📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 চরিত্রের সংজ্ঞা

📄 চরিত্রের সংজ্ঞা


প্রথমত: আভিধানিক অর্থে চরিত্র:
আরবি (الخلق) উচ্চারণ 'লাম' বর্ণে পেশ ও সাকিন সহকারে। এর অর্থ হল: দ্বীন, স্বভাব এবং সহজাত বৈশিষ্ট্য।
আর তার হাকীকত হল, এটি মানুষের ভেতরের প্রতিচ্ছবি এবং এটি স্বয়ং, তার গুণাবলী ও সুনির্দিষ্ট তাৎপর্য হল বাহ্যিক প্রতিচ্ছবি দেহকাঠামো, তার গুণাবলী ও তাৎপর্যের পর্যায়ভুক্ত। উভয়েরই ভাল এবং মন্দ গুণাবলী রয়েছে।(১)
'মুজামুল ওয়াসীতে' এসেছে চরিত্র হল: অন্তরের স্থিতিশীল অবস্থা; যেখান থেকে ভাল বা মন্দ কর্মগুলো কোন ধরণের চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছাড়াই উদ্ভূত হয়।(২)
'খুলুক' শব্দটি মানুষ যে স্বভাব-চরিত্র অর্জন করে তা বুঝাতেও ব্যবহার হয়। যেমন বলা হয়: تخلق بخلق كذا সে অমুক চরিত্র গ্রহণ করেছে অর্থাৎ সে জন্মগত বৈশিষ্ট্যের বাইরে কোন একটি স্বভাব-চরিত্র ধারণ করেছে। অনুরূপভাবে বল হয়: 'অমুক তার স্বভাবের বাইরের চরিত্র ধারণ করেছে' অর্থাৎ সে চরিত্র গ্রহণের ভান করেছে। (৩)
রাগেব ইস্পাহানী বলেন: “যে উত্তম গুণ মানুষ তার স্বভাবের মাধ্যমে অর্জন করে; তাই চরিত্র।(৪)
আর 'ইলমুল আখলাক হল: মূল্যবোধ সংক্রান্ত বিধিবিধান যা নন্দিত বা নিন্দিত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কর্মের সাথে সম্পর্ক রাখে।(৫)
পূর্বোক্ত আলোচন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আখলাক আভিধানিকভাবে পরস্পর বিপরীতধর্মী ও কাছাকাছি অর্থে ব্যবহৃত হয়। অনুশীলনের মাধ্যমে ভাল বা মন্দ চরিত্র ধারণে মানুষের সক্ষমতার কারণে আখলাক কখনো স্বভাব, সহজাত বৈশিষ্ট্য এবং ফিতরাত অর্থে ব্যবহৃত হয় আবার কখনো কৃত্রিমভাবে স্বভাব গ্রহণ ও চরিত্র গ্রহণের ভান ধরার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। অনুরূপভাবে উত্তম মেলামেশি অর্থেও ব্যবহৃত হয়。
অন্যভাবে, আভিধানিক অর্থ প্রমাণ করছে যে আখলাকের কিছু অংশ সহজাত আর কিছু অংশ অর্জনীয়। আর উভয়েরটির ভাল ও মন্দ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
দ্বিতীয়ত: কুরআনুল কারীমের বর্ণনায় চরিত্র:
কুরআনুল কারীমের দু'টি স্থানে (خُلُق) বা চরিত্র শব্দটি এসেছে: قَالُوا سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَوَعَظْتَ أَمْ لَمْ تَكُن مِّنَ الْوَاعِظِينَ إِنْ هَذَا إِلَّا خُلُقُ ﴾الْأَوَّلِينَ অর্থ: [তারা বলল, তুমি উপদেশ দাও বা না-ই দাও উভয়ই আমাদের জন্য সমান* এটা তো কেবল পূর্ববর্তীদেরই স্বভাব।] (১)
ইবনু কাসীর রহঃ বলেন: “তারা এ কথার দ্বারা তাদের ধর্ম ও তারা যে বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তা বুঝাতে চায়। আর তা হল, তাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদাদের ধর্ম। তারা প্রকারান্তে বলে যে, আমরা তাদের অনুগামী ও তাদের জীবন-যাপন পদ্ধতির অনুসারী এবং তারা যে বিশ্বাসের উপর মৃত্যুবরণ করছে আমরাও সেভাবে মৃত্যুবরণ করব। আর পুনরুত্থান ও পরকাল বলে আদতে কিছুই নেই”।(২)
খ. মহান আল্লাহ বলেন: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ﴿ অর্থ: [আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।] (৩) অর্থাৎ, “আপনি শ্রেষ্ঠ দ্বীন ইসলামের উপর রয়েছেন”। (৪) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল: “রাসূল সাঃ কুরআনের আদেশ-নিষেধ পালনে এবং আখলাক-চরিত্রে ধারণে উত্তম দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিলেন। কুরআন যে বিষয়ে তাকে নির্দেশ দিয়েছে তিনি তা পালন করেছেন এবং যে বিষয়ে তাকে নিষেধ করেছে তা থেকে তিনি বিরত থেকেছেন। এর সাথে সাথে লজ্জাশীলতা, দানশীলতা, সাহসিকতা, সহনশীলতা এবং সকল অনুপম চরিত্রের ন্যায় যে মহান আদর্শের উপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন”। (৫) আর এর প্রতিই উম্মুল মুমেনীন আয়েশা রাঃ ইঙ্গিত করেছিলেন যখন কাতাদা রাঃ তাকে রাসূল সাঃ এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। তিনি বলেছিলেন: (তুমি কি কুরআন পাঠ কর না? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহর নবী সাঃ এর চরিত্র তো ছিল আল-কুরআনই।) (৬)
অনুরূপভাবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস রাঃ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: (আমি দশ বছর রাসূল সাঃ এর খেদমত করেছি। আল্লাহর শপথ! তিনি কখনো আমাকে উহ শব্দও বলেন নি এবং কোন বিষয়ে আমাকে এটা কেন করলে, ওটা কেন কর নি, তাও বলেন নি।) (৭) এটি রাসূল সাঃ এর খাদেমের সাথে ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ দিক। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহঃ বলেন: “আর আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ সাঃ কে যে 'মহান চরিত্র' হিসেবে বর্ণনা করেছেন তা হল পূর্ণাঙ্গ দ্বীন যা শর্তহীনভাবে আল্লাহর সকল নির্দেশনাকে অন্তর্ভুক্ত করে। এমন ব্যাখ্যা করেছেন মুজাহিদ রহঃ এবং অন্যান্য ইমামগণ। তা হল কুরআনের ব্যাখ্যা, যেমন বলেছেন আয়েশা রাঃ 'তার চরিত্র তো ছিল আল-কুরআনই।' এর হাকীকত হল প্রফুল্ল চিত্তে এবং প্রশস্ত হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালা যা পছন্দ করেন তা পালনে উদ্যোগী হওয়া”। (৮)
এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে 'খুলুক বা চরিত্র' শব্দটি শ্রেষ্ঠ দ্বীন ইসলাম বুঝাতেও প্রয়োগ করা হয়। যেমনটি দ্বিতীয় আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়। আর এটি রাসূল সাঃ এর নিরঙ্কুশ অনুসরণ এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিশুদ্ধ নিয়তকে অন্তর্ভুক্ত করে; যেন ইসলামী চরিত্রের গুণাবলী অর্জিত হয়। আবার কখনো অন্যান্য ধর্ম ও তার মাঝে সংঘটিত আচরণগত বিকৃতি বুঝাতেও প্রয়োগ করা হয়; যেমনটি প্রথম আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ, উত্তম গুণাবলী ও প্রশংসনীয় স্বভাব বুঝাতে যেমন 'খুলুক/চরিত্র' শব্দটি ব্যবহার হয় অনুরূপভাবে এবং মন্দ গুণাবলী বুঝাতেও ব্যবহার হয়; যেমন আভিধানিক অর্থে এবং কুরআনে বর্ণিত অর্থে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে।
তৃতীয়ত: হাদিসের বর্ণনায় চরিত্র: 'খুলুক' শব্দটি হাদিসে নববীর বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে; এখানে তার কিছু উদাহরণ পেশ করা হল:
ক. পুণ্য অর্থে: নাওয়াস বিন সামআন আল-আনসারী রাঃ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাঃ কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তখন তিনি জবাব দিলেন: (পুণ্য হল উন্নত চরিত্র। আর পাপ হল যা তোমার অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক - তুমি তা অপছন্দ কর)। (১) হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, উত্তম চরিত্র হল পুণ্য। আর (ā) শব্দটি সম্পর্ক, বন্ধুবাৎসল্য, সৎকর্ম, উত্তম সঙ্গ ও মেলামেশা এবং মহৎ কাজ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর এ সবগুলোর সমষ্টিই হল উত্তম চরিত্র।(২) পূর্বোক্ত হাদিসে সম্পর্কে ইবনুল কায়্যিম রহঃ বলেন: “হাদিসটি প্রমাণ করে যে, উত্তম চরিত্র হল অন্তঃকরণ ও হৃদয়ের প্রশান্তি।(৩) এ ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, উত্তম চরিত্র যাহেরী ও বাতেনী উভয় প্রকার আমলকে ধারণ করে।
খ. প্রশংসনীয় গুণাবলী ও আমলে সালেহ অর্থে: রাসূল সাঃ বলেছেন: (নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মহান তিনি মহত্বকে পছন্দ। তিনি উন্নত চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং মন্দ চরিত্রকে ঘৃণা করেন।)(৪) আনাস রাঃ বলেন: (আমি দশ বছর রাসূল সাঃ এর খেদমত করেছি। আল্লাহর শপথ! তিনি কখনো আমাকে উহ শব্দও বলেন নি এবং কোন বিষয়ে আমাকে এটা কেন করলে, ওটা কেন কর নি, তাও বলেন নি।) (৫) রাসূল সাঃ এর চরিত্র বর্ণনায় আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ বলেন: (তিনি অশ্লীল ভাষী ও অসদাচারী ছিলেন না।)(৬) রাসূল সাঃ আরো বলেন: (তোমাদের মাঝে যার স্বভাব-চরিত্র ভাল সেই তোমাদের মধ্যে সব চাইতে উত্তম।) (৭) এ সকল হাদিস প্রমাণ করে যে, আখলাকের কতক অংশ উত্তম ও প্রশংসিত। আর তা হল, যে সকল চরিত্র প্রশংসনীয় গুণাবলী, সৎকর্ম এবং মানুষের সাথে উত্তম মেলামেশার প্রতিনিধিত্ব করে।
গ. অশ্লীল স্বভাব-চরিত্র অর্থে: রাসূল সাঃ বলেন: (হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই মন্দ আখলাক, মন্দ আমল এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে।)(৮) তিনি আরো বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মহান তিনি মহত্বকে পছন্দ। তিনি উন্নত চরিত্রকে ভালোবাসেন এবং মন্দ চরিত্রকে ঘৃণা করেন।)(১) সুতরাং হাদিসে বর্ণিত ( منكرات سفاسفها) و (الأخلاق) মন্দ চরিত্র শব্দটি প্রমাণ করছে যে, চরিত্রের কিছু অংশ নিন্দনীয় ও ঘৃণিত। আর তা হল যে সকল চরিত্র ব্যক্তির খারাপ আচরণ ও হীন অভ্যাস চর্চার প্রতিনিধিত্ব করে।
ঘ. সহজাত ও জন্মগত স্বভাব অর্থে: এর প্রমাণ পাওয়া যায় আশাজ্জ আব্দুল কায়েস কে সম্বোধন করে বলা কথার মাঝে: (তোমার মাঝে দু'টি উত্তম স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন: ধৈর্য ও ধীরস্থিরতা। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি স্বভাব গড়ে তুলেছি না আল্লাহ আমাকে এ দু'টি স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছেন? রাসূল সাঃ বললেন: আল্লাহই তোমাকে এ দু'টি স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছেন। তখন তিনি বললেন: প্রশংসা করছি সেই আল্লাহর যিনি আমাকে এমন দু'টি স্বভাবের উপর সৃষ্টি করেছেন যাকে স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পছন্দ করেন।)(২) হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, উত্তম চরিত্রের কিছু অংশ সহজাত ও জন্মগত ব্যাপার; যার উপর আল্লাহ তায়ালা তার কতক বান্দাকে সৃষ্টি করে থাকেন।
হাফেয ইবনু হাজার রহঃ বলেন: “রাসূল সাঃ কে বারবার প্রশ্নটি করা এবং রাসূল সাঃ কর্তৃক তার কথাকে স্বীকৃতি দেয়া বুঝায় যে, স্বভাব-চরিত্রের কিছু অংশ জন্মগত আর কিছু অংশ অর্জনীয়”।(৩)
ঙ. অর্জনীয় স্বভাব-চরিত্র অর্থে: যে চরিত্র মানুষ চর্চা, অভ্যাস এবং প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে অর্জন করে। এ জন্য রাসূল সাঃ একজন ব্যক্তিকে উপদেশ চাওয়ার প্রেক্ষিতে তাকে নির্দেশনা দিলেন এই বলে যে: (যেখানেই থাকবে তুমি আল্লাহকে ভয় করবে। মন্দ কাজের অনুবর্তীতে নেককাজ করবে; ফলে মন্দ অপসৃত হয়ে যাবে। আর মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করবে।) (৪) (সেই ব্যক্তির জন্য আমি জান্নাতের মধ্যস্থলে একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যে উপহাস ছলেও মিথ্যা বলা বর্জন করে। আর সেই ব্যক্তির জন্য আমি জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যার চরিত্র সুন্দর।) (৫) এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মানুষ তার সামর্থের মাধ্যমে উত্তম গুণাবলী অর্জন করতে পারে এবং তা চরিত্রে ধারণ করতে পারে অবশেষে সে চরিত্র তার স্বভাব ও গুণে পরিণত হয়ে পড়ে। ফলে সে এর মাধ্যমে বিনিময়, প্রতিদান এবং সুউচ্চ মর্যাদা অর্জন করে থাকে, যেমনটি রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণ সর্বোত্তম সে-ই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় এবং কিয়ামত দিবসেও আমার খুবই নিকটে থাকবে। তোমাদের মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে বেশি ঘৃণ্য এবং কিয়ামত দিবসে আমার নিকট হতে অনেক দূরে অবস্থান করবে বাচাল, ধৃষ্ট-নির্লজ্জ এবং মুতাফাইহিক লোকজন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! বাচাল ও ধৃষ্ট-দাম্ভিকদের তো আমরা জানি কিন্তু মুতাফাইহিক কারা? তিনি বললেন: অহংকারীরা।) (৬) তিনি আরো বলেন: (কিয়ামত দিবসে মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় সচ্চরিত্র ও সদাচারের চেয়ে বেশি ওজনের আর কোন জিনিস হবে না। আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন।) (১)
এখান থেকে প্রতিভাত হয় যে, নন্দিত বা নিন্দিত যে সকল গুণাবলীতে মানুষ গুণান্বিত হয় সে সকল গুণের সমষ্টিগত নামই হল চরিত্র। সুতরাং তা যদি প্রশংসনীয় হয় তাহলে তাকে উত্তম স্বভাব-চরিত্র হিসেবে নামকরণ হয় আর যদি নিন্দিত হয় তাহলে মন্দ এবং নিকৃষ্ট স্বভাব-চরিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, চরিত্র হল এমন একটি রূপ যা দ্বারা একজন মানুষ যে কোনভাবে বিশেষিত হয়। আর এ কথার প্রমাণ বহন করে কুরআনের দু'টি আয়াত; যার একটি কুরআনিক চরিত্র এবং আরেকটি পূর্ববর্তীদের চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। যেমন আল্লাহর বাণী: ﴾إِنْ هَذَا إِلَّا خُلُقُ الْأَوَّلِينَ﴿ অর্থ: [এটা তো কেবল পূর্ববর্তীদেরই স্বভাব।] (২) আল্লাহর বাণী: ﴾وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ﴿ অর্থ: [আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।] (৩) আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা পূর্বে গত হয়েছে। অনুরূপভাবে আভিধানিক অর্থে চরিত্র মানুষের অপ্রকাশ্য রূপকে বুঝায় এবং এর ভাল ও মন্দ বিশেষণ রয়েছে। এখান থেকে বুঝা যায় যে স্বভাব-চরিত্রের সাধারণ অর্থ অভিধান, কুরআন এবং হাদিসের ভাষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চতুর্থত: পারিভাষিক অর্থে চরিত্র:
ইসলামী পরিপালনে স্বভাব-চরিত্রের সুনির্দিষ্ট ধারণা পেতে আমি এখানে কতগুলো সংজ্ঞা উল্লেখ করব:
- চরিত্র হল মানুষের নানা গুণাবলী যার মাধ্যমে সে অন্যদের সাথে আচরণ করে; চাই তা নন্দিত বা নিন্দিত হোক। ইবনু হাজার রহঃ বলেন: “সাধারণভাবে যা প্রশংসনীয় চরিত্র তা নিজের চেয়ে অন্যের সাথে হয়; সুতরাং তুমি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে এবং প্রতিশোধ নিবে না। আর বিস্তারিতভাবে ভাল গুণাবলী হল, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, দানশীলতা, ধৈর্য ধরা, কষ্ট সহ্য করা, দয়ার্দ্রতা, সহানুভূতি, অন্যের অভাব পূরণ, বন্ধুভাবাপন্নতা এবং কোমল আচরণ ইত্যাদি। আর নিন্দিত চরিত্র হল এ সব গুণাবলীর বিপরীত গুণসমূহ”। (৪)
- চরিত্রকে তার উৎসসূত্রে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এ দৃষ্টিকোন থেকে ইবনু মুফলেহ চরিত্রের সংজ্ঞায় বলেন: “চরিত্রের হাকীকত হল, এটি মানুষের ভেতরের প্রতিচ্ছবি এবং এটি নিজেই তার গুণাবলী ও তাৎপর্য। এর রয়েছে ভাল ও মন্দ বিশেষণ”। (৫) অর্থাৎ, মানুষ যে সমস্ত ভালো এবং মন্দ গুণাবলীতে বিশেষিত হয় তার সমষ্টি হল চরিত্র। এটা মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত করে; ফলে এটা যখন প্রকাশিত হয় তখন মানুষের বাহ্যিক অবয়বের অনুরূপ হয়। আর এরূপ উল্লেখ করেছেন ইমাম সাফারীনী রহঃ। (৬)
- মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দারাজ রহঃ বলেন: “চরিত্র হল ইচ্ছার মাঝে নিহিত একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি যা প্রশংসনীয় হলে ভাল ও কল্যাণকর এবং নিন্দিত হলে মন্দ ও অন্যায় বেছে নেয়ার প্রবণতা রাখে”। (৭) অর্থাৎ চরিত্রের কেন্দ্রবিন্দু হল মানুষের অভ্যন্তর, আর তার বাস্তবতার প্রকাশ ঘটে আচরণে। এ সংজ্ঞার মাধ্যমে মুহাম্মাদ দারাজ ইবনে মুফলেহ ও সাফারীনী রহিঃ এর সাথে সহমত পোষণ করেছেন। অন্য আরেকটি গ্রন্থে মুহাম্মাদ দারাজ পূর্বের সংজ্ঞার অনুরূপ সংজ্ঞা আরো বিশদভাবে ব্যক্ত করে বলেন: “চরিত্র শব্দটি সঠিক অর্থে সেই সহজাত ও অর্জিত শক্তিকে বুঝায়, যা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আচরণ প্রকাশ পায়। অন্যভাবে, চরিত্র হল আমাদের অভ্যন্তরীণ অস্তিত্বের স্থির রূপ। আর তা হল প্রতিটি সৃষ্টিজীবকে আল্লাহর দেয়া বাহ্যিক গঠনের বিপরীত। (১)
ইমাম গাযালী রহিঃ বলেন: “স্বভাব-চরিত্র অন্তরের মাঝে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রূপ, যেখান থেকে কর্মগুলো সহজে এবং অনায়াসে উদ্ভূত হয় কোন ধরণের চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছাড়াই। (২) যে রূপটি স্বভাব-চরিত্র উদ্ভূত হওয়ার উৎস সে সম্পর্কে ইমাম গাযালী রহিঃ বলেন: “তা থেকে যদি মন্দ কর্মসমূহ প্রকাশ পায় তাহলে সে উৎস রূপটিকে মন্দ চরিত্র নামে নামকরণ করা হয়। আর আমরা তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত রূপ বলেছি; কেননা যে ব্যক্তি হঠাৎ আগত প্রয়োজনে কদাচিৎ অর্থ খরচ করে তার এ চরিত্রকে দানশীলতা বলা হয় না যতক্ষণ না এটি তার অভ্যন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত না হয়। আর 'তা থেকে কর্মগুলো সহজে উদ্ভূত হয় কোন ধরণের চিন্তা ছাড়াই' শর্তটি আরোপ করেছি; কেননা যে ব্যক্তি কষ্টচিত্তে সম্পদ ব্যয় করে অথবা রাগের সময় চেষ্টা করে ও সতর্কতার সাথে নিরবতা অবলম্বন করে; তার এ ধরণের চরিত্রকে দানশীলতা ও সহনশীলতা বলা হয় না।(৩)
কোন কোন বিদ্বান 'খুলুক' ও 'তাখাল্লুক' এর মাঝে পার্থক্য করেছেন। রাগেব ইস্পাহানী রহিঃ বলেন: "খুলুক' বা চরিত্র ও 'তাখাল্লুক' বা আচরণ এর মাঝে পার্থক্য হল, ‘তাখাল্লুক' এর সাথে পরিশ্রম ও নিরুৎসাহ রয়েছে এবং বাইরে থেকে উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রয়োজন হয়। আর 'খুলুক' এর সাথে স্বতঃস্ফূর্ততা ও প্রফুল্লতা থাকে এবং বাইরে থেকে উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রয়োজন হয় না।(৪)
আর বাস্তবে স্বভাব-চরিত্রের জন্য পূর্ব থেকে স্বভাব ধারণ ও অভ্যস্ত হওয়া অপরিহার্য। আর সেটি হল নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্র। আর উদ্দেশ্য যত শক্তিশালী হবে ব্যক্তির অভ্যন্তরে আচরণ তত দ্রুত স্থিতি লাভ করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি বিনয় প্রকাশ করে বা সাময়িক দুনিয়াবী স্বার্থে অর্থ ব্যয় করে তার এ চরিত্র হারিয়ে যাবে উদ্দেশ্য লোপ পাওয়ার সাথে সাথে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য হল আল্লাহর ইবাদত করা বা তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিদান ও সওয়াবের প্রত্যাশা করা; তার চরিত্রটি স্থায়ী হওয়ার অধিক নিকটবর্তী। আর তা শক্তিশালী উদ্দেশের কারণে। এখান থেকে আমরা পাই যে, তারবিয়াহ ইসলামিয়াহ এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণসমূহের অন্যতম হল, এটি সেই ইসলামী আকীদা থেকে উৎসারিত যেটি সৃষ্টিজীবের পক্ষ থেকে প্রতিদানের চেয়ে সৃষ্টিকর্তার উত্তম ও স্থায়ী প্রতিদানকে শ্রেষ্ঠতর মনে করে। কেউ যদি তা প্রত্যাশা করে তার প্রতিদান ও সওয়াব অর্জিত হয়। যেমনটি মহান আল্লাহর বাণীতে বর্ণিত হয়েছে: إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا [অর্থ: [শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়।] (৫) আল্লাহ তায়ালা উত্তম চরিত্রের জন্য ব্যাপক প্রতিদান দিয়েছেন। রাসূল সাঃ বলেছেন: (নিশ্চয় মুমিন ব্যক্তি তার উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে নফল সিয়াম পালনকারী এবং সালাত আদায় কারীর মর্যাদা লাভ করে থাকে।) (৬)
রাগেব ইস্পাহানীর কাছাকাছি সংজ্ঞার প্রতি ইশারা করেছেন ইমাম মাওয়ারদী। তিনি (الخيم) যা জন্মগত স্বভাব বুঝায় এবং (خلق) যা অর্জিত স্বভাব বুঝায়; এতদুভয়ের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করে বলেন: জন্মগত স্বভাবকে খীম বলে আর অর্জিত স্বভাবকে খুলুক বলে।(১)
আবার কেউ কেউ শরীয়ত ও বুদ্ধি-বিবেক এর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত স্বভাবকে 'খুলুক' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আবুল ইয়াজিদ আল-আজমী বলেন: 'খুলুক' বা স্বভাব-চরিত্র হল এক ধরণের চর্চা ও অনুশীলন যাকে শরীয়ত ও বুদ্ধি-বিবেক মানুষের অবস্থার জন্য কল্যাণকর ও তাদের দু'টি সৌভাগ্য নিশ্চিতকারী হিসেবে মনে করে। পার্থিব জীবনে সহাবস্থানের সৌভাগ্য ও আখেরাতে সওয়াব ও নেয়ামত প্রাপ্তির সৌভাগ্য।(২)
কতক বিদ্বান আখলাককে উত্তমতার দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইমাম হাসান বসরী রহিঃ বলেন: "উত্তম চরিত্রের হাকীকত হল: সৎকর্ম করা, কষ্টদানে বিরত থাকা এবং চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা”।(৩) আবার কারো মতে উত্তম চরিত্র হল: "দান করা, কষ্টদানে বিরত থাকা এবং চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা”।(৪) ইবনুল কায়্যিম রহিঃ বলেন: “উত্তম চরিত্র হল দান করা, কষ্টদানে বিরত থাকা এবং কষ্ট সহ্য করা। কারো মতে: ভাল কাজ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা। আবার কারো মতে: মন্দ চরিত্র পরিহার করা এবং ভাল চরিত্র গ্রহণ করা”। (৫)
কাজী আয়ায রহিঃ বলেন: “উত্তম চরিত্র হল মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করা, তাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা, সহমর্মিতা দেখান, তাদেরকে সহ্য করা, তাদের সমস্যা দূর করা ও অপছন্দনীয় বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করা, তাদের সাথে অহংকার পরিহার করা ও জবান সংযত রাখা, তাদের প্রতি কঠোরতা ও রাগ প্রদর্শন এবং তাদের নিন্দা করা পরিহার করা”। (৬) ইবনে রজব রহিঃ বলেন: “উত্তম চরিত্র দ্বারা কখনো শরীয়তের নির্দেশিত আখলাক ধারণ করা এবং আল্লাহ প্রদত্ত সে আদব গ্রহণ করা বুঝায়; যে আদব দ্বারা তিনি স্বীয় গ্রন্থে তাঁরা বান্দাদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন”। (৭)
ইবনে তাইমিয়া রহিঃ বলেন: “মানুষের সাথে উত্তম আচরণের সমষ্টি হল যে ব্যক্তি তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে সালাম প্রদানের মাধ্যমে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাকে সম্মান করা ও তার জন্য দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, তার প্রশংসা করা ও তাকে দেখতে যাওয়া। যে ব্যক্তি তোমাকে শিক্ষা, সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছে; তাকে দান করা এবং যে ব্যক্তি তোমার প্রতি যুলুম করেছে রক্তপাত ঘটিয়ে বা সম্পদ নিয়ে অথবা সম্মান হানি করে; তাকে ক্ষমা করা। এগুলোর মাঝে কিছু ওয়াজীব আর কিছু মুস্তাহাব”। (৮) আব্দুর রহমান আল-মায়দানী বলেন: “স্বভাব-চরিত্র হল অন্তরের মাঝে স্থিতিশীল-সহজাত বা অর্জনীয়- এমন বৈশিষ্ট্য যার প্রভাব রয়েছে আচরণে; চাই তা ভাল হোক বা মন্দ”। (৯) সুতরাং তিনি মানুষের বৈশিষ্ট্যাবলী আকস্মিক আগত প্রতিটি আচরণকে তার স্বভাব থেকে বাদ দেন; চাই সেই আচরণ ভাল হোক বা মন্দ। তাই যতক্ষণ না আচরণটি তার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সে আচরণটিকে চারিত্রিক আচরণ হিসেবে গণ্য করেন না। অনুরূপভাবে আল-মায়দানী মানুষের ভাল-মন্দ সকল বৈশিষ্ট্যকে আখলাক গণ্য করেন। সুতরাং আখলাক মন্দ গুণাবলী ব্যতীত শুধু উত্তম গুণাবলীর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন: “উত্তম চরিত্র হল অন্তরের মাঝে সহজাত ও অর্জিত একটি স্থির বৈশিষ্ট্য; যা জ্ঞানীদের নিকট প্রশংসনীয় ঐচ্ছিক আচরণের দিকে চালিত করে। যেমন: প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যাওয়া সত্ত্বেও সত্য, কল্যাণ ও সৌন্দর্যকে গ্রহণ করা এবং প্রবৃত্তি বা কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে যাওয়া সত্ত্বেও মিথ্যা, মন্দ ও কদর্যতাকে পরিত্যাগ করা”।(১) মন্দ চরিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন: “তা হল অন্তরের মাঝে সহজাত ও অর্জিত একটি স্থির বৈশিষ্ট্য; যা জ্ঞানীদের নিকট নিন্দনীয় ঐচ্ছিক আচরণের দিকে চালিত করে। যেমন: প্রবৃত্তি ও কামনার অনুসরণে মিথ্যা, মন্দ ও কদর্যতাকে গ্রহণ করা এবং সত্য, কল্যাণ ও সৌন্দর্যকে পরিত্যাগ করা”। (২)
বাস্তবে নিন্দিত চরিত্র মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য নয় বরং তা মানুষের ভাল বা মন্দ গ্রহণের ক্ষমতা থাকার কারণে অর্জনীয় বৈশিষ্ট্য; কেননা মানুষের ফিতরাতের মূল হল নিস্কুলষতা। যেমনটি রাসূল সাঃ তার রবের থেকে বর্ণনা করে বলেছেন: (... আমি আমার সমস্ত বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দেয়।) (৩) হাদিসে বর্ণিত হুনাফা তথা একনিষ্ঠ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: মুসলিম করে, কারো মতে: পাপাচার থেকে পবিত্র করে, আবার কারো মতে: হেদায়াত কবুলের উপযুক্ত করে। (৪)
মিকদাদ ইয়ালজিন বলেন: "ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আখলাককে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে যে, আখলাক হল মানবীয় আচরণকে সুবিন্যস্তকারী কিছু নিয়ম-কানুন ও মূলনীতি যাকে অহী নির্ধারণ করছে মানুষের জীবনকে সুবিন্যস্ত করা এবং অন্যের সাথে তার সম্পর্ককে এমনভাবে নির্ধারণ করার লক্ষ্যে যেন এ বিশ্বে তার উপস্থিতির উদ্দেশ্য পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে পারে”।(৫)
এ সংজ্ঞা প্রদানের মাধ্যমে মিকদাদ আখলাককে সংজ্ঞায়িত করেছেন তার উৎস বিবেচনায়; যার মাধ্যমে মানবীয় আচরণ সুশৃঙ্খলিত হয়। এ থেকে বলা যেতে পারে যে, মিকদাদ ইয়ালজিন আখলাক পরিভাষাকে মন্দ চরিত্র বা নিন্দিত বৈশিষ্ট্যের উপর প্রয়োগকে অসম্ভব মনে করেন; কেননা ইসলামের মাঝে নিন্দিত বলে কোন কিছু নেই।
আখলাক এর কিছু প্রশংসনীয় আর কিছু নিন্দনীয়। আর উভয় প্রকার মানুষের আচরণে সমবেত হয়। এ সবগুলোর সংজ্ঞা নিম্নে স্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হল: ১- উত্তম চরিত্র হল: আল্লাহ প্রদত্ত মানহায অনুযায়ী ভাল উদ্দেশ্যে লালিত সমস্ত ভাল গুণ।
উপরোক্ত সংজ্ঞার বিশ্লেষণ:
'সমস্ত ভাল গুণ' শর্তের দ্বারা মন্দ গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে পরিহার করা হয়েছে。
'ভাল উদ্দেশ্যে' কথা দ্বারা সে সমস্ত ভাল গুণকে পরিহার করা হয়েছে যে গুলোর সাথে হারাম বা মাকরূহ নিয়ত যুক্ত হয়েছে। যেমন: রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা এবং সুনাম-সুখ্যাতির ইচ্ছা পোষণ করা যেন লোকেরা তাকে দানশীল হিসেবে আখ্যায়িত করে। অথবা জিহাদে বীরত্ব প্রদর্শন করা যেন লোকেরা তাকে বাহাদুর হিসেবে সম্বোধন করে।
'আল্লাহ প্রদত্ত মানহায অনুযায়ী' বাক্য দ্বারা সে সমস্ত চরিত্রকে বর্জন করা হয়েছে যে সমস্ত চরিত্র নষ্ট অভিরুচী, বিকৃত চিন্তা-চেতনা এবং অন্ধ অনুসরণের প্রেক্ষিতে অনুশীলন করা হয়।
এই জন্য চারিত্রিক আচরণ সঠিক ও একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া অপরিহার্য। কিন্তু যদি আচরণটি সঠিক হয় তবে তা খালেসভাবে আল্লাহর জন্য না হয়; তাহলে আচরণটি উত্তম বলে বিবেচিত হলেও ধারকব্যক্তি উত্তম নয় -তবে যদি তার নিয়ত ভাল হয়। যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন উত্তম শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত কিন্ত এটি তার উদ্দেশ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং নিয়তের প্রয়োজন অনুভবকারী। যেমন হাদিসে এসেছে: (একব্যক্তি নবী সাঃ এর কাছে এস বলল, একজন গনীমত লাভের জন্য, একজন প্রসিদ্ধ হওয়ার জন্য এবং একজন বীরত্ব দেখানোর জন্য জিহাদে শরীক হল। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করল? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর কালিমা বুলন্দ থাকার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করল, সে-ই আল্লাহর পথে জিহাদ করল।) (১) তিনি আরো বলেছেন: (সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য তার নিয়ত অনুযায়ী। অতএব, যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ এর উদ্দেশ্যে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ এর উদ্দেশ্যে হয়েছে বলেই গণ্য হবে। আর যার হিজরত হয় দুনিয়া হাসিলের জন্য বা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্য, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে-যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে。)(২)
সুতরাং আমলকারীর আমলের সওয়াব তার নেক নিয়ত অনুসারে হয়ে থাকে এবং তার আমলের শাস্তিও তার নষ্ট নিয়ত অনুযায়ী হয়ে থাকে। কাজেই কারো নিয়ত যদি মুবাহ পর্যায়ের হয় তাহলে তার আমলটিও মুবাহ হিসেবে গণ্য হবে; ফলে সে কোন সওয়াব বা শাস্তি লাভ করবে না। সুতরাং আমল নেক বা ফাসেদ বা মুবাহ হওয়াটা নির্ভর করে আমলটিল নিয়তের উপর। (৩)
২-মন্দ চরিত্র হল: আল্লাহর মানহাযের বাইরে লালিত সমস্ত গুণ।
উপরোক্ত সংজ্ঞার বিশ্লেষণ:
'সমস্ত গুণ' শব্দযুগল নিঃশর্তভাবে সমস্ত মন্দ চরিত্র এবং নেক-নিয়ত হীন উত্তম চরিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে।
আর 'আল্লাহর মানহাযের বাইরে' বাক্যংশ দ্বারা সে সকল গুণাবলী এর অন্তর্ভুক্ত হবে না যেগুলোকে শরীয়ত স্বীকৃতি দিয়েছে বা পালন করতে নির্দেশ দিয়েছে।
৩- চারিত্রিক আচরণ হল: সে সকল গুণাবলী যেগুলোকে একজন ব্যক্তি নিজের মাঝে অথবা অন্যের সাথে আচরণে ধারণ করে এবং তা তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে; চাই সে সকল গুণাবলী সহজাত বা অর্জনীয় হোক, নন্দিত বা নিন্দনীয় হোক।
উপরোক্ত সংজ্ঞার বিশ্লেষণ:
'সে সকল গুণাবলী যেগুলোকে একজন ব্যক্তি ধারণ করে' বাক্য দ্বারা মানুষের সে সকল বৈশিষ্ট্যকে পরিহার করা হয়েছে যেগুলোকে মানুষ কম অনুশীলন করে। ফলে কম অনুশীলনের কারণে সে গুলোকে সহজাত চরিত্র বলা যায় না।
'নিজের মাঝে' শর্ত দ্বারা কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়েছে যা ব্যক্তির মাঝে থাকে কিন্তু অন্যের সাথে আচার-ব্যবহারে সে বৈশিষ্ট্যের সরাসরি কোন প্রভাব থাকে না। যেমন: সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ, পরিচ্ছন্ন পোশাক এবং দেহের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা।
'অথবা অন্যের সাথে' শর্ত দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চারিত্রিক গুণাবলীর দু'টি দিক রয়েছে। একটি ব্যক্তিগত দিক, আরেকটি সামাজিক দিক। আর চারিত্রিক আচরণ উভয় প্রকারকে অন্তর্ভুক্ত করে।
'তা তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে' শর্ত দ্বারা সে চরিত্রকে পরিহার করা হয়েছে যে চরিত্রটি ব্যক্তির মাঝে অপ্রতুল বা কম দেখা যায়। যেমন: যে ব্যক্তি দানশীল হিসেবে পরিচিত, তার থেকে যদি কখনো বিপরীত চরিত্র প্রকাশ পায় তাহলে সেটিকে বিরল হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এর জন্য তাকে কৃপণ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না।
'চাই সে সকল গুণাবলী সহজাত বা অর্জনীয় হোক' বাক্য দ্বারা গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যে, চারিত্রিক গুণাবলীর কিছু অংশ সহজাত আর কিছু অংশ অর্জনীয়।
'নন্দিত বা নিন্দনীয় হোক' উক্তি দ্বারা বুঝান হয়েছে যে চারিত্রিক আচরণের কিছু অংশ প্রশংসনীয়; ফলে বল যায় যে, অমুক প্রশংসনীয় আচরণের অধিকারী। আর কিছু অংশ নিন্দনীয় ফলে বলা যায় যে, অমুক নিন্দনীয় আচরণের অধিকারী।
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, চরিত্রের কিছু অংশ প্রশংসনীয় আর কিছু অংশ নিন্দনীয়। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি প্রশংসনীয় চরিত্র ধারণ করে তাহলে তার চরিত্রটি তখনই উত্তম বলে বিবেচিত হবে যখন তার সাথে নেক নিয়ত যুক্ত হবে। আর যদি কোন ব্যক্তি অপ্রতুলভাবে মন্দ চরিত্র ধারণ করে তাহলে তাকে ঐ চরিত্র দিয়ে চিত্রিত করা হবে না; কেননা এটি তার স্বভাবসূলভ চরিত্র নয়। যদিও তার এ মন্দ চরিত্রের কারণে তাকে তিরস্কৃত করা হয় বা কখনো জবাবদিহি করা হয়; যার বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।

টিকাঃ
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১/৮৬)।
(২) ফিরোজ আবাদী, আল-কামুক আল-মুহীত (৩/২২৯)।
(৩) মাজমাউল লুগাহ, (১/২৫২)।
(৪) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (১০/৮৭)।
(৫) মাজমাউল লুগাহ, (১/২৫২)।
(১) সূরা আশ-শুআ'রা: (১৩৬-১৩৭)।
(২) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৩৫৫)।
(৩) সূরা আল-কলম: (০৪)।
(৪) তাফসীরে ইবনে কাসীর: (৪/৪২৯)।
(৫) প্রাগুক্ত (৪/৪২৯)।
(৬) সহীহ মুসলিম (১/৫১২-৫১৩)।
(৭) সহীহ বুখারী (৪/৯৮, হা: ৬০৩৮), সহীহ মুসলিম (৪/১৮০৪)।
(৮) মাজমুউর রাসায়েল (১/২৩৪)।
(১) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৮০, হা: ১৪-২৫৫৩)।
(২) ইমাম নববী, শরহে সহীহ মুসলিম (১৬/১১১)।
(৩) মাদারেজুস সালেকীন (২/৩১৯)।
(৪) মুস্তাদরাকে হাকেম (১/৪৮), খারায়েত্বী, মাকারেমুল আখলাক (পৃ: ৫৫), জামেউস সগীরে (১/৩৭০, হা: ১৮০০) শাইখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৫) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৬) আরবি 'ফুহশুন' শব্দটি সকল মন্দ অভ্যাস বুঝাতে ব্যবহৃত হয়; সুতরাং মন্দ কথা ও কাজ উভয়টির ক্ষেত্রেই শব্দটি প্রয়োগ হয়ে থাকে। আর 'মুতাফাহেহশ' এর অর্থ হল, যে স্বেচ্ছাই ও স্বজ্ঞানে মন্দ কথা ও কাজ করে। আন-নিহায়া (৩/৪১৫), আল-মুফরাদাত (পৃ: ৩৭৩-৩৭৪)।
(৭) সুনানে তিরমিযি (৫/৫৩৬, হা: ৬০২৯), মুস্তাদরাকে হাকেম (১/৫৩২) এবং তিনি বলেন: হাদিসটির সনদ ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ। জামেউস সগীরে (১/২৭৮, হা: ১২৯৮) শাইখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৮) সুনানে তিরমিযি (৫/৫৩৬, হা: ৩৫৯১), মুস্তাদরাকে হাকেম (১/৫৩২) এবং তিনি তিনি বলেন: হাদিসটির সনদ ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ। জামেউস সগীরে (১/২৭৮, হা: ১২৯৮) শাইখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(২) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৩) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৫৯)।
(৪) সুনানে তিরমিযি (৪/৩১২-৩১৩, হা: ১৯৮৭), মুসনাদে আহমাদ (৫/১৫৩), সহীহ সুনানে তিরমিযিতে (১৬১৮-২০৭০) শাইখ আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
(৫) সুনানে আবু দাউদ (১/১৫০, হা: ৪৮০০), সুনানে তিরমিযি (৪/৩১৫, হা: ১৯৯৪), সুনানে ইবনে মাজাহ (১/১৯-২০, হা: ৫১) সিলসিলাতুল আহাদিসে (২৭৩) শাইখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(৬) সুনানে তিরমিযি (৪/৩২৫, হা: ২০১৮), মুসনাদে আহমাদ (৪/১৯৪), শাইখ আলবানী সহীহ জামেউস সগীরে (১৫৩৫) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৫০, হা: ৪৭৯৯), সুনানে তিরমিযি (৪/৩১৮-৩১৯, হা: ২০০২) এবং তিনি হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন, মুসনাদে আহমদ (৬/৪৪২, ৪৪৬, ৪৫১, ৪৫২) সহীহ সুনানে তিরমিযিতে (১৬২৮-২০৮৭) শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(২) সূরা আশ-শুআ'রা: (১৩৭)।
(৩) সূরা আল-কলম: (০৪)।
(৪) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৪৫৬)।
(৫) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরঈয়্যাহ (২/২০৫)।
(৬) আস-সাফারীনী, গিযাউল আলবাব (১/৩৬০)।
(৭) মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, দিরাসাত ইসলামিয়্যাহ (পৃ: ৮৮)।
(১) মুহাম্মাদ দারাজ, দুস্তরুল আখলাক ফিল কুরআন (পৃ: ৬০৫)।
(২) গাযালী, এহইয়াউ উলুমুদ্দীন (৩/৫৩)।
(৩) প্রাগুক্ত (৩/৫৪)।
(৪) রাগেব ইস্পাহানী, আয-যারিয়া ইলা মাকারিমিশ শরীয়া (পৃ: ১২২)।
(৫) সূরা আল-ইনসান: (৯)।
(৬) সুনানে আবু দাউদ (৫/১৫০, হা: ৪৭৯৯), ইমাম হাকেম স্বীয় মুস্তাদরাক গ্রন্থে (১/১৯৫, হা: ১৮৬) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
(১) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরঈয়্যাহ (২/২০৫)।
(২) আবুল ইয়াজিদ আল-আজমী, আস-সুলুক আল-খুলুকী, মাজাল্লাতুল জুনদী (সংখ্যা: ৩৯, পৃ: ৪)।
(৩) ইবনে মুফলেহ, আল-আদাব আশ-শরঈয়্যাহ (২/২০৭)।
(৪) ইবনে তাইমিয়াহ, আল-ঈমান (পৃ: ১০)।
(৫) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩১৯)।
(৬) সানআনী, সুবুলুস সালাম (৪/১৫১৭)।
(৭) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ২৩৯)।
(৮) মাজমুউর রাসায়েল (পৃ: ২৩৪)।
(৯) আল-আখলাক আল-ইসলামিয়্যাহ (১/১০)।
(১) প্রাগুক্ত (১/১৬)।
(২) প্রাগুক্ত (১/১৬)।
(৩) সহীহ মুসলিম (৪/২১৯৭, হা: ১৩-২৮৬৫)।
(৪) নববী, শরহে মুসলিম (১৭/১৯৭)।
(৫) আত-তারবিয়াহ আল-আখলাকিয়াহ ফিল ইসলাম (পৃ: ৭৫)।
(১) সহীহ বুখারী (২/৩০৯, হা: ২৮১০), সহীহ মুসলিম (৩/১৫১২-১৫১৩, হা: ১৪৯-১৯০৪)।
(২) সহীহ বুখারী (১/১৩, হা: ১), সহীহ মুসলিম (৩/১৫১৫-১৫১৬, হা: ১৫৫-১৯০৭)।
(৩) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম।

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 শিষ্টাচার সম্পর্কিত নীতিমালাসমূহ

📄 শিষ্টাচার সম্পর্কিত নীতিমালাসমূহ


‘যাবেত’ বা নীতিমালার সংজ্ঞা:
‘যবত’ শব্দের অর্থ হল: কোন কিছুর সাথে লেগে থাকা ও তাকে আবদ্ধ করা। আর কোন কিছুকে আয়ত্ব করা হল তা দৃঢ়তার সাথে সংরক্ষণ করা।(১)
সুতরাং ‘যাবেত’ বা নীতিমালা অর্থ হল, যে কোন কিছুকে সীমাবদ্ধ করে রাখে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজের শর্তাধীন করে রাখে।
আর শিষ্টাচার সম্পর্কিত নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল মানবীয় আচরণের সীমানির্ধারণী ও শর্তারোপকারী নীতিসমূহ।
নীতিমালার প্রকারভেদ:
এই বিষয়ে এবং এর অনুরূপ বিষয়গুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অংশ মনোযোগের দাবী রাখে তা হল, এর উৎস, শাখা-প্রশাখা এবং এটি বোঝার পদ্ধতির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা; যাতে এর অন্বেষণকারীগণ অদূরদর্শীতার গোলকধাঁধা থেকে দূরে থাকতে পারে। ফলে যা শিষ্টাচারের অংশ নয় তাকে সে শিষ্টাচারের অন্তরর্ভুক্ত করবে না এবং যা তার অন্তর্ভুক্ত তাকে সে খারিজ করে দিবে না।
এই বিষয়টির জন্য এমন নীতিমালা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন যে নীতিমালার ছায়ায় এটি চলমান; যাতে এটি বিপথগামী হয়ে ধ্বংস হয়ে না যায়। আর এই নীতিমালাগুলো তিনটি পয়েন্টে সুনির্দিষ্ট করা যায়:
১- শরয়ী নীতিমালা।
২- উরফ বা প্রথাগত নীতিমালা।
৩- মনস্তাত্ত্বিক নীতিমালা।
প্রথমত: শরয়ী নীতিমালা:
শরয়ী নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল কুরআন ও সুন্নাহর সে সব দলীল যার দাবীর আলোকে সম্বোধিত ব্যক্তি কাজে বা কথায় সম্পাদন করতে বা বর্জন করতে বাধ্য। আর এটি পাঁচভাবে হয়ে থাকে: (২)
১- হারাম আচরণসমূহ:
আর তা হল ঐ সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ যা থেকে শরীয়ত প্রণেতা হারামের দৃষ্টিকোণ থেকে নিষেধ করেছেন। যেমন: কথায় বা কাজে মাতাপিতার অবাধ্যাচরণ অথবা মিথ্যা বলা, অন্যায় করা এবং জুলুম করা।
এর অন্তর্ভুক্ত হবে প্রজ্ঞাবান শরীয়ত প্রণেতার নির্দেশের বিপরীত কর্ম সম্পাদন করা এবং ওয়াজীবের ভঙ্গিতে শরীয়ত প্রণেতা যা করতে নির্দেশ দিয়েছে তা সম্পাদন না করা।
২- মাকরূহ আচরণসমূহ:
সে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ যা থেকে শরীয়ত প্রণেতা মাকরূহ তথা অপছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে নিষেধ করেছেন। আর তা বর্জন করা সম্পাদন করার চেয়ে উত্তম। এ পরিভাষাটি কখনো বারণকৃত বিষয়ে এবং অপছন্দনীয় বিষয়ের উপর প্রয়োগ হয়ে থাকে। ফলে এটি সম্পাদন করার সাথে শাস্তি সম্পর্কযুক্ত নয়।(১) যেমনঃ বাম হাতে গ্রহণ করা এবং বাম হাত দিয়ে কোন কিছু প্রদান করা。
৩- ওয়াজীব আচরণসমূহ:
যে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ এর বিষয়ে শরীয়ত প্রণেতা ওয়াজীবের দৃষ্টিকোণ থেকে পালনের আদেশ করেছেন। যেমনঃ মাতাপিতার সাথে সদাচার, সত্য কথা বলা, ওয়াজীব বিধান পালনে ধৈর্য ধারণ করা, আমানত বুঝিয়ে দেয়া এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।
৪- মুস্তাহাব আচরণসমূহ:
যে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ এর বিষয়ে শরীয়ত প্রণেতা মুস্তাহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে তা পরিত্যাগ করার কারণে কোন শাস্তি নেই; তবে তা পালন করলে সওয়াব রয়েছে। যেমনঃ ডান হাত দ্বারা কোন কিছু গ্রহণ করা।
৫- মুবাহ আচরণসমূহ:
যে সকল মৌখিক ও আমলগত আচরণ এর সাথে কোন আদেশ ও নিষেধের সম্পর্ক নেই। যেমন: মেহমানদের সামনে খাবার পরিবেশনের পদ্ধতি এবং পেশকৃত খাবারের প্রকার।
সুতরাং যদি মুবাহ কর্মের সাথে হারাম অথবা মাকরূহ যুক্ত হয়ে যায় তখন তার বিধান সে অনুযায়ী হবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় যে মেহমানদারির পদ্ধতির সাথে হারাম বা মাকরূহ বিষয় যুক্ত হওয়া; যেমনঃ অপচয়। অথবা মুবাহ কর্মের সাথে ওয়াজীব বা মুস্তাহাব বিষয় যুক্ত হলে তখন তার বিধান তদানুসারে হবে। যেমনঃ রাস্তায় বসলে চোখ অবনত রাখা, কষ্ট না দেয়া এবং সালামের জওয়াব দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত: উরফ বা প্রথাগত নীতিমালা:
উরফ বা প্রথাগত নীতিমালা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষ যে সকল মুবাহ বিষয় সম্পাদন বা পরিহারে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, পরিহার বা সম্পাদনের মাধ্যমে তাদের প্রথার বিরোধীতাকে সমাজের স্বীকৃত আদব এর লঙ্ঘন হিসেবে দেখে।
উরফ বা প্রথার মূল শরীয়তে স্বীকৃত। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে: (মুসলিমগণ যেটাকে ভালো মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট ভালো। আর তারা যেটাকে মন্দ মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট মন্দ।) (১)
অভ্যাস ও প্রথার গুরুত্ব হল এই যে, ইসলামী ফিকহে অনেক মাসয়ালা এর উপর নির্ভর করে। তন্মধ্যে কিছু আচরণগত দিকের সাথে সম্পৃক্ত; যেমন: কারিগরদের কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক রীতি, মৌখিক সম্মতি ছাড়াই মেহমানের জন্য পেশকৃত খাবার থেকে খাওয়া, প্রতিযোগিতা ও কুস্তিতে এবং পতিত ফল গ্রহণের ক্ষেত্রে পালনীয় রীতি। আর ব্যক্তি মালিকানাধীন নালা ও খাল থেকে নিজে পানি পান ও পশুকে পান করানোর ক্ষেত্রে মৌখিক অনুমতি বিবেচ্য বিষয়।(২)
অনুরূপভাবে মানুষেরা পারস্পরিক যে রীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে পরিচিত ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে সাক্ষাতে সালাম বিনিময়ের পর স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া এবং অবস্থা বিবেচনায় বাসায় নিমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে প্রতিবেশী ও মেহমানের সম্মানার্থে এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর মেহমানকে আমন্ত্রণ করা অথবা গাড়ি ড্রাইভিং এর অনাবশ্যক এমন বিশেষ আদব যা পরিহারে কোন ক্ষতি নেই।
সামাজিক আদব ক্ষেত্র অনুযায়ী হয়ে থাকে, এজন্য আমরা বিভিন্ন রীতি প্রত্যক্ষ করে থাকি; যেমন: আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, বাণিজ্যিক রীতিনীতি, প্রশাসনিক রীতি, কর্মচারী নীতি এবং পারিবারিক রীতি। এ সকল নানাবিধ রীতিনীতি সরকার আরোপ করেনি বরং বাস্তবে চর্চার মাধ্যমে সে নিজেই আরোপ করেছে। (৩)
সামাজিক প্রথা শর্তহীনভাবে আবশ্যিক স্বভাব-চরিত্র নয় বরং তার জন্য শর্ত রয়েছে। নতুবা সামাজিক প্রথার ছদ্মাবরণে ইসলামী শিষ্টাচারের মাঝে তার সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় অনুপ্রবেশ করবে। নিম্নে উরফ বা সামাজিক প্রথার শর্তসমূহ সংক্ষেপে পেশ করা হল:(৪) ১- অভ্যাস এবং প্রথাটি বহুলপ্রচলিত হওয়া। ২- আচরণের ক্ষেত্রে যে প্রথাটি মধ্যস্থতাকারী হবে তা অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। অর্থাৎ প্রথাটি আচরণের সময়ের পূর্বেই যেন ঘটে, তারপর তার সময়ের সাথে চলতে থাকে এবং তার সাথে তুলনা করা হয়। চাই আচরণটি মৌখিক বা কর্মগত হোক। ৩- উরফ বা প্রথা যেন প্রমাণিত দলীল বা শরীয়ার অকাট্য মূলনীতির বিপরীত না হয়। অর্থাৎ সেটি যেন শরয়ী দলীল এবং ফিকহী ইজমার বিপরীত না হয়। ৪- উরফ বা প্রথাকে বিবেচনা করা হবে না এবং সেটি দলীল হিসেবে গৃহিত হবে না যদি সেটি মানুষের অভ্যস্ততার বা জানাশোনার বিপরীত হয়।
স্থায়ী ও পরবর্তনশীল অভ্যাস:
অভ্যাস স্থায়িত্ব ও পরবর্তনশীলতার দিক থেকে দু'ভাগে বিভক্ত: (১)
১- স্থায়ী অভ্যাস:
স্থায়ী অভ্যাস বলেতে বুঝায় যে সকল অভ্যাস অপরিবর্তনীয়। যেমন খাদ্য, পানীয়, মর্যাদা, দেখা, কথা বলা, বলপ্রয়োগ এবং হাঁটার আসক্তির উপস্থিতি। সুতরাং এটা যদি এমন কার্যসম্পাদনের কারণ হয় যে বিষয়ে শরীয়ত প্রণেতা ফায়সালা দিয়েছেন; তাহলে তা বিবেচনা করতে, তার উপর নির্ভর করতে এবং সে অনুযায়ী ফায়সালা করতে কোন সমস্যা নেই। যেমন: মহান শরীয়ত প্রণেতা উদ্ধতভাবে চলাচল করতে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورِ﴿ অর্থ: [যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।](২)
২-পরিবর্তনশীল অভ্যাস:
পরিবর্তনশীল অভ্যাসের কতগুলো ভালো থেকে মন্দের দিকে পরিবর্তিত হয় আর কতগুলো মন্দ থেকে ভালোর দিকে পরিবর্তিত হয়। আর মন্দ সবসময় পরিতাজ্য; কেননা এটি সত্য শরীয়া ও সুস্থ মস্তিষ্কের সাথে সাংঘর্ষিক।
আরেক দিক থেকে, একটি অভ্যাস কখনো কোন সম্প্রদায়ে নিকট উত্তম চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে আবার ভিন্ন সম্প্রদায়ের নিকট তা নাও হতে পারে। ইমাম শাতেবী রহিঃ বলেন: “যেমন মাথা খোলা রাখা। এটির বিধান দেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। পূবের দেশগুলোতে মাথা উন্মুক্ত রাখা ব্যক্তিত্বসম্পন্নদের জন্য মন্দ বিষয়। তবে মাগরেবী অঞ্চলের দেশগুলোতে মন্দ বিষয় নয়। কাজেই মাথা উন্মুক্ত রাখা পুবের দেশগুলোর বাসিন্দাদের নিকট ব্যক্তির আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কিন্তু মাগরেবী অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিকট এটি প্রশ্নবিদ্ধকারী নয়”। (৩)
আবার কখনো অভ্যাসের ভালো মন্দ যুগ অনুযায়ী পরিবর্তন হয়ে থাকে। সুতরাং বর্তমানে অধিকাংশ আরব উপদ্বীপের পছন্দনীয় পোশাক – জুব্বা ও গুতরা- এবং তার অধিবাসীদের মধ্য হতে কারো পক্ষ থেকে উক্ত পোশাকের বিপরীত পোশাক পরিধান করা তাদের নিকট অপছন্দনীয়। কখনো এরূপ আচরণকে নিজস্ব অভ্যাস-সংস্কৃতির বিপরীত ভিন্ন পোশাক পরিধানকারীর আদলতের ক্ষেত্রে মন্দ দিক বিবেচনা করা হয়।
তৃতীয়ত: মনস্তাত্ত্বিক নীতিমালা:
এটি হল, যে বিষয়ে কোন দলীল বর্ণিত হয়নি এমন বিষয়ে ব্যক্তির মৌখিক ও কর্মগত আচরণ গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি। রাসূল সাঃ বলেছেন: (পূণ্য হল উত্তম চরিত্র। আর পাপ হল যা তোমার অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ কর।) (৪) ওয়াবিসা বিন মা'বাদ রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (আমি রাসূল সাঃ এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন: তুমি আমাকে পূণ্য ও পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমার অন্তরকে জিজ্ঞাসা কর। তোমার নফস যে বিষয়ে প্রশান্তি লাভ করে, তোমার হৃদয় যে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়; তা-ই হল পূণ্য। আর তোমার মন যে বিষয়ে চিন্তিত হয়, তোমার অন্তরে যা দ্বিধা সঞ্চার করে; তা-ই হল পাপ। লোকেরা যদি তোমাকে কোন সিদ্ধান্ত দেয়, তবে তুমি তা গ্রহণ করবে।) (১)
এ দু'টি হাদিসে এমন বিষয় রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদেরকে সত্যের প্রতি ভালোবাসা, তার প্রতি প্রশান্তি ও তা গ্রহণ করে নেয়ার সহজাত বৈশিষ্ট্যের উপর সৃষ্টি করেছেন এবং সত্যের প্রতি ভালোবাসা ও অসত্যকে ঘৃণা করা বান্দাদের স্বভাব-চরিত্রে গেঁথে দিয়েছেন। (২) রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে।) (৩) রাসূল সাঃ হাদিসে কুদসীতে তার রবের থেকে বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ বলেন: (আমি আমার সমস্ত বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দেয়।) (৪)
ইবনে তাইমিয়া রহিঃ বলেন: “অতএব জানা গেল যে, মানুষের ফিতরাতে এমন শক্তি রয়েছে যা সত্যে বিশ্বাস এবং উপকারী ইচ্ছার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে”। (৫) তিনি আরো বলেন: “অন্তরে এমন কিছু রয়েছে যা বিশ্বাস ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে বাতিলের উপর হকের অগ্রাধিকারকে অবধারিত করে। আর এটিই যথেষ্ট যে, অন্তর ফিতরাতের উপর সৃষ্ট”। (৬) সুতরাং মুমিন ব্যক্তি বুদ্ধিমান এবং সচেতন; সে তার নিষ্কলুষ ফিতরাত ও সঠিক গড়ে উঠার মাধ্যমে বুঝতে পারে যা একজন ফাসেক ব্যক্তি পারে না। “হক ও বাতিল দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মুমিনের নিকট সংশয়পূর্ণ হয় না; বরং সে তার নিকট অবস্থিত নূরের সাহায্যে হককে চিনতে পারে এবং তার হৃদয় তা গ্রহণ করে নেয়। আর সে বাতিল থেকে পালিয়ে যায় এবং তা সে চিনতে পারে না”। (৭)
আর মুমিন ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় যে সব বিষয়ের সম্মুখীন হয় তা নিম্নোক্ত রূপে হয়ে থাকে: যে বিষয়ে শরয়ী দলীল বা ইজমা রয়েছে; সে ক্ষেত্রে মুমিন ব্যক্তির করণীয় হল আল্লাহর আনুগত্য করা। মহান আল্লাহ বলেন: -
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا অর্থ: [আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।] (৮) সুতরাং তার জন্য করণীয় হল প্রশস্ত ও সন্তুষ্ট চিত্তে তা মেনে নেয়া。
আর যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ থেকে কোন দলীল নেই এবং অনুসরণীয় সাহাবী ও উম্মতের পূর্বসূরীদের থেকে কোন বক্তব্য নেই; এমন বিষয়ে কোন সন্দেহ-সংশয় যদি ঈমানে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী, জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোয় উন্মুক্ত বক্ষসম্পন্ন মুমিনের অন্তরে প্রবেশ করে এবং কোন সংশয়ের প্রেক্ষিতে তার হৃদয়ে যদি দ্বিধা সঞ্চারিত হয়; আর এমতাবস্থায় সে যদি ছাড়ের বিষয়ে রায়পন্থী, জ্ঞান ও দ্বীনদারিতায় অননির্ভরযোগ্য এবং প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তি ব্যতীত ফাতওয়া নেয়ার জন্য কাউকে না পায় -তাহলে সে তার হৃদয়ে সঞ্চারিত দ্বিধার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে এবং দ্বিধান্বিত বিষয় পরিহার করবে। যদিও ঐ সকল মুফতিগণ বৈধতার ফাতওয়া দেয়। এমন বিষয়ে ইমাম আহমদ রহিঃ বক্তব্য রয়েছে।(১)
এমন পরিস্থিতিতে মুমিন ব্যক্তি তার হৃদয়ের দ্বিধার দিকে দৃষ্টি দিবে। হৃদয়ের যে কোন ধরণের সংকোচ থাকে ও তার প্রতি হৃদয় যদি প্রফুল্ল না থাকে এবং হৃদয়ে যদি উক্ত সংকোচ কেন্দ্রিক সন্দেহ ও পাপের ভয় সৃষ্টি হয়; তাহলে সংকোচিত ও দ্বিধান্বিত বিষয় পরিহার করবে। আর এই পরিহার করাটি কোন শরয়ী দলীলের প্রেক্ষিতে নয় তবে তা দ্বিধা, হৃদয়ে সন্দেহ এবং পাপের ভয়ের কারণে। সুতরাং একজন মুসলিমের আচরণের জন্য এটি একটি চারিত্রিক মূলনীতি।
ইমাম ইবনু রজব রহিঃ বলেন: “ওয়াবিসার হাদিস এবং তার সমার্থক হাদিস প্রমাণ করছে যে, সন্দেহ-সংশয়ের ক্ষেত্রে হৃদয় যে দিকে স্বস্তি অনুভব করে তাই সৎকর্ম ও হালাল। আর এর বিপরীত হল পাপ”।(২)
আর এটি সূফীদের ওয়াসওয়াসা ও হৃদয়ের চিন্তা নয়; তথা এ বিষয়ে তাদের কথা শরয়ী দলীল নির্ভর নয়। বরং তা শুধুমাত্র তাদের মতামত ও অভিরুচী। পক্ষান্তরে সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে হৃদয়ের দিকে প্রত্যবর্তন করা নববী দলীল ও সাহাবীদের ফাতওয়া দ্বারা প্রমাণিত। (৩)
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। আর তা হল, হৃদয়ে যা নিয়ে দ্বিধার সঞ্চার হয় তা মানুষ জেনে যাওয়াকে অপছন্দ করা; যদি সে দ্বিধাকে কথা বা কাজে প্রকাশ করা হয়। কেননা মুসলিমগণ মন্দকে ভালো মনে করা বা ভালোকে মন্দ করার বিষয়ে একমত হয় না। ইবনু মাসউদ রাঃ বলেন: (মুমিনেরা যেটাকে ভালো মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট ভালো। আর তারা যেটাকে মন্দ মনে করেন সেটা আল্লাহর নিকট মন্দ।) (৪) এটি আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক মূলনীতি। এ প্রেক্ষিতে বল যায় যে, মনস্তাত্ত্বিক মূলনীতি দু'টি বিষয়ে সীমাবদ্ধ:
১- হৃদয়ে দ্বিধার সঞ্চার হওয়া এবং অন্তর তার প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া ও ঐ বিষয়ে সন্দেহ এবং পাপের ভয় সৃষ্টি হওয়া।
২- মানুষেরা বিষয়টি জেনে যাক; ভয় ও লজ্জাবশত এটি অপছন্দ করা।

টিকাঃ
(১) ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব (৭/৩৪০)।
(২) দেখুন: আল-জুয়াইনী, আল-ওরাকাত (পৃ: ৮), আল-ফাতুহী, আল-কাওকাবুল মুনীর (১০৫-১৩৪), মুহাম্মাদ আশ-শানক্বিতী, মুযাক্কেরাতু উসূলুল ফিকহ (পৃ: ২৫)।
(১) মুহাম্মাদ আশ-শানক্বিতী, মুযাক্কেরাতু উসূলুল ফিকহ (পৃ: ২৫)।
(১) মুসনাদে আহমাদ (১/৩৭৯)।
(২) সুয়ূতী, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের (পৃ: ৯০)।
(৩) আব্দুর রহমান আল-কাসেম, নাযরিয়‍্যাতুল উরফ (পৃ: ১৭)।
(৪) প্রাগুক্ত (পৃ: ৩৮৩৯)।
(১) আশ-শাতেবী, আল-মুয়াফাকাত (২/১৯৮)।
(২) সূরা লুকমান: (১৮)।
(৩) আশ-শাতেবী, আল-মুয়াফাকাত (২/১৯৮)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৮0, হা: ১৪-২৫৫৩)।
(১) মুসনাদে আহমাদ (৪/২৮৮), সুনানে দারেমী (২/২৪৫-২৪৬), মুসনাদে আবু ইয়ালা (১৫৮৬), মুজামুল কাবীর; তাবারানী (২২/৪০৩)।
(২) দেখুন: ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম।
(৩) সহীহ বুখারী (১/৪২৪, হা: ৪/২০৪৭), সহীহ মুসলিম (৪/২০৪৭, হা: ২২-২৬৫৮)।
(৪) সহীহ মুসলিম (৪/২১৯৭, হা: ১৩-২৮৬৫)।
(৫) দারউ তাআরুদিল আকলি ওয়ান নাক্বলি।
(৬) প্রাগুক্ত।
(৭) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম।
(৮) সূরা আল-আহযাব: (৩৬)।
(১) ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম (পৃ: ২৪০)।
(২) প্রাগুক্ত (পৃ: ২৪০)।
(৩) প্রাগুক্ত (পৃ: ২৪১)।
(৪) মুসনাদে আহমাদ (৪/২৮৮), মুজামুল কাবীর; তাবারানী (২২/৪০৩), আল-হাইছামী মাজমাউজ জাওয়য়েদ গ্রন্থে (১/১৭৭-১৭৮) বলেছেন: ইমাম আহমাদ, বাযযার, তাবারানী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং হাদিসের রাবীগণ ছিকাহ। ইমাম হাকেম মুস্তাদরাকে বলেছেন: হাদিসটির সনদ সহীহ তবে বুখারী ও মুসলিম তাদের গ্রন্থে সংকলন করেন নি। ইমাম যাহাবী তালখীল গ্রন্থে (৩/৭৮-৭৯) উক্ত মতের সাথে সম্মতি প্রকাশ করেছেন।

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখা

📄 স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখা


স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার সংজ্ঞা:
আরবি (১) অর্থ হল: দু'টি বস্তুর মাঝের সেই প্রতিবন্ধক যা একটিকে অপরটির সাথে মিশে যেতে বাধা দেয়। আর কোন বিষয়ের সংজ্ঞা হল: সে বৈশিষ্ট্য যা তার সমার্থক বিষয়কে ধারণ করে এবং অন্যদের থেকে তাকে পৃথক করে।(১)
আখলাকের সংজ্ঞা হল: যে বৈশিষ্ট্য চারিত্রিক কর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ভাল-মন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। যেমন: বীরত্ব; এটি একটি উন্নত চারিত্রিক গুণ। এ গুণের অধিকারী ব্যক্তি যদি বীরত্বের বৃত্তের বাইরে গিয়ে উচ্চতার দিকে থেকে তার সীমা অতিক্রম করে; তাহলে এ আচরণকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর যদি বীরত্বের সীমা থেকে নিচে চলে যায়, আত্মগোপন করে এবং করণীয় দায়িত্ব থেকে সরে পড়ে; তাহলে এটিকে কাপুরুষত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
বীরত্ব প্রদর্শনে সীমা অতিক্রমের বৈশিষ্ট্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে বিবেচনা করা হয়। বিপরীতে বীরত্ব প্রদর্শনে অবহেলার বৈশিষ্ট্যকে কাপুরুষতা হিসেবে গণ্য করা হয়। আর যদি বীরত্বের বৈশিষ্ট্যের সীমার মাঝে থাকা হয় তাহলে তাকে বীরত্ব হিসেবে নামকরণ করা হয়। এ নিয়মের উপরে বীরত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ অন্যান্য গুণাবলীকে অনুমান করতে হবে।
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার গুরুত্ব:
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার গুরুত্ব দু'টি দিক থেকে প্রতিভাত হয়; যথা: স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার স্বয়ং একটি জ্ঞান এবং এ সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞান লাভের গুরুত্ব। নিম্নে বিষয়টির স্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হল:
জ্ঞানগুলোর মধ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জ্ঞানটি ভালভাবে অনুধাবন করা উচিৎ তা হল আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত আল্লাহর শরীয়তের সীমারেখার শুরু ও শেষ সম্পর্কিত জ্ঞান; যেন তা কেউ অতিক্রম না করে এবং তা পালনে ত্রুটি না করে। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর শরীয়তের সীমারেখা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করছেন এবং অন্যত্র সীমার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا وَمَن ﴾يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُوْلَتَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ অর্থ: [এ সব আল্লাহর সীমারেখা সুতরাং তোমরা এর লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমারেখা লংঘন করে তারাই যালিম।(১) তিনি আরো বলেন : تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا অর্থ: [এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ে না।](২)
এক আয়াতে তিনি সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন আর অন্যত্র তিনি সীমার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। আর তা এ জন্য যে, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা হল হালাল ও হারামের মাঝে পৃথককারী শেষ সীমা। কোন জিনিসের শেষ সীমা কখনো তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে তার হুকুম ধারণ করে। আবার কখনো কোন জিনিসের শেষ সীমা তার অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণে তার বিপরীত জিনিসের হুকুম ধারণ করে। প্রথম অবস্থার বিবেচনায় সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় দিক বিবেচনায় সীমার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করা হয়েছে।(৩)
স্বভাব-চরিত্র হল মানুষের অভ্যন্তরীণ চিত্র এবং সে যে তাকওয়া, ঈমান, ভীতি, দুর্বলতা ও অজ্ঞতা ধারণ করে তার প্রকৃত প্রকাশ। স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান লাভ করা উচিৎ; যেন সে তাতে অবহেলা না করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে বিপরীতে চলে না যায়।
জ্ঞানগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে উপকারী জ্ঞান হল সীমারেখা সম্পর্কিত জ্ঞান। বিশেষত শরীয়তের আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত বিধিবিধানের জ্ঞান। সুতরাং মানুষের মাঝে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি যে সীমারেখা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানে; যেন সে তাতে এমন কিছুকে অন্তর্ভুক্ত না করে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এমন কিছুকে তার থেকে বাদ না দেয় যা তার অন্তর্ভুক্ত। কাজেই সবচেয়ে মধ্যপন্থী হল সে ব্যক্তি, যে ব্যক্তি স্বভাব-চরিত্র এবং শরয়ী বিধিবিধানের সীমারেখা মেনে চলে জ্ঞানগত ও কর্মগত দিক দিয়ে।(৪)
স্বভাব-চরিত্রের সীমারেখার প্রকারভেদ:
১- সাধারণ সীমারেখা:
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সে সকল সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও নীতিমালা যেগুলো প্রয়োগ করা সম্ভব এবং যে গুলোর উপর সকল মৌখিক ও কর্মর্গত আখলাক পরিমাপ করা যায়। অর্থাৎ, সাধারণ সীমারেখা হল এমন সামগ্রিক নীতিমালা যা উত্তম চরিত্র ও মন্দ চরিত্রের সীমা নির্ধারণ করে। আর এটি চারটি কায়দা বা মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত:
প্রথম মূলনীতি:
উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না যা তার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার উপর উত্তম চরিত্রের বিধান আরোপ করা হবে না। যেমন: চাটুকারিতাকে সৌজন্যমূলক আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা এ যুক্তিতে যে, এটা পারস্পরিক আচরণের অন্যতম একটি উত্তম গুণ। অথচ মুদাহানা তথা চাটুকারিতার ব্যাখ্যায় বিদ্বানগণ বলেন: চাটুকারিতা হল ফাসেক ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং তার কর্মের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ; তাকে কোন ধরণের নিষেধ করা ছাড়াই।(১)
দ্বিতীয় মূলনীতি:
উত্তম চরিত্রের মধ্য থেকে তার কোন একককে বাদ দেয়া যাবে না এবং তার মূল বিধান বাতিল করে বিপরীতধর্মী বিধান দেয়া যাবে না। যেমন: লজ্জাশীলতার মধ্য হতে তার কিছু প্রকারকে বাদ দেয়া। উদাহরণত: অপরিচিত পুরুষের সাথে নারীর মুসাফাহা করা এবং বলা যে, এটি লজ্জাশীলতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এটি উত্তম চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এ উদাহরণে লজ্জাশীলতার কিছু প্রকারকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং তার মূল নিষিদ্ধের বিধানকে বাতিল করে তাকে বৈধতার বিধান দেয়া হয়েছে।
তৃতীয় মূলনীতি:
মন্দ চরিত্রের মাঝে এমন কিছু প্রবেশ করান যাবে না যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়; অতঃপর তার উপর মন্দ চরিত্রের বিধান আরোপ করা হবে। যেমন: সৌজন্যমূলক আচরণকে মন্দ আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা এবং এ আচরণকারীকে চাটুকার বলা।
অথচ সৌজন্যমূলক আচরণ মুমিনদের চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। আর তা হল মানুষের সামনে বিনয়ের প্রকাশ, নম্র ভাষায় কথা বলা এবং কর্কশ ভাষা পরিহার করা। কেননা এগুলো মিল-মহাব্বতের শক্তিশালী মাধ্যম। আর সৌজন্যমূলক বা কোমল আচরণের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে; যেমন: শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে জাহেল ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধের ক্ষেত্রে ফাসেকের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করা এবং কঠোরতা পরিহার করা; যাতে সে তার অবস্থার উপর অবিচল না থাকে। তাকে নম্র ভাষায় নিষেধ করা বিশেষত যখন তার মিল-মহাব্বত কামনা করা হয়, ইত্যাদি।(২)
চতুর্থত মূলনীতি:
মন্দ চরিত্রের মধ্য থেকে তার কোন একককে বাদ দেয়া যাবে না এবং তার মূল বিধান বাতিল করে বিপরীতধর্মী বিধান আরোপ করা যাবে না। যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে মন্দ চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত গণ্য না করা। অতঃপর এটির অবৈধ হওয়ার বিধানকে বৈধতার বিধান দিয়ে পরিবর্তন করা এবং এটিকে চারিত্রিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা।
২- বিশেষ সীমারেখা:
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল প্রতিটি চরিত্র বা গুণের জন্য স্বতন্ত্র নীতিমালা। অর্থাৎ এটি বিশেষ নীতিমালার সমষ্টি যা চারিত্রিক গুণাবলীর সকল এককের পরিধি নিয়ন্ত্রণ করে।
যেমন প্রতিটি চারিত্রিক গুণাবলীর নির্দিষ্ট পরিধি রয়েছে, যখন কোন ব্যক্তি তা অতিক্রম করে বা তাতে ত্রুটি করে; তখন সে তা পালনে ব্যর্থ হয়। আর যেহেতু চারিত্রিক গুণাবলী অসংখ্য তাই তার কিছু উদাহরণ পেশ করা যায় এবং সেগুলোর উপর অন্যগুলো অনুমান করা যায়।
ইবনুল কায়্যিম রহিঃ কিছু চারিত্রিক গুণাবলীর প্রতি ইশারা করেছেন; আর তা হল:(১)
ক্রোধ: আর তার সীমা হল প্রশংসনীয় বীরত্ব এবং মন্দ চরিত্র ও ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিহার করা। এখন যদি কেউ এর সীমা অতিক্রম করে তাহলে সে সীমালঙ্ঘন করল, আর যদি কেউ এতে ত্রুটি করে তাহলে কাপুরুষতা করল এবং মন্দ চরিত্র পরিহার করল না।
লালসা: লালসার সীমা হল পার্থিব বিষয়ে পর্যাপ্ততা এবং যথেষ্টতা অর্জন করা। যখন তা থেকে কম হয় তখন তা অপমান হিসেবে গণ্য হয় আর যখন তার থেকে বেশি হয় তখন তা লোলুপতা ও অপ্রশংসনীয় বিষয়ে আগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঈর্ষা বা হিংসা: হিংসার সীমা হল পরিপূর্ণতা অর্জনে প্রতিযোগিতা করা এবং তার সমকক্ষ ব্যক্তি তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা। তাই যখন সে এটা অতিক্রম করে তখন সে সীমালঙ্ঘন ও জুলুম করে, নেয়ামতপ্রাপ্তের থেকে নেয়ামত বিলুপ্তির কামনা করে এবং তাকে কষ্ট দিতে উদগ্রীব থাকে। আর যখন তা থেকে কমে যায় তখন এটি দুর্বল হিম্মত ও মনের ক্ষুদ্রতা বলে বিবেচিত হয়।
কামনা-বাসনা: কামনার সীমা হল ইবাদতের পরিশ্রম থেকে মন-মস্তিষ্ককে স্বস্তি প্রদান, উত্তম গুণাবলী অর্জন এবং সেগুলো পূরণ করার মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা। যখন এটি সীমা অতিক্রম করে তখন কামাসক্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং এর অধিকারী ব্যক্তি জানোয়ারের পর্যায়ে নেমে যায়। আর যখন এটি হ্রাস পায় এবং পূর্ণতা ও মর্যাদা অন্বেষণে অবসর পায় না তখন তা দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অপমান হিসেবে বিবেচিত হয়。
বিশ্রাম: বিশ্রামের সীমা হল ইবাদতের প্রস্তুতি ও সৎগুণ অর্জনের লক্ষ্যে অন্তর ও সঞ্চিত শক্তিকে বিশ্রাম দেয়া। যখন এটি সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন ধীরতা, অলসতা ও সময়ের অপচয় বলে গণ্য হয়। আর যখন এটি হ্রাস পায় তখন সঞ্চিত শক্তির জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়।
দানশীলতা: দু'দিক থেকে দানশীলতার সীমা রয়েছে। যখন তার সীমা অতিক্রম করা হয় তখন তা অপচয় বলে বিবেচিত হয় আর যখন তার থেকে হ্রাস পায় তখন কৃপণতা ও অবহেলা বলে গণ্য হয়।
বীরত্ব: বীরত্বের সীমা অতিক্রম করাকে পাগলামি গণ্য করা হয় আর তার সীমা থেকে কমে গেলে কাপুরুষতা ও দুর্বলতা বলে বিবেচনা করা হয়। আর বীরত্বের সীমা হল অগ্রসর হওয়ার জায়গায় অগ্রসর হওয়া এবং পেছানোর জায়গায় পিছিয়ে আসা।
গায়রত বা আত্মসম্মানবোধ: যখন গায়রতের সীমা অতিক্রম করা হয় তখন তা অপবাদ ও নির্দোষের প্রতি কু-ধারণা বলে গণ্য হয়। আর যখন তা থেকে হ্রাস পায় তখন এটাকে উদাসীনতা এবং অবাধা মেলামেশার সুযোগ করে দেয়া বলে বিবেচিত হয়।
বিনয়: বিনয়ের সীমা যখন অতিক্রম করা হয় তখন সেটি অপদস্থতা ও অপমান হিসেবে গণ্য হয়। আর যে তা পালনে ত্রুটি করে সে অহঙ্কার ও গর্বের দিকে ধাবিত হয়।
সম্মান-মর্যাদা: যখন এর সীমা অতিক্রম করা হয় তখন তা অহঙ্কার ও মন্দ চরিত্র হিসেবে গণ্য হয় আর যখন হ্রাস পায় তখন অপমান হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইবনু হাযম রহিঃ কিছু উত্তম গুণাবলীর সীমা উল্লেখ করেছেন; তন্মধ্যে:(১)
সচ্চরিত্রতা বা পবিত্রতা: এর সীমা হল চোখ অবনত রাখা এবং সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে হারাম বস্তু থেকে দূরে রাখা। সুতরাং এটি অতিক্রম করা ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার শামিল। আর আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হালালকৃত বস্তু থেকে বিরত থাকা দুর্বলতা ও অপারগতা হিসেবে গণ্য।
ইনসাফ: এর সীমা হল নিজের পক্ষ থেকে অধিকার প্রদান করা এবং নিজেরটা গ্রহণ করা। পক্ষান্তরে জুলুমের সীমা হল নিজেরটা গ্রহণ করে পরের অধিকার না দেয়া। আর মহানুভবতার সীমা হল অনুগত হয়ে নিজের পক্ষ থেকে অন্যের অধিকার প্রদান করা এবং সক্ষম অবস্থায় অন্যের কাছে থাকা নিজের অধিকার ছেড়ে দেয়া।

টিকাঃ
(১) রাগেব ইস্পাহানী, আল-মুফরাদাত (পূ: ১০৯)।
(১) সূরা আল-বাকারা: (২২৯)।
(২) সূরা আল-বাকারা: (১৮৭)।
(৩) ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মুহাজের (পৃ: ৩৭)।
(৪) ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ (পৃ: ১৫৮)।
(১) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী (১০/৫২৮)।
(২) প্রাগুক্ত (১০/৫২৮-৫২৯)।
(১) ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ (পৃ: ১৫৬-১৫৮)।
(১) ইবনে হাযম, আল-আখলাক ওয়াস সীরাহ (পৃ: ৩১-৩২)।

📘 ইসলামি চরিত্রের মূল নীতি 📄 চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি

📄 চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি


চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে বুনিয়াদের উপর মানুষের প্রশংসনীয় আচরণ গড়ে ওঠে। আর মূলনীতি ধারণ করে বদান্যতা, নিবৃত থাকা এবং সহনশীলতাকে। যেমন এর পরিচয় দিয়েছেন হাসান আল-বসরী রহিঃ নিম্নোক্ত ভাষায়: চারিত্রিক আচরণের মূলনীতি হল চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা, উত্তম জিনিস দান করা এবং কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা।(১) ইবনুল কায়্যিম রহিঃ বলেন: তা হল বদান্যতা প্রদর্শন করা, কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা এবং কষ্ট সহ্য করা।(২)
সুতরাং মানুষের আচরণ অন্যের প্রতি দানশীলতার মাধ্যমে হবে; আর এটিই হল বদান্যতা, তাদের থেকে যে দোষ-ত্রুটি প্রকাশ পায় তা সহ্য করা; আর এটিই হল সহনশীলতা এবং তাদের ক্ষতি করা থেকে নিজেকে নিবৃত করা; আর এটিই হল কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। এগুলোই হল উত্তম চরিত্রের মূলনীতি; এর বর্ণনা নিম্নে প্রদত্ত হল:
প্রথমত: বদান্যতা প্রদর্শন করা।
বদান্যতা প্রদর্শন অর্থ হল দান করা এবং মহানুভবতা প্রদর্শন করা। বদান্যতা প্রদর্শন দুইভাবে হতে পারে, তা হল, দাবী প্রত্যাহার করা ও দান করার মাধ্যমে।
১- দাবী প্রত্যাহার দুই প্রকার:
ক. অন্যের কাছে থাকা নিজের অধিকারের সম্পূর্ণ বা অধিকাংশ অথবা কিছু অংশ মাফ করে দেয়া। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: (পূর্বযুগে এক ব্যক্তি মানুষদের ঋণ দিত এবং তার চাকরকে বলত যে, যখন তুমি কোন পরিশোধে অসমর্থ ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির কাছে যাবে তাকে ক্ষমা করে দেবে। হয়ত এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করলে-মারা গেলে- আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।)(৩) আর এটি হল অন্যের কাছে থাকা নিজের অধিকার ক্ষমা করে দেয়ার দৃষ্টান্ত।
খ. মানুষের হাতে থাকা সম্পদকে উপেক্ষা করা। অর্থাৎ মানুষের হাতে থাকা সম্পদ চাওয়া থেকে বিরত থাকা এবং নিজের কাছে যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা। আর এটি উদারতার চেয়ে উত্তম। যেমনটি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিঃ বলেছেন: মানুষের নিকট যে সম্পদ আছে তার প্রতি অমুখাপেক্ষিতা দানশীলতার চেয়ে উত্তম।(৪)
তবে এটি শর্তসাপেক্ষ। সুতরাং মানুষের সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা যদি দ্বীন, শরীর অথবা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয় তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করাটাই উত্তম। যেমন: দরিদ্র অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজন এমন ব্যক্তির যে তাকে ওষুধ সংগ্রহে সহায়তা করবে। চিকিৎসার অভাবে যদি তার মৃত্যু বরণের আশঙ্কা তৈরি হয় তাহলে অন্যের সহায়তা গ্রহণ করা তার জন্য ওয়াজীব। অনুরূপভাবে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির জন্য এমন ব্যক্তির প্রয়োজন যে তাকে জীবন বাঁচাতে খাবার দিয়ে সহায়তা করবে। যদি খাবার না চাওয়ার কারণে তার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে অন্যের সহায়তা গ্রহণ করা একান্ত কর্তব্য। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: ﴾وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴿ অর্থ: [নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না।] (১)
২- দানশীলতা: আর তা হল ব্যয়ের মাধ্যমে দানশীলতা। এ প্রকারের উৎস হল:
ক. জীবন।
খ. সম্পদ।
গ. মর্যাদা-খ্যাতি।
ঙ. ইলম বা জ্ঞান।
এর বিশদ বিবরণ নিম্নরূপ:
জীবন বা আত্মদান হল: জিহাদ, মুসলমানদের সম্মান-সম্ভ্রম রক্ষা এবং ডুবন্ত বা অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিকে উদ্ধার করার ন্যায় অগ্রাধিকারযোগ্য স্বার্থে মানুষ তার জীবনকে ঝুঁকির মাঝে ফেলে উৎসর্গ করে দেয়া। আর এটি হল সর্বোচ্চ পর্যায়ের বদান্যতা।
সে আত্মত্যাগ করে যখন কৃপণ তা আঁকড়ে থাকে………আর আত্মত্যাগই হল সর্বোচ্চ ত্যাগ।
আত্মোৎসর্গের উদাহরণ হল: হানযালা বিন আবু আমের রাঃ এর শহীদ হওয়ার ঘটনা; যিনি ওহুদের যুদ্ধে নিজের জীবনকে দান করেছিলেন। ওহুদ যুদ্ধের আগের রাতে তিনি বাসর করছিলেন। তিনি প্রত্যুষে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে গোসল না করেই যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন। রাসূল সাঃ তার সম্পর্কে বলেছিলেন: (তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল দিয়েছে।)(২)
সম্পদ দ্বারা দানশীলতা হল: নেক কাজে সম্পদ ব্যয় করা। যেমন: সাদাকা, ঋণ প্রদান, দান ও উপহার প্রদান করার মাধ্যমে অভাবীদের সহায়তা করা এবং মেহমান ও প্রতিবেশীকে সম্মান করা।
আর এই প্রকারের বদান্যতা প্রশংসনীয় ও কাঙ্খিত এবং প্রতিযোগীদের এতে প্রতিযোগিতা করা বাঞ্ছনীয়। রাসূল সাঃ বলেছেন: (দু'টি বিষয় ছাড়া ঈর্ষা করা যায় না। এক ব্যক্তি হচ্ছে, আল্লাহ যাকে কুরআন দান করেছেন, আর সে দিবারাত্র তা তিলাওয়াত করে। অপর ব্যক্তি বলে, এ লোকটিকে যা দেওয়া হয়েছে আমাকে যদি অনুরূপ দেওয়া হতো, তা হলে আমিও অনুরূপ করতাম, সে যেরূপ করছে। আরেক ব্যক্তি হচ্ছে সে, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দিয়েছেন। ফলে সে তা যথাযথভাবে ব্যয় করছে। তখন অপর ব্যক্তি বলে, একে যা দেওয়া হয়েছে, আমাকেও যদি অনুরূপ দেওয়া হতো, আমিও তাই করতাম, সে যা করছে।)(১)
আর এটিকে ঈর্ষা নামকরণ করা হয়েছে রূপকার্থে। উমর রাঃ আবু বকর রাঃ এর সাথে দান করাতে প্রতিযোগিতা করেছিলেন।(২)
মর্যাদার মাধ্যমে বদান্যতা হল: মানুষের নিকট ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা কাজে লাগিয়ে মানুষকে সহায়তা প্রদান করা। যেমন: অভাবী এবং মাজলুমদের অধিকার ও প্রয়োজন পুনরুদ্ধারের চেষ্টার মাধ্যমে তাদের জন্য মধ্যস্থতা করা। মহান আল্লাহ বলেন: مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا وَمَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا অর্থ: [কেউ কোন ভাল কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে এবং কেউ কোন মন্দ কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর নজর রাখেন।](৩)
ইমাম মুজাহিদ, হাসান বসরী, ইবনু যায়েদ এবং প্রমূখগণ বলেন: মানুষের পারস্পরিক প্রয়োজনে সুপারিশ বা মধ্যস্থতা করা। সুতরাং যে ব্যক্তি উপকারমূলক কাজে সুপারিশ করবে সে একটি অংশ পাবে আর যে ক্ষতিকর কাজে সুপারিশ করবে তারও একটি অংশ থাকবে।(৪)
মানুষকে ইলম শিক্ষা দানের মাধ্যমে বদান্যতা: দুই ভাবে হতে পারে: (৫)
ক. প্রশ্নকারীর উত্তরে যতটুকু বলা প্রয়োজন তার চেয়ে বিশদাকারে জওয়াব দেয়া এবং তার উপকারে আসে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে বলা। উত্তরে বেশি করে বলা রাসূল সাঃ এর অনুপম চরিত্রে অন্তর্গত। যেমন রাসূল সাঃ কে যখন সাগরের পানির বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল তখন তিনি প্রশ্নকর্তার জিজ্ঞাসিত বিষয়ের চেয়ে বেশি উত্তর দিয়েছিলেন: (সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।)(৬)
খ. ইলম বা জ্ঞানকে মানুষের নিকট প্রশ্নাকারে উত্থাপন করা। আর এরূপ করা রাসূল সাঃ এর বৈশিষ্ট্য ছিল। রাসূল সাঃ এর বাণী থেকে এর উদাহরণ হল: (তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে?...) (৭) অনুরূপভাবে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ কে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন: (হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি, তুমি আল্লাহ তায়ালার বিধিনিষেধ রক্ষা করবে তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন।)(৮)
কায়িক শ্রম দিয়ে উপকার করার মাধ্যমে বদান্যতা: যেমন কোন ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের বোঝা বহন করে দেয়ার মাধ্যমে সহায়তা করা অথবা তার গৃহের কোন নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিস ঠিক করে দেয়া ইত্যাদি। রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রত্যেক দিন যাতে সূর্য উদিত হয়, তাতে মানুষের দেহের প্রতিটি জোড়া হতে একটি মানুষের প্রত্যেক জোড়ার প্রতি সাদাকা রয়েছে। প্রতিদিন যাতে সূর্য উদিত হয়। দু'জন লোকের মধ্যে সুবিচার করাও সাদাকা। কাউকে সাহায্য করে সাওয়ারীতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার উপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়াও সাদাকা। ভাল কথাও সাদাকা। সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি কদমেও সাদাকা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদাকা।) (১)
সময় এবং আরাম বিসর্জন দিয়ে বদান্যতা: নিজের আরাম-আয়েশ মানুষের জন্য বিসর্জন দেয়া এবং নিজের আরামের উপর অন্যদের আরামকে অগ্রাধিকার দেয়া। যেমন রোগীর সাথে রাত্রিযাপন এবং তাকে আনন্দ দেয়া। বলা হয়ে থাকে:
তিনি বদান্যতার প্রেমিক, যদি কোন আবেদনকারী তার নিকট আবেদন করে…… আপনি আমাকে আপনার চোখের ঘুম দিয়ে দিন, তবে (সে তাকে ঘুম দিয়ে দিবে) আর ঘুমাবে না।
দ্বিতীয়ত: কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা:
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি অন্যকে যে সব ক্ষেত্রে কষ্ট দেয় সে সব ক্ষেত্র থেকে নিজের কষ্ট প্রদানের উসৎগুলোকে নিবৃত্ত রাখা। আর ধরনের দিক থেকে কষ্ট প্রদানের উৎসগুলো দু’ভাগে বিভক্ত:
১- বাচিক উৎস: আর তা জবানে উচ্চারণ এবং কলমে লিখে কিছু বর্ণনা করার মাধ্যমে হয়ে থাকে।
২- কর্মর্গত উৎস: এটি মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন: হাত, চোখ, কান, চোখের পাতা এবং ইশারার মাধমে হয়ে থাকে।
কষ্ট প্রদানের উৎস কথা ও কাজ যে সকল বিষয়ে আপতিত হয় এবং এর ফলে মানুষ কষ্ট পায় তা হল: দ্বীন, সম্পদ, সম্মান-সম্ভ্রম, জান এবং বুদ্ধি-বিবেক। কষ্ট প্রদানের উৎস ও কষ্ট পাওয়ার ক্ষেত্রগুলোর বিশদ আলোচনা নিম্নে উপস্থাপন করা হল:
প্রথমত: কষ্ট প্রদানের উৎসসমূহ:
১- বাচিক উৎস:
সে সকল কষ্ট যার উৎস হল বর্ণনা; চাই তা জবানে উচ্চারণ বা আঙ্গুল দিয়ে লেখার মাধ্যমে হোক অথবা উভয়ের মাধ্যমে হোক। আর জবান হল কষ্ট প্রদানের শক্তিশালী উৎস, বিশেষত যখন তার অধিকারী জবানকে মানুষের উপর লাগামহীন করে দেয়। আর নবী সাঃ জবানের ভয়াবহতা ও তা মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে - এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নবী সাঃ মুয়াজ রাঃ কে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন: (হে মুয়াজ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। মানুষকে তাদের নিজেদের জিভঘটিত পাপ ছাড়া অন্য কিছু কি তাদের মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?) (২)
তিনি বলেছেন: (নিশ্চয়ই বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির কোন কথা উচ্চারন করে অথচ সে কথার গুরুত্ব সম্পর্কে চেতনা নেই। কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা অনেক গুন বাড়িয়ে দেন। আবার বান্দা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কোন কথা বলে ফেলে যার পরিনতি সম্পর্কে সে সচেতন নয়, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে পতিত হবে。)(১) তিনি আরো বলেছেন: (যে ব্যক্তি আমার জন্য দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু -জিহ্বা- এবং দুই পা-র মাঝের বস্ত-লজ্জাস্থান- এর যামিন হবে আমি তার জন্য জান্নাতের যামিন হব।)(২)
একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হল সে তার জবান দ্বারা অন্য মুসলিমদের কষ্ট প্রদান করা থেকে বিরত থাকবে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে।)(৩)
হাফেজ ইবনে হাজার রহিঃ বলেন: “জিহ্বাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এ জন্য যে, এটি হল হৃদয়ের অভিব্যক্তি প্রকাশকারী। অনুরূপ হল হাত; কেননা উভয়ের দ্বারা অধিকাংশ কর্ম সম্পাদিত হয়। হাতের তুলনায় হাদিসটি জিহ্বার প্রেক্ষিতে ব্যপক অর্থবোধক। কেননা জিহ্বা দ্বারা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য বিষয়ে কথা বলা যায়, হাতের বিপরীতে। এ ক্ষেত্রে জিহ্বার সহযোগী হতে পারে লেখনী, আর এ ক্ষেত্রে তার প্রভাব ব্যাপক! (৪)
সুতরাং ইসলামী বিধান জিহ্বার ভয়াবহতা প্রমাণ করেছে। ফলে মানুষ নিজেকে এবং সে যাদের দায়িত্বশীল তাদেরকে তরবিয়ত প্রদান করা ব্যতীত কোন উপায় অবশিষ্ট নেই।
২- কর্মগত উৎস: আর তা হল ঐ সকল প্রদত্ত কষ্ট যার উৎস মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ; যেমন: হাত, চোখ, কান ইত্যাদি।
ক. হাত: হাত দ্বারা ক্ষতি বিরাট, তার ভয়াবহতা বিশাল; যেহেতু এটা হত্যা, মারপিট এবং চুরি করার একটি মাধ্যম। আর রাসূল সাঃ হাতের ভয়াবহতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন যখন তা অন্যায় কাজে ব্যবহার করা হয়। তিনি হাতের সঠিক ব্যবহারকে প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় হিসেবে নির্ধারণ করে বলেছেন: (প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে।)(৫)
খ. চোখ: এটি কষ্ট প্রদানের উৎস যদি এর দ্বারা তুচ্ছ, হেয় এবং বিদ্রুপ করার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিত করা হয় অথবা হারাম কিছু দেখতে ব্যবহার করা হয়। যেমন: অন্যের বাড়ির গোপন বিষয় অবগত হওয়ার জন্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। রাসূল সাঃ তার গৃহের ছিদ্র দিয়ে উঁকিমারা ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে অবস্থায় তার হাতে একটি চিরুনী ছিল এবং তা দিয়ে তিনি মাথার চুল আচড়াচ্ছিলেন: (যদি আমি জানতাম যে তুমি উঁকি মারবে, তবে এ দিয়ে তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। তাকানোর জন্য অনুমতি গ্রহণের বিধান দেয়া হয়েছে।) (৬)
মানুষ তার চোখের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে; যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন: إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَتَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا অর্থ: [নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (১)
গ. ইশারা-ইঙ্গিত: কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ, হেয়জ্ঞান এবং বিদ্রুপ করার উদ্দেশ্যে চোখের পাতা দ্বারা ইশারা করা। মহান আল্লাহ বলেন: وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةِ لُمَزَةٍ﴿ অর্থ: [দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পিছনে ও সামনে লোকের নিন্দা করে।] (২)
আরবিতে 'হাম্মায' বলা হয় যে ব্যক্তি ইশারা ও কর্মের মাধ্যমে মানুষের নিন্দা করে এবং দোষারোপ করে। আর 'লাম্মায' হল যে তাদেরকে কথার মাধ্যমে দোষারোপ করে। (৩)
ঘ. কান: কানের মাধ্যমে কষ্ট প্রদানের ধরণ হল, আড়ি পেতে ও কান পেতে অন্যের কথা শোনা এবং এর মাধ্যমে তাদের কষ্ট প্রদান করা। চাই তারা তাৎক্ষণিক কষ্ট পাক তাকে আড়ি পেতে কথা শুনতে দেখার মাধ্যমে অথবা তারা কষ্ট পাক পরবর্তীতে তার শ্রুত কথা প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে। আর মানুষ জিজ্ঞাসিত হবে এ মহান আয়াতের প্রেক্ষিতে এবং কানের অপব্যবহারের কারণে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَتَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا অর্থ: [নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।] (৪)
দ্বিতীয়ত: ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা কষ্ট পাওয়ার ক্ষেত্রসমূহ:
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল মানুষ যে সকল ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; চাই তা তার দ্বীন, সম্পদ, সম্ভ্রম, জান বা বুদ্ধি-বিবেক এর ক্ষেত্রে হোক। এই পাঁচটি বিষয়কে একত্রে ফিকহের পরিভাষায় 'আজ-জরুরিয়‍্যাত আল-খামসা' তথা 'পাঁচটি প্রয়োজনীয় বিষয়' বলে অভিহিত করা হয়। এগুলোর বিশদ আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হল:
১- দ্বীন: দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ধরণ হল কোন ব্যক্তিকে দ্বীনের আবশ্যকীয় বিধান পালনে বাঁধা দেয়া। যেমন: সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার বিষয়ে একজন ব্যক্তিকে বাঁধা প্রদান করা বা সে যে ওয়াজীব ও সুন্নাত বিধান পালন করে তা নিয়ে বিদ্রুপ করা, যেমন: টাখনুর উপর কাপড় পড়া এবং দাড়ি ছেড়ে দেয়া। ইমাম শাতেবী রহিঃ বলেন: “অস্তিত্বের দিক থেকে মৌলিক ইবাদতগুলো দ্বীনের হেফাযতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে; যেমন: ঈমান, দুই শাহাদার উচ্চারণ, যাকাত, সিয়াম, হজ ইত্যাদি”।(৫)
২- ধন-সম্পদ: নানা পদ্ধতিতে মানুষের সম্পদের উপর আক্রমণ করা; যেমন: চুরি, ধোঁকা, প্রতারণা, ঘুষ গ্রহণ অথবা সম্পদে আক্রমণ করার অন্যান্য পদ্ধতিতে। ইসলাম সম্পদের হেফাযত করেছে এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে হস্তগত করাকে হারাম করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم : بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُواْ فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।](১) অত্র আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। এর অন্তর্ভুক্ত হল: জুয়া, প্রতারণা, আত্মসাৎ, অন্যের অধিকার অস্বীকার করা এবং সম্পদের মালিক যার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। আরো অন্তর্ভুক্ত হল শরীয়ত যা হারাম করেছে যদিও মালিক তার প্রতি সন্তুষ্ট; যেমন: যিনাকারী ও গণকের উপার্জন, মদ ও শুকুর বিক্রির মূল্য ইত্যাদি।(২)
নবী সাঃ বলেছেন: (তোমাদের জান, তোমাদের মাল, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর তোমাদের জন্য হারাম। এখানে উপস্থিত ব্যাক্তি আমার এ বাণী যেন অনুপস্থিত ব্যাক্তির কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যাক্তি হয়ত এমন এক ব্যাক্তির কাছে পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার থেকে বেশি স্মরণ রাখতে পারবে।) (৩)
৩- বুদ্ধি-বিবেক: এর উপর আক্রমণ তিনভাবে হতে পারে:
ক. তাকে এমন স্থানে আঘাত করা যেখানে আঘাত করার ফলে তার চিন্তা-শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সে তার ভূমিকা পালনে অক্ষম হয়ে পড়ে。
খ. যে সব দ্রব্য বুদ্ধি-বিবেককে নষ্ট করে দেয় এমন দ্রব্য বিক্রয় ও বিপননের মাধ্যমে বিবেকের প্রতি আক্রমণ করা। যেমন: এ্যালকোহল, আফিম এবং সব ধরণের নেশাদ্রব্য। কেননা এগুলো মানুষের চিন্তা শক্তিকে নষ্ট করে দেয়, তাকে তার ইহকালীন ও পরকালীন কল্যান থেকে বঞ্চিত রাখে এবং তার বিষয়গুলো অস্পষ্ট করে দেয়; ফলে সে ভাল-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না। এভাবে সে তার আচরণের মাধ্যমে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য থেকে বের হয় যায়।
নেশাদ্রব্য মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে। এ জন্য শয়তান নেশাদ্রব্যকে মানুষের নিকট মনোমুগ্ধকররূপে উপস্থাপন করে। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَوَةَ : وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ তো চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না?] (৪)
গ. সাংস্কৃতিক বিনাশকারী: মানুষের বিবেকের উপর আক্রমণ করা হয় ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনার প্রচার ও প্রসার, মানুষের মাঝে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি এবং ভ্রান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক লেখনী ও চিত্তাকর্ষক সাহিত্যের পথ ধরে বিচ্যুতি-বিকৃতিকে নানা উপায়ে সুশোভিত করার মাধ্যমে。
৪- জান: জানের উপর আক্রমণ করা হয় হত্যা, আঘাত ইত্যাদির মাধ্যমে। যুলুম ও সীমালঙ্ঘনবশত জানের উপর আক্রমণকে ইসলাম হারাম করেছে। মহান আল্লাহ বলেন: وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنَا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا [ মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।] (১)
রাসূল সাঃ বলেছেন: (যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, সেই মুসলিম ব্যক্তির খুন এই তিনটির একটি কারণ ছাড়া হালাল নয়: বিবাহিত হওয়ার পর ব্যভিচারী হওয়া, প্রাণের বদলায় প্রাণ গ্রহণ, দ্বীন পরিত্যাগী মুসলিমের জামায়াত বিছিন্ন হওয়া।)(২)
৫-মান-সম্ভ্রম: মানুষের চরিত্রে কালিমা লেপনের মাধ্যমে আক্রমণ করা। আর ইসলাম মান-সম্মানে আক্রমণের সকল অবস্থাকেই নিষিদ্ধ করেছে। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের মান-সম্ভ্রম তোমাদের জন্য হারাম।) (৩)
তৃতীয়ত: কষ্ট সহ্য করা:
কষ্টের বিপরীতে অনুরূপ কষ্ট না দেয়ার মাধ্যমে কষ্ট সহ্য করার গুণ অর্জিত হয়। আর এটি দু'ভাবে হয়ে থাকে:
১- ক্ষমা ও উপেক্ষা করার মাধ্যমে মন্দ আচরণ মোকাবেলা করা। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন: وَجَزَاؤُا سَيِّئَةِ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ [আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। নিশ্চয় তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।] (৪) আল্লাহ তায়ালা আদল বা ন্যায়বিচারকে শরীয়াভুক্ত করেছেন, আর সে আদল হল কিসাস। তবে তিনি উত্তমতার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন, আর সে উত্তম কাজটি হল ক্ষমা। আল্লাহ তায়ালার নিকট ক্ষমার প্রতিদান কখনো বিনষ্ট হয় না।(৫) রাসূল সাঃ বলেছেন: (সাদাকাহ করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন।) (৬)
আবু বকর আস-সিদ্দীক রাঃ তার খালাত ভাই মিসতাহ বিন আসাসাহ এর উপর যে সাদাকা করতেন তা বন্ধ করে দেন যখন সে আয়েশা রাঃ এর উপর ইফক তথা মিথ্যা অপবাদ রটনার ঘটনায় জড়িত হয়। অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন এবং তাকে যে পরিমাণ দান করতেন তা পুনরায় চালু করেন যখন তিনি আল্লাহ তা’য়ালার নিম্নোক্ত বাণী শ্রবণ করলেন: وَلَا يَأْتَلِ أُوْلُوا الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُوْلِي الْقُرْبَى وَالْمَسَكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ ﴾رَّحِيمٌ অর্থ: [আর তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থকে ও আল্লাহ্র রাস্তায় হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না; তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।] (১)
আর ক্ষমা করা সবসময় শুধু প্রশংসনীয়ই নয় বরং তা কখনো শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় যদি ক্ষমার কারণে কোন বিপর্যয় না ঘটে। যদি ক্ষমার পরিণতিতে কোন বিপর্যয় ঘটে তাহলে ক্ষমা না করাই হল অতি উত্তম। উদাহরণত যে ব্যক্তি মানুষের উপর যুলুম করার কারণে প্রসিদ্ধ তাকে ক্ষমা করার ফলে সে যুলুম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হবে। আর যদি ক্ষমা করার ফলে কোন বিপর্যয় না ঘটে অথবা তা যদি মিমাংসার দিকে নিয়ে যায় তাহলে ক্ষমা করাই উত্তম。
২- মন্দ আচরণের বিপরীতে উত্তম আচরণ: আর ইসলাম এ বিষয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। হাদিসে এসেছে, নবী সাঃ বলেছেন: (হে উকবাহ বিন আমের! যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তুমি তার সাথে তা বজায় রাখ, তোমাকে যে বঞ্চিত করেছে তুমি তাকে প্রদান কর এবং যে তোমার উপর জুলুম করেছে তুমি তাকে ক্ষমা কর।)(২)
সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হবে সালাম প্রদান, সম্মান করা, তার জন্য দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, তার প্রশংসা করা এবং তাকে দেখতে যাওয়ার মাধ্যমে। আর যে আপনাকে বঞ্চিত করেছে তাকে শিক্ষা দেয়া, উপকার করা এবং সম্পদ দেয়ার মাধ্যমে প্রদান করা হবে। আর যে আপনার প্রতি অবিচার করেছে তার ক্ষমা হবে রক্তপণ ও সম্ভ্রমের ক্ষেত্রে। এগুলোর কতক ওয়াজীব ও কতক মুস্তাহাব।(৩) ওয়াজীব হল যে আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা। (৪) আর মুস্তাহাব হল যে আপনার উপর যুলুম করেছে তাকে ক্ষমা করা。
চতুর্থত: চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখা:
হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ভ্রুকুটিপূর্ণ ও মলিন চেহারার বিপরীত। অর্থাৎ মুসলিম ভাইদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে সাক্ষাৎ করা। কেননা এটি মিল-মহাব্বত এবং পূণ্যের অন্যতম উৎস। রাসূল সাঃ বলেছেন: (তুমি পূণ্যের কোন কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। এমন কি হোক সেটা তোমার মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।)(১)
অনুরূপভাবে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা হল সুখ্যাতি অর্জনের মাধ্যম। যেমনটি বলেছেন মুহাম্মাদ বিন হাযেম:
সুখ্যাতির অনুসন্ধানীরা তা অর্জন করতে পারেনি…যেমনটি পেরেছে উৎফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল চেহারার অধিকারীরা।

টিকাঃ
(১) সুনানে তিরমিযি (৪/৩১৯, হা: ২০০৫)।
(২) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩২০)।
(৩) সহীহ বুখারী (২/৮২, হা: ২০২৮), সহীহ মুসলিম (৩/১১৯৬, হা: ১৩-১৫৬২)।
(৪) ইবনুল কায়্যিম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩০৩)।
(১) সূরা আল-মায়েদা: (২)।
(২) মুস্তাদরাকে হাকেম (৩/২০৪)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/৪১১, হা: ৭৫২৮)।
(২) সুনানে তিরমিযি (৫/৫৭৪, হা: ৩৬৭৫)।
(৩) সূরা আন-নিসা: (৮৫)।
(৪) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (৫/১৯০)।
(৫) দেখুন: ইবনুল কায়ি‍্যম, মাদারেজুস সালেকীন (২/৩০৫-৩০৭)।
(৬) সুনানে আবু দাউদ (১/৬৪, হা: ৮৩)।
(৭) সহীহ মুসলিম (৪/১৯৯৭, হা: ৫৯-২৫৮১)।
(৮) সুনানে তিরমিযি (৪/৫৭৫-৫৭৬, হা: ২৫১৬), মুসনাদে আহমাদ (১/২৯৩)।
(১) সহীহ বুখারী (২/৩৫৫-৩৫৬, হা: ২৯৮৯), সহীহ মুসলিম (২/৬৯৯, হা: ৫৬-১০০৯)।
(২) মুসনাদে আহমাদ (৫/২৩৬)।
(১) সহীহ বুখারী (৪/১৮৭, হা: ৬৪৭৮)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/১৮৬-১৮৭, হা: ৬৪৭৪)।
(৩) সহীহ বুখারী (১/২০-২১, হা: ১০), সহীহ মুসলিম (১/৬৫, হা: ৬৫-৪১)।
(৪) ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী।
(৫) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৬) সহীহ বুখারী (৪/১৩৮, হা: ৬২৪১)।
(১) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(২) সূরা আল-হুমাযা: (১)।
(৩) তাফসীরুস সাদী (৫/৪৫৫)।
(৪) সূরা আল-ইসরা: (৩৬)।
(৫) আশ-শাতেবী, আল-মুয়াফাকাত (২/৪)।
(১) সূরা আল-বাকারা: (১৮৮)।
(২) কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (২/২২৫)।
(৩) সহীহ বুখারী (১/৪১, হা: ৬৭), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০৬, হা: ৩০-১৬৭৯)।
(৪) সূরা আল-মায়েদা: (৯১)।
(১) সূরা আন-নিসা: (৯৩)।
(২) সহীহ বুখারী (৪/২৬৮, হা: ৬৮৭৮), সহীহ মুসলিম (৩/১৩০২-১৩০৩, হা: ২৫-১৬৭৬)।
(৩) হাদিসটির তাখরীজ পূর্বে গত হয়েছে।
(৪) সূরা আশ-শূরা: (৪০)।
(৫) তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/১২৮)।
(৬) সহীহ মুসলিম (৪/২০০১, হা: ৬৯-২৫৮৮)।
(১) সূরা আন-নূর: (২২)।
(২) মুসনাদে আহমাদ (৪/১৫৮)।
(৩) ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমুউর রাসায়েল।
(৪) সহীহ বুখারী (৪/৯০, হা: ৫৯৯১)।
(১) সহীহ মুসলিম (৪/২০২৬, হা: ২৬২৬-২৫২৬)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px