📄 সিরিয়ায় শারঈ বিচারব্যবস্থা
সিরিয়া ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উসমানি সালতানাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘৃণ্য ফরাসি প্রতিনিধির অধীনতা গ্রহণ করে। তথাপি তুরস্কের পূর্ববর্তী বিচারব্যবস্থাই সিরিয়ায় চলতে থাকে। ফরাসি হাই কমিশনার ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশ্র আদালত প্রতিষ্ঠা করে। এই আদালতগুলোকে দেওয়া উচ্চতর ক্ষমতা এবং পরিধি ছিল সিরিয়ার দূতাবাস-সম্বন্ধীয় ক্ষমতা এবং পরিধি থেকে বেশি। পরবর্তী সময়ে ফরাসি প্রতিনিধির অবসানের সাথে সাথে মিশ্র আদালত পদ্ধতিরও অবসান ঘটে। ১৯৪৭ সালে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। অবশিষ্ট আদালতগুলো সিরিয়ায় আপন অবস্থাতেই চলছিল। এরপর ২৮শে সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ৭৪ নং আইন এবং ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২২শে জুন ৮৫ নং সংশোধিত আইন অনুসারে ‘সিভিল প্রসিডিউর কোড’ জারি করা হয়। ১৯৫৩ সালের ৮ই অক্টোবরে আরও জারি করা হয় বিচার বিভাগের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট আইন। এই আইন দুটিই সিরিয়ার বর্তমান বিচারব্যবস্থা পরিচালিত করছে। সাধারণ বিচারব্যবস্থা এবং বিশেষভাবে শারঈ বিচারব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে উপস্থাপন করা হবে।
টিকাঃ
[১১১৬] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৯৬
📄 সৌদি আরবে শারঈ বিচারব্যবস্থা
নাজদ এবং রিয়াদে বাদশাহ আবদুল আজিজ আধিপত্য বিস্তার করার পর এই অঞ্চলগুলোতে উসমানি শাসনের প্রভাব বিলুপ্ত হয়। তখন প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সৌদি আরব রাজ্য’। এরপর রাষ্ট্র বিস্তার হতে হতে হিজাজ-সহ আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর আগে সমস্ত অঞ্চলের বিচারব্যবস্থা তিন ধরনে বিভক্ত ছিল।
প্রথম ধরনটি ছিল হিজাজে। এখানকার বিচারব্যবস্থা হিজাজের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক উন্নত এবং আধুনিক ছিল। কেননা হিজাজ উসমানি সাম্রাজ্যের চালু করা দেওয়ানি বিচারব্যবস্থার সংশোধনীগুলোর পাশাপাশি ইসলামি শরীয়ত বাস্তবায়ন করে আসছিল। বিশেষত ১৮৩৯, ১৮৫৬ এবং ১৮৭৬ সালের সংশোধনী আইন উল্লেখযোগ্য। এসব নতুন ব্যবস্থাপনা হিজাজের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ আরব বিদ্রোহের পর শরিফ হুসাইন এসকল নতুন নতুন ব্যবস্থাপনা বিলুপ্ত করে দেন। এরপর আদালত শুধু শারঈ ব্যবস্থাপনার ওপরে বাকি থাকে। মক্কায় একটি বৃহৎ এবং প্রধানতম আদালত ছিল। যা-তে একজন প্রধান বিচারক এবং তিনজন প্রতিনিধি ছিলেন। তারা ছিলেন আদালতের সদস্য পর্যায়ের। এদের প্রত্যেকে ইসলামের প্রসিদ্ধ মাযহাবগুলোর কোনো একটি মাযহাবের প্রতিনিধিত্ব করতেন। প্রত্যেক বিচারকের কাছে ওসিয়ত এবং বিবাহ সম্পর্কিত বিভিন্ন মামলা উত্থাপন করা হতো।
দ্বিতীয় ধরন হলো নাজদের বিচারব্যবস্থা। এই বিচারব্যবস্থায় বিচার-সংক্রান্ত সংশোধনীর কোনো প্রভাব ছিল না। প্রচলিত রীতিনীতি, ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী বিবাদ মীমাংসার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত উত্তরাধিকারী বিচারব্যবস্থা অনুসারে এই অঞ্চলের বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে আসছিল। বিচারব্যবস্থায় বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করত বিচারক এবং আমির। আমির প্রথমে চেষ্টা করতেন দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতা করে দিতে। দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতা না হলে বিচারকের কাছে মামলা রেফার করে দিতেন। বিচারক রায় জারি করার সময় রায় বাস্তবায়নের জন্য সেটা আমিরের কাছে পেশ করতেন। বিচারের এখানে মৌলিক উৎস ছিল আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহ। বিচারের উৎসকে ‘আশ-শারউ’ তথা বিচার পরিষদ বলা হতো।
তৃতীয় ধরন তথা গোত্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। বিভিন্ন গোত্র এ ব্যবস্থা প্রয়োগ করত। এ ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি ছিল প্রচলিত রীতিনীতি এবং পূর্বসূরিদের বিচারাচার। সর্বজনস্বীকৃত বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ এবং প্রজ্ঞার অধিকারীরা এই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। গোত্রের রীতিনীতি সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা থাকত। দুই গোত্রের মাঝে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তারা সালিশের আশ্রয় নিতেন।
১৩৪৩ সালে হিজাজ নাজদের অধীনস্থ এলাকাগুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং ‘সৌদি আরব রাজ্য’ ঘোষিত হয়। আদালত ও বিচার বিভাগে আগের অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। উসমানি সালতানাতের ধারা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে যেমনটি ২৭/১২/১৩৪৫ হিজরির ১১৬৬ নং স্পষ্ট পাবলিক প্রসিকিউশনে এসেছে। এরপর ধীরে ধীরে আরব রাজ্যের সকল প্রান্তে একই পদ্ধতিতে বিচারব্যবস্থা চালু হয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা একীভূত করা হয়।
📄 আধুনিক যুগে শারঈ বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
পূর্বের আলোচনা থেকে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে আরব দেশগুলোর বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো এমন:
১. অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র বেসামরিক এবং শারঈ—উভয় বিচারব্যবস্থাই গ্রহণ করে নিয়েছে। কিছু কিছু দেশ একটি স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা হিসেবে শারঈ আদালতকে বিলুপ্ত করে দিলেও বেসামরিক বিচারব্যবস্থার ছত্রছায়ায় শারঈ বিচারব্যবস্থার কিছু অস্তিত্ব এখনো রয়েছে। কোনো কোনো আরব দেশ শারঈ বিচারব্যবস্থাকে মৌলিক এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থা মনে করে। কিন্তু শারঈ বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি কিছু অর্ধ বিচারিক সংস্থা পাওয়া যায়, কার্যক্রমের ক্ষেত্রে যেগুলো শারঈ বিচারব্যবস্থার অংশীদার।
২. বেসামরিক বিচারব্যবস্থাকে মৌলিক এবং সাধারণ এখতিয়ারের অধিকারী বিচারব্যবস্থা মনে করা হয়। এই বিচারব্যবস্থার বিরাট প্রভাব আছে। আরব রাষ্ট্রগুলোয় এই বিচারব্যবস্থার একাধিক আদালত আছে। বেসামরিক বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি কিংবা তার ভেতরে নির্দিষ্ট পরিসরে শারঈ বিচারব্যবস্থা পাওয়া যায়। সাধারণভাবে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক আদালতের ক্ষেত্রে শারঈ বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধ পরিধি থাকে। আর শারঈ বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ প্রভাব পাওয়া যায়।
৩. আরব রাষ্ট্রগুলোতে বিচারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে অংশীদারিত্ব মূলক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু এসব ব্যবস্থাপনার মাঝে ভীষণ বৈপরীত্য থাকে। এর চেয়েও ভয়ংকর কথা হলো, আরব রাষ্ট্রগুলোর মাঝে আইন এবং বিচার নীতির ক্ষেত্রেও এই বৈপরীত্যের দেখা মিলে। এগুলো আরব বিশ্বের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, দাসত্ব এবং আঞ্চলিকতাকে আরও দৃঢ় করে। এসবের মাধ্যমে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো থেকে আমদানিকৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের মাধ্যমে আইনি সাম্রাজ্যবাদকে নিশ্চিত হয়। অধিকাংশ রাষ্ট্রেই ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া ইসলামি আইনের কোনো প্রভাব বাকি নেই।
৪. বর্তমান অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে কেবল ব্যক্তিগত বিষয়ে শারঈ আদালতের পরিধি আছে। এর পাশাপাশি বেসামরিক এবং দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়ে শারঈ আদালত সামান্য পরিধিই রেখে থাকে। অথচ বিচারের ক্ষেত্রে শারঈ আদালতই সাধারণ পরিধি এবং ব্যাপক ক্ষমতার দাবিদার।
৫. ধর্ম এবং মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তি ধর্মীয় আধ্যাত্মিক, সাম্প্রদায়িক এবং মতাদর্শিক আদালতের বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকে। বেসামরিক আদালতের মধ্যে অমুসলিমরা যেমন বিচারের দায়িত্ব পালন করে। কখনো কখনো অমুসলিমরা মুসলিমদের ব্যক্তিগত বিষয়ে আইনত বা কার্যত বিচারের দায়িত্ব পালন করে।
৬. অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র এক প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে শারঈ বিচারব্যবস্থায় মামলা পরিচালনা করে। তারপর তদন্ত এবং যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সর্বোচ্চ আদালতে মামলাগুলো পেশ করা হয়। জর্ডানে এই কোর্টকে আপিল কোর্ট বলা হয়। অথবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেফার আদালতের একটি বিভাগ আছে। অথচ কিছু কিছু আরব রাষ্ট্র দুই বিভাগের ব্যবস্থাপনাই শরীয়তের ওপর বাস্তবায়ন করতে চায়। ফলে শারঈ আদালত গঠিত হয় প্রাথমিক আদালত দিয়ে। তারপর পর্যায়ক্রমে আপিল এবং রেফার আদালত।
পূর্বের আলোচনা থেকে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে আরব দেশগুলোর বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো এমন:
১. অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র বেসামরিক এবং শারঈ—উভয় বিচারব্যবস্থাই গ্রহণ করে নিয়েছে। কিছু কিছু দেশ একটি স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা হিসেবে শারঈ আদালতকে বিলুপ্ত করে দিলেও বেসামরিক বিচারব্যবস্থার ছত্রছায়ায় শারঈ বিচারব্যবস্থার কিছু অস্তিত্ব এখনো রয়েছে। কোনো কোনো আরব দেশ শারঈ বিচারব্যবস্থাকে মৌলিক এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থা মনে করে। কিন্তু শারঈ বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি কিছু অর্ধ বিচারিক সংস্থা পাওয়া যায়, কার্যক্রমের ক্ষেত্রে যেগুলো শারঈ বিচারব্যবস্থার অংশীদার।
২. বেসামরিক বিচারব্যবস্থাকে মৌলিক এবং সাধারণ এখতিয়ারের অধিকারী বিচারব্যবস্থা মনে করা হয়। এই বিচারব্যবস্থার বিরাট প্রভাব আছে। আরব রাষ্ট্রগুলোয় এই বিচারব্যবস্থার একাধিক আদালত আছে। বেসামরিক বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি কিংবা তার ভেতরে নির্দিষ্ট পরিসরে শারঈ বিচারব্যবস্থা পাওয়া যায়। সাধারণভাবে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক আদালতের ক্ষেত্রে শারঈ বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধ পরিধি থাকে। আর শারঈ বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ প্রভাব পাওয়া যায়।
৩. আরব রাষ্ট্রগুলোতে বিচারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে অংশীদারিত্ব মূলক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু এসব ব্যবস্থাপনার মাঝে ভীষণ বৈপরীত্য থাকে। এর চেয়েও ভয়ংকর কথা হলো, আরব রাষ্ট্রগুলোর মাঝে আইন এবং বিচার নীতির ক্ষেত্রেও এই বৈপরীত্যের দেখা মিলে। এগুলো আরব বিশ্বের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, দাসত্ব এবং আঞ্চলিকতাকে আরও দৃঢ় করে। এসবের মাধ্যমে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো থেকে আমদানিকৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের মাধ্যমে আইনি সাম্রাজ্যবাদকে নিশ্চিত হয়। অধিকাংশ রাষ্ট্রেই ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া ইসলামি আইনের কোনো প্রভাব বাকি নেই।
৪. বর্তমান অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে কেবল ব্যক্তিগত বিষয়ে শারঈ আদালতের পরিধি আছে। এর পাশাপাশি বেসামরিক এবং দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়ে শারঈ আদালত সামান্য পরিধিই রেখে থাকে। অথচ বিচারের ক্ষেত্রে শারঈ আদালতই সাধারণ পরিধি এবং ব্যাপক ক্ষমতার দাবিদার।
৫. ধর্ম এবং মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তি ধর্মীয় আধ্যাত্মিক, সাম্প্রদায়িক এবং মতাদর্শিক আদালতের বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকে। বেসামরিক আদালতের মধ্যে অমুসলিমরা যেমন বিচারের দায়িত্ব পালন করে। কখনো কখনো অমুসলিমরা মুসলিমদের ব্যক্তিগত বিষয়ে আইনত বা কার্যত বিচারের দায়িত্ব পালন করে।
৬. অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র এক প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে শারঈ বিচারব্যবস্থায় মামলা পরিচালনা করে। তারপর তদন্ত এবং যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সর্বোচ্চ আদালতে মামলাগুলো পেশ করা হয়। জর্ডানে এই কোর্টকে আপিল কোর্ট বলা হয়। অথবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেফার আদালতের একটি বিভাগ আছে। অথচ কিছু কিছু আরব রাষ্ট্র দুই বিভাগের ব্যবস্থাপনাই শরীয়তের ওপর বাস্তবায়ন করতে চায়। ফলে শারঈ আদালত গঠিত হয় প্রাথমিক আদালত দিয়ে। তারপর পর্যায়ক্রমে আপিল এবং রেফার আদালত।
📄 পরিশিষ্ট
এতক্ষণ বিভিন্ন যুগের ইসলামি বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নবি-যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন কিছু পয়েন্টের মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনার সংক্ষিপ্ত ফলাফল উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. নবি-যুগে ইসলামি বিচারব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। রাশিদুন যুগে তা বেড়ে উঠে পূর্ণাঙ্গতা পায়, স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করে। উমাইয়া যুগে এবং আব্বাসি যুগের প্রথম ভাগে ইসলামি বিচারব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এরপর আব্বাসি যুগের শেষে, তারপর মামলুক যুগে, এরপর উসমানি যুগে বিচারব্যবস্থায় ক্ষয় ধরে। ধীরে ধীরে বর্তমান যুগে এসে তা নিশ্চিহ্নপ্রায় হয়ে গেছে। কিছু কিছু আরব রাষ্ট্রে ইসলামি বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে। অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রেই ইসলামি বিচারব্যবস্থাকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
২. ইসলামি বিচারব্যবস্থা হলো ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের প্রতিনিধি। নৈপুণ্য, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা আর নীতির সংরক্ষণ, মানুষের অধিকার, জান ও মাল সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তা একটি দৃষ্টান্ত।
৩. দীর্ঘ ইতিহাসে এক ঝাঁক শ্রেষ্ঠ বিচারকের নমুনা পাওয়া যায়। যারা ন্যায় এবং ইনসাফের সাথে বিচার করতেন। সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো ক্ষমতা, প্রভাব, কোনো শাসককে ভয় করতেন না। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তাঁদের ছিল না।
৪. ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ইসলামি বিচারব্যবস্থায় একতা ছিল। শারঈ বিচারক ছিলেন রাষ্ট্রের একমাত্র বিচারের আশ্রয়। এ অবস্থা ছিল উসমানি শাসনের দ্বিতীয় যুগ পর্যন্ত। এরপর বিচারব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে দ্বৈত নীতি। শারঈ আদালতের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় বেসামরিক আদালত। জীবনের সমস্ত অঙ্গনে বেসামরিক আদালত শারঈ আদালতের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে।
৫. অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারঈ বিচারব্যবস্থা প্রথম স্তরের একজন বিচারকের বিচারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরকমই হতো। পক্ষান্তরে আপিল আদালত এবং রেফার আদালত একটি দলের বিচারের ওপর নির্ভরশীল। যা তিন বা ততোধিক উপদেষ্টার সমন্বয়ে গঠিত হতো।
৬. ইসলামি বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য পরিপূর্ণ সুস্পষ্ট। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে তা এভাবেই চলে আসা প্রমাণিত। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় একইভাবে ইসলামি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, জান-মাল এবং ইজ্জত-আবরুর সংরক্ষণ, জুলুম আর সীমালঙ্ঘনের প্রতিরোধ, হকদারদের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, শরীয়তের বিধিবিধান সঠিকভাবে বাস্তবায়ন, শাশ্বত দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলামি আইনের উৎস থেকে গৃহীত ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করার একমাত্র দায়িত্বশীল হলো ইসলামি বিচারব্যবস্থা।
৭. ইসলামি বিচারব্যবস্থার প্রাথমিক অবস্থা সুস্পষ্ট এবং সুসাব্যস্ত। তবে মানুষের প্রয়োজন, ইসলামের বিজয়ধারা, সম্প্রসারণ এবং সমাজ, রাষ্ট্র আর ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তনে এসব বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার পদ্ধতি পরিবর্তিত হতে থাকে। এ কারণেই দেখা যায়, অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। বিচারকের পরিধি স্থান এবং কাল ভেদে সম্প্রসারিত হয়েছে। তাকে এমন দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে, যা বিচার সংশ্লিষ্ট নয়। আবার বিচারব্যবস্থার স্থান এবং কালও বদলেছে। প্রয়োজনবোধে একাধিক বিচারক এবং বিচারালয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এত পরিবর্তন সত্ত্বেও ইসলামি বিচারব্যবস্থা সগৌরবে মাথা উঁচু করে ছিল।
৮. ইসলামি বিচারব্যবস্থার প্রথম যুগ থেকে নিয়ে আব্বাসি যুগের মাঝামাঝি কাল অবধি—এ সময়ের বিচারকরা ছিলেন মুজতাহিদ তথা গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত। তার পরবর্তী বিচারকরা প্রসিদ্ধ এবং স্বীকৃত মাযহাবের অনুসরণ করেছেন।
৯. সরাসরি ইসলামি আইন তথা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস ইত্যাদির মাঝেই ইসলামি বিচারব্যবস্থার উৎস ছিল সীমাবদ্ধ। তারপর ফতোয়া এবং বিচারব্যবস্থা সংক্রান্ত মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদিই ভরসা হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে আসে সাম্রাজ্যবাদী আইন। ভিনদেশ থেকে আমদানি করা হয় আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। উসমানি সালতানাতের দ্বিতীয় যুগ থেকে নিয়ে বর্তমান যুগ পর্যন্ত এভাবেই চলে আসছে।
১০. নবি-যুগেই অন্যায়ের বিচারব্যবস্থার বীজ বপন করা হয়েছিল। উমাইয়া যুগে তা বেড়ে উঠে এবং ডালপালা ছড়ায়। ইসলামের ইতিহাসে অন্যায়ের বিচার অন্যতম স্থান তৈরি করে নেয়। কিন্তু আস্তে আস্তে আরব রাষ্ট্রগুলো থেকে তা প্রায় বিদায়ই নিয়েছে। এর জায়গা দখল করেছে প্রশাসনিক বিচারব্যবস্থাপনা অথবা রাষ্ট্র পরিষদ। এক সৌদি আরব ছাড়া অন্যায়ের বিচারের কার্যত অস্তিত্ব কোথাও নেই। বিচার বিভাগের এই নামটাই কেবল ব্যবহার করা হয়। একই অবস্থা হয়েছে হিসবাহ বিচারের ক্ষেত্রেও। ইতিহাসের অলিগলি পেরিয়ে বর্তমানে তা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিভাগ এর কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করলেও সমকালীন বিচারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় হিসবাহ বিচারের পরিধি একদমই নেই।
১১. উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনের পাশাপাশি একাধিক বিচার পদ্ধতি চালু হয়েছে। প্রয়োজন, জনস্বার্থ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দরকারে ইসলামি দেশগুলোতে চালু হয়েছে বিচারকের একাধিক সহযোগী।
১২. আলিম, ফকিহ আর মুজতাহিদদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ দেয়া হতো। তারপর প্রত্যেক শহরে প্রচলিত মাযহাব অনুসারীদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার পদ্ধতি চালু হয়। উসমানি যুগে হানাফি মাযহাব প্রাধান্য পায়। বর্তমান যুগে আরব রাষ্ট্রগুলোতে অন্যান্য বিচারকদের মাধ্যমে শারঈ বিচারকদের নিয়োগ দেয়া হয়। বিচারক নিয়োগের বিষয়টি অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে বা আইন ইনস্টিটিউট থেকে গ্রাজুয়েটদের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিছু কিছু আরব রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়, শরীয়াহ অনুষদ, বিচার বিভাগের উচ্চতর ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। শেষ যুগে কিছু কিছু বিচারকের মাঝে দুর্বলতা আর দুর্নীতি দেখা দেয়।
১৩. নবি-যুগে বিচারের দায়িত্বে ছিল শক্তিশালী ভিত্তি। ইসলামি বিচার বিভাগের ব্যবস্থা ছিল সামগ্রিক এবং পরিপূর্ণ। এ যুগেই গতিশীল বিচারব্যবস্থার সূচনা ঘটে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে যা ছিল গতিশীল। প্রশাসনিকভাবে এবং গঠনমূলকভাবে নবি-যুগের বিচার সর্বজনীন ইসলামি বিচারব্যবস্থার উৎস। রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থাও পরবর্তী ইসলামি বিচারব্যবস্থার উৎস। প্রত্যেক যুগেই তার পূর্ববর্তীদের বিচারব্যবস্থা হলো দৃষ্টি এবং নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু।
১৪. আব্বাসি যুগের শেষ সময়ে বিচারব্যবস্থায় দুর্বলতা সংক্রমিত হতে থাকে। ধেয়ে আসতে থাকে পতন। অনিবার্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। মামলুক এবং উসমানি যুগেও যা অব্যাহত ছিল। শেষে উসমানি যুগে এসে বিচারব্যবস্থায় সত্য আর মিথ্যা মিশে যায়। অবিচলতা আর শক্তির সাথে দুর্বলতা আর অবসন্নতার সংমিশ্রণ ঘটে। তারপরও উসমানি যুগ ছিল ইসলাম আর ইসলামের আইন থেকে বেরিয়ে আসা ও পরিবর্তন হওয়ার টার্নিং পয়েন্ট। এ সময় জারি করা হয় অনেক ভিনদেশি আইন এবং ব্যবস্থাপনা। প্রতিষ্ঠিত হয় বেসামরিক এবং নাগরিক আদালত। যা শরীয়ত মেনে চলা তো দূরের কথা, শাশ্বত শরীয়ত থেকে অনেক দূরে ছিল তার অবস্থান।
১৫. বর্তমান যুগে শারঈ বিচারব্যবস্থা কেবল বিবাহ-শাদি, তালাক, ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ের গণ্ডির ভেতর এক সংকীর্ণ আঙিনায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে তার অস্তিত্ব এবং স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে বেসামরিক বিচারব্যবস্থার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। কিছু কিছু আরব রাষ্ট্রে তো নানা ধরনের চাপের প্রভাবে শারঈ বিচারব্যবস্থা একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এতক্ষণ বিভিন্ন যুগের ইসলামি বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নবি-যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন কিছু পয়েন্টের মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনার সংক্ষিপ্ত ফলাফল উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. নবি-যুগে ইসলামি বিচারব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। রাশিদুন যুগে তা বেড়ে উঠে পূর্ণাঙ্গতা পায়, স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করে। উমাইয়া যুগে এবং আব্বাসি যুগের প্রথম ভাগে ইসলামি বিচারব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। এরপর আব্বাসি যুগের শেষে, তারপর মামলুক যুগে, এরপর উসমানি যুগে বিচারব্যবস্থায় ক্ষয় ধরে। ধীরে ধীরে বর্তমান যুগে এসে তা নিশ্চিহ্নপ্রায় হয়ে গেছে। কিছু কিছু আরব রাষ্ট্রে ইসলামি বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে। অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রেই ইসলামি বিচারব্যবস্থাকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
২. ইসলামি বিচারব্যবস্থা হলো ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের প্রতিনিধি। নৈপুণ্য, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা আর নীতির সংরক্ষণ, মানুষের অধিকার, জান ও মাল সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তা একটি দৃষ্টান্ত।
৩. দীর্ঘ ইতিহাসে এক ঝাঁক শ্রেষ্ঠ বিচারকের নমুনা পাওয়া যায়। যারা ন্যায় এবং ইনসাফের সাথে বিচার করতেন। সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো ক্ষমতা, প্রভাব, কোনো শাসককে ভয় করতেন না। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তাঁদের ছিল না।
৪. ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ইসলামি বিচারব্যবস্থায় একতা ছিল। শারঈ বিচারক ছিলেন রাষ্ট্রের একমাত্র বিচারের আশ্রয়। এ অবস্থা ছিল উসমানি শাসনের দ্বিতীয় যুগ পর্যন্ত। এরপর বিচারব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে দ্বৈত নীতি। শারঈ আদালতের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় বেসামরিক আদালত। জীবনের সমস্ত অঙ্গনে বেসামরিক আদালত শারঈ আদালতের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে।
৫. অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারঈ বিচারব্যবস্থা প্রথম স্তরের একজন বিচারকের বিচারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরকমই হতো। পক্ষান্তরে আপিল আদালত এবং রেফার আদালত একটি দলের বিচারের ওপর নির্ভরশীল। যা তিন বা ততোধিক উপদেষ্টার সমন্বয়ে গঠিত হতো।
৬. ইসলামি বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য পরিপূর্ণ সুস্পষ্ট। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে তা এভাবেই চলে আসা প্রমাণিত। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় একইভাবে ইসলামি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, জান-মাল এবং ইজ্জত-আবরুর সংরক্ষণ, জুলুম আর সীমালঙ্ঘনের প্রতিরোধ, হকদারদের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, শরীয়তের বিধিবিধান সঠিকভাবে বাস্তবায়ন, শাশ্বত দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলামি আইনের উৎস থেকে গৃহীত ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করার একমাত্র দায়িত্বশীল হলো ইসলামি বিচারব্যবস্থা।
৭. ইসলামি বিচারব্যবস্থার প্রাথমিক অবস্থা সুস্পষ্ট এবং সুসাব্যস্ত। তবে মানুষের প্রয়োজন, ইসলামের বিজয়ধারা, সম্প্রসারণ এবং সমাজ, রাষ্ট্র আর ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তনে এসব বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার পদ্ধতি পরিবর্তিত হতে থাকে। এ কারণেই দেখা যায়, অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। বিচারকের পরিধি স্থান এবং কাল ভেদে সম্প্রসারিত হয়েছে। তাকে এমন দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে, যা বিচার সংশ্লিষ্ট নয়। আবার বিচারব্যবস্থার স্থান এবং কালও বদলেছে। প্রয়োজনবোধে একাধিক বিচারক এবং বিচারালয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এত পরিবর্তন সত্ত্বেও ইসলামি বিচারব্যবস্থা সগৌরবে মাথা উঁচু করে ছিল।
৮. ইসলামি বিচারব্যবস্থার প্রথম যুগ থেকে নিয়ে আব্বাসি যুগের মাঝামাঝি কাল অবধি—এ সময়ের বিচারকরা ছিলেন মুজতাহিদ তথা গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত। তার পরবর্তী বিচারকরা প্রসিদ্ধ এবং স্বীকৃত মাযহাবের অনুসরণ করেছেন।
৯. সরাসরি ইসলামি আইন তথা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস ইত্যাদির মাঝেই ইসলামি বিচারব্যবস্থার উৎস ছিল সীমাবদ্ধ। তারপর ফতোয়া এবং বিচারব্যবস্থা সংক্রান্ত মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদিই ভরসা হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে আসে সাম্রাজ্যবাদী আইন। ভিনদেশ থেকে আমদানি করা হয় আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। উসমানি সালতানাতের দ্বিতীয় যুগ থেকে নিয়ে বর্তমান যুগ পর্যন্ত এভাবেই চলে আসছে।
১০. নবি-যুগেই অন্যায়ের বিচারব্যবস্থার বীজ বপন করা হয়েছিল। উমাইয়া যুগে তা বেড়ে উঠে এবং ডালপালা ছড়ায়। ইসলামের ইতিহাসে অন্যায়ের বিচার অন্যতম স্থান তৈরি করে নেয়। কিন্তু আস্তে আস্তে আরব রাষ্ট্রগুলো থেকে তা প্রায় বিদায়ই নিয়েছে। এর জায়গা দখল করেছে প্রশাসনিক বিচারব্যবস্থাপনা অথবা রাষ্ট্র পরিষদ। এক সৌদি আরব ছাড়া অন্যায়ের বিচারের কার্যত অস্তিত্ব কোথাও নেই। বিচার বিভাগের এই নামটাই কেবল ব্যবহার করা হয়। একই অবস্থা হয়েছে হিসবাহ বিচারের ক্ষেত্রেও। ইতিহাসের অলিগলি পেরিয়ে বর্তমানে তা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিভাগ এর কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করলেও সমকালীন বিচারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় হিসবাহ বিচারের পরিধি একদমই নেই।
১১. উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনের পাশাপাশি একাধিক বিচার পদ্ধতি চালু হয়েছে। প্রয়োজন, জনস্বার্থ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দরকারে ইসলামি দেশগুলোতে চালু হয়েছে বিচারকের একাধিক সহযোগী।
১২. আলিম, ফকিহ আর মুজতাহিদদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ দেয়া হতো। তারপর প্রত্যেক শহরে প্রচলিত মাযহাব অনুসারীদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার পদ্ধতি চালু হয়। উসমানি যুগে হানাফি মাযহাব প্রাধান্য পায়। বর্তমান যুগে আরব রাষ্ট্রগুলোতে অন্যান্য বিচারকদের মাধ্যমে শারঈ বিচারকদের নিয়োগ দেয়া হয়। বিচারক নিয়োগের বিষয়টি অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে বা আইন ইনস্টিটিউট থেকে গ্রাজুয়েটদের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিছু কিছু আরব রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়, শরীয়াহ অনুষদ, বিচার বিভাগের উচ্চতর ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। শেষ যুগে কিছু কিছু বিচারকের মাঝে দুর্বলতা আর দুর্নীতি দেখা দেয়।
১৩. নবি-যুগে বিচারের দায়িত্বে ছিল শক্তিশালী ভিত্তি। ইসলামি বিচার বিভাগের ব্যবস্থা ছিল সামগ্রিক এবং পরিপূর্ণ। এ যুগেই গতিশীল বিচারব্যবস্থার সূচনা ঘটে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে যা ছিল গতিশীল। প্রশাসনিকভাবে এবং গঠনমূলকভাবে নবি-যুগের বিচার সর্বজনীন ইসলামি বিচারব্যবস্থার উৎস। রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থাও পরবর্তী ইসলামি বিচারব্যবস্থার উৎস। প্রত্যেক যুগেই তার পূর্ববর্তীদের বিচারব্যবস্থা হলো দৃষ্টি এবং নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু।
১৪. আব্বাসি যুগের শেষ সময়ে বিচারব্যবস্থায় দুর্বলতা সংক্রমিত হতে থাকে। ধেয়ে আসতে থাকে পতন। অনিবার্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। মামলুক এবং উসমানি যুগেও যা অব্যাহত ছিল। শেষে উসমানি যুগে এসে বিচারব্যবস্থায় সত্য আর মিথ্যা মিশে যায়। অবিচলতা আর শক্তির সাথে দুর্বলতা আর অবসন্নতার সংমিশ্রণ ঘটে। তারপরও উসমানি যুগ ছিল ইসলাম আর ইসলামের আইন থেকে বেরিয়ে আসা ও পরিবর্তন হওয়ার টার্নিং পয়েন্ট। এ সময় জারি করা হয় অনেক ভিনদেশি আইন এবং ব্যবস্থাপনা। প্রতিষ্ঠিত হয় বেসামরিক এবং নাগরিক আদালত। যা শরীয়ত মেনে চলা তো দূরের কথা, শাশ্বত শরীয়ত থেকে অনেক দূরে ছিল তার অবস্থান।
১৫. বর্তমান যুগে শারঈ বিচারব্যবস্থা কেবল বিবাহ-শাদি, তালাক, ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ের গণ্ডির ভেতর এক সংকীর্ণ আঙিনায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে তার অস্তিত্ব এবং স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে বেসামরিক বিচারব্যবস্থার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। কিছু কিছু আরব রাষ্ট্রে তো নানা ধরনের চাপের প্রভাবে শারঈ বিচারব্যবস্থা একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।