📄 সিরিয়ার সাধারণ বিচার বিভাগের আদালত
মূলত সাধারণ বিচার বিভাগের আদালত ছিল নিম্নের আদালতগুলো নিয়ে গঠিত।
১. ব্যক্তিগত অবস্থার আদালত: এই আদালতের দায়িত্ব ছিল পরিবারের বিবাহ, তালাক, মিরাস, বংশ, ভরণপোষণ ইত্যাদির সাথে সম্পর্কিত বিষয়ের মামলা শুনানি।
ব্যক্তিগত অবস্থার আদালত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। (ধারা নং: ৩৩।)
ক. শারঈ আদালত: একজন বিচারক নিয়ে এ আদালত গঠিত হতো। যাকে শারঈ বিচারক বলা হতো। কোনো এলাকায় একাধিক শারঈ আদালত থাকলে সর্বোচ্চ বিচারক বা প্রবীণ বিচারক আদালতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতেন। (ধারা নং: ৩৪।) দামিস্কে বিশেষভাবে প্রথম শারঈ বিচারকের দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা। পূর্ববর্তী আলোচনায় যাকে ‘কাযিউল কুযাত’ বা প্রধান বিচারপতি বলা হতো।
খ. মতাদর্শিক আদালত: এই আদালত দ্রুজ সম্প্রদায়ের লোকদের পক্ষ থেকে একজন শারঈ বিচারক নিয়ে গঠিত হতো। উল্লিখিত সম্প্রদায়ের পারিবারিক বিভিন্ন মামলা শুনানির দায়িত্ব পালন করত এই আদালত। আইনমন্ত্রীর মতামত এবং বিচার বিভাগের উচ্চ পরিষদের সম্মতি গ্রহণের পর একটি ফরমানের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩৫ নং ধারা অনুযায়ী বিচারক নিয়োগের সকল শর্ত পরিপূর্ণভাবে দেখা হতো। মতাদর্শিক আদালত ৩০৭ নং ধারার প্রতি লক্ষ রেখে সিরিয়ান পারিবারিক আইন প্রয়োগ করত। বিশেষভাবে দ্রুজ সম্প্রদায়ের সাথে সম্পৃক্ত বিশেষ কিছু আইন ছিল এই ধারার অন্তর্ভুক্ত।
গ. আধ্যাত্মিক আদালত: এই আদালত বিধর্মী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পারিবারিক মামলার শুনানির দায়িত্ব পালন করত। রেজোলিউশন নং ৬০ L.R (১৩ই মার্চ ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৩৬ নং ধারা এই আদালত নিয়ন্ত্রণ করে তার পরিধি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করত। লেবাননের মতো সিরিয়াতেও এই রেজোলিউশন বিধর্মী সম্প্রদায়ের একটি পরিসংখ্যান করেছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে লেবাননের মতো সিরিয়ার অমুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা গণনা করা হয়েছিল। তারা ছিল—১. ম্যারোনাইটস, ২. গ্রিক অর্থোডক্স, ৩. রোমান ক্যাথলিক, ৪. আর্মেনিয়ান অর্থোডক্স, ৫. আর্মেনিয়ান ক্যাথলিক, ৬. সিরিয়ান অর্থোডক্স, ৭. সিরিয়ান ক্যাথলিক, ৮. অ্যাসিরিয়ান ক্যালডক্স, ৯. ক্যালদিয়ান, ১০. ল্যাটিন, ১১. প্রোটেস্ট্যান্ট, ১২. দামিস্ক সিনাগগের ইহুদি এবং ১৩. আলেপ্পো সিনাগগের ইহুদি। এই রেজুলেশন এখনো কার্যকর।
সিরিয়ান পারিবারিক আইনের ৩০৮ নং ধারাটি পারিবারিক অবস্থা ধারণ করে। খ্রিষ্টান এবং ইহুদি আধ্যাত্মিক আদালতগুলো পারিবারিক মামলাগুলোর শুনানি দেখার দায়িত্ব পালন করত। এই ধারাটির মধ্যে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের ধর্মীয় যে আইনকানুন এবং বিধিবিধান রয়েছে—সেগুলো পালন করতে হবে। বিবাহের প্রস্তাব, বিবাহের শর্ত এবং বিবাহ সম্পাদন, বিবাহের পরে তাদের খোঁজখবর রাখা, স্ত্রীর ভরণপোষণ, ছোটদের ভরণপোষণ, বিবাহ বাতিল এবং বিবাহের বৈধতা, বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, তালাকে বায়িনের ক্ষেত্রে যৌতুক এবং লালনপালনের সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়—এগুলো তার অন্তর্ভুক্ত হবে। এসব ছাড়া আরও যে আইনকানুন রয়েছে, সেগুলো শারঈ আদালতের মধ্যে সকল সিরিয়াবাসীর ওপর কার্যকর করা হতো।
২. কিশোর আদালত অপ্রাপ্তবয়স্কদের সাথে জড়িত সমস্ত মামলার শুনানি করত। ৩০শে মার্চ ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩৬ নং ধারায় জারি করা কিশোর আইন বাস্তবায়ন করা হয়।
৩. আপোস আদালত একজন বিচারক নিয়ে গঠিত হতো। যাকে ‘ম্যাজিস্ট্রেট জজ’ বলা হতো। (ধারা নং: ৩৮।) এই আদালত ১০ হাজার সিরিয়ান পাউন্ডের কম মূল্যমানের মামলার মীমাংসা করত। দেওয়ানি, বাণিজ্যিক এবং ফৌজদারি বিষয়গুলো ছিল যার নির্ধারিত কার্যবিধি। ফৌজদারি আইন যেগুলো নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। (ধারা নং: ৬২ এবং তার পরবর্তী ধারাসমূহ। ধারা নং: ৩৯। বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের আইন থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল।)
৪. প্রাথমিক আদালত একজন বিচারক নিয়ে এই আদালত গঠিত হতো। যাকে প্রাথমিক বিচারক বলা হতো। (বিচার বিভাগ আইনের ৪০ নং ধারা।) এই আদালতগুলো এমন সব মামলার নিষ্পত্তি করত, যার জন্য কোনো বিশেষ বিচারিক কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করা হয়নি। (ধারা নং ৪০-এর ২ নং দফা।) মামলা নীতি আইন প্রাথমিক আদালতের পরিধি নির্ধারণ করে দিত। (ধারা নং: ৭৭।)
৫. ফৌজদারি আদালত এটি সিরিয়ার দেওয়ানি বিচার বিভাগের একটি অংশ। ফৌজদারি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলো ছোটখাটো লঙ্ঘন এবং অপরাধের বিচার করত। ফৌজদারি প্রাথমিক আদালতগুলোর শুধু অপরাধের বিচার করত। তারপর আপিল আদালত প্রাথমিক অপরাধের বিচার করত। ফৌজদারি আদালত ছিল আপিল বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত। যা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার করত। ফৌজদারি আদালতে থাকত আপিল আদালতের তিনজন উপদেষ্টা। এই আদালতের রায়গুলো কোনো আপিল গ্রহণ করত না। তবে রেফার আদালতের সামনে রেফারের মাধ্যমে আদালতের রায়গুলো নিয়ে আলোচনা করার বৈধতা ছিল। ফৌজদারি আদালতের সহযোগী ছিল সাধারণ প্রতিনিধি পাবলিক প্রসিকিউশনের মাধ্যমে। আর তদন্ত বিচারক মামলার তদন্ত করত। তদন্ত করার পরে ফৌজদারি আদালত মামলার শুনানি শুরু করত। সিরিয়ার এই আদালতগুলো ছিল স্বাধীন ফৌজদারি মামলা আইনের অধীনে।
৬. আপিল আদালত
এটি একজন প্রধান বিচারক এবং দুইজন উপদেষ্টা নিয়ে গঠিত ছিল। ফৌজদারি মামলা এবং যেসব মামলা আপিল গ্রহণ করত, এই আদালত সেসব মামলার মীমাংসা করত। (বিচার বিভাগীয় আইনের ৪১ নং ধারা এবং দেওয়ানি মামলা নীতির ৭৯ নং ধারা।)
৭. রেফার আদালত
এর মূল কেন্দ্র ছিল দামিস্কে। একজন প্রধান বিচারক, প্রধান বিচারকের কয়েকজন প্রতিনিধি এবং দুইজন উপদেষ্টা নিয়ে এই আদালত গঠিত হতো। এই আদালত ছিল তিন ভাগে বিভক্ত। যথা: ১. দেওয়ানি এবং বাণিজ্যিক মামলা বিভাগ, ২. ফৌজদারি মামলা বিভাগ এবং ৩. ব্যক্তিগত মামলা বিভাগ। তিনজন উপদেষ্টার সমন্বয়ে রেফার আদালত তার সিদ্ধান্ত জারি করত। (বিচার বিভাগের ৪৪ নং ধারা এবং তার পরবর্তী ধারাগুলো।)
টিকাঃ
[১১২৩] তানযীমুল আহওয়ালিশ শাখসিয়্যাহ, লিগায়রিল মুসলিমিন, পৃ. ৩৭, ৬১, ৬২ এবং ৬৫
[১১২৪] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ১০৮; মাজমুআতু তাকনীনি উসূলিল মুহাকামাত, পৃ. ১৮১
📄 শারঈ আদালতের পরিধি
সিরিয়ার শারঈ আদালত একদিক থেকে একটি স্বাধীন আদালত হিসেবে বিবেচিত হতো। অন্যদিক থেকে সেটি ছিল একটি বিশেষ আদালত। এই আদালত কেবলমাত্র নির্ধারিত মামলাগুলোর শুনানি করত।
এরপর আসে সিরিয়ান কোড অফ সিভিল প্রসিডিউর। এই আইন শারঈ আদালত সম্পর্কে কথা বলার জন্য ৪ নং বই নির্দিষ্ট করে দেয়। এ আইন এ-কথাও স্পষ্ট করে দেয় যে, শারঈ আদালতের পরিধি দুটি মৌলিক অংশে বিভক্ত।
১. সাধারণ পরিধি: শারঈ আদালতের পরিধি ছিল মতাদর্শিক। চিন্তা-চেতনার ভিন্নতা সত্ত্বেও সমস্ত সিরিয়াবাসীর কিছু বিষয়ের মামলার শুনানির নির্ধারিত দায়িত্ব। এমনকি সিরিয়ায় বসবাসকারী সিরিয়ান নয় বিদেশিদের জন্যও তা প্রযোজ্য হতো। ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক রায়ের ক্ষেত্রে তারা ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুসরণ করত। অভিভাবকত্ব, উইল বা ওসিয়ত, আইনি প্রতিনিধিত্ব, মৃত্যু প্রমাণ করা, উত্তরাধিকারীদের জন্য উত্তরাধিকারের ভাগ নির্ধারণ করা, বংশ, স্বামী/স্ত্রী এবং সন্তান ব্যতীত আত্মীয়দের ভরণপোষণ, নিষেধাজ্ঞা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, প্রাপ্তবয়স্কতা প্রমাণ করা এবং নিখোঁজ ব্যক্তির দায়িত্ব ছিল সাধারণ পরিধির অন্তর্ভুক্ত। (ধারা নং: ৫৫৩। আই.এম.)
২. বিশেষ পরিধি: শারঈ আদালতের নির্ধারিত দায়িত্ব ছিল কেবল মুসলিমদের পারিবারিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত মামলাগুলোর দেখাশোনা করা। বিবাহ-শাদি, বিবাহ বিচ্ছেদ, দেনমোহর, যৌতুক, শিশুর লালনপালন, স্তন্যপান করানো, স্বামী/স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে ভরণপোষণ, শারঈ হুকুম, প্রয়োজনীয়তা ও শর্তসাপেক্ষে জনকল্যাণমূলক দাতব্য ওয়াকফ ছিল এই দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। (ধারা নং: ৫৩৬। আই.এম) আরও ছিল ওসিয়ত, জনকল্যাণমূলক দাতব্য ওয়াকফের সমস্ত অধিকার নিয়ন্ত্রণ, বিবাহ চুক্তি এবং সেটাকে নিশ্চিতকরণ, তালাক তথা বিবাহ বিচ্ছেদ, আইনি উত্তরাধিকার নির্ধারণ নথিপত্র, শারঈ আইনি প্রতিনিধি নিযুক্ত করা, ভরণপোষণ আরোপ করা, পরস্পর সন্তুষ্টির মাধ্যমে ভরণপোষণ রহিত করা, বাবা-মায়ের অনুমোদনের সাথে সন্তানের বংশ সাব্যস্ত করা এবং নতুন চাঁদ সাব্যস্ত করা। (ধারা নং: ৫৩৮। আই. এম)
টিকাঃ
[১১২৫] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ১১২
📄 সিরিয়ার শারঈ বিচারকের শর্তাবলি
সিরিয়ায় সাধারণভাবে বিচার বিভাগ, পাবলিক প্রসিকিউশন এবং বিশেষভাবে শারঈ আদালতে যে দায়িত্ব পালন করত, তার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত প্রযোজ্য ছিল সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হলো।
১. ব্যক্তিটির কমপক্ষে পাঁচ বছর সিরিয়ান আরব প্রজাতন্ত্রের নাগরিকত্ব থাকতে হবে। তার ধর্ম বা বর্ণ যা-ই হোক না কেন।
২. তাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ যোগ্য হতে হবে এবং নাগরিক অধিকার ভোগ করতে হবে।
৩. তাকে অবশ্যই সংক্রামক রোগ এবং এমন অক্ষমতা থেকে মুক্ত হতে হবে, যা তাকে দায়িত্ব পালন করতে বাধা দেয়।
৪. বয়স। একজন সহকারী শারঈ বিচারক বা একজন প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ হলে তার বয়স ২২ হতে হবে। আর আপিল আদালতের সভাপতি এবং রেফার আদালতের উপদেষ্টা পদের জন্য বয়স কমপক্ষে ৩৫ হওয়া বাঞ্ছনীয়। সর্বোচ্চ বয়স হলো ৫০।
৫. প্রার্থী যেন কোনোভাবেই গুরুতর বা জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত না হয়। কিংবা এক বছর মেয়াদের বেশি সময় যেন কারাদণ্ডে দণ্ডিত না হয়।
৬. প্রার্থীকে অবশ্যই আইনের ডিগ্রিধারী হতে হবে। প্রযোজ্য আইনে নির্ধারিত এবং নিরপেক্ষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এ ক্ষেত্রে শারঈ বিচার বিভাগের সনদও গৃহীত হবে না।
৭. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তথা সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ অবশ্যই তার মনোনয়ন গ্রহণে সম্মত হতে হবে।
টিকাঃ
[১১২৬] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ১০২ এবং ১০৩