📄 শিষ্টাচার ও চারিত্রিক গুণাবলী
দ্বীন ইসলামের বিশেষত্ব ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অন্তর্গত হল, এটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক শিষ্টাচারে স্বয়ংসম্পূর্ণ; যা ব্যক্তির চারিত্রিক পরিপালন নিশ্চিত করে।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযী রহঃ আদবকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন(১); সেগুলো:
১- আল্লাহর সাথে আদব।
২- রাসূল সাঃ ও তার আনীত শরীয়তের সাথে আদব।
৩- সৃষ্টিজীবের সাথে আদব।
এই অনুচ্ছেদে আমি ইসলামী পরিপালন সংশ্লিষ্ট শিষ্টাচার ও চারিত্রিক গুণাবলীকে বিভক্ত করব:
প্রথমত: আল্লাহ তায়ালার সাথে আদব।
দ্বিতীয়ত: রাসূল সাঃ এর সাথে আদব।
তৃতীয়ত: মাতা-পিতার সাথে আদব।
চতুর্থত: রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের সাথে আদব।
পঞ্চমত: প্রতিবেশির সাথে আদব।
ষষ্ঠত: চারিত্রিক গুণাবলী: লজ্জাশীলতা। ধৈর্য। সত্যবাদিতা। বিনয়। সহমর্মিতা ও দয়া। আমনতদারিতা।
প্রথমত: আল্লাহর সাথে আদব:
চারিত্রিক পরিপালনের গুরুত্বপূর্ণ ও মহত্তম দিক হল ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর একনিষ্ঠ অনুসরণ এবং কথা ও কাজে আল্লাহর প্রতি খালেস নিয়তের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর ভয়, আশা, মহাব্বত এবং ইখলাসের উপর বেড়ে উঠবে। যা নিষ্কলুষ সহজাত স্বভাবকে বিকশিত করবে, তার জন্য সরল পথকে উন্মুক্ত করবে এবং ভ্রষ্টতার পথ থেকে বিরত রাখবে; ফলে সে আল্লাহর সাথে আদব রক্ষাকারী হিসেবে বেড়ে উঠবে।
আল্লাহর সাথে বান্দার আদবের অন্যতম দিক হল, সে আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা পোষণ করবে; কেননা এটি তাওহীদের ওয়াজীব বিষয়ের অন্তর্গত। রাসূল সাঃ আল্লাহর থেকে বর্ণনা করেন: (আমি সেই রূপই যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে।) (১) যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার প্রতি কু-ধারণা পোষণ করে তাকে তিনি তিরস্কার করেছেন। তিনি বলেন: ﴿يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَل لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِن شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ﴾ অর্থ: [অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ্ সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা করে নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করেছিল এ বলে যে, আমাদের কি কোন কিছু করার আছে? বলুন, সব বিষয় আল্লাহরই ইখতিয়ারে।] (২)
আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখার অন্তর্গত হল এ বিশ্বাস রাখা যে, তিনি তার বিষয়ে অবগত, তার সম্পাদিত কর্ম এবং তার অন্তর যে কুমন্ত্রণা দেয়; সে ব্যাপারে তিনি জানেন। "সু-ধারণার ভিত্তি হল আল্লাহর রহমত, তাঁর মর্যাদা, অনুগ্রহ, ক্ষমতা, জ্ঞান ও সুন্দর বাছাই এবং তাঁর উপর ভরসাকারীর শক্তি সম্পর্কে জানার উপর। সুতরাং উক্ত বিষয় সম্পর্কে যখন জানা পূর্ণতা পাবে আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা তখন ফলপ্রসূ হবে”(৩)।
রবের সাথে বান্দার আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, সে তাকে ভালবাসবে; কেননা “তাঁকে ভালবাসা দ্বীন ইসলামের মৌল বিষয় যার উপর ইসলামের চাকার অক্ষ ঘুরছে। কাজেই আল্লাহর ভালবাসার পূর্ণতার মাধ্যমে ইসলাম পূর্ণতা পায় এবং তা হ্রাসের কারণে মানুষের তাওহীদ হ্রাস পায়”(৪)। আর ভালবাসা রাসূল সাঃ এর আনুগত্য এবং তার আনীত বিধিবিধানের অনুসরণ দাবি করে। মহান আল্লাহ বলেন : ﴿قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾ অর্থ: [বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।] (৫) এটাকে মহাব্বতের আয়াত নামে অভিহিত করা হয়(৬)।
রাসূল সাঃ বলেছেন: (তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া। একমাত্র আল্লাহ জন্যই কাউকে ভালবাসা এবং কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করা।)(১) হাদিসের উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ আন্তরিকভাবে বান্দার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হবে অন্যদের থেকে। যেমন কিছু হাদিসে এসেছে: (তোমরা সমস্ত অন্তর দিয়ে আল্লাহকে ভালবাস।) সুতরাং বান্দা তার সবকিছু দিয়ে এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হবে যেন তিনিই একমাত্র প্রিয়জন এবং উপাস্যতে পরিণত হন। আর সে আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ভালবাসবে তাঁর ভালবাসার অংশ হিসেবে। যেমন সে নবীগণ, রাসূলগণ, ফেরেশতাগণ এবং নেককার বান্দাদের ভালবাসবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালবাসার প্রেক্ষিতে। এটি আল্লাহ যা ভালবাসেন তা ভালবাসা, যা অপছন্দ করেন তা অপছন্দ করা, তাঁর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর উপর অগ্রাধিকার দেয়া, সাধ্যনুযায়ী তাঁর সন্তোষজনক কাজে চেষ্টা করা এবং তাঁর অপছন্দনীয় বিষয় পরিহার করাকে আবশ্যককারী। আর এগুলো হল খাঁটি ভালবাসার আলামত ও তার আবশ্যিক অনুষঙ্গ।
আল্লাহর সাথে বান্দার আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, সে তাঁর শাস্তিকে ভয় করবে এবং তাঁর নিকট প্রতিদান প্রত্যাশা করবে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ অর্থ: [তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।] (২)
“আর আল্লাহর ভয় হল দ্বীনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ মাকাম”। (৩) যখন সে ভয় করবে তখন সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না বরং সৎকাজের মাধ্যমে তা সে প্রত্যাশা করবে। মহান আল্লাহ বলেন: قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ অর্থ: [তিনি বললেন, যারা পথভ্রষ্ট তারা ছাড়া আর কে তার রবের অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়?] (৪)
কাজেই আল্লাহর প্রতি বিনয় ও ভয় এবং সাথে তাঁর রহমত ও ভালবাসা প্রত্যাশার মাধ্যমে বান্দার আদব বজায় রাখা অপরিহার্য। “কেননা যে শুধুমাত্র আল্লাহকে ভালবেসে ইবাদত করে সে যিন্দিক, যে শুধুমাত্র প্রাপ্তির আশায় তাঁর ইবাদত করে সে মুরজিয়া, যে শুধুমাত্র ভীত হয়ে তাঁর ইবাদত করে সে হারুরী(৫), আর যে ভালবেসে, ভীত হয়ে, প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাঁর ইবাদত করে সে হল একত্ববাদী মুমিন”(৬)।
আল্লাহর সাথে বান্দার আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, সে তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী, তাঁর স্মরণকারী এবং রহমানের মুনাজাতে হৃদয় পূর্ণকারী হবে (৭)। আর এটি ইত্তেবার দাবী রাখে যে, তুমি তাঁর ইবাদত করবে যেভাবে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী নয় এবং তোমার অভ্যাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নয় (১)। দাসত্বের আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, আল্লাহ সকল কিছুর প্রতিপালক ও সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এ বিশ্বাস রেখে এবং বিনয় ও নম্রতার সাথে তার অভিমুখী হয়ে, সকল প্রকার ইবাদত তাঁকে প্রদান করে, মহান আল্লাহর কথায় সাড়া দিয়ে এককভাবে তাঁর ইবাদত করা এবং একমাত্র قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ অর্থ: [বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।* তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।] (২)
দাসত্বের যে আদবের উপর তরবিয়ত অর্জনকারীদের গড়ে তোলা শিক্ষক ও দায়ীদের কর্তব্য: তা হল, ওজু, সুন্দরভাবে তেলাওয়াত, গভীর চিন্তা-ভাবনা, নিরবতা এবং কুরআন পাঠ করা শুনলে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার এ নির্দেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাঁর কিতাবের সাথে আদব বজায় রাখা وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْءَانُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ : হয় তখন তোমরা মনোযোগের সাথে তা শুন এবং নিশ্চুপ হয়ে থাক যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়。](৩)
নিজের মধ্যে আল্লাহর নজরদারি ও তাঁর ভয় গ্রোথিত করা, বিশ্বাস রাখা যে তিনি ছোট-বড় সবকিছুর উপর অবগত এমনকি আসমান ও জমীনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কোন কিছু। তিনি জানেন চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ অর্থ: [আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন—তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।] (৪)
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ অর্থ: [আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আর আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর।](৫)
আল্লাহ তায়ালা লুকমানের অসীয়তে বলেন যখন সে তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল: يَبُنَيَّ إِنَّهَا إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُن فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اَللّٰهُ لَطِيْفٌ خَبِيْرٌ অর্থ: [হে আমার প্রিয় বৎস, নিশ্চয় তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষা দানার পরিমাণ হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমানসমূহে বা যমীনের মধ্যে, আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন; নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ]। (১)
দ্বিতীয়ত: রাসূল সাঃ সহ সকল নবীগণ আঃ এর সাথে আদব: নবীগণের সাথে আদবের বিষয়টি ছোট-বড় মানুষের মাঝে প্রবিষ্ট হয় যখন সে জানতে পারে নবীগণের অবস্থা, তাঁদের কর্ম এবং তাঁদের রবের রেসালাতের বাণী পৌঁছে দিতে যে কষ্ট-ক্লেশ ও অসুবিধা তাঁরা সহ্য করেছেন। আর এ জন্য নবীগণের জীবনের প্রতিটি অংশে বিরতি দিয়ে, তাঁদের চরিত্র ও নৈতিকতার বিশদভাবে বর্ণনা করে, মানুষের সাথে তাঁদের সদ্ব্যবহার, উত্তম কথপোকথন, বিনয়-নম্রতা, দয়াদ্রতা, অনুগ্রহ এবং দাওয়াত পৌঁছানোর পথে মানুষের পক্ষ থেকে প্রদেয় কষ্টের উপর তাঁদের ধৈর্যের বিষয়টি পরিষ্কার করে শিক্ষক বা মুরুব্বীকে তাঁদের জীবনী পর্যালোচনা করতে হবে।
নবী সাঃ এর সাথে আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, হৃদয়ে তাঁর ভালবাসাকে প্রাধান্য দেয়া তাঁর নির্দেশনা বাস্তবায়নার্থে; যেমন তিনি বলেছেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান এবং সব মানুষের অপেক্ষা অধিক ভালবাসার পাত্র হই)।(২) আর রাসূল সাঃ এর মহাব্বত তাঁর সুন্নাত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে আনীত জীবনবিধান অনুসরণ করা এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা ও শরীয়ত বহির্ভূত কোন কিছুকে তাতে অন্তর্ভুক্ত না করার দাবী রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا﴾ অর্থ: [রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক]।(৩)
তিনি আরো বলেন: ﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا﴾ অর্থ: [অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে]।(৪) রাসূল সাঃ এর মহাব্বত যখন তার নামোল্লেখ করা হয় তখন তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠের দাবী রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾ করেন এবং তার ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোয়া-ইস্তেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথ ভাবে সালাম জানাও।](৫)
“এ আয়াত থেকে উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিকট উর্ধ্বজগতের অধিবাসীগণের মাঝে তাঁর বান্দা এবং নবীর মর্যাদার বিষয়ে তাঁর বান্দাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। তিনি ঘনিষ্ট ফেরেশতাগণের নিকট নবীর প্রশংসা করেন এবং ফেরেশতাগণ তার জন্য দোয়া- ইস্তেগফার করেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা নিম্নজগতের অধিবাসীদের তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন; যেন তার প্রশংসা উর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় জগতের বাসিন্দাদের থেকে ধ্বনিত হয়”।(১)আর যে ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর উপর দরুদ পাঠ করে না তাকে তিনি কৃপণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন: (কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার নিকট আমার উল্লেখ করা হল কিন্তু সে আমার উপর দরুদ পাঠ করল না।) (২) আনুগত্য ও অনুসরণকে আবশ্যককারী এই মহব্বতের তরবিয়ত অর্জিত হবে তার সীরাত নিয়ে গভীর ও চিন্তাশীল পর্যালোচনা এবং তার সমগ্র জীবনে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষা ও চারিত্রিক গুণাবলী আহরণ করার মাধ্যমে। আর পরিপালনের পদ্ধতির অন্যতম হল যে কোন তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক, মুরুব্বী বা দাঈ ব্যক্তি উপস্থাপন করবে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নে সাহাবায়ে কেরাম তার সাথে আদব বজায় রেখে কীভাবে আচরণ করতেন। মহান আল্লাহ বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ أُوْلَبِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَىٰ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرُ عَظِيمٌ অর্থ : হে ঈমানদারগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সম্মুখে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না আর তোমরা আল্লাহ্ তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।* হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তার সাথে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না; এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সকল কাজ বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।* নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।](৩) তিনি আরো বলেন : لَّا تَجْعَلُواْ دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا অর্থ: [তোমরা রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের একে অপরের আহবানের মত গণ্য করো না।] (৪)
শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতী রহঃ বলেন: “অর্থাৎ যখন তোমরা তাকে আহ্বান করবে তখন তোমাদের আহ্বান যেন সম্মান, শ্রদ্ধা বিহীন না হয়; যেমন তারা একে অপরের সাথে করে থাকে। সুতরাং তোমরা বলো না: হে মুহাম্মাদ! বরং তোমরা বলবে: হে আল্লাহর রাসূল। আর তোমরা তার সামনে উচ্চস্বরে কথা বলবে না বরং নিচুস্বরে কথা বলবে”।(৫) রাসূল সাঃ এর মৃত্যুর পরেও তার সাথে আদবের ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে; তাই আমরা শুধু তার নামোল্লেখ করব না। বরং তার সাথে রেসালাতের মর্যাদার বিষয়টি যুক্ত করে ইয়া রাসূল্লাহ বলব এবং তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করব। তার সাথে আদবের অন্তর্ভুক্ত হল কারো কথাকে তার কথার উপর অগ্রাধিকার দিবো না; কেননা যখন কোন বিষয়ে রাসূল রাঃ এর সুন্নাত স্পষ্ট হবে তখন তা অনুসরণ এবং অন্য সকল কিছুর উপর অগ্রধিকার দেয়া ওয়াজিব হবে -সে যেই হোক না কেন! আর এটি হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে আবশ্যক আদব এবং এটি বান্দার সৌভাগ্য ও সফলতার প্রতীক। পক্ষান্তরে এটি ছুটে গেলে মিলবে না স্থায়ী সৌভাগ্য ও অনন্ত সুখ”। (১)
সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র এবং রাসূল সাঃ এর ভালবাসায় তাদের আত্মত্যাগের অন্যতম হল, তাদের কেউ প্রত্যাশা করে যে তাকে হত্যা করে রক্ত প্রবাহিত করা হলেও রাসূল সাঃ যেন সামান্য কষ্ট না পান; যদিও তা কাঁটার আঘাত হয়। খোবাইব রাঃ এর ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে যে, যখন মুশরিকগণ তাকে শূলে চড়িয়ে তরবারি দিয়ে তাকে আঘাত করে বলল, তোমার স্থানে মুহাম্মাদ থাকুক এটা কি তুমি চাও? জবাবে সে বলল: না, মহান আল্লাহর শপথ! আমার মুক্তির বিনিময়ে তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হোক; এটিও আমি চাই না।(২)
নবী সাঃ এর সাথে সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র এমনই ছিল এবং এ চরিত্রের উপরই সন্তানদের গড়ে তোলা উচিৎ।
তৃতীয়ত: মাতা-পিতার সাথে আদব।
ইসলামী চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত হল একজন ব্যক্তি তার মাতা-পিতার অধিকার সম্পর্কে জানবে যা আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য সন্তানদের উপর ওয়াজীব করেছে। আর তা হল, তাদের আনুগত্য করা, ভালবাসা, আল্লাহ তায়ালার নাফরমানী হয় না এমন কাজে তাদের সন্তুষ্টি তালাশ করা, তাদের সাথে নম্র আচরণ করা ও ভালবাসা দেখানো, সমবেদনা ও সহানুভূতি জানানো এবং তাদের কোন কথা ও কাজের কারণে চিৎকার না করা ও উফ শব্দ না বলা; আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে সাড়া দানের প্রেক্ষিতে। মহান আল্লাহ বলেন: وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا﴿ ج تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا অর্থ: [আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করতে ও পিতা- মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।* আর অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।] (৩)
সায়্যেদ কুতুব বলেন: “এই কোমল কথামালা এবং অনুপ্রেরণাদায়ক চিত্র দিয়ে কুরআনুল কারীম সন্তানদের হৃদয়ে সদ্ব্যবহার এবং দয়ার আবেগ জাগরিত করে। বার্ধক্যের সম্মান রয়েছে এবং বার্ধক্যের দুর্বলতার একটি বার্তা রয়েছে। আর )عندك( বা 'তোমার জীবদ্দশায়' শব্দটি বার্ধক্য এবং দুর্বলতার অবস্থায় ঠাই ও আশ্রয়ের তাৎপর্যকে যথাযথভাবে চিত্রিত করে। আর দেখাশোনা এবং আদবের পর্যায়সমূহের মধ্য হতে প্রথম পর্যায় হল, সন্তানের পক্ষ থেকে এমন কোন শব্দ উচ্চারণ না করা যা অসন্তোষ ও বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে এবং যা তাদের প্রতি অবহেলা এবং দুর্ব্যবহার বুঝায়। আদবের সর্বোচ্চ পর্যায় হল: মাতা-পিতার সাথে সন্তানের কথাবার্তা সম্মান ও মর্যাদায় পরিপূর্ণ হবে”।(১)
এ জন্য রাসূল সাঃ তাদের সাথে সদ্ব্যবহার, তাদের প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের নানা বিষয়ে ধৈর্য ধারণকে জিহাদ হিসাবে গণ্য করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (এক ব্যক্তি নবী সাঃ এর নিকট এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তখন তিনি বললেন, তোমার মাতা-পিতা কি জীবিত আছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তবে তাদের খেদমত করতে চেষ্টা কর।) (২)
মাতা-পিতাকে পাওয়া বিরাট অর্জন এবং লাভজনক ব্যবসা স্বরূপ; কেননা তারা সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের চাবিকাঠি যে তাদের আনুগত্য করে ও তাদের দেখাশোনা করে। আর যে ব্যক্তি তাদের উভয়কে বা একজনকে পেল অথচ জান্নাত ও তার নেয়ামত লাভের জন্য তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করল না; সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ হল। এ বিষয়টি হেদায়েত ও রহমতের রাসূল সাঃ বর্ণনা করে বলেন: (তার নাক ধুলিমলীন হোক, আবার তার নাক ধুলিমলীন হোক, আবার তার নাক ধুলিমলীন হোক। জিজ্ঞাসা করা হল, কার হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল, এরপরও সে জান্নাতে প্রবেশ করল না।) (৩)
মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার বিরাট নেককাজ। আর সদ্ব্যবহার পাওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার বেশি; যেহেতু সে বেশি কষ্ট সহ্য করে “এবং বেশি যন্ত্রণা, ক্লেশ, রাতজাগা এবং জটিলতার সম্মুখীন হন। মায়েরা তিনটি কঠিন কষ্ট সহ্য করেন যা পিতারা সহ্য করেন না। তন্মধ্যে প্রথমটি হল গর্ভধারণের কষ্ট। দ্বিতীয়টি হল প্রসব বেদনার কষ্ট। আর তৃতীয়টি হল সন্তানকে দুধ পান করানো এবং লালনপালন করার কষ্ট”। (৪) মহান আল্লাহ বলেন: وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَلُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَى الْمَصِيرُ অর্থ: [আর আমি মানুষকে তাঁর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে, আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু'বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। ফিরে আসা তো আমারই কাছে।] (৫)
আবু হুরায়রা রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নিকট এস জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাপেক্ষা হকদার ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপর তোমার পিতা।) (৬) “এ হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, মায়ের প্রতি মহাব্বত ও দয়া পিতার চেয়ে তিনগুণ বেশি হবে; কেননা রাসূল সাঃ মায়ের বিষয়টি তিনবার উল্লেখ করেছেন আর পিতার বিষয়টি একবার উল্লেখ করেছেন। আর এর রহস্য সম্পর্কে ইবনু বাত্তাল রহিঃ যেমনটি বলেছেন: “তিনটি জিনিস পিতার থেকে মা আলাদাভাবে সম্পাদন করে: সেগুলো হল, গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবের কষ্ট এবং সন্তানকে দুধ পান করানো কষ্ট। এ তিনটি জিনিস মা একাই সম্পাদন এবং কষ্ট করে থাকে। অতঃপর বাবা সন্তান লালনপালনে অংশগ্রহণ করে থাকে”। (১)
মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের গুরুত্বের কারণে সন্তান যতই তার মাতা-পিতার প্রতি অনুগত ও অনুগ্রহ করুক না কেন সে তাদের প্রতিদান দিতে পারে না; তবে সে উভয়কে যদি ক্রিতদাস অবস্থায় পেয়ে তাদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন সন্তান তার পিতার হক পরিশোধ করতে পারে না। তবে হ্যাঁ, সে যদি তার পিতাকে ক্রিতদাস হিসেবে পায় এবং তখনই তাকে ক্রয় করে নিয়ে মুক্ত করে দেয়।)(২) ইমাম নববী রহঃ বলেন: “তার প্রতি অনুগ্রহ বা অধিকার আদায় করে তার প্রতিদান দেয়া সম্ভব নয় তাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করা ব্যতীত”। (৩)
এ জন্য তাদের আনুগত্য করা এবং তাদের সাথে আদব বজায় রাখা ওয়াজীব; আর আদবের অন্তর্ভুক্ত হল: তাদের নাম ধরে না ডাকা। বরং তাদেরকে বাবা, মা বলে সম্বোধন করা। তাদের নিকট নিজেকে ছোট বুঝাতে কন্ঠের আওয়াজে কোমলতা প্রকাশ করা। তারদের পূর্বে আসন গ্রহণ না করা, আহার না করা এবং হাঁটার সময় পিতার আগে আগে না চলা; কেননা এগুলো খারাপ আদব এবং নিন্দিত চরিত্রের অন্তর্গত। “আবূ হুরায়রা রাঃ একজন ব্যক্তিকে অন্য আরেকজনের পশ্চাদে চলতে দেখলেন। তিনি বললেন: লোকটি কে? তিনি বললেন: আমার পিতা। আবূ হুরায়রা রাঃ বললেন: পিতার নাম ধরে ডাকবে না, তার পূর্বে আসন গ্রহণ করবে না এবং তার সামনে সামনে হাঁটবে না”। (৪)
এই ইসলামী দিকনির্দেশনা থেকে মুরুব্বী বা শিক্ষক মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার সম্পর্কিত একটি তরবিয়তি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন এবং একটি ভাল উদাহরণের মাধ্যমে বাস্তব পদ্ধতি পেশ করতে পারেন যা দ্বারা পিতা-মাতার সাথে তার আচরণ, তারা বেঁচে থাকলে তাদের সাথে উত্তমভাবে বসবাস এবং তারা মারা গেলে তাদের জন্য দোয়া করার মাধ্যমে সদাচরণের বিষয়টি চিহ্নিত হবে। যাতে এটি একটি বাস্তব নমুনা এবং ভাল উদাহরণ হয়ে থাকে তরবিয়তের ময়দানে। অন্য দিক থেকে, সে তার সন্তানদের মাতা-পিতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে উত্তম বসবাসের শিক্ষার উপর গড়ে তুলবে। (৫)
চতুর্থত: 'আরহাম' বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে আদব:
আভিধানিক অর্থে )الرحم( রেহেম হল: আত্মীয়তার মাধ্যম। আর রেহেম শব্দের মূল অর্থ সন্তান জন্মের স্থান বা গর্ভাশয়। (৬)
পারিভাষিক অর্থে: “কোন ব্যক্তির বাবা-মায়ের দিক থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ককে রেহেম বলে। সুতরাং তাদের প্রতি সুনির্দিষ্ট এবং অতিরিক্ত অধিকার আবশ্যক হবে”।(১) আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা হল: “বংশীয় ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সদাচরণ, সহমর্মিতা, অনুগ্রহ প্রদর্শন করা এবং তাদের অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া; যদিও তারা বাড়াবাড়ি ও দুর্ব্যবহার করে। আর এর বিপরীত হল আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা”। (২)
ইবনু আবি হামজাহ বলেন: “সাধ্যানুযায়ী উপকার করা এবং অপকার দূরীভূত করা উদ্দেশ্য।”।(৩)
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হল: আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সদাচরণ করা এবং তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা।
আত্মীয়দের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক অনুসারে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত ও ছিন্ন হয়। আর আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্ককে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন এমন শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে; যা সম্পর্ককে শক্তিশালী ও বিকশিত করে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَءَاتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا﴿ অর্থ: [আর আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদেরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় কর না।] (৪)
কাযী ইয়ায রহঃ বলেন: “সাধারণভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজীব এবং তা ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ নেই। তিনি বলেন: অধ্যায়ে বর্ণিত হাদিসসমূহ এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য দয়ে। তবে সম্পর্ক রক্ষার অনেক স্তর রয়েছে যার একটি অপরটি চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তার সর্বনিম্ন স্তর হল একে অন্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে পরিহার করা এবং কথা বলার মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করা যদিও তা সালামের মাধ্যমে হয়। এটি সামর্থ্য ও প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তিত হয়; তন্মধ্যে কিছু ওয়াজীব আর কিছু মুস্তাহাব। কেউ যদি সম্পর্কের কিছু দিক রক্ষা করে কিন্তু লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম না হয় তাহলে তাকে ছিন্নকারী বলা হয় না। আর কেউ যদি সে যা করতে সক্ষম এবং তার পক্ষে যা করা উচিত তা করতে ত্রুটি করে তবে তাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী বলা হয় না”। (৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একে অন্যকে পরিদর্শন করা, দুঃখ-কষ্টে ও আনন্দ-উল্লাসে অর্থ ও শ্রম দিয়ে পরস্পরে অংশগ্রহণ, উপহার প্রদানের মাধ্যমে সহানুভূতি জানান এবং তাদের অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়ার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক অর্জিত হয় ও বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেন: أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَىٰ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ ﴿١٩﴾ الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ ﴿٢٠﴾ وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ ﴿٢١﴾ অর্থ: [আপনার রব হতে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে কি তার মত যে অন্ধ? উপদেশ গ্রহণ করে শুধু বিবেকসম্পন্নগণই।* যারা আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং প্রতিজ্ঞা ভংগ করে না।* আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুন্ন রাখে, ভয় করে তাদের রবকে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে।](১)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা হল তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা, অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া, সম্মান করা, উপহার দেয়া, তাদের মাঝে যারা দরিদ্র তাদের দান করা, অসুস্থদের দেখাশোনা করা, তাদের আনন্দে-উৎসবে অংশ নেয়া, তাদের দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনা দেয়া এবং সে সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া যে সকল ক্ষেত্রে তারা আত্মীয়তার কারণে অন্যদের চেয়ে বেশি হক্কদার। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হল তাদেরকে পরিহার করা, সাধ্য থাকার পরও দেখা-সাক্ষাৎ না করা, তাদের আনন্দ-উৎসবে অংশ না নেয়া, তাদের দুঃখে-কষ্টে সান্ত্বনা না দেয়া এবং যে সকল ক্ষেত্রে তারা অধিক হক্কদার সে সকল ক্ষেত্রে অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়া।(২) মহান আল্লাহ বলেন: فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِعُواْ أَرْحَامَكُمْ﴿ 1840 GR: MOSIR GAR 203 RACE ACE أُوْلَبِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَرَهُمْ তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।* এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেছেন, ফলে তিনি তাদের বিধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন।](৩)
সুতরাং ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মর্যাদা অনেক বড় এবং এর গুরুত্ব অনেক বেশি। যেহেতু এ সম্পর্কে নবী সাঃ হাদিসে এমন বক্তব্য এসেছে যা তার গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হল সম্পর্ক রক্ষাকারীর প্রতি আল্লাহ তায়ালার দানের কারণ। পক্ষান্তরে তা ছেদ করা আত্মতীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছেদের দিকে নিয়ে যায়। সহীহ মুসলিমে এসেছে নবী সাঃ বলেছেন: (আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে। সে বলে যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবেন।) (৪) এ হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য হল আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব, তা রক্ষার ফযিলত এবং তা ছিন্নকারীর গুরুত্বর পাপ বুঝান। (৫)
অনুরূপভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা প্রশস্ত রিযিক ও জীবনে বরকত লাভের অন্যতম দ্বার। নবী সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি চায় যে তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুন্ন রাখে।) (৬)
পঞ্চমত: প্রতিবেশীর সাথে আদব:
আভিধানিক অর্থে )الجار( বা প্রতিবেশী:
'লিসানুল আরব' অভিধানে এসেছে: প্রতিবেশী সেই ব্যক্তি যার গৃহ আপনার গৃহের পাশে অবস্থিত। প্রতিবেশীর অন্য আরো অর্থ হল: স্থাবর সম্পত্তিতে অংশীদার, মৈত্রিচুক্তিতে আবদ্ধ, সাহায্যকারী এবং ব্যবসায় অংশীদার ব্যক্তি।(১)
পারিভাষিক অর্থে (al-Jār) বা প্রতিবেশী: প্রতিবেশীর আভিধানিক অর্থ পারিভাষিক অর্থ থেকে ভিন্ন নয়। “বিজ্ঞজনেরা প্রতিবেশিত্বের সীমা নির্ধারণে মতভেদ করেছেন। ইমাম আওজায়ী রহঃ বলেন: চতুর্দিক থেকে চল্লিশ ঘর পর্যন্ত হল প্রতিবেশী। ইমাম যুহরীও এমনটিই বলেছেন”।(২)
মহান আল্লাহ বলেন: وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ অর্থ: [আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোন কিছুকে তাঁর শরীক করো না; এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ, নিকট প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী।](৩)
ইবনে হাজার রহঃ বলেন: “নিকট প্রতিবেশী হল যাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। আর দূর প্রতিবেশী হল নিকট প্রতিবেশির বিপরীত। এটিই অধিকাংশের মত”।(৪)
এ কথা থেকে উদ্দেশ্য হল প্রতিবেশী দুই প্রকার: প্রথমত এমন প্রতিবেশী যাদের সাথে আত্মীয়তা ও প্রতিবেশিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয়ত এমন প্রতিবেশী যাদের সাথে শুধুই প্রতিবেশিত্বের সম্পর্ক রয়েছে。
পূর্ববর্তী অর্থসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রতিবেশী ঘরের নিকটবর্তী এবং আল্লাহর পরে তার জন্য সাহায্যকারী হওয়ার দরুন অংশীদারের সমপর্যায়ের। যদি বিপদাপদ তাকে বেষ্টন করে এবং দুর্যোগ তাকে শঙ্কিত করে তাহলে আল্লাহর পরে সে যার নিকট সর্বপ্রথম সাহায্য চায় সে হল তার প্রতিবেশী; কেননা সে সবচেয়ে কাছের মানুষ। যদি তাদের স্বভাব-চরিত্র ইসলামী আদর্শের অনুরূপ হয় তাহলে প্রতিবেশিত্বের উপর ভালবাসা, সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক সদুপোদেশ ও দান-উপহার প্রাধান্য বিস্তার করে এবং এর মাধ্যমে ছোট-বড় সকলেই প্রভাবিত হয়। আর যদি তাদের স্বভাব-চরিত্র ইসলামী আদর্শের বিপরীত হয় তাহলে বিরোধ বিরাজ করে, তাদের সম্পর্কের উপর মতভেদ আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাদের প্রত্যেকে অন্যের অধিকার ও অনুভূতির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। আর এভাবেই এটি ছোটদের মাঝে প্রসারিত হয় ফলে তারা প্রতিবেশির সাথে ঝগড়া-বিবাদ ও দুর্ব্যবহার করার অভ্যাসের উপর বেড়ে উঠে。
সুতরাং প্রতিবেশের সম্পর্কের জন্য এমন কাউকে প্রয়োজন যে তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিবে যাতে প্রতিবেশের পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব কল্যাণ ও বরকতের প্রভাবে পরিণত হয় এবং তা সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। আর ইসলামই একমাত্র মানহায যা তার ঐশ্বরিক মানহাযের সাথে নিশ্চিত করে, যদি প্রতিবেশের সম্পর্ক বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে সমাজের সর্বত্র উত্তম চরিত্র বিরাজ করবে এবং সবাই শান্তি, ভালবাসা এবং সম্প্রীতির সাথে বসবাস করবে।
ইসলামে প্রতিবেশের বিরাট মর্যাদা রয়েছে, কারণ “আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে এবং তাঁর নবীর জবানে প্রতিবেশকে রক্ষা ও তার অধিকার আদায় এবং দায়-দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি কি দেখ না যে আল্লাহ তায়ালা প্রতিবেশের বিষয়টি মাতা-পিতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরেই উল্লেখ করেছেন”।(১) যেমনটি পূর্বের আয়াতে এসেছে এবং অনেক নববী নির্দেশনাতেও প্রতিবেশির প্রতি অসিয়তের কথা এসেছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, নবী সাঃ বলেছেন: (জিবরীল আঃ সর্বদা আমাকে প্রতিবেশির ব্যাপারে অসিয়ত করে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয় যে, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন)।(২)
সুতরাং প্রতিবেশ প্রতিবেশির প্রতি সদ্ব্যবহার, অনুগ্রহ, উত্তমভাবে মেলামেশা, সাহায্যের প্রয়োজন হলে তাকে সাহায্য করা, তার সন্তানদের প্রতি দয়ার্দ্র আচরণ করা এবং তাকে সদুপোদেশ দেয়া, তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা সহ আরো অন্যান্য ইসলামী শিষ্টাচারের প্রয়োজন বোধ করে; যার মধ্য হতে গুটিকয়েক বিষয় নিম্নে স্পষ্ট করা হল:
১- গভীর জ্ঞানার্জন, শিক্ষা গ্রহণ এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে পারস্পরিক সহায়তা করা; কেননা এর মধ্য দিয়ে সমন্বিত সামাজিক বিকাশ সাধিত হয় এবং এতে রয়েছে প্রশংসনীয় ইসলামী শিষ্টাচার গ্রহণের সুযোগ। নবী সাঃ প্রতিবেশীদের জ্ঞানার্জন এবং একে অন্যকে উপদেশ দেয়ার নির্দেশ দিতেন। ইমাম হাইছামী স্বীয় গ্রন্থে হাদিস বর্ণনা করেন, নবী সাঃ একদা আলোচনা করলেন। তিনি কতিপয় লোকের উত্তম প্রশংসা করলেন। অতঃপর বললেন: “লোকেদের কী হয়েছে যে তারা প্রতিবেশীদের বিধিবিধান সহ প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দেয় না, তাদের উপদেশ দেয় না এবং তাদেরকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে না! লোকদের কী হয়েছে যে তারা প্রতিবেশীদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না, গভীর জ্ঞানার্জন করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না”।(৩)
আর এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম রা: ছিলেন নববী দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইলম অর্জনে উমর রাঃ এর আগ্রহের অংশ হল যে, তিনি তার প্রতিবেশির সাথে পালাক্রমে রাসূল সাঃ এর কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করতেন। ইবনু আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত, নিশ্চয় উমর রাঃ বলেন: (আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী বনী উমাইয়্যা ইবনু যায়দের মহল্লায় বাস করতাম। এ মহল্লাটি ছিল মদিনার উঁচু এলাকায় অবস্থিত। আমরা দু'জনে পালাক্রমে রাসূল সাঃ এর খিদমতে হাজির হতাম। তিনি একদিন আসতেন আর আমি একদিন আসতাম। আমি যেদিন আসতাম সেদিনের অহী প্রভৃতির খবর নিয়ে তাকে পৌঁছে দিতাম। আর তিনি যেদিন আসতেন সেদিন তিনি অনুরূপ করতেন।)(৪)
প্রতিবেশের আবশ্যিক অনুষঙ্গের অন্তর্গত হল: হৃদ্যতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, কল্যাণ কামনা, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ।
২- কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা:
প্রতিবেশের কর্তব্য এবং অধিকারসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম হল: প্রতিবেশীকে নিজে এবং বাচ্চাদের দ্বারা কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা; চাই হাত বা জিহ্বা অথবা ভিন্ন কিছুর মাধ্যমে হোক। কেননা আবূ হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, একজন ব্যক্তি বলল: (হে আল্লাহর রাসূল! অমুক মহিলা বেশি বেশি সালাত আদায় করে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি আবার বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক মহিলা অল্প সিয়াম রাখে, দান-খয়রাত করে ও সালাত আদায় করে। আর সে পাত্র ভর্তি পনির সাদকা করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। তিনি বললেন, সে জান্নাতে যাবে।) (১) রাসূল সাঃ বলেছেন: (আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি? হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।) (২)
নবী সাঃ ঐ ব্যক্তির মুমিন হওয়াকে অস্বীকার করেছেন যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না। এটি প্রতিবেশীর অধিকার ব্যাপক হওয়া বুঝানোর ক্ষেত্রে অতিশয়োক্তি এবং প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।(৩)
নবী সাঃ বর্ণনা করেছেন যে, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেছেন: (যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।) (৪)
এগুলো হল নববী তরবিয়তি দিকনির্দেশনা, যা নির্দেশ করে প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া এবং তার বিরাট অধিকারের উপর। আর প্রতিবেশের আচরণ গ্রহণ করা হল জান্নাতের পথ। কাজেই পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য হল পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে এ আদবসমূহকে বিকশিত করা।
৩- প্রতিবেশির সাথে সহনশীল আচরণ করা তার কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে। তার প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান এবং ছোটখাট বিষয়েও তাকে সহাযোগিতা করা; যেমন প্রতিবেশীকে তার বাড়ির দেয়ালে খুঁটি বসাতে অনুমতি দেয়া। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যেন তার প্রতিবেশীকে তার দেয়ালের সাথে খুঁটি গাড়তে বাঁধা না দেয়।) (৫)
এই হাদিসটি প্রতিবেশীর অধিকারের বড়ত্ব এবং উত্তম আখলাকের সাথে তার সঙ্গে মেলামেশার গুরুত্বের উপর নির্দেশ করে। অনুরূপভাবে এই মেলামেশার আচরণগত প্রভাব রয়েছে যা প্রতিবেশী ছাড়াও উঠতি প্রজন্মের উপর প্রতিফলিত হয়।
প্রতিবেশীর অধিকার শুধু কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকাই নয়; বরং কষ্ট সহ্য করা, তার প্রতি সদয় হওয়া, প্রথমে তাকে সালাম দেয়া, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া, বিপদে তাকে সান্ত্বনা দেয়া, উৎসবে তাকে অভিনন্দন জানানো, তার আঘাতকে উপেক্ষা করা, তার গৃহে উঁকি না দেয়া, তার ঘরের দেয়ালে খুঁটি গেড়ে তাকে বিরক্ত না করা, তার নর্দমায় পানি না ঢালা, তার উঠানে মাটি নিক্ষেপ না করা, তাকে পর্যবেক্ষণে না রাখা, প্রতিবেশীর সতরের কোন অংশ প্রকাশ পেলে তা গোপন রাখা, তার কথা কান লাগিয়ে না শোনা এবং তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখা। (১)
৪- প্রতিবেশীকে দান করা ও হাদিয়া প্রদান করা: আর তা হল প্রতিবেশীকে ঘরে প্রস্তুতকৃত খাবার প্রদান করা; এর ফলে ভালবাসা ও উত্তম আচরণ তৈরি হয় এবং অভাব ও মন্দ দূরীভূত হয়। “এক প্রতিবেশী কখনো তার আরেক প্রতিবেশীর পাতিলের খাবারের সুঘ্রাণে কষ্ট পেতে পারে। কখনো তার ছোট সন্তান-সন্ততি থাকতে পারে; ফলে তাদের বাসনা জাগ্রত হয় এবং তাদের অভিভাবকের জন্য বিষয়টি বড় কষ্টকর হয়। বিশেষত তাদের অভিভাবক যদি দরিদ্র অথবা বিধবা হয় তখন তাদের কষ্ট, যাতনা এবং আফসোস তীব্রতর হয়”। (২) আবূ যার রাঃ কে বলে নবী সাঃ প্রতিবেশীর প্রতি খেয়াল রাখার বিষয়ে মুসলিম জাতিকে নির্দেশনা দিয়েছেন: (হে আবূ যার! তোমরা যখন তরকারি রান্ন করো তখন পানি একটু বেশি করে দিও এবং প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য রেখা) (৩)
প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণ ঈমানের পূর্ণতার অন্তর্ভূক্ত। আর জাহেলী যুগের লোকেরাও তা সংরক্ষণ করত। অসীয়ত পালিত হবে সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর প্রতি নানা অনুগ্রহ করার মাধ্যমে; যেমন হাদিয়া প্রদান, সালাম দেয়া, হাস্যজ্জোল মুখে সাক্ষাৎ করা, অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া এবং তার প্রয়োজন পূরণ করা ইত্যাদি। আর তাকে সকল প্রকার শারীরিক মানসিক কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। (৪)
এটাই যদি জাহেলী যুগের লোকদের চরিত্র হয় যারা ছিল মূলত কাফের তাহলে মুসলিমরা প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহারের আদর্শ গ্রহণ করার অধিক উপযুক্ত; কেননা এটি তাদের দ্বীন ইসলামের বিধান যার প্রতি আল্লাহ তাঁর কিতাবে এবং নবী মুহাম্মাদ সাঃ এর সুন্নাতে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
প্রতিবেশের অধিকার পাবে সর্বাধিক নিকটবর্তী প্রতিবেশী। আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু'জন প্রতিবেশী রয়েছে। তাদের মধ্য হতে আমি কাকে হাদিয়া প্রদান করব? তিনি বললেন: এ দু'জনের মাঝে যার দরজা তোমার বেশি নিকটে।) (৫) অনুরূপভাবে একজন মুসলিমের জন্য শোভনীয় হল, যে কোন খাবার প্রতিবেশীকে দিতে দ্বিধান্বিত না হওয়া। নবী সাঃ বলেছেন: (কোন মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনীকে হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি তা ছাগলের সামান্য গোশতযুক্ত হাড় হলেও।) (৬) ইবনে হাজার রহঃ বলেন: “অর্থাৎ, এক প্রতিবেশিনী যেন তার অপর প্রতিবেশিনীকে হাদিয়া দিতে তুচ্ছ মনে না করে যদিও অধিকাংশ সময় হাদিয়া প্রদানকৃত বস্তুটি উপকার লাভের অযোগ্য হয়। হাদিসটির অর্থ এমন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যে, একটি বিষয়ে নিষেধ করে তার বিপরীত বিষয় করার নির্দেশ বুঝান। আর সে নির্দেশিত বিষয় হল পারস্পরিক হৃদ্যতা এবং ভালবাসা। যেন তিনি বলেছেন: এক প্রতিবেশিনী যেন তার অপর প্রতিবেশিনীর সাথে হাদিয়া প্রদানের মাধ্যমে হৃদ্যতা বজায় রাখে যদিও প্রদেয় বস্তুটি তুচ্ছ হয়। এ বিষয়ে ধনী-গরীব সমান। বিশেষ করে নারীদের নিষেধ করা হয়েছে কেননা তারা ভালবাসা ও ঘৃণা উৎপন্ন হওয়ার পাত্রী”।(১)
পরিবার তার সদস্যদের নিকট যে খাবার বা ফলমূল রয়েছে তা প্রতিবেশীদের দেয়ার শিক্ষার উপর গড়ে তুলবে; যাতে তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
হাদিয়া হল হৃদ্যতার বাহক। এটি ভালবাসা অনায়ন করে, সম্পর্ককে শক্তিশালী করে এবং প্রতিবেশীদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে। হাদিয়া প্রদান উত্তম চরিত্র, ভাল স্বভাব এবং প্রশংসনীয় আচরণের অন্তর্ভূক্ত। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা উপহার বিনিময় কর, পারস্পরিক সম্প্রীতি লাভ করবে।) (২) আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: (আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু'জন প্রতিবেশী রয়েছে। তাদের মধ্য হতে আমি কাকে হাদিয়া প্রদান করব? তিনি বললেন: এ দু'জনের মাঝে যার দরজা তোমার বেশি নিকটে।) (৩)
এ ধরণের নববী হাদিস পরিবারের সদস্যদের নিকট ব্যাখ্যা করা, তাদের অনুমতি প্রার্থনা ও তাদের নিকট প্রবেশের আদব বর্ণনা করার মাধ্যমে এবং প্রতিবেশীদের সতর বা গোপন বিষয় অবগত হওয়া, তাদের গোপন আলাপ শোনা, তাদের নিকট যা আছে তার দিকে দৃষ্টি দেয়া অথবা যা দেখেছে তা বর্ণনা করা থেকে তাদেরকে সতর্ক করার মাধ্যমে পরিবারের লালন-পালন ভূমিকা রাখে এর সদস্যদের প্রতিবেশীদের ভালবাসতে, তাদের সহযোগিতা করতে এবং তাদের প্রতি সৌজন্যশীল হতে। যদিও তারা এমন বিষয়ে সংবাদ দেয় যা তারা প্রত্যক্ষ করেছে বা শ্রবণ করেছে; তাদেরকে চুপ থাকার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে এবং তাদেরকে বুঝাতে হবে যে এরূপ আচরণ প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। কেননা এতে তাদের গোপনীয়তা প্রকাশের বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে, মাতা-পিতা তাদের প্রতিবেশীদের একান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করবে না। যেমন এরূপ বলা: তুমি তাদের কী করতে দেখলে? বা তাদেরকে কী বলতে শুনলে? বা তাদের নিকট কিছু দেখেছ কি? কেননা এ ধরণের প্রশ্ন বাচ্চাদেরকে পরবর্তী সাক্ষাতের সময় বিষয়গুলো অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখতে উৎসাহিত করে এবং সে সংবাদ দেয়া শুরু করবে তাকে জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই।
আর কিছু পরিবার যে খারাপ চারিত্রিক লালন-পালনের সমস্যায় ভুগছে তন্মধ্যে একটি হল, যা তাদের সন্তানদেরকে প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশীর সন্তানদের সাথে আক্রমণাত্মক আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। এরূপ বিষয় শিশুর মাঝে আক্রমণাত্মক আচরণের জন্ম দেয় ফলশ্রুতিতে সে অন্যদের সাথে একই ধরণের আচরণ করে। (৪)
ইসলামী লালন-পালনের পদ্ধতিতে প্রয়োজন হল, সন্তানদেরকে প্রতিবেশীর অধিকার এবং প্রতিবেশীর পরিবার, সম্মান ও সম্পদের ক্ষতি না করা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া। আর সমীচীন হল প্রতিবেশীর পরিবারের দিকে দৃষ্টি না দেয়া, তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন রাখা, তাদের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করা ইত্যাদি ইসলামী পরিপালনীয় আদব সম্পর্কে সন্তানদের সচেতন করা।
ষষ্ঠত: চারিত্রিক গুণাবলী:
-লজ্জাশীলতা।
আভিধানিক অর্থে )الحياء( বা লজ্জা হল: শালীন ও লজ্জিত হওয়া। ভাষাবিদ ইস্পাহানী বলেন: “লজ্জা হল নিকৃষ্ট কাজ থেকে নিজেকে সংযত রাখা”।(১)
পারিভাষিক অর্থে লজ্জা হল: এমন স্বভাব যা নিকৃষ্ট কাজ পরিহারে উৎসাহিত করে এবং হকদারের অধিকার প্রদানে অবহেলাকে প্রতিরোধ করে।(২)
লজ্জাশীলতা দুই প্রকার: জন্মগত; যার উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্জনীয়; যা মানুষ অর্জন করে থাকে, হয় উপদেশ ও শিক্ষার মাধ্যমে অথবা অন্যদের সাথে মেলামেশা ও তার ফলে মন্দকে মন্দ মনে করা, পঙ্কিলতাকে পঙ্কিল মনে করা ও ভালকে ভাল মনে করার দ্বারা যে সাদৃশ্য সৃষ্টি হয় তার মাধ্যমে অথবা নৈতিক অবক্ষয় ও লজ্জাহীনতার শাস্তির ভয়ের মাধ্যমে। ইবনে মুফলেহ বলেন: “একাধিক বিদ্বান বলেছেন, সকল সৎকাজের ন্যায় লজ্জা কখনো অর্জনীয় হতে পারে। আবার কখনো তা সহজাত হতে পারে। লজ্জাকে শরীয়া মোতাবেক ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন আমল ও নিয়ত”।(৩) অনুরূপ উক্তির দিকে ইঙ্গিত করেছেন ইবনে রজব রহঃ, তিনি বলেন: “লজ্জা দুই প্রকার: প্রথমত: যা সহজাত ও জন্মগত, অর্জনীয় নয়। এটি হল সর্বোত্তম আখলাকের অন্তর্গত যা আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে দান করেন এবং যার উপর তাকে সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয়ত: যা অর্জনীয়। যেমন আল্লাহ সম্পর্কে জানা, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী ও তাদের বিষয়ে অবগত এবং চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন; ইত্যাদি সম্পর্কে পরিচয় লাভ করা। এটি ঈমানের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত বরং এটি ইহসানের সর্বোত্তম স্তরের অন্তর্ভুক্ত”।(৪) কেননা উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি তা অর্জন করেছে আল্লাহর আনুগত্য এবং ভালবাসার আশায়। আর ঈমানের অন্তর্গত হল আল্লাহর জন্যই লজ্জশীলতা অর্জন করা। এর মাধ্যমে লজ্জা হল ঈমানের মূলের অন্তর্ভুক্ত; কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন: (ঈমানের সত্তরটির অধিক শাখার রয়েছে অথবা ষাটের অধিক শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম শাখা হল "লা-ইলাহা ইল্লাহ" বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হল রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ঈমানে একটি বিশেষ শাখা।) (৫)
সুতরাং অর্জনযোগ্য লজ্জাশীলতা লাভ করার জন্য তরবিয়তি প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সেই সাথে আল্লাহর নজরদারির বিষয়টি স্মরণ রাখা; যাতে আল্লাহ তাকে পাপাচারে লিপ্ত অবস্থায় দেখার বিষয়ে সে লজ্জিত হয়। আর এ জন্য শরীয়ত অনুযায়ী লজ্জা অর্জন, জ্ঞান এবং নিয়তের প্রয়োজন অনুভব করে। এ কারণেই লজ্জা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
রাসূল সাঃ ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বাধিক লজ্জাশীল এবং পরিপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী; এমনকি আবূ সাঈদ আল-খুদরী রাঃ বলেন: (পর্দার ভেতরে কুমারীদের চেয়েও নবী সাঃ বেশি লাজুক ছিলেন। যখন তিনি অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন তখন আমরা তার চেহারাতেই এর আভাস পেয়ে যেতাম।) (৬)
লজ্জাশীলতার বিরাট ফযিলত রয়েছে এবং আচরণে এর ব্যাপক প্রভাবে রয়েছে; কেননা এর পরিধি মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত। যেমন: তার গৃহে, তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে মেলামেশায়, তার আমলে, তার বাজার-ঘাটে যাতায়াতে এবং তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে আলাপচারিতায়। এ জন্য লজ্জাশীলতার পুরোটাই কল্যাণকর; যেমনটি বলেছেন রাসূল সাঃ (লজ্জার সবটাই কল্যাণকর।) (১) লজ্জার ফযিলতের অন্তর্ভুক্ত হল যে এটি আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রিয়। যেমন রাসূল সাঃ বলেছেন: (নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বড় লজ্জাশীল ও পর্দাশীল। তিনি লজ্জাশীলতা এবং পর্দা করাকে বেশি পছন্দ করেন। তাই তোমাদের কেউ গোসল করতে গেলে সে যেন পর্দা অবলম্বন করেন।) (২) লজ্জা শুধু মানুষকে কল্যাণের দিকেই পরিচালিত করে এবং শুধু কল্যাণই আনায়ন করে।
কিছু মানুষ লজ্জাকে ভুলভাবে বুঝে থাকে; ফলে সে সত্যকথা বলার ক্ষেত্রে লাজুকতাকে এবং অসৎকাজে নিরবতাকে লজ্জা মনে করে থাকে। অথচ এটি হল কাপুরুষতা এবং সকল অকল্যাণের চাবিকাঠি। পক্ষান্তরে লজ্জাশীলতা হল সকল কল্যাণের চাবিকাঠি এবং জান্নাতের পথ। সুতরাং যে লাজুকতা তার সীমা অতিক্রম করে অসৎকাজে বাঁধা প্রদান এবং সত্যকথা বলার সময় নিরবতা অবলম্বনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়; তা লজ্জার কোন অংশ নয়। বরং তা হল সত্যকথা বলায় ত্রুটি, দুর্বলতা, ভয় এবং কাপুরুষতা। “এ কারণে লাজুকতা নিন্দিত; যেহেতু এর মাঝে সীমালঙ্ঘনের বিষয় রয়েছে। এ দৃষ্টিকোন থেকে পূর্বের বিদ্বানগণ লাজুকতাকে দুর্বলতা এবং তা কখনো রিযিক নষ্টের কারণ হতে পারে বলে মত ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেছেন: 'লাজুকতা রিযিক প্রাপ্তিতে বাঁধা প্রদান করে'। বেজায়গায় ব্যক্তির লজ্জাশীলতার প্রকাশ দুর্বলতা”। ইমাম সানআনী রহঃ বলেন: “তুমি যদি বল যে লজ্জা তো কখনো কখনো ব্যক্তিকে অসৎকাজে বাঁধা প্রদান থেকে নিবারণ করে; যা হল আবশ্যকীয় বিষয় পালনে ত্রুটি হিসেবে গণ্য, তাহলে 'লজ্জা শুধু কল্যাণই আনায়ন করে' এ কথার ব্যাপক অর্থ পূর্ণতা পায় না! সানআনী রহঃ বলেন, এর জওয়াবে বলা যায় যে, হাদিসে বর্ণিত লজ্জা দ্বারা শরয়ী লজ্জা উদ্দেশ্য এবং আবশ্যকীয় বিষয় পরিহার করা থেকে যে লজ্জার সৃষ্টি হয় তা শরয়ী লজ্জা নয়; বরং তা অক্ষমতা ও নীচতা। আর শরয়ী লজ্জার সাথে সাদৃশ্য রাখার কারণে তাকে লজ্জা হিসেবে অভিহিত করা হয়”। (৩) এ জন্য অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোকে লজ্জাশীলতা হিসেবে গ্রহণ করা হয় না, যেমন: সত্যকথা বলা থেকে নিরবতা পালন করা। অনুরূপভাবে লাজুকতার খারাপ দিক হল এটি তার অধিকারীকে শিক্ষা লাভ এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞানার্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। মুজাহিদ রহঃ বলেন: “লাজুক এবং অহংকারী ব্যক্তি ইলম অর্জন করতে পারে না”। (৪) এ জন্য আনসারী মহিলারা দ্বীনের আবশ্যকীয় জ্ঞানার্জনে লজ্জা করত না। ফলে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ তাদের প্রশংসা করে বলেন: (আনসারদের মহিলারা কতই না ভাল! লজ্জা তাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান থেকে ফিরিয়ে রাখে না।) (৫)
কাজেই মানবজাতির কল্যাণ হল হৃদয়ে আল্লাহর ব্যাপারে ভয়-ভীতি ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করা এবং তিনি তাদেরকে এমন কাজ ও কথার অবস্থায় দেখবেন যা তিনি অনুমোদন করেন না -এ ব্যাপারে লজ্জা করা। যুন নূন বলেন: “লজ্জাশীলতা হল হৃদয়ে শ্রদ্ধার উপস্থিতি এবং তোমার রবের নিকট অতীত কৃতকর্মের ব্যাপারে ভীত হওয়া”।(১)
সুতরাং লজ্জা মানুষকে কথা ও কাজের মাধ্যমে মন্দকে পরিহারে দিকে পরিচালিত করে যাকে লজ্জা করা হয় তার নির্দেশ পালন ও তার থেকে লজ্জা পাওয়ার অংশ হিসেবে। আর যাকে সবচেয়ে বেশি লজ্জা পাওয়া হয় তিনি হলেন সেই সত্ত্বা যিনি মানুষকে অগণিত নেয়ামত প্রদান করেছেন এবং অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং কারো থেকে যদি লজ্জাশীলতার পরিপন্থী কোন কিছু প্রকাশ পায় ফিরে আসবে এবং তাওবা করবে। আল্লাহর ভয়হীন লজ্জা ব্যক্তির থেকে চলে যায়, যখন সে মানুষের থেকে দূরে থাকে অথবা অপরিচিত জনদের মাঝে থাকে। তাই লজ্জার উৎস হওয়া উচিৎ আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর ভালবাসা এবং তাঁর ভয়।
-ধৈর্য:
আভিধানিক অর্থে ধৈর্য হল: অস্থিরতা ও অধৈর্যতার বিপরীত। অস্থিরতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর 'তাসাব্বর' অর্থ হল ধৈর্য ধারণ করা।(২)
পারিভাষিক অর্থে ধৈর্য হল: হৃদয়ের গুণাবলীসমূহের মধ্য হতে একটি উত্তম গুণ যা অসুন্দর কাজ থেকে বিরত রাখে এবং আত্মার একটি শক্তি যার মাধ্যমে এর অবস্থা সংশোধিত হয় ও বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। উমর বিন উসমান আল-মাক্কী রহঃ বলেন: “ধৈর্য হল আল্লাহর সাথে অবিচল থাকা এবং তাঁর দেয়া বিপদাপদগুলো প্রশস্ত হৃদয়ে ও বিনয়ের সাথে গ্রহণ করা”। (৩)
আর আল্লাহ তায়ালা সে সকল ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন যারা সহনশীলতা, ক্রোধ সংবরণ ও অস্থিরতা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ধৈর্য ধারণ করে এবং ধৈর্য ধারণের সাথে সাথে তারা বলে 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিয়ূন'। মহান আল্লাহ বলেন: وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَبَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا GR إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُوْلَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ) [আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে।* যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।* এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রব-এর কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই সৎপথে পরিচালিত।](৪)
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা ধৈর্য ধারণ, অন্তরকে ধৈর্য ধারণে উদ্দীপ্ত করণ এবং অপছন্দনীয় ও অনাকাঙ্খিত বিপদাপদে অস্থির না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন : يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ أَصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ ﴾وَرَابِطُواْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক, আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।] (১) হাসান বসরী রহঃ বলেন: “মুসলিমদেরকে তাদের জন্য মনোনীত দ্বীন ইসলামের উপর ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তারা যেন সুসময়ে, দুরাবস্থায়, কষ্টে এবং সুখে তা পরিত্যাগ না করে; যাতে তারা মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করে। তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তারা ধৈর্যের সাথে সে সকল শত্রুদের মোকাবেলা করে যারা তাদের ধর্মকে গোপন রাখে। এরূপ উক্ত করেছেন একাধিক সালাফ”। (২) মহান আল্লাহ বলেন: وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَّعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَوْةِ الدُّنْيَا অর্থ: [আর আপনি নিজকে ধৈর্যের সাথে রাখবেন তাদেরই সংসর্গে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে তাদের রবকে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং আপনি দুনিয়ার জীবনের শোভা কামনা করে তাদের থেকে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না।] (৩)
ধৈর্য হল কল্যাণ ও সফলতার বাহন এবং চারিত্রিক গুণাবলীর স্তম্ভ ও কেন্দ্রবিন্দু। কারণ সমস্ত উত্তম গুণাবলী ধৈর্যের উপর তাদের স্থিতিশীলতার জন্য নির্ভর করে। আর কোন ব্যক্তি উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী ধারণ করতে পারবে না যতক্ষণ না তার ধৈর্যের ভিত্তি মজবুত হয়। সত্যবাদিতার জন্য একজন ব্যক্তিকে সঠিক কথা বলার উপর ধৈর্য ধরতে হয় যদিও সে জানে যে, এতে তার কিছু বিষয়ে ক্ষতি হতে পারে। বিনয়-নম্রতার জন্য আত্মা ও প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা এবং আত্ম-অহংকার থেকে ধৈর্যের প্রয়োজন। অশ্লীল কথাবার্তা এবং বিকৃত আচরণ পরিহারে লজ্জাশীলতার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। আর সকল চারিত্রিক গুণাবলীকেই এর উপর অনুমান করতে হবে। এ জন্য হৃদয়ে ধৈর্যের স্থিতিশীলতা এবং তার অভ্যস্ততা চারিত্রিক অর্জন এবং শ্রেষ্ঠ লাভ; কেননা সকল উত্তম শিষ্টাচার তার উপরই নির্ভর করে。
এটি কোন অন্যায় নয় যে, কল্যাণের সকল গুণাবলী, সৎকর্মের বৈশিষ্ট্যাবলী, ইবাদতের অবস্থাসমূহ এবং চারিত্রিক উত্তম গুণাবলী ধৈর্যের সাথে সম্পৃক্ত, ধৈর্যের দিকে প্রত্যাগমনকারী, ধৈর্যের উপর নির্ভরকারী এবং ধৈর্যের সাথে প্রবাহমান; আমরা যেভাবেই ভাবি না কেন ও যে অবস্থাতেই লক্ষ্য করি না কেন! কেননা ধৈর্য হল কেন্দ্র যার উপর সকল প্রশংসনীয় কর্ম ঘূর্ণায়মান। 'ধৈর্য হল এমন একটি গুণ যা আমাদেরকে কষ্টসাধ্য অন্যান্য গুণাবলীর বোঝা বহন করতে সক্ষম করে তোলে'। (৪)
সুতরাং যে তার চরিত্রকে উন্নত করতে চায় তার জন্য নিজেকে ধৈর্যের উপর গড়ে তোলা আবশ্যক; যাতে সে মন্দ আচরণ থেকে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বাতিল রীতিনীতি ও আচারের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে। তার জন্য আরো আবশ্যক হল সে বর্জন ও গ্রহণ দু'দিক থেকে ধৈর্য ধারণ করবে; বর্জনের ধৈর্য হল চরিত্র বিনষ্টকারী বিষয় পরিহার করা, আর গ্রহণের ধৈর্য হল উত্তম গুণাবলীকে নিত্যসঙ্গী করা। ধৈর্যের ক্ষেত্রগুলো অধিকতর স্পষ্ট করার জন্য পাঁচটি বিধানের আলোকে নিম্নোক্ত প্রকারভেদ উল্লেখ করছি:
১- ওয়াজীব ধৈর্য: এটি তিন প্রকার: প্রথম-হারামবস্তু পরিহারে ধৈর্য ধারণ। দ্বিতীয়- ওয়াজীব আদায়ে ধৈর্য ধারণ। তৃতীয়- বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ।
২- মুস্তাহাব ধৈর্য: আর তা হল মাকরূহ বিষয় পরিহারে, মুস্তাহাব আদায়ে এবং অপরাধীর অপরাধের বিপরীতে অনুরূপ করার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ।
৩- নিষিদ্ধ ধৈর্য: আর তা হল হিংস্র জন্তু, সাপ, আগুন অথবা পানি যা ব্যক্তিকে ধ্বংস করতে চায় তার উপর ধৈর্য ধরা বা মৃত্যু পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা।
৪- মাকরূহ ধৈর্য: যেমন মুস্তাহাব কর্ম পরিহার করা এবং মাকরূহ বিষয়ে জড়িত হওয়া।
৫- মুবাহ ধৈর্য হল: যে সকল বিষয় করা বা বর্জনের ক্ষেত্রে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে এমন কর্ম পরিহার করা।
ধৈর্য হল উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যার বিশদ বর্ণনা পূর্বে গত হয়েছে। যে ব্যক্তি তা অর্জন করল সে সৌভাগ্যের দরজায় প্রবেশ করল আর যে তা বর্জন করল সে দুর্ভাগ্যের দরজায় প্রবেশ করল। কেননা অপরাধ এবং মন্দ চরিত্রের কারণ হল তা থেকে বিরত না থাকা। এ জন্য যে আল্লাহর ইবাদতে ধৈর্য ধারণ করে সে আল্লাহর সাহায্য লাভ করে। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। সবরের চাইতে উত্তম ও ব্যাপক কোন নিয়ামত কাউকে দেয়া হয়নি।) (১)
ধৈর্যের চরিত্রে অংকিত হওয়া দৃঢ় সংকল্পের অন্তর্গত; যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ অর্থ: [আর অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, নিশ্চয় তা দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।](২) সৎ আমলের সাথে ধৈর্য ধারণ করার উপর আল্লাহ তায়ালা বিশাল প্রতিদান এবং ক্ষমা নির্ধারণ করে রেখেছেন। তিনি বলেন: إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُواْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَوْلَتَبِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ অর্থ: [কিন্তু যারা ধৈর্যশীল ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরই জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।](৩)
আর ধৈর্যশীলগণ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবে, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَزَعُوا فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ রাসূলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহু ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।](৪)
নিশ্চয় ফেরেশতাগণ আল্লাহ ইবাদতে ধৈর্যধারণকারীদের সালাম দিবে এবং অভিবাদন জানাবে যে দিন তারা স্থায়ী শান্তির নিবাস জান্নাতে প্রবেশ করবে। মহান আল্লাহ বলেন: سَلَامُ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ অর্থ: [এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি; আর আখেরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম!] (১) অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম এবং অভিবাদন অবতীর্ণ হোক তোমাদের সেই ধৈর্যের বিনিময়ে যা তোমাদেরকে এই সুউচ্চ মর্যাদায় ও মূল্যবান জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছে। (২)
ধৈর্যের সুফলের অন্তর্ভুক্ত হল এ বিশাল প্রতিদান যা রাসূল সাঃ আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন। আনাস বিন মালেক রাঃ বলেন, আমি রাসূল সাঃ কে বলতে শুনেছি: (আমি যদি আমার কোন বান্দাকে তার অতি প্রিয় দু'টি জিনিসের ব্যাপারে পরীক্ষায় ফেলি, আর সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে আমি তাকে সে দু'টির বিনিময়ে দান করব জান্নাত। তিনি দু'টি জিনিস দ্বারা ব্যক্তির চক্ষুদয়কে উদ্দেশ্য করেছেন।)(৩) রাসূল সাঃ বলেছেন: (যখন কোন বান্দার সন্তান মারা যায় তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবয করে নিয়ে এলে? তারা বলে হ্যাঁ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা তার হৃদয়ের ফল কবয করে নিয়ে এলে? তারা বলে হ্যাঁ। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা কী বলেছে? তারা বলে, আপনার প্রশংসা পাঠ করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর বায়তুল হামদ বা প্রশংসালয়।)(৪) সে যদি ধৈর্য ধারণ না করে অস্থির হত তাহলে সওয়াব তার হাতছাড়া হয়ে যেত। আর আল্লাহর নির্দেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। সুতরাং ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর সওয়াব বিশাল; কেননা তিনি তাদেরকে কল্যাণের বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিশেষভাবে করেছেন। তিনি বলেন: وَمَا يُلَقَّهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُواْ وَمَا يُلَقَّهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ অর্থ: [আর এটি শুধু তারাই প্রাপ্ত হবে যারা ধৈর্যশীল। আর এর অধিকারী তারাই হবে কেবল যারা মহাভাগ্যবান।](৫) তিনি আরো বলেন: وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيُلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ অর্থ: [আর যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলল, ধিক তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ছাড়া তা কেউ পাবে না।](৬) ধৈর্যের বিপরীত হল ক্রোধান্বিত ও বিরক্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ না করার মাধ্যমে অস্থির হওয়া। আর এটি হল নিন্দিত স্বভাব যা ক্রোধকে উস্কে দেয়। আত্মা যখন উত্তেজিত হয়ে পড়ে তখন বন্ধনমুক্ত এবং লাগামহীন হয়ে পড়ে। এর ফলে তার কথাবার্তায় তেজ, ভর্ৎসনায় ক্ষিপ্রতা ও কঠোরতা এবং কর্মে বুদ্ধিহীনতা প্রকাশ পায়। “সুতরাং অধৈর্যতা হল (আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন) একটি নিন্দনীয় চরিত্র যা ভাষাকে কর্কশ করে, হৃদয়কে দুর্বল করে, স্বভাবের দুর্বলতা প্রমাণ করে এবং শরীয়া লঙ্ঘন করতে উৎসাহিত করে”। (৭)
ধৈর্য নেতিবাচক একটি বৈশিষ্ট্য নয়। আর ধৈর্যের অর্থ হল, যা প্রতিকার করা যায় তার নিকট আত্মসমর্পণ করা; এটি একটি ভুল উপলব্ধি এবং ভ্রান্ত ধারণা। বরং ধৈর্য যেমন পাপাচার থেকে বিরত হওয়া এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা বুঝায় অনুরূপভাবে প্রায়শই তা একটি ইতিবাচক আমলগত প্রচেষ্টাও বুঝায়। সুতরাং ধৈর্য হল কথা ও কাজের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে আত্মার জন্য যা ক্ষতিকর; তা থেকে আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
-সত্যবাদিতা।
আভিধানিক অর্থে সত্যবাদিত হল: মিথ্যার বিপরীত। (১)
পারিভাষিক অর্থে সত্যবাদিতা হল: কোন বিষয় সম্পর্কে বাস্তবতার নিরিখে সংবাদ প্রদান করা। (২)
কারো মতে সত্যবাদিতা হল: প্রকাশ্য ও অভ্যন্তরীণ দিক সমান হওয়া। (৩)
এখান থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে সত্যবাদিতা চরিত্র হল: প্রত্যেক কথা, কাজ ও বিশ্বাস যা বাস্তবতার অনুকূল হয় ও অনুযায়ী হয়。
আর সত্যবাদিতা হল উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম যার গুণে নবীগণ গুণান্বিত এবং আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে তাদের প্রশংসা করেছেন, তিনি বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا ও অর্থ: [আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইবরাহীমকে; তিনি তো ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ নবী।] (৪)
তিনি বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا অর্থ: [আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইদরীসকে, তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ নবী] (৫)
তিনি আরো বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا অর্থ: [আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইসমাঈলকে, তিনি তো ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসূল, নবী] (৬)
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা আমাদেকে সত্যবাদিতার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ اُتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُواْ مَعَ الصَّدِقِينَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।] (৭)
“অর্থাৎ তোমরা সত্য বল এবং সত্যবাদিতাকে আঁকড়ে ধর; ফলে তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে, ধ্বংস থেকে রক্ষা পাবে এবং তিনি তোমাদের কঠিন বিষয়ে নিষ্কৃতির পথ বের করে দিবেন”।(১) বস্তুত সত্যবাদিতা হল কল্যাণ ও নাজাতের বাহন এবং সৌভাগ্যের মাধ্যম। পক্ষান্তরে মিথ্যা হল ধ্বংশ ও বিনাশের বাহন। “মানুষের হতবুদ্ধিতা এবং দুর্দশার কারণ হল তাদের এই সুস্পষ্ট মূলনীতি থেকে অন্যমনস্কতা এবং তাদের নিজেদের ও চিন্তাধারার উপর মিথ্যা ও বিভ্রমের আধিপত্যের বিস্তার; যা তাদেরকে সীরাতে মুস্তাকীম থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে এবং যে সত্য মেনে চলা আবশ্যক তা থেকে বিপথে পরিচালিত করেছে”। অর্থাৎ বিশ্বাস, কথা এবং আচরণে মিথ্যার মাঝে তাদের বসবাস করার কারণে তাদের নিশানা, চিন্তাধারা এবং নষ্ট শিক্ষানীতির মাধ্যমে তারা বিশ্বে মিথ্যা রটনাকারীতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য সর্বোত্তম প্রবেশ ও নিষ্কৃতি হল সত্যবাদিতা। আর আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলকে এটি প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন: وَقُل رَّبِّ أَدْخِلْنِي﴿ ] : مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَل لِّي مِن لَّدُنكَ سُلْطَانًا نَّصِيرًا রব! আমাকে প্রবেশ করান সত্যতার সাথে এবং আমাকে বের করান সত্যতার সাথে এবং আপনার কাছ থেকে আমাকে দান করুন সাহায্যকারী শক্তি।] (২)
আর সত্যবাদিতা যেমন কথার মাধ্যমে হয় অনুরূপভাবে কাজ, বিশ্বাস এবং বিভিন্ন অবস্থার মাধ্যমেও হয়। সুতরাং কথার মাঝে সত্যবাদিতা হল কথার উপর জিহ্বার স্থিরতা যেমন কাণ্ডের মাথার উপর মুকুল স্থির থাকে। আর অবস্থার মাঝে সত্যবাদিতা হল ইখলাসের উপর অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্ম স্থির থাকা এবং শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করা। এর মাধ্যমে বান্দা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা সত্যসহ আগমন করেছে।(৩)
সত্যবাদিতার উদ্দীপক হল বুদ্ধি-বিবেক, দ্বীন, ব্যক্তিত্ব এবং প্রশংসা প্রীতি। -বুদ্ধি-বিবেক: এটি মিথ্যা অপছন্দ করাকে অবধারিত করে; বিশেষত মিথ্যা উপকার করে না এবং ক্ষতি প্রতিহত করে না। পক্ষান্তরে বুদ্ধি-বিবেক ভাল কিছু করার দিকে আহ্বান জানায় এবং মন্দ বিরত রাখে।
-দ্বীন: শরীয়ত মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করেছে যদিও তা কল্যাণ বয়ে আনে অথবা অকল্যাণ প্রতিহত করে। আর বুদ্ধি-বিবেক নিষিদ্ধ করেছে যা কল্যাণ আনায়ন করে না বা অকল্যাণ প্রতিহত করে না। সুতরাং বিবেক যা প্রয়োজন বোধ করে শরীয়ত তার চেয়ে মিথ্যা নিষিদ্ধের ন্যায় অতিরিক্ত বিধান সহ আগমন করেছে।
-ব্যক্তিত্ব: এটি মিথ্যাকে প্রতিহত করে এবং সত্যবাদিতার উপর উদ্বুদ্ধ করে।
-প্রশংসা প্রীতি: প্রশংসা প্রীতি এবং সত্যবাদিতার খ্যাতি মিথ্যাকে প্রতিহত করে যাতে তার কথাকে প্রত্যাখ্যান না করা হয় এবং সে তিরস্কৃত না হয়। (৪)
তবে বিবেক, ব্যক্তিত্ব এবং প্রশংসা প্রীতির সত্যবাদিতা যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যবাদিতার জন্য দ্বীনের আবশ্যকীয়তা দ্বারা সমর্থিত না হয়; ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি সত্য থেকে আত্মগোপন করে যদি সে ধারণা করে মিথ্যার মাঝে কল্যাণ রয়েছে। সত্যবাদিতার সর্বোত্তম উদ্দীপক হল দ্বীন; কেননা তা আচরণে এবং মূলনীতিতে অবিচলতা বপন করে। সত্যবাদিতা হল পরিপক্কতা ও শক্তিশালী ঈমানের নিদর্শন। কোন কোন বিদ্বান বলেন: “কোন ব্যক্তিকে বুদ্ধিমান বলা যাবে না যতক্ষণ না সে তিনটি বিষয় পূর্ণ করে: সন্তোষ ও ক্রোধের অবস্থায় নিজের পক্ষ থেকে হক আদায় করা, মানুষের জন্য তাই পছন্দ করা যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে এবং সচেতনতার সময় তার পদস্খলন দৃষ্টিগোচর হবে না। আবুল আতাহিয়্যাহ বলেন: “যার থেকে সত্য হারিয়ে যায় তার মতামত হারিয়ে যায়”।(১) এই গুণগুলো অর্জন করতে পারে শুধুমাত্র মযবুত ঈমান ও সৎ নিয়তের অধিকারী ব্যক্তি; কেননা যে নিজের পক্ষ থেকে অধিকার প্রদান করে তাকে ক্রোধ পরাজিত করতে পারে না যাতে সে যুলুম করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মিথ্যা বলে। আর যে ব্যক্তি মানুষের জন্য তাই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে, সে ব্যক্তি শক্তিশালী ঈমানে অধিকারী; কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।)(২) আর সচেতনতার সময় যার কোন ভুল দৃষ্টিগোচর হয় না সে ব্যক্তি তাদের অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেদের উপর আল্লাহকে পর্যবেক্ষক মনোনীত করেছে; ফলে আল্লাহ তাকে কোন মন্দ কাজে লিপ্ত দেখবে -এ ব্যাপারে সে লজ্জাবোধ করে। এ সবগুলোর উৎপত্তিস্থলই হল আল্লাহর সাথে সত্যবাদিতা।
যে বিষয়টি সত্যবাদিতার নীতির প্রতি মানব সমাজের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব প্রমাণ করে তা হল, সামাজিক সম্পর্ক ও মানুষের লেনদেনের এক বিরাট অংশ সত্য কথা ও কাজের উপর নির্ভর করে; কেননা মানুষের অভিপ্রায়গুলো শুধুমাত্র সত্য আচরণ ও স্বচ্ছ নিয়তের মাধ্যমেই জানা যায়। যদি সত্য কথার উপর বিশ্বাস না থাকত তাহলে মানুষের অধিকাংশ সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যেত। এটি তরবিয়তের দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য করে তুলেছে; কেননা এটি এ কর্তব্যের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং তার তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজে উত্তম চরিত্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। আর এর জন্য সর্বোত্তম উপায় হল, সে তরবিয়তের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া যে তরবিয়ত শিক্ষার্থীদের মাঝে দৃঢ় সংকল্প রোপন করে দেয়। কেননা সর্বদা সত্যবাদিতা মেনে চলতে কঠিন ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় সংকল্প, শক্তিশালী ঈমান এবং সত্যবাদিতার কারণে আপতিত বিপদ সহনের ক্ষমতার প্রয়োজন হয়।
আর যা এই অভিপ্রায়কে শক্তিশালী করে এবং তাকে সত্যবাদিতার উপর গড়ে তোলে তা হল, সেই প্রতিদান যা সত্যবাদীদের জন্য অপেক্ষা করছে এবং সেই শাস্তি যা মিথ্যাবাদীদের জন্য প্রতীক্ষা করছে। যেমনটি এসেছে রাসূল সাঃ এর হাদিসে: (সত্য আকড়িয়ে ধরা তোমাদের একান্ত কর্তব্য; কেননা সত্য নেকীর দিকে পরিচালিত করে, আর নেকী জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। কোন ব্যক্তি সর্বদা সত্য বলার অভ্যাস রপ্ত করলে ও সত্যের উপর সংকল্পবদ্ধ হলে আল্লাহর কাছে সে সত্যবাদীরূপে লিপিবদ্ধ হয়। আর তোমরা মিথ্যা বলা থেকে সাবধান থাক! কেননা মিথ্যা পাপের দিকে পরিচালিত করে। আর পাপ নিশ্চিত জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করে। কোন ব্যক্তি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে এবং মিথ্যার উপর সংকল্পবদ্ধ হলে তার নাম আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদীরূপে লিপিবদ্ধ হয়।)(৩) ইমাম সানআনী রহিঃ তরবিয়তের ক্ষেত্রে এ হাদিস থেকে যে ফায়দা অর্জিত হয় তার প্রতি ইশারা করেছেন এই বলে: "প্রশিক্ষণ ও অর্জনের মাধ্যমে নন্দিত ও নিন্দিত বৈশিষ্ট্যগুলো চলমান থাকে”। (৪) কাজেই পরিবার ও সমাজের তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হল, সত্যের প্রতি উৎসাহ ও তার প্রতিদান দেয়া এবং মিথ্যার শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে চারিত্রিক এ গুণটি সদস্যদের মধ্যে বপন করা।
-বিনয়:
আরবি )التواضع( শব্দের আভিধানিক অর্থ হল: অবনত বা নীচু হওয়া।(১)
পারিভাষিক অর্থে: নিজেকে নম্র রাখা এবং আত্মপ্রতারণা থেকে দূরে থাকা।(২) কারো মতে: সত্যের সামনে বান্দার নত হওয়া।(৩) আবার কেউ বলেছেন: বিনয় হল অহংকার না করা।(৪)
বিনয় হল একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; যেটিকে ইবনুল কায়্যিম রহিঃ তিনভাগে বিভক্ত করেছেন: প্রথমত- দ্বীনের প্রতি বিনয়: আর তা হল, রাসূল সাঃ যা নিয়ে আগমন করেছেন তার আনুগত্য করা, তার নিকট আত্মসমর্পণ করা এবং তিনটি বিষয়ে স্বীকৃতি দেয়া: ১- তিনি যে বিধানসহ আগমন করেছেন তার বিরুদ্ধে বিপরীত কিছু দাঁড় করাবে না। ২- দ্বীনের কোন দলীলকে অভিযুক্ত করবে না যে সেটির নির্দেশনা বাতিল অথবা ত্রুটিপূর্ণ বা অসম্পূর্ণ এবং তার বিপরীত বিষয়টি দ্বীনের দলীলের চেয়েও অধিক পূর্ণাঙ্গ। ৩- দলীলের বিপরীতে অন্তরে, কথায় এবং কাজে কখনো ভিন্ন পথ গ্রহণ করবে না।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের মধ্য থেকে যাকে নিজের বান্দা হিসেবে পছন্দ করেছেন তাকে তুমি ভাই হিসেবে পছন্দ করবে, তোমার শত্রুর অধিকার অস্বীকার করবে না এবং ওজর পেশকারীর ওজর গ্রহণ করবে।
তৃতীয়ত: সর্বদা হকের অনুসরণ করা; সুতরাং হক প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথেই নিজের মতামত এবং সুবিধা থেকে সরে আসা।(৫)
আর বিনয়ের সর্বোত্তম স্থান হল আল্লাহর ইবাদতে, তাঁর ভয়ে এবং তাঁর ভালবাসায় বিনয় প্রকাশ করা। সুতরাং একজন ব্যক্তি বশ্যতা স্বীকার, অবনত হওয়া, আমলে বাস্তবায়ন করা এবং আল্লাহর নিষিদ্ধবস্তু থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশাবলীর প্রতি বিনয়ী হবে। অপদস্থতা এবং নীচতা ব্যতিরেখে তার মুসলিম ভাইদের সাথে বিনয়ী হবে; কেননা “বিনয়ের একটি সীমারেখা রয়েছে, যখন তা অতিক্রম করা হয় তখন তা অপদস্থতা ও নীচতা হিসেবে গণ্য হয়। অপরদিকে যে ব্যক্তি বিনয় প্রদর্শনে অবহেলা করে সে অহংকার এবং গর্বের দিকে চালিত হয়”।(৬) আর বিনয় কে নীচতা দ্বারা ব্যাখ্যা করা একটি ভুল ব্যাখ্যা। যেমন অত্যাচারী এবং ধনীদের সামনে নীচতা প্রকাশ করা বিনয় নয়; কেননা সক্ষমতা, স্বেচ্ছাধীনতা এবং সত্যের প্রভাবের সাথে বিনয় সম্পৃক্ত। বিনয় বলা হয় যখন তা সক্ষম ব্যক্তি থেকে প্রকাশ পায়। পক্ষান্তরে যদি কোন ব্যক্তি লোভ বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে অথবা কোন ব্যক্তির ভয়ে তার সামনে নীচতা প্রকাশ করে তাহলে সেটা বিনয় নয়। “আর নিন্দিত বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত হল, কোন ধনী ব্যক্তির সামনে বিনয় প্রকাশ করা তার সম্পদের জন্য”।(১)
প্রত্যাশিত বিনয় হল গরীব-মিসকীনদের সাথে বসা, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, বিভিন্ন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা যদিও তারা কম মর্যাদাসম্পন্ন হয়, সমমর্যাদাসম্পন্ন বা তার চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন মানুষদের দেখতে যাওয়া, গরীব-মিসকীন ও ছোট-বড় মানুষের সাথে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় সাক্ষাৎ করা এবং চলাচল, প্রবেশ, প্রস্থান ও আরোহণে প্রবীনদের অগ্রাধিকার দেয়া। ইবনু মাসউদ রাঃ বলেন: “বিনয় হল মজলিসের সম্মানিত স্থানের চেয়ে নীচু স্থানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং যার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে তাকে সালাম দেয়া”। সুলায়মান বিন দাউদ আঃ বনী ইসরাঈলের মজলিসের সবচেয়ে নীচু স্থানে বসতেন এবং বলতেন: মিসকীনদের মাঝে একজন মিসকীন উপবিষ্ট।(২) বিনয়ের আরো অন্তর্ভুক্ত হল, শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে মূর্খের সাথে কোমল আচরণ করা, মুসলিমদের প্রতি নম্রতার পক্ষপট অবনমিত করা এবং তাদের সাথে কঠোরতা পরিহার করা।
বিনয় হল সর্বোত্তম নবীগণের বৈশিষ্ট্যাবলী। আর উত্তম আদর্শ নবী সাঃ এর পদাঙ্ক অনুকরণ এবং তার চারিত্রিক গুণাবলী অনুসরণের মাঝে নিহিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম গুণাবলীর উপর গড়ে তুলেছেন, তিনি বলেন: ﴾وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ﴿ অর্থ: [এবং যারা আপনার অনুসরণ করে সেসব মুমিনদের প্রতি আপনার পক্ষপুট অবনত করে দিন।] (৩)
রাসূল সাঃ ছিলেন তার সর্বোত্তম উদাহরণ; মহান আল্লাহ তায়ালা তার ব্যাপারে বলেন : فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবেন; নিশ্চয় আল্লাহ (তার উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন।](৪)
রাসূল সাঃ এর সুবাসিত জীবনী এবং তার পবিত্র সুন্নাহ বিনয়ের প্রতি উৎসাহিত করে; কেননা তিনি আল্লাহ তায়ালার রাসূল হিসেবে বলেছেন: (হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে। আমি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর শপথ! আমি পছন্দ করি না যে তোমরা আমাকে আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার চেয়ে অধিক মর্যাদা দিবে।)(৫)
তিনি আরো বলেছেন: (তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন মারইয়াম এর পুত্র ঈসা আঃ সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।) (১)
রাসূল সাঃ এর বিনয়ের অন্যতম হল তিনি অসুস্থদের দেখতে যেতেন এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করতেন; ফলে তাদের উপর রাসূল সাঃ এর স্নেহ, মায়ার ছাপ পড়ত যা তাদের যন্ত্রণা লাঘব করত। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ বলেন: (বিদায় হজের বছর আমি একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে রাসূল সাঃ আমার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য আসতেন।)(২)
যদি কোন ব্যক্তি তার নিজের বিনয়ের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চায় তাহলে তার একটি পরিমাপক প্রয়োজন যার মাধ্যমে সে তার আচরণকে পরিমাপ করে জানতে পারবে তার বিনয়ের পরিমাণ ও তার স্তর। আর সর্বোত্তম পরিমাপক যা দ্বারা মানুষ তার আচরণকে পরিমাপ করতে পারে তা হল, রাসূলগণের সর্দার মুহাম্মাদ সাঃ এর চরিত্র। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে আমাদের জন্য অনুসরণীয় নমুনা এবং উত্তম আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন : لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةً حَسَنَةٌ﴿ অর্থ: [অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ।](৩)
মানব জীবনের শুরু এবং শেষ পরিণতি, বিনয়ীদের গুণাবলী ও মানুষের নিকট তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং জমীনে উদ্ধত বা ফাসাদ সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক নয় এমন বিনয়ীদের জন্য আল্লাহ যে প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন তা সর্বদা পর্যালোচনার পথ দিয়ে বিনয় আগমন করে। “আলী রাঃ এর নিকট দু'জন ব্যক্তি একে অপরের সাথে বড়াই করছিল। তিনি বললেন: তোমরা কি ক্ষয়শীল দেহ নিয়ে বড়াই করছ? যদি তোমাদের কোন নেক আমল থাকে তাহলে তা তোমাদের মূল সম্পদ। তোমাদের যদি উত্তম চরিত্র থাকে তাহলে তা তোমাদের জন্য গৌরবের বিষয়। তোমাদের যদি তাকওয়া থাকে তাহলে তা তোমাদের জন্য মহত্ত্বের বিষয়। নতুবা গাধা তোমাদের চেয়ে অধিক উত্তম এবং তোমরা কারো চেয়ে উত্তম নও”। (৪)
বিনয়ের পদ্ধতির অন্তর্গত হল সর্বদা এ কথা স্মরণ করা যে, ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু রয়েছে তা ধ্বংস হবে এবং নিঃশেষ হয়ে যাবে; বিশ্বপালনকর্তার চেহারা ব্যতীত। যেমন তিনি বলেছেন: كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانِ وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ অর্থ: [ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছুই নশ্বর।* আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।] (৫) সুতরাং শেষ পরিণতি ও গন্তব্যস্থল সম্পকে অবগতি এবং সর্বদা এ বিষয়টির স্মরণ জীবন্ত অন্তরকে বিনয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। যদি ধন-সম্পদের উপর বড়াই করা হয় তাহলে এর পরিণতি হল একটি অপরটির পূর্বে ক্ষয় হয়ে যাওয়া, যদি সুস্বাস্থ্যের জন্য অহংকার করা হয় তাহলে জেনে রাখা উচিত যে শরীরের গন্তব্যস্থল হল মাটি, আর পদের অহংকার করা হলে জেনে রাখা উচিত হবে যে, তা একদিন তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে চলে যাবে। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিঃ বলেন: “ধনাঢ্যতা হৃদয়ে, মহত্ত্ব তাকওয়ায় এবং সম্মান-মর্যাদা বিনয়ে।”(১) বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত হল, চলাচলের ক্ষেত্রে বিনয়ীদের বর্ণনা এবং তাদের মূর্খদের নির্বুদ্ধিতা উপেক্ষা করা সংক্রান্ত মহান আল্লাহর বাণীকে স্মরণ করা : وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا [২৫:৬৩]। অর্থ: [আর রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম।] (২)
এগুলো হল আল্লাহর বান্দাদের গুণসমূহ; কেননা তারা অহঙ্কার, বড়াই, দম্ভ এবং ঔদ্ধত্য ব্যতীত জমীনে চলাফেরা করে। এর দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয় যে, তারা জমীনে রোগীদের ন্যায় চলাফেরা করে; না ছল করে, আর না অহঙ্কার করে। আর রাসূল সাঃ যখন চলতেন তখন মনে হত যেন তিনি ঢালবিশিষ্ট জায়গা হতে নিচে অবতরণ করছেন এবং যেন তার জন্য জমীন সংকুচিত করে দেয়া হচ্ছে। কোন কোন সালাফ দুর্বল ও কৃত্রিমভাবে চলাফেরাকে অপছন্দ করেছেন। বর্ণিত আছে যে, উমর রাঃ একদা এক যুবককে ধীরগতিতে হাঁটতে দেখলেন। তিনি বললেন, তোমার কী হয়েছে? তুমি কি অসুস্থ? সে বলল: না, হে আমীরুল মুমিনীন! তিনি তার ছড়ি উঠিয়ে তাকে শক্তিমত্তার সাথে চলার নির্দেশ দিলেন। আর বিনম্রভাবে চলাফেরা দ্বারা উদ্দেশ্য হল তাতে স্থিরতা এবং গাম্ভীর্য বজায় রাখা।(৩)
বিনয়ের পন্থার অন্তর্ভুক্ত হল, যারা যমীনে উদ্ধত হতে এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা যে মর্যাদা এবং প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন; এ বিষয়টি স্মরণ করা। আর তাদের উদ্দেশ্য হল আল্লাহর আনুগত্য এবং তার জন্য বিনয়ী হওয়া। ফলে তারা তাঁর অহঙ্কার নিয়ে বিবাদ করে না। মহান আল্লাহ বলেন: تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ অর্থ: [এটা আখেরাতের সে আবাস যা আমরা নির্ধারিত করি তাদের জন্য যারা যমীনে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।] (৪) সুতরাং এই উপদেশ ও ধারাবাহিক পর্যালোচনা অন্তরে বিনয়ের স্থান উন্মুক্ত করে দেয় এবং এতে বিনয়ের প্রতি ভালবাসা রোপন করে।
-সহমর্মিতা ও দয়া:
আভিধানিক অর্থে (الرحمة) দয়া হল: কোমলতা ও সদয়তা। লোকেরা একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে আরবিতে "تراحم القوم" বলা হয়। আবার রহমত 'ক্ষমা' অর্থেও ব্যবহৃত হয়।(৫)
আর (الرفق) কোমলতা হল: কঠোরতার বিপরীত।(৬)
পারিভাষিক অর্থে (الرحمة) দয়া হল: হৃদয়ের নম্রতা যাকে কষ্ট স্পর্শ করে যখন ইন্দ্রিয় অথবা মস্তিষ্ক অপর ব্যক্তির মাঝে কষ্টের উপস্থিতি দেখতে পায়। অথবা তাকে আনন্দ স্পর্শ করে যখন ইন্দ্রিয় অথবা মস্তিষ্ক অপর ব্যক্তির মাঝে আনন্দের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।(১)
কোমলতার সাথে দয়ার এমন নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যে একে অপর থেকে পৃথক হয় না। সুতরাং যে অন্যের প্রতি দয়া অনুভব করে সে তার সাথে ব্যবহারে কঠোর না হয়ে কোমল হবে। কেননা কোমলতা তাকে দয়ার দিকে পরিচালিত করে।(২)
পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, দয়ার উৎস হল উচ্ছ্বসিত অনুভূতি এবং অভ্যন্তরীণ আবেগপূর্ণ উপলব্ধি। সুতরাং দয়া যখন হৃদয়ে সক্রিয় হয় তখন মানুষের আচরণে মিথস্ক্রিয়া ও মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণরূপে আবেগপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশিত হয়। ফলে আচরণে ও ব্যবহারে সহমর্মিতা এবং করুণা প্রকাশিত হয়। ইমাম ইস্পাহানী রহিঃ বলেন: "দয়া হল এমন কোমলতা যা অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি সদ্ব্যবহারের দাবী করে। কখনো দয়া শুধুমাত্র কোমলতা বুঝাতে ব্যবহার হয় আবার কখনো কোমলতা মুক্ত সদ্ব্যবহার বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়: আল্লাহ অমুকের প্রতি দয়া করুন”।(৩) অর্থাৎ দয়া যখন আচরণে রূপ নেয় তখন সেটি কোমলতা বা সহমর্মিতা হয়ে যায়। আর যখন এটা শুধু অনুভূতি হয় এবং তার সাথে ইতিবাচক আচরণ যুক্ত না হয় তখন এটা শুধু মানসিক সমবেদনায় রূপ নেয়।
সুতরাং সহমর্মিতার উৎস হল রহমত বা দয়া। মানুষ যখন সহমর্মী হয় তখন সে দয়াশীল হয়। সুতরাং রহমত বা দয়া হল সে উৎসশক্তি যা মানুষকে পরস্পর সহযোগিতা এবং একতার দিকে ধাবিত করে। “সুতরাং রহমত বা দয়া হল এমন শক্তি যা সদস্যদেরকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে এবং তাদেরকে প্রবণতা ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে এক পরিবারে পরিণত করে”।(৪) রহমত ব্যক্তিকে মানুষের কষ্ট অনুভব করতে, তা দূরীভূত করতে উদ্যোগী হতে এবং তাদের ভুলে আফসোস করতঃ তাদের জন্য হেদায়েত কামনা করতে শেখায়। এ জন্য সে তাদের প্রতি আগ্রহ থেকে উৎপন্ন আন্তরিক কাজের মাধ্যমে প্রচেষ্টা করে।
রহমত বা দয়া আল্লাহ তায়ালার সিফাতসমূহের মধ্য হতে একটি সিফাত; মহান আল্লাহ বলেন: وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ অর্থ: [আর আমার দয়া- তা তো প্রত্যেক বস্তুকে ঘিরে রয়েছে।](৫) তিনি আরো বলেন: وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا﴿ অর্থ: [আর তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।](৬) আর এই রহমত বা দয়া দুনিয়া ও আখেরাতে মুমিনদের জন্য। দুনিয়াতে এইভাবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সেই হকের দিকে হেদায়েত দিয়েছেন যাকে অন্যরা ভুলে রয়েছে এবং তাদেরকে সেই পথের সন্ধান দিয়েছেন যেই পথ থেকে অন্যরা বিচ্যুত হয়েছে। আর আখেরাতে তাদের প্রতি দয়ার অর্থ হল, মহাভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ রাখা হবে এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান হবে।
আল্লাহ তায়ালা এই মহৎ চারিত্রিক গুণে গুণান্বিতদের প্রশংসা করে বলেন: ﴿ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ ءَامَنُواْ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ أُوْلَبِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ﴾ হয়ে যায় যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পর উপদেশ দিয়েছে দয়া অনুগ্রহের।* তারাই সৌভাগ্যশালী।](১) অর্থাৎ তারা মানুষদেরকে উপদেশ দিয়েছে তাদের অভাবগ্রস্তদের খাবার প্রদান, তাদের মূর্খদের শিক্ষা দেয়া, সার্বিকভাবে তাদের প্রয়োজন পূরণ, দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণে তাদের সহযোগিতা করা এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করা হয় তা তাদের জন্য অপছন্দ করার ব্যাপারে। ওরাই হল তারা, যারা বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেছে; যদি তাদের মাঝে দয়ার গুণের সাথে সূরা বালাদে উল্লেখিত গুণগুলো পূর্ণতা পায়।(২)
মানুষের প্রতি সহমর্মিতা হল সেই চারিত্রিক আচরণ যা মানুষের দয়ার সুপ্ত ইচ্ছাকে উন্মুক্ত করে। এটি মানুষের মাঝে সমবেদনা ও সম্প্রীতির প্রকৃত সমার্থক শব্দ। সুতরাং কোন ব্যক্তি যখন অন্যকে দরিদ্রতা ও অভাবে কষ্ট করতে দেখে তখন তার হৃদয় ঐ ব্যক্তির প্রতি কোমল হয়; ফলে সে তার প্রতি করুণা করে এবং তার অবস্থার প্রতি সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতা করে সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে। আর যদি তাকে বিপথে চলে যেতে দেখে তাহলে তার অবস্থা দেখে হৃদয় বিগলিত হয়। ফলে সে তাকে নসীহা করে এবং তাকে হেদায়েত ও সংশোধনের পথ দেখায়; যাতে তাকে ধ্বংসের গহ্বর থেকে উদ্ধার করতে পারে। আর এটি তার অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রতি অনুগ্রহ ব্যতীত আর কিছুই নয়।
দয়ার মর্ম উপলব্ধি ও অনুভব করার ক্ষেত্রে তারতম্য হওয়ার কারণে মানুষের কাছে দয়ার হালতের তারতম্য হয়। কিছু মানুষ মনে করে যে, দয়া শুধুমাত্র তাদের জন্য যাদেরকে তারা ভালবাসে; যেমন সন্তান-সন্ততি এবং আত্মীয়-স্বজন এবং তারা ব্যতীত অন্যদের জন্য নয় যারা করুণা এবং দয়ার যোগ্য। ফলে তাদের দুঃখ-কষ্টে সে কোন প্রকারের মানসিক অংশগ্রহণ অনুভব করে না। কখনো কারো দয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়ে বংশ, গোত্র এবং শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, আবার কারো দয়া করুণা ও রহমতযোগ্য প্রতিটি জীবিত প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করে।(৩) নিশ্চয় স্বার্থপরতার সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে সুপরিসর ও বিস্তৃত বৃত্তের দিকে মানুষের প্রস্থান এবং শুধু নিজেকে ভালবাসার কাঠামো থেকে অন্যদেরকে ভালবাসার সুপরিসর কাঠামোর দিকে মানুষের যাত্রা হল মহান চারিত্রিক উন্নতি।
রহমতের বৃত্ত বিস্তৃত হয়ে তার সকল মর্মকে তুমি মূর্ত হতে দেখবে রাসূল সাঃ এর চরিত্রে, তার উপদেশ ও নির্দেশনায় এবং তার নসীহত ও কওমের লোকদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত কষ্টের উপর তার ধৈর্যধারণে। আল্লাহ তায়ালা তাকে রহমত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন: ﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ﴾ অর্থ: [আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবেন; নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন।] (৪)
এ জন্য আমরা রাসূল সাঃ হাদিসসমূহকে পায় ক্রমাগতভাবে নম্রতা ও সহমর্মিতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে। যেমন তিনি বলেছেন: (যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহও তাকে দয়া করেন না।) (৫) তিনি আরো বলেন: (নম্রতা যে কোন বিষয়কে সৌন্দর্য মণ্ডিত করে। আর যে কোন বিষয় থেকে নম্রতা বিদূরিত হলে তাকে কলুষিত করে।) (৬)
রাসূল সাঃ এর আচরণের মধ্য হতে যে বিষয়টি দয়ার সকল মর্মই প্রমাণ করে তা হল ছোটদের প্রতি তার স্নেহ-মায়ার প্রদর্শন। বাচ্চাদের চুমু দেয়া, তাদেরকে কোলে নেয়া তো দয়ার নিদর্শন বৈ আর কিছুই নয়। আর তারা দুর্বল ও ছোট হওয়ার কারণে শৈশবে তারা এগুলোর প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী। অনুরূপভাবে এটি তাদের মাঝে নম্রতা, সহমর্মিতা ও করুণার বীজ বপন করে দেয়। আবু হুরায়রা রাঃ বলেন: (রাসূল সাঃ একদা হাসান বিন আলী রাঃ কে চুম্বন করেন। সে সময় তার নিকট আকরা বিন হাবেস উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা বিন হাবেস বললেন: আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেউ কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূল সাঃ তার পানে তাকালেন, অতঃপর বললেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।) (৭)
এটা প্রায়োগিক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা যা শিশুদের প্রতি রাসূল সাঃ এর ভালবাসা, স্নেহ-মায়া এবং গুরুত্বপ্রদান সুস্পষ্ট করে। আরো প্রতীয়মান হয়েছে রাসূল সাঃ কর্তৃক শিশুদের প্রতি করুণার মাধ্যমে তাদের হৃদেয় দয়ার সঞ্চারণ করা, তাদেরকে সহমর্মিতা ও তার গুরুত্ব অবহিত করা; যাতে তারা রাসূল সাঃ এর ভালবাসাকে উপলব্ধি করতে পারে এবং তাদের অনুভূতিতে তার ভালবাসার প্রতিফলন ঘটে।
তবে কঠিন হৃদয় অন্যের দুঃখে-কষ্টে আন্দোলিত হয় না এবং দুর্বলের দুর্বলতা, রোগীর যন্ত্রণা, বয়োবৃদ্ধের বার্ধক্য, ছোটদের অক্ষমতা এবং গরীর-মিসকীনের অভাব তাদেরকে জাগ্রত করে না। মানুষের চরিত্রে কঠোরতা বড় ধরণের ত্রুটির প্রমাণ। আর প্রশস্ত হৃদয় খুব কমই নিষ্ঠুরতার উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়। বস্তুত এটি ঘৃণা ও কঠোরতা অপেক্ষা ক্ষমা ও স্নেহ-মমতার অধিক কাছাকাছি। কেউ কেউ মনে করেন যে, কঠোর শব্দ বা শিষ্টাচারের জন্য প্রহার করার দ্বারা তরবিয়ত গ্রহণকারীর অনুভূতিকে আঘাত না করে তরবিয়তের ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন হল লালন-পালনের ক্ষেত্রে শিথিলতা। শিষ্টাচার শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা যদি উপযুক্ত স্থানে হয় তাহলে সেটি শিক্ষার্থীর প্রতি রহমত; কেননা ধর্তব্য হল ফলাফল। সুতরাং যারা বাচ্চাদেরকে ভীত না করার উপদেশ দেন তারা বাচ্চাদেরকে প্রাকৃতিক ভয়ের মুখোমুখী হওয়ার আবশ্যকীয়তার কথা বলেন; যেন তারা শক্ত মেরুদণ্ড, দৃঢ় সংকল্প এবং ঝুঁকি মোকাবেলা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হতে সদিচ্ছার অধিকারী হিসেবে বেড়ে ওঠে। (৮)
এ জন্য শরীয়তের নির্দেশানুসারে চোরের হাত কাটা তার প্রতি রহমত হিসেবে গণ্য করা হবে; যাতে সে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অবৈধ উপায়ে মানুষের সম্পদ ভক্ষণের পাপ করতে না পারে। শরীয়তের নির্দেশানুসারে কিসাস তার প্রতি রহমতস্বরূপ যার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হয়; যাতে সে মানুষের ঘাড় না মাড়ায় ফলে তার পাপ বৃদ্ধি পায়। আর এটি একই সময়ে সমাজের প্রতিও রহমতস্বরূপ এবং ঐ ব্যক্তির প্রতি রহমতস্বরূপ যে অন্তরে অন্যের ক্ষতির আকাঙ্খা লালন করে অতঃপর অন্যের উপর শাস্তির যন্ত্রণা দেখে সে ক্ষতি করা থেকে নিবৃত থাকে। সুতরাং রহমত বা দয়া কঠোর ও শক্ত হৃদয়ের অধিকারীদের হক নয়। অন্যভাবে বলা যায় যে, দয়া প্রাপ্তি দয়া করার শর্তের সাথে যুক্ত; এমনকি কঠোর ব্যক্তির চরিত্র যতই উন্নত হোক না কেন তার জন্য রহমত প্রার্থনায় আমাদের নৈতিক বিবেক সায় দেয় না। আর শিরক ও কবীরা গোনাহকারী এবং সত্য ও উত্তম গুণাবলীর শত্রুরা যেহেতু সামাজিক ব্যাধি লালন করে যা নিরাময় করা অসম্ভব বিধায় তাদের ঘৃণা করা আবশ্যক; যাতে তারা সঠিক পথে এবং ইসলামী চারিত্রিক গুণাবলীর দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তাহলে হৃদয় ভালবাসা ও করুণার সাথে তাদের অভিমূখী হবে।(১)
-আমানতদারিতা: আভিধানিক অর্থে আমানতদারিতা হল: খেয়ানতের বিপরীত। আর সমাজের বিশ্বাসভাজন হল সেই ব্যক্তি যার প্রতি মানুষেরা আস্থা রাখে এবং যাকে আমানতদার ও রক্ষক হিসেবে মেনে নেয়। আমানতের আরো অর্থ হল: আনুগত্য, ইবাদত, সম্পদ আমানত রাখা এবং আস্থা।(২)
পারিভাষিক অর্থে আমানতদারিতা হল: “ফরজ, ওয়াজীব পালন ও হারাম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আল্লাহর হকসমূহের পরিচর্যা করা এবং বান্দার হকসমূহের হেফাযত করা। সুতরাং যখন কোন ব্যক্তির নিকট আমানত রাখা হয় তখন সে ঐ আমানতের সম্পদের প্রতি লালায়িত হবে না, কোন সম্পদ পাহারার দায়িত্ব পেলে সে তা দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে না, ধোঁকার আশ্রয় নিবে না, ওজন ও পরিমাপে কম করবে না, দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান ও প্রচার করবে না এবং ইলম ছাড়া ফতোয়া দিবে না”। (৩)
“মনস্তাত্বিক দিক থেকে আমানতদারিত হল, অন্তরের মাঝে স্থায়ী একটি চরিত্র; যার দ্বারা মানুষ যে সম্পদে তার অধিকার নেই তা গ্রহণ করা থেকে বেঁচে থাকে। যদিও মানুষের নিকট নিন্দার শিকার হওয়া ব্যতীত তার সম্মুখে আমানতে সীমালঙ্ঘন করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সে তার উপর অথবা তার নিকট অন্যের যে হক রয়েছে তা আদায় করে; যদিও সে মানুষের নিকট নিন্দার শিকার হওয়া ব্যতীত সেই হক ভক্ষণ করতে সক্ষম হয়”। (৪)
ইমাম কুরতুবী রহিঃ বলেন: “বিশুদ্ধ মতে আমানতদারিতা দ্বীনের সকল কর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে; আর এটি জমহুরের মত”। (৫)
লেখকের মতে আমানতদারিতা হল: মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা হেফাযত করা এবং তার নিকট অন্য মানুষের যে অধিকার রয়েছে তা অনৈতিকভাবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা।
আমানতদারিতার ব্যাপক অর্থ এবং বহুমুখী দিক রয়েছে। এটি গচ্ছিত সম্পদের হেফাযত, গোপন কথার হেফাযত এবং ব্যক্তিকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তা পালনে পূর্ণ চেষ্টা করাও আমানত।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে আমানত অন্তর্ভুক্ত করে আল্লাহ তায়ালা যে সব তরবিয়ত, দিকনির্দেশনা, হকসমূহ আদায় এবং কর্তব্য পালন করতে বলেছেন, সেগুলোকে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কান, চোখ, জিহ্বা এবং বুদ্ধি-বিবেকের ন্যায় যে সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েছেন; এ ক্ষেত্রে আমানতদারিতা হল; এগুলোকে দ্বীনের খেয়ানত ও দায়িত্বের খেয়ানত থেকে হেফাযত করা। মহান আল্লাহ বলেন: لَيْسَ لَكَ بِهِۦ وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِۦ ই عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾ [আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (১)
আর তা হল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়সমূহ, বুদ্ধি-বিবেক এবং হৃদয়ের আমানত; যে সম্পর্কে এগুলোর অধিকারী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়সমূহ, বুদ্ধি-বিবেক এবং হৃদয়সহ সকলকে জিজ্ঞাসা করা হবে। এমন আমানত যার সুক্ষ্মতা ও বিশালতার কারণে বিবেক কেপে ওঠে; যখনই জিহ্বা কোন শব্দ উচ্চারণ করে বা মানুষ কোন ঘটনা বর্ণনা করে অথবা কোন ব্যক্তি, বিষয় বা ঘটনার উপর হুকুম প্রদান করে।
আল্লাহ তায়ালা আমানত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং খেয়ানতের চরিত্র ধারণে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا [নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।] (২)
তিনি বলেন: وَإِن كُنتُمْ عَلَى سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُواْ كَاتِبَا فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُم بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَنَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا تَكْتُمُواْ الشَّهَادَةً وَمَن يَكْتُمُهَا فَإِنَّهُ عَاثِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ অর্থ: [আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত বন্ধক রাখবে। অতঃপর তোমাদের একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করলে, যার কাছে আমানত রাখা হয়েছে সে যেন আমানত প্রত্যার্পণ করে এবং তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। আর যে কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবগত।] (৩)
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَنَتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।] (১)
সুতরাং আমানত আদায় করা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াজীব। সকল মুসলমানের উপর অবধারিত যে, সে আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূলের সাথে ও মানুষের সাথে আমানতের হেফাযত করবে এবং সে খেয়ানতকারীদের সাথে খেয়ানত করবে না। বরং সে তাদের আমানত তাদের নিকট ফেরত দিবে রাসূল সাঃ এর কথার প্রেক্ষিতে: (যে ব্যক্তি তোমার কাছে আমানত রেখেছে তাকে তা ফেরত দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না।) (২)
আর আমানতের বিপরীত হল খেয়ানত যা সংকট, প্রতারণা এবং ধোঁকার কারণ; কেননা আমানতের অনুপস্থিতিতে নানা পেশায় ও কাজে কর্মের ফলাফল হ্রাস পায় এবং দায়িত্বপালনের হার দুর্বল হয়। অনুরূপভাবে আমানতের অনুপস্থিতিতে ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা যায় এবং লেনদেনে বিশ্বাসহীনতার কারণে মানুষের মাঝে ব্যবসা হোঁচট খায়।
আমানতের অনুপস্থিতিতে অপরাধ, আত্মসাৎ, সম্মানহানী এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আর ইসলাম খেয়ানতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ধ্বংস করার জন্য এবং মানুষের মাঝে এর প্রভাবকে চূর্ণ করার জন্য। সুতরাং ঈমানের পাল্লায় খেয়ানত হল নিফাকের আলামতসমূহের মধ্য হতে একটি আলামত। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (মুনাফিকের আলামত তিনটি: বলতে গেলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে খেয়ানত করে, আর ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।) (৩)
আর যখন খেয়ানত বিস্তার লাভ করে ও আমানত হারিয়ে যায় তখন এটি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সতর্কবার্তা এবং কিয়ামতের একটি নিদর্শন। আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন: (যখন আমানত নষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। সে বলল, কিভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন, যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তুমি কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে।) (৪)
সুতরাং অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে কাজের দায়িত্ব দেয়া খেয়ানত ও আমানত বিনষ্ট করার নামান্তর। এ জন্য রাসূল সাঃ যখন নাজরান বাসীর প্রতি একজনকে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন তাদের জন্য এই উম্মতের 'আমীন' আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাঃ কে প্রেরণ করেন। আবু উবায়দাহ রাঃ কে চয়ন করার কারণ হল, তার মর্যাদা ও যিনি কাজের গুরুভার গ্রহণ করবেন তার ব্যক্তিত্বের গুরুত্বের দিক বিবেচনায়। হুযায়ফা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ নাজরান বাসীকে বললেন: (আমি তোমাদের নিকট এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাব যিনি হবেন প্রকৃতই বিশ্বস্ত। একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতে লাগলেন। পরে তিনি আবু উবায়দাহ রাঃ কে পাঠালেন।) (৫)
অনুরূপভাবে বর্তমান সমাজে আমানতের অনুপস্থিতির কারণ হল আকীদা, ইবাদত এবং দণ্ডবিধিতে মুক্তশিক্ষা এবং বিপথগামী সামাজিক স্রোতের কুফল।
ইসলামী লালন-পালনে পরিবারের শিথিলতা আমানতদারিতার অনুপস্থিতির কারণ; যখন ইসলামী তরবিয়তের মানহায সুস্পষ্ট বোধগম্য, সহজ পদ্ধতি, স্বচ্ছ তরবিয়তি লক্ষ্য ও আকাঙ্খা বাস্তবায়নকারী এবং সর্বযুগে, সর্বাবস্থায় ও সকল শ্রেণীর জন্য আমলযোগ্য।
বর্তমান যুগের সমাজ কথা, কাজে, অধিকারে, দায়িত্ব-কর্তব্যে এবং ইন্দ্রীয়সমূহে যে আমানতের অনুপস্থিতি ও খেয়ানতের বিস্তার লাভের সমস্যার সম্মুখীন; তা মূলত ইসলামী তরবিয়তের মানহায পরিত্যাগের ফলাফল।
টিকাঃ
(১) মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৯১)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/৩৮৪, হা: ৭৪০৫), সহীহ মুসলিম (৪/২১০২)।
(২) সূরা আলে-ইমরান: (১৫৪)।
(৩) শাইখ সুলাইমান বিন মুহাম্মাদ, তাইসীরুল আজিজিল হামীদ, (পৃ: ৩৩২)।
(৪) আব্দুর রহমান আলুশ শাইখ, ফাতহুল মাজীদ (পৃ: ৩৩২)।
(৫) সূরা আলে-ইমরান: (৩১)।
(৬) আব্দুর রহমান আলুশ শাইখ, ফাতহুল মাজীদ (পৃ: ৩৩২)।
(১) সহীহ বুখারী (১/২২, হা: ১৬), সহীহ মুসলিম (১/৬৬, হা: ৬৭/৪৩)।
(২) সূরা আল-আম্বিয়া: (৯০)।
(৩) আব্দুর রহমান আলুশ-শাইখ, ফাতহুল মাজীদ (পৃ: ৩৪৪)।
(৪) সূরা আল-হিজর: (৫৬)।
(৫) যিন্দিক: যে ব্যক্তি কুফুরী গোপন করে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করে। মুরজিয়াহ: যারা বিশ্বাস রাখে যে, ঈমান আনার পরে পাপ করলে কোন ক্ষতি হয় না যেমন কুফরী অবস্থায় সৎকাজ কোন উপকারে আসে না। হারুরী: আলী রাঃ সালিশি বিচার মেনে নেওয়ার কারণে যারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। হাশিয়াতু কিতাবিল উবৃদিয়্যাহ, ইবনুল কায়্যিম (পৃঃ ২৭)।
(৬) ইবনে তাইমিয়াহ, আল-উবৃদিয়্যাহ (পৃঃ ৩৭)।
(৭) মুহাম্মাদ আল-আজুররী, আখলাকুল কুরআন (পৃঃ ১২৮)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৯১)।
(২) সূরা আল-আন'আম: (১৬২)।
(৩) সূরা আল-আ'রাফ: (২০৪)।
(৪) সূরা আল-হাদিদ: (০৪)।
(৫) সূরা ক্বাফ: (১৬)।
(১) সূরা লুকমান: (১৬)।
(২) সহীহ বুখারী (১/২২, হা: ১৫), সহীহ মুসলিম (১/৬৭, হা: ৭০-৪৪)।
(৩) সূরা আল-হাশর: (০৭)।
(৪) সূরা আল-আহযাব: (২১)।
(৫) সূরা আল-আহযাব: (৫৬)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৫১৪)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৫/৫১৫, হা: ৩৫৪৬) এবং তিনি হাদিসটিকে আনাস রাঃ হতে ছাবেতের সূত্রে গরীব বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ (১/২০১), শাইখ আলবানী সহীহুল জামেউস সগীর গ্রন্থে (১/৫৫৭, হা: ২৮৭৮) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সূরা আল-হুজুরাত: (০১-০২)।
(৪) সূরা আন-নূর: (৬৩)।
(৫) মুহাম্মাদ আল-আমীন শানক্বীতী, তার থেকে লেখেছেন আহমদ কাদেরী (পৃ: ২০৭)।
(১) আব্দুর রহমান আস-সাদী, তাফসীরুল কারীমির রহমান (৫/৬৭)।
(২) কান্ধালভী, হায়াতুস সাহাবা (পৃ: ৫২৫)।
(৩) সূরা আল-ইসরা: (২৩-২৪)।
(১) সায়্যেদ কুতুব, ফী যিলালিল কুরআন (৪/২২২১)।
(২) সহীহ বুখারী (২/৩৫৯, হা: ৩০০৪), সহীহ মুসলিম (৪/১৯৭৫, হা: ৫/২৫৪৯)।
(৩) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৭৮, হা: ১০/২৫৫১)।
(৪) আব্দুল্লাহ আব্দুর রহীম, মিনাল আদাব ওয়াল আখলাক (পৃ: ৪৫)।
(৫) সূরা লুকমান: (১৪)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/৮৬, হা: ৫৯৭১), সহীহ মুসলিম (৪/১৯৭৪, হা: ১/২৫৪৮)।
(১) মুহাম্মাদ আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (১/৩৮৬)।
(২) সহীহ মুসলিম (২/১১৪৮, হা: ২৫/১৫১০)।
(৩) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১/১৫৩)।
(৪) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়িয়্যাহ (১/৪৫৩)।
(৫) আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (১/৩৭৩-৩৯৩)।
(৬) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১২/২৩২)।
(১) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (১৬/১৬৪)।
(২) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৫৩১)।
(৩) প্রাগুক্ত (৪/১৫৫৩)।
(৪) সূরা আল-ইসরা: (২৬)।
(৫) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৬/১১৩)।
(১) সূরা আর-রাদ (১৯-২১)।
(২) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (২/৩৬-৩৭)।
(৩) সূরা মুহাম্মাদ (২২-২৩)।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/৯৫-৯৬, হা: ৬০২৪) সহীহ মুসলিম (৪/২০০৩-২০০৪, হা: ৭৭/২৫৯৩)।
(৫) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৬/১১২)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/৮৯, হা: ৫৯৮৫) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৮২, হা: ২০/২৫৫৭)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৪/১৫৪)।
(২) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১২১)।
(৩) সূরা আন-নিসা: (৩৬)।
(৪) ইবনে হাজার ফাতহুল বারী (১/৪৪১)।
(১) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১২০)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০২৫, হা: ১৪০/২৬২৪)।
(৩) নূরুদ্দীন আল-হাইছামী, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ (১/১৬৪)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৪৯, হা: ৮৯)।
(১) মুসনাদে আহমদ (২/৪৪০)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৬), সহীহ মুসলিম (১/৬৮, হা: ৭৩/৪৬)।
(৩) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৪২)।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৮), সহীহ মুসলিম (১/৬৮, হা: ৭৪/৪৭)।
(৫) সহীহ বুখারী (২/১৯৫, হা: ২৪৬৩), সহীহ মুসলিম (৩/১২৩০, হা: ১৩৬/১৬০৯)।
(১) ইবনু কুদামা আল-মাকদেসী, মুখতাসারু মিনহাজিল কাসেদীন (পৃ: ১১৬)।
(২) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১২১)।
(৩) সহীহ মুসলিম (৪/২০২৫, হা: ১৪২/২৬২৫)।
(৪) ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৪২)।
(৫) সহীহ বুখারী (২/১২৯, হা: ২২৫৯)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৭), সহীহ মুসলিম (২/৭১৪, হা: ৯০/১০৩০)।
(১) ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৪৫)।
(২) মুসনাদে আবি ইয়ালা (১১/৯, হা: ৬০১৪৮)। শায়খ আলবানী জামেউস সগীরে (৩০০৪) হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
(৩) সহীহ বুখারী (২/১২৯, হা: ২২৫৯)।
(৪) আব্দুল হামিদ হাশেমী, আল-মুরশিদ ফি ইলমিন নাফস (পৃ: ৩০৮)।
(১) আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত (পৃ: ১৪০)।
(২) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০৬)।
(৩) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২২৬-২২৭)।
(৪) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ১৯০)।
(৫) সহীহ বুখারী (১/২০, হা: ৯), সহীহ মুসলিম (১/৬৩, হা: ৫৮/৩৫)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/১১০, হা: ৬১০২), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৯-১৮১০, হা: ৬৭/৩২২০)।
(১) সহীহ মুসলিম (১/৬৮, হা: ৬۱/৩৭)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৪/৩০২, হা: ৪০১২), নাসায়ী (১/২০০, হা: ৪০৬), শাইখ আলবানী সহীহুল জামেউস সগীরে (১/৩৬১, হা: ১৭৫৬) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০৬)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৬৩)।
(৫) সহীহ বুখারী (১/৬৩), সহীহ মুসলিম (১/২৬১, হা: ৬১/৩৩২)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/২৭০)।
(২) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৪/৪৩৮-৪৩৯)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, উদ্দাতুস সাবেরীন (পৃ: ১৭)।
(৪) সূরা আল-বাকারা (১৫৫-১৫৭)।
(১) সূরা আলে-ইমরান (২০০)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৪৫৪)।
(৩) সূরা আল-কাহফ (২৮)।
(৪) আহমাদ আব্দুর রহমান, আল-ফাযায়েল আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ১৬৪)।
(১) সহীহ বুখারী (১/৪৫৫, হা: ১৪৫৯), সহীহ মুসলিম (২/৭২৯, হা: ১২৪/১০৫৩)।
(২) সূরা আশ-শুরা: (৪৩)।
(৩) সূরা হুদ: (১১)।
(৪) সূরা আল-আনফাল: (৪৬)।
(১) সূরা আর-রাদ: (২৪)।
(২) আব্দুর রহমান আস-সাদী, তাইসীরুল কারীমীর রহমান (২/৪৬৯)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/২৫, হা: ৫৬৫৩)।
(৪) সুনানে তিরমিযি (৩/৩৪১, হা: ১০২১), মুসনাদে আহমদ (৪/৪১৫), শাইখ আলবানী আল-জামেউস সগীরে (১/১৯৯, হা: ৭৯৫) হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
(৫) সূরা ফুসসিলাত: (৩৫)।
(৬) সূরা আল-কাসাস: (৮০)।
(৭) মুহাম্মাদ আহমদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/২৮৫)।
(১) ফিরোজ আবাদী, আল-কামুস আল-মুহীত (৩/২৫২)।
(২) আব্দুল লতীফ মুহাম্মাদ, আল-আখলাক ফিল ইসলাম (পৃ: ১৭০)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/২৮৫)।
(৪) সূরা মারইয়াম: (৪১)।
(৫) সূরা মারইয়াম: (৫৬)।
(৬) সূরা মারইয়াম: (৫৪)।
(৭) সূরা আত-তাওবা: (১১৯)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (২/৪১৪)।
(২) সূরা আল-ইসরা: (৮০)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/২৮১)।
(৪) আল-মাওয়ারদী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন (পৃ: ২৬২-২৬৩)।
(১) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (১/৪১)।
(২) সহীহ বুখারী (১/২১, হা: ১৩), সহীহ মুসলিম (১/৬৭, হা: ৭১/৪৫)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/১০৯, হা: ৬০৯৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১২-২৫১৩, হা: ১০৫/২৬০৭)।
(৪) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০৩)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৮/৩৯৭)।
(২) আহমাদ, মাওসুআতু আখলাকিল কুরআন (১/৬৮)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৪৬)।
(৪) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০۹)।
(৫) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৪৭-৩৫১)।
(৬) ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ (পৃঃ ১৫৮)।
(১) আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (২/২৩২)।
(২) প্রাগুক্ত (২/২৩১)।
(৩) সূরা আশ-শুআ'রা: (২১৫)।
(৪) সূরা আলে-ইমরান: (১৫৯)।
(৫) মুসনাদে আহমদ (৩/১৫৩-২৪১), শাইখ আলবানী রহিঃ সিলসিলাতুল আহাদিস সহীহাহতে (১৫৭২) হাদিসটিকে 'ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ' বলেছেন。
(১) সহীহ বুখারী (২/৪৮৯-৪৯০, হাঃ ৩৪৪৫)।
(২) সহীহ বুখারী (১/৩৯৯, হাঃ ১২৯৫)।
(৩) সূরা আল-আহযাব: (২১)।
(৪) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২১০)।
(৫) সূরা আর-রহমান: (২৬-২৭)।
(১) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২৩১)।
(২) সূরা আল-ফুরকান: (৬৩)।
(৩) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৩৩৬-৩৩৭)।
(৪) সূরা আল-কাসাস: (৮৩)।
(৫) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১২/২৩০)।
(৬) প্রাগুক্ত (১০/১১৮)।
(১) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (২/৫)।
(২) প্রাগুক্ত (২/৩১৫)।
(৩) রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃ: ১৯১)।
(৪) মুহাম্মাদ আহমাদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/২৭৩)।
(৫) সূরা আল-আ'রাফ: (১৫৬)।
(৬) সূরা আল-আহযাব: (৪৩)।
(১) সূরা আল-বালাদ: (১৭-১৮)।
(২) তাফসীরুল কারীম, সা'দী (৫/৪১৮-৪১৯)।
(৩) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামীয়্যাহ (২/৫)।
(৪) সূরা আলে-ইমরান: (১৫৯)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/৩৭৪, হা: ৭৩৭৬), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৯, হা: ৬৬/২৩১৯)।
(৬) সহীহ মুসলিম (৪/২০০৪, হা: ৭৮/২৫৯৪)।
(৭) সহীহ বুখারী (৪/৯১, হা: ৫৯৯৭), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৮-১৮০৯, হা: ৬৫/২৩১৮)।
(৮) আহমাদ ফুয়াদ, আত-তারবিয়াহ ফীল ইসলাম (পৃ: ১২৯)।
(১) আহমাদ আব্দুর রহমান, আল-ফাযায়েল আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ১৭৭)।
(২) ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব (১৩/২২)।
(৩) মুহাম্মাদ আহমাদ জাদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/১৫৫)।
(৪) আব্দুর রহমান আল-ময়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (১/৬৪৫)।
(৫) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (১৪/১৬২)।
(১) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(২) সূরা আন-নিসা: (৫৮)।
(৩) সূরা আল-বাকারা: (২৮৩)।
(১) সূরা আল-আনফাল: (২৭)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৩/৮০৩-৮০৫, হা: ৩৫৩৪), তিরমিযি (৩/৫৬৪, হা: ১২৬৪) শাইখ আলবানী রহিঃ আল-জামেউস সগীরে (১/১০৭, হা: ২৪০) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সহীহ বুখারী (১/২৭, হা: ২৩), সহীহ মুসলিম (১/৭৮, হা: ১০৭-৫۹)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৩৭, হা: ৫৯)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/৩৫৪, হা: ৭২৫৪)।
দ্বীন ইসলামের বিশেষত্ব ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অন্তর্গত হল, এটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক শিষ্টাচারে স্বয়ংসম্পূর্ণ; যা ব্যক্তির চারিত্রিক পরিপালন নিশ্চিত করে।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযী রহঃ আদবকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন(১); সেগুলো:
১- আল্লাহর সাথে আদব।
২- রাসূল সাঃ ও তার আনীত শরীয়তের সাথে আদব।
৩- সৃষ্টিজীবের সাথে আদব।
এই অনুচ্ছেদে আমি ইসলামী পরিপালন সংশ্লিষ্ট শিষ্টাচার ও চারিত্রিক গুণাবলীকে বিভক্ত করব:
প্রথমত: আল্লাহ তায়ালার সাথে আদব।
দ্বিতীয়ত: রাসূল সাঃ এর সাথে আদব।
তৃতীয়ত: মাতা-পিতার সাথে আদব।
চতুর্থত: রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের সাথে আদব।
পঞ্চমত: প্রতিবেশির সাথে আদব।
ষষ্ঠত: চারিত্রিক গুণাবলী: লজ্জাশীলতা। ধৈর্য। সত্যবাদিতা। বিনয়। সহমর্মিতা ও দয়া। আমনতদারিতা।
প্রথমত: আল্লাহর সাথে আদব:
চারিত্রিক পরিপালনের গুরুত্বপূর্ণ ও মহত্তম দিক হল ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর একনিষ্ঠ অনুসরণ এবং কথা ও কাজে আল্লাহর প্রতি খালেস নিয়তের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর ভয়, আশা, মহাব্বত এবং ইখলাসের উপর বেড়ে উঠবে। যা নিষ্কলুষ সহজাত স্বভাবকে বিকশিত করবে, তার জন্য সরল পথকে উন্মুক্ত করবে এবং ভ্রষ্টতার পথ থেকে বিরত রাখবে; ফলে সে আল্লাহর সাথে আদব রক্ষাকারী হিসেবে বেড়ে উঠবে।
আল্লাহর সাথে বান্দার আদবের অন্যতম দিক হল, সে আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা পোষণ করবে; কেননা এটি তাওহীদের ওয়াজীব বিষয়ের অন্তর্গত। রাসূল সাঃ আল্লাহর থেকে বর্ণনা করেন: (আমি সেই রূপই যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে।) (১) যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার প্রতি কু-ধারণা পোষণ করে তাকে তিনি তিরস্কার করেছেন। তিনি বলেন: ﴿يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَل لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِن شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ﴾ অর্থ: [অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ্ সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা করে নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করেছিল এ বলে যে, আমাদের কি কোন কিছু করার আছে? বলুন, সব বিষয় আল্লাহরই ইখতিয়ারে।] (২)
আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখার অন্তর্গত হল এ বিশ্বাস রাখা যে, তিনি তার বিষয়ে অবগত, তার সম্পাদিত কর্ম এবং তার অন্তর যে কুমন্ত্রণা দেয়; সে ব্যাপারে তিনি জানেন। "সু-ধারণার ভিত্তি হল আল্লাহর রহমত, তাঁর মর্যাদা, অনুগ্রহ, ক্ষমতা, জ্ঞান ও সুন্দর বাছাই এবং তাঁর উপর ভরসাকারীর শক্তি সম্পর্কে জানার উপর। সুতরাং উক্ত বিষয় সম্পর্কে যখন জানা পূর্ণতা পাবে আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা তখন ফলপ্রসূ হবে”(৩)।
রবের সাথে বান্দার আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, সে তাকে ভালবাসবে; কেননা “তাঁকে ভালবাসা দ্বীন ইসলামের মৌল বিষয় যার উপর ইসলামের চাকার অক্ষ ঘুরছে। কাজেই আল্লাহর ভালবাসার পূর্ণতার মাধ্যমে ইসলাম পূর্ণতা পায় এবং তা হ্রাসের কারণে মানুষের তাওহীদ হ্রাস পায়”(৪)। আর ভালবাসা রাসূল সাঃ এর আনুগত্য এবং তার আনীত বিধিবিধানের অনুসরণ দাবি করে। মহান আল্লাহ বলেন : ﴿قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾ অর্থ: [বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।] (৫) এটাকে মহাব্বতের আয়াত নামে অভিহিত করা হয়(৬)।
রাসূল সাঃ বলেছেন: (তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া। একমাত্র আল্লাহ জন্যই কাউকে ভালবাসা এবং কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করা।)(১) হাদিসের উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ আন্তরিকভাবে বান্দার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হবে অন্যদের থেকে। যেমন কিছু হাদিসে এসেছে: (তোমরা সমস্ত অন্তর দিয়ে আল্লাহকে ভালবাস।) সুতরাং বান্দা তার সবকিছু দিয়ে এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হবে যেন তিনিই একমাত্র প্রিয়জন এবং উপাস্যতে পরিণত হন। আর সে আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ভালবাসবে তাঁর ভালবাসার অংশ হিসেবে। যেমন সে নবীগণ, রাসূলগণ, ফেরেশতাগণ এবং নেককার বান্দাদের ভালবাসবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালবাসার প্রেক্ষিতে। এটি আল্লাহ যা ভালবাসেন তা ভালবাসা, যা অপছন্দ করেন তা অপছন্দ করা, তাঁর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর উপর অগ্রাধিকার দেয়া, সাধ্যনুযায়ী তাঁর সন্তোষজনক কাজে চেষ্টা করা এবং তাঁর অপছন্দনীয় বিষয় পরিহার করাকে আবশ্যককারী। আর এগুলো হল খাঁটি ভালবাসার আলামত ও তার আবশ্যিক অনুষঙ্গ।
আল্লাহর সাথে বান্দার আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, সে তাঁর শাস্তিকে ভয় করবে এবং তাঁর নিকট প্রতিদান প্রত্যাশা করবে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ অর্থ: [তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।] (২)
“আর আল্লাহর ভয় হল দ্বীনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ মাকাম”। (৩) যখন সে ভয় করবে তখন সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না বরং সৎকাজের মাধ্যমে তা সে প্রত্যাশা করবে। মহান আল্লাহ বলেন: قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ অর্থ: [তিনি বললেন, যারা পথভ্রষ্ট তারা ছাড়া আর কে তার রবের অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়?] (৪)
কাজেই আল্লাহর প্রতি বিনয় ও ভয় এবং সাথে তাঁর রহমত ও ভালবাসা প্রত্যাশার মাধ্যমে বান্দার আদব বজায় রাখা অপরিহার্য। “কেননা যে শুধুমাত্র আল্লাহকে ভালবেসে ইবাদত করে সে যিন্দিক, যে শুধুমাত্র প্রাপ্তির আশায় তাঁর ইবাদত করে সে মুরজিয়া, যে শুধুমাত্র ভীত হয়ে তাঁর ইবাদত করে সে হারুরী(৫), আর যে ভালবেসে, ভীত হয়ে, প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাঁর ইবাদত করে সে হল একত্ববাদী মুমিন”(৬)।
আল্লাহর সাথে বান্দার আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, সে তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী, তাঁর স্মরণকারী এবং রহমানের মুনাজাতে হৃদয় পূর্ণকারী হবে (৭)। আর এটি ইত্তেবার দাবী রাখে যে, তুমি তাঁর ইবাদত করবে যেভাবে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী নয় এবং তোমার অভ্যাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নয় (১)। দাসত্বের আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, আল্লাহ সকল কিছুর প্রতিপালক ও সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এ বিশ্বাস রেখে এবং বিনয় ও নম্রতার সাথে তার অভিমুখী হয়ে, সকল প্রকার ইবাদত তাঁকে প্রদান করে, মহান আল্লাহর কথায় সাড়া দিয়ে এককভাবে তাঁর ইবাদত করা এবং একমাত্র قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ অর্থ: [বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।* তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।] (২)
দাসত্বের যে আদবের উপর তরবিয়ত অর্জনকারীদের গড়ে তোলা শিক্ষক ও দায়ীদের কর্তব্য: তা হল, ওজু, সুন্দরভাবে তেলাওয়াত, গভীর চিন্তা-ভাবনা, নিরবতা এবং কুরআন পাঠ করা শুনলে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার এ নির্দেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাঁর কিতাবের সাথে আদব বজায় রাখা وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْءَانُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ : হয় তখন তোমরা মনোযোগের সাথে তা শুন এবং নিশ্চুপ হয়ে থাক যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়。](৩)
নিজের মধ্যে আল্লাহর নজরদারি ও তাঁর ভয় গ্রোথিত করা, বিশ্বাস রাখা যে তিনি ছোট-বড় সবকিছুর উপর অবগত এমনকি আসমান ও জমীনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কোন কিছু। তিনি জানেন চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ অর্থ: [আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন—তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।] (৪)
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ অর্থ: [আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আর আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর।](৫)
আল্লাহ তায়ালা লুকমানের অসীয়তে বলেন যখন সে তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল: يَبُنَيَّ إِنَّهَا إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُن فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اَللّٰهُ لَطِيْفٌ خَبِيْرٌ অর্থ: [হে আমার প্রিয় বৎস, নিশ্চয় তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষা দানার পরিমাণ হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমানসমূহে বা যমীনের মধ্যে, আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন; নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ]। (১)
দ্বিতীয়ত: রাসূল সাঃ সহ সকল নবীগণ আঃ এর সাথে আদব: নবীগণের সাথে আদবের বিষয়টি ছোট-বড় মানুষের মাঝে প্রবিষ্ট হয় যখন সে জানতে পারে নবীগণের অবস্থা, তাঁদের কর্ম এবং তাঁদের রবের রেসালাতের বাণী পৌঁছে দিতে যে কষ্ট-ক্লেশ ও অসুবিধা তাঁরা সহ্য করেছেন। আর এ জন্য নবীগণের জীবনের প্রতিটি অংশে বিরতি দিয়ে, তাঁদের চরিত্র ও নৈতিকতার বিশদভাবে বর্ণনা করে, মানুষের সাথে তাঁদের সদ্ব্যবহার, উত্তম কথপোকথন, বিনয়-নম্রতা, দয়াদ্রতা, অনুগ্রহ এবং দাওয়াত পৌঁছানোর পথে মানুষের পক্ষ থেকে প্রদেয় কষ্টের উপর তাঁদের ধৈর্যের বিষয়টি পরিষ্কার করে শিক্ষক বা মুরুব্বীকে তাঁদের জীবনী পর্যালোচনা করতে হবে।
নবী সাঃ এর সাথে আদবের অন্তর্ভুক্ত হল, হৃদয়ে তাঁর ভালবাসাকে প্রাধান্য দেয়া তাঁর নির্দেশনা বাস্তবায়নার্থে; যেমন তিনি বলেছেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান এবং সব মানুষের অপেক্ষা অধিক ভালবাসার পাত্র হই)।(২) আর রাসূল সাঃ এর মহাব্বত তাঁর সুন্নাত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে আনীত জীবনবিধান অনুসরণ করা এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা ও শরীয়ত বহির্ভূত কোন কিছুকে তাতে অন্তর্ভুক্ত না করার দাবী রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا﴾ অর্থ: [রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক]।(৩)
তিনি আরো বলেন: ﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا﴾ অর্থ: [অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে]।(৪) রাসূল সাঃ এর মহাব্বত যখন তার নামোল্লেখ করা হয় তখন তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠের দাবী রাখে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾ করেন এবং তার ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোয়া-ইস্তেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথ ভাবে সালাম জানাও।](৫)
“এ আয়াত থেকে উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিকট উর্ধ্বজগতের অধিবাসীগণের মাঝে তাঁর বান্দা এবং নবীর মর্যাদার বিষয়ে তাঁর বান্দাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। তিনি ঘনিষ্ট ফেরেশতাগণের নিকট নবীর প্রশংসা করেন এবং ফেরেশতাগণ তার জন্য দোয়া- ইস্তেগফার করেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা নিম্নজগতের অধিবাসীদের তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন; যেন তার প্রশংসা উর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় জগতের বাসিন্দাদের থেকে ধ্বনিত হয়”।(১)আর যে ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর উপর দরুদ পাঠ করে না তাকে তিনি কৃপণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন: (কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার নিকট আমার উল্লেখ করা হল কিন্তু সে আমার উপর দরুদ পাঠ করল না।) (২) আনুগত্য ও অনুসরণকে আবশ্যককারী এই মহব্বতের তরবিয়ত অর্জিত হবে তার সীরাত নিয়ে গভীর ও চিন্তাশীল পর্যালোচনা এবং তার সমগ্র জীবনে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষা ও চারিত্রিক গুণাবলী আহরণ করার মাধ্যমে। আর পরিপালনের পদ্ধতির অন্যতম হল যে কোন তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক, মুরুব্বী বা দাঈ ব্যক্তি উপস্থাপন করবে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নে সাহাবায়ে কেরাম তার সাথে আদব বজায় রেখে কীভাবে আচরণ করতেন। মহান আল্লাহ বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ أُوْلَبِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَىٰ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرُ عَظِيمٌ অর্থ : হে ঈমানদারগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সম্মুখে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না আর তোমরা আল্লাহ্ তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।* হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তার সাথে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না; এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সকল কাজ বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।* নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।](৩) তিনি আরো বলেন : لَّا تَجْعَلُواْ دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا অর্থ: [তোমরা রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের একে অপরের আহবানের মত গণ্য করো না।] (৪)
শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতী রহঃ বলেন: “অর্থাৎ যখন তোমরা তাকে আহ্বান করবে তখন তোমাদের আহ্বান যেন সম্মান, শ্রদ্ধা বিহীন না হয়; যেমন তারা একে অপরের সাথে করে থাকে। সুতরাং তোমরা বলো না: হে মুহাম্মাদ! বরং তোমরা বলবে: হে আল্লাহর রাসূল। আর তোমরা তার সামনে উচ্চস্বরে কথা বলবে না বরং নিচুস্বরে কথা বলবে”।(৫) রাসূল সাঃ এর মৃত্যুর পরেও তার সাথে আদবের ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে; তাই আমরা শুধু তার নামোল্লেখ করব না। বরং তার সাথে রেসালাতের মর্যাদার বিষয়টি যুক্ত করে ইয়া রাসূল্লাহ বলব এবং তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করব। তার সাথে আদবের অন্তর্ভুক্ত হল কারো কথাকে তার কথার উপর অগ্রাধিকার দিবো না; কেননা যখন কোন বিষয়ে রাসূল রাঃ এর সুন্নাত স্পষ্ট হবে তখন তা অনুসরণ এবং অন্য সকল কিছুর উপর অগ্রধিকার দেয়া ওয়াজিব হবে -সে যেই হোক না কেন! আর এটি হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে আবশ্যক আদব এবং এটি বান্দার সৌভাগ্য ও সফলতার প্রতীক। পক্ষান্তরে এটি ছুটে গেলে মিলবে না স্থায়ী সৌভাগ্য ও অনন্ত সুখ”। (১)
সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র এবং রাসূল সাঃ এর ভালবাসায় তাদের আত্মত্যাগের অন্যতম হল, তাদের কেউ প্রত্যাশা করে যে তাকে হত্যা করে রক্ত প্রবাহিত করা হলেও রাসূল সাঃ যেন সামান্য কষ্ট না পান; যদিও তা কাঁটার আঘাত হয়। খোবাইব রাঃ এর ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে যে, যখন মুশরিকগণ তাকে শূলে চড়িয়ে তরবারি দিয়ে তাকে আঘাত করে বলল, তোমার স্থানে মুহাম্মাদ থাকুক এটা কি তুমি চাও? জবাবে সে বলল: না, মহান আল্লাহর শপথ! আমার মুক্তির বিনিময়ে তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হোক; এটিও আমি চাই না।(২)
নবী সাঃ এর সাথে সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র এমনই ছিল এবং এ চরিত্রের উপরই সন্তানদের গড়ে তোলা উচিৎ।
তৃতীয়ত: মাতা-পিতার সাথে আদব।
ইসলামী চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত হল একজন ব্যক্তি তার মাতা-পিতার অধিকার সম্পর্কে জানবে যা আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য সন্তানদের উপর ওয়াজীব করেছে। আর তা হল, তাদের আনুগত্য করা, ভালবাসা, আল্লাহ তায়ালার নাফরমানী হয় না এমন কাজে তাদের সন্তুষ্টি তালাশ করা, তাদের সাথে নম্র আচরণ করা ও ভালবাসা দেখানো, সমবেদনা ও সহানুভূতি জানানো এবং তাদের কোন কথা ও কাজের কারণে চিৎকার না করা ও উফ শব্দ না বলা; আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে সাড়া দানের প্রেক্ষিতে। মহান আল্লাহ বলেন: وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا﴿ ج تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا অর্থ: [আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করতে ও পিতা- মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।* আর অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।] (৩)
সায়্যেদ কুতুব বলেন: “এই কোমল কথামালা এবং অনুপ্রেরণাদায়ক চিত্র দিয়ে কুরআনুল কারীম সন্তানদের হৃদয়ে সদ্ব্যবহার এবং দয়ার আবেগ জাগরিত করে। বার্ধক্যের সম্মান রয়েছে এবং বার্ধক্যের দুর্বলতার একটি বার্তা রয়েছে। আর )عندك( বা 'তোমার জীবদ্দশায়' শব্দটি বার্ধক্য এবং দুর্বলতার অবস্থায় ঠাই ও আশ্রয়ের তাৎপর্যকে যথাযথভাবে চিত্রিত করে। আর দেখাশোনা এবং আদবের পর্যায়সমূহের মধ্য হতে প্রথম পর্যায় হল, সন্তানের পক্ষ থেকে এমন কোন শব্দ উচ্চারণ না করা যা অসন্তোষ ও বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে এবং যা তাদের প্রতি অবহেলা এবং দুর্ব্যবহার বুঝায়। আদবের সর্বোচ্চ পর্যায় হল: মাতা-পিতার সাথে সন্তানের কথাবার্তা সম্মান ও মর্যাদায় পরিপূর্ণ হবে”।(১)
এ জন্য রাসূল সাঃ তাদের সাথে সদ্ব্যবহার, তাদের প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের নানা বিষয়ে ধৈর্য ধারণকে জিহাদ হিসাবে গণ্য করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (এক ব্যক্তি নবী সাঃ এর নিকট এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তখন তিনি বললেন, তোমার মাতা-পিতা কি জীবিত আছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তবে তাদের খেদমত করতে চেষ্টা কর।) (২)
মাতা-পিতাকে পাওয়া বিরাট অর্জন এবং লাভজনক ব্যবসা স্বরূপ; কেননা তারা সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের চাবিকাঠি যে তাদের আনুগত্য করে ও তাদের দেখাশোনা করে। আর যে ব্যক্তি তাদের উভয়কে বা একজনকে পেল অথচ জান্নাত ও তার নেয়ামত লাভের জন্য তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করল না; সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ হল। এ বিষয়টি হেদায়েত ও রহমতের রাসূল সাঃ বর্ণনা করে বলেন: (তার নাক ধুলিমলীন হোক, আবার তার নাক ধুলিমলীন হোক, আবার তার নাক ধুলিমলীন হোক। জিজ্ঞাসা করা হল, কার হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল, এরপরও সে জান্নাতে প্রবেশ করল না।) (৩)
মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার বিরাট নেককাজ। আর সদ্ব্যবহার পাওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার বেশি; যেহেতু সে বেশি কষ্ট সহ্য করে “এবং বেশি যন্ত্রণা, ক্লেশ, রাতজাগা এবং জটিলতার সম্মুখীন হন। মায়েরা তিনটি কঠিন কষ্ট সহ্য করেন যা পিতারা সহ্য করেন না। তন্মধ্যে প্রথমটি হল গর্ভধারণের কষ্ট। দ্বিতীয়টি হল প্রসব বেদনার কষ্ট। আর তৃতীয়টি হল সন্তানকে দুধ পান করানো এবং লালনপালন করার কষ্ট”। (৪) মহান আল্লাহ বলেন: وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَلُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَى الْمَصِيرُ অর্থ: [আর আমি মানুষকে তাঁর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে, আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু'বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। ফিরে আসা তো আমারই কাছে।] (৫)
আবু হুরায়রা রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নিকট এস জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাপেক্ষা হকদার ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপর তোমার পিতা।) (৬) “এ হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, মায়ের প্রতি মহাব্বত ও দয়া পিতার চেয়ে তিনগুণ বেশি হবে; কেননা রাসূল সাঃ মায়ের বিষয়টি তিনবার উল্লেখ করেছেন আর পিতার বিষয়টি একবার উল্লেখ করেছেন। আর এর রহস্য সম্পর্কে ইবনু বাত্তাল রহিঃ যেমনটি বলেছেন: “তিনটি জিনিস পিতার থেকে মা আলাদাভাবে সম্পাদন করে: সেগুলো হল, গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবের কষ্ট এবং সন্তানকে দুধ পান করানো কষ্ট। এ তিনটি জিনিস মা একাই সম্পাদন এবং কষ্ট করে থাকে। অতঃপর বাবা সন্তান লালনপালনে অংশগ্রহণ করে থাকে”। (১)
মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের গুরুত্বের কারণে সন্তান যতই তার মাতা-পিতার প্রতি অনুগত ও অনুগ্রহ করুক না কেন সে তাদের প্রতিদান দিতে পারে না; তবে সে উভয়কে যদি ক্রিতদাস অবস্থায় পেয়ে তাদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন সন্তান তার পিতার হক পরিশোধ করতে পারে না। তবে হ্যাঁ, সে যদি তার পিতাকে ক্রিতদাস হিসেবে পায় এবং তখনই তাকে ক্রয় করে নিয়ে মুক্ত করে দেয়।)(২) ইমাম নববী রহঃ বলেন: “তার প্রতি অনুগ্রহ বা অধিকার আদায় করে তার প্রতিদান দেয়া সম্ভব নয় তাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করা ব্যতীত”। (৩)
এ জন্য তাদের আনুগত্য করা এবং তাদের সাথে আদব বজায় রাখা ওয়াজীব; আর আদবের অন্তর্ভুক্ত হল: তাদের নাম ধরে না ডাকা। বরং তাদেরকে বাবা, মা বলে সম্বোধন করা। তাদের নিকট নিজেকে ছোট বুঝাতে কন্ঠের আওয়াজে কোমলতা প্রকাশ করা। তারদের পূর্বে আসন গ্রহণ না করা, আহার না করা এবং হাঁটার সময় পিতার আগে আগে না চলা; কেননা এগুলো খারাপ আদব এবং নিন্দিত চরিত্রের অন্তর্গত। “আবূ হুরায়রা রাঃ একজন ব্যক্তিকে অন্য আরেকজনের পশ্চাদে চলতে দেখলেন। তিনি বললেন: লোকটি কে? তিনি বললেন: আমার পিতা। আবূ হুরায়রা রাঃ বললেন: পিতার নাম ধরে ডাকবে না, তার পূর্বে আসন গ্রহণ করবে না এবং তার সামনে সামনে হাঁটবে না”। (৪)
এই ইসলামী দিকনির্দেশনা থেকে মুরুব্বী বা শিক্ষক মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার সম্পর্কিত একটি তরবিয়তি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন এবং একটি ভাল উদাহরণের মাধ্যমে বাস্তব পদ্ধতি পেশ করতে পারেন যা দ্বারা পিতা-মাতার সাথে তার আচরণ, তারা বেঁচে থাকলে তাদের সাথে উত্তমভাবে বসবাস এবং তারা মারা গেলে তাদের জন্য দোয়া করার মাধ্যমে সদাচরণের বিষয়টি চিহ্নিত হবে। যাতে এটি একটি বাস্তব নমুনা এবং ভাল উদাহরণ হয়ে থাকে তরবিয়তের ময়দানে। অন্য দিক থেকে, সে তার সন্তানদের মাতা-পিতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে উত্তম বসবাসের শিক্ষার উপর গড়ে তুলবে। (৫)
চতুর্থত: 'আরহাম' বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে আদব:
আভিধানিক অর্থে )الرحم( রেহেম হল: আত্মীয়তার মাধ্যম। আর রেহেম শব্দের মূল অর্থ সন্তান জন্মের স্থান বা গর্ভাশয়। (৬)
পারিভাষিক অর্থে: “কোন ব্যক্তির বাবা-মায়ের দিক থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ককে রেহেম বলে। সুতরাং তাদের প্রতি সুনির্দিষ্ট এবং অতিরিক্ত অধিকার আবশ্যক হবে”।(১) আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা হল: “বংশীয় ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সদাচরণ, সহমর্মিতা, অনুগ্রহ প্রদর্শন করা এবং তাদের অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া; যদিও তারা বাড়াবাড়ি ও দুর্ব্যবহার করে। আর এর বিপরীত হল আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা”। (২)
ইবনু আবি হামজাহ বলেন: “সাধ্যানুযায়ী উপকার করা এবং অপকার দূরীভূত করা উদ্দেশ্য।”।(৩)
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হল: আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সদাচরণ করা এবং তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা।
আত্মীয়দের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক অনুসারে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত ও ছিন্ন হয়। আর আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্ককে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন এমন শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে; যা সম্পর্ককে শক্তিশালী ও বিকশিত করে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَءَاتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا﴿ অর্থ: [আর আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদেরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় কর না।] (৪)
কাযী ইয়ায রহঃ বলেন: “সাধারণভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজীব এবং তা ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ নেই। তিনি বলেন: অধ্যায়ে বর্ণিত হাদিসসমূহ এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য দয়ে। তবে সম্পর্ক রক্ষার অনেক স্তর রয়েছে যার একটি অপরটি চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তার সর্বনিম্ন স্তর হল একে অন্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে পরিহার করা এবং কথা বলার মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করা যদিও তা সালামের মাধ্যমে হয়। এটি সামর্থ্য ও প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তিত হয়; তন্মধ্যে কিছু ওয়াজীব আর কিছু মুস্তাহাব। কেউ যদি সম্পর্কের কিছু দিক রক্ষা করে কিন্তু লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম না হয় তাহলে তাকে ছিন্নকারী বলা হয় না। আর কেউ যদি সে যা করতে সক্ষম এবং তার পক্ষে যা করা উচিত তা করতে ত্রুটি করে তবে তাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী বলা হয় না”। (৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একে অন্যকে পরিদর্শন করা, দুঃখ-কষ্টে ও আনন্দ-উল্লাসে অর্থ ও শ্রম দিয়ে পরস্পরে অংশগ্রহণ, উপহার প্রদানের মাধ্যমে সহানুভূতি জানান এবং তাদের অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়ার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক অর্জিত হয় ও বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেন: أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَىٰ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ ﴿١٩﴾ الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ الْمِيثَاقَ ﴿٢٠﴾ وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ ﴿٢١﴾ অর্থ: [আপনার রব হতে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে কি তার মত যে অন্ধ? উপদেশ গ্রহণ করে শুধু বিবেকসম্পন্নগণই।* যারা আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং প্রতিজ্ঞা ভংগ করে না।* আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুন্ন রাখে, ভয় করে তাদের রবকে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে।](১)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা হল তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা, অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া, সম্মান করা, উপহার দেয়া, তাদের মাঝে যারা দরিদ্র তাদের দান করা, অসুস্থদের দেখাশোনা করা, তাদের আনন্দে-উৎসবে অংশ নেয়া, তাদের দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনা দেয়া এবং সে সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া যে সকল ক্ষেত্রে তারা আত্মীয়তার কারণে অন্যদের চেয়ে বেশি হক্কদার। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হল তাদেরকে পরিহার করা, সাধ্য থাকার পরও দেখা-সাক্ষাৎ না করা, তাদের আনন্দ-উৎসবে অংশ না নেয়া, তাদের দুঃখে-কষ্টে সান্ত্বনা না দেয়া এবং যে সকল ক্ষেত্রে তারা অধিক হক্কদার সে সকল ক্ষেত্রে অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়া।(২) মহান আল্লাহ বলেন: فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِعُواْ أَرْحَامَكُمْ﴿ 1840 GR: MOSIR GAR 203 RACE ACE أُوْلَبِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَرَهُمْ তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।* এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেছেন, ফলে তিনি তাদের বিধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন।](৩)
সুতরাং ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মর্যাদা অনেক বড় এবং এর গুরুত্ব অনেক বেশি। যেহেতু এ সম্পর্কে নবী সাঃ হাদিসে এমন বক্তব্য এসেছে যা তার গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা হল সম্পর্ক রক্ষাকারীর প্রতি আল্লাহ তায়ালার দানের কারণ। পক্ষান্তরে তা ছেদ করা আত্মতীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছেদের দিকে নিয়ে যায়। সহীহ মুসলিমে এসেছে নবী সাঃ বলেছেন: (আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে। সে বলে যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবেন।) (৪) এ হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য হল আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব, তা রক্ষার ফযিলত এবং তা ছিন্নকারীর গুরুত্বর পাপ বুঝান। (৫)
অনুরূপভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা প্রশস্ত রিযিক ও জীবনে বরকত লাভের অন্যতম দ্বার। নবী সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি চায় যে তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুন্ন রাখে।) (৬)
পঞ্চমত: প্রতিবেশীর সাথে আদব:
আভিধানিক অর্থে )الجار( বা প্রতিবেশী:
'লিসানুল আরব' অভিধানে এসেছে: প্রতিবেশী সেই ব্যক্তি যার গৃহ আপনার গৃহের পাশে অবস্থিত। প্রতিবেশীর অন্য আরো অর্থ হল: স্থাবর সম্পত্তিতে অংশীদার, মৈত্রিচুক্তিতে আবদ্ধ, সাহায্যকারী এবং ব্যবসায় অংশীদার ব্যক্তি।(১)
পারিভাষিক অর্থে (al-Jār) বা প্রতিবেশী: প্রতিবেশীর আভিধানিক অর্থ পারিভাষিক অর্থ থেকে ভিন্ন নয়। “বিজ্ঞজনেরা প্রতিবেশিত্বের সীমা নির্ধারণে মতভেদ করেছেন। ইমাম আওজায়ী রহঃ বলেন: চতুর্দিক থেকে চল্লিশ ঘর পর্যন্ত হল প্রতিবেশী। ইমাম যুহরীও এমনটিই বলেছেন”।(২)
মহান আল্লাহ বলেন: وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ অর্থ: [আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোন কিছুকে তাঁর শরীক করো না; এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ, নিকট প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী।](৩)
ইবনে হাজার রহঃ বলেন: “নিকট প্রতিবেশী হল যাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। আর দূর প্রতিবেশী হল নিকট প্রতিবেশির বিপরীত। এটিই অধিকাংশের মত”।(৪)
এ কথা থেকে উদ্দেশ্য হল প্রতিবেশী দুই প্রকার: প্রথমত এমন প্রতিবেশী যাদের সাথে আত্মীয়তা ও প্রতিবেশিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয়ত এমন প্রতিবেশী যাদের সাথে শুধুই প্রতিবেশিত্বের সম্পর্ক রয়েছে。
পূর্ববর্তী অর্থসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রতিবেশী ঘরের নিকটবর্তী এবং আল্লাহর পরে তার জন্য সাহায্যকারী হওয়ার দরুন অংশীদারের সমপর্যায়ের। যদি বিপদাপদ তাকে বেষ্টন করে এবং দুর্যোগ তাকে শঙ্কিত করে তাহলে আল্লাহর পরে সে যার নিকট সর্বপ্রথম সাহায্য চায় সে হল তার প্রতিবেশী; কেননা সে সবচেয়ে কাছের মানুষ। যদি তাদের স্বভাব-চরিত্র ইসলামী আদর্শের অনুরূপ হয় তাহলে প্রতিবেশিত্বের উপর ভালবাসা, সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক সদুপোদেশ ও দান-উপহার প্রাধান্য বিস্তার করে এবং এর মাধ্যমে ছোট-বড় সকলেই প্রভাবিত হয়। আর যদি তাদের স্বভাব-চরিত্র ইসলামী আদর্শের বিপরীত হয় তাহলে বিরোধ বিরাজ করে, তাদের সম্পর্কের উপর মতভেদ আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাদের প্রত্যেকে অন্যের অধিকার ও অনুভূতির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। আর এভাবেই এটি ছোটদের মাঝে প্রসারিত হয় ফলে তারা প্রতিবেশির সাথে ঝগড়া-বিবাদ ও দুর্ব্যবহার করার অভ্যাসের উপর বেড়ে উঠে。
সুতরাং প্রতিবেশের সম্পর্কের জন্য এমন কাউকে প্রয়োজন যে তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিবে যাতে প্রতিবেশের পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব কল্যাণ ও বরকতের প্রভাবে পরিণত হয় এবং তা সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। আর ইসলামই একমাত্র মানহায যা তার ঐশ্বরিক মানহাযের সাথে নিশ্চিত করে, যদি প্রতিবেশের সম্পর্ক বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে সমাজের সর্বত্র উত্তম চরিত্র বিরাজ করবে এবং সবাই শান্তি, ভালবাসা এবং সম্প্রীতির সাথে বসবাস করবে।
ইসলামে প্রতিবেশের বিরাট মর্যাদা রয়েছে, কারণ “আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে এবং তাঁর নবীর জবানে প্রতিবেশকে রক্ষা ও তার অধিকার আদায় এবং দায়-দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি কি দেখ না যে আল্লাহ তায়ালা প্রতিবেশের বিষয়টি মাতা-পিতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরেই উল্লেখ করেছেন”।(১) যেমনটি পূর্বের আয়াতে এসেছে এবং অনেক নববী নির্দেশনাতেও প্রতিবেশির প্রতি অসিয়তের কথা এসেছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, নবী সাঃ বলেছেন: (জিবরীল আঃ সর্বদা আমাকে প্রতিবেশির ব্যাপারে অসিয়ত করে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয় যে, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন)।(২)
সুতরাং প্রতিবেশ প্রতিবেশির প্রতি সদ্ব্যবহার, অনুগ্রহ, উত্তমভাবে মেলামেশা, সাহায্যের প্রয়োজন হলে তাকে সাহায্য করা, তার সন্তানদের প্রতি দয়ার্দ্র আচরণ করা এবং তাকে সদুপোদেশ দেয়া, তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা সহ আরো অন্যান্য ইসলামী শিষ্টাচারের প্রয়োজন বোধ করে; যার মধ্য হতে গুটিকয়েক বিষয় নিম্নে স্পষ্ট করা হল:
১- গভীর জ্ঞানার্জন, শিক্ষা গ্রহণ এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে পারস্পরিক সহায়তা করা; কেননা এর মধ্য দিয়ে সমন্বিত সামাজিক বিকাশ সাধিত হয় এবং এতে রয়েছে প্রশংসনীয় ইসলামী শিষ্টাচার গ্রহণের সুযোগ। নবী সাঃ প্রতিবেশীদের জ্ঞানার্জন এবং একে অন্যকে উপদেশ দেয়ার নির্দেশ দিতেন। ইমাম হাইছামী স্বীয় গ্রন্থে হাদিস বর্ণনা করেন, নবী সাঃ একদা আলোচনা করলেন। তিনি কতিপয় লোকের উত্তম প্রশংসা করলেন। অতঃপর বললেন: “লোকেদের কী হয়েছে যে তারা প্রতিবেশীদের বিধিবিধান সহ প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দেয় না, তাদের উপদেশ দেয় না এবং তাদেরকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে না! লোকদের কী হয়েছে যে তারা প্রতিবেশীদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না, গভীর জ্ঞানার্জন করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না”।(৩)
আর এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম রা: ছিলেন নববী দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইলম অর্জনে উমর রাঃ এর আগ্রহের অংশ হল যে, তিনি তার প্রতিবেশির সাথে পালাক্রমে রাসূল সাঃ এর কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করতেন। ইবনু আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত, নিশ্চয় উমর রাঃ বলেন: (আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী বনী উমাইয়্যা ইবনু যায়দের মহল্লায় বাস করতাম। এ মহল্লাটি ছিল মদিনার উঁচু এলাকায় অবস্থিত। আমরা দু'জনে পালাক্রমে রাসূল সাঃ এর খিদমতে হাজির হতাম। তিনি একদিন আসতেন আর আমি একদিন আসতাম। আমি যেদিন আসতাম সেদিনের অহী প্রভৃতির খবর নিয়ে তাকে পৌঁছে দিতাম। আর তিনি যেদিন আসতেন সেদিন তিনি অনুরূপ করতেন।)(৪)
প্রতিবেশের আবশ্যিক অনুষঙ্গের অন্তর্গত হল: হৃদ্যতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, কল্যাণ কামনা, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ।
২- কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা:
প্রতিবেশের কর্তব্য এবং অধিকারসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম হল: প্রতিবেশীকে নিজে এবং বাচ্চাদের দ্বারা কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা; চাই হাত বা জিহ্বা অথবা ভিন্ন কিছুর মাধ্যমে হোক। কেননা আবূ হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, একজন ব্যক্তি বলল: (হে আল্লাহর রাসূল! অমুক মহিলা বেশি বেশি সালাত আদায় করে, সিয়াম রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি আবার বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক মহিলা অল্প সিয়াম রাখে, দান-খয়রাত করে ও সালাত আদায় করে। আর সে পাত্র ভর্তি পনির সাদকা করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জিভ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। তিনি বললেন, সে জান্নাতে যাবে।) (১) রাসূল সাঃ বলেছেন: (আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি? হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।) (২)
নবী সাঃ ঐ ব্যক্তির মুমিন হওয়াকে অস্বীকার করেছেন যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না। এটি প্রতিবেশীর অধিকার ব্যাপক হওয়া বুঝানোর ক্ষেত্রে অতিশয়োক্তি এবং প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।(৩)
নবী সাঃ বর্ণনা করেছেন যে, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেছেন: (যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।) (৪)
এগুলো হল নববী তরবিয়তি দিকনির্দেশনা, যা নির্দেশ করে প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া এবং তার বিরাট অধিকারের উপর। আর প্রতিবেশের আচরণ গ্রহণ করা হল জান্নাতের পথ। কাজেই পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য হল পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে এ আদবসমূহকে বিকশিত করা।
৩- প্রতিবেশির সাথে সহনশীল আচরণ করা তার কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে। তার প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান এবং ছোটখাট বিষয়েও তাকে সহাযোগিতা করা; যেমন প্রতিবেশীকে তার বাড়ির দেয়ালে খুঁটি বসাতে অনুমতি দেয়া। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ যেন তার প্রতিবেশীকে তার দেয়ালের সাথে খুঁটি গাড়তে বাঁধা না দেয়।) (৫)
এই হাদিসটি প্রতিবেশীর অধিকারের বড়ত্ব এবং উত্তম আখলাকের সাথে তার সঙ্গে মেলামেশার গুরুত্বের উপর নির্দেশ করে। অনুরূপভাবে এই মেলামেশার আচরণগত প্রভাব রয়েছে যা প্রতিবেশী ছাড়াও উঠতি প্রজন্মের উপর প্রতিফলিত হয়।
প্রতিবেশীর অধিকার শুধু কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকাই নয়; বরং কষ্ট সহ্য করা, তার প্রতি সদয় হওয়া, প্রথমে তাকে সালাম দেয়া, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া, বিপদে তাকে সান্ত্বনা দেয়া, উৎসবে তাকে অভিনন্দন জানানো, তার আঘাতকে উপেক্ষা করা, তার গৃহে উঁকি না দেয়া, তার ঘরের দেয়ালে খুঁটি গেড়ে তাকে বিরক্ত না করা, তার নর্দমায় পানি না ঢালা, তার উঠানে মাটি নিক্ষেপ না করা, তাকে পর্যবেক্ষণে না রাখা, প্রতিবেশীর সতরের কোন অংশ প্রকাশ পেলে তা গোপন রাখা, তার কথা কান লাগিয়ে না শোনা এবং তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখা। (১)
৪- প্রতিবেশীকে দান করা ও হাদিয়া প্রদান করা: আর তা হল প্রতিবেশীকে ঘরে প্রস্তুতকৃত খাবার প্রদান করা; এর ফলে ভালবাসা ও উত্তম আচরণ তৈরি হয় এবং অভাব ও মন্দ দূরীভূত হয়। “এক প্রতিবেশী কখনো তার আরেক প্রতিবেশীর পাতিলের খাবারের সুঘ্রাণে কষ্ট পেতে পারে। কখনো তার ছোট সন্তান-সন্ততি থাকতে পারে; ফলে তাদের বাসনা জাগ্রত হয় এবং তাদের অভিভাবকের জন্য বিষয়টি বড় কষ্টকর হয়। বিশেষত তাদের অভিভাবক যদি দরিদ্র অথবা বিধবা হয় তখন তাদের কষ্ট, যাতনা এবং আফসোস তীব্রতর হয়”। (২) আবূ যার রাঃ কে বলে নবী সাঃ প্রতিবেশীর প্রতি খেয়াল রাখার বিষয়ে মুসলিম জাতিকে নির্দেশনা দিয়েছেন: (হে আবূ যার! তোমরা যখন তরকারি রান্ন করো তখন পানি একটু বেশি করে দিও এবং প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য রেখা) (৩)
প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণ ঈমানের পূর্ণতার অন্তর্ভূক্ত। আর জাহেলী যুগের লোকেরাও তা সংরক্ষণ করত। অসীয়ত পালিত হবে সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর প্রতি নানা অনুগ্রহ করার মাধ্যমে; যেমন হাদিয়া প্রদান, সালাম দেয়া, হাস্যজ্জোল মুখে সাক্ষাৎ করা, অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া এবং তার প্রয়োজন পূরণ করা ইত্যাদি। আর তাকে সকল প্রকার শারীরিক মানসিক কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। (৪)
এটাই যদি জাহেলী যুগের লোকদের চরিত্র হয় যারা ছিল মূলত কাফের তাহলে মুসলিমরা প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহারের আদর্শ গ্রহণ করার অধিক উপযুক্ত; কেননা এটি তাদের দ্বীন ইসলামের বিধান যার প্রতি আল্লাহ তাঁর কিতাবে এবং নবী মুহাম্মাদ সাঃ এর সুন্নাতে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
প্রতিবেশের অধিকার পাবে সর্বাধিক নিকটবর্তী প্রতিবেশী। আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু'জন প্রতিবেশী রয়েছে। তাদের মধ্য হতে আমি কাকে হাদিয়া প্রদান করব? তিনি বললেন: এ দু'জনের মাঝে যার দরজা তোমার বেশি নিকটে।) (৫) অনুরূপভাবে একজন মুসলিমের জন্য শোভনীয় হল, যে কোন খাবার প্রতিবেশীকে দিতে দ্বিধান্বিত না হওয়া। নবী সাঃ বলেছেন: (কোন মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনীকে হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি তা ছাগলের সামান্য গোশতযুক্ত হাড় হলেও।) (৬) ইবনে হাজার রহঃ বলেন: “অর্থাৎ, এক প্রতিবেশিনী যেন তার অপর প্রতিবেশিনীকে হাদিয়া দিতে তুচ্ছ মনে না করে যদিও অধিকাংশ সময় হাদিয়া প্রদানকৃত বস্তুটি উপকার লাভের অযোগ্য হয়। হাদিসটির অর্থ এমন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যে, একটি বিষয়ে নিষেধ করে তার বিপরীত বিষয় করার নির্দেশ বুঝান। আর সে নির্দেশিত বিষয় হল পারস্পরিক হৃদ্যতা এবং ভালবাসা। যেন তিনি বলেছেন: এক প্রতিবেশিনী যেন তার অপর প্রতিবেশিনীর সাথে হাদিয়া প্রদানের মাধ্যমে হৃদ্যতা বজায় রাখে যদিও প্রদেয় বস্তুটি তুচ্ছ হয়। এ বিষয়ে ধনী-গরীব সমান। বিশেষ করে নারীদের নিষেধ করা হয়েছে কেননা তারা ভালবাসা ও ঘৃণা উৎপন্ন হওয়ার পাত্রী”।(১)
পরিবার তার সদস্যদের নিকট যে খাবার বা ফলমূল রয়েছে তা প্রতিবেশীদের দেয়ার শিক্ষার উপর গড়ে তুলবে; যাতে তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
হাদিয়া হল হৃদ্যতার বাহক। এটি ভালবাসা অনায়ন করে, সম্পর্ককে শক্তিশালী করে এবং প্রতিবেশীদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে। হাদিয়া প্রদান উত্তম চরিত্র, ভাল স্বভাব এবং প্রশংসনীয় আচরণের অন্তর্ভূক্ত। নবী সাঃ বলেছেন: (তোমরা উপহার বিনিময় কর, পারস্পরিক সম্প্রীতি লাভ করবে।) (২) আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: (আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু'জন প্রতিবেশী রয়েছে। তাদের মধ্য হতে আমি কাকে হাদিয়া প্রদান করব? তিনি বললেন: এ দু'জনের মাঝে যার দরজা তোমার বেশি নিকটে।) (৩)
এ ধরণের নববী হাদিস পরিবারের সদস্যদের নিকট ব্যাখ্যা করা, তাদের অনুমতি প্রার্থনা ও তাদের নিকট প্রবেশের আদব বর্ণনা করার মাধ্যমে এবং প্রতিবেশীদের সতর বা গোপন বিষয় অবগত হওয়া, তাদের গোপন আলাপ শোনা, তাদের নিকট যা আছে তার দিকে দৃষ্টি দেয়া অথবা যা দেখেছে তা বর্ণনা করা থেকে তাদেরকে সতর্ক করার মাধ্যমে পরিবারের লালন-পালন ভূমিকা রাখে এর সদস্যদের প্রতিবেশীদের ভালবাসতে, তাদের সহযোগিতা করতে এবং তাদের প্রতি সৌজন্যশীল হতে। যদিও তারা এমন বিষয়ে সংবাদ দেয় যা তারা প্রত্যক্ষ করেছে বা শ্রবণ করেছে; তাদেরকে চুপ থাকার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে এবং তাদেরকে বুঝাতে হবে যে এরূপ আচরণ প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। কেননা এতে তাদের গোপনীয়তা প্রকাশের বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে, মাতা-পিতা তাদের প্রতিবেশীদের একান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করবে না। যেমন এরূপ বলা: তুমি তাদের কী করতে দেখলে? বা তাদেরকে কী বলতে শুনলে? বা তাদের নিকট কিছু দেখেছ কি? কেননা এ ধরণের প্রশ্ন বাচ্চাদেরকে পরবর্তী সাক্ষাতের সময় বিষয়গুলো অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখতে উৎসাহিত করে এবং সে সংবাদ দেয়া শুরু করবে তাকে জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই।
আর কিছু পরিবার যে খারাপ চারিত্রিক লালন-পালনের সমস্যায় ভুগছে তন্মধ্যে একটি হল, যা তাদের সন্তানদেরকে প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশীর সন্তানদের সাথে আক্রমণাত্মক আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। এরূপ বিষয় শিশুর মাঝে আক্রমণাত্মক আচরণের জন্ম দেয় ফলশ্রুতিতে সে অন্যদের সাথে একই ধরণের আচরণ করে। (৪)
ইসলামী লালন-পালনের পদ্ধতিতে প্রয়োজন হল, সন্তানদেরকে প্রতিবেশীর অধিকার এবং প্রতিবেশীর পরিবার, সম্মান ও সম্পদের ক্ষতি না করা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া। আর সমীচীন হল প্রতিবেশীর পরিবারের দিকে দৃষ্টি না দেয়া, তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন রাখা, তাদের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করা ইত্যাদি ইসলামী পরিপালনীয় আদব সম্পর্কে সন্তানদের সচেতন করা।
ষষ্ঠত: চারিত্রিক গুণাবলী:
-লজ্জাশীলতা।
আভিধানিক অর্থে )الحياء( বা লজ্জা হল: শালীন ও লজ্জিত হওয়া। ভাষাবিদ ইস্পাহানী বলেন: “লজ্জা হল নিকৃষ্ট কাজ থেকে নিজেকে সংযত রাখা”।(১)
পারিভাষিক অর্থে লজ্জা হল: এমন স্বভাব যা নিকৃষ্ট কাজ পরিহারে উৎসাহিত করে এবং হকদারের অধিকার প্রদানে অবহেলাকে প্রতিরোধ করে।(২)
লজ্জাশীলতা দুই প্রকার: জন্মগত; যার উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্জনীয়; যা মানুষ অর্জন করে থাকে, হয় উপদেশ ও শিক্ষার মাধ্যমে অথবা অন্যদের সাথে মেলামেশা ও তার ফলে মন্দকে মন্দ মনে করা, পঙ্কিলতাকে পঙ্কিল মনে করা ও ভালকে ভাল মনে করার দ্বারা যে সাদৃশ্য সৃষ্টি হয় তার মাধ্যমে অথবা নৈতিক অবক্ষয় ও লজ্জাহীনতার শাস্তির ভয়ের মাধ্যমে। ইবনে মুফলেহ বলেন: “একাধিক বিদ্বান বলেছেন, সকল সৎকাজের ন্যায় লজ্জা কখনো অর্জনীয় হতে পারে। আবার কখনো তা সহজাত হতে পারে। লজ্জাকে শরীয়া মোতাবেক ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন আমল ও নিয়ত”।(৩) অনুরূপ উক্তির দিকে ইঙ্গিত করেছেন ইবনে রজব রহঃ, তিনি বলেন: “লজ্জা দুই প্রকার: প্রথমত: যা সহজাত ও জন্মগত, অর্জনীয় নয়। এটি হল সর্বোত্তম আখলাকের অন্তর্গত যা আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে দান করেন এবং যার উপর তাকে সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয়ত: যা অর্জনীয়। যেমন আল্লাহ সম্পর্কে জানা, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী ও তাদের বিষয়ে অবগত এবং চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন; ইত্যাদি সম্পর্কে পরিচয় লাভ করা। এটি ঈমানের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত বরং এটি ইহসানের সর্বোত্তম স্তরের অন্তর্ভুক্ত”।(৪) কেননা উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি তা অর্জন করেছে আল্লাহর আনুগত্য এবং ভালবাসার আশায়। আর ঈমানের অন্তর্গত হল আল্লাহর জন্যই লজ্জশীলতা অর্জন করা। এর মাধ্যমে লজ্জা হল ঈমানের মূলের অন্তর্ভুক্ত; কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন: (ঈমানের সত্তরটির অধিক শাখার রয়েছে অথবা ষাটের অধিক শাখা রয়েছে। এর সর্বোত্তম শাখা হল "লা-ইলাহা ইল্লাহ" বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হল রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ঈমানে একটি বিশেষ শাখা।) (৫)
সুতরাং অর্জনযোগ্য লজ্জাশীলতা লাভ করার জন্য তরবিয়তি প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সেই সাথে আল্লাহর নজরদারির বিষয়টি স্মরণ রাখা; যাতে আল্লাহ তাকে পাপাচারে লিপ্ত অবস্থায় দেখার বিষয়ে সে লজ্জিত হয়। আর এ জন্য শরীয়ত অনুযায়ী লজ্জা অর্জন, জ্ঞান এবং নিয়তের প্রয়োজন অনুভব করে। এ কারণেই লজ্জা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
রাসূল সাঃ ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বাধিক লজ্জাশীল এবং পরিপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী; এমনকি আবূ সাঈদ আল-খুদরী রাঃ বলেন: (পর্দার ভেতরে কুমারীদের চেয়েও নবী সাঃ বেশি লাজুক ছিলেন। যখন তিনি অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন তখন আমরা তার চেহারাতেই এর আভাস পেয়ে যেতাম।) (৬)
লজ্জাশীলতার বিরাট ফযিলত রয়েছে এবং আচরণে এর ব্যাপক প্রভাবে রয়েছে; কেননা এর পরিধি মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত। যেমন: তার গৃহে, তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে মেলামেশায়, তার আমলে, তার বাজার-ঘাটে যাতায়াতে এবং তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে আলাপচারিতায়। এ জন্য লজ্জাশীলতার পুরোটাই কল্যাণকর; যেমনটি বলেছেন রাসূল সাঃ (লজ্জার সবটাই কল্যাণকর।) (১) লজ্জার ফযিলতের অন্তর্ভুক্ত হল যে এটি আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রিয়। যেমন রাসূল সাঃ বলেছেন: (নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বড় লজ্জাশীল ও পর্দাশীল। তিনি লজ্জাশীলতা এবং পর্দা করাকে বেশি পছন্দ করেন। তাই তোমাদের কেউ গোসল করতে গেলে সে যেন পর্দা অবলম্বন করেন।) (২) লজ্জা শুধু মানুষকে কল্যাণের দিকেই পরিচালিত করে এবং শুধু কল্যাণই আনায়ন করে।
কিছু মানুষ লজ্জাকে ভুলভাবে বুঝে থাকে; ফলে সে সত্যকথা বলার ক্ষেত্রে লাজুকতাকে এবং অসৎকাজে নিরবতাকে লজ্জা মনে করে থাকে। অথচ এটি হল কাপুরুষতা এবং সকল অকল্যাণের চাবিকাঠি। পক্ষান্তরে লজ্জাশীলতা হল সকল কল্যাণের চাবিকাঠি এবং জান্নাতের পথ। সুতরাং যে লাজুকতা তার সীমা অতিক্রম করে অসৎকাজে বাঁধা প্রদান এবং সত্যকথা বলার সময় নিরবতা অবলম্বনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়; তা লজ্জার কোন অংশ নয়। বরং তা হল সত্যকথা বলায় ত্রুটি, দুর্বলতা, ভয় এবং কাপুরুষতা। “এ কারণে লাজুকতা নিন্দিত; যেহেতু এর মাঝে সীমালঙ্ঘনের বিষয় রয়েছে। এ দৃষ্টিকোন থেকে পূর্বের বিদ্বানগণ লাজুকতাকে দুর্বলতা এবং তা কখনো রিযিক নষ্টের কারণ হতে পারে বলে মত ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেছেন: 'লাজুকতা রিযিক প্রাপ্তিতে বাঁধা প্রদান করে'। বেজায়গায় ব্যক্তির লজ্জাশীলতার প্রকাশ দুর্বলতা”। ইমাম সানআনী রহঃ বলেন: “তুমি যদি বল যে লজ্জা তো কখনো কখনো ব্যক্তিকে অসৎকাজে বাঁধা প্রদান থেকে নিবারণ করে; যা হল আবশ্যকীয় বিষয় পালনে ত্রুটি হিসেবে গণ্য, তাহলে 'লজ্জা শুধু কল্যাণই আনায়ন করে' এ কথার ব্যাপক অর্থ পূর্ণতা পায় না! সানআনী রহঃ বলেন, এর জওয়াবে বলা যায় যে, হাদিসে বর্ণিত লজ্জা দ্বারা শরয়ী লজ্জা উদ্দেশ্য এবং আবশ্যকীয় বিষয় পরিহার করা থেকে যে লজ্জার সৃষ্টি হয় তা শরয়ী লজ্জা নয়; বরং তা অক্ষমতা ও নীচতা। আর শরয়ী লজ্জার সাথে সাদৃশ্য রাখার কারণে তাকে লজ্জা হিসেবে অভিহিত করা হয়”। (৩) এ জন্য অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোকে লজ্জাশীলতা হিসেবে গ্রহণ করা হয় না, যেমন: সত্যকথা বলা থেকে নিরবতা পালন করা। অনুরূপভাবে লাজুকতার খারাপ দিক হল এটি তার অধিকারীকে শিক্ষা লাভ এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞানার্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। মুজাহিদ রহঃ বলেন: “লাজুক এবং অহংকারী ব্যক্তি ইলম অর্জন করতে পারে না”। (৪) এ জন্য আনসারী মহিলারা দ্বীনের আবশ্যকীয় জ্ঞানার্জনে লজ্জা করত না। ফলে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ তাদের প্রশংসা করে বলেন: (আনসারদের মহিলারা কতই না ভাল! লজ্জা তাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান থেকে ফিরিয়ে রাখে না।) (৫)
কাজেই মানবজাতির কল্যাণ হল হৃদয়ে আল্লাহর ব্যাপারে ভয়-ভীতি ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করা এবং তিনি তাদেরকে এমন কাজ ও কথার অবস্থায় দেখবেন যা তিনি অনুমোদন করেন না -এ ব্যাপারে লজ্জা করা। যুন নূন বলেন: “লজ্জাশীলতা হল হৃদয়ে শ্রদ্ধার উপস্থিতি এবং তোমার রবের নিকট অতীত কৃতকর্মের ব্যাপারে ভীত হওয়া”।(১)
সুতরাং লজ্জা মানুষকে কথা ও কাজের মাধ্যমে মন্দকে পরিহারে দিকে পরিচালিত করে যাকে লজ্জা করা হয় তার নির্দেশ পালন ও তার থেকে লজ্জা পাওয়ার অংশ হিসেবে। আর যাকে সবচেয়ে বেশি লজ্জা পাওয়া হয় তিনি হলেন সেই সত্ত্বা যিনি মানুষকে অগণিত নেয়ামত প্রদান করেছেন এবং অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং কারো থেকে যদি লজ্জাশীলতার পরিপন্থী কোন কিছু প্রকাশ পায় ফিরে আসবে এবং তাওবা করবে। আল্লাহর ভয়হীন লজ্জা ব্যক্তির থেকে চলে যায়, যখন সে মানুষের থেকে দূরে থাকে অথবা অপরিচিত জনদের মাঝে থাকে। তাই লজ্জার উৎস হওয়া উচিৎ আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর ভালবাসা এবং তাঁর ভয়।
-ধৈর্য:
আভিধানিক অর্থে ধৈর্য হল: অস্থিরতা ও অধৈর্যতার বিপরীত। অস্থিরতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর 'তাসাব্বর' অর্থ হল ধৈর্য ধারণ করা।(২)
পারিভাষিক অর্থে ধৈর্য হল: হৃদয়ের গুণাবলীসমূহের মধ্য হতে একটি উত্তম গুণ যা অসুন্দর কাজ থেকে বিরত রাখে এবং আত্মার একটি শক্তি যার মাধ্যমে এর অবস্থা সংশোধিত হয় ও বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। উমর বিন উসমান আল-মাক্কী রহঃ বলেন: “ধৈর্য হল আল্লাহর সাথে অবিচল থাকা এবং তাঁর দেয়া বিপদাপদগুলো প্রশস্ত হৃদয়ে ও বিনয়ের সাথে গ্রহণ করা”। (৩)
আর আল্লাহ তায়ালা সে সকল ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন যারা সহনশীলতা, ক্রোধ সংবরণ ও অস্থিরতা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ধৈর্য ধারণ করে এবং ধৈর্য ধারণের সাথে সাথে তারা বলে 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিয়ূন'। মহান আল্লাহ বলেন: وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَبَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا GR إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُوْلَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ) [আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে।* যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।* এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রব-এর কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই সৎপথে পরিচালিত।](৪)
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা ধৈর্য ধারণ, অন্তরকে ধৈর্য ধারণে উদ্দীপ্ত করণ এবং অপছন্দনীয় ও অনাকাঙ্খিত বিপদাপদে অস্থির না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন : يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ أَصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ ﴾وَرَابِطُواْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক, আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।] (১) হাসান বসরী রহঃ বলেন: “মুসলিমদেরকে তাদের জন্য মনোনীত দ্বীন ইসলামের উপর ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তারা যেন সুসময়ে, দুরাবস্থায়, কষ্টে এবং সুখে তা পরিত্যাগ না করে; যাতে তারা মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করে। তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তারা ধৈর্যের সাথে সে সকল শত্রুদের মোকাবেলা করে যারা তাদের ধর্মকে গোপন রাখে। এরূপ উক্ত করেছেন একাধিক সালাফ”। (২) মহান আল্লাহ বলেন: وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَّعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَوْةِ الدُّنْيَا অর্থ: [আর আপনি নিজকে ধৈর্যের সাথে রাখবেন তাদেরই সংসর্গে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে তাদের রবকে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং আপনি দুনিয়ার জীবনের শোভা কামনা করে তাদের থেকে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না।] (৩)
ধৈর্য হল কল্যাণ ও সফলতার বাহন এবং চারিত্রিক গুণাবলীর স্তম্ভ ও কেন্দ্রবিন্দু। কারণ সমস্ত উত্তম গুণাবলী ধৈর্যের উপর তাদের স্থিতিশীলতার জন্য নির্ভর করে। আর কোন ব্যক্তি উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী ধারণ করতে পারবে না যতক্ষণ না তার ধৈর্যের ভিত্তি মজবুত হয়। সত্যবাদিতার জন্য একজন ব্যক্তিকে সঠিক কথা বলার উপর ধৈর্য ধরতে হয় যদিও সে জানে যে, এতে তার কিছু বিষয়ে ক্ষতি হতে পারে। বিনয়-নম্রতার জন্য আত্মা ও প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা এবং আত্ম-অহংকার থেকে ধৈর্যের প্রয়োজন। অশ্লীল কথাবার্তা এবং বিকৃত আচরণ পরিহারে লজ্জাশীলতার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। আর সকল চারিত্রিক গুণাবলীকেই এর উপর অনুমান করতে হবে। এ জন্য হৃদয়ে ধৈর্যের স্থিতিশীলতা এবং তার অভ্যস্ততা চারিত্রিক অর্জন এবং শ্রেষ্ঠ লাভ; কেননা সকল উত্তম শিষ্টাচার তার উপরই নির্ভর করে。
এটি কোন অন্যায় নয় যে, কল্যাণের সকল গুণাবলী, সৎকর্মের বৈশিষ্ট্যাবলী, ইবাদতের অবস্থাসমূহ এবং চারিত্রিক উত্তম গুণাবলী ধৈর্যের সাথে সম্পৃক্ত, ধৈর্যের দিকে প্রত্যাগমনকারী, ধৈর্যের উপর নির্ভরকারী এবং ধৈর্যের সাথে প্রবাহমান; আমরা যেভাবেই ভাবি না কেন ও যে অবস্থাতেই লক্ষ্য করি না কেন! কেননা ধৈর্য হল কেন্দ্র যার উপর সকল প্রশংসনীয় কর্ম ঘূর্ণায়মান। 'ধৈর্য হল এমন একটি গুণ যা আমাদেরকে কষ্টসাধ্য অন্যান্য গুণাবলীর বোঝা বহন করতে সক্ষম করে তোলে'। (৪)
সুতরাং যে তার চরিত্রকে উন্নত করতে চায় তার জন্য নিজেকে ধৈর্যের উপর গড়ে তোলা আবশ্যক; যাতে সে মন্দ আচরণ থেকে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বাতিল রীতিনীতি ও আচারের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে। তার জন্য আরো আবশ্যক হল সে বর্জন ও গ্রহণ দু'দিক থেকে ধৈর্য ধারণ করবে; বর্জনের ধৈর্য হল চরিত্র বিনষ্টকারী বিষয় পরিহার করা, আর গ্রহণের ধৈর্য হল উত্তম গুণাবলীকে নিত্যসঙ্গী করা। ধৈর্যের ক্ষেত্রগুলো অধিকতর স্পষ্ট করার জন্য পাঁচটি বিধানের আলোকে নিম্নোক্ত প্রকারভেদ উল্লেখ করছি:
১- ওয়াজীব ধৈর্য: এটি তিন প্রকার: প্রথম-হারামবস্তু পরিহারে ধৈর্য ধারণ। দ্বিতীয়- ওয়াজীব আদায়ে ধৈর্য ধারণ। তৃতীয়- বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ।
২- মুস্তাহাব ধৈর্য: আর তা হল মাকরূহ বিষয় পরিহারে, মুস্তাহাব আদায়ে এবং অপরাধীর অপরাধের বিপরীতে অনুরূপ করার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ।
৩- নিষিদ্ধ ধৈর্য: আর তা হল হিংস্র জন্তু, সাপ, আগুন অথবা পানি যা ব্যক্তিকে ধ্বংস করতে চায় তার উপর ধৈর্য ধরা বা মৃত্যু পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা।
৪- মাকরূহ ধৈর্য: যেমন মুস্তাহাব কর্ম পরিহার করা এবং মাকরূহ বিষয়ে জড়িত হওয়া।
৫- মুবাহ ধৈর্য হল: যে সকল বিষয় করা বা বর্জনের ক্ষেত্রে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে এমন কর্ম পরিহার করা।
ধৈর্য হল উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যার বিশদ বর্ণনা পূর্বে গত হয়েছে। যে ব্যক্তি তা অর্জন করল সে সৌভাগ্যের দরজায় প্রবেশ করল আর যে তা বর্জন করল সে দুর্ভাগ্যের দরজায় প্রবেশ করল। কেননা অপরাধ এবং মন্দ চরিত্রের কারণ হল তা থেকে বিরত না থাকা। এ জন্য যে আল্লাহর ইবাদতে ধৈর্য ধারণ করে সে আল্লাহর সাহায্য লাভ করে। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। সবরের চাইতে উত্তম ও ব্যাপক কোন নিয়ামত কাউকে দেয়া হয়নি।) (১)
ধৈর্যের চরিত্রে অংকিত হওয়া দৃঢ় সংকল্পের অন্তর্গত; যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ অর্থ: [আর অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, নিশ্চয় তা দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।](২) সৎ আমলের সাথে ধৈর্য ধারণ করার উপর আল্লাহ তায়ালা বিশাল প্রতিদান এবং ক্ষমা নির্ধারণ করে রেখেছেন। তিনি বলেন: إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُواْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَوْلَتَبِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ অর্থ: [কিন্তু যারা ধৈর্যশীল ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরই জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।](৩)
আর ধৈর্যশীলগণ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবে, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَزَعُوا فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ রাসূলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহু ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।](৪)
নিশ্চয় ফেরেশতাগণ আল্লাহ ইবাদতে ধৈর্যধারণকারীদের সালাম দিবে এবং অভিবাদন জানাবে যে দিন তারা স্থায়ী শান্তির নিবাস জান্নাতে প্রবেশ করবে। মহান আল্লাহ বলেন: سَلَامُ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ অর্থ: [এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি; আর আখেরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম!] (১) অর্থাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম এবং অভিবাদন অবতীর্ণ হোক তোমাদের সেই ধৈর্যের বিনিময়ে যা তোমাদেরকে এই সুউচ্চ মর্যাদায় ও মূল্যবান জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছে। (২)
ধৈর্যের সুফলের অন্তর্ভুক্ত হল এ বিশাল প্রতিদান যা রাসূল সাঃ আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন। আনাস বিন মালেক রাঃ বলেন, আমি রাসূল সাঃ কে বলতে শুনেছি: (আমি যদি আমার কোন বান্দাকে তার অতি প্রিয় দু'টি জিনিসের ব্যাপারে পরীক্ষায় ফেলি, আর সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে আমি তাকে সে দু'টির বিনিময়ে দান করব জান্নাত। তিনি দু'টি জিনিস দ্বারা ব্যক্তির চক্ষুদয়কে উদ্দেশ্য করেছেন।)(৩) রাসূল সাঃ বলেছেন: (যখন কোন বান্দার সন্তান মারা যায় তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবয করে নিয়ে এলে? তারা বলে হ্যাঁ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা তার হৃদয়ের ফল কবয করে নিয়ে এলে? তারা বলে হ্যাঁ। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা কী বলেছে? তারা বলে, আপনার প্রশংসা পাঠ করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর বায়তুল হামদ বা প্রশংসালয়।)(৪) সে যদি ধৈর্য ধারণ না করে অস্থির হত তাহলে সওয়াব তার হাতছাড়া হয়ে যেত। আর আল্লাহর নির্দেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। সুতরাং ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর সওয়াব বিশাল; কেননা তিনি তাদেরকে কল্যাণের বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিশেষভাবে করেছেন। তিনি বলেন: وَمَا يُلَقَّهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُواْ وَمَا يُلَقَّهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ অর্থ: [আর এটি শুধু তারাই প্রাপ্ত হবে যারা ধৈর্যশীল। আর এর অধিকারী তারাই হবে কেবল যারা মহাভাগ্যবান।](৫) তিনি আরো বলেন: وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيُلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ অর্থ: [আর যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলল, ধিক তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ছাড়া তা কেউ পাবে না।](৬) ধৈর্যের বিপরীত হল ক্রোধান্বিত ও বিরক্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ না করার মাধ্যমে অস্থির হওয়া। আর এটি হল নিন্দিত স্বভাব যা ক্রোধকে উস্কে দেয়। আত্মা যখন উত্তেজিত হয়ে পড়ে তখন বন্ধনমুক্ত এবং লাগামহীন হয়ে পড়ে। এর ফলে তার কথাবার্তায় তেজ, ভর্ৎসনায় ক্ষিপ্রতা ও কঠোরতা এবং কর্মে বুদ্ধিহীনতা প্রকাশ পায়। “সুতরাং অধৈর্যতা হল (আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন) একটি নিন্দনীয় চরিত্র যা ভাষাকে কর্কশ করে, হৃদয়কে দুর্বল করে, স্বভাবের দুর্বলতা প্রমাণ করে এবং শরীয়া লঙ্ঘন করতে উৎসাহিত করে”। (৭)
ধৈর্য নেতিবাচক একটি বৈশিষ্ট্য নয়। আর ধৈর্যের অর্থ হল, যা প্রতিকার করা যায় তার নিকট আত্মসমর্পণ করা; এটি একটি ভুল উপলব্ধি এবং ভ্রান্ত ধারণা। বরং ধৈর্য যেমন পাপাচার থেকে বিরত হওয়া এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা বুঝায় অনুরূপভাবে প্রায়শই তা একটি ইতিবাচক আমলগত প্রচেষ্টাও বুঝায়। সুতরাং ধৈর্য হল কথা ও কাজের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে আত্মার জন্য যা ক্ষতিকর; তা থেকে আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
-সত্যবাদিতা।
আভিধানিক অর্থে সত্যবাদিত হল: মিথ্যার বিপরীত। (১)
পারিভাষিক অর্থে সত্যবাদিতা হল: কোন বিষয় সম্পর্কে বাস্তবতার নিরিখে সংবাদ প্রদান করা। (২)
কারো মতে সত্যবাদিতা হল: প্রকাশ্য ও অভ্যন্তরীণ দিক সমান হওয়া। (৩)
এখান থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে সত্যবাদিতা চরিত্র হল: প্রত্যেক কথা, কাজ ও বিশ্বাস যা বাস্তবতার অনুকূল হয় ও অনুযায়ী হয়。
আর সত্যবাদিতা হল উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম যার গুণে নবীগণ গুণান্বিত এবং আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে তাদের প্রশংসা করেছেন, তিনি বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا ও অর্থ: [আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইবরাহীমকে; তিনি তো ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ নবী।] (৪)
তিনি বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا অর্থ: [আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইদরীসকে, তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ নবী] (৫)
তিনি আরো বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا অর্থ: [আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইসমাঈলকে, তিনি তো ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসূল, নবী] (৬)
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা আমাদেকে সত্যবাদিতার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ اُتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُواْ مَعَ الصَّدِقِينَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।] (৭)
“অর্থাৎ তোমরা সত্য বল এবং সত্যবাদিতাকে আঁকড়ে ধর; ফলে তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে, ধ্বংস থেকে রক্ষা পাবে এবং তিনি তোমাদের কঠিন বিষয়ে নিষ্কৃতির পথ বের করে দিবেন”।(১) বস্তুত সত্যবাদিতা হল কল্যাণ ও নাজাতের বাহন এবং সৌভাগ্যের মাধ্যম। পক্ষান্তরে মিথ্যা হল ধ্বংশ ও বিনাশের বাহন। “মানুষের হতবুদ্ধিতা এবং দুর্দশার কারণ হল তাদের এই সুস্পষ্ট মূলনীতি থেকে অন্যমনস্কতা এবং তাদের নিজেদের ও চিন্তাধারার উপর মিথ্যা ও বিভ্রমের আধিপত্যের বিস্তার; যা তাদেরকে সীরাতে মুস্তাকীম থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে এবং যে সত্য মেনে চলা আবশ্যক তা থেকে বিপথে পরিচালিত করেছে”। অর্থাৎ বিশ্বাস, কথা এবং আচরণে মিথ্যার মাঝে তাদের বসবাস করার কারণে তাদের নিশানা, চিন্তাধারা এবং নষ্ট শিক্ষানীতির মাধ্যমে তারা বিশ্বে মিথ্যা রটনাকারীতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য সর্বোত্তম প্রবেশ ও নিষ্কৃতি হল সত্যবাদিতা। আর আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলকে এটি প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন: وَقُل رَّبِّ أَدْخِلْنِي﴿ ] : مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَل لِّي مِن لَّدُنكَ سُلْطَانًا نَّصِيرًا রব! আমাকে প্রবেশ করান সত্যতার সাথে এবং আমাকে বের করান সত্যতার সাথে এবং আপনার কাছ থেকে আমাকে দান করুন সাহায্যকারী শক্তি।] (২)
আর সত্যবাদিতা যেমন কথার মাধ্যমে হয় অনুরূপভাবে কাজ, বিশ্বাস এবং বিভিন্ন অবস্থার মাধ্যমেও হয়। সুতরাং কথার মাঝে সত্যবাদিতা হল কথার উপর জিহ্বার স্থিরতা যেমন কাণ্ডের মাথার উপর মুকুল স্থির থাকে। আর অবস্থার মাঝে সত্যবাদিতা হল ইখলাসের উপর অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্ম স্থির থাকা এবং শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করা। এর মাধ্যমে বান্দা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা সত্যসহ আগমন করেছে।(৩)
সত্যবাদিতার উদ্দীপক হল বুদ্ধি-বিবেক, দ্বীন, ব্যক্তিত্ব এবং প্রশংসা প্রীতি। -বুদ্ধি-বিবেক: এটি মিথ্যা অপছন্দ করাকে অবধারিত করে; বিশেষত মিথ্যা উপকার করে না এবং ক্ষতি প্রতিহত করে না। পক্ষান্তরে বুদ্ধি-বিবেক ভাল কিছু করার দিকে আহ্বান জানায় এবং মন্দ বিরত রাখে।
-দ্বীন: শরীয়ত মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করেছে যদিও তা কল্যাণ বয়ে আনে অথবা অকল্যাণ প্রতিহত করে। আর বুদ্ধি-বিবেক নিষিদ্ধ করেছে যা কল্যাণ আনায়ন করে না বা অকল্যাণ প্রতিহত করে না। সুতরাং বিবেক যা প্রয়োজন বোধ করে শরীয়ত তার চেয়ে মিথ্যা নিষিদ্ধের ন্যায় অতিরিক্ত বিধান সহ আগমন করেছে।
-ব্যক্তিত্ব: এটি মিথ্যাকে প্রতিহত করে এবং সত্যবাদিতার উপর উদ্বুদ্ধ করে।
-প্রশংসা প্রীতি: প্রশংসা প্রীতি এবং সত্যবাদিতার খ্যাতি মিথ্যাকে প্রতিহত করে যাতে তার কথাকে প্রত্যাখ্যান না করা হয় এবং সে তিরস্কৃত না হয়। (৪)
তবে বিবেক, ব্যক্তিত্ব এবং প্রশংসা প্রীতির সত্যবাদিতা যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যবাদিতার জন্য দ্বীনের আবশ্যকীয়তা দ্বারা সমর্থিত না হয়; ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি সত্য থেকে আত্মগোপন করে যদি সে ধারণা করে মিথ্যার মাঝে কল্যাণ রয়েছে। সত্যবাদিতার সর্বোত্তম উদ্দীপক হল দ্বীন; কেননা তা আচরণে এবং মূলনীতিতে অবিচলতা বপন করে। সত্যবাদিতা হল পরিপক্কতা ও শক্তিশালী ঈমানের নিদর্শন। কোন কোন বিদ্বান বলেন: “কোন ব্যক্তিকে বুদ্ধিমান বলা যাবে না যতক্ষণ না সে তিনটি বিষয় পূর্ণ করে: সন্তোষ ও ক্রোধের অবস্থায় নিজের পক্ষ থেকে হক আদায় করা, মানুষের জন্য তাই পছন্দ করা যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে এবং সচেতনতার সময় তার পদস্খলন দৃষ্টিগোচর হবে না। আবুল আতাহিয়্যাহ বলেন: “যার থেকে সত্য হারিয়ে যায় তার মতামত হারিয়ে যায়”।(১) এই গুণগুলো অর্জন করতে পারে শুধুমাত্র মযবুত ঈমান ও সৎ নিয়তের অধিকারী ব্যক্তি; কেননা যে নিজের পক্ষ থেকে অধিকার প্রদান করে তাকে ক্রোধ পরাজিত করতে পারে না যাতে সে যুলুম করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মিথ্যা বলে। আর যে ব্যক্তি মানুষের জন্য তাই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে, সে ব্যক্তি শক্তিশালী ঈমানে অধিকারী; কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।)(২) আর সচেতনতার সময় যার কোন ভুল দৃষ্টিগোচর হয় না সে ব্যক্তি তাদের অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেদের উপর আল্লাহকে পর্যবেক্ষক মনোনীত করেছে; ফলে আল্লাহ তাকে কোন মন্দ কাজে লিপ্ত দেখবে -এ ব্যাপারে সে লজ্জাবোধ করে। এ সবগুলোর উৎপত্তিস্থলই হল আল্লাহর সাথে সত্যবাদিতা।
যে বিষয়টি সত্যবাদিতার নীতির প্রতি মানব সমাজের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব প্রমাণ করে তা হল, সামাজিক সম্পর্ক ও মানুষের লেনদেনের এক বিরাট অংশ সত্য কথা ও কাজের উপর নির্ভর করে; কেননা মানুষের অভিপ্রায়গুলো শুধুমাত্র সত্য আচরণ ও স্বচ্ছ নিয়তের মাধ্যমেই জানা যায়। যদি সত্য কথার উপর বিশ্বাস না থাকত তাহলে মানুষের অধিকাংশ সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যেত। এটি তরবিয়তের দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য করে তুলেছে; কেননা এটি এ কর্তব্যের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং তার তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজে উত্তম চরিত্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। আর এর জন্য সর্বোত্তম উপায় হল, সে তরবিয়তের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া যে তরবিয়ত শিক্ষার্থীদের মাঝে দৃঢ় সংকল্প রোপন করে দেয়। কেননা সর্বদা সত্যবাদিতা মেনে চলতে কঠিন ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় সংকল্প, শক্তিশালী ঈমান এবং সত্যবাদিতার কারণে আপতিত বিপদ সহনের ক্ষমতার প্রয়োজন হয়।
আর যা এই অভিপ্রায়কে শক্তিশালী করে এবং তাকে সত্যবাদিতার উপর গড়ে তোলে তা হল, সেই প্রতিদান যা সত্যবাদীদের জন্য অপেক্ষা করছে এবং সেই শাস্তি যা মিথ্যাবাদীদের জন্য প্রতীক্ষা করছে। যেমনটি এসেছে রাসূল সাঃ এর হাদিসে: (সত্য আকড়িয়ে ধরা তোমাদের একান্ত কর্তব্য; কেননা সত্য নেকীর দিকে পরিচালিত করে, আর নেকী জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। কোন ব্যক্তি সর্বদা সত্য বলার অভ্যাস রপ্ত করলে ও সত্যের উপর সংকল্পবদ্ধ হলে আল্লাহর কাছে সে সত্যবাদীরূপে লিপিবদ্ধ হয়। আর তোমরা মিথ্যা বলা থেকে সাবধান থাক! কেননা মিথ্যা পাপের দিকে পরিচালিত করে। আর পাপ নিশ্চিত জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করে। কোন ব্যক্তি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে এবং মিথ্যার উপর সংকল্পবদ্ধ হলে তার নাম আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদীরূপে লিপিবদ্ধ হয়।)(৩) ইমাম সানআনী রহিঃ তরবিয়তের ক্ষেত্রে এ হাদিস থেকে যে ফায়দা অর্জিত হয় তার প্রতি ইশারা করেছেন এই বলে: "প্রশিক্ষণ ও অর্জনের মাধ্যমে নন্দিত ও নিন্দিত বৈশিষ্ট্যগুলো চলমান থাকে”। (৪) কাজেই পরিবার ও সমাজের তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হল, সত্যের প্রতি উৎসাহ ও তার প্রতিদান দেয়া এবং মিথ্যার শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে চারিত্রিক এ গুণটি সদস্যদের মধ্যে বপন করা।
-বিনয়:
আরবি )التواضع( শব্দের আভিধানিক অর্থ হল: অবনত বা নীচু হওয়া।(১)
পারিভাষিক অর্থে: নিজেকে নম্র রাখা এবং আত্মপ্রতারণা থেকে দূরে থাকা।(২) কারো মতে: সত্যের সামনে বান্দার নত হওয়া।(৩) আবার কেউ বলেছেন: বিনয় হল অহংকার না করা।(৪)
বিনয় হল একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; যেটিকে ইবনুল কায়্যিম রহিঃ তিনভাগে বিভক্ত করেছেন: প্রথমত- দ্বীনের প্রতি বিনয়: আর তা হল, রাসূল সাঃ যা নিয়ে আগমন করেছেন তার আনুগত্য করা, তার নিকট আত্মসমর্পণ করা এবং তিনটি বিষয়ে স্বীকৃতি দেয়া: ১- তিনি যে বিধানসহ আগমন করেছেন তার বিরুদ্ধে বিপরীত কিছু দাঁড় করাবে না। ২- দ্বীনের কোন দলীলকে অভিযুক্ত করবে না যে সেটির নির্দেশনা বাতিল অথবা ত্রুটিপূর্ণ বা অসম্পূর্ণ এবং তার বিপরীত বিষয়টি দ্বীনের দলীলের চেয়েও অধিক পূর্ণাঙ্গ। ৩- দলীলের বিপরীতে অন্তরে, কথায় এবং কাজে কখনো ভিন্ন পথ গ্রহণ করবে না।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের মধ্য থেকে যাকে নিজের বান্দা হিসেবে পছন্দ করেছেন তাকে তুমি ভাই হিসেবে পছন্দ করবে, তোমার শত্রুর অধিকার অস্বীকার করবে না এবং ওজর পেশকারীর ওজর গ্রহণ করবে।
তৃতীয়ত: সর্বদা হকের অনুসরণ করা; সুতরাং হক প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথেই নিজের মতামত এবং সুবিধা থেকে সরে আসা।(৫)
আর বিনয়ের সর্বোত্তম স্থান হল আল্লাহর ইবাদতে, তাঁর ভয়ে এবং তাঁর ভালবাসায় বিনয় প্রকাশ করা। সুতরাং একজন ব্যক্তি বশ্যতা স্বীকার, অবনত হওয়া, আমলে বাস্তবায়ন করা এবং আল্লাহর নিষিদ্ধবস্তু থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশাবলীর প্রতি বিনয়ী হবে। অপদস্থতা এবং নীচতা ব্যতিরেখে তার মুসলিম ভাইদের সাথে বিনয়ী হবে; কেননা “বিনয়ের একটি সীমারেখা রয়েছে, যখন তা অতিক্রম করা হয় তখন তা অপদস্থতা ও নীচতা হিসেবে গণ্য হয়। অপরদিকে যে ব্যক্তি বিনয় প্রদর্শনে অবহেলা করে সে অহংকার এবং গর্বের দিকে চালিত হয়”।(৬) আর বিনয় কে নীচতা দ্বারা ব্যাখ্যা করা একটি ভুল ব্যাখ্যা। যেমন অত্যাচারী এবং ধনীদের সামনে নীচতা প্রকাশ করা বিনয় নয়; কেননা সক্ষমতা, স্বেচ্ছাধীনতা এবং সত্যের প্রভাবের সাথে বিনয় সম্পৃক্ত। বিনয় বলা হয় যখন তা সক্ষম ব্যক্তি থেকে প্রকাশ পায়। পক্ষান্তরে যদি কোন ব্যক্তি লোভ বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে অথবা কোন ব্যক্তির ভয়ে তার সামনে নীচতা প্রকাশ করে তাহলে সেটা বিনয় নয়। “আর নিন্দিত বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত হল, কোন ধনী ব্যক্তির সামনে বিনয় প্রকাশ করা তার সম্পদের জন্য”।(১)
প্রত্যাশিত বিনয় হল গরীব-মিসকীনদের সাথে বসা, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, বিভিন্ন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা যদিও তারা কম মর্যাদাসম্পন্ন হয়, সমমর্যাদাসম্পন্ন বা তার চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন মানুষদের দেখতে যাওয়া, গরীব-মিসকীন ও ছোট-বড় মানুষের সাথে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় সাক্ষাৎ করা এবং চলাচল, প্রবেশ, প্রস্থান ও আরোহণে প্রবীনদের অগ্রাধিকার দেয়া। ইবনু মাসউদ রাঃ বলেন: “বিনয় হল মজলিসের সম্মানিত স্থানের চেয়ে নীচু স্থানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং যার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে তাকে সালাম দেয়া”। সুলায়মান বিন দাউদ আঃ বনী ইসরাঈলের মজলিসের সবচেয়ে নীচু স্থানে বসতেন এবং বলতেন: মিসকীনদের মাঝে একজন মিসকীন উপবিষ্ট।(২) বিনয়ের আরো অন্তর্ভুক্ত হল, শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে মূর্খের সাথে কোমল আচরণ করা, মুসলিমদের প্রতি নম্রতার পক্ষপট অবনমিত করা এবং তাদের সাথে কঠোরতা পরিহার করা।
বিনয় হল সর্বোত্তম নবীগণের বৈশিষ্ট্যাবলী। আর উত্তম আদর্শ নবী সাঃ এর পদাঙ্ক অনুকরণ এবং তার চারিত্রিক গুণাবলী অনুসরণের মাঝে নিহিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম গুণাবলীর উপর গড়ে তুলেছেন, তিনি বলেন: ﴾وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ﴿ অর্থ: [এবং যারা আপনার অনুসরণ করে সেসব মুমিনদের প্রতি আপনার পক্ষপুট অবনত করে দিন।] (৩)
রাসূল সাঃ ছিলেন তার সর্বোত্তম উদাহরণ; মহান আল্লাহ তায়ালা তার ব্যাপারে বলেন : فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবেন; নিশ্চয় আল্লাহ (তার উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন।](৪)
রাসূল সাঃ এর সুবাসিত জীবনী এবং তার পবিত্র সুন্নাহ বিনয়ের প্রতি উৎসাহিত করে; কেননা তিনি আল্লাহ তায়ালার রাসূল হিসেবে বলেছেন: (হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে। আমি মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর শপথ! আমি পছন্দ করি না যে তোমরা আমাকে আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার চেয়ে অধিক মর্যাদা দিবে।)(৫)
তিনি আরো বলেছেন: (তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন মারইয়াম এর পুত্র ঈসা আঃ সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।) (১)
রাসূল সাঃ এর বিনয়ের অন্যতম হল তিনি অসুস্থদের দেখতে যেতেন এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করতেন; ফলে তাদের উপর রাসূল সাঃ এর স্নেহ, মায়ার ছাপ পড়ত যা তাদের যন্ত্রণা লাঘব করত। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ বলেন: (বিদায় হজের বছর আমি একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে রাসূল সাঃ আমার খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য আসতেন।)(২)
যদি কোন ব্যক্তি তার নিজের বিনয়ের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চায় তাহলে তার একটি পরিমাপক প্রয়োজন যার মাধ্যমে সে তার আচরণকে পরিমাপ করে জানতে পারবে তার বিনয়ের পরিমাণ ও তার স্তর। আর সর্বোত্তম পরিমাপক যা দ্বারা মানুষ তার আচরণকে পরিমাপ করতে পারে তা হল, রাসূলগণের সর্দার মুহাম্মাদ সাঃ এর চরিত্র। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে আমাদের জন্য অনুসরণীয় নমুনা এবং উত্তম আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন : لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةً حَسَنَةٌ﴿ অর্থ: [অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ।](৩)
মানব জীবনের শুরু এবং শেষ পরিণতি, বিনয়ীদের গুণাবলী ও মানুষের নিকট তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং জমীনে উদ্ধত বা ফাসাদ সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক নয় এমন বিনয়ীদের জন্য আল্লাহ যে প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন তা সর্বদা পর্যালোচনার পথ দিয়ে বিনয় আগমন করে। “আলী রাঃ এর নিকট দু'জন ব্যক্তি একে অপরের সাথে বড়াই করছিল। তিনি বললেন: তোমরা কি ক্ষয়শীল দেহ নিয়ে বড়াই করছ? যদি তোমাদের কোন নেক আমল থাকে তাহলে তা তোমাদের মূল সম্পদ। তোমাদের যদি উত্তম চরিত্র থাকে তাহলে তা তোমাদের জন্য গৌরবের বিষয়। তোমাদের যদি তাকওয়া থাকে তাহলে তা তোমাদের জন্য মহত্ত্বের বিষয়। নতুবা গাধা তোমাদের চেয়ে অধিক উত্তম এবং তোমরা কারো চেয়ে উত্তম নও”। (৪)
বিনয়ের পদ্ধতির অন্তর্গত হল সর্বদা এ কথা স্মরণ করা যে, ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু রয়েছে তা ধ্বংস হবে এবং নিঃশেষ হয়ে যাবে; বিশ্বপালনকর্তার চেহারা ব্যতীত। যেমন তিনি বলেছেন: كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانِ وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ অর্থ: [ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছুই নশ্বর।* আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।] (৫) সুতরাং শেষ পরিণতি ও গন্তব্যস্থল সম্পকে অবগতি এবং সর্বদা এ বিষয়টির স্মরণ জীবন্ত অন্তরকে বিনয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। যদি ধন-সম্পদের উপর বড়াই করা হয় তাহলে এর পরিণতি হল একটি অপরটির পূর্বে ক্ষয় হয়ে যাওয়া, যদি সুস্বাস্থ্যের জন্য অহংকার করা হয় তাহলে জেনে রাখা উচিত যে শরীরের গন্তব্যস্থল হল মাটি, আর পদের অহংকার করা হলে জেনে রাখা উচিত হবে যে, তা একদিন তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে চলে যাবে। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিঃ বলেন: “ধনাঢ্যতা হৃদয়ে, মহত্ত্ব তাকওয়ায় এবং সম্মান-মর্যাদা বিনয়ে।”(১) বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত হল, চলাচলের ক্ষেত্রে বিনয়ীদের বর্ণনা এবং তাদের মূর্খদের নির্বুদ্ধিতা উপেক্ষা করা সংক্রান্ত মহান আল্লাহর বাণীকে স্মরণ করা : وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا [২৫:৬৩]। অর্থ: [আর রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম।] (২)
এগুলো হল আল্লাহর বান্দাদের গুণসমূহ; কেননা তারা অহঙ্কার, বড়াই, দম্ভ এবং ঔদ্ধত্য ব্যতীত জমীনে চলাফেরা করে। এর দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয় যে, তারা জমীনে রোগীদের ন্যায় চলাফেরা করে; না ছল করে, আর না অহঙ্কার করে। আর রাসূল সাঃ যখন চলতেন তখন মনে হত যেন তিনি ঢালবিশিষ্ট জায়গা হতে নিচে অবতরণ করছেন এবং যেন তার জন্য জমীন সংকুচিত করে দেয়া হচ্ছে। কোন কোন সালাফ দুর্বল ও কৃত্রিমভাবে চলাফেরাকে অপছন্দ করেছেন। বর্ণিত আছে যে, উমর রাঃ একদা এক যুবককে ধীরগতিতে হাঁটতে দেখলেন। তিনি বললেন, তোমার কী হয়েছে? তুমি কি অসুস্থ? সে বলল: না, হে আমীরুল মুমিনীন! তিনি তার ছড়ি উঠিয়ে তাকে শক্তিমত্তার সাথে চলার নির্দেশ দিলেন। আর বিনম্রভাবে চলাফেরা দ্বারা উদ্দেশ্য হল তাতে স্থিরতা এবং গাম্ভীর্য বজায় রাখা।(৩)
বিনয়ের পন্থার অন্তর্ভুক্ত হল, যারা যমীনে উদ্ধত হতে এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা যে মর্যাদা এবং প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন; এ বিষয়টি স্মরণ করা। আর তাদের উদ্দেশ্য হল আল্লাহর আনুগত্য এবং তার জন্য বিনয়ী হওয়া। ফলে তারা তাঁর অহঙ্কার নিয়ে বিবাদ করে না। মহান আল্লাহ বলেন: تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ অর্থ: [এটা আখেরাতের সে আবাস যা আমরা নির্ধারিত করি তাদের জন্য যারা যমীনে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।] (৪) সুতরাং এই উপদেশ ও ধারাবাহিক পর্যালোচনা অন্তরে বিনয়ের স্থান উন্মুক্ত করে দেয় এবং এতে বিনয়ের প্রতি ভালবাসা রোপন করে।
-সহমর্মিতা ও দয়া:
আভিধানিক অর্থে (الرحمة) দয়া হল: কোমলতা ও সদয়তা। লোকেরা একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে আরবিতে "تراحم القوم" বলা হয়। আবার রহমত 'ক্ষমা' অর্থেও ব্যবহৃত হয়।(৫)
আর (الرفق) কোমলতা হল: কঠোরতার বিপরীত।(৬)
পারিভাষিক অর্থে (الرحمة) দয়া হল: হৃদয়ের নম্রতা যাকে কষ্ট স্পর্শ করে যখন ইন্দ্রিয় অথবা মস্তিষ্ক অপর ব্যক্তির মাঝে কষ্টের উপস্থিতি দেখতে পায়। অথবা তাকে আনন্দ স্পর্শ করে যখন ইন্দ্রিয় অথবা মস্তিষ্ক অপর ব্যক্তির মাঝে আনন্দের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।(১)
কোমলতার সাথে দয়ার এমন নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যে একে অপর থেকে পৃথক হয় না। সুতরাং যে অন্যের প্রতি দয়া অনুভব করে সে তার সাথে ব্যবহারে কঠোর না হয়ে কোমল হবে। কেননা কোমলতা তাকে দয়ার দিকে পরিচালিত করে।(২)
পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, দয়ার উৎস হল উচ্ছ্বসিত অনুভূতি এবং অভ্যন্তরীণ আবেগপূর্ণ উপলব্ধি। সুতরাং দয়া যখন হৃদয়ে সক্রিয় হয় তখন মানুষের আচরণে মিথস্ক্রিয়া ও মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণরূপে আবেগপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশিত হয়। ফলে আচরণে ও ব্যবহারে সহমর্মিতা এবং করুণা প্রকাশিত হয়। ইমাম ইস্পাহানী রহিঃ বলেন: "দয়া হল এমন কোমলতা যা অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি সদ্ব্যবহারের দাবী করে। কখনো দয়া শুধুমাত্র কোমলতা বুঝাতে ব্যবহার হয় আবার কখনো কোমলতা মুক্ত সদ্ব্যবহার বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়: আল্লাহ অমুকের প্রতি দয়া করুন”।(৩) অর্থাৎ দয়া যখন আচরণে রূপ নেয় তখন সেটি কোমলতা বা সহমর্মিতা হয়ে যায়। আর যখন এটা শুধু অনুভূতি হয় এবং তার সাথে ইতিবাচক আচরণ যুক্ত না হয় তখন এটা শুধু মানসিক সমবেদনায় রূপ নেয়।
সুতরাং সহমর্মিতার উৎস হল রহমত বা দয়া। মানুষ যখন সহমর্মী হয় তখন সে দয়াশীল হয়। সুতরাং রহমত বা দয়া হল সে উৎসশক্তি যা মানুষকে পরস্পর সহযোগিতা এবং একতার দিকে ধাবিত করে। “সুতরাং রহমত বা দয়া হল এমন শক্তি যা সদস্যদেরকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে এবং তাদেরকে প্রবণতা ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে এক পরিবারে পরিণত করে”।(৪) রহমত ব্যক্তিকে মানুষের কষ্ট অনুভব করতে, তা দূরীভূত করতে উদ্যোগী হতে এবং তাদের ভুলে আফসোস করতঃ তাদের জন্য হেদায়েত কামনা করতে শেখায়। এ জন্য সে তাদের প্রতি আগ্রহ থেকে উৎপন্ন আন্তরিক কাজের মাধ্যমে প্রচেষ্টা করে।
রহমত বা দয়া আল্লাহ তায়ালার সিফাতসমূহের মধ্য হতে একটি সিফাত; মহান আল্লাহ বলেন: وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ অর্থ: [আর আমার দয়া- তা তো প্রত্যেক বস্তুকে ঘিরে রয়েছে।](৫) তিনি আরো বলেন: وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا﴿ অর্থ: [আর তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।](৬) আর এই রহমত বা দয়া দুনিয়া ও আখেরাতে মুমিনদের জন্য। দুনিয়াতে এইভাবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সেই হকের দিকে হেদায়েত দিয়েছেন যাকে অন্যরা ভুলে রয়েছে এবং তাদেরকে সেই পথের সন্ধান দিয়েছেন যেই পথ থেকে অন্যরা বিচ্যুত হয়েছে। আর আখেরাতে তাদের প্রতি দয়ার অর্থ হল, মহাভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ রাখা হবে এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান হবে।
আল্লাহ তায়ালা এই মহৎ চারিত্রিক গুণে গুণান্বিতদের প্রশংসা করে বলেন: ﴿ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ ءَامَنُواْ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ أُوْلَبِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ﴾ হয়ে যায় যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পর উপদেশ দিয়েছে দয়া অনুগ্রহের।* তারাই সৌভাগ্যশালী।](১) অর্থাৎ তারা মানুষদেরকে উপদেশ দিয়েছে তাদের অভাবগ্রস্তদের খাবার প্রদান, তাদের মূর্খদের শিক্ষা দেয়া, সার্বিকভাবে তাদের প্রয়োজন পূরণ, দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণে তাদের সহযোগিতা করা এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করা হয় তা তাদের জন্য অপছন্দ করার ব্যাপারে। ওরাই হল তারা, যারা বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেছে; যদি তাদের মাঝে দয়ার গুণের সাথে সূরা বালাদে উল্লেখিত গুণগুলো পূর্ণতা পায়।(২)
মানুষের প্রতি সহমর্মিতা হল সেই চারিত্রিক আচরণ যা মানুষের দয়ার সুপ্ত ইচ্ছাকে উন্মুক্ত করে। এটি মানুষের মাঝে সমবেদনা ও সম্প্রীতির প্রকৃত সমার্থক শব্দ। সুতরাং কোন ব্যক্তি যখন অন্যকে দরিদ্রতা ও অভাবে কষ্ট করতে দেখে তখন তার হৃদয় ঐ ব্যক্তির প্রতি কোমল হয়; ফলে সে তার প্রতি করুণা করে এবং তার অবস্থার প্রতি সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতা করে সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে। আর যদি তাকে বিপথে চলে যেতে দেখে তাহলে তার অবস্থা দেখে হৃদয় বিগলিত হয়। ফলে সে তাকে নসীহা করে এবং তাকে হেদায়েত ও সংশোধনের পথ দেখায়; যাতে তাকে ধ্বংসের গহ্বর থেকে উদ্ধার করতে পারে। আর এটি তার অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রতি অনুগ্রহ ব্যতীত আর কিছুই নয়।
দয়ার মর্ম উপলব্ধি ও অনুভব করার ক্ষেত্রে তারতম্য হওয়ার কারণে মানুষের কাছে দয়ার হালতের তারতম্য হয়। কিছু মানুষ মনে করে যে, দয়া শুধুমাত্র তাদের জন্য যাদেরকে তারা ভালবাসে; যেমন সন্তান-সন্ততি এবং আত্মীয়-স্বজন এবং তারা ব্যতীত অন্যদের জন্য নয় যারা করুণা এবং দয়ার যোগ্য। ফলে তাদের দুঃখ-কষ্টে সে কোন প্রকারের মানসিক অংশগ্রহণ অনুভব করে না। কখনো কারো দয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়ে বংশ, গোত্র এবং শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, আবার কারো দয়া করুণা ও রহমতযোগ্য প্রতিটি জীবিত প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করে।(৩) নিশ্চয় স্বার্থপরতার সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে সুপরিসর ও বিস্তৃত বৃত্তের দিকে মানুষের প্রস্থান এবং শুধু নিজেকে ভালবাসার কাঠামো থেকে অন্যদেরকে ভালবাসার সুপরিসর কাঠামোর দিকে মানুষের যাত্রা হল মহান চারিত্রিক উন্নতি।
রহমতের বৃত্ত বিস্তৃত হয়ে তার সকল মর্মকে তুমি মূর্ত হতে দেখবে রাসূল সাঃ এর চরিত্রে, তার উপদেশ ও নির্দেশনায় এবং তার নসীহত ও কওমের লোকদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত কষ্টের উপর তার ধৈর্যধারণে। আল্লাহ তায়ালা তাকে রহমত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন: ﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ﴾ অর্থ: [আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোন সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবেন; নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন।] (৪)
এ জন্য আমরা রাসূল সাঃ হাদিসসমূহকে পায় ক্রমাগতভাবে নম্রতা ও সহমর্মিতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে। যেমন তিনি বলেছেন: (যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহও তাকে দয়া করেন না।) (৫) তিনি আরো বলেন: (নম্রতা যে কোন বিষয়কে সৌন্দর্য মণ্ডিত করে। আর যে কোন বিষয় থেকে নম্রতা বিদূরিত হলে তাকে কলুষিত করে।) (৬)
রাসূল সাঃ এর আচরণের মধ্য হতে যে বিষয়টি দয়ার সকল মর্মই প্রমাণ করে তা হল ছোটদের প্রতি তার স্নেহ-মায়ার প্রদর্শন। বাচ্চাদের চুমু দেয়া, তাদেরকে কোলে নেয়া তো দয়ার নিদর্শন বৈ আর কিছুই নয়। আর তারা দুর্বল ও ছোট হওয়ার কারণে শৈশবে তারা এগুলোর প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী। অনুরূপভাবে এটি তাদের মাঝে নম্রতা, সহমর্মিতা ও করুণার বীজ বপন করে দেয়। আবু হুরায়রা রাঃ বলেন: (রাসূল সাঃ একদা হাসান বিন আলী রাঃ কে চুম্বন করেন। সে সময় তার নিকট আকরা বিন হাবেস উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা বিন হাবেস বললেন: আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেউ কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূল সাঃ তার পানে তাকালেন, অতঃপর বললেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।) (৭)
এটা প্রায়োগিক তরবিয়তি দিকনির্দেশনা যা শিশুদের প্রতি রাসূল সাঃ এর ভালবাসা, স্নেহ-মায়া এবং গুরুত্বপ্রদান সুস্পষ্ট করে। আরো প্রতীয়মান হয়েছে রাসূল সাঃ কর্তৃক শিশুদের প্রতি করুণার মাধ্যমে তাদের হৃদেয় দয়ার সঞ্চারণ করা, তাদেরকে সহমর্মিতা ও তার গুরুত্ব অবহিত করা; যাতে তারা রাসূল সাঃ এর ভালবাসাকে উপলব্ধি করতে পারে এবং তাদের অনুভূতিতে তার ভালবাসার প্রতিফলন ঘটে।
তবে কঠিন হৃদয় অন্যের দুঃখে-কষ্টে আন্দোলিত হয় না এবং দুর্বলের দুর্বলতা, রোগীর যন্ত্রণা, বয়োবৃদ্ধের বার্ধক্য, ছোটদের অক্ষমতা এবং গরীর-মিসকীনের অভাব তাদেরকে জাগ্রত করে না। মানুষের চরিত্রে কঠোরতা বড় ধরণের ত্রুটির প্রমাণ। আর প্রশস্ত হৃদয় খুব কমই নিষ্ঠুরতার উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়। বস্তুত এটি ঘৃণা ও কঠোরতা অপেক্ষা ক্ষমা ও স্নেহ-মমতার অধিক কাছাকাছি। কেউ কেউ মনে করেন যে, কঠোর শব্দ বা শিষ্টাচারের জন্য প্রহার করার দ্বারা তরবিয়ত গ্রহণকারীর অনুভূতিকে আঘাত না করে তরবিয়তের ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন হল লালন-পালনের ক্ষেত্রে শিথিলতা। শিষ্টাচার শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা যদি উপযুক্ত স্থানে হয় তাহলে সেটি শিক্ষার্থীর প্রতি রহমত; কেননা ধর্তব্য হল ফলাফল। সুতরাং যারা বাচ্চাদেরকে ভীত না করার উপদেশ দেন তারা বাচ্চাদেরকে প্রাকৃতিক ভয়ের মুখোমুখী হওয়ার আবশ্যকীয়তার কথা বলেন; যেন তারা শক্ত মেরুদণ্ড, দৃঢ় সংকল্প এবং ঝুঁকি মোকাবেলা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হতে সদিচ্ছার অধিকারী হিসেবে বেড়ে ওঠে। (৮)
এ জন্য শরীয়তের নির্দেশানুসারে চোরের হাত কাটা তার প্রতি রহমত হিসেবে গণ্য করা হবে; যাতে সে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অবৈধ উপায়ে মানুষের সম্পদ ভক্ষণের পাপ করতে না পারে। শরীয়তের নির্দেশানুসারে কিসাস তার প্রতি রহমতস্বরূপ যার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হয়; যাতে সে মানুষের ঘাড় না মাড়ায় ফলে তার পাপ বৃদ্ধি পায়। আর এটি একই সময়ে সমাজের প্রতিও রহমতস্বরূপ এবং ঐ ব্যক্তির প্রতি রহমতস্বরূপ যে অন্তরে অন্যের ক্ষতির আকাঙ্খা লালন করে অতঃপর অন্যের উপর শাস্তির যন্ত্রণা দেখে সে ক্ষতি করা থেকে নিবৃত থাকে। সুতরাং রহমত বা দয়া কঠোর ও শক্ত হৃদয়ের অধিকারীদের হক নয়। অন্যভাবে বলা যায় যে, দয়া প্রাপ্তি দয়া করার শর্তের সাথে যুক্ত; এমনকি কঠোর ব্যক্তির চরিত্র যতই উন্নত হোক না কেন তার জন্য রহমত প্রার্থনায় আমাদের নৈতিক বিবেক সায় দেয় না। আর শিরক ও কবীরা গোনাহকারী এবং সত্য ও উত্তম গুণাবলীর শত্রুরা যেহেতু সামাজিক ব্যাধি লালন করে যা নিরাময় করা অসম্ভব বিধায় তাদের ঘৃণা করা আবশ্যক; যাতে তারা সঠিক পথে এবং ইসলামী চারিত্রিক গুণাবলীর দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তাহলে হৃদয় ভালবাসা ও করুণার সাথে তাদের অভিমূখী হবে।(১)
-আমানতদারিতা: আভিধানিক অর্থে আমানতদারিতা হল: খেয়ানতের বিপরীত। আর সমাজের বিশ্বাসভাজন হল সেই ব্যক্তি যার প্রতি মানুষেরা আস্থা রাখে এবং যাকে আমানতদার ও রক্ষক হিসেবে মেনে নেয়। আমানতের আরো অর্থ হল: আনুগত্য, ইবাদত, সম্পদ আমানত রাখা এবং আস্থা।(২)
পারিভাষিক অর্থে আমানতদারিতা হল: “ফরজ, ওয়াজীব পালন ও হারাম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আল্লাহর হকসমূহের পরিচর্যা করা এবং বান্দার হকসমূহের হেফাযত করা। সুতরাং যখন কোন ব্যক্তির নিকট আমানত রাখা হয় তখন সে ঐ আমানতের সম্পদের প্রতি লালায়িত হবে না, কোন সম্পদ পাহারার দায়িত্ব পেলে সে তা দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে না, ধোঁকার আশ্রয় নিবে না, ওজন ও পরিমাপে কম করবে না, দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান ও প্রচার করবে না এবং ইলম ছাড়া ফতোয়া দিবে না”। (৩)
“মনস্তাত্বিক দিক থেকে আমানতদারিত হল, অন্তরের মাঝে স্থায়ী একটি চরিত্র; যার দ্বারা মানুষ যে সম্পদে তার অধিকার নেই তা গ্রহণ করা থেকে বেঁচে থাকে। যদিও মানুষের নিকট নিন্দার শিকার হওয়া ব্যতীত তার সম্মুখে আমানতে সীমালঙ্ঘন করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সে তার উপর অথবা তার নিকট অন্যের যে হক রয়েছে তা আদায় করে; যদিও সে মানুষের নিকট নিন্দার শিকার হওয়া ব্যতীত সেই হক ভক্ষণ করতে সক্ষম হয়”। (৪)
ইমাম কুরতুবী রহিঃ বলেন: “বিশুদ্ধ মতে আমানতদারিতা দ্বীনের সকল কর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে; আর এটি জমহুরের মত”। (৫)
লেখকের মতে আমানতদারিতা হল: মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা হেফাযত করা এবং তার নিকট অন্য মানুষের যে অধিকার রয়েছে তা অনৈতিকভাবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা।
আমানতদারিতার ব্যাপক অর্থ এবং বহুমুখী দিক রয়েছে। এটি গচ্ছিত সম্পদের হেফাযত, গোপন কথার হেফাযত এবং ব্যক্তিকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তা পালনে পূর্ণ চেষ্টা করাও আমানত।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে আমানত অন্তর্ভুক্ত করে আল্লাহ তায়ালা যে সব তরবিয়ত, দিকনির্দেশনা, হকসমূহ আদায় এবং কর্তব্য পালন করতে বলেছেন, সেগুলোকে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কান, চোখ, জিহ্বা এবং বুদ্ধি-বিবেকের ন্যায় যে সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েছেন; এ ক্ষেত্রে আমানতদারিতা হল; এগুলোকে দ্বীনের খেয়ানত ও দায়িত্বের খেয়ানত থেকে হেফাযত করা। মহান আল্লাহ বলেন: لَيْسَ لَكَ بِهِۦ وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِۦ ই عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾ [আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (১)
আর তা হল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়সমূহ, বুদ্ধি-বিবেক এবং হৃদয়ের আমানত; যে সম্পর্কে এগুলোর অধিকারী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়সমূহ, বুদ্ধি-বিবেক এবং হৃদয়সহ সকলকে জিজ্ঞাসা করা হবে। এমন আমানত যার সুক্ষ্মতা ও বিশালতার কারণে বিবেক কেপে ওঠে; যখনই জিহ্বা কোন শব্দ উচ্চারণ করে বা মানুষ কোন ঘটনা বর্ণনা করে অথবা কোন ব্যক্তি, বিষয় বা ঘটনার উপর হুকুম প্রদান করে।
আল্লাহ তায়ালা আমানত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং খেয়ানতের চরিত্র ধারণে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا [নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।] (২)
তিনি বলেন: وَإِن كُنتُمْ عَلَى سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُواْ كَاتِبَا فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُم بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَنَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا تَكْتُمُواْ الشَّهَادَةً وَمَن يَكْتُمُهَا فَإِنَّهُ عَاثِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ অর্থ: [আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত বন্ধক রাখবে। অতঃপর তোমাদের একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করলে, যার কাছে আমানত রাখা হয়েছে সে যেন আমানত প্রত্যার্পণ করে এবং তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। আর যে কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবগত।] (৩)
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَنَتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।] (১)
সুতরাং আমানত আদায় করা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াজীব। সকল মুসলমানের উপর অবধারিত যে, সে আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূলের সাথে ও মানুষের সাথে আমানতের হেফাযত করবে এবং সে খেয়ানতকারীদের সাথে খেয়ানত করবে না। বরং সে তাদের আমানত তাদের নিকট ফেরত দিবে রাসূল সাঃ এর কথার প্রেক্ষিতে: (যে ব্যক্তি তোমার কাছে আমানত রেখেছে তাকে তা ফেরত দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তুমি তার সাথে খেয়ানত করো না।) (২)
আর আমানতের বিপরীত হল খেয়ানত যা সংকট, প্রতারণা এবং ধোঁকার কারণ; কেননা আমানতের অনুপস্থিতিতে নানা পেশায় ও কাজে কর্মের ফলাফল হ্রাস পায় এবং দায়িত্বপালনের হার দুর্বল হয়। অনুরূপভাবে আমানতের অনুপস্থিতিতে ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা যায় এবং লেনদেনে বিশ্বাসহীনতার কারণে মানুষের মাঝে ব্যবসা হোঁচট খায়।
আমানতের অনুপস্থিতিতে অপরাধ, আত্মসাৎ, সম্মানহানী এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আর ইসলাম খেয়ানতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ধ্বংস করার জন্য এবং মানুষের মাঝে এর প্রভাবকে চূর্ণ করার জন্য। সুতরাং ঈমানের পাল্লায় খেয়ানত হল নিফাকের আলামতসমূহের মধ্য হতে একটি আলামত। যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (মুনাফিকের আলামত তিনটি: বলতে গেলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে খেয়ানত করে, আর ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।) (৩)
আর যখন খেয়ানত বিস্তার লাভ করে ও আমানত হারিয়ে যায় তখন এটি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সতর্কবার্তা এবং কিয়ামতের একটি নিদর্শন। আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেন: (যখন আমানত নষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। সে বলল, কিভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন, যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তুমি কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে।) (৪)
সুতরাং অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে কাজের দায়িত্ব দেয়া খেয়ানত ও আমানত বিনষ্ট করার নামান্তর। এ জন্য রাসূল সাঃ যখন নাজরান বাসীর প্রতি একজনকে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন তাদের জন্য এই উম্মতের 'আমীন' আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাঃ কে প্রেরণ করেন। আবু উবায়দাহ রাঃ কে চয়ন করার কারণ হল, তার মর্যাদা ও যিনি কাজের গুরুভার গ্রহণ করবেন তার ব্যক্তিত্বের গুরুত্বের দিক বিবেচনায়। হুযায়ফা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল সাঃ নাজরান বাসীকে বললেন: (আমি তোমাদের নিকট এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাব যিনি হবেন প্রকৃতই বিশ্বস্ত। একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতে লাগলেন। পরে তিনি আবু উবায়দাহ রাঃ কে পাঠালেন।) (৫)
অনুরূপভাবে বর্তমান সমাজে আমানতের অনুপস্থিতির কারণ হল আকীদা, ইবাদত এবং দণ্ডবিধিতে মুক্তশিক্ষা এবং বিপথগামী সামাজিক স্রোতের কুফল।
ইসলামী লালন-পালনে পরিবারের শিথিলতা আমানতদারিতার অনুপস্থিতির কারণ; যখন ইসলামী তরবিয়তের মানহায সুস্পষ্ট বোধগম্য, সহজ পদ্ধতি, স্বচ্ছ তরবিয়তি লক্ষ্য ও আকাঙ্খা বাস্তবায়নকারী এবং সর্বযুগে, সর্বাবস্থায় ও সকল শ্রেণীর জন্য আমলযোগ্য।
বর্তমান যুগের সমাজ কথা, কাজে, অধিকারে, দায়িত্ব-কর্তব্যে এবং ইন্দ্রীয়সমূহে যে আমানতের অনুপস্থিতি ও খেয়ানতের বিস্তার লাভের সমস্যার সম্মুখীন; তা মূলত ইসলামী তরবিয়তের মানহায পরিত্যাগের ফলাফল।
টিকাঃ
(১) মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৯১)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/৩৮৪, হা: ৭৪০৫), সহীহ মুসলিম (৪/২১০২)।
(২) সূরা আলে-ইমরান: (১৫৪)।
(৩) শাইখ সুলাইমান বিন মুহাম্মাদ, তাইসীরুল আজিজিল হামীদ, (পৃ: ৩৩২)।
(৪) আব্দুর রহমান আলুশ শাইখ, ফাতহুল মাজীদ (পৃ: ৩৩২)।
(৫) সূরা আলে-ইমরান: (৩১)।
(৬) আব্দুর রহমান আলুশ শাইখ, ফাতহুল মাজীদ (পৃ: ৩৩২)।
(১) সহীহ বুখারী (১/২২, হা: ১৬), সহীহ মুসলিম (১/৬৬, হা: ৬৭/৪৩)।
(২) সূরা আল-আম্বিয়া: (৯০)।
(৩) আব্দুর রহমান আলুশ-শাইখ, ফাতহুল মাজীদ (পৃ: ৩৪৪)।
(৪) সূরা আল-হিজর: (৫৬)।
(৫) যিন্দিক: যে ব্যক্তি কুফুরী গোপন করে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করে। মুরজিয়াহ: যারা বিশ্বাস রাখে যে, ঈমান আনার পরে পাপ করলে কোন ক্ষতি হয় না যেমন কুফরী অবস্থায় সৎকাজ কোন উপকারে আসে না। হারুরী: আলী রাঃ সালিশি বিচার মেনে নেওয়ার কারণে যারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। হাশিয়াতু কিতাবিল উবৃদিয়্যাহ, ইবনুল কায়্যিম (পৃঃ ২৭)।
(৬) ইবনে তাইমিয়াহ, আল-উবৃদিয়্যাহ (পৃঃ ৩৭)।
(৭) মুহাম্মাদ আল-আজুররী, আখলাকুল কুরআন (পৃঃ ১২৮)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৯১)।
(২) সূরা আল-আন'আম: (১৬২)।
(৩) সূরা আল-আ'রাফ: (২০৪)।
(৪) সূরা আল-হাদিদ: (০৪)।
(৫) সূরা ক্বাফ: (১৬)।
(১) সূরা লুকমান: (১৬)।
(২) সহীহ বুখারী (১/২২, হা: ১৫), সহীহ মুসলিম (১/৬৭, হা: ৭০-৪৪)।
(৩) সূরা আল-হাশর: (০৭)।
(৪) সূরা আল-আহযাব: (২১)।
(৫) সূরা আল-আহযাব: (৫৬)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৫১৪)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৫/৫১৫, হা: ৩৫৪৬) এবং তিনি হাদিসটিকে আনাস রাঃ হতে ছাবেতের সূত্রে গরীব বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ (১/২০১), শাইখ আলবানী সহীহুল জামেউস সগীর গ্রন্থে (১/৫৫৭, হা: ২৮৭৮) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সূরা আল-হুজুরাত: (০১-০২)।
(৪) সূরা আন-নূর: (৬৩)।
(৫) মুহাম্মাদ আল-আমীন শানক্বীতী, তার থেকে লেখেছেন আহমদ কাদেরী (পৃ: ২০৭)।
(১) আব্দুর রহমান আস-সাদী, তাফসীরুল কারীমির রহমান (৫/৬৭)।
(২) কান্ধালভী, হায়াতুস সাহাবা (পৃ: ৫২৫)।
(৩) সূরা আল-ইসরা: (২৩-২৪)।
(১) সায়্যেদ কুতুব, ফী যিলালিল কুরআন (৪/২২২১)।
(২) সহীহ বুখারী (২/৩৫৯, হা: ৩০০৪), সহীহ মুসলিম (৪/১৯৭৫, হা: ৫/২৫৪৯)।
(৩) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৭৮, হা: ১০/২৫৫১)।
(৪) আব্দুল্লাহ আব্দুর রহীম, মিনাল আদাব ওয়াল আখলাক (পৃ: ৪৫)।
(৫) সূরা লুকমান: (১৪)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/৮৬, হা: ৫৯৭১), সহীহ মুসলিম (৪/১৯৭৪, হা: ১/২৫৪৮)।
(১) মুহাম্মাদ আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (১/৩৮৬)।
(২) সহীহ মুসলিম (২/১১৪৮, হা: ২৫/১৫১০)।
(৩) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১/১৫৩)।
(৪) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়িয়্যাহ (১/৪৫৩)।
(৫) আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (১/৩৭৩-৩৯৩)।
(৬) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১২/২৩২)।
(১) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (১৬/১৬৪)।
(২) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৫৩১)।
(৩) প্রাগুক্ত (৪/১৫৫৩)।
(৪) সূরা আল-ইসরা: (২৬)।
(৫) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৬/১১৩)।
(১) সূরা আর-রাদ (১৯-২১)।
(২) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (২/৩৬-৩৭)।
(৩) সূরা মুহাম্মাদ (২২-২৩)।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/৯৫-৯৬, হা: ৬০২৪) সহীহ মুসলিম (৪/২০০৩-২০০৪, হা: ৭৭/২৫৯৩)।
(৫) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৬/১১২)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/৮৯, হা: ৫৯৮৫) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৮২, হা: ২০/২৫৫৭)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৪/১৫৪)।
(২) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১২১)।
(৩) সূরা আন-নিসা: (৩৬)।
(৪) ইবনে হাজার ফাতহুল বারী (১/৪৪১)।
(১) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১২০)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০২৫, হা: ১৪০/২৬২৪)।
(৩) নূরুদ্দীন আল-হাইছামী, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ (১/১৬৪)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৪৯, হা: ৮৯)।
(১) মুসনাদে আহমদ (২/৪৪০)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৬), সহীহ মুসলিম (১/৬৮, হা: ৭৩/৪৬)।
(৩) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৪২)।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৮), সহীহ মুসলিম (১/৬৮, হা: ৭৪/৪৭)।
(৫) সহীহ বুখারী (২/১৯৫, হা: ২৪৬৩), সহীহ মুসলিম (৩/১২৩০, হা: ১৩৬/১৬০৯)।
(১) ইবনু কুদামা আল-মাকদেসী, মুখতাসারু মিনহাজিল কাসেদীন (পৃ: ১১৬)।
(২) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১২১)।
(৩) সহীহ মুসলিম (৪/২০২৫, হা: ১৪২/২৬২৫)।
(৪) ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৪২)।
(৫) সহীহ বুখারী (২/১২৯, হা: ২২৫৯)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/৯৪, হা: ৬০১৭), সহীহ মুসলিম (২/৭১৪, হা: ৯০/১০৩০)।
(১) ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৪৫)।
(২) মুসনাদে আবি ইয়ালা (১১/৯, হা: ৬০১৪৮)। শায়খ আলবানী জামেউস সগীরে (৩০০৪) হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
(৩) সহীহ বুখারী (২/১২৯, হা: ২২৫৯)।
(৪) আব্দুল হামিদ হাশেমী, আল-মুরশিদ ফি ইলমিন নাফস (পৃ: ৩০৮)।
(১) আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত (পৃ: ১৪০)।
(২) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০৬)।
(৩) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২২৬-২২৭)।
(৪) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ১৯০)।
(৫) সহীহ বুখারী (১/২০, হা: ৯), সহীহ মুসলিম (১/৬৩, হা: ৫৮/৩৫)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/১১০, হা: ৬১০২), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৯-১৮১০, হা: ৬৭/৩২২০)।
(১) সহীহ মুসলিম (১/৬৮, হা: ৬۱/৩৭)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৪/৩০২, হা: ৪০১২), নাসায়ী (১/২০০, হা: ৪০৬), শাইখ আলবানী সহীহুল জামেউস সগীরে (১/৩৬১, হা: ১৭৫৬) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০৬)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৬৩)।
(৫) সহীহ বুখারী (১/৬৩), সহীহ মুসলিম (১/২৬১, হা: ৬১/৩৩২)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/২৭০)।
(২) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৪/৪৩৮-৪৩৯)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, উদ্দাতুস সাবেরীন (পৃ: ১৭)।
(৪) সূরা আল-বাকারা (১৫৫-১৫৭)।
(১) সূরা আলে-ইমরান (২০০)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৪৫৪)।
(৩) সূরা আল-কাহফ (২৮)।
(৪) আহমাদ আব্দুর রহমান, আল-ফাযায়েল আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ১৬৪)।
(১) সহীহ বুখারী (১/৪৫৫, হা: ১৪৫৯), সহীহ মুসলিম (২/৭২৯, হা: ১২৪/১০৫৩)।
(২) সূরা আশ-শুরা: (৪৩)।
(৩) সূরা হুদ: (১১)।
(৪) সূরা আল-আনফাল: (৪৬)।
(১) সূরা আর-রাদ: (২৪)।
(২) আব্দুর রহমান আস-সাদী, তাইসীরুল কারীমীর রহমান (২/৪৬৯)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/২৫, হা: ৫৬৫৩)।
(৪) সুনানে তিরমিযি (৩/৩৪১, হা: ১০২১), মুসনাদে আহমদ (৪/৪১৫), শাইখ আলবানী আল-জামেউস সগীরে (১/১৯৯, হা: ৭৯৫) হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
(৫) সূরা ফুসসিলাত: (৩৫)।
(৬) সূরা আল-কাসাস: (৮০)।
(৭) মুহাম্মাদ আহমদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/২৮৫)।
(১) ফিরোজ আবাদী, আল-কামুস আল-মুহীত (৩/২৫২)।
(২) আব্দুল লতীফ মুহাম্মাদ, আল-আখলাক ফিল ইসলাম (পৃ: ১৭০)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/২৮৫)।
(৪) সূরা মারইয়াম: (৪১)।
(৫) সূরা মারইয়াম: (৫৬)।
(৬) সূরা মারইয়াম: (৫৪)।
(৭) সূরা আত-তাওবা: (১১৯)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (২/৪১৪)।
(২) সূরা আল-ইসরা: (৮০)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/২৮১)।
(৪) আল-মাওয়ারদী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন (পৃ: ২৬২-২৬৩)।
(১) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (১/৪১)।
(২) সহীহ বুখারী (১/২১, হা: ১৩), সহীহ মুসলিম (১/৬৭, হা: ৭১/৪৫)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/১০৯, হা: ৬০৯৪), সহীহ মুসলিম (৪/২০১২-২৫১৩, হা: ১০৫/২৬০৭)।
(৪) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০৩)।
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৮/৩৯৭)।
(২) আহমাদ, মাওসুআতু আখলাকিল কুরআন (১/৬৮)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৪৬)।
(৪) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৬০۹)।
(৫) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩৪৭-৩৫১)।
(৬) ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ (পৃঃ ১৫৮)।
(১) আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (২/২৩২)।
(২) প্রাগুক্ত (২/২৩১)।
(৩) সূরা আশ-শুআ'রা: (২১৫)।
(৪) সূরা আলে-ইমরান: (১৫৯)।
(৫) মুসনাদে আহমদ (৩/১৫৩-২৪১), শাইখ আলবানী রহিঃ সিলসিলাতুল আহাদিস সহীহাহতে (১৫৭২) হাদিসটিকে 'ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ' বলেছেন。
(১) সহীহ বুখারী (২/৪৮৯-৪৯০, হাঃ ৩৪৪৫)।
(২) সহীহ বুখারী (১/৩৯৯, হাঃ ১২৯৫)।
(৩) সূরা আল-আহযাব: (২১)।
(৪) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২১০)।
(৫) সূরা আর-রহমান: (২৬-২৭)।
(১) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরইয়্যাহ (২/২৩১)।
(২) সূরা আল-ফুরকান: (৬৩)।
(৩) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৩৩৬-৩৩৭)।
(৪) সূরা আল-কাসাস: (৮৩)।
(৫) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১২/২৩০)।
(৬) প্রাগুক্ত (১০/১১৮)।
(১) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (২/৫)।
(২) প্রাগুক্ত (২/৩১৫)।
(৩) রাগেব আল-ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন (পৃ: ১৯১)।
(৪) মুহাম্মাদ আহমাদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/২৭৩)।
(৫) সূরা আল-আ'রাফ: (১৫৬)।
(৬) সূরা আল-আহযাব: (৪৩)।
(১) সূরা আল-বালাদ: (১৭-১৮)।
(২) তাফসীরুল কারীম, সা'দী (৫/৪১৮-৪১৯)।
(৩) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামীয়্যাহ (২/৫)।
(৪) সূরা আলে-ইমরান: (১৫৯)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/৩৭৪, হা: ৭৩৭৬), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৯, হা: ৬৬/২৩১৯)।
(৬) সহীহ মুসলিম (৪/২০০৪, হা: ৭৮/২৫৯৪)।
(৭) সহীহ বুখারী (৪/৯১, হা: ৫৯৯৭), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৮-১৮০৯, হা: ৬৫/২৩১৮)।
(৮) আহমাদ ফুয়াদ, আত-তারবিয়াহ ফীল ইসলাম (পৃ: ১২৯)।
(১) আহমাদ আব্দুর রহমান, আল-ফাযায়েল আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ১৭৭)।
(২) ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব (১৩/২২)।
(৩) মুহাম্মাদ আহমাদ জাদ, আল-খুলুক আল-কামেল (৪/১৫৫)।
(৪) আব্দুর রহমান আল-ময়দানী, আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (১/৬৪৫)।
(৫) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (১৪/১৬২)।
(১) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(২) সূরা আন-নিসা: (৫৮)।
(৩) সূরা আল-বাকারা: (২৮৩)।
(১) সূরা আল-আনফাল: (২৭)।
(২) সুনানে আবু দাউদ (৩/৮০৩-৮০৫, হা: ৩৫৩৪), তিরমিযি (৩/৫৬৪, হা: ১২৬৪) শাইখ আলবানী রহিঃ আল-জামেউস সগীরে (১/১০৭, হা: ২৪০) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৩) সহীহ বুখারী (১/২৭, হা: ২৩), সহীহ মুসলিম (১/৭৮, হা: ১০৭-৫۹)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৩৭, হা: ৫৯)।
(৫) সহীহ বুখারী (৪/৩৫৪, হা: ৭২৫৪)।
📄 চারিত্রিক শিক্ষা এবং চারিত্রিক হুকুম আরোপের ভিত্তিসমূহ
চারিত্রিক শিক্ষার বুনিয়াদ সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে দু'টি বিষয়ে অবগত হওয়া প্রয়োজন: তন্মধ্যে একটি হল চারিত্রিক হুকুম আরোপের সাথে সম্পর্কিত; কেননা এটি মানুষের মাঝে চারিত্রিক ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তরবিয়তি কার্যক্রমের উপর এর প্রভাব রয়েছে।
দ্বিতীয়টি হল চারিত্রিক শিক্ষার বুনিয়াদের সাথে সম্পর্কিত। এর আলোচনা নিম্নরূপ:
প্রথমত: চারিত্রিক হুকুম আরোপ:
চারিত্রিক হুকুম আরোপ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষেরা একে অপরের উপর যে প্রশংসনীয় বা নিন্দিত বিশেষণ আরোপ করে।
একে অন্যের উপর মানুষেরা যে হুকুম আরোপ করে সেক্ষেত্রে তাদের মাঝে ব্যবধান রয়েছে। তুমি কাউকে দেখবে যে ধারাবাহিকভাবে তার উপকরা করার পরেও যখন একবার করবেনা তখন সে তার সাথে সংঘটিত সর্বশেষ আচরণের সাথে তোমাকে সম্পৃক্ত করবে এবং সে ভুলে যাবে তোমার প্রকৃত ভাল আচরণ। আর কিছু মানুষকে দেখবে যে তারা মর্যাদাবান ব্যক্তিদের বলায়, বক্তৃতায় এবং কাজে সামান্য ভুল পেলে তা উল্লেখ করে। আবার কখনো তাদের স্বাভাবিক মহৎ চারিত্রিক গুণাবলীর বিপরীত গুণে তাদেরকে অভিযুক্ত করে।
এ জন্য মানুষের চরিত্রে, তাদের লেনদেনে, তাদের আন্তঃসম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নতায়, তাদের পারস্পরিক নৈকট্য ও দূরত্বে এবং শত্রুতা ও মিত্রতায় চারিত্রিক হুকুম আরোপের প্রভাব রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে প্রজ্ঞাপূর্ণ শরয়ী বিধানের আলোকে এর জন্য মূলনীতি তৈরি করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
চারিত্রিক আচরণ যদি এমন প্রতিটি গুণ হয় যা ব্যক্তি নিজের মাঝে বা অন্যের সাথে আচারণে ধারণ করে এবং তা তার স্বভাবে পরিণত হয়; তাহলে এর মাধ্যমে প্রতিটি ব্যতিক্রমী আচরণ বাদ দেয়া হবে যা মানুষের সহজাত চরিত্র বা ব্যক্তির জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। কেননা যে ব্যক্তিকে মানুষেরা কৃপণ হিসেবে জেনে অভ্যস্ত সে যদি কোন প্রলোভনে হঠাৎ কখনো দান করে; তাহলে সে এই একক কর্মের বিনিময়ে দানশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হওয়ার উপযুক্ত নয়। কেননা এই গুণসহ অন্যান্য গুণ হারিয়ে যায় যখন এর উদ্দেশ্য লোপ পায়। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তির যদি দান করা অভ্যাস হয়ে থাকে এবং সে যদি হঠাৎ আগত জাগতিক বা অন্যান্য কারণে এ গুণটি হারিয়ে ফেলে; তাহলে তার উপর কৃপণতার হুকুম আরোপ করা হবে না; কেননা তার উপর এ হুকুম আরোপ করলে যুলুম করা হবে। সহীহ বুখারীর হাদিসে এসেছে রাসূল সাঃ তার কসওয়া উটনী সম্পর্কে বলেছেন: (কসওয়া জিদ করেনি এবং এটা তার স্বভাবজাতও নয়।) (১)
ইবনে হাজার রহিঃ বলেন: “অত্র হাদিসে কোন কিছুর উপর তার অভ্যাস অনুপাতে হুকুম আরোপের বৈধতা রয়েছে, যদিও তার অভ্যাসের বিপরীত কিছু আকস্মিকভাবে তার উপর আসতে পারে। সুতরাং কোন ব্যক্তি থেকে যদি এমন কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশ পায় যার অনুরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতি তার থেকে সাধারণত পাওয়া যায় না; তাহলে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির সাথে তাকে সম্বন্ধযুক্ত করা হবে না”।(১) বস্তুত ভুলকে ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত করা যায়, ব্যক্তিকে ভুলে দিকে নয়।
এ নীতির আলোকে ব্যক্তির আচরণে আকস্মিক আগত ভাল বা মন্দ স্বভাব দ্বারা তাকে গুণান্বিত করা যাবে না; বরং এক্ষেত্রে সে যে স্বভাব, চরিত্র ও অভ্যাসের উপর গড়ে উঠেছে এবং পরিচিত হয়েছে; তাই গ্রহণীয় দলীল। যদিও ভুল তার দিকে সম্বন্ধিত করা যাবে কিন্তু সেটিকে তার স্বভাব হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না। আর শরয়ী দণ্ডবিধি ও বিচারিক রায়ের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
দ্বিতীয়ত: চারিত্রিক শিক্ষার ভিত্তিসমূহ:
শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চারিত্রিক শিক্ষার কার্যক্রম নির্ভর করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর:
১- উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষণ করা ব্যক্তি ও সমাজের উপর তার প্রতিফল এবং উপকারিতা বর্ণনা করার মাধ্যমে।
২- মন্দ চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষণ করা ব্যক্তি ও সমাজের উপর তার কুফল এবং ক্ষতিকর প্রভাব বর্ণনা করার মাধ্যমে।
৩- কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত দলীল এবং সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মতের উলামাদের থেকে বর্ণিত উক্তির দ্বারা উক্ত দিকনির্দেশনাকে শক্তিশালী করা।
৪- চারিত্রিক অংশে গুরুত্ব দেয় না এমন সমাজের নৈতিক অধঃপতন সম্পর্কে যা দেখা যায় এবং শোনা যায় তার সাথে এই নির্দেশনাগুলোকে সংযুক্ত করা। আর তা হবে ঘটনা বর্ণনা, উদাহরণ পেশ এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীরা যে দুর্ঘটনা, বিপদাপদ এবং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে।
শিক্ষা কার্যক্রমে এই পদ্ধতির অনুসরণ শিক্ষার্থীর মনে বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করে; কেননা এই পদ্ধতি বিশদ বিবরণ, বিশ্লেষণ, বক্তব্যকে দলীল-প্রমাণ দ্বারা শক্তিশালী করণকে ধারণ করার সাথে সাথে সেগুলোকে প্রত্যক্ষ অথবা শ্রুত বাস্তবতার সাথে যুক্ত করে।
এর মাধ্যমে এই ইসলামী মহান মূলনীতির গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়। যে মূলনীতি মানুষের সুপ্ত বাসনা ও তার ধারণ করা গুণাবলীকে বর্ণনা করে এবং যা নিজের সাথে ও অন্যের সাথে তার আচরণ এব কর্মে প্রতিফলিত হয়। আর ইসলাম এই মূলনীতির প্রতি ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছে ফলে এটি নবী প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে; যিনি আগমন করেছেন উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দিতে।
কিন্তু কিছু মানুষ এই মূলনীতিকে ভিন্ন অর্থে, সংজ্ঞায় এবং পদ্ধতিতে বুঝে থাকে; ফলে মানুষের মাঝে পরিমাপক এবং হুকুম ভিন্নতর হয়ে থাকে। এ জন্য এই পরিচ্ছদে শিষ্টাচারকে বুঝা ও তা প্রয়োগের জন্য সংজ্ঞা এবং পদ্ধতিগত মূলনীতি আলোচিত হয়েছে।
অনুরূপভাবে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে চারিত্রিক শিক্ষার ভিত্তিসমূহকে ধারণ করাও আবশ্যকীয় কর্তব্য।
টিকাঃ
(১) সহীহ বুখারী (২/২৭৯, হা: ২৭৩১, ২৭৩২)।
(১) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (৫/৩৩৫)।
চারিত্রিক শিক্ষার বুনিয়াদ সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে দু'টি বিষয়ে অবগত হওয়া প্রয়োজন: তন্মধ্যে একটি হল চারিত্রিক হুকুম আরোপের সাথে সম্পর্কিত; কেননা এটি মানুষের মাঝে চারিত্রিক ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তরবিয়তি কার্যক্রমের উপর এর প্রভাব রয়েছে।
দ্বিতীয়টি হল চারিত্রিক শিক্ষার বুনিয়াদের সাথে সম্পর্কিত। এর আলোচনা নিম্নরূপ:
প্রথমত: চারিত্রিক হুকুম আরোপ:
চারিত্রিক হুকুম আরোপ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষেরা একে অপরের উপর যে প্রশংসনীয় বা নিন্দিত বিশেষণ আরোপ করে।
একে অন্যের উপর মানুষেরা যে হুকুম আরোপ করে সেক্ষেত্রে তাদের মাঝে ব্যবধান রয়েছে। তুমি কাউকে দেখবে যে ধারাবাহিকভাবে তার উপকরা করার পরেও যখন একবার করবেনা তখন সে তার সাথে সংঘটিত সর্বশেষ আচরণের সাথে তোমাকে সম্পৃক্ত করবে এবং সে ভুলে যাবে তোমার প্রকৃত ভাল আচরণ। আর কিছু মানুষকে দেখবে যে তারা মর্যাদাবান ব্যক্তিদের বলায়, বক্তৃতায় এবং কাজে সামান্য ভুল পেলে তা উল্লেখ করে। আবার কখনো তাদের স্বাভাবিক মহৎ চারিত্রিক গুণাবলীর বিপরীত গুণে তাদেরকে অভিযুক্ত করে।
এ জন্য মানুষের চরিত্রে, তাদের লেনদেনে, তাদের আন্তঃসম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নতায়, তাদের পারস্পরিক নৈকট্য ও দূরত্বে এবং শত্রুতা ও মিত্রতায় চারিত্রিক হুকুম আরোপের প্রভাব রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে প্রজ্ঞাপূর্ণ শরয়ী বিধানের আলোকে এর জন্য মূলনীতি তৈরি করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
চারিত্রিক আচরণ যদি এমন প্রতিটি গুণ হয় যা ব্যক্তি নিজের মাঝে বা অন্যের সাথে আচারণে ধারণ করে এবং তা তার স্বভাবে পরিণত হয়; তাহলে এর মাধ্যমে প্রতিটি ব্যতিক্রমী আচরণ বাদ দেয়া হবে যা মানুষের সহজাত চরিত্র বা ব্যক্তির জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। কেননা যে ব্যক্তিকে মানুষেরা কৃপণ হিসেবে জেনে অভ্যস্ত সে যদি কোন প্রলোভনে হঠাৎ কখনো দান করে; তাহলে সে এই একক কর্মের বিনিময়ে দানশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হওয়ার উপযুক্ত নয়। কেননা এই গুণসহ অন্যান্য গুণ হারিয়ে যায় যখন এর উদ্দেশ্য লোপ পায়। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তির যদি দান করা অভ্যাস হয়ে থাকে এবং সে যদি হঠাৎ আগত জাগতিক বা অন্যান্য কারণে এ গুণটি হারিয়ে ফেলে; তাহলে তার উপর কৃপণতার হুকুম আরোপ করা হবে না; কেননা তার উপর এ হুকুম আরোপ করলে যুলুম করা হবে। সহীহ বুখারীর হাদিসে এসেছে রাসূল সাঃ তার কসওয়া উটনী সম্পর্কে বলেছেন: (কসওয়া জিদ করেনি এবং এটা তার স্বভাবজাতও নয়।) (১)
ইবনে হাজার রহিঃ বলেন: “অত্র হাদিসে কোন কিছুর উপর তার অভ্যাস অনুপাতে হুকুম আরোপের বৈধতা রয়েছে, যদিও তার অভ্যাসের বিপরীত কিছু আকস্মিকভাবে তার উপর আসতে পারে। সুতরাং কোন ব্যক্তি থেকে যদি এমন কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশ পায় যার অনুরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতি তার থেকে সাধারণত পাওয়া যায় না; তাহলে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির সাথে তাকে সম্বন্ধযুক্ত করা হবে না”।(১) বস্তুত ভুলকে ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত করা যায়, ব্যক্তিকে ভুলে দিকে নয়।
এ নীতির আলোকে ব্যক্তির আচরণে আকস্মিক আগত ভাল বা মন্দ স্বভাব দ্বারা তাকে গুণান্বিত করা যাবে না; বরং এক্ষেত্রে সে যে স্বভাব, চরিত্র ও অভ্যাসের উপর গড়ে উঠেছে এবং পরিচিত হয়েছে; তাই গ্রহণীয় দলীল। যদিও ভুল তার দিকে সম্বন্ধিত করা যাবে কিন্তু সেটিকে তার স্বভাব হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না। আর শরয়ী দণ্ডবিধি ও বিচারিক রায়ের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
দ্বিতীয়ত: চারিত্রিক শিক্ষার ভিত্তিসমূহ:
শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চারিত্রিক শিক্ষার কার্যক্রম নির্ভর করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর:
১- উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষণ করা ব্যক্তি ও সমাজের উপর তার প্রতিফল এবং উপকারিতা বর্ণনা করার মাধ্যমে।
২- মন্দ চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষণ করা ব্যক্তি ও সমাজের উপর তার কুফল এবং ক্ষতিকর প্রভাব বর্ণনা করার মাধ্যমে।
৩- কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত দলীল এবং সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মতের উলামাদের থেকে বর্ণিত উক্তির দ্বারা উক্ত দিকনির্দেশনাকে শক্তিশালী করা।
৪- চারিত্রিক অংশে গুরুত্ব দেয় না এমন সমাজের নৈতিক অধঃপতন সম্পর্কে যা দেখা যায় এবং শোনা যায় তার সাথে এই নির্দেশনাগুলোকে সংযুক্ত করা। আর তা হবে ঘটনা বর্ণনা, উদাহরণ পেশ এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীরা যে দুর্ঘটনা, বিপদাপদ এবং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে।
শিক্ষা কার্যক্রমে এই পদ্ধতির অনুসরণ শিক্ষার্থীর মনে বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করে; কেননা এই পদ্ধতি বিশদ বিবরণ, বিশ্লেষণ, বক্তব্যকে দলীল-প্রমাণ দ্বারা শক্তিশালী করণকে ধারণ করার সাথে সাথে সেগুলোকে প্রত্যক্ষ অথবা শ্রুত বাস্তবতার সাথে যুক্ত করে।
এর মাধ্যমে এই ইসলামী মহান মূলনীতির গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়। যে মূলনীতি মানুষের সুপ্ত বাসনা ও তার ধারণ করা গুণাবলীকে বর্ণনা করে এবং যা নিজের সাথে ও অন্যের সাথে তার আচরণ এব কর্মে প্রতিফলিত হয়। আর ইসলাম এই মূলনীতির প্রতি ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছে ফলে এটি নবী প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে; যিনি আগমন করেছেন উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দিতে।
কিন্তু কিছু মানুষ এই মূলনীতিকে ভিন্ন অর্থে, সংজ্ঞায় এবং পদ্ধতিতে বুঝে থাকে; ফলে মানুষের মাঝে পরিমাপক এবং হুকুম ভিন্নতর হয়ে থাকে। এ জন্য এই পরিচ্ছদে শিষ্টাচারকে বুঝা ও তা প্রয়োগের জন্য সংজ্ঞা এবং পদ্ধতিগত মূলনীতি আলোচিত হয়েছে।
অনুরূপভাবে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে চারিত্রিক শিক্ষার ভিত্তিসমূহকে ধারণ করাও আবশ্যকীয় কর্তব্য।
টিকাঃ
(১) সহীহ বুখারী (২/২৭৯, হা: ২৭৩১, ২৭৩২)।
(১) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (৫/৩৩৫)।
📄 সারসংক্ষেপ
আমরা এই পরিচ্ছেদে কুরআন, সুন্নাহ, অভিধান এবং উলামাদের পরিভাষায় 'আখলাক' বা শিষ্টাচারের পরিচয় উল্লেখ করেছি; যা থেকে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, শিষ্টাচারের কিছু অংশ সহজাত এবং কিছু অংশ অর্জনীয়। আর ‘আখলাক' শব্দটি ভাল ও মন্দ চরিত্র দুটো বুঝাতেই ব্যবহৃত হয় এবং প্রতীয়মান হয়েছে যে, কুরআন, সুন্নাহ, অভিধান ও পরিভাষায় আখলাকের অর্থ একই।
এর পর আমরা এ ফলাফল বের করেছি যে, নন্দিত চরিত্র হল: প্রতিটি উত্তম গুণাবলী যা একজন মানুষ আল্লাহর খালেস নিয়তে ও তাঁর পদ্ধতি অনুযায়ী ধারণ করে।
পক্ষান্তরে নিন্দিত চরিত্র হল: প্রতিটি গুণাবলী যা আল্লাহর প্রদর্শিত পদ্ধতি ও তাঁর খালেস নিয়ত ব্যতীত মানুষ ধারণ করে থাকে।
আর চারিত্রিক আচরণ হল: প্রতিটি গুণাবলী যা মানুষ নিজের মাঝে অথবা অন্যের সাথে লেনদেনে ধারণ করে এবং এটি তার স্বভাবে পরিণত হয়; চাই তা সহজাত বা অর্জনীয়, নন্দিত বা নিন্দিত হোক।
ইসলামী চরিত্রের ভিত্তিসমূহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামের মানদণ্ডে উত্তম চরিত্রের চারিত্রিক মূল্য তখনই অর্জিত হবে যখন তা আল্লাহর খালেস নিয়তে এবং ইসলামী মানহাযের কাঠামোর মধ্যে থেকে ধারণ করা হবে। আরো প্রতীয়মান হয়েছে যে, ইসলামী চরিত্রের ভিত্তিসমূহ যার উপর স্থাপিত তা হল আরোপিত। অর্থাৎ ইসলামী চরিত্র ধারণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক, এটি সহজ, সরল ও মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এর মাঝে মানুষের সাধ্য ও সক্ষমতার বাইরে কোন চাপ নেই।
স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামী চরিত্র তার আওতায় লজ্জাশীলতা, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, কোমলতা, দয়া এবং আমানতদারিতা ন্যায় সকল উত্তম গুণাবলীকে ধারণ করে। অনুরূপভাবে তা রবের সাথে, নবীর সাথে এবং সমাজের সকলের সাথে বান্দার আদবের বিষয়টি স্পষ্ট করে।
এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী চরিত্রের ধারণা জীবনের সকল ক্ষেত্র ও মানুষের সম্পর্ককে অন্তর্ভুক্ত করে। আর ইসলামী চরিত্র হল উপযুক্ত মানহায যা সমাজের পার্থিব ও পরকালীন সুখ-শান্তি নিশ্চিত করে এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, মানুষের মাঝে সম্পর্কের অবনতি, সামাজিক ভাঙ্গন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ হল ইসলামী তরবিয়তের মানহায থেকে সমাজগুলোর দূরে সরে যাওয়া।
আমরা এই পরিচ্ছেদে কুরআন, সুন্নাহ, অভিধান এবং উলামাদের পরিভাষায় 'আখলাক' বা শিষ্টাচারের পরিচয় উল্লেখ করেছি; যা থেকে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, শিষ্টাচারের কিছু অংশ সহজাত এবং কিছু অংশ অর্জনীয়। আর ‘আখলাক' শব্দটি ভাল ও মন্দ চরিত্র দুটো বুঝাতেই ব্যবহৃত হয় এবং প্রতীয়মান হয়েছে যে, কুরআন, সুন্নাহ, অভিধান ও পরিভাষায় আখলাকের অর্থ একই।
এর পর আমরা এ ফলাফল বের করেছি যে, নন্দিত চরিত্র হল: প্রতিটি উত্তম গুণাবলী যা একজন মানুষ আল্লাহর খালেস নিয়তে ও তাঁর পদ্ধতি অনুযায়ী ধারণ করে।
পক্ষান্তরে নিন্দিত চরিত্র হল: প্রতিটি গুণাবলী যা আল্লাহর প্রদর্শিত পদ্ধতি ও তাঁর খালেস নিয়ত ব্যতীত মানুষ ধারণ করে থাকে।
আর চারিত্রিক আচরণ হল: প্রতিটি গুণাবলী যা মানুষ নিজের মাঝে অথবা অন্যের সাথে লেনদেনে ধারণ করে এবং এটি তার স্বভাবে পরিণত হয়; চাই তা সহজাত বা অর্জনীয়, নন্দিত বা নিন্দিত হোক।
ইসলামী চরিত্রের ভিত্তিসমূহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামের মানদণ্ডে উত্তম চরিত্রের চারিত্রিক মূল্য তখনই অর্জিত হবে যখন তা আল্লাহর খালেস নিয়তে এবং ইসলামী মানহাযের কাঠামোর মধ্যে থেকে ধারণ করা হবে। আরো প্রতীয়মান হয়েছে যে, ইসলামী চরিত্রের ভিত্তিসমূহ যার উপর স্থাপিত তা হল আরোপিত। অর্থাৎ ইসলামী চরিত্র ধারণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক, এটি সহজ, সরল ও মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এর মাঝে মানুষের সাধ্য ও সক্ষমতার বাইরে কোন চাপ নেই।
স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামী চরিত্র তার আওতায় লজ্জাশীলতা, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, কোমলতা, দয়া এবং আমানতদারিতা ন্যায় সকল উত্তম গুণাবলীকে ধারণ করে। অনুরূপভাবে তা রবের সাথে, নবীর সাথে এবং সমাজের সকলের সাথে বান্দার আদবের বিষয়টি স্পষ্ট করে।
এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী চরিত্রের ধারণা জীবনের সকল ক্ষেত্র ও মানুষের সম্পর্ককে অন্তর্ভুক্ত করে। আর ইসলামী চরিত্র হল উপযুক্ত মানহায যা সমাজের পার্থিব ও পরকালীন সুখ-শান্তি নিশ্চিত করে এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, মানুষের মাঝে সম্পর্কের অবনতি, সামাজিক ভাঙ্গন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ হল ইসলামী তরবিয়তের মানহায থেকে সমাজগুলোর দূরে সরে যাওয়া।