📄 শারঈ বিচার বিভাগ
শারঈ আদালতগুলো শারঈ বিচার বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করত। যাকে প্রধান বিচারপতি বিভাগ বলা হতো। এটি বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল না; বরং এটি ছিল মন্ত্রণালয়ের মতো একটি স্বাধীন বিভাগ। প্রধান বিচারপতি মন্ত্রীর মতো এই বিচার বিভাগের নেতৃত্বে থাকতেন।
প্রধান বিচারপতির বিভাগটি প্রধান বিচারপতি এবং প্রতিটি জেলার কিছু আদালত নিয়ে গঠিত। প্রধান বিচারপতির বিভাগে থাকত একজন প্রধান বিচারক এবং প্রত্যেক জেলায় কয়েকটি করে আদালত। প্রধান বিচারপতির কার্যালয়ে তিনজন কর্মচারী এবং শারঈ আদালত থাকত। যার প্রত্যেকটিতে একজন বিচারক, একজন মুন্সি, একজন আদালতের পেশকার এবং একজন ঘোষক ছিল।
পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতির বিভাগটিতে থাকতেন প্রধান বিচারপতি নিজে, শারঈ আদালতের পরিচালক, অডিট বোর্ড, শারঈ আদালতের প্রধান বিচারপতি, ইয়াতিম ফাউন্ডেশন এবং উইল বিভাগের পরিচালক। শারঈ আদালতের পরিচালক তার দায়িত্বের পাশাপাশি রাজধানীর মূল বিচারক ছিলেন।
পরবর্তী প্রধান বিচারপতির বিভাগটি পঞ্চম দশকে স্থিতিশীল হয়ে আরও সম্প্রসারিত আকারে এবং নিম্নোক্ত বিভাগগুলো নিয়ে গঠিত হয়।
ক. প্রধান বিচারপতি: যাকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা এবং একজন মন্ত্রীর বেতন-ভাতায় নিয়োগ দেয়া হতো। প্রধান বিচারপতির প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি সম্পর্ক থাকত। একজন মন্ত্রীর ক্ষমতা তিনি রাখতেন। কিন্তু মন্ত্রীপরিষদের সাথে তিনি একত্র হতেন না। রাজ্যে শারঈ বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করলেও বিচারকের ক্ষমতা তার হাতে থাকত না। তারপর ছিল বেসামরিক আদালতের আইনমন্ত্রীর সমপর্যায়ের পদ। মন্ত্রীদের সাথে সম্পৃক্ত প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজ যিনি পরিচালনা করতেন। তার দায়িত্ব ছিল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। বিচার বিভাগের দায়িত্ব তার ছিল না।
যেসব ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরিধি ছিল, সেগুলো হচ্ছে: ১. রাজকীয় উইল জারি করার জন্য বিচারিক পরিষদের সিদ্ধান্ত জমা দেওয়া। ২. প্রয়োজনে বিচারকদের ডাকা। ৩. জুডিশিয়াল কাউন্সিল আহ্বান করা। ৪. জুডিশিয়াল কাউন্সিলে বিচারকদের পক্ষ থেকে পদত্যাগের অনুরোধ জমা দেওয়া। ৫. সমস্ত শারঈ আদালত এবং তাদের বিচারকদের তত্ত্বাবধান করা। এ ক্ষেত্রে শারঈ পরিচালক এবং শারঈ আদালতের পরিদর্শক তাকে সহায়তা করত। ৬. বিচারকদের সতর্ক করা। ৭. শারঈ কর্মকর্তাদের কাজের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা এবং তাদের নিয়োগ অনুমোদন করা। ৮. শারঈ আইনজীবীদের সার্টিফিকেট প্রদান মঞ্জুর করা, এবং আদালতের রেজিস্টার খাতায় তাদের রেজিস্ট্রেশন করে রাখা। ৯. ১৯৫৫ সালের ২ নং ধারায় বিচারিক ক্ষমতার একটি ব্যবস্থাপনা জারি করা হয়েছিল। ২১শে এপ্রিল ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এ ধারা অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি কাজ শুরু করেন।
খ. শারঈ পরিচালক: প্রধান বিচারপতির পরেই ছিল তার পদ। তিনিই প্রথম শারঈ বিচারকের অবস্থানে থাকতেন। কিন্তু মৌলিকভাবে তিনি হতেন একজন বিচারক। শারঈ আদালতের সাথে সম্পৃক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো তিনি পালন করতেন।
গ. শারঈ আদালতের পরিদর্শক: তিনি মৌলিকভাবে একজন বিচারক হতেন। আদালতগুলো পরিদর্শন করার সাথে সাথে আদালত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য আদালতের রেজিস্টার খাতা থেকে সংগ্রহ করতেন।
ঘ. শারঈ আপিল আদালতের চেয়ারম্যান: এই আদালতটি ছিল রেফার কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের মতো।
ঙ. আপিল আদালতের সদস্য: একজন চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন সদস্য নিয়ে শারঈ আপিল আদালত গঠিত হতো। এই আদালতের বৈঠক শুরু হতো একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন সদস্যের মাধ্যমে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অকাট্যভাবে আদালতের সিদ্ধান্ত এবং রায়গুলো জারি করা হতো। (শারঈ আদালত গঠন আইনের সংশোধিত ২১ নং ধারা।)
প্রাথমিক শারঈ আদালতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মামলাগুলো পরিচালনার জন্য এই আদালত ছিল সর্বোচ্চ আদালতের পর্যায়ে। যেমনটা এই আদালতে উল্লেখিত ১৯৭৭ সালের ২০ নং ধারায় এবং ১৩৫-১৫২ নং ধারায়, ১৯৫৯ সালের ৩১ নং ধারায় আপিল আদালতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সাথে জারি করা হয়েছে। শারঈ মামলা পদ্ধতির আইনের ধারায় আপিল মামলা শুনানির পদ্ধতির স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। আপিল আদালত ছিল দুটি। একটি ওমানে, আরেকটি আল-কুদসে। প্রয়োজনের সময় তৃতীয় কোনো আদালত গঠন করার অধিকার মন্ত্রীপরিষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
চ. শারঈ আদালত: প্রয়োজন অনুপাতে কখনো কখনো একই আদালতে একাধিক বিচারক থাকতেন। প্রত্যেক বিচারক স্বাধীনভাবে তার মামলা শুনানি করতেন। ব্যক্তিগত মোকদ্দমা, ওয়াকফকৃত সম্পদ এবং মুক্তিপণের ক্ষেত্রে ছিল শারঈ আদালতের পরিধি। এটা সবিস্তারে সামনে বর্ণনা করা হবে। শারঈ বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত ছিল, শারঈ বিচারকের অবশ্যই শারঈ বিচারের সনদ বা শারঈ অনুষদ এবং আইনে স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে। প্রশাসনিক অনুমোদনে এবং শারঈ বিচার বিভাগের কাউন্সিল কর্তৃক তাকে নিয়োগ দেওয়া হতো।
ছ. ব্যুরো: এটি একজন প্রধান, একজন সচিব, একজন আর্থিক পরিচালক এবং একজন নথি-মুনশি নিয়ে গঠিত।
টিকাঃ
[১১৫৫] নিযামুল কাদ্বায়িল উরদুন্নি, পৃ. ৮০; আল-কাদ্বাউশ শারঈ আল-উরদুন্নি, পৃ. ৬৩; উসুসুত তাশরী, পৃ. ১১৪
[১১৫৬] আল-কারারাতুল কাদ্ধাইয়্যাহ ফী উসূলিল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৩৩৯ এবং ৩৮০; নিযামুল কাদ্বায়িল উরদুন্নি, পৃ. ৬৫ এবং ১৬৫; উসুসুত তাশরী, পৃ. ১১৯
[১১৫৭] নিযামুল কাদ্বায়িল উরদুন্নি, পৃ. ৬৪; আল-কাদ্বাউশ শারঈ আল-উরদুন্নি, পৃ. ৬৪
[১১৫৮] আল-কাদ্বাউশ শারঈ আল-উরদুন্নি, পৃ. ৫১
📄 শারঈ আদালত গঠন
জর্ডানে ১৯৭২ সালের ১৯ নং ধারায় শারঈ আদালত গঠন আইন জারি হয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ১৮ নং আইন, ১৯৭৯ সালের ৮ নং আইন, ১৯৮৯ সালের ২৫ নং আইন এবং ১৯৮৩ সালের ২৫ নং আইনে শারঈ আদালত গঠন আইনের প্রয়োজনীয় সংযোজন এবং সংশোধনী জারি করা হয়।
শারঈ আদালত গঠন এবং এর সংশোধনী সংক্রান্ত আইনের ২ নং ধারাটি শারঈ বিচারক কারা হবে—এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। তারা হলেন:
১. প্রাথমিক শারঈ আদালতের বিচারক
২. শারঈ আপিল আদালতের প্রধান আর সদস্য
৩. শারঈ আদালতের পরিদর্শক
৪. শারঈ আদালতের মহাপরিচালক
৫. প্রধান বিচারপতির জন্য বিচার বিভাগের উপদেষ্টা
১৪ নং ধারা অনুযায়ী গঠিত শারঈ আদালত আইন উল্লেখ করেছে যে, নিম্নোক্ত পদগুলোর সমন্বয়ে শারঈ বিচার কাউন্সিল গঠন করা হবে। যথা:
১. শারঈ আপিল আদালতের প্রধান
২. শারঈ পরিচালক
৩. শারঈ আপিল আদালতের বিচারক দুজনের মাঝে যিনি সবচেয়ে প্রবীণ
৪. শারঈ আদালতের পরিদর্শক
এই পরিষদ ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন আদালতের ক্ষেত্রে দেওয়ানি বিচারক নিয়োগ দেওয়ার জন্য বিশেষ বিচারিক পরিষদের মতোই। বিচারিক প্রতিযোগিতায় অগ্রগামীদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে শারঈ বিচার বিভাগ পরিষদ নির্বাচন করত। তারপর নিয়োগের ক্ষেত্রে মহামান্য রাজকীয় প্রশাসনের অনুমোদন জারি করার জন্য প্রধান বিচারকের কাছে এসব অগ্রগামীর নাম পেশ করা হতো।
টিকাঃ
[১১৫৯] নিযামুল কাদ্বায়িল উরদুন্নি, পৃ. ৭১
📄 শারঈ আদালতের পরিধি
১৯৫২ সালে জর্ডানের সংবিধানের ১০৬ নং ধারায় এ ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, যে-কয়েকটি বিষয়ে শারঈ আদালতের বিশেষ আইন অনুযায়ী শারঈ আদালতের বিচারকার্য পরিচালনা করার অধিকার রয়েছে—সেগুলো হচ্ছে:
১. মুসলিমদের ব্যক্তিগত বিষয়ে
২. মুসলিমদের মাঝে রক্তপণের বিষয়ে। যদি দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ মুসলিম হয় আর দুই পক্ষই শারঈ আদালত মেনে নেয়।
৩. ওয়াকফকৃত সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত মামলার ক্ষেত্রে।
এরপর ১৯৫৯ সালের ৩১ নং আইন আসে। সেটা হলো শারঈ মামলা পদ্ধতি আইন। এর ২ নং ধারায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল শারঈ আদালতের পরিধি। এই আলোচনার মধ্যে উল্লেখ ছিল যে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো শারঈ আদালত দেখাশোনা করবে।
১. ওয়াকফ করা, মুসলিমদের দ্বারা এর বাস্তবায়ন করা, এর শর্ত, এর ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেয়া, পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনা এবং স্থানান্তর।
২. দুই ওয়াকফের মাঝে বিরোধ, এবং ওয়াকফের বৈধতা-সংক্রান্ত মামলা।
৩. শারঈ দলিলভিত্তিক উইলের সম্পত্তি এবং ইয়াতিমদের সম্পত্তির ঋণ তহবিল।
৪. অভিভাবকত্ব, ওসিয়ত এবং উত্তরাধিকার।
৫. নিষেধাজ্ঞা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী।
৬. পরিচালক ও ওসি নিয়োগ এবং তাদের বরখাস্ত করা।
৭. নিখোঁজ ব্যক্তি।
৮. বিবাহ-শাদি, বিবাহ বিচ্ছেদ, মোহর, যৌতুক, মোহর হিসেবে যা পরিশোধ করা হয়, ভরণপোষণ, বংশ এবং লালনপালন।
৯. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঘটে যাওয়া বিষয় এবং যার মূল কারণ হয় বিবাহের সময়ের চুক্তি।
১০. উত্তরাধিকার সম্পত্তি লিখে রাখা, উত্তরাধিকার স্থাবর সম্পত্তির দাবি ও তার মীমাংসা করা।
১১. দুপক্ষ মুসলিম হলে মুক্তিপণের দাবি। অনুরূপভাবে দুই পক্ষের এক পক্ষ যদি অমুসলিম হয় আর তারা এ ব্যাপারে সম্মতি দেয়, যে ব্যাপারে শারঈ আদালত বিচার করতে পারবে।
১২. স্থাবর সম্পত্তি এবং অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সম্পত্তির সকল বিনিয়োগ।
১৩. মৃত্যুশয্যায় দান এবং ওসিয়ত।
১৪. অভিভাবক, তত্ত্বাবধায়ক এবং পরিচালককে অনুমোদন দেয়া, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা এবং এই জবাবদিহি অনুসারে ফয়সালা করা।
১৫. শারঈ আদালতের কাছে রেকর্ডকৃত উইল সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা। যদি ওয়াকফকারী অমুসলিম হয় এবং দুপক্ষ এ ব্যাপারে সম্মতি দেয়।
১৬. মুসলিমদের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সকল বিষয়।
১৭. শারঈ আদালতের কাছে অথবা শারঈ আদালত সমর্থিত অন্য কোনো আদালতের কাছে রেজিস্ট্রেশন করা বৈবাহিক সকল চুক্তি।
টিকাঃ
[১১৬০] আল-কারারাতুল কাদ্ধাইয়্যাহ ফী উসূলিল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৩৪০; আল-কাদ্বাউশ শারঈ আল-উরদুন্নি, পৃ. ৬৪; উসুসুত তাশরী, পৃ. ১১৬
📄 শারঈ বিচারব্যবস্থার রায়ের উৎস
১৯৫২ সালের জর্ডানের সংবিধানের ১০৬ নং ধারায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, শারঈ আদালত দ্বীনের সঠিক বিধান বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি নিম্নোক্ত আইনগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারেও শারঈ আদালত দায়িত্বশীল।
১. শারঈ মামলা-নীতির আইন। (১৯৬৯ সালের ৩১ নং আইন।)
২. সাময়িক ব্যক্তিগত আইন। (১৯৭৬ সালের ৬১ নং আইন।)
৩. জর্ডানের অস্থায়ী দেওয়ানি আইন। (১৯৭৬ সালের ৪৩ নং আইন।)
৪. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ বা লেনদেন ও নাগরিকত্ব আইন। যা ১২৯৩ হিজরিতে উসমানি সালতানাতে জারি করা হয়েছিল। জর্ডানের নাগরিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক মাজাল্লার আইনকে বিলুপ্ত করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। শপথ এবং প্রমাণের মতো অন্যান্য আইনগুলো মাজাল্লা অনুসারে পরিচালিত হতো।