📄 লেবাননের শারঈ বিচারব্যবস্থা
লেবানন হলো শাম অঞ্চল এবং সাধারণ সিরিয়ার একটি অংশ। বর্তমান যুগের আগে লেবাননের স্বাধীন কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তা সিরিয়ার সাথে মিলে উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্থানীয়, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে এই অঞ্চলে একপ্রকার স্বায়ত্তশাসন রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লেবানন ছিল ফরাসি আধিপত্যের করতলে। ১৯৪৩ সালের নভেম্বর মাসে তা ফরাসিদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে ধর্মীয় এবং মতাদর্শ ভিত্তিক অনেকগুলো সম্প্রদায় আছে। তারা হলো: ১. সুন্নি, ২. শিয়া, ৩. দ্রুজ, ৪. ম্যারোনাইট ক্যাথলিক, ৫. রোমান ক্যাথলিক, ৬. আর্মেনিয়ান ক্যাথলিক, ৭. সিরিয়ান ক্যাথলিক, ৮. গ্রিক অর্থোডক্স, ৯. আর্মেনিয়ান অর্থোডক্স, ১০. সিরিয়ান অর্থোডক্স, ১১. ইভানজেলিকালস, ১২. ক্যালডীয় অ্যাসিরিয়ান, ১৩. ইহুদি।
প্রতিটি সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিষয়ের একটি বিশেষ বিচারব্যবস্থা রয়েছে। ধর্ম এবং বিচার বিভাগের প্রতিটি সাম্প্রদায়িক ও আধ্যাত্মিক আদালতের দায়িত্বে রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক এবং বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী বিচারক। সুন্নি এবং শিয়া সম্প্রদায়গুলো আইনশাস্ত্রের চিন্তাধারায় পৃথক ছিল না। তবে ফরাসি আধিপত্যের সময় একটি আধ্যাত্মিক দ্রুজ সম্প্রদায়ের সাথে তারা আলাদা হয়ে ওঠে।
লেবাননের বিচার বিভাগ দ্বৈত। তা একটি সাধারণ বিচার বিভাগ। যা আইন মন্ত্রণালয় এবং একটি ধর্মীয় বিচার বিভাগের সাথে যুক্ত। সাধারণ বিচার বিভাগটি দেওয়ানি, ফৌজদারি এবং প্রশাসনিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। সাধারণ আদালত তিনটি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত। যথা: ১. প্রাথমিক আদালত, ২. আপিল আদালত এবং ৩. বিচার সংশ্লিষ্ট আদালত।
লেবাননে শূরা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা পরিষদ, অডিট ব্যুরো (হিসাব ও কর্মচারীদের বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে) এবং সামরিক আদালত আছে। সেখানে একাধিক ধর্মীয় আদালত আছে। এর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির কথা এখানে উল্লেখ করা হলো।
১. ইসলামি শারঈ আদালত
এটা দুই রকম। একটি হানাফি মাযহাব অনুসারে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করে। উসমানি সালতানাতে যে মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় মাযহাব হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মাঝে এই মাযহাবই এখনো আমলযোগ্য রয়েছে। তবে পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। আরেকটি বিচারব্যবস্থা শিয়াদের ইমাম জাফারের মাযহাব অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা করে। শারঈ আদালত দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিত:
একটি প্রাথমিক আদালত। ব্যক্তিগত, ইসলামি ওয়াকফ, অভিভাবক নির্ধারণ, পরিচালক নির্ধারণ, তাদের বরখাস্ত করা, তাদের কাছে জবাবদিহি চাওয়া—এ সকল শারঈ মামলার ক্ষেত্রে এই আদালতের পরিধি আছে।
আরেকটি হলো শারঈ সর্বোচ্চ আদালত। প্রাথমিক আদালত থেকে সরাসরি প্রকাশিত রায়কে এই আদালতে আপিল করা হয়। অথবা আপিল করা ছাড়াই এই আদালতের অধীনে প্রাথমিক আদালত থেকে প্রকাশিত রায়গুলোকে রেফার করা হয়। যেমন, শারঈ সর্বোচ্চ আদালত প্রাথমিক আদালতের বিচারগুলোকেও পর্যবেক্ষণ করে থাকে। প্রাথমিক আদালতের রায় যদি আইনভিত্তিক হয়, তাহলে সেগুলোকে অনুমোদন দেয়। অন্যথায় এগুলো আবার উত্থাপন করা হয়।
২. দ্রুত ধর্মীয় বিচার আদালত
১৯৫৯ সালে এই বিচারব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়। দুটি বিভাগ নিয়ে এটি গঠিত। একটি হলো প্রাথমিক আদালত। আরেকটি হলো সর্বোচ্চ আপিল আদালত। এই আদালত দ্রুজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ মামলা, দ্রুজ রীতিনীতি এবং তাদের প্রণয়ন করা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনের সাথে সম্পৃক্ত লেনদেন এবং বিভিন্ন মামলার দেখাশোনা করে থাকে। সুতরাং তারা যদি কোনো ডকুমেন্ট বা কোনো রীতিনীতি না পায়, তাহলে শারঈ আদালতে গৃহীত মামলা নীতি অথবা দেওয়ানি আইন অনুসারে যেগুলো তাদের ধর্মীয় মত এবং রীতিনীতির সাথে খাপ খায় সেগুলোতে প্রয়োগ করে। তাদের সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ করা হয়। তাদের আদালত দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। প্রাথমিক আদালতটি একজন বিচারক নিয়ে গঠিত এবং সর্বোচ্চ আপিল আদালতটি তিনজন বিচারক নিয়ে গঠিত।
৩. গির্জাভিত্তিক আদালত অথবা আধ্যাত্মিক আদালত
এই আদালতগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় এবং খ্রিষ্টান ধর্মের মতাবলম্বীদের জন্য। যার আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করেছি। এই আদালতগুলো ইতিহাসজুড়ে সংঘটিত খ্রিষ্টান কাউন্সিলের আইন প্রয়োগ করে। তারপর ইস্টার্ন চার্চের বিচার আইন জারি করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চল ও ডায়োসিসে অনেকগুলো প্রাথমিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। আদালত এমন সব নির্দেশ এবং শিক্ষা বাস্তবায়ন করত, যেগুলো খ্রিষ্টধর্মের আইনবহির্ভূত নয়। তবে প্রমাণ সংগ্রহ, বিবাদী ও সাক্ষীদের উপস্থিত করা এবং ধর্মের সাথে সম্পর্ক নেই এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের সহযোগিতা নেয়ার অনুমোদন ছিল।
টিকাঃ
[১১৮২] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ ফী লুবনান মিনান নাহিয়াতাইন আল-কানুনিয়্যাহ ওয়াশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৩৪ এবং তানযীমুল আহওয়ালিশ শাখসিয়্যাহ লিগায়রিল মুসলিমিন ফী সুরিয়্যাহ ওয়া লুবনান, পৃ. ৬৮ দ্রষ্টব্য
লেবানন হলো শাম অঞ্চল এবং সাধারণ সিরিয়ার একটি অংশ। বর্তমান যুগের আগে লেবাননের স্বাধীন কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তা সিরিয়ার সাথে মিলে উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্থানীয়, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে এই অঞ্চলে একপ্রকার স্বায়ত্তশাসন রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লেবানন ছিল ফরাসি আধিপত্যের করতলে। ১৯৪৩ সালের নভেম্বর মাসে তা ফরাসিদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে ধর্মীয় এবং মতাদর্শ ভিত্তিক অনেকগুলো সম্প্রদায় আছে। তারা হলো: ১. সুন্নি, ২. শিয়া, ৩. দ্রুজ, ৪. ম্যারোনাইট ক্যাথলিক, ৫. রোমান ক্যাথলিক, ৬. আর্মেনিয়ান ক্যাথলিক, ৭. সিরিয়ান ক্যাথলিক, ৮. গ্রিক অর্থোডক্স, ৯. আর্মেনিয়ান অর্থোডক্স, ১০. সিরিয়ান অর্থোডক্স, ১১. ইভানজেলিকালস, ১২. ক্যালডীয় অ্যাসিরিয়ান, ১৩. ইহুদি।
প্রতিটি সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিষয়ের একটি বিশেষ বিচারব্যবস্থা রয়েছে। ধর্ম এবং বিচার বিভাগের প্রতিটি সাম্প্রদায়িক ও আধ্যাত্মিক আদালতের দায়িত্বে রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক এবং বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী বিচারক। সুন্নি এবং শিয়া সম্প্রদায়গুলো আইনশাস্ত্রের চিন্তাধারায় পৃথক ছিল না। তবে ফরাসি আধিপত্যের সময় একটি আধ্যাত্মিক দ্রুজ সম্প্রদায়ের সাথে তারা আলাদা হয়ে ওঠে।
লেবাননের বিচার বিভাগ দ্বৈত। তা একটি সাধারণ বিচার বিভাগ। যা আইন মন্ত্রণালয় এবং একটি ধর্মীয় বিচার বিভাগের সাথে যুক্ত। সাধারণ বিচার বিভাগটি দেওয়ানি, ফৌজদারি এবং প্রশাসনিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। সাধারণ আদালত তিনটি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত। যথা: ১. প্রাথমিক আদালত, ২. আপিল আদালত এবং ৩. বিচার সংশ্লিষ্ট আদালত।
লেবাননে শূরা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা পরিষদ, অডিট ব্যুরো (হিসাব ও কর্মচারীদের বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে) এবং সামরিক আদালত আছে। সেখানে একাধিক ধর্মীয় আদালত আছে। এর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির কথা এখানে উল্লেখ করা হলো।
১. ইসলামি শারঈ আদালত
এটা দুই রকম। একটি হানাফি মাযহাব অনুসারে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করে। উসমানি সালতানাতে যে মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় মাযহাব হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মাঝে এই মাযহাবই এখনো আমলযোগ্য রয়েছে। তবে পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। আরেকটি বিচারব্যবস্থা শিয়াদের ইমাম জাফারের মাযহাব অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা করে। শারঈ আদালত দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিত:
একটি প্রাথমিক আদালত। ব্যক্তিগত, ইসলামি ওয়াকফ, অভিভাবক নির্ধারণ, পরিচালক নির্ধারণ, তাদের বরখাস্ত করা, তাদের কাছে জবাবদিহি চাওয়া—এ সকল শারঈ মামলার ক্ষেত্রে এই আদালতের পরিধি আছে।
আরেকটি হলো শারঈ সর্বোচ্চ আদালত। প্রাথমিক আদালত থেকে সরাসরি প্রকাশিত রায়কে এই আদালতে আপিল করা হয়। অথবা আপিল করা ছাড়াই এই আদালতের অধীনে প্রাথমিক আদালত থেকে প্রকাশিত রায়গুলোকে রেফার করা হয়। যেমন, শারঈ সর্বোচ্চ আদালত প্রাথমিক আদালতের বিচারগুলোকেও পর্যবেক্ষণ করে থাকে। প্রাথমিক আদালতের রায় যদি আইনভিত্তিক হয়, তাহলে সেগুলোকে অনুমোদন দেয়। অন্যথায় এগুলো আবার উত্থাপন করা হয়।
২. দ্রুত ধর্মীয় বিচার আদালত
১৯৫৯ সালে এই বিচারব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়। দুটি বিভাগ নিয়ে এটি গঠিত। একটি হলো প্রাথমিক আদালত। আরেকটি হলো সর্বোচ্চ আপিল আদালত। এই আদালত দ্রুজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ মামলা, দ্রুজ রীতিনীতি এবং তাদের প্রণয়ন করা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনের সাথে সম্পৃক্ত লেনদেন এবং বিভিন্ন মামলার দেখাশোনা করে থাকে। সুতরাং তারা যদি কোনো ডকুমেন্ট বা কোনো রীতিনীতি না পায়, তাহলে শারঈ আদালতে গৃহীত মামলা নীতি অথবা দেওয়ানি আইন অনুসারে যেগুলো তাদের ধর্মীয় মত এবং রীতিনীতির সাথে খাপ খায় সেগুলোতে প্রয়োগ করে। তাদের সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ করা হয়। তাদের আদালত দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। প্রাথমিক আদালতটি একজন বিচারক নিয়ে গঠিত এবং সর্বোচ্চ আপিল আদালতটি তিনজন বিচারক নিয়ে গঠিত।
৩. গির্জাভিত্তিক আদালত অথবা আধ্যাত্মিক আদালত
এই আদালতগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় এবং খ্রিষ্টান ধর্মের মতাবলম্বীদের জন্য। যার আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করেছি। এই আদালতগুলো ইতিহাসজুড়ে সংঘটিত খ্রিষ্টান কাউন্সিলের আইন প্রয়োগ করে। তারপর ইস্টার্ন চার্চের বিচার আইন জারি করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চল ও ডায়োসিসে অনেকগুলো প্রাথমিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। আদালত এমন সব নির্দেশ এবং শিক্ষা বাস্তবায়ন করত, যেগুলো খ্রিষ্টধর্মের আইনবহির্ভূত নয়। তবে প্রমাণ সংগ্রহ, বিবাদী ও সাক্ষীদের উপস্থিত করা এবং ধর্মের সাথে সম্পর্ক নেই এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের সহযোগিতা নেয়ার অনুমোদন ছিল।
টিকাঃ
[১১৮২] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ ফী লুবনান মিনান নাহিয়াতাইন আল-কানুনিয়্যাহ ওয়াশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৩৪ এবং তানযীমুল আহওয়ালিশ শাখসিয়্যাহ লিগায়রিল মুসলিমিন ফী সুরিয়্যাহ ওয়া লুবনান, পৃ. ৬৮ দ্রষ্টব্য