📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগ

📄 বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগ


সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা প্রধান তিনটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। এ বিভাগ তিনটি একটি থেকে আরেকটি স্বতন্ত্র। সেগুলো এই:

১. শারঈ বিচারব্যবস্থা এবং শারঈ আদালত: শারঈ আদালত মূলত বিচারব্যবস্থার অনুগত। এটা ছিল মৌলিক বিচারব্যবস্থা। যার সাধারণ পরিধি ছিল বিভিন্ন বিরোধ এবং অপরাধের ক্ষেত্রে। এই বিচার বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগগুলোকে আলাদা মনে করা হয়। শারঈ বিচারব্যবস্থা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলত। আরও কিছু আধা বিচারিক সংস্থা আইন মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হবে।

২. দুর্নীতি বিভাগ: এটি একটি স্বতন্ত্র বিচার বিভাগ। এই বিভাগের সম্পর্ক সরাসরি বাদশাহর সাথে। এ বিভাগের সর্বশেষ ক্ষমতা বাদশাহর জন্য সংরক্ষিত। (ধারা নং: ১।) বাদশাহ এ বিভাগকে বিশেষ ক্ষমতা এবং পরিধি দিয়েছেন। এ বিভাগে তিনটি প্রধান কমিটি আছে। যথা: ক. তদন্ত কমিটি, খ. উপদেষ্টা কমিটি এবং গ. অডিট কমিটি। ১/১১/১৩৭৯ হিজরির ৩৫৭০/১ নং ধারায় দুর্নীতি বিভাগের প্রধান একটি সিদ্ধান্ত জারি করা হয়। এ সিদ্ধান্তে দুর্নীতি বিভাগের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

তুলনামূলকভাবে দুর্নীতি দমন বিভাগের ব্যাপক ক্ষমতা ছিল। এ বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অথবা রাষ্ট্রীয় অন্য কোনো বিভাগ থেকে এই বিভাগে রেফার করা সকল মামলা পরিচালনার অধিকার এই বিভাগের ছিল। যেসব বিরোধের ক্ষেত্রে প্রশাসন একটি পক্ষ হতো, সেসব বিরোধ মীমাংসা করার ব্যাপক পরিধি এই আদালতের থাকত। শৃঙ্খলামূলক বা সতর্কতামূলক মামলা-কর্মীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে নিয়ন্ত্রণ ও তদন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে যে সকল মামলা উত্থাপন করা হতো, সেসব মামলার নিষ্পত্তি এই বিভাগ করত। কিছু কিছু ফৌজদারি মামলা যেমন জালিয়াতি অপরাধ, ঘুষ লেনদেন, জনসাধারণের তহবিল পরিচালনার অপরাধ এবং অন্যান্য অপরাধের মামলা পরিচালনাও এ বিভাগ করত। এ বিভাগটি ভিনদেশি রায় বাস্তবায়নের অনুরোধ, প্রাদেশিক ব্যবস্থা লঙ্ঘনের মামলা, এবং অন্যান্য বিষয় যেগুলো এই বিভাগের মন্ত্রী পরিষদ কর্তৃক প্রেরিত, বা রাজকীয় ফরমান, মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত এবং রাজকীয় আদেশে নির্ধারিত থাকত। বিশদ অধ্যয়নের তুলনায় এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাই এখানে যথেষ্ট।

টিকাঃ
[১১৬৭] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ১২০
[১১৬৮] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ১২৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 স্বাধীন বিচার বিভাগের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান

📄 স্বাধীন বিচার বিভাগের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান


এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিচার সংশ্লিষ্ট এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। এগুলো বিচারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচারের বিভিন্ন পরিধি থাকলেও এগুলো আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভিন্ন। বিভিন্ন বিচার-সংক্রান্ত আদালত থেকে এগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন। এ ধরনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হচ্ছে: ১. মন্ত্রীদের বিচার বিভাগ, ২. বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা, ৩. বাণিজ্যিক প্রতারণা প্রতিরক্ষা কমিটি, ৪. বাণিজ্যিক সংস্থা আইনে নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করার জন্য বিশেষ সংস্থা, ৫. বাণিজ্যিক কাগজপত্র কমিটি, ৬. মান এবং পরিমাণ লঙ্ঘন পর্যালোচনা করার জন্য দায়বদ্ধ কমিটি, ৭. রসদ জোগানোর জন্য বিচার বিভাগীয় কমিটি, ৮. বাণিজ্যিক আদালত, ৯. চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ১০. ওয়ার্ক কমিটি এবং শ্রমিকদের বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটি, ১১. সামরিক বাহিনীর জন্য শৃঙ্খলা পরিষদ, ১২. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা পরিষদ এবং ১৩. প্রশাসনিক আদালত হিসেবে কাস্টমস কমিটি।

এই স্বাধীন বা অর্ধ-বিচারিক সংস্থাগুলো একাধিক মন্ত্রণালয়ের সাথে যুক্ত ছিল। বিশেষ প্রক্রিয়ার অধীনে থাকত সংস্থাগুলো। এই বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবস্থাপনা এর নীতিগুলো বাস্তবায়ন করত। এসব সংস্থা শারঈ বিচারক এবং শারঈ আদালতের বোঝা লাঘব করে দিত। তবে এই বিভাগ বিচারিক স্থিতিশীলতা উপভোগ করতে পারে না। কেননা মূলত এই আদালত প্রয়োজনের সময় গঠিত হতো। বা যারা এই বিচার বিভাগের পূর্ণ-সময়ের সদস্য নয়, তাদের নিয়ে গঠিত হতো এই বিভাগ। যা শারঈ আদালতের কর্তৃত্ব দুর্বল করে দিত। বিচার মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বও দুর্বল করে দিত। আবার বিশেষ ব্যবস্থাপনা এবং বিধি প্রয়োগের পথও খুলে দিত। তবে সাধারণ শরীয়ত বাস্তবায়ন করত না।

বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলোর বহুবিধতা একটি অবাঞ্ছিত বিষয়। যা সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাই আদালত এবং বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলোকে একটি সংস্থায় একীভূত করতে ৩/২১/১৩৯৮ হিজরিতে মন্ত্রীসভার ২৩৬ নং রেজোলিউশন জারি করা হয়। যাতে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ১৪/৯/১৪০১ হিজরিতে মন্ত্রীসভার ১৭৬ নং রেজোলিউশন জারি করা হয়। যাতে আদালত গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেই আদালতগুলো হবে আইন মন্ত্রণালয়ের অনুগত। আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো শাসকের পক্ষ থেকে দেওয়া নির্দেশনাবলি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা অনুসারে বিভিন্ন ট্রাফিক মামলা, বাণিজ্যিক বিরোধ এবং শ্রমিক বিরোধ নিষ্পত্তি করা। যেগুলো কুরআন, সুন্নাহ বা ইজমার দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বিভিন্ন শারঈ আদালতে কর্মরত বিচারকদের মধ্য থেকে এই আদালতগুলোতে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। রিয়াদ এবং মক্কা মুকাররমায় দুই রেফার আদালতের মধ্যে বিশেষ দুটি বিভাগ রাখা হয় বাণিজ্যিক আদালত, শ্রমিক আদালত এবং ট্রাফিক আদালতের পক্ষ থেকে জারি করা রায়গুলো রেফার করার জন্য। এ ব্যবস্থাপনা উচ্চতর বিচার বিভাগের ইনস্টিটিউট এবং শারঈ কলেজগুলোতে পড়ানো হবে—এই শর্তে দুটি বিভাগকে বিশেষভাবে রাখা হয়। এসব ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক নিয়ম এবং বিচারিক ও প্রশাসনিক পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়।

টিকাঃ
[১১৬৯] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ১১৭
[১১৭০] আলে শাইখ, আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ২৩-২৪

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 শারঈ আদালত

📄 শারঈ আদালত


নতুন বিচারব্যবস্থা চার ধরনের আদালত (৫ নং ধারা) নিয়ে শারঈ আদালত সাজিয়েছে।

১. বিচারের সর্বোচ্চ পরিষদ: এই পরিষদটি ১১জন সদস্য নিয়ে গঠিত। এই পরিষদটি মামলা যাচাই-বাছাই করার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, অঙ্গচ্ছেদ বা রজম বিষয়ে জারি করা রায়গুলো পর্যালোচনা করে থাকে।

২. রেফার আদালত: এই আদালত তিনটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। প্রত্যেক বিভাগের প্রধান বা তার প্রতিনিধি এটা পরিচালনা করে। বিভাগ তিনটি হচ্ছে: (ক) ফৌজদারি মামলার শুনানি বিভাগ, (খ) ব্যক্তিগত মামলা শুনানি বিভাগ এবং (গ) অন্যান্য মামলা শুনানি বিভাগ। ১০ নং ধারা অনুসারে রেফার আদালতে প্রয়োজনের সময় একাধিক বিচারক থাকতে পারে। তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে বিচারের সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশ করা হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড, হাত কাটা এবং রজমের ক্ষেত্রে ৫জন বিচারকের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত জারি করা হয়। সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তগুলো জারি করা হয়। (ধারা নং: ১৩।)

৩. সাধারণ আদালত: এই আদালত এক বা একাধিক বিচারক নিয়ে গঠিত। আদালতের মধ্যে একজন বিচারকের পক্ষ থেকে রায় জারি করা হয়। তবে হত্যা, রজম এবং হাত কাটার মামলার ক্ষেত্রে তিনজন বিচারকের পক্ষ থেকে রায় জারি করা হয়। (ধারা নং: ২৩।)

৪. আংশিক আদালত: এ আদালত এক বা একাধিক বিচারক নিয়ে গঠিত। একজন বিচারকের পক্ষ থেকে আদালতের রায়গুলো প্রকাশ করা হয়। (ধারা নং: ২৪-১৫।)

নতুন বিচারব্যবস্থা এই আদালতের প্রতিটির ধরনের পরিধি নির্ধারণ করে দেয় নি। বিচারের সর্বোচ্চ পরিষদের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে আইনমন্ত্রী কর্তৃক সিদ্ধান্ত জারির ওপর পরিধি নির্ধারণের বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০/১/১৩৯৭ হিজরিতে মামলা দায়ের ব্যবস্থা, ফৌজদারি পদ্ধতি এবং আইনমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এ আদালতের পরিধি নির্ধারণ করা হয়। (ধারা নং: ১২-১৩।)

বিচারব্যবস্থা সাধারণভাবে শারঈ আদালতের পরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটাও নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, শারঈ আদালত সকল বিরোধ এবং সকল অপরাধের বিচার করবে। তবে বিচার বিভাগ যে সমস্ত বিচারকে পৃথক করবে, সেগুলো করতে পারবে না। বিচারের সর্বোচ্চ পরিষদের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে রাজকীয় আদেশে বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা যাবে। শারঈ আদালত সাধারণ পরিধির অধিকারী। এ ছাড়া অন্যান্য আদালতগুলোকে ব্যতিক্রমধর্মী বিচার বিভাগ মনে করা হয়। যেমন অপ্রাপ্তবয়স্কদের মামলা-সংক্রান্ত আদালত, বিবাহ এবং জরিমানা সংক্রান্ত আদালত।

বিচারক হিসেবে নিয়োগের শর্ত হলো প্রার্থীকে অবশ্যই সৌদি রাজ্যের কোনো শারঈ অনুষদ থেকে সনদ অর্জন করতে হবে। বিচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। জরুরি অবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সনদ অর্জন ছাড়াও ইলমে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের কাউকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। (ধারা নং: ৩৭)।

শারঈ আদালত নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসরণ না করে সরাসরি কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে গৃহীত শারঈ বিধান আঁকড়ে ধরার ওপর নির্ভরশীল। ৭/১/১৩৪৭ হিজরির ৩ নং ধারায় বিচার সংস্থার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয় এবং ২৪/৩/১৩৪৭ হিজরিতে সৌদি উচ্চ প্রশাসনের সমর্থনে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছে, সকল আদালতের মধ্যে বিচারের রায় যেন হাম্বলি মাযহাবের মুফতির ওপর ভিত্তি করে হয়। তবে জনস্বার্থে অন্যান্য মাযহাবের মতামতও গ্রহণ করা যাবে। ফসলের জমি, স্থাবর সম্পত্তি এবং ওয়াকফের বিরোধের ক্ষেত্রে ওই জায়গায় প্রচলিত মাযহাব অনুসারে বিচার করা হবে।

টিকাঃ
[১১৭১] আল শাইখ, আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ৫৫ এবং ৫৭
[১১৭২] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ১৫৬; আল শাইখ, আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ৪০ এবং ৪৯
[১১৭৩] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ১৬১
[১১৭৪] আত-তানযীমুল কাদ্বাঈ, পৃ. ১৭০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00