয়ে ঘৃণিত স্বভাব যা রোগাগ্রস্ত অন্তর, নীচু স্বভাব এবং সম্মান বিনষ্ট, গোপনীয় বিষয় প্রকাশ ও ক্ষতি সাধনে আগ্রহের উপর প্রমাণ করে।(১)

চুগলির বিপদসমূহ:
১- চোগলখোরির ব্যাপারে রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন চোগলখোরই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।)(২) ইমাম নববী রহিঃ হাদিসটির অর্থ সম্পর্কে বলেন:
প্রথমত: হাদিসটির অর্থ ঐ ব্যক্তির উপর প্রয়োগ করা হবে যে ব্যক্তি চোগলখোরিকে হারাম জানার সাথে ভিন্ন ব্যাখ্যা করা ব্যতীত হালাল মনে করে।
দ্বিতীয়টি: হাদিসটি দ্বারা উদ্দেশ্য হল চোগলখোর ব্যক্তি বিজয়ীদের মত জান্নাতে প্রবেশ করবে না।(৩)
২- চোগলখোর ব্যক্তি কবরের শাস্তি থেকে নিস্তার পাবে না। ইবনু আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (নবী সাঃ একদা দু'টি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তিনি বললেনঃ এদের আযাব দেয়া হচ্ছে, কোন গুরুতর অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব হতে সতর্ক থাকত না। আর অপরজন চোগলখোরী করে বেড়াত। তারপর তিনি একখানি কাঁচা খেজুরের ডাল নিয়ে ভেঙ্গে দু'ভাগ করলেন এবং প্রত্যেক কবরের উপর একখানি গেড়ে দিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আশা করা যেতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত এ দু'টি শুকিয়ে না যায় তাদের আযাব কিছুটা হালকা করা হবে।)(৪)
৩- চোগলখোর ব্যক্তিকে সবচেয়ে ঘৃণিত চরিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: সে মানুষের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং এমন দু'মুখো স্বভাবের অধিকারী যে একদলের সাথে একভাবে কথা বলে আর অপর দলের সাথে অন্যভাবে কথা বলে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (আর মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঐ দু'মুখী ব্যাক্তি যে একদলের সাথে একভাবে কথা বলে অপর দলের সাথে অন্যভাবে কথা বলে।) (১)
ইমাম কুরতুবী রহিঃ বলেন: “দু'মুখো ব্যক্তি মানুষের মাঝে সর্বাধিক নিকৃষ্ট হওয়ার কারণ, তার অবস্থা মুনাফিকের ন্যায়। কেননা সে বাতিল ও মিথ্যার মাধ্যমে চাটুকারিতা করে এবং মানুষের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি করে”। ইমাম নববী রহিঃ বলেন: "দু'মুখো ব্যক্তি হল সেই যে প্রত্যেক দলের কাছে তাই বলে যা তাদেরকে সন্তুষ্ট করে। ফলে সে নিজেকে তাদেরই দলভুক্ত ও তাদের প্রতিপক্ষের বিরোধিতাকারী হিসেবে প্রকাশ করে। তার এরূপ কার্যকলাপ নিফাকী, শ্রেফ মিথ্যা, প্রতারণা এবং উভয় দলের গোপন বিষয় অবগত হওয়ার কৌশলমাত্র। (২)
৪- অনুরূপভাবে জনগণের সামাজিক বন্ধন কর্তন, পরিবারের রক্তের সম্পর্কে বিভাজন, বন্ধুদের মাঝের সম্পর্ক বিনষ্ট এবং মানুষের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ বিস্তারে এটি একটি অস্ত্র হিসেবে সে ব্যবহৃত হয়।
৫- দু'মুখোর ব্যক্তি সম্পর্কে কঠিন শাস্তির বার্তা সম্বলিত হাদিস বর্ণিত হওয়ার পাশাপাশি সে তার সমাজে পরিত্যক্ত, বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথীদের মাঝে অপছন্দনীয় হয়ে পড়ে এবং যারা তার মত নয় তারা তাকে পরিহার করে।

যার নিকট চুগলি করা হয় তার উপর ৬ টি দায়িত্ব-কর্তব্য বর্তায়(৩):
১- সে তাকে বিশ্বাস করবে না; কেননা চোগলখোর ব্যক্তি ফাসেক।
২- সে তাকে নিষেধ করবে, নসীহত করবে এবং তার কর্মকে তিরস্কার করবে।
৩- তাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঘৃণা করবে।
৪- তার নিকট তার অনুপস্থিত ভাইয়ের ব্যাপারে মন্দ ধারণা করবে না।
৫- তাকে যা বলা হয়েছে সেটি যেন তাকে কথা বন্ধ রাখতে এবং বিষয়টি নিয়ে অধিকতর অনুসন্ধানে প্ররোচিত না করে।
৬- চোগলখোরকে যে বিষয়ে নিষেধ করেছে সে বিষয়টি নিজের জন্য পছন্দ করবে না। সুতরাং সে তার সূত্রে চুগলি বর্ণনা করবে না এবং বলবে না যে, অমুক এরূপ বলেছে। ফলে সে-ও চোগলখোর হিসেবে গণ্য হবে এবং সে যে বিষয়ে নিষেধ করেছে তা সম্পাদনকারী হবে।

প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনাসমূহ:
প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনাসমূহের অন্তর্গত হল:
১- একজন ব্যক্তির পক্ষে চোগলখোরের অবস্থা এবং তার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনার বিষয়টি স্মরণ করা। যেমন চোগলখোর ব্যক্তির কবরে শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার বিষয়টি কল্পনা করা এবং রাসূল সাঃ এর এই কথাকে স্মরণ করা: (কোন চোগলখোরই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।)(১)
২- যার নিকট চুগলি করা হয় তাকে নিষেধ করা, উপদেশ দেয়া, সঠিক নির্দেশনা দেয়া, শাস্তির বার্তা সম্বলিত হাদিসগুলো এবং চুগলি যে মানুষের মাঝের সম্পর্ক বিনষ্ট করে -এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া।
৩- সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার মুসলিম ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করা। নিজেকে প্রশ্ন করা, কেউ তার ব্যাপারে চুগলি করুক -সে কি তা পছন্দ করে? অনুরূপভাবে অন্যান্য মানুষেরাও তা পছন্দ না করে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।)(২)
৪- ব্যক্তি ও সমাজের উপর চুগলির ক্ষতি মূলোৎপাটনে মসজিদ, সংবাদ মাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার উপর গুরুত্ব প্রদান করা।
৫- ধৈর্য ধারণ করা এবং চুগলি ও সীমালঙ্ঘন থেকে নফসের জিদকে নিয়ন্ত্রণ করা।

মিথ্যা মিথ্যার সংজ্ঞা: আভিধানিক অর্থে মিথ্যা হল: সত্যের বিপরীত। (১)
আর পারিভাষিক অর্থে: ইমাম সানআনী রহিঃ বলেন: “মিথ্যা হল যা বাস্তবের বিপরীত”। (২) কোন জিনিসের বাস্তব অবস্থার বিপরীত সংবাদ দেয়াই হল মিথ্যা। (৩)

মিথ্যা বলার কারণসমূহ:
যে কারণসমূহ মিথ্যার দিকে ধাবিত করে এবং মিথ্যুককে ধ্বংসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে; তা অসংখ্য। তার কিছু সংখ্যক ইমাম মাওয়ারদী রহিঃ উল্লেখ করেছেন এবং মুহাম্মাদ আহমাদ তার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।(৪) সুতরাং মিথ্যার কারণসমূহের অন্তর্গত হল:
১- নফসে আম্মারার ধোঁকায় প্রতারিত হয়ে এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে একজন ব্যক্তি কল্পিত সুবিধা অর্জন অথবা ক্ষতির আশঙ্কা প্রতিহত করতে মিথ্যা বলে। ফলে এটি সে যা আশা করে তার থেকে অনেক দূরে এবং সে যা ভয় পায় তার অনেক নিকটে।
২- কেউ মিথ্যা বলতে পারে প্রিয়পাত্র হওয়ার উদ্দেশ্যে এবং তার কথা রসিকতাপূর্ণ হওয়ার জন্য; বিশেষত যখন সে তার সত্য কথাবার্তায় কোন রসিকতাপূর্ণ এবং মজাদার কথা খুঁজে পায় না।
৩- মানুষ কখনো মিথ্যা বলে তার শত্রু থেকে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। ফলে সে তার শত্রুর মন্দ বর্ণনা করে এবং তার দিকে এমন কথা ও কাজ সম্পৃক্ত করে, যা থেকে সে মুক্ত।
৪- মিথ্যার কারণসমূহ তার অনুগামী হওয়ায় সে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে মিথ্যা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে পড়ে এবং তার হৃদয় মিথ্যার অনুগামী হয়ে যায়।
৫- ব্যক্তি কখনো একটি মিথ্যা কথা বলে এবং পূর্বের বলা মিথ্যাকে গোপন করতে এটি তাকে অসংখ্য মিথ্যা বলতে বাধ্য করে।
৬- সম্ভবত মিথ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল দ্বীনদারিতার ত্রুটি এবং শরীয়ত সম্পর্কে ভুল বুঝ। কেননা দ্বীনদার ব্যক্তি মিথ্যা বলার কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পায় না।
৭- শ্রেষ্ঠত্ব, সুখ্যাতি ও নিজেকে প্রকাশের ঝোঁকে একজন ব্যক্তি কখনো মিথ্যা বলে। ফলে সে নিজেকে উচ্চাসনে দেখানোর জন্য মিথ্যা বলে।

মিথ্যা বলার আরো কিছু কারণ রয়েছে। মানুষের মাঝে কেউ কেউ মিথ্যা বলে মিথ্যার মাঝে বেড়ে উঠার কারণে, তার পরিবার ও সমাজের সদস্যদের মিথ্যাকে পছন্দ করতে এবং তাদের সন্তান ও মানুষের সাথে তাদের মিথ্যার ব্যবহার করতে দেখার কারণে। ফলে এই তরবিয়ত প্রার্থী মিথ্যাকে ভাল মনে করে এ ধারণা বশত যে, মিথ্যা তার থেকে ক্ষতি দূর করতে পারবে এবং তার কল্যাণ করতে পারবে। অথচ সে ধারণা করে নাই, এ জন্য তার নামে মিথ্যার গোনাহ লিপিবদ্ধ করা হয়। 'আবার একই সময়ে তারা তাকে মন্দ আচরণে অভ্যস্ত করে তুলেছে পরামর্শ, অনুকরণ এবং খারাপ উদাহরণের মাধ্যমে'।
এই জন্য রাসূল সাঃ অভিভাবককে তার সন্তানের সাথে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন আমের রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (রাসূল সাঃ একদা আমাদের বাড়িতে এলেন। আমি তখন শিশু ছিলাম। এমতাবস্থায় আমি খেলার জন্য বাড়ির বাইরে বের হতে যাচ্ছিলাম। তা দেখে আমার মা আমার উদ্দেশ্যে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে কিছু দিবো। রাসূল সাঃ তাকে প্রশ্ন করলেন, তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা করছে? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূল সাঃ তাকে বললেন, যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে এ কারণে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ হতো।) (১)

মিথ্যা বলার বিপদসমূহ:
১- এটি নিফাকের আলামতের অন্তর্গত; রাসূল সাঃ বলেছেন: (সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে এবং যখন চুক্তি করে তা লংঘন করে।)(২)
২- মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়। পাপ তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা কথা বলতে বলতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাবাদী রূপে সাব্যস্ত হয়ে যায়।) (৩)
৩- মানুষের নিকট পছন্দনীয় বিষয় হল বেশি বেশি কথা বলা এবং সে যা শোনে তাই প্রচার করার প্রবণতা। আর রাসূল সাঃ এ বিষয়ে নিষেধ করেছেন: (মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শোনে বিনা বিচারে তা-ই বর্ণনা করে।) (৪)
৪- মিথ্যা হল সকল পাপের মূল ভিত্তি এবং সংবাদ বিকৃতির প্রমাণ। যেহেতু সংবাদমূলক কথাই মানুষকে আলাদা করে, তাই একজন মিথ্যাবাদী চতুষ্পদজন্তর চেয়েও খারাপ হয়ে যায়। সমাজ বিনষ্টের একটি পথ হল মিথ্যা এবং বর্তমান বিশ্বের সমস্যার সূচনা হল সত্যের অনুপস্থিতি এবং কথায়, কাজে, নিয়তে ও বেশভূষায় মিথ্যার বিস্তৃতি।
৫- মিথ্যা পরিবার, সামষ্টিক কাজ এবং বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের সদস্যদের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করে। কারণ এটি কথা ও কাজে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে; ফলে তা মানসিক অস্থিরতা ও তাদের সাথে মেলামেশাকারীর প্রতি সন্দেহের দিকে ধাবিত করে। পরিণতিতে মানুষের মাঝে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়।

প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা মিথ্যার প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনাসমূহ:
১- মানুষের এটি জানা ও সর্বদা অনুভব করা যে, তার থেকে ভাল বা মন্দ যাই প্রকাশ পায় তা লেখার জন্য দু'জন ফেরেশতা রয়েছে এবং সকল বিষয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন: إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ শَِّمَالِ قَعِيدٌ মَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ অর্থ: [ডানে ও বামে বসা দু'জন ফেরেশতা পরস্পর তার আমল লিখার জন্য গ্রহণ করে।* সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।] (১)
২- মাতাপিতা এবং মুরুব্বীদের কথাবার্তায় সত্যবাদিতা এবং সন্তানদের নিকট প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়গুলো মান্য করা কর্তব্য। যাতে তারা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে বেড়ে না ওঠে এবং মাতাপিতা, মুরুব্বী ও শিক্ষকদের প্রতি তাদের আস্থা হ্রাস না পায়। কখনো বা তারা তাদের ভাই-বেরাদার ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দৈনন্দিন আচারণে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে; ফলে তারা যখন এ অভ্যাসের উপর বড় হবে তখন এটি তাদের স্বভাবে পরিণত হবে।
৩- সত্য বলার সওয়াব সম্পর্কে জানা। সত্য মানুষকে সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে, আর সৎকর্ম জান্নাতের দিকে পথপ্রদর্শন করে। এটি এমন একটি উদ্বুদ্ধকারী যা কথা ও কাজে, নিয়তে ও বাহ্যিক অবয়বে সততার আচরণ গ্রহণে উৎসাহিত করে। আর রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন ব্যক্তি সর্বদা সত্য কথা বললে ও সত্য বলার চেষ্টায় রত থাকলে আল্লাহর নিকট সে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।)(২) মহান আল্লাহ বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّدِقِينَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।] (৩)
৪- অনুরূপভাবে সত্যবাদিতা হল নবীগণের বৈশিষ্ট্য। আর আল্লাহ তায়ালা ইবরাহীম আঃ এর প্রশংসা করেছেন এবং তাকে সত্যবাদী হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন: [আর স্মরণ করুন। এ কিতাবে ইবরাহীমকে; তিনি তো ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ, নবী।] (৪)
৫- ব্যক্তি ও সমাজের উপর মিথ্যার ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট করণে পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের নিজস্ব ভূমিকা পালন করা।

লানত করা এবং গালি দেয়া লানত ও গালির পরিচয়:
লানত শব্দের আভিধানিক অর্থ হল: অসন্তোষের প্রেক্ষিতে বিতাড়ন করা বা দূরে সরিয়ে দেয়া। লানত যখন আল্লাহ পক্ষ থেকে হয় তখন আখেরাতের প্রেক্ষাপটে অর্থ হল, তাঁর পক্ষ হতে শাস্তি এবং দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে অর্থ হল, তাঁর রহমত ও তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়া। আর লানত যখন মানুষের পক্ষ থেকে হয় তখন তার অর্থ হল, অন্যের উপর বদদোয়া করা।(১)
আর আরবি )السَّبُ( শব্দের অর্থ হল: গালি-গালাজ করা ও তিরস্কার করা।(২)
গালি ও লানত হল মন্দ চরিত্রের অন্তর্গত যার বিরুদ্ধে ইসলাম লড়াই করে এবং তা অপছন্দ করে ও তা থেকে সতর্ক করে; কেননা এগুলো ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার দিকে ধাবিত করে এবং কখনো হাতাহাতির পর্যায়ে নিয়ে যায়। এগুলো হারাম হওয়া ছাড়াও অশ্লীল ও হীন আচরণ যা সুস্থ রুচীর অধিকারীগণ অপছন্দ করেন। গালি এবং লানত এমন প্রবেশদ্বার যা কষ্ট প্রদান এবং অপবাদ দেয়ার দিকে পরিচালিত করে; কেননা লানতকারী এবং গালিদাতা যাকে লানত বা গালি দেয়া হয় তাকে কষ্ট দেয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُواْ فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا :[ পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো।] (৩)

লানতের কারণসমূহ:
১- কখনো লানত বা গালির কারণ হতে পারে প্রতিশোধ গ্রহণ। এটি সেই ঘৃণা থেকে উৎপন্ন হয় যা গালিদাতাকে গালিগালাজকৃত ব্যক্তির প্রতি উস্কে দেয়। তীব্র ঘৃণার কারণে সে তাকে সবচেয়ে মন্দ ও নোংরা গুণে বিশেষিত করে বা তাকে লানত করে অজ্ঞাত বশত অথবা জেনে-বুঝে। আর এর দ্বারা মূলত সে তাকে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছা করে। ইমাম গাযালী রহিঃ এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: “গালি দেয়ার কারণ হয় কষ্ট প্রদান অথবা ফাসেক, খবীস ও হীনদের সাথে মেলামেশার কারণে গড়ে উঠা অভ্যাস। আর তাদের অভ্যাস হল গালি দেয়া”। (৪)
২- লানত করা ও গালি দেয়ার কারণ কখনো হতে পারে রাগের বিস্ফোরণ এবং তা উত্তেজনার চরম সীমায় পৌছে যাওয়া। ফলে রাগান্বিত ব্যক্তি ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা বলে তার কথার পরিণতি সম্পর্কে অনুধাবন না করেই।
৩- কখনো লানত করা ও গালি দেয়ার কারণ হতে পারে ফাসেক, খবীস ও হীনদের সাথে মেলামেশার কারণে গড়ে উঠা অভ্যাস। আর তাদের অভ্যাস হল গালি দেয়া। এই মন্দ আচরণগুলো সাধারণত রাস্তা, বাজারঘাট এবং সমবেত হওয়ার জায়গাসমূহে ছোট-বড়দের থেকে শোনা যায়।

লানত করা ও গালি দেয়ার বিপদসমূহ:
১- গালিদাতার গালিকে ফাসেকী হিসেবে গণ্য করা হয়। নবী সাঃ বলেছেন: (মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তাকে হত্যা করা কুফরী।) (১) ইমাম নববী রহিঃ বলেন: “অন্যায়ভাবে কোন মুসলিমকে গালি দেয়া এই উম্মতের সর্বসম্মত মতে হারাম এবং গালিদাতা ফাসেক যেমনটি নবী সাঃ সংবাদ দিয়েছেন”। (২)
২- লানতের পাপ ভয়াবহ এবং মুসলিম ব্যক্তির মুখে তা বড়ই কদর্য। রাসূল সাঃ বলেছেন: (মুমিনকে লানত করা তাকে হত্যা করার সমান।) (৩) হাদিসটি মুসলিম ব্যক্তিকে লানত করা কঠোরভাবে হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করছে; আর এ বিষয়ে কোন মতানৈক্য নেই। ইমাম গাযালী সহ প্রমূখ আলেমগণ বলেন: “কোন মুসলিমকে লানত করা জায়েয নয় এমনকি চুতষ্পদ প্রাণীকে। ফাসেক এবং তার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। সুনির্দিষ্টভাবে জীবিত অথবা মৃত কোন কাফেরকেও লানত করা জায়েজ নয় তবে দলীলের মাধ্যমে আমরা যাদের কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার বিষয়টি জানতে পেরেছি; যেমন আবু লাহাব, আবু জাহেল এবং তাদের অনুরূপ ব্যক্তিবর্গ।
তাদেরকে দলগতভাবে লানত করা জায়েয; যেমন এরূপ বলা: আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের উপর লানত বর্ষণ করুন এবং আল্লাহ তায়ালা ইহুদী-নাসারাদের উপর লানত বর্ষণ করুন। আর রাসূল সাঃ এর বাণী: (মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তাকে হত্যা করা কুফরী।) বাহ্যিকভাবে উভয়টি মূলগতভাবে হারাম হওয়ার দিক থেকে সমান। যদিও হত্যা কঠোরভাবে হারাম। এ মতটি ইমাম আব্দুল্লাহ আল-মাজেরী গ্রহণ করেছেন। কারো মতে, হাদিসটির বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। (৪)
৩- লানতকারীগণ কিয়ামতের দিন শাফায়াত করতে পারবে না। যদিও মুমিনগণ তাদের সেসব ভাইদের জন্য শাফায়াত করবে যাদের জন্য আযাব অবধারিত হয়ে গেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (লানতকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী কিংবা সাক্ষ্যদাতা হতে পারবে না।) (৫) হাদিসের অর্থ হল: তারা কিয়ামতের দিন শাফায়াত করতে পারবে না এবং সাক্ষ্যদাতাও হতে পারবে না, যদিও মুমিনগণ তাদের সেসব ভাইদের জন্য শাফায়াত করবে যাদের জন্য আযাব অবধারিত হয়ে গেছে; এ বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে (৬):
ক. বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মত হল: পূর্ববর্তী জাতির রাসূলগণ তাদের স্বজাতির নিকট রেসালাত পৌঁছানোর বিষয়ে কিয়ামত দিবসে লানতকারীরা সাক্ষ্যদাতা হতে পারবে না।
খ. তারা দুনিয়াতে সাক্ষ্যদাতা হতে পারবে না। অর্থাৎ তারা ফাসেক হওয়ার কারণে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।
গ. তাদের শাহাদাত নসীব হবে না। অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য তার লাভ করবেনা।
৪- যাকে গালি দেয়া হয় সে যদি গালির উপযুক্ত না হয় তাহলে গালিদাতার দিকে গালি ফিরে আসবে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (একজন অপর জনকে ফাসিক বলে যেন গালি না দেয় এবং একজন অন্যজনকে কাফির বলে অপবাদ না দেয়। কেননা, অপরজন যদি তা না হয়, তবে সে অপবাদ তার নিজের উপরই আপতিত হবে।) (১) তিনি আরো বলেন: (যখন কোন ব্যক্তি কারো উপর লা'নত করে, তখন তা আসমানের দিকে উথিত হয়। কিন্তু তা সেখানে পৌঁছবার আগেই আসমানের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে পৃথিবীর দিকে নেমে আসে। তখনও তার সামনে পৃথিবীর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাজেই ডানে-বামে ফিরতে থাকে। পরিশেষে যখন তা কোন যথার্থ স্থান পায় না, তখন অভিশপ্ত বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি ফিরে যায়; যদি সে অভিশাপের উপযুক্ত হয়, তাহলে অভিশাপ তার উপর বর্ষিত হয়। নচেৎ তা অভিশাপ-কারীর প্রতি ফিরে আসে।) (২)
লানতের বিষয়টি কষ্টকর ও নোংরামি হওয়ার কারণে চতুষ্পদ প্রাণীকেও লানত করতে নিষেধ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমের অধ্যায়সমূহের মধ্যে 'চতুষ্পদ প্রাণী ও অন্যান্য কিছুকে লানত করা নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত অধ্যায়' শীর্ষক একটি অধ্যায় রয়েছে এবং সেই অধ্যায়ের অধীনে ইমরান বিন হুসাইন রাঃ এর হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন: (একদা রাসূল সাঃ কোন এক সফরে ছিলেন। এক আনসারী মহিলা একটি উটনীর উপর সওয়ার ছিল। সে বিরক্ত হয়ে উটনীটিকে অভিসম্পাত করতে লাগল। রাসূল সাঃ তা শুনে সঙ্গীদেরকে বললেন, এ উটনীর উপরে যা কিছু আছে সব নামিয়ে নাও এবং ওকে ছেড়ে দাও। কেননা, ওটি এখন অভিশপ্ত। ইমরান রাঃ বলেন, 'যেন আমি এখনো উঁটনীটিকে দেখছি, উঁটনীটি লোকদের মধ্যে চলাফেরা করছে, আর কেউ তাকে বাধা দিচ্ছে না।) (৩)

প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা লানতের আপদের প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেনসমূহের মধ্য হতে:
১- লানতের গোনাহ এবং তার পরিণতির দিকে একজন ব্যক্তি দৃষ্টি দেয়া কর্তব্য; কেননা লানত যদি কোন যথার্থ স্থান না পায় তাহলে লানতদাতার দিকে ফিরে আসে। অনুরূপভাবে এ বিষয়ে রাসূল সাঃ এর পূর্বোক্ত হাদিসগুলো অনুধাবন করা এবং তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা আবশ্যক।
২- রাসূল সাঃ কর্তৃক চতুষ্পদ জন্তুকে লানত করা নিষিদ্ধের বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। তিনি মহিলার সেই উটনীটিকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন যাকে সে লানত করেছিল; কেননা সেটি অভিশপ্ততে পরিণত হয়েছিল। সুতরাং অধিকতর উপযোগী হল একজন মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইকে লানত করবে না বা গালি দিবে না।
৩- বিবেকবান ও মর্যাদাবান মানুষের নিকট গালি এবং লানতের বৈশিষ্ট্য ও তার ঘৃণ্যতা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করা। যদি সে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে গালি ও লানতের নিকৃষ্টতা এবং শব্দের হীনতাকে অনুভব করবে; ফলে সে তা মন্দ জ্ঞান করবে এবং তার মুখ থেকে তা উচ্চারিত হওয়া থেকে সে বিরত থাকবে।
৪- গালি ও লানতের কার্যকর কারণের দিকে দৃষ্টি দেয়া এবং তার বিপরীত বিষয় দ্বারা প্রতিকার করা। যদি গালি ও লানতের কারণ হয় অভ্যাস, তাহলে অভ্যাস পরিবর্তন করবে। আর যদি অসৎ সঙ্গ হয়, তাহলে ভাল সঙ্গ দ্বারা পরিবর্তন করবে।
৫- মানুষের সাথে তার মনোবাঞ্ছা ও একান্ত বিষয় সংশোধন করা এবং আল্লাহর সওয়াব ও তাঁর রহমতের প্রত্যাশায় তাদের প্রতি কোন ধরণের বিদ্বেষ, চক্রান্ত, হিংসা না রাখা। এটি তাকে গালিগালাজ ও লানত না করার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।

শিরকী ও বিদয়াতী শব্দাবলী শিরকঃ দ্বীনের মাঝে মানুষের শিরক দুই প্রকার:
শিরকে আকবার বা বড় শিরক হল: আল্লাহর তা'আলার রুবুবিয়্যাহ (প্রভূত্ব), উলুহিয়্যাহ (উপাস্য) এবং তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলীতে মানুষ কর্তৃক তাঁর সমকক্ষ নির্ধারণ করা।(১)
শিরকে আসগর বা ছোট শিরক হল: রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা। হাদিসে এসেছে: (তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয় তা হল ছোট শিরক। এ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: রিয়া বা লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল।) (২)
বিদয়াত হল: এমন কথা বা কাজের প্রচলন করা যাতে শরয়ী পন্থা অনুসরণ করা হয় না।(৩)
এগুলোর উদাহরণ হল:
১- গায়রুল্লাহর নামে শপথ করা:
আরবি (الحلف) শব্দের অর্থ হল: শপথ।
মানুষ দু'ভাবে কসম বা শপথ করে: হয় সে আল্লাহ তা'আলার নামে ও তাঁর গুণাবলীর মাধ্যমে শপথ করে - এতে নিষিদ্ধের কিছু নেই; অথবা গায়রুল্লাহর নামে কসম করে থাকে। এ কসম সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করে সে কুফুরী বা শিরক করল।) (৪)
হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, গায়রুল্লাহর নামে শপথ করা শিরক এবং অত্র হাদিসে গায়রুল্লাহর নামে শপথ করার ভয়াবহতার প্রমাণ রয়েছে; যেমন নবী, মর্যাদা অথবা নবীগণের নামে কোন ব্যক্তির শপথ করা। কেননা কসম করা মূলত কসমকৃত বিষয়কে তাযীম করা বুঝায়; আর তাযীম শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হবে, অন্য কারো জন্য নয়। সুতরাং মুসলিম উম্মতের জন্য করণীয় হল তাদের সন্তানদের আল্লাহ যা ভালবাসেন ও পছন্দ করেন তার উপর গড়ে তোলা; তিনি যা অপছন্দ বা ঘৃণা করেন তার উপর নয়।

২- 'আল্লাহ যা চান এবং আপনি যা চান' এরূপ বলা:
কথার মাঝে ভুলত্রুটির অন্তর্গত হল কোন মুসলিমের এ কথা বলা: আল্লাহ যা চান এবং আপনি যা চান। অর্থাৎ মাখলুকের চাওয়াকে আল্লাহর চাওয়ার সাথে ‘ওয়াও’ (الواو) হরফ দ্বারা সংযোজন করা। আর এর মাঝে শিরক নিহিত রয়েছে। কেননা নবী সাঃ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, (একজন ইহুদী নবী সাঃ এর নিকট আগমন করে বলল: আপনারা তো আল্লাহর সাথে শরীক ও তাঁর সমকক্ষ স্থির করে থাকেন। আপনারা বলে থাকেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন আর আপনি যা ইচ্ছা করেন। আর আপনারা আরো বলেন থাকেন, কাবার কসম! তখন রাসূল সাঃ নির্দেশ দিলেন যে, যখন কসম করার ইচ্ছা করবে, তখন বলবে: কাবার রবের কসম! আরো বলবে, আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর আপনি যা চেয়েছেন।) (১)
সাহাবী আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে আমর বিন শুরাহবীল বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: (আমি নবী সাঃ কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, কোন গুনাহ আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য সমকক্ষ দাঁড় করান, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।) (২)
আমর এর হাদিসে শিরক মহা পাপ হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। আর প্রথম হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, 'আল্লাহ যা চান এবং আপনি যা চান' এরূপ বলা শিরক। বরং ব্যক্তি বলবে 'আল্লাহ যা চান'-এটি অধিক উত্তম 'আল্লাহ যা চান অতঃপর আপনি যা চেয়েছেন' এরূপ বলা থেকে। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।

৩- আল্লাহর কালাম নিয়ে বিদ্রূপ করা:
কথার মাঝে সবচেয়ে দোষণীয় হল আল্লাহর কালাম নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা বলা। যে সকল মুনাফিকেরা আল্লাহর নিদর্শনাবলী নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত তাদের সম্বন্ধে তিনি বলেন: وَلَئِن সَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَءَايَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِءُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ : إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ মِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
অবশ্যই তারা বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে?* তোমরা ওজর পেশ করোনা তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ। আমি তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেব-কারণ তারা অপরাধী।] (৩)
তাফসীরে এসেছে যে, তাবুক যুদ্ধে মুসলমান ও তাদের দ্বীনে একদল মুনাফিক আঘাত করে বলল: আমাদের এ কারীসাহেবগণ (রাসূল ও সাহাবায়ে কিরামদেরকে মুনাফিকদের পক্ষ থেকে উপহাস করে দেয়া নাম) উদরপূর্তির প্রতি বেশী আগ্রহী, কথাবার্তায় মিথ্যাচার, আর শত্রুর সামনে সবচেয়ে ভীরু ইত্যাদি। অতঃপর তারা নবী সাঃ এর কাছে এসে ওযর পেশ করে বলতে লাগল: (আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম।) মহান আল্লাহ তাদের প্রতিউত্তরে বলেন: ﴾قُلْ أَبِاللَّهِ وَءَايَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِعُونَ﴿ অর্থ: [বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?](৪)
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করা এমন পর্যায়ের কুফর যা দ্বীন থেকে বের করে দেয়; কেননা দ্বীনের মূল ভিত্তি আল্লাহ ও তাঁর মনোনীত দ্বীন এবং তাঁর রাসূলকে সম্মান করার উপর স্থাপিত। আর এর কোনটির প্রতি বিদ্রূপ করা মানেই হল এই নীতির প্রতি সম্মান করার বিরোধী।
সুতরাং একজন মুসলিম ব্যক্তির আল্লাহর কালাম, তাঁর রাসূল এবং তাঁর দ্বীনের প্রতি বিদ্রুপ করা থেকে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য।

৪- যুগ-যামানাকে গালি দেয়া:
যুগ-যামানাকে গালি দেয়া মন্দ চরিত্রের অন্তর্গত; কেননা রাসূল সাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন: (আল্লাহ তায়ালা বলেন: আদম সন্তানরা আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যামানাকে গালি দেয়; অথচ আমিই যামানা। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা; রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি।) (১) অন্য বর্ণনায় রয়েছে: (তোমরা যামানাকে গালি দিয়ো না; যেহেতু আল্লাহই যামানার বিবর্তনকারী।)(২)
আরবি 'দাহর' শব্দের অর্থ হল: যুগ, যামানা বা সময়। অর্থাৎ বিপদাপদ সংঘটনের জন্য যামানাকে দায়ী মনে করা।
'আমিই যামানা' কথাটির অর্থ হল, আমি যামানার প্রতিপালক এবং যামানা ও তার মাঝে যা সংঘটিত হয় তার নিয়ন্ত্রণকারী।
এ হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সংবাদ দিচ্ছেন যে, আদম সন্তানেরা কখনো আল্লাহ অপছন্দনীয় কর্ম সম্পাদন করে। তন্মধ্যে যুগ-যামানাকে গালি দেয়া এবং বিপদাপদের দায় তার দিকে সম্পৃক্ত করা। আর এ কর্মটি অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ এই যে, আল্লাহ তায়ালাই হলেন যামানার মালিক, তার নিয়ন্ত্রণকারী এবং তার মাঝে যা কিছু সংঘটিত হয় সেগুলোর বিবর্তনকারী। ফলে যুগ-যামানাকে গালি দেয়া তার মালিককে গালি দেয়ার নামান্তর। দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে: নবী সাঃ যামানাকে গালি দেয়া নিষেধ করেছেন এ সংবাদ দিয়ে যে, আল্লাহ তায়ালা যামানার মালিক এবং তিনিই যামানা ও তার মাঝে সংঘটিত বিষয়ের নিয়ন্তা। এর মাধ্যমে রাসূল সাঃ হাদিসে কুদসীতে যা বর্ণিত হয়েছে সেটিকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করেছেন।

৫- ইসলাম যেহেতু শ্রেষ্ঠ আচরণের নির্দেশ দেয় এবং হীন আচরণ থেকে নিষেধ করে; সেহেতু রাসূল সাঃ বাতাসকে গালি দেয়া এবং তাকে লানত করা থেকে নিষেধ করেছেন। কেননা বাতাস হল আল্লাহর সৃষ্টিজীবসমূহের মধ্য হতে একটি সৃষ্টিজীব। বাতাসের স্থির থাকা, প্রবাহিত হওয়া, উপকার কিংবা ক্ষতি করা; সবই আল্লাহর নির্দেশে। তাই বাতাসকে গালি দেয়া মানে তার পরিচালক আল্লাহ তায়ালাকে গালি দেয়া।
রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমরা বাতাসকে গাল-মন্দ করবে না। তোমাদের অপছন্দনীয় কিছু দেখলে বলবে: হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি এই বাতাসের কল্যাণ, তাতে নিহিত বিষয়ের কল্যাণ এবং সে যে বিষয়ে নির্দেশিত হয়েছে তার কল্যাণ। আর আশ্রয় চাই এই বাতাসের অকল্যাণ থেকে, তাতে নিহিত বিষয়ের অমঙ্গল থেকে এবং সে যে বিষয়ে নির্দেশিত তার অমঙ্গল থেকে।) (৩)
সুতরাং হে মুসলিম! ইসলামের সেই মহান শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন, যে শিক্ষা একজন মুসলিমকে আল্লাহর সৃষ্টিজীবের সাথে সুন্দর ভাষা ব্যবহার এবং মন্দ ভাষা পরিহারের শিক্ষা দেয়। কাজেই একজন মুসলিমের জন্য উপযুক্ত হল তার রব, নবী এবং আল্লাহর সকল সৃষ্টিজীবের সাথে তার ব্যবহৃত ভাষাকে নিকৃষ্ট আচরণ থেকে পরিচ্ছন্ন করা এবং উত্তম আচরণকে ধারণ করা।

শিরকী ও বিদয়াতী শব্দাবলীতে জড়িত হওয়ার কারণসমূহ:
১- পরিবেশ। অর্থাৎ একজন মানুষের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা শিরক-বিদয়াত প্রভাবিত পরিবেশে হওয়ার কারণে সে তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে তার মুখের ভাষায় শিরক-বিদয়াতমূলক শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। যেমন কেউ বলে: নবীর কসম, আমার মর্যাদার কসম বা আমার সন্তানের জীবনের শপথ।
২- কিছু মন্দ শব্দাবলীকে মানুষের নিকট শয়তান কর্তৃক সুশোভিত করে তোলা।
৩- বিশ্বাস করা যে, কিছু অনৈসলামিক শব্দাবলী কতক চাহিদা পূরণ করে অথবা কিছু বিপদাপদকে বাঁধা প্রদান করে।
৪- আলেমের ছদ্মাবরণে থাকা এমন কিছু জাহেলদের অনুসরণ করা যারা শিরকী ও বিদয়াতী শব্দাবলী উচ্চারণ করে থাকে।
৫- অন্যান্য ধর্মের লোকদের সাথে উঠাবসা এবং একত্রে বসবাসের ফলস্বরূপ তাদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।

শিরকী ও বিদয়াতী শব্দাবলীর বিপদসমূহ:
১- নিঃসন্দহে বড় শিরক আমল বিনষ্টকারী; মহান আল্লাহ বলেন: وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَশْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ অর্থ: [আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী হয়েছে যে, যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।] (১)
২- আল্লাহ তায়ালা ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না যে তার সাথে শিরক করা অবস্থায় তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُশْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَশَاءُ وَمَن يُশْرِكَ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا অর্থ: [নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।] (২)
৩- এটা আল্লাহর শাস্তিকে অবধারিত করে; রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যকে তাঁর সমকক্ষ স্থাপন করতঃ মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে যাবে।)(৩)
৪- এটা কল্যাণ কামনায় বা মন্দ প্রতিহতে উপকরণ গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের অন্তরকে আল্লাহ ব্যতীত সৃষ্টিজীবের উপর নির্ভরশীল করে দেয়।
৫- এটা মানুষের চারিত্রিক অবনতি ঘটায়; ফলে সে মাখলুকের নিকট তেমনভাবে অবনত হয় যেমনভাবে মাখলুক তার সৃষ্টিকর্তার নিকট অবনত হয়।
৬- এটা মানুষের বুদ্ধি-বিবেকের হ্রাস ঘটায় এবং ক্রমান্বয়ে তাকে দুর্বলতা ও অপদস্থতার দিকে নিয়ে যায়; কেননা তার হৃদয় কল্যাণ কামনায় এবং অনিষ্ট প্রতিহতে পাথর, গাছ, জীবজন্তুর উপর নির্ভর করে, সেগুলোকে ভয় করে, উপকার প্রত্যাশা করে এবং ভালবাসে। অথচ সেগুলোও তার মত মাখলুক বা সৃষ্টিজীব; যারা আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন: يَتَأَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ শَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْةٌ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ অর্থ: [হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোন; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও অন্বেষণকৃত কতই না দুর্বল।](১)

প্রতিকার প্রতিকারের উপায়সমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হল:
১- তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন এবং তদানুপাতে আমল করা; কেননা উভয় প্রকারের শিরকে জড়িত হওয়ার মূল কারণ হল জাহালত বা অজ্ঞতা। আর জ্ঞান অর্জিত হয় শিক্ষা গ্রহণ, প্রশ্ন করা এবং জ্ঞানীদের সাথে ওঠা-বসার মাধ্যমে।
২- তাওহীদের মর্যাদা সম্পর্কে জানা; আর তা হল যে ব্যক্তি তাওহীদ বাস্তবায়ন করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি আল্লাহ সাথে কাউকে শরীক না করে সাক্ষাৎ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে শিরক করা অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।)(২)
৩- এটা জানা কর্তব্য যে, শিরকী ও বিদয়াতী শব্দাবলী শুধুমাত্র জাহেলদের থেকেই প্রকাশিত হয়; যারা তাওহীদের হাকীকত ও তার মর্যাদা সম্পর্কে জাহেল। আর মুসলিম ব্যক্তি জাহেল হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে।
৪- সঠিক আদর্শের উপস্থিতি যা কথা এবং কাজে তাওহীদের মর্মকে নিশ্চিত করে; কেননা মানুষেরা সবসময় ও মুহূর্তে আদর্শের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। যেমন মুসা আঃ এর সম্প্রদায় তাদের নবীর সাথে থাকাবস্থায় যখন সাগর পার হয়ে এসে মুশরিকদের প্রতিমাপূজা দেখল তখন তারা মুসা আঃ এর নিকট অনুরূপ আবেদন করল। কিন্তু অনুসরণীয় সঠিক আদর্শের ধারক মুসা আঃ তাদেরকে নিষেধ করলেন এবং তাদেরকে মূর্তিপূজার প্রকৃত অবস্থা ব্যাখ্যা করলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা এ প্রসঙ্গে বলেন: وَجَوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَاءِيلَ الْبَحْرَ فَأَتَوْا عَلَى قَوْمٍ يَعْكُفُونَ عَلَى أَصْنَامٍ لَّهُمْ قَالُوا يَمُوسَى اجْعَل لَّنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ عَالِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ : إِنَّ هَؤُلَاءِ مُتَبَّرٌ মَّا هُمْ فِيهِ وَبَاطِلٌ মَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ করিয়ে দেই; তারপর তারা মূর্তিপূজায় রত এক জাতির কাছে উপস্থিত হয়। তারা বলল, হে মূসা! তাদের মা'বুদদের ন্যায় আমাদের জন্যও একজন মা'বুদ স্থির করে দাও। তিনি বললেন, তোমরা তো এক জাহিল সম্প্রদায়।* এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো বিধ্বস্ত করা হবে এবং তারা যা করছে তাও অমূলক।] (১)
৫- এমন পাঠ্যক্রমের উপস্থিতি যা উঠতি প্রজন্মকে সঠিক আকীদা লালন ও শিরকমুক্ত শব্দাবলী ব্যবহারের শিক্ষা দিবে।

দ্বিতীয়ত: চোখ-কানের দোষত্রুটি:
চোখ ও কান অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। আর উভয়টি হল শিক্ষা লাভের মাধ্যম। সুতরাং মানুষ চোখের দ্বারা আল্লাহর জাগতিক নিদর্শনাবলী অবলোকন করে, এই দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা যে সব দর্শনীয় বস্তুসমূহ রেখেছেন সে তা উপভোগ করে, কান দিয়ে কথাবার্তা শোনে এবং নানা আওয়াজের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে; ফলে দেখা ও শোনার মাধ্যমে তার জ্ঞান, বোধ এবং উপদেশের ভাণ্ডার বৃদ্ধি পায়। এই মহা নেয়ামাতের প্রেক্ষিতে মানুষকে সে নেয়ামতের দায়-দায়িত্ব এবং তা ব্যবহারের পরিণাম গ্রহণ করতে হয়। তাই কোন মুমিনের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার চোখ-কানকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে ব্যবহার করবে। তার কেমন অবস্থা হবে যদি তাকে চোখ-কানের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করা হয়?
মন্দ আচরণের অন্তর্গত হল, একজন ব্যক্তি কর্তৃক এ সকল ইন্দ্রীয়গুলোকে আল্লাহ যা হারাম করেছেন; সেক্ষেত্রে ব্যবহার করা। যার বিবরণ নিম্নে পেশ করা হল:

গানবাদ্য শ্রবণ করা
আরবি (المعازف) শব্দটির বহুবচন, এর একবচন হল: মিজাফ ও মিজাফাহ। যার অর্থ হল: বিনোদন যন্ত্র বা বাদ্যযন্ত্র।
আল-আজফু অর্থ হল: বাদ্যযন্ত্র বাজান। যেমন দফ ইত্যাদি যাতে আঘাত করে বাজান হয়।
আজেফ অর্থ হল: বাদক বা গায়ক। (১)
জাওহারী থেকে ইমাম কুরতুবী উল্লেখ করেন যে, মাআজেফ শব্দের অর্থ হল গান। তবে জাওহারীর সিহাহ গ্রন্থে এর অর্থ রয়েছে বাদ্যযন্ত্র, কারো মতে: বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ। দিময়াতীর লিখিত টীকায় মাআজেফ শব্দের অর্থ দফ বা অনুরূপ যা আঘাত করে বাজান হয় তা উল্লেখ করা হয়েছে। আর গান বুঝাতে আজফুন ব্যবহার করা হয়। মূলত সকল ক্রীড়া-তামাশাই আজফ।(২)

গানবাদ্যের বিধান: وَمِنَ النَّاسِ مَن يَশْتَرِى لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُوْلَتَبِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ অর্থ: [আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য আসার বাক্য কিনে নেয় জ্ঞান ছাড়াই এবং আল্লাহর দেখানো পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।] (৩)
ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস রাঃ সহ প্রমূখগণ আয়াতে বর্ণিত 'লাহওয়াল হাদিস' বা অসার বাক্য দ্বারা গান অর্থ করেছেন। আর সেটি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা নিষিদ্ধ। ইমাম কুরতুবী রহিঃ বলেন: “এটি তিনটি আয়াতের একটি আয়াত যা দ্বারা উলামাগণ গান নিষিদ্ধ ও মাকরূহ হওয়ার প্রমাণ পেশ করেছেন। আর দ্বিতীয় আয়াতটি হল মহান আল্লাহর বাণী: ﴾وَأَنتُمْ سَمِدُونَ﴿ অর্থ: [আর তোমরা উদাসীন।](১) ইবনু আব্বাস রাঃ এর ব্যাখ্যায় বলেন, হিমইয়ারী ভাষায় 'সামিদূন' অর্থ গান। যেমন বলা হয় )أسمدي لنا( অর্থাৎ আমাদের জন্য গান গাও।
আর তৃতীয় আয়াত হল মহান আল্লাহর বাণী: ﴾وَاسْتَفْزِزُ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ﴿ অর্থ: [আর তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো পদস্খলিত কর।](২) ইমাম মুজাহিদ রহিঃ বলেন: “গান এবং বাঁশী”।
সুন্নাহ থেকে গানবাদ্য নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল হল রাসূল সাঃ এর বাণী: (আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে।)(৩)
এ সকল কুরআনের আয়াত, হাদিসে নববী এবং এ দলীলগুলো থেকে উলামাগণের বুঝ একজন ব্যক্তির নিকট গান-বাদ্যের ইসলামী বিধান সুস্পষ্ট করেছে।
এটা হল গানবাদ্য ও অশ্লীল কথাবার্তা মুক্ত নাশীদ শোনার বিপরীত; এটি বৈধ। যেমনটি আরবের লোকেরা তাদের সফরে নাশীদ গাইত। ইমাম কুরতুবী বলেন: “আর তা হল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ গান এবং যা আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি ও প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে, আর যে অশ্লীল কথাবার্তা সুপ্ত কামনা-বাসনাকে জাগিয়ে তোলে। এ প্রকার যদি এমন কবিতা হয় যাতে নারীদের ও তাদের সৌন্দর্য্যের উল্লেখ থাকে এবং হারাম বস্তু ও মদের আলোচনা থাকে; তাহলে তা হারাম হওয়ার বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই। কেননা রঙ্গ-তামাশ এবং গান নিন্দনীয় সর্বসম্মতিক্রমে।
তবে যদি কোন গান উপরোক্ত বিষয় থেকে মুক্ত হয় তাহলে আনন্দ, বিয়ে ও ঈদের মুহূর্তে এবং কঠিন কাজে প্রেরণা দানের সময় কিছু গাওয়া জায়েয আছে। যেমন খন্দক খননের সময় গান গাওয়া বা উট চালনার সময় আনজাশা এবং সালামাহ বিন আকওয়া রাঃ এর গান গাওয়া। আর বর্তমান যুগের সুফীরা খঞ্জনী, দফ এবং তারযন্ত্রের মাধ্যমে গান শোনার নেশার যে প্রচলন ঘটিয়েছে তা হারাম”। (৪)

গান শোনার কারণসমূহ:
গানবাদ্য শোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলার নানা কারণ রয়েছে; যেগুলো অনুসরণ করলে ব্যক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং পরিহার করার মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে হল:
১- অসৎ লোকজন কর্তৃক সুরেলা কন্ঠের অধিকারীদের তাদের কণ্ঠকে গানবাজনায় ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং তাদেরকে অর্থবিত্ত, উৎসাহ এবং সুখ্যাতির প্রলোভন দেয়া।
২- গান গাওয়ার মাধ্যমে সুখ্যাতি অর্জনের আগ্রহ এবং কাম-প্রবৃত্তির মাঝে নিমজ্জিত হওয়ার বাসনা।
৩- ব্যক্তি যে পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং মহল্লায় বসবাস করে সেখানের শিক্ষণীয় পরিবেশের ভূমিকা। যদি এই সমস্ত পরিবেশ গান শোনার প্রতি উদ্বুদ্ধকারী হয় তাহলে ব্যক্তি বেড়ে ওঠে গানের প্রতি ভালবাসা এবং আসক্তি নিয়ে।
৪- গানবাদ্যওয়ালা এবং গানের প্রতি আসক্তদের সাথে মেলামেশা ব্যক্তিকে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করে।
৫- গানের শরয়ী বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং গান শোন বৈধ ফতোয়া প্রদান ও দলীলের অপব্যাখ্যা করার মাধ্যমে শরীয়া সম্পর্কে জ্ঞান রাখে এমন কতক দাবিদারদের গান শোনার বিষয়টি সুশোভিত করে উপস্থাপন করা।

গান শ্রবণের বিপদসমূহ: দুনিয়া ও আখেরাতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উপর গানবাদ্যের ভয়াবহ প্রভাব রয়েছে; যেমনটি নিম্নে উল্লেখ করা হল:
১- গানবাদ্য মানুষকে আল্লাহর যিকির-আযকার থেকে বিরত রাখে; কেননা সেটি বিরত রাখারই মাধ্যম। মহান আল্লাহ বলেন: وَمِنَ النَّاسِ مَن يَশْتَرِى لَهُوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُوْلَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ অর্থ: [আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য আসার বাক্য কিনে নেয় জ্ঞান ছাড়াই এবং আল্লাহর দেখানো পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।] (১) ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহিঃ বলেন: “গানে আসক্ত এমন কাউকে পাবেন না যার মাঝে জ্ঞানগত ও আমলগত হেদায়েত থেকে ভ্রষ্টতা নাই! আর তার মাঝে কুরআন শ্রবণে অনাগ্রহ এবং গান শ্রবণের আগ্রহ রয়েছে”। (২)
২- গানবাদ্য অন্তরকে অশ্লীলতা এবং বেহায়াপনার দিকে চালিত করে। ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহিঃ বলেন: “গানবাদ্য শয়তানের কুরআন এবং দয়াময় আল্লাহর পথে বড় অন্তরায়। এটি সমকামিতা ও ব্যাভিচারের মন্ত্র। এর মাধ্যমেই নষ্ট আশেক তার মাশুককে কাছে পায়, শয়তান বাতিল অন্তরগুলোকে ধোঁকা দেয় এবং প্রতারণাপূর্ণ উপায়ে সে তাদের নিকট গানকে সুন্দর করে তোলে”।(৩)
৩- গানের সাথে যুক্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা হবে। ইমাম কুরতুবী রহিঃ বলেন: “সর্বদা গান শোনায় মগ্ন থাকা নির্বুদ্ধিতা এবং তার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যাত হবে। তবে সে যদি নিয়মিত গান না শোনে তাহলে তার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা হবে না। (৪)
৪- গান অন্তরে নিফাকির জন্ম দেয়। আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমদ রহিঃ বলেন: আমি আমার পিতাকে গান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, গান অন্তরে নিফাকির জন্ম দেয় এবং আমি অপছন্দ করি। অতঃপর তিনি ইমাম মালেক রহিঃ এর উক্তি বর্ণনা করলেন: আমাদের নিকট ফাসেকেরা গান গায়।(১)
৫- গানবাদ্যের বিপদের অন্যতম হল এটি যা কিছু উৎপন্ন করে তা হারাম; তাই এটি থেকে মজুরি নেয়া হারাম এবং এর দ্বারা সম্পদ ভক্ষণ করা অন্যায় যা মৃতবস্তু ও রক্তের বিনিময় গ্রহণ করে ভক্ষণ করার সমপর্যায়ের। আর কোন ব্যক্তির জন্য গায়কের জন্য অর্থ ব্যয় করা জায়েয নয় বরং এটা তার জন্য হারাম।
৬- অনুরূপভাবে গানবাদ্যের বিপদের অন্তর্গত হল এটি লজ্জা কমিয়ে দেয়, কাম-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি করে এবং ব্যক্তিত্ব ধ্বংস করে। ইয়াজীদ বিন ওয়ালীদ বলেন: হে বনী উমাইয়্যাহ! তোমরা গানবাদ্য থেকে বেঁচে থাকবে; কেননা এটি লজ্জা কমিয়ে দেয়, কাম-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি করে এবং ব্যক্তিত্ব ধ্বংস করে।(২)
৭- গানবাদ্য কাম-প্রবৃত্তির আহ্বায়ক এবং যিনার পথ; কেননা এটি বিবেকের শরাব। কত স্বাধীন নারীই না গানবাদ্যের কারণে ব্যাভিচারিনীতে পরিণত হয়েছে, কত স্বাধীন ব্যক্তিই না এর কারণে বালক-বালিকাদের দাসে পরিণত হয়েছে, কত আত্মমর্যাদাবান ব্যক্তিই না এর কারণে মানুষের মাঝে খারাপ নামে পরিচিত হয়েছে, কত সম্পদশালী ব্যক্তিই না এর কারণে নিঃস্বতে পরিণত হয়েছে এবং কত বিপদমুক্ত ব্যক্তিই না গানবাদ্যে লিপ্ত হওয়ার কারণে সন্ধ্যায় উপনীত হতেই নানা ধরণের বিপদআপদে আক্রান্ত হয়েছে।(৩)

প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনা:
১- বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা এবং কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করা; কেননা এটি মুমিনদের জন্য তৃপ্তিদায়ক, সকল প্রকার নির্জনতায় সাথী, উৎকণ্ঠা থেকে প্রশান্তিদায়ক এবং সকল দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা থেকে আনন্দের উপলক্ষ। মহান আল্লাহ বলেন: الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ অর্থ: [যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের মন প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়।] (৪)
২- গানবাদ্যের আসর এবং গানবাদ্যের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা। কেননা তাদের সাথে মেলামেশা তাদের সাদৃশ্যতা ও ঘনিষ্ঠতাকে আবশ্যক করে।
৩- বিবেক-বুদ্ধির বিকাশ ঘটায় এবং জ্ঞানের আলো বৃদ্ধি করে এমন উপকারী পাঠে আত্মনিয়োগ করা।
৪- বাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে ইসলামী তরবিয়ত শিক্ষা দেয়া।
৫- মসজিদের মিম্বারে এবং সংবাদ মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের নিকট গানবাদ্যের বিধান বর্ণনা করা।

গোয়েন্দাগিরি তাজাসসুস বা গোয়েন্দাগিরির আভিধানিক অর্থ হল:
অভ্যন্তরীণ বিষয় অনুসন্ধান করা। আর গোয়েন্দাগিরি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় মন্দ বিষয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে। কারো মতে দোষত্রুটি অনুসন্ধান করাকে গোয়েন্দাগিরি বলা হয়। আর জাসুস হল যে গোয়েন্দাগিরি করে।(১)
পারিভাষিক অর্থ: তাজাসসুসের অর্থ হল: অনুসন্ধান করা, এটি আবু উবায়দা রহিঃ এর বক্তব্য।(২)
তাজাসসুস বা গোয়েন্দগিরি হল মানুষের একান্তে অবস্থানের সময় তাদের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা; হয় অজ্ঞাতে তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করা বা অজান্তে তাদের কথা চুরি করে শোনা অথবা তাদের লেখনী, দলীল- দস্তাবেজ এবং গোপনীয়তা যা কিছু তারা মানুষের দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে রাখত -তাদের অনুমতি ব্যতীত সেগুলো অবগত হওয়ার মাধ্যমে।

মুসলিমদের উপর গোয়েন্দগিরি করা, তাদের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা এবং তাদের গতিবিধি, কথাবার্তা ও কাজকর্মের উপর নজরদারি করা সে সব মন্দস্বভাবের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো থেকে ইসলাম নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।] (৩)

রাসূল সাঃ বলেছেন: (হে ঐ সম্প্রদায় যারা মুখে ঈমান এনেছ কিন্তু হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করেনি! শোন, তোমরা মুমিনদের কষ্ট দিবে না, তাদের লজ্জা দিবে না, তাদের গোপন দোষ তালাশ করে ফিরবেনা। কেননা, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ তালাশ করবে আল্লাহ তার গোপন দোষ উদঘাটিত করে দিবেন। আর আল্লাহ যার দোষ বের করে দিবেন তাকে তিনি লাঞ্চিত করবেন যদিও সে তার হাওদার অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহণ করে।)(৪) তিনি আরো বলেছেন: (তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কারো প্রতি ধারণা পোষন করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ অন্বেষন করো না, গোয়েন্দাগিরী করো না, পরস্পর হিংসা করো না একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষন করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে থেকো।) (১)

কিছু মানুষ গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়, সে যদি চিন্তা করে এবং ছিদ্র, দরজা ও জানালা ভেদ করে তার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, মুসলিমদের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করে এবং ঐ মুহূর্ত অবলোকন করে স্বাদ অনুভব করে, যার কারণে তার গোনাহ লেখা হয় -সে যেন রাসূল এই হাদিসটি হৃদয়াঙ্গম করে। তিনি বলেছেন: (কোন ব্যক্তি যদি কারো ঘরে তার বিনা অনুমতিতে উঁকি মারে আর ঘরের মালিক তার চোখ ফুঁড়ে দেয়, তবে সে দিয়াত এবং বদলা কিছুই পাবে না।) (২)

ইবনু শিহাব থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় সাহল বিন সাদ আস-সায়েদী রাঃ তাকে সংবাদ দিয়েছেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর দরজার একটি ছিদ্র দিয়ে তাকাল। তখন রাসূল সাঃ এর কাছে একটি চিরুনি ছিল, যা দিয়ে তিনি তার মাথা চুলকাচ্ছিলেন। রাসূল সাঃ তাকে দেখে বললেন: (আমি যদি জানতাম যে তুমি আমাকে দেখছ, তাহলে অবশ্যই তা দিয়ে তোমার চোখে আঘাত করতাম। রাসূল সাঃ আরো বললেন, চোখের কারণেই তো অনুমতির বিধান করা হয়েছে।) (৩)
ইমাম নববী রহিঃ বলেন: “অত্র হাদিসে হালকা বস্তু দিয়ে ঘরে উঁকি দেয়া ব্যক্তির চোখে আঘাত করা বৈধতার প্রমাণ রয়েছে। সুতরাং কেউ যদি হালকা বস্তু নিক্ষেপ করে এবং এর ফলে উঁকিমারা ব্যক্তির চোখ নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এর কোন জামানত নেই; যদি সে ঘরে মাহরাম কোন নারী না থাকে। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত”। (৪)

গোয়েন্দাগিরির প্রকারভেদ
গোয়েন্দাগিরির প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হল:
শত্রু এবং তাদের সরঞ্জাম, সৈন্য সংখ্যা, গতিবিধি ইত্যাদির উপর যুদ্ধকালীন গোয়েন্দাগিরি করা তাদের জয় লাভের সুযোগ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয় প্রকার হল: রাষ্ট্র কর্তৃক সন্দেহভাজনদের উপর নজরদারি করা। আর এ মাসয়ালাগুলোর নির্ধারিত বিধান রয়েছে ইসলামে। তৃতীয় প্রকার হল: একজন ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তির উপর গোয়েন্দাগিরি করা। এখানে এটিই উদ্দিষ্ট বিষয়।

গোয়েন্দাগিরির বিপদসমূহ:
১- যে ব্যক্তি গোয়েন্দাগিরি করল সে হারাম কাজে লিপ্ত হল এবং আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করল। মহান আল্লাহ বলেন: ( يَاأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا ) :
[হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না।] (৫)
২- মুসলিমদের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর লাঞ্ছনার সম্মুখীন করে তোলে; যদি সে হাওদার মাঝে অবস্থান করে। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ তালাশ করবে আল্লাহ তার গোপন দোষ উদঘাটিত করে দিবেন। আর আল্লাহ যার দোষ বের করে দিবেন তাকে তিনি লাঞ্ছিত করবেন যদিও সে তার হাওদার অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহণ করে।) (১)
৩- দোষ অনুসন্ধানকারী এবং যার দোষ অনুসন্ধান করা হয় উভয়ের মাঝে গোয়েন্দাগিরি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা উস্কে দেয়।
৪- যে মুসলিমদের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করে বেড়ায় সে তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; ফলে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখে নিজের জন্য কষ্ট-ক্লেশ এবং বিপদাপদ ডেকে আনে।
৫- গোয়েন্দাগিরি ব্যক্তির জন্য সমাজের ঘৃণা এবং তার ব্যাপারে তাদের ভয় তৈরি করে।

প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা গোয়েন্দাগিরির প্রতিকারমূলক তরবিয়তি দিকনির্দেশনার অন্তর্গত হল:
১- মুসলমানদের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করার ভয়াবহতার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পরিবার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার উপর গুরুত্বারোপ করা। তাদের উপর যে শত্রুতা, অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের মত ফলাফল সৃষ্টি করে আড়ি পেতে কথা শোনা, নানা ইন্দ্রীয় দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কারণে এবং তাদের গোপনীয়তা প্রকাশ করার কারণে সমাজ ব্যবস্থা যে ভেঙ্গে পড়ে এ বিষয়েও সচেতনতা সৃষ্টিতে সমাজ ও পরিবারের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দেয়া।
২- মুসলমানদের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধানে যার অন্তর তাকে প্ররোচিত করেছে সে হাওদার মাঝে অবস্থান করলেও আল্লাহর শাস্তি এবং তাঁর লাঞ্ছনা করার বিষয়টি যেন স্মরণ করে।
৩- ইসলামি চারিত্রিক মানদণ্ড স্থাপন করা যে, সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে মুসলিমদের জন্যও তাই পছন্দ করে এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করে সে তাদের জন্যও তা অপছন্দ করে। কেননা এটি পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।)(২) সুতরাং সে বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত ভাববে এবং তার আচরণে প্রয়োগ করবে।
৪- এটা স্মরণ করা যে, কিছু মানুষের চরিত্র অন্যের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করার মন্দ চরিত্র থেকে উন্নত। বরং মানুষের দোষত্রুটি প্রকাশ পেলেও তারা উপেক্ষা করে। উরউয়া ইবনুল ওয়ারদ বলেন(৩):
তীব্র বাতাস আমার প্রতিবেশির ঘর উন্মুক্ত করে দিলে…আমি অন্যমনস্ক থাকব যতক্ষণ না ঘর আবৃত করা হয়।

আনতারা বিন শাদ্দাদ বলেন(১): আমার প্রতিবেশির কিছু প্রকাশ পেলে দৃষ্টি সংযত রাখি……. যতক্ষণ না আমার প্রতিবেশী তার আবাসস্থল আবৃত করে। তাহলে একজন মুসলিম কীভাবে মানুষের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করে? জাহেলী যুগের জ্ঞানীরা যা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত বস্তুর দিকে দৃষ্টি দেয়া আভিধানিক অর্থ:
নজর অর্থ হল: চোখের দর্শন, আর তা হল কোন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা। (২) হারাম হল হালালের বিপরীত এবং বহুবচন হুরুম। (৩) আর হারাম জিনিস এলাহী অধীনতা অথবা জবরদস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা দ্বারা নিষিদ্ধ।(৪)

পারিভাষিক অর্থ: নিষিদ্ধ দৃষ্টি হল: আল্লাহ তায়ালা যা দেখতে নিষেধ করেছেন চোখ দিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করা। নিষিদ্ধবস্তুর দিকে দৃষ্টি দেয়ার অসংখ্য কারণ রয়েছে; তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল:
১- কোন জিনিসের গুণগত, আকারগত, বর্ণগত এবং পরিমাণগত অবস্থা অবগত হওয়া এবং তার প্রকৃত অবস্থা জানার বাসনা। ২- দৃশ্য অবলোকনের মাধ্যমে উপভোগ করা। ৩- দৃশ্যের আকর্ষণ, তার প্রতি দৃষ্টি দেয়ার মাধ্যমে তার ভালবাসার টান অনুভব এবং হৃদয়কে আকৃষ্টকরণ। ৪- সৌন্দর্য বা অসৌন্দর্যের মাধ্যমে দৃশ্যের দৃষ্টি আকর্ষণের অধিকারী হওয়া।

হারামবস্তুর দিকে দৃষ্টি দেয়ার বিপদসমূহ: দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত। কাজেই ব্যক্তি যদি এটাকে আল্লাহর কর্তৃক অবৈধ কিছু অবলোকনে ব্যবহার করে তাহলে এটি তার জন্য বিপদ ও অনিষ্টের কারণ হবে এবং তার জন্য নানা ধরণের বিপদাপদ এবং ক্ষতি ডেকে আনবে; আর তা হল:
১- হারাম দৃষ্টির মাঝে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাফরমানি এবং এই নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা রয়েছে যে নেয়ামতকে আল্লাহ তায়ালা অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন: قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغْضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُّونَ مِنْ أَبْصَرِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ অর্থ: [মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।* আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে।](১)
২- দৃষ্টি হল হারাম কাজ সংঘটনের বিপদজনক উপকরণ এবং মাধ্যম। সুতরাং গায়রে মাহরাম পুরুষ নারীর দিকে বা নারী পুরুষের দিকে তাকান মন্দের সূচনা করে এবং কাম-প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (দৃষ্টি হল ইবলিসের বিষাক্ত তীরসমূহের মধ্য হতে একটি তীর।)(২)
৩- হারাম দৃষ্টি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ডেকে আনে। মন্দ থেকে দূরে থাকা কত প্রশান্ত অন্তরই না টেলিভিশন অথবা সাময়িকীর হারাম জিনিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার কারণে তার প্রশান্তিকে অনিষ্ট, বিপর্যয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ এবং আফসোসে পর্যবসিত করেছে।
৪- হারাম দৃষ্টির মাঝে আল্লাহর আনুগত্য এবং যা বান্দার দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কল্যাণকার তা থেকে চিন্তাভাবনাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার গুণ নিহিত রয়েছে। সুতরাং কত হারাম দৃষ্টিই না ব্যক্তিকে ইবাদত আদায় এবং সুন্নাহ বাস্তবায়ন থেকে ব্যস্ত রেখেছে অথবা তার পেশা ও আয়ের উৎস থেকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করেছে।
৫- হারাম দৃষ্টি কখনো অন্তরকে অসুস্থ ও তার কল্যাণের ইচ্ছাকে দুর্বল করে দেয়।

প্রতিকারমূলক তরবিয়তি পদ্ধতি
যে ব্যক্তি তার দৃষ্টিকে হারাম জিনিসের প্রতি মুক্ত করে দিয়েছে তার সংশোধনের জন্য প্রতিকারমূলক তরবিয়তি কিছু পদ্ধতি:
১- একজন ব্যক্তির জানা ও অনুধাবন করা উচিৎ যে, মানুষের উপর আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতসমূহের মধ্যে হল তিনি তাকে দুটি চোখ দান করেছেন যা দ্বারা সে অনেক জিনিস অবলোকন করে এবং তিনি যা বৈধ করেছেন তা উপভোগ করে। আর নেয়ামতের হক হল তার শুকরিয়া আদায় করা এবং তার কুফরী না করা। আর চোখের শুকরিয়া হল হারাম বস্তু থেকে দৃষ্টিকে অবনত রাখা এবং হৃদয় ও জিহ্বা দ্বারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যেহেতু সে দৃষ্টিশক্তির নেয়ামত হারায়নি।
২- অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দায়িত্ব সম্পর্কে অনুভব করা যার অন্যতম হল চোখ। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾ :অর্থ [আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (১)
৩- দৃষ্টি অবনত রাখার উত্তম পরিণতি রয়েছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (দৃষ্টি হল ইবলিসের বিষাক্ত তীরসমূহের মধ্য হতে একটি তীর। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তা পরিহার করবে আল্লাহ তাকে বিনিময়ে ঈমান দান করবেন; যার স্বাদ সে হৃদয়ে উপলব্ধি করবে।)(২)
যে ব্যক্তি হারামবস্তু থেকে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখবে আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরদৃষ্টি ও হৃদয়ের নূরকে উন্মুক্ত করে দিবেন। ফলে সে এমন কিছু দেখবে যা ঐ ব্যক্তি দেখতে পায় না যে তার দৃষ্টিকে মুক্ত করে দিয়েছে এবং আল্লাহর হারামবস্তু থেকে দৃষ্টিকে অবনত রাখেনি।(৩)
৪- দৃষ্টিশক্তি হল শিক্ষা গ্রহণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জন এবং এর দ্বারা দ্বীন-দুনিয়ার বিষয়ে উপকৃত হওয়ার মাধ্যম; এ বিষয়টি জানা। এ প্রেক্ষিতে বান্দার উপর আবশ্যক হল সে তার দৃষ্টিকে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হারাম বিষয়ে নিক্ষেপ করবে না।
৫- যে সব মাধ্যম হারাম বিষয়ে দৃষ্টি দিতে প্ররোচিত করে এমন মাধ্যম থেকে দূরে থাকা; যেমন: বাজার-ঘাট, অবাধ মেলামেশা এবং পত্রিকা, সাময়িকী ও টেলিভিশনে প্রকাশিত ছবি দেখা।

তৃতীয়ত: কর্মগত দোষত্রুটি:
কর্মগত দোষত্রুটি দ্বারা উদ্দেশ্য হল সেই সমস্ত চারিত্রিক বিচ্যুতি যা সম্পাদনের জন্য শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়; যেমন: যিনা, চুরি, দেহপ্রদর্শনী, নেশাদ্রব্য গ্রহণ ইত্যাদি। এগুলো যেহেতু অনেক তাই এর মধ্যে যেগুলোর ভয়াহতা সবচেয়ে বেশি সেগুলো উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি।

শিরকী কর্মকাণ্ডসমূহ:
শব্দগত দোষত্রুটির আলোচনায় আমাদের নিকট শিরকের ধারণা ও তার কারণ এবং প্রতিকারের আলোচনা স্পষ্টরূপে বিবৃত হয়েছে। এখানে আমি শুধু কর্মর্গত শিরকী কর্মকাণ্ডের প্রকারসমূহের উদাহরণ উল্লেখ করা যথেষ্ট মনে করছি; আর সেগুলো হল:
১- গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবাই বা কুরবানী করা:
রবের সাথে বান্দার আচরণের সাথে সম্পর্কিত সবচেয়ে ঘৃণিত ও ধিকৃত মন্দ আচরণ হল, যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত এমন কোন কিছুকে গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা; যেমন গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবাই বা কুরবানী করা। আর এটি হল শিরক। মহান আল্লাহ বলেন: قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ﴾الْعَالَمِينَ অর্থ: [বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।] (১) অত্র আয়াতটি প্রমাণ করছে যে, পশু যবাই বা কুরবানী আল্লাহর উদ্দেশ্যেই শুধু শুদ্ধ হবে এবং তা গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে করা শিরক।
কিছু মানুষ কল্যাণ আনায়ন এবং অনিষ্ট দূর করার জন্য জ্বিন এবং শয়তানের উদ্দেশ্যে কুরবানী করার শিক্ষার উপর বেড়ে উঠেছে। অথচ এ কর্মের মাঝে আল্লাহর সাথে শিরকের অপরাধ নিহিত রয়েছে। সুতরাং একজন মুসলিমের আবশ্যকীয় করণীয় হল নিজেকে আল্লাহর খালেস তাওহীদের উপর গড়ে তোলা এবং তার পরিবার- পরিজনদের এর শিক্ষা দেয়া; যাতে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হতে পারে।

২- তাবিজ ঝুলানো:
তাওহীদী আক্বীদার বিপরীত খারাপ চরিত্রের অন্তর্গত হল বদ-নজর বা হিংসা প্রতিরোধের জন্য এবং কল্যাণ ও সুস্থতা আনয়নের লক্ষ্যে মানুষ, প্রাণী বা গাড়ীর উপর ঝুলানো তাবিজের সাথে অন্তরকে সম্পৃক্ত করা। নবী সাঃ উম্মতকে এসমস্ত শিরকী কর্মকান্ড থেকে সতর্ক করে বলেনঃ (নিশ্চয় রুকা বা মন্ত্র, তাবিজ ও তেওলা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।) (১)
তামিমা বা তাবিজ হল: বদ-নজর থেকে বাঁচার জন্য বাচ্চাদের শরীরের যে পুঁতি জাতীয় জিনিস ঝুলানো হয়।
তেওলা হল: স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে বস করানো বা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বস করানো উদ্দেশ্যে যা কিছু করা হয়। রুকা বা ঝাড়ফুক তিনটি শর্তের ভিত্তিতে জায়েয যথাঃ ক- তা আল্লাহর কালাম, তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলীর মাধ্যমে হতে হবে বা আল্লাহর নিকট দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থণার মাধ্যমে হতে হবে। খ- অর্থবোধক সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় হতে হবে। গ- এই বিশ্বাস রাখা যাবে না যে, স্বয়ং তাবিজই তার উপকারে আসবে। বরং বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীর অনুযায়ী এর উপকার হবে।)(২)

৩- সৎলোকদের করব নিয়ে বাড়াবাড়িঃ
সম্মানের উদ্দেশ্যে করব অভিমুখী হওয়া নিঃসন্দেহে শিরক, চায় সেখানে তাওয়াফ করুক বা সেটাকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করুক কিংবা কবরবাসী থেকে সাহায্য কামনা করুক। কেননা এগুলো হল ইবাদত যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা বৈধ নয়। সহীহ হাদিসে এসেছে: (হে আল্লাহ! তুমি আমার কবরকে মূর্তি বানিও না যা লোকেরা ইবাদত করবে। আল্লাহর কঠিন রোষাণলে পতিত হবে সেই জাতি যারা তাদের নবীর কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।) (৩)
হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাসূল সাঃ আল্লাহর নিকট দোয়া করেছেন যে, তিনি যেন তার কবরকে মূর্তি না বানান যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করা হবে। অথচ তিনি হলেন সর্বোত্তম মানুষ। সুতরাং তার চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষের কবরের বিষয়টি কেমন?! তাই একজন মুসলিমের জন্য আবশ্যক হল সে আল্লাহর ইবাদত করবে যেমনভাবে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিজেকে একনিষ্ঠ তাওহীদের উপর গড়ে তুলবে।

বিকৃত যৌনাচার বিকৃত যৌনাচারের অর্থঃ মানুষের দ্বারা সংঘটিত কতিপয় বিকৃত যৌনাচার হল: ব্যভিচার, পুরুষ-পুরুষ ও নারী-নারী সমকামিতা। এগুলো জাহেলী ব্যাধি যা ইসলাম হারাম করেছে ও নির্মূলের চেষ্টা করেছে। এগুলোর বিস্তারিত জানার পূর্বে তার পরিচয় জানা প্রয়োজন।
ব্যভিচারঃ তা হল, বিশুদ্ধ বা সংশয়মূলক বিবাহ কিংবা দাসী ব্যতীত অন্য কারো সাথে সহবাস করা। আর এ ব্যাপারে সকল ওলামাগণ একমত। (১)
এর সংজ্ঞায় আরো বলা হয়েছে: শরীয়তসম্মত বৈবাহিক সম্পর্ক ব্যতীত নারী-পুরুষ সহবাস করা।(২) এভাবেও বলা যায় যে, তার জন্য বৈধ নয় এমন নারীর লজ্জাস্থানে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ প্রবেশ করা।(৩)
সমকামিতাঃ তা হল লূত সম্প্রদায়ের কর্ম করা। বলা হয়ে থাকে )لوّط فلان( তথা লূত সম্প্রদায়ের কর্ম করল। (৪)
সিহাক তথা নারী সমকামিতা: আরবীতে সিহাক অর্থ চাপ দেয়া, আর সাহাক বলা হয় ভেজা কাপড়কে, আবার সুহুক অর্থ দূরে যাওয়া। সমকামী নারী কথাটি খারাপ গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নারী সমকামি বলা হয় নারী-নারীতে সহবাস ব্যতীত আনুসাঙ্গিক কাজ করা। (৫)

বিকৃত যৌনাচারের কারণ: নিম্নে বিকৃত যৌনাচারের কারণ আলোচনা করা হল:
১- ভুল ধারণাসমূহ: কখনো মানুষ ধারণা করে যে এক লিঙ্গের মানুষের অপর লিঙ্গের অসংখ্য ব্যক্তির সাথে সহবাস করা তাকে কাঙ্খিত উপভোগ ও বিনোদন দিবে। তার কল্পনায় আসেনা যে, এই ধারণা তাকে সতীত্ব ও সংযমে থেকে শরয়ী বিবাহের প্রকৃত উপভোগ থেকে বঞ্চিত করবে। যেলোক এ ধরণের কাজ করে তার আত্মসম্মানের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।
এই দিকে ইঙ্গিত করে ইবনুল কায়্যিম বলেন: অন্তরের প্রাথমিক কল্পনাকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তবে তা চিন্তায় রূপান্তরিত হয়, আর চিন্তাকে যদি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্তের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়; তবে তার সাথে কুমন্ত্রণা মিশ্রিত হয়ে কুপ্রবৃত্তির জন্ম দেয়।(৬)
২- মিডিয়ার প্রোপাগান্ডাঃ
সকল ধরণের যৌন অশ্লীলতা প্রচার ও তার আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করছে সে সকল মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা যা বিভিন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে। এগুলো ফিতনা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার প্রচার করছে। অনুরূপভাবে বিভিন্ন সাহিত্যিক লেখনি ও ভালবাসার গল্প যা প্রকাশনীগুলো তৈরী করছে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ীক লাইব্রেরী বিক্রি করছে। এই দিকে ইঙ্গিত করে মওদুদী বলেন: যৌন উম্মদনার উৎস হল সাহিত্য, ছবি, সিনেমা, মঞ্চ, নাচ, দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং মাসিক ম্যাগাজিন যেগুলো গল্প ও প্রবন্ধগুলো প্রকাশ করছে চরম অশ্লীল ভাষায় ও লজ্জাজনক উলঙ্গ ছবিতে; কেননা তা প্রচার-প্রসারে অধিক কার্যকর। (১)
ইসলামী দেশসমূহের মিডিয়ায় প্রচারিত দৈনন্দিন বিজ্ঞাপনে দৃষ্টিদানকারী ব্যক্তি লক্ষ্য করবে উগ্রতার দিক থেকে তা কোন অংশেই ইউরোপের চেয়ে কম নয়। এমনকি পণ্যটিতে যে কাভার লাগনো হয় তাতে নারীর ছবি থাকে যে নারীকে নির্বাচন করা হয়েছে তার সৌন্দর্য ও অকর্ষণীয়তার ভিত্তিতে। আর এগুলোকে সমর্থন যোগায় কিছু প্রডাক্টের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যাতে যুবক যুবতীরা সম্পৃক্ত থাকে এর দ্বারা নারী-পুরুষের মাঝে ফেতনা ও কুপ্রবৃত্তি ছাড়ায়।
৩- সৌন্দর্য প্রদর্শনঃ
যৌন ফেতনা বৃদ্ধির আরো একটি কারণ হল, নারীদের সৌন্দর্য প্রকাশ, তাদের সাজসজ্জা, সুগন্ধি ব্যবহার, চেহারা উন্মুক্ত ও সৌন্দর্য প্রকাশ করে বাইরে বের হওয়া, উপরন্ত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অপরিচিত লোকের সাথে একান্তে বাস। এটি শয়তানের প্রবেশ পথ। তাই ইসলাম আমাদেরকে অপরিচিত লোকের সংস্পর্শ গ্রহণ করা থেকে সতর্ক করেছে। নবী সাঃ বলেছেনঃ (মাহরামের বিনা উপস্থিতিতে কোন পুরুষ যেন অপর কোন মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান না করে। এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক অমুক যুদ্ধের জন্য আমার নাম তালিকাভূক্ত করা হয়েছে কিন্তু আমর স্ত্রী হজে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে যাও নিজ স্ত্রীর সঙ্গে হজ কর।)(২)
অনুরূপভাবে পুরুষের সাথে নারী ওপেন কাজের সুযোগ অবাধ মেলামেশা ও সংস্পর্শ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দৃষ্টিপাত, কথোপকথন ও হাসি সহজ করেছে। ফেতনার দার উন্মুক্ত করেছে ও অকল্যাণের আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছে। এগুলো চরিত্রের স্তর অধঃপতনে এবং পর্দা ও শালীনতার উপর আক্রমণে অবদান রেখেছে।
৪- গান-বাজনাঃ
যৌন প্রবৃত্তি প্রসারের আরেকটি মাধ্যম হল গান-বাজনা শ্রবণ। এটা মনের জন্য মদ স্বরূপ। মদ মাথার ভিতর প্রবেশ করলে যে ক্ষতি করে তার চেয়ে তা অধিক ক্ষতিকর।(৩) অনুরূপভাব এটি হৃদয়কে নষ্ট করে এবং এর শ্রোতাকে যিনা ও সমকামিতার মত অশ্লীলতায় জড়িত হওয়াকে সুশোভিত করে। কেননা গান হল যিনার মন্ত্র এবং ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। (১) আল্লাহর শপথ কত সম্ভ্রান্ত নারী গানের কারণে পতিতায় পরিণত হয়েছে এবং কত সম্ভ্রান্ত পুরুষ এর কারণে শিশু-কিশোরদের দাসে পরিণত হয়েছে।(২)
৫- দেরীতে বিবাহ করাঃ
যিনা ও সমকামিতার আরেকটি কারণ হল বিবাহ বন্ধনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ এবং এমন সব কঠিন ও অপ্রয়োজনীয় শর্তারোপ করা যা বৈবাহিক জীবনের ক্ষেত্রে মূল্যহীন। যেমন নির্দিষ্ট চাকুরি, গুণাবলী ও সৌন্দর্যের মাপকাঠি নির্ধারণ করা; যা বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে সময় নষ্ট হয় এবং যুবক-যুবতীরা তাদের কাল্পনিক স্বপ্নের পিছনে ছুটতে থাকে, এমনকি যখন সুযোগ নষ্ট হয়ে যায় এবং অপ্রতিরোধ্য লালসার সামনে নিরাপত্তার বেষ্টনী খুলে যায় তখন উভয়ে হারাম সম্পর্কে লিপ্ত হয় ও সীমালঙ্ঘন ও ফাসাদের পথে পা বাড়ায়। তাইতো ইসলাম সম্পর্ক নির্বাচনের এমন মানদন্ড নির্ধারণ করেছে, যে সম্পর্কে নবী সাঃ বলেনঃ (যখন তোমাদের কাছে এমন কারো প্রস্তাব আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদের পছন্দ হয় তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। তা যদি না কর তবে পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসা'দ সৃষ্টি হবে। সাহাবীরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি তার মাঝে (কুফু-এর দিক থেকে) কিছু ত্রুটি থাকে? তিনি বললেন, যখন তোমাদের কাছে এমন কারো প্রস্তাব আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদের পছন্দ হয় তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। এই কথা তিনি তিনবার বললেন।) (৩)
তিনি আরো বলেনঃ (চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।) (৪)
৬- স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের থেকে দূরে থাকাঃ
এর আরেকটি কারণ হল স্বামীর দূরে থাকা ও দুনিয়াবী বিষয়ের ব্যস্ততায় স্ত্রী বিমুখ হওয়া, অনুরূপভাবে স্ত্রীর স্বামী থেকে দূরে থাকা। ফলশ্রুতিতে তাদের একজন বা উভয়েই অপ্রাপ্তির ঘাটতি মিটাতে চায় উপস্থিত ব্যক্তির দ্বারা; যারা দুশ্চরিত্রবান, ব্যভিচারী এবং অশ্লীলতায় লিপ্ত।
৭- অরাজক শিক্ষা ব্যবস্থাঃ
যৌন অশ্লীলতার আরেকটি কারণ হল বিশৃঙ্খল শিক্ষা ব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা যৌন চাহিদাকে শক্তিশালী করেছেন যা মানুষকে সে চাহিদাকে তৃপ্ত করতে ও ও তার দাবী পূরণ করতে উদ্বীপ্ত করে, যেন মানব বংশানুক্রম চলমান থাকে। কিন্তু মানুষের মাঝে এমন কত লোক রয়েছে, যখন তাদের যৌন চাহিদা প্রবল হয়, তখন লজ্জা ও শালীনতার পর্দাকে নষ্ট করে সে চাহিদা পূরণে হারাম পথে পা বাড়ায়; অস্থায়ী তৃপ্তির পিছনে ছুটে। কেউ তা অন্বেষণ করে যিনার মাধ্যমে, আর যার বক্রতা আরো বেশি সে তা অন্বেষণ করে সমকামিতার মাধ্যমে। আর এটাই হল মানব মনে জাগ্রত সবচেয়ে মারাত্মক অনুভূতি।(১)
যদি ইসলামী শিক্ষা তাকে সংশোধন ও পরিমার্জন না করে তবে সে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাবে এবং সে চতুষ্পদ জন্তুর মত হয়ে যাবে; যে চারণভূমিতে ঘুরে বেড়ায় এবং কোন বাধা ও অন্তরায় ছাড়া সকল ধরণের গাছ হতে ও যেকোন স্থান হতে খায়। এরা ইসলামী শিক্ষার মহান নীতি দ্বারা সজ্জিত হয়নি। বরং তাদের মানহায ছিল যেমনটি সায়্যেদ কুতুব বলেছেন: নতুন পদ্ধতিতে, অনুভূতি শক্তিকে দমন করে এবং স্বাধীনতাকে চরম পর্যায়ে ব্যবহার করে যুবক যুবতীরা তাদের শারীরিক প্রবৃত্তির পিছনে দৌড়াচ্ছে এবং তারা মনে করছে না যে তারা এমন কোন অপরাধমূলক কর্ম করছে যার কারণে কারো নিকট জবাবদিহি করতে হবে; না কোন ব্যক্তি বা সমাজ, বা দেশ কিংবা ধর্মের নিকট।(২)
মাওদুদী বলেন: নারী স্বাধীনতা এধরণের অবস্থার উপস্থিতিকে অপছন্দ করে না। পিতা-মাতা তাদের মেয়েদের পর্যাবেক্ষণ ও রক্ষাবেক্ষণে এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, তারা তারা তাদের এমন স্বাধীনতার সুযোগ করে দিয়েছেন যা ত্রিশ বা চল্লিশ বছর আগে ছেলেদের জন্যও সহজ ছিল না।(৩)

বিকৃত যৌনাচারের বিপদ ও পরিণতি নিম্নরূপঃ ১- তা পাপ ও শাস্তি নিয়ে আসে, আল্লাহ তায়ালা যিনাকে শিরক ও হত্যার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا ]এবং তারা আল্লাহর সাথে কোন ইলাহকে ডাকে না। আর আল্লাহ যে নফসকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর তারা ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে, সে শাস্তি ভোগ করবে।] (৪)
যেহেতু যিনার ক্ষতি চরম এবং তা বংশ পরম্পরা রক্ষা, লজ্জাস্থানের হেফাযত ও পবিত্রতার সংরক্ষণের বিশ্বময় রীতির কল্যাণের বিপরীত তাই কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রে তার স্থান হত্যার অপরাধের পরপরই।(৫)
অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি হল তার প্রতি দয়া প্রদর্শন ও সহানুভূতি প্রকাশ ছাড়াই বেত্রাঘাত করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ [ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং আখেরাতের উপর ঈমানদার হও; আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।](১)
নবী সাঃ বলেছেনঃ (তোমরা আমার কাছ থেকে গ্রহণ কর, তোমরা আমার কাছ থেকে গ্রহণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মহিলাদের জন্য একটি পথ বের করে দিয়েছেন। অবিবাহিত অবিবাহিতার সাথে ব্যভিচার করলে একশ বেত্রাঘাত কর এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন দাও। আর বিবাহিত বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করলে একশত বেত্রাঘাত এবং পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করবে।) (২)
আর যদি বিবাহিত হয় বা যদি পূর্বে বিবাহ হয়ে থাকে তবে পুরুষ, নারী উভয় ব্যভিচারীর শাস্তি হল রজম তথা পাথর নিক্ষেপে হত্যা। নবী সাঃ গামেদী গোত্রের মহিলা ও মায়েজ রাঃ-কে রজম করেছিলেন। (৩) যদি ব্যভিচারী দাস হয় তবে তার উপরও শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। নবী সাঃ বলেছেনঃ (তোমাদের কোন দাসী ব্যভিচার করলে এবং তার ব্যভিচার প্রমানিত হলে তাকে 'হদ' স্বরূপ বেত্রাঘাত করবে, কিন্তু তাকে ভর্ৎসনা করবে না। এরপর যদি সে আবার ব্যভিচার করে তাকে 'হদ' হিসাবে বেত্রাঘাত করবে, কিন্তু তাকে ভর্ৎসনা করবেনা। তারপর সে যদি তৃতীয়বার ব্যভিচার করে এবং তার ব্যভিচার প্রমানিত হয়, তবে তাকে বিক্রি করে দেবে, যদিও তা চুলের রশির (তুচ্ছ মূল্যের) বিনিময়ে হয়।) (৪)
فَإِذَا أُحْصِنَ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِশَةٍ فَعَلِيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ ] : মহান আল্লাহ বলেনঃ [
] [ অতঃপর যখন তারা বিবাহিত হবে তখন যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের উপর স্বাধীন নারীর অর্ধেক শাস্তি হবে।] (৫)
আর সমকামিকে সমাজ থেকে নির্মূল করা হবে, কর্তা ও কৃত উভয়কেই। নবী সাঃ বলেছেনঃ (তোমরা কাউকে যদি লূত গোত্রের মতই কুর্কমে লিপ্ত দেখতে পাও তাহলে কর্তা ও যার সঙ্গে করা হয়েছে তাদের উভয়কে হত্যা করো। আর যাকে কোন জন্তুর সাথে ব্যভিচার করতে দেখ তাকে এবং জন্তুটিকেও হত্যা করো।) (৬)
এদের শাস্তির পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, আগুন দিয়ে জালিয়ে দেয়া হবে। কারো মতে সর্বোচ্চ বিল্ডিং এর উপর থেকে উপুড় করে ফেলে দেয়া হবে। আবার কারো মতে রজম তথা পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে।(৭)
২- যিনার আরেকটি বিপদ হল তা দারিদ্রতাকে আবশ্যক করে, আয়ু সংকুচিত করে, ব্যভিচারীর চেহারাকে কালিমালিপ্ত করে, মানুষের মাঝে ঘৃণার সৃষ্টি করে, অন্তরকে মেরে না ফেললেও বিক্ষিপ্ত ও অসুস্থ করে, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও ভীতির সঞ্চার করে। এজন্য তাতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, খারাপ ও কঠিনভাবে হত্যার বিধান দেয়া হয়েছে।(১) তাই ইউরোপীয়দের সম্পর্কে মানুষ জেনেছে যে, তাদের কোন আত্মমর্যাদা নেই, এমনকি পিতা তার মেয়ের সাথে এবং ভাই তার বোনের সাথে ব্যভিচার করা কোন বিস্ময়ের বিষয় নয়।(২)
আপনি যদি মুসলিমদের আত্মমর্যাদার বিষয়ে চিন্তা করেন, যারা তাদের স্ত্রীদের অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে, তাহলে দেখতে পাবেন সেটা খুবই শক্তিশালী। সা'দ বিন উবাদা রাঃ বলেনঃ (যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অপর কোন পুরুষকে দেখতে পাই তবে নিশ্চয়ই আমি তাকে আমার তরবারীর ধার দিয়ে তার উপর আঘাত হানব- পার্শ্ব দিয়ে নয়। একথা নবী সাঃ এর কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন, তোমরা কি সা'দের আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে আশ্চর্য হয়েছে? আল্লাহর কসম! আমি তার চাইতে অধিকতর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। আর আল্লাহ আমার তুলনায় অধিকতর মর্যাদাবান। আল্লাহ তাঁর আত্মমর্যাদার কারণে প্রকাশ্য ও গোপন যাবতীয় অশ্লীল কর্ম হারাম করেছেন।)(৩)
৩- যখন কোন সম্প্রদায়ের মাঝে যিনার প্রসার ঘটে তখন তাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ, অসন্তোষ ও শাস্তি অবতীর্ণ হয়। নবী সাঃ বলেছেনঃ (যখন কোন জনপদে ব্যভিচার ও সূদ প্রকাশ লাভ করে, তখন তার বাসিন্দারা নিজেদের জন্য আল্লাহর আযাব বৈধ করে নেয়।)(৪)
৪- আর সমকামিতা এমন অশ্লীলতা যা মন অস্বীকার করে এবং আল্লাহর সৃষ্টিগত সহজাত স্বভাব থেকে বিচ্যুত হয়নি এমন বিশুদ্ধ স্বভাব তা থেকে পালায়ন করে। এটা এমন অশ্লীলতা সর্বপ্রথম যার প্রচলন করেছিল লূত সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ বলেনঃ وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِশَةَ مَا سَبَقَكُم بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعَالَمِينَ [আর আমি লূতকেও পাঠিয়েছিলাম। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, “তোমরা কি এমন খারাপ কাজ করে যাচ্ছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি?](৫)
আর আল্লাহ তায়ালা লূত সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে বর্ণনা করেছেনঃ وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِم مَّطَرًا فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ [আর আমরা তাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। কাজেই দেখুন, অপরাধীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছিল।](৬)
অনুরূপভাবে একাজে জড়িত ব্যক্তিদেরকে বর্ণনা করেছেন খারাপ ফাসেক সম্প্রদায় হিসেবে এবং তাদের এ কাজ নিকৃষ্ট কর্মের অন্তর্গত। মহান আল্লাহ বলেনঃ وَلُوطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَت تَّعْمَلُ الْخَبَائِثَ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ তাকে উদ্ধার করেছিলাম এমন এক জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা লিপ্ত ছিল অশ্লীল কাজে; নিশ্চয় তারা ছিল এক মন্দ ফাসেক সম্প্রদায়।] (১)
সুতরাং আল্লাহ তায়ালা লূত সম্প্রদায়কে সর্ব নিকৃষ্ট ও মন্দ গুণ দ্বারা বর্ণনা করেছেন; কারণ এটি নিকৃষ্টতম চারিত্রিক অপরাধ ও মানুষের সহজাত স্বভাবের গন্ডির বাইরে।
৫- সমকামিতা সমকামীকে আল্লাহর ক্রোধ, অসন্তোষ ও শাস্তির মাধ্যমে ধ্বংসকারী। লূত সম্প্রদায়ের ধ্বংসের মাঝে এ বিষয়ে নিদর্শন ও শিক্ষা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَلِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّن سِجِيلٍ مَّنضُودٍ * مُسَوَّمَةً عِندَ رَبِّكَ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدِ ) [অতঃপর যখন আমার আদেশ আসল তখন আমি জনপদকে উল্টে দিলাম, এবং তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর। যা আপনার রবের কাছে চিহ্নিত ছিল। আর এটা যালিমদের থেকে দূরে নয়।] (২)
সুতরাং শাস্তির ধরণটা ছিল খুবই কষ্টদায়ক, যেহেতু লূত সম্প্রদায়ের জনপদকে উপর নিচ করে উল্টিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং তাদের উপর ক্রমাগত পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এটি ছিল ধ্বংসের পূর্ণাঙ্গ রূপ যা সকল কিছুকে উল্টিয়ে দিয়েছিল, নিদর্শনসমূহ পরিবর্তিত করে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।(৩)
৬- জাতির সেনাশক্তির উপর বিকৃত যৌনাচারের ভয়াবহতম প্রভাব হচ্ছে, যদি সেনাবাহিনীর মাঝে এর প্রসার ঘটে তবে তা শরীরকে দূর্বল ও ক্ষীণ করে। এর দলীল হল ফ্রান্সের তিক্ত অভিজ্ঞতা; যেহেতু বিকৃত যৌনাচারের কারণে ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর শারীরিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছিল এবং দিন দিন তা ক্রমান্বয়ে দূর্বল হচ্ছিল। বিংশ শাতাব্দির শুরু থেকে ফ্রান্সের সেনা কর্মকর্তাগণ সেনাবাহিনীর শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থতার বিষয়ে ঢিলেমি করত। যার ফলে তাদের দেশ প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শুরুর দুই বছরে সিফিলিস আক্রান্ত হওয়ার কারণে পঁচাত্তর হাজার সৈন্যকে কাজ থেকে অব্যহতি দিয়ে হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল এবং একই সময়ে একটি মধ্যম আকৃতির সেনাছাউনীতে (২৪২) জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।(৪)
৭- বিকৃত যৌনাচারের শরীরের উপর আরেকটি বিপদের দিক হল, শরীরের বিভিন্ন রোগের প্রকাশ ও ব্যপ্তি লাভ। যেমন সিফিলিস রোগ, কেননা তা শরীরের সকল শিরা ও অঙ্গকে আক্রান্ত করে। তা এক ধরণের ব্যকটেরিয়া তৈরী করে যাকে (হেলিকয়েড) বলা হয়, যা যৌন সঙ্গমের মাধ্যম এক ব্যক্তি থেকে অপর ব্যক্তির মাঝে সংক্রমিত হয়। এটি মারাত্মক ব্যাধি যদি তা হার্ট বা কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে। নারী পুরুষের মাঝে (গনোরিয়া) নামক আরেকটি রোগ রয়েছে যা পেশাবের সময় প্রচন্ড জ্বালাপোড়ার সৃষ্টি করে। কখনো এটি জয়েন্টগুলোতে প্রদাহের এবং নারী পুরুষের জয়েন্টের স্থায়ী অক্ষমতার সৃষ্টি করতে পারে।
(ইনগুইনাল গ্রানুলোমা) নামে আরেকটি রোগ রয়েছে যা সাধারণত যৌনাঙ্গের বহিরাংশ ও আশপাশ আক্রান্ত করে ও কঠিনভাবে জড়িযে যায়। এর চিকিৎসা না করা হলে চরম অক্ষমতা ও ওজন হ্রাস দেখা দেয় ফলে রোগী মৃত্যুর মুখে ঢোলে পড়ে। (৫)
আধুনিক সময়ের আরেকটি রোগ যা ১৪০২ হিজরী মোতাবেক ১৯৮১ ইং সনে প্রকাশ পেয়েছে তা হল প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা (এইডস) যা যিনা, সমকামিতা ও রক্ত প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন থেকে অপরজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় সমকামীরা। এ রোগটি কতগুলো ভাইরাসের সমষ্টি যা রক্তের শ্বেত কণিকাকে ধ্বংস করে; ফলে শরীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাবিহীন হয়ে পড়ে এবং তা বিভিন্ন অণুজীবের আক্রমণের পথ তৈরী করে যা নানাধরণের প্রদাহ ও ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ। আমেরিকায় প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।(১)
যিনা, ব্যভিচার ও সমকামিতার রোগগুলোর মাঝে একটি কমন বৈশিষ্ট্য হল তা সংক্রামক রোগ যা যিনার মাধ্যমে বা কখনো যিনার পূর্বকর্মের মাধমে একজন থেকে অপরজনের মাঝে স্থানান্তরিত হয়। এগুলোর আরো বৈশিষ্ট্য হল তা নির্ণয় করা ও তার জীবাণু চিহ্নিত করা কঠিন।(২)
৮- ব্যভিচারী পুরুষের জন্য একমাত্র উপযুক্ত হচ্ছে ব্যভিচারী নারী। মহান আল্লাহ বলেনঃ الرَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا - ] زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ অথবা মুশরিক নারীকে ছাড়া বিয়ে করে না এবং ব্যভিচারিণী নারী, তাকে ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া কেউ বিয়ে করে না, আর মুমিনদের জন্য এটা হারাম করা হয়েছে।] (৩)
যিনাকারী যদি তওবা না করে, তবে তার জন্য উপযুক্ত হচ্ছে যিনাকারীণী বা মুশরিক নারী, কোন অবস্থায় তার জন্য সৎ মুমিন নারী উপযুক্ত নয়। তার পাপাচার ও উলঙ্গপনা জানার পরও কোন মুমিন ব্যক্তির জন্য তার সাথে মেয়ে বিবাহ দেয়া বৈধ নয়। অনুরূপভাবে ব্যভিচারী নারীর জন্য ব্যভিচারী বা মুশরিক পুরুষই উপযুক্ত, তার জন্য সৎ, চরিত্রবান মুমিন উপযুক্ত নয়।
এই বিধান প্রযোজ্য সে সমস্ত ব্যভিচারী নারী পুরুষদের জন্য যারা তাদের অভ্যাস থেকে বিরত হয় না ও তওবা করে না। পক্ষান্তরে যারা তওবা করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় তাদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়। কেননা তওবা ও সংশোধনের পরে তাদের মাঝে ব্যভিচারীর বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে না। (৪)
এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী শিক্ষা কীভাবে পরিবার গঠনের সূচনা থেকেই এই আচরণগত বিচ্যুতিকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছে, ব্যভিচারীদের সাথে চরিত্রবান পুরুষ ও নারীদের বিবাহ না দেয়ার মাধ্যমে; যা এই অপরাধের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এ থেকে বিরত, তওবা ও পবিত্র হওয়ার দ্বারা বিবাহের ক্ষেত্রে সে নারী-পুরুষ অন্যান্য মুসলিমদের মত হয়ে যাবে। এটি বিপর্যয় বিস্তার রোধে একটি সামাজিক চিকিৎসা এবং বাস্তবসম্মত মানসিক নিরাময়; যেন ব্যভিচারীরা অনুভব করে যে, তাদের নিকৃষ্ট কর্মের কারণে সমাজ তাদেরকে প্রত্যাখান করছে।

পরিপালনগত প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনা নিম্নে ব্যভিচারীর জন্য পরিপালনগত প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনা আলোচনা করা হল, ইসলাম এর জন্য নিম্নবর্ণিত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেঃ
১- মুসলিম নারীদেরকে শালীনতা, মর্যাদা, পর্দা রক্ষা করা এবং সাজসজ্জা প্রকাশ ও অবাধ মেলামেলা পরিহারের উপর গড়ে তোলা। আর এটি দুইভাবে হয়ে থাকেঃ
ক- সাজসজ্জা প্রকাশ, অবাধ মেলামেশার হুকুম ও পর্দাহীনতা ক্ষতির বর্ণনা করা এবং মানুষের মাঝে তা প্রচার করা।
খ- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়ে শালীনতা রক্ষা ও অবাধ মেলামেশা পরিহারের উপর জাতিকে গড়ে তোলা; যার মাধ্যমে অন্তর মূর্খতা ও পাপাচারের মরণ থেকে জেগে উঠবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا [হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।] (১)
২- কঠোরতা আরোপ, সরলতা না করা এবং নারীদের সাথে পোষাক পরিচ্ছদ, চলাফেরা ও কথাবার্তায় সাদৃশ্য না রাখার উপর যুব সমাজকে গড়ে তোলা; কেননা এগুলো তাদের মাঝে মেয়েলী ভাব তৈরী করে, যার ফলে তারা সমকামিতার ন্যায় বিচ্যুত যৌনাচারের দিকে যায়। ইবনে আব্বাস রাঃ বলেছেনঃ (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষদেরকে এবং পুরুষের বেশ ধারণকারী মহিলাদেরকে অভিশাপ করেছেন।)(২)
৩- মানুষকে দৃষ্টি অবনমনের শিক্ষা দেয়া ও তার উপর গড়ে তোলা এবং মানুষের জীবনে এর ফায়েদা ও উপকারিতা বর্ণনা করা। এই ফায়েদাগুলো হলঃ
ক- আত্মার প্রশান্তি ও আরামের জন্য ঈমানের স্বাদ ও মূল্য অনুধাবন করা। কেননা কেউ যদি আল্লাহর জন্য কোন কিছু পরিত্যাগ করে, তবে আল্লাহ তাকে তার বিনিমিয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। নবী সাঃ বলেছেনঃ (দৃষ্টি প্রদান হচ্ছে ইবলীসের তীরগুলোর একটি তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তা পরিত্যাগ করবে আল্লাহ তার নিকট এমন এক ঈমান আনবেন যে, সে তার হৃদয়ে তার মধুরতা অনুভব করবে।) (৩)
খ- অন্তরের জ্যোতি ও সঠিক অন্তরদৃষ্টির সৃষ্টি, সে যেহেতু তার দৃষ্টির আলোকে হারাম থেকে বিরত রেখেছে তাই আল্লাহ তায়ালা তার দৃষ্টি ও অন্তররের আলোকে খুলে দিবেন। ফলে সে এমন কিছু দেখতে পাবে, যে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণ করেনা এবং হারাম থেকে দৃষ্টিকে অবনমিত করেনা সে তা দেখতে পায়না। এই বিষয়টি মানুষ তার অন্তরে অনুভব করবে।
গ- অন্তরের শক্তি ও বীরত্ব, আল্লাহ তায়ালা তাকে বিজয়ের ক্ষমতা দান করবেন যেমনভাবে তাকে হুজ্জাতের ক্ষমতা দান করেছেন। ফলে তার মাঝে উভয় ক্ষমতার সমন্বয় ঘটবে। (১)
ঘ- দৃষ্টি অবনমনের মাঝে মানুষের পরিশুদ্ধি রয়েছে। কেননা দৃষ্টি হল অন্তরের অগ্রদূত যেমন জ্বর মৃত্যুর অগ্রদূত।(২) মহান আল্লাহ বলেন: قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغْضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ ﴾ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ]মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।] (৩)
৫- যৌন উদ্দীপক বস্তু হতে দূরে থাকা। যেমন ছবি দেখা, খারাপ বন্ধুদের সাথে বসা, যেনার মন্ত্র তথা গান-বাজনা শ্রবণ করা; যা অশ্লীল যৌন চাহিদা পূরণের জন্য শরীরের ক্যালরিকে উত্তপ্ত করে। যেহেতু তা সম্পর্ক তৈরী ও সহবাসে মনের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করে। অনুরূপভাবে গান শোনা হারামকে হালাল মনে করার শামিল। নবী সাঃ বলেছেনঃ (আমার উম্মতের মাঝে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে যারা ব্যাভিচার, রেশমী কাপড় মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে।) (৪)
৬- মদের ভয়াবহতা ও ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্ট করা ও তা প্রচার করা। কেননা তা যৌন বিচ্যুতির একটি অনুঘটক। যেহেতু তা জ্ঞান ও অনুধাবন শক্তির বিলোপ ঘটায় ও এর কার্যকারীতা নষ্ট করে। ফলে এই মাদকাসক্ত ব্যক্তি নেশা ও মাদকের প্রভাবে তার ধারণা ও কল্পনায় যা আসে তাই করে।
৭- এ সকল বিকৃত যৌনাচারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইসলামী বিভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা করা। যেমন ভীতি প্রদর্শন ও আশান্বিত করা। আমাদের জন্য কুরআনের আয়াত ও নবীর হাদীসসমূহে ঐ সমস্ত লোকদের উপর আত্মিক প্রভাবের বিষয়ে উদাহরণ রয়েছে। এতে রয়েছে উদাহরণ বর্ণনার পদ্ধতি যেমন লূত সম্প্রদায় (৫), এতে রয়েছে ঘটনা বর্ণনার পদ্ধতি যেমন ইউসুফ আঃ এর সচ্চরিত্রের ব্যাখ্যা যখন তাকে বাদশার স্ত্রী প্ররোচিত করেছিল (৬) এবং বশিঃকরণ আলোচনা যেমন নবী সাঃ এর আলোচনা ঐ ব্যক্তির সাথে যে তার নিকট যিনার অনুমতি চেয়েছিল।(৭)
৮- অবস্থা অনুযায়ী সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা। যেমনটি রাসূল সাঃ ফাযল বিন আব্বাস রাঃ এর সাথে করেছিলেন। ইবনে আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেনঃ (একবার কুরবানীর দিনে রাসূল সাঃ ফাযল ইবনু 'আব্বাস (রাঃ)-কে আপন সওয়ারীর পিঠে নিজের পেছনে বসালেন। ফাযল একজন সুন্দর ব্যক্তি ছিলেন। নবী সাঃ লোকেদের মাসআলা মাসায়িল বলে দেয়ার জন্য আসলেন। এ সময় খাশ'আম গোত্রের এক সুন্দরী নারী রাসূল সাঃ এর নিকট একটা মাসআলা জিজ্ঞেস করার জন্য আসল। তখন ফাযল তার দিকে তাকাতে লাগলেন। মহিলাটির সৌন্দর্য তাঁকে আকৃষ্ট করল। নবী সাঃ ফাযল এর দিকে ফিরে দেখলেন যে, ফাযল তার দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি নিজের হাত পেছনের দিকে নিয়ে ফাযল এর চিবুক ধরে ঐ নারীর দিকে না তাকানোর জন্য তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন।)(১)
যে সমস্ত স্থানে দিকনির্দেশনা, নসিহত ও পথপ্রদর্শনের দাবি রাখে সে সকল স্থানে রাসূল সাঃ এর উদ্বুদ্ধ করণে ইসলামী শিক্ষার বাস্তবায়নের বিষয়টি স্পষ্ট। তাইতো তিনি ফাযল রাঃ কে সেই মহিলার দিকে তাকাতে ছেড়ে দেননি, বরং এমন শিক্ষা দিয়েছেন যার মাধ্যমে সে অনুধাবন করতে পেরেছে যে, একজন অপরিচিত নারীর সাথে কিরূপ আচরণ করা উচিত; দৃষ্টির ভয়াবহতা বুঝানোর জন্য। জারির বিন আব্দুল্লাহ রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (আমি রাসূল সাঃ-কে হঠাৎ দৃষ্টিপাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে আদেশ দিলেন।)(২) সুতরাং যদি কোন ব্যক্তিকে দেখা যায় যে, হারাম বিষয়ের প্রতি সে দীর্ঘ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বা বারবার দৃষ্টিপাত করছে, তবে তাকে তাৎক্ষনাত নিষেধ করা হবে যেন তার মাঝে লজ্জা ও সংযমের পোষাক প্রোথিত হয় এবং বুঝতে পারে যে, মানুষ তার প্রতি লক্ষ্য ও খেয়াল রাখছে এবং তার কর্মে ক্রোধান্বিত হচ্ছে।
৯-পুরুষ ও নারীদের সমকামিতার আরেকটি কারণ হল, একজন পুরুষের অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত, অনুরূপভাবে একজন নারীর অপর নারীর লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত। সুতরাং একজন ব্যক্তির উচিত যেন অপর কোন ব্যক্তি তার লজ্জাস্থান না দেখে সে ব্যাপারে আগ্রহী থাকা। রাসূল সাঃ বলেছেনঃ (কোন নারী যেন অপর নারীর লজ্জাস্থানের দিকে না তাকায়। একইভাবে কোন পুরুষ যেন অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে না তাকায়।)(৩)
উরুও লজ্জাস্থানের অন্তর্ভুক্ত। কেননা নবী সাঃ বলেছেন (রানও সতরের অন্তর্গত।)(৪) কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা মানুষের সামনে তাদের উরুর অধিকাংশ প্রকাশ করতে কোন ধরণের ইতস্তবোধ করেনা। বিশেষতঃ যারা বিভিন্ন ধরণের খেলাধূলার সাথে জড়িত। কাজেই এই প্রজন্মকে ইসলামী নির্দেশনা উপর গোড়ে তোলা ও তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন। যেন তাদের সংকল্প ও চরিত্র উন্নত হয় এবং খারাপ চরিত্র ও তার উপকরণ থেকে মুক্ত হয়।
১০- ব্যক্তি ও সমাজের উপর সমকামিতার ভয়াবহতা বর্ণনা করা, লূত আঃ এর সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা করা কিভাবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ধ্বংস করেছিলেন এবং সমকামিতার পাশ্চাত্য প্রচারণার ব্যাপারে সতর্ক থাকা। আর এর চিকিৎসা হবে দুই পদ্ধতিতেঃ
এক: ঘটার পূর্বে তার মূলধাতুকে নিয়ন্ত্রণ করা; দৃষ্টিকে অবনমিত করা ও আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করার মাধ্যমে। এর ফলে শয়তানের জন্য অন্তরে প্রবেশের পথ বন্ধ হবে। উপরন্তু সে তার অন্তরকে কল্যাণকর কাজে ব্যস্ত রাখতে পারবে।
দুই: ঘটে যাওয়ার পর তাকে মূল থেকে উপড়ে ফেলা; এর থেকে দূরে রাখার বিষয়গুলোতে অন্তরকে ব্যস্ত রাখার মাধমে এবং এ ধরণের কাজে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে অস্থির ভয় বা কঠিন ভালবাসার দ্বারা প্রতিবন্ধকতা তৈরী করবে। কেননা কোন আত্মা অধিক প্রিয় বস্তু ব্যতীত বা কোন অধিক ক্ষতির আশঙ্কাজনক বস্তুর ভয় ব্যতীত তার পছন্দনীয় বস্তুকে ত্যাগ করে না। সাথেসাথে এই কাজ পরিত্যাগের ব্যাপারে সে ধৈর্যসহ দৃঢ় সংকল্প করবে।(১)
১১- নিরাময় ও প্রতিরক্ষার দ্বারা এই নিকৃষ্ট যৌনাচার প্রতিরোধে মিডিয়া, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ভুমিকা প্রকাশ করা।
১২- চরিত্র গঠনে মিডিয়ার সঠিক কর্তব্য পালন; চরিত্র ধ্বংসকারী বিষয়ের প্রতি উস্কানি ও প্ররোচনা দান থেকে বিরত থেকে, বিশেষতঃ যে সব মিডিয়ায় সমাজ বিনষ্টকারী গান ও ছবি প্রচার করা হয়।

নেশা ও মাদকদ্রব্যসমূহ
ইসলামী চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন বিচ্যুত আচরণের অন্তর্গত হল মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্য পান করা; কেননা এগুলোর দ্বীন, সম্পদ, শরীর, আচরণ ও সমাজের উপর ভয়াবহ ক্ষতি ও পরিণতি রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার পূর্বে এগুলোর সংজ্ঞা জানা প্রয়োজন:
নেশা ও মাদকদ্রব্য দ্বারা উদ্দেশ্য আভিধানিক অর্থঃ
আরবী সুকর (السُّكْر): বলতে এমন অবস্থা বুঝায় যা মানুষ ও তার বিবেকের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অধিকাংশ সময় শব্দটি ব্যবহার করা হয় মদ ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে। সুকর হল সুস্থতার বিপরীত।(২)
আল খামর (الخمر): কোন কিছুর নিকটবর্তী হওয়া ও তার সাথে মিশ্রিত হওয়া। ইবনুল আরাবী বলেন: (খামরকে খামর বলা হয় কারণ তাকে রেখে দেয়ার ফলে আচ্ছাদিত হয়ে গেছে অর্থাৎ তার গন্ধ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আরো বলা হয়েছে এর নাম করণের কারণ হল তা বিবেককে আচ্ছাদিত করে ফেলে।) (৩)
আল মুখাদ্দিরাত (المخدرات): পানীয় ও ওষুধের ক্ষেত্রে খাদির হল, এমন অবসাদ ও দুর্বলতা যা পানকারীর আপতিত হয়। (৪)
মদ (الخمر): যে সকল জিনিস বিবেককে ঢেকে দেয় তাকে খামর বলে। এর নাম করণের কারণ হল তা বিবেককে আচ্ছাদিত করে ফেলে। (৫)
আর তা হল (জুস বা নাবিয ইত্যাদি নেশা সৃষ্টিকারী সকল জিনিস)।(১)
তা হল যব, খেজুর, আঙ্গুর, আপেল ও কিছু প্রজাতির পেয়াজ ইত্যাদি উদ্ভিদে উপস্থিত নেশা জাতীয় পদার্থের প্রক্রিয়াজাত করার ফলে উৎপন্ন পদার্থ। (২)
সুকর )السكر(: এমন স্বাদ বা আনন্দ উপভোগ করা যার ফলে বিবেক লোপ পায় ও সে কি বলছে তা অনুধাবন করতে পারেনা। (৩)
মাদকদ্রব্য )المسكرাতের(: মদ জাতীয় সকল প্রকার জিনিস। (৪)
নেশাদ্রব্য )المখদ্দেরাতের(: এমন সব পদর্থ যা জীবিত মানুষ গ্রহণ করার ফলে তার জীবনীশক্তির এক বা একাধিক কর্মতৎপরতা পরিবর্তন ঘটায়। (৫)
এ থেকে বুঝা যায় যে, নেশা ও মাদকদ্রব্য জাতীয় বিভিন্ন প্রকারগুলোর সম্পর্ক অত্যান্ত শক্তিশালী। যার মূল হল বিবেকের সঠিক অনুভূতির বিলোপ। সুতরাং সুকর হল মদ বা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করার ফলে বিবেক যে অবস্থায় পৌছে তা। যেমন বাইরের প্রভাবের ফলে উত্তেজনা, অস্বাভাবিক কাজকর্ম বা অবসাদ বা বিবেকের অনুপস্থিতি। আর খামর ও মুখাদ্দেরাত তা সংঘটিত করে।

নেশা ও মাদকদ্রব্য গ্রহণের কারণসমূহঃ
কোন ব্যক্তি প্রভাবক ছাড়া কোন কাজ করেন না যা তাকে অনুপ্রাণিত করে এবং তাকে সেই কাজ সম্পাদনে উৎসাহিত করে, তা তার নিজের ইচ্ছায় হোক বা বাহ্যিক চাপের কারণে হোক, যেমন কেউ যদি তাকে জোর করে সেই কাজ সম্পাদন করতে বাধ্য করে। মানব জীবনের আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর প্রভাবক হল: যা ব্যক্তির পরম ইচ্ছা থেকে উদ্ভূত শক্তি; কারণ তা ব্যক্তিগত ও মানসিক প্রবণতার ফলাফলস্বরূপ যা তাকে বিচ্যুত করেছিল। আর যা তার ইচ্ছার বাইরে তা হল: মানুষকে কখনো কোন কাজ করতে বাধ্য করা হয়, যা প্রতিহত করার ক্ষমতা তার নেই; যেহেতু তার ইচ্ছার কোন মূল্যায়ন নেই। মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্যগুলোতে জড়িত হওয়ার প্রভাবকগুলো হল:
১- প্রবৃত্তির অনুসরণ ও প্রবৃত্তির সময়ে পরিণতির চিন্তা না করে তার সুখের অনুসন্ধান করা ব্যক্তিকে তার খোঁজ করতে, তার পিছনে পড়ে থাকতে ও সুখানুভূতির জন্য তা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সাধারণত এটা অল্প বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। তাদের দুর্বল বিবেক ও দূরদৃষ্টি না থাকার কারণে। বিবেকের উপর প্রবৃত্তির প্রভাব থাকার কারণে তা প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করতে উৎসাহিত করে। এই দিকে ইঙ্গিত করে ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়া বলেন: (সুকর বা নেশা দুইটি অর্থকে সংযুক্ত করে: সুখের উপস্থিতি আর বোধের অনুপস্থিতি। নেশাকারী কখনো উভয় বা এর যেকোন একটিকে উদ্দেশ্য করে থাকে। কেননা মনের চাহিদা ও প্রবৃত্তি যা অর্জনে সে সুখ পায়। আর এ সকল উপভোগে যে স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি রয়েছে তার জ্ঞান এসব গ্রহণে তাকে বাধা দেয়। বিবেক তাকে তা বাস্তবায়নে নিষেধ করে। কাজেই যখন প্রার্থক্যকারী জ্ঞান ও আদেশ- নিষেধকারী বিবেক লোপ পায়, তখন মন প্রবৃত্তির মাঝে ডুব দেয় এবং প্রশস্ত ময়দান পেয়ে যায়।) (১)
২- নেশা ও মাদকদ্রব্যের ক্ষতির ব্যাপারে দূরদৃষ্টির অভাব। অদূরদর্শী ব্যক্তিদের শিকার ও হত্যা করতে এ সকল বিষ আমদানি ও পাচার করার মধ্যমে ইসলামী সমাজ ব্যব্যস্থা ধ্বংস করার লক্ষ্যে উপনিবেশকরা যা করছে সে সম্পর্কে অজ্ঞতা-ই এসব গ্রহণে ও প্রচলনে তাদেরকে উৎসাহিত করছে। (২) এমনকি যখন তারা দুর্বল হয়ে যাবে ও নতিস্বীকার করবে তখন তাদের অর্থনীতিতে আগ্রহী হয়ে তাদের নিকট উপনিবেশ হিসেবে আসবে।
৩- প্রচলিত ভুল ধারণা যে, এ সকল মাদক যৌন শক্তি বৃদ্ধি করে। কাজেই যাদের এ সমস্যা আছে তারা মাদকের অনুসন্ধান করে। যদিও বাস্তব চিকিৎসা বিজ্ঞান এর বিপরীত প্রমাণ করেছে। আরো প্রমাণ করেছে যে, মাদক যৌন শক্তিকে দূর্বল করে, শক্রাণু ধ্বংস করে এবং বিভিন্ন ধরণের রোগ-ব্যাধির আগমন ঘটায়। (৩)
৪- আর্থিক উন্নতি, যার ফলে তার নিকট অতিরিক্ত অর্থের উপস্থিতি।
৫- পাশ্চাত্য দেশসমূহে ভ্রমণ অভ্যাসের বিস্তৃতি।
৬- বিশাল সংখ্যক বিদেশী শ্রমিক আনয়ন। (৪) যা খারাপ অভ্যাস ও চিন্তা প্রসার এবং নেশা ও মাদক প্রচলনে ভুমিকা রেখেছে; তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা মাধ্যমে বা তাদের দেশে এসব বস্তুর প্রাপ্তির স্থানের আলোচনায় বা এ গুলো পাচারের মাধ্যমে।

নেশা ও মাদকদ্রব্যের ক্ষতি নেশা ও মাদকদ্রব্যের ব্যাপক ও অসংখ্য ক্ষতি রয়েছে যা একটি স্বতন্ত্র গবেষণাপত্র ছাড়া আলোচনা প্রায় অসম্ভব। কেননা তা ধর্ম, অর্থ, বিবেক, ব্যক্তি সত্ত্বার ক্ষতি করে এবং সমাজ ও নিরাপত্তার হুমকি বৃদ্ধি করে। নিম্নে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিগুলো নিয়ে আলোচনা করা হল:
১- তা চরিত্রের পরিবর্তন ঘটায়। কেননা মাদকের নেশা মাতালের রগে রগে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে তার চরিত্র খারাপ হয় এবং সে নিজের ও অন্যের গোপন বিষয় প্রকাশ করে। কখনো কখনো শত্রুপক্ষের গোয়েন্দাবাহিনী ভয়ংকর তথ্য উৎঘাটনের জন্য মদ ব্যবহার করে থাকে।
২- তা মানসিক ও শারীরিক বিকাশ রোধ করে। আর এগুলো চরিত্রের গুরত্বপূর্ণ মানদন্ড ও অংশ; কেননা বিবেক না থাকলে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি না থাকায় স্বাভাবতই চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়।
৩- তা মাদকাসক্তকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের সম্মুখীন করে এবং তার স্বাস্থ্য ও শারীরিক সিস্টেম নষ্ট করে দেয়।
৪- মাদকাসক্তকে চতুষ্পদ জন্তুতে রুপান্তরিত করে।
৫- তা মাদকাসক্তকে আল্লাহর যিকির ও সালাত থেকে বিরত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّমَا يُرِيدُ শَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ ]শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না।] (১)
সুতরাং নেশা ও মাদকদ্রব্য মানুষকে কুরআন তেলাওয়াত, ইলমের মজলিসে উপস্থিত হওয়া এবং সৎ ব্যক্তিদের সহচার্য গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করে। কেননা বিপরীত মেজাজ ও মতামতের জন্য সে এগুলো থেকে পলায়ন করে।
৬- এগুলো তার মাঝে বিবেকবোধ, উত্তম চরিত্র ও সহজাত স্বভারের বিপরীতে নির্বুদ্ধিতা, বোকামি ও রাগ নিয়ে আসবে। কাজেই সে শুধুমাত্র অপ্রয়োজনীয় ও অশ্লীল কথা শুনবে ও অস্বাভাবিক নড়াচড়া করবে। কেননা তার বিবেক নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে তার আত্মা খাম-খেয়ালির অধীন হয়ে গেছে। তাইতো তার বিবেচনাহীন ইচ্ছা জাগ্রত হয়। ফলস্বরূপ কাউকে হত্যা করে বা নিজে নিহত হয় কিংবা কারো উপর যুলুম করে বা নিজে যুলুমের শিকার হয়। (২)
এ ধরণের আত্মিক ও আচরণগত অধঃপতনের ক্ষেত্রে যারা বেশি পরিমাণ বা অল্প পরিমাণ গ্রহণ করে সকলেই সমান। মনোপলি, আলজেরিয়া ও লিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজিক্যাল ল্যাবরেটরীর পরীক্ষা প্রমাণ করেছে যে, অতি অল্প পরিমাণ মাদকও মানসিক ভারসম্যের পরিবর্তন করতে সক্ষম।(3) আর ইসলাম মদকে হারাম করেছে, তা অল্প পরিমাণ হোক বা বেশি পরিমাণ হোক। নবী সাঃ বলেছেন: (যে বস্তর বেশী পরিমাণ নেশাগ্রস্ত করে তার অল্প পরিমাণও হারাম।) (৪)
৭- পশু-পাখিও তামাক গাছের নিকটে যায় না কারণ তারা স্বভাবগতভাবে এর ক্ষতি সম্পর্কে জানে। (৫) কাজেই যেখানে প্রাণিরা তাদের সহজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে এর ক্ষতি সম্পর্কে জানে, সেখানে জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের কি হল যে, এর অনুসন্ধান করে, এটা উপভোগ করে এবং এর কারণে দ্বীন ও সম্পদ নষ্ট করে? তাহলে প্রাণীরাই কি এদের চাইতে অধিক জ্ঞানী? অপশিক্ষার দরুণ এসমস্ত মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের যে সহজাত স্বভাবের পরিবর্তন হয়েছে পরিবার ও সমাজের উপর তার প্রভাবের মাঝেই এর জবাব নিহিত।
৮- নারীদের ডিম্বাণু ও পুরুষদের শুক্রাণুর ক্ষতির মাধ্যমে যৌন দূর্বলতার সৃষ্টি করে। একজন গবেষক বলেছেন যে, নেশাগ্রস্তদের বিশ্লেষণের সময় ৮৬% ব্যক্তিদের মাঝে শুক্রাণুর উপস্থিতি দেখা যায়নি। (৬)
ধুমপান ও অ্যানিউরিসিমা রোগের মাঝে সরাসরি সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে। এটি রক্তের ধমনীকে আক্রান্ত করে এবং অ্যানিউরিজমের সৃষ্টি করে। অনুরূপভাবে বর্তমান বিশ্বে নিরাময়যোগ্য ক্যান্সারের সৃষ্টি করতে পারে। (১)
মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক রোগ যা মদ পানে অভ্যস্ত ব্যক্তিদেরকে আক্রান্ত করে ফলে তাদের মাঝে চরম শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। উপরন্তু এটি একটি বিপদজনক সমাজিক ব্যাধি যা সমাজের সন্তানদেরকে ধ্বংস করে, ফলে তাদের শরীর ধ্বংস, জ্ঞান লোপ পায় ও চারিত্রিক মূল্যবোধ নষ্ট হয় এবং তাদেরকে সমাজের ক্ষতিকর উপাদানে পরিণত করে। (২)
৯- এটি মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, ফলে অতি সাধারণ বিষয়ে তার মাঝে হতাশা, নিরাশ, অস্থিরতা ও ভয়ের অনুভূতি জাগে। যার ফলে তার চারিত্রিক মূল্যবোধ নষ্ট হয় এমনকি পাগলামির দিকে নিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে পাগলদের ৫০% মদ্যপায়ী। (৩)
১০- এটি বিবেকের কেন্দ্রবিন্দু মগজের ব্যাপক ক্ষতি করে। ফলশ্রুতিতে মস্তিষ্ক বিকৃতির ফলে অপরাধের দিকে ধাবিত হয়। গবেষণার মাধমে প্রমাণিত হয়েছে যে, মাদকাসক্ত যুবকেরা কোন ধরণের যাচাই-বাছাই ছাড়াই অপরাধ সংঘটিত করে। উদাহরণস্বরূপ ফ্রান্সে ৬৬% অপরাধীরা মদ্যপায়ী, ৮২% সহিংসতার অপরাধে জড়িত এবং ৫২% সরকারী কর্মচারীদের উপর আক্রমণের অপরাধে জড়িত। (৪) নিঃসন্দেহে হত্যা ও সহিংসতা এমন অপরাধ ইসলামী শিক্ষা যা অপছন্দ করে এবং বিভিন্ন উপায়ে তা নির্মূলে ভূমিকা রাখে, যেমন:
ক- ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরী।
খ- এর থেকে বিরত রাখতে নির্ধারিত শাস্তির ব্যবস্থা করা।
গ- ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতির মাধমে নসিহত ও দিকনির্দেশনা প্রদান, অনুপ্রাণিত ও ভীতি প্রদর্শন করা।
১১- মাদকাসক্ত ব্যক্তি একটি হারাম পাপে জড়িত হয়ে পড়েছে। নবী সাঃ বলেছেন: (যা নেশা সৃষ্টি করে তাই মদ। আর যা নেশা সৃষ্টি করে তাই হারাম। যে ব্যক্তি পৃথিবীতে মদ পান করবে এবং (অভ্যস্ত রূপে) সর্বদা এ কাজ করে তাওবা না করেই মৃত্যুবরণ করবে, সে পরকালে তা (জান্নাতের পানীয়) পান করতে পারবে না।) (৫)
১২- মদপানকারী নিজের জন্য শরয়ী হদের সম্মুখীন হওয়াকে আবশ্যক করে নেয়। আনাস বিন মালেক রাঃ হতে বর্ণিত, (নবী সাঃ এর কাছে এক ব্যক্তিকে আনা হল। সে মদ পান করেছিল। তখন তিনি তাকে দুইট খেজুর ডাল দিয়ে প্রায় চল্লিম ঘা মারেন। পরবর্তীতে আবু বকর রাঃ তা পালন করেন। অতঃপর যখন উমর রাঃ খলীফা হলেন তখন তিনি এ বিষয়ে লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আবদুর রহমান বিন আওফ রাঃ বললেন, সর্বনিম্ন হদ হল আশি ঘা দুররা মারা। তখন উমর রাঃ এ সংখ্যক হদ কার্যকরী করেন।)(১)
১৩- মদপানকারী নিজেকে আখেরাতে আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি করে। যেমনটি সহীহ হাদিসে এসেছে নবী সাঃ বলেছেন: (নেশা উদ্রেক করে এমন সবই নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, যে লোক নেশাযুক্ত জিনিস পান করবে তাকে তিনি “তীনাতুল খাবাল” পান করিয়ে ছাড়বেন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তীনাতুল খাবাল কি? তিনি বললেন, জাহান্নামবাসীদের ঘাম বা জাহান্নামবাসীদের মলমূত্র।)(২)
১৪- দুনিয়ায় মদ পানকারী নিজেকে আখেরাতের পানীয় থেকে বঞ্চিত করে। এমর্মে নবী সাঃ বলেছেন: (…যে ব্যক্তি পৃথিবীতে মদ পান করবে এবং (অভ্যস্ত রূপে) সর্বদা এ কাজ করে তাওবা না করেই মৃত্যুবরণ করবে, সে পরকালে তা (জান্নাতের পানীয়) পান করতে পারবে না।) (৩)

পরিপালনগত প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনাঃ
মদ ও মাদকে আসক্তির বিচ্যুতির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিপালনগত প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনাগুলো হল:
১- নেশা ও মাদক গ্রহণ, বিক্রয় ও প্রচলনের বিষয়ে ইসলামী হুকুম প্রচার করা; সাথে এই মহামারী থেকে সতর্ককারী কুরআনের আয়াতসমূহ ও নবীর হাদিসসমূহ উল্লেখ করা। কেননা এগুলোতে রয়েছে মাদক থেকে নিষেধকারী ও সকর্তকারী শিক্ষা এবং মানুষের মাঝে আল্লাহ ভীতি ও তাঁর চরম শাস্তির ভীতি তৈরী করা। যা আত্মাকে কষ্ট দেয় ও কলঙ্কিত করে তার সকল কিছু থেকে দূরে থাকা।
২- যারা মাদক গ্রহণ করে বা তা প্রচলন করে তাদের প্রতি কঠোর সামাজিক সমালোচনা প্রকাশ করা, তাদের বিরত রাখা, নসিহত করা ও দিকনির্দেশনা দেয়া।
৩- এর স্বাস্থ্যগত ক্ষতি এবং অস্ত্র, বংশ পরম্পরা রক্ষা ও মস্তিষ্কের ক্ষতি প্রকাশ করা। অনুরূপভাবে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সমাজের উপর এর ক্ষতি প্রকাশ করা।
৪- যারা জীবনের সমস্যা, দুশ্চিন্তা ও বিপদ থেকে দূরে থাকতে এসব গ্রহণ করে তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা এবং হাদিসে বর্ণিত বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেয়া। নবী সাঃ বলেছেন: (কোন বান্দা বিপদ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে এই দোয়া পড়ে: ] اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ، ابْنُ عَبْدِكَ، ابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضِي فِي حُكْمِكَ، عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ، أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ، أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجَلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي[ ]হ আল্লাহ! নিঃসন্দেহে আমি আপনার বান্দা, আপনার এক বান্দা ও এক বান্দির সন্তান, আপনার হাতে আমার মালিকানা, আমার ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্তই অবধারিত, আমার ব্যাপারে আপনার ফয়সালাই সঠিক, যে সমস্ত নামে আপনি নিজেকে ভূষিত করেছেন বা আপনার কিতাবে আপনার যেসব নাম অবতীর্ণ করেছেন বা আপনার সৃষ্টির কাউকে শিখিয়েছেন, অথবা আপনার নিকটই ইলমে গাইবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন সেসব নামের উসিলায় আপনার নিকট প্রার্থনা করছি যে, আপনি কুরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত এবং অন্তরের নূর বানিয়ে দিন এবং এটাকে আমার বিষন্নতা দূরকারী ও দুশ্চিন্তা মুক্তকারী বানিয়ে দিন] তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার দুশ্চিন্তা দূর করে দিবেন এবং তার দুশ্চিন্তাকে আনন্দে পরিবর্তন করে দিবেন।) (১)
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ এ সকল দোয়া জানেনা; মানুষের মাঝে এগুলো স্বল্প প্রচারের কারণে। মানুষের লক্ষ্য ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন অসংখ্য সমস্যা ও বিষয়ের সম্মুখীন হওয়ার কারণে প্রত্যেক মানুষই চিন্তাগ্রস্ত হয়। তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ ধৈর্যধারণ করে ও আল্লাহর নিকট সাওয়াবের প্রত্যাশা করে, আবার কেউ কেউ ধৈর্যধারণ ও সাওয়াব প্রত্যাশার সাথেসাথে তা দূর করার জন্য শরয়ী পন্থায় চেষ্টা করে আর অল্প সংখ্যক মানুষ ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে তা থেকে মুক্তির চেষ্টা করে। এটি কিছু সময়ের জন্য বিবেককে নিষ্ক্রিয় করা যেন সে এই বিষয় ও দুঃখগুলো ভুলে থাকতে পারে। পরবর্তীতে যা তার কাছে পুনরায় ফিরে আসে।
৫- যে সমস্ত লোকেরা তাদের মেহমানদেরকে (বিড়ি-সিগারেট ও সিসা) দিয়ে মেহমানদারী করে এবং মনে করে যে, এটা তাদের বদন্যতার প্রমাণ তাদেরকে দিকনির্দেশনা ও নসিহত করা। তারা বুঝতে পারে না যে, তারা পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে ও ভয়াবহতা ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং শরীরকে প্রজ্জ্বলনকারী ও ধ্বংসকারী আগুন জালাচ্ছে। অথচ তাদের সাধ্য ছিল তা নির্বাপন করার; এগুলো না উপস্থাপন করে এবং উপদেশ প্রদান করার মাধ্যমে।
৬- ইসলামী দেশসমূহ মদ ও সিগারেট তৈরী ও আমাদানি নিষিদ্ধ করবে এবং মানুষের মাঝে এগুলোর প্রচার প্রসারে যারা মূল ভুমিকা পালনকারী তথা পাচারকারী ও চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৭- মসজিদ, মিডিয়া, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধরণ শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এই বিষ নির্মূলে সঠিক বক্তব্য ও লেখনির মাধ্যমে তাদের প্রকৃত দায়িত্ব পালন করবে। কেননা অন্তরে এর প্রভাব গভীর ও ব্যাপক।

সৌন্দর্য প্রদর্শন সৌন্দর্য প্রদর্শনের অর্থঃ
সৌন্দর্য প্রদর্শনের অর্থ হল পুরুষের সামনে নারীদের সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রকাশ করা। আরবীতে (تبرجت المرأة) বলা হয় যখন নারী তার চেহারা ও গ্রীবাদেশের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।(১)
সৌন্দর্য প্রদর্শন তার সকল সুরতে ফেতনা-ফ্যাসাদ ও চরিত্র নষ্টের প্রশস্ত দ্বার। হোক তা স্বর মোটা ও সুন্দর করার মাধ্যমে, কিংবা গ্রীবার কোন অংশ প্রকাশ পায় এমন পাতলা ও ছোট পোষাক পরার মাধ্যমে অথবা আকর্ষণীয় অঙ্গ-ভঙ্গিতে চলার মাধ্যমে। কাজেই এটা কঠিন রোগ ও চরম অনিষ্ট।
ইসলামী শিক্ষায় এক্ষেত্রে মানুষের অবস্থা ও স্বভাবের সাথে উপযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সঠিক পথ নির্দেশ রয়েছে; ধমক, ভর্ৎসনা ও উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে।

সৌন্দর্য প্রদর্শনের কারণসমূহঃ নিম্নে সৌন্দর্য প্রদর্শনের পিছনের উল্লেখযোগ্য কারণগুলো আলোচনা করা হল:
১- পরিবার ও সমাজের প্রবৃত্তির অনুসরণ ও ভাঙ্গনের ফলে, দ্বীনি শিক্ষার দূর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও শক্তিহীন হওয়া।
২- নিজের সৌন্দর্য অন্য মানুষকে দেখানো জন্য সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রকাশের আগ্রহ। বিষয়টি স্পষ্ট হয় তাদের চুল খোলামেলা রাখা, পাতলা, টাইট ও ছোট পোষাক পরিধানের মাধ্যমে; তারা যা গোপন রাখা দরকার ছিল তা মানুষকে দেখিয়ে বেড়ায়।
৩- সৌন্দর্য প্রদর্শনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল নারী পুরুষের কথা বলার স্বাদ আস্বাদনের মাধ্যমে অন্তরের খিয়ানত। তাইতো খিয়ানতকারী অন্তর তার স্বরকে আকর্ষণীয়, ভাষাকে মধুর ও কথা বলাকে মিষ্ট করে দেয়। কুরআন এ থেকে নিষেধ করেছেন, মহান আল্লাহ বলেন يَنِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ، مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا] হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।] (২)
ইবনে কাসীর রহঃ বলেন: এটা এমন শিষ্টাচার যার প্রতি আল্লাহ তায়ালা নবী পত্নীদেরকে আদেশ করেছেন। আর এক্ষেত্রে উম্মতের বাকী নারীগণ তাদেরই অনুগামী।(৩)
৪- অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে অনুকরণ হল সাজসজ্জা প্রকাশের অন্যতম অনুঘটক। বিশেষ করে সেই অনুকরণের ক্ষেত্রে যদি পরাজয়ের অনুভূতি থাকে যেই দল বা সমাজের অনুকরণ করছে তাদের সামনে। কেননা পরাজিত ব্যক্তি বিজয়ী ব্যক্তির প্রতীক, পোষাক-পরিচ্ছদ, ব্যয় এবং তার সকল অবস্থা ও রীতিনীতির অনুকরণ করতে আগ্রহী থাকে।(১) যদি এটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয় তবুও যাদের নৈতিকতা নেই তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
৫- সমালোচনার অভাব: যখন সমাজের অধিকাংশ মানুষের মাঝে অন্ধ অনুকরণ ছড়িয়ে পড়ে তখন সামাজিক সমালোচনা কমে যায়। সুতরাং নারীরা সাজসজ্জা প্রকাশকে কোন খারাপ কিছু মনে করে না। কেননা সমালোচনার ভাষা অনুকরণের পায়ের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। অথচ ইসলাম আমাদেরকে নসীহত করার নির্দেশ দেয়। নবী সাঃ বলেছেন: (দীন হলো নসীহত। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন কোন ব্যক্তিদের জন্য? জবাবে নবী সাঃ বলেনঃ আল্লাহ্ জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম শাসকের জন্য এবং সমস্ত মুসলিমের জন্য।) (২) আর ইসলামী মানহাজ নসীহত ও পরিবর্তনের মূলনীতি বর্ণনা করেছে। তা হল:
হাতের দ্বারা বল প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন, যদি এর ক্ষমতা না থাকে তবে জিহ্বা দ্বারা আর সর্বনিম্নস্তর হল অন্তর দ্বারা ঘৃণা করা। এ মর্মে নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘৃণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর।)(৩)

সাজসজ্জা প্রকাশের বিপদসমূহঃ নিচে সাজসজ্জা প্রদর্শনের বিপদসমূহ আলোচনা করা হল:
১- নারীর সংকীর্ণ ও পাতলা পোষাক পরিধান করা, তার আকর্ষণীয় স্বর, উন্মুক্ত শরীর ও তার ব্যবহৃত সাজসজ্জা ও সুগন্ধির কারণে ফেতনা ফ্যাসাদের প্রসার ঘটে। তাইতো ইসলাম নারীর ফেতনা থেকে সতর্ক করেছে, নবী সাঃ বলেন: (আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চাইতে অধিক ক্ষতিকর কোন ফেতনা রেখে যাচ্ছি না।) (৪)
২- নিশ্চয় নারীদের সাজসজ্জা প্রকাশ আল্লাহর আদেশের সুস্পষ্ট বিরোধিতা। আল্লাহর আদেশের দাবী হচ্ছে নারীরা অসুস্থ হৃদয়ের মানুষদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য নরম ও সুন্দর স্বরে কথা বলবে না, তারা তাদের গৃহেই অবস্থান করবে এবং সাজসজ্জা করে বাইরে বের হয়ে পুরুষদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। মহান আল্লাহ বলেন: يَنِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّসَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَءَاتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا ﴾ [হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।](১)
৩- সাজসজ্জা প্রকাশ অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ার অন্যতম মাধ্যম। নারী সৌন্দর্য ও তার আকর্ষণীয় বিষয়গুলো প্রকাশ করে, আর পুরুষ এতে আকৃষ্ট ও আকর্ষিত হয়; বিশেষত বর্তমান সময়ে যখন লোকেরা বিভিন্ন ধরণের সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় মাধ্যম প্রস্তুতে ব্যস্ত, যেমন পাতলা পোষাক, আলংকারিক পোষাক ও সীমাহীন পর্দাহীনতা। ফলে এখানে ফেতনা ব্যাপকতা লাভ করে, প্রবৃত্তি ছড়িয়ে পড়েছে এবং লালসা ব্যাপৃত হয়েছে। (২)
আর নিঃসন্দেহে সাজসজ্জা প্রকাশ ও তাতে বিদ্যমান উত্তেজনা অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে পরিচালিত করছে; যা থেকে ইসলাম মানব সমাজকে পবিত্র করতে চায়। তাইতো ইসলাম নারীদেরকে সুগন্ধি ব্যবহার করে পুরুষদের মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে নিষেধ করেছে যেন প্রবৃত্তির চাহিদা ছড়িয়ে না পড়ে। এ মর্মে নবী সাঃ বলেছেন: (প্রতিটি চোখ ব্যভিচারী। কোন মহিলা যদি আতর লাগিয়ে কোন মজলিসের পাশ দিয়ে যায় তবে সে হল এমন এমন অর্থাৎ ব্যভিচারিণী।) (৩)
অনুরূপভাবে ইসলাম নারীদেরকে চলার সময় সজোরে পদক্ষেপ ফেলতে নিষেধ করেছে যেন তাদের সৌন্দর্য যেমন গয়নার শব্দ বা কাপড়ের কারুকার্য প্রকাশ না পায়। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ [তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে।] (৪)
৪- সাজসজ্জা প্রকাশ নবী সাঃ এর পূর্ব সময়ের জাহেলী যুগের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সুতরাং ইসলাম বিরোধী প্রতিটি সমাজের এটি বৈশিষ্ট্য। বর্তমান সময়ে পাশ্চাত্য সমাজের অবস্থা ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগের অবস্থার চেয়েও কুৎসিত; পত্রিকা ও বিজ্ঞাপনে প্রকাশিত ছবি ও শব্দের মাধ্যমে অশ্লীলতা ও মন্দের দিকে আহ্বানের পথ ও পদ্ধতির কারণে। তারা যে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে তা মুসলিম নারীদের মধ্যে হতে অন্ধ অনুকরণের দ্বারা সাজসজ্জা প্রকাশকারিণীদের নারীদের উপর প্রভাব ফেলছে। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى [তোমরা প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।](৫)

পরিপালনগত প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনা পরিপালনগত প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনাসমূহ নিম্নরূপ:
১- সাজসজ্জা প্রকাশ ও পর্দাহীনতার হুকুম বর্ণনা করা, ফাসেক ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী হতে নারীকে হেফাযতের হিকমত প্রকাশ করা এবং সমাজে মুরুব্বী, মা ও গৃহ শিক্ষিকা হিসেবে তার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করা।
২- মহিলা সাহাবীদের পর্দা, শালীনতা ও সংযম পালনের দিক এবং কোন ধরণের অবহেলা ও শিথিলতা ছাড়াই তাদের ইসলামী শরীয়ত বাস্তবায়নের দিক প্রকাশ করা। আশা করা যায় এটি তাদের নিকট পর্দা ও শালীনতার ক্ষেত্রে নারী সাহাবীদের অনুসরণকে প্রিয় করে তুলবে।
৩- সাজসজ্জা প্রকাশের খারাপ দিকগুলো বর্ণনা করা, তা যে বিপর্যয় ও অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায় তা প্রকাশ করা এবং এর কারণে পাশ্চাত্য নারীরা যে অবস্থায় পৌছেছে তা উল্লেখ করা; যার ফলে নারীরা পণ্যে পরিণত হয়েছে, সুস্থ অবস্থায় তার স্বাদ গ্রহণের জন্য ক্রয় করা হয় আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হয় যেন কোন সামাজিক সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ তাকে কুড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলস্বরূপ প্রশান্তিময় বৈবাহিক জীবন নষ্ট হয়ে গেছে এবং সন্তানদের লালনপালন ও পরিচর্যার প্রাণশক্তি মৃত্যুবরণ করেছে। নারী স্বাধীনতার আহ্বানকারীদের তা জানা উচিত, হয়ত তারা তাদের মত্ততা থেকে সম্বিত ফিরে পাবে এবং সঠিক পথে ফিরে আসবে।
৪- সমাজকে দিকনির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে মসজিদ, পরিবার, মিডিয়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্ব-কর্তব্য প্রকাশ করা। তাদের অন্তরে লজ্জাশীলতা ও সংযমশীলতার বিজ বপন করা, বিশেষ করে প্রচার মাধ্যমগুলোতে, কেননা ভাল-মন্দ প্রচারে এগুলোর ব্যাপক ভুমিকা রয়েছে। এগুলোর যন্ত্রপাতি, নানাবিধ মাধ্যম এবং সারা পৃথিবীব্যাপী তা বিস্তৃত হওয়ার গুরুত্বের কারণে।
৫- সাজসজ্জা প্রকাশ ও অবাধ মেলামেশা বন্ধে সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন হাসপাতাল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ। যেন তা সৎচরিত্র ও শালীনতা প্রচারে তাদের জন্য উৎসাহ প্রদানকারী হয়।
৬- মানুষ ধর্মীয় নির্দেশনা পালনে সম্মানবোধ করবে, দ্বীনি চরিত্র গ্রহণ করবে এবং এর আদেশসমূহ মেনে চলবে।

কৃপণতা কৃপণতার অর্থঃ
আভিধানিক অর্থঃ আরবী বুখল বা বাখল শব্দের অর্থ হল, দানশীলতার বিপরীত। বাখলা বলা যে জিনিস আপনাকে কৃপণতায় উদ্বুদ্ধ করে তাকে।
পারিভাষিক অর্থঃ পরিভাষায় বুখল বলা হয়, দান হতে বিরত থাকার ইচ্ছা, কৃপণতাকে প্রাধান্য দেয়া এবং সকল দিক থেকে ব্যয় করা হতে বিরত থাকা।(১)
কৃপণতা একটি মন্দ ও অপছন্দনীয় গুণ। যেহেতু তাতে রয়েছে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার্পণ্য এবং সম্পদ কুক্ষিগত ও পুঞ্জিভূত করার আগ্রহ। তা অনেক সময় ঋণ দেয়া ও অন্যকে সহযোগিতার ভয়ে মানুষ দারিদ্রতা প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে বা মেহমানকে সম্মান না করতে ও সন্তানদের জন্য খরচ না করতে প্ররোচিত করে। আর এটা অনেক সময় সন্তানদের ভিক্ষাবৃত্তি ও পিতার অনুকরণের দিকে নিয়ে যায়।
কৃপণতা কখনো সম্পদের ক্ষেত্রে, কখনো জ্ঞানের ক্ষেত্রে আবার কখনো নানা ধরণের আচরণগত রীতির ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

কৃপণতার কারণসমূহ:
কৃপণতার কারণসমূহ নিম্নরূপঃ
১- আশ-শুহহ )الشح(: লোভসহকারে কৃপণতা, নবী সাঃ এ ধরণের কার্পণ্য থেকে নিষেধ করেছেন এবং এর চরম ক্ষতির কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: (তোমরা যুলুমকে ভয় কর। কেননা কিয়ামত দিবসে যুলুম অন্ধকারে পরিণত হবে। তোমরা কৃপণতা থেকে সাবধান থেকো। কেননা এই কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে। তা তাদের খুন-খারাবী ও রক্তপাতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারাম বস্তুসমূহ হালাল জ্ঞান করতে প্রলুব্ধ করেছে।)(২) মহান আল্লাহ বলেন: ﴾ وَمَن يُوقَ শُحَّ نَفْسِهِ، فَأُوْلَتَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴿ ]আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হতে রক্ষা করা হয়; তারাই তো সফলকাম।](৩)
২- কৃপণতার আরেক কারণ হল, সম্পদের প্রতি ভালবাসা।(৪) আর এটা তাকে সম্পদ জমা করতে এবং পরিমাণ অনুযায়ী ও প্রয়োজনীয় পরিমাপে আবশ্যকীয় কাজে তা ব্যয় না করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
৩- মূর্খতা এবং ব্যয় ও বদান্যতার গুরুত্ব সম্পর্কে না জানা; অথচ তা সম্পদ বৃদ্ধি করে ও তার বরকত বাড়িয়ে দেয়। নবী সাঃ তার রবের পক্ষ থেকে হাদিসে কুদসীতে বলেন: (মহান আল্লাহ বলেন, হে, আদম সন্তান! তুমি খরচ কর, তাহলে আমিও খরচ করবো তোমার প্রতি।) (১) নবী সাঃ বলেছেন: (সাদকা করার ফলে সম্পদ হ্রাস পায় না।)২)

কৃপণতার ক্ষতিসমূহ নিম্নরূপঃ
১- কৃপণতা ধর্মীয় দিক থেকে কৃপণের জন্য ক্ষতিকর। এটা তাকে যাকাত ও সাদকা করা, মেহমান ও প্রতিবেশীর সম্মান করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হতে বিরত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا ءَاتَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم بَلْ هُوَ শَرٌّ لَّهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ) [আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদের দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তাদের জন্য তা কল্যণকর, এমনটি যেন তারা কিছুতেই মনে না করে। বরং তা তাদের জন্য অকল্যণকর। যেটাতে তারা কৃপণতা করবে কেয়ামতের দিন সেটাই তাদের গলায় বেড়ী হবে। আসমান ও যমীনের সত্ত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা কর আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবহিত।] (৩) অর্থাৎ কৃপণ ব্যক্তি যেন মনে না করে যে, সম্পদ জমা করা তার উপকারে আসবে। বরং তা তার জন্য ধর্মীয় ক্ষেত্রে ক্ষতিকর এমনকি কোন কোন সময় দুনিয়ার ক্ষেত্রেও ক্ষতিকর হতে পারে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তার সম্পদের পরিণতির সংবাদ দিয়ে বলেছেন: ] لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِ يَوْمَ الْقِيَمَةِ[ ]যটাতে তারা কৃপণতা করবে কেয়ামতের দিন সেটাই তাদের গলায় বেড়ী হবে।] (৪)
আর যাকাত দানে অস্বীকারকারী ব্যক্তিকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাস্তি দেয়া হবে। নবী সাঃ বলেছেন: (যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সাপটি তার মুখের দু'পার্শ্ব কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল।) (৫)
২- নিশ্চয় কৃপণতা ধ্বংসকারী এবং হত্যা, ছিনতাই ও লুণ্ঠনের দিকে আহবানকারী: সুতরাং যাকাত প্রদান না করার কারণে ও অভাবী লোকদের সাহায্য না করার কারণে, ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা না থাকলে দরিদ্রতা তাদেরকে ছিনতাই, লুণ্ঠন ও হত্যা সংঘটিত করতে এবং সম্পদশালীদের সাথে শত্রুতা করতে বাধ্য করে। নবী সাঃ আমাদেরকে এ থেকে সতর্ক করেছেন এবং সমাজের উপর এর ক্ষতি বর্ণনা করেছেন। এ মর্মে তিনি বলেন: (তোমরা যুলুমকে ভয় কর। কেননা কিয়ামত দিবসে যুলুম অন্ধকারে পরিণত হবে। তোমরা কৃপণতা থেকে সাবধান থেকো। কেননা এই কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে। তা তাদের খুন-খারাবী ও রক্তপাতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারাম বস্তুসমূহ হালাল জ্ঞান করতে প্রলুব্ধ করেছে।)(৬)
৩- কৃপণতা বিনাশের দ্বার আর দান করা সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির দ্বার। নবী সাঃ বলেছেন: (প্রতিদিন সকালে দু'জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।)(১)
৪- কৃপণতার ক্ষতির আরেকটি দিক হল, কৃপণ ব্যক্তি কৃপণতার দরুন নিজেকে ফকিরী হালতে ও নোংরা পোশাকে প্রকাশ করে। অথচ নবী সাঃ সাহাবী আহওয়াছকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তার মাঝে সম্পদ নিদর্শন দেখা যায়। আবু আহওয়াছ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: (আমি একবার রাসূল সাঃ এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে পুরাতন মলিন কাপড় পরিহিত খারাপ অবস্থায় দেখে বললেনঃ তোমার কি কোন মাল-সম্পদ আছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। আল্লাহ তায়ালা আমাকে সর্বপ্রকার সম্পদই দান করেছেন। তখন তিনি বললেনঃ যখন তোমাকে আল্লাহ মাল দান করেছেন, তখন এর চিহ্ন তোমার মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়।)(২)
৫- কৃপণতা করা আহলে কিতাবদের বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন : الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا ءَاتَلَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ، وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴾ [যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তা গোপন করে। আর আমি কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।] (৩)
ইবনে কাসীর রহঃ বলেন: কোন কোন সালাফ এই আয়াতটিকে মুহাম্মাদ সাঃ এর বিষয়ে ইহুদীদের নিকট যে জ্ঞান ছিল তা প্রকাশের কৃপণতা ও গোপন করার উপর প্রয়োগ করেছেন। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: ] وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا[ ]আর আমি কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।](৪)
সুতরাং জ্ঞানের কৃপণতা ও সম্পদের কৃপণতার বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও পূর্বাপর আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় এখানে উদ্দেশ্য হল জ্ঞানের কৃপণতা। আর এই ব্যাধি দ্বারা কিছু জ্ঞানের দাবীদার ব্যক্তিদেরকেও পরীক্ষা করা হয়েছে। তারা অনেক সময় কৃপণতা করে তাদের জ্ঞানকে গোপন করে, এই হিংসায় যে তারা যা পেয়েছে অন্যরা তা পেয়ে যাবে, আবার কখনো বা এর বিনিময়ে কোন দায়িত্ব বা সম্পদ গ্রহণ করে আর আশঙ্কা করে যে, প্রকাশ করলে তার দায়িত্ব ও সম্পদ কমে যাবে।(৫)

প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনা:
প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনাগুলো নিম্নরূপঃ
১- মানুষ কৃপণতা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে। রাসূল সাঃ সবচেয়ে দানশীল ও শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি হওয়ার পরও আল্লাহর নিকট তা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলতেন: ) اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبُهَمّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ (হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রাধান্য থেকে আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি।)(১)
২- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ইসলামে দানের গুরুত্ব, তার সাওয়াব ও প্রতিদান বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক শিক্ষা প্রদানে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে। দান হল সম্পদ বৃদ্ধি ও তাতে বরকত লাভের মাধ্যম। পক্ষান্তরে কৃপণতা হল হিংসা-বিদ্বেষ, জোর-জবরদস্তি, বিপর্যয়, রক্ত প্রবাহিত করা ও চুরির কারণ। আর কৃপণ ব্যক্তি ও সমাজের উপর এর ক্ষতি চরম।
৩- মানুষ ব্যয় করতে চেষ্টা করবে এবং নিজেকে দান করার উপর অভ্যস্ত করে তুলবে। তাহলে ব্যয়ের অনুভূতি সম্পদ পুঞ্জিভূত করার ভালবাসার উপর প্রাধান্য পাবে এবং দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আর জান্নাত লাভের প্রবল আকাঙ্খা রাখবে; যার প্রশস্ততা আসমান ও যমিনের সমান।
৪- পিতা-মাতা ও মুরুব্বীগণ সঠিক লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করবেন এবং অপচয়হীন দানের ক্ষেত্রে তারা সন্তানদের জন্য উত্তম আদর্শ হবেন।
৫- মানুষ সাহাবাদের দানশীলতা ও নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়গুলো খেয়াল করবে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা আনসার সাহাবীদের বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে বলেছেন: وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفুسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ খَصَاصَةٌ ]আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।](২)

চুরি করা চুরির অর্থঃ
চুরির আভিধানিক অর্থঃ চুরি হল: যা তার মালিকানাধীন নয় তা গোপনে নিয়ে নেওয়া।(১)
পারিভাষিক অর্থঃ পরিভাষায় চুরি হল: গোপনে কোন কিছু গ্রহণ করা।(২)
ইসলামী মূলনীতির বিপরীত অপশিক্ষার কারণে যেসব আচরণগত ত্রুটির উদ্ভব হয় তার অন্যতম হল, শরীয়তসম্মত পদ্ধতি ব্যতীত অন্যের হক গ্রহণে উদাসীনতা ও তা উপভোগ করা, যার ফলে ভয়, আতঙ্ক এবং শান্তি ও স্বীয় সম্পদের নিরাপত্তার অভাব সৃষ্টি হয়। ইসলামী দিকনির্দেশনার ব্যাপারে চিন্তাশীল ব্যক্তি লক্ষ্য করবে যে, এই চরিত্রগত অপরাধে জড়িত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা কঠোরতা আরোপ করেছে, এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারণের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ বলেন: وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَأَقْطَعُواْ أَيْدِيَهُمَا جَزَاءُ بِمَا كَسَبًا نَكَلًا مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴾ [আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।](৩) নবী সাঃ বলেছেন: (আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হয় সে চোরের উপর যে একটি ডিম চুরি করেছে যার ফলে তার হাত কাটা গেছে বা একটি দড়ি চুরি করেছে যার ফলে তার হাত কাটা গেছে।)(৪)

চৌর্যবৃত্তির কারণসমূহ নিম্নরূপঃ
১- একনিষ্ঠ ইসলামী মানহাজের উপর সঠিক প্রতিপালন না করা। পিতা-মাতা অনেক সময় তার সন্তানের হাতে এমন কিছু দেখে যা তাকে দেয়নি, তারপরও সে কোথা থেকে সেটা পেল তা জিজ্ঞেস করে না ও যাচাই করে দেখে না। এক্ষেত্রে তারা ঢিলেমি করে এমনকি যখন সন্তান বড় হয়ে যায় এবং এতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন পিতা-মাতার জন্য তাকে সঠিক শিক্ষা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কখনো কখনো তারা তাকে চুরি ও এর মাধ্যমসমূহে জড়িয়ে যেতে ছেড়ে দেয়। কোন একটি আদালত আল্লাহর বিধান অনুযায়ী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে হাত কাটার রায় দিয়েছিল। অতঃপর যখন তা কার্যকরের সময় হল তখন সে উচ্চ স্বরে বলল: তোমরা আমার হাত কাটার পূর্বে শুনে রাখ! আমি সর্বপ্রথম আমার প্রতিবেশীর থেকে একটি ডিম চুরি করেছিলাম, কিন্তু আমার মা আমাকে সতর্ক করেনি এবং তা ফিরিয়ে দিতেও বলেনি, বরং বলেছিল: আমার ছেলে বড় হয়ে গেছে। যদি আমার মায়ের মুখের ভাষা আমাকে অপরাধে জড়িত হতে উৎসাহিত না করত, তবে আমি সমাজে চোর হিসেবে আবির্ভূত হতাম না।(১)
২- চুরির শাস্তি প্রয়োগে উদাসীনতা বা একেবারে শাস্তি প্রয়োগ না করা দুর্বল মনের মানুষদের চুরি করতে উৎসাহিত করে। অথচ রাসূল সাঃ চুরির শাস্তি কার্যকরের ব্যাপারে কঠোরতা করে বলেন: (আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।)(২)
৩- চৌর্যবৃত্তির আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, অন্যের নিকট যা আছে এবং তারা যা উপভোগ করছে তার প্রতি লোভ-লালসা। কেননা অনেক সময় লোভ পরোক্ষভাবে চুরি করতে উদ্বুদ্ধ করে।(৩)

চৌর্যবৃত্তির বিপদসমূহ নিম্নরূপঃ
১- তা চোরকে শাাস্তি স্বরূপ হাত কাটার সম্মুখীন করে। মহান আল্লাহ বলেন: وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَأَقْطَعُواْ [أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَلًا مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।] (৪)
২- তা চোরকে আল্লাহর লা'নতের মুখোমুখী করে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে রাসূল সাঃ বলেন: (আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হয় সে চোরের উপর যে একটি ডিম চুরি করেছে যার ফলে তার হাত কাটা গেছে বা একটি দড়ি চুরি করেছে যার ফলে তার হাত কাটা গেছে।) (৫)
৩- সমাজের লোকদের মানসিক শান্তি বিনষ্ট হয় অধিক চুরি ও সম্পদ লুণ্ঠনের কারণে। যে সকল দেশ ইসলামী শরীয়ত ও উপকারী ইসলামী শিক্ষা বাস্তবায়ন করে না সে সকল দেশে তা বিদ্যমান। আমেরিকাতে অপরাধ সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে প্রতি দুই মিনিটে একটি চুরি সংঘটিত হয়। বাড়ী প্রতি ২০ সেকেন্ডে এবং গাড়ী প্রতি ৪০ সেকেন্ডে চুরি সংঘটিত হয়। তথা বছরে ২৮৫ মিলিয়ন চুরি সংঘটিত হয়। (৬)
৪- চৌর্যবৃত্তির আরেকটি বিপদ হল, চোর রাস্ট্রীয় শক্তির ধাওয়ার সম্মুখীন হয়, তাকে জেলে ঢোকানো হয় এবং সে শাস্তির মুখোমুখী হয়।
৫- চোরের ক্ষেত্রে সামাজিক বিশ্বাস নষ্ট হওয়া। তার অনিষ্ট থেকে কেউ নিরাপদ থাকে না। ফলে যারাই তাকে চিনে তার থেকে দূরে থাকে। সে পূর্ণ অনুতপ্ত না হলে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে না। তাই সে চারপাশের লোকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়।
৬- সে চুরির মাল খায়, যা তার জন্য হারাম।

প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনা প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনা নিম্নরূপঃ
১- চুরির শাস্তি কার্যকর করা; কেননা তা বাস্তবায়ন করলে একটা নষ্ট হাতকে বিচ্ছিন্ন করা হবে ও তার চিকিৎসা করা হবে এবং যাদের মনের মাঝে অন্যের সম্পদের উপর আক্রমণের অভিপ্রায় থাকে তার জন্য শিক্ষা হবে। সুতরাং শাস্তির মাঝেই শিক্ষণীয়, প্রতিকারমূলক ও প্রতিরক্ষামূলক ইসলামী নির্দেশনা রয়েছে। কাজেই তা চোরের জন্য প্রতিকারমূলক এবং যার মনে চুরির ইচ্ছা আছে তার জন্য প্রতিরক্ষামূলক।
২- দায়িত্বশীলগণ এবং শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সতর্কতা অবলম্বন করবে। যেন সন্তানরা অন্যের হকের প্রতি সম্মান ও তার উপর সীমালঙ্ঘন না করার উপর গড়ে উঠে। তাদেরকে ছোট বেলা থেকেই আল্লাহর ভয়ে অন্যের সম্পদ চুরি না করতে ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উপর অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
৩- অনুরূপভাবে পিতা-মাতার উচিত হবে অন্যের সম্পদের সম্মান করা এবং কোন ভাবেই তার উপর আক্রমণ না করা। কেননা তারাই সন্তানদের জন্য আদর্শ।
৪- অনুরূপভাবে সন্তানদের সম্পদের সম্মান করা। যেন সন্তানের হাত গোপনে সেদিকে না যায়। যাতে সন্তানরা অনুমতি নেয়ার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয় এবং চুরির দিকে অগ্রসর না হয়।
৫- প্রচার মাধ্যমসমূহ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ইসলামী চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি সচেতনতা প্রচার করবে এবং দুনিয়ায় এর শাস্তির বিষয়টি বর্ণনা করবে। আর প্রত্যেক খারাপ কাজের শাস্তি ও ভাল কাজের পরকালীন প্রতিদান বর্ণনা করবে। যেন মানুষেরা ইসলামী চরিত্রের ফযিলত জেনে তা বাস্তবায়ন করতে পারে এবং খারাপ বিষয়ের শাস্তি ও তিরস্কারের বিষয় জেনে তা থেকে বিরত থাকতে পারে। কেননা মানুষ কে খারাপ কাজে জড়িত হতে উৎসাহিত করে এর বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও দ্বীনি প্রতিবন্ধকতার অভাব।

ধোঁকা ও খিয়ানত ধোঁকা ও খিয়ানতের অর্থঃ
ধোঁকা হল: কল্যাণ কামনার বিপরীত।(১)
বলা হয় )غشه( তাকে ধোঁকা দিয়েছে: অর্থাৎ তার কল্যাণ কামনা করেনি এবং তার অন্তরে যা রয়েছে তার বিপরীত প্রকাশ করেছে।(২)
খিয়ানত হল: এটিও কল্যাণ কামনার বিপরীত। কামুসুল মুহীতে বলা হয়েছে, খিয়ানত হল মানুষ তাকে আমনতদার মনে করবে কিন্তু সে ঐ বিষয়ে কল্যাণ কামনা করবে না।(৩) এর অন্তর্ভুক্ত হল ঘুষ গ্রহণ, কেননা এটাকে খিয়ানত হিসেবে গণ্য করা হয় যাকে একটি নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
ঘুষ হল, মানুষ যা বিচারক বা অন্য কাউকে প্রদান করে ফয়সালা বা বিধানটি তার পক্ষে আনার জন্য। (৪)
সকল ক্ষেত্রে খিয়ানত খারাপ কাজ। তবে একটি থেকে অপরটি অধিক খারাপ। যে ব্যক্তি আপনার সাথে টাকা-পয়সার ব্যাপারে খিয়ানত করেছে সে ঐ ব্যক্তির মত নয় যে আপনার সাথে পরিবার ও সম্পদের ক্ষেত্রে খিয়ানত করেছে এবং বড় অপরাধ সংঘটন করেছে। (৫)

ধোঁকা ও খিয়ানতের প্রকারভেদঃ
ধোঁকা ও খিয়ানতের প্রকারভেদ নিম্নরূপঃ
১- গোপন বিষয় প্রকাশ: গোপনীয়তা প্রকাশের কারণে কত রক্ত প্রবাহিত হয়েছে এবং তার লক্ষ্য অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যদি সে তা গোপন রাখত তাহলে এর প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকত, পরিণতি থেকে মুক্ত থাকত এবং তার প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে আশাবাদী থাকত।(৬)
এজন্য একজন মুসলিমের উপর ওয়াজীব হল সে মানুষের গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করবে না। কারণ এর কারণে সে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। ইমাম বুখারী অধ্যায় রচনা করেছেন: গোপনীয়তা রক্ষার অধ্যায় শিরোনামে। এখানে তিনি আনাস বিন মালেক রাঃ এর হাদিস নিয়ে এসেছেন, তিনি বলেন: (একবার নবী সাঃ আমার কাছে একটি বিষয় গোপনে বলেছিলেন। আমি তার পরেও কাউকে তা জানাইনি। এটা সম্পর্কে উম্মে সুলায়ম রাঃ (আমার স্ত্রী) আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। কিন্তু আমি তাকেও বলি নি।) (১)
২- বিচারক কর্তৃক বিচার প্রার্থীর সাথে ধোঁকা: তার মাধ্যমে ধোঁকা সংঘটিত হয় তাদের উপর যুলুম করা, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ, তাদের রক্ত প্রবাহিত করা, তাদের সম্ভ্রমহানী করা, তাদের প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত করা, তাদের নিজস্ব সম্পদ থেকে বাধা দেয়া, দ্বীন ও দুনিয়া বিষয়ক আবশ্যকীয় জ্ঞান হতে দূরে রাখা, শাস্তি প্রয়োগে অবহেলা, বিপর্যয়কারীদের বাধা না দেয়া এবং জিহাদ নষ্ট করা ইত্যাদি দ্বারা; যা কিছুতে বান্দাদের জন্য মঙ্গল নিহিত...।(২)
নবী সাঃ বলেছেন: (আল্লাহ তায়ালা যাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন কিন্তু তাতে খিয়ানাতকারীরূপে যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।) (৩) তিনি আরো বলেন: (মুসলিমদের দায়িত্বে নিযুক্ত কোন আমীর (শাসক) যদি তাদের কল্যাণ কামনা না করে এবং তাদের সার্থ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রয়াস না চালায়, তবে সে মুসলিমদের সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।) (৪)
৩- লেনদেনের ক্ষেত্রে ধোঁকা মুসলিমদের সাথে ও তার আমানতদারিতার বিষয়ে খিয়ানত। অনেকেই প্রকার ও মানের ক্ষেত্রে ধোঁকা দেয়; উপরের অংশে ভালগুলো রাখে আর মধ্যে ও নিচে নষ্টগুলো রাখে। আবার অনেকেই ওজন ও পরিমাণে ধোঁকা দেয়। অনেকেই আবার শপথ করার মাধ্যমে ধোঁকা দেয়; যেন মানুষেরা তার পণ্যের উপর বিশ্বাস করে, এরপর যখন বিশ্বাস করে তার পণ্য ক্রয় করে নিয়ে আসে তখন তাদের কাছে এর দোষগুলো স্পষ্ট হয়ে যায় যা সে মিথ্যা শপথের মাধ্যমে গোপন রেখেছিল।
ধোঁকা থেকে সতর্ককারী ইসলামী দিকনির্দেশনাসমূহ অনেক। তার মধ্যে একটি হল, মহান আল্লাহ বলেন: وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ * الَّذِينَ إِذَا اکْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ * وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ ] [দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।] (৫) তিনি আরো বলেন: فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ وَلَا تَبْخَسُواْ النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَحِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ] [ কাজেই তোমরা মাপ ও ওজন ঠিকভাবে দেবে, লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এবং দুনিয়ার শান্তি স্থাপনের পর বিপর্যয় ঘটাবে না; তোমরা মুমিন হলে তোমাদের জন্য এটাই কল্যাণকর।] (৬)
নবী সাঃ বলেছেন: (যে ব্যাক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়, আর যে ব্যাক্তি আমাদের ধোঁকা দিবে সেও আমাদের দলভূক্ত নয়।) (৭) আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত (একদা রাসূল সাঃ খাদ্য শস্যের একটি স্তুপের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করলেন। তিনি স্তুপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন ফলে হাতের আঙ্গুলগুলো ভিজে গেলো। তিনি বললেন, হে স্তুপের মালিক! এ কি ব্যাপার? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এতে বৃষ্টির পানি লেগেছে। তিনি বললেন, সেগুলো তুমি স্তুপের ওপরে রাখলে না কেন? তাহলে লোকেরা দেখে নিতে পারতো। জেনে রেখো, যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে, সে আমার দলভূক্ত নয়।(১)
৩- মানুষের কার্যক্রম সহজ করার বিপরীতে ঘুষ গ্রহণ অথবা হককে বাতিল বা বাতিলকে হকে পরিণত করতে ঘুষ গ্রহণ খিয়ানত। অনুরূপভাবে সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে ঘুষ প্রদানও খিয়ানত। এর মাধ্যমে অফিসসমূহ পরিবর্তন হয়ে যাবে এবং তা যুলুমের স্থানে পরিবর্তিত হবে। মানুষের হকের বিষয়ে ক্রয়-বিক্রয়ের সময় ঘুষ প্রদানও খিয়ানত। এজন্য রাসূল সাঃ ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে লা'নত করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন: (ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক।)(২)
মুস্তফা সেবায়ী বলেন: বর্তমানে সমাজের খারাপ অবস্থার বিষয়ে অভিযোগ বেড়ে গেছে, এমনকি একজন ব্যক্তিও পাবেন না যে সমাজের সুখ-শান্তির বিষয়ে সন্তুষ্টির সাথে কথা বলছে, যে তার নিজস্ব হকেব ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, এসকল অস্থিরতার একটায় কারণ পাবেন তা হল আমানতদারিতার অনুপস্থিতি। (৩)
৫- যে ব্যক্তি পরামর্শের ক্ষেত্রে আপনাকে আমানতদার মনে করেছে তার জন্য কল্যাণ কামনা না করা খিয়ানত। কেননা এ অবস্থায় সে তার জন্য সঠিক নসীহত উপস্থাপন করেনি। অথচ সে জানত যে, এর চেয়ে উত্তম নসীহা রয়েছে। কিন্তু লোভ বা হিংসার কারণে তাকে সঠিক নসীহা করেনি। রাসূল সাঃ বলেছেন: (যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয় সে আমানতদার।)(৪)
৬- মানুষের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে তাদের কল্যাণ নষ্ট করার মাধ্যমে তাদেরকে ধোঁকা দেয়া খিয়ানত। বিশেষ করে যাকে কোন কাজের বা অফিসের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নবী সাঃ ধোঁকা থেকে সতর্ক করে বলেছেন: (যে ব্যাক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়, আর যে ব্যাক্তি আমাদের ধোঁকা েরেকসত্মানুষমারাচ্ছেদ্যভূস্পায়।) ও পরিবারের ব্যাপারে খিয়ানত করে। যেমন আপনি একজনকে আমানতদার ভেবে তার দুনিয়াবী বিপদ দূর করার জন্য তাকে ঋণ দিলেন, কিন্তু সে আপনাকে তা ফেরত দিল না। এটি আমানতের খিয়ানত। যখন মিসরের বাদশা ইউসুফ আঃ-কে মিসরের ধনভান্ডারের দায়িত্ব দিতে চাইলেন, তখন তিনি ইউসুফ আঃ-এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করলেন যে সে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত, যা ধোঁকা ও খিয়ানতের বিপরীত। কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ বলেন: ] وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصْهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلَّمَهُ, قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينُ أَمِينٌ[ ]আর বাদশা বলল, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে আস; আমি তাকে আমার নিজের জন্য আপন করে নেব। তারপর বাদশা যখন তার সাথে কথা বলল, তখন বলল, 'আজ আপনি তো আমাদের কাছে মর্যাদাশীল আস্থাভাজন।(৬)
৭- আবার এমন মানুষও আছে যে অন্যের পরিবারের ব্যাপারে খিয়ানত করে কিংবা প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীর পরিবারের বিষয়ে খিয়ানত করে। অথচ এগুলো ইসলামী চরিত্র নয়। বাদশার স্ত্রীর সাথে ইউসুফ আঃ-এর ঘটনায় কুরআনিক উপস্থাপনা রয়েছে ইউসুফ আঃ-এর আমানতদারিতা, তার সচ্চরিত্র ও তার খিয়ানত মুক্ত থাকার বিষয়ে।

ধোঁকাবাজি করার কারণসমূহ নিম্নরূপঃ ১- মনের সংকীর্ণতা ও ধৈর্যের অভাব এমনকি সে কোন বিষয় গোপন রাখতে পারে না এবং ধৈর্যধারণ করতে পারে না। (১)
২- জ্ঞানীদের মত সতর্কতা এবং মেধাবীদের মত বিচক্ষণতা থেকে উদাসীনতা। (২)
৩- আমানতদারিতার গুণের বিষয়ে অবহেলা।
৪- মানুষের গোপন বিষয়কে তুচ্ছজ্ঞান করা ও তা গোপন রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দেয়া।
৫- অহংকারবোধ করা ও মানুষকে হেয় করা এবং তাদের ও তাদের হকের প্রতি গুরুত্ব না দেয়া।
৬- সম্পদ ও সম্পদ অর্জনের প্রতি তীব্র ভালবাসা এমনকি এটাই তার উপর প্রাধান্য পেয়ে গেছে। ফলে তা সঠিক ওজন না করা, পূর্ণ মাপ না দেয়া, পণ্যে ঠকবাজি করা ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে তাকে ধ্বংসে নিপতিত করেছে।

ধোঁকা ও খিয়ানতের বিপদসমূহঃ ১- কোন মানুষের জনগণের সাথে ধোঁকাবাজি ও খিয়ানত করা তাকে আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তির সম্মুখীন করবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে রাসূল সাঃ বলেছেন: (আল্লাহ তায়ালা যাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন কিন্তু তাতে খিয়ানাতকারীরূপে যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।) (৩) তিনি আরো বলেন: (মুসলিমদের দায়িত্বে নিযুক্ত কোন আমীর (শাসক) যদি তাদের কল্যাণ কামনা না করে এবং তাদের সার্থ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রয়াস না চালায়, তবে সে মুসলিমদের সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।) (৪)
২- যে ব্যক্তি ওজন ও মাপে কম দিবে সে নিজেকে আল্লাহর আযাব ও অসন্তুষ্টির সম্মুখীন করবে। মহান আল্লাহ বলেন:﴾ وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اکْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَزَنُوهُمْ يُحْسِرُونَ[ ]দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।] (৫)
৩- ইসলামী দিকনির্দেশনা যা এগুলোকে হারাম করে ও এ থেকে সতর্ক করে তার সামনে ধোঁকা ও খিয়ানত ঐ ব্যক্তিকে দুনিয়াতে মানসিক কষ্টের মধ্যে নিপতিত করে। যেহেতু সে যে অপরাধ করেছে ও করছে তার কারণে আতঙ্ক ও পরকালীন অপেক্ষমাণ শাস্তির মধ্যে বসবাস করে। অনুরূপভাবে সে অনুভব করে যে, তার অর্জিত সম্পদ ও সম্মান স্বীয় প্রচেষ্টার কারণে নয়, বরং তা অর্জন হয়েছে খিয়ানত ও অপরাধের মাধ্যমে। তাই সে একনিষ্ঠ আমানতদার মুসলিমদের সামনে নিজেকে ছোট ও হীন মনে করে।
৪- অনুরূপভাবে ধোঁকাবাজ লোক দেখবে যে তার চার পাশের লোক তাকে অপছন্দ করছে ও তার থেকে দূরে যাচ্ছে। আর যে তার সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে, তার বন্ধুত্ব মূলত সাময়িক, প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলেই তা শেষ হয়ে যাবে।
৫- ধোঁকা ও খিয়ানত মানুষের মাঝে ধ্বংস ও বিনাশ ঘটায়। যদি গোপন বিষয় প্রকাশের ক্ষেত্রে তা হয় তবে তা ঝগড়া ও দলাদলির সৃষ্টি করে। আর যদি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে হয় তবে তা হিংসা বিদ্বেষ তৈরী করে। পক্ষান্তরে যদি কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে হয় তবে ক্ষতি ও ধ্বংসের জন্ম দেয়।

প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনা ধোঁকা ও খিয়ানতের ক্ষেত্রে প্রতিকারমূলক পরিপালনেগত দিকনির্দেশনাসমূহ নিম্নরূপঃ
১- যাদের আমানতদারিতা হ্রাস পেয়েছে, যাদের মাঝে ধোঁকাবাজি বৃদ্ধি পেয়েছে, আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়াকে ভালবাসেছে, মানুষ ও তাদের আমানতকে অবজ্ঞা করেছে, ফলে তারা আল্লাহ ও নিজেদের সাথে খিয়ানত করেছে, তাদেরকে মুরুব্বী ও উপদেশদাতা কর্তৃক উপদেশ দেওয়া। কেননা খিয়ানত অত্যান্ত মারাত্মক বিষয় এবং সমাজ ও ব্যক্তির উপর তার কুপ্রভাব দীর্ঘ। মহান আল্লাহ তা থেকে সতর্ক করেছেন, তিনি বলেন: ﴾يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَخُونُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓاْ أَمَٰنَٰতكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿ [হে ঈমানদারগণ! তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।](১) তিনি আরো বলেন: ﴾ ذَٰلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّى لَمْ أَخُنْهُ بِٱلْغَيْبِ وَأَنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى كَيْدَ ٱلْخَآئِنِينَ ﴿ [এটা এ জন্যে যে, যাতে সে জানতে পারে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না।](২) নবী সাঃ বলেছেন: (যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই।) (৩) তিনি আরো বলেছেন: (মুনাফিকের আলামত তিনটি- যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে; ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে; এবং তার কাছে আমানত রাখা হলে সে তার খিয়ানত করে।) (৪)
২- ধৈর্যের শিক্ষা নেয়া ও তার উপর অভ্যস্ত হওয়া: কেননা তা গোপন বিষয়ের ছিপি, দারিদ্রতা সহ্য ও প্রতিকূলতার সাথে জীবন যাবনের পথ; সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে খিয়ানতের মাঝে জড়িত হওয়া ছাড়াই। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَٱسْتَعِينُواْ بِٱলصَّبْرِ وَٱلصَّلَوٰةِ ۚ وَإِنَّهَا لَকَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى ٱلْخَٰশِعِينَ ﴿ [আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আর নিশ্চয় তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন।](৫)
৩- দারিদ্রতা, স্বল্প জীবিকা ও বিপদের উপর ধৈর্যধারণের সওয়াবের কথা স্মরণ করা এবং এও স্মরণ রাখা যে, তা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষা। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِশَىْءٍ মِّنَ ٱلْخَوْفِ وَٱلْجُوعِ وَنَقْصٍ মِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَশِّরِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَبَتْهُم মُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّ لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتُ )মِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُوْلَتَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ ]আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে। যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রব-এর কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই সৎপথে পরিচালিত।](১)
৫- সামাজিক সমালোচনা: খিয়ানতকারী ও ঘুষগ্রহণকারীদের বিষয়ে আলোচনা এবং তাদের প্রতি তুচ্ছ- তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে ইশারা করার মাধ্যমে সমালোচনা তাদের উপর প্রভাব ফেলে। কাজেই সমাজের ভাল মানুষদেরকে মাহফিল, খুতবা, প্রচার মাধ্যম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে এসমস্ত খারাপ চরিত্রের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে তা নির্মূলে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে হবে। আশা করা যায় এর ফলে সরাসরি নসীহতের উপর ভিত্তি করে কষ্টদায়ক সামাজিক সমালোচনার প্রভাব বৃদ্ধি পাবে।

অন্তর সম্পর্কিত দোষত্রুটি: অন্তর হল মানুষের শ্রেষ্ঠাংশ, এর মাধ্যমেই মানুষ সংশোধিত হয় আর এটা নষ্ট হয়ে গেলে আচরণ নষ্ট হয়ে যায় ও চরিত্র ধ্বংস হয়। নবী সাঃ বলেন: (জেনে রাখ! শরীরে একটি মাংসপিন্ড আছে যা ঠিক থাকলে সমস্ত শরীর ঠিক থাকে, আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায় তখন সমস্ত শরীর নষ্ট হয়ে যায়। আর তা হল অন্তর।) (১) অন্তরের খারাপ বৈশিষ্ট্যসমূহ বলতে উদ্দেশ্য হল, অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট বিচ্যুতিসমূহ। আর কখনো কখনো এর প্রভাব বাহ্যিক আচরণের মধ্যেও পড়ে। যেমন: হিংসা, রাগ ও খারাপ ধারণা ইত্যাদি। এ সকল আচরণের কেন্দ্র হল অন্তর। তবে ব্যক্তি কখনো তা কর্মের মাধ্যমে ব্যক্ত করে ফলে তা বাহ্যিক আমলে রূপান্তরিত হয়, আবার কখনো গোপন রাখে ফলে তা অন্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর কতিপয় উদাহরণ নিম্নরূপঃ

হিংসা হিংসার অর্থ: আভিধানিক অর্থঃ রাগেব আল-আসবাহানী বলেন: হিংসা হল, নিয়ামতের অধিকারী ব্যক্তি হতে তা সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করা, কখনো এর সাথে তা সরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা যুক্ত থাকে।(২)
পারিভাষিক অর্থঃ ইবনে হাজার রহঃ বলেন: হিংসা হল নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তি হতে তা সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করা। (৩) মাহমূদ দিমাশকী বলেন: হিংসাকৃত ব্যক্তি হতে নিয়ামত সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করা। এটি একটি মারাত্মক রোগ যাতে অনেক মানুষ আক্রান্ত। (৪)
হিংসার সংজ্ঞায় আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের মাঝে মিল রয়েছে। এটি একটি রোগ যা দ্বারা অন্তর আক্রান্ত হয়, ফলে কোন মানুষের উপর আল্লাহর নিয়ামত দেখলে সে কষ্ট পায়। তাইতো মানুষের সাথে হিংসুকের চলাফেরা বিপরীতমুখী হয়; আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অপছন্দ করার কারণে। যখন বিষয়টি তার নিকট আরো গুরুতর হয় এবং হিংসা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছে তখন তাদের থেকে নিয়ামত সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করে, আবার কখনো তা সরিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। তাই মনের উপর এর ক্ষতি বিরাট, সমাজের উপর এর অনিষ্ট দীর্ঘ এবং তার পরিণতি হল সুস্পষ্ট লোকসান। এটি সম্পর্ক নষ্ট করা, বন্ধুত্ব নিঃশেষ করা, ভালবাসা ও মানুষের মাঝের পারস্পরিক বন্ধন ধ্বংস করার পথ এবং বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টিকারী।

হিংসার সীমারেখাঃ হিংসা মানব স্বভাবের অন্তর্নিহিত বিষয়। (৫) যদি তা ঈর্ষা পর্যায়ে থাকে তবে তা প্রতিযোগিতার দিকে নিয়ে যায় এবং এর সীমা লংঘন করে না। ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেনঃ হিংসার একটি সীমা আছে, তা হল পূর্ণতা অর্জনে প্রতিযোগিতা এবং তার সমপর্যায়ের কারো অগ্রগামী হওয়ার ক্ষেত্রে অত্মসম্মানবোধ অনুভব করা। যখন এই সীমা অতিক্রম করে তখন তা যুলুমে পরিণত হয় এবং হিংসাকৃত ব্যক্তি থেকে নিয়ামত সরে যাওয়ার কামনা করে ও তাকে কষ্ট দিতে চেষ্টা করে। আর যখন এই সীমার থেকে কম থাকে তখন সে হীনমন্য ও দুর্বল সংকল্পের অধিকারী হয়।(১)
সুতরাং যখন তার সীমা অতিক্রম করে তখন হিংসায় পরিণত হয়, আর যখন এতে ঘাটতি থাকে তখন সে কাপুরুষে পরিণত হয়। আর যখন এটি তার সীমার মধ্যে থাকে তখন তা গ্রহণীয় ঈর্ষা পর্যায়ে থাকে।

হিংসার প্রকারভেদ: মনে হিংসার উপস্থিতির পরিমাণের উপর ভিত্তি করে মানুষ কয়েকভাগ বিভক্ত। এই হিংসার উপস্থিতি তার আচরণ ও চলফেরার পরিবর্তন ঘটায়। হিংসাকে চার ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
১- একজন মানুষ তার অপর মুসলিম ভাইয়ের নিকট নিয়ামত দেখতে অপছন্দ করবে। এর তিনটি ধরণ রয়েছে:
ক- হিংসুক হিংসাকৃত ব্যক্তির নিকট নিয়ামতের উপস্থিতি ও তা উপভোগ করতে দেখে তা তার নিকট থেকে সরে যাওয়ার কামনা করবে, তবে তা তার নিকট স্থান্তরিত হওয়ার আশা করবে না। এদিকে ইঙ্গিত করে সনয়ানী রহঃ বলেন: একপ্রকার হল, সে এই নিয়ামতকে অপছন্দ করবে এবং তা সরে যাওয়ার কামনা করবে। আর এই অবস্থাকে হিংসা বলা হয়। (২)
খ- আবার কেউ কেউ সেই নিয়ামত সরে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ও উপকরণ গ্রহণ করে থাকেন। তাদের কেউ কথা ও কাজের দ্বারা হিংসাকৃত ব্যক্তির উপর জুলুম করার মাধ্যমে তার থেকে সেই নিয়ামত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। (৩)
গ- আরেক প্রকার লোক আছে যারা হিংসাকৃত ব্যক্তি থেকে নিয়ামত সরে গিয়ে তার নিকট চলে আসার প্রত্যাশা করে। এদিকে ইঙ্গিত করে ইবনে রজব রহঃ বলেন: তাদের কেউ কেউ তা নিজের নিকট স্থান্তরিত করার চেষ্টা করে। (৪)
এ ধরণগুলো হিংসার জঘন্য ও নিষিদ্ধ ধরণ। ইবনে হাজার রহঃ বলেন: যখন সে অন্যের নিকট এমন কিছু দেখে যা তার নিকট নেই, তখন সে ঐ ব্যক্তির থেকে তা সরে যাওয়ার কামনা করে, যেন তার থেকে উপরে উঠতে পারে বা তার সমান হতে পারে। এধরণের কাজে জড়িত ব্যক্তি ঘৃণিত যদি সে এরূপ বিষয় অন্তর, কথা বা কাজ দ্বারা করে। (৫)
২- একজন ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের উপর নিয়ামত দেখে তা সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করে না, কিন্তু সেও তার অনুরূপ নিয়ামত কামনা করে। একে ঈর্ষা বলা হয়। ঈর্ষা হল, মনের মধ্যে অন্যের অনুরূপ নিয়ামতের আশা রাখা। এটি প্রশংসনীয়। কেননা এর সাথে দৃঢ় সংকল্প ও কাজের প্রতি ভালবাসা থাকলে তা প্রতিযোগিতার দিকে নিয়ে যায়।(১)
ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন: সে অন্য ব্যক্তির তার উপর শ্রেষ্ঠত্বকে অপছন্দ করে, তাই সে তার মত বা তার চেয়ে উত্তম হতে চায়। এটা হল হিংসা, এটাকে অনেকে ঈর্ষা বলে নামকরণ করেছেন।(২)
ইবনে হাজার রহঃ বলেন: ঈর্ষা হল, সে তার জন্য অন্যের সমপরিমাণ নিয়ামত চায়, তবে তা ঐ ব্যক্তির থেকে সরে গিয়ে নয়। এ ব্যাপারে আগ্রহী থাকাকে বলা হয় মুনাফাসা বা প্রতিযোগিতা। আর এটি যদি আনুগত্যের কাজে হয় তবে তা প্রশংসনীয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ﴿ ] আর প্রতিযোগিতাকারীদের উচিৎ এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা।] (৩) আর যদি তা পাপ কাজে হয় তবে তা নিন্দনীয়। যেমনটি হাদিসে এসেছে (তোমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা কর না)। আবার যদি তা জায়েয কাজের ক্ষেত্রে হয় তাবে তা বৈধ।(৪)
৩- দরকারি হিংসা। এটা এমন হিংসা যা মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করে। নবী সাঃ বলেছেন: (দু'টি বিষয় ছাড়া হিংসা করা যায় না। এক ব্যক্তি হচ্ছে, আল্লাহ যাকে কুরআন দান করেছেন, আর সে দিবারাত্র তা তিলাওয়াত করে। যা দেখে অপর ব্যক্তি বলে, এ লোকটিকে যা দেওয়া হয়েছে আমাকে যদি অনুরূপ দেওয়া হতো, তা হলে আমিও অনুরূপ করতাম, সে যেরূপ করছে। আরেক ব্যক্তি হচ্ছে সে, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দিয়েছেন। ফলে সে তা যখাযথভাবে ব্যয় করছে। তখন অপর ব্যক্তি বলে, একে যা দেওয়া হয়েছে, আমাকেও যদি অনুরূপ দেওয়া হতো, আমিও তাই করতাম, সে যা করেছে।)(৫) এখানে ঈর্ষাকে হিংসা বলা হয়েছে রূপক অর্থে। এটা হল প্রতিযোগিতার হিংসা, যার কারণে হিংসুক ব্যক্তি হিংসাকৃত ব্যক্তির মত হতে চায়। এটা লাঞ্ছনাকর হিংসা নয় যার কারণে হিংসুক হিংসাকৃত ব্যক্তির থেকে নিয়ামত সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করে।(৬) উমর বিন খাত্তাব রাঃ আবু বকর সিদ্দিক রাঃ-এর সাথে সাদকা করার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করেছিলেন। যায়েদ বিন আসলাম হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি উমর বিন খাত্তাব রাঃকে বলতে শুনেছি (একদিন রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাদেরকে সাদকা করার নির্দেশ দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন আমার কাছে মালও ছিলো। আমি (মনে মনে) বললাম, আজ আমি আবু বকর রাঃ এর অগ্রগামী হবো, যদিও আমি কোন দিন দানে তার অগ্রগামী হতে পারিনি। কাজেই আমি আমার অর্ধেক মাল নিয়ে উপস্থিত হলাম। রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট রেখে এসেছো? আমি বললাম, এর সম-পরিমান। উমর রাঃ বলেন, আর আবু বকর রাঃ তার সমস্ত মাল নিয়ে উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাঃ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট রেখে এসেছো? তিনি বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি। তখন আমি বললাম, আমি কখনো কোনো বিষয়েই আপনাকে অতিক্রম করতে পারবো না।)(৭)
৪- কিছু মানুষ আছে যারা হিংসাকে দমন করে; যা তাকে হিংসাকৃত ব্যক্তির সাথে সদাচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই সে হিংসার মহাবিপদের সময় নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে হিংসাকৃত ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ ও তার জন্য দোয়া করার মাধ্যমে। ইবনে রজব রহঃ বলেন: “আরেক প্রকার লোক রয়েছে যখন সে মনের মাঝে হিংসা অনুভব করে, তখন তা দূরীভূত করতে, হিংসাকৃত ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করতে, তার জন্য দোয়া করতে ও তার মর্যাদা প্রচার করতে চেষ্টা করে। এমনকি সে তার হিংসাকে মহব্বতে পরিবর্তন করে যে, অপর মুসলিম তার চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। আর এটা ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরের অন্তর্ভুক্ত”।(১)

হিংসার কারণসমূহঃ
১- রিযিক বন্টনে আল্লাহর হিকমত ও ইচ্ছার ব্যাপারে দূর্বল ঈমান ও আল্লাহ যা দান করেছেন তার উপর তুষ্ট না হওয়া। আর এটা মানুষকে আল্লাহর বান্দাদের থেকে নিয়ামত সরে যাওয়ার প্রত্যাশা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটা হল আত্মম্ভরিতা ও স্বার্থপরতা এবং আল্লাহর পূর্ণ হিকমতের ব্যাপারে ঈমানের দুর্বলতা।(২)
২- হিংসাকৃত ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ যা তার নিয়ামতকে অপছন্দ করার দিকে নিয়ে যায়। মাওরদী রহঃ এর প্রতি ইঙ্গিত করে মত প্রদান করেছেন যে, হিংসার কারণ হল হিংসাকৃত ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ যার কারণে তার কোন মর্যাদা প্রকাশ পেলে বা কোন শুকরিয়াযোগ্য অর্জন দেখলে কষ্ট অনুভব করে। তাই শত্রুতার আড়ালে হিংসা বিস্তার করে। এ ধরণের হিংসা ব্যাপক নয় যদিও তা সর্বাধিক ক্ষতিকর; কেননা সে সকল মানুষের সাথে হিংসা করে না।(৩)
৩- হিংসুকের উপর হিংসাকৃত ব্যক্তির এমন শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ যা অর্জন করতে হিংসুক অক্ষম। তাই সে তার চেয়ে অগ্রগামী হওয়া ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হওয়াকে অপছন্দ করে। এর ফলে সে হিংসা করে, যদি এরূপ না হত তবে সে হিংসা থেকে বিরত থাকত।(৪) আর এটা প্রত্যেক মানুষের স্বকীয়তা ও নির্দিষ্ট সক্ষমতার বিষয়ে অসন্তুষ্টি ও অস্বীকৃতির ফলস্বরূপ। কেননা কিছু মানুষকে আল্লাহ তায়ালা চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার ক্ষমতা দিয়েছেন, অথচ তার সমবয়সী অপরজনকে কষ্ট ও বোঝা বহনের ক্ষমতা দিয়েছেন। সুতরাং প্রথমজনের উচিত ডাক্তারী করা আর দ্বিতীয়জনের উচিত মেশিনারিজ বা কৃষিকাজ ইত্যাদি শিক্ষা করা। একজন অপরজনের দিকে দেখবে না, পরস্পর হিংসা করবে না এবং একে অপরকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না। কেননা হিংসা করা নিন্দিত কাজ এবং তুচ্ছজ্ঞান করারও ঘৃণীত কাজ।
৪- একই লক্ষ্য উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতা করা, ফলে হিংসুক তার কাঙ্খিত বিষয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় করে। যেমন একই কর্ম বা একই পদ অর্জনের জন্য প্রতিযোগী ব্যক্তিরা।(৫)
৫- পিতা-মাতা ও মুরুব্বী কর্তৃক অন্যদের উপর কোন সন্তান বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রধান্য দেয়া; ইনসাফ বহির্ভূত কোন আবেগের কারণে। যা তাদের মাঝে পারস্পরিক হিংসার বিজ বপন করে। অথবা কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান ও দায়িত্বশীল কর্তৃক নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া তার অন্যান্য সহকর্মীকে বাদ দিয়ে; কোন বিশেষ সম্পর্ক বা স্বার্থ থাকার কারণে যা মূলত প্রাধান্য দেওয়ার কোন কারণ নয়। ফলস্বরূপ তাদের মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার সৃষ্টি হয়।

হিংসার বিপদসমূহঃ
১- হিংসা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক কষ্টের কারণ। যেহেতু এর ফলে মানুষের জীবন কর্দমাক্ত হয় যা তাকে উৎকণ্ঠিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে, তার হৃদয় ছিন্ন ভিন্ন হয় এবং অন্তর চিন্তিত হয়। যেহেতু বঞ্চিত ও ঈর্ষার ব্যাথা এবং বাধাপ্রাপ্ত লোলুপতা, প্রত্যাখ্যাত লিপ্সা, দমিত লোভ, নিয়ন্ত্রিত চাহিদা ও আহত হৃদয়ের ব্যাথা কঠিন শক্ত স্নায়ুগুলোকে চুর্ণ করছে।(১) অনুরূপভাবে হিংসুক হিংসার আফসোস ও শরীরের রুগ্নতার ব্যাথায় কাতর হয়। অতঃপর তার আফসোসের কোন সীমা থাকে না এবং তার রোগমুক্তির কোন আশা দেখে না।(২) যার ফলে সে অন্তরের প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত হয়, তার হৃদয় অন্ধ হয় ও তার বিবেক লোপ পায়।(৩)
২- হিংসা করার মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিষেধাজ্ঞার বিপরীত কর্ম করা হয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কেননা কারো প্রতি ধারণা পোষন করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা পরস্পর দোষ অন্বেষন করো না, গোয়েন্দাগিরী করো না, পরস্পর প্রতিযোগিতা করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষন করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে থেেকা।)(৪)
৩- ঘৃণীত হিংসার মাধ্যমে আল্লাহর বন্টিত রিযিকের ব্যাপারে বিরোধিতা করা হয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকেন আর যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করেন আবার যার জন্য ইচ্ছা বিলম্বিত করেন। অনুরূপভাবে হিংসা করা ঈমানের হকীকতের বিপরীত; যেহেতু ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না। কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন মুমিনের পেটে আল্লাহর রাস্তার ধূলা এবং জাহান্নামের আগুনের শিখা একত্রিত হবে না। আর আল্লাহর বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হবে না।)(৫)
৪- হিংসা করা ইহুদীদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাদেরকে হিংসুক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন : وَدَّ كَثِيرٌ মِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْيَرُدُّونَكُم মِّنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا মِّندِ أَنفُسِهِم مِّنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُوا وَأَصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ শَيْءٍ قَدِيرٌ [আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর কাফের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারত! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে হিংসাবশত (তারা এরূপ করে থাকে)। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে চল, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।](৬)
৫- এটি পূর্ববর্তী জাতির রোগ। রাসূল সাঃ বলেছেন: (পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের রোগ তোমাদের মাঝেও সংক্রমিত হয়েছে। তা হল হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা। এ হল মুণ্ডনকারী। আমি বলি না যে, তা চুল মুণ্ডন করে বরং তা দ্বীনকে মুণ্ডন (ধ্বংস) করে দেয়। সে সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা মুমিন না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালবাসবে। এই ভালবাসা কেমন করে সুদৃঢ় হয় তা তোমাদের বলব কি? তা হল তোমরা পরস্পর সালামের প্রসার ঘটাও।) (১)
৬- হিংসা হিংসুকের মর্যাদা হ্রাস ঘটায়, নিয়ামতপ্রাপ্তদেরকে অপছন্দ করার ফলস্বরূপ। মানুষেরা তার থেকে দূরে সরে যায় এবং নিন্দিত আচরণ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা তার প্রতি ইঙ্গিত করে, তার ও তার আচরণ থেকে দূরে থাকার জন্য। মাওরদী এইদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, হিংসার ফলে তার মান-মর্যাদার অবনতি ঘটে। যেহেতু মানুষেরা তাকে এড়িয়ে চলে। আগের বাগধারায় বলা হয়েছে, হিংসুক নেতা হতে পারে না।(২)
৭- হিংসার বিপদের আরেকটি দিক হল, সমাজের উপর তার কুপ্রভাব। যেহেতু চরম হিংসা তাকে হিংসাকৃত ব্যক্তি থেকে নিয়ামত সরিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে এপথে সে কথা বা কর্ম বা উভয়ের মাধ্যমে অপরাধে জড়েয়ে পড়ে। অনুরূপভাবে এটি চোগলখোরী ও গীবতের একটি অন্যতম কারণ। যেহেতু হিংসুক হিংসাকৃত ব্যক্তির গীবত করে থাকে যেন তার মর্যাদা হ্রাস পায় ও সে হেয় হয়। অনুরূপভাবে হিংসাকৃত ব্যক্তির প্রতি হিংসুকের লুকায়িত বিষয়ের ফলস্বরূপ তা বিদ্বেষ ও শত্রুতার সৃষ্টি করে।

প্রতিকারমূলক পরিপালনের রূপরেখা হিংসার বিপদের ক্ষেত্রে প্রতিকারমূলক পরিপালনের রূপরেখা নিম্নরূপঃ
১- মানুষ তার জন্য উপকারী জ্ঞান অর্জন করবে, আর তা হল কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান; যা হিংসার ময়লা থেকে অন্তরকে পরিচ্ছন্ন ও মনকে পবিত্র করে এবং হৃদয়ের মাঝে তাকওয়া ও অন্যের প্রতি ভালবাসা, আল্লাহ তার উপর যে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন তার জন্য আনন্দ এবং তিনি যা দিয়েছেন তার প্রতি সন্তুষ্টি ও পরিতুষ্টি সৃষ্টি করে। সাথে সাথে সেগুলো উত্তম পন্থায় ব্যয় করার সঠিক পদ্ধতি অনুসন্ধান করবে। আর এটা পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্ব যে, তারা স্বীয় জাতি ও সাধারণ মানুষকে ইসলামী চরিত্রের উপর গড়ে তুলবে এবং তা তাদের অন্তরে গেঁথে দিবে।
২- সমাজ হিংসার ক্ষতি, ভয়াবহতা ও বিপদ অনুধাবন করবে, যা ভালকাজসমূহকে গলধঃকরণ করে খারাপ অবস্থায় নিপতিত করে। অনেক মানুষই জানে যে, হিংসা ঘৃণীত, কিন্তু তারা জানে না যে, তা ইহুদী ও পূর্ববতীদের চরিত্র এবং এই বিষয়ে ইসলামের চরম নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কেও জানে না। তারা এও জানে না যে, হিংসা ও ঈমান একসাথে একত্রিত হতে পারে না। যেমনটি হিংসার বিপদসমূহের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
৩- মানুষ অন্যের জন্য কল্যাণ কামনার বিষয়ে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত হবে। সুতরাং যদি সে মনের মাঝে অন্যের বিষয়ে হিংসা অনুভব করে, তাহলে তার প্রতি অনুগ্রহ করতে ও তার জন্য দোয়া করতে চেষ্টা করবে। হতে পারে এরূপ বারবার করার ফলে ও এতে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে তার মনের হিংসা দূরীভূত হবে। মহান আল্লাহ বলেন: ]﴾ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ [ [নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।] (১)
ইবনু তাইমিয়া রহঃ বলেন: কেউ যদি অন্যের বিষয়ে মনের মাঝে হিংসা পায় তাহলে সে যেন তার সাথে তাকওয়া ও ধৈর্যের সাথে ব্যবহার করে এবং মনে মনে হিংসাকে অপছন্দ করে। (২) আর হিংসার পরিবর্তে সেটা ঈর্ষায় পরিবর্তন করবে। আর ঈর্ষা হল সে হিংসাকৃত ব্যক্তির অনুরূপ হতে আকাঙ্খা করবে তবে ঐ ব্যক্তির নিকট হতে নিয়ামত সরে গিয়ে নয় এবং এটাকে কল্যাণকর পথে ব্যয়ের নিয়ত দ্বারা শক্তিশালী করবে।
৪- সে দোয়া ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে। আর সে আল্লাহর নিকট চাইবে যে, তিনি যেন তাকে হিংসার রোগ হতে মুক্তি দেন ও রক্ষা করেন। মহান আল্লাহ বলেন: ]وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي ] [ عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْশُدُونَ ﴾ বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।] (৩) আর মানুষের প্রতি হিংসা করার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইবে। মহান আল্লাহ বলেন: ]وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ] [ আর তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।](১)
৫- মানুষ তাদের সুন্দর স্বভাব, চরিত্র ও জীবনী বিষয়ে জানবে ও চিন্তা করবে যাদের অন্তর হিংসা থেকে পবিত্র এবং মানুষদের তাদের প্রতি ভালবাসা ও আগ্রহের মূল্যায়ন করবে। আর তারা যে, নির্মল চিত্ত ও মানসিক প্রশান্তি উপভোগ করে তা অনুধাবন করবে। এগুলো শুধু তারাই অনুধাবন করতে পারবে যাদের অন্তর হিংসা হতে মুক্ত। আমাদের জন্য আনসারী সাহাবীদের জীবনীতে রয়েছে উত্তম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন: ]وَالَّذِينَ تَبَوَّءُ والدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ )﴾﴾ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ খَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ শُحَّ نَفْسِهِ، فَأُوْلَتَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ[ [আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।] (২)
৬- হিংসা সৃষ্টিকারী কারণসমূহ অপসারণ করা। যেমন জুলুম করা এবং ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক ফয়সালা না করা। সুতরাং পিতা-মাতা, মুরুব্বীগণ, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও দয়িত্বশীলগণ তাদের অধীনস্তদের ক্ষেত্রে ইনসাফ বজায় রাখবে। যাতে করে তাদের মাঝে ভালবাসা ও ঐক্য তৈরী হয়। বস্তুত ইনসাফ ভালবাসা ও সন্তুষ্টির আগমণ ঘটায়, পক্ষান্তরে জুলুম প্রতিযোগিতা, হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। যদি কোন মুরুব্বী, পিতা-মাতা বা কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি দেখে যে, বিশেষ কোন কারণে কারো প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন তাহলে সে যেন এ ব্যাপারে সহনশীল ও বিচক্ষণ হয়; যাতে অন্যরা সে বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে টের না পায় এবং সে বিষয়টিকে অবস্থা বিবেচনায় সমাধান করবে। আমাদের জন্য ইউসুফ আঃ ও তার ভাইদের ঘটনায় এ বিষয়ে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ]إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَى أَبِينَا مِنَا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ[ [স্মরণ করুন, যখন তারা বলেছিল, আমাদের পিতার কাছে ইউসুফ এবং তার ভাই তো আমাদের চেয়ে বেশী প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে।] (৩)

ক্রোধ ক্রোধের অর্থঃ
আভিধানিক অর্থঃ ক্রোধ হল: সন্তুষ্টির বিপরীত।
ক্রোধের পারিভাষিক অর্থঃ ইবনে রজব রহঃ বলেন: ক্রোধ হল, কষ্টদায়ক কিছু আপতিত হওয়ার আশঙ্কায় তা প্রতিরোধ করার জন্য বা যার থেকে কষ্ট পেয়েছে তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য অন্তরের ফুটন্ত অবস্থা।(১)
এভাবেও বলা যায়: মনের স্পন্দন যার কারণে প্রতিশোধ গ্রহণের নেশায় হৃদয়ের রক্ত টগবগ করে। (২)

ক্রোধের কারণসমূহঃ ১- অন্যদের হতে মন যা অপছন্দ করে তার আক্রমণ।(৩)
২- জুলুম বা বঞ্চিতের শিকার হওয়ার অনুভব করা এবং বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে মেজাজ খারাপ হওয়া। যেমন গরম আবহাওয়া। এ সবগুলোই দ্রুত রাগান্বিত হতে সাহায্য করে। (৪)
৩- ক্রোধ সৃষ্টির আরেকটি অন্যতম কারণ হল, অসুস্থতা, কাজের ব্যস্ততা, নিয়মিত রাত্রী জাগরণ এবং লোভের মাঝে নিমজ্জিত থাকা; যা শরীর ও মনের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এগুলো হল ক্রোধের বীজের মত। আর সবচেয়ে বড় কারণ হল এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া।
জরুরী কারণগুলোর নিরাময় করতে হবে তা সংশোধন করে নেওয়ার মাধ্যমে যাতে মনের মাঝে পঙ্কিলতা তৈরী না হয়। এর পর ধারাবাহিকভাবে সেগুলো প্রতিহত করতে হবে। (৫)

ক্রোধের প্রকৃতি: মানুষ স্বভাবগতভাবে রাগের অধিকারী। যদি সে তা হারিয়ে ফেলে তবে তার অনুভূতিগুলো নিস্তেজ হয়ে যাবে, সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমের আত্মমর্যাদায় উত্তেজিত হবে না এবং তার বীরত্ব নষ্ট হয়ে সে কাপুরুষে পরিণত হবে। কাজেই ক্রোধ হল উভয় ধার বিশিষ্ট অস্ত্র। ইবনুল কায়্যিম জাওযীয়া রহঃ বলেন: ক্রোধের সীমা রয়েছে তা হল প্রশংসনীয় বীরত্ব এবং খারাপ ও ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট হতে মুক্ত থাকা। আর এটা হল ক্রোধের পূর্ণতা। আর যখন তার সীমা অতিক্রম করে তখন এর অধিকারী সীমালঙ্ঘন করে ও জুলুম করে। আর যদি তা নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে কম থাকে তবে সে কাপুরুষ হয় এবং খারাপ বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত থাকে না।(১)
আলী বিন আবু তালেব রাঃ বলেন: সহনশীলতার সীমা হল ক্রোধের উত্তেজনা হতে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা।(২)

ক্রোধের প্রকারভেদ: ক্রোধের প্রকৃতি থেকে স্পষ্ট হয় যে, তা তিন প্রকারঃ
১- এমন ক্রোধ যা মানুষকে বীরত্ব, দ্বীন ও মুসলিম সম্ভ্রমের মর্যাদা রক্ষা করতে এবং খারাপ ও ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে মুক্ত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। এ ধরণের ক্রোধ প্রশংসনীয় ও কাঙ্খিত। আবু সাঈদ খুদরী রাঃ হতে সহীহ সুত্রে বর্ণিত হয়েছে, (পর্দার ভেতরে কুমারীদের চেয়েও নবী সাঃ বেশী লাজুক ছিলেন। যখন তিনি তার কাছে অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন, তখন আমরা তার চেহারাতেই এর আভাস পেয়ে যেতাম।) (৩) যখন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ রাসূল সাঃ নিকট এক ব্যক্তির এই বক্তব্য পৌছালেন (এ বণ্টনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি।) তখন তা তার জন্য কষ্টকর হল, তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল এবং রাগান্বিত হলেন। কিন্তু তারপরও শুধু এটুকুই বললেন: (মূসা আঃ কে এর চেয়েও বেশী কষ্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন।) (৪) আবার তিনি যখন এমন কিছু দেখতেন বা শুনতেন যা আল্লাহ অপছন্দ করেন তখন রাগান্বিত হতেন এবং সে বিষয়ে কথা বলতেন, চুপ থাকতেন না। তিনি একবার আয়েশা রাঃ গৃহে প্রবেশ করলেন, অতঃপর একখানা পর্দা দেখলেন যাতে ছবি ছিল। তা দেখে নবী সাঃ এর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি পর্দাখানা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। আর বললেন: (কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ঐসব লোকের যারা এ সব ছবি অঙ্কণ করে।) (৫) মুগিরা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা'দ ইবনু উবাদা রাঃ বলেছেন, যদি আমি আমার স্ত্রীর সাথে কোন পরপুরুষকে দেখি তাহলে আমি তাকে তরবারীর ধারালো দিক দিয়ে আঘাত করব। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (তোমরা কি সা'দ এর আত্মমর্যাদাবোধে বিস্মিত হচ্ছ? আমি ওর চেয়েও বেশি আত্মসম্মানী। আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি আত্মসম্মানের অধিকারী।) (৬)
২- কাপুরুষতা, আত্মমর্যাদাবোধ না থাকা এবং খারাপ ও লাঞ্ছনাকর বিষয়ে চুপ থাকার ফলস্বরূপ মানুষদের মাঝে যে ক্রোধহীনতার সৃষ্টি হয় তা প্রত্যাখাত ও অপ্রশংসনীয়।
৩- মানুষদের ক্রোধ তার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করবে। ফলে তার পরিমাপের বাইরে চলে যাবে এবং তার শিরাগুলো ফেঁপে উঠবে, যার দরুন সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তার জিহ্বা দিয়ে অশ্লীল শব্দ বের হবে ও হাত সঠিক স্থানের বিপরীতে গিয়ে পড়বে এবং ক্রোধের ফলে তার ফয়সালার ক্ষেত্রে জুলুম করবে, সহনশীলতার অংশ তার মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে এবং সে বিবেক বহির্ভুত কথা বলবে। নবী সাঃ বলেছেন: (প্রকৃত বীর সে নয়, সে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই প্রকৃত বাহাদুর, সে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।)(১) আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল: আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন: তুমি রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার একই কথা বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বারেই বললেন: রাগ করো না।)(২)

ক্রোধের বিপদসমূহঃ ১- ক্রোধ হল বিভিন্ন বিষয়ে অমনোযোগিতার দ্বার; কেননা তা বিভিন্ন বিষয়ের শেষপরিণতি অনুধাবনে বিবেক ও বিচক্ষণতার পথগুলো বন্ধ করে দেয় এবং অমনোযোগিতার কারণগুলো উন্মুক্ত করে। তখন মানুষ অন্যমনষ্ক ও রক্ত গরম থাকা অবস্থায় কাজ করে। যার ফলে হয়ত কাউকে হত্যা করে বা কাউকে স্পর্শ করে বা পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে, কখনো বা জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এমন কথা বলে যার কারণে ক্রোধ দমে যাওয়ার পর অনুতপ্ত হয়; কিন্তু সে সময় অনুতাপ কোন কাজে আসে না।
২- অনুপোযুক্ত স্থানে চরমভাবে রেগে যাওয়া মানুষদের মর্যদা, গাম্ভীর্য ও প্রভাব কমিয়ে দেয়; যেহেতু ক্রোধান্বিত ব্যক্তির মাঝে ভয়ঙ্কর আকৃতি অঙ্কিত হয়। যেমন শিরা ফেপে উঠা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং তার শরীরের অস্বাভাবিক নড়াচড়া, এর সাথে তার মুখ থেকে অশালীন বাক্য বের হওয়া।
৩- ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা তাকে ক্রোধ সংবরণ করার প্রতিদান হতে বঞ্চিত করবে। নবী সাঃ বলেছেন: (প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা সত্তেও যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন সকল মানুষের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হুরকে সে চায় তাকে গ্রহণের ইখতিয়ার দিবেন।)(৩)

প্রতিকারমূলক পরিপালনের রূপরেখা ক্রোধের প্রতিকারমূলক পরিপালনের রূপরেখা নিম্নরূপঃ
১- মানুষ আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। যেমনটি ঐ ব্যক্তির হাদিসে এসেছে যার রাগ বেড়ে গেছিল, তখন নবী সাঃ বলেছিলেন: (আমি এমন একটি দোয়া জানি, যদি লোকটি পড়ে তবে সে যে রাগ অনুভব করছে তা দূর হয়ে যাবে। (তিনি বললেন) সে যদি পড়ে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রজীম" আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।)(৪)
২- মানুষ তার অবস্থার পরিবর্তন করবে। নবী সাঃ বলেছেন: (যদি তোমদের কেউ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় রাগান্বিত হয়, তবে সে যেন বসে পড়ে। যদি এতে রাগ চলে যায়, তবে ভাল; নয়তো সে শুয়ে পড়বে।)(৫)
৩- একজন মুসলিম ক্রোধ সংবরণকারীদের ফযিলতের কথা স্মরণ করবে। মহান আল্লা তাদের প্রশংসা করে বলেন: [الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِশَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا ﴾ عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ[ ]যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আর আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালবাসেন; আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে-বুঝে তারা তা পুনরায় করতে থাকে না।] (১) নবী সাঃ বলেছেন: (প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা সত্তেও যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন সকল মানুষের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হুরকে সে চায় তাকে গ্রহণের ইখতিয়ার দিবেন।)(২) তিনি আরো বলেছেন: (আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে তা অন্য কিছু সংবরণে নেই।) (৩)
৪- একজন মানুষ স্মরণ করবে ও চিন্তা করবে ক্রোধের সময় সহনশীল ব্যক্তির অবস্থা এবং রাগান্বিত ব্যক্তির অবস্থা। প্রথমজনের প্রতি মানুষের হৃদয় ও আত্মা স্নেহশীল ও আকৃষ্ট হয়। আর দ্বিতীয়জনের থেকে বিবেকবানরা দূরে থাকে এবং মানুষেরা তার কর্ম থেকে বেঁচে চলে।

ধারণা পোষণ করা খারাপ ধারণা পোষণ করার অর্থঃ
ধারণা হল: কোন বিষয়ে উত্থাপিত সন্দেহ, পরবর্তীতে সে সন্দেহকে বাস্তাবায়ন করা ও দৃঢ় করা।(১)
ধারণা হল, পরিবার আত্মীয় ও সাধারণ মানুষকে অযাচিতভাবে অপবাদ দেয়া ও বিশ্বাসঘাতকতা করা।(২)
ইসলাম খারাপ ধারণা পোষণ করা থেকে নিষেধ করেছে, যার বর্ণনা আল্লাহর কিতাব নবী সাঃ এর সুন্নাতে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ]﴾يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ [ [হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন অনুমান পাপ।] (৩) তিনি আরো বলেন: ]وَمَ صلے GRIZA REC GIS CPI on a ] [لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ শَيْئًا তো শুধু অনুমানেরই অনুসরণ করে; আর নিশ্চয় অনুমান সত্যের মোকাবিলায় কোনই কাজে আসে না।] (৪)
নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা হতে বেঁচে থাক। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা।) (৫) সুতরাং কোন প্রকার দলিল প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী হয়ে কারো ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা, অপবাদ দেয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। খাত্তাবী রহঃ বলেন: আহকামের সাথে সংশ্লিষ্ট ধারণা এখানে উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হল যা ধারণাকৃত বস্তুর ক্ষতি করে সে ধরণের ধারণার বাস্তবায়ন পরিত্যাগ করা। অনুরূপভাবে অন্তরে দলীল বিহীন যা কিছু উদিত হয় তাও উদ্দেশ্য; কেননা মানুষের মনে সৃষ্ট প্রাথমিক ধারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যা করতে সক্ষম নয় তা করতে বাধ্য করা হয় না।(৬)

ধারণা পোষণ করার কারণসমূহঃ
১- কোন ব্যক্তির থেকে আশঙ্কা করা: এটা অনেক সময় মানুষকে সন্দেহ ও তার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে অপবাদের মধ্যে নিপতিত করে। ফলে তার কথা ও কাজকে অপব্যাখ্যা করে।
২- কোন ব্যক্তির সম্পর্কে শ্রুত গল্প বা কথা যা সাধারণত সত্য নয় তার আলোকে ভুল কল্পনা। তাই সে তার সাধারণ কাজকে খারাপ অর্থে প্রয়োগ করে।
৩- অপশিক্ষা, তার এমন এক পরিবেশে বসবাস করার কারণে যেখানে মানুষের চলাফেরাকে খারাপ অর্থে ব্যবহার করা হয়। ফলে তার মাঝে পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে সে খারাপ ধারণাসমূহ প্রবেশ করে। ফলস্বরূপ তার চরিত্র এ খারাপ আচরণে অভ্যস্ত হয়।
৪- অন্যদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষে অন্তর পরিপূর্ণ থাকা যা তাকে আর চারপাশের সকল মানুষ সম্পর্কে বা কিছু মানুষ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণে উৎসাহিত করে।
৫- সন্দেহজনক ও অপবাদমূলক স্থানে প্রকাশ পাওয়া যদিও তা অনিচ্ছায় হয়, এটা অন্যদেরকে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা করতে অনুপ্রাণিত করে। কেননা তারা তার কারণ সম্পর্কে অবগত নয়। তাই ইসলাম সন্দেহপূর্ণ স্থান থেকে নিষেধ করেছে। নবী সাঃ বলেন: (হালালও স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু'য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানেনা। যে ব্যাক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকে রক্ষা করতে পারবে।) (১)
৬- খারাপ ধারণার কুপ্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞতা ও উদাসীনতা: তার ফলে সৃষ্ট পাপ ও সামাজিক বিছিন্নতা।

বিপদসমূহঃ খারাপ ধারণার মারত্মক কুপ্রভাব রয়েছে ধারণা পোষণকারী ও যার বিষয়ে ধারণা করা হয় তার উপর। কখনো তা সমাজের উপরও প্রভাব ফেলে। সংক্ষেপে খারাপ ধারণার বিপদসমূহ নিম্নরূপঃ
১- খারাপ ধারণা পোষণকারীর উপর পাপ অর্পিত হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন: ]﴾إِنَّ بَعْضَ الظَّنْ إِثْمٌ[ [নিশ্চয় কোন কোন অনুমান পাপ।](২)
কাজেই যার ব্যাপারে ধারণা করা হচ্ছে তার থেকে যদি ভাল ও কল্যাণকামিতা লক্ষ্য করা যায় এবং বাহ্যিকভাবে তার আমানতদারিতা দেখা যায়, তবে তার ক্ষেত্রে খারাপ ও খিয়ানতের ধারণা করা হারাম।(৩)
২- মানুষ এ ধরণের চরিত্রের লোকদেরকে অপছন্দ করে, তারা তার সন্দেহ ও ধারণাকে ভয় করে এবং তার সাথে আলাপচারিতা এড়িয়ে চলে, এ আশঙ্কায় যে, হয়ত তারা অনিচ্ছায় কোন ভুল করবে, পরবর্তীতে তা খারাপ অর্থে প্রয়োগ করা হবে। অনেক সময় সফরে তার সঙ্গী হওয়াকে অপছন্দ করা হয়; তার খারাপ ধারণার ভয়ে।
৩- আবার অনেক সময় খারাপ ধারণা তাকে অন্যদের সাথে গোয়েন্দাগিরি করে তাদের গোপন অবস্থা নির্ণয়ে উদ্বুদ্ধ করে; যার ফলে সে অন্যান্য খারাপ চরিত্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে।
৪- অনেক সময় খারাপ ধারণা অপবাদকে সত্যরূপে বা প্রায় সত্যরূপে ছড়িয়ে দিতে আগ্রগামী করে। যার ফলে ধারণাকৃত ব্যক্তির ব্যাপারে অপবাদ রটানো হয় অথচ তিনি তা থেকে মুক্ত। অনেক সময় এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়, যার কারণে তার সম্ভ্রমহানী হয়।
৫- ধারণাকৃত ব্যক্তির অযাচিত অপবাদ প্রচার করা, ধারণাকারী ও ধারণাকৃত ব্যক্তি এবং সমাজের অন্যান্যদের মাঝে বিদ্বেষ পোষণ ও সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায়, যার ফলে সমাজে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়।
৬- খারাপ ধারণা পোষণকারীর মাঝে উদ্বেগ-অস্থিরতার সৃষ্টি; কেননা সে অন্যদের কর্মকাণ্ডকে অপব্যাখ্যা করে, যা তাকে তাদের আচরণের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে ও সেগুলোকে খারাপ অর্থে প্রয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে তার মনের মাঝে উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

প্রতিকারমূলক দিকনির্দেশনাঃ
১- মানুষকে সুদৃঢ় আক্বীদার গোড়ে তোলা, যা তাদেরকে প্রশংসনীয় চরিত্র গ্রহণে এবং নিন্দিত চরিত্র বর্জনে সক্ষম করে তুলবে। আর খারাপ চরিত্র থেকে অন্তরকে পুতঃপবিত্র করবে।
২- মানুষ খারাপ ধারণা পোষণ করার পাপের বিষয়ে জেনে তা থেকে বিরত থাকবে।
৩- অন্যদের বক্তব্যকে কোন প্রকার অপব্যাখ্যা ছাড়াই যথাসম্ভব ভাল অর্থে প্রয়োগ করবে। যেমনটি উমর বিন খাত্তাব রাঃ বলেছেন: (তোমার ভায়ের মুখ থেকে নির্গত কোন শব্দকে ভাল অর্থে প্রয়োগ করো, যতক্ষণ তুমি সেটাকে ভাল অর্থে প্রয়োগে সুযোগ পাও।) (১)

অহঙ্কার করা অহঙ্কারের অর্থঃ
আভিধানিক অর্থঃ আরবী কিবর, তাকাব্বর ও ইস্তেকবার (الكبر، والتكبر، والاستكبار) এর অর্থ কাছাকাছি। আর এটা এমন অবস্থা যখন মানুষ নিজেকে নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে; নিজেকে অন্যদের থেকে বড় মনে করার মাধ্যমে। সবচেয়ে জঘন্য অহঙ্কার হল আল্লাহর উপর অহঙ্কার করা; হক গ্রহণ ও আল্লাহর ইবাদত পালন থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। অহঙ্কার দুইভাবে হয়ে থাকেঃ
একঃ মানুষ বড় হওয়ার পথ অনুসন্ধান করবে। এটা যদি আবশ্যকীয় বিষয়ে ও আবশ্যকীয় ক্ষেত্রে হয় তবে তা প্রশংসনীয়।
দুইঃ সে আত্মতুষ্টি প্রকাশ করবে। ফলে সে নিজের ব্যাপারে এমন কিছু প্রকাশ করবে যা তার মাঝে নেই। আর এটা নিন্দনীয়। (১)

পারিভাষিক অর্থঃ অহঙ্কারের পারিভাষিক অর্থ রাসূল সাঃ এই হাদিস থেকে সুস্পষ্ট হয়, তিনি বলেছেন: (যার অন্তরে অণু পরিমান অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যাক্তি জিজ্ঞেস করল, মানুষ চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এও কি অহঙ্কার? রাসুল সাঃ বললেনঃ আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালবাসেন। অহঙ্কার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা।)(২)
হাদিসে বর্ণিত (غمط) শব্দের অর্থ হল, কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করা। এবং (بطر الحق) এর অর্থ হল, আত্মম্ভরিতার কারণে সত্যকে প্রতিরোধ করা ও অস্বীকার করা।(৩) অহঙ্কার হল একটি গোপন চরিত্র, আর তার কর্ম হল এর ফল; তাই এর উৎস হল নিজের প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করা।(৪)
ইমাম নববী বলেন: অহঙ্কার হল, মানুষদের উপর নিজেকে বড় মনে করা ও তাদেরকে তুচ্ছ মনে করা এবং সত্যকে প্রতিহত করা।(৫)

অহঙ্কার প্রকাশের কারণসমূহঃ ১- ব্যক্তির ঈমানের দুর্বলতা ও তার এ জ্ঞানের অভাব যে, অহঙ্কার একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং এটা কোন সৃষ্ট জীবের জন্য উপযুক্ত নয়।
২- আত্মঅহমিকা বা আমিত্ববাদের মন্দ প্রভাব ও চরম পরিণতি রয়েছে। এটাই অহঙ্কার ও গর্বের মধ্যে নিপতিত হওয়ার পথ। আত্ম-অহমিকাবোধের কতগুলো কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হল, নিকট লোকদের দ্বারা অত্যাধিক প্রশংসা ও চাটুকারদের তোষামোদি; যারা মুনাফেকীকে তাদের অভ্যাসে পরিণত করেছে।(১)
বিবেক যত লোপ পায় চিন্তা-ভাবনা ও বোধশক্তি তত হ্রাস পায় এবং ঐ ব্যক্তি নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী ও বিবেকবান ভাবতে থাকে।(২) আবার কখনো আত্ম-অহমিকা মানুষদের মাঝে সুপ্ত থাকে, অতঃপর যখন সে কিছু সম্পদ বা মর্যাদা অর্জন করে তখন তা তার মাঝে প্রকাশ পায় এবং তার বিবেক এটা দমিয়ে ও গোপন রাখতে অপারগ হয়।(৩) আর জ্ঞানের পূর্ণতা তো শরয়ী ইলমের মাধ্যমে হয়ে থাকে যা হালাল ও হারামের মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম।
৩- বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের উপর নিজেকে বড় মনে করা এবং সমাজে তার অবস্থানের কারণে গর্ববোধ করা।(৪) আর এটা মনের মাঝে সুপ্ত অহঙ্কারের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গণ্য।
৪- অহঙ্কারীর মনের মাঝে অনুভূত ত্রুটি ও জ্ঞানের ঘাটতিকে গোপন করার আগ্রহ। তাই সে আগ্রহী থাকে নিজেকে মানুষদের চোখে বড় হিসেবে প্রকাশ করতে এবং তাদের নিকট তার ত্রুটি যেন প্রকাশ না পায়।(৫)
চরম ঘাটতি আচরণে এমন প্রভাব তৈরী করে যা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয় বা তা স্বীকার করে নেওয়াও সহজ নয়। যেহেতু সে এমনভাবে চলাফেরা করে যেন সে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। যার ফলে তার মাঝে আত্ম-অহমিকার সৃষ্টি হয়।
৫- অনুরূপভাবে এর অরেকটি বড় কারণ হল কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা এবং সমপর্যায়ের লোকদের সাথে উঠাবসা কম করা। (৬)

অহঙ্কারের প্রকারভেদঃ
১- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর অহঙ্কার করা। এটা সর্বনিকৃষ্ট ও ঘৃণীত প্রকার; কেননা তা মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাবকে অস্বীকার করা এবং সৃষ্টজীবের প্রতি স্রষ্টার নিয়ামত অমান্য করা। মহান আল্লাহ বলেন: [أَفَكُلًّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ] [তবে কি যখন কোন রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু এনেছে যা তোমাদের মনঃপূত নয় তখনি তোমরা অহংকার করেছ?](৭) তিনি আরো বলেন: [وَقَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْمَلَيْكَةُ أَوْ نَرَى رَبَّنَا لَقَدِ اسْتَكْبَرُوا فِي أَنفُسِهِمْ وَعَتَوْ عُنُوا كَبِيرًا) ]আর যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না তারা বলে, আমাদের কাছে ফেরেশতা নাযিল করা হয় না কেন? অথবা আমরা আমাদের রবকে দেখি না কেন? তারা তো তাদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং তারা গুরুতর অবাধ্যতায় মেতে উঠেছে।] (১)
ইবলিস তো আদাম আঃ কে সিজদা করা হতে বিরত ছিল অহঙ্কারের কারণেই-এটা ছিল সম্মানসূচক সিজদা ইবাদত হিসেবে সিজদা নয়- ফলে সে কাফেরদের অন্তর্গত হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন: [وَإِذْ ﴾ لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ[ ]আর স্মরণ করুন, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল; সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল। আর সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হল।] (২)
২- মানুষদের উপর গর্ববোধ করা, তাদেরকে ছোট মনে করা এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা; নিজের শারিরিক, অর্থগত বা জ্ঞানগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। তাই সে স্বীয় মনে বড়ত্ব অনুভব করে এবং অন্যরা তার চেয়ে ছোট, যদিও তারা আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত মর্যাদার কারণে শ্রেষ্ঠ হোক না কেন। আর এটিই পার্থিব জাতিগত বর্ণবাদের সূচনা। ইসলাম এ থেকে নিষেধ ও সতর্ক করেছে। বিষয়টি রাসূল সাঃ এর এই হাদিসের দিকনির্দেশনা থেকে স্পষ্ট হয়, তিনি বলেন: (আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি অহী করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও। এমনকি কেউ যেন কারো উপর গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারো উপর সীমালঙ্ঘন না করে।) (৩)
সর্বনিকৃষ্ট অহঙ্কার হল, যে ব্যক্তি মানুষদের উপর স্বীয় জ্ঞান নিয়ে গর্ব করে ও মর্যাদার কারণে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। কেননা এ ধরণের লোক তার জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে পারেনি। কারণ যে ব্যক্তি আখেরাতের জন্য ইলম অন্বেষণ করে, ইলম তাকে বিনয়ী করে, তার হৃদয় নম্র হয়, আত্ম প্রশান্ত হয় এবং সে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে। তাই কোন ধরণের উদাসীনতা করে না এবং সর্বাস্থায় তার মূল্যায়ন করে ও নিয়ন্ত্রণ করে। যদি কেউ তার মনের ব্যাপারে উদাসীন থাকে তবে সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যাবে। (৪)
৩- মানসিক অহঙ্কারঃ তা হল পোষাকে গর্ব ও অহঙ্কার অনুভব করা। সে হয়ত মানুষদের সাথে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে না বরং তাদের সাথে নম্র আচরণ করে, কিন্তু সে পোষাকে অহমিকা দেখায়। এটা তাকে অনেক সময় নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে উদ্বুদ্ধ করে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, রাসূল সাঃ বলেছেন: (এক ব্যাক্তি চিত্তাকর্ষক এক জোড়া কাপড় পরে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে পথ চলছিল; হঠাৎ আল্লাহ তাকে মাটির নীচে ধ্বসিয়ে দেন। কিয়ামত পর্যন্ত সে এভাবে নিচের দিকে ধ্বসে যেতে থাকবে।) (৫) মহান আল্লাহ এ ধরণের আচরণ থেকে নিষেধ করে বলেন: [وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْশِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ] [আর তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।] (৬)
তা হল কোন প্রকার কারণ ও প্রয়োজন ছাড়াই আনন্দের সাথে চলা। এ ধরণের চরিত্রের অধিকারীরা সর্বদা অহঙ্কার ও গর্বের সাথে চলে।(১) এর অর্থ এই নয় যে, সুন্দর পোষাক পরিধান করতে নিষেধ করা হচ্ছে কিন্তু নিষিদ্ধ হল অহঙ্কার, গর্ব ও অহমিকা বোধ করা।
রাসূল সাঃ বলেছেন: (যার অন্তরে অণু পরিমান অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যাক্তি জিজ্ঞাস করল, মানুষ চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এও কি অহঙ্কার? রাসুল সাঃ বললেনঃ আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালবাসেন। অহঙ্কার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা।)(২)
এই খারাপ চরিত্র থেকে নিষেধ করার পর চলার ক্ষেত্রে তার বিকল্প উত্তম চরিত্রের রূপরেখা অঙ্কন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ]﴾ الْحَمِيرِ[ وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ ]আর তুমি তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো; নিশ্চয় স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।] (৩)
কুরতুবী রহঃ বলেন: অর্থাৎ এ ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করুন, কাজেই আপনি মুমূর্ষ ব্যক্তির ন্যায় ধীরে চলবেন না এবং ধূর্ত লোকের মত দ্রুত চলবেন না।(৪)
তবে নবী সাঃ এর থেকে যে বর্ণনা রয়েছে যে, তিনি যখন হাটতেন তখন দ্রুত চলতেন এবং আয়েশা রাঃ হতে উমর রাঃ এর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনিও হাটার সময় দ্রুত চলতেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তারা মুমূর্ষ ব্যক্তির মত ধীরে চলতেন বরং তার চেয়ে দ্রুত চলতেন।(৫)

অহঙ্কারের বিপদসমূহঃ
১- সত্য বঞ্চিত হওয়া এবং অন্তর আল্লাহর আয়াতসমূহ বুঝতে ও তার বিধানসমূহ অনুধাবন করতে অন্ধ হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন: ]سَأَصْرِفُ عَنْ ءَايَتِيَ الَّذِينَ يَتَکَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِن يَرَوْا كُلَّ ءَايَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِن يَرَوْا سَبِيلَ الرُّশْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا وَإِن يَرَوْا سَبِيلَ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِايَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ[ ]যমীনে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার করে বেড়ায় আমার নিদর্শনসমূহ থেকে আমি তাদের অবশ্যই ফিরিয়ে রাখব। আর তারা প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও তাতে ঈমান আনবে না এবং তারা সৎপথ দেখলেও সেটাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না, কিন্তু তারা ভুল পথ দেখলে সেটাকে পথ হিসেবে গ্রহণ করবে। এটা এ জন্য যে, তারা আমার নিদর্শনসমূহে মিথ্যারোপ করেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা ছিল গাফেল।] (৬)
الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي ءَايَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَنٍ أَتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ وَعِندَ الَّذِينَ ءَامَنُوا كَذَلِكَ : আল্লাহ GIC يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَکَبِّرِ جَبَّارٍ[ ]যারা নিজেদের কাছে (তাদের দাবীর সমর্থনে) কোন দলীল-প্রমাণ না আসলেও আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়। তাদের এ কাজ আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে খুবই ঘৃণার যোগ্য। এভাবে আল্লাহ মোহর করে দেন প্রত্যেক অহংকারী, স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়ে।](১)
২- আল্লাহর ক্রোধ ও ঘৃণায় নিপতিত হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন: [لَا جَرَمَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَکْبِرِينَ] [এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ জানেন যা তারা গোপন করে আর যা প্রকাশ্যে করে, তিনি অহঙ্কারীদেরকে ভালবাসেন না।](২)
৩- অহঙ্কারীকে মানুষ ঘৃণা করে ও অপছন্দ করে, যেহেতু সে নিজেকে অন্যদের থেকে বড় মনে করে ও অন্যদের মর্যাদাহানী করে, সেহেতু তার বিপরীতে তারা তাকে ঘৃণা করে ও ভালবাসে না। কেউ কেউ যদিও তার সাথে ভদ্রতা দেখায়, তারা মূলত তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তা করে, অথবা দুনিয়ার কোন কিছু পাওয়ার আশায় করে, পেয়ে গেলে তার থেকে দূরে সরে যাবে। এটা তাকে মানসিক অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়; যখন সে লক্ষ্য করে যে মানুষদেরা তার সাথে তাদের প্রয়োজনের জন্য সৌজন্যমূলক আচরণ করছে, যখন তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে তখন তারা তার নিকট হতে পলায়ন করবে যেমনভাবে অস্ত্রের আওয়াজ শুনে পাখি তার বাসা থেকে পলায়ন করে। যেমনটি ঐ সমস্ত লোকদের অবস্থা হয়ে থাকে যারা চাকুরী জীবনে ছিল অহঙ্কারী তাদের যখন অবসরে পাঠানো হয়। যদি অহঙ্কারীরা এদের অবস্থা দেখে শিক্ষা নিত!
মাওরদী বলেন: অহঙ্কার ঘৃণার সৃষ্টি করে, ঐক্য বিনষ্ট করে ও বন্ধুদের অন্তরকে উত্তেজিত করে, খারাপ দিক বর্ণনায় এগুলোই যথেষ্ট।(৩)
৪- অহঙ্কারীর নিজের দোষ-ত্রুটির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা ও সেগুলোকে সংশোধন না করা। কেননা তার ইন্দ্রিয়গুলো অহঙ্কার, গর্ব, অহমিকা ও গৌরবের মাঝে বাঁধা। তারা মনে করে তারা ভাল কাজ করছে অথচ তারা অহমিকার ভ্রষ্টতায় পথহারা। মহান আল্লাহ বলেন: [قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَلًا الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا] [বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত? ওরাই তারা, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পণ্ড হয়, যদিও তারা মনে করে যে, তারা সৎকাজই করছে।] (৪)

প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনা অহঙ্কারের জন্য প্রতিকারমূলক পরিপালনগত দিকনির্দেশনাগুলো হলঃ
১- মানুষ অহঙ্কারের অসীম গুনাহ ও শাস্তির কথা স্মরণ করবে। আর এও স্মরণ করবে যে অহঙ্কারী আল্লাহর চাদর নিয়ে বিতর্ককারীর মত। রাসূল সাঃ আল্লাহ তায়ালা থেকে বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ বলেন (হাদিসে কুদসী): (অহঙ্কার আমার চাদর এবং শ্রেষ্ঠত্ব আমার লুঙ্গী স্বরূপ। কেউ এ দু'টির কোন একটি নিয়ে আমার সাথে বিবাদ করলে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।) (১) রাসূল সাঃ বলেছেন: (যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।) (২) তিনি আরো বলেন: (আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা দুর্বল এবং অসহায়; কিন্তু তারা যদি কোন ব্যাপারে আল্লাহর নামে কসম করে বসেন, তাহলে তিনি তা পূরণ করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা রূঢ় স্বভাব, অধিক মোটা এবং অহংকারী।) (৩)
২- সে আল্লাহর নিকট বিনয়ী ব্যক্তির প্রতিদান ও তার জন্য প্রস্তুতকৃত নিয়ামতের কথা স্মরণ করবে। মহান আল্লাহ বলেন: [ تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ] [আখেরাতের সে আবাস যা আমি নির্ধারিত করি তাদের জন্য যারা যমীনে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।] (৪)
রাসূল সাঃ বলেছেন: (সাদকাহ করলে মাল কমে যায় না এবং ক্ষমা করার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা (ক্ষমাকারীর) সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর কেউ আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য বিনয়ী হলে, আল্লাহ তাকে উচ্চ করেন।) (৫)
৩- সে ঔদ্ধত্য অহঙ্কারীদের সাথে উঠাবসা করবে না, যারা মানুষদের হৃদয়কে নষ্ট করে দেয় এবং তাদেরকে এমন কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে যা অন্তরের ক্ষতি করবে কোন উপকার করবে না; কারণ কেউ কারো সাথে উঠাবসা করলে তাদের সাদৃশ্য ধারণ করে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।) (৬) পক্ষান্তরে সৎকর্মলীল বিনয়ীদের সাথে উঠাবসা করলে মানুষ বিনয়ী হয়।
৪- মানুষ তার আসল সৃষ্টিরহস্যে ও পেটে যা বহন করছে সেদিকে দৃষ্টি দিবে, যদি সে তা অনুধাবন করতে পারে তবে সে অহমিকা মুক্ত থাকবে। এজন্য কুরআনুল কারীম আমাদের মূল সৃষ্টির দিকে বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন : [ فَلْيَنظُرِ الْإِنسَانُ مِمَّ خُلِقَ خُلِقَ مِن مَّاءٍ دَافِقٍ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَابِ ] [অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিৎ, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি হতে। এটা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও পঞ্জরাস্থির মধ্য থেকে।](১)
৫- বিবেকবান সম্ভ্রান্ত সৎলোকদের নিকট অহঙ্কারীদের অবস্থা ও তাদের সামাজিক অবস্থানের বিষয়ে চিন্তা করবে।
৬- মানুষদের সবশেষ প্রত্যাবর্তন স্থলের বিষয়ে চিন্তা করবে; মৃত্যু ও তার নিঃশেষ হয়ে যাওয়াকে স্মরণ করা এবং কবর যিয়ারত করার মাধ্যমে। কেননা তা হৃদয়কে নরম ও কোমল করে। নবী সাঃ বলেছেন: (…তোমরা কবর যিয়ারত করো কেননা তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।)(২)

টিকাঃ
(১) সহীহ বুখারী (৪/১৮৭, হা: ৬৪৭৭)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৫/১৫, হা: ২৬১৬), মুসনাদে আহমাদ (৫/২৩১), সহীহ হাদিস, সহীহুল জামেউস সগীর (২/৯১৩)।
(৩) সূরা কাফ: (১৮)।
(৪) আর-রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃঃ ৩৬৭)।
(১) সহীহ মুসলিম (৪/২০০১, হা: ৭০/২৫৭৯)।
(২) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৫৮৩)।
(৩) গাযালী, এহইয়াউ উলুমুদ্দীন (৩/১৪০)।
(৪) প্রাগুক্ত।
(৫) প্রাগুক্ত (৩০/১৪১)।
(১) সূরা আল-হুজুরাত: (১২)।
(২) ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর (৭/১৮৫)।
(৩) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৯৪, হা: ৪৮৯০), শাইখ আলবানী রহিঃ সহীহ সুনানে আবু দাউদে (৪০৮২-৪৮৭৮) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৪) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৯৪-১৯৫, হা: ৪৮৮০), শাইখ আলবানী রহিঃ সহীহ সুনানে আবু দাউদে (৪০৮২-৪৮৭৮) হাদিসটিকে 'হাসান সহীহ' বলেছেন।
(১) সহীহ বুখারী (১/২০-২১, হা: ১০), সহীহ মুসলিম (১/৬৫, হা: ৬৫/৪১)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৪/২৮৮, হা: ১৯৩১), তিনি হাদিসটিকে 'হাসান' বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ (৫/২৩১), শাইখ আলবানী সহীহ সুনানে তিরমিযিতে (১৫৭৫-২০১৩) হাদিসটিকে 'সহীহ' বলেছেন।
(৩) সূরা আল-কলম: (১১)।
(৪) আর-রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃঃ ৫০৬)।
(৫) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (২/২৪৬-২৪৭)।
(৬) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (২/১১২)।
(১) আহমাদ মুহাম্মাদ জাদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/৪৩৬)।
(২) সহীহ মুসলিম (১১/১০১, হা: ১৬৮/১০৫)।
(৩) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (২/১১৩)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৪২৩, হা: ১৩৭৮)।
(১) সহীহ বুখারী (২/৫০৩, হা: ৩৪৯৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১১, হা: ১০০/২৫২৬)।
(২) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১/৪৭৫)।
(৩) আল-গাজ্জালী, এহইয়াউ উলুমুদ্দীন (৩/১৪৯-১৫০), ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (২/১১৩)।
(১) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(২) সহীহ বুখারী (২/২১, হা: ১৩), সহীহ মুসলিম (১/৬৭, হা: ৭১/৫)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১/৭০৪)।
(২) আস-সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০২)।
(৩) মুহাম্মাদ আহমাদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/৪৩৯)।
(৪) মাওয়ারদী, আদাবুদ দুনিয়া (পৃ: ২৬৩-২৬৪)।
(১) মুসনাদে আহমাদ (৩/৪৪৭)।
(২) সহীহ বুখারী (১/২৭, হা: ৩৩), সহীহ মুসলিম (১/৭৮, হা: ১০৭/৫৯)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/১০৯, হা: ৬০৯৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১২-২০১৩, হা: ১০৫/৬০৭)।
(৪) সহীহ মুসলিম (১/১০, হা: ৫/৫)।
(১) সূরা কাফ: (১৭-১৮)।
(২) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৩) সূরা আত-তাওবা: (১১৯)।
(৪) সূরা মারইয়াম: (৪১)।
(১) আর-রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃঃ ৪৫১)।
(২) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১/৪৫৫)।
(৩) সূরা আল-আহযাব: (৫৮)।
(৪) আল-গাজ্জালী, এহইয়াউ উলুমুদ্দীন (৩/১১৮)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/৯৯, হা: ৬০৪৪)।
(২) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (২/৫৪)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/৯৯, হা: ৬০৪৭), সহীহ মুসলিম (১/১০৪, হা: ১৭৬/১১০)।
(৪) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (২/১২৫)।
(৫) সহীহ মুসলিম (৪/২০০৬, হা: ৮৫/২৫৯৮)।
(৬) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৬/১৪৯)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/৯৯, হা: ৬০৪৫)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৫/২১০-২১১, হা: ৪৯০৫), মুসনাদে আহমাদ (১/৪০৮), হাদিসটি হাসান পর্যায়ের সিলসিলাহ সহীহাহ (৩/২৬৪-২৬৫, হা: ১২৬৯)।
(৩) সহীহ মুসলিম (৪/২০৪, হা: ৪৯০৫)।
(১) ইবনে উসায়মীন, আল-ক্বওলুল মুফীদ (১/১৩৯)।
(২) মুসনাদে আহমাদ (৩/৭)।
(৩) আর-রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃঃ ৩৯)।
(৪) সুনানে তিরমিযি (৪/৯৩-৯৪, হা: ১৫৩৫), মুসনাদে আহমাদ (২/৬৯)।
(১) সুনানে নাসায়ী (৭/৬, হা: ৩৭৭৩), মুসনাদে আহমাদ (৬/৩৭১), শাইখ আলবানী সিলসিলাহ সহীহাহতে (১৩৬) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(২) সহীহ বুখারী (৪/৪০৯, হা: ৭৫২০)।
(৩) সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬।
(৪) সূরা আত-তাওবা: (৬৫)।
(১) সহীহ মুসলিম (৪/১৭৬২, হা: ২২৪৬)।
(২) প্রাগুক্ত (৪/১৭৬৩, হা: ২২৪৬)।
(৩) সুনানে তিরমিযি (৪/৪৫১-৪৫২, হা: ২২৫২)।
(১) সূরা আয-যুমার: (৬৫)।
(২) সূরা আন-নিসা: (৪৮)।
(৩) সহীহ বুখারী (৩/১৯৬, হা: ৪৪৯৭)।
(১) সূরা আল-হজ্জ: (৭৩)।
(২) সহীহ মুসলিম (১/৯৪, হা: ১৫২-৯৩)।
(১) সূরা আল-আ'রাফ: (১৩৮-১৩৯)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৯/২৪৪)।
(২) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৫৫)।
(৩) সূরা লুকমান: (০৬)।
(১) সূরা আন-নাজম: (৬১)।
(২) সূরা আল-ইসরা: (৬৪)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/১৩, হা: ৫৯০৯)।
(৪) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (১৪/৩৬)।
(১) সূরা লুকমান: (৬)।
(২) ইগাছাতুল লাহফান (১/২৫৯)।
(৩) প্রাগুক্ত।
(৪) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (১৪/৩৮)।
(১) ইগাছাতুল লাহফান (১/২৪৮)।
(২) প্রাগুক্ত (১/৪৬৩)।
(৩) প্রাগুক্ত (১/২৬৫)।
(৪) সূরা আর-রাদ: (২৮)।
(১) ইবনে মানযুর লিসানুল আরব (৬/৩৮)।
(২) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (৬/১৪৩)।
(৩) সূরা আল-হুজুরাত: (১২)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/১০৩, হাঃ ৬০৬৪), মুসলিম (৪/১৯৮৫, হাঃ ২৮/২৫৬৩)।
(২) সুনানে নাসায়ী (৮/৬১, হা: ৪৮৬০), শাইখ আলবানী সহীহুল জামে গ্রন্থে (২/১৪৪৫) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/২৭৪, হা: ৬৯০২), সহীহ মুসলিম (৩/১৬৯৮, হা: ৪০-২১৫৬)।
(৪) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৪/১৩৮)।
(৫) সূরা আল-হুজুরাত: (১২)।
(১) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৯৪, হা: ৪৮৮০), সুনানে তিরমিযি (৪/৩৩১-৩৩২, হা: ২০৩২)।
(২) সহীহ বুখারী (২/২১, হা: ১৩), সহীহ মুসলিম (১/৬৭, হা: ৭১/৫)।
(৩) দিওয়ানে উরউয়া (পৃঃ ১৯)।
(১) আশআরু আনতারা (পৃঃ ৮৬)।
(২) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৫/২১৫)।
(৩) প্রাগুক্ত (১২/১১৯)।
(৪) আর-রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃঃ ১১৪)।
(১) সূরা আন-নূর: (৩০-৩১)।
(২) আল-হাকেম, আল-মুস্তাদরাক (৪/৩১৪) এবং তিনি হাদিসটির ইসনাদকে সহীহ বলেছেন আর ইমাম যাহাবী সহমত পোষণ করেছেন।
(১) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(২) মুস্তাদরাকে হাকেম (৪/৩১৪), যাহাবী সহমত পোষণ করেছেন।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, ইগাছাতুল লাহফান (১/৬০-৬১)।
(১) সূরা আল-আন'আম: (১৬২)।
(১) আহমাদ (১/৩৮১) হাকেম সহীহ বলেছেন (৪/৪১৮), যাহাবী সহমত পোষণ করেছেন।
(২) আহমাদ (১/৩৮১) হাকেম সহীহ বলেছেন (৪/৪১৮), যাহাবী সহমত পোষণ করেছেন।
(৩) মুয়াত্তা মালেক (৮৫)।
(১) ইবনে রুশদ আল-কুরতুবী, বেদায়াতুল মুজতাহিদ (২/৪৬৭)।
(২) মাওদুদী, তাফসীরে সূরাতুন নূর পৃঃ (৩৮)।
(৩) শানকীতী, তাফসীরে সূরাতুন-নূর পৃষ্ঠা (২৫)।
(৪) আর রাগেব আল-আসবাহানী, আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন পৃষ্ঠা (৪৫৬)।
(৫) সায়্যেদ সাবেক, ফিকহুস সুন্নাহ (২/৪২৬)।
(৬) ইবনুল জাওযী, যাম্মুল হাওয়া পৃষ্ঠা (১২০)।
(১) আবুল আলা মাওদুদী, আল-হিজাব পৃষ্ঠা (৯৩)।
(২) সহীহ বুখারী (৩/২৯৫, হাঃ ৫২৩৩), সহীহ মুসলিম (২/৯৭৮, হাঃ ৪২৪/১৩৪১)।
(৩) ইবনে তাইমিয়া, আল-ফাতাওয়া (১০/৪১৭)।
(১) পূর্বোক্ত (১০/৪১৭-৪১৮)।
(২) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযীয়া, ইগাসাতুল লাহফান (১/২৬৫)।
(৩) তিরমিযি (৩/৩৯৫) হাঃ (১০৮৫)। শায়খ আলবানী বলেছেন হাসান সহীহ।
(৪) বুখারী (৩/৩৬০) হাঃ (৫০৯০), মুসলিম (২/১০৮৬) হাদিস নং (৫৩/১৪৬৬)।
(১) আল-ইনসান বাইনাল মাদ্দিয়া ওয়াল ইসলাম, পৃঃ (২১০)।
(২) পূর্বোক্ত পৃঃ (২২৫)।
(৩) আবুল আলা মাওদুদী রচিত হিজাব, পৃঃ (১২৮)।
(৪) সূরা-আল ফুরকান: (৬৮)।
(৫) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযীয়া, আদ-দা ও আদ-দাওয়া, পৃষ্ঠা (২৬৪)।
(১) সূরা আন-নূর: (২)।
(২) সহীহ মুসলিম (৩/১৩১৬, হাঃ ১২/১৬৯০)।
(৩) পূর্বোক্ত (৩/১৩২১-১৩২২, হাঃ ২২/১৩৯৫)।
(৪) বুখারী (৪/২৬০, হাঃ ৬৮৩৯), মুসলিম (৩/১৩২৮ হাঃ ৩০/১৭০৩)।
(৫) সূরা আন-নিসা: (২৫)।
(৬) আবু দাউদ (৪/৬০৭-৬০৮, হাঃ ৪৪৬২), তিরমিযি (৪/৪৭ হাঃ ১৪৫৬), ইবনু মাজাহ (২/৮৫৯ হাঃ ২৫৬১)। শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।
(৭) সুবুলুস সালাম (৪/১২৮৪-১২৮৫)।
(১) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযীয়া, আদ-দা ও আদ-দাওয়া, পৃষ্ঠা (২৬৪)।
(২) তাওফীক মুহাম্মাদ ইজ্জুদ্দীন, দালিলুল আনফাস পৃষ্ঠা (৪১০)।
(৩) বুখারী (৪/৩৮৭, হাঃ ৭৪১৬), মুসলিম (২/১১৭৬, হাঃ ১৭/১৪৯৯)
(৪) মুস্তাদরাকে হাকেম (২/২৩৭), তিনি বলেছেন: সনদ সহীহ, শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।
(৫) সূরা আল-আরাফ: (৮০)।
(৬) সূরা আল-আরাফ: ৮৪।
(১) সূরা আন-আম্বিয়া: ৭৪।
(২) সূরা আল-হুদ: ৮২-৮৩।
(৩) সায়্যিদ কুতুব, ফি যিলালীল কুরআন (৪/১৯১৫)।
(৪) আবু আলা মাওদুদী, আল-হিজাব পৃষ্ঠা (১০১-১২)।
(৫) আব্দুর রহমান ওয়াসেল, মুশকিলাতুশ শাবাব পৃষ্ঠা (১৪৮-১৫১)।
(১) তাওফীক মুহাম্মাদ ইজ্জুদ্দীন, দালিলুল আনফাস পৃষ্ঠা (৪০৮-৪০৯)।
(২) পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা (৪০৭)।
(৩) সূরা আন-নূর: ৩।
(৪) আবুল আলা মাওদুদী, তাফসীরে সূরা আন-নূর, পৃষ্ঠা (৮৯)।
(১) সূরা আল- আহযাব: ৫৯।
(২) বুখারী (৪/৭১, হাঃ ৫৮৮৫)।
(৩) মুস্তাদরাকে হাকেম (৪/৩১৪), তিনি বলেছেন: হাদিসের সনদ সহীহ, যাহবী সহমত পোষণ করেছেন।
(১) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযীয়া, ইগাসাতুল লাহফান (১/৫৯-৬১)।
(২) কুরতুবী, আল জামে লি আহকামিল কুরাআন (১২/১৫১)।
(৩) সূরা আন-নূর: ৩১
(৪) সহীহ বুখারী (৪/১৩, হা: ৫৫৯০)।
(৫) দেখুন, সূরা আল-আনকাবূত (২৮-৩৫), সূরা আশ-শুআরা: (১৬০-১৭৫), সূরা হুদ: (৮০-৮৩)।
(৬) দেখুন, সূরা ইউসূফ (২৩-৩৪)।
(৭) মুসনাদে আহমাদ (৬/২৫৬-২৫৭), শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।
(১) বুখারী (৪/১৩৫-১৩৬, হাঃ ৬২২৮)।
(২) সহীহ মুসলিম (৩/১৬৯৯, হাঃ ৪৫/২১৫৯)।
(৩) সুনানে ইবনে মাজাহ (১/২১৭ হাঃ (৬৬১), শাইখ আলবানী হাদিসটি সহীহ বলেছেন।
(৪) আবু দাউদ (৪/৩০৩ হাঃ ৪০১৪), তিরমিযি (৫/১০২ হাঃ ২৭৯৫), আহমাদ (৩/৪৭৮-৪৭৯), শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।
(১) ইবনুল কায়ি‍্যম আল-জাওযীয়া, আদ-দা ও আদ-দাওয়া, পৃষ্ঠা (৩০৬-৩১০)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরাব (৪/৩৭২)।
(২) পূর্বোক্ত (৪/২৫৫)।
(৩) পূর্বোক্ত (৪/২৩২)।
(৪) পূর্বোক্ত (৪/২৩২)।
(৫) আশ-শাওকানী, নাইলুল আওতার (৭/১৩৯)।
(১) আস-সনআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৩১১)।
(২) মাওকিফুল ইসলাম মিনাল খামর, পৃষ্ঠা (২৭)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারিজুস সালেকীন (৩/৩১৯)।
(৪) আল-ইসলাম ওয়া জরুরীয়াতুল হায়াত পৃ: (১১৯)।
(৫) সউদ বিন আব্দুল আজীজ আত- তুরকী, আল আওয়ামেল আল মুওয়াদ্দিয়া।
(১) ইবনুল কায়্যিম, মাদারিজুস সালেকীন (৩/৩২০)।
(২) আল-মুসকেরাত আদরারুহা ওয়া আহাকমুহা, পৃঃ (২২৮)।
(৩) পূর্বোক্ত।
(৪) সউদ বিন আব্দুল আজীজ আত- তুরকী, আল আওয়ামেল আল মুওয়াদ্দিয়া, মাজাল্লা জামেয়াতে ইমাম পৃ: (৪২২-৪২৩)।
(১) সূরা আল-মায়েদাঃ (৯১)।
(২) রসায়েলুল ইসলাহ (২/২৩-২৫)।
(৩) দালিলুল আনফাস বাইনাল কুরআনুল কারীম ওয়াল ইলমুল হাদিস পৃঃ (৪১২)।
(৪) সুনানে আবু দাউদ (৪/৮৭, হাঃ ৩৬৮১), সুনানে তিরমিযি (৪/২৮৫, হাঃ ১৮৬৫), আহমাদ (২/৯১), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
(৫) আত-তাওজীহাতুল ইসলামিয়া লি ইসলাহেল ফারদ ওয়াল মুজতামা, পৃঃ (৪০০)
(৬) মাওকিফুল ইসলাম মিনাল খামর পূঃ (২৫)।
(১) আছারুল মুখাদ্দেরাত ওয়াল মুসকেরাত ওয়াত তাদখীন ফিস সিহহা ওয়াদ দ্বীন পৃঃ (৯২)।
(২) মাওকিফুল ইসলাম মিনাল খামর পৃঃ (৩৪)।
(৩) পূর্বোক্ত পূঃ (৩৫-৩৬)।
(৪) আল-আওয়ামেল আল-মুয়াদ্দিয়া ইলা তায়তিল মুখাদ্দিরাত, পৃঃ (৪২৭)।
(৫) সহীহ মুসলিম (৩/১৫৮৭, হাঃ ७৩/২০০৩)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/২৪৬, হাঃ ৬৭৭৯), সহীহ মুসলিম (৩/১৩৩০, হাঃ ৩৫/১৭০৬)।
(২) সহীহ মুসলিম (৩/১৫৮৭, হাঃ ৭২/২০০২)।
(৩) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) মুসনাদে আহমাদ (১/৪৫২)।
(১) লিসানুল আরাব (২/২১২০)।
(২) সূরা আল-আহযাবঃ (৩২)।
(৩) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৪৯০)।
(১) আল-মুকাদ্দিমা লি ইবনে খালদুন, পৃঃ (১৪৭)।
(২) সহীহ মুসলিম (১/৭৪, হাঃ ৯৫/৫৫)।
(৩) সহীহ মুসলিম (১/৬৯, হাঃ ৭৮-৪৯)।
(৪) সহীহ বুখারী (৩/৩৬১, হাঃ ৫০৯৬), সহীহ মুসলিম (হাঃ ৯৭-৭৪০)।
(১) সূরা আল-আহযাবঃ (৩২-৩৩)।
(২) ফি জিলালীল কুরআন (৫/২৮৫৯)।
(৩) সুনানে তিরমিযি (৫/৯৮-৯৯, হাঃ ২৭৮৬), সুনানে নাসায়ী (৮/১৫৩, হাঃ ৫১২৬), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(৪) সূরা আন-নূর (৩১)।
(৫) সূরা আল-আহযাবঃ (৩৩)।
(১) আল-খুলুকুল কামেল (৪/৪৬৯)।
(১) আল-খুলুকুল কামেল পৃঃ (৪৬৯)।
(২) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৯৬, হাঃ ৫৬-২৫৭৮)।
(৩) সূরা আত-তাগাবুন (১৬)।
(৪) আল-খুলুকুল কামেল পৃঃ (৪৬৯)।
(১) সহীহ বুখারী (৩/৪২৪, হাঃ ৫৩৫২), সহীহ মুসলিম (২/৬৯০-৬৯১, হাঃ ৩৬-৯৯৩)।
(২) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩) সূরা আলে ইমরানঃ (১৮০)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৪৪২)
(৫) সহীহ বুখারী (১/৪৩৩, হাঃ ১৪০৩), সহীহ মুসলিম (২/৬৮৫)।
(৬) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) সহীহ মুসলিম (২/৭০০, হাঃ ৫৭-১০১০)।
(২) সুনানে নাসায়ী (৮/১৯৬, হাঃ ৫২৯৪), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সূরা আন-নিসাঃ (৩৭)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৫০৮)।
(৫) ইকতেযাইস সিরাতাল মুস্তাকীম, পৃঃ (৭)।
(১) সহীহ বুখারী (২/৩২৯-৩৩০, হাঃ ২৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৪/২০৮, হাঃ ৫২-১৭০৬)।
(২) সূরা আল-হাশরঃ (৯)।
(১) আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন পৃঃ (২৩১)।
(২) ফিকহুস সুন্নাহ (২/৪৮৬)।
(৩) সূরা আল-মায়েদাঃ (৩৮)।
(৪) বুখারী (৪/২৪৭, হাঃ ৬৭৮৩), মুসলিম (৩/১৩১৪, হাঃ (৭/১৬৮৭)।
(১) আখলাকুনাল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (১৬২)।
(২) বুখারী (৪/২৪৮-২৪৯, হাঃ ৬৭৮৮), মুসলিম (৩/১৩১৫, হাঃ ৮/১৬৮৮)।
(৩) মুকাফাহাতুস সারেকা ফিল ইসলাম পৃঃ (২১৬)।
(৪) সূরা আল-মায়েদা (৩৮)।
(৫) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৬) মুশকিলাতুশ শাবাব আল জিনসিয়া পৃঃ (৪৬-৪৭)।
(১) লিসানুল আরাব (৬/৩২৩)।
(২) আল-কামুসূল মুহিত (২/২৮১)।
(৩) পূর্বোক্ত (৪/২২০)।
(৪) আল মিসবাহুল মুনির (১/৩১০)।
(৫) আল-কাবায়ের লিয-যাহাবী পৃঃ (১১৯)।
(৬) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃঃ (৩০৭)।
(১) ফাতহুল বারী (১১/৮২)।
(২) সুবুলুস সালাম (৪/১৫৭৯)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/৩৩১, হাঃ ৭১৫১), মুসলিম (৩/১৪৬০, হাঃ ২১-১৪২)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৩/১৪৬০, হাঃ ২১-১৪২)।
(৫) সূরা আল-মুতাফফিফীনঃ (১-৩)।
(৬) সূরা আল-আরাফঃ (৮৫)।
(৭) সহীহ মুসলিম (১/৯৯, হাঃ ১৬৪-১০১)।
(১) সহীহ মুসলিম (১/৯৯, হাঃ ১৬৪-১০২)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৪/৯-১০, হাঃ ৩৫৮০), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) আখলাকুনাল ইজতেমাইয়া পূঃ (১০৭)।
(৪) সুনানে আবু দাউদ (৫/৩৪৫, হাঃ ৫১২৮), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৫) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৬) সূরা ইউসূফঃ (৫৪)।
(১) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃঃ (৩০৭)।
(২) পূর্বোক্ত।
(৩) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৪) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৫) সূরা আল-মুতাফফিফীনঃ (১-৩)।
(১) সূরা আল-আনফালঃ (২৭)।
(২) সূরা ইউসূফঃ (৫২)।
(৩) মুসনাদে আহমাদ (৩/১৩৫, ১৪৫, ২১০, ২৫১)।
(৪) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৫) সূরা আল-বাকারাঃ (৪৫)।
(১) সূরা আল-বাকারাঃ (১৫৫-১৫৭)।
(১) সহীহ বুখারী (১/৩৪, হাঃ ৫২)।
(২) আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন পৃঃ (১১৮)।
(৩) ফাতহুল বারী (১/১৬৬)।
(৪) আদাবুল খুলুক ফিল ইসলাম, পৃঃ (১৫৭)।
(৫) জামেউল উলুম ওয়াল হেকাম, পৃঃ (৩১৮)।
(১) আল- ফাওয়ায়েদ, ইবনুল কায়্যিম, পৃঃ (১৫৭)।
(২) সুবুলুস সালাম (৪/১৫৬৫)।
(৩) জামেউল উলুম ওয়াল হেকাম, পৃঃ (৩০৮)।
(৪) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩০৮)।
(৫) ফাতহুল বারী (১/১৬৬)।
(১) আল-খুলুকুল কামেল (৪/৪২০)।
(২) ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া (১/১১২)।
(৩) সূরা আল-মুতাফফিফীনঃ (২৬)।
(৪) ফাতহুল বারী (১/১৬৭)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/৪১১, হাঃ ৭৫২৮)।
(৬) আল- ফাওয়ায়েদ, ইবনুল কায়্যিম, পৃঃ (১৫৭)।
(৭) সুনানে তিরমিযি (৫/৫৭৪, হাঃ ৩৬৭৫), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(১) জামেউল উলুম ওয়াল হেকাম, পৃঃ (৩০৯)।
(২) আল-আখলাক আল-ইসলামীয়া (১/৭৮৯)।
(৩) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃঃ (২৭০-২৭১)।
(৪) পূর্বোক্ত পূঃ (২৭১)।
(৫) আল-খুলুকুল কামেল (৪/৪২২)।
(১) আল-আখলাকাল কামেল (১/৮০৫)।
(২) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃঃ (২৭৩)।
(৩) আদাবুল খুলুক ফিল ইসলাম (১৫৯)।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/১০৩, হাঃ ৬০৬৪), মুসলিম (৪/১৯৮৫, হাঃ ২৮/২৫৬৩)।
(৫) সুনানে নাসায়ী (৬/১৩, হাঃ ৩১০৯), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৬) সূরা আল-বাকারাঃ (১০৯)।
(১) সুনানে তিরমিযি (৪/৫৭৩, হাঃ ২৫১০), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(২) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃঃ (২৭৩)।
(১) সূরা আর-রাদঃ (১১)।
(২) ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া (১০/১২৫)।
(৩) সূরা আল-বাকারাঃ (১৮৬)।
(১) সূরা আল-বাকারাঃ (১৯৯)।
(২) সূরা আল-হাশরঃ (৯)।
(৩) সূরা ইউসুফঃ (৮)।
(১) ইবনে রজব রচিত জামেউল উলুম ওয়াল হেকাম, পৃঃ (১৩৮)।
(২) আল-খুলুকুল কামেল (১/৩৬৭)।
(৩) আদাবুদ দ্বীন ওয়াদ দুনিয়া পৃঃ (২৫৮)।
(৪) আল-উসুস আন-নাফসিয়া লিননুমু, পৃঃ (২৯৪)।
(৫) আল-খুলুকুল কামেল (৪/৩৮৭)।
(১) ফাওয়ায়েদ ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়া, পৃঃ (১৫৬)।
(২) আদাবুদ দ্বীন ওয়াদ দুনিয়া পৃঃ (২৫২)।
(৩) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/১১০, হাঃ ৬১০০), সহীহ মুসলিম (২/৭৩৯, হাঃ ১৪১-১০৬২)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/১১১)।
(৬) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) সহীহ বুখারী (৪/১১২, হাঃ ৬১১৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১৪, হাঃ ১০৭-২৬০৯)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/৯১২, হাঃ ৬১১৬)।
(৩) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৩৭-১৩৮, হাঃ ৪৭৭৭), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/১১২, হাঃ ৬১১৫)।
(৫) মুসনাদে আহমাদ (৫/১৫২), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) সূরা আলে ইমরানঃ (১৩৪-১৩৫)।
(২) পূর্বে তাখরিজ উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩) সুনানে ইবনে মাজাহ (২/১৪০১, হাঃ ৪১৮৯), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) আন-নিহায়া ফি গারিবীল হাদিস (৩/১৬৩)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/২২৭)।
(৩) সূরা আল-হুজুরাতঃ (১২)।
(৪) সূরা আন-নাজমঃ (২৮)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/১০৩, হাঃ ৬০৬৪)।
(৬) ফাতহুল বারী (১০/৪৮১)।
(১) সহীহ বুখারী (১/৩৪, হাঃ ৫২)।
(২) সূরা আল-হুজুরাতঃ (১২)।
(৩) আল-জামে লি আহকামিল কুরআন (১৬/২১৭)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/২২৭)।
(১) আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন পৃঃ (৪২১)।
(২) সহীহ মুসলিম (১/৯৩, হাঃ ১৪৭/৯১)।
(৩) শরহু সহীহ মুসলিম লিন নববী (২/৯০)।
(৪) আল-খুলুকুল কামেল (৪/৩৭৮)।
(৫) শরহু সহীহ মুসলিম লিন নববী (২/৯১)।
(১) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন পৃঃ (২৩৯)।
(২) আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার, পৃঃ (৭৬)।
(৩) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৭৬)।
(৪) আল-আখলাকুল কে ইসলামিয়া ওয়া উসুসুহা (১/৭১৮)।
(৫) পূর্বোক্ত।
(৬) আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন পৃঃ (২৩৯)।
(৭) সূরা আল-বাকারাঃ

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 চারিত্রিক বিচ্যুতির কারণসমূহ

📄 চারিত্রিক বিচ্যুতির কারণসমূহ


প্রকৃতি ও পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে চারিত্রিক বিচ্যুতিসমূহও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। ব্যক্তি ও সমাজের উপর তার বিপদ ও ক্ষতির ভিত্তিতে এর প্রভাব কম বেশি হয়ে থাকে। অপর দিক থেকে সমাজের ভিন্নতার কারণেও চারিত্রিক বিচ্যুতির ভিন্নতা হয়ে থাকে; বিচ্যুতির উপকরণসমূহের শক্তির তারতম্যে কারণে। যেমন দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের দূর্বলতা, বিচ্যুত আক্বীদা, সামাজিক প্রতিপালন, অর্থনৈতিক অবস্থা, সাংস্কৃতি স্নায়ু যুদ্ধের প্রভাব, লালন-পালনের ধরণ ইত্যাদি অন্যান্য উপকরণসমূহ। যখন এগুলোর নেতিবাচক প্রভাব বেড়ে যায় তখন বিচ্যুতির পরিমাণও বৃদ্ধি পায় এবং তা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে।

মানুষের চারিত্রিক বিচ্যুতির কারণ হিসেবে কোন একটি নির্দিষ্ট কারণকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তবে এ কারণগুলো তার প্রভাবের শক্তি বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট কারণগুলোর প্রতিরোধ বা গুরুত্বারোপ জীবনের কোন একটি নির্দিষ্ট দিকের উপর ভিত্তি করে সম্ভব নয়। কেননা বিচ্যুতির কারণসমূহ ভিন্ন ভিন্ন, উদাহরণস্বরূপ সন্তানের উপর পিতার ইতিবাচক বা নেতিবাচক আচরণের প্রভাব রয়েছে। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রতিটি নবজাতকই জন্মলাভ করে ফিতরাতের উপর। এরপর তা মা-বাপ তাকে ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে।) অনুরূপভাবে বন্ধুর উপর বন্ধুর প্রভাব রয়েছে, যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।)

কাজেই বিচ্যুতির ঘটনাটি অবশ্যই একাধিক কারণের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরী হতে হবে এবং বিচ্যুতির ঘটনাটি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। যেন এটি একটি আক্বীদাগত, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং পরিপালনগত ইত্যাদি সমস্যার সাথে সম্পর্কিত সকল কিছু নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়। সুতরাং চারিত্রিক বিচ্যুতির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কারণগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা আবশ্যক। কেননা মূল কারণ জানা গেলে চিকিৎসা দেয়া ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হয়।

এই পরিচ্ছেদে আমরা যে কারণগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করব সেগুলো হল:
১- দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাব।
২- মনস্তাত্ত্বিক অসঙ্গতি।
৩- আর্থিক কারণসমূহ।
৪- সামাজিক পরিবেশ।

প্রথমতঃ দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাবঃ
নিঃসন্দেহে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাব চারিত্রিক বিচ্যুতির অন্যতম ও প্রধান কারণ। কেননা এ অবস্থায় মানুষ হঠাৎ মৃত্যু বা কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। সুতরাং সেই দিনের উপভোগে তার চিন্তা নিবন্ধিত যা প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণে, ভোগের গণ্ডিতে এবং বিচ্যুতির স্রোতের অধীনে; যা তাকে ডানে বামে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাইতো তার নিকট ভাল-মন্দ একাকার হয়ে গেছে। আর তার চাহিদের স্রোত যেদিকে প্রবাহিত করে সে সেই প্রবাহের অধীন। ফলে তা তাকে খারাপের দিকে নিয়ে যায়। ফলস্বরূপ তার মাঝে উদাসীনতা, মন্দ চিন্তা ও বিকৃত আচরণের প্রাদুর্ভাব ঘটে। যা তার জন্য বিচ্যুত আচরণ করা ও তার দিকে অগ্রসর হওয়াকে সহজ করে দেয়। নিচের পয়েন্টগুলো থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবেঃ

বিচ্যুতি ও উদাসীনতাঃ
উদাসীনতা হল: অসতর্কতার দরুণ মানুষের মাঝে যে অন্যমনস্কের সৃষ্টি হয়। যখন মানুষের এরূপ অবস্থা হয় তখন তার মাঝে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়। আর মানুষের নিকট যখন দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায় তখন তার ইন্দ্রীয়গুলোকে মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য তথা ভাল কাজ, সত্য শ্রবণ, জ্ঞানার্জন ও সতর্কতায় ব্যবহারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সে চতুষ্পদ জন্তুর মত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ﴿ [আর আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।] মহান আল্লাহ আরো বলেন: ﴾وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْرَمَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ * يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ﴿ [এটা আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যাতিক্রম করেন না, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, আর তারা আখিরাত সম্বন্ধে গাফিল।] অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার উপার্জন বিষয়ক জ্ঞান আছে। কাজেই তারা তা অর্জনে অধিক মেধাবী কিন্তু দ্বীনি বিষয় এবং পরকালে যা তাদের উপকারে আসবে সে বিষয়ে তারা গাফিল।

সুতরাং এটাই তার পথ ও পন্থা। কেননা শয়তান তার বন্ধু। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ﴿ [আর যে রহমানের যিক্র থেকে বিমুখ হয় আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সে হয় তার সহচর।] অর্থাৎ এই ব্যক্তি যে হেদায়াতের পথ থেকে গাফিল ছিল, আমি তার জন্য শয়তানকে নিযুক্ত করে দিব, যে তাকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জাহান্নামের পথে নিয়ে যাবে।

যে সমস্ত কারণ মানুষকে গাফলতির দিকে নিয়ে যায় তার অন্যতম হল, জায়েয কাজে শিথিলতা ও অধিক পরিমাণে তাতে মগ্ন থাকা। ফলে তা গাফলতির অবির্ভাব ঘটায়, যা অধিক আশাবাদী হওয়ার কারণ। ফলস্বরূপ সে পাপ কাজের দিকে অগ্রসর হয়। এ সকল গাফেলরা তাদের গাফলতির প্রভাবে খারাপ কাজে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয় না। ফলে তাদেরকে দেখবেন যে, তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে, তা উপভোগ করছে ও তাতেই তারা আনন্দিত। আর এ সবগুলোই হয়ে থাকে অন্তরে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের বা একেবারে নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে।

দ্বীন নষ্ট হয় হয়ত বাতিল বিশ্বাস ও সে অনুযায়ী কথা বলার কারণে অথবা বিশ্বাসের বিপরীত আমল করার কারণে। প্রথম ধরণ হল বিদআত, আর দ্বিতীয় ধরণ হল, ফাসেকী আমল। প্রথমটি হয়ে থাকে সন্দেহের কারণে আর দ্বিতীয়টি হয়ে থাকে প্রবৃত্তির কারণে। ইসলামী শিক্ষার ভুমিকা হল ভুল বিশ্বাসের রাস্তাকে বিশুদ্ধ করা যেন মানুষেরা সঠিক আচরণের দিকে ফিরে আসে। কেননা মানুষের অন্তরে একনিষ্ট দ্বীন ও বিশুদ্ধ আকিদা না থাকলে তার অকল্যাণ ও ফাসাদের পরিমাণ ব্যাপক আকার ধারণ করে, ফেতনা বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যবোধ ধ্বংস হয়। ফলে বাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রতারণা ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে কোন সততা, প্রতিশ্রুতিশীলতা, আমানতদারিতা ও লজ্জাবোধ থাকে না। কেননা তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধকে নষ্ট করেছে; আর তা হল আংশিক নয় বরং সম্পূর্ণরূপে এবং শুধু কথায় নয় বরং বাস্তবে আল্লাহর মানহাজকে গ্রহণ করা।

বিচ্যুতি ও অস্থিরতাঃ
মানসিক অস্থিরতা ও দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অভাবের মাঝে জোড়ালো সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি কিছু মানসিক রোগ ব্যক্তির মাঝে চারিত্রিক বিচ্যুতি ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ সাইকোপ্যাথি রোগ। তা এমন অসুস্থ অবস্থা যা পুনরাবৃত্তিমূলক আবেগপ্রবণ আচরণে নিজেকে প্রকাশ করে, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সমাজকে তুচ্ছ মনে করে এবং এর প্রতি শত্রুতা প্রকাশ করে। যেহেতু ভুক্তভোগী নিজেকে নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা বা বঞ্চনা ও হতাশার সম্ভাবনায় ভুগছেন। তাই তিনি দুনিয়াবী আনন্দগুলি স্থগিত করতে অক্ষম, বরং তার চাহিদা এবং উদ্দেশ্যগুলি মেটাতে দ্রুত অগ্রসর হয়।

মানুষের চারিত্রিক বিচ্যুতি সংঘটনকারী এই মানসিক উপসর্গগুলো নিয়ে গবেষণাকারী ব্যক্তি লক্ষ্য করবে যে, এই উপসর্গগুলো মূলত মানসিক প্রশান্তি যা মানুষকে এই প্রভাবগুলো মোকাবেলা করার সুযোগ করে দেয় তার অভাবে সৃষ্ট। আর এটা মানসিক প্রশান্তি ও আস্থার কারণগুলোর সাথে সম্পর্ক কম থাকার কারণে হয়ে থাকে। মূলত যা আল্লাহর প্রতি শক্তিশালী ঈমানের প্রমাণ বহন করে। তাইতো এর পরে সে কোন ক্ষতি ও বিপদের আশঙ্কা করে না। কেননা জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যেখানে মানুষ আল্লাহর অভিমুখী হতে বাধ্য, চায় সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন। বস্তুত জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যা পুরো জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, এ অবস্থায় কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসীগণই স্থির থাকতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴿ [যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।] তিনি আরো বলেন: ﴾فَمَن يُؤْمِن بِرَبِّهِ فَلَا يَخَافُ بَحْسًا وَلَا رَهَقًا﴿ [সুতরাং যে ব্যক্তি তার রবের প্রতি ঈমান আনে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না।]

বিচ্যুতি ও অমূলক কল্পনাঃ
কিছু মানুষের দ্বীনের ব্যাপারে কুধারণা সৃষ্টি হয়েছে, তারা মনে করে যে, দ্বীন হল আমল ব্যতীত শুধু মৌখিক স্বীকৃতি, অথবা দ্বীন আমলের সমষ্টি কিন্তু তা যখন যেভাবে ইচ্ছা আদায় করা যাবে। এদেরকে তাদের ধারণা বিচ্যুতি ও নিম্ন চরিত্রের দিকে নিয়ে যায়। কেননা তারা মনের চারিত্রিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। যদি প্রকৃত ধারণার ক্ষেত্রে তাদের অন্তর ও দৃষ্টি সতর্ক হত এবং তাদের কল্পনা সঠিক হত, তবে অবশ্যই তাদের চরিত্র সংশোধন হত। জাহেলী যুগে নষ্ট চরিত্রের ব্যাপকতা ছিল; যেমন মেয়ে সন্তানকে জীবিত প্রোথিত করা, মদ পান ও যিনা করা। কিন্তু যখন তারা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল এবং মেনে নিল যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই, তখন তাদের এসকল চরিত্র পরিবর্তন হয়ে গেল। ফলে তারা পথ হারানোর পর পথ পেল, অধঃপতনের পর তারা সমুন্নত হল, চরিত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তারা উন্নত চরিত্রের অধিকারী হল, পৃথিবী সংকীর্ণ হওয়ার পর প্রশস্ত হল, তাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেল ও তাদের মধ্য থেকে আমিত্ববাদ দূরীভূত হল। আর যুলুমের স্থল ভ্রাতৃত্বে পরিবর্তিত হল। এই সবগুলোই হয়েছিল তাদের আক্বিদাগত ও ইবাদতগত ধারণা বিশুদ্ধ হওয়ার পর। ফলে তাদের মধ্য থেকে বিচ্যুতি বিদায় নিল এবং সে স্থানে উত্তম চরিত্র আগমন করল।

মাঠ পর্যায়ে গবেষণার আলোকে বিচ্যুতিঃ
মিসরে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সাথে বিচ্যুতির সম্পর্ক কত গভীর। আর চারিত্রিক বিচ্যুতির পিছনে দুর্বল দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যেঃ
১- চুরির অপরাধের সাথে জড়িত বেনামাযির পরিমাণ ৭১.৮%।
২- বেরোযাদার চুরির সাথে জড়িত অপরাধীর পরিমাণ ৫৩.৫%।
৩- আরেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইস্কান্দারিয়ার বিচারালয়ে আগত বিচ্যুত ঘটনাসমূহের সাথে জড়িত সকলেই আক্বিদাকে একটি প্রচলিত ধারণা বলে বিশ্বাস করে এবং তাদের মাঝে একজনকেও পাওয়া যায়নি যে দ্বীনি ফরয বিধানসমূহকে পরিপূর্ণভাবে পালন করে। আর এটাই চারিত্রিক বিচ্যুরিত পিছনে দুর্বল দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের দৃঢ় সম্পর্ককে প্রমাণ করে।

অনুরূপভাবে টেকনোলজিতে আগ্রগামী বিশ্বের সমাজে চিন্তাগত চরম সমস্যা বিদ্যমান। যেমন, বিভিন্ন রূপে ও প্রকারে জাতিগত ও অর্থগত বিবাদ, বিকৃত চিন্তা, নষ্ট চরিত্র এবং অত্যাচার। এ সকল বিচ্যুতিগুলো প্রকাশ পেয়েছে দ্বীনি নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতিতে। আর প্রত্যেক ব্যক্তি এমনভাবে চলাফেরা করে যেন সে নিজেই চারিত্রিক মূল্যবোধের মাপকাঠি।

দ্বিতীয়তঃ মানসিক অসঙ্গতি
নফস বা আত্মা মৌলিক দিক থেকে এক, তবে তার অবস্থাগত দিক থেকে তিন প্রকার: নফসে মুতমাইন্না, নফসে আম্মারা বিস-সু ও নফসে লাওয়ামা। সুতরাং আত্মা যদি আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়, তাঁর যিকিরে প্রশান্তি পায়, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁর সাক্ষাতে আগ্রহী থাকে ও তাঁর নৈকট্য লাভে আনন্দিত হয়, তবে তা নফসে মুতমাইন্না। আর যখন এর বিপরীত হয় তখন তা নফসে আম্মারা বিস-সু; তা এই ব্যক্তিকে প্রবৃত্তি অনুযায়ী খারাপ কর্ম ও বাতিল অনুসরণের আদেশ করে। ফলে তা সকল খারাপের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। তৃতীয় অবস্থা হল নফসে লাওয়ামা, এটা মুমিনের অবস্থা। সে নিজেকে প্রতিটি অবস্থার জন্য তিরস্কার করে ও সকল কাজে ঘাটতি মনে করে। ফলে সে লজ্জিত হয় ও আফসোস করে। পক্ষান্তরে পাপী সামনে অগ্রসর হতেই থাকে নিজেকে কখনো তিরস্কার করে না।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অন্তরের রোগ ও তার নিরাময়ের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং নবী সাঃ এর সুন্নাতেও তা বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ﴿ [তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী।] তিনি আরো বলেন: ﴾فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ﴿ [সুতরাং যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে আপনি তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিলিত হতে দেখবেন এ বলে, আমরা আশংকা করছি যে, কোন বিপদ আমাদের আক্রান্ত করবে।] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴾يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مّিনَ النّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا﴿ [হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর তাহলে পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।] তিনি আরো বলেছেন: ﴾يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِّمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ﴿ [হে মানবসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।] নবী সাঃ বলেছেন: (তারা জানেনা তো জিজ্ঞাসা করল না কেন? কেননা অজ্ঞতার চিকিৎসা হল জিজ্ঞেস করা।)

মানসিক অসঙ্গতিকে অন্তরের রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যা চারিত্রিক বিচ্যুতি ঘটায়। আর তা দুই প্রকারঃ
- অনুভূতি নষ্ট হয়ে যাওয়া।
- স্বাভাবিক চলাচল ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
এর উভয়টির অনুপস্থিতির কারণে কষ্ট ও শান্তি হয়। কেননা আনন্দের কারণ হল সামঞ্জস্যশীলতার অনুভূতি আর কষ্টের কারণ হল অসঙ্গতির অনুভূতি। অন্তরের রোগ দুর্বল দৃষ্টিভঙ্গি ও সংকীর্ণ দিগন্তের দিকে নিয়ে যায়। কেননা মানসিক প্রবৃত্তি ও চাহিদা এবং তার দুনিয়াবী কল্যাণের বৈশিষ্ট্য হল, তা মানুষের দূরদৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয় বা তাকে রাতকানা করে দেয় বা তার উপর কোন ধরণের পর্দা বিস্তার করে দেয়; এর ফলে মানুষ হককে বাতিল ও বাতিলকে হক হিসেবে দেখে, তার বিষয়গুলো গুলিয়ে যায় এবং যেকোন জিনিসের ধারণা তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়। এর এটা পর্দার পুরুত্ব অনুযায়ী হয়ে থাকে। ফলে তার মাঝে মানসিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়; পর্দা যে পরিমাণ তার দূরদৃষ্টিকে আড়াল করে সে অনুসারে।

মানসিক অস্থিরতাঃ
কিছু ব্যক্তি রয়েছে যাদের মাঝে বোধ শক্তির ক্ষেত্রে অস্থিরতা নেই, কিন্তু তাদের খারাপ আচরণ এমন নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত যায়, যে পর্যন্ত অস্থির বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিরা যেতে পারে না। তাদের কাউকে দেখা যায় এমন কিছু আচরণের সাথে জড়িত যা সঠিক চরিত্র ও বিশুদ্ধ স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরণের বিচ্যুত আচরণের অন্তর্গত হল, মাদক গ্রহণ ও তা প্রসার করা, সমকামিতা ইত্যাদি বিচ্যুত আচরণসমূহ। যার লক্ষণ হল, বিপদের সময়ে ভয়, অস্থিরতা, খাবার গ্রহণ থেকে দূরে থাকা ও ক্ষুধা মন্দা, চরম লজ্জাশীলতা, দ্রুত রাগান্বিত হওয়া, আনুগত্য না করা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা, দ্রুত বিভ্রান্ত হওয়া, কঠিন অভিমান, আক্রমণাত্বক শত্রুতার দিকে অগ্রসর হওয়া, দিবা স্বপ্ন দেখা, মিথ্যা বলা, মাঝে মাঝে চুরি করা ইত্যাদি। যেহেতু এসকল অস্থিরতার কোন ওষুধ পাওয়া যায় না সেহেতু তাদের চরিত্রের মাঝে বিপদজনক প্রভাব ফেলে।

মানসিক সঙ্গতিঃ
সঙ্গতি বলতে, ব্যক্তির চারপাশের সামাজিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা, যেখানে ব্যক্তি তার চারপাশের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করে নিতে সক্ষম এবং সে পরিবেশ ও সমাজে আপতিত সমস্যাগুলোকে সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে সক্ষম। আর মুসলিম ব্যক্তির ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারিত হবে ইসলামী মানহাজের আলোকে। সুতরাং মানসিক সঙ্গতি হল, একটি চলমান কর্মতৎপরতা যা আচরণ ও সামাজিক পরিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাতে পরিবর্তন পরিমার্জনের মাধ্যমে যেন ব্যক্তি ও পরিবেশের মাঝে ইসলামী মূলনীতির আলোকে ভারসাম্য তৈরী হয়।

সুতরাং ইতিবাচক মানসিক সঙ্গতি ব্যক্তি, সমাজ ও কর্মের মাঝে সামঞ্জস্যতার দাবী রাখে। যাতে ব্যক্তি উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অনুভব করে যা তাকে নিজ ব্যক্তিত্ব, সমাজ ও পেশা সম্পর্কে প্রশান্তি দেবে। ব্যক্তি যখন সঠিক পদ্ধতিতে এই তিনটি দিক তথা নিজ সত্ত্বা, সমাজ ও পেশার মাঝে সমন্বয় করতে পারে না তখন সে পরোক্ষ মাধ্যমে তা প্রকাশের চেষ্টা করে। সে নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে করে যে তা তাকে উচ্চমানের সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি এনে দিবে। এই পরোক্ষ মাধ্যমগুলোকে মানসিক আচরণ বিশেষজ্ঞরা (মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা কৌশল) বলে অভিহিত করেন। তা হল কতগুলো মাধ্যম ও উপকরণের সমষ্টি যা একজন ব্যক্তি বাস্তবায়ন করে। এগুলোর কাজ হল হাকিকতকে বিকৃত করা এবং কতগুলো যুক্তি দাঁড় করানো যেন ব্যক্তি অধঃপতন ও সংঘাত হতে সৃষ্ট অস্থিরতা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পায়; যা তার মনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। এর লক্ষ্য হল, নিজেকে রক্ষা করা, তার পক্ষ হতে প্রতিহত করা, মনের বিশ্বাসকে সংরক্ষণ করা, আত্মসম্মানবোধ রক্ষা করা ও মনের প্রশান্তি বাস্তবায়ন করা। পরবর্তীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, মানুষের নিকট হয়ত ইতিবাচক মানসিক সঙ্গতি অথবা অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক নেতিবাচক মানসিক সঙ্গতি রয়েছে। কেননা মানুষ যখন কোন সমস্যা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুভব করে, যেমন চাহিদা পূরণে অর্থের প্রয়োজনীয়তা তখন সে বুঝতে পার যে, এটা অর্জনের একমাত্র পথ হল, পরিশ্রম, ধৈর্যধারণ ও একটা ভাল মানের আয়ের উৎস। তাই সে সঞ্চয় করতে থাকে যাতে তার নিকট প্রয়োজীয় পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত হয়। কিন্তু যখন এটা পূর্ণ করতে পারে না, তখন সে আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। আর এটা তার চোখের সামনেই রাখে এ আশায় যে, আল্লাহ হয়ত কোন সুযোগ নিয়ে আসবেন। তাই সে এটা বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। এই ধরণের ব্যক্তির নিকট গ্রহণযোগ্য সঙ্গতি রয়েছে। কেননা তখনই এটা গ্রহণযোগ্য সঙ্গতি বলে গণ্য হবে, যখন ব্যক্তি সকল সম্ভবনা ও সাম্ভব্য ফলাফলের আলোকে তার সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। অতঃপর তা বাস্তবায়নের জন্য এমন পদ্ধতি গ্রহণ করবে যা ইসলামী মানহাজের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আর যখন মানুষ স্বীয় ক্ষমতা ও প্রস্তুতি অনুযায়ী তার সমস্যাগুলোর যথাপোযুক্ত সমাধান করতে অপারগ হবে, তখন সে কতগুলো (প্রতিরক্ষামূলক কৌশল) পদ্ধতি অবলম্বনের দিকে যাবে; যা এক ধরণের বাস্তবতাকে বিকৃত করা। মানুষ এগুলো করে থাকে নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যগুলো সাধনের লক্ষ্যেঃ
- ব্যক্তি তার অস্থিরতা অবস্থা ও তদসংশ্লিষ্ট পাপের অনুভূতি থেকে বেঁচে থাকবে।
- ব্যক্তি তার স্বীয় ব্যক্তিত্বকে রক্ষা করবে।
- প্রতিরক্ষা কৌশলের আড়ালে সে তার প্রবৃত্তি ও ভোগকে বাস্তবায়ন করবে।

প্রতিরক্ষা কৌশলসমূহঃ
তা হল ব্যক্তির প্রবঞ্চনার পথের আশ্রয় নেয়া যখন সে এমন বিপদের সম্মুখীন হয় যা সমাধান করার ক্ষমতা নেই, অথবা সে নিজে ভুল পথে চলে বুঝতে পেরে নিজেকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রবঞ্চনাকর দায়মুক্তির আশ্রয় নিবে। প্রতিরক্ষা কৌশলসমূহ নিম্নরূপঃ
যখন মানুষ অনুভব করবে যে, তার কাজটি আবশ্যকীয় কর্মের বিপরীত, তখন সে তার বিকৃত আচরণকে দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করবে কতগুলো খোড়া যুক্তির মাধ্যমে। এই যুক্তিগুলো নিম্নরূপঃ
১- যৌক্তিকতা অনুসন্ধানঃ যখন মানুষ তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিফল হবে, বা ওয়াজীব আদায় করতে ত্রুটি করবে, অথবা ভাল চরিত্রের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গিয়ে খারাপ আচরণ করবে, তখন সে তার এই আচরণকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য কতগুলো দুর্বল ওযর অনুসন্ধানের চেষ্টা করবে। যেন তার থেকে অভ্যন্তরীণ বা সামাজিক তিরস্কার দূরীভূত হয়। সুতরাং তা এমন কৌশল যা ব্যক্তি তার খারাপ আচরণকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য পেশ করে। উদাহরণস্বরূপঃ বেতন রয়েছে এমন কাজে যে ব্যক্তি তার নির্ধারিত পুরো সময় দেয়, আর মনে মনে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, অফিস তার ও তার সহকর্মীদের মাঝ ইনসাফ করেনি, অথবা কাজের তুলনায় বেতন কম বা তার অধিকাংশ সহকর্মীগণ তার চেয়ে কম পরিশ্রম করে ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের যুক্তি যা সে তার মনে প্রাশান্তি দেয়ার জন্য অনুসন্ধান করে থাকে।
২- অন্যের উপর দায় চাপানোঃ এর অর্থ হল, তার নিজের মনের মাঝে বিদ্যমান অনাকাঙ্খিত গুণাবলীকে অন্যের উপর চাপানো, সেটাকে বিরাট করে প্রকাশ করার পরে। সুতরাং মানুষ যখন কোন কাজ করে, অতঃপর বুঝতে পারে যে, এটি উত্তম চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক তখন তা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। অথবা যখন কোন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়, তখন তার কারণটা অন্যের উপর চাপায়। যেমন একজন ছাত্র বলল যে কঠিন প্রশ্নই আমার ফেল করার কারণ। বা কোন ব্যক্তি বলল যে, প্রয়োজনই এটা করতে বা পরিত্যাগে বাধ্য করেছে। অথবা অমুক ব্যক্তি আমার নিকট এটাকে সুশোভিত করেছে বা আমাকে ধোঁকা দিয়েছে।
৩- অন্যের রূপ ধারণঃ এটা অন্যের উপর দায় চাপানো বিপরীত। কেননা এই অবস্থায় ব্যক্তি অন্যের মাঝ বিদ্যমান ভাল গুণগুলোকে নিজের বলে প্রচার করে। সুতরাং সে নিজের জন্য অন্যের মাঝে বিদ্যমান ভাল বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধার করে। আর নিজেকে অন্য ব্যক্তির আকৃতিতে প্রকাশ করে যার মাঝে ঐ বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান। অথবা ব্যক্তি নিজেকে অন্য ব্যক্তি বা দলের সাথে মিলিয়ে ফেলে যাদের মাঝে আকর্ষণীয় গুণ রয়েছে, অথচ সে গুণ তার মাঝে নেই। অন্যের আকৃতি ধারণ করা তা যেকোন ভাবেই হোক না কেন, একটি ভুল পদ্ধতি ও মানসিক অসঙ্গতির খারাপ উদাহরণ। তা কয়েকটি উদাহরণ হতে স্পষ্ট হয়, যেমন কোন সমস্যায় পড়লে যেকোন সরকারী ব্যক্তির রূপ ধারণ করা, বা আলেম না হয়েও আলেমের রূপ ধারণ করা অথবা কোন দলের নেতার রূপ ধারণ করবে অথচ সে তার উপযুক্ত নয়।
৪- নেতিবাচক মনোভাবঃ তা হল প্রতিরোধমূলক কর্ম সাধন। তা হা-বোধক বা না-বোধক হতে পারে। তখনই হা-বোধক হবে যখন সে তার থেকে প্রত্যাশিত বিষয়ের বিপরীত কর্ম করে। আর না-বোধক হবে যখন সে প্রত্যাশিত কর্ম করা থেকে বিরত থাকে। সুতরাং তা দায়িত্ববোধ ও চাপের প্রতিরোধ যখন কোন ব্যক্তি প্রত্যাশার বিপরীত কর্ম করে, বা তা করা থেকে বিরত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, চুপ থাকা, প্রতিরোধ করা, বিরোধিতা করা, তর্ক করা, বিদ্রোহ করা, একগুঁয়েমি করা ও প্রত্যাখ্যান করা। কাজেই আপনি যখন এরূপ ব্যক্তির কাছ থেকে সুপারিশ চাইবেন অন্য ব্যক্তির নিকট থেকে কিছু অর্থ ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে, তখন সে মধ্যস্থতা করা থেকে বিরত থাকবে। এটা হল না-বোধক কর্ম। আর যদি সে ঋণদাতার নিকট ঋণ গ্রহীতার অবস্থানকে বিনষ্ট করতে চেষ্টা করে ও ঋণ প্রদান না করতে উৎসাহিত করে তবে সে দাবির বিপরীত কর্ম করল। মধ্যস্থতাকারী এই দুই ধরণের আচরণই তার মানসিক রোগের প্রমাণ বহন করে। এর কারণ হতে পারে সে ঋণগ্রহীতাকে অপছন্দ করে, বা তার সাথে হিংসা করে ইত্যাদি বিকৃত আচরণ।
৫- শত্রুতাঃ প্রতিরক্ষামূলক কৌশল কোন কোন সময় শত্রুতার রূপ ধারণ করে। আর তা হল কোন ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে আক্রমণ করা, যার মাধ্যমে ব্যক্তি যুক্তি পেশ করবে যে, ঐটা-ই মূল ঘটনার অনুঘটক এবং তার অক্ষমতার জন্য সে-ই দায়ী। এ ধরণের কৌশলগুলো ষড়যন্ত্র, নিন্দা, অবজ্ঞা বা বিদ্রূপ আকারে প্রকাশ পায়। এ সবগুলোই চারিত্রিক বিচ্যুতির রূপ, যার কোন গ্রহণযোগ্য যৌক্তিকতা নেই।
৬- পশ্চাৎপদতাঃ সাফল্যহীন আচরণ ও সঙ্গতি হতে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া যায়। বিশেষত মানুষ যখন এমন সমস্যার সম্মুখীন হয় যা সে মোকাবেলা করতে পারে না। যেমন প্রাপ্ত বয়স্ক লোক যখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের পথে চলে। তখন সে নিম্ন স্তরের দিকে ফিরে যায় প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে।

এ থেকে স্পষ্ট হল যে, মানুষ যখন তার ক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য করতে পারে না, তখন তার প্রয়োজন পূরণের জন্য বিকৃত ধরণের বিচ্যুত চরিত্রের দিকে অগ্রসর হয়। এ ক্ষেত্রে সে সহযোগিতা নেয় এমন সব প্রতিরক্ষা কৌশল ও যুক্তির, যার ছায়ার নিচে সে তার প্রবৃত্তি ও ভোগ চরিতার্থ করতে পারবে।

প্রতিরক্ষা কৌশলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ
ক- ব্যক্তির মনের ব্যাথা থেকে বেঁচে থাকা; নফসে লাওয়ামার প্রভাবের ফলস্বরূপ।
খ- অন্যদের সমালোচনা বা সম্ভাব্য সমালোচনা থেকে মুক্তি পাওয়া।
গ- মনের ব্যাথা থেকে রক্ষা পাওয়া যা একজন ব্যক্তি ব্যর্থতার কারণে বা সাফল্যহীন হওয়ার কারণে অনুভব করে।

প্রতিরক্ষা কৌশল বিদ্যমান থাকার কারণসমূহঃ
১. মানসিক যন্ত্রণাকে লুকিয়ে রাখা, বিকল্প প্রকাশের মাধ্যমে যা তার মনের মাঝে প্রবেশ করে। আর এটাই হল প্রতিরক্ষা কৌশল।
২. বাস্তবতা থেকে পলায়ন করা; তা মোকাবেলা করার ক্ষমতা না থাকার কারণে।
৩. ভুল ও নিষ্ফলতা মোকাবেলায় সহযোগিতাকারী সঠিক পূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ব্যর্থতা এবং পূর্বে এ ধরণের পরিস্থিতিতে পড়া থেকে বিরত থাকা।
৪. এটা পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সঠিক শিক্ষার অভাবের কারণে হয়ে থাকে।

দীর্ঘস্থায়ীভাবে প্রতিরক্ষা কৌশল প্রয়োগের ভয়াবহতাঃ
যদিও প্রতিরক্ষা কৌশল মনের অভ্যন্তরের কষ্টকে লাঘব করে; যা তাকে পর্যুদস্ত করে ও পীড়িত করে। তবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে তা প্রয়োগ ব্যক্তিকে ব্যর্থ, মিথ্যাবাদী ও অন্যদের মোকাবেলা করতে অক্ষম করে তোলে।

মানসিক অসঙ্গতির কারণসূহঃ মানসিক অসঙ্গতি যা তার মাঝে অস্থিরতা ও চারিত্রিক বিচ্যুতি নিয়ে আসে তার অন্যতম কারণ হল: উচ্চাকাঙ্খা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরশীলতা, অধিক পরিমাণে খাওয়া ইত্যাদি। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলঃ
১- আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরশীলতাঃ ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: সবচেয়ে লাঞ্ছিত মানুষ সে-ই ব্যক্তি যে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভর করে। কেননা এর কারণে তার যে সফলতা ও কল্যাণ হাতছাড়া হয়ে যায় তার পরিমাণ যা কিছু অর্জিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। আর সে ধ্বংস ও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ ব্যক্তির উদাহরণ হল মাকড়সার ঘর দ্বারা গরম ও ঠান্ডা থেকে আত্মরক্ষাকারীর ন্যায়। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরতার অরেকটি দিক হল, ইবাদত আদায়ে ত্রুটি করে অর্থের প্রতি ভালবাসা ও তা অর্জনের চেষ্টায় লেগে থাকা। অথবা মানুষ গণক, জাদুকর ও দাজ্জালদের কথার উপর নির্ভর করবে। এসকল কাজ মানসিক অস্থিরতার কারণ।
২- আকাঙ্খা করা ও তুষ্ট না হওয়াঃ মানব মনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, মালিকানার প্রতি ভালবাসা। এই বৈশিষ্ট্যের ফলস্বরূপ তার মাঝে উচ্চাকাঙ্খার বিষয়টি প্রকাশ পায়। যেহেতু মানুষ তার আশার কল্পনাকে অঙ্কন করে যদিও তা দুর্বল বিষয় হোক না কেন; সে ঐ পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম নয় আল্লাহ প্রদত্ত তার স্বাভাবিক ও সীমাবন্ধ ক্ষমতা দ্বারা, বিশেষ করে তার আকাঙ্খা যদি এমন হয় যা অর্জন করা দূরূহ। সে আশা করে বিশাল অট্রালিকা, সুন্দর বাহন, আরামদায়ক বিছান ও নেতৃত্ব। এমনকি তার আশার কারণে মন্দকে ভাল বলে ও কঠিনকে সহজ বলে মনে হয়। কাজেই মিথ্যা আকাঙ্খা ও বাতিল কল্পনা এর আরোহী কে নিয়ে খেলা করতে থাকে যেমন কুকুর মৃত দেহ নিয়ে খেলা করতে থাকে। আর এটাই প্রত্যক নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য আত্মার অবলম্বন। আর এই কাল্পনিক আকাঙ্খার ফলে বিচ্যুতি, পাপ, ক্লান্তি ও কষ্টে নিপতিত হয়।
৩- অধিক পরিমাণ খাবার গ্রহণঃ একজন ব্যক্তির অপচয় ও ব্যাপক পরিমাণে খাবার গ্রহণ তাকে আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় ও তাকে ব্যস্ত রাখে পেটের চাহিদা পূরণে। আর যখন তা পেয়ে যায় তখন তার ব্যয়পদ্ধতি ও তার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা তাকে ব্যস্ত রাখে। তার উপর প্রবৃত্তির উৎসগুলো, শয়তানের পথগুলো প্রভাব বিস্তার করে। যে শয়তান মানুষের শিরায় রক্তের মত প্রবাহিত হয়। আর যখন শয়তানের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধীনে প্রবৃত্তি উৎসগুলো শক্তিশালী হয় তখন মানুষ ভাল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে খারাপ পথে পরিচালিত হয়; তার অস্থির মনের চাহিদা পূরণের জন্য। বিশেষ করে যখন খাবারের পরিমাণ সংক্রান্ত ইসলামী শিক্ষা অনুপস্থিত থাকে। এ মর্মে রাসূল সাঃ বলেছেন: (মানুষ পেট হতে অধিক নিকৃষ্ট কোন পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে এমন কয়েক গ্রাস খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।)

তৃতীয়তঃ অর্থনৈতিক কারণসমূহ
মানব জীবনের উপর অর্থনীতির একটা বিরাট প্রভাব রয়েছে, তার দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণে এর ভূমিকার কারণে; যেমন খাদ্য, পানীয়, পোষাক, বাসস্থান ইত্যাদি আরো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খরচ। নিঃসন্দেহে ব্যক্তির আচরণে তার আর্থিক সমৃদ্ধি ও ঘাতটির প্রভাব রয়েছে। আর অর্থনীতির প্রভাব শুধুমাত্র যুব সমাজের উপর সীমাবদ্ধ নয়। বরং ছোট শিশুদের উপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে; পরিতৃপ্ত হওয়া বা বঞ্চিত হওয়ার দিক থেকে এবং অবহেলা বা দেখাশুনা ও নিরাপত্তা বা নিরাপত্তাহীনতা দিক থেকে। এই অনুচ্ছেদে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো আলাচনা করা হবে:
ক- বিচ্যুতির সহযোগিতাকারী অর্থনৈতিক কারণসমূহ, তা হল দুইটি কারণ দারিদ্রতা ও প্রাচুর্যতা।
খ- সে সমস্ত প্রভাবক যা দারিদ্রতা ও প্রচুর্যতার সাথে মিলিত হলে তা চারিত্রিক বিচ্যুতির উপর প্রভাব বিস্তার করে।
গ- অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তার প্রভাব। আর মানুষের জন্য কোনটি অধিক কল্যাণকর।

ক- বিচ্যুতির সহযোগিতাকারী অর্থনৈতিক কারণসমূহঃ
প্রথমতঃ প্রাচুর্যতা: প্রাচুর্যতার অর্থ হল নিয়ামতপূর্ণ ও বিলাসী জীবন। দুর্বল দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ, খেল-তামাশা ও অশ্লীলতার প্রসার, দুর্বল চারিত্রিক প্রতিপালনের সাথে অর্থিক প্রাচুর্য ও অধিক পরিমাণ নগদ অর্থের উপস্থিতি বিলাসী ব্যক্তিদেরকে খারাপ চরিত্রের দিক নিয়ে যায়; তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করার জন্য। নিম্নের পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে প্রাচুর্যের বিচ্যুতির বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করা সম্ভবঃ
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: ব্যক্তির নিকট অধিক পরিমাণে নগদ টাকার উপস্থিতি এবং সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে তাতে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত থাকা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ। আর এ কর্মটাই স্বয়ং উন্নত চরিত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া। শিল্প সমাজের বৈশিষ্ট্য হল একদিকে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ ও শিক্ষার উপর প্রভাব, অপর দিকে ব্যক্তি নিজেকে পরিবার থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তা করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে। সেখানে পতিতাবৃত্তি এবং পাপ ও অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ করার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। এই রোগগুলো যে কোন সমাজকে টুকরা টুকরা করে দেয়। কেননা প্রাচুর্যতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানবসমাজের সম্পর্ক নষ্ট করার সবচেয়ে শক্তিশালী ও নোংরা কারণ। প্রবৃত্তির চারণক্ষেত্রে ডুবে থাকা ও লোলুপ স্বভাবকে পরিতৃপ্ত করা আত্মমর্যাদা ও সম্মানবোধের অনুভূতিকে হত্যা করে এবং খারাপ চরিত্রকে তার অধঃপতিত জীবনের নিটক প্রিয় করে তোলে যা তাকে অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। ফলে সে সামাজিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে তার আর্থিক দিক ও উচ্চাভিলাষ পূরণে ব্যস্ত থাকে।
খেল-তামাশার জীবন: অর্থনৈতিক প্রাচুর্যতা অধিকাংশ সময় খেল-তামাশা ও চাহিদা পূরণে সময় নষ্ট করার দিকে নিয়ে যায়; যা দ্বীনি গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য ও আরামদায়ক স্থানের প্রভাবে হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে কিছু পরিবারের নিকট আর্থিক প্রাচুর্যতা ও বিনোদন মাধ্যমের উপস্থিতি অনেক সময় যুব সমাজকে চরিত্র নষ্টকারী হারাম বিনোদন উপভোগের দিকে নিয়ে যায়। ধনাঢ্য নারীদের বিনোদনকে জনৈক লেখক বর্ণনা করেছেন এইভাবে, মা একদল যিয়ারতকারীকে অভ্যর্থনা জানায় যেন তারা তাদের অধিকাংশ সময়কে তাস খেলা, স্বামী-স্ত্রী ও প্রেমিকদের সম্পর্কে বকবকানি করে এবং অর্থ ও জিনিসপত্র নিয়ে আলাপ করে সময় কাটাতে পারে।
মাদকদ্রব্যঃ যে ধনী ব্যক্তি ইসলামী শিক্ষার উপর গড়ে উঠেনি সে তার সম্পদ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে ব্যয় করে যদিও তা হারাম হয় না কেন। যেমন মাদক ও এ জাতীয় বস্তু। কাতারের অপরাধ বিশ্লেষণ অধিদপ্তর উপসাগরীয় দেশসমূহের মাদক গ্রহণ বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করে যাতে প্রমাণিত হয় যে, এর কারণ হল উপসাগরীয় দেশসমূহের আর্থিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যতা।
অহঙ্কার-অহমিকা: যে ব্যক্তি অর্থের সঠিক ব্যয় জানেনা তার নিকট অধিক পরিমাণ অর্থের উপস্থিতি তাকে হক থেকে বিচ্যুত করে দেয়। কেননা সে চিন্তা করে যে, সে এমন কিছুর মালিক যা অন্যরা খুজে ফিরছে। তাই অনেক সময় তা বাতিল পন্থায় ব্যয় করে, ফলে সে নিজে ও অন্যকে ইসলামী চরিত্র থেকে ভ্রষ্ট করে দেয়। সে এ সম্পদের মাধ্যমে কিছু মানুষকে অপদস্থ করে, তাদের উপর গর্ব করে এবং কল্যাণের পথের দায়ীদের সাথে শত্রুতা করে। কেননা অপচয়কারীরা সংশোধনকারী ও কল্যাণকামীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত থেকে পলায়ন করে ও তাতে বাধা দেয় এবং মানুষদেরকে এ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। রাসূলগণের দাওয়াত ও তাদের বাস্তব আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে, যা তারা পরিত্যাগ করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ كَافِرُونَ﴿ [আর আমি যে জনপদেই সতর্ককারী প্রেরণ করলেই সেখানকার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ আমরা তার সাথে কুফরী করি।] কারুন যাকে আল্লাহ তায়ালা এত ধনভান্ডার দান করেছিলেন যে, তার চাবি বহন করতে একদল শক্তিশালী লোক লাগত। যখন তাকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা এই সম্পদ দিয়ে আখেরাত অনুসন্ধান করতে ও দুনিয়ায় তার অংশ ভুলে না যেতে আহবান জানাল, তখন সে বলল আল্লাহ তাকে এই সম্পদ দিয়েছেন কারণ আল্লাহ জানেন যে, আমিই এর হকদার। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ * قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِندِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِن قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْتَلُ عَن ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ﴿ [আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং যমীনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না। সে বলল, এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে পেয়েছি। সে কি জানত না আল্লাহ তার আগে ধ্বংস করেছেন বহু প্রজন্মকে, যারা তার চেয়ে শক্তিতে ছিল প্রবল, জনসংখ্যায় ছিল বেশী? আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না।]

প্রাচুর্যতা ও যুলুমঃ আল্লাহর সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তির নিকট আনন্দের সময়ে সম্পদ থাকলে সে অনেক সময় তা বান্দাদের উপর যুলুম করার জন্য ব্যয় করে। এর মাধ্যমে সে উত্তম চরিত্র থেকে নিকৃষ্ট চরিত্রের দিকে যায়। কেননা প্রাচুর্যতা ও যুলুমের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যুলুম প্রাচুর্যের সাথেই থাকে এবং প্রাচুর্যতা যুলুমের অন্যতম কারণ। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّনْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ﴿ [অতঃপর তোমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের লোকসমূহ এমন প্রজ্ঞাবান কেন হয়নি, যারা যমীনে ফাসাদ করা থেকে নিষেধ করত? অল্প সংখ্যক ছাড়া, যাদেরকে আমি তাদের মধ্য থেকে নাজাত দিয়েছিলাম। আর যারা যুলম করেছে, তারা বিলাসিতার পেছনে পড়ে ছিল এবং তারা ছিল অপরাধী।]

দ্বিতীয়ত: দারিদ্রতাঃ
ফকির বলা হয়: যার কিছুই নেই বা তার ও তার অধীনস্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অর্ধেকের কম পরিমাণের মালিক। আর মিসকিন বলা হয়: যে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় জিনিসের অর্ধেক বা অধিকাংশের মালিক কিন্তু তার নিকট পর্যাপ্ত পরিমাণ নেই। অর্থাৎ তাদের উভয়েরই অতিরিক্ত আর্থিক উৎসের প্রয়োজন। আর নিঃসন্দেহে মানুষের আচরণের উপর দারিদ্রতার প্রভাব রয়েছে যদি তার মাঝে ঈমান ও সঠিক চরিত্র না থাকে। কেননা অনেক সময় বঞ্চিত দরিদ্রকে তার কষ্ট ও বঞ্চনা এমন আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে যা উত্তম ও সম্মানিত চরিত্রবানরা পছন্দ করে না- বিশেষ করে যদি তার প্রতিবেশীরা নিয়ামতপ্রাপ্ত বিত্তশালী হয়। রাসূল সাঃ দারিদ্রতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন, হাদিসে এসেছে, তিনি বলেছেন: (اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ) (হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কুফরী, দরিদ্রতা ও কবর 'আযাব হতে আশ্রয় চাই।) তিনি আরো বলেছেন: (اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ) (হে আল্লাহ! আমি দরিদ্রতা হতে, তোমার কম অনুকম্পা ও অসম্মানী হতে এবং আমি কারো প্রতি জুলুম করা হতে বা নিজে অত্যাচারিত হওয়া থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) অনুরূপভাবে দারিদ্রতা ব্যক্তিকে ঋণগ্রস্থতার দিকে নিয়ে যায়, আর ঋণগ্রস্থতা মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিকে অগ্রসর করে। রাসূল সাঃ এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলতেন, (اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ) (হে আল্লাহ্! গুনাহ্ ও ঋণগ্রস্থতা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই। তখন এক ব্যাক্তি তাঁকে বলল, আপনি কতই না ঋণগ্রস্থতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যখন কোন ব্যাক্তি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে তখন কথা বলার সময় মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।)

নিশ্চয় ব্যক্তির আচরণ ও তার জীবনধারায় নগদ অর্থ প্রবাহের ঘাটতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে; যেহেতু তার প্রভাব শিক্ষা, জীবিকা ও স্বাস্থ্যের উপর প্রকাশ পায়। আর এটা আচরণের ধরণ ও তার বিচ্যুতির উপর প্রভাব ফেলে। নিচের পয়েন্টগুলোতে এটা আরো স্পষ্ট হবেঃ
দারিদ্রতা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে এর প্রভাবঃ শিক্ষার উপর দারিদ্রতার প্রভার রয়েছে। সুতরাং অল্প উপার্জন পিতা বা পরিবারকে বাধ্য করে অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে কাটাতে; পরিবারের প্রয়োজনের অনুসন্ধান করতে। ফলে সে সন্তানদের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। সে তাদেরকে সমাজের বিচ্যুতির প্রভাবকের সামনে ছেড়ে দেয়। অনুরূপভাবে অতি দারিদ্রতা পিতাকে রুক্ষ মেজাজী ও দ্রুত রাগান্বিত করে তোলে। যার ফলে সে রূঢ় ও কঠোর স্বভাবের হয়। আবার অনেক সময় সে জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে সন্তানদের সহযোগিতা নেয় যা তাদের শিক্ষার সুযোগকে নষ্ট করে বা তাদের পড়া লেখার সময় কমিয়ে দেয়। অনুরূপভাবে বাড়িও পড়ালেখার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। এ সকল অবস্থা পারিবারিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে, মূর্খতার দ্বারকে উন্মুক্ত করে এবং বিচ্যুতির জানালাকে খোলা রাখে; যা সন্তানদেরকে চারিত্রিক বিচ্যুতির সম্মুখীন করে।
দারিদ্রতা ও বেকারত্বঃ কিছু সমাজে ব্যাপকহারে বেকরাত্ব বিদ্যমান। আর এটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থার বিরুপ প্রভাব বিস্তার করে। শিল্পোন্নত দেশসমূহে কর্মজীবিদের খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা ও বেকারত্বের হার বৃদ্ধি গৃহহীন হওয়া, বিভ্রান্তি ও ভিক্ষাবৃত্তির অপরাধের হার বৃদ্ধি করছে, অনুরূপভাবে অশ্লীলতা ও যৌন অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এগুলো অনেক সময় পারিবারিক দারিদ্রতা ও আবশ্যকীয় প্রয়োজন পূরণের আশার কারণে হয়ে থাকে। ফলে পরিবার বিচ্যুতির কারণে শরীয়ত বহির্ভূত পন্থায় উপার্জনের দিকে যায়। আবার অনেকে মনে করেন যে, দারিদ্রতা, অনির্দিষ্ট জীবিকা ও কষ্টসাধ্য কাজ মাদক গ্রহণ ও তা বিক্রয় প্রসারে সাহায্য করে; বেকারত্বের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ঘাতটি পূরণে মাধ্যম হিসেবে। পরিবারের কর্তা ও কিশোর অপরাধের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তি এই যে, পরিবার প্রধানের বেকারত্ব তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত অর্থনৈতিক অবস্থা যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে তার দায়িত্বের ত্রুটি; এর ফলে পরিবার তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ত্রুটির সম্মুখীন হয়। আবার অনেক সময় পিতা ও পরিবারের কর্তার বেকারত্ব মা ও সন্তানদেরকে রিযিকের উৎস অনুসন্ধানে বাধ্য করে। এই অবস্থাগুলো অনেক সময় বিচ্যুতি ঘটার দিকে নিয়ে যায়।
দারিদ্রতা ও শিশু-কিশোরঃ স্বল্প আয় বা একেবারেই আয় না থাকা, পিতা কর্তৃক কিশোর সন্তানদেরকে অতি অল্প বয়সে কাজ করাতে উৎসাহিত করে। যদিও কিছু কিছু কাজে জড়িত হওয়া যেমন কফিশপ বা বিনোদন কেন্দ্রে কাজ করা কিশোরদেরকে অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। কিছু কিছু গবেষণা প্রমাণ করেছে, যে সমস্ত কিশোররা কাজ করে তাদের মাঝে অপরাধের প্রবণতা যারা কাজ করে না তাদের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে দশগুণ পর্যন্ত বেশি। অনুরূপভাবে কিশোরদের অল্প বয়সে কর্মে জড়িত হওয়া প্রাপ্ত বয়স্ক বিচ্যুতদের থেকে তাদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা নিয়ে আসে; কিশোরদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরিপক্কতা না থাকার ফলে।
দারিদ্রতা ও তোষামোদঃ তীব্র দারিদ্রতা অনেক সময় বিচ্যুত ব্যক্তিকে কর্ম সম্পাদনের বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণের দিকে নিয়ে যায়। অনুরূপভাবে তাকে লেনদেনে তোষামোদি ও চাটুকারিতার দিকে নিয়ে যায়। এই দিকে ইঙ্গিত করে ইবনুল জাওযী রহঃ বলেনঃ আমরা এমন কিছু লোকদের দেখেছি, যারা শাসকদের নিকট থেকে কিছু পাওয়ার জন্য তাদেরকে ধোঁকা দেয়। কেউ তাদের তোষামোদি করে, কেউ বা নাজায়েয পর্যায়ের প্রশংসা করে আবার কেউ বা খারাপ কাজ দেখে চুপ থাকে ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের চাটুকারিতা করে দারিদ্রতার কারণে।
দারিদ্রতা ও সুস্থ্যতাঃ দারিদ্রতা শারিরিক সুস্থ্যতার জন্য বিপদজনক যেহেতু এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে অখাদ্য ও খারাপ বাসস্থান। তা মানসিক সুস্থ্যতার জন্যও বিপদজনক কেননা এর কারণে অস্থিরতা, অসন্তোষ, উদ্বেগ ও বিরক্তির অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়। দারিদ্রতার সাথে অ্যানিমিয়া, যক্ষা ও হাড়ের রিকেটস রোগ ইত্যাদি জটিল রোগের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আর এটা খাবার ও ঔষুধের মূল্য জোগাড় করার জন্য বিচ্যুত আচরণ ভিক্ষা বৃত্তির দিকে নিয়ে যায়।

খ- বিচ্যুতির অর্থনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে সহযোগী কারণসমূহঃ
এই প্রভাবকের ক্ষেত্রে কতগুলো প্রশ্ন আসে, সেগুলো হল: শুধুমাত্র দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা অথবা উভয়টি বিচ্যুত আচরণের জন্য দায়ী? নাকি অন্য কোন প্রভাবক আছে যেগুলো এর যেকোন একটি বা উভয়টির সাথে সম্পৃক্ত হলে বিচ্যুতি সংঘটিত হয়? এই প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি যে, গবেষকগণ এই বিষয়টি নিয়ে তাদের পরিবেশে গবেষণা চালিয়েছে। তাদের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে যে, দারিদ্রতার সাথে বিচ্যুতির সম্পর্ক খুবই দূর্বল এবং দারিদ্রতাই একমাত্র বিচ্যুতির কারণ নয়। কেননা অনেক দরিদ্র কিশোরদের মাঝে বীরত্ব ও আমানতদারিতার গুণ বিদ্যমান। বিচ্যুতি তাদেরকে চুরি করতে বা শরীয়ত বহির্ভূত পন্থায় উপার্জন করতে আকৃষ্ট করেনি। বরং তারা বিচ্যুত লোকদেরকে ঘৃণা করে। অপরদিকে অনেক ধনাঢ্য পরিবারে বেড়ে উঠা কিশোরদেরকে বিচ্যুত হতে দেখা যায়।
এ ব্যাপারে আমরা একটি উদাহরণ গ্রহণ করতে পারি যা প্রমাণ করে যে, দরিদ্রদেরকে তাদের দারিদ্রতা চারিত্রিক বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যায়নি। এই উদাহরণের নমুনা হলেন চারশ জন দরিদ্র মুহাজির সাহাবী, যাদের মদিনায় কোন বাসস্থান ছিলনা, কোন নিকট আত্মীয় ছিলনা তথাপি তাদের নিজেদেরকে আবদ্ধ রেখেছিল আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্য, তারা রাসূল সাঃ কর্তৃক প্রেরিত সারিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল, তারা হলেন আহলে সুফফার সাহাবীগণ। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ﴿ [এগুলো অভাবগ্রস্থ লোকদের প্রাপ্য; যারা আল্লাহ্র পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, দেশময় ঘুরাফিরা করতে পারে না; আত্মসম্মানবোধে না চাওয়ার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে; আপনি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না। আর যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ্ সে ব্যাপারে সবিশেষ জ্ঞানী।]
অর্থনৈতিক দিক থেকে ধনাঢ্যতার আরেকটি উদাহরণ হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র তথাপি অন্য সমাজের চেয়ে তাদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনুরূপভাবে দারিদ্রতার সাথে বিচ্যুতির সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণার ফলাফলগুলো বৈপরিত্যপূর্ণ। এই দিকে ইঙ্গিত করে বিচ্যুতি বিষয়ক একজন গবেষক বলেন: অর্থনৈতিক কারণ ও কিশোর অপরাধের সম্পর্ক বিষয়ক পরিচালিত গবেষণাগুলোর ফলাফল পরস্পর বিরোধী। এর কারণ হিসেবে বলেন: এসমস্ত গবেষণার পদ্ধতিগত ঘাটতির কারণে, কেননা তা সূক্ষ্ম তুলনা বা অপরাধীদের নিদিষ্ট নীতির দলের উপর নির্ভর করে তৈরী করা হয়নি। এমনকি এসমস্ত গবেষণার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম কোন মাধ্যম ব্যবহার করা হয়নি।
সুতরাং এই উপসংহারে আসা যায় যে, স্বয়ং দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা বিচ্যুতির কারণ নয়; তবে যদি তার সাথে যুক্ত হয় ইসলামী মূল্যবোধের চরিত্রের উপর দুর্বল প্রতিপালন। এর ফলে দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা চারিত্রিক বিচ্যুতির প্রভাবক কারণ হিসেবে প্রকাশ পায়। কেননা এমন অনেক ধনী ব্যক্তি পাওয়া যায় যে তার সম্পদের হেফাযত করে এবং একমাত্র শরীয়তসম্মত পন্থায় তা ব্যয় করে। আবার এমন দরিদ্র পাওয়া যায় যে বিচ্যুত না হয়ে তার দারিদ্রতার উপর ধৈর্যধারণ করে। আমার দৃষ্টিতে এর মূল হল প্রতিপালন ও দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ। যদি তা দুর্বল হয় বা অনুপস্থিত হয় তাহলে বিচ্যুতির ক্ষেত্রে দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়ে আল্লাহই ভাল জানেন।

গ- অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বিচ্যুতির ক্ষেত্রে এর প্রভাবঃ
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে তিনটি নীতি: ইসলামী নীতি, পুঁজিবাদী নীতি ও সমাজতান্ত্রিক নীতি। বাস্তবধর্মী গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, মানব রচিত অর্থনৈতিক নীতি ব্যার্থ হয়েছে, কেননা তা চারিত্রিক বিচ্যুতির ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। পক্ষান্তরে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজের জন্য কার্যকর নিরাময়ের ব্যবস্থা করেছে। তন্মধ্যে উদাহরণস্বরূপ, ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে সম্পর্ক সৃষ্টি; যা যাকাত, সাদকা ও ইহসানের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।

অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা মনে করে, দারিদ্রতা নির্মূলের একমাত্র উপায় হল ধনীদেরকে নির্মূল করা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ও তাদের প্রাচুর্যতা থেকে বঞ্চিত করা। বরং তারা এর চেয়েও দূরে গেছে মালিকানা বাতিলের কারণে বিশেষত উৎপাদিত সম্পদের ক্ষেত্রে যেমন যমীন ও অস্ত্র ইত্যাদি। তারা দরিদ্র সমাজকে ধনীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে, তাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষের প্রসার ঘটিয়েছে এবং সংঘাতের আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছে। এমনকি সবশেষে যারা সংখ্যায় বেশি তারাই বিজয়ী হয়েছে। আর তারা হল সাধারণ শ্রমিক শ্রেণী যাদেরকে তারা সর্বহারা বলে। এর অর্থ হল চারিত্রিক মূলনীতি থেকে সমাজের বিচ্যুত হয়ে খারাপ চরিত্র যেমন সংঘাত, বিদ্বেষ এর দিকে যাওয়া। আর মালিকানার প্রতি আগ্রহের প্রবণতাকে শেষ করে দেওয়া; যার অনুপস্থিতি চারিত্রিক বিচ্যুতির অনেকগুলো কারণকে প্রকাশ করে যার অন্যতম হল মানসিক টেনশন।

অনেক বিতর্ক সংঘটিত হয়েছে বিচ্যুতি ও অপরাধ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সমাজে অপরাধী চরিত্রের জন্য দায়ী। এই মতটি প্রকাশ করেন ইতালিয়ান চিন্তাবিদ (তুরানি), সবচেয়ে প্রশিদ্ধ যে ব্যক্তি পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থাকে সমাজে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য দায়ী করেছন তিনি হল্যান্ডের চিন্তাবিদ ইউনজার। উদাহরণস্বরূপ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার আলোকে মানুষকে ধনী-গরিব দুই ভাগে ভাগ করাই সরাসরি চুরির অপরাধের সাথে সম্পর্কিত।

পক্ষান্তরে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনী-গরিবের সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। সুতরাং তা ধনী-গরিবের মাঝে শত্রুতা-সংঘাত সৃষ্টিকারী সকল মতবাদ বা মানুষের মাঝে শ্রেণীবিন্যাসের মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। আর কেনই বা তা করবে? অথচ ভ্রাতৃত্ব হল ঈমানের সমার্থবোধক ও ইসলামের ফলস্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ﴿ [মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও।]

ইসলাম তাদের মাঝের সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্ববোধের সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে দেখে, ভ্রাতৃত্ববন্ধন রক্ষা, সাদকা ও ইহসান করার মাধ্যমে; দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য, যেন শয়তান তাকে প্রলুব্ধ করে বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যেতে না পারে। মহান আল্লাহ বান্দাদেরকে দান সাদকার আদেশ করে বলেন: ﴾وَأَنفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُم مُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ﴿ [আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর।] তিনি আরো বলেনঃ ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِمَّا رَزَقْنَاكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ يَوْمٌ لَّا بَيْعٌ فِيهِ وَلَا خُلَّةٌ وَلَا شَفَاعَةٌ وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴿ [হে মুমিনগণ! আমি যা তোমাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তোমরা ব্যয় কর সেদিন আসার পূর্বে, যেদিন বেচা-কেনা, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকবে না, আর কাফেররাই যালিম।]

দারিদ্রতার সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলাম ধনীদেরকে দরিদ্রদের জন্য দান যেমন যাকাত ও সাদকা করতে এবং সচ্ছল নিকট আত্মীয়দেরকে দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অনুরূপভাবে দারিদ্রতা বিমোচনের জন্য সঠিক সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছে। এর বর্ণনা পবিত্র কুরআনে নূহ আঃ এর জবানে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا﴿ [অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, এবং তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।]

ইবনে আব্বাস রাঃ ও অন্যান্যরা বলেন: অর্থাৎ যখন তোমরা তাওবা করবে, ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং মানুষদেরকে খাবার খাওয়াবে তখন তোমাদের রিযিক বৃদ্ধি পাবে। অনুরূপভাবে ইসলাম আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের আশার প্রাঞ্জলতা রোপন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴾إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴿ [তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।] তিনি আরো বলেনঃ ﴾سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا﴿ [অবশ্যই আল্লাহ কষ্টের পর দেবেন স্বস্তি।]

আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, দারিদ্র চিরস্থায়ী নয়। বরং তা পরিবর্তনশীল। আবার কখনো দূরীভূত হয়ে আবার ফিরে আসে। আজকের দিনের দরিদ্র ব্যক্তিরা হতে পারে আগামীকাল ধনী। কেননা রিযিক আল্লাহর হাতে। আর ইসলামে মানুষের মর্যাদা অর্থের ভিত্তিতে নয় বরং তাকওয়ার ভিত্তিতে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴿ [তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন।] নবী সাঃ বলেছেন: (বহু এমন লোকও আছে যার মাথা উষ্কখুষ্ক ধুলোভরা, যাদেরকে দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। (কিন্তু সে আল্লাহর নিকট এত প্রিয় যে) সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন।)

অপরদিকে ধনীদের জন্য সম্পদ ব্যবহারে ইসলামের দিকনির্দেশনা হল, এমন নির্দেশনা যা অপচয় ও বিচ্যুতি হতে মুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴿ [আর তোমরা অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।] তিনি আরো বলেন: ﴾وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا * إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴿ [এবং কিছুতেই অপব্যয় কর না। নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রাবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴾وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ﴿ [আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং যমীনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না।]

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি ইনসাফ ভিত্তিক ব্যবস্থা, যা আন্তরিক বন্ধন সৃষ্টি করে; সঠিক সামাজিক সংহতির মাধ্যমে। যা ব্যক্তিকে তার প্রিয় বস্তুকে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও প্রতিদানের আশায়। আর পারস্পরিক সহযোগিতা দারিদ্রতার ফলে সৃষ্ট গরিবদের বিচ্যুতির বিপক্ষে দাঁড়াতে সাহায্য করে এবং ধনীদের বিচ্যুতিপূর্ণ বিলাসিতার বিপরীতে দাঁড়াতেও সাহায্য করে। যদিও মুসলিম সমাজে ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে বিচ্যুতির পদস্খলন বিদ্যমান কিন্তু সেটা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগের অভাবে এবং ইসলামী শিক্ষার মানহাজ বাস্তবায়ন না করার কারণে।

পূর্বের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কিছু ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে বিদ্যমান বিচ্যুতির জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হল ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আর দারিদ্রতা বা ধনাঢ্যতা দ্বীনি নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক চারিত্রিক প্রতিপালনের অনুপস্থিতি বা দুর্বলতার সময় এবং বিপর্যয়কর পরিবেশের উপস্থিতিতে চারিত্রিক বিচ্যুতির অন্যতম কারণ।

চতুর্থতঃ সামাজিক পরিবেশ
পরিবেশ বলতে বুঝায়, মানুষের চার পাশে পরিবেষ্টিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকসমূহ। আর এটা মানুষের আচরণে ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল মানুষের চারপাশে বেষ্টিত পারিবারিক, গোত্রীয়, শিক্ষাক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি বিভিন্ন দল এবং সংস্কৃতি ও বিশ্বাসগত বিভিন্ন ধরণ যা অনেক সময় এক জাতীয় আবার কখনো বা ভিন্নভিন্ন হয়। মানুষকে প্রায়ই তাদের সাথে উঠবসা করতে হয় আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী হওয়া বা প্রতিবেশীর হুকুমে হওয়ার কারণে। নিশ্চয় এদের সকলের ব্যক্তি জীবনে প্রভাব রয়েছে তার অনুরাগ ও চারিত্রিক পথের ধরণ অনুযায়ী এবং ব্যক্তির সে প্রভাবকগুলো গ্রহণ করার স্তর অনুসারে।

সঙ্গী দুই ধরণের হয়ে থাকে: অসৎ সঙ্গী ও সৎ সঙ্গী। কোন ব্যক্তির খারাপ লোকদের সাথে উঠাবসা তার জন্য বিচ্ছিন্নতা, বিভেদ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, দুর্বলতা, তাদের পক্ষ হতে বহনের অযোগ্য বোঝা, স্বীয় কল্যাণ বিনষ্ট করা, কল্যাণ বাদ দিয়ে তাদের সাথে ব্যস্ত থাকা এবং তাদের চাহিদার মাঝে নিজের চিন্তাকে নিবদ্ধ রাখাকে আবশ্যক করে। এরপর তার আল্লাহ ও আখেরাতের জন্য কী বাকী থাকবে? এমনকি আল্লাহর হক নষ্ট করার কারণে যখন পরিতাপ ও আফসোসের দিন আসবে, তখন আফসোস ও পরিতাপ কোন উপকারে আসবে না। সে সময় অত্যাচারী তার উভয় হাত কামড়াতে থাকবে এবং আকাঙ্খা করবে যদি অমুক ব্যক্তিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করত আর রাসূলের পথকে যদি আঁকড়ে ধরত। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا﴿ [যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম। হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ পৌছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।] আরেকটি কুরআনিক উদাহরণ রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন: ﴾الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ﴿ [বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকীরা ছাড়া।] তিনি আরো বলেন: ﴾إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتُّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ * وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَلَهُمْ حَسَرَاتٍ عَلَيْهِمْ وَمَا هُم بِخَارِجِينَ مِنَ النَّارِ﴿ [যখন যাদের অনুসরণ করা হয়েছে তারা, যারা অনুসরণ করেছে তাদের থেকে নিজেদের মুক্ত করে নেবে এবং তারা শাস্তি দেখতে পাবে। আর তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, আর যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে, 'হায়! যদি একবার আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী তাদেরকে দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। আর তারা কখনো আগুন থেকে বহির্গমণকারী নয়।]

এজন্য সালাফগণ বলতেন: তোমরা দু'ধরণের মানুষ থেকে সতর্ক থাক। এক: প্রবৃত্তি অনুসরণকারী যাকে তার প্রবৃত্তি ফেতনাগ্রস্থ করে রেখেছে, দুই: দুনিয়া পাগল ব্যক্তি যাকে দুনিয়া অন্ধ করে রেখেছে। তারা আরো বলতেন: তোমরা পাপাচারী আলেম ও মূর্খ ইবাদতকারীর ফেতনা থেকে সতর্ক থাক। কেননা তাদের ফেতনাটা সকলের জন্য ফেতনা।

সুতরাং খারাপ বন্ধুগণ মানুষকে খারাপ পথই দেখাবে, ফলে তারা তার স্বভাবকে খারাপে রূপান্তরিত করবে এবং তার কাছে খারাপ আমলসমূহকে সুশোভিত করে উপস্থাপন করবে। এমনকি যখন খারাপ চরিত্রে জড়িয়ে পড়বে ও তার কাছে নত হয়ে যাবে এবং সে অধঃপতনের গহ্বরে নিপতিত হবে, তখন সে মর্যাদাবান লোকদের নিকট অপছন্দনীয় ও বিবেকবানদের হতে প্রত্যাখাত হবে। নিকৃষ্ট লোকেরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে আর উত্তম লোকরো তার থেকে সতর্ক থাকবে। অনুরূপভাবে সে কষ্ট-ক্লেশের মাঝে থাকবে তার উপর খারাপ স্বভাব ও বিকৃত আচরণ ভর করা এবং তার বিচ্যুতির কারণে।

এখানে নিচের প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা আবশ্যকঃ জীবন বা কর্মের কারণে খারাপ লোকের সাথে উঠাবসার প্রয়োজন দেখা দিলে একজন মুসলিম কী করবে? তাদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে তাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচার উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, এ সকল ক্ষেত্রে তাদের সাথে লেনদেনের সময় হিকমত অবলম্বন করা আবশ্যক। এর বর্ণনা দিয়ে ইবনুল কায়্যিম আল জাওযীয়া বলেন: তাদের সাথে উঠাবসা করা একান্তই আবশ্যক হয়ে পড়ে, তাদের এড়িয়ে চলা সম্ভব না হয়, তবে তাদের সাথে সহমত পোষণ করা থেকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে, তার সাহায্যকারী ও শক্তি না থাকলে তাদের কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করবে, কেননা তারা অবশ্যই তাকে কষ্ট দিবে। তবে এই কষ্টের পর তাদের, মুমিনদের ও বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে সম্মান, ভালবাসা, মর্যাদা ও প্রশংসা আসবে। আর যদি উঠাবসা জায়েয বিষয়ের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে চেষ্টা করবে যেন সেই মজলিসকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগানো যায়, নিজেকে এব্যাপারে উৎসাহিত করবে ও অন্তরকে শক্ত করবে। যদি তার সক্ষমতা এটা করতে অপারগ হয় তবে সে যেন তাদের মাঝ থেকে সেরূপভাবে বেরিয়ে যায় যেরূপভাবে আটার খামির থেকে চুলকে বের করে দেয়া হয়। তাদের মাঝে তার অবস্থা যেন হয়, উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত, কাছে থেকেও দূরে এবং জাগ্রত থেকেও ঘুমন্ত।

পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার তথা সৎ ব্যক্তিদের সঙ্গ গ্রহণ, এটা কাঙ্খিত ও ইপ্সিত। কেননা এখানে কুৎসিত কিছু নেই। বরং এর মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী হবে। সুতরাং সৎকর্মশীলগণ ব্যক্তির জন্য শোভা স্বরূপ, যা তাকে প্রতিদিন সুন্দর সুন্দর পোশাক পরিধান করাবে, তাদের সহচর্যে সীমাহীন কল্যাণ লাভ হবে, তা তার মাঝে ভাল কাজের প্রতি ভালবাসা ও সে অনুযায়ী আমল করার শক্তি যোগাবে এবং তার মাঝে খারাপ কাজের প্রতি ঘৃণা ও তা পরিত্যাগ করার স্পৃহা তৈরী করবে। ফলে তার স্বভাব ও চরিত্র সুন্দর থেকে সুন্দরতম হবে। কাজেই এদের সঙ্গ গ্রহণে উৎসাহী থাকা উচিত। তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূল সাঃ বলেন: (সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।)

যদিও চারিত্রিক বিচ্যুতির ক্ষেত্রে পরিবেশের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, তথাপি তা এমন কোন জটিল কারণ নয় যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা দুষ্কর। কেননা এমন কত লোক রয়েছে যারা কুফর ও নাস্তিকতার মাঝে জীবন যাপন করেছে, কিন্তু তারা তাকওয়ার ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ। আবার এমন কত ব্যক্তি রয়েছে যারা উত্তম তাকওয়া সম্পন্ন গৃহে লালিত-পালিত হয়েছে, তথাপি তারা এর দ্বারা প্রভাবিত হয়নি বরং বিচ্যুত হয়েছে ও পরিবেশের পথ থেকে সরে গেছে ফলে তারা কুফর ও নাস্তিকতার উদাহরণে পরিণত হয়েছে। নূহ আঃ ও লূত আঃ এর স্ত্রীরা ছিল নবী গৃহে, কিন্তু তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অপরপক্ষে ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন কুফরী গৃহে কিন্তু তিনি হককে বুঝতে পেরেছিলেন তাই তো কুফর থেকে সঠিক পথে ফিরে এসেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ * وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴿ [যারা কুফরী করে, আল্লাহ্ তাদের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন নূহের স্ত্রী ও লুতের স্ত্রীর, তারা ছিল আমাদের বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লুত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারলেন না এবং তাদেরকে বলা হল, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ কর। আর যারা ঈমান আনে, আল্লাহ্ তাদের জন্য পেশ করেন ফেরাউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত, যখন সে এ বলে প্রার্থনা করেছিল, হে আমার রব! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে উদ্ধার করুন ফেরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।]

এর অর্থ সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকে হেয় করা নয় বরং তা ব্যক্তির আচরণে সবচেয়ে বড় প্রভাবক। কেননা সঙ্গ গ্রহণের জন্য আবশ্যক হল সাদৃশ্যতা গ্রহণ। কিন্তু ব্যক্তি তার প্রচেষ্টা দ্বারা আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্যে এ থেকে মুক্তি পেতে পারে। আরো কতগুলো প্রভাবক রয়েছে যা খারাপ চরিত্রের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখে ও তার কারণ হিসেবে বিবেচিত এবং উত্তম চরিত্র থেকে বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তার প্রভাব ক্রিয়াশীল। সেগুলো নিম্নরূপঃ
১- শিক্ষণীয় প্রতিপালনের অভাবঃ সঠিক শিক্ষণীয় প্রতিপালনকে উন্নত প্রশংসনীয় আচরণের জন্য ফলস্বরূপ গণ্য করা হয়, অনুরূপভাবে খারাপ প্রতিপালন নোংরা চরিত্রের মূল। বরং খারাপ প্রতিপালন মানুষের আক্বীদার মূলে প্রভাব ফেলে এবং তাকে তার প্রকৃত স্বভাব থেকে বিচ্যুত করে। নবী সাঃ এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন: (প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বা খৃস্টান অথবা অগ্নি উপাসকরূপে রুপান্তরিত করে।)
আর শিক্ষণীয় প্রতিপালনের অভাব বিভিন্ন দিক থেকে হয়ে থাকে যা ব্যক্তি ও সমাজের চরিত্র গঠনে ভুমিকা রাখে, সেগুলো হল:
শিক্ষাগত দিক: ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীয়ী ইলমের বিষয়ে দুর্বল প্রতিপালন সবচেয়ে বড় স্বীয় নিরাপত্তাকে হারিয়ে ফেলে। কেননা শরীয়ী ইলমই ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়ার বীজ বপন করে এবং দুনিয়া পরবর্তীতে যে নিয়ামত বা শাস্তি রয়েছে সে বিষয়ে দূরদর্শিতা তৈরী করে। যা তাকে ভাল কাজে অগ্রগামী করে ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। ব্যক্তির অন্তরে শরয়ী শিক্ষার অভাব তাকে এমন মূর্খতার দিকে নিয়ে যায় যা তাকে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। কাজেই তা খারাপের জখমে ও বিপদের কষ্টে এবং নিকৃষ্ট চরিত্রে ব্যাথায় নাড়া দেয় না। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: ব্যাপক মূর্খতায় অন্তর মৃত্যুবরণ করে, আর যে কোন ধরণের মূর্খতায় তা রোগাক্রান্ত হয়। শরীয়ী ইলম বাদ দিয়ে দুনিয়াবী শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা অন্তর ও বিবেকে ফাটল সৃষ্টি করে। ফলে ঐ ব্যক্তি শুধু ঐসকল জ্ঞানই জানে যা আখেরাত বিমুখ হয়ে তার দুনিয়াবী লালসা বাস্তবায়ন করবে। ফলশ্রুতিতে সে চুরি করবে, আক্রমণ করবে, যিনা করবে ও হারাম কাজে জড়িত হবে।
আক্বীদা ও ইবাদতগত দিকঃ ব্যক্তিকে আক্বীদা ও ইবাদতের ক্ষেত্রে দুর্বল প্রতিপালন, তাকে সহজে প্রবৃত্তি ও আনন্দের পিছনে তাড়িত করবে; যা তাকে বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যাবে। কেননা সঠিক আক্বীদা ও ইবাদত একজন মুসলিমের মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস, সুদৃঢ় দূরদর্শিতা, চরম ধৈর্য ও উচ্চাকাঙ্খা সৃষ্টি করে এবং হীনমন্যতা থেকে দূরে রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ﴿ [আপনি তেলাওয়াত করুন কিতাব থেকে যা আপনার প্রতি ওহী করা হয় এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয় সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।]
অশ্লীলতা হল যার কদর্যতা সকলের নিকট স্পষ্ট এবং সকল বিবেকবান ব্যক্তি তা খারাপ মনে করে। তাই একে যিনা ও সমকামিতা দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। আল্লাহ একে ফাহেশা বলেছেন যেন মানুষরা এর নোংরামি থেকে বিরত থাকে। অনুরূপভাবে নোংরা কথাকেও অশ্লীলতা বলা হয়। আর তা হল যার কদর্যতা খুবই স্পষ্ট যেমন গালি দেয়া, অপবাদ দেয়া ইত্যাদি। আর বান্দা যখন নির্দেশিত পন্থায় সালাত আদায় করে তখন তা তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। এটা জ্ঞাত বিষয় যে কোন ব্যক্তি যদি গোপন বিনয়ের ও প্রকাশ্য আমলের মাধ্যমে এই সালাতের হেফাযত করে এবং সে আল্লাহকে যথাযথ ভয় করে, তবে সে ওয়াজীব সময় বাস্তবায়ন করবে ও কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। আর যখন দ্বীনি প্রতিপালন দূর্বল হবে তখন ব্যক্তি বিচ্যুত আচরণের দিকে ধাবিত হবে।
চারিত্রিক দিকঃ ইসলামী মূল্যবোধের উপর দুর্বল চারিত্রিক প্রতিপালন ব্যক্তিকে এর বিপরীত খারাপ আচরণে জড়িত হওয়াকে অতি সহজ করে দেয়। কেননা সে ধৈর্য্যের শিক্ষার উপর গড়ে উঠেনি। যার ফলে তার খামখেয়ালিপনা ও প্রবৃত্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে পারে না। সে লজ্জাশীলতার শিক্ষা পায়নি যার ফলে সে অপরাধ কর্ম করতে লজ্জাবোধ করে না। সে সততা ও আমানতদারিতার শিক্ষা পায়নি তার ফলে সে চুরি করে, প্রতারণা করে এবং কথা ও কাজে ধোঁকা দেয়। ইবনে হাযম রহঃ বলেন: সৌভাগ্যবান সেই যার অন্তর ভাল কাজে প্রশান্তি পায় এবং খারাপ ও পাপ কাজ থেকে পলায়ন করে। আর দুর্ভাগা সে যার অন্তর খারাপ ও পাপ কাজে প্রশান্তি পায় এবং ভাল ও আনুগত্যের কাজ থেকে পলায়ন করে। কাজেই চারিত্রিক প্রতিপালনের দুর্বলতা বিচ্যুতি ও বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ।
শাস্তিগত দিকঃ অপরাধ দমনে শাস্তির কার্যকর প্রভাব রয়েছে। আর শাস্তি প্রয়োগ না করা ব্যক্তি ও সমাজকে শয়তানের আক্রমণের কাছে নতি স্বীকার করার সুযোগ সৃষ্টি করে। যেহেতু বর্তমান সমাজে ইসলামী শাস্তি প্রয়োগ হয়না, তাই তা চারিত্রিক বিচ্যুতির সম্মুখীন হচ্ছে। কেননা মানব রচিত আইন একদিক থেকে বিচ্যুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অপরদিকে সেখানে শরয়ী নিয়ন্ত্রণ অনুপস্থিত। আর অপরাধী যখন প্রতিরোধমূলক শাস্তি পায়না তখন অকল্যাণ তার অন্তরের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করে। ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: অপরাধী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের শাস্তি পরিপূর্ণ হয়না যদি না তা প্রতিরোধকারী কষ্টদায়ক না হয় এবং যারা এরূপ কর্ম করতে চায় তাদের জন্য অপরাধী একজন শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত না হয়। এজন্য ছোট-বড়, কম-বেশী অপরাধ অনুযায়ী তার কোন কিছু নষ্ট করা আবশ্যক। কাজেই শরয়ী শাস্তি বাস্তবায়ন ব্যতীত কোন প্রতিরোধকারী নেই।

২- খারাপ আদর্শঃ খারাপ আদর্শ অন্যদের মাঝে কার্যকর প্রভাব ফেলে; কেননা তা অন্যদের সামনে বিচ্যুতির বাস্তব উদাহরণ উপস্থাপন করে। আর এটা স্পষ্ট করে পথ, পন্থা ও প্রতারণার মাধ্যমে যা দুর্বল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদেরকে বিচ্যুত আচরণের দিকে নিয়ে যায়। রাসূল সাঃ এর ও এর সাথে জড়িত ব্যক্তির ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন, আরো বর্ণনা করেছেন যারা এর অনুসরণ করবে ও এর দ্বারা প্রভাবিত হবে তাদের বোঝা তাকে বহন করতে হবে। নবী সাঃ বলেন: (যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে (ইসলামের পরিপন্থী) কোন খারাপ প্রথা বা কাজের প্রচলন করবে, তাকে তার এ কাজের বোঝা (গুনাহ এবং শাস্তি) বহন করতে হবে। তারপর যারা তাকে অনুসরণ করে এ কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ বোঝাও তাকে বইতে হবে। তবে এতে তাদের অপরাধ ও শাস্তি কোন অংশেই কমবে না।)
খারাপ আদর্শ হয় নোংরা কথা ও নিকৃষ্ট কাজের মাধ্যমে; চায় তা সরাসরি হোক বা ছবি, লেখনি অথবা অন্যকোন মাধ্যমে হোক যেটাকে মানুষ অন্যের মাঝে প্রভাব বিস্তার করার জন্য ব্যবহার করে ও তাদের মাঝে বিপর্যয় বিস্তার করে। সুতরাং খারাপ আদর্শ বিচ্যুত আচরণের বাস্তব উদাহরণ, কেননা তার প্রভাব ব্যাপক। বিশেষ করে যদি সে আদর্শ ব্যক্তি ভাল মানুষদের নিকট প্রিয় হয় ও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। যেমন পিতা, শিক্ষক, বন্ধু ইত্যাদি। অথবা খারাপ আদর্শের ব্যক্তি এমন বৈশিষ্ট্যের হবে যাতে শারীরিক বা মেধাভিত্তিক একধরণের শক্তি রয়েছে। ফলে অন্যরা তার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তার পথই অনুসরণ করবে। সুতরাং কিশোর ও যুবক বয়সে বীরত্বপূর্ণ গুণের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, যেহেতু ব্যক্তি এই সময় বীরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই যদি সমাজে খারাপ আদর্শ বিদ্যমান থাকে আর উত্তম আদর্শ অনুপস্থিত থাকে, তবে যুব সমাজ তাদের নষ্ট চরিত্রেরই অনুসরণ করে, যেমন চুরি করা, ডাকাতি করা, ছিনতাই করা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে যদি খারাপ আদর্শ অনুপস্থিত থাকে ও উত্তম আদর্শ প্রকাশিত হয়, যা ভালকাজে বীরত্বের প্রতি গুরুত্ব দেয়, তবে যুব সমাজ তার অনুসরণ করে। যেমন অন্যদের সাহায্য করা, ভাল কাজে কষ্ট ও দুর্দশা সহ্য করা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে বৃদ্ধ বয়সের মানুষ, যদি দুষ্টপ্রকৃতির বৃদ্ধ তার আচরণে এমন কিছু থাকে যা অনুসরণ ও খারাপ আদর্শের মাধ্যম তবে তা তার সমবয়ষ্কদের মাঝে প্রভাব ফেলে। আর মানুষ পরস্পরের কার্যক্রম ও অনসরণের ক্ষেত্রে বিড়ালের পালের ন্যায়, যারা পারস্পারিক সাদৃশ্য রাখতে অভ্যস্ত।

৩- বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতধারা দ্বারা প্রভাবিত হওয়াঃ ইসলামী সমাজের জন্য শত্রুদের থেকে আগত বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতধারাকে চরিত্রের জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকারক মনে করা হয়। যেহেতু আকর্ষণীয় বক্তব্য, রঙ্গিন স্ক্রিন ও সরাসরি সম্প্রচারগুলোতে অন্ধকার রাত্রীর ন্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক ফেতনা ছড়ানো হয়। তা দৃঢ় বিশ্বাসের পরিবর্তে সংশয়ের বীজ বপন করে ও ফেতনা ছাড়ে যা চরিত্রকে নষ্ট করে ও অধঃপতিত করে। বায়বীয় চিন্তার স্রোতধারার বিস্তৃতি বিভিন্ন উপায়ে হয়ে থাকে যা নিম্নরূপঃ
সরাসরি সম্প্রচারঃ সরাসরি সম্প্রচার সবচেয়ে দ্রুততম আধুনিক মাধ্যমে যা পূরো বিশ্বকে গ্রাস করে নিয়েছে এবং মানুষের মাঝে ভাল-মন্দ সমানভাবে প্রচার করেছে। আর মন্দের পরিমাণই ব্যাপক ও অধিক। কাফের ও ইতর লোকদের খারাপ চরিত্রগত অভ্যাস সম্প্রচার করা হয় যা দ্বীন ও চরিত্রকে নষ্ট করে, সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে এবং বিপর্যয় ও দুশ্চরিত্রের বিস্তার করে; এগুলোকে আকর্ষণীয় পোষাকে উপস্থাপনের মাধ্যমে। এর ফলে যুব সমাজ ও দুর্বল আত্মার মানুষেরা পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং তাদের উপর কুপ্রবৃত্তি ভর করছে।
তরজমা বা অনুবাদঃ বিচ্যুত চিন্তাধারা আরবী ভাষায় অনুবাদ করায় ঐ সমস্ত পাঠকদের উপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে যাদের শরয়ী ও জ্ঞানগত সুরক্ষা নেই; যা তাদেরকে পঠিত চিন্তার ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করবে। যেমন সে চিন্তার অনুবাদ করা যা নারী স্বাধীনতা ও তাদের বাড়ী থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য আহবান করে, যেন তারা পুরুষদের সাথে বাজারে, কারখানায়, শ্রেণীকক্ষে ও সকল স্থানে দাঁড়াতে পারে। আর এর বিরোধীতা করাই পশ্চদপদতা। আবার কতগুলো গল্প ও বর্ণনার মাধ্যমে যুব সমাজকে হারাম সম্পর্কে জড়াতে উৎসাহিত করে, যাকে সুশোভিত করা হয় আন্তর্জাতিক বর্ণনা নামকরণ করে। আবার কতগুলো পাঠকের সামনে অপরাধের পথকে স্পষ্ট করে, কিভাবে এর জন্য পরিকল্পনা করবে, কিভাবে বাস্তবায়ন করবে ইত্যাদি। এ ধরণের অনুবাদগুলোর মানুষের আচরণের উপর মারাত্মক প্রভাব রয়েছে।
কাফের দেশে ভ্রমণঃ বিনা প্রয়োজনে কাফের দেশে ভ্রমণ করা ভ্রমণকারীদের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। যেহেতু তারা হারাম চর্চা দেখতে পায়, যা তাতে পতিত হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সেটাকে তাদের সমাজে স্থানান্তরিত করার দিকে পরিচালিত করে বা এসম্পর্কে ও তার প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে আলোচনা করতে উৎসাহিত করে। আবার অনেক সময় সে দিকে আহবান করতে ও তা প্রচার করতে ভুমিকা রাখে। কাজেই মুসলিম সমাজে অবাধ মেলামেশা, পর্দাহীনতা ও মাদকের বিস্তৃতির পিছনে সফরের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
সম্মানিত শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায রহঃ কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেসকল কোম্পানী সম্পর্কে যারা বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করে মুসলিম সন্তানদেরকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য গ্রীষ্মের ছুটি পাশ্চাত্যে কাটনোর জন্য আহবান করে। তিনি এর উত্তরে বলেন: মুসলিমদের সাথে কাফেরদের শত্রুতার বিষয়ে অসংখ্য আয়াত রয়েছে, এর উদ্দেশ্য হল তারা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কোন ধরণের ত্রুটি করে না। এ ক্ষেত্রে তাদের অসংখ্য পদ্ধতি এবং প্রকাশ্য ও গোপন মাধ্যম রয়েছে। তারমধ্য হতে বর্তমানে প্রকাশ পেয়েছে কিছু ভ্রমণ ও পর্যটন কোম্পানী কর্তৃক এমন বিজ্ঞাপন প্রচার যাতে এই দেশের সন্তানদেরকে ইংরেজী শিক্ষার অযুহাতে গ্রীষ্মের ছুটি ইউরোপ আমেরিকায় কাটানোর আহ্বান জানানো হয়। তারা সফরের পূরো সময়ের জন্য একটি পূর্ণ প্যাকেজ তৈরী করে। এই প্যাকেজে বিভিন্ন ধারা থাকে তন্মধ্যেঃ
ক- ছাত্রের অবস্থানের জন্য একটি ইংরেজ কাফের পরিবার চয়ন করা; যদিও এতে অসংখ্য বিপদের কারণ রয়েছে।
খ- যে শহরে অবস্থান করবে সে শহরে মিউজিক অনুষ্ঠান, নাট্যমঞ্চ ও বিভিন্ন বিনোদনে ছাড়ের ব্যবস্থা করা।
গ- নাচ ও বিনোদন কেন্দ্র পরিদর্শন করা।
ঘ- ইংরেজ যুবতীদের সাথে ডিসকো নাচ ও নাচের প্রতিযোগিতা চর্চা করা।
ঙ- এক ইংরেজ শহরের বিনোদন কেন্দ্রে প্রাপ্য বিষয়ের বর্ণনায় এসেছে: (নাইট শো, ডিসকো নাচ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আধুনিক জায ও রক মিউজিক, নাট্যমঞ্চ ও সিনেমা হল এবং ঐতিহ্যবাহী ইংরেজ মদের বার।)
এ ধরণের বিজ্ঞাপনগুলো অনেক মারাত্মক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তন্মধ্যেঃ - মুসলিম যুবকদেরকে বিচ্যুত ও ভ্রষ্ট করা। - চরিত্র নষ্ট করা ও খারাপ কাজে জড়িত করা, নষ্টের উপকরণগুলো সহজলভ্য ও হাতের নাগালে করার মাধ্যমে। - মুসলিমদের আক্বীদায় সন্দেহের সৃষ্টি করা। - পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি মুগ্ধতা ও আকর্ষণের মনোভাব তৈরী করা। - পাশ্চাত্যের নিকৃষ্ট আচার আচরণে অনেক বেশি অভ্যস্ত হওয়া। - দ্বীনের প্রতি মনোযোগ না দিতে ও তার আদেশসমূহ ও আদবের প্রতি দৃষ্টি না দিতে অভ্যস্ত হওয়া। - মুসলিম যুব সমাজকে প্রস্তুত করা যেন এই সফর থেকে ফিরে যাওয়ার পরে তারা তাদের দেশে পাশ্চাত্যের দিকে আহ্বানকারী হয় এবং তারা পশ্চিমা চিন্তাধারা, অভ্যাস ও জীবনধরণ পদ্ধতি দ্বারা তৃপ্ত হয়। ইত্যাদি বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেগুলো বাস্তবায়নে ইসলামের শত্রুরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসংখ্য পথ ও পদ্ধতির মাধ্যমে প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।
যারা শিক্ষার জন্য বিদেশে সফর করে সে ভাষা দ্বারা অধিক উপকৃত হওয়ার আশায় পরিবারসহ বসবাস করছে তাদের হুকুম সম্পর্কীয় প্রশ্নের উত্তরে সম্মানিত শায়খ বলেন: সেখানে পরিবারসহ বসবাস করা জায়েয নয়, যেহেতু ছাত্রের কাফেরদের চরিত্র ও নারী দ্বারা ফেতনায় পড়ার সম্ভবনা রয়েছে। আর ছাত্রের বসবাস ফেতনার স্থান থেকে দূরে হওয়া আবশ্যক। এই আলোচনা শিক্ষার উদ্দেশ্যে কাফেরদের দেশে ভ্রমণ করা বৈধ এমতের উপর ভিত্তি করে। তবে সঠিক হল, চরম প্রয়োজন ছাড়া শিক্ষার উদ্দেশ্যে কাফের দেশে সফর করা জায়েয নয়, তবে এক্ষেত্রে শর্ত হল, তাকে জ্ঞান ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে এবং সে ফেতনার উপকরণ হতে দূরে থাকবে।

৪- সামাজিক সুপরামর্শের অভাবঃ নেক ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধের মাধ্যমে সামাজিক সুপরামর্শ সামাজিক বিশুদ্ধতা ও নিরাপত্তার মূল। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴿ [পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।] রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘৃণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর।) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজীব, উত্তম ও সুন্দর আমল।
আর যখন সামাজিক সুপরামর্শের অভাব হবে, তখন বিচ্যুত ব্যক্তি বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য তার সামনে উন্মুক্ত সুযোগ পেয়ে যাবে। কেউ তাকে বিচ্যুতি থেকে নিষেধ করবে না এবং কেউ তার সমালোচনাও করবে না। ফলে সে ভ্রষ্টতা ও বক্রতা আরো বাড়িয়ে দিবে। হয়ত তার দ্বারা অন্যরা প্রভাবিত হবে। কাজেই নারী তাকে খারাপ চরিত্র থেকে নিষেধ করার জন্য কাউকে পাবে না, ছোটরা অসৎ আমলের ব্যাপারে আদব দেয়ার কাউকে পাবে না, যুবকেরা খারাপ চরিত্র থেকে সতর্ক করার কাউকে পাবে না এবং প্রাপ্তবয়স্কদেরকে কেউ সঠিক কাজ ও উন্নত চরিত্রের আদেশ করবে না। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এর ফলে সমাজ ভেঙ্গে পড়বে; কেননা তার সদস্যগুলো এমন স্বাধীনতা পেয়েছে যা সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত। কাজেই মানুষেরা প্রবৃত্তির অনুসরণে কোন লাঞ্ছনাবোধ করে না। জাতির সদস্যদের মাঝে সামাজিক সুপরামর্শের অভাবের কারণগুলো নিম্নরূপঃ
ব্যক্তিগত ব্যস্ততাঃ মানুষ তার ব্যক্তিগত বিষয়ে, তা পর্যালোচনায় ও নিজস্ব কল্যাণ বাস্তবায়নের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে সে সত্য বলা ভুলে যায়; যে সত্য মানুষকে ভাল কাজ করতে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। অনেক সময় বন্ধু, প্রতিবেশী বা কোন সন্তানের মাঝে ত্রুটি দেখতে পায়, কিন্তু নিজের বিষয়ে ব্যস্ত থেকে অন্যদের কল্যাণ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয় না। আর এতে বিরাট অকল্যাণ রয়েছে যা উম্মতের উপর বর্তায় এমনকি ঐ ব্যক্তির উপরও বর্তায়। নবী সাঃ বলেছেন: (যার হাতে আমার প্রাণ সে সত্তার কসম, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে থাকবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর তাঁর আযাব নিপতিত করবেন। তখন তোমরা তাঁর নিকট দোয়া করবে কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল হবে না)
আর্থিক প্রতিযোগিতাঃ সামাজিক সুপরামর্শের অভাবের অন্যতম কারণ হল মানুষের মাঝে আর্থিক প্রতিযোগিতা। প্রত্যেক ব্যক্তিই অর্থ জমা করার পিছনে ছুটছে, যা মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করছে। ফলে মানুষদেরকে তাদের চরিত্রগত দিক বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যার ফলে মানুষেরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পরিত্যাগ করে সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতার পিছনে দৌড়াচ্ছে। আবার অনেক সময় বিচ্যুত লোকদের সম্পদের কারণে তাদের সাথে উঠাবসা করছে, খাচ্ছে ও তোষামোদ করছে; তাদের থেকে কিছু পাওয়ার আশায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে সতর্ক করেছেন এবং বিচ্যুত লোকদের সাথে মেলামেশা করার ফলে বনী ইসরাঈলরা কী শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিল তার বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ﴾لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ * كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ﴿ [বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে দাউদ ও মারইয়াম পুত্র ঈসার মুখে লা'নত করা হয়েছে। তা এ কারণে যে, তারা অবাধ্য হয়েছে এবং তারা সীমালঙ্ঘন করত। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা হতে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট।]
দায়িত্ববোধ অনুভব না করাঃ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমাজের দায়িত্ববোধ অনুভব না করার ফলে তা তাদেরকে এই বিধানের প্রতি অজ্ঞতা ও বাস্তবায়ন না করার দিকে নিয়ে গেছে। নবী সাঃ বলেছেন: (যার হাতে আমার প্রাণ সে সত্তার কসম, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে থাকবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর তাঁর আযাব নিপতিত করবেন। তখন তোমরা তাঁর নিকট দোয়া করবে কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল হবে না।)
কাজেই উম্মতের যে বিষয়টি একান্ত প্রয়োজন তা হল, এই বিধানের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে দায়িত্বের পরিধি জানা, যেন তারা আল্লাহর আবশ্যকীয় বিধান পালন করতে পারে।

৫- খারাপ সঙ্গীঃ বন্ধুর উপর তার কথা, কাজ ও বিশ্বাসে খারাপ বন্ধুর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। আর ইসলামী শিক্ষানীতি এ বিষয়ে অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে সতর্ক করেছে। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ﴿ [বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্রু, মুত্তাকীরা ছাড়া।] তিনি আরো বলেন: ﴾وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَّقَدْ أَضَلَّনি عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا﴿ [যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম। হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার কাছে উপদেশ পৌছার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।] আর নবী সাঃ বলেছেন: (মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর গড়ে উঠে, সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিৎ সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।)
সুতরাং খারাপ সঙ্গী ব্যক্তির বিশ্বাসের উপর ও ইবাদতের বিধান পালনের উপর প্রভাব ফেলে। অনুরূপভাবে তা ব্যক্তির আচরণ ও চরিত্রের উপর প্রভাব ফেলে। ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: খারাপ বন্ধু তার জন্য বিচ্ছিন্নতা, বিভক্ততা, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, দুর্বলতা ও এমন বোঝা নিয়ে আসে যা বহন করতে সক্ষম নয়। তার কল্যাণ বিনষ্ট হয়, কল্যাণ বাদ দিয়ে তাদেরকে নিয়ে ও তাদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাদের চাহিদা ও দাবীর পিছনে চলে তার চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত হয়। কাজেই আল্লাহ ও পরকালের জন্য তার কী বাকী থাকে? বস্তুত খারাপ সঙ্গী হক হতে বাধা প্রদান করে, বাতিলের আদেশ দেয়, মিষ্ট ভাষায় খারাপ জিনিসকে সুশোভিত করে ও ভাল কাজ হতে নিষেধ করে; অকল্যাণ ও ফাসাদের প্রতি ভালবাসায় এবং কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতি ঘৃণায়। যেসব পরিবেশে মানুষ খারাপ সঙ্গীর শিকারে পরিণত হয় তা নিম্নরূপঃ
পড়ার সাথীঃ মাদরাসার সহপাঠীরা কোন সময় ভাল হয় আবার কোন সময় খারাপ হয়; উভয় প্রকার হতে কোন একটিকে এখতিয়ার করা এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার আলোকে। তাদের সাথে অধিক পরিমাণে উঠাবসা করা তাদের অনুসরণ ও অনুকরণ আবশ্যক করে, এজন্য নবী সাঃ আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছেন: (সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হল কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের ন্যায়। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হযত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।)
এজন্য পরিবারের উপর ওয়াজীব হল, তারা তাদের সন্তানদেরকে উত্তম সাথী নির্বাচনের দিকনির্দেশনা দিবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপরও অনুরূপ কর্তব্য, তারা তাদের সকল ছাত্রদেরকে উত্তম সাথী হিসেবে গড়ে তুলবে।
আত্মীয়-স্বজনঃ সকল আত্মীয়-স্বজনই কল্যাণকামী ও ভাল নয় এবং আত্মীয়দের সকল সন্তানেরাও সৎকর্মশীল নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক পরিবার উদাসীন থাকে এবং তাদের সন্তানদেরকে খারাপ আত্মীয়দের সাথে মেলামেশা করার সুযোগ দেয়। যার ফলে ক্ষতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। আর তারা বিচ্যুত আচরণের উপর পরস্পর অধিক সহযোগিতা করে। যেহেতু আত্মীয়তার সম্পর্কের সাথে প্রবৃত্তির সম্পর্ক সম্পৃক্ত থাকে। কাজেই এ ধোঁকা থেকে পরিবারের সতর্ক থাকা উচিত এবং খারাপ লোকদের থেকে বেঁচে থাকা উচিত তারা যে পর্যায়েরই আত্মীয় হোক না কেন।
গ্রামের সাথীঃ স্থানগত নৈকট্য, সহজ সাক্ষাত ও বিপর্যয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাথী হওয়ার কারণে অনেক সময় গ্রামের লোকদের মধ্য হতেই খারাপ সঙ্গী হয়ে থাকে। আর এটা ছোট-বড় সকলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। গ্রামের এ ধরণের খারাপ সঙ্গী হওয়ার পিছনে পিতা-মাতার উদাসীনতার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশেষত যখন গ্রামের লোকদের মাঝে ভাল ও তাকওয়ার কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার ও সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধের সুপরামর্শের অভাব থাকে।
কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীঃ কর্মক্ষেত্রে খারাপ সহকর্মীর অপর সহকর্মীদের উপর কার্যকর প্রভাব রয়েছে। যেহেতু ব্যক্তিগত কাজের মঙ্গলের জন্য তাদের মাঝে সম্পর্ক বিদ্যমান। যা কোন কোন সময় এমন গভীর হয় যে পারস্পরিক যিয়ারত ও সম্পর্ক তৈরীতে রূপ নেয়। ফলে তাদের মাঝে সম্পর্ক গভীর হয় এবং তাদের মাঝে ধারাবাহিক ফ্যাসাদের চিত্র ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং ব্যক্তি যদি সতর্ক না হয় তবে কিছু সময় পর দেখবে যে সে তাদের মতই খারাপ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে এমন শক্তিশালী সংকল্পে অভ্যস্ত হতে হবে, যেন কোন বিচ্যুত ব্যক্তি তার উপর প্রভাব ফেলতে না পারে। আর ঐ ধরণের সম্পর্কগুলো যেন কাজের ও দায়িত্বপালনের পরিধি অতিক্রম না করে। সর্বপরি সে তার কর্মক্ষেত্রে কল্যাণকামিতার উত্তম ভিত্তি হবে, যা দ্বারা তার চারপাশের লোকদের অবস্থা সংশোধন হবে।

টিকাঃ
(১) আত-তারবিয়া ইসলামিয়া ওয়া দাওরুহা ফি ইলাজিল আহদাসিল জানেহীন, পৃঃ (৩৭২)।
(২) সহীহ বুখারী (১/৪২৪ হাঃ ১৩৮৫), সহীহ মুসলিম (৪/২০৪৭, হাঃ ২২/২৬৫)।
(৩) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৬৮, হাঃ ৪৮৩৩), সুনানে তিরমিযি (৪/৫০৯, হাঃ ২৩৭৮)। শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(৪) আস-সুলুকীল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী, পৃঃ (১৫৮-১৫৯)।
(১) আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন পৃঃ (৩৬২)।
(২) সূরা আল-আরাফঃ (১৭৯)।
(৩) সূরা আর-রুম (৬-৭)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৪৩৭)।
(৫) সূরা আয-যুখরুফঃ (৩৬)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/১৩৮)।
(২) ফাতহুল বারী (১/৬১)।
(৩) ইকতেযাইস সিরাত আল-মুস্তাকীম, পৃঃ (২৫)।
(৪) কালেমাত ফিল আখলাক পৃঃ (৬২)।
(৫) মুকাদ্দামা ফি ইলমিন নাফসিল ইজতেমায়ী ওয়া দিরাসাত আল-মুসলিমীন, পৃঃ (১৫৮-১৫৯)।
(১) ফি জিলালিল কুরআন (৪/১৩/২০৬)।
(২) সূরা আর-রাদ (২৮)।
(৩) সূরা আল-জীনঃ (১৩)।
(৪) ওয়াকিউনাল মুয়াসারা, পৃঃ (১৬৮)।
(৫) আল-জারিমা ফিল মুজতামা পৃঃ (৩৮৫)।
(১) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩৮৬)।
(২) হাজাতুনা ইলাল ঈমান ওয়াল আখলাক বিজিওয়ারিল ইলমে ওয়াত তেকনুলোজিয়া, পৃঃ (৩০৪)।
(৩) ইগাসাতুল লাহফান পৃঃ (৯১-৯৪)।
(৪) সূরা আল-বাকারাঃ (১০)।
(৫) সূরা আল-মায়েদাঃ (৫২)।
(১) সূরা আল-আহযাবঃ (৩২)।
(২) সূরা ইউনুসঃ (৫৭)।
(৩) সুনানে আবু দাউদ (১/২৩৯-২৪০, হাঃ ৩৩৬), সুনানে ইবনে মাজাহ (১/১৮৯, হাঃ ৫৭২), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(৪) আত-তুহফা আল-ইরাকিয়া ফি আমালিল কালবিয়া, পৃঃ (১৬৩)।
(৫) বাসায়ের লিল মুসলিম আল মুয়াসের, পৃঃ (১১৯)।
(৬) ইলমুল আমরাদ আন-নাফসিয়া ওয়াল আকলিয়া, পৃঃ (৪৭৯-৪৭০)।
(৭) মুকাদ্দামাতুল খাদামাতুল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (৪২৪)।
(১) আস-সুলুকুল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী (১/১৪৫)।
(২) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া ওয়াল ইলাজান নাফসী, পৃঃ (২৯)।
(৩) পূর্বোক্ত পৃঃ (৪১)।
(৪) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া, পৃঃ (২১৭)।
(১) পূর্বোক্ত, পৃঃ (২১৯)।
(২) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া, পৃঃ (২২১)।
(১) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া ওয়াল ইলাজান নাফসী, পৃঃ (৪২)।
(২) মুশকিলাতুশ শাবাব ওয়াল মানহাজাল ইসলামী ফি ইলাজিহা, পৃঃ (৮৫-৮৬)।
(৩) আস-সিহহা আন-নাফসিয়া ওয়াল ইলাজান নাফসী, পৃঃ (৪৪)।
(১) মাদারিজুস সালেকীন (১/৪৮৮-৪৯৪)।
(২) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৪৯২)।
(৩) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৪৯১)।
(১) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৪৯৩)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৪/৫০৯-৫১০, হাঃ ২৩৮০) তিনি হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) মুকাদ্দামাতুল খাদামাতুল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (৪৪0)।
(১) আস-সুলুকুল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী, (১/১১১)।
(২) সুনানুল্লাহ ফিল মুজতামা মিন খিলালিল কুরআন, পৃঃ (৩৬-৩৭০।
(৩) ইলমুল ইজতেমা আল-হাদারী আত-তামাদ্দুন ফিশ শারকীল আওসাত, পৃঃ (১১৭-১৭৮)।
(১) আল-আয়ামেল আল-মুয়াদ্দিয়া ইলা তায়াতিল মুখাদ্দারাত, পৃঃ (৪২২)।
(২) আল-ইসলাম ওয়া দরুরিয়াতুল হায়া, পৃঃ (১৫২-১৫৩)।
(৩) সূরা সাবাঃ (৩৪)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৪০৯-৪১০)।
(৫) সূরা আল-কাসাসঃ (৭৭-৭৮)।
(১) আল-ইসলাম ওয়া দরুরিয়াতুল হায়া, পৃঃ (১৫৩)।
(২) সূরা হুদঃ (১১৬)।
(৩) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কায়ফা আলাজাহাল ইসলাম, পৃঃ (৮১)।
(৪) পূর্বোক্ত, পৃঃ (১৩)।
(৫) সুনানে নাসায়ী (৩/৭৩-৭৪, হাঃ ১৩৪৭), আহমাদ (৫/৩৬,৩৯,৪২), শায়খ আলবানী হাদিসটির সনদকে সহীহ বলেছেন।
(৬) সুনানে আবু দাউদ (২/১৯০-১৯১, হাঃ ১৫৪৪), সুনানে নাসায়ী (৮/২৬১, হাঃ ৫৪৬২), আহমাদ (২/৩০৫-৩২৫), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) সহীহ বুখারী (১/২৬৮, হাঃ ৮৩২, সহীহ মুসলিম (১/৪১২, হাঃ ১২৯-৫৮৯)।
(২) মুকাদ্দামাতুল খাদামাতাল ইজতেমাইয়া, পৃঃ (৪৪২-৪৪৩)।
(৩) আস-সুলুকুল ইজরামী ওয়াত তাফসীরুল ইসলামী (১/১১০)।
(৪) আল-আয়ামেল আল-মুয়াদ্দিয়া ইলা তায়াতিল মুখাদ্দারাত, পৃঃ (৪৫৮)।
(১) আল-জারিমা ফিল মুজতামা, পৃঃ (৩৮০)।
(২) পূর্বোক্ত (৩৭৮)।
(৩) সয়দুল খাতের, পৃঃ (১৬১)।
(৪) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (১৬)।
(৫) মুকাদ্দামাতুল খাদামাত আল ইজতেমাইয়া পৃঃ (৪৪২)।
(১) পূর্বোক্ত পৃঃ (৪৪১)।
(২) মাদারিজুস সালেকীন (২/৪৫৬)।
(৩) সূরা আল-বাকারাঃ (২৭৩)।
(৪) আল- জারিমা ফিল মুজতামা, পৃঃ (৩৮৪)।
(৫) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩৭২)।
(৬) পূর্বোক্ত, পৃঃ (৩৭২)।
(১) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (৯)।
(২) আল-জারিমা ফিল মুজতামা পৃঃ (৩৮২)।
(৩) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (২৭)।
(৪) সূরা আল-হুজুরাতঃ (১০)।
(৫) সূরা আল-হাদীদঃ (৭)।
(১) সূরা আল-বাকারাঃ (২৫৪)।
(২) সূরা নূহঃ (১০-১২)।
(৩) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/৪৫৩)।
(৪) সূরা আন-নূরঃ (৩২)।
(৫) সূরা আত-ত্বলাকঃ (৭)।
(৬) মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম পৃঃ (১৩৩)।
(৭) সূরা আল-হুজুরাতঃ (১৩)।
(৮) সহীহ মুসলিম (৪/২০২৪, হাঃ ১৩৮-২৬২২)।
(১) সূরা আল-আনআমঃ (১৪১)।
(২) সূরা আল-ইসরাঃ (২৬-২৭)।
(৩) সূরা আল-কাসাসঃ (৭৭)।
(৪) আল খুলুকুল কামেল (১/৬৫)।
(১) মাদারিজুস সালেকীন (১/৪৮৯)।
(২) সূরা আল-ফুরকানঃ (২৭-২৯)।
(৩) সূরা আয-যুখরুফঃ (৬৭)।
(৪) সূরা আল-বাকারাঃ (১৬৬-১৬৭)।
(৫) ইকতেযাইস সিরাতাল মুস্তাকীম, পৃঃ (২৫)।
(১) ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া (১০/৯৪)।
(২) সূরা আল-আনকাবূতঃ (৪৫)।
(৩) মাদরিজুস সালেকীনঃ (১/৪০২)।
(৪) ইবনে তাইমিয়া রচিত আল-ঈমান পৃঃ (২৮-২৯)।
(১) আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার পৃঃ (১৮)।
(২) আলামুল মুয়াক্কেয়ীন (২/১২২)।
(৩) সহীহ মুসলিম (২/৭০৫, হাঃ ৬৯-১০১৭)।
(১) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পৃঃ (৪৪)।
(১) ফাতাওয়া ইসলামীয়া (১/১১৮-১১৯)।
(১) প্রাগুক্ত (১/১১৭)।
(২) সূরা আল-মায়েদাঃ (২)।
(১) সহীহ মুসলিম (১/৬৯, হাঃ ৭৮-৪৯)।
(২) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, পৃঃ (২৬-২৭)।
(৩) সুনানে তিরমিযি (৪/৪০৬, হাঃ ২১৬৯), তিনি বলেন: এই হাদিসটি হাসান। শায়খ আলবানীও হাদিসকে হাসান বলেছেন।
(১) সূরা আল-মায়েদাঃ (৭৮-৭৯)।
(২) হাদিসটির তাখরিজ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩) সূরা আয-যুখরুফ: (৬৭)।
(৪) সূরা আল-ফুরকান: (২৭-২৯)।
(৫) সুনানে আবু দাউদ: (৫/১৬৮, হাঃ ৪৮৩৩)।
(১) মাদারিজুস সালেকীনঃ (১/৪৮৯)।
(২) সহীহ বুখারী (৩/৪৬৩, হাঃ ৫৫৩৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০২৬, হাঃ ১৪৬-২৬২৮)।

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 বিচ্যুত আচরণসমূহের দায়ভার

📄 বিচ্যুত আচরণসমূহের দায়ভার


উম্মতের মাঝে বিচ্যুত আচরণের উপস্থিতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে অধঃপতনের আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর ইসলামী শিক্ষার দায়িত্ব অর্পিত ব্যক্তিদের মাঝে ত্রুটি বিদ্যমানতার বিষয়ে এটা একটা ইন্ডিকেটর। বিচ্যুত আচরণের বিষয়ে শিক্ষার এই দায়ভার কোনটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং প্রত্যেক কর্তৃপক্ষই তাদের অবহেলার পরিমাণ অনুযায়ী দায়ী। সুতরাং দেশের কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে, অনুরূপভাবে পরিবারের, সমাজ ও ব্যক্তির তাদের পরিমাণ অনুযায়ী দায়ভার রয়েছে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক। আর প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। নেতা (イمام) একজন রক্ষক, সে তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে তার পরিবারের লোকজন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক, তাকে তার রক্ষনাবেক্ষন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইবনু উমর রাঃ বলেন আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছেন, ছেলে তার পিতার সম্পত্তির রক্ষক এবং সে জিজ্ঞাসিত হবে তার রক্ষনাবেক্ষন সম্বন্ধে। অতএব, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।)

বিচ্যুত আচরণের জন্য দায়ী কর্তৃপক্ষসমূহ নিম্নরূপঃ

প্রথমতঃ ব্যক্তিগত দায়ভারঃ
মানুষের উপর তার ব্যক্তিগত দায়ভার বর্তায়। সুতরাং সে তার চলাচল, বিচ্যুতি ও তদসংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে দায়িত্বশীল। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ﴿ [প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।] তিনি আরো বলেন: ﴾فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ * وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴿ [কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে সে তাও দেখবে।]

কাজেই কোন ব্যক্তির জন্য উচিত নয় যে, সে তার বিচ্যুতির জন্য সামাজিক পরিবেশকে দায়ী করবে, -যে পরিবেশে সে বসবাস করছে তা যদি বিচ্যুত হয়- অথবা খারাপ বন্ধু বা পরিবারকে দায়ী করবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যেন সে তার দায়িত্ব বহন করতে পারে। তাকে জ্ঞান দান করেছেন যা বিধি-বিধান প্রযোজ্য হওয়ার ভিত্তি, আর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন, যাদের সর্বশেষ হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাঃ, কুরআন আমাদের মাঝে বিদ্যমান, অনুরূপভাবে সুন্নাহ ও বিদ্যমান যা আমাদেরকে হকের পথ দেখায় এবং আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কি আবশ্যক করেছেন আর কি নিষেধ করেছেন তা বর্ণনা করে এবং মানব মনে এমন কিছুর উদ্রেক করে যা এগুলোকে আবশ্যক করে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا﴿ [তারপর তাকে তার সৎকাজের এবং তার অসৎ-কাজের জ্ঞান দান করেছেন।] অর্থাৎ তার জন্য ভাল-মন্দ বর্ণনা করে দিয়েছেন। শাওকানী বলেন: অর্থাৎ তাকে জানিয়েছেন ও বুঝিয়েছেন তার জন্য কি এবং এর মাঝে কি ভাল-মন্দ রয়েছে।

মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে আখেরাতের জন্য কি কাজ করেছে ও কি অর্জন করেছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে ও চিন্তা করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴿ [হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; এবং প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।]

নবী সাঃ ব্যক্তির চলাফেরারের বিষয়ে তার স্বীয় দায়িত্বের কথা বর্ণনা করে বলেন, (কিয়ামত দিবসে কোনো বান্দার পা ততক্ষণ পর্যন্ত নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: কোন কাজে তার জীবন অতিবাহিত করেছে এবং ইলম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে এবং তার ধন-সম্পদ কোথা হতে উপার্জন করেছে এবং তা কোথায় ব্যয় করেছে; এবং তার দেহ কোন কাজের মধ্য দিয়ে জীর্ণ করেছে।)

মুসলিম ব্যক্তির জানা উচিত যে, নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সর্বোত্তম জিহাদের অন্তর্ভুক্ত, এমনকি এটাকে সর্বশ্রেষ্ট জিহাদ বলা হয়েছে। নবী সাঃ বলেছেন: (প্রকৃত মুজাহিদ হলো সেই, যে স্বীয় নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে।) আর অপারগ ব্যক্তি সে যার সম্পর্কে উমর রাঃ বলেন: (প্রকৃত অপারগ ব্যক্তি সেই যে তার স্বীয় নফসকে পরিচালনা করতে অক্ষম।)

ফেরাউনের স্ত্রীর কথা চিন্তা করুন! সে একজন কাফের, উদ্ধত ও প্রতাপশালী ব্যক্তির গৃহে এবং আল্লাহর শত্রুর বাড়ীতে ছিল, কিন্তু সে তার নিজের দায়িত্বের বিষয় অনুধাবন করতে পেরেছিল, তাই সে কুফরীর দায় প্রকাশ করেনি যদিও সে তার অধীনে থাকত। বরং সে ঈমান এনেছিল এবং এমন কথা বলেছিল যার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছে: ﴾وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴿ [আর যারা ঈমান আনে, আল্লাহ্ তাদের জন্য পেশ করেন ফেরাউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত, যখন সে এ বলে প্রার্থনা করেছিল, হে আমার রব! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে উদ্ধার করুন ফেরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।]

আবার অনেক মানুষ তাদের বিচ্যুতির পক্ষে দলিল পেশ করে তাকদীরের কথা বলে। অর্থাৎ এটা তাদের উপর নির্ধারিত ও লিপিবদ্ধ। আর তারা ভুলে যায় শরীয়তের পক্ষ হতে তাদের কর্ম ও চলাচলের বিষয়ে দায়িত্ববোধ সম্পর্কে। অপরপক্ষে তাদেরকে রিযিক অন্বেষনের পিছনে ছুটতে দেখা যায় এই বলে যে, আল্লাহ তায়ালা সাবাব তথা উপকরণ গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তারা বিচ্যুতির ব্যাপারে নিজেদের বিভ্রান্ত করে, কিন্তু রিযিক উপার্জনের ক্ষেত্রে সঠিকপথে থাকে।

বান্দার নির্ধারিত তাকদীরের বিষয়ে দুটি অবস্থা এবং আদিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রেও দুটি অবস্থা। যখন এই অবস্থাগুলো বুঝবে তখন তার বিষয়গুলো ঠিক থাকবে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এর বর্ণনা করেছেন যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপঃ
প্রথম: তাকদীরের ক্ষেত্রে বান্দার অবস্থাঃ
১- তাকদীর পতিত হওয়ার পূর্বের অবস্থা: এই অবস্থায় তার কর্তব্য হচ্ছে সে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে, তাঁর উপর ভরসা করবে এবং তাঁর নিকট দোয়া করবে।
২- তাকদীর পতিত হওয়ার পরের অবস্থা: যদি তার কর্ম ছাড়াই তাকদীর নির্ধারিত বিষয় এসে যায়, তবে তার কর্তব্য হচ্ছে, ধৈর্যধারণ করা ও সন্তুষ্ট থাকা। আর যদি তার কর্মের ফলে তাকদীর নির্ধারিত বিষয় আসে এবং সেটা নিয়ামত হয়, তবে তার কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা করবে, আর যদি পাপের কাজ হয় তবে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে。

দ্বিতীয়ঃ আদিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে বান্দার অবস্থাঃ
১- কাজ করার পূর্বের অবস্থাঃ তা বাস্তবায়নের জন্য সংকল্প করা ও সে ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।
২- কাজ করার পরের অবস্থাঃ ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং কল্যাণকর কাজের নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া করা। এর মাধ্যেমে ব্যক্তি তার উত্তম আচরণ বাস্তবায়ন করবে এবং আদিষ্ট বিষয় ও তাকদীরের বিষয় হৃদয়াঙ্গম করতে পারবে।
কাজেই একজন মুসলিম তার চলাচল ও বিচ্যুতির বিষয়ে নিজের দায়িত্ববোধ অনুধাবন করবে। যদি সে শাস্তির উপযুক্ত হয় তবে দুনিয়াতে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। আর পরকালে আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন, নইলে তাকে শাস্তি দিবেন। তার কর্তব্য হল আল্লাহ থেকে যথাযথ লজ্জাবোধ করা যে, তিনি তাকে পাপকাজ করতে দেখবেন。

দ্বিতীয়তঃ পারিবারিক দায়ভারঃ
প্রতিপালনের পরিভাষায় পরিবারের অর্থ: তারা সে সমস্ত লোক যারা তার চারপাশে অবস্থান করে এবং তাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশ্বায়নের ফলে বর্তমানে মুসলিম পরিবারগুলো অসংখ্য আক্বীদাগত, চরিত্রগত ও চিন্তাগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে; যে বিশ্বায়নের মাধ্যমে চরিত্রগত ও ধর্মীয় সামাজিক পার্থক্যগুলোকে দূর করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো সন্তানদের প্রতি পরিবারের লালন-পালনগত দায়ভার বাড়িয়ে দিচ্ছে; বিশেষত এমন বিশ্বে যখন পঠনযোগ্য ও ভিষ্যুয়াল প্রচার মাধ্যমেগুলো বিস্তার লাভ করেছে যা পূর্ব হতে পশ্চিমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তাকে পথের দুর্গমতা বা দূরত্ব বাধা দিতে পারে না। বিশেষ যখন তা আকর্ষণীয় মোড়কে প্রচার করা হয়।

উপরাস্তু যখন মুসলিম পরিবারগুলো বৈশ্বিক সামাজিক পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, নারীরা কর্মক্ষেত্রে বের হচ্ছে, পুরুষের সাথে অফিস, মার্কেট ও কারখানায় মেলামেশা করছে। এ সকল বিষয়গুলো মুসলিম পরিবারকে নষ্টের হুমকি দিচ্ছে এবং এর সদস্যদের প্রতি শিক্ষার দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করছে。

ইসলাম পরিবারের উপর তার সদস্যদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক। আর প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। নেতা (ইমাম) একজন রক্ষক, সে তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে তার পরিবারের লোকজন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক, তাকে তার রক্ষনাবেক্ষন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।) এই হাদিস স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে ব্যক্তির দায়িত্বকে শক্তিশালী করে, যারা তার অধীনস্থ। অনুরূপভাবে মহিলা তার বাড়ীর সদস্যদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাদের হক আদায় ব্যতীত তার এই দায়িত্ব সম্পন্ন হবে না। যে দায়িত্বের অন্যতম হল রক্ষণাবেক্ষণ করা, দিকনির্দেশনা দেয়া এবং ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতিতে উপদেশ দেয়া; যার মাঝে থাকবে উত্তম আদর্শ, সদুপদেশ, উপমা বর্ণনা, আগ্রহী করা ও ভীতি প্রদর্শন করা এবং সবশেষ আদব শিক্ষা দেয়া。

মহান আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ﴿ [হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর।] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন: তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের কাজ কর, তাঁর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তোমাদের পরিবারকে যিকিরের নির্দেশ দাও তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন। আলী বিন আবু তালেব রাঃ বলেন: তোমরা তাদের শিক্ষা দাও ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও。

পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা পরিপালনগত দায়িত্ব পালনের দাবী রাখে; নসিহত ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। কাজেই মুসলিম পরিবারের উপর আবশ্যক তাদের সন্তানদের প্রতি গুরুত্ব দেয়া ও হেফাযত করা এবং তাদেরকে সকল ধরণের চারিত্রিক বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা।

এই উম্মতের সালাফে সালেহীনগণ পরিবারের দায়িত্ব ও তার বিশাল গুরুত্ব অনুধাবন করতেন। উমর বিন আব্দুল আজিজ রহঃ আমাদের জন্য পরিপালনগত দায়িত্ববোধের একটি উত্তম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে গেছেন। তিনি তার সন্তানদেরকে উত্তমভাবে লালন-পালন করেছিলেন। তার নিকট সংবাদ পৌছেছিল যে, তার এক সন্তান একহাজার দিরহাম দিয়ে আংটির পাথর ক্রয় করেছেন, তখন তার কাছে লিখে পাঠালেন: আমার নিকট সংবাদ এসেছে যে, তুমি একহাজার দিরহাম দিয়ে একটি আংটির পাথর ক্রয় করেছ, তুমি সেটা বিক্রয় করে দিয়ে তার দ্বারা একহাজার জন ক্ষুধার্থকে খাবার দাও। আর তুমি একটি লোহার চায়না আংটি খরিদ কর এবং তাতে লিখে রাখ, আল্লাহ সে ব্যক্তির প্রতি রহম করুন যে তার নিজের মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত।

সুতরাং বর্তমানে পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে; যেহেতু জীবনকে বিশ্বায়ন, স্নায়ুযুদ্ধ ও আক্বীদাগত বিচ্যুতি বেষ্টন করে রেখেছে এবং সরাসরি সম্প্রচার ও দ্রুত ভ্রমণমাধ্যমের কারণে দূরত্ব কমে এসেছে।

তৃতীয়তঃ সামাজিক দায়ভারঃ
আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে একটি মহান বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যদি তারা এই বৈশিষ্ট্যের দাবী অনুযায়ী কাজ করে। বৈশিষ্ট্যটি হল উত্তমতা যার চাহিদা হল সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মাধ্যমে পারস্পরিক কল্যাণকামনার দায়িত্ব পালন করা। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ﴿ [তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য যাদের বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।]

উপরোক্ত আয়াতে এই উম্মতের প্রশংসা করা হয়েছে যতক্ষণ প্রর্যন্ত তারা এটা বাস্তবায়ন করবে এবং এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে। আর যখন তারা বাধা দেয়া ছেড়ে দিবে এবং খারাপ কাজে সহমত পোষণ করবে তখন তাদের থেকে এই প্রশংসা বিলীন হয়ে যাবে। কাজেই এই উম্মতের যে ব্যক্তি উক্ত গুণগুলো ধারণ করবে সে তাদের সাথে প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত হবে। কাতাদা রহঃ বলেন: আমার কাছে সংবাদ পৌছেছে উমর রাঃ একবার হজ করতে গিয়ে মানুষের মাঝে সহনশীলতা দেখতে পেলেন, তখন তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন [তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য যাদের বের করা হয়েছে;] অতঃপর বললেন: যে ব্যক্তি এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আনন্দিত হতে চায় সে যেন এর শর্ত পূরণ করে। আর যে ব্যক্তি এই গুণগুলো ধারণ করবে না, সে আহলে কেতাবদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হবে যাদেরকে আল্লাহ তিরস্কার করেছেন।

এটা উপরোক্ত উপকরণগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ হতে এই উম্মতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান; যার মাধ্যমে তারা বৈশিষ্ট্য মন্ডিত হয়েছে এবং সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে। তারা শ্রেষ্ঠ মানুষ নসিহত পেশ, কল্যাণের প্রতি ভালবাসা, দাওয়াত, শিক্ষা, দিকনির্দেশনা এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের বাধা প্রদানের দিক থেকে। তাই আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে আদেশ করেছেন যেন তারা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করণের দায়িত্ব পালন করে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴿ [আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম।]

ইসলাম সমাজের উপর সেই দায়িত্ব অর্পণ করে যা তার সাধ্যের মধ্যে। তাইতো সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী কল্যাণ কামনার দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘৃণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর।)

সামাজিক দায়িত্ব শুধু খারাপ কাজে বাধা প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কর্তব্য হল খারাপ কাজ বিদ্যমানতার কারণ দূর করা; দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতার মাধ্যমে। যেন সে তার প্রয়োজন পূরণে চুরি ধোঁকাবাজী ইত্যাদি বিচ্যুত আচরণের দিকে না যায়।

আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য আয়াতে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন: ﴾لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ﴿ [তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করবে না। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।] আবু তালহা রাঃ এই আয়াত শ্রবণের পর খুবই চমৎকার ঘটনা ঘটান, যা আনাস রাঃ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: (মদিনার আনসারীগণের মধ্যে আবু তালহা (রাঃ) সব চাইতে অধিক খেজুর বাগানের মালিক ছিলেন। মসজিদে নববীর নিকটবর্তী বায়রুহা নামক বাগানটি তাঁর কাছে অধিক প্রিয় ছিল। রাসূল সাঃ তাঁর বাগানে প্রবেশ করে এর সুপেয় পানি পান করতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ [তোমরা যা ভালোবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করবে না] তখন আবূ তালহা (রাঃ) রাসূল সাঃ এর কাছে গিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ বলছেনঃ তোমরা যা ভালোবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনও পূণ্য লাভ করবেনা। আর বায়রুহা বাগানটি আমার কাছে অধিক প্রিয়। এটি আল্লাহর নামে সাদকা করা হল, আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়রূপে থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভাল মনে করেন তাকে দান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাকে ধন্যবাদ এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ, এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ।)

চতুর্থতঃ রাষ্ট্রের দায়ভারঃ
রাষ্ট্র ব্যতীত সামাজিক মূল্যবোধ ঠিক হয় না, আর শাসক ব্যতীত কোন রাষ্ট্র হতে পারে না যে শাসক সেখানে ফয়সালা করবে ও আল্লাহর বিধান কায়েম করবে। আর শাসকের বিষয়গুলো প্রজা ছাড়া বাস্তবায়িত হবে না, যারা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জানবে, শাসকের হক আদায় করবে, তার কথা শ্রবণ করা, তার জন্য কল্যাণ কামনা ও একনিষ্টতার মাধ্যমে এবং সমাজের হক আদায় করবে রক্ষণাবেক্ষণ, সংশোধন ও ক্ষতি প্রতিরোধের মাধ্যমে, সর্বোপরি দেশ থেকে তা নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে।

সুতরাং খারাপ চরিত্র দূরীভূত করা ও তা প্রতিরোধ করা শাসকের দায়িত্ব। এরা দুই ধরণের: ওলামা ও শাসকবর্গ। এদের সাথে অন্তর্ভুক্ত হল, রাজাগণ, মাশায়েখগণ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ও সরকারী কর্মচারীবৃন্দ। তাদের প্রত্যেকের উপর আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তার আদেশ দেয়া এবং তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বারণ করা আবশ্যক।

রাষ্ট্রের আমানত বাস্তবায়নের ব্যাপারে শাসক আল্লাহর সামনে জিজ্ঞাসিত হবে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সকলেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক একজন দায়িত্বশীল এবং সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।) তিনি আরো বলেন: (আল্লাহ তায়ালা যে বান্দাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে খেয়ানতকারীরুপে যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।) তিনি আরো বলেন: (এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; সে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ প্রবেশ করতে পারবে না।) তিনি শাসনভারের দায়িত্ব সম্পর্কে আবু যার রাঃ কে বলেছিলেন: (হে আবূ যার! তুমি দুর্বল অথচ এটা হচ্ছে একটা আমানত। আর কিয়ামতের দিন এটা লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে। তবে যে এটা যথাযথরূপে গ্রহন করবে এবং তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে (তার কথা স্বতন্ত্র)।)

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শাসকের জন্য যে বিষয়গুলো পালন আবশ্যকীয় তা নিম্নরূপঃ
১- প্রমাণিত মূলনীতি ও সালাফে সালেহীনের ঐক্যমতের আলোকে দ্বীনের হেফাযত করা।
২- বিবাদমান দুই পক্ষের মাঝে সমাধান করে দেয়া, যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কোন যালিম সীমালঙ্ঘন করতে না পারে বা কোন নির্যাতিত নিজেকে দুর্বল মনে না করে。
৩- জাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও নারীর সংরক্ষণ করা যেন মানুষেরা জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে ও সফরের সময় নিরাপত্তা অনুভব করে নিজের ব্যক্তি বা সম্পদের ক্ষতি হওয়া থেকে।
৪- শরয়ী শাস্তি বাস্তবায়ন করা; যেন আল্লাহর হারামকৃত বিষয় লঙ্ঘন করা না হয় এবং বান্দার হক নষ্ট থেকে রক্ষা পায়।
৫- অপচয় ও কৃপণতা মুক্তভাবে বায়তুল মাল থেকে দান ও বেতন ভাতা নির্ধারণ করা এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করা।

রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে ভালকাজের প্রচার করা ও খারাপ কাজ প্রতিহত করা যা বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হল মানুষের মাঝে শরয়ী শিক্ষার বিস্তার করা এবং খারাপ চরিত্রবানদের উপর শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ করা। শাস্তি দুই ধরণের;
সাধারণ শাস্তিঃ তা হল শরয়ীতের নিষিদ্ধ কাজ করার ফলে কিংবা শরীয়তের আদেশ পালন না করার কারণে সে শাস্তি হয়।
হদের শাস্তিঃ আল্লাহর হক লঙ্ঘনের কারণে শরীয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট শাস্তি। যেমন যেনা, সমকামিতা, চুরি, মদ্যপান, মুরতাদ হওয়া, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইত্যাদি হদের শাস্তি。
অনির্ধারিত শাস্তিঃ যে সমস্ত অপরাধের ক্ষেত্রে শরীয়তে নির্দিষ্ট হদ নেই তার জন্য শাস্তি দেয়া। এর হুকুম ব্যক্তি ও কর্ম ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সুতরাং এটা এক দিক থেকে হদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কেননা তা সংশোধন ও সতর্ক করার জন্য শাস্তি, আর হদ থেকে ভিন্ন এ কারণে যে, অপরাধের ভিন্নতার কারণে তা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে。

সুতরাং রাষ্ট্র যদি তার শরয়ী শাস্তি প্রয়োগ এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের দায়িত্ব পালন করে তাহলে সমাজের বিষয়গুলো ঠিক থাকে এবং বিচ্যুত ব্যক্তিরা বিরত থাকে। আর যদি এই দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করে তাহলে সমাজের মানুষদের মাঝে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, খারাপ চরিত্র ব্যাপকতা লাভ করে এবং বিপদ নেমে আসে। তাই মুসলিম দেশের তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক।

নবী সাঃ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদের শাস্তি প্রয়োগ না করার ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেছেন: (যে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমা লঙ্ঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মতো, যারা কুরআ'র মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পেল উপর তলায় আর কেউ নীচ তলায় (পানির ব্যবস্থা ছিল উপর তলায়) কাজেই নীচের তলার লোকেরা পানি সংগ্রহ কালে উপর তলার লোকদের ডিঙ্গিয়ে যেত। তখন নীচ তলার লোকেরা বলল, উপর তলার লোকেদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নেই (তবে ভালো হয়) এমতাবস্থায় তারা যদি এদেরকে আপন মর্জির উপর ছেড়ে দেয় তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে) তবে তারা এবং সকলেই রক্ষা পাবে।)

রাষ্ট্রের শাসকের উপর আবশ্যক হল উপযুক্ত লোকদের উপর দায়িত্ব অর্পন করা। কেননা মানুষেরা হল আল্লাহর বান্দা আর শাসকগণ হলেন বান্দাদের উপর আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তারা বান্দাদের ব্যাপারে কার্যনির্বাহী; পরস্পর অংশিদারিত্ব পর্যায়ের। সুতরাং তাদের মাঝে দায়িত্ব ও প্রতিনিধিত্বের অর্থ রয়েছে। সুতরাং দয়িত্বশীল ও প্রতিনিধি যখন কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয় এবং তার চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে বাদ দেয় অথবা কোন পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশি দামে ক্রয় করার লোক থাকা সত্ত্বেও কম দামে বিক্রি করে তাহলে সে খিয়ানত করল।

যখন মুসলিম রাষ্ট্র এই দায়িত্বগুলো পালন করবে, তখন তাদের অবস্থা ভাল হবে, তাদের চরিত্র সংশোধিত হবে এবং তাদের চারিত্রিক বিচ্যুতি কমে আসবে। উমর রাঃ মদিনায় নৈশ প্রহরী রাখতেন এবং তিনি নিজে দিন-রাত মদিনার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন মুসলিমদের অবস্থা জানার জন্য, বঞ্চিতদেরকে তাদের হক দেয়ার জন্য এবং অত্যাচারিতদেরকে সাহায্য করা ও যালিমদেরকে পাকড়াও করার জন্য।

যদি সমাজ এমন দেশে হয় যে দেশ কল্যাণ প্রচারে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করে এবং শরয়ী শাস্তি বাস্তবায়ন করে, তাহলে সে সমাজের লোকদের মাঝে এই হদগুলোর প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত হবে, বিচ্যুত ও খারাপ আচরণ থেকে দূরে থাকবে এবং উন্নত চরিত্রের প্রতি তারা আগ্রহী হবে। সুতরাং এই সমাজের মাঝে কোন অপরাধ বিস্তার লাভ করবে না। কেননা যখন সমাজের মাঝে অকল্যাণ ও খারাপ চরিত্রের পথ রুদ্ধ হবে তখন অবশ্যই কল্যাণ ও উত্তম চরিত্রের পরিধি বিস্তার লাভ করবে। ফলে মানুষেরা ইসলামী চরিত্রে ভরপুর সুখী জীবন যাপন করবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা প্রয়োজন তা হল, যদি শাসক তার প্রজাদের প্রতি যুলুম করে, তবে মুসলিমের প্রতি আবশ্যক হল ধৈর্যধারণ করা, বিদ্রোহ ও বিতর্কের মাধ্যমে তার মোকাবেলা করা বৈধ নয়। কেননা তাতে মুসলিমদের উপর অনেক বিপদ ও ক্ষতি নেমে আসে। যখন কোন সম্প্রদায় তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তখন তাদের আঙ্গিনায় অকল্যাণ নেমে আসে। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা আমার ওফাতের পর অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়া দেখতে পাবে, তখন তোমরা ধৈর্যধারণ করবে, হাউযে কাওসারে আমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত।) এক ব্যক্তি রাসূল সাঃ কে জিজ্ঞেস করেছিল, (হে আল্লাহর নবী! যদি আমাদের উপর এমন শাসকেরা ক্ষমতাবান হয় যে, তারা তাদের হক তো আমাদের কাছে দাবী করে কিন্তু আমাদের হক তারা দেয়না। এমতাবস্থায় আপনি আমাদেরকে কি করতে বলেন? তিনি তার উত্তর এড়িয়ে গেলেন। তিনি আবার তাকে প্রশ্ন করলেন, আর তিনি এড়িয়ে গেলেন। এভাবে প্রশ্নকারী দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারও একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন আশআস ইবন কায়েস রাঃ তাকে টান দিলেন। তিনি বললেন: তোমরা শুনবে এবং মানবে। কেননা তাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তাদের উপর বর্তাবে আর তোমাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তোমাদের উপর বর্তাবে।)

পঞ্চমতঃ শিক্ষার পরিবেশের দায়ভারঃ
এর দ্বারা শিক্ষা ও সংশোধনের জন্য প্রস্তুতকৃত স্থানসমূহ। যেমন: মাদরাসা, মসজিদ, সামাজিক সংরক্ষণ অফিস, কিশোর সংরক্ষণ অফিস ও জেলখানা। এই পরিবেশগুলোর কার্যকর প্রভাব রয়েছে, খারাপ চরিত্রের প্রতিষেধকমূলক বা প্রতিরোধমূলক হোক। যেহেতু এর মাধ্যমে উত্তম চরিত্রের পরিপালনের বিস্তার এবং নোংরা চরিত্রের প্রতিকার করা হয় ও যারা এতে অভ্যস্ত তাদের থেকে তা দূর করা হয়।

মানুষের মাঝে উত্তম চরিত্র প্রথিত করতে এবং তাদের খারাপ ও বিচ্যুত আচরণকে প্রতিরোধ করতে এই পরিবেশের উপর শিক্ষণীয় গুরুত্বারোপের দায়িত্ব অর্পিত হয়। যা নবী সাঃ এর এই কথা থেকে গ্রহণ করা হয় (তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সকলেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।) সুতরাং শিক্ষক তার ক্লাসে ছাত্রদের বিষয়ে দায়িত্বশীল, মসজিদের ইমাম তার মসজিদের লোকদের বিষয়ে দায়িত্বশীল, তার এলাকায় খারাপ চরিত্রগুলো খুজে বের করে হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তার প্রতিকার করবে; আকর্ষণীয় জুমার খুতবার মাধ্যমে যাতে থাকবে ভাল কাজে উৎসাহ প্রদান, খারাপ থেকে সতর্কবার্তা, সত্য ঘটনা, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদাহরণ বর্ণনা এবং খারাপ চরিত্রের ফলে সমাজে যে সব ঘটনা ঘটছে তার পর্যালোচনা।

জেলার তার জেলে বন্দী লোকদের বিষয়ে দায়িত্বশীল, সে তাদের দেখাশোনা করবে, তাদেরকে উত্তম চরিত্রের প্রতি উৎসাহিত করবে, তাদের বিচ্যুতির দিকগুলো জানবে এবং তাদেরকে শিক্ষা, উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নিয়োগ দিবে যে তাদের থেকে অজ্ঞতা ও নোংরা চরিত্রকে দূর করবে।

অনুরূপভাবে সামাজিক সুরক্ষা অফিসসমূহ ও কিশোর অপরাধ বিষয়ক অফিসসমূহ তাদের সদস্যদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তারা তাদের সন্তানতুল্য। আর আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে সৎকর্ম, অনুগ্রহ ও পারস্পারিক সহযোগিতা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন : ﴾وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴿ [নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না।] নবী সাঃ বলেছেন: (আল্লাহ তায়ালা যে বান্দাকে জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে খেয়ানতকারীরুপে যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।)

এ সকল দায়িত্বের ক্ষেত্রে বর্ণিত পরিণতি মুসলিমদের কোন বিষয়ে দায়িত্বশীলদের বিশাল মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। চায় তিনি শাসক হোন বা শিক্ষক হোন বা কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান হোন। কেননা মানুষদের দায়িত্বভার গ্রহণ করা সহজ কথা নয়। বরং ইসলামী মানহাজে তা বিশাল আমানত আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ; যা মানুষদের সকল বিষয় ও কর্মে পূর্ণ প্রচেষ্টার দাবী রাখে। আর এটা আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত মানুষের সকল ধরণের প্রতিপালন ও দিকনির্দেশনাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তায়ালা এই আমানত আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন: ﴾إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا﴿ [নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।] তিনি আরো বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴿ [হে ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।]

আর যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলগণ শিক্ষার দায়িত্বের আমানত আদায় করতে অক্ষম হবে তখন শিক্ষাদান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তাদের অধীনস্তদের মাঝে উত্তম চরিত্র বির্নিমাণে ও বিচ্যুত চরিত্র দূরীকরণে ব্যর্থ হবে। তার ফলে সমাজে অপরাধ ও ছিনতাই বৃদ্ধি পাবে এবং ফাসাদ ও সম্ভ্রমহানী ব্যাপক আকার ধারণ করবে। সর্বোপরি মানুষের হক নষ্ট করা হবে। বর্তমান সমাজ যে চারিত্রিক অধঃপতন লক্ষ্য করছে তা মূলত দায়িত্ব ও তার মহত্ব অনুভব না করার কারণে। আর এ থেকে সৃষ্টি হয়েছে দুর্বল ও ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা যা মানুষকে তার প্রবৃত্তি, আকাঙ্খা ও শয়তানী খেয়াল প্রতিরোধ করার ব্যাপারে শক্তিশালী করে না। সুতরাং মুসলিম সমাজকে অবশ্যই খারাপ চরিত্র প্রতিরোধে তার শিক্ষার দায়িত্ববোধ অনুধাবন করতে হবে এবং এই পরিবেশ তার সর্বশক্তি দিয়ে উত্তম চরিত্র গঠন করতে ও খারাপ চরিত্র দাফন করতে চেষ্টা করবে。

টিকাঃ
(১) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হাঃ ৬৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হাঃ ২০/১৮২৯)。
(২) সূরা আল-মুদ্দাস্সিরঃ (৩৮)。
(৩) সূরা আয-যিলযালঃ (৭-৮)。
(১) সূরা আশ-শামসঃ (৮)。
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/৫৫১)。
(৩) ফাতহুল কাদীর (৫/৪৪৯)。
(৪) সূরা আল-হাশরঃ (১৮)。
(৫) সুনানে তিরমিযি (৪/৫২৯, হাঃ ২৪১৭), তিনি বলেছেনঃ হাদিসটি হাসান সহীহ, শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(৬) আল-জামে লি আহকামিল কুরআন (১৩/২৪২)。
(৭) সুনানে তিরমিযি (৪/১৪২, হাঃ ১৬২১), মাসনাদে আহমাদ (৬/২০), শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন。
(৮) আদাবুদ দুনিয়া ওয়া আদদ্বীন পৃঃ (২৩৪)。
(১) খালেদ হামেদ রচিত আল-মুশকিলা আত-তারবাবীয় আল-উসারীয়া পৃঃ (৪)。
(২) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হাঃ ৬৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হাঃ ২০/১৮২৯)。
(৩) সূরা আত-তাহরীমঃ (৬)。
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/২৩৩)。
(৫) পূর্বোক্ত ((৪/৪১৭)。
(১) সিরাত ও মানাকিবু উমার বিন আব্দুল আজীজ, পৃঃ (৩১৫)。
(২) সূরা আলে ইমরানঃ (১১০)。
(৩) আল-জামে লি আহকামিল কুরআন (৪/১১১)。
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৪০৪)。
(১) তাফসীরে সাদী (১/২৬২)。
(২) সূরা আলে ইমরানঃ (১০৪)。
(৩) সহীহ মুসলিমঃ (১/৬৯, হাঃ ৭৮-৪৯)。
(৪) সূরা আলে ইমরান (৯২)。
(১) সহীহ বুখারী (৩/২০৯, হাঃ ৪৫৫৪)。
(২) ইবনে তাইমিয়া রচিত সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, পৃঃ (৬৮)。
(৩) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হাঃ ৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হাঃ ২০/১৮২৯)。
(৪) সহীহ মুসলিম (১/১২৫, হাঃ ২২৭-১৪২)。
(৫) পূর্বোক্ত (১/১২৬, হাঃ ২২৯-১৪২)。
(৬) পূর্বোক্ত (৩/১৪৫৭, হাঃ ১৬/১৮২৫)。
(১) আল-আহকাম আস-সুলতানিয়াঃ পৃঃ (১৮)。
(২) আল- উকুবাত ফিত তাশরী আল ইসলামী, পৃঃ (১৯)。
(৩) নায়লুল আওতার (৭/৮৭)。
(৪) আল-আহকাম আস-সুলতানিয়াঃ পৃঃ (১৮)。
(১) সহীহ বুখারী (২/২০৫-২০৬, হাঃ ২৪৯৩)。
(২) আস-সিয়াসা আশ-শারয়িয়া, পৃঃ (১৪)。
(৩) তারিখু উমার বিন খাত্তাব (১০২-১১৩)。
(৪) সহীহ মুসলিম (৩/১৪৭৪, হাঃ ৪৮-১৮৪৫)。
(৫) সহীহ মুসলিম (৩/১৪৭৪-১৪৭৫, হাঃ ৪৯-১৮৪৬)。
(১) সূরা আল-মায়েদাঃ (২)。
(২) সহীহ মুসলিম (১/১২৫, হাঃ ২২৭-১৪২)。
(১) সূরা আন-নিসা: (৫৮)。
(২) সূরা আল-আনফাল: (২৭)。

ফন্ট সাইজ
15px
17px