📄 শিষ্টাচার সম্পর্কিত নীতিমালাসমূহ
‘যাবেত’ বা নীতিমালার সংজ্ঞা:
‘যবত’ শব্দের অর্থ হল: কোন কিছুর সাথে লেগে থাকা ও তাকে আবদ্ধ করা। আর কোন কিছুকে আয়ত্ব করা হল তা দৃঢ়তার সাথে সংরক্ষণ করা।(১)
সুতরাং ‘যাবেত’ বা নীতিমালা অর্থ হল, যে কোন কিছুকে সীমাবদ্ধ করে রাখে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজের শর্তাধীন করে রাখে।
আর শিষ্টাচার সম্পর্কিত নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল মানবীয় আচরণের সীমানির্ধারণী ও শর্তারোপকারী নীতিসমূহ।
নীতিমালার প্রকারভেদ:
এই বিষয়ে এবং এর অনুরূপ বিষয়গুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অংশ মনোযোগের দাবী রাখে তা হল, এর উৎস, শাখা-প্রশাখা এবং এটি বোঝার পদ্ধতির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা; যাতে এর অন্বেষণকারীগণ অদূরদর্শীতার গোলকধাঁধা থেকে দূরে থাকতে পারে। ফলে যা শিষ্টাচারের অংশ নয় তাকে সে শিষ্টাচারের অন্তরর্ভুক্ত করবে না এবং যা তার অন্তর্ভুক্ত তাকে সে খারিজ করে দিবে না।
এই বিষয়টির জন্য এমন নীতিমালা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন যে নীতিমালার ছায়ায় এটি চলমান; যাতে এটি বিপথগামী হয়ে ধ্বংস হয়ে না যায়। আর এই নীতিমালাগুলো তিনটি পয়েন্টে সুনির্দিষ্ট করা যায়:
১- শরয়ী নীতিমালা।
২- উরফ বা প্রথাগত নীতিমালা।
৩- মনস্তাত্ত্বিক নীতিমালা।
প্রথমত: শরয়ী নীতিমালা:
শরয়ী নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল কুরআন ও সুন্নাহর সে সব দলীল যার দাবীর আলোকে সম্বোধিত ব্যক্তি কাজে বা কথায় সম্পাদন করতে বা বর্জন করতে বাধ্য। আর এটি পাঁচভাবে হয়ে থাকে: (২)
১- হারাম আচরণসমূহ:
আর তা হল ঐ সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ যা থেকে শরীয়ত প্রণেতা হারামের দৃষ্টিকোণ থেকে নিষেধ করেছেন। যেমন: কথায় বা কাজে মাতাপিতার অবাধ্যাচরণ অথবা মিথ্যা বলা, অন্যায় করা এবং জুলুম করা।
এর অন্তর্ভুক্ত হবে প্রজ্ঞাবান শরীয়ত প্রণেতার নির্দেশের বিপরীত কর্ম সম্পাদন করা এবং ওয়াজীবের ভঙ্গিতে শরীয়ত প্রণেতা যা করতে নির্দেশ দিয়েছে তা সম্পাদন না করা।
২- মাকরূহ আচরণসমূহ:
সে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ যা থেকে শরীয়ত প্রণেতা মাকরূহ তথা অপছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে নিষেধ করেছেন। আর তা বর্জন করা সম্পাদন করার চেয়ে উত্তম। এ পরিভাষাটি কখনো বারণকৃত বিষয়ে এবং অপছন্দনীয় বিষয়ের উপর প্রয়োগ হয়ে থাকে। ফলে এটি সম্পাদন করার সাথে শাস্তি সম্পর্কযুক্ত নয়।(১) যেমনঃ বাম হাতে গ্রহণ করা এবং বাম হাত দিয়ে কোন কিছু প্রদান করা。
৩- ওয়াজীব আচরণসমূহ:
যে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ এর বিষয়ে শরীয়ত প্রণেতা ওয়াজীবের দৃষ্টিকোণ থেকে পালনের আদেশ করেছেন। যেমনঃ মাতাপিতার সাথে সদাচার, সত্য কথা বলা, ওয়াজীব বিধান পালনে ধৈর্য ধারণ করা, আমানত বুঝিয়ে দেয়া এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।
৪- মুস্তাহাব আচরণসমূহ:
যে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ এর বিষয়ে শরীয়ত প্রণেতা মুস্তাহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে তা পরিত্যাগ করার কারণে কোন শাস্তি নেই; তবে তা পালন করলে সওয়াব রয়েছে। যেমনঃ ডান হাত দ্বারা কোন কিছু গ্রহণ করা।
৫- মুবাহ আচরণসমূহ:
যে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ এর সাথে কোন আদেশ ও নিষেধের সম্পর্ক নেই। যেমন: মেহমানদের সামনে খাবার পরিবেশনের পদ্ধতি এবং পেশকৃত খাবারের প্রকার।
সুতরাং যদি মুবাহ কর্মের সাথে হারাম অথবা মাকরূহ যুক্ত হয়ে যায় তখন তার বিধান সে অনুযায়ী হবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় যে মেহমানদারির পদ্ধতির সাথে হারাম বা মাকরূহ বিষয় যুক্ত হওয়া; যেমনঃ অপচয়। অথবা মুবাহ কর্মের সাথে ওয়াজীব বা মুস্তাহাব বিষয় যুক্ত হলে তখন তার বিধান তদানুসারে হবে। যেমনঃ রাস্তায় বসলে চোখ অবনত রাখা, কষ্ট না দেয়া এবং সালামের জওয়াব দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত: উরফ বা প্রথাগত নীতিমালা:
উরফ বা প্রথাগত নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষ যে সকল মুবাহ বিষয় সম্পাদন বা পরিহারে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, পরিহার বা সম্পাদনের মাধ্যমে তাদের প্রথার বিরোধীতাকে সমাজের স্বীকৃত আদব এর লঙ্ঘন হিসেবে দেখে।
উরফ বা প্রথার মূল শরীয়তে স্বীকৃত। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে: (মুসলিমগণ যেটাকে ভালো মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট ভালো। আর তারা যেটাকে মন্দ মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট মন্দ।) (১)
অভ্যাস ও প্রথার গুরুত্ব হল এই যে, ইসলামী ফিকহে অনেক মাসয়ালা এর উপর নির্ভর করে। তন্মধ্যে কিছু আচরণগত দিকের সাথে সম্পৃক্ত; যেমন: কারিগরদের কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক রীতি, মৌখিক সম্মতি ছাড়াই মেহমানের জন্য পেশকৃত খাবার থেকে খাওয়া, প্রতিযোগিতা ও কুস্তিতে এবং পতিত ফল গ্রহণের ক্ষেত্রে পালনীয় রীতি। আর ব্যক্তি মালিকানাধীন নালা ও খাল থেকে নিজে পানি পান ও পশুকে পান করানোর ক্ষেত্রে মৌখিক অনুমতি বিবেচ্য বিষয়।(২)
অনুরূপভাবে মানুষেরা পারস্পরিক যে রীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে পরিচিত ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে সাক্ষাতে সালাম বিনিময়ের পর স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া এবং অবস্থা বিবেচনায় বাসায় নিমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে প্রতিবেশী ও মেহমানের সম্মানার্থে এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর মেহমানকে আমন্ত্রণ করা অথবা গাড়ি ড্রাইভিং এর অনাবশ্যক এমন বিশেষ আদব যা পরিহারে কোন ক্ষতি নেই।
সামাজিক আদব ক্ষেত্র অনুযায়ী হয়ে থাকে, এজন্য আমরা বিভিন্ন রীতি প্রত্যক্ষ করে থাকি; যেমন: আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, বাণিজ্যিক রীতিনীতি, প্রশাসনিক রীতি, কর্মচারী নীতি এবং পারিবারিক রীতি। এ সকল নানাবিধ রীতিনীতি সরকার আরোপ করেনি বরং বাস্তবে চর্চার মাধ্যমে সে নিজেই আরোপ করেছে। (৩)
সামাজিক প্রথা শর্তহীনভাবে আবশ্যিক স্বভাব-চরিত্র নয় বরং তার জন্য শর্ত রয়েছে। নতুবা সামাজিক প্রথার ছদ্মাবরণে ইসলামী শিষ্টাচারের মাঝে তার সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় অনুপ্রবেশ করবে। নিম্নে উরফ বা সামাজিক প্রথার শর্তসমূহ সংক্ষেপে পেশ করা হল:(৪) ১- অভ্যাস এবং প্রথাটি বহুলপ্রচলিত হওয়া। ২- আচরণের ক্ষেত্রে যে প্রথাটি মধ্যস্থতাকারী হবে তা অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। অর্থাৎ প্রথাটি আচরণের সময়ের পূর্বেই যেন ঘটে, তারপর তার সময়ের সাথে চলতে থাকে এবং তার সাথে তুলনা করা হয়। চাই আচরণটি মৌখিক বা কর্মগত হোক। ৩- উরফ বা প্রথা যেন প্রমাণিত দলীল বা শরীয়ার অকাট্য মূলনীতির বিপরীত না হয়। অর্থাৎ সেটি যেন শরয়ী দলীল এবং ফিকহী ইজমার বিপরীত না হয়। ৪- উরফ বা প্রথাকে বিবেচনা করা হবে না এবং সেটি দলীল হিসেবে গৃহিত হবে না যদি সেটি মানুষের অভ্যস্ততার বা জানাশোনার বিপরীত হয়।
স্থায়ী ও পরবর্তনশীল অভ্যাস:
অভ্যাস স্থায়িত্ব ও পরবর্তনশীলতার দিক থেকে দু'ভাগে বিভক্ত: (১)
১- স্থায়ী অভ্যাস:
স্থায়ী অভ্যাস বলেতে বুঝায় যে সকল অভ্যাস অপরিবর্তনীয়। যেমন খাদ্য, পানীয়, মর্যাদা, দেখা, কথা বলা, বলপ্রয়োগ এবং হাঁটার আসক্তির উপস্থিতি। সুতরাং এটা যদি এমন কার্যসম্পাদনের কারণ হয় যে বিষয়ে শরীয়ত প্রণেতা ফায়সালা দিয়েছেন; তাহলে তা বিবেচনা করতে, তার উপর নির্ভর করতে এবং সে অনুযায়ী ফায়সালা করতে কোন সমস্যা নেই। যেমন: মহান শরীয়ত প্রণেতা উদ্ধতভাবে চলাচল করতে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورِ﴿ অর্থ: [যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।](২)
২-পরিবর্তনশীল অভ্যাস:
পরিবর্তনশীল অভ্যাসের কতগুলো ভালো থেকে মন্দের দিকে পরিবর্তিত হয় আর কতগুলো মন্দ থেকে ভালোর দিকে পরিবর্তিত হয়। আর মন্দ সবসময় পরিতাজ্য; কেননা এটি সত্য শরীয়া ও সুস্থ মস্তিষ্কের সাথে সাংঘর্ষিক।
আরেক দিক থেকে, একটি অভ্যাস কখনো কোন সম্প্রদায়ে নিকট উত্তম চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে আবার ভিন্ন সম্প্রদায়ের নিকট তা নাও হতে পারে। ইমাম শাতেবী রহিঃ বলেন: “যেমন মাথা খোলা রাখা। এটির বিধান দেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। পূবের দেশগুলোতে মাথা উন্মুক্ত রাখা ব্যক্তিত্বসম্পন্নদের জন্য মন্দ বিষয়। তবে মাগরেবী অঞ্চলের দেশগুলোতে মন্দ বিষয় নয়। কাজেই মাথা উন্মুক্ত রাখা পুবের দেশগুলোর বাসিন্দাদের নিকট ব্যক্তির আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কিন্তু মাগরেবী অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিকট এটি প্রশ্নবিদ্ধকারী নয়”। (৩)
আবার কখনো অভ্যাসের ভালো মন্দ যুগ অনুযায়ী পরিবর্তন হয়ে থাকে। সুতরাং বর্তমানে অধিকাংশ আরব উপদ্বীপের পছন্দনীয় পোশাক – জুব্বা ও গুতরা- এবং তার অধিবাসীদের মধ্য হতে কারো পক্ষ থেকে উক্ত পোশাকের বিপরীত পোশাক পরিধান করা তাদের নিকট অপছন্দনীয়। কখনো এরূপ আচরণকে নিজস্ব অভ্যাস-সংস্কৃতির বিপরীত ভিন্ন পোশাক পরিধানকারীর আদলতের ক্ষেত্রে মন্দ দিক বিবেচনা করা হয়।
তৃতীয়ত: মনস্তাত্ত্বিক নীতিমালা:
এটি হল, যে বিষয়ে কোন দলীল বর্ণিত হয়নি এমন বিষয়ে ব্যক্তির মৌখিক ও কর্মগত আচরণ গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি। রাসূল সাঃ বলেছেন: (পূণ্য হল উত্তম চরিত্র। আর পাপ হল যা তোমার অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ কর।) (৪) ওয়াবিসা বিন মা'বাদ রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (আমি রাসূল সাঃ এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন: তুমি আমাকে পূণ্য ও পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমার অন্তরকে জিজ্ঞাসা কর। তোমার নফস যে বিষয়ে প্রশান্তি লাভ করে, তোমার হৃদয় যে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়; তা-ই হল পূণ্য। আর তোমার মন যে বিষয়ে চিন্তিত হয়, তোমার অন্তরে যা দ্বিধা সঞ্চার করে; তা-ই হল পাপ। লোকেরা যদি তোমাকে কোন সিদ্ধান্ত দেয়, তবে তুমি তা গ্রহণ করবে।) (১)
এ দু'টি হাদিসে এমন বিষয় রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদেরকে সত্যের প্রতি ভালোবাসা, তার প্রতি প্রশান্তি ও তা গ্রহণ করে নেয়ার সহজাত বৈশিষ্ট্যের উপর সৃষ্টি করেছেন এবং সত্যের প্রতি ভালোবাসা ও অসত্যকে ঘৃণা করা বান্দাদের স্বভাব-চরিত্রে গেঁথে দিয়েছেন। (২) রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে।) (৩) রাসূল সাঃ হাদিসে কুদসীতে তার রবের থেকে বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ বলেন: (আমি আমার সমস্ত বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দেয়।) (৪)
ইবনে তাইমিয়া রহিঃ বলেন: “অতএব জানা গেল যে, মানুষের ফিতরাতে এমন শক্তি রয়েছে যা সত্যে বিশ্বাস এবং উপকারী ইচ্ছার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে”। (৫) তিনি আরো বলেন: “অন্তরে এমন কিছু রয়েছে যা বিশ্বাস ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে বাতিলের উপর হকের অগ্রাধিকারকে অবধারিত করে। আর এটিই যথেষ্ট যে, অন্তর ফিতরাতের উপর সৃষ্ট”। (৬) সুতরাং মুমিন ব্যক্তি বুদ্ধিমান এবং সচেতন; সে তার নিষ্কলুষ ফিতরাত ও সঠিক গড়ে উঠার মাধ্যমে বুঝতে পারে যা একজন ফাসেক ব্যক্তি পারে না। “হক ও বাতিল দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মুমিনের নিকট সংশয়পূর্ণ হয় না; বরং সে তার নিকট অবস্থিত নূরের সাহায্যে হককে চিনতে পারে এবং তার হৃদয় তা গ্রহণ করে নেয়। আর সে বাতিল থেকে পালিয়ে যায় এবং তা সে চিনতে পারে না”। (৭)
আর মুমিন ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় যে সব বিষয়ের সম্মুখীন হয় তা নিম্নোক্ত রূপে হয়ে থাকে: যে বিষয়ে শরয়ী দলীল বা ইজমা রয়েছে; সে ক্ষেত্রে মুমিন ব্যক্তির করণীয় হল আল্লাহর আনুগত্য করা। মহান আল্লাহ বলেন: -
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا অর্থ: [আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।] (৮) সুতরাং তার জন্য করণীয় হল প্রশস্ত ও সন্তুষ্ট চিত্তে তা মেনে নেয়া。
আর যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ থেকে কোন দলীল নেই এবং অনুসরণীয় সাহাবী ও উম্মতের পূর্বসূরীদের থেকে কোন বক্তব্য নেই; এমন বিষয়ে কোন সন্দেহ-সংশয় যদি ঈমানে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী, জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোয় উন্মুক্ত বক্ষসম্পন্ন মুমিনের অন্তরে প্রবেশ করে এবং কোন সংশয়ের প্রেক্ষিতে তার হৃদয়ে যদি দ্বিধা সঞ্চারিত হয়; আর এমতাবস্থায় সে যদি ছাড়ের বিষয়ে রায়পন্থী, জ্ঞান ও দ্বীনদারিতায় অননির্ভরযোগ্য এবং প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তি ব্যতীত ফাতওয়া নেয়ার জন্য কাউকে না পায় -তাহলে সে তার হৃদয়ে সঞ্চারিত দ্বিধার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দ্বিধান্বিত বিষয় পরিহার করবে। যদিও ঐ সকল মুফতিগণ বৈধতার ফাতওয়া দেয়। এমন বিষয়ে ইমাম আহমদ রহিঃ বক্তব্য রয়েছে।(১)
এমন পরিস্থিতিতে মুমিন ব্যক্তি তার হৃদয়ের দ্বিধার দিকে দৃষ্টি দিবে। হৃদয়ের যে কোন ধরণের সংকোচ থাকে ও তার প্রতি হৃদয় যদি প্রফুল্ল না থাকে এবং হৃদয়ে যদি উক্ত সংকোচ কেন্দ্রিক সন্দেহ ও পাপের ভয় সৃষ্টি হয়; তাহলে সংকোচিত ও দ্বিধান্বিত বিষয় পরিহার করবে। আর এই পরিহার করাটি কোন শরয়ী দলীলের প্রেক্ষিতে নয় তবে তা দ্বিধা, হৃদয়ে সন্দেহ এবং পাপের ভয়ের কারণে। সুতরাং একজন মুসলিমের আচরণের জন্য এটি একটি চারিত্রিক মূলনীতি।
ইমাম ইবনু রজব রহিঃ বলেন: “ওয়াবিসার হাদিস এবং তার সমার্থক হাদিস প্রমাণ করছে যে, সন্দেহ-সংশয়ের ক্ষেত্রে হৃদয় যে দিকে স্বস্তি অনুভব করে তাই সৎকর্ম ও হালাল। আর এর বিপরীত হল পাপ”।(২)
আর এটি সূফীদের ওয়াসওয়াসা ও হৃদয়ের চিন্তা নয়; তথা এ বিষয়ে তাদের কথা শরয়ী দলীল নির্ভর নয়। বরং তা শুধুমাত্র তাদের মতামত ও অভিরুচী। পক্ষান্তরে সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে হৃদয়ের দিকে প্রত্যবর্তন করা নববী দলীল ও সাহাবীদের ফাতওয়া দ্বারা প্রমাণিত। (৩)
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। আর তা হল, হৃদয়ে যা নিয়ে দ্বিধার সঞ্চার হয় তা মানুষ জেনে যাওয়াকে অপছন্দ করা; যদি সে দ্বিধাকে কথা বা কাজে প্রকাশ করা হয়। কেননা মুসলিমগণ মন্দকে ভালো মনে করা বা ভালোকে মন্দ করার বিষয়ে একমত হয় না। ইবনু মাসউদ রাঃ বলেন: (মুমিনেরা যেটাকে ভালো মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট ভালো। আর তারা যেটাকে মন্দ মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট মন্দ।) (৪) এটি আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক মূলনীতি। এ প্রেক্ষিতে বল যায় যে, মনস্তাত্ত্বিক মূলনীতি দু'টি বিষয়ে সীমাবদ্ধ:
১- হৃদয়ে দ্বিধার সঞ্চার হওয়া এবং অন্তর তার প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া ও ঐ বিষয়ে সন্দেহ এবং পাপের ভয় সৃষ্টি হওয়া।
২- মানুষেরা বিষয়টি জেনে যাক; ভয় ও লজ্জাবশত এটি অপছন্দ করা।
টিকাঃ
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৭/৩৪০)।
(২) দেখুন: আল-জুয়াইনী, আল-ওরাকাত (পৃ: ৮), আল-ফাতুহী, আল-কাওকাবুল মুনীর (১০৫-১৩৪), মুহাম্মাদ আশ-শানক্বিতী, মুযাক্কেরাতু উসূলুল ফিকহ (পৃ: ২৫)।
(১) মুহাম্মাদ আশ-শানক্বিতী, মুযাক্কেরাতু উসূলুল ফিকহ (পৃ: ২৫)।
(১) মুসনাদে আহমাদ (১/৩৭৯)।
(২) সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের (পৃ: ৯০)।
(৩) আব্দুর রহমান আল-কাসেম, নাযরিয়্যাতুল উরফ (পৃ: ১৭)।
(৪) প্রাগুক্ত (পৃ: ৩৮৩৯)।
(১) আশ-শাতেবী, আল-মুয়াফাকাত (২/১৯৮)।
(২) সূরা লুকমান: (১৮)।
(৩) আশ-শাতেবী, আল-মুয়াফাকাত (২/১৯৮)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৮0, হা: ১৪-২৫৫৩)।
(১) মুসনাদে আহমাদ (৪/২৮৮), সুনানে দারেমী (২/২৪৫-২৪৬), মুসনাদে আবু ইয়ালা (১৫৮৬), মুজামুল কাবীর; তাবারানী (২২/৪০৩)।
(২) দেখুন: ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম।
(৩) সহীহ বুখারী (১/৪২৪, হা: ৪/২০৪৭), সহীহ মুসলিম (৪/২০৪৭, হা: ২২-২৬৫৮)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৪/২১৯৭, হা: ১৩-২৮৬৫)।
(৫) দারউ তাআরুদিল আকলি ওয়ান নাক্বলি।
(৬) প্রাগুক্ত।
(৭) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম।
(৮) সূরা আল-আহযাব: (৩৬)।
(১) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ২৪০)।
(২) প্রাগুক্ত (পৃ: ২৪০)।
(৩) প্রাগুক্ত (পৃ: ২৪১)।
(৪) মুসনাদে আহমাদ (৪/২৮৮), মুজামুল কাবীর; তাবারানী (২২/৪০৩), আল-হাইছামী মাজমাউজ জাওয়য়েদ গ্রন্থে (১/১৭৭-১৭৮) বলেছেন: ইমাম আহমাদ, বাযযার, তাবারানী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং হাদিসের রাবীগণ ছিকাহ। ইমাম হাকেম মুস্তাদরাকে বলেছেন: হাদিসটির সনদ সহীহ তবে বুখারী ও মুসলিম তাদের গ্রন্থে সংকলন করেন নি। ইমাম যাহাবী তালখীল গ্রন্থে (৩/৭৮-৭৯) উক্ত মতের সাথে সম্মতি প্রকাশ করেছেন।
📄 স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখা
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার সংজ্ঞা:
আরবি (১) অর্থ হল: দু'টি বস্তুর মাঝের সেই প্রতিবন্ধক যা একটিকে অপরটির সাথে মিশে যেতে বাধা দেয়। আর কোন বিষয়ের সংজ্ঞা হল: সে বৈশিষ্ট্য যা তার সমার্থক বিষয়কে ধারণ করে এবং অন্যদের থেকে তাকে পৃথক করে।(১)
আখলাকের সংজ্ঞা হল: যে বৈশিষ্ট্য চারিত্রিক কর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ভাল-মন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। যেমন: বীরত্ব; এটি একটি উন্নত চারিত্রিক গুণ। এ গুণের অধিকারী ব্যক্তি যদি বীরত্বের বৃত্তের বাইরে গিয়ে উচ্চতার দিকে থেকে তার সীমা অতিক্রম করে; তাহলে এ আচরণকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর যদি বীরত্বের সীমা থেকে নিচে চলে যায়, আত্মগোপন করে এবং করণীয় দায়িত্ব থেকে সরে পড়ে; তাহলে এটিকে কাপুরুষত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
বীরত্ব প্রদর্শনে সীমা অতিক্রমের বৈশিষ্ট্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে বিবেচনা করা হয়। বিপরীতে বীরত্ব প্রদর্শনে অবহেলার বৈশিষ্ট্যকে কাপুরুষতা হিসেবে গণ্য করা হয়। আর যদি বীরত্বের বৈশিষ্ট্যের সীমার মাঝে থাকা হয় তাহলে তাকে বীরত্ব হিসেবে নামকরণ করা হয়। এ নিয়মের উপরে বীরত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ অন্যান্য গুণাবলীকে অনুমান করতে হবে।
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার গুরুত্ব:
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার গুরুত্ব দু'টি দিক থেকে প্রতিভাত হয়; যথা: স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার স্বয়ং একটি জ্ঞান এবং এ সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞান লাভের গুরুত্ব। নিম্নে বিষয়টির স্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হল:
জ্ঞানগুলোর মধ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জ্ঞানটি ভালভাবে অনুধাবন করা উচিৎ তা হল আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত আল্লাহর শরীয়তের সীমারেখার শুরু ও শেষ সম্পর্কিত জ্ঞান; যেন তা কেউ অতিক্রম না করে এবং তা পালনে ত্রুটি না করে। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর শরীয়তের সীমারেখা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করছেন এবং অন্যত্র সীমার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا وَمَن ﴾يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُوْلَتَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ অর্থ: [এ সব আল্লাহর সীমারেখা সুতরাং তোমরা এর লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমারেখা লংঘন করে তারাই যালিম।(১) তিনি আরো বলেন : تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا অর্থ: [এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ে না।](২)
এক আয়াতে তিনি সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন আর অন্যত্র তিনি সীমার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। আর তা এ জন্য যে, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা হল হালাল ও হারামের মাঝে পৃথককারী শেষ সীমা। কোন জিনিসের শেষ সীমা কখনো তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে তার হুকুম ধারণ করে। আবার কখনো কোন জিনিসের শেষ সীমা তার অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণে তার বিপরীত জিনিসের হুকুম ধারণ করে। প্রথম অবস্থার বিবেচনায় সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় দিক বিবেচনায় সীমার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করা হয়েছে।(৩)
স্বভাব-চরিত্র হল মানুষের অভ্যন্তরীণ চিত্র এবং সে যে তাকওয়া, ঈমান, ভীতি, দুর্বলতা ও অজ্ঞতা ধারণ করে তার প্রকৃত প্রকাশ। স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান লাভ করা উচিৎ; যেন সে তাতে অবহেলা না করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে বিপরীতে চলে না যায়।
জ্ঞানগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে উপকারী জ্ঞান হল সীমারেখা সম্পর্কিত জ্ঞান। বিশেষত শরীয়তের আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত বিধিবিধানের জ্ঞান। সুতরাং মানুষের মাঝে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি যে সীমারেখা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানে; যেন সে তাতে এমন কিছুকে অন্তর্ভুক্ত না করে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এমন কিছুকে তার থেকে বাদ না দেয় যা তার অন্তর্ভুক্ত। কাজেই সবচেয়ে মধ্যপন্থী হল সে ব্যক্তি, যে ব্যক্তি স্বভাব-চরিত্র এবং শরয়ী বিধিবিধানের সীমারেখা মেনে চলে জ্ঞানগত ও কর্মগত দিক দিয়ে।(৪)
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার প্রকারভেদ:
১- সাধারণ সীমারেখা:
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সে সকল সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও নীতিমালা যেগুলো প্রয়োগ করা সম্ভব এবং যে গুলোর উপর সকল মৌখিক ও কর্মর্গত আখলাক পরিমাপ করা যায়। অর্থাৎ, সাধারণ সীমারেখা হল এমন সামগ্রিক নীতিমালা যা উত্তম চরিত্র ও মন্দ চরিত্রের সীমা নির্ধারণ করে। আর এটি চারটি কায়দা বা মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত:
প্রথম মূলনীতি:
উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না যা তার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার উপর উত্তম চরিত্রের বিধান আরোপ করা হবে না। যেমন: চাটুকারিতাকে সৌজন্যমূলক আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা এ যুক্তিতে যে, এটা পারস্পরিক আচরণের অন্যতম একটি উত্তম গুণ। অথচ মুদাহানা তথা চাটুকারিতার ব্যাখ্যায় বিদ্বানগণ বলেন: চাটুকারিতা হল ফাসেক ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং তার কর্মের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ; তাকে কোন ধরণের নিষেধ করা ছাড়াই।(১)
দ্বিতীয় মূলনীতি:
উত্তম চরিত্রের মধ্য থেকে তার কোন একককে বাদ দেয়া যাবে না এবং তার মূল বিধান বাতিল করে বিপরীতধর্মী বিধান দেয়া যাবে না। যেমন: লজ্জাশীলতার মধ্য হতে তার কিছু প্রকারকে বাদ দেয়া। উদাহরণত: অপরিচিত পুরুষের সাথে নারীর মুসাফাহা করা এবং বলা যে, এটি লজ্জাশীলতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এটি উত্তম চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এ উদাহরণে লজ্জাশীলতার কিছু প্রকারকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং তার মূল নিষিদ্ধের বিধানকে বাতিল করে তাকে বৈধতার বিধান দেয়া হয়েছে।
তৃতীয় মূলনীতি:
মন্দ চরিত্রের মাঝে এমন কিছু প্রবেশ করান যাবে না যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়; অতঃপর তার উপর মন্দ চরিত্রের বিধান আরোপ করা হবে। যেমন: সৌজন্যমূলক আচরণকে মন্দ আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা এবং এ আচরণকারীকে চাটুকার বলা।
অথচ সৌজন্যমূলক আচরণ মুমিনদের চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। আর তা হল মানুষের সামনে বিনয়ের প্রকাশ, নম্র ভাষায় কথা বলা এবং কর্কশ ভাষা পরিহার করা। কেননা এগুলো মিল-মহাব্বতের শক্তিশালী মাধ্যম। আর সৌজন্যমূলক বা কোমল আচরণের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে; যেমন: শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে জাহেল ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধের ক্ষেত্রে ফাসেকের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করা এবং কঠোরতা পরিহার করা; যাতে সে তার অবস্থার উপর অবিচল না থাকে। তাকে নম্র ভাষায় নিষেধ করা বিশেষত যখন তার মিল-মহাব্বত কামনা করা হয়, ইত্যাদি।(২)
চতুর্থত মূলনীতি:
মন্দ চরিত্রের মধ্য থেকে তার কোন একককে বাদ দেয়া যাবে না এবং তার মূল বিধান বাতিল করে বিপরীতধর্মী বিধান আরোপ করা যাবে না। যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে মন্দ চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত গণ্য না করা। অতঃপর এটির অবৈধ হওয়ার বিধানকে বৈধতার বিধান দিয়ে পরিবর্তন করা এবং এটিকে চারিত্রিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা।
২- বিশেষ সীমারেখা:
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল প্রতিটি চরিত্র বা গুণের জন্য স্বতন্ত্র নীতিমালা। অর্থাৎ এটি বিশেষ নীতিমালার সমষ্টি যা চারিত্রিক গুণাবলীর সকল এককের পরিধি নিয়ন্ত্রণ করে।
যেমন প্রতিটি চারিত্রিক গুণাবলীর নির্দিষ্ট পরিধি রয়েছে, যখন কোন ব্যক্তি তা অতিক্রম করে বা তাতে ত্রুটি করে; তখন সে তা পালনে ব্যর্থ হয়। আর যেহেতু চারিত্রিক গুণাবলী অসংখ্য তাই তার কিছু উদাহরণ পেশ করা যায় এবং সেগুলোর উপর অন্যগুলো অনুমান করা যায়।
ইবনুল কায়্যিম রহিঃ কিছু চারিত্রিক গুণাবলীর প্রতি ইশারা করেছেন; আর তা হল:(১)
ক্রোধ: আর তার সীমা হল প্রশংসনীয় বীরত্ব এবং মন্দ চরিত্র ও ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিহার করা। এখন যদি কেউ এর সীমা অতিক্রম করে তাহলে সে সীমালঙ্ঘন করল, আর যদি কেউ এতে ত্রুটি করে তাহলে কাপুরুষতা করল এবং মন্দ চরিত্র পরিহার করল না।
লালসা: লালসার সীমা হল পার্থিব বিষয়ে পর্যাপ্ততা এবং যথেষ্টতা অর্জন করা। যখন তা থেকে কম হয় তখন তা অপমান হিসেবে গণ্য হয় আর যখন তার থেকে বেশি হয় তখন তা লোলুপতা ও অপ্রশংসনীয় বিষয়ে আগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঈর্ষা বা হিংসা: হিংসার সীমা হল পরিপূর্ণতা অর্জনে প্রতিযোগিতা করা এবং তার সমকক্ষ ব্যক্তি তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা। তাই যখন সে এটা অতিক্রম করে তখন সে সীমালঙ্ঘন ও জুলুম করে, নেয়ামতপ্রাপ্তের থেকে নেয়ামত বিলুপ্তির কামনা করে এবং তাকে কষ্ট দিতে উদগ্রীব থাকে। আর যখন তা থেকে কমে যায় তখন এটি দুর্বল হিম্মত ও মনের ক্ষুদ্রতা বলে বিবেচিত হয়।
কামনা-বাসনা: কামনার সীমা হল ইবাদতের পরিশ্রম থেকে মন-মস্তিষ্ককে স্বস্তি প্রদান, উত্তম গুণাবলী অর্জন এবং সেগুলো পূরণ করার মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা। যখন এটি সীমা অতিক্রম করে তখন কামাসক্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং এর অধিকারী ব্যক্তি জানোয়ারের পর্যায়ে নেমে যায়। আর যখন এটি হ্রাস পায় এবং পূর্ণতা ও মর্যাদা অন্বেষণে অবসর পায় না তখন তা দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অপমান হিসেবে বিবেচিত হয়。
বিশ্রাম: বিশ্রামের সীমা হল ইবাদতের প্রস্তুতি ও সৎগুণ অর্জনের লক্ষ্যে অন্তর ও সঞ্চিত শক্তিকে বিশ্রাম দেয়া। যখন এটি সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন ধীরতা, অলসতা ও সময়ের অপচয় বলে গণ্য হয়। আর যখন এটি হ্রাস পায় তখন সঞ্চিত শক্তির জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়।
দানশীলতা: দু'দিক থেকে দানশীলতার সীমা রয়েছে। যখন তার সীমা অতিক্রম করা হয় তখন তা অপচয় বলে বিবেচিত হয় আর যখন তার থেকে হ্রাস পায় তখন কৃপণতা ও অবহেলা বলে গণ্য হয়।
বীরত্ব: বীরত্বের সীমা অতিক্রম করাকে পাগলামি গণ্য করা হয় আর তার সীমা থেকে কমে গেলে কাপুরুষতা ও দুর্বলতা বলে বিবেচনা করা হয়। আর বীরত্বের সীমা হল অগ্রসর হওয়ার জায়গায় অগ্রসর হওয়া এবং পেছানোর জায়গায় পিছিয়ে আসা।
গায়রত বা আত্মসম্মানবোধ: যখন গায়রতের সীমা অতিক্রম করা হয় তখন তা অপবাদ ও নির্দোষের প্রতি কু-ধারণা বলে গণ্য হয়। আর যখন তা থেকে হ্রাস পায় তখন এটাকে উদাসীনতা এবং অবাধা মেলামেশার সুযোগ করে দেয়া বলে বিবেচিত হয়।
বিনয়: বিনয়ের সীমা যখন অতিক্রম করা হয় তখন সেটি অপদস্থতা ও অপমান হিসেবে গণ্য হয়। আর যে তা পালনে ত্রুটি করে সে অহঙ্কার ও গর্বের দিকে ধাবিত হয়।
সম্মান-মর্যাদা: যখন এর সীমা অতিক্রম করা হয় তখন তা অহঙ্কার ও মন্দ চরিত্র হিসেবে গণ্য হয় আর যখন হ্রাস পায় তখন অপমান হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইবনু হাযম রহিঃ কিছু উত্তম গুণাবলীর সীমা উল্লেখ করেছেন; তন্মধ্যে:(১)
সচ্চরিত্রতা বা পবিত্রতা: এর সীমা হল চোখ অবনত রাখা এবং সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে হারাম বস্তু থেকে দূরে রাখা। সুতরাং এটি অতিক্রম করা ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার শামিল। আর আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হালালকৃত বস্তু থেকে বিরত থাকা দুর্বলতা ও অপারগতা হিসেবে গণ্য।
ইনসাফ: এর সীমা হল নিজের পক্ষ থেকে অধিকার প্রদান করা এবং নিজেরটা গ্রহণ করা। পক্ষান্তরে জুলুমের সীমা হল নিজেরটা গ্রহণ করে পরের অধিকার না দেয়া। আর মহানুভবতার সীমা হল অনুগত হয়ে নিজের পক্ষ থেকে অন্যের অধিকার প্রদান করা এবং সক্ষম অবস্থায় অন্যের কাছে থাকা নিজের অধিকার ছেড়ে দেয়া।
টিকাঃ
(১) রাগেব ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত (পূ: ১০৯)।
(১) সূরা আল-বাকারা: (২২৯)।
(২) সূরা আল-বাকারা: (১৮৭)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মুহাজের (পৃ: ৩৭)।
(৪) ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ (পৃ: ১৫৮)।
(১) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৫২৮)।
(২) প্রাগুক্ত (১০/৫২৮-৫২৯)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ (পৃ: ১৫৬-১৫৮)।
(১) ইবনে হাযম, আল-আখলাক ওয়াস সীরাহ (পৃ: ৩১-৩২)।
📄 চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি
চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে বুনিয়াদের উপর মানুষের প্রশংসনীয় আচরণ গড়ে ওঠে। আর মূলনীতি ধারণ করে বদান্যতা, নিবৃত থাকা এবং সহনশীলতাকে। যেমন এর পরিচয় দিয়েছেন হাসান আল-বসরী রহিঃ নিম্নোক্ত ভাষায়: চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি হল চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা, উত্তম জিনিস দান করা এবং কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা।(১) ইবনুল কায়্যিম রহিঃ বলেন: তা হল বদান্যতা প্রদর্শন করা, কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা এবং কষ্ট সহ্য করা।(২)
সুতরাং মানুষের আচরণ অন্যের প্রতি দানশীলতার মাধ্যমে হবে; আর এটিই হল বদান্যতা, তাদের থেকে যে দোষ-ত্রুটি প্রকাশ পায় তা সহ্য করা; আর এটিই হল সহনশীলতা এবং তাদের ক্ষতি করা থেকে নিজেকে নিবৃত করা; আর এটিই হল কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। এগুলোই হল উত্তম চরিত্রের মূলনীতি; এর বর্ণনা নিম্নে প্রদত্ত হল:
প্রথমত: বদান্যতা প্রদর্শন করা।
বদান্যতা প্রদর্শন অর্থ হল দান করা এবং মহানুভবতা প্রদর্শন করা। বদান্যতা প্রদর্শন দুইভাবে হতে পারে, তা হল, দাবী প্রত্যাহার করা ও দান করার মাধ্যমে।
১- দাবী প্রত্যাহার দুই প্রকার:
ক. অন্যের কাছে থাকা নিজের অধিকারের সম্পূর্ণ বা অধিকাংশ অথবা কিছু অংশ মাফ করে দেয়া। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: (পূর্বযুগে এক ব্যক্তি মানুষদের ঋণ দিত এবং তার চাকরকে বলত যে, যখন তুমি কোন পরিশোধে অসমর্থ ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির কাছে যাবে তাকে ক্ষমা করে দেবে। হয়ত এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করলে-মারা গেলে- আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।)(৩) আর এটি হল অন্যের কাছে থাকা নিজের অধিকার ক্ষমা করে দেয়ার দৃষ্টান্ত।
খ. মানুষের হাতে থাকা সম্পদকে উপেক্ষা করা। অর্থাৎ মানুষের হাতে থাকা সম্পদ চাওয়া থেকে বিরত থাকা এবং নিজের কাছে যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা। আর এটি উদারতার চেয়ে উত্তম। যেমনটি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিঃ বলেছেন: মানুষের নিকট যে সম্পদ আছে তার প্রতি অমুখাপেক্ষিতা দানশীলতার চেয়ে উত্তম।(৪)
তবে এটি শর্তসাপেক্ষ। সুতরাং মানুষের সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা যদি দ্বীন, শরীর অথবা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয় তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করাটাই উত্তম। যেমন: দরিদ্র অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজন এমন ব্যক্তির যে তাকে ওষুধ সংগ্রহে সহায়তা করবে। চিকিৎসার অভাবে যদি তার মৃত্যু বরণের আশঙ্কা তৈরি হয় তাহলে অন্যের সহায়তা গ্রহণ করা তার জন্য ওয়াজীব। অনুরূপভাবে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির জন্য এমন ব্যক্তির প্রয়োজন যে তাকে জীবন বাঁচাতে খাবার দিয়ে সহায়তা করবে। যদি খাবার না চাওয়ার কারণে তার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে অন্যের সহায়তা গ্রহণ করা একান্ত কর্তব্য। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴾وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴿ অর্থ: [নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না।] (১)
২- দানশীলতা: আর তা হল ব্যয়ের মাধ্যমে দানশীলতা। এ প্রকারের উৎস হল:
ক. জীবন।
খ. সম্পদ।
গ. মর্যাদা-খ্যাতি।
ঙ. ইলম বা জ্ঞান।
এর বিশদ বিবরণ নিম্নরূপ:
জীবন বা আত্মদান হল: জিহাদ, মুসলমানদের সম্মান-সম্ভ্রম রক্ষা এবং ডুবন্ত বা অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিকে উদ্ধার করার ন্যায় অগ্রাধিকারযোগ্য স্বার্থে মানুষ তার জীবনকে ঝুঁকির মাঝে ফেলে উৎসর্গ করে দেয়া। আর এটি হল সর্বোচ্চ পর্যায়ের বদান্যতা।
সে আত্মত্যাগ করে যখন কৃপণ তা আঁকড়ে থাকে………আর আত্মত্যাগই হল সর্বোচ্চ ত্যাগ।
আত্মোৎসর্গের উদাহরণ হল: হানযালা বিন আবু আমের রাঃ এর শহীদ হওয়ার ঘটনা; যিনি ওহুদের যুদ্ধে নিজের জীবনকে দান করেছিলেন। ওহুদ যুদ্ধের আগের রাতে তিনি বাসর করছিলেন। তিনি প্রত্যুষে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে গোসল না করেই যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন। রাসূল সাঃ তার সম্পর্কে বলেছিলেন: (তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল দিয়েছে।)(২)
সম্পদ দ্বারা দানশীলতা হল: নেক কাজে সম্পদ ব্যয় করা। যেমন: সাদাকা, ঋণ প্রদান, দান ও উপহার প্রদান করার মাধ্যমে অভাবীদের সহায়তা করা এবং মেহমান ও প্রতিবেশীকে সম্মান করা।
আর এই প্রকারের বদান্যতা প্রশংসনীয় ও কাঙ্খিত এবং প্রতিযোগীদের এতে প্রতিযোগিতা করা বাঞ্ছনীয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (দু'টি বিষয় ছাড়া ঈর্ষা করা যায় না। এক ব্যক্তি হচ্ছে, আল্লাহ যাকে কুরআন দান করেছেন, আর সে দিবারাত্র তা তিলাওয়াত করে। অপর ব্যক্তি বলে, এ লোকটিকে যা দেওয়া হয়েছে আমাকে যদি অনুরূপ দেওয়া হতো, তা হলে আমিও অনুরূপ করতাম, সে যেরূপ করছে। আরেক ব্যক্তি হচ্ছে সে, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দিয়েছেন। ফলে সে তা যথাযথভাবে ব্যয় করছে। তখন অপর ব্যক্তি বলে, একে যা দেওয়া হয়েছে, আমাকেও যদি অনুরূপ দেওয়া হতো, আমিও তাই করতাম, সে যা করছে।)(১)
আর এটিকে ঈর্ষা নামকরণ করা হয়েছে রূপকার্থে। উমর রাঃ আবু বকর রাঃ এর সাথে দান করাতে প্রতিযোগিতা করেছিলেন।(২)
মর্যাদার মাধ্যমে বদান্যতা হল: মানুষের নিকট ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা কাজে লাগিয়ে মানুষকে সহায়তা প্রদান করা। যেমন: অভাবী এবং মাজলুমদের অধিকার ও প্রয়োজন পুনরুদ্ধারের চেষ্টার মাধ্যমে তাদের জন্য মধ্যস্থতা করা। মহান আল্লাহ বলেন: مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا وَمَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا অর্থ: [কেউ কোন ভাল কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে এবং কেউ কোন মন্দ কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর নজর রাখেন।](৩)
ইমাম মুজাহিদ, হাসান বসরী, ইবনু যায়েদ এবং প্রমূখগণ বলেন: মানুষের পারস্পরিক প্রয়োজনে সুপারিশ বা মধ্যস্থতা করা। সুতরাং যে ব্যক্তি উপকারমূলক কাজে সুপারিশ করবে সে একটি অংশ পাবে আর যে ক্ষতিকর কাজে সুপারিশ করবে তারও একটি অংশ থাকবে।(৪)
মানুষকে ইলম শিক্ষা দানের মাধ্যমে বদান্যতা: দুই ভাবে হতে পারে: (৫)
ক. প্রশ্নকারীর উত্তরে যতটুকু বলা প্রয়োজন তার চেয়ে বিশদাকারে জওয়াব দেয়া এবং তার উপকারে আসে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে বলা। উত্তরে বেশি করে বলা রাসূল সাঃ এর অনুপম চরিত্রে অন্তর্গত। যেমন রাসূল সাঃ কে যখন সাগরের পানির বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল তখন তিনি প্রশ্নকর্তার জিজ্ঞাসিত বিষয়ের চেয়ে বেশি উত্তর দিয়েছিলেন: (সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।)(৬)
খ. ইলম বা জ্ঞানকে মানুষের নিকট প্রশ্নাকারে উত্থাপন করা। আর এরূপ করা রাসূল সাঃ এর বৈশিষ্ট্য ছিল। রাসূল সাঃ এর বাণী থেকে এর উদাহরণ হল: (তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে?...) (৭) অনুরূপভাবে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ কে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন: (হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি, তুমি আল্লাহ তায়ালার বিধিনিষেধ রক্ষা করবে তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন।)(৮)
কায়িক শ্রম দিয়ে উপকার করার মাধ্যমে বদান্যতা: যেমন কোন ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের বোঝা বহন করে দেয়ার মাধ্যমে সহায়তা করা অথবা তার গৃহের কোন নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিস ঠিক করে দেয়া ইত্যাদি। রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রত্যেক দিন যাতে সূর্য উদিত হয়, তাতে মানুষের দেহের প্রতিটি জোড়া হতে একটি মানুষের প্রত্যেক জোড়ার প্রতি সাদাকা রয়েছে। প্রতিদিন যাতে সূর্য উদিত হয়। দু'জন লোকের মধ্যে সুবিচার করাও সাদাকা। কাউকে সাহায্য করে সাওয়ারীতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার উপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়াও সাদাকা। ভাল কথাও সাদাকা। সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি কদমেও সাদাকা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদাকা।) (১)
সময় এবং আরাম বিসর্জন দিয়ে বদান্যতা: নিজের আরাম-আয়েশ মানুষের জন্য বিসর্জন দেয়া এবং নিজের আরামের উপর অন্যদের আরামকে অগ্রাধিকার দেয়া। যেমন রোগীর সাথে রাত্রিযাপন এবং তাকে আনন্দ দেয়া। বলা হয়ে থাকে:
তিনি বদান্যতার প্রেমিক, যদি কোন আবেদনকারী তার নিকট আবেদন করে…… আপনি আমাকে আপনার চোখের ঘুম দিয়ে দিন, তবে (সে তাকে ঘুম দিয়ে দিবে) আর ঘুমাবে না।
দ্বিতীয়ত: কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা:
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি অন্যকে যে সব ক্ষেত্রে কষ্ট দেয় সে সব ক্ষেত্র থেকে নিজের কষ্ট প্রদানের উসৎগুলোকে নিবৃত্ত রাখা। আর ধরনের দিক থেকে কষ্ট প্রদানের উৎসগুলো দু’ভাগে বিভক্ত:
১- বাচিক উৎস: আর তা জবানে উচ্চারণ এবং কলমে লিখে কিছু বর্ণনা করার মাধ্যমে হয়ে থাকে।
২- কর্মর্গত উৎস: এটি মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন: হাত, চোখ, কান, চোখের পাতা এবং ইশারার মাধমে হয়ে থাকে।
কষ্ট প্রদানের উৎস কথা ও কাজ যে সকল বিষয়ে আপতিত হয় এবং এর ফলে মানুষ কষ্ট পায় তা হল: দ্বীন, সম্পদ, সম্মান-সম্ভ্রম, জান এবং বুদ্ধি-বিবেক। কষ্ট প্রদানের উৎস ও কষ্ট পাওয়ার ক্ষেত্রগুলোর বিশদ আলোচনা নিম্নে উপস্থাপন করা হল:
প্রথমত: কষ্ট প্রদানের উৎসসমূহ:
১- বাচিক উৎস:
সে সকল কষ্ট যার উৎস হল বর্ণনা; চাই তা জবানে উচ্চারণ বা আঙ্গুল দিয়ে লেখার মাধ্যমে হোক অথবা উভয়ের মাধ্যমে হোক। আর জবান হল কষ্ট প্রদানের শক্তিশালী উৎস, বিশেষত যখন তার অধিকারী জবানকে মানুষের উপর লাগামহীন করে দেয়। আর নবী সাঃ জবানের ভয়াবহতা ও তা মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে - এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নবী সাঃ মুয়াজ রাঃ কে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন: (হে মুয়াজ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। মানুষকে তাদের নিজেদের জিভঘটিত পাপ ছাড়া অন্য কিছু কি তাদের মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?) (২)
তিনি বলেছেন: (নিশ্চয়ই বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির কোন কথা উচ্চারন করে অথচ সে কথার গুরুত্ব সম্পর্কে চেতনা নেই। কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা অনেক গুন বাড়িয়ে দেন। আবার বান্দা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কোন কথা বলে ফেলে যার পরিনতি সম্পর্কে সে সচেতন নয়, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে পতিত হবে。)(১) তিনি আরো বলেছেন: (যে ব্যক্তি আমার জন্য দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু -জিহ্বা- এবং দুই পা-র মাঝের বস্ত-লজ্জাস্থান- এর যামিন হবে আমি তার জন্য জান্নাতের যামিন হব।)(২)
একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হল সে তার জবান দ্বারা অন্য মুসলিমদের কষ্ট প্রদান করা থেকে বিরত থাকবে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে।)(৩)
হাফেজ ইবনে হাজার রহিঃ বলেন: “জিহ্বাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এ জন্য যে, এটি হল হৃদয়ের অভিব্যক্তি প্রকাশকারী। অনুরূপ হল হাত; কেননা উভয়ের দ্বারা অধিকাংশ কর্ম সম্পাদিত হয়। হাতের তুলনায় হাদিসটি জিহ্বার প্রেক্ষিতে ব্যপক অর্থবোধক। কেননা জিহ্বা দ্বারা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য বিষয়ে কথা বলা যায়, হাতের বিপরীতে। এ ক্ষেত্রে জিহ্বার সহযোগী হতে পারে লেখনী, আর এ ক্ষেত্রে তার প্রভাব ব্যাপক! (৪)
সুতরাং ইসলামী বিধান জিহ্বার ভয়াবহতা প্রমাণ করেছে। ফলে মানুষ নিজেকে এবং সে যাদের দায়িত্বশীল তাদেরকে তরবিয়ত প্রদান করা ব্যতীত কোন উপায় অবশিষ্ট নেই।
২- কর্মগত উৎস: আর তা হল ঐ সকল প্রদত্ত কষ্ট যার উৎস মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ; যেমন: হাত, চোখ, কান ইত্যাদি।
ক. হাত: হাত দ্বারা ক্ষতি বিরাট, তার ভয়াবহতা বিশাল; যেহেতু এটা হত্যা, মারপিট এবং চুরি করার একটি মাধ্যম। আর রাসূল সাঃ হাতের ভয়াবহতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন যখন তা অন্যায় কাজে ব্যবহার করা হয়। তিনি হাতের সঠিক ব্যবহারকে প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় হিসেবে নির্ধারণ করে বলেছেন: (প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে।)(৫)
খ. চোখ: এটি কষ্ট প্রদানের উৎস যদি এর দ্বারা তুচ্ছ, হেয় এবং বিদ্রুপ করার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিত করা হয় অথবা হারাম কিছু দেখতে ব্যবহার করা হয়। যেমন: অন্যের বাড়ির গোপন বিষয় অবগত হওয়ার জন্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। রাসূল সাঃ তার গৃহের ছিদ্র দিয়ে উঁকিমারা ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে অবস্থায় তার হাতে একটি চিরুনী ছিল এবং তা দিয়ে তিনি মাথার চুল আচড়াচ্ছিলেন: (যদি আমি জানতাম যে তুমি উঁকি মারবে, তবে এ দিয়ে তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। তাকানোর জন্য অনুমতি গ্রহণের বিধান দেয়া হয়েছে।) (৬)
মানুষ তার চোখের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে; যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন: إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَتَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا অর্থ: [নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (১)
গ. ইশারা-ইঙ্গিত: কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ, হেয়জ্ঞান এবং বিদ্রুপ করার উদ্দেশ্যে চোখের পাতা দ্বারা ইশারা করা। মহান আল্লাহ বলেন: وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةِ لُمَزَةٍ﴿ অর্থ: [দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পিছনে ও সামনে লোকের নিন্দা করে।] (২)
আরবিতে 'হাম্মায' বলা হয় যে ব্যক্তি ইশারা ও কর্মের মাধ্যমে মানুষের নিন্দা করে এবং দোষারোপ করে। আর 'লাম্মায' হল যে তাদেরকে কথার মাধ্যমে দোষারোপ করে। (৩)
ঘ. কান: কানের মাধ্যমে কষ্ট প্রদানের ধরণ হল, আড়ি পেতে ও কান পেতে অন্যের কথা শোনা এবং এর মাধ্যমে তাদের কষ্ট প্রদান করা। চাই তারা তাৎক্ষণিক কষ্ট পাক তাকে আড়ি পেতে কথা শুনতে দেখার মাধ্যমে অথবা তারা কষ্ট পাক পরবর্তীতে তার শ্রুত কথা প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে। আর মানুষ জিজ্ঞাসিত হবে এ মহান আয়াতের প্রেক্ষিতে এবং কানের অপব্যবহারের কারণে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَتَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا অর্থ: [নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (৪)
দ্বিতীয়ত: ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা কষ্ট পাওয়ার ক্ষেত্রসমূহ:
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল মানুষ যে সকল ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; চাই তা তার দ্বীন, সম্পদ, সম্ভ্রম, জান বা বুদ্ধি-বিবেক এর ক্ষেত্রে হোক। এই পাঁচটি বিষয়কে একত্রে ফিকহের পরিভাষায় 'আজ-জরুরিয়্যাত আল-খামসা' তথা 'পাঁচটি প্রয়োজনীয় বিষয়' বলে অভিহিত করা হয়। এগুলোর বিশদ আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হল:
১- দ্বীন: দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ধরণ হল কোন ব্যক্তিকে দ্বীনের আবশ্যকীয় বিধান পালনে বাঁধা দেয়া। যেমন: সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার বিষয়ে একজন ব্যক্তিকে বাঁধা প্রদান করা বা সে যে ওয়াজীব ও সুন্নাত বিধান পালন করে তা নিয়ে বিদ্রুপ করা, যেমন: টাখনুর উপর কাপড় পড়া এবং দাড়ি ছেড়ে দেয়া। ইমাম শাতেবী রহিঃ বলেন: “অস্তিত্বের দিক থেকে মৌলিক ইবাদতগুলো দ্বীনের হেফাযতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে; যেমন: ঈমান, দুই শাহাদার উচ্চারণ, যাকাত, সিয়াম, হজ ইত্যাদি”।(৫)
২- ধন-সম্পদ: নানা পদ্ধতিতে মানুষের সম্পদের উপর আক্রমণ করা; যেমন: চুরি, ধোঁকা, প্রতারণা, ঘুষ গ্রহণ অথবা সম্পদে আক্রমণ করার অন্যান্য পদ্ধতিতে। ইসলাম সম্পদের হেফাযত করেছে এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে হস্তগত করাকে হারাম করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم : بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُواْ فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।](১) অত্র আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। এর অন্তর্ভুক্ত হল: জুয়া, প্রতারণা, আত্মসাৎ, অন্যের অধিকার অস্বীকার করা এবং সম্পদের মালিক যার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। আরো অন্তর্ভুক্ত হল শরীয়ত যা হারাম করেছে যদিও মালিক তার প্রতি সন্তুষ্ট; যেমন: যিনাকারী ও গণকের উপার্জন, মদ ও শুকুর বিক্রির মূল্য ইত্যাদি।(২)
নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের জান, তোমাদের মাল, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর তোমাদের জন্য হারাম। এখানে উপস্থিত ব্যাক্তি আমার এ বাণী যেন অনুপস্থিত ব্যাক্তির কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যাক্তি হয়ত এমন এক ব্যাক্তির কাছে পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার থেকে বেশি স্মরণ রাখতে পারবে।) (৩)
৩- বুদ্ধি-বিবেক: এর উপর আক্রমণ তিনভাবে হতে পারে:
ক. তাকে এমন স্থানে আঘাত করা যেখানে আঘাত করার ফলে তার চিন্তা-শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সে তার ভূমিকা পালনে অক্ষম হয়ে পড়ে。
খ. যে সব দ্রব্য বুদ্ধি-বিবেককে নষ্ট করে দেয় এমন দ্রব্য বিক্রয় ও বিপননের মাধ্যমে বিবেকের প্রতি আক্রমণ করা। যেমন: এ্যালকোহল, আফিম এবং সব ধরণের নেশাদ্রব্য। কেননা এগুলো মানুষের চিন্তা শক্তিকে নষ্ট করে দেয়, তাকে তার ইহকালীন ও পরকালীন কল্যান থেকে বঞ্চিত রাখে এবং তার বিষয়গুলো অস্পষ্ট করে দেয়; ফলে সে ভাল-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না। এভাবে সে তার আচরণের মাধ্যমে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য থেকে বের হয় যায়।
নেশাদ্রব্য মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে। এ জন্য শয়তান নেশাদ্রব্যকে মানুষের নিকট মনোমুগ্ধকররূপে উপস্থাপন করে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَوَةَ : وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ তো চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না?] (৪)
গ. সাংস্কৃতিক বিনাশকারী: মানুষের বিবেকের উপর আক্রমণ করা হয় ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনার প্রচার ও প্রসার, মানুষের মাঝে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি এবং ভ্রান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক লেখনী ও চিত্তাকর্ষক সাহিত্যের পথ ধরে বিচ্যুতি-বিকৃতিকে নানা উপায়ে সুশোভিত করার মাধ্যমে。
৪- জান: জানের উপর আক্রমণ করা হয় হত্যা, আঘাত ইত্যাদির মাধ্যমে। যুলুম ও সীমালঙ্ঘনবশত জানের উপর আক্রমণকে ইসলাম হারাম করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنَا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا [ মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।] (১)
রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, সেই মুসলিম ব্যক্তির খুন এই তিনটির একটি কারণ ছাড়া হালাল নয়: বিবাহিত হওয়ার পর ব্যভিচারী হওয়া, প্রাণের বদলায় প্রাণ গ্রহণ, দ্বীন পরিত্যাগী মুসলিমের জামায়াত বিছিন্ন হওয়া।)(২)
৫-মান-সম্ভ্রম: মানুষের চরিত্রে কালিমা লেপনের মাধ্যমে আক্রমণ করা। আর ইসলাম মান-সম্মানে আক্রমণের সকল অবস্থাকেই নিষিদ্ধ করেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের মান-সম্ভ্রম তোমাদের জন্য হারাম।) (৩)
তৃতীয়ত: কষ্ট সহ্য করা:
কষ্টের বিপরীতে অনুরূপ কষ্ট না দেয়ার মাধ্যমে কষ্ট সহ্য করার গুণ অর্জিত হয়। আর এটি দু'ভাবে হয়ে থাকে:
১- ক্ষমা ও উপেক্ষা করার মাধ্যমে মন্দ আচরণ মোকাবেলা করা। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন: وَجَزَاؤُا سَيِّئَةِ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ [আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। নিশ্চয় তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।] (৪) আল্লাহ তায়ালা আদল বা ন্যায়বিচারকে শরীয়াভুক্ত করেছেন, আর সে আদল হল কিসাস। তবে তিনি উত্তমতার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন, আর সে উত্তম কাজটি হল ক্ষমা। আল্লাহ তায়ালার নিকট ক্ষমার প্রতিদান কখনো বিনষ্ট হয় না।(৫) রাসূল সাঃ বলেছেন: (সাদাকাহ করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন।) (৬)
আবু বকর আস-সিদ্দীক রাঃ তার খালাত ভাই মিসতাহ বিন আসাসাহ এর উপর যে সাদাকা করতেন তা বন্ধ করে দেন যখন সে আয়েশা রাঃ এর উপর ইফক তথা মিথ্যা অপবাদ রটনার ঘটনায় জড়িত হয়। অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন এবং তাকে যে পরিমাণ দান করতেন তা পুনরায় চালু করেন যখন তিনি আল্লাহ তা’য়ালার নিম্নোক্ত বাণী শ্রবণ করলেন: وَلَا يَأْتَلِ أُوْلُوا الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُوْلِي الْقُرْبَى وَالْمَسَكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ ﴾رَّحِيمٌ অর্থ: [আর তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থকে ও আল্লাহ্র রাস্তায় হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না; তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।] (১)
আর ক্ষমা করা সবসময় শুধু প্রশংসনীয়ই নয় বরং তা কখনো শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় যদি ক্ষমার কারণে কোন বিপর্যয় না ঘটে। যদি ক্ষমার পরিণতিতে কোন বিপর্যয় ঘটে তাহলে ক্ষমা না করাই হল অতি উত্তম। উদাহরণত যে ব্যক্তি মানুষের উপর যুলুম করার কারণে প্রসিদ্ধ তাকে ক্ষমা করার ফলে সে যুলুম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হবে। আর যদি ক্ষমা করার ফলে কোন বিপর্যয় না ঘটে অথবা তা যদি মিমাংসার দিকে নিয়ে যায় তাহলে ক্ষমা করাই উত্তম。
২- মন্দ আচরণের বিপরীতে উত্তম আচরণ: আর ইসলাম এ বিষয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। হাদিসে এসেছে, নবী সাঃ বলেছেন: (হে উকবাহ বিন আমের! যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তুমি তার সাথে তা বজায় রাখ, তোমাকে যে বঞ্চিত করেছে তুমি তাকে প্রদান কর এবং যে তোমার উপর জুলুম করেছে তুমি তাকে ক্ষমা কর।)(২)
সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হবে সালাম প্রদান, সম্মান করা, তার জন্য দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, তার প্রশংসা করা এবং তাকে দেখতে যাওয়ার মাধ্যমে। আর যে আপনাকে বঞ্চিত করেছে তাকে শিক্ষা দেয়া, উপকার করা এবং সম্পদ দেয়ার মাধ্যমে প্রদান করা হবে। আর যে আপনার প্রতি অবিচার করেছে তার ক্ষমা হবে রক্তপণ ও সম্ভ্রমের ক্ষেত্রে। এগুলোর কতক ওয়াজীব ও কতক মুস্তাহাব।(৩) ওয়াজীব হল যে আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা। (৪) আর মুস্তাহাব হল যে আপনার উপর যুলুম করেছে তাকে ক্ষমা করা。
চতুর্থত: চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা:
হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ভ্রুকুটিপূর্ণ ও মলিন চেহারার বিপরীত। অর্থাৎ মুসলিম ভাইদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে সাক্ষাৎ করা। কেননা এটি মিল-মহাব্বত এবং পূণ্যের অন্যতম উৎস। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তুমি পূণ্যের কোন কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। এমন কি হোক সেটা তোমার মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।)(১)
অনুরূপভাবে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা হল সুখ্যাতি অর্জনের মাধ্যম। যেমনটি বলেছেন মুহাম্মাদ বিন হাযেম:
সুখ্যাতির অনুসন্ধানীরা তা অর্জন করতে পারেনি…যেমনটি পেরেছে উৎফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারার অধিকারীরা।
টিকাঃ
(১) সুনানে তিরমিযি (৪/৩১৯, হা: ২০০৫)।
(২) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩২০)।
(৩) সহীহ বুখারী (২/৮২, হা: ২০২৮), সহীহ মুসলিম (৩/১১৯৬, হা: ১৩-১৫৬২)।
(৪) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩০৩)।
(১) সূরা আল-মায়েদা: (২)।
(২) মুস্তাদরাকে হাকেম (৩/২০৪)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/৪১১, হা: ৭৫২৮)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৫/৫৭৪, হা: ৩৬৭৫)।
(৩) সূরা আন-নিসা: (৮৫)।
(৪) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১৯০)।
(৫) দেখুন: ইবনুল কায়ি্যম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩০৫-৩০৭)।
(৬) সুনানে আবু দাউদ (১/৬৪, হা: ৮৩)।
(৭) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৯৭, হা: ৫৯-২৫৮১)।
(৮) সুনানে তিরমিযি (৪/৫৭৫-৫৭৬, হা: ২৫১৬), মুসনাদে আহমাদ (১/২৯৩)।
(১) সহীহ বুখারী (২/৩৫৫-৩৫৬, হা: ২৯৮৯), সহীহ মুসলিম (২/৬৯৯, হা: ৫৬-১০০৯)।
(২) মুসনাদে আহমাদ (৫/২৩৬)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/১৮৭, হা: ৬৪৭৮)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/১৮৬-১৮৭, হা: ৬৪৭৪)।
(৩) সহীহ বুখারী (১/২০-২১, হা: ১০), সহীহ মুসলিম (১/৬৫, হা: ৬৫-৪১)।
(৪) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী।
(৫) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/১৩৮, হা: ৬২৪১)।
(১) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(২) সূরা আল-হুমাযা: (১)।
(৩) তাফসীরুস সাদী (৫/৪৫৫)।
(৪) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(৫) আশ-শাতেবী, আল-মুয়াফাকাত (২/৪)।
(১) সূরা আল-বাকারা: (১৮৮)।
(২) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (২/২২৫)।
(৩) সহীহ বুখারী (১/৪১, হা: ৬৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০৬, হা: ৩০-১৬৭৯)।
(৪) সূরা আল-মায়েদা: (৯১)।
(১) সূরা আন-নিসা: (৯৩)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/২৬৮, হা: ৬৮৭৮), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০২-১৩০৩, হা: ২৫-১৬৭৬)।
(৩) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৪) সূরা আশ-শূরা: (৪০)।
(৫) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/১২৮)।
(৬) সহীহ মুসলিম (৪/২০০১, হা: ৬৯-২৫৮৮)।
(১) সূরা আন-নূর: (২২)।
(২) মুসনাদে আহমাদ (৪/১৫৮)।
(৩) ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমুউর রাসায়েল।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/৯০, হা: ৫৯৯১)।
(১) সহীহ মুসলিম (৪/২০২৬, হা: ২৬২৬-২৫২৬)।
📄 ইসলামী স্বভাব-চরিত্রের মূলভিত্তি
ভূমিকা ইসলামী আখলাক বা স্বভাব-চরিত্র অপরিকল্পিত নীতি অথবা কুপ্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা কেন্দ্রিক গড়ে উঠা আনন্দ, অভিরুচী এবং উপভোগের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং তা কিছু মূলনীতি ও মূলভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং যেই চারিত্রিক কর্মে খালেস নিয়ত অথবা রাসূল সাঃ এর মানহাযের নিঃশর্ত অনুসরণ অনুপস্থিত থাকে সেটি ইসলামের মানদণ্ডে চারিত্রিক কর্ম হিসেবে গণ্য হয় না। অনুরূপভাবে জ্ঞাতব্য বিষয় যে, ইসলামী স্বভাব-চরিত্র সহজতা এবং আরোপণ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
এই মূলভিত্তিগুলো ব্যতীত কোন চারিত্রিক কর্মকেই সফলতা এবং ধারাবাহিকতা দান করা হয় না; কেননা সেটি এমন ধারণা হিসেবে থেকে যায় যার বাস্তবে কোন ভিত্তি নেই এবং তার শিক্ষামূলক প্রভাব ব্যক্তি অথবা সমাজের মাঝে সঞ্চারিত হয় না।
আর ভিত্তিগুলোর অধিকতর আলোচনা নিম্নে উপস্থাপন করা হল:
১- নিয়ত বা ইখলাস: নিয়ত হল: অন্তরের সংকল্প। (১) আর এখানে নিয়ত দ্বারা উদ্দেশ্য হল: আমলের উদ্দেশ্য নিরূপণ করা যে, আমলটি কি এক আল্লাহর জন্য; যার কোন শরীক নেই? নাকি সেটি আল্লাহ এবং অন্যের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত? (২) কেননা ইসালামে নিয়ত হল এমন একটি স্তম্ভ ও প্রধান নিয়ামক যার উপর আমল কবুল হওয়া ও না হওয়া নির্ভর করে। অনুরূপভাবে এ কথাটি নিশ্চিত করে যে, আচরণকে চারিত্রিক মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত হল প্রধান নিয়ামক। কেননা মানুষ কখনো এমন আমল করে যার বাহ্যিকরূপ উত্তম চরিত্রের গুণে গুণান্বিত কিন্তু তার অভ্যন্তর বাহ্যিকরূপের বিপরীত। ফলে তার আচরণকে কিভাবে চারিত্রিক মর্যাদা দেয়া হবে অতঃপর সে ঐ ব্যক্তির সমপর্যায়ে উপনীত হবে যে ব্যক্তি তার আমলকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সম্পাদন করেছে? উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, বীরত্ব হল উত্তম চরিত্রের অন্তর্গত; কিন্তু ইসলামের মানদণ্ডে তার কোন মূল্য নেই যখন সেটি আল্লাহর খালেস নিয়ত শূন্য হয়। আবু মূসা আল-আশয়ারী রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (এক ব্যাক্তি নবী সাঃ এর কাছে এসে বলল, এক ব্যাক্তি গনীমত লাভের জন্য, এক ব্যাক্তি প্রসিদ্ধির জন্য এবং এক ব্যাক্তি বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য জিহাদে শরীক হল। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করল? তিনি বললেন, যে ব্যাক্তি আল্লাহর কলিমা বুলন্দ রাখার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করল, সে-ই আল্লাহর পথে জিহাদ করল।)(৩) সুতরাং যার আমল বিশুদ্ধ নিয়ত শূন্য হবে তার আমল বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে এবং ইসলামের মানদণ্ডে তার কোন মূল্য নেই। এ জন্য রাসূল সাঃ ঐ দুই ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করেছেন যার নিয়ত আল্লাহকে সন্তষ্টি করা এবং যার নিয়ত ভিন্ন কিছু অর্জন করা, যেমনটি এসেছে প্রসিদ্ধ হাদিসে: (প্রত্যেক আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং কোন ব্যক্তি কেবল তাই লাভ করবে যা সে নিয়ত করে। যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যে বলে গণ্য হবে, আর যার হিজরত পার্থিব কোন লাভ বা কোন মহিলাকে বিবাহের উদ্দেশ্যে হবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যের হিজরত বলেই গণ্য হবে।)(১) এ জন্য মানবীয় আচরণের চারিত্রিক মর্যাদা সঠিক ও বিনষ্ট হওয়া মযবুতভাবে নিয়তের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইমাম ইবনে রজব রহিঃ বলেন: “আমলের সঠিকতা ও বিনষ্টতা তাকে অস্তিত্বে আনায়নের প্রয়োজনীয় নিয়তের অনুপাতে হয়ে থাকে”।(২) কেননা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় ও তাঁর মানহায অনুযায়ী কর্মের উপস্থিতি কবুলিয়াত অর্জন করে। বস্তুত আমলকারীর আমলের সওয়াব তার নেক নিয়ত অনুপাতে হয় এবং তার পরিণতিও তার খারাপ নিয়তের অনুপাতে হয়। কখনো তার নিয়ত মুবাহ বিষয়ে হতে পারে তখন তার কর্মও মুবাহ হিসেবে গণ্য হবে; ফলে তার কোন সওয়াব এবং শাস্তি হবে না। সুতরাং আমল স্বয়ং তার সঠিকতা, বিনষ্টতা এবং মুবাহ হওয়ার বিষয়টি তাকে অস্তিত্বে আনায়নের প্রয়োজনীয় নিয়তের অনুপাতে হবে।(৩)
সুতরাং মুসলিম ব্যক্তি যখন আহার করে বা ঘুমায় অথবা খালেস নিয়তে দান করে তখন সেটি ইসলামের মানদণ্ডে উত্তম হিসেবে বিবেচিত হয় তার চাইতে যাতে খালেস নিয়ত অনুপস্থিত। কখনো মানুষের দৃষ্টিতে একজন ব্যক্তির আমল কম হতে পারে কিন্তু সেটি খালেস নিয়তে হওয়ার কারণে আল্লাহর নিকট অনেক বড়। পক্ষান্তরে কখনো কোন ব্যক্তির আমল মানুষের দৃষ্টিতে অনেক বড় হতে পারে কিন্ত ইসলামের মানদণ্ডে কোন মূল্য নেই; তাতে খালেস নিয়ত না থাকার কারণে।
নাফে বিন হাবীবকে জিজ্ঞাসা করা হল: 'আপনি কি জানাযাতে উপস্থিত হবেন না? জবাবে বললেন: আমি নিয়ত করে নেই। তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন অতঃপর বললেন: আমি রওয়ানা হচ্ছি'। কোন কোন পূর্বসূরী বিদ্বান বলেছেন: 'যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তার আমলকে যেন পূর্ণতা দেয়া হয় সে যেন তার নিয়তকে সুন্দর করে; কেননা আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে প্রতিদান দেন এমনকি খাবারের লোকমাতেও যদি সে তার নিয়তকে সুন্দর করে নেয়'।(৪)
নেক নিয়তের পরিধি যখন বিস্তৃতি লাভ করে তখন শরীয়া অনুপাতে সম্পাদিত সমস্ত আচরণগত কাজকে চারিত্রিক মর্যাদাসম্পন্ন কাজে পরিণত করে; যে কাজের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান ও সওয়াব দেয়া হয়। আর এ প্রেক্ষিতেই আচরণ চারিত্রিক মর্যাদা লাভ করে, তাদের আমলের বিপরীত যারা লৌকিকতা প্রদর্শন করে যখন তারা দান করে বা বিনয় প্রকাশ করে অথবা তাদের নিয়তের উপর ইখলাসের প্রাধান্য ব্যতীত সুনির্দিষ্ট চারিত্রিক আচরণ করে। এ কারণে তাদের চারিত্রিক আমলে ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় না এবং দুনিয়াবী উদ্দেশ্য লাভের পর তা থেমে যায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এ ধরণের চরিত্রকে সাময়িক স্বভাব-চরিত্র বলা হয়।
খালেস নিয়তের উপর প্রতিষ্ঠিত চারিত্রিক আচরণের স্থায়িত্ব যা নিশ্চিত করে তা হল আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে সম্পাদিত পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের গুণের স্থায়িত্ব; কেননা তাদের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের উৎস হল আল্লাহর উদ্দেশ্যে খালেস নিয়ত। ফলে এর উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা; দুনিয়ার উদ্দেশ্যে নয় যা অর্জনে কোন এক পক্ষ লালায়িত। এমনকি সাদ বিন রবী রাঃ তিনি তার অর্ধেক সম্পদ ও তার একজন স্ত্রীকে আব্দুর রহমান বিন আওফ রাঃ কে দান করে দিয়েছিলেন। তবে ইবনু আওফ রাঃ তা গ্রহণে বিরত ছিলেন এবং তার আনসারী ভাইয়ের সম্পদে লালায়িত হননি।(১) কেননা তাদের মাঝের সম্পর্ক বস্তুগত নয় বরং তা থেকে অনেক উন্নত এবং উঁচু। এটি ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক যার মূল হল আল্লাহর জন্য ভালবাসা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা। আর বর্তমানে মুসলিমদের তাদের আমলে এবং সম্পর্কে খালেস নিয়ত প্রতিফলিত করার কতই না প্রয়োজন; যাতে উন্নত ইসলামী চারিত্রিক মূল্যবোধ অর্জিত হয়।
ইসলামী স্বভাব-চরিত্রের সাথে নিয়তের আরেকটি সম্পর্ক রয়েছে; আর তা হল, কোন ব্যক্তি অন্তরে সৎকাজের নিয়ত করে অতঃপর অক্ষমতার কারণে তা করতে সক্ষম হয় না, তদুপরি তার জন্য একটি নেকী লিখে দেয়া হয়। যেমনটি নবী সাঃ হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন: (আল্লাহ তায়ালা সমুদয় সৎ ও অসৎ কর্মের হিসাব লেখেন। এরপর রাসুল সাঃ এটিকে আরও বিস্তৃত করে বলেনঃ সুতরাং যে ব্যাক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করেছে অথচ তা সম্পাদন করে নি আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে তার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সোয়াব লিখে দেন। তার ইচ্ছার পর কাজে পরিণত করলে আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে দশ থেকে সাতশ গুন পর্যন্ত সোয়াব লিখে দেন। পক্ষান্তরে যদি কোন মন্দ কর্মের অভিপ্রায় করে এবং তা কাজে পরিণত না করে তবে আল্লাহ তায়ালা তার বিনিময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সোয়াব লিখে দেন। আর অভিপ্রায়ের পর তা সম্পাদন করে ফেললে তিনি একটি মাত্র গুনাহ লেখেন।)(২)
সুতরাং নিয়তের উপর মুসলিম ব্যক্তির প্রতিটি আচরণ অথবা সে যা করার ইচ্ছা করেছে তার চারিত্রিক মূল্য নির্ভর করে। কাজেই যে ব্যক্তি অন্তরে ভাল কাজের ইচ্ছা রাখে সে মূলত উন্নত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে যদি সে তা বাস্তবায়নে অপারগতার কারণে চরিত্রে রূপ দিতে না পারে। অনুরূপভাবে কেউ যদি পাপ কাজের ইচ্ছা করে অতঃপর আল্লাহর ভয়ে বা তাঁর আনুগত্যের আকাঙ্খায় অথবা তাঁর লজ্জায় সে তা থেকে সরে আসে; তাহলে সে উন্নত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ধারণ করল-আর তা হল আল্লাহর ব্যাপারে লজ্জাশীলতা।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে নিয়ত হল আমল কবুল ও তার উপর চারিত্রিক মূল্যবোধ আরোপের মূল বিষয়; যদিও কখনো কখনো তাকে আচরণে রূপ দেয়া না যায় এবং মানসিক অংশগ্রহণের সময় তা স্থগিত হয়ে যায় বাস্তবায়ন প্রতিবন্ধকতার উপস্থিতির কারণে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহিঃ বলেন: “শুধুমাত্র নিয়তের কারণে মুমিন ব্যক্তিকে সওয়াব দেয়া হয় এবং তা আমলের স্থলাভিষিক্ত হয় যদিও সে কোন অক্ষমতার কারণে আমলে পরিণত করতে না পারে। আর এটি সকল কল্যাণকর আমলের ক্ষেত্রেই প্রজোয্য”। (৩)
এই জন্য সমীচীন হল, সর্বদা চারিত্রিক লালন-পালন তার দিকনির্দেশনায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিয়ত করা ও তা খালেসভাবে এক আল্লাহর জন্য করার উপর গুরুত্ব প্রদান করবে; যাতে ব্যক্তির আমল ইসলামী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে এবং ধারাবাহিকতা ও অটলতা লাভ করে। কেননা ইসলামী চরিত্র অনুশীলনের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী হল আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা; কোন বস্তুগত সাময়িক সুযোগ-সুবিধা নয় যা উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়।
২- ইত্তেবা বা অনুসরণ:
আমলটি উন্নত চারিত্রিক মর্যাদাসম্পন্ন হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত উপস্থিত থাকা অপরিহার্য। আর তা হল, রাসূল সাঃ এর যথাযথ অনুসরণ, তার বৃত্তের মধ্যে থেকে ও তার দিকনির্দেশনার আলোকে আমল এবং তার মানহায থেকে বের না হওয়া যদিও নিয়তের পক্ষে অনেক সঙ্গত কারণ থাকে।
যেই কর্মচারী তার কর্মঘন্টা মেনে চলে কিন্তু সে নির্ধারিত কাজের তুলনায় কম কাজ সম্পন্ন করে; ফলে কাজ পূর্ণরূপে সম্পন্ন করা ব্যতীত নিয়মানুবর্তিতায় তার একনিষ্ঠতা তাকে একনিষ্ঠের মর্যাদা দিবে না। কেননা সে কাজের প্রধান অংশ দৈনন্দিন লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য উন্নত চারিত্রিক আচরণকে সঠিক নিয়ত এবং শুধু রাসূল সাঃ এর অনুসরণের সাথে যুক্ত না করা হল ভুল। সুতরাং যে আচরণ আল্লাহর জন্য ও তাঁর মানহায অনুযায়ী নয় এবং যে আচরণ তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ও রাসূল সাঃ এর মানহায অনুযায়ী; উভয়ের উপর চারিত্রিক হুকুম আরোপের জন্য পার্থক্য করা অপরিহার্য।
আর এটি দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের দাবী রাখে যাতে মানুষ সঠিক মানহাযের উপর চলতে পারে; আর তা হল রাসূল সাঃ এর অনুসরণ যেমনটি আল্লাহ্ বানীতে বিবৃত হয়েছে: وَمَا آتَنكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ [রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর।] (১)
আদেশ ও নিষেধের এই জ্ঞান চারিত্রিক কর্মের জন্য জরুরী বলে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ দ্বীনী জ্ঞানকে মানবীয় প্রয়োজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। এ জন্য নবীগণের রেসালাত অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ছিল বিবেকগত, সহজাতগত এবং কল্যাণমূলক জ্ঞানকে পরিপূর্ণ করার লক্ষ্যে; যা তাদেরকে সে সকল বিষয় সম্পর্কে জানাবে যা জানতে তারা অক্ষম। (২)
ইসলামী মানহায অনুসরণ না করার পন্থাসমূহের অন্তর্গত হল বুদ্ধি-বিবেক, নিজস্ব অভিরুচী ও আকর্ষণের বিবেচনাকে ইসলামী মানহাযের প্রমাণিত বিষয়ের উপর অগ্রাধিকার দেয়া। তদানুসারে নিজস্ব অভিরুচীর মনোভাবাপন্ন কিছু ব্যক্তির নিকট নৈতিক বাধ্যবাধকতার উৎস বিবেচনা করার ক্ষেত্রে ভুল হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনার আশ্রয় না নিয়ে শুধুমাত্র আবেগীয় দিকের উপর নির্ভর করা।(৩) কেননা মানুষের বুদ্ধিগত দিক এবং উপলব্ধির বিভিন্ন শক্তির উপর শুধু নির্ভরতার পরিণতি নিরাপদ নয়। কারণ তথায় এমন মনস্তাত্ত্বিক ও অমনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ রয়েছে যা জ্ঞানকে নির্দেশনার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। ফলস্বরূপ সে মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ -যেমন: কুপ্রবৃত্তি, সন্দেহ-সংশয় এবং কামনা-বাসনা- থেকে যে বুদ্ধিগত হুকুম প্রকাশিত হয়, তাতে তার প্রভাব থাকে; যা মানুষকে রাসূল সাঃ কর্তৃক আনীত হেদায়েতের মানহায অনুসরণে অতি প্রয়োজনীয় করে তোলে। যে হেদায়েতের মানহাযে কুপ্রবৃত্তি, সন্দেহ-সংশয় এবং কামনা বাসনার জাল থেকে মানবজাতির মুক্তি নিহিত রয়েছে।
আর বুদ্ধি-বিবেককে বিচারক মানা এবং তাকে শরীয়তের উপর অগ্রাধিকার দেয়া ব্যক্তিকে ধ্বংসের গহ্বরে নিক্ষেপ করে; কেননা “বুদ্ধি-বিবেক কখনো অনুকরণীয় ও সঠিক চরিত্র নির্ধারণে দিশেহারা হতে পারে; যেমন সে কখনো হাকীকতে পৌঁছতে ব্যর্থ হতে পারে”। এ জন্য আসমানী নির্দেশনা প্রবৃত্তির অনুসারী ও পথভ্রষ্টদের অনুসরণ করা থেকে সাবধান করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ، عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا অ: [আর আপনি তার আনুগত্য করবেন না—যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খশীর অনুসরণ করেছে ও যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে।](১)
কুপ্রবৃত্তি, শয়তান এবং নিজস্ব অভিরুচী কখনো মন্দ চরিত্রকে মানুষের নিকট সুশোভিত করে তোলে এই যুক্তিতে যে, এটি এক প্রকারের আধুনিকতা ও সভ্যতা; যেমন হিজাব পরিত্যাগ করা। এ প্রেক্ষিতে কোন মুসলিমের জন্য জায়েয এবং গ্রহণীয় নয় যে, সে নিজের জন্য এমন নিজস্ব অভিরুচী ও বিচ্যুত চিন্তার দায়মুক্তির নায্যতা দিবে সভ্য হওয়ার নামে অথবা ভিন্ন কোন দাবীতে; যাতে তাকে ইসলামের মানহায থেকে বের করে দেয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা সঠিক মানহায বর্ণনা করা ও রাসূল সাঃ এর জবানে তা সুস্পষ্ট করার পর তার মাঝে তার জন্য কোন কল্যাণ নেই। মহান আল্লাহ বলেন: ﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ﴾ অর্থ: [আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়।] (২)
রাসূল সাঃ বলেছেন: (কেউ আমাদের এই শরীয়তে নেই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।) (৩)
ইসলামী মানহায অনুসরণ না করার একটি পদ্ধতি হল আমলের ক্ষেত্রে নৈতিক গুণের প্রয়োগ না করে কথাবার্তায় নৈতিকতার ভান করা। সুতরাং এটি আল্লাহর মানহায ব্যতীত ভিন্ন কিছুর অনুসরণ, যদিও তার কথার বাহ্যিক দিক নৈতিকতাসম্পন্ন। কিন্তু সে তা বাস্তবায়ন করা থেকে দূরে থেকেছে। এই জন্য এটি তাকে চারিত্রিক মর্যাদা দেয় না। মহান আল্লাহ বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা কর না তা তোমরা কেন বল?* তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে খুবই অসন্তোষজনক।](৪) আয়াতে যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে তা তিরস্কারমূলক। অর্থাৎ তোমরা ভাল কথা কেন বল যা তোমরা কাজে পরিণত কর না? অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এ স্বভাবের জন্য তাদের কর্মকে চরম অসন্তোষজনক বলে নিন্দা করেছেন। আর আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাইলকেও নিন্দা করেছেন এই বলে যে: أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ অর্থ: [তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না?] (১)
বনী ইসরাইলেরা মানুষদেরকে আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর তাকওয়া এবং নেককাজের নির্দেশ দিত কিন্তু তারা বিপরীত কাজ করত। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তিরস্কার করেছেন। কাজেই যে ব্যক্তি ভাল কাজের নির্দেশ দিবে সে যেন মানুষের মাঝে তাতে সবার চেয়ে বেশি অগ্রগামী হয়। (২) তাদের বিষয়টি বাহ্যিকভাবে উন্নত নৈতিক কর্ম হলেও সেটি আমলে বাস্তবায়নের মানহায শূন্য হয়েছে; ফলে সেটি তার চারিত্রিক মর্যাদা হারিয়েছে।
এ জন্য উত্তম চরিত্র হল শরীয়ত যে বিধান নিয়ে এসেছে তার অনুসরণ করা এবং তার উপর নিজস্ব অভিরুচী, বুদ্ধি-বিবেক, কামনা-বাসনা ও সন্দেহ-সংশয়কে অগ্রাধিকার না দেয়া। বরং আমল হবে শরীয়ার মানহায অনুযায়ী। মহান আল্লাহ বলেন: وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا অর্থ: [তার চেয়ে দ্বীনে আর কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাতকে অনুসরণ করে?] (৩) সুতরাং আমলে সালেহ হল সৎকর্ম করা। আর সৎকর্ম হল যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ ভালবাসেন, অর্থাৎ যে বিষয়ে আবশ্যিকভাবে অথবা পছন্দনীয় মনে করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই যে বিষয়টি দ্বীনের মাঝে বিদআত বলে গণ্য তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ ভালবাসেন না। তাই সেটি সৎকর্ম এবং আমলে সালেহ এর অন্তর্ভুক্ত নয়। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি যা বৈধ নয় এমন কিছু করে যেমন: অশ্লীলতা এবং যুলুম; তা সৎকর্ম এবং আমলে সালেহ এর অন্তর্ভুক্ত নয়।(৪)
আর ইসলামী মানহায হল সুস্পষ্ট এবং পরিপূর্ণ। তার উপর নিজস্ব অভিরুচীকে অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন: الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا অর্থ: [আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।](৫)
৩-চারিত্রিক বাধ্যবাধকতা:
দ্বীন ইসলামের উৎস হল আল্লাহ তায়ালা। তিনি রাসূল সাঃ কে এ দ্বীন সহ প্রেরণ করেছেন সকল ধর্মের উপর এ দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। মহান আল্লাহ বলেন: هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ، وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ অর্থ: [তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।] (১) অতঃপর এই দ্বীন আগমন করেছে যমীনে উন্নত জীবন বাস্তবায়ন করা এবং মানবজাতিকে ভ্রষ্টতার বিচ্যুতি, অন্ধকারের গোলকধাঁধা এবং হিংসা-বিদ্বেষ থেকে প্রীতি-ভালবাসার দিকে উদ্ধার করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন: وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءَ فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ ) عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا অর্থ: [আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নি গর্তের দ্বারপ্রান্তে ছিলে, তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন।] (২)
তাই এই সত্য দ্বীন অনুসরণ করতে মানবজাতি বাধ্য; কেননা একমাত্র এই দ্বীন মানবজাতিকে বিপথগামীতা এবং ভ্রষ্টতা থেকে উদ্ধার করতে পারে। যেহেতু এটাই আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণীয় দ্বীন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ যা শরীয়তসিদ্ধ করেছেন তা ব্যতীত অন্য কোন পথে চলবে; তার কোন কিছু গ্রহণ করা হবে খনাবুল করা হবে না।(৩) মহান আল্লাহ বলেন: وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ অর্থ: [আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না।] (৪)
রাসূল সাঃ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তার দাওয়াত উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য। যেমন তিনি বলেছেন: (সর্বোত্তম স্বভাব-চরিত্রের পূর্ণতা দেয়ার জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।) (৫)
অতএব, স্বভাব-চরিত্রের ভিত্তি স্থাপনের জন্য একটি বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন যা আনুগত্য, অনুসরণ এবং মান্যতার চেতনাকে জাগ্রত করে। এই জন্য চরিত্র বিষয়ে গবেষকগণ নৈতিক বাধ্যবাধকতার উপর গুরুত্বারোপ করেন। যেমন একজন গবেষক বলেন: নৈতিক ব্যবস্থা বাধ্যবাধকতার স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান। আর বাধ্যবাধকতা হল ব্যবহারিক প্রজ্ঞার মূল উপাদান ও হাকীকত এবং এর মাধ্যমেই দায়িত্ব বাস্তবায়িত হয়…… মানবজীবনে শৃঙ্খলা বিরাজ করে এবং তাদের বাস্তব জীবনে ন্যায়-ইনসাফ ছড়িয়ে পড়ে।(৬)
এ জন্য বাধ্যবাধকতা হল মূলভিত্তি যাকে কেন্দ্র করে নৈতিক ব্যবস্থা আবর্তন করে এবং যা হারানো বাস্তবিক প্রজ্ঞার হাকীকতকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা কীভাবে বাধ্যবাধকতা ব্যতীত নৈতিক ভিত্তি কল্পনা করতে পারি?
মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা থেকে আরোপনমূলক দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا অর্থ: [আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শংকিত হল, আর মানুষ তা বহন করল; সে অত্যন্ত যালিম, খুবই অজ্ঞ।] (১)
আয়াতে বর্ণিত আমানত হল আদেশ, নিষেধ, অবশ্য পালনীয় ফরজ, দণ্ডবিধি ও ইবাদত এবং এগুলোর উপর যে সওয়াব ও শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে তা কবুল করে নেয়া।(২)
আর আল্লাহ তায়ালার হিকমতের অংশ হল যে, তিনি মানবাত্মাকে ভাল-মন্দের জ্ঞান দান করেছেন যাতে সে জিজ্ঞাসাবাদ, প্রতিদান এবং হিসাবে প্রদানে প্রস্তুত থাকে। মহান আল্লাহ বলেন: أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ وَهِدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ وَلِسَانًا وَشَفَتَيْنِ অর্থ: [আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করিনি দুচোখ?* আর জিহ্বা ও দুই ঠোঁট?* আর আমরা তাকে দেখিয়েছি দুটি পথ।](৩) তিনি আরো বলেন: فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَنَهَا অর্থ [তারপর তাকে তার সৎকাজের এবং তার অসৎ-কাজের জ্ঞান দান করেছেন।](৪)
অর্থাৎ তাকে ভাল এবং মন্দের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। (৫) শাওকানী রহিঃ বলেন: তাকে উভয়ের অবস্থা এবং উভয়ের মাঝে যে ভাল ও মন্দের বিষয় রয়েছে তা অবহিত করেছেন। (৬) তাই যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধিকে আবশ্যক করে নিবে সফলতা এবং কৃতকার্যতা তার ভাগ্যে জুটবে। পক্ষান্তরে ক্ষতিগ্রস্ততা তাদের জন্য যারা কলুষিত অন্তরের অধিকারী। মহান আল্লাহ বলেন: ۖوَقَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّنَهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّهَا﴿ অর্থ: [সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পবিত্র করেছে।* আর সে-ই ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে।](৭) অর্থাৎ সফলকাম সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং তাকে মন্দ চরিত্র থেকে পবিত্র করেছে। আর বিফল সেই ব্যক্তি যে সুপথ পরিত্যাগ করে পাপাচারে নিমজ্জিত হয়েছে এবং আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে দিয়েছে।
তাই চারিত্রিক বাধ্যবাধকতা মানুষের নিকট জন্ম নেয় তার প্রতি ঐশ্বরিক নজরদারির উপলব্ধি, আত্মসমালোচনা, দায়িত্বের অনুভূতির পথ ধরে এবং মানসিক এই প্রত্যয়ের মাধ্যমে যে, মহৎ গুণই হল সর্বোত্তম গুণ ও নীচতা হল সবচেয়ে খারাপ গুণ। যেমনটি প্রতিভাত হবে নিম্নের বিশদ আলোচনা থেকে:
ক. পর্যবেক্ষণ বা নজরদারি:
ইসলামে চারিত্রিক বাধ্যবাধকতার একটি দিক হল একজন মুসলিমের এই অনুভূতি লালন করা যে, প্রতিটি মুহূর্তেই সে আল্লাহ তায়ালার নজরদারির মাঝে আছে। আর এই নজরদারির ভিত্তি হল আল্লাহ সম্পর্কে জানা এবং তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে জানা। তিনি চোখসমূহের খেয়ানত, অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে এবং সংগোপনে আলাপকারী দু'জনের কথোপকথন সম্পর্কে জানেন। মহান আল্লাহ বলেন: يَعْلَمُ خَابِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ অর্থ: [চোখসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন।] (১) তিনি আরো বলেন: أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ : وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُواْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ অর্থ: [আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না। এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠ জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।] (২)
এই পর্যবেক্ষণের বিষয়টি মানুষের নিকট ভয়-ভীতি সৃষ্টি করে। আর ভয়-ভীতি মুমিন ব্যক্তিকে গভীর নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে চারিত্রিক দায়িত্ব পালনে তাকে উদগ্রীব করে তোলে।(৩) এই ভয়-ভীতি মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহর ইবাদত করতে, তাঁর আনুগত্য করতে, তাঁকে ভয় করতে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে প্রস্তুত করে তাঁর আদেশ মেনে ও তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থেকে; কেমন যেন সে তাকে দেখছে। আর এটাই হল ইহসানের অর্থ যার পরিচয় রাসূল সাঃ দিয়েছেন: (আল্লাহর ইবাদত এমন নিষ্ঠার সঙ্গে করবে, যেন তুমি তাকে দেখছ। আর তুমি যদি তাকে দেখতে না পাও, তবে জানবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।)(৪) এটি দায়িত্ববোধের অনুভূতির সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট এবং গভীরতম স্তর যা মুমিনকে নৈতিক গুণাবলী মেনে চলতে ও ত্রুটিপূর্ণ আচরণ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করে।
খ. আত্মপর্যালোচনা:
ইসলামী চারিত্রিক বাধ্যবাধকতা প্রতিফল এবং হিসাবনিকাশের মাধ্যমে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত হয় যা ভাল প্রতিদান ও শাস্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে। চাই সেটি দুনিয়াতে শাস্তি, শরয়ী দণ্ড এবং তাওফীক না পাওয়ার মাধ্যমে হোক অথবা পরকালে জান্নাত ও তার নেয়ামত লাভ বা জাহান্নাম ও তার উষ্ণতায় প্রবেশের মাধ্যমে হোক। মহান আল্লাহ বলেন: فَأَمَّا مَن طَغَى وَوَاثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى * وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ، وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى অর্থ: [সুতরাং যে সীমালঙ্ঘন করে।* এবং দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়।* জাহান্নামই হবে তার আবাস।* আর যে তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে।* জান্নাতই হবে তার আবাস।](৫) এই প্রতীক্ষিত নেয়ামতই মুমিনের বিবেককে উজ্জীবিত করে এবং চিরস্থায়ী আবাস জান্নাত লাভের আশায় আল্লাহর সীমারেখা মান্য করা ও সে সীমা অতিক্রম না করার মধ্য দিয়ে তার সমস্ত অনুভূতিকে পরিপূর্ণ করে। ভীতি প্রদর্শনকারী শাস্তি ব্যতিরেখেই; যা মন্দ আচরণের পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বনে মুসলিমকে বাধ্য করে।
আরো অনেক ইসলামী দিকনির্দেশনা রয়েছে যা বিবেককে উজ্জীবিত করে এবং আবেগকে জাগিয়ে তোলে যেন মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলে এবং নিজের কর্মের ব্যাপারে আত্মপর্যালোচনা করে। মহান আল্লাহ বলেন: يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُحْضَرًا وَمَا عَمِلَتْ مِن سُوءِ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا ﴾وَبَيْنَهُ أَمَدًا بَعِيدًا وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ অর্থ: [যেদিন প্রত্যেকে সে যা ভাল আমল করেছে এবং সে যা মন্দ কাজ করেছে তা উপস্থিত পাবে, সেদিন সে কামনা করবে- যদি তার এবং এর মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকত আল্লাহ তার নিজের সম্বন্ধে তোমাদেরকে সাবধান করছেন।](১)
সওয়াব এবং শাস্তি ব্যক্তির মাঝে আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর ভয় প্রোথিত করে দেয় এবং এই ভয় নৈতিক বাধ্যবাধকতার কার্যক্রমকে বৃদ্ধি করে, তাকে শক্তিশালী করে ও তার সুস্পষ্টতা, দৃঢ়তা এবং স্থায়িত্বতা বৃদ্ধি করে। বিশেষত যখন সে পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং যখন তথায় এমন প্রলোভন থাকে যা ব্যক্তিকে ঘিরে রাখে, তার অনুভূতি, ঝোঁক ও আবেগকে জাগিয়ে তোলে। এমতাবস্থায় ভয়-ভীতির ভূমিকাই হল পরিস্থিতির মিমাংসাকারী। (২)
প্রতিফল এবং সওয়াব ব্যক্তিকে আত্মপর্যালোচনা করতে শেখায় যে কাজ করতে সে সংকল্পবদ্ধ তা শুরু করার পূর্বেই। যদি সে কাজটি করে ফেলে তাহলে ব্যক্তি তার ভুল-ত্রুটি স্মরণ করে আত্মপর্যালোচনা করে যাতে সে নিজের অপরাধ বুঝতে পারে অতঃপর ক্ষমা প্রার্থ করে, তাওবা করে এবং মন্দ আচরণে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে। এই আত্মপর্যালোচনা মানুষের সর্বদা সতর্ককারী হিসেবে কাজ করে যাতে সে আল্লাহর সীমারেখার নিকট অবস্থান করে। সুতরাং অন্তরের চেতনা, আত্মপর্যালোচনা এবং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসাবাদের অনুভূতি মুমিনের হৃদয়ে দায়িত্বশীলতার গভীর বোধ সৃষ্টি করে।
সুতরাং ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তার সময়, যৌবন, উপার্জন ও তার সম্পদ ব্যয় সম্পর্কে। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (কোন বান্দার পদদ্বয় কিয়ামতের দিন এতটুকুও সরবে না যতক্ষণ না তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে, তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে, কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোথায় তা ব্যয় করেছে এবং কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে।) (৩)
আর আল্লাহ তায়ালা মুমিন ব্যক্তিকে তার আমল, উপার্জন এবং দুনিয়া থেকে আখেরাতে কী প্রেরণ করেছে; তার প্রতি দৃষ্টি দেয়ার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ ﴾وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; এবং প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।] (১)
গ. দায়িত্বশীলতা:
প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ তায়ালা পরিবার, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ, কর্মচারী এবং ছাত্র সহ প্রমূখের যে দায়িত্ব প্রদান করেছেন; এ বিষয়ে তার জবাবদিহিতা রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে সে তার দায়িত্ব পালন করবে উত্তম চরিত্র অর্জনে আদব শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা যাকে গৃহ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সামাজিক তরবিয়তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েছেন সে এ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবে এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি শিষ্টাচার মেনে চলবে অন্যকে তা মেনে চলতে বাধ্য করার পূর্বেই। আর এ দায়িত্বশীলতার কথা রাসূল সাঃ বর্ণনা করে বলেছেন: (তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। দাস তার প্রভুর সম্পদের দায়িত্বশীল। সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূল সাঃ আরো বলেছেনঃ পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের দায়িত্বশীল এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকেই তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।)(২)
আর ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ﴿ অর্থ: [প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।] (৩) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সে তার আমলের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে।(৪) আর চোখ, কান এবং ইন্দ্রীয়ের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ﴿ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا অর্থ: [আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (৫)
ঘ. বুদ্ধিবৃত্তিক তৃপ্তি:
ইসলাম বুদ্ধি-বিবেক ও তাকে সম্বোধন করার বিষয়টি এড়িয়ে যায় নি; কেননা বুদ্ধি-বিবেক হল ইসলামী বিধান আরোপের কেন্দ্রবিন্দু এবং এটা তার অধিকারীকে ধ্বংসের অতল গহ্বর থেকে রক্ষা করে। বলা হয়: আকল তথা বিবেককে বিবেক বলা হয় এ জন্য যে, সে তার অধিকারীকে ধ্বংসস্থলে পতিত হওয়া থেকে আটকে রাখে। উমর বিন খাত্তাব রাঃ বলেন: মানুষের মূল হল তার বুদ্ধি-বিবেক, তার মর্যাদা হল তার দ্বীন এবং তার ব্যক্তিত্ব হল তার চরিত্র। ইসলাম মানুষকে সম্বোধন করে তার বিবেকের দিকে লক্ষ্য করে; যেন মন্দ আচরণের কদর্যতা তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়। আর তা সে সমস্ত উত্তম গুণাবলীর সাথে তুলনা করার মাধ্যমে যা সহজাত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করে। মহান আল্লাহ বলেন: قُل لَّا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ﴿ كُثْرَةُ الْخَبِيثُ فَاتَّقُوا اللَّهَ يَأُوْلِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ মন্দের আধিক্য তোমাকে চমৎকৃত করে। কাজেই হে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরা! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।](১) অর্থাৎ, হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা জেনে রাখ যে, উপকারী সামান্য হালাল জিনিস ক্ষতিকর অধিক পরিমাণ হারাম জিনিস অপেক্ষা উত্তম। তোমরা হারাম থেকে বেঁচে থাক এবং তা পরিহার কর। হালাল বস্তুতে পরিতৃপ্ত হও এবং হালালে সন্তুষ্ট থাক।(২)
সন্তোষজনক বাধ্যবাধকতার আরেকটি দিক হল, কুরআন গীবতকে এমনভাবে চিত্রিত করে যা বিবেককে সম্বোধন করে গীবতের কদর্যতা বুঝাতে সক্ষম হয় এবং একই সময়ে মানুষের সহানুভূতিকে তার ভাইয়ের দিকে ধাবিত করে; যাতে গীবতের প্রভাবক চিত্রায়ণের মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন করা যায়। যেমন: গীবতকারীকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণকারীর সাথে সাদৃশ্য প্রদান। আর এটি এমন কর্ম যা মানুষেরা ঘৃণা করে। মহান আল্লাহ বলেন: يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابُ رَّحِيمٌ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।] (৩)
চারিত্রিক বাধ্যবাধকতার সুক্ষ্ম মানদণ্ড রয়েছে আর তা হল, আচরণের প্রতি আস্থা। কেননা অন্তর যদি আশ্বস্ত না হয় তাহলে ভয়-ভীতি ও সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয় এবং চারিত্রিক আচরণের জন্য বক্ষ উন্মুক্ত হয় না; এই বিশ্বসে যে, এতে পাপ নিহিত রয়েছে এবং মানুষেরা কর্মটি সম্পর্কে জেনে যাক এ বিষয়ে অনিচ্ছা তৈরি হয়। এ ধরণের বিষয়গুলো মুসলিম ব্যক্তি পরিহার করবে রাসূল সাঃ এর দিকনির্দেশনার প্রেক্ষিতে; যেখানে তিনি বলেছেন: (আর পাপ হল যা তোমার অন্তরে সংশয়ের সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তুমি তা অপছন্দ কর।) (৪)
আর এ জন্য শরীয়তের আলোকে বুদ্ধি-বিবেক হল জ্ঞানের অবস্থানস্থল।
৪. চারিত্রিক সহজতা:
বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলাম হল মানবজাতির প্রতি রহমত স্বরূপ; যা তাদেরকে শান্তির পথ প্রদর্শন করে, তাদের জীবনকে সুবিন্যস্ত করে এবং তাদের সৃষ্টিকর্তার সাথে তাদের সম্পর্ক ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে নির্ধারণ করে। যাতে করে তাদের আচরণ বিশৃংখল অবস্থা থেকে উন্নত হয়ে সেই প্রকৃত মানবিক পর্যায়ে উপনীত হয়; যা মানবজাতির জন্য আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন। ফলে তিনি তাঁর রাসূলকে বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েত ও রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَلَمِينَ﴿ অর্থ: [আর আমি তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।](১) ইবনে কাসীর রহিঃ বলেন: “আল্লাহ তায়ালা এ মর্মে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি মুহাম্মাদ সাঃ কে বিশ্ববাসীর প্রতি রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি রহমতটিকে গ্রহণ করে নিল এবং এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করল সে দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যবান হল। আর যে তাকে প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করল সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হল”। (২)
এ দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের চারিত্রিক গুণাবলীর মাঝে কোন কঠিনতা এবং সংকীর্ণতা থাকবে; এটি প্রায় অসম্ভব। দ্বীনের চারিত্রিক গুণাবলী হল ঐ ব্যক্তির জন্য রহমত স্বরূপ যে ইসলামের মানহায ও আদর্শ অনুসরণ করে চলে।
সুতরাং ইসলামী আদর্শের পুরোটাই মহান আদর্শ; যা ইসলামী শিষ্টাচারকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে তা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যের অনুকূল হওয়ার কারণে। ইসলামী চরিত্র ব্যক্তিকে তার সহজাত চরিত্র থেকে মুক্ত করে না বরং তাকে সেই সঠিক মানহায অনুপাতে সুবিন্যস্ত করে যা মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে এবং তাকে এমন নেতাতে পরিণত করে যে তার আশা-আকাঙ্খা ও সহজাত বৈশিষ্ট্যকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়, না তার দাস হতে নির্দেশনা দেয়। এ জন্য ইসলামী দিকনির্দেশনা মানুষের সহজাত স্বভাবের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করে, দ্বীনী বিধান আরোপকালে তাকে অস্বীকার করে না অথবা তা থেকে তাদের মুক্ত করে না। যেমন কুরআনুল কারীম সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করছে যে, মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হল সম্পদের মোহ, উপকার ও কৃপণতা প্রীতি, দুর্বলতা, হতাশা এবং অস্থিরতা।
সম্পদের প্রতি মোহ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴾وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا﴿ অর্থ: [আর তোমরা ধন- সম্পদ খুবই ভালবাস।] (৩)
আর উপকার প্রীতি যার মূল হল ধন-সম্পদ, সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَإِنَّهُ لِحُبِّ الْخَيْرِ لَشَدِيدٌ﴿ অর্থ: [আর নিশ্চয় সে ধন-সম্পদের আসক্তিতে প্রবল।] (৪)
কৃপণতা প্রীতির বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴾وَكَانَ الْإِنسَنُ قَتُورًا﴿ অর্থ: [আর মানুষ তো খুবই কৃপণ।](৫)
﴾وَلَئِنْ أَذَقْنَا الْإِنسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَئُوسُ كَفُورٌ﴿ অর্থ: [আর যদি আমি মানুষকে আমার কাছ থেকে রহমত আস্বাদন করাই ও পরে তার কাছ থেকে আমি তা ছিনিয়ে নেই তবে তো নিশ্চয় সে হয়ে পড়ে হতাশ ও অকৃতজ্ঞ।](১)
ত্বরা প্রবণতা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴾وَكَانَ الْإِنسَنُ عَجُولًا﴿ অর্থ: [মানুষ তো প্রকৃতিগতভাবে খুব বেশী তাড়াহুড়াকারী।] (২)
যুলুম ও অজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا﴿ অর্থ: [সে অত্যন্ত যালিম, খুবই অজ্ঞ।](৩)
অস্থিরতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: ﴾إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا﴿ অর্থ: [নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে।](৪)
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ * مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَتَابِ অর্থ: [নারী, সন্তান, সোনারূপার স্তুপ, বাছাই করা ঘোড়া, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট সুশোভিত করা হয়েছে। এসব দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহ্, তাঁরই নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।](৫)
আল্লাহ তায়ালা এই সহজাত চরিত্রকে সুবিন্যস্ত করেছেন, ফেলেও রাখেন নাই এবং ধ্বংসও করেন নাই। উদাহরণ স্বরূপ ইসলাম সহবাসের ক্ষমতাকে নষ্ট করে নাই বরং চরিত্র ও বংশের হেফাযত এবং মানুষকে চারিত্রিক রোগ থেকে রক্ষার নিমিত্তে তাকে সুবিন্যস্ত করেছে। যেমন ইসলাম যিনাকে হারাম করেছে পক্ষান্তরে একজন থেকে চারজন পর্যন্ত নারীকে বিবাহ করার অনুমোদন দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَعَ﴿ অর্থ: [তবে বিয়ে করবে নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন বা চার।] (৬)
আল্লাহ তায়ালার দয়ার অন্তর্গত হল, তিনি বিবাহকে করেছেন শান্তি, ভালবাসা এবং প্রশান্তির মাধ্যম। যেমন তিনি বলেন: ﴾وَمِنْ ءَايَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً﴿ ﴾وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ অর্থ: [আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া; যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সহমর্মিতা। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।] (১)
উস্তায সাইয়্যেদ কুতুব বলেন: “তবে মানুষ খুব কমই আল্লাহর এ নেয়ামতের কথা স্মরণ করে যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, তাদের অন্তরে এই সহমর্মিতা ও অনুভূতি স্থাপন করেছেন, এ সম্পর্ককে তাদের অন্তরের শান্তি, শরীরের আনন্দ, জীবনের ও জীবিকার স্থিতি, স্বামী-স্ত্রীর জন্য বন্ধুত্ব এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রশান্তিদায়ক করেছেন”।(২) এই সঠিক চারিত্রিক আচরণ, যার দ্বারা আল্লাহ তায়ালা বিশ্ববাসীর বংশধারা ও ইজ্জত রক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন; তার মাঝে সংকীর্ণতা কোথায়?
জাগতিক উপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের জন্য ক্ষতিকারক লেনদেন ইসলাম হারাম করেছে, যেমন: সুদ। আর তাদের জন্য শরীসম্মত ব্যবসা হালাল করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَوْاً﴿ অর্থ: [অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।](৩) সুতরাং ইসলাম জাগতিক উপার্জনের সহজাত বৈশিষ্ট্য ছিনিয়ে নেয় নি, বরং তাকে পরিপাটি করেছে মহান আদর্শের কাঠামোর মাঝে।
অনুরূপভাবে ইসলামী চরিত্রের সহজতা পরিস্ফুটিত হয় মানুষ, প্রাণী এবং উদ্ভীদের অপরিহার্য অনুষঙ্গ খাবার ও পানীয়ের মাঝে। সুতরাং ইসলামী চরিত্র মানুষকে খাবারের নেয়ামত এবং তার স্বাদ আস্বাদন থেকে বঞ্চিত করেনি। বরং সে তার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে যাতে অপচয় না হয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴿ অর্থ: [তোমরা অপচয় কর না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।](৪) সাধারণভাবে মহান আল্লাহ বলেন : ﴾وَابْتَغِ فِيمَا ءَاتَنَكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةً وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ অর্থ: [আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।] (৫)
বিধান আরোপের ক্ষেত্রে ইসলামী মানহাযে মানুষের প্রতি এমন কোন দায়িত্ব নেই যা করতে সে সক্ষম নয়। মহান আল্লাহ বলেন: ﴾لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا অর্থ: [আল্লাহ কারো উপর এমন কোন দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যাতীত।] (৬) অর্থাৎ, তিনি কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। আর এটি হল সৃষ্টিজীবের প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া এবং করুণা।(১) তিনি আরো বলেন: فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ অর্থ: [সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর।](২)
ইবনে কাসীর রহিঃ বলেন: অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা ও সামর্থ্য অনুযায়ী। রাসূল সাঃ বলেছেন: (হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী আমল কর। কেননা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সওয়াব দিতে ক্লান্ত হন না বরং তোমরাই ইবাদত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়। আর কম হলেও আল্লাহর কাছে স্থায়ী আমল সর্বাধিক পছন্দনীয়।) (৩) তিনি আরো বলেছেন: (আমি তোমাদের যা নিষেধ করেছি, তা থেকে বিরত থাক এবং যা তোমাদের আদেশ করেছি যথাসম্ভব তা পালন কর।)(৪) ইমাম নববী রহিঃ বলেন: “এটা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি এবং এর মাঝে অগণিত বিধিবিধান রয়েছে”।(৫) আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (রাসূল সাঃ আমার নিকট আগমন করে বললেন: আমি কি এই সংবাদ পাইনি যে, তুমি রাতে নফল নামায পড়ছ এবং দিনে রোযা রাখছ?” আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, পুনরায় এ কাজ করো না। তুমি নামায পড় এবং নিদ্রাও যাও, রোযা রাখ এবং ছেড়েও দাও। কারণ তোমার উপর তোমার দেহের অধিকার আছে, তোমার উপর তোমার চক্ষুদ্বয়ের অধিকার আছে, তোমার উপর তোমার অতিথির অধিকার আছে এবং তোমার উপর তোমার স্ত্রীর অধিকার আছে।) (৬)
এখান থেকে ইসলামী মানহাযে এবং মানব জীবন সুশৃঙ্খল করনে নৈতিক সহজতা এবং ইসলামী উদারতার বিষয়টি ফুটে উঠে। বিপরীত দিকে মানব রচিত মতবাদে, যেমন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা মনে করে যে, সুখ-সমৃদ্ধি অর্জন করা সহজাত বাসনা পরিত্যাগ করা ব্যতীত সম্ভব নয় অথবা পশ্চিমারা যেমন স্বেচ্ছাচারিতার মাঝে ব্যতীত সুখ খুঁজে পায় না।
ইসলামী চরিত্রের সহজতার দিক হল, এটি মানুষের ভুল-ভ্রান্তিকে অস্বীকার করে না। এ জন্য সে তার জন্য তাওবা ও ইস্তেগফারের দরজা উন্মুক্ত রাখে যেন সে তার ভুলের কারণে সর্বদা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় না ভোগে। মহান আল্লাহ বলেন: قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُواْ مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ অর্থ: [বলুন, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ; আল্লাহ্র অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।] (৭)
আমাদের উপর আবশ্যক হল ভুল-ভ্রান্তিতে না জড়াতে প্রচেষ্টা জারি রাখা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, সকল পরিস্থিতিতে কর্তব্যের সঠিক রূপটি আমরা অর্জন করি বরং আমরা যেন অবিরাম প্রচেষ্টা করি যাতে ইসলামী সংবিধান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং আমরা তার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পথ চলতে পারি।(১) হানযালাহ আল-উসাইদী রাঃ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম: (হে আল্লাহর রাসূল! হানযালাহ মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসূল সাঃ বললেন, সে কি কথা? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যখন আপনার নিকটে থাকি, তখন আপনি আমাদেরকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা এমনভাবে শুনান; যেমন নাকি আমরা তা প্রত্যক্ষভাবে দেখছি। অতঃপর আমরা যখন আপনার নিকট থেকে বের হয়ে যাই এবং স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও কারবারে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন অনেক কথা ভুলে যাই। -এ কথা শুনে- রাসূল সাঃ বললেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি তোমরা সর্বদা এই অবস্থায় থাকতে, যে অবস্থাতে তোমরা আমার নিকটে থাক এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতে, তাহলে ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও তোমাদের পথে তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করতেন। কিন্তু ওহে হানযালাহ! - সর্বদা মানুষের এক অবস্থা থাকে না- কিছু সময়-ইবাদতের জন্য- ও কিছু সময় -সাংসারিক কাজের জন্য-। তিনি এ কথা তিনবার বললেন।(২)
ইসলামী শিষ্টাচারিতায় এই উদারতা এবং সহজতা বিদয়াতীদের মানহাযের বিপরীত; যারা মনে করে সুলুকের পথ হল প্রথমত সম্পূর্ণরূপে দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা, অন্তরকে দুনিয়া মুক্ত করা এবং পরিবার, সম্পদ, সন্তান ও দেশের চিন্তা ঝেড়ে ফেলা।
আল্লাহ আমাদের যে জ্ঞানার্জন, আল্লাহর দিকে দাওয়াত প্রদান এবং সন্তান লালন-পালনের আদেশ দিয়েছেন -এগুলো পালন করতে বাঁধা দেয় মানুষ ও জ্ঞানার্জনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এবং পরিবার ও সন্তান-সন্ততির প্রতি অবহেলা।
ইলমের গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَلَؤُا﴿ অর্থ: [আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাকে ভয় করে।](৩) ইলম-ই হল আল্লাহর ভয়-ভীতি অর্জন ও তাঁর সন্তোষজন পন্থায় ইবাদত করার পথ। আর লালন-পালনের দায়িত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا قُوْاْ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ অর্থ: [হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর।](৪) দাওয়ার ক্ষেত্র সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন: وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ﴿ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ অর্থ: [আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।](৫)
সুতরাং মানুষ কীভাবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে, সহজতাকে কঠিন করে এবং সরলকে জটিল করে?
এ প্রেক্ষিতে আমরা ইসলামে চারিত্রিক সহজতাকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর মাধ্যমে চিহ্নিত দেখতে পায়:
১- ইসলামী আদবসমূহ মানুষের মনুষ্যত্বের বাইরে নয় এবং তাদের সক্ষমতার উর্দ্ধে নয়।
২- একজন মুসলিম তার ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও সামর্থ্যের মধ্যে ইসলামী শিষ্টাচার ও আদব পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত।
টিকাঃ
(১) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ২০)।
(২) প্রাগুক্ত (পৃ: ৮)।
(৩) সহীহ বুখারী (২/৩০৯, হা: ২৮১০), সহীহ মুসলিম (৩/১৫১২-১৫১৩, হা: ১৪৯-১৯০৪)।
(১) সহীহ বুখারী (১/১৩, হা: ১), সহীহ মুসলিম (৩/১৫১৫-১৫১৬, হা: ১৫৫-১৯০৭)।
(২) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ৭)।
(৩) প্রাগুক্ত (পৃ: ৭-৮)।
(৪) প্রাগুক্ত (পৃ: ৭-৮)।
(১) দেখুন: সহীহ বুখারী (৩/৩৮, হা: ৩৭৮০)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/১৮৯, হা: ৬৪৯১), সহীহ মুসলিম (১/১১৭, হা: ২০৩-১২৮)।
(৩) ইবনে তাইমিয়াহ, মাজমুউল ফাতাওয়া (১০/৭৬১)।
(১) সূরা আল-হাশর: (০৭)।
(২) মুহাম্মাদ আফীফী, আন-নাযরিয়্যাহ আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ১৫৭)।
(৩) প্রাগুক্ত (পৃ: ১১৩)।
(১) সূরা আল-কাহফ: (২৮)।
(২) সূরা আল-আহযাব: (৩৬)।
(৩) সহীহ বুখারী (২/২৬৭, হা: ২৬৯৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩৪৩, হা: ১৭-১৭১৮)।
(৪) সূরা আস-সফ: (২-৩)।
(১) সূরা আল-বাকারা: (৪৪)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৮৮)।
(৩) সূরা আন-নিসা: (১২৫)।
(৪) ইবনে তাইমিয়াহ, আল-ফাতাওয়া (১০/১৭৩)।
(৫) সূরা আল-মায়েদা: (৩)।
(১) সূরা আস-সফ: (৯)।
(২) সূরা আলে-ইমরান: (১০৩)।
(৩) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৩৮৭)।
(৪) সূরা আলে-ইমরান: (৮৫)।
(৫) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে。
(৬) কামাল ঈসা, কালিমাত ফিল আখলাক (পৃ: ১০৫)।
(১) সূরা আল-আহযাব: (৭২)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৫৩০)।
(৩) সূরা আল-বালাদ: (৮-১০)।
(৪) সূরা আল-শামস: (৮)।
(৫) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৫৩০)।
(৬) ফাতহুল কাদীর (৫/৪৪৯)।
(৭) সূরা আল-শামস: (৯-১০)।
(১) সূরা গাফির: (১৯)।
(২) সূরা আল-মুজাদালা: (৭)।
(৩) মুহাম্মাদ আফীফী, আন-নাযরিয়্যাহ আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ৯৭)।
(৪) সহীহ বুখারী (১/৩৩, হা: ৫০), সহীহ মুসলিম (১/৩৬, হা: ১/৮)।
(৫) সূরা আন-নাযিআত: (৩৭-৪১)।
(১) সূরা আলে-ইমরান: (৩০)।
(২) মুহাম্মাদ আফীফী, আন-নাযরিয়্যাহ আল-খুলুকিয়্যাহ (পৃ: ৯৭)।
(৩) সুনানে তিরমিযি (৪/৫২৯, হা: ২৪১৭) এবং তিনি হাদিসটিকে 'হাসান সহীহ' বলেছেন।
(১) সূরা আল-হাশর: (১৮)।
(২) সহীহ বুখারী (১/২৮৪-২৮৫, হা: ৮৯৩), সহীহ মুসলিম (৩/১৪৫৯, হা: ২০/১৮২৯)।
(৩) সূরা আল-মুদ্দাসসির: (৩৮)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/৪৭৬)।
(৫) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(১) সূরা আল-মায়েদা: (১০০)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (২/১০৭-১০৮)।
(৩) সূরা আল-হুজুরাত: (১২)।
(৪) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(১) সূরা আম্বিয়া: (১০৭)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/২১০)।
(৩) সূরা আল-ফাজর: (২০)।
(৪) সূরা আল-আদিয়াত: (৮)।
(৫) সূরা আল-ইসরা: (১০০)।
(১) সূরা হুদ: (৯)।
(২) সূরা আল-ইসরা: (১১)।
(৩) সূরা আল-আহযাব: (৭২)।
(৪) সূরা আল-মা'আরিজ: (১৯)।
(৫) সূরা আলে-ইমরান: (১৪)।
(৬) সূরা আন-নিসা: (৩)।
(১) সূরা আর-রুম: (২১)।
(২) ফী যিলালিল কুরআন (৫/২৭৬৩)।
(৩) সূরা আল-বাকারা: (২৭৫)।
(৪) সূরা আল-আ'রাফ: (৩১)।
(৫) সূরা আল-কাসাস: (৭৭)।
(৬) সূরা আল-বাকারা: (২৮৬)।
(১) তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/৩০৫)।
(২) সূরা আত-তাগাবুন: (১৬)।
(৩) সহীহ বুখারী (৪/৬৭, হা: ৫৮৬১), সহীহ মুসলিম (১/৫৪০-৫৪১, হা: ২১৫-৭৮২)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৪/১৮৩০, হা: ৬১৩৪)।
(৫) নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (৯/১০২)।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/১১৫-১১৬, হা: ৬১৩৪)
(৭) সূরা আয-যুমার: (৫৩)।
(১) মুহাম্মাদ দারাজ, দুস্তরুল আখলাক (পৃ ৪৪৫)।
(২) সহীহ মুসলিম (৪/২১০৬-২১০৭, হা: ১২-২৭৫০)।
(৩) সূরা ফাতির: (২৮)।
(৪) সূরা আত-তাহরীম: (৬)।
(৫) সূরা আলে-ইমরান: (১০৪)।